ইতিহাস ও উপন্যাস : বহুরৈখিক সম্পর্ক : শাহনাজ মুন্নী

বিশেষ রচনা : ইতিহাস ও উপন্যাস : উপন্যাসে ইতিহাস
উপন্যাসে বা আরেকটু বিস্তৃত করে দেখলে বিশ্বসাহিত্যে ইতিহাসের উপাদান ব্যবহারের ইতিহাস বহু প্রাচীন। বাংলা সাহিত্যের শুরুর দিকেই লেখকদের মধ্যে ঐতিহাসিক বিষয়াদি নিয়ে সাহিত্য রচনার ঝোঁক দেখা যায়। সম্ভবত ১৮৬৫ সালে প্রকাশিত দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসে ইতিহাসের একটা প্রলেপ দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তবে সেটি সার্থক উপন্যাস যতখানি ছিল, ঐতিহাসিক উপন্যাস ততখানি ছিল না বলেই সমালোচকদের ধারণা। দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসটিতে মোগল-পাঠান যুদ্ধের প্রসঙ্গ থাকলেও ইতিহাসের চেয়ে ত্রিভুজ প্রেমের কাল্পনিক চরিত্রগুলোই এতে প্রাধান্য পেয়েছে। তবে পরবর্তীকালে তাঁর লেখা রাজসিংহ, আনন্দমঠ ও সীতারাম উপন্যাসে ঐতিহাসিক উপন্যাসের অনেক উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়। অনতিকাল পরে কবি নবীনচন্দ্র সেন ১৮৭৫ সালে পলাশির যুদ্ধ নামে উপন্যাস নয় বরং ঐতিহাসিক কাব্য রচনা করে খ্যাতিমান হয়েছিলেন।
মীর মশাররফ হোসেন কারবালার যুদ্ধকে ভিত্তি করে বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসটি প্রকাশ করেন ১৮৮৪ সালে। ইমাম হাসান, হোসেন, মুয়াবিয়া ও ইয়াজিদের মতো অনেক সত্য চরিত্রের বিবরণ থাকলেও অনেক সমালোচক বিষাদ সিন্ধুকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলতে নারাজ। কবি কায়কোবাদ একে ‘ইতিহাস বিচ্ছিন্ন কাল্পনিক কথায় পরিপূর্ণ’ রচনা বলে সমালোচনা করেছেন।
সাধারণত অতীতের কোনও নির্দিষ্ট সময়কাল, ঘটনা, সত্য চরিত্র ও কাল্পনিক চরিত্রের সমাহার থাকে ঐতিহাসিক উপন্যাসে। এতে লেখক ইতিহাস ও কল্পনার সংমিশ্রণ ঘটান। কোনও নির্দিষ্ট সময়ের ঘটনা ফুটিয়ে তুলতে নিজের মতো করে সেই সময়ের উপযোগী ভাষা, সংলাপ ও আবহ তৈরি করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যাকে বলেছেন, ‘ইতিহাসের বিশেষ সত্য এবং সাহিত্যের নিত্য সত্য’―এই দুইয়ের মিলন।
কিন্তু ইতিহাসবিদরা সাহিত্যিকদের ইতিহাস নিয়ে লেখাজোখার এই ব্যাপারটি ভালোভাবে নিতে পারেননি। অনেক সময় তারা বেশ খাপ্পা হয়েছেন লেখকের ওপর। রবীন্দ্রনাথ যেমন স্যার ফ্রান্সিস প্যালগ্রেভকে উদ্ধৃত করে বলেছেন ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস যেমন একদিকে ইতিহাসের শত্রু তেমনি অন্যদিকে গল্পেরও মস্ত রিপু। অর্থাৎ উপন্যাসলেখক গল্পের খাতিরে ইতিহাসকে আঘাত করেন, আবার সেই আহত ইতিহাস তাহার গল্পকেই নষ্ট করিয়া দেয়। ইহাতে গল্প বেচারার শ্বশুরকুল পিতৃকুল দুই কুলই মাটি।’
আরেক ইংরেজ ইতিহাসবিদ ফ্রিম্যানও উপন্যাসে ইতিহাসের যে বিকার ঘটে সেটার ওপর আক্রোশ প্রকাশ করেছেন। স্কটিশ লেখক স্যার ওয়াল্টার স্কট ক্রুসেড চলাকালীন ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে আইভানহো নামের একটি উপন্যাস লিখেছিলেন। ইংল্যান্ডের তৎকালীন রাজা রিচার্ডের প্রিয়পাত্র নাইট আইভানহোর বীরত্বের কাহিনি নিয়ে এই উপন্যাস লেখা হয়েছিল।
