গল্প : ময়লা দিল ময়লা জ্যোতি : মহিউদ্দীন আহমেদ

‘সাজঘরে থাকতেই মালটাল খাইয়া লইছি; খালি তাগড়া শরীল দ্যাখাইলেই তো হয় না, কারিশমা দেখানো লাগে-তাছাড়া বাঞ্চোৎ দর্শক হালারপোরা খালি মাইয়া মাইনষের কোমর-পাছা-হাঁটু দেখবার চায়-তা আমরা যাই কই ? আমরাও তো ডাইরেক্টারের থনে ট্যাকা লই, তাছাড়া ইস্টাব্লিশ হওয়ার খায়েশ আমাগোও কম নি ? তো ড্যান্সের সময় করলাম কী, প্রিন্সেস ময়নারে জাপ্টায়ে ধরলাম-দর্শক তখন খালি চিল্লাপাল্লা করে, কয়, আছিÑধর ধর! আমিও কম কিসে-ইস্টাব্লিশ হওনের খায়েশ উত্রায়া উঠল; নাচতে নাচতে প্রিন্সেস ময়নারে চিৎ কইরা হুতাইয়াই ফেল্লাম! কী ? না না, কাপড়চোপড় খুলি ক্যামনে, সোনালী অপেরা তাহলে শ্যাষ হইয়া যায় না!’
‘তারপর ?’
‘তারপর আর কী! ময়না তো মনে করছে আমি হাচা-হাচাই নাচতে নাচতে অরে হুতাইছি। নিচথন অয় নাচের তালে তালে কাতড়াইতেই আছে। ওদিকে দর্শকের তুমুল চিল্লাচিল্লা। এক হালারপো তো ইস্টেজের উপ্রেই উইঠা আসছিল!’
‘যখন আপনে অর উপ্রে তখন আপনের ক্যামন লাগে ?’
‘ধুর কী কন! উপ্রে ওঠা এমন আর কী! কোনও রকমই না। কইলাম না মালটাল খায়া লইছি। ওসব তো এজন্যই খায়া লই। যাতে শরীলে কন্ট্রোল থাকে। ইস্টেজে উইঠা তো আর ওসব চলে না, বুঝেন না ?’
‘অ।’
‘তারপর শোনেন। শো শ্যাষ হইতে হইতে ভোর ৫টা কি সাড়ে ৫টা; শ্যাষ হওয়ার পর খালি আমার নামÑখালি আমার নাম। পরিচালক দৌড়ায়া আইসা আমার বুকে থাপ্পড় মারেÑআমি তো ভয়ে অস্থির, হ্যায় আবার আসল ব্যাপারটা ধইরা ফালাইলনি ? পরে দেখি, না, ধরবার পারে নাই, গোলাপ আমার বুকে আসোÑবইলা আমার লগে কোলাকুলি করে; আমি খুব কষ্টে ঐরকম মোটা আর খাটা লোকটার লগে প্রথম কোলাকুলি করলাম। এর আগে আমারে পাত্তাই দিত না। হ্যার মুখে খালি ময়না আর ময়না। ময়নার নাম কইতে কইতে মনে করেন যে, সে মুখে ফেনা তুইলা ফ্যালে। তো শুধু ডাইরেক্টার না, প্রিন্সেস ময়না পর্যন্ত কয়, গোলাপ ভাই! আপনে আজকা ইস্টার হইয়া গেলেন গা! আরে হমু না ? ইস্টার কি তুমি শুধু একলাই হইবা ? ইস্টার হইছ বইলাই তো পরিচালক পর্যন্ত তোমার হোগার পিছন পিছন ঘোরে।’
‘মুখের উপ্রে এই কথা কইয়া দিলেন ?’
‘আরে না! এই ভাবে কওয়া যায় নাকি ? মনে মনে কইছি!’
এরই মধ্যে একজন ভদ্রলোককে রানা অয়েল মিলের দরজার সামনে আঁতিপাঁতি করতে দেখলে গোলাপ খান ত্বরিত উঠে দাঁড়ায়। বুঝতে পারে লোকটা তেল নিতেই এসেছে। ফলে তইজুদ্দির সাথে আপাতত গল্পের ইতি টেনে দৌড় মারে মিলের দিকে।
গোলাপ খান চলে যাওয়ার পর তইজুদ্দির চোখের সামনে প্রিন্সেস ময়নাকে চিত করে শোয়ানোর দৃশ্যটি ভেসে ওঠে। সে একটু উত্তেজনাও বোধ করে। আজ হঠাৎ চিত করে শোয়ানোর গল্পে তইজুদ্দি উত্তেজনা বোধ করছে কেন ? সে কি সদ্য যৌবনে পা ফেলা কিশোর ? চিত করার পর্বটি তো তার জীবনে শুরু হয়েছে কিশোর বয়সেই। চৌদ্দ কি পনের বছর বয়সে তার ছিপি খোলা শুরু। সেই যে আফজাজুল্লার বড় মেয়ে সকিনা পড়ত এইটে আর তইজুদ্দি নাইনে। সম্পর্কে সকিনা তইজুদ্দির নাতনি অর্থাৎ আফাজুল্লা তার চাচাত ভাইয়ের মেয়ের জামাই। সেই সূত্রে নানা। সকিনা তাকে নানা বলে ডাকে। তইজুদ্দি একটু একটু শরম পায়। ওদিকে নাতনির শরীর দেখলে নানার শরীরে জ্বালা ধরে। তো আর যায় কোথায়! কেল্লা ফতে। তা সকিনার কথা মনে পড়লে তইজুদ্দির মনটা খারাপ লাগে। প্রথম প্রেম বলে কথা। তইজুদ্দি তাকে অনেক করে বুঝিয়েছিল, ‘তুমি বিয়েতে রাজি হইয়ো না, আমি তোমারে বিয়া করুম।’ কিন্তু সকিনার মনে অন্য কথাÑনানাবাড়িতে বউ হয়ে আসা তার কাছে চক্ষুলজ্জার ব্যাপার। লোকে বলবে কী ? নাহ! বেচারা গোলাপ ভাই আজ তইজুদ্দির ফ্রেশ মনটা একেবারে মেঘলা করে দিল।
