বই নিয়ে আয়োজন

দেশের এক নম্বর দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক হিসেবেই তাঁকে দেশবাসী চেনে। জাঁদরেল সাংবাদিক তাঁর মুখ্য পরিচয়। তিনি যে একজন বামপন্থি বিপ্লবী ও প্রগতিশীল লেখক―সে পরিচয় অনেকের কাছে অজ্ঞাত। একজন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বাম বিপ্লবী নেতার উপর দীর্ঘ ৪২ বছরের গবেষণা করে তিনি একটি বই লিখেছেন। নিজে যে আদর্শে বিশ্বাস করতেন এবং দীর্ঘকাল যে পার্টির সক্রিয় সদস্য ছিলেন সেই কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস লিখেছেন―সেও অনেক বছর গবেষণা করে। মতিউর রহমানের লেখা দুটি বই নিয়ে সেপ্টেম্বরের কুড়ি তারিখে আলোচনাসভার আয়োজন করল বেঙ্গল বই। অনুষ্ঠানের নাম ‘আলাপে বিস্তারে : মতিউর রহমানের দুটি বই’। আলোচক মফিদুল হক, শেখর দত্ত, সামসুদ্দোজা কাজেন ও জামিল খান।
দেখা হলো আলোচকদের একজন মফিদুল হকের সঙ্গে। তিনি আমাকে Chronicler বলে সম্বোধন।
দেখা হলো বেঙ্গল শিল্পালয়ের পরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী, কবি সাজ্জাদ শরিফ, কথাসাহিত্যিক আফসানা বেগম প্রমুখের সঙ্গে। তাঁরা বাইরের খোলা অংশে শুভেচ্ছা বিনিময় ও আলাপচারিতা করছিলেন। বেঙ্গল গ্রুপের কর্ণধার শিল্পপতি আবুল খায়ের লিটুকে সুস্বাস্থ্য কামনা করলে তিনি বললেন, ‘বেঁচে থাকার বিড়ম্বনা অনেক। অনেক অপ্রিয় বিষয় দেখতে হয়। পড়ন্ত বয়সে স্বাস্থ্য টিকিয়ে রাখাও একটা চ্যালেঞ্জ।’
ঘড়ির কাঁটা সাড়ে চারটায় গিয়ে দাঁড়ালে লুভা নাহিদ চৌধুরীও মেঝে থেকে স্বল্পউঁচু বেদিটির একমাত্র আসবাব পোডিয়ামের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর কথা থেকে জানলাম ২০১৭ সাল থেকে বেঙ্গল বই বই নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। অনেক দিন ধরেই এটা চলছে। মতিউর রহমানকে পরিচয় করিয়ে দেবার যদিও কোনও প্রয়োজন নেই, তবু কিছু তো বলতে হয়। লুভা নাহিদ চৌধুরী বললেন, ‘তাঁকে মতি ভাই বলেই চিনি। তবে একজন লেখক মতিউর রহমান আছেন যিনি তাঁর লেখক পরিচয়টি সামনে আনেননি।’
পত্রিকা সম্পাদনার বাইরে অনেক গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন মতিউর রহমান। একজন অজানা বিপ্লবীর কাহিনি নিয়ে তার প্রথম বইটি চার দশকের সাধনার ফল। বইটি গত বছর প্রকাশিত হয়েছিল। তার যে অন্বেষা তা ঐকান্তিক এবং সত্যানুসন্ধানী। বিপ্লবী তথ্য, গোপন তথ্য। ফলে তা বের করে আনা দুরূহ। এই দুরূহ কাজটি করেছেন প্রথিতযশা সম্পাদক, যার অন্য পরিচয় তিনি ছিলেন বাম আদর্শের একজন কর্মী ও নেতা।

মতিউর রহমান শুরু করলেন অনাড়ম্বর ভঙ্গিতে। অনুষ্ঠানে যোগ দেবার আনন্দ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বললেন, ‘বই তো আছেই, অন্য কারণও আছে। বন্ধুদের সাথে দেখাসাক্ষাৎ হয়। বন্ধুরা এসেছেনও।’ অতঃপর তাঁর দার্শনিক উক্তি, ‘বন্ধুরাই আসেন।’ তাঁর আনন্দ সম্প্রসারিত হলো এ ঘোষণায়, ‘আমার একজন নাতিও এসেছে।’
পার্টির ইতিহাস ও একজন নাম-না-জানা নেতার ওপর লিখিত দুটি বইয়ের মাঝে সম্পর্কটি হলো কমিউনিস্ট মতাদর্শ। বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস নিয়ে প্রথম বই, দ্বিতীয় বই ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নেতা গোলাম আম্বিয়া খান লুহানীর জীবন নিয়ে। দ্বিতীয় বইটি সম্পর্কে তার প্রথম কথা, এটা সত্যি যে ৪২ বছরের চেষ্টায় বইটি লিখিত ও প্রকাশিত, তবে তা ভেঙে ভেঙে করা, ক্রমাগত বা অবিরত চেষ্টায় নয়। অনুমান করা কঠিন নয় এর মাঝে হাজারটা কাজ করেছেন মতিউর রহমান।
বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস বইটি প্রসঙ্গে বললেন, কমিউনিস্ট পার্টি তার জীবনের প্রথম প্রেম। ওটাই প্রথম, ওটাই শেষ। ১৯৯১ সালে তিনি পার্টির কার্যক্রম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। তাঁর ভাষ্য, আমি সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দিইনি, পার্টিও আমার সদস্যপদ খারিজ করেনি। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে নিজের জড়িয়ে পড়া প্রসঙ্গে মতিউর রহমান বললেন, তিনি এমন একটি পারিবারিক পরিবেশে বড় হয়ে উঠেছেন যেখানে কমিউনিস্ট মতাদর্শ প্রভাববিস্তারী ছিল। ১৯৬২ সালে আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে আন্দোলন, ষাটের দশকে ছাত্র ইউনিয়নে সক্রিয় কর্মীর ভূমিকা, একুশে সংকলন প্রকাশ―এ সবই ছিল ধ্যানজ্ঞান। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ এই চার বছর তিনি ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে। তখন সাংস্কৃতিক কর্মীদের মাঝে কোনও সংকীর্ণতা ছিল না। তিনি তাঁর দুজন পুরোনো কমরেড মফিদুল হক ও শেখর দত্তকে এ বক্তব্যের সাক্ষী মানলেন। কারণ তাঁরাও তা দেখেছে।
পাকিস্তান আমলে মুসলিম লীগের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির সখ্য টিকে ছিল এক বছর। এরপরে পাকিস্তান সরকার আমেরিকার চাপে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের গণহারে গ্রেফতার করে নির্যাতন করতে শুরু করে। জেলের ভেতর নিহত হন ১০০ নেতা-কর্মী। ভারতে মৃত্যুবরণ করেছিল ১১০০ বিপ্লবী নেতা-কর্মী। তখন বাইরে বিপ্লব চলছিল, ভেতরেও বিপ্লব চলছিল। জেলের ভেতরে আন্দোলন হয়েছিল। ১৯৫০ সালে রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে ৭ জন বিপ্লবী নিহত হন। খাপড়া ওয়ার্ডের হত্যাকাণ্ড নিয়ে বই প্রকাশ করেছেন মতিউর রহমান। তিনি বললেন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টির বড় ভূমিকা ছিল। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয়, যুক্তফ্রন্ট বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। সেই নির্বাচনে ২৪ জন বামপন্থি বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ কথা বলার পরে মতিউর রহমান আক্ষেপ করে বললেন, ‘আর আজ আমরা কোথায় এসে ঠেকেছি ?’ নিষিদ্ধ ঘোষিত হবার পরে কমিউনিস্ট পার্টি আত্মগোপনে চলে যায়, কিন্তু ছাত্র ইউনিয়ন প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র সাপ্তাহিক একতা পত্রিকা প্রকাশের অনুমতি বহাল ছিল। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি একতা-র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। একতা ছিল স্বাধীনতার প্রতীক, মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনে যে আশা ও স্বপ্ন জেগে উঠেছিল সারা বাংলাদেশে, তা ব্যর্থ হয়েছিল। একদলীয় শাসন সে ব্যর্থতার চূড়ান্ত পরিণতি। এরপরে সেনাঅভ্যুত্থান, পাল্টা সেনা অভ্যুত্থান, সামরিক শাসন, রক্তারক্তি ঘটনাবলি ঘটতে থাকে।
মতিউর রহমান ১৯৮৮ সালে শেষবারের মতো মস্কো গিয়েছিলেন। তখন সবকিছু খোলামেলা আলোচনা হয়। পার্টির ভেতরে থেকে মুক্ত আলোচনা, মুক্ত সংস্কৃতির সাথে যুক্ত হওয়া ছিল কঠিন। রাজনীতি ও সাংবাদিকতা খুবই পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত ও ঘনিষ্ঠ। সংবাদপত্রের যে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ভূমিকা থাকা দরকার। সবসময় সত্য কথা বলে যেতে পারি না।

