Uncategorized

গল্প : সংবাদ কাটিংবিষয়ক বিভ্রান্তি : মঈনুস সুলতান

বাংলোর সুপ্রশস্ত বারান্দায়, রোজউডে নির্মিত ইংরেজ আমলের জমকালো প্ল্যান্টার্স চেয়ারটিতে বসে দাহার সাহেব কেবলই উসখুস করেন। প্রত্যুষের মিহি আলোয় সিরামিকের টবগুলোতে আধফোটা কলিসমেত পত্রপল্লব সোনালি আভায় দারুণভাবে উজ্জ্বল হয়ে আছে। কী যেন এক প্রতীক্ষায় তাঁর বেজায় বেচইন লাগে। শ্বেতশুভ্র চুল-দাড়ি-গোঁফে সুদর্শন বৃদ্ধ দারুণ তাজ্জব হন মরা সোতায় ঝিরিঝিরি জলের মতো স্মৃতি ফিরে আসছে দেখে! তিনি আধাফোটা কলিগুলোতে নজর রেখে মনে মনে উচ্চারণ করেন-অ্যাস্টার, চন্দ্রমল্লিকা, অ্যালিসম, স্ন্যাপড্রাগন ও জারবেরা…!

মাসখানেক আগে তিনি যেমন ওয়াকার ছাড়া ওয়াশরুমে পর্যন্ত যেতে পারতেন না, বাংলোর বেয়ারা তাঁকে ধরে-করে ওয়াকার থেকে নামিয়ে ইজিচেয়ারটিতে বসিয়ে দিলে, তিনি ঘঁষা কাচের মতো ঘোলাটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন টবে টবে ফুটে থাকা ফুলগুলোর দিকে, কিন্তু ওগুলোর নাম স্মরণ করা দূরে থাক, কখনও-কখনও নিজের বাবা কিংবা শ্বশুরের নামও গুলিয়ে ফেলতেন। আজ এ মুহূর্তে ফুলগুলোর নাম ইয়াদ করতে তাঁর যেমন কোনও অসুবিধা হচ্ছে না, তেমনি ওয়াকার নয়, কেবল লাঠির ওপর ভরসা করে হেঁটে এসে বারান্দার ভিনটেজ চেয়ারটিতে নিজে-নিজেই  বসতে পারলেন; ঘটনাটি শুধু রিমার্কয়েবলই না, উল্লেখযোগ্যও বটে। তো অভ্যাসবশত দাহার সাহেব পার্সি-কোটের জেব থেকে বের করেন ছোট্ট একটি নোটবুক। ভাবেন, ভুলে যাওয়ার আগে লিখে ফেলতে হয় ফুলগুলোর নাম, কিন্তু কোটের একাধিক জেবে হাত ঢুকিয়েও খুঁজে পান না ফাউন্টেন পেনটি।

যাক ফুল-টুলের নাম-টাম লিখে আর হবেটা কি ? কাবুলি বিলাইয়ের পশমি ছোঁয়ার মতো এক পশলা রোদ নীলমণিলতার দীঘল ঝোপটি ডিঙিয়ে এসে পড়ছে গায়ের উপর। ভোরবেলাকার উষ্ণতা উপভোগ করতে করতে দাহার সাহেব ভাবেন, ঠিক কত বছর আগে, সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর, কিংবা কোল্ডস্টোরেজের ব্যবসায় মুনাফার সংবাদে প্রফুল্ল হয়ে, তিনি তেতালা বাড়ির বেলকনিতে বসে শীতের সকালে পান করেছিলেন হরলিক্সের সাথে দুচামচ ব্র্যান্ডি মেশানো এক পেয়ালা ওয়ার্ম উইন্টার মর্নিং ড্রিংক। গেল বছর দশেকেÑ হতে পারে তেরো কিংবা ষোলো বছর ধরে, ডাক্তারদের বিধান মোতাবেক জীবন এত বেশি নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে যে, ওষুধভিত্তিক একাধিক গ্লাস-ভরা জল ভিন্ন অন্য কোনও পানীয় তাঁর পাতে জুটছে না।

দাহার সাহেবের অন্তরীণ জীবনের শুরুয়াৎ হয় চিকিৎসার জন্য বিলেত পাড়ি দিলে পর। সম্ভবত সুস্থও হয়েছিলেন বেশ খানিকটা, কিন্তু স্বাবলম্বী হতে পারেননি, তাই মেয়ে তাঁকে আটকে রাখলো ব্রিকলেইন এলাকার একটি আঁটসাঁট ফ্লাটে; মাঝেমধ্যে দেশে ফেরার জন্য অস্থির হয়ে ওঠলে, বিপত্নীক বাবাকে হরেক অজুহাতে পাঠালো একাধিক চিকিৎসা বিশেষজ্ঞর কাছে। এক পর্যায়ে শরীরে বাড়াবাড়ির ব্যাপারটা তুমুল হয়ে উঠে। মেয়ে ও জামাই তখন তাঁকে বৃদ্ধদের জন্য নির্ধারিত নার্সিং হোমে পাঠানোর পায়তারা কষলে তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন; বিষয়টা হাঙ্গার স্ট্রাইক অবধি গড়ালে, ক্যালিফোর্নিয়ায় কর্মরত ছোট ছেলে ও কোস্টারিকান পুত্রবধু তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেয়ার বন্দোবস্ত করে দেয়। বেশ কিছুদিন ছিলেন দিব্যি আরামে তাদের বাড়িতে। একটি জ্যামাইকান নার্স সপ্তাহে দু-তিন বার করে আসতো পরিষেবা দিতে। দিনকাল তাঁর কম-বেশি ভালোই চলছিল। কিন্তু ছন্দপতন ঘটলো ক্যান্সারের বিস্তৃতি ঘটায়। চিকিৎসা চললো মাসের পর মাস, ভালো হলেন, ফিরে এল সংক্রমণ ফের, সার্জারি, কেমো, রেডিয়েশন প্রভৃতির পর বছরখানেকের মেয়াদ দিয়ে অণকোলজিস্টই পরামর্শ দিলেন দেশে ফিরে যেতে।

