Uncategorized

গল্প : মানুষের মুখ : পারভেজ হোসেন

গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় এসে চার দিন ধরে পল্টনের একটা হোটেলে আটকে আছে হায়দার। গন্তব্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি। কিন্তু ফ্লাইটের কোনও ঠিক-ঠিকানা নেই। শত শত যাত্রী মহাবিপদের মধ্যে প্রতিদিন বিমান অফিসের সামনে হৈ-হল্লা করছে। পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করছে। মহামারির আতঙ্কজনক অবস্থায়ও তোয়াক্কা করছে না স্বাস্থ্যবিধির। কারও মুখে মাস্ক আছে তো কারও নেই আর থাকলেও তা মুখে নেই, নমুনা হয়ে থুতনির নিচে ঝুলছে। আজ দুপুরে মাথার তালু ফাটানো কটকটে রোদের মধ্যে একেবারে মরিয়া হয়ে উঠল বিদেশগামী অসহায় মানুষগুলো। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠল। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতেই লাঠিপেটা শুরু করল পুলিশ। দৌড়াতে গিয়ে আছড়ে পড়ে হাঁটু ছিলে গেছে হায়দারের। ঠোঁট ফেটে ফুলে গেছে। এ বয়সে এটা মারাত্মক। একটা জোয়ান ছেলে টেনে না ধরলে আরও বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারত।

পৃথিবীর বাতাসে তাণ্ডব চলছে, হাহাকার উঠেছে। এই দেশও এখন আর তার বাইরে নয়। অথচ এর মধ্যেও প্রয়োজন মানুষকে কেমন উ™£ান্ত করে তুলেছে! মৃত্যুকেও বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করছে না কেউ। কী করেই বা করবে―এদের কারও কারও ভিসার মেয়াদ শেষ। কারও চাকরিতে যোগ দেবার সময় ফুরিয়ে গেছে। ঢাকায় কয়েকটা দিন থেকে যে অপেক্ষা করবে তেমন টাকা-পয়সাও হাতে নেই এমন লোকের অভাব হবে না এখানে। তাছাড়া কোভিড-১৯ পরীক্ষার কাগজের মেয়াদও তো শেষ হয়ে যাবে। তা হলে উপায় ? ওই কাগজ না থাকলে কোনও অজুহাতই চলবে না বিদেশে। প্রবাসী এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াবার কেউ থাকবে না তখন!

যে ছেলেটা তাকে টেনে তুলেছে, একটা অফিসের সিঁড়ির ছায়ায় এনে বসিয়েছে, সে বলল, কর্জ কইরা এক বছর আগে সৌদি গেছি। যা কথা ছিল তার অর্ধেক বেতনে রাস আল খাইমায় লেবারের চাকরি করি। তিন বছরেও এই টাহা তুলতে পারমু না। পরশু আমার ভিসার ডেট শ্যাষ। এহন যদি ফ্লাইট না পাই কোনও উপায় থাকপে কন! ভিক্ষা করতে অইবো আমারে!

৭ দিনের কঠোর লকডাউন দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ৪ দিন পার হয়ে গেছে। শোনা যাচ্ছে আরও এক সপ্তাহ লকডাউন বাড়াবে। বাড়াতে বাড়াতে কোথায় নিয়ে যাবে কে জানে! ছেলেমেয়েরা অস্থির হয়ে আছে আবুধাবিতে। স্ত্রীও ফোন দিতে দিতে একেবারে পাগল করে তুলেছে। জমাজমি নিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়াঝাঁটির আর সময় পেল না। কী কুক্ষণেই না দেশে এসেছিল হায়দার!

গত কয়েক দিনে মাত্র সাড়ে চার শ লোক এ পর্যন্ত উঠতে পেরেছে বিমানে কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও নিজের কোনও উপায় করতে পারেনি সে। এ কেমন গজব দিল আল্লা! দেশে ১১২ জন লোকের মৃত্যু হয়েছে আজ এই মহামারিতে। এক দিনে এটিই সর্বোচ্চ। সারা পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত মোট মৃত্যু ৩০লাখ ৩৩ হাজার! বিদেশে অসংখ্য কবর খুঁড়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন কবরস্থানে। টিভিতে দেখাচ্ছে সেই আগাম খুঁড়ে রাখা কবরের খবর। ওগুলোর মধ্যে কোনটা যে কার কেউ কি তা জানে ? হোটেলের খাটে শুয়ে বন্ধু এনামুলের মুখখানা চোখের সামনে ভেসে ওঠে হায়দারের। ৭ দিন আগে কোভিডে মারা গেছে এনামুল। অনবরত সিগারেট ফুঁকতো বলে ফুসফুসের জটিলতায় এমনিতেই ভুগছিল সে। তবু ৬০ বছর বয়সে এ মৃত্যু মানা যায় না। ভেবেছিল যাওয়ার আগে দেখা করে যাবে কিন্তু চাইলেই কি আর সব হয়! বাড়ি থেকে এসে ফোন দিতেই জানল খবরটা।