এদিকে আজ বিক্রিবাট্টাও তেমন নাই। এমনিতেই বিকাল বেলা। রাস্তা খারাপ, একটু বৃষ্টিতে এঁদোকাদায় লেজে গোবরে অবস্থা। পৌরসভার নজর এদিকে নাই বললেই চলে। তবে মাঝেমধ্যে একটু আধটু নজর পড়ে বৈকি। কত টাকা বিল পাস হয় কে জানে, কন্ট্রাক্টর শালারপোরা কয়েক ট্রাক খোয়া-বালি ফেলেই ভাগে। তাতে রাস্তার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়।
কাঠের তৈরি কোকাকোলার খালি কেস উপুড় করে বসিয়ে তার উপর একটা ছালার বস্তা চার ভাজ করে বিছানো। গদিটা ভালোই হয়েছেÑনরম। গদিতে পাছা ঠেকিয়ে ধামায় রাখা মশুরি, খেসারি, মাসকালাই, বিদেশি বুটের ডাল ইত্যাদি পরিপাটি করা তইজুদ্দির নিয়মিত অভ্যাস। কিন্তু কাস্টমার কই ? কাস্টমার না এলে এসব সাজানো বলো আর পরিপাটি বলোÑকোনও লাভ আছে ? বরঞ্চ এভাবে বসে থাকতে থাকতে কোমর ব্যথা হয়ে আসে। কোনও কোনও দিন এই ব্যথা কোমর থেকে মেরুদণ্ডের মোটা হাড়ে পর্যন্ত চলে যায়। তখন তইজুদ্দি ওঠ-বস করতে পারে না। কিন্তু হলে কী হবে, এই মনোহারী ব্যবসা ছাড়া তার অন্য কোনও উপায় নেই।
খানিক বাদে গোলাপ খান এসে হাসি হাসি মুখে বলে, ‘আর কইয়েন না। ইস্টার-উস্টার হইলে এই এক বিপদ। যেখানেই যাই লোকে চিনা ফেলে।’ তার মুখের ভাবখানা এমন বিরক্তিকর যেন স্টার হওয়া একেবারে নগণ্য ব্যাপার।
গোলাপ খানের কথার আগাগোড়া কিছুই বুঝতে না পেরে তইজুদ্দি জানতে চায়, ‘ক্যান, কী হইছে ?’
‘কী আরÑএকটু আগে যেই ভদ্রলোকটা আসল না ?’ কিছুক্ষণ আগে তেল নিতে আসা ভদ্রলোকের কথা বলে গোলাপ খান, ‘হ্যায় আমার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল কইরা চায়া থাকে। আমি কই, কতটুকু ত্যাল নিবেন ? সে কথা কয় না। ঘোরলাগা মাইনষের মতো চায়াই থাকে। শেষে আমি ধমক দিয়া কই, আরে আপনে কথা কন না ক্যান ? তা লোকটা ধড়ফড় কইরা চ্যাতন হয়। বলে, না ইয়ে মানে…আপনারে চিনাচিনা লাগে যে! কই য্যান দেখছি বইলা মনে হয়। তা চিনা চিনা লাগতেই পারে। ১২ বছর দ্যাশের আনাচে-কানাচে যাত্রাপালা কইরা বেড়াইছি, ময়ূরের মতো নাইচা নাইচা ইস্টেজ কাঁপাইছি, বাঘের মতো গর্জন দিয়া অভিনয় করছিÑচিনতেই পারে। বুঝলেন কিছু ? আমাগো দিন তো পুরাপুরি শ্যাষ হইয়া যায় নাই। কিন্তু…গোলাপ খান ৎচ ৎচ করে, ‘কিন্তু লেবারেশনটাই সব খাইল। সেভেনটি ওয়ানের যুদ্ধটাই আমার ভাগ্যের শনি, বুঝলেন ? ক্যান যে যুদ্ধ লাগল। যুদ্ধ লাগল তো ভালো কথাÑআমাগো কী! আমরা হইলাম শিল্পী মানুষ। শিল্পীরা ঘরে বইসাই যুদ্ধ করে। কিন্তু না। ঐ যে আমগো ইয়া মোটা লাম্বা পরিচালক’Ñএই পর্যন্ত বলা হলে তইজুদ্দি তাকে শুধরে দেয়, ‘আপনাগো পরিচালক তো লাম্বা না, খাটা।’
‘হ খাটা।’ তা তইজুদ্দির স্মৃতিশক্তির কাছে গোলাপ খান হার মানে, ‘খাটা লোকের নাটা বুদ্ধি। করল কীÑসোনালী অপেরা টিকানোর জন্য মাঙ্গেরপো রাজাকার গো লগে হাত মিলাইলো। লোভী, বুঝলেন ? দেশের চাইতে নিজের স্বার্থটারে বড় কইরা দেখল। কিন্তু কদ্দিন ? দুই নাম্বারি কইরা কি দল টেকানো যায়, কন ? কয়দিন বাদে কোথায় গেল সোনালী অপেরা! কোথায় গেল রঙিন নাচন!’ এই দীর্ঘ বক্তৃতার পর গোলাপ খান একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বেশি কথার তোড়ে বাম হাতের আঙুলে গালের দুপাশে জমা হওয়া সাদা লালা মোছে তারপর আসল কথায় ফিরে আসে, ‘আপনেই কন, ১২ বছরের শিল্পী জীবন কি এমনে এমনে ? কিছুই কি করি নাই ?’
