
থেকে থেকেই কৈশোরের বন্ধুদের যেমন মনে পড়ে, তাদেরও কারও কারও মনে জাগে কি আমার কথা! তাদেরও কারও কারও স্মৃতিতে কখনও কি উঁকি দেয় আমার মুখ! একান্ত নিভৃতে, কোনও নদী, জলাশয় কিংবা ঘন সবুজ অরণ্যের পাড়ে তন্ময় হয়ে পড়ে যখন বন্ধুদের কেউ সে-ও কি ফিরে যায় আমাদের সম্মিলিত শৈশবে-কৈশোরে ? যেমন ফিরে ফিরে যাই আমি!
যখনই ছোটবেলার বন্ধুদের মুখ মনে করি আমার করোটিতে তখন কেবল তাদের মুখচ্ছবিই ভেসে ওঠে না। অব্যবহিত পরেই, কখনওবা আবার যুগপৎ মুহূর্তেই শুশুকের মতো ভুস করে ভেসে ওঠে এই প্রশ্নও, আকাক্সক্ষামিশ্রিত এই কৌতূহলও।
বন্ধুদের মুখ মনে করতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বহুবর্ষী এক শ্যাওড়া গাছ। কোকড়ানো এক রাশ সবুজ পাতার দঙ্গল কাঁধে করে যে দাঁড়িয়ে আছে মনসুরদের পুকুড়পাড়ে। মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এসে পুকুরের জল ছুঁয়ে খানিক দূর এগিয়েই বাঁক নিয়ে ফের উঠে গেছে আসমানের দিকে। ঝুম বাদলার দিনে শ্যাওড়ার ঘন সবুজ পাতাদের ভেতর থেকে বন্ধুদের মুখগুলো টুপ করে পড়ে যেতে দেখি পুকুরের শ্যাওলাটে জলের গভীরে। মনসুরের বাপ পুকুরের ওই পাড় থেকে ধমকে ওঠেন। তেড়েমেড় আসতে থাকেন আমাদের দিকে। পুকুর ও বৃষ্টি-জলের তীব্র শৈত্যে কম্পমান আমরা তাড়া খেয়ে লুকিয়ে পড়ি। পুকুরপাড় সুনসান নিস্তব্ধতায় ছেয়ে যায়। কেবল পুকুরের জলে বৃষ্টিপতনের রিমঝিম শোন যায়। মনসুরের বাপ পুকুরের কিনার থেকে অদৃশ্য হলে আমরা বেরিয়ে আসি আমাদের গোপন আস্তানা হতে। ফের উঠে যাই শ্যাওড়ার শরীর বেয়ে তার একেবারে চূড়ায়। আসমান স্পর্শ করার ভঙ্গিতে দল বেঁধে লাফিয়ে পড়তে থাকি শীতল জলের গভীরে। আমাদের রক্তের ভেতর তখন আগুন খেলা করে।
বন্ধুদের মুখ মনে করতেই থোকা থোকা বকুলের তীব্র গন্ধ মগজের খুব গভীরে প্রবেশ করে সমস্ত শরীর অবশ করে দিয়ে যায়। আমাকে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয় স্নিগ্ধ এক শীতার্ত ভোরে, সবুজ ঘাসে পড়ে থাকা রাশ রাশ বকুলের সামনে। আমাদের ভেতর মিষ্টি কোমল হুড়াহুড়ি পড়ে যায়। ফজরের নামাজান্তে মসজিদ ফেরত আমরা মাথার টুপি খুলে মুঠো মুঠো উন্মাতাল গন্ধ কুড়াতে থাকি। ক্রমশই ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে আমাদের করতল, হাতে রাখা টুপি, পাঞ্জাবির কোঁচড়। মুঠো মুঠো স্নিগ্ধতা আর শিশিরসিক্ত মাদকতা সঙ্গে করে আমরা বাড়ির পথ ধরি। আমরা বন্ধুরা বকুলের মালা গাঁথি, কেউ আবার কুড়োনো ফুলগুলো ছড়িয়ে দিই আমাদের পাঠের টেবিলে, বইপত্রের ভাঁজে ভাঁজে এবং আমাদের শয্যার শিথানে।