সেই কবেকার কলেজ জীবনের এনামুলের সঙ্গে কত স্মৃতি ভেসে ওঠে মনে, তখনকার ওর মুখখানা ভাবতে চায় হায়দার। ভেবে পায়ও। ১৯৭৯ সালে বরিশাল থেকে ঢাকায় এসে জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হবার পর লক্ষ্মীবাজারের পাতলা খান লেনের একটা হোস্টেলে সিট নিয়েছিল সে। কলেজের সহপাঠী লক্ষ্মীবাজারের অদূরে কে এম দাশ লেনের এই এনামুল ছিল খুব মেধাবী এবং নিরুপদ্রব রোগা দেহের একটি ছেলে। প্যান্টের ওপর খাটো পাঞ্জাবি পরে চটি পায়ে হন হন করে হাঁটত ছেলেটা। যেমন পড়ুয়া তেমনই উৎসুক এবং অনুসন্ধানী এনামুলের চোখ দুটোও যেন কথা বলত সব সময়।

প্রায় প্রতিদিন ছুটির পর ভিক্টোরিয়া পার্ক ছেড়ে মুসলিম হাইস্কুলের দেয়াল ধরে ভজহরি সাহা স্ট্রিট দিয়ে যেত তারা। হাঁটতে হাঁটতে পাতলা খান লেনে এসে ‘যাই’ বলে বায়ে মোড় নিয়ে কে এম দাশ লেনের রাস্তা ধরত এনামুল। একটু এগিয়ে গিয়ে লড়ঝড়ে দরজার বিশাল পাল্লা ঠেলে হোস্টেলের ভেতরে ঢুকে পড়ত হায়দার। পলেস্তারা খসা ইট-সুরকি বেরিয়ে পড়া পুরোনো দিনের বাড়ি। ইটের ফাঁকে ফাঁকে কয়েকটা বট আর পাকুড়ের চারা শিকড়-বাকর ছড়িয়ে বড় হচ্ছে। চামসে গন্ধের স্যাঁতসেতে ওই বাড়ির আঠারোটি কামরার কোনওটিতে তিনটি, কোনওটিতে চারটি আর একেবারে ছোটগুলোয় দুটি করে আম কাঠের চৌকি পাতা। প্রতিটি চৌকি লাগোয়া একখানা করে নড়বড়ে হাতলওয়ালা চেয়ার আর ছোট্ট একটি টেবিল।

প্রায়ই সন্ধ্যার আগে হোস্টেলে এসে ওকে ডাকত এনামুল। বেরিয়ে এসে আক্কাসের দোকানে বসে চা-পুরি  খেতে খেতে আড্ডা দিত তারা। চা-পুরির সেই আড্ডায় ওই বয়সেই একটার পর একটা সিগারেট ফুঁকে যেত এনামুল আর এত অজানা বিষয়ে কথা বলত যে হায়দারের মনে প্রশ্ন জাগত―আলপিনের ডগা থেকে মহাবিশ্বের কোনও কিছুই কি অজানা নাই ছেলেটার ?

’৭৫-এর আগস্টের পর পাঁচ বছর ধরে জেনারেল জিয়া ক্ষমতায়। রাজনীতিশূন্য সামরিক শাসনের পুরো সময়টায় যে পরিস্থিতির মধ্যে বেড়ে উঠেছে গ্রামের ছেলে হায়দার, ওই বয়সে যেটুকু অভিজ্ঞতা তাতে এনামুলের কথাবার্তা মাঝেমধ্যে আজগুবিও লাগত তার। কলেজে ছাত্ররাজনীতি একটু একটু করে শুরু হয়েছে তখন। সবে জন্ম হয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের। নতুন এই সংগঠনের মাধ্যমে ভবিষ্যতের সৎ যোগ্য মেধাবী নেতৃত্বের খোঁজে নেমেছেন জিয়াউর রহমান। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে যোগ দেওয়ার জন্যে তরুণদের মধ্যেও উৎসাহ কম নয়।

ওর কথা শুনে হাঁ করে তাকিয়ে থাকত হায়দার। বলত, কি যে কও তুমি বুঝি না। জিয়া তো তাঁর দল সাজানোর জন্যে  হন্যে হয়ে দৌড়াইতে আছে। ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যনও যে পথ দিয়া হাঁটে না সেই পথ দিয়া আমাগো প্রেসিডেন্ট হাঁটে, ছোট বড় সবার সাথে হাত মিলায়, কুশলাদি জিজ্ঞাসা করে। কোদাল হাতে খাল কাডে। সিপাহি বিপ্লবের নেতা জিয়া সেনাবাহিনীর মধ্যে যেরহম, সাধারণ মানুষের মধ্যেও তো সেরহমই জনপ্রিয়। এহন তো তারই সময়, এনামুল।

কোথাও বসলেই নানা কথাবার্তার মধ্যে খুব আগ্রহ নিয়ে এসব পাকনা পাকনা কথা বলত এনামুল। বলত, বাংলাদেশটার কপালে অনেক দুঃখ আছে রে হায়দার!