স্বদেশে ততদিনে সরকারের বদল হয়েছে কম-সে-কম বার-চারেক, গড়ে উঠেছে হরেক রকমের অবকাঠামো। দাহার সাহেব যখন বিদেশে পাড়ি জমান, তখন অবধি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় তাঁর মাতৃভূমিকে অভিহিত করা হতো বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি হিসেবে; হালফিল অর্থনৈতিক নিরিখে বাংলদেশ থেকে যেমন তিরোহিত হয়েছে অতিদারিদ্র্য, তেমনি প্রযুক্তি অভিযোজনের ফলে যোগাযোগের বিষয়টা হয়ে উঠেছে অত্যন্ত সহজ। ধলছড়া চা-বাগানের জেনারেল ম্যানেজার বড় ছেলের আলিশান বাংলোটিতে এসে উঠার পথে, গাড়ির জানালা দিয়ে চোখে যা পড়লো… তথা বিদেশ-বাসের কতগুলো বছরের ব্যবধানে, দেশের পরিবর্তন, চেনা রেলওয়ে স্টেশন কিংবা জেলা-সদরের কোতোওয়ালি থানার সাবেকি কায়দার দালানকোঠা তেমন কিছুই আর আগের মতো নেই। রিকশা-জাতীয় যানবাহনে ব্যাটারির সংযুক্তি দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস করাটা তাঁর কঠিন হয়ে উঠল; এমন কি গরিবগুর্বো, মুটে-মজুর সকলের হাতে মোবাইলের ব্যবহার দেখে তিনি যেন শিঙমাছের কাঁটায় বেমক্কা ঘা খেয়ে গেলেন!

ভেবেছিলেন, বড়ছেলে সপ্তা-দুয়েকের মেহমানদারির পর বাবাকে পাঠাবে গ্রামের বনেদি বাড়িটিতে, ওখানকার পারিবারিক গোরস্তানে তো তাঁর কবরস্থ হওয়ার কথা; কিন্তু নানা অজুহাতে… অজ পাড়াগাঁয়ে রাতবিরাতে কিছু ঘটলে হাসপাতালে স্থানান্তর করা দুরুহ হবে বিধায়, তাঁকে ধরে রাখা হলো চা-বাগানের বাংলো-বাড়িটিতে। কম্পাউন্ডার এসে হররোজ খামোকা ফোঁড়তে শুরু করল ইনজেকশন, তত্ত্বতালাশির জন্য রাখা হলো একজন চা-শ্রমিক আয়াকে। চলৎশক্তিরহিতাবস্থায়ও পরিস্থিতি মেনে নিতে পারলেন না দাহার সাহেব। দিন কয়েকের জন্য গ্রামের বাড়িটিতে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়লেন, অবশেষে পুত্রবধূর মুখ থেকে শুনলেন, পৈতৃক বাড়িটি পঞ্চাশ বছরের মেয়াদে লিজ দেওয়ার কথা। একটি পর্যটক কোম্পানি নাকি আগেকার আমলের টিনের তিনতলা ঘরটি ভেঙে ওই জায়গায় হালফ্যাশনের কোঠাবাড়ি তুলে চালাচ্ছে বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট জাতীয় গেস্টহাউস; বিত্তবান পর্যটকরা এসে ওখানে দু-রাত্রি থেকে পুবের পাহাড়ে হামেশা যাচ্ছে ইকো-ট্যুর করতে। ইকো-ট্যুর বিষয়টি কি তা পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও জীবিতাবস্থায় সন্তানাদিকে সহায়-সম্পত্তির তাবৎ কিছুর মালিকানা হস্তান্তর করার বেআক্কেলামির জন্য নিজের ললাটে বিদ্যাসাগরী চটি দিয়ে তাঁর কষে চপেটাঘাত করতে বাসনা হলো।

এসব টানোপোড়েনে কখন যে প্রত্যাশিত মৃত্যুর মেয়াদ অতিক্রম করেছেন দাহার, তা কেউ খেয়াল রাখার প্রয়োজন বোধ করেনি। তবে তিনি কোনও এক ফাঁকতালে এ বাবদে সচেতন হয়ে ওঠে নিজের মনে হিসাব কষতে শুরু করেন, ক্যালেন্ডার ঘেঁটে নিশ্চিত হন, ডাক্তার-নির্ধারিত মেয়াদের পরও তিনি এক বছর পেরিয়ে আরও মাস-সাতেক দিব্যি বেঁচেবর্তে আছেন। শুধু কি তাই, শরীর যেন ভালো হয়ে উঠতে শুরু করেছে, কেমোতে ঝরে যাওয়া চুল-দাড়ি ফের গজিয়েছে, গায়ে জোর পাচ্ছেন, ফিরে এসেছে মনোবলও। তো লাঠিতে ভর দিয়ে একটু হাঁটাচলা শুরু করেন, বাধ সাধে পুত্র ও পুত্রবধূ; তাদের ধারণা, এ সব আচরণ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, পড়ে-টড়ে হাঁড়গোড় ভাঙলে এ বয়সে গর্দিসের শেষ হবে না। তাঁর শারীরিকভাবে সক্ষম হয়ে উঠাতে তারা যেন সন্ধিগ্ধ হয়ে পড়েছে।

অবশেষে ছেলে-বউ দুজনে মিলে যোগসাজশ করে ডেকে আনে গোটা দুই বিশেষজ্ঞ, তাদের মধ্যে একজন রীতিমতো জাঁদরেল কিসিমের। হাই-পাওয়ারের চশমার ফাঁক দিয়ে চোখমুখ বেজায় সিরিয়াস করে তিনি পয়েন্ট বাই পয়েন্ট ব্যাখ্যা করেন যে, তাঁর স্বাস্থ্যের এ পজিটিভ পরিবর্তন আদতে ঝড়-তুফানের পূর্ব মুহূর্তে সুশান্ত প্রকৃতির মতো। অন্য ডাক্তারটি আচরণে সহজ-সরল হলেও কোনও কারণ ছাড়া দেঁতো হেসে, রীতিমতো ডায়াগ্রাম এঁকে তাঁকে বোঝান, অবধারিত মৃত্যুর আগে তাঁর দেহ থেকে তিরোহিত হয়েছে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা, এ মুহূর্তে বারান্দায় গিয়ে বসাটাও হয়ে উঠতে পারে বিপজ্জনক। স্পেশালিস্ট দুজনই তাঁকে টোটাল বেড রেস্টের পরামর্শ দিলে তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর স্বাস্থ্যের উন্নতিতে খুশি হয়নি কেউই।

