প্রবন্ধ : বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্রমবিকাশে কবিতা পত্রিকার দূরসঞ্চারী ভূমিকা : সুশীল সাহা

গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে বুদ্ধদেব বসুর উদ্যোগে প্রকাশিত কবিতা পত্রিকাটি বাংলা কবিতা সম্পর্কে যথার্থভাবে আধুনিকতা অর্জন করে। একটানা পঁচিশ বছর ধরে প্রকাশিত এই পত্রিকার ১০৪টি সংখ্যা আধুনিক বাংলা কবিতার সমৃদ্ধি, প্রসার ও তাকে জনপ্রিয় করে তোলায় এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিল। যাঁর প্রত্যক্ষ অনুশাসন, প্রেরণা ও সদিচ্ছায় পত্রিকাটি দীর্ঘকাল প্রকাশিত হয়েছিল সেই অনন্য প্রতিভাদীপ্ত কবি ও প্রাজ্ঞজন বুদ্ধদেব বসুর এটি একটি স্মরণীয় কীর্তি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সত্যিকারের আধুনিকমনস্ক পাঠক তৈরিতে এই পত্রিকার ভূমিকা অনস্বীকার্য। আর সেই পত্রিকাকে যথাযথভাবে নির্মাণ করার জন্যে শ্রী বসুর মেধাদীপ্ত মনন ও চিন্তন বিশেষভাবে কাজ করেছে। রবীন্দ্র-পরিমণ্ডলের বাইরে বেরিয়ে এসে নতুন কবিতা লিখবার যে তাগিদ অনুভব করেছিলেন তখনকার তরুণ কবিরা, তাঁদের একরকম নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বুদ্ধদেব বসু। আর সেই নেতৃত্বদানের অন্যতম হাতিয়ার ছিল এই পত্রিকাটি। শুধু কবিতা নিয়ে সেই সময়ে এমন একটি পত্রিকা প্রকাশ করার যে অসম সাহস দেখিয়েছিলেন সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু, তারই প্রভাবে তখনকার উদীয়মান কবিরা একজোট হয়ে হাতে হাত মিলিয়ে ছিলেন। সেই কবিদের মধ্যে ছিলেন জীবনানন্দ দাশ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সমর সেন, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, অজিত দত্ত প্রমুখ। রবীন্দ্র-বলয়ের বাইরে এসেও রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করতে চাননি তাঁরা। বরং রবীন্দ্রনাথের আশ্রয় ও প্রশ্রয়ের ঔদার্যে তাঁরা সমৃদ্ধ হয়েছিলেন। তাই কবিতার মতো পত্রিকা একটানা ২৫ বছর সগর্বে প্রকাশিত হতে পেরেছিল। প্রথম সংখ্যাটি হাতে পেয়ে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। তাঁর সেই অনাবিল আনন্দের অভিব্যক্তি ব্যক্ত হয়েছিল সম্পাদককে লেখা একটি চিঠিতে। সেই চিঠি বহন করছে এক ঐতিহাসিক তাৎপর্য তথা পত্রলেখকের বিশাল হৃদয়াবেগ এবং আনন্দ-সন্দেশ। তিনি লিখেছিলেন, ‘…তোমাদের কবিতা পত্রিকাটি পড়ে বিশেষ আনন্দ পেয়েছি। এর প্রায় প্রত্যেক রচনার মধ্যেই বৈশিষ্ট্য আছে। সাহিত্য-বারোয়ারির দল-বাঁধা লেখার মতো হয়নি। ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্য নিয়ে পাঠকদের সঙ্গে নূতন পরিচয় স্থাপন করেছে।’ দীর্ঘ এই চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত সব কটি লেখা সম্পর্কে তাঁর খোলামেলা মন্তব্য জানিয়েছিলেন। মনে রাখা দরকার কবিতার প্রথম সংখ্যায় প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিষ্ণু দে, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এবং অজিত দত্ত ছাড়া স্বয়ং সম্পাদক বুদ্ধদেব বসুরও কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল। ছিল কবিতাবিষয়ক কয়েকটি প্রবন্ধ। প্রসঙ্গত জানাই প্রথম সংখ্যার সম্পাদক ছিলেন বুদ্ধদেব বসু ও প্রেমেন্দ্র মিত্র। প্রথম দু বছর যুগ্ম সম্পাদনায় পত্রিকাটি প্রকাশিত হতে থাকলেও এর মূল চালিকাশক্তি ছিল বুদ্ধদেব বসুর হাতে। পরে প্রেমেন্দ্র মিত্র বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে তাঁর জায়গায় আসেন