বইটির প্রথম অংশ বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-র অভ্যন্তরের কার্যক্রমের গভীর বিশ্লেষণ। এর সময়কাল ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬। সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটি। এখানে অনেক নতুন তথ্য আছে। দ্বিতীয় অংশটি দলিলভিত্তিক। ভবিষ্যতে কেউ যদি সিপিবি নিয়ে কাজ করতে চান তবে তা কাজে লাগতে পারে। কমিউনিস্ট আন্দোলন ঠেকাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেক কর্মসূচি নিয়েছিল। ১৯৫৪ সালের জুলাই মাসে সিপিবি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তখন পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টির দুটি শাখা ছিল।
বইতে তিনি বিতর্কিত বিষয়ের অবতারণা করেননি। মতিউর রহমান বললেন তার জীবন গড়ে ওঠার পেছনে ওই কাজগুলোর ভূমিকা রয়েছে। তিনি তাঁর বিপ্লবী সহযোগীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। তাঁর বিপ্লবী বন্ধু কমরেড শেখর দত্ত বই লিখেছেন। তাতে অনেক নাম আছে। অনেক কমরেডই মৃত্যুবরণ করেছেন। সারা জীবন আত্মত্যাগ করে গেছেন, আদর্শবিচ্যুত হননি। অনেক কষ্ট করেছেন তাঁরা, কারাবরণ করেছেন, নির্যাতন সয়েছেন। মতিউর রহমান বললেন, নানা দেশ দেখার সুযোগ তাঁর হয়েছে যা সমৃদ্ধ করেছে তাঁর ভাবনা, চিন্তা, উপলব্ধি।
দ্বিতীয় বই গোলাম আম্বিয়া খান লুহানী―এক অজানা বিপ্লবীর কাহিনি বইটি রচনার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করলেন তিনি। ১৯৮১ সালে তাঁরা ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে দিল্লি যান। তাঁরা দিল্লির ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত মার্গ (সড়ক)-এ অবস্থিত ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির অফিস অজয় ভবনে পার্টির প্রবীণ নেতা, ইতিহাসবিদ ও বিখ্যাত বিজ্ঞানী ড. গঙ্গাধর অধিকারীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। ড. গঙ্গাধর অধিকারী ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অতীত ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তিনি দেশ-বিদেশ থেকে প্রাচীন দলিল সংগ্রহ করছিলেন। মতিউর রহমানের কাছে তার প্রশ্ন ছিল, সে লুহানীকে চেনে কিনা ? মতিউর রহমান ঐ প্রথম গোলাম আম্বিয়া খান লুহানীর নাম শুনেছিলেন। ড. গঙ্গাধর অধিকারী তাঁকে গোলাম আম্বিয়া খান লুহানীর হাতে লেখা চিঠির উত্তর দেখালেন যা বার্লিন থেকে তিনি তাঁর মাকে লিখেছিলেন। এমন একজন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিপ্লবী, পূর্ববঙ্গের মানুষ তিনি, অথচ আমরা কিছুই জানি না। মতিউর রহমানের আগ্রহ সৃষ্টি হলো।
নামের মিল দেখে কৌতূহল হলো ফতেহ লোহানীর পরিবারের সাথে গোলাম আম্বিয়া খান লুহানীর কোনও আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে কিনা। ফতেহ লোহানী কিছু জানতেন না। কিন্তু তাঁর বোন হুসনা বানু বলেছিলেন, তিনি শুনেছেন তাদের এক মামা মস্কো থাকতেন। গোলাম আম্বিয়া খান লুহানীর ভাই গোলাম ইসরাইল খানের পুত্র তখন লে. কর্নেল, পরে মেজর জেনারেল, হেলাল মোর্শেদের কাছে একটা পোটলা পেয়েছিলেন। তাতে মৃত্যুশয্যায় থাকা মায়ের কাছে লেখা তিনটি চিঠি ছিল। মায়ের কাছে তিনি ৩০০ রুপি চেয়েছিলেন। তখন ৩০০ রুপিতে ৩০০০ ফরাসি মুদ্রা ফ্রাঁ পাওয়া যেত। মা ছেলেকে দেশে ফিরে আসতে বলেছিলেন। পরে টাকাও পাঠিয়েছিলেন। মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা ছিল লুহানীর।