হায়দার ভেবে পেত না, এত কথা ও পায় কই ?

অল্প দিনের মধ্যেই ক্লাস বন্ধ হয়ে কলেজের পাট চুকে গেল ওদের। পরীক্ষার ডেট পেয়ে হোস্টেল ছেড়ে মাসখানেকের জন্য বাড়ি গেল হায়দার।

ঢাকায় এসে দু বছরের মধ্যেই কথাবার্তায় চালচলনে হায়দারের মধ্যে বদলে যাওয়ার একটা হাওয়া খেলতে শুরু করেছে বলে শরীরে গাঁও-গেরামের রোদেপোড়া ভাবটি গেল বছরের তুলনায় এ বছর আরও অনেকটা কমেছে। তাতে কী ? গাঁয়ে ফিরে এসে পড়ালেখার ফাঁকে এক মাথা রোদ নিয়ে খালে ডোবায় মাছ ধরে সে। গাছের ডাব পাড়ে, আম পাড়ে, ফেলে যাওয়া স্কুলের বন্ধুদের নিয়ে হাডুডু খেলে। এই করে করে দুর্নিরোধ্য কয়েকটা দিনে বছর দুয়েক আগের চেহারায় ফিরে যায় হায়দার। যখন এই গ্রামে ছিল এসব তো তখন তার নিত্যদিনের অভ্যাস। কিন্তু দু বছরের দূরত্ব মাড়িয়ে কয়েক দিনের জন্য সবকিছুতে ঘনিষ্ঠ হবার আকুলতাটা বেড়ে গিয়ে থাকলেও এখন আবার ঢাকায় ফিরে যেতে তার হৃদয়টা একেবারে অধীর হয়ে পড়েছে।

ঢাকায় হোস্টেলের চৌকিতে গড়াগড়ি খেয়ে একঘেয়ে সময় যেন যেতেই চাইত না কিন্তু গ্রামে এসে পড়ার চাপের মধ্যেও একেকটা দিন কতভাবেই না কাটালো সে। ভোলাটাও পিছ ছাড়ে না। কাঠালিয়ার চিকন কাঁচা রাস্তার নিটোল যে পথটি ধরে প্রতিদিন স্কুলে যেত, সেই পুরোনো পথ ধরে হেঁটে এসে মহাসড়কের পাশে বটবৃক্ষের ছায়ায় যখন দাঁড়ায়, পেছন পেছন তাদের কুকুর ভোলাও এসে লেজ নাড়তে থাকে গা ঘেঁষে। বিশখালির ওপাড়ে নানা বাড়িতে বিয়ানো সাত-আটটা বাচ্চার ভেতর থেকে বেছে ওকে এই এতটুকু এনেছিল সে। খুব দ্রুতই বড় হয়ে উঠেছে কুকুরটা।

প্রায় এক মাসের মাথায় এপ্রিল মাসের ২৯ তারিখ এনামুলের চিঠি আসে। সে লিখেছে, পরীক্ষাসংক্রান্ত ব্যাপারে স্যাররা সবাইকে ডেকেছেন। হায়দার যেন দুই-তিন দিনের মধ্যেই চলে আসে।     

একদিন পরই ঢাকায় চলে যাবে হায়দার। রান্নাঘরে মা তেলে ভেজে শুকনো পিঠা বানাচ্ছেন, বিন্নি ধানের খৈ ভেজেছেন। একটা টিনের বাক্সে ভরে ছেলেকে দেওয়ার জন্যই এই আয়োজন। ছোট বোন রাশেদা, বড় চাচার মেয়ে আকলিমা সাহায্য করেছে তাঁকে। নিবিষ্ট হয়ে নিপুণ হাতে পিঠায় নকশা করেছে ওরা। ছোট ভাই হাসান, হান্নান গাঁয়ের ছেলেদের নিয়ে কই কই যে থাকে কে জানে, বাড়ির লোক ওদের নাগালই পায় না। বাবা এসে বসেছেন ঢেঁকির উপর। মা তাঁকে গরম গরম পিঠা খেতে দিয়েছেন। খেতে খেতেই বাবা বললেন, তোমার ছোট চাচার খবর পাইছি আইজ, হায়দার। জেল থেইক্যা ছাড়া পাওনের একটা চান্স আছে। তয় ছাড়া পাইয়া আর কী অইবে। আবার তো গিয়া হানবে পার্টিতে। পুলিশ এগো য্যামনে তাড়া দেতে আছে, কহন যে আবার গুলি খাইয়া মরে আল্লা মালুম!