ফ্রিম্যান সাহেব বলেছিলেন, ‘যাহারা ইউরোপের ধর্মযুদ্ধযাত্রা যুগ সম্বন্ধে কিছু জানিতে ইচ্ছা করেন, তাহারা যেন স্কটের আইভানহো পড়িতে বিরত থাকেন।’
রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘ইউরোপের ধর্মযুদ্ধযাত্রা যুগ সম্বন্ধে প্রকৃত তথ্য জানা আবশ্যক সন্দেহ নাই, কিন্তু স্কটের আইভানহোর মধ্যে চিরন্তন মানব ইতিহাসের যে নিত্যসত্য আছে, তাহাও আমাদের জানা আবশ্যক। এমনকি তাহা জানিবার আকাঙ্খা আমাদের এত বেশি যে ক্রুসেড যুগ সম্বন্ধে ভুল সংবাদ পাইবার আশঙ্কা সত্ত্বেও ছাত্রগণ অধ্যাপক ফ্রিম্যানকে লুকাইয়া আইভানহো পাঠ করিবার প্রলোভন সম্বরণ করিতে পারিবে না।’
সাহিত্যের রসে ইতিহাস জারিত করে ঐতিহাসিক উপন্যাস রচিত হয়। ইতিহাসবিদ যেমন প্রামাণ্য দলিল, দস্তাবেজ ও সন-তারিখ উল্লেখ করে অতীতের ঘটনাসমূহ তথ্যসূত্র অনুযায়ী সুশৃঙ্খল ও প্রমাণভিত্তিক বর্ণনা করেন ঔপন্যাসিকের তেমন কোনও দায় থাকে না। তিনি ইতিহাস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করেন তারপর নিজস্ব মুনশিয়ানায় কল্পনার আশ্রয় নিয়ে সেই ইতিহাসের সাহিত্যিক রূপ নির্মাণ করেন। তাতে প্রাধান্য পায় ব্যক্তির অনুভূতি, ব্যক্তির সংগ্রাম ও ব্যক্তির ভালোবাসা, বেদনা, যন্ত্রণা, আশা ও হতাশার মানবিক বিবরণ।
ঐতিহাসিক উপন্যাস রচয়িতার সামনে বহুবিধ চ্যালেঞ্জ থাকে। তাকে বুঝতে হয়, ঐতিহাসিক সত্যের সঙ্গে তিনি কতখানি কল্পনা মেশাবেন যাতে সত্যের বরখেলাপ না হয় আবার সাহিত্যরসও ক্ষুণ্ন না হয়। তাছাড়া যে যুগ বা সময়ের চিত্র তিনি আঁকবেন সেই সুনির্দিষ্ট সময়ের ভাষা, সংস্কৃতি, চালচলন, লোকভ্যাস, পোশাক আশাক ইত্যাদি সম্পর্কে তাঁর পরিষ্কার ধারণা না থাকলে লেখাটি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে না। আর সেজন্য লেখককে গবেষকের দৃষ্টিতে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে নিয়োজিত হতে হয়। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির মনস্তত্ব, তার আচরণ, স্বপ্ন, আশা ও চিন্তাকে উপলব্ধি করে লিখতে হয়। লেখক প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করবেন, গবেষণা করবেন সেটা যেমন দরকার তেমনি সব তথ্য বা সব উপকরণই হয়তো তিনি লেখায় ব্যবহার করেন না। লেখকের জহুরির মতো চোখ আর বিচার বুদ্ধিসম্পন্ন তীক্ষè বোধ ঠিক করে দেয় কোন তথ্য কতটুকু ব্যবহার করবেন। বলা বাহুল্য কাজটি খুব একটা সহজ নয়।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই সময় ও পূর্ব-পশ্চিম খুবই সুস্বাদু গদ্যের ইতিহাস আশ্রয়ী উপন্যাস। ১৮৪০ থেকে ১৮৭০ সময়কালের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির বিশদ বিবরণ পাই সুনীলের সেই সময় উপন্যাসে। সত্য চরিত্রের পাশাপাশি তিনি কাল্পনিক বিভিন্ন চরিত্রও নির্মাণ করেছেন এই উপন্যাসে।