গোলাম আম্বিয়া খান লুহানীর একটি সংক্ষিপ্ত জীবনী তিনি শ্রোতাদের সমুখে তুলে ধরলেন। গোলাম আম্বিয়া খান লুহানী জন্মগ্রহণ করেন পাবনা জেলার তৎকালীন সিরাজগঞ্জ মহকুমায়। তিনি আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। অতঃপর বিলাতে যান আইনশাস্ত্র পড়ে ব্যারিস্টার হতে। লন্ডনে গিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। সেখানকার নৌ-শ্রমিকদের সাথে কাজ করতেন। মাসে বেতন পেতেন ১২ পাউন্ড। ১৯১৯ সালে মেক্সিকোতে যে তৃতীয় কমিনটার্ন অনুষ্ঠিত হয় তাতে তিনি যোগ দিয়েছিলেন। এখানেই তিনি পরিচিত হন আরেক বিখ্যাত ভারতীয় বিপ্লবী নেতা মানবেন্দ্র নাথ রায়, যিনি এম এন রায় নামেই সমধিক পরিচিত, তাঁর সঙ্গে। এখানে বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টিকে তাদের কার্যক্রমে সাহায্য করার জন্য সোভিয়েত রাশিয়া একটি তহবিল গঠন করে। সাহায্যের এই ধারা ১৯৯০ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার আগ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলো শুধু মতাদর্শগতভাবে নয়, আর্থিকভাবে নির্ভরশীল ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর।
গোলাম আম্বিয়া খান লুহানী লন্ডন থেকে বার্লিন হয়ে মস্কো যান। সেখান থেকে ফিরে আসেন প্যারিসে, প্যারিস থেকে জেনেভা যান। পরে তিনি প্যারিস থেকে ফের মস্কো যান এবং সেখানেই সেটেল করেন। প্যারিসে তিনি দেখা পান একজন সুন্দরী মডেলের যার নাম গ্রাব্রিয়েল এম সোয়েনে। সে সময়ে বিখ্যাত ইতালিয়ান চিত্রশিল্পী আমেদেও মোদিগ্লিয়ানির ছবিতে মডেলিং করছেন গ্যাব্রিয়েল। এই ফরাসি ফ্যাশন ডিজাইনার ও মডেলকে বিয়ে করেছিলেন গোলাম আম্বিয়া খান লুহানী। ১৯১৯ সালে লন্ডনে তাদের বিয়ে হয়।
২০২৪ সালে নিউ ইয়র্ক থেকে জুলিয়া বডেউইন নামের একজন শিল্পগবেষক মতিউর রহমানকে গ্যাব্রিয়েল এম সোয়েনে নামের একজন নারীর তথ্য চেয়ে ইমেইল করেছিলেন। এই গ্যাব্রিয়েল এম সোয়েনে হলেন সেই নারী যাকে লুহানী বিয়ে করেছিলেন। একবার বিচ্ছেদও হয়েছিল, তারপর পুনর্মিলন ঘটে দুজনের। পেইন্টার রজার ফ্রাই গ্যাব্রিয়েল লুহানীর একটি পোর্টেট এঁকেছিলের যা ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। স্যার এপস্টাইন গ্যাব্রিয়েলের একটি আবক্ষ মূর্তি তৈরি করেছিলেন। ১৯৪৩ সালে গ্যাব্রিয়েল মৃত্যুবরণ করেন। গোলাম আম্বিয়া খান লুহানীকে নিয়ে মতিউর রহমান সাপ্তাহিক একতা ও দৈনিক প্রথম আলোয় বই নিয়ে আয়োজন লিখেছেন, ফিচার ছেপেছেন।

ড. গঙ্গাধর অধিকারীর পরামর্শ মেনে তিনি প্রখ্যাত মার্কসবাদী লেখক ও ইতিহাসবিদ চিন্মোহন সেহানবীশের লেখা গবেষণামূলক গ্রন্থ রুশ বিপ্লব ও প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবী পাঠ করেন। এ বইতে তিনি লুহানী সম্পর্কে কিছু কৌতূহলজাগানিয়া তথ্য পেয়ে যান।
১৯৮২ সালে মতিউর রহমান মস্কো গিয়েছিলেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির জন্য সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির দায়িত্বপ্রাপ্ত ভøাদিমির বাইদাকভের কাছে গোলাম আম্বিয়া খান লুহানী সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি একদিন একটি প্যাকেট নিয়ে আসেন যার ভেতর ছিল লুহানীর জীবনপঞ্জির ফটোকপি, যাতে প্রশ্নগুলো ছিল না, ছিল শুধু লুহানীর নিজের হাতে লেখা উত্তরগুলো। এছাড়া লুহানীর বার্লিন ও প্যারিসে তোলা দুটি ছবি ছিল সেই প্যাকেটে।
২০২৩ সালে মতিউর রহমানের সাংবাদিক ও লেখক বন্ধু মনজুরুল হক টোকিও থেকে তাঁকে একটি বই পাঠিয়েছিলেন। বইটি হলো ডেভিড কিংয়ের অর্ডিনারি সিটিজেন্স : ভিকটিমস অব স্টালিন। স্টালিনের শাসনামলে অনেক মানুষকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করে, মিথ্যে অভিযোগ সাজিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এদের ভেতর যেমন আছেন সাধারণ রুশ নাগরিক, তেমনি লেখক, শিল্পী, প্রকৌশলী, সেনা কর্মকর্তা, বিদেশী বিপ্লবী নেতা। এ বইয়ের ১৩৫ নম্বর পৃষ্ঠায় রয়েছেন গোলাম আম্বিয়া খান লুহানীর বিষণ্নতায় মোড়ানো উস্কুখুস্কু চুলের ছবি। ২০০৬ সালে মস্কোয় ছাত্রাবস্থায় ড. জামিল খান কমিন্টার্ন আর্কাইভ থেকে বেশ কিছু চিঠিপত্র, লেখা সংগ্রহ করে পাঠিয়েছিলেন যা এই বইটি রচনায় সাহায্য করে।