এইবার তইজুদ্দি অবাক হয় গোলাপ খানের এক কথা বলতে গিয়ে অন্য বিষয়ের ভেতর চালচাষ করে ফিরে এসেও মূল কথায় স্থির থাকতে দেখে। তা বেচারার মধ্যে কিছু মাল-মশলা আছে বটে। হয়তো সে বেশ জ্ঞানী। না হলে এভাবে কথা বলা সম্ভব না।
‘আপনেই কন ১২ বছর কি কম সময় ? ১২ বছরের একটা মাইয়া বিয়ার লায়েক হয়। ১২ বছরের একটা গাছ ফুলে-ফলে ভইরা ওঠে।’ কথার ফ্লো দেখে সহজেই অনুমেয় গোলাপ খান এবার তার ১২ বছরের সঞ্চিত জল ঘোলা করে ছাড়বে, ‘আর হ্যায় কয়, আপনেরে চিনা চিনা লাগে। আরে চিনা চিনা লাগে কস ক্যান তোর মাইরে বাপ, ক ইস্টার, হ, আই এ্যাম এ ইস্টার! মান্দারপো কয়, আপনেরে চিনা চিনা লাগে!Ñকী কইলেন ? রাগ করুম না ? ধুৎ! শরীলডায় আগুনের দলা ফালায়া দিছে। মনে করেন যে, শরীলে আগুন পড়ার লগে লগে ফোস্কা পইড়া গেছে। লগে লগে আবার সেই ফোস্কা গইলাও গেছে। আরে ভাই ১২ বছর কি কম সময় ? আপনে এই দোকানডা দিছেন কয় বছর ধইরা ?’ গোলাপ খান বোধ হয় তইজুদ্দিকেও ঘোলা জলে ডুব দিইয়ে ছাড়বে, ‘আপনেরে মাইনষে চিনে না, কন ? আমারে কয় চিনা চিনা লাগেÑসাহস দেখছেন মাঙ্গেরপোর ?’
তইজুদ্দি আমতা আমতা করে বলে, ‘হয়তো আপনেরে কম দেখছে।’
‘আরে ধুৎ কী কন আপনে! আমারে কম দেখছে মানে ? ১২ বছর তাহলে কি মাইনষের বালডা ফালাইলামনি ?’
তইজুদ্দি তার কাছে পরাস্ত হয়ে নিশ্চুপ হয়ে পড়ে।
ওদিকে গোলাপ খানের গোলাবারুদ হতে বারুদ বের হতেই আছে, ‘কী কইলেন ? আমারে কম দেখছে ? তাইলে তো জীবনটাই বিরথা।’ বলতে বলতে ভাব একটু কমিয়ে আনে।
তইজুদ্দি বলে, ‘একজন মানুষরে কি সবাই চিনে ?’
কিন্তু তইজুদ্দির এই সহজ যুক্তি খুন করতে বেগ পেতে হয় না গোলাপ খানের, ‘আরে ভাই, আকাশের তারারে ক্যাডায় চিনে না কন ? ইস্টার হইল আকাশের তারা। আকাশের তারা সবাই চিনে। চিনন লাগে।’
শেষে তাইজুদ্দি চূড়ান্তভাবে হার মানে, ‘না ভাই। আপনার লগে তর্কে পারুম না।’
‘তাই কন।’ গোলাপ খান নিজেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে, ‘পারবেন কেমনে ? ১২ বছর তো খালি বাদাইম্মাগিরি কইরা কাটাইনি। কাজ-কাম কিছু করছি। দ্যাশের সব মানুষ জানে। এখনও যশোর, রাজশাহী, চিটাগাং, সিলেট, খুলনাÑএইসব অঞ্চলে ভ্রমণ করতে গেলে মানুষ আমারে এক নজর দেখার লিগা পাগলের মতো ছুইটা আসে। বুকে জড়ায়া নেয়।’
তবে তইজুদ্দির হার মানার ব্যাপারটা গোলাপ খানের চোখ এড়ায় না। চট করে সে তা ধরেও ফেলে।
মাস দুয়েক আগে গোলাপ খান রানা অয়েল মিলে চাকরি নিয়েছে। তার কাজ হলোÑখুচরা তেল বিক্রি করা।
এর মধ্যে কাজের ফাঁকে তইজুদ্দির সাথে গল্প করে বুঝেছে, বেচারাকে অনায়াসেই গল্প খাওয়ানো যায়। সে জানে, সবার সাথে গল্প করে সুখ নাই। তাই তইজুদ্দির মতো নিবিষ্ট শ্রোতা হারাতে সে নারাজ। রানা অয়েল মিলে তো আরও ২০/২২ জন লেবার আছে যাদের কেউ কেউ সরিষা ভাঙ্গায়, কেউ কেউ তেলের টিনে লেবেল লাগায়Ñকৈ, তাদের কারও সাথেই তো গোলাপ খানের জমলো না ? জমবে কী, বাঞ্চোৎগুলা একেকটা হারামির হারামি। কিছু বলতে গেলেই ফিকফিক করে হসে। গোলাপ খানের যে কোনও কথা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে হেসে উড়িয়ে দেয়। তারপর দ্যাখো, শালারা একজোট হয়েছে; গোলাপ খানের ধারে কাছেই চাপে না। এমনি হয়। গুণী লোকের কদর সাধারণ জনগণ কোনওদিনই দিতে পারে নাই। তা যাক না আরও কিছু দিন। শালারা সবাই সার বেঁধে আসবে গোলাপ খানের কাছে! আসতে হবে। আরে এই গোলাপ খান যেখানেই যায় সেখানেই আশপাশের মানুষ সার বেঁধে আসে। আর তোরা তো তেলের মিলের লেবার। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২ ঘণ্টাই তোদের চোখ দিয়ে সরিষার তেলের ঝাঁঝের পানি ঝরেÑতোদের চিন্তা-ভাবনা আর কেমন হবে ?