বন্ধুদের মুখ মনে করতেই মনে পড়ে যায় সংহতি ক্রীড়াচক্র, নিরালা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ আর তাতে দিনমান কসরতরত তানভির, মোজাম্মেল, সৈকত, শমসের এবং আরও কতিপয় ‘বখে’ যাওয়া কিশোরের ছায়া। বেলা বাড়ে। ক্রমশ প্রলম্বিত হতে থাকে ছায়াসমূহ। আমি কিছুটা দূর হতে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে তাদের ঘেমে নেয়ে ওঠা দেখতে থাকি। ওই তো, নিজামকে দেখতে পাওয়া যায়। নিজের প্রান্তের গোলরক্ষকের ছুড়ে দেওয়া বল বুক পেতে দারুণভাবে রিসিভ করল। মুহূর্তে বুক থেকে মাটিতে নামিয়ে এনে বলটাকে ডান পা-বাঁ পা করল একবার। পরক্ষণেই ডান প্রান্ত দিয়ে তিরের মতো ছুটে বেরিয়ে যেতে শুরু করল সে। নিজাম ছুটছে। পথিমধ্যের দুটি বাধা চমৎকার পাশ কাটিয়ে নিজাম ছুটছে অপর প্রান্তের গোলবার লক্ষ করে। ডি বক্সের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছে নিজাম। তার সামনে এখন একটিই বাধা। গোলরক্ষক রাজন। ডি বক্সের খানিক বাইরে বলটাকে সামান্য স্থির রেখে দিক নির্ণয় করে নিতে চায় নিজাম। চূড়ান্ত লক্ষ্য স্থিরও করে ওঠে হয়তো বা। বাঁ পা উঁচু করে শট নিতে যাবে অমনি পেছন থেকে কারও ধাক্কা অনুভব করে সে। আর সঙ্গে সঙ্গেই ছিটকে যায় ডি বক্সের ভেতরে প্রায় দুই হাত দূরত্বে। বলটা তার ডি বক্সের বাইরেই স্থির পড়ে থাকে। চূড়ান্ত লক্ষ্যে আর আঘাত হানা হয় না।
নিরালা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠজুড়ে অকস্মাৎ নেমে আসা বিষণ্ন নীরবতা খানখান করে দিয়ে মামুন ভাইয়ের বাঁশি চিৎকার করে ওঠে। দৌড়ে এসে ভূপাতিত নিজামকে ঘিরে ধরে ঘর্মাক্ত ও শঙ্কিত ছায়াগুলো। না, তেমন গুরুতর কিছু নয়। ততক্ষণে নিজামও নিজেকে সামলে নিয়েছে। একবার চোখ তুলে চায় কেবল ধাক্কাদায়ী মুখটির দিকে। ফারুক। ফারুক ডিফেন্সের আর কোনও তরিকা এখনও আয়ত্ত করে উঠতে পারল না―এই আফসোস কিংবা হতাশা কিংবা দুঃখবোধ থেকে তার মুখ হতে ‘চ্যু চ্যু’ ধ্বনি বেরিয়ে আসে। আর কিছু নয়। ফারুক জবাবে শুধুই মুচকি হাসে। বুটের ফিতা বেঁধে নিজাম ফের উঠে দাঁড়ালে অকস্মাৎ নেমে আসা বিষণ্নতা এবং দুপুরের তীক্ষè রোদ উপেক্ষা করে সকলে তাদের খেলায় ফিরে আসে।