১৯২০ সালের নভেম্বরে প্রবাসী বিপ্লবী নেতা বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় বার্লিন থেকে যে সাত সদস্যের ভারতীয় বিপ্লবী দল (যাকে বার্লিন গ্রুপ বলা হয়) নিয়ে কমিন্টার্নে যোগ দিতে মস্কো যান সে দলে গোলাম আম্বিয়া খান লুহানী ছিলেন। বার্লিন গ্রুপের পক্ষ থেকে বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, পাণ্ডুরাজ খানখোজে ও গোলাম আম্বিয়া খান লুহানী যৌথভাবে ‘ইন্ডিয়া অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড রেভল্যুশন’ শিরোনামে ১৪ পৃষ্ঠার একটি থিসিস তৈরি করেছিলেন। ১৯২১ সালের জুলাইয়ে কমিন্টার্নের তৃতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন চলাকালীন তাঁরা থিসিসটি লেনিনের কাছে পাঠিয়েছিলেন। তাঁরা লেনিনের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে সাক্ষাৎ হয়েছিল কিনা তাঁর কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না, তবে লেনিন চিঠির উত্তর দিয়েছিলেন এবং দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। সম্ভবত লেনিন অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাদের দেখা হয়নি। বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ও মস্কোতেই মারা গিয়েছিলেন।
মতিউর রহমান সাংবাদিক বন্ধু মিজানুর রহমান খানের মাধ্যমে রুশ গবেষক সভেৎলানা চেরভোয়ান্নার খবর পান, যিনি কমিন্টার্ন নিয়ে গবেষণা করেন। সভেৎলানা কমিন্টার্ন আর্কাইভে লুহানীর গ্রেপ্তার, বিচার, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ও সমাহিত করার গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো পান। ১৯৩৭-৩৮ সালে তিন বাঙালি বিপ্লবী স্টালিনের ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুবরণ করেন। মতিউর রহমানের লেখা বইটির তৃতীয় শিরোনাম ‘স্তালিনের নৃশংসতার শিকার এক বাঙালি’। এসব নৃশংসতা ধ্বংস করল বিপ্লবী চেতনা ও আদর্শকে। টিকে থাকল না বিপ্লব।
চার আলোচকের মাঝে সবার শেষে যার নাম সেই জামিল খান এলেন প্রথম আলোচনা করতে। তিনি প্রথম রাশিয়া যান ২০০৬ সালে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়াশোনা মস্কোতে। এরপরে ২০১৬ সালে ফের মস্কোর পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করতে যান। তিনি সে সময় দৈনিক প্রথম আলোয় লিখতেন।
তিনি মতিউর রহমানের নিষ্ঠা ও একাগ্রতার ভূয়সী প্রশংসা করলেন এই বলে যে ৪২ বছর একটি বইয়ের পেছনে লেগে থাকা লেখালেখির ইতিহাসে বিরল। এই বই নিয়ে মতিউর রহমানের সাথে তাঁর মস্কোতে প্রথম কথা হয়, এরপরে ঢাকায় ও মস্কোতে কথা হয়েছে; লেখক তাঁকে বহুবার তাগাদা দিয়েছেন। বইটি একটি আবেগের জায়গা।
মতিউর রহমানের বন্ধু সাংবাদিক মিজানুর রহমান তাঁকে অনুরোধ করেন লুহানী সম্পর্কে জানতে। তিনি মস্কোর স্টেট লাইব্রেরিতে যান। জামিল খান দাবি করলেন তিনিই প্রথম বাঙালি যিনি লুহানী সম্পর্কে বিশদ জানতে মস্কোর লাইব্রেরিতে গিয়েছিলেন। সেখানে বিভিন্ন দেশের বিপ্লবীদের তথ্যসমৃদ্ধ ফাইল রয়েছে। লুহানীর ফাইল নাম্বার ২০৫। ১৯৩৭ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে মেরে ফেলা হয়। যোশেফ স্টালিন তাঁকে ফায়ারিং স্কোয়াডে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সভেৎলানা চেরভোয়ান্নার সেদিনই লাইব্রেরিতে আসেন। তিনদিন পরে অনুমতি মেলে ফাইল খোলার। এগুলো ছিল টপ সিক্রেট নথি।