আরেকটি যে বিখ্যাত ঐতিহাসিক উপন্যাসের কথা আমার মনে পড়ছে, সেটা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা শাহজাদা দারাশুকো। মোগল সম্রাট শাহজাহানের জ্যেষ্ঠ পুত্র দারাশিকো এর মূল চরিত্র হলেও মোগলদের রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা, ষড়যন্ত্র, নিষ্ঠুরতাসহ প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন তথ্য এই উপন্যাসে এসেছে। বাংলাদেশের জনপ্রিয় ঔপনাসিক হুমায়ূন আহমেদের বাদশাহ নামদার উপন্যাসটিও মোগল আমলের ইতিহাসকেন্দ্রিক। এটি মোগল সম্রাট হুমায়ূনের জীবন নিয়ে রচিত যেখানে ঐতিহাসিক সত্যের পাশাপাশি লেখক হৃদয়জাত সত্যেরও অন্বেষণ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে শওকত আলীর প্রদোষে প্রাকৃতজন-এর কথাও বলা যেতে পারে। বাংলার প্রাচীন ইতিহাস তথা সেন রাজত্বের সময়কালে সমাজের প্রান্তিক অবহেলিত ও অত্যাচারিত মানুষজনের টিকে থাকার লড়াই এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য।
এই উপন্যাসগুলো ইতিহাসের নীরস সাল তারিখ বা যুদ্ধের কথা বলে না বরং ইতিহাসে অনুল্লিখিত অনেক সাধারণ মানুষের না বলা কথা এমন আশ্চর্য মুনশিয়ানায় তুলে ধরে যা সত্যিই অভূতপূর্ব।
আমাদের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা উপন্যাসগুলোও তো এখন ইতিহাসের কথাই বলে। কিন্তু সেই ইতিহাস মানুষের হৃদয়ানুভূতির, তার আত্মত্যাগ, তার প্রিয়জন হারানোর বেদনা এবং প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির গল্পগুলোও তুলে ধরে।
যদিও প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক দেবেশ রায় বলেছিলেন, ‘উপন্যাসের অন্বিষ্ট সমাজ নয়, সময় নয়, ইতিহাসও নয়। উপন্যাসের অন্বিষ্ট ব্যক্তি-মানুষ।’
অর্থাৎ ইতিহাস ও সাহিত্যের উদ্দেশ্য, দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রকাশ ভঙ্গি কখনই একরকম নয়।
ইতিহাসের লক্ষ্য হলো নির্মেদ নির্মোহ তথ্য উপাত্তের মাধ্যমে বাস্তব ঘটনার সঠিক বিবরণ তুলে ধরা আর সাহিত্য চায় সেই ঘটনার ভেতরের মানুষকে তার স্বপ্ন, অনুভব, আবেগ অনুভূতি ও দুঃখ যন্ত্রণাসহ চিত্রিত করতে। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেন, আমরা সত্যের জন্য ইতিহাস পড়ি, আনন্দের জন্য উপন্যাস পড়ি। সাহিত্যে যদি ভুল শিখি ইতিহাস পড়ে তা সংশোধন করা সম্ভব। কিন্তু সাহিত্যরস থেকে বঞ্চিত হলে হৃদয় ও স্বভাব শুকিয়ে শীর্ণ হয়ে যায়।
সবশেষে বলা যায়, ইতিহাস ও সাহিত্য প্রায়ই হাত ধরাধরি করে চলে। ইতিহাস চেতনা ও সময়ের গতিপ্রবাহের ওপর ভিত্তি করেই লেখক তাঁর উপন্যাসের কাহিনি সাজান। ঔপন্যাসিক নিপুণ দক্ষতায় ইতিহাসের কঙ্কালের ওপর রক্ত মাংস লাগান আর ইতিহাসকে অর্থপূর্ণ ও প্রাণময় করে তোলেন। ইতিহাস আমাদের জানায় কী ঘটেছিল আর সাহিত্য বর্ণনা করে সেই ঘটনার গুরুত্ব ও জনমানুষের মনে এবং জীবন যাপনে সেই ঘটনার প্রতিক্রিয়া। হৃদয় সত্য আর বাস্তব সত্য তখন একাকার হয়ে নতুন ও পূর্ণ সত্য নির্মিত হয়।
লেখক : কবি ও কথাশিল্পী
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