কিন্তু মামুন ভাই ছেড়ে কথা বলেন না। আজ বাদে কাল দিঘলিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের সঙ্গে তাদের সেমি ফাইনাল ম্যাচ। মামুন ভাই কোনওভাবেই এবারের জুনিয়র ফুটবল গোল্ড কাপের ট্রফি হাতছাড়া করতে চান না। দারুণ ছন্দে থাকা দলটাকে শেষ মুহূর্তের জন্য আরও খানিক ঝালিয়ে নিতে চান। কিন্তু প্রাকটিস ম্যাচে ফারুক যদি এমন রাফভাবে নিজেদের সেরা স্ট্রাইকারকেই ইনজুরিতে ফেলে দেয় তাহলে আশার গুড়ে বালি পড়া ছাড়া আর উপায় কী থাকে! ফারুকের ডিফেন্সও সংহতি ক্রীড়াচক্রের জুনিয়র ফুটবল দলের কোচ মামুন হায়দার, মানে আমাদের মামুন ভাইকে ভীষণ ভাবিয়ে তোলে।
আমি দূর হতে নিরালা প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ প্রাঙ্গণে চলমান ছায়াছবিটির দিকে তাকিয়ে টের পাই, মামুন ভাই ফারুকের কাঁধে হাত রেখে কী যেন বলছেন। আর ক্রমশই তার উজ্জ্বল ফর্সা অবয়ব আরও রক্তিম হয়ে উঠছে। কোনও কোনও অলস দিনে এইসব রক্তিম কিংবা বিষণ্ন ছায়াগুলো আমাকে তাড়া করে ফেরে।
পেছনপানে উঁকি দিলে মাঝেমধ্যে বিশেষভাবে বন্ধু নিজামের মুখটা বড় স্পষ্টভাবে মনে পড়ে। আমাদের ভেতর সব চাইতে শিষ্ট ও পরোপকারি ছিল কি নিজামই!
মনে পড়ে, একবার এক আন্তঃমহল্লা ক্রিকেট টুর্নামেন্টে আমাদের দল ফাইনালে উঠেছে। পুরো মহল্লার মানুষের ভেতর সে কি উচ্ছ্বাস! ফাইনাল খেলার ভেন্যু নির্ধারিত হয়েছে পশ্চিম বানিয়াখামার স্কুল মাঠ। আমরা কিশোরেরা দল বেঁধে রিক্সা ভ্যান ও ছোট ছোট পিক-আপযোগে হাজির হয়েছি পশ্চিম বানিয়াখামার স্কুল মাঠে। মহল্লার বড় ভাইয়েরা খেলছে। আমরা দর্শকসারির কিশোর তরুণ এমনকি বৃদ্ধরা পর্যন্ত নিজেদের দলকে সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছি। মাঠের চারপাশের স্কুলভবন লোকে লোকারণ্য। দোতলা ভবনের বারান্দাজুড়ে পা ফেলবার মতোন আর জায়গা নাই। ভবন লাগোয়া বিভিন্ন গাছ বেয়ে ছাদে পর্যন্ত পৌঁছে গেছে মানুষ। চির প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল বিহারি কলোনি বনাম পূর্ব বানিয়াখামারের মধ্যকার ফাইনাল ম্যাচ। জমে তো উঠবেই। ভীষণ উৎসাহ-উৎকণ্ঠা নিয়ে হাজার জোড়া চোখ স্কুল মাঠের দিকে নিবিষ্ট। কারও একটু অন্যমনস্ক হবার জো নেই। আমাদের ঝন্টু ভাই দুর্দান্ত একেকটি শট খেলে প্রায় প্রতিটি বল বাউন্ডারি ছাড়া করছেন। আর আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে হৈ হৈ করে উঠছে দর্শকসারিতে বসে থাকা বিহারি কলোনির সমর্থকেরা।