ফাইলের কাগজপত্র, দলিল-দস্তাবেজ সব ছিল রুশ ভাষায় লেখা। সেগুলো অনুবাদ করে প্রতিদিনের আপডেট মিজানুর রহমানকে ইমেইল করে তিনি পাঠাতেন। দুর্ভাগ্য যে মিজানুর রহমান করোনায় মারা যান। গ্রন্থাগারে একটা ফি দিয়ে দলিলগুলো ডুপ্লিকেট করা হয়েছে। প্রথমে দলিলগুলো ছিল গোপন দলিল, পরে সেগুলো ডিক্লাসিফায়েড হয়ে যায়। ড. জামিল মস্কো পার্টের তথ্য সংগ্রহ করে দেশে ফিরে আসেন এবং ২০১৭ সালে দৈনিক প্রথম আলো-য় যোগ দেন। তাঁর কাজ ছিল ডকুমেন্ট অনুবাদ করা। পাণ্ডুলিপি, সংকলন ইত্যাদি অনুবাদ করা। কাজ এখনও শেষ হয়নি। রুশ ভাষায় বইটির যে রিভিউ তিনি লিখেছেন সেটি মস্কো থেকে প্রকাশিত হয়েছে। একাডেমিক জার্নালে পাঠিয়েছেন, অক্টোবরে রিভিউ প্রকাশিত হবে। মস্কোয় যে বাড়িতে লুহানী দম্পতি বাস করতেন তিনি সে বাড়ি দেখতে যান। প্রাথমিক অসুবিধা ছিল ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পরে মস্কোর অনেক সড়কের নাম বদলে গিয়েছিল।
পরের বক্তা সামসুদ্দোজা সাজেন বললেন, লুহানী সম্পর্কে তিনি প্রথম জানতে পারেন দ্য ডেইলি স্টার-এ রিভিউ পাঠ করে। কমিউনিস্ট আন্দোলনে মুসলমানরা তেমন নেই। লুহানী সে বিচারে ‘আবিষ্কার’। উপরন্তু সে পূর্ববঙ্গের মানুষ। গ্লোবাল ইনটেলেকচুয়াল হিস্ট্রি পাঠ করলে বোঝা যায় বুদ্ধিজীবীদের একটা রাজনৈতিক পরিভ্রমণ ও একটি ব্যক্তিগত পরিভ্রমণ রয়েছে। দুটোই আকর্ষণীয়। কিন্তু দুঃখজনক যে বিপ্লবীদের জীবনী পাঠ করলে শুধুই রাজনৈতিক পরিভ্রমণ পাওয়া যায়, ব্যক্তিগত পরিভ্রমণ পাওয়া যায় না। মতিউর রহমানের বইটিকে তিনি একটি দীর্ঘ অনুসন্ধানের কাহিনি হিসেবে চিহ্নিত করলেন। এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অভিযাত্রা।
তাঁর মনে পড়ল মাওলানা ভাসানী নিয়ে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে কাজ করছেন লাইলি সামাদ। বাইরের দেশে বইয়ের হিস্ট্রি লেখা হয়, বাংলাদেশে তা হয় না। তিনি কামরান আসগর অলিকে বড় মাপের গবেষক হিসেবে উল্লেখ করলেন। তিনি বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করেন। বৈশ্বিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপট কীভাবে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টিকে প্রভাবিত করেছিল তা দেখতে হবে। নির্মোহভাবে না লিখলে ইতিহাস লেখা হয় না। কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস নিয়ে মতিউর রহমানের আগে বই লিখেছেন শেখর দত্ত, আমজাদ হোসেন প্রমুখ।
এরপরের আলোচক শেখর দত্ত একজন বাম বিপ্লবী, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা, মতিউর রহমানের সতীর্থ। একটু আগেই তাঁর নাম উচ্চারিত হলো। কমরেড শেখর দত্ত ডায়াসে উঠে বললেন, তাঁর নার্ভাস লাগছে। যে পথ তিনি তার দীর্ঘ জীবনে পেরিয়ে এসেছেন সেখানে নার্ভাসনেস বলে কিছু নেই। ওটা তাঁর বিনয়। তিনি মতিউর রহমানের বইটিকে কয়েকটি শুভ বিশেষণে জড়ালেন। বললেন বইটি সুচিন্তিত, সুপরিকল্পিত, সুলিখিত, সুমুদ্রিত। দুটো বই একটি আরেকটির পরিপূরক, তাঁরা আলাদা নয়। লেখক দুটো বই লিখে একসঙ্গে প্রকাশ করে একটা বৃহত্তর ইচ্ছা পূরণ করেছেন।
তিনি তাঁর পার্টি জীবনের গোড়ার দিকে ফিরে গেলেন। ’৭০ ও ’৮০ দশকে তিনি গ্রামাঞ্চলে পার্টির কাজ করতেন। তখন জনগণ ও পার্টির কর্মীদের সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতেন না। ওই বিব্রতকর অবস্থা থেকে মুক্ত হতেই তিনি পড়াশোনা শুরু করেন। পার্টিতে কিছুটা অগ্রজ মতিউর রহমানের সংস্পর্শে এসে তিনি অনুসন্ধিৎসা ও জ্ঞানের আলোক পেয়েছেন।