তো পুত্র ও পুত্রবধূ মাসখানেকের দীর্ঘ ফার্লো বা বাৎসরিক ভেকেশনে বিলেত গেলে দাহার সাহেবের অন্তরীণ-মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ওরা বিমানের সিঁড়িতে পা দেওয়ার সাথে সাথেই তিনি মুক্তি-পরিকল্পনার ছক কেটে ফেলেন। পয়লা পদক্ষেপ হিসেবে কম্পাউন্ডারকে দরাজ হাতে বখশিশ দিয়ে তাকে সপ্তাখানেকের জন্য ইনজেকশন থেকে বিরতি দিতে অনুরোধ করেন। কম্পাউন্ডার এতে অসন্তুষ্ট হয় না, উলটে সে টাকাগুলো সাবধানে মানিব্যাগে পুরে; তারপর বাহু, কোমর ও পায়ে অজস্র ইনজেকশন-জনিত ক্ষতে ফানাই নদীর বালু গরম করে সেক দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে, হাতের তালু ঘঁষতে ঘঁষতে গলা খাকারি দিয়ে বেরিয়ে যায়।

ইনজেকশন কর্মসূচি বাতিলের দু-দিন পর, শরীরে তুমুল তাকদ অনুভব করলে, দাহার সাহেব লাঠি ভর দিয়ে এসে বসেন বারান্দায়, বায়োস্কোপের রিলের মতো হারানো দিনের স্মৃতি ফিরে আসতে শুরু করে তখন। চোখ মুদে তিনি দেখতে পান, দৈনিক আজাদের পৃষ্ঠায় কৈশোরোত্তীর্ণ দাহারের চার-চারটি লেটার পেয়ে মেট্রিক পরীক্ষার মেধাতালিকায় বোর্ডে স্ট্যান্ড করার সুসংবাদ। পরবর্তী ফ্রেমে দেখতে পান, তরুণ ডাক্তার হিসেবে প্রচুর আত্মবিশ্বাস নিয়ে পারফর্ম করছেন প্রথম সার্জারি। ভাবেন, কোন কৌশলে এ চলমান দৃশ্যপটকে করে তুলবেন স্থিরচিত্র, তারপর তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করবেন স্মৃতিময় ছবিটি, কিন্তু সফল হন না, ঘুরতে থাকে চলচিত্রের অদৃশ্য রিল, পরিষ্কার দেখতে পান―পরিবর্তন হয়েছে তাঁর পেশার, মফসসলের সরকারি ডাক্তারের চাকরি থেকে রিজাইন দিয়ে সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, এমন কি… গলায় একাধিক ফুলের মালা পরে হাঁটছেনও নির্বাচন পরবর্তী বিজয় মিছিলে।

বুড়োসুড়ো মালি সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসে বারান্দার নানা জায়গায় রাখা সিরামিকের ফুলদানিগুলোতে তাজা-ফুল গুঁজলে, তাঁর স্মৃতিচারণে ইন্টারমিশন ঘটে। মালি তাঁকে ঝুঁকে সালাম দেয়, তিনি তার সঙ্গে আলাপ শুরু করেন। কথাবার্তায় জানতে পারেন যে, তিন-চার প্রজন্ম ধরে বাগানে কাজ করা এ বয়োবৃদ্ধ শ্রমিকের নাম বীরশা টপ্পো, তার জ্ঞাতিগোষ্ঠীর চা-শ্রমিকদের দিনযাপনে ইদানীং অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটছে। আজকাল তারা ঢেউটিনের চালওয়ালা পাকা ঘরে বসবাস করছে, বন্দোবস্ত হয়েছে বিজলি বাতিরও। তাদের ছেলেমেয়েরা সুযোগ পাচ্ছে স্কুলে যাওয়ার। বেশ কয়েকটি শ্রমিক-সন্তান কলেজে পাস দিয়ে বাগানের বাইরে নিকটবর্তী শহরে চাকরি-বাকরি জুটিয়ে নিয়েছে। মালির ছোট-ছেলে সীতারাম টপ্পো কলেজে পড়াশোনা করেছে বছর চারেক, একটি চাকরিও পেয়েছিল, কিন্তু পোষায়নি, তাই যুবকটি হালফিল উবার চালাচ্ছে এবং নাইট কলেজে এলএলবি পড়ছে। দাহার সাহেবের ট্রেন ধরে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার আগ্রহের কথা শুনে বীরশা মোবাইলে ছেলে সীতারামকে কল দেয়। তরুণটি রাজি হয় পরদিন ভোরবেলা তাঁকে রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে দেওয়ার।

এ বাংলোর গ্যারেজে হাল ফ্যাশনের গাড়ি আছে গোটা তিনেক। সুখলাল ওরাও নামে একটি প্রৌঢ় ড্রাইভারও আপাতত অবসর পেয়ে গ্যারেজের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁতে খৈনী গুঁজে সময় কাটাচ্ছে। সে দাহার-সাহেবকে গাড়িতে চড়তে দিতে অলরেডি অপারগতা প্রকাশ করেছে। কারণ, বড়ছেলে ও তার পত্নী বাংলো ছাড়ার আগে তাকে পই পই করে নিষেধ করে গেছে। বকশিশ দিয়ে কর্তাভজা সুখলালকে টলানো যাবে না। সুতরাং বীরশার পুত্র সীতারাম এ মুহূর্তে হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্ধের যষ্ঠির মতো দাহার সাহেবের একমাত্র ভরসা।