এত সব উচ্ছ্বাস আনন্দের ভেতর অনাকাক্সিক্ষত এক দুর্ঘটনা ঘটে গেল।
কোথাও সুবিধামতো জায়গা না পেয়ে সদ্য শৈশব পেরুনো উঠতি এক কিশোর ভবনসংলগ্ন সুপারি গাছ বেয়ে স্কুল ভবনের ছাদে উঠে গিয়েছিল। ছাদেও তো তখন বেশ ভিড়। খেলা দেখার উত্তেজনাকর এক মুহূর্তে কারও হাতের ধাক্কায় সেই উঠতি কিশোর তাল সামলাতে না পেরে একেবারে সোজা শান বাঁধানো সিঁড়ির ওপর গিয়ে পড়ে। পড়তেই রক্তে ভেসে যেতে থাকে প্রান্তর। সবা মনোযোগ তো তখন খেলার দিকে। অল্প যে ক’জনের মনযোগ আকর্ষণ করতে সমর্থ হয় রক্তাক্ত বালক তারাও তাৎক্ষণিক কর্তব্য ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
ভাগ্য ভালো, আমাদের বন্ধু নিজাম কাছেই কোথাও ছিল। এবং দৃশ্যটি তার নজরেও পড়ে। আর তখনই সে, এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে, রক্তাক্ত বালকটির কাছে পৌঁছে যায় এবং তাকে পাঁজাকোলা করে অতি দ্রুত মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দিকে ছুটে যায়।
আমরা দুর্ঘটনার শিকার কিশোরকে দেখতে গিয়ে জেনেছিলাম, পাঁচটা বড়সড় সেলাইয়েরও প্রয়োজন হয়েছিল বালকের রক্ত বন্ধ হতে। এবং রক্তের ক্ষরণস্বল্পতার পেছনে নিজামের তাৎক্ষণিকতা একটি বড় ভূমিকা পালন করেছিল। সেই সেদিন এবং পরে পরোপকারিতার আরও নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নিজামের প্রতি আমরা সমীহ অনুভব করতাম। তার মতো বন্ধুর কারণে গর্ব ও আহ্লাদও হতো আমাদের।
অতীত দিনের স্মৃতিচারণের নিমজ্জমান মুহূর্তগুলোর তাই বেশ অনেকখানি অংশই নিজামের জন্য বরাদ্দ রাখতে হয়।
কেমন আছে এখন নিজাম! এখন এই বিপন্ন সময়ে, দেশজুড়ে যখন সীমাহীন বর্বরতা চলমান তখন কোথায় কেমন ছিল তানভীর, এনায়েত, মোজাম্মেল কিংবা আমার শৈশব-কৈশোরের অপরাপর বন্ধুরা!
রক্তের স্বজনদের পাশাপাশি ক’দিন ধরে আমার বন্ধুদের ব্যাপারেও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। আমরা তো স্বৈরাচারমুক্ত নতুন এক বাংলাদেশে প্রবেশ করার অবকাশ পেলাম। কিন্তু এত এত প্রাণক্ষয়, এত এত রক্তক্ষয়ের কি প্রয়োজন ছিল! কদিন ধরে বুঝতে পারছিলাম, অনেক প্রাণ ঝরে পড়ছে। কিন্তু সংখ্যাটা কোনওক্রমেই এতোটা অনুমেয় ছিল কি! খুনি হাসিনার পলায়নের পর হতাহতের যে পরিমাণ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে তা কি কোনওভাবেই সহ্য করার মতো! উফ্, কতটা পাষাণ ও অন্ধ হলে মানুষ এতটা নির্মম হতে পারে!