ওদিকে ‘আপনার লগে পারুম না’Ñবলে তইজুদ্দি মুখে খিল মেরে আছে। কিন্তু নিবিষ্ট শ্রোতা মুখে খিল মারলে বক্তার ঠকা। তাই তার লাগামহীন আস্ফালন আর অল্প ঝালের কটু রাগের কপালে তেলাকুচ পাতার জলপট্টি দেয়, ‘আরে ভাই রাগ করি কি সাধে ? রাগ আসে। রাগ ভেতর থিকা উৎরায়া ওঠে।’
কিন্তু এতেও আশানুরূপ কাজ হয় না। তইজুদ্দি গোলাপ খানের সাথে কথা না বলে পেছনের দিকটা ঝাড়মোছ করে। অযথাই কোকাকোলার কেস থেকে বোতল বের করে মোছে। আবার ঢোকায়। তারপর দ্যাখোÑসেকেন্ড হ্যান্ড সাড়ে আট সিফটি ক্যালভিনেটর ফ্রিজ মোছে। মুছতে মুছতে যেন ফ্রিজের ভেতরেই ঢুকে পড়ে। তার সামনে যে গোলাপ খান বসে আছে, সেদিকে একটুও খেয়াল নাই।
ফ্রিজটা তইজুদ্দিকে বেশ জ্বালাচ্ছে। কদিন পর পর এটা নষ্ট, ওটা পালটাও, এটা ফিউজÑএ দিয়ে পয়সা আসবে কী, মূলধন ঠিক রাখাই দায়। তার উপর আছে বিদ্যুৎ বিল। মাসান্তে ৪৮০ হতে ৫৫০ পর্যন্ত ঠেকে। দোকানের ভাড়া ১২০০ টাকা। বউ পোলাপানের পিছে তো কম যায় না। অথচ আয়ের উৎস তো এই দোকানটাই। ভাগ্যিসÑবাপের রেখে যাওয়া একতলা একটা বাড়ি ছিল। অবশ্য বাপের প্রতিও তইজুদ্দির রাগ কম নয়। বাড়ি যখন করলেনই তো ৩ রুমের কেন, আর একটু বড় করতেন। এ-রকম খুপড়ি ঘরে মানুষ থাকে কীভাবে ? আর একটু বড় হলে এখন মাসে কিছু টাকা ভাড়াও পাওয়া যেত। তা না। একটা মুরগির খোপ বানিয়েই ক্ষান্ত।
Ñএই যে তইজুদ্দি তার মৃত বাপকে দোষী সাব্যস্ত করছে এ কথা তার বউ কুলসুম কোনও সময়ই অনুমোদন করে না। তার কথাবার্তা ভিন্ন। সে বলে ‘আব্বায় যা পারছেন তা তো করছেনই। এবার তুমি একখান ছাদ লাগাও। নিচতলা ভাড়া দিয়ে আমরা উপ্রে যাই।’ তা সে তো বলে তার বাপের বাড়ির পয়সার গরমে। তার বড় ভাই কালা তোতা ডিবি ভিসায় সুদূর আমরিকা সেটেলড। আর তার ছোট ভাই ঢ্যাঙ্গা ফারুকÑসে তো মহল্লার মাস্তান। খুন-খারাবিতে তার জুড়ি নাই। তো পয়সার গরম দেখাও, আনো না কিছু টাকাÑকাজ আরম্ভ করো, দেখি কেমন মুরোদ। সে বেলায় তো একেবারে ঠনঠনে। সেই বিয়ের সময় আলমারি না ড্রেসিং টেবিল না খাটপালঙ্কÑকী এনেছিল তার খোটা কথায় কথায়, উঠতে বসতে।
প্রথম ডোজে তইজুদ্দি কাৎ হয়াই বলে গোলাপ খান দ্বিতীয় ডোজ দেয়, ‘আছেন তো সুখে। নিজের একখান বাড়ি আছে শহরে। এ-রকম দুই-এক দোকান করলেই কি আর না-করলেই কি।’ এমন ডোজে পুরুষ মানুষ কাৎ করা সহজ।
‘কৈ আর সুখে আছি ?’ সুখে থাক আর না থাক তইজুদ্দির কাঁচা-পাকা গোঁফের নিচে তামাটে ঠোঁটের কাঁপন দেখে বোঝা মুস্কিল তার আসল অবস্থা।
এদিকে গোলাপ খান তার ডোজ কিন্তু চালাতেই আছে, ‘আপনে না কইলে কী, সুখী মানুষ দেখলেই বোঝা যায়।’ পুরোপুরি মানুষটাকে এইবার কাৎ করে গোলাপ খান ৩/৪ জনের বসার মতো নড়বড়ে কাঠের বেঞ্চটি দোকানের সাথে ঠেকিয়ে এমনভাবে বসে যাতে অন্য কেউ সেই বেঞ্চে বসা তো দূরে থাক, বেঞ্চের কূল ঘেঁষে দাঁড়াতেও চাইবে না, কারণ তার আলাপের ভঙ্গিমা দেখে কানার ভাই অন্ধও বলে দেবে তাদের মধ্যে গোপনীয় কিছু হচ্ছে। সে কাছে চাপে আর তইজুদ্দির দিকে নজর বাড়ায়; সত্যিই তইজুদ্দির চোখে-মুখে সুখের রোশনাই ফুটে উঠেছে। সাধারণ একটি মুখ এত সহজেই অতিরিক্ত সুখের রোশনাইতে ভরে উঠতে পারে তা কি বিশ্বাস করা যায় ?