কাঁচা কাজ করার বান্দা নন ডাক্তার দাহার, রীতিমতো রেলওয়ে টাইমটেবিল দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সকাল সাড়ে-নয়টার লোকাল ট্রেনটি ধরার। সে মোতাবেক, আটটা তিরিশে সীতারাম টপ্পোর উবার নিয়ে তাঁকে পিকআপ করার জন্য বাংলোতে এসে পৌঁছার কথা। সদ্য ফোটা ফুলের তালাশ পাওয়া মৌমাছির মতো অস্থির হয়ে দাহার সাহেব এদিক-ওদিক তাকান, অতঃপর কব্জিতে পরা ওমেগা-স্পিডমাস্টার ঘড়িটির দিকে নজর দেন। না, আটটা বাজতে এখনও মিনিট-পাঁচেক বাকি আছে। রোদ পড়ে নিখাদ সিলভারের ডায়ালটি ঝলমলিয়ে উঠছে, সুন্দর একটি স্মৃতি ফিরে আসে মনে। বিয়ের বছর সাতেক পর তিনি সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁর শ্বশুর, পেশায় জেলা শহরের দুঁদে আইনজীবী হলেও যিনি গ্রহ-নক্ষত্রের খোঁজখবর রাখতেন, ঈদে-চান্দে ঘাঁটতেন স্টার-ম্যাপ ও খগোল পরিচয় জাতীয় কেতাবপত্তর, স্পিডমাস্টার ঘড়িটি উপহার হিসেবে তাঁর হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘দিস ইজ নোউন অ্যাজ মুনওয়াচ, ইউ রিয়েলি ডিজার্ভ ইট, মাই ডিয়ার সন।’

উঠে পড়ে দাহার সাহেব বারান্দার হ্যাট-স্ট্যান্ডের সামনে দাঁড়ান, দেয়ালে টাঙানো আয়নায় পার্সি-কোট পরা তাঁর দীর্ঘ-দেহটি প্রতিফলিত হয়, পিতলের আটটি বোতাম কিঞ্চিৎ জং-ধরে খানিকটা মলিন হলেও লেবাসটি তাঁকে দিয়েছে ফর্মাল লুক, শ্বেতশুভ্র চুলদাড়িতেও এসেছে বাদশাহ শাহজাহান শোভন আভিজাত্য। তিনি দাড়ি খিলাল করতে করতে ভাবেন সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার প্রসঙ্গ। সরকারি ডাক্তারের চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে হজে যাওয়া উপলক্ষ্যে রেখেছিলেন কুচকুচে কালো চাপ-দাড়ি, কিন্তু ক্যান্ডিডেট হিসেবে পোস্টারের ছবি তোলার সময় কায়দা করে কেটেছেটে তা ফ্রেঞ্চ-কাটের শেপে নিয়ে আসেন। ক্যাপস্টেন সিগ্রেট ছেড়ে ওই সময়ই পাইপ স্মোক করতে শুরু করেছিলেন, এরিনমোর টোবাকোর গন্ধটা তাঁর দারুণ লাগতো, সাংসদ হিসেবে প্রথম যে বার পার্লামেন্টারি টিমের সদস্য হয়ে ইউরোপ গেলেন, ফেরার পথে হিথরো বিমানবন্দর থেকে কিনেছিলেন ব্রায়ারের একটি সুদর্শন পাইপ…, ‘হাউ কুইকলি গন আর দোজ গুড ওল্ড ডেইজ…’ উচ্চারণ করতে করতে দীর্ঘশ্বাস চাপেন তিনি, তখনই সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠে এসে সালাম দেয় বুড়ো মালি বীরশা টপ্পো, বুঝতে পারেন উবার নিয়ে তার ছেলে সীতারাম চলে এসেছে।

স্টিয়ারিং হুইল ধরে থাকা সীতারাম টপ্পোর পাশে সামনের সিটটিতে বসেন দাহার সাহেব। চেক-কাটা মাফলারে গলা জড়ানো চশমা-চোখে বুদ্ধিদীপ্ত চেহারার সীতারামকে তাঁর পছন্দ হয়। তরুণটি সদালাপি, যেতে যেতে আলাপ জমে উঠতে দেরি হয় না। নাইট কলেজে এলএলবি পড়ার কারণে সীতারাম আইন-কানুনের সাম্প্রতিক পরিবর্তন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। কৌতূহলবশত তিনি উইল করে ছেলেমেয়েদের সহায়-সম্পত্তি তাবৎ কিছু দিয়ে দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করেন। সে আইনের একাধিক ধারা-উপধারা উল্লেখ করে তাঁকে বুঝিয়ে বলে, উইল করাতে কিংবা পারিবারিক এস্টেটের ব্যবস্থাপনা সন্তানদের হাতে ট্রান্সফার করার পরও কিন্তু সম্পত্তির ওপর তিনি মালিকানা হারাননি। চাইলে দক্ষ উকিলের মারফত এগুলো বাতিল করে নতুন উইল করতে পারেন, অথবা প্রপার্টি ব্যবস্থাপনার দায়-দায়িত্ব নিজের হাতে তুলেও নিতে পারেন।

গাড়ি এসে থামে রেলওয়ে স্টেশনের সামনে। সীতারামের মোবাইলে কল আসে, দাহার সাহেব ইশরায় তাকে ধন্যবাদ দিয়ে নেমে পড়তে গেলে, সে মোবাইল সরিয়ে ফোনালাপ সারার জন্য তাকে মিনিটখানেক সময় দিতে অনুরোধ করে। রাজি হন না তিনি, বলেন, ‘থ্যাংক ইউ ইয়াংম্যান, এ রেলওয়ে স্টেশনটি আমার চেনা, আই ক্যান টেক কেয়ার অব মাইসেল্ফ,’ বলে চা-গাছের শিকড় পালিশ করে তৈরি কোঁকড়া লাঠিতে ভর দিয়ে হেঁটে যান টিকিট কাউন্টারের দিকে। ওখানে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের ভিড় দেখতে পেয়ে তিনি সোজা হেঁটে গিয়ে  ঢোকেন টিকিট-মাস্টারের কামরায়। টেলিফোনে ‘হ্যালো হ্যালো…কন্ট্রোল…নাইন ডাউন…,’ বলতে বলতে থতমত খেয়ে টিকিট-মাস্টার তাঁকে সালাম দিয়ে বসতে বলেন। ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট খরিদ করতে কোনও অসুবিধা হয় না, টিকিট-মাস্টার উলটো তাঁকে তোয়াজ করে চা খেতে অনুরোধ করেন। স্বভাববশত মৃদু হেসে অনুরোধ উপেক্ষা করে টিকিট-মাস্টারের হাতে তিনি তুলে দেন তাঁর ভিজিটিং কার্ডটি। চশমার ফাঁক দিয়ে টিকিট-মাস্টার ‘সাবেক সাংসদ’ প্রভৃতি পড়ে আরও গদগদ হয়ে ট্রেনটি যে ঘণ্টাখানেক লেট হবে―তা জানিয়ে, পাইটম্যান গোছের এক লোককে ডেকে, দাহার সাহেবকে আপার ক্লাস ওয়েটিং রুমে পৌঁছে দিতে হুকুম করেন।