মুঠোফোনের মৃদু ‘বিপ বিপ’ ধ্বনিতে আমার ভাবনায় ছেদ পড়ে। আনমনা আমি মুঠোফোন হাতে তুলে দেখি ম্যাসেঞ্জারে বন্ধু রাব্বির ম্যাসেজ। কোনও সুনির্দিষ্ট বার্তা নয় : কেবলই একটা লিংক। লিংকে ক্লিক করতেই মুঠোফোনের স্ক্রিনে একটি চলমান দৃশ্য ফুটে ওঠে। ফেসবুকে ইতোমধ্যে ভাইরাল যে দৃশ্য আমার চোখেও দু-একবার পড়েছে। দেখার মতো কোনও দৃশ্য নয়। এই নির্মমতা কোনও সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়।
শৈশব-কৈশোরের বন্ধুদের মধ্য হতে রাব্বির সঙ্গেই যা একটু নিত্য যোগাযোগ অব্যাহত আছে আমার। উৎসবে-ঈদে ঘটা করে আলাপ হয়। তার বাইরে ফেসবুকে পরস্পর যুক্ত থাকবার সুবাদে ইনবক্সে মাঝেমধ্যে হাই হ্যালো ও কুশলের বিনিময় ঘটে। আর রাব্বিই প্রায় প্রায় ভাইরাল বিভিন্ন ঘটনার লিংক আমার ইনবক্সে কিংবা হোয়াটসঅ্যাপে সরবরাহ করে থাকে। যার অধিকাংশই তেমন কাজের না। আমার জন্য আগ্রহজাগানিয়া তো নয়ই। তারপরও বন্ধুতার খাতিরে, কৈশোরিক আন্তরিকতার আবহে তার সরবরাহকৃত লিংকে প্রবেশ করি। দুয়েক লাইনের মন্তব্যও আদান-প্রদান হয়ে থাকে আমাদের মধ্যে। আজকে তার সরবরাহকৃত ভিডিওটি, যা ইতোমধ্যে আমার দেখা, উপরন্তু আমার জন্য অসহ্যকর একটি চিত্রায়ন, ফলে দৃশ্যটিকে মুহূর্তমাত্রও আমি আর সচল রাখতে পারি না। ভিডিওটি বন্ধ করে আমি আমার অসমাপ্ত ভাবালুতার ভেতর ফিরে আসি। এক ধরনের নির্মোহ নির্লিপ্ততা গ্রাস করে নেয় আমাকে।
কিন্তু পর মুহূর্তেই আমার ভাবালুতার সমস্ত রেশ কেটে দিয়ে কেঁপে ওঠে মুঠোফোন। আলো জ্বলা স্ক্রিনে ভেসে ওঠে রাব্বির বার্তা : ‘খুনিটাকে চিনতে পারছিস ?’
রাব্বির এই জিজ্ঞাসায় আমি চমকে উঠি। সে এ প্রশ্ন কেন করছে! তবে কি এ আমাদের চেনাজানা কেউ! করোটির ভেতর জেগে ওঠা কৌতূহলের এই বুদ্বুদ দূর করতে ভিডিওটি আবার চালু করি। এবারে আর দূর থেকে ক্লিষ্ট হৃদয়ে ভাসাভাসা দৃষ্টিতে নয়; অভিজ্ঞ গোয়েন্দার মতো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তীক্ষè নজরে দেখতে থাকি।
খুনিটা আর সব পুলিশের মতো গাঢ় নীল পোশাকে নয়। সশস্ত্র সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মতো কিছুটা দেখতে তার পরনের পোশাক। বিশেষ কোনও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য সে হয়ে থাকবে হয়তো বা। হাতের বন্দুক টান করে সোজা তাক করল অদূরে জটলা করে দাঁড়িয়ে থাকা নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার দিকে। তার চোখে মুখে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা কিংবা তাড়াহুড়ার কোনও চিহ্ন নেই। নেই সামান্য দ্বিধা কিংবা সন্দেহগ্রস্ততার ছায়া। বড় ধীর সে অস্ত্রধারী এক চোখ বন্ধ করে নিশানা নির্ণয় করে নিল। আর পরক্ষণে ট্রিগারে চাপ দিতেই ছাত্র-জনতার সম্মুখ সারিতে দণ্ডায়মান এক তরুণ কর্তিত কলাগাছের মতো ঝুপ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
আহ! অসহ্য! কী মর্মান্তিক!