কথাটা শুনে বুকের মধ্যে ছ্যাৎ করে ওঠে হায়দারের। বলে, রুস্তম চাচা এ্যাহন কোন জেলে, আব্বা ?

হুনছি তো ঢাহা সেন্ট্রাল জেলে। সিরাজ সিকদার খুন অওনের পর থেইক্যা তো তাগো নিজেগো মধ্যেই হাজারডা বিবাদ ফ্যাসাদ। নিজেরাই কে কারে মারে ঠিক নাই। ওইদিগে পুলিশের চিরুনিতল্লাসি শুরু হইছে। ‘সর্বহারা’দের এফির আর ছারবে না জিয়া। বাইর ওইয়া আবার যদি পার্টিতে ঢোকে উপায় থাকপে না। এত বোঝাইলাম তারপরও মোগো ত্যাগ কইর‌্যা সর্বহারা অইলো! বাড়ি-ঘর ছাইর‌্যা দিল! বড়ই আফসোস!

হায়দার বলে, ওগুলান আপনের রাগের কথা, আব্বা। চাচায় ত্যাগ করবে ক্যান ? মোগো কি কম ভালোবাসে ? আর হেরা তো চুরি ডাহাতিতে নামে নাই। ওইডা তাগো রাজনৈতিক বিশ্বাসের পথ, আপনেগো লগে মেলে নাই। আগের দিন তো আর নাই, আব্বা। জেল থেইক্যা বাইর অইলেই তারে বাড়ি ফিরাইয়া আনেন। সেল্টার দেন। থানা-পুলিশ সামলান। ঢাকা যাইয়াই মুই তালাশ নিমু আনে।

ছেলে বড় হয়েছে। এখন তার কথার ধরন, বুঝ-ব্যবস্থার ধরনই আলাদা। ওর বয়ানে ইউসুফ আলি হাওলাদার খুশি হতে পারলেন কি না কে জানে, পিঠা খাওয়া শেষ হতেই হাতের বাটিটা রেখে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যাবার আগে বললেন, শ্রেণিশত্রু খতমের নামে সর্বহারাদের এহন ডাহাতি করা, খুন করা ছাড়া আর কি কিছু করার আছে ?

বাবার কথার কোনও উত্তর দেয় না হায়দার। ইন্টারমিডিয়েট দেবে সে, লায়েক হয়েছে তবু এক হিসেবে তো যথেষ্ট ছেলে মানুষ। বাড়ির মুরব্বিদের বিষয়ে যা বলেছে এর বেশি আর কি-ই বা বলবে সে। তারপরও মাকে বলে, আম্মা, আপনে আব্বারে বোঝান, বড় চাচারেও কন। ওনাদের নামে অনেক মামলা থাকলেও জেলে গোনে বাইর অইয়া কেউ যদি সাধারণ জীবন-যাপনে ফেরতে চায় পুলিশ আর ঘাটাইবে বইল্যা মনে অয় না। আওয়ামী লীগের আমলের মতো অবস্থা এহন তো আর নাই, আম্মা।

এ বাড়িতে বউ হয়ে আসার পর হায়দারের মা তাঁর ছোট দেবরটিকে ভাইয়ের মতো আগলে রেখেছেন। চোখের সামনেই তো সে বড় হলো। কলেজে ঢুকল। তারপরই কি না হয়ে গেল গেরিলা!

কলেজ থেকে ফিরে মুড়ি খৈ কিংবা চালভাজা যা কিছুই দেওয়া হউক খেতে খেতে কবিতা শোনাতো ছেলেটা। বলত, ভাবি, দেশ তো স্বাধীন কইর‌্যা আনছে মিয়াভাইরা, যুদ্ধ কিন্তু শেষ অয় নাই। সব মানুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা না অওয়া পর্যন্ত, শ্রেণিশোষণ আর সামাজিক অসাম্যরে দূর না করা পর্যন্ত, গণমানুষের মুক্তি না অওয়া পর্যন্ত মোগো এই যুদ্ধ আর থামবে না। সবার জন্য চাই সমাজতন্ত্র। শেণিবিভেদ ঘোঁচাইয়া দিতে হইবে ঘুণে ধরা এই সমাজের। কেউ খাইবে আর কেউ খাইবে না, তা অইবে না।