টিকিটের কামরা থেকে বেরোতে গিয়ে দাহার সাহেব অনুভব করেন, প্রায় এক যুগ পর তাঁর শরীরের প্রতিটি রন্ধ্র দিয়ে বসন্তের কিশলয়ের মতো বেরুচ্ছে আলগা এনার্জি। ওয়েটিং রুমের সামনে এসে ওয়ালেট থেকে বের করে দরাজ হাতে পাইটম্যানটিকে বকশিশ দেন, তারপর রুপিয়ার নোটগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে ভাবেন, ভাগ্যিস, অনেক বছর ধরে হ্যাঙ্গারে ঝুলে থাকা পার্সি-কোটটির পকেটে ভিজিটিং কার্ডের কেইস ও একতাড়া রুপিয়া-ভর্তি ওয়ালেটটি ছিল। হাঁটাহাঁটিতে ইতিমধ্যে তাঁর কিঞ্চিৎ ক্ষুধারও উদ্রেক হয়েছে। তো ওয়েটিংরুমে না গিয়ে সটান গিয়ে ঢুকে পড়েন পাশের আপার ক্লাশ রিফ্রেশমেন্ট রুমে।

রোগশোকে ভুগে বছর-কে-বছর তিনি কেবল যৎসামান্য ওটমিল, ভেজিটেবল স্যুপ ও ফলের রস খেয়ে বেঁচে আছেন, আজ সুযোগ পেয়ে ওয়েটারকে বাটারটোস্ট ও চিকেন কাটলেট সার্ভ করতে হুকুম করেন। মুখরোচক নাস্তাপানির পরপরই পরিবেশিত হয় টিপট ভর্তি তপ্ত চা। তাতে চুমুক দিতে দিতে ভাবেন, স্টেশনে ব্রিটিশ আমলের দালানকোঠা ভেঙেচুরে উত্তরাধুনিক কেতার অবকাঠামো গড়ে উঠেছে বলে যে গল্প ছেলে ও পুত্রবধূর মুখ থেকে শুনেছেন, তা সম্পূর্ণ ভুয়া, ঠিক বুঝতে পারেন না চলৎশক্তিরহিত ব্যাপকভাবে রুগ্ণ পিতাকে নিজের পুত্রসন্তান কেন ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করে রেখেছিল ?

ওয়েটারকে বকশিশ দিয়ে প্ল্যাটফর্মে বেরিয়ে আসেন দাহার সাহেব। না, তেমন কোনও পরিবর্তন তো চোখে পড়ছে না। বইপত্রের স্ট্যান্ডটি ঠিক আগের জায়গায়ই আছে, তো ওখান থেকে তিনি কিনে নেন ‘পূর্বদেশ’ ও ‘মর্নিংনিউজ’ নামে দুটি পত্রিকা। হেডলাইনে ফলাও করে ছেপেছে, আগরতলা ষড়যন্ত্র মমলার বিবরণ। তাতে চোখ বুলিয়ে আস্তে-ধীরে পায়চারি করেন দাহার। পার্সি-কোট ও আলিগড়ি পায়জামায় ধোপদুরস্ত মানুষটিকে সমীহ করে প্ল্যাটফর্মে মুটেমজুররা সালাম ঠোকে, ভিখারিরাও হাত পাতে। ওদের হাতে ভাংতি পয়সা গুঁজে দিতে গিয়ে জেবের তলানিতে ঠেকে সিলভারের সিগ্রেট হোল্ডার ও রনসন গ্যাসলাইটার। হোল্ডারটি ঠোঁটে কামড়ে তিনি জমজমাট একটি টং-দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ান। হুকে ঝুলানো ট্রানজিসটার-রেডিওতে ফেরদৌসী রহমানের গলায় বাজছে আধুনিক গান, ‘ছায়া হয়ে তবু পাশে রইবো…,’  কণ্ঠসংগীতটি শুনতে শুনতে অনুভব করেন, পুরো পরিসর ভরে উঠছে পানপরাগ ও গুলবাহার জর্দার সুগন্ধে। দোকানির ঠিক পেছনে ঝুলছে অনেকগুলো হাতআয়না, তাতে বাহার সাহেবের শ্বেতসৌম্য চেহারার অনেকগুলো খণ্ডাংশ ভেসে ওঠে; বেজায় অবাক হন হাতআয়নাগুলোর তলায় সযত্নে রাখা কয়েকটি ত্রি-ক্যাসোলস ও সিনিয়র সার্ভিস সিগারেটের প্যাকেট দেখে!