সমর সেন। কিন্তু এক বছর পরেই সম্পাদনা ও প্রকাশনার দায়িত্ব এককভাবে চলে আসে বুদ্ধদেব বসুর হাতে। তারপর থেকে সব কটি সংখ্যার দায়িত্বভার শ্রী বসুই বহন করেন। ১৩৪২ বঙ্গাব্দের আশ্বিন থেকে ১৩৬৭ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত একটানা পঁচিশ বছরে ১০৪টি সংখ্যায় মোট ৩৫ জন লেখক এতে শামিল হয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, সমর সেন, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অজিত দত্ত, প্রতিভা বসু, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, পরিমল রায়, নরেশ গুহ, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, অমিয় চক্রবর্তী, কামাক্ষী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, শামসুর রাহমান, আবু সয়ীদ আইয়ুব, হুমায়ুন কবির, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, আনোয়ার পাশা, আল মাহমুদ, মোফাজ্জেল হায়দার চৌধুরী, আলাউদ্দীন আল আজাদ, শঙ্খ ঘোষ প্রমুখ। তখনকার চিরাচরিত গদ্যবিষয়ক পত্রিকার পাশাপাশি শুধু কবিতা নিয়ে এই পত্রিকাটির প্রকাশ অবশ্যই একটি ব্যতিক্রমী প্রয়াস বলতে হবে। কেননা তখন সব পত্রিকাতেই গদ্যবিষয়ক লেখাই মূলত প্রকাশিত হতো। সেখানে কবিতার জায়গা ছিল অতি সামান্যই। তাই এই বিষয়-বৈগুণ্যেই পত্রিকাটি সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিশেষ জায়গার দাবিদার। শুধু কবিতাই নয়, কবিতাবিষয়ক প্রবন্ধ, সমালোচনা পত্রিকাটিকে এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে দেয়। এই পত্রিকার রবীন্দ্র সংখ্যা, নজরুল সংখ্যা, জীবনানন্দ সংখ্যা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তৃতীয় বর্ষের (১৩৪৫ বঙ্গাব্দ) বৈশাখ সংখ্যাটি ছিল কবিতা বিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা। এতে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের স্বরূপ, জীবনানন্দ দাশের কবিতার কথা, আবু সয়ীদ আইয়ুবের কাব্যের বিপ্লব ও বিপ্লবের কাব্য, বুদ্ধদেব বসুর কবি ও তাঁর সমাজ প্রভৃতি বিশেষ প্রবন্ধসমূহ প্রকাশিত হয়েছিল।
মনে রাখা দরকার কবিতা পত্রিকায় স্বনামে বা বেনামে বুদ্ধদেব বসুর প্রচুর লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। সম্পাদক হিসেবে তিনি যেন নিজের কাছেই দায়বদ্ধ ছিলেন। তাই পত্রিকাটিকে মনের মতো করে সাজিয়ে তোলার জন্যে অন্যের ভালো ভালো লেখার পাশাপাশি নিজেও অকাতরে লিখেছেন। সাহিত্যের নানারকম ঘটনা, তা দেশে হোক বা বিদেশে, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। এইভাবে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হলেও কবিতা পত্রিকাটি হয়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক মানের। বুদ্ধদেব বসুর লেখায় তখনকার প্রধান বাঙালি কবিদের কবিতা নিয়ে ক্ষুরধার সমালোচনা এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সময়ের কবিদের সম্পর্কে তিনি যে-সব বৈশিষ্ট্য ব্যক্ত করে গেছেন পরবর্তীকালে সেগুলোই প্রায় প্রবাদের মতো নানাজনের লেখায় ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন ‘নির্জনতম কবি জীবনানন্দ’। সেই সময়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমাদের আধুনিক কবিদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ সবচেয়ে নির্জন, সবচেয়ে স্বতন্ত্র। বাংলা কবিদের প্রধান ঐতিহ্য থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন এবং গেল দশ বছরে যে-সব আন্দোলনের ভাঙাগড়া আমাদের কাব্যজগতে চলেছে তাতেও কোনো অংশ তিনি গ্রহণ করেননি।’ মনে রাখা দরকার কবিতা পত্রিকায় জীবনানন্দের অধিকাংশ বিখ্যাত কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। একই কথা প্রযোজ্য সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সমর সেন ও বুদ্ধদেব বসুর ক্ষেত্রেও। এঁদের সকলের কবিখ্যাতি এই পত্রিকার সুবাদেই হয়েছে, এ কথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য। শুধু কবিতা প্রকাশই নয়, আলোচিত হয়েছে তাঁদের লেখা কবিতা নিয়েও।
বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একজন উল্লেখযোগ্য কবি, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও সম্পাদক। বিংশ শতাব্দীর কুড়ি এবং ত্রিশের দশকে যখন বাংলা কবিতার আধুনিকতার পালাবদল চলছে, তখন তার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন তিনি। সাহিত্য সমালোচনা তথা কবিতা নিয়ে আন্দোলনের জন্যে তাঁর কবিতা পত্রিকার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অতি অল্প বয়স থেকেই তিনি কবিতা রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই তাঁর প্রভাবমুক্ত হয়ে লেখালিখিতে বাংলার যে তরুণ কবিরা একজোট হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে বুদ্ধদেব বসু স্বয়ং অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথকে স্বীকার করেই তাঁর বিপুল প্রভাব থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করতে তাঁরা প্রয়াসী হয়েছিলেন। এই প্রত্যয়ী মনোভাব এবং সৃজনশীল কাজে নিজেদের পুরো মাত্রায় নিয়োজনে তাঁরা ব্রতী হয়েছিলেন বলেই আধুনিক বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছিল। কেবল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে নয়, বুদ্ধদেব বসু ইংরেজি ভাষাতেও দক্ষ ছিলেন। ফলে বিশ্ব সাহিত্যের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে নিজেদের কাজকর্মের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারার এক দুর্লভ ক্ষমতা তাঁর মধ্যে ছিল। সেই সময়ের বিখ্যাত পত্রিকা প্রগতি ও কল্লোল-এ তিনি নিয়মিত লিখেছেন। তারপর তাঁর সমস্ত মেধা ও মনন নিবেদন করেছেন শুধু কবিতা নিয়ে নিজের পত্রিকা কবিতায়। পত্রিকাটি আমেরিকার শিকাগো থেকে ১৯১২ সালে প্রকাশিত পোয়েট্রি পত্রিকা দ্বারা অনুপ্রাণিত, যার শুরু হয় হ্যারিয়েট মনরোর হাত দিয়ে। বলা বাহুল্য সারা বিশ্বে সুপরিচিত এই পত্রিকাটি, যাতে একসময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতাও প্রকাশিত হয়েছিল।
অত্যন্ত মেধাদীপ্ত বুদ্ধদেব বসুর শিক্ষাজীবন দুর্দান্ত সাফল্যে ভরা। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে তিনি রেকর্ড নম্বর পেয়ে সাফল্য অর্জন করেন যা আজ অবধি অক্ষুণ্ন আছে। শিক্ষকতায় নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে নিয়োজিত করলেও সৃজনশীল লেখালেখিতে তাঁর দক্ষতা সর্বজনবিদিত। কর্মজীবনে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে মেধাবী ভাষণ দিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। কিছুদিন বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিক দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় সাংবাদিকতা করলেও তাঁর আসল ক্ষেত্র ছিল শিক্ষকতা। তাই জীবনের একটা বড় অংশ ব্যয় করেছেন দেশে ও বিদেশের নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করে। তাঁরই উদ্যোগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৫৬ সালে তুলনামূলক ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সূচনা হয়, যার বিভাগীয় প্রধান হিসেবে তিনি একটানা সাত বছর কাজ করেন।