কিন্তু ঘটনা মোড় নেয় অন্যদিকে। সুখী সুখী তাকে যতই দেখাক হঠাৎ কী মনে করে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ‘আর সুখ!’
গোলাপ খান তার অলৌকিক শক্তিবলে নাকি আন্দাজের কোপে তইজুদ্দিকে চমক লাগায়, ‘বুঝতে পারছি। ভাবিসাবের লগে মহব্বত কম। ঠিক কইছি না, কন ?’ গোলাপ খানের ভাবখানা এমন যে, মিথ্যা হলেও সে যখন বলেছে তাহলে তা সত্য।
‘আরে ন্নাহ,’ কিন্তু তইজুদ্দি যতই না বলুক মুখাবয়বে জোরালো ভাবটা ফুটে ওঠে না।
তইজুদ্দিন অবাক হয়। মানুষের মনের কথা টেনে বের করে আনতে দেখে তইজুদ্দি তার পাশের মানুষটার দিকে তাকিয়ে থাকে। না, কুলসুমের সাথে বনিবনা আছে। কিন্তু… কিন্তু কী ? মানে ইদানীং তাদের আট বছরের দাম্পত্য জীবনে একটু দূরত্ব তৈরি হয়ে চলছে। তইজুদ্দির তিন মেয়ে। গত বছর আরও একটি মৃত মেয়ে জন্মেছিল। এক হালি মেয়ে জন্ম দেওয়ার জন্য বউয়ের সাথে তইজুদ্দির ঝগড়া লাগে। অথচ দ্যাখো, তইজুদ্দি একটা ছেলের জন্য চিকিৎসা কম করেনি। হাকিম কোবরেজ বেটে খাইয়েছে কুলসুমকে। না, কোনও লাভ হয়নি। তা কেমনে হবে, পেটে তার কারখানাটাই তো সেট করা একের পর এক মেয়ে পয়দা করার জন্য। চিকিৎসা বলো, টোটকা বলো কাজে লাগে কেমনে ?
চার নম্বর মেয়েটি জন্মের আগে দুজনে খাটাখাটুনি ভালোই করেছে। দেশের বিখ্যাত সব মাজার জিয়ারত করেছে। সে কি কম ঝক্কি আর খরচের ব্যাপার ? খুলনা যাও, সিলেট যাও, ছাওমিঞা পীরের গোসল করা পানি খাও, নয়াডিঙ্গির পাচু বাবাজীর মাজারে পড়ে থাকোÑকিছু কি বাদ রেখেছে ? টুম্পাকে কোলে তুলে দুজনে বের হয় পাচু বাবাজীর মাজারের উদ্দেশে; বাড়িতে থাকে চম্পা আর শম্পা; মেয়েদের প্রতি অবহেলা যতই থাক নামের অন্ত্যমিলের ব্যাপারে তইজুদ্দি সজাগ। টুম্পা কোলে, বয়স তার কম, তাই তাকে রেখে যাওয়া চলে না।
পাচু বাবাজীর খবর দিয়েছিল তার খালাত ভাই ন্যাংড়া মুন্তাজ। জমিজমার মামলাসংক্রান্ত কাজে তাকে প্রায়ই শহরে আসতে হয়। এই লোকটা মামলা করতে ওস্তাদ। তইজুদ্দি ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছে তার এই খালাত ভাইটা একটার পর একটা মামলা জুড়েই আছে। তো মামলার কাজে ন্যাংড়া মুন্তাজ মাঝে মাঝে এসে তইজুদ্দির বাড়িতে রাত্রিবাস করে। তো আলাপ প্রসঙ্গে সে-ই একদিন জানায় পাচু বাবাজীর কথা।
ন্যাংড়া মুন্তাজ এরূপ জানায়, পাচু বাবাজী এককালে বড় দরবেশ ছিলেন। তিনি যা বলতেন তাই হতো। একবার হলো কী, তাঁর এক বন্ধু এল নোয়াখালী থেকে। নোয়াখালীর লোক বলে কথাÑদুনিয়ার ঘাউরাÑপাচু বাবাজীর কেরামতি পরীক্ষা করার জন্য গভীর রাতে জানাল কই মাছের ঝোল দিয়ে চিতই পিঠা খাবে। পাচু বাবাজী আর কী করেন। প্রথমে তিনি এক নাগাড়ে টানা পাঁচ মিনিট ধরে প্রস্রাব করতে লাগলেন। তাঁর প্রস্রাবের স্রোতধারায় এক বিঘা পরিমাণ জমি প্লাবিত হয়ে জলকাদায় এবড়োখেবড়ো হয়ে গেল। কোথা থেকে দুইটা হাত নেমে এল ধরায়। সেই হাত মেশিনের গতিতে ধানের চারা রোপণ করতে লাগল। চোখের পলকে ধানের চারা বড় হলো, ধানের শিষ দেখা গেলÑতারপর পাকল। কারা ধান কেটে নিয়ে গেল বাবাজীর বাড়িতে। শুধু কি তাই, ধান কাটা হলে দেখা গেল ক্ষেতের কাদাজলে শত শত কই মাছ লাফাচ্ছে। এই পর্যন্ত দেখে নোয়াখাল্যা ঘাউরা বন্ধুটি বাবাজির পায়ে ধরে মাফ চেয়ে তৎক্ষণাৎ তাঁর মুরিদ হয়ে গেল।