ওর ওই জটিল কথা শুনে ভাবি হকচকিয়ে যেতেন। বলতেন, হায় হায়, কও কী! তুমি তো দেহি কমুনিস্ট অইয়া গেছো! কমুনিস্টরা তো আল্লা খোদা কিচ্ছু মানে না, ভাই।

ক্যা ? কমিউনিস্ট আন্দোলন কি শুধু নাস্তিকের আন্দোলন নাহি ? এই আন্দোলন তো বুর্জোয়া খেদাইন্ন্যার আন্দোলন। সমাজে যারা ভাব ধইর‌্যা বইস্যা থাহে আর দুর্বলের উপরে ছড়ি ঘুরায় তাগো খতমের আন্দোলন। কমিউনিস্ট আন্দোলন হইছে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-আস্তিক-নাস্তিক সব রহোম শোষিত-নিপীড়িত মাইনষের মুক্তির আন্দোলন। সকলের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করোনের আন্দোলন।

ভাবি নির্বাক হয়ে রুস্তমের জ্বলজ্বলে মুখখানার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, শোষণ-বঞ্চনা ও অসাম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সংকল্প থেকে একটা নতুন পৃথিবীর স্বপ্নে বিভোর এই টগবগে তরুণটি। ওর কথা পরিষ্কার করে না বুঝলেও ওর অন্তরের বিপ্লবী আকাক্সক্ষাটির উষ্ণ স্পর্শ অনুভব করতে পারতেন তিনি ঠিকই।

ছেলে হায়দারের কথায় আজ হয়তো পুরোনো সেই স্মৃতির কিছুটা উথলে উঠেছে তার মায়ের মনে। সে কারণেই বুঝি আঁচলে চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, তোমরা দেহো নাই ? বুক দিয়াই তো আগলাইছিলাম তোমার চাচারে। কিন্তু তার চিন্তা তার উৎসাহ এত বড় আছিলো যে এই বুকে ধরে নাই, বাবা।

সিরাজ সিকদারকে তখনও সামনাসামনি দেখে নাই রুস্তম। আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা কলেজের পার্টি-কর্মীদের সঙ্গে গোপনে কাজ করে যাচ্ছিল সে। এক সময় পরিবার থেকে বেরিয়ে গিয়ে পুরোপুরি সর্বহারা গেরিলা হয়ে উঠল।

কমরেড সিরাজ সিকদার চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার হলেন ১৯৭৫-এর ১ জানুয়ারি। হাতকড়া পরিয়ে বিমানে ঢাকায় আনা হলে পুলিশ সুপার মাহবুব উদ্দিন আহমদকে দেওয়া হলো তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের দায়িত্ব। জীবনের কী এক আশ্চর্য পরিহাস! এই পুলিশ সুপার মাহবুব ছিলেন সিরাজের বাল্যকালের বন্ধু। ছেলেবেলায় দুজনেই একসঙ্গে লেখাপড়া করতেন বরিশালে। মাহবুবের ডাক নাম ছিল কুদরত আর সিরাজের নাম ছিল সেরা। জীবনের শেষ প্রহরে এসে বন্দি সেরা আবার কুদরতের দেখা পেলেন। কিন্তু হায়, যে কোনওভাবেই হোক ৩২ বছর বয়সের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তরুণ সেরার জীবনপ্রদীপ নিভে গেল তাঁরই বাল্যবন্ধু কুদরতের হেফাজতে।

সিরাজ সিকদারের মৃত্যুসংবাদ নিয়ে একজন পুলিশ কর্মকর্তা শেখ মুজিবের কাছে গেলে তিনি রেগে গিয়ে বললেন, তোরা ওকে মেরে ফেললি ?   

দুর্ভাগ্য এই যে, সর্বহারা পার্টি তাদের গোপন কার্যক্রম থেকে যখন প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছিল ঠিক তখনই নিহত হলেন সিরাজ সিকদার। ওই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সর্বহারা পার্টিতে নেমে এল মহা দুর্দিন। শুরু হলো নৈরাজ্য। উপদলে উপদলে খণ্ড খণ্ড হয়ে একে অপরের শত্রু হয়ে উঠল তারা। সরকারের গোয়েন্দা-গুপ্তচরেরাও এই সুযোগ হাতছাড়া করল না। তাদের তৎপরতায় এবং দলীয় কোন্দলে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা চরমপন্থি সশস্ত্র বিপ্লবীদের মধ্যে শুরু হয়ে গেল পরস্পরের কলজে ছিঁড়ে খাবার লড়াই। এমনকি নিজেরাই নিজেদের দলের লোকদের পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেওয়ার মতো অপকর্ম করতেও ছাড়ল না। ওভাবেই একদিন পুলিশের কাছে ধরা খেলেন রুস্তম আলি হাওলাদার। সেই থেকে এক জেল হয়ে আরেক জেলে ঘুরতে ঘুরতে তাঁর জীবনের মূল্যবান ৪টি বছর শেষ হয়ে গেল!