শিক্ষক হিসেবে সফল হলেও তিনি আসলে ছিলেন একজন সৃজনশীল মানুষ। লেখালিখির পাশাপাশি কবিতা পত্রিকা প্রকাশ করে তিনি বিদগ্ধ মহলে সমাদৃত হন। পত্রিকাটি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এক দূরসঞ্চারী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। একটানা পঁচিশ বছর ধরে প্রকাশিত হয়ে এর ১০৪টি সংখ্যা বাংলা ভাষা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ। প্রথম সংখ্যাটি হাতে পেয়ে সম্পাদককে লেখা রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ চিঠির কথা আগেই উল্লেখ করেছি। শুধু চিঠি লিখে পত্রিকার শুভ উদ্যোগের প্রশংসাই কেবল তিনি করেননি, নিজের লেখাও পাঠিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘আফ্রিকা’ এই পত্রিকাতেই প্রথম মুদ্রিত হয়। তাছাড়া নানা সময়ে পাঠিয়েছেন চিঠি। সেই চিঠিগুলো নিছক প্রশংসায় ভরাই ছিল না। সেগুলো ছিল আসলে সাহিত্যের নানা দিক নিয়ে একেকটি মননঋদ্ধ আলোচনা। এছাড়া সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু নিজেও কবিতার নানাদিক নিয়ে নানা সময়ে আলোচনা করেছেন। সেই সব আলোচনা অত্যন্ত উচ্চমানের ছিল। দু-একটি নমুনা থেকে কিছু অংশ এখানে তুলে দিচ্ছি।

“…এখন বলতে গেলে, কবিতা ‘বোঝা’ কথাটাই অপ্রাসঙ্গিক। কবিতা আমরা বুঝিনা; কবিতা আমরা অনুভব করি। কবিতা আমাদের কিছু ‘বোঝায়’ না; স্পর্শ করে, স্থাপন করে একটা সংযোগ। ভালো কবিতার প্রধান লক্ষণই এই যে তা ‘বোঝা’ যাবে না। বোঝানো যাবে না। যে-কবিতা বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে বোঝা যায় তার উচ্চতম রূপ আঠারো শতকের ইংরেজি কবিতা; তাতে আর সবই আছে, কবিতা নেই। যে কবিতা পড়বার সঙ্গে সঙ্গে নিতান্তই বোঝা গেলো, সে-কবিতা লংফেলো মিসেস হেমান্সদের, ইস্কুলের পাঠ্য কেতাবে তার গৌরবময় কবর। যা ‘বোঝাবার’ জিনিস, বোঝাবার সঙ্গে-সঙ্গেই তা ফুরিয়ে যায়, কিছু বাকি থাকে না। কিন্তু বুদ্ধি-অতীত বুদ্ধি পলাতক যে-বিরাট উদ্বৃত্ত, যে-জ্বলন্ত ভাবমণ্ডল―যেখানে অপরূপ ধ্বনির আর অলৌকিক ইঙ্গিতের সীমাহীনতা―কবিতা তো তার-ই, তাছাড়া আর কী ? সেটা বোঝা যায় না, বোঝানো যায় না; যে নিজে না দ্যাখে, চোখে আঙুল দিয়ে বোঝানো যায় না তাকে। রামকৃষ্ণ পরমহংস বর্ণিত-উপলব্ধির মত এ-উপলব্ধিও অসংবেদনীয়।” (কবিতার দুর্বোধ্যতা, বর্ষ ১)
“…শিশুকালে আমাদের প্রায় সকলের কানেই ছন্দ-মিলের ঝমঝমানি ভালো লাগে। তার মানে এই নয় যে বড়ো হ’য়ে আমরা সবাই কাব্যরসিক হবো। আমরা সকলেই হয়-তো এক ধরনের শিক্ষা পেয়েছি, সকলেই আমরা বুদ্ধিমান ও রুচি-সম্পন্ন, বয়ঃক্রমের সঙ্গে-সঙ্গে মনের যথাযোগ্য পরিণতি হ’লো সকলেরই―কিন্তু কবিতা ভালোবাসার বৃত্তি সকলের সমান বিকশিত হ’তে দেখা গেলো না। যদি দশজনকে নেয়া যায়, তার মধ্যে হয়-তো একজন রবীন্দ্রনাথের মর্মে প্রবেশ করতে পারলো, চারজন পৌঁছলো সত্যেন্দ্র দত্ত পর্যন্ত, আর বাকি পাঁচজন হ’লো, হয় কবিতা সম্বন্ধে একেবারেই উদাসীন, নয় এমন সব ‘কবি’র ভক্ত যাঁদের নাম এখানে উল্লেখ না-করাই ভালো মনে করলুম। (সুবিধের জন্য এখানে ধরে নিচ্ছি যে কোন কবি ভালো আর কোন কবি কম ভালো সে-বিষয়ে আমার পাঠকরা আমার সঙ্গে মোটামুটি একমত।)” (কবিতার পাঠক, বর্ষ ১)