ষাটের দশক ছিল উত্থান পর্ব। বই পড়তে পড়তে মাথা পাগল হয়ে গেছে। মতিউর রহমান ও তিনি বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলেন। বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পার্টির ব্যর্থতা প্রসঙ্গে এই প্রবীণ বিপ্লবী প্রশ্ন রাখলেন, আমরা কি আত্মসমালোচনা করেছি ? সত্যের মুখোমুখি হয়েছি ? দুটো প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন উত্থাপনের পরে তার উপসংহার, রাজনীতির লোকেরা সত্যের মুখোমুখি হতে চায় না। ভেতর থেকে সত্য বলা যায় না―এটাও সত্য। মতিউর রহমান সত্য কথা বলেছেন, ভেতরে থেকেও যিনি আসলে ভেতরে নেই, যার আছে নির্মোহ স্বভাব, তাঁর পক্ষেই সত্য বলা সম্ভব। কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস বলতে গিয়ে তিনি তাই বলেছেন। ইতিহাসকে দেখেছেন নির্মোহভাবে।
আজকের আলোচক চতুষ্টয়ের সর্বশেষজন হলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক। ইনিও বামপন্থি, কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য ও নেতা ছিলেন। তিনি কথা বলেন ধীরস্থিরভাবে কিন্তু তাঁর প্রতিটি কথাই মূল্যবান। লুহানীকে ভারতবর্ষের স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীদের মাঝে সংখ্যালঘু মুসলমান বলে একজন বক্তা যে প্রসঙ্গ টেনেছিলেন সে প্রসঙ্গে তিনি বললেন, হিন্দু-মুসলমান প্রশ্ন এখানে অবান্তর।
১৯২৪ সালে গোলাম আম্বিয়া খান লুহানী যখন ইংল্যান্ডে ব্যারিস্টারি পড়তে যান তখন তিনি নিশ্চয়ই বিপ্লবী মতাদর্শের একটা বীজ নিয়ে গিয়েছিলেন। গোলাম আম্বিয়া খান লুহানীর বিলেতযাত্রাকে মফিদুল হক আখ্যা দিলেন দুনিয়ার সাথে বাংলার সংযোগস্থাপন বলে। তাঁর যাত্রা ছিল রাজনৈতিক। ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের একটি অংশ ছিল কমিউনিস্ট পার্টির কার্যক্রম। রুশ বিপ্লবের প্রভাব ছিল ব্যাপক। ১৯২০ সালে বার্লিন কমিটি একটি প্রস্তাব রেখেছিল যা ছিল উচ্চস্তরের বুদ্ধিবৃত্তিক। এম এন রায়েরও একটি প্রস্তাবনা ছিল।
তখন ভারতের অর্থনীতি ছিল এক নিষ্ঠুর মিশ্রণের মতো, একদিকে সামন্তবাদ, অন্যদিকে পুঁজিবাদ। ১৯১৪ থেকে ১৯২০ ইংল্যান্ড অভিবাসীদের স্বাগত জানিয়েছে। কারণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রচুর সৈন্য হারিয়েছিল ইংল্যান্ড। যুদ্ধে ও যুদ্ধপরবর্তী দেশ পুনর্গঠনে মানুষ দরকার ছিল। ইউরোপে অসাধারণ একটা আর্ট মুভমেন্ট চলছিল, ইউরোপ ছিল শিল্প সাহিত্যের আশ্রয়। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনেরও পটভূমি। লুহানী দুটোর সাথেই সংযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি কোনও রহস্যময় চরিত্র ছিলেন না, তিনি নিজেকে রাজনীতি ও সংস্কৃতির দুটি ভিন্ন স্রোতের সাথে সংযুক্ত করতে সমর্থ হয়েছিলেন এবং সেটা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে।
মোদিগ্লিয়ানি ন্যুড পোর্ট্রেট আঁকতেন, তাঁর ছবিতে নারীর গ্রীবার খাঁজ, বিষণ্নতা চমৎকার ফুটে উঠত। এত যে ভালো ছবি আঁকতেন, জীবদ্দশায় তেমন ছবি বিক্রি করতে পারেননি। অথচ এখন কোটি কোটি টাকায় তার ছবি বিক্রি হয়। মোদিগ্লিয়ানির ছবিতে গ্যাব্রিয়েল মডেল হয়েছিলেন সত্যি, কিন্তু সে অর্থে মডেল ছিলেন না। রজার ফ্রাই ইংল্যান্ডে শিল্প আন্দোলন করেছেন। তখন শিল্পীদের আয় উপার্জন তেমন ছিল না, গ্যাব্রিয়েলেরও তেমন কোনও উপার্জন ছিল না। আয় না থাকলে কী হবে তাদের আত্মবিশ্বাস ছিল। এরা থাকবে না, আমরা থাকব। কবি জ্যা কঁকতো একবার বলেছিলেন, Picasso keeps me talking.