উর্দি পরুয়া সশস্ত্র খুনি সামান্য বিচলিত নয়। নিরস্ত্র তরুণের গুলিবিদ্ধ নিথর দেহ দেখার পরও সে সামান্য কুণ্ঠিত নয়। সে বরং আরও উদ্ধত। আরও দুর্বিনীত। আরও নৃশংস। ট্রিগার টেনে আবারও নিশানা ঠিক করে নেয়। যেন তার সমুখে নিরস্ত্র যে তরুণেরা তারা কোনও মানুষ নয়। পশু কিংবা তারও অধম কোনও বস্তু। চারপাশ কাঁপিয়ে আবারও সশব্দে চিৎকার করে ওঠে খুনির রাইফেল। সেই সঙ্গে মুখ ব্যাদান করে ফুটে ওঠে চওড়া হাসি। চিত্রগ্রাহকের বহুদূর অবস্থান সত্ত্বেও ভিডিওতে শোনা যায় খুনির ঔদ্ধত্যপূর্ণ উচ্চারণ : ‘দিসি, দিসি আরেকটারে ফালায়া।’
আহ! নিজের কানকে আমি বিশ্বাস করতে পারি না। এই ঠান্ডা মাথার খুনি আমাদেরই নিরাপত্তা বাহিনীর অংশ! এই মস্তিষ্ক বিকৃত পশু আমাদেরই প্রাণের সুরক্ষায় নিয়োজিত! আমার চোখকেও যেন বা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। আমার ভ্রম হলো, কোনও শত্রুদেশের সৈন্য বোধহয় ঝাঁপিয়ে পড়েছে তার প্রতিপক্ষের ওপর! কিন্তু হায়, দুর্ভাগ্য আমার। এ আমার এক ভ্রমই মাত্র।
দৃশ্যটি দেখা আমার পক্ষে আর সম্ভব হয় না। চোখ নামিয়ে নিই।
কেমন এক বিবমিষায় আমার সারা শরীর গুলিয়ে আসতে থাকে। আমি রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে দু চোখ অর্ধ নিমীলিত রেখে বিবমিষা দূর করতে সচেষ্ট হলাম।
কিন্তু তখনও পর্যন্ত আমার জানা নাই, কী নিদারুণ ধাক্কা আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
মুঠোফোনের আলো জ্বলে রাব্বির দ্বিতীয় বার্তা ভেসে উঠল। ‘খুনিটাকে চিনতে পারলি! আমাদের বন্ধু নিজাম!’
মনে হলো, যেন একটা জগদ্দল পাথর রাব্বি আমার বুকের ওপর চাপিয়ে দিল। আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে থাকল। মনে হলো, পৃথিবীর সকল আলো যেন বা কেউ নিভিয়ে দিয়েছে। হঠাৎই চারপাশ কালো করে আমার চোখে অন্ধকার নেমে এল।
বহুকাল মুখচ্ছবি না দেখলেও আমরা শুনেছিলাম ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা খালাতো ভাইয়ের সুবাদে নিজাম রাষ্ট্রীয় কোনও নিরাপত্তা বাহিনীতে কর্মরত। আমরা শুনেছিলাম বেতন-ভাতা, উৎসবকালীন বোনাস ও প্রয়োজনীয় রেশনসহ সে বেশ ভালোই আছে। আমরা বন্ধুরা এও জেনেছিলাম উত্তরোত্তর তার উন্নতির সম্ভাবনাও প্রবল। কিন্তু আমরা কখনও এতদূর বুঝতে পারিনি যে, একজন নিজাম, ভীষণ শিষ্ট ও পরোপকারী নিজাম, ক্রমশ পশু হয়ে উঠবে, হয়ে উঠবে ঠান্ডা মাথার একটা নির্মম খুনি।
আর সহ্য করতে পারি না। মুঠোফোনের সুইচ অফ করে ফেলি। আসন্ন বিবমিষা ঠেকাতে দু চোখ বন্ধ করে নিজেকে অন্ধকারের আশ্রয়ে সঁপে দিই। কিন্তু কী যন্ত্রণা, চোখ বন্ধ করতেই অন্ধকারের ভেতর বন্ধুদের মুখগুলো ক্রমান্বয়ে ভেসে উঠতে থাকে।
তবে আশ্চর্য, সেখানে আমি নিজামের মুখচ্ছবি দেখি না। শত চেষ্টা সত্ত্বেও তার মুখটা আর মনে করতে পারি না। ধীর প্রশান্তিতে ক্রমশ আমি আরও গভীরতর অন্ধকার আশ্রয়ের ভেতর তলিয়ে যেতে থাকি।
সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ