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ সব ব্র্যান্ডের সিগারেট দোকানপাট থেকে উধাও হয়ে গিয়ে তার জায়গায় যে ফাইভ ফিফটি ফাইভ ও বেনসন হেজেস প্রভৃতি চালু হওয়ার কথাবার্তা শুনেছিলেন, তা আদৌ সত্য নয়! তাঁকে এ রকম ধোঁকার ধূম্রজালে ঢেকে রাখার জন্য বেজায় অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি কিনে নেন এক প্যাকেট সিনিয়র সার্ভিস সিগারেট। সিলভারের হোল্ডারে এক শলা গুঁজে প্রায় দেড়-যুগ পর আয়েশ করে ধোঁয়া ছাড়েন। টং টং করে ঘণ্টা বাজিয়ে, পুরো প্ল্যাটফর্মে আলোড়ন তুলে সমারোহে এসে পৌঁছে তাঁর প্রত্যাশিত লোকাল ট্রেন। একটু আগে বকশিশ পাওয়া পাইটম্যানটি এসে তাঁকে ছোটাছুটিতে ব্যস্ত ভিড়ভাট্টার ভেতর দিয়ে আগ বাড়তে সাহায্য করে। ট্রেনের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল করেন, ইন্টার ক্লাসের বগির সিঁড়িতে ত্রিপিস স্যুট পরা এক প্যাসেঞ্জারের সঙ্গে বেঁধেছে মাথায় গামছা-পেঁচানো মারকুটে কিসিমের এক মুটেমজুরের জোর কাজিয়া, যাত্রীটির সদ্যবিবাহিত স্ত্রী অপ্রস্তুত হয়ে মেহেদিপরা হাতে কাঞ্চিপুরম শাড়ির আঁচল টেনে ঘোমটা দেওয়ার চেষ্টা করছে। পাশে জেনানাদের জন্য নির্ধারিত বগিটির জানালায় বোরকাপরা এক নারী হাত বাড়িয়ে ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কিনছেন ঝালমুড়ি।

পাইটম্যান তাঁকে তুলে দেয় ফার্স্টক্লাস কম্পার্টমেন্টে। উলটোদিকের জানালা ঘেঁষা সিটে বসে মাঝবয়সী এক মহিলা কুরুশকাঁটায় কিছু বুনতে বুনতে আড়চোখে তাঁকে দেখে নেন। মহিলার সহযাত্রী কোর্তা-পায়জামা-নাগরায় লেফাফাদুরস্ত পুরুষটি মুখের সামনে থেকে রিডার্স ডাইজেস্টখানা সরিয়ে সমীহ করে তাঁকে সালাম দেন। তার আচরণে মনে হয় তিনি দাহার সাহেবকে ঠিকই শনাক্ত করতে পেরেছেন। না পারারও কোনও কারণ নেই, হেঁজিপেঁজি কেউ তো নন, তিন-তিন বারের নির্বাচিত সাংসদ, পল্লী-বান্ধব নামে একটি পত্রিকাও দাহার সম্পাদনা করেছেন বছর-পাঁচেক। যাই হোক, স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্য নিয়ে তিনি জানালায় চোখ রাখেন। প্রলম্বিত ভেঁপুতে প্ল্যাটফর্ম উতরোল করে দিয়ে মৃদু ঝাঁকুনিতে চলতে শুরু করে ট্রেন।

রেলগাড়িটি আজ কেন জানি বেজায় জোরে ছুটছে। লোকাল ট্রেনের তো এত ফাস্ট মুভ করার কথা না। চেনা একটি স্টেশনে এসে থামে গাড়িটি। ‘ফৈজি মিয়ার হাতকাটা মহাশক্তি তৈল’ হাঁক দিয়ে এক ফেরিওয়ালা সিঁড়ি-ধরে উঠে পড়লে পুরুষ-সহযাত্রীটি চাপা-স্বরে ‘ফার্স্ট ক্লাস’ বলে তাকে হটিয়ে দেন। দাহার সাহেব চেষ্টা করেন পূর্বদেশ পত্রিকার লিড-নিউজটি পড়তে, কিন্তু হেডলাইনে বড় করে ছাপা ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ ছাড়া আর কিছু চোখে ঠাহর করতে পারেন না, বড্ড আফসোস হয় হাই-পাওয়ারের রিডিং গ্লাসটি সাথে করে না আনার জন্য। হাল ছেড়ে দেন তিনি, কিন্তু মাথা থেকে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’র প্রসঙ্গ সরাতে পারেন না, ঠিক বুঝতে পারেন না, দেশ হানাদারমুক্ত হওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব পাকিস্তানের জেলখানা থেকে ছাড়া পেয়ে ঢাকায় ফিরে নতুন দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন, আরও কত কী ঘটলো, তারপরও কেন পূর্বদেশ পত্রিকাটি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছে ?

ট্রেন এবার ঝমঝমিয়ে পাড়ি দিচ্ছে ইলাশপুরের ডালার পুল। জং-ধরা লোহার রেলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবেন, আদ্যিকালের এ রেলওয়ে ব্রিজটি ভেঙে নতুন করে সেতু তৈরি হওয়ার যে আষাঢ়ে গল্প বড়ছেলে ও তার বউয়ের মুখে শুনেছিলেন, তা সম্পূর্ণ অসত্য, ব্রিজখানি তো অবিকল আগের মতোই আছে; তলা দিয়ে ভেসে যাচ্ছে দড়ি দিয়ে বাঁধা পর পর অনেকগুলো বাঁশের চালি। একটি স্মৃতি ফিরে আসে মানসপটে। সরকারি ডাক্তারের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন সাংসদ, পাশাপাশি শুরু করেছেন কিছু ব্যবসা-বাণিজ্য। ইজারা নিয়েছেন         বাঁশমহাল, পুবের পাহাড় থেকে কেটে নেওয়া বাঁশের চালান এরকম চালির মারফত ভাসিয়ে পাঠাতেন দূর দূরান্তের শহর-বন্দরে; তখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাঁর নামে তহবিল তছরুপের বদনাম উঠিয়েছিল। এটা ঠিক, সাংসদ হিসেবে প্রভাব খাটিয়ে তিনি বাঁশমহালের ইজারা নিয়েছিলেন, তাঁর মহালদার হওয়াতে কিছু লোকের যে কর্মসংস্থান হয়েছিল, মুনাফার টাকাতে ঈদে যে তিনি শত-শত গরিবগোর্বাকে লুঙি-শাড়ি বিতরণ করতেন, এ সব ভালো কাজের কথা কিন্তু কাউকে কখনও উল্লেখ করতে শোনেননি।

খামোকা ভেঁপু বাজিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটছে ট্রেন, জারকিংয়ে বিপন্ন হয়ে তিনি সিটরেস্ট খুঁজেন। চোখের কোণ দিয়ে তখন দেখতে পান, গ্রামীণ হাসপাতালের জং-ধরা ঢেউটিনে ছাওয়া দালানটি। এখানে অনেক অনেক বছর আগে শুরুয়াৎ হয়েছিল তাঁর ডাক্তারি ক্যারিয়ারের। সেকেন্ডহ্যান্ড একটি হোন্ডা-ফিফটি মোটরবাইক কিনেছিলেন, বয়োবৃদ্ধ পিতা তখন গ্রামের বাড়িতে বয়সের ভারে তুমুলভাবে ভারাক্রান্ত; কোথাও যেতে-টেতে পারেন না, বারান্দায় ঘরবৈঠকী হালতে বসে হয় গোরা নয় বিষাদ সিন্ধুর পৃষ্ঠা উলটান, ফর্সিহুক্কায় দম দিয়ে প্রবলভাবে কাশেন, আর বারবার নিজের ভাগ্যকে দোষারূপ করে চিলমচিতে ফেলেন কফ-কাশ। তো প্রতি বৃহস্পতিবারে বাইক হাঁকিয়ে গ্রামে ফিরতেন তিনি। শুক্রবার বাদ-জুম্মা গ্রামের বাজারে দাহার-মার্কেটের ঘুপচি এক কামরায় বসতেন ঘণ্টা  দুয়েক, হরেক রোগেশোকে ব্যতিব্যস্ত পাড়া-গাঁয়ের মানুষজন তখন চিকিৎসার জন্য তাঁর দ্বারস্থ হত। ফ্রি প্রেসক্রিপশন লিখে দিতেন। ওই একটি ঘোড়া তারুণ্যে তিনি ঠিক ঠিকই ধরেছিলেন, যারা তাঁর চিকিৎসায় উপকার পেয়েছিল, তারা পর পর তিন-তিনটি নির্বাচনে তাঁকে শুধু ভোট দেয়নি, কেউ কেউ ক্যানভাসেও শরিক হয়ে প্রতিদান দিয়েছিল।

 লেভেল ক্রসিং পাড়ি দিতে গিয়ে স্লো হয় ট্রেনটি। রেললাইনের পাশাপাশি প্যারালাল চলছে রাজসড়ক। ফানাই নদীর যে পুলটি মেরামতের জন্য সরকারি অনুদান পেতে তাঁকে তত্ত্বতালাশি করতে হয়েছিল, চোখে পড়ে―তার রেলিংয়ে বসে গুলতানিতে মেতেছে কয়েকটি তরুণ। ধানখেত পাড়ি দিয়ে হাজামজা দিঘির পাড়ে ঠিক আগের মতো দাঁড়িয়ে আছে দাহার কোল্ড স্টোরেজ। ওই ব্যবসাটি দাঁড় করানোর জন্য তাঁকে মেহনত করতে হয়েছিল প্রচুর, তবে এতে শুধু কর্মসংস্থান হয়নি, চাঙ্গা হয়েছিল স্থানীয় অর্থনীতিও। দুর্নীতির বদনামও জুটেছিল, জেলা সদরের দুটি পত্রিকা লেগেছিল তাঁর পেছনে। যদিও কোল্ড স্টোরেজ করার জন্য মন্ত্রী-মিনিস্টারকে ধরে-করে তিনি ব্যাংক-লোন নিয়েছিলেন, কিন্তু মূলধন তো জোগাড় করেছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া মা ও দাদির অলংকারাদি বিক্রি করে, বাবার মৃত্যর পর সিন্দুক খুলে তিনি পেয়েছিলেন কম-বেশি আশি-পঁচাশি ভরির মতো সোনার জেওরাত।

 ট্রেন এসে থামে―যে পল্লীগ্রামে তাঁর জন্ম গেল শতাব্দীর ঠিক মাঝামাঝি, তার সংলগ্ন একটি স্টেশনে। কড়ই গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি প্যাডেল-রিকশা, একটি চালক তাঁকে সমাদর করে তুলে নেয়। চুটকি দাড়ি-ভরা মুখে সুন্দর করে হেসে প্যাডেল মারতে মারতে ঘাড় ফিরিয়ে তাঁকে সালাম দিলে, রিকশাওয়ালা রহমত আলীকে চিনতে দাহার সাহেবের কোনও অসুবিধা হয় না। হোন্ডা-ফিফটি বাইকটি কেনার আগে তিনি যখন লোকাল ট্রেনে বাড়ি ফিরতেন, এই রহমত আলীই কখনও ছাতা…আর রাতবিরাত হলে লণ্ঠন-হাতে তাঁর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকত প্ল্যাটফর্মে। বড্ড তাজ্জব লাগেÑএত বছরের ব্যবধানেও রিকশাওয়ালাটির গতরে বয়সের কোনও ছাপ পড়েনি দেখে!

দু পাশে ধানের খেতের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা মেঠোপথে রিকশাটি আগায়। কপালে হাত দিয়ে সূর্যের আলো ফেরান তিনি, তারপর বাম দিকের রবিশস্যে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা মাঠের দিকে তাকান। দূরের নারকেলবীথির উপর দিয়ে দেখা যায়, পুরোনো কেতার ঝুল বারান্দাওয়ালা তাঁদের ঢেউটিনের তিনতলা বাড়ি। নিমেষে তাঁর হৃৎপিণ্ড যেন একটি বিট স্কিপ করে, দারুণভাবে অবাক হওয়ার সাথে ক্ষোভ মিশে গিয়ে তাঁকে রীতিমতো হতভম্ব করে দেয়! অনেক বছরের বিষয়ী-বান্দা ডাক্তার দাহার, কোনও কিছু আঁচ করার অসামান্য খোদাদাদ ক্ষমতার জন্য তিনি যেমন তারুণ্যে ডাক্তার হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছিলেন, তেমনি পরবর্তী জীবনে শুধু সফল রাজনীতিবিদই নন বিপুল ভূসম্পত্তির অধীকারীও হয়েছিলেন; তাঁর মস্তিষ্কে ঠিক ঢোকে না, কী কারণে পুত্রবধূ তাঁকে পৈত্রিক বাড়িটি পঞ্চাশ বছরের জন্য কোনও এক পর্যটন কোম্পানিকে লিজ দেওয়া এবং তা ভেঙেচুরে কোঠাবাড়ি তোলার আজগুবি কিসসা শুনিয়েছিল!

পদাঘাতে চরের বালুকা সরে গিয়ে অনেক দিন আগে হারিয়ে যাওয়া আংটি খুঁজে পাওয়ার মতো প্রয়োজনীয় একটি স্মৃতি ফিরে আসে। সাইক্লোনে পিতামহের আমলে তৈরি ঢেউটিনের ঝুলবারান্দাওয়ালা বাড়িটি বিপদজ্জনকভাবে ঝুঁকে পড়লে, পক্ষাঘাতে পঙ্গু পিতাকে দাহার জেলাসদরের নিজ বাসায় নিয়ে যান, ওখানে পিতার চিকিৎসার সুবন্দোবস্ত হলেও বৃদ্ধ মানুষটির মনের শান্তি ফিরে আসেনি, তিনি কেবলই বনেদি বাড়িটি যে কোনও মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে এ আশঙ্কায় অষ্টপ্রহর আহাজারি করতেন। তো দাহার সাহেব ঘরটি সাবধানে ভাঙিয়ে, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বিশেষ ধরনের কাঠ আমদানি করিয়ে, বাড়িটি প্রায় আগের ডিজাইনে পুনরায় নির্মাণ করিয়েছিলেন; এমনি কি ঝুলবারান্দা ও ঢেউটিনের কার্নিসের সর্বত্র কাঁঠাল-কাঠ কুঁদে তৈরি ঝালরও লাগিয়েছিলেন; এবং তিনতলায় হাওয়ার টুল্লির জায়গায় নিজের জন্য চিলতে বেলকনিযুক্ত একটি কামরাও তৈরি করিয়েছিলেন। পুনরায় নির্মিত ঘরটির সাদাকালো ফটোগ্রাফ দেখে বাবা খুব খুশি হয়েছিলেন। পিতার ওফাতের পর সপ্তাহে দুবার করে গ্রামের বাড়িতে ফিরতে শুরু করেন দাহার। রাজনীতির ডামাডোল প্রখর হলে, কিংবা অন্য কোনও কারণে স্ট্রেস তুমুল হলে, ঘরে ফিরে তিনি তিনতলার কামরাটিতে নিরিবিলি একটি-দুটি দিন কাটাতেন। বেলকনি থেকে পরিষ্কার দেখা যেত বালুচরে ধূসর হয়ে ওঠা বহতা নদী, সন্ধ্যারাতে চাঁদ উঠলে জ্যোৎস্নায় বাক্সমময় হয়ে উঠতো চলমান জলের রজতরেখা, মাঝেমধ্যে বেলকনিতে বসে দাহার-সাহেব পান করতেন এক পেগ ব্র্যান্ডি, আর গ্রামোফোনে বাজতো ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলীর গীত ঠুমরি‘ম্যায় কা কারো সজনি, আয়ে না বালাম…।’

রিকশা তাঁকে নামিয়ে দেয় দাহার মার্কেটের মূল দালানের সামনে। বারান্দার ছাদ-ছত্রীতে রেড অক্সাইড দিয়ে লেখা, ‘স্থাপিত-১৯৪১ সাল,’ মলিন হয়েছে বটে, তবে সম্পূর্ণ মুছে যায়নি। পার্টিশনের আগে, ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকে যখন দাহার সাহেবের বাবা নির্বাচিত হয়েছিলেন ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের সদস্য, তখন এ দালানটি হয়ে উঠেছিল তাঁর বৈঠকখানার মতো। কাজ-বাজের ফাঁকে টানাপাঙ্খার তলায় বসে তিনি জিরোতে জিরোতে অলস চোখে উলটাতেন পরিচয় কিংবা সওগাতের পৃষ্ঠা। জমিদারি বিলুপ্ত হওয়ার অনেক বছর পর খেসারতের টাকা পেয়ে, তা দিয়ে দু পাশে ভাড়া দেওয়ার জন্য আরও ষোলটি দোকানঘর যুক্ত করিয়েছিলেন। পিতা পক্ষাঘাতে পঙ্গু হলে এ বৈঠকখানাতে বাবার সংগ্রহের বইপত্তর দিয়ে দাহার সাহেব চালু করেছিলেন পাঠাগার।

রিডিং ক্লাব নামে পাঠাগারটি এখনও চালু আছে দেখতে পেয়ে খুশি হয়ে দাহার সাহেব ঢুকে পড়েন হলকামরায়। অদল-বদল তেমন হয়নি দেখে তাঁর ভীষণ ভালো লাগে। তবে লাইব্রেরিয়ান বলে কাউকে দেখতে না পেয়ে যুগপৎ বিরক্তও হন। তখনই চোখে পড়ে যৎসামান্য পরিবর্তন, টানাপাঙ্খার জায়গায় ফরফরিয়ে ঘুরছে ফ্যান, আর বাবার ছবিটি একপাশে সরিয়ে ওই জায়গায় লাগানো হয়েছে কাচে-বাঁধানো দাহার সাহেবের প্রিন্স স্যুট পরা চৌকশ একটি ফটোগ্রাফ। কৌতূহলী হয়ে তিনি আলোকচিত্রটি খুঁটিয়ে দেখতে আগান। নজরে পড়ে, তলায় ফ্রেম করা একটি সংবাদ কাটিং। ঝুঁকে তিনি নিউজটি পড়ার চেষ্টা করেন, হেডিংয়ের শব্দগুলো দৃষ্টিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ‘প্রয়াত সাংসদ দাহার সাহেবের স্মৃতিতে জেলাসদরে শোকসভা।’ ঠিক বুঝতে পারেন না, সক্রিয় রাজনীতি থেকে তিনি অবসর নিয়েছেন দেড়যুগের মতো, তারপরও স্থানীয় একটি পত্রিকা কেন তাঁর জীবন-মৃত্যু নিয়ে বেমক্কা মজাক করল, নাকি এ অপসংবাদ মুদ্রণের পেছনে আছে কোনও মহলের গূঢ় কোনও অভিপ্রায় ? বেজায় বিভ্রান্ত লাগে তাঁর! কাঁপা হাতে তিনি ধরান এক শলা সিনিয়র সার্ভিস সিগারেট।

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button