জীবনানন্দ দাশের কবিত্বশক্তি সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসু প্রথম থেকেই অত্যন্ত ইতিবাচক কথা বলেছেন। তাঁর কয়েকটি মাত্র কবিতার প্রকাশকালেই শ্রী বসু বাংলা কবিতায় এক নতুন স্বরের আগমনী ধ্বনি শুনতে পেয়েছিলেন। এমনকী রবীন্দ্রনাথও যাঁর কবিতাকে কেবলমাত্র ‘চিত্ররূপময়’ বলে আখ্যায়িত করে থেমে গেছেন, সেখানে শ্রী বসু তাঁর ‘কবিতা’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা থেকে জীবনানন্দ দাশের একাধিক কবিতা কেবল প্রকাশ করেননি, তাঁর কবিতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনাও করেছেন। কবিতার দ্বিতীয় বর্ষের একটি সংখ্যায় ‘প্রকৃতির কবি’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি অনেকগুলো কবিতার উল্লেখসহ যে প্রবন্ধটি লিখেছিলেন সেটি কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতার মর্মবাণীর এক গভীর অনুসন্ধানী বিশ্লেষণ হয়ে ওঠে। কবির সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ধূসর পাণ্ডুলিপির সমালোচনা প্রসঙ্গে তিনি লিখেছিলেন, ‘…আমার মনে হয়, আমাদের আধুনিক কবিদের মধ্যে একজনকে এই বিশেষ অর্থে প্রকৃতির কবি বলা যায় : তিনি জীবনানন্দ দাশ। তাঁর নব-প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ধূসর পাণ্ডুলিপি পড়ে এই কথাই মনে হলো। অবশ্য এই বইয়ের কবিতাগুলো আমার পক্ষে একেবারে নতুন নয়। এদের রচনার কাল আজ থেকে এগারো বছর ও সাত বছরের মধ্যে : এবং সেই সময়ে এরা অধুনালুপ্ত কয়েকটি মাসিকপত্রে আত্মপ্রকাশ করে, তখন থেকেই এদের সঙ্গে আমার পরিচয়।’ ‘…যে সময়ে জীবনানন্দ সে-সব কবিতা বিভিন্ন মাসিকপত্রে প্রকাশ করেন তা পড়ে আমি মুগ্ধ হয়েছিলুম এবং এখন সেগুলোই দেখতে পাচ্ছি ধূসর পাণ্ডুলিপিতে একত্রিত। ভালো কবিতার কেমন একটা আদিম অপূর্বতা আছে : মনে হয় এ যেন সদ্যোজাত অথচ চিরন্তন ; এইমাত্র এই মুহূর্তে এর জন্ম হলো, এবং চিরকালের মধ্যে এর মতো আর কিছু হবে না। এই কবিতাগুলোয় ছিলো সেই সুরের অনন্যতা ও অখণ্ডতা ; প্রতিটি রচনার ভিতর দিয়ে এমন একটা স্বর বুকে এসে লাগলো, যেরকম আর কখনো শুনিনি। একেবারে নতুন সেই স্বর, আর এমন অদ্ভুত যে চমকে উঠতে হয়।’ ‘…জীবনানন্দ দাশকে আমি আধুনিক যুগের একজন প্রধান কবি বলে বিবেচনা করি, এবং ধূসর পাণ্ডুলিপি তাঁর প্রথম পরিণত গ্রন্থ। আমার নিজের তাঁর কবিতা অত্যন্তই ভালো লাগে, কিন্তু আশা করি নেহাৎই আমার ব্যক্তিগত অভিরুচির দ্বারা এই মতামত গঠিত হতে দিইনি।’ (প্রকৃতির কবি, বর্ষ ২)
সমালোচনা সাহিত্য যে কতখানি উচ্চমানের হতে পারে কবিতা পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাগুলো পড়লে সেটা বোঝা যায়। পত্রিকার প্রতি সংখ্যায় এক একজন কবির একাধিক কবিতার পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রন্থ নিয়ে আলোচনা প্রকাশিত হতো। সেই লেখাগুলো কেবল কিছু প্রশংসাবাণীর সমাহার নয়। সেগুলো আসলে বাংলা সাহিত্যের কিছু নির্মাণের সঙ্গে পাঠকদের নিবিড় পরিচয় করানোয় সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে। এই পত্রিকাতেই প্রথম সুধীন্দ্রনাথের অর্কেষ্ট্রা গ্রন্থের সমালোচনা প্রকাশিত হয়। সেই আলোচনার কিছু অংশ পড়লেই বোঝা যাবে সম্পাদক তথা সমালোচক বুদ্ধদেব বসুর মেধা ও কাব্যবিচারের মাপকাঠি কতখানি নিরপেক্ষ ও অমোঘ ছিল। আসলে সমালোচনা যে কেবল লেখকের ভুলত্রুটির প্রতি আলোকপাত করা নয়, আরও কিছু তা এইসব লেখা থেকেই অনুভব করা যায়। ‘…কবিদের মধ্যে দুটো জাত আছে; যাঁরা ঝোঁকের মাথায় লেখেন, আর যাঁরা ভেবেচিন্তে লেখেন; যাঁরা কবিতা লেখেন না-লিখে পারেন না বলে, আর যাঁরা লেখেন লিখতে হবে বলেই। কোনো কোনো কবি আছেন স্বভাবতই মাতাল, কোনো কোনো কবি নিতান্তই প্রকৃতিস্থ। তীব্র আবেগই হচ্ছে প্রথম জাতের কবিদের চিরন্তন উৎস, দ্বিতীয় জাতের কবিরা বুদ্ধিনির্ভর। কবিতার এই দুটি কখনো মেলামেশা না হয় এমন নয়, তবু আলাদা দুই জাত স্পষ্টই চেনা যায়। শেলি, বার্নস, রবীন্দ্রনাথ প্রথম জাতের মিলটন, রবার্ট ব্রিজেস, মোহিতলাল দ্বিতীয় জাতের। সুধীন্দ্রনাথকে প্রথম জাতের না বলে বরঞ্চ দ্বিতীয় জাতের বলাই ভালো।’ এইভাবেই কবির একটা স্পষ্ট শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করে তাঁর কবিতার মর্মবাণীকে সামনে এনেছেন তিনি। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, ‘…এটা যদি ধরে নিই যে তিনি কবিতা লেখেন আত্ম-প্রকাশের অনিবার্য তাগিদে নয়, বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা হিসেবে, তাহলে তাঁর এই অর্কেষ্ট্রা বইতে অনেক ভালো জিনিস আবিষ্কার করতে দেরি হয় না। যিনি কবি যতটা, তার চেয়ে কারিগর ঢের বেশি ; এবং কারিগরিতে তাঁর অসামান্য কৃতিত্বের প্রমাণ অর্কেষ্ট্রার প্রতি পাতায়।’ (কবিতা, বর্ষ-১) এই সুধীন্দ্রনাথেরই অন্য আরেকটি কাব্যগ্রন্থ ক্রন্দসী প্রসঙ্গে সমালোচক বুদ্ধদেব বসু প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন এইভাবে, ‘…একটা কথা মনে হয়; সুধীন্দ্রনাথ কি এ-জীবনের কথা কখনোই কিছু বলবেন না, যেখানে ফুল আছে, আছে শিশু, আছে বৃষ্টি আর রোদ; আছে হঠাৎ খুশি হওয়া; আছে মানুষের আশা, চেষ্টা, জয়োল্লাস, আছে ক্লান্তি ও পরাজয়, আছে দুঃখ ও মৃত্যু। এটা কেমন করে হলো যে এই অপরূপ চিরন্তন রহস্যের মধ্যে তিনি শুধু কালের নির্মম ধ্বংসকেই দেখতে পেলেন, নিছক মৃত্যুকে আর দেখলেন বিশুদ্ধ জৈব-ধর্মমাফিক ‘আলিঙ্গন― পুনরালিঙ্গন’! সুধীন্দ্রনাথের রচনায় এমন কোনো উপমা কি রূপক-মূর্তি নেই, যা আমাদের চির-পরিচিত কোনো অভিজ্ঞতাকে নতুন ও চিরন্তন করে সৃষ্টি করে ; এমন কোনো বিচ্ছিন্ন পঙ্ক্তি মগজে এসে লাগে না যার ধাক্কায় সহজ অস্পষ্ট ও অচেতন স্মৃতি মর্মরিত হয়ে ওঠে।’ (কবিতা, বর্ষ-৩)। বলা বাহুল্য সমালোচক বুদ্ধদেব বসুর কবিতা নিয়ে বিশ্লেষণ এমনই ক্ষুরধার এবং অনপেক্ষ ছিল, যার প্রমাণ পত্রিকার পাতায় পাতায় রয়েছে।
কবিতা পত্রিকার তৃতীয় বর্ষের একটি সংখ্যায় আবু সয়ীদ আইয়ুবের ‘কাব্যের বিপ্লব ও বিপ্লবের কাব্য’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। একই সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘কবিতার কথা’। এছাড়া বুদ্ধদেব বসুর কঙ্কাবতী কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে জীবনানন্দ দাশের চমৎকার একটি মূল্যায়ন প্রকাশিত হয়েছিল ওই সংখ্যাতেই। বিষয়ের গুরুত্বে এবং লেখার মুন্সিয়ানায় সংখ্যাগুলি তাই প্রথম থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বুদ্ধদেব বসুর সম্পাদনার বৈশিষ্ট্য এখানেই।
পত্রিকাটির প্রত্যেকটি সম্পাদকীয় ছিল সুলিখিত, অনেক ভাবনা চিন্তার ফসল। কবিতা নিয়ে সম্পাদক যে কতখানি ‘সিরিয়াস’ ছিলেন তার নানারকম প্রতিফলন ঘটত ওইসব লেখায়। প্রসঙ্গত দ্বাদশ বর্ষের প্রথম সংখ্যা থেকে বুদ্ধদেব বসুর তেমন একটি বড় লেখার খানিকটা অংশ এখানে তুলে দিচ্ছি ব্যাপারটা বোঝানোর জন্যে, “কবিতার দ্বাদশ বর্ষের প্রারম্ভে এই প্রশ্ন মনে জাগলো যে প্রথম পাঁচ-ছ বছরে আমরা যে পরিমাণ ভালো কবিতা পরিবেশন করতে পেরেছি, যে-অনুপাতে আশাপ্রদ ও অজ্ঞাত নবীনদের পাদপ্রদীপের সামনে আনতে পেরেছি, এখনও কি তাই পারছি ? স্বীকার করতেই হয়, না। গেলো কয়েক বছর ধ’রে যে-সব কবিতা আমরা প্রকাশ করছি, তার অধিকাংশই কোনোরকমে প্রকাশযোগ্য মাত্র, তার বেশি কিছু না। ও-সব প্রকাশ না ক’রে, দুটি চারটি মাত্র কবিতা রেখে কবিতাকে প্রধানত সমালোচনা-পত্রিকায় পরিণত করবার কথাও আমাদের মনে হয়েছে, কিন্তু ভেবে দেখেছি যে তা’হলে ‘কবিতা’ নামের অর্থ আর থাকে না, আমাদের মৌল লক্ষ্য থেকেও অনেকখানি চ্যুত হতে হয়। বাংলাদেশে মাসিকপত্রাদিতে কবিতার সম্মান নেই, এ-কথা বারো বছর আগে যতখানি সত্য ছিলো, এখন আর ঠিক ততটা না- হ’লেও এখনও প্রয়োজন আছে এমন একটি পত্রিকার, কবিতা যেখানে পাদপূরণ নয়, এমনকি অলংকরণও নয়, কবিতাই যার প্রধান উপাদান ও আলোচ্য, কবিরা যেখানে একান্তরূপে স্বজাতিসঙ্গে নিশ্বাস ফেলে বাঁচবেন, বিরূপ, বিরুদ্ধ ও বিপরীত প্রতিবেশিতায় পীড়িত হবেন না। কাব্যকলা সম্বন্ধে আরো বেশি পাঠককে উদবুদ্ধ করবার সঙ্গে-সঙ্গে কাব্যরচনায় উন্মুখ নবীনদের উৎসাহিত করতেও আমরা চাই; সেইজন্য, অবিশ্রাম নতুন লেখকদের স্থান না-দিলে কবিতার সার্থকতাই অনেকখানি নষ্ট হয়। আর সেইজন্যই, যে-সব রচনায় সামান্যতম ভালোরও আভাস আছে, তা-ই থেকেই বেছে-বেছে প্রকাশ ক’রে কবিতার বিশিষ্টতা ধারাবাহিকভাবে অক্ষুণ্ন রাখতে আমরা প্রয়াসী; আজ পর্যন্ত এমন ঘটনা প্রায়ই দেখছি যে কবিতায় যাঁর রচনা প্রথম বেরুলো, দু এক বছরের মধ্যেই নানা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে তিনি কোনো-একরকমের ‘খ্যাতি’ অর্জন করলেন। বলা বাহুল্য, বার-বার ছাপার অক্ষরে নাম বেরুনোকেই বাংলাদেশে খ্যাতি বলে, এবং প্রতি বছরেই এইরকম এক-একজন খ্যাতিমানের কথা শোনা যায়, যাকে লক্ষ্য ক’রে অজিত দত্ত নতুন ক’রে বলতে পারেন, ‘তুমিও বিখ্যাত হ’লে, সেই দুঃখে লিখি না কবিতা’।”
উপরোক্ত লেখাটি পড়লেই বোঝা যায় সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু কবিতা পত্রিকাটি নিয়ে কতখানি সচেতন ছিলেন। বলা বাহুল্য পঁচিশ বছর ধরে সক্রিয় থাকা এই পত্রিকাটির বিষয় মূলত কবিতাই ছিল। এ ছাড়া কবিতা নিয়ে বহু আলোচনা ও সমালোচনা এতে প্রকাশিত হয়েছে। তবে সাহিত্যের অন্যান্য শাখা সম্পর্কেও এই পত্রিকার একটি সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। তবে কবিতা এবং কবিতাই হয়ে উঠেছে এর প্রধান উপজীব্য। তাই তো বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এর একটা উজ্জ্বল ভূমিকা রয়ে গেছে, বিশেষ করে কবিতার ক্ষেত্রে। আমরা জানি, পরবর্তীকালের খ্যাতিমান বহু কবিরই যাত্রা শুরু হয়েছে এই পত্রিকা থেকেই। এই পত্রিকাকে সে যুগের কবিরা তাঁদের সাহিত্যচর্চার উপযুক্ত মৃগয়া-ভূমি বলে গণ্য করতেন আর সেই সেই কারণেই সম্পাদক হিসেবে শ্রী বসুর একটা বিশিষ্ট ভূমিকা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে আমরা আজও স্বীকার করি।
কবিতা পত্রিকার এই সিকি শতাব্দীর যাত্রা (১৯৩৫-৬১) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বুদ্ধদেব বসুর (১৯০৮-৭৪) এক অনন্য কীর্তি হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। কেননা শুধু কবিতা নিয়ে এমন একটি কাজ তার আগে কেউ করার সাহস দেখাননি। আশ্চর্যের কথা এই যে সুদীর্ঘ ৬৫ বছর পেরিয়ে এসেও আমরা কেবল কবিতা নিয়ে এমন একটি উদ্যোগ আর কাউকে নিতে দেখলাম না। আসলে সম্পাদক শ্রী বসুর অবিশ্বাস্য দক্ষতা ও মেধার স্বাক্ষর বহন করছে এই পত্রিকা। গদ্যের পাশাপাশি কবিতাকেও এক মহান উচ্চতায় পৌঁছে দেবার জন্যে তাঁর এক অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তা-চেতনাই কাজ করেছে। তাই এত বছর পেরিয়ে এসেও ওই পত্রিকার সুদূরপ্রসারী অবদানকে আমরা একান্ত শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করি।
মনে রাখা দরকার বুদ্ধদেব বসু শুধু একজন কবিই ছিলেন না। তিনি একজন সুপ্রতিষ্ঠিত কথাসাহিত্যিকও। তাছাড়া বিদগ্ধ অধ্যাপক হিসেবেও তাঁর সুনাম দেশে বিদেশে সুবিদিত। যৌবনের প্রারম্ভে তিনি অমন একটি পত্রিকার কথা ভেবেছিলেন। শুধু ভাবেননি। দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে এর দায়িত্বভার বহন করেছেন। আপন লক্ষ্যে এমন নিবেদিত প্রাণ মানুষ খুব কম দেখা যায়। কবিতা নিয়ে তাঁর এই আবেগ আর ভালোবাসার প্রকাশ ঘটে কলকাতার রাসবিহারী এভিনিউয়ের নিজের বাড়ির নামকরণ ‘কবিতা ভবন’ থেকে। সেই বাড়ির হাট করে খোলা দরজা দিয়ে কত যে গুণী ও জ্ঞানী মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকত, তার ইয়ত্তা নেই। তবে সাহিত্য আর শিল্প নিয়ে সেই বাড়ির অঢেল আড্ডা চিরজাগরুক হয়ে আছে বহু মানুষের স্মৃতিতে, যদিও কালের পরিক্রমায় তাঁদের অনেকেই প্রয়াত হয়ে গেছেন।
বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে যে মানুষটার জন্ম সেই বুদ্ধদেব বসু সত্তর দশকের প্রথমার্ধেই প্রয়াত হয়েছিলেন মাত্র ৬৬ বছর বয়সে। তবে ওই কালখণ্ডের মধ্যেই প্রচুর কাজ করে গেছেন তিনি। তাঁর কবিতা গ্রন্থের সংখ্যা ১৪টি। এছাড়া উপন্যাসের সংখ্যা ১৬টি, গল্পগ্রন্থের সংখ্যা ১০টি, নাটকের সংখ্যা ছয়টি, অনূদিত গ্রন্থসংখ্যা পাঁচটি, ভ্রমণকথা তিনটি, স্মৃতিগদ্য দুটি এবং সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা একটি হলেও প্রবন্ধগ্রন্থের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ১৯টি। তাঁর এই বিপুল রচনাসমগ্রের সংখ্যা প্রমাণ করে মানুষটার বৈদগ্ধ্য ও মনীষা। বিশ্ববিদ্যালয়ে সাফল্যের সঙ্গে শিক্ষকতা করেছেন বহু বছর। তৈরি করেছেন বিদগ্ধ ছাত্রবৃন্দ। দেশে বিদেশে নানা সভায় ভাষণ দিয়েছেন।
সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর কবি পরিচয়টি মুখ্য হয়ে ওঠে। আর এই পরিচয়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ তাঁর কবিতা পত্রিকার ১০৪টি সংখ্যা। পরিশেষে তাঁর সম্পর্কে সুকুমার সেনের একটি মূল্যবান উক্তি উদ্ধৃত করতে চাই। তিনি বুদ্ধদেব বসুর কবিস্বভাব নিয়ে লিখেছিলেন, “তাঁর লক্ষ্য ছিল আধুনিক কবিতার স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং ‘আধুনিক’ কবিতা লেখকদের পক্ষ সমর্থন করা।” প্রসঙ্গত জগদীশ ভট্টাচার্যের একটি উক্তি উল্লেখ করতে চাই। তিনি যথার্থই বলেছিলেন, ‘বস্তুত শুধু নিজে অজস্র রূপ ও রীতির কবিতা লিখেই নয়, সহযাত্রী এবং উত্তরসূরি আধুনিক কবি সমাজকে কবি মর্যাদায় সমুন্নিত করে কবিতা সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু একালের বাংলা কাব্যের ইতিহাসে অমর হয়ে রইলেন।’
তিরিশের দশকে ঢাকার পুরানা পল্টন থেকে যাত্রা শুরু করে দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় কলকাতার ২০২ রাসবিহারী এভিনিউ-তে থিতু হয়েছিলেন যে কবি, তাঁর জীবনের একটা বড় সময় ব্যয়িত হয়েছিল কবিতা পত্রিকার জন্যে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে পত্রিকাটি স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়েছে আপন বিভা এবং স্বতন্ত্রতায়। আর মাত্র পাঁচ বছর পরেই যার শতবর্ষ উদ্যাপিত হবে, সেই বাংলা পত্রিকার ইতিহাসে একমেবাদ্বিতীয়ম কবিতা পত্রিকার অসামান