এমন বিজ্ঞাপন শুনে তইজুদ্দি আর কুলসুম যায় পাচু বাবাজীর মাজারে। সালু কাপড় মোড়ানো দরগায় পড়ে থেকে তারা একযোগে তাদের বাসনার কথা বলে। মাজারের খাদেম তাদের কাছ থেকে টাকা রেখে বলে, হক মওলা, বাসনা পূরণ হবে।
এই আশ্বাস পেয়ে তইজুদ্দি খুশিতে গদগদ। একটা ছেলে আসছে তার ঘরেÑএই খুশিতে সে আত্মহারা। ছেলের নাম নাম পর্যন্ত ঠিক করে ফেলেÑসফরউদ্দি। কিন্তু ছেলে তো দূরে থাক মেয়েই জন্মায়, তাও আবার মৃত। সেই থেকে তইজুদ্দি আর কোথাও যায় না। চেষ্টার তদবিরও করে না। অথচ আজ গোলাপ খানের অলৌকিক গুণের কথা শুনে সে দুর্বল হয়ে পড়ল।
‘আমার কাছে গোপন করার কী আছে ভাই ? আমারে আপন ভাবতে পারেন না ? কত মাইনষেরে ডিল করলাম। সংসার জীবনে সুখ নাই, এমন কত মাইনষেরে যে সুখী করলাম তার ল্যাখাজুখা নাই।’ গোলাপ খান তার জীবনের আর একটা অধ্যায় খোলে, ‘এই ধরেন, আমার চিকিৎসায় কমপক্ষে ১ ডজন বাঞ্জা মাইয়ার পোলাপান হইছে! তারা শ্বশুরবাড়িতে অবহেলিত ছিল। এখন অবশ্য শাশুড়ির নয়নমণি!’
এই কথার তোড়ে তইজুদ্দিকে সামলে রাখা দায়। সে বুঝি বলেই ফেলে, ‘ছাওয়াল হওয়ায়া দিতে পারেন ?’ কিন্তু না, তইজুদ্দি নিজেকে কন্ট্রোলে রাখে; কড়া বিশ্বাসের চোখে গোলাপ খানের দিকে তাকিয়ে থাকে।
গোলাপ খান ভাবে, তার মুখের দিকে তাকিয়ে এত গভীরভাবে দেখার কী আছে ? টিয়ার ঠোঁটের মতো লম্বাটে তার মুখ, জুলফি না রাখলেও কানের লতি পর্যন্ত নেমে আসা কাঁচাপাকা লালচে চুলের গোছার নিচ থেকে থুতনির উপরিভাগ পর্যন্ত চিকন চিরুনি দিয়ে খুঁজলেও দাড়ি পাওয়া যাবে না; তবে পাতলা হলেও পুরো থুতনিটা কোঁকড়ানো দাড়িতে ছড়াছড়ি এবং দু পাশের গোঁফ এসে এমনভাবে থুতনির পাতলা জঙ্গলের সাথে মিশেছে যে, দেখে অনেকেই ভাবতে পারে জুলফির নিচে দাড়ি রয়েছে কিন্তু ভাবনাটা পুরোপুরি ভুল। কালচে-মোটা ঠোঁটের নিচে হলুদাভ দাঁতের সারি, তবে দাঁত মাশাল্লা শক্ত এখনও। আজীবন দাড়ি না কামানোর ফলে মুখের চামড়া এখনও বেশ মসৃণ, তবে চোয়ালের চামড়া অতিমাত্রায় পাতলা হওয়ায় সেই চামড়ায় ইদানীং ছোট বড় ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে। নাকটা লম্বাটে তবে অতিমাত্রায় মোটা; দেখতে অনেকটা মুগুরের মতো। এই নাকটা গোলাপ খানকে সারা বছর জ্বালায়। শীত হোক গ্রীষ্ম হোকÑবাম হাতের তর্জনী দ্বারা নাকের এক ছিদ্র পথ রুদ্ধ করে অন্য ছিদ্রে জোরে বাতাস বের করতে গেলেই সপাৎ করে একদলা পাকা শিকনি ছিটকে পড়ে মাটিতেÑমাঝেমধ্যে অবশ্য হাতাকাটা ও কোমর পর্যন্ত ঝুলের পাঞ্জাবির বুকে কিংবা পেটেও লেপটে পড়ে। তবে সতর্ক থাকলে এ-রকম দুর্ঘটনা হয় না। যা হোক, নাক থেকে এই বস্তু ফেলতে পারলে তার বেশ আরাম লাগে। মাথাটা পাতলা হয়ে আসে।
ভ্রƒ না থাকলেও মোটা আইল্যান্ডের নিচে কোঁচকানো পাপড়ির ভেতর সাঁটানো ফ্যাকাশে চোখের মণি ঘোলাটে; একটু আধটু পানিপড়া ছাড়া অন্য কোনও রোগ নাই। ১৭ জনের মেসে আলমের মার রান্না করা ইরি-২২ চালের মোটা ভাত-ভাজি-ডিম, সপ্তাহে একবার গোরুর গোশত কিংবা মাছ আর নিত্যদিনের মশুরির ডাল উদরপূর্তি করে করে গোলাপ খানের পাতলা পেট বেশ প্রসারিত হতে শুরু করেছে। খাওয়ার পর ছোট আকারের জামাটি খুলে, কষে বাঁধা লুঙ্গির উপরে নাভির চারপাশে জমতে শুরু করা মেদে হাত রাখতে পারলে তার মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে ওঠে। প্রায়ই নিজের নরম পেটে হাত বোলাতে বোলাতে সে মনে মনে বলে, ‘নুন্দি বেশ হইতাছে!’