গ্যাব্রিয়েলের ছবি দেখে বোঝা যায় তিনি অভিজাত ছিলেন। হাইকলার জামা, হাতে গ্লাভস পরা। তিনি প্রথমে একজন সুইস কবিকে বিয়ে করেছিলেন। তখন তাঁর নাম ছিল গ্যাব্রিয়েল এম সোয়েনে। রজার ফ্রাই ইংল্যান্ডে এলেন গ্যাব্রিয়েলের ছবি বিক্রি করে সে অর্থ দিয়ে। মোদিগ্লিয়ানি গ্যাব্রিয়েলের কয়েকটি স্কেচ এঁকেছিলেন। লুহানী ছিলেন বিপ্লবী আন্দোলন ও উত্থানের ভেতর আর গ্যাব্রিয়েল চিত্রকলা, ফ্যাশন আর মডেলিংয়ের জগতে। গ্যাব্রিয়েলের জগতে লুহানী কী করে মানানসই হয়েছিল বোঝা দায়। গ্যাব্রিয়েল ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু মনের। এটাই বোধ হয় লুহানীকে আকৃষ্ট করেছিল। লুহানীর মা অর্থাৎ শাশুড়িকে তিনি যে দয়ার্দ্র ভাষায় চিঠি লিখেছিলেন (১৯২৪-২৫) তা প্রমাণ করে তিনি ছিলেন একজন মহতী নারী, যার হৃদয় ছিল মমতায় ভরা। লুহানী যক্ষ্মায় ভুগছিলেন। তাঁর সঙ্গে গ্যাব্রিয়েলের মস্কো না যাবার এটাই কারণ কিনা কে জানে ?
বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের তৃতীয় আন্তর্জাতিককে ফরাসি শিল্পীরা প্রবলভাবে সমর্থন জ্ঞাপন করেছিলেন। তখন মস্কো-প্যারিস সমান্তরাল ছিল। রাশিয়ায় লুহানী কাজ খুঁজতেন। স্টালিন তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা চাইতে গিয়ে তিনি যে নির্মমতার শিকার হলেন তা তাঁর প্রাপ্য ছিল না কোনওভাবেই। কারণ তিনি রুশ বিপ্লবেরও একজন বড় সমর্থক ছিলেন। তিনি রুশ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ ও রুশ নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন। একজন আন্তর্জাতিক মানের বিপ্লবীর জীবন কীভাবে বিপর্যস্ত হলো। লুহানীর প্রথম ছবিটিতে দেখা যায় তিনি কেতাদুরস্ত ছিলেন। ফায়ারিং স্কোয়াডে নিয়ে গুলি করে মারার আগে তাঁর যে ফাইল ফটো তোলা হয়েছিল তাতে দেখা যায় তিনি ভীষণ বিপর্যস্ত―আধা পাকা এলোমেলো চুল, গালভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি, বিষণ্নতায় ভরা দুটি চোখ। সমাজতন্ত্র তাঁর নিজের লোকদের প্রতি কী অমানবিক আচরণ করেছে তা এ দুটো ছবি মেলালেই বোঝা যায়। অথচ সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্ববিপ্লবের কথা বলতো, সশস্ত্র বিপ্লবের কথা বলতো। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব থেকে তখন বেরুনো কঠিন ছিল। জন রিডের দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন যে রুশ বিপ্লবের সুনন্দ ছবি এঁকেছিল তাও ফিকে হয়ে এলো নিষ্ঠুরতার নিষ্পেষণে।
রাশিয়ার ভবিষ্যতবাদী কবি আন্না আখমোতোভার স্বামী লেনিনের সময়েই কারারুদ্ধ ছিলেন। তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। জেল থেকে কারও পার্সেল ফেরত আসা মানেই সে মানুষটিকে হত্যা করা হয়েছে। আন্না আখমোতোভা মোদিগ্লিয়ানির বন্ধু ছিলেন। তাঁর জবয়ঁরস লেখাটি লিখতে ৪০ বছর লেগেছিল। কারণ এ হলো জমাটবাঁধা অশ্রুবিন্দুর মতো। এই মুহূর্তটি কি আপনি বর্ণনা করতে পারবেন ?
মফিদুল হক বললেন, শেখর দত্ত কতগুলো যৌক্তিক প্রশ্ন তুলেছেন। আমাদের দেশের কবি-লেখক-শিল্পীরা প্রায় সকলেই একসময় প্রগতিশীল ছিলেন। মফিদুল হক আক্ষেপ করে বললেন, অতীতের অনেক ভুলের ফলাফল আজকের পরিণতি। এ পরিণতি দেখে দুঃখবোধ কাজ করে।
মতিউর রহমানের লেখা দুটি গুরুত্বপূর্ণ বই নিয়ে জমজমাট বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা শেষ হলো। এক অজানা বাঙালি বিপ্লবী যিনি বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে লন্ডনে শ্রমিক আন্দোলন ও সোভিয়েত বিপ্লবের সমর্থনে প্রচারাভিযানের সাথে জড়িয়ে পড়েছিলেন, যুক্ত হয়েছিলেন কমিন্টার্ন ও রুশ কমিউনিস্ট পার্টির সাথে, নিয়েছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের নাগরিকত্ব, স্বপ্ন দেখেছিলেন মুক্ত ভারতবর্ষের, তাঁকে মিথ্যা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে অন্যায়ভাবে হত্যা করেন স্বৈরাচারী একনায়ক যোশেফ স্টালিন। স্বদেশ থেকে সহস্র মাইল দূরে সমাহিত সেই অজানা বিপ্লবীর জন্য আমাদের মন ভারী হয়ে ওঠে।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও ভ্রমণসাহিত্যিক