ছোট চাচা রুস্তম আলিকে শেষ যেবার দেখেছে হায়দার তখন সে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। সেদিনের কথা খুব মনে পড়ে তার। খেয়ে-দেয়ে কিছুক্ষণ আগে ঘুমিয়ে পড়েছে তারা যে যার ঘরে। বাইরে জানালার কাছে কারও ডাক শুনে হড়বড়িয়ে উঠে কুপি জ্বালেন তার মা। আলো হাতে গিয়ে দরজা খোলেন। ঘুম ভেঙে গেলে হায়দারও বাবার পাশ থেকে উঠে চুপি চুপি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখে―শীত রাতের ঝুম-অন্ধকারে কালো চাদরে মোড়া ভূতের মতো কোথা থেকে এসে কুপির কম্পমান আলোয় মুখ তুলেছে ছোট চাচা রুস্তম। সাথে আছে তারই মতো দেখতে আর একজন। তাদের উশকোখুশকো চুল, উদ্ভ্রান্ত বদনে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, জ¦লজ¦লে চোখগুলো মনে হচ্ছে একেকটা অন্ধকার খোড়লে ঢোকা। মায়ের সাথে ফিসফিসিয়ে কথা বলছে। খুবই ক্ষুধার্ত তারা। গায়ে জড়ানো চাদরের নিচ থেকে অস্ত্র আর টর্চলাইট ঢেঁকির উপর রেখে মাদুর বিছিয়ে মেঝেতে বসেছে। তাদের এতই তাড়া, মা যে রান্না করে কিছু খাওয়াবেন সেই সুযোগও নাই। যা আছে তাই দিতে বললে সকালের জন্যে রাখা পান্তাভাত আর চিংড়ি দিয়ে রান্না করা মিষ্টি কুমড়ার তরকারি বাড়লেন মা।

কুপির আলোয় নাকে-মুখে ভাত-তরকারি গিলতে গিলতে ছোট চাচা বলছে, কত দিন পর এমন খাওন খাইতে আছি। কমরেড নিহত হবার পর দলের মধ্যে কী যে অইছে, এতই কোন্দল যে কেউ কাউরে শান্তিতে থাকতে দেতে আছে না। তাছাড়া পুলিশ আর রক্ষীবাহিনীর দাবড়ানি তো আছেই। বনে-বাদাড়ে ঝোপে-জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতেই এই অবস্থা, ভাবি। ধারে কাছেই একটা অপারেশনে আইছিলাম। মিঞাভাই তো মোর মুখ দেখপে না জানি, তা-ও ভাবলাম আপনের হাতের রান্ধন থাকলে খাইয়া যাই।

পেছন থেকে হায়দার খেয়াল করে তার মা বারবার আঁচলে চোখ মুছছেন আর বলছেন, তোমাগোর এইসবের মুই আর কী বুঝি! তয় এইটুক বুঝি, ফুল ঝইড়্যা গেলে গাছে কাঁডা ছাড়া কিছু থাহে না, ভাই! অনুসরণের যদি কিছু না পাও, লক্ষ্য যদি মুইছা যাইয়া থাহে তাইলে হেই পথটা তো ভুল পথ। ভুল পথে জীবন ক্ষয় হইর‌্যা লাভ কী ? ভালো হইর‌্যা ভাইব্বা দেহো। বাড়িতে ফিইর‌্যা আসো।

চাচা বললেন, ফেরতে চাইলেও ফেরার পথ নাই, ভাবি। মোগো রেহাই নাই।

হায়দার টের পায় যে তার বাবাও উঠেছেন। কিন্তু মানুষটা রান্নাঘরের দিকে না গিয়ে আবার লেপ মুড়ি দিয়ে শক্ত হয়ে পড়ে রইলেন। হায়দারের মন চাইছে ওদের কাছে গিয়ে বসতে কিন্তু চাচা যে গোপনে এসেছেন আবার গোপনেই চলে যাবেন সেটা অনুমান করতে পেরে দরজার আড়াল থেকে সরে এসে বাবার কোল ঘেঁষে শুয়ে পড়ে আবার।

ঘুম থেকে উঠে সকালবেলা যখন মুখ ধুতে পুকুরঘাটে যায় হায়দার, শোনে, পাশের গ্রামের হারুন চেয়ারম্যান রাতে খুন হয়েছেন। খুব দুশ্চিন্তা নিয়ে ঘাটে বসে আরও অনেকের সঙ্গে এই নিয়ে আলোচনা করছেন তার বড় চাচা আর বাবা। কারা কীভাবে খুন করেছে তার কোনও হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। পুলিশ এসেছে এবং সবাই ধারণা করে নিয়েছে এটা আবদুল হকের কমিউনিস্ট পার্টি নয়তো সর্বহারাদেরই কাজ।