গোলাপ খানের মুখাবয়ব জরিপ শেষ হলে তইজুদ্দি মূল জায়গায় হাত দেয়, ‘তামাম জিন্দেগি তো যাত্রাটাত্রা করলেন, ফোকরান্তি করলেন কবে ?’
এই প্রশ্নে গোলাপ খান বেশ উৎসাহ পায়, ‘সেই কথা কইতাছি। তার আগে কন, আমারে আপন ভাবতাছেন কি না ?’ এই বলে গোলাপ খান তার কর্মজীবনের বৃত্তান্ত শাখা-উপশাখায় বিভক্ত করে, ‘যাত্রা করলাম তো সেভেনটি ওয়ান পর্যন্ত। যুদ্ধ লাগল তো যাত্রা শ্যাষ। আমরা শিল্পী মানুষ। যুদ্ধ-মুদ্ধর কী বুঝি, কন ?’ যাত্রার কথা তুললেই গোলাপ খান যেভাবেই হোক যুদ্ধের প্রসঙ্গটা পাড়ে, ‘যুদ্ধের পর বেসরকারি চাকরি। বেশি দিন না। ৬ মাস।’
যাক। তইজুদ্দি তাহলে গোলাপ খানের চাকরির ব্যাপারে আগ্রহী! বেশ। তা তার কবিরাজি লাইফটা শুরু হলো লেবারেশনেরও কয়েক বছর পরে। সেই সূত্রে সে হলো কবিরাজ। না, তইজুদ্দি বলে ‘ফোকরান্তি’Ñযদিও শব্দটা তার কানে একটু লেগেছে। যাক এ ব্যাপারে তইজুদ্দিকে কিছু না বলাই ভালো। কিন্তু তার এই ফোকরান্তি হোক কবিরাজি হোক এই লাইফের আগের গ্যাপটায় সে কী করল ? না, চুরি-বাটপারি করে নাই। তবে সে ঐ সময় করলটা কী ? কিছু একটা বলার জন্য মনের ভেতর থেকে গোলাপ খানকে কে যেন খোঁচাতে লাগল, তার মুখটা আকুপাকু করতে লাগল। কিন্তু যতই আকুপাকু করুক বলা যাবে না।
না মানে, সে আর এক তেতো কাহিনি। অন্যের কথা বলতেও মুখে বাধে। আমি বাপু তার যাত্রাফাত্রা লাইফের কথা জানি না। যা জানি তাই বলব। লেবারেশনের পর গোলাপ খান চাকরি নেয় গুলিস্তানে। বেসরকারি চাকরিই বটে। মাহমুদ শাহ জুয়েলার্সে। দেশ স্বাধীন হলেও বেচারা মাহমুদ শাহের ভয় কাটেনি তখনও। তাই সে দোকানে স্বস্তি পেত না। তার ভরসা গোলাপ খান। কিন্তু গোলাপ খান তো একা দোকানে নবাব আলিবর্দী খাঁ। সকাল গড়িয়ে দুপুরÑতারপর সন্ধ্যা, কিন্তু মালিকের আসার খবর নাই। বেশ। গোলাপ খানের কামনাও তাই। সকাল বেলা দোকান খোলার আগে কোরমানের মুকদম খাঁ রেস্টুরেন্টে দেড় কি দুই প্লেট তেহারি ও সুগন্ধি মিষ্টিজর্দাসমেত পান খাওয়াÑসে এক বাদশাহি কারবার। তবে দোষ তার যতই থাক কখনওই সে ধূমপানে আসক্ত হয়নি। তারপর সারাদিন হরেক কিসিমের মেয়েমানুষ দেখা তো বাড়তি পাওনা। শুধু কী তাই, আর একটু সুযোগ পেলে মানে সাপ্তাহিক বন্ধে খানকিপাড়া পর্যন্তÑ(আস্তাগফেরুল্লা) ঢুঁ মেরেছে। তো এইভাবে কতদিন ? মাহমুদ শাহের তখন ক্যাশের লালবাতি জ্বলার উপক্রম। তবে এসব তো আর বেশিদিন চলে না। মাহমুদ শাহ ঠিকই টের পেয়ে গেল। কিন্তু সে কোনও হাঙ্গামায় না গিয়ে পুলিশের হাতে সোপর্দ করল গোলাপ খানকে। তা জেলটেল কতদিন খেটেছিল আমি জানি না।
এদিকে তইজুদ্দির কাছে নিজেকে আপন করার পর্বটি প্রতিষ্ঠা করার পর গোলাপ খান তার গৌরবময় কর্মজীবনের স্মৃতিচারণ করে, ‘সেভেনটি ওয়ানের বছর পাঁচেক পর একটা চাকরি করছি। নবাবপুরে। মালিক ভালো ছিল। কখনও সেলারি দিতে গড়িমসি করে নাই। তারে কখনও নামাজ কামাই করতে দেখি নাই। কিন্তু তার মুখখানা সবসুম থাকত আষাঢ় মাসের মেঘলা আাকাশের মতো গোমড়া। ক্যান ? ঘরে পাঁচ পাঁচখান মাইয়া। অতবড় সংসারÑকাড়ি কাড়ি ট্যাকাÑবংশ রক্ষার জন্য কম কইরা হইলেও একখান পোলা তার চাইই চাই। তার বিবিসাবরে তামাম দুনিয়ার ডাক্তার-কোবরেজ বাইটা খাওয়াইছে কিন্তু ঐ ব্যারামের কূল-কিনারা কেউ করবার পারে নাই। এইসব শুইনা কী আর করি কন! চিকিৎসা জাইনাও না-করা গুনাহ। তাই আমিই ডিল করলাম। আল্লার অশেষ রহমত, আমার মালিকের বিবিসাবের কোল জুইড়া চান্দের মতো ফুটফুটা এক পোলা আইল!’