মায়ের সাথে কথা বলতে বলতেই কুপির আবছা আলোয় দেখা প্রায় ৪ বছর আগের ছোট চাচা আর তার সঙ্গীর সেই দিনের সেই ছোড়ভঙ্গ মুখ আর সেই খুনের খবরটা এতদিন পরেও মনের মধ্যে দপদপিয়ে ওঠে হায়দারের। চারদিকে ওরকম কত খুনের কথাই তো তারা শুনত তখন। কিন্তু ওই রাতের ওই খুনের সঙ্গে কি তবে রুস্তম চাচাও জড়িত ছিলেন ? ভেতরে ভেতরে এক আশ্চর্য অস্থিরতায় তড়পায় হায়দার।

ঢাকায় ফিরে এসে মিষ্টির দোকান থেকে বড় সাইজের একটা খালি মিষ্টির প্যাকেট কিনে আনে হায়দার। মায়ের দেওয়া খৈ আর পিঠা প্যাকেটে ভরে বিকালে কে এম দাস লেনে এনামুলের বাড়ির দিকে যায়। এই বাড়িতে এর আগেও কয়েকবার এসেছে সে কিন্তু ভেতরে ঢোকেনি। পুরোনো দোতলা বাড়ির কাঠের গেটে ঝোলানো শেকল নাড়তেই একটা মেয়ে এসে কপাট খুলে জানতে চায়, কাকে চাই ? এনামুলের কথা বললে আবার কপাট ভিড়িয়ে চলে যায় মেয়েটি।

এনামুল এসেই বলে, আরে দোস্তো, কখন আইলা তুমি ? দেইখা তো লাগে জমি চইষা আইছো!

হাসতে হাসতে হায়দার হাতের প্যাকেটটা ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, আইছি আইজ দুপুরেই। এইটা রাখো, আম্মায় দিছে অনেক, তোমার জন্যে একটু আনলাম।

কী এর মধ্যে, মিষ্টি ?

আরে না, খৈ আর পিঠা। গ্রামে কীইবা আছে, এমন কীইবা আনা যায় কও ?

এনামুল একটু জোর দিয়েই বলে, নিজেরে ছোট কইরা দেইখো না হায়দার, এইটা তোমার মায়ের হাতের জিনিস। আই অ্যাম ভেরি হ্যাপি মাই ডিয়ার। ভেতরে আহো মিয়া, আমার রুমে গিয়া বসি।

খাট, পড়ার টেবিল, গোটা দুই চেয়ার নিয়ে নিচতলায় এমানুলের লম্বাটে ঘরটা একেবারে ছোট নয়। কিন্তু বই দিয়ে এমনই ঠাসা যে বাংলাবাজারের বইয়ের দোকানের মতো লাগছে। এরই মধ্যে প্যাকেট খুলে পিঠা খেতে খেতে ‘চায়ের কথা কইয়া আহি’ বলে দোতলায় চলে যায় সে। হায়দার এনামুলের ঘর, বইপত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে।

ফিরে এসে এনামুল বলে, এইখানে যত বই দেখতাছো এর অনেক বইই আমার মামার। স্টুডেন্ট থাকাকালে এইটা ছিল উনারই রুম। অহন আমার। আর এই বাড়িটা আমার নানার। বাবা মারা যাওনের পর আমরা এইখানেই আছি। এরপর দেয়ালে ঝোলানো একটা ফ্রেমের আলোকচিত্রে কারও পরনে লুঙ্গি, কারও পরনে প্যান্ট, গায়ে গেঞ্জি অথবা শার্ট এরকম সাধারণ পোশাকের বেশ কজন যুবককে দেখিয়ে এনামুল বলে, ওই ছবিতে যাঁদের দেখতাছো তাঁরা সবাই কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার। তাগো মধ্যে একজন হইছেন আমার মামা। অহন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, ক্যান্টনমেন্টে থাকেন।

হায়দার আশ্চর্য হয়ে দেয়ালে ঝোলানো ফ্রেমবন্দি বড় বড় মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি দেখে আর মনে মনে ভাবে, তার বাবাও তো যুদ্ধ করছিল কিন্তু যুদ্ধকালের কোনও ছবি নাই। কেন জানি হঠাৎই খুব আফসোস হয় তার।