এইবার তইজুদ্দি পুরোপুরি কাত। আর কিছু জিজ্ঞেস করার দরকার নাই। এবার তাকে সব খুলে বলতে হবে, বাড়িতে নিয়ে একদিন সমাদর করতে হবে।
কুলসুম কিন্তু ঐ রকম ছাগল-দাড়িওয়ালা লোকটার সাথে তইজুদ্দির এত মাখো মাখো ভাবটা অনুমোদন করতে পারে না। লোকটা কুলসুমের শ্বশুরের বয়সী না হলেও ভাসুরের বয়সী হবেÑএতে কোনও সন্দেহ নাই; অথচ টেডি লোকটার কাজ দ্যাখো, গদগদ গলায় সে কুলসুমকে ডাকে, ‘ভাবি!…ও ভাবি! আপনার রান্নায় জাদু আছে।’ কৈ তইজুদ্দি তো কোনওদিন তার রান্নার এমন প্রশংসা করে না ? আসলে এইগুলা হলো ভড়ং। ভুজংভাজং। মানে হলো খাওয়ার খায়েশ মেটে নাই। আবারও একদিন আসার ফন্দি।
কিন্তু তইজুদ্দির কাছে ছাগল দাড়িওয়ালা লোকটার সম্বন্ধে সব শোনার পর কুলসুমের হাঁসফাঁস ভাবটা কাটে। নিজেকে সে অপরাধীই মনে করে। একজন বুজুর্গ লোককে খাওয়াতে পারা তো তার জন্য ভাগ্যের ব্যাপার।
এদিকে গোলাপ খানও সফল। সে তার আচার-ব্যবহার দিয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই জয় করে নিয়েছে।
তইজুদ্দির জন্যে গোলাপ খানের কষ্টই হয়। বেচারার তিন তিনটে মেয়ে।
ক্যাশ থেকে টাকা সরানো গোলাপ খানের পুরোনো অভ্যাস। তইজুদ্দির বাড়িতে যাওয়ার পর থেকে ঐ অভ্যাসটা প্রবলভাবে বেড়েছে। মরিচা ধরা টিনের বাক্সের মধ্যে গোলাপ খানের মেটে রঙের কোট। এই কোটটা সে লেবারেশন পিরিয়ডে গুলিস্তান হকার্স মার্কেট থেকে কিনেছিল। সেই কোটের বুক পকেটে লুকানো টাকা বের করামাত্র গোলাপ খানের হাত নিশপিশ করে, চোখ উপরে ওঠার দশা হয়। টাকাগুলো আলগোছে গেরোবন্দি করে সরাসরি চৌরঙ্গী সুপার মার্কেট। কী কিনবে ? জামা-কাপড় ? না, একটা রুপার বালা কিনে দ্রুত তইজুদ্দির বাড়িতে হাজির হয়, যখন বাড়িওয়ালা বাড়িতে নাই। চম্পা না শম্পা তাকে দেখে একটু হৈচৈ করে, কাকা আইছে কাকা আইছে! বলে। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। হৈচৈইটা জমে ওঠে না। ঠিক আছে, না জমুক।
গোলাপ খান বসে ১৭ বছরের পুরোনো আমিন ফ্যানের নিচে। এই ফ্যানের ক্যাঁড়ক্যাঁড় শব্দে গোলাপ খানের শ্বাস-প্রশ্বাসের রিদমে ব্যাঘাত ঘটে। খানিক বাদে কুলসুম শরবতের গ্লাস নিয়ে ঘরে ঢোকে।
গোলাপ খান কাচুমাচু করতে শুরু করে। ১০০ ওয়াটের ফিলিপস বাল্বের আলোতেও তার মুখটা ফ্যাকাশে দেখায়Ñএকটু কাঁপে তার ঠোঁট। কুলসুম এসে চেয়ারে বসতেই সে চুপসে যায়। অবশেষে কুলসুমই তাকে উদ্ধার করে, ‘আমাগো ব্যাপারে কী করলেন ?’
‘সেই জন্যই তো আসা।’ গোলাপ খান মুখে এ কথা বললেও আসল গুরুত্ব যায় সদ্য কেনা বালার প্রতি। পকেটে হাত দিয়ে সে বালাটি বের করে। কুলসুম তার পকেটে হাত দেওয়া দেখে ভাবে, ওষুধ হবে হয়তো কিন্তু একটা ঝকমকে বালা দেখে কুলসুমের প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হওয়ার আগেই তইজুদ্দির কাশির আওয়াজে সব ঘোলাটে হয়ে যায়। তইজুদ্দির কাশির শব্দে গোলাপ খানের করোটিতে ট্রাফিক জ্যাম শুরু হয়। মনুমেন্টের মতো ফ্রিজড হয়ে যাওয়া গোলাপ খানের হাত কয়েক সেকেন্ড পর একটু নড়াচড়া করে। বালা মোড়ানো পাতলা কাগজ খচমচ করে উঠলে সে যেন পা ফসকে চাঁদের মাটি হতে পৃথিবীতে পতিত হয়। বালাটি কোথায় লুকাবে এই ভাবতে ভাবতে বেহায়া হাতখানা একটু আশ্রয় খোঁজে। এই মুহূর্তে অভিনয়ের কোনও ডায়লগ কিংবা ময়ূরের মতো না হোক নিদেনপক্ষে কাকের নৃত্য জানা থাকলেও আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যেত না ?
লেখক : গল্পকার ও নাট্যকার
সচিত্রকরণ : রজত