অনেক কথাবার্তার পর অত্যন্ত সংশয়ের সঙ্গে রুস্তম চাচার ৪ বছর ধরে জেলে থাকার বিষয়টা তোলে হায়দার। ও ভাবতেই পারেনি এনামুলের প্রতিক্রিয়া এমন হবে। এনামুল বলে, আরে দোস্তো, তুমি একজন কমরেডের ভাতিজা, একজন মুক্তিযোদ্ধার পোলা, ভাবতেই তো পারি না! আগে কখনওই কও নাই যে! লুকাইছো ক্যান ? এইডা কি লুকাবার মতোন জিনিস ? তোমার উপরে শ্রদ্ধা তো বাইরা গেল, মিঞা। শোনো, চাচার জইন্যে চিন্তা কইরো না, আগে খোঁজ-খবর লাগাই তারপর একদিন যামুনে সেন্ট্রাল জেলে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মামাকে বলে তিন দিনের মধ্যে মুচলেকা দিয়ে রুস্তম চাচাকে জেল থেকে ছাড়ায় এনামুল। জেলগেটে হায়দার চিনতেই পারে না তার চাচাকে। ৪ বছর আগে গভীর রাতে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে মায়ের হাতের কুপির আলোয় দেখা রুস্তম চাচার ছোড়ভঙ্গ মুখের ওপর অন্ধকার খোড়লে ঢোকা জ¦লজ¦লে সেই চোখ দুটো এখন কই ?

এতদিন পর জীবনের এই প্রান্তে এসে, এই দুঃসময়ে, এই মহামারীর কালে আজ ওসব মনে করে কেমন অস্থির লাগে হায়দারের। স্পষ্ট মনে পড়ে, এর কিছুদিন পর মে মাসের ৩০ তারিখ কবি নজরুল কলেজের কেন্দ্রে ইন্টারের শেষ পরীক্ষাটা দিয়ে বেলা ২টার দিকে হল থেকে বেরিয়েছে তারা। ভিক্টোরিয়া পার্কের উত্তর দিকটায় উঁচু লাল ইটের পানির ট্যাঙ্কিটার ওধারে গির্জার দেয়াললগ্ন মটরপার্টসের দোকানটার সামনে উৎসুক মানুষের অসম্ভব একটা ভিড়। কাছে গিয়ে দেখে গভীর আগ্রহে রেডিও শুনছে সবাই। ‘চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ভোর চারটায় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু তাঁর লাশ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আত্মসমর্পণের জন্যে বিদ্রোহী সৈন্যদের বারবার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।’ খবরটা ভালো করে শোনাও হয়নি ‘আমি যাই’ বলে একটা অকথ্য-উদ্বেগ নিয়ে এনামুল পড়িমরি লাগালো এক দৌড়।

ইন্টারমিডিয়েটের রেজাল্ট পেয়ে অনার্সে জগন্নাথেই ভর্তি হয়েছিল হায়দার কিন্তু সেই যে গেল এনামুল আর দেখা হয়নি। আর্থিক সচ্ছলতার আশায় পড়ালেখা ছেড়ে আবুধাবি চলে যেতে হয়েছিল তাকেও। এর প্রায় তিরিশ বছর পর আবার এনামুলের সাথে দেখা হলো হায়দারের। মতিঝিলের একটা ট্রাভেল এজেন্সিতে। আহা, কত কত দিনের অদর্শনের পর প্রিয় বন্ধুকে পেয়ে সেদিন কীভাবেই না জড়িয়ে ধরেছিল সে!

এই নিদানকালে পল্টনের হোটেলের এই খাটে চিত হয়ে শুয়ে এনামুলকে জড়িয়ে ধরার সেদিনের সেই উষ্ণতা বুঝি আজ আবার অনুভব করে হায়দার! কিন্তু সে তো মরে গেছে ৭ দিন আগে। মৃতের শীতল শরীরে এত উষ্ণতা আসে কীভাবে ? ব্যথায় মাথাটা কি ছিড়ে যাচ্ছে তার! খুব শীত লাগছে কি! ঘুমের মধ্যেই চাদরটা টেনে নিয়েছিল গায়ে। সেই ঘুম আর ভাঙেনি বুঝি! নাকি ঘুমের মধ্যেই স্বপ্নে জেগে আছে সে। নিজের অজান্তেই গোঙাতে লেগেছে। গোঙানির শব্দে নির্জন ঘরের নীরবতা ভেঙে পড়ার আওয়াজ পাচ্ছে। এনামুলের মতো সিগারেট খায় না তাতে কি, তারও তো শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে। কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসায় সেই কষ্টটা কি বেড়ে গেছে এবার ? গভীর রাতের ঘোরের মধ্যে, অদ্ভুত এক আতঙ্কের মধ্যে, আত্মার ছটফটানির মধ্যে টেলিভিশনে দেখা দুনিয়াব্যাপী আগাম খুঁড়ে রাখা সারি সারি কবরের মধ্যে কোনটি কার সেই হিসাব কি মেলাতে পারছে! 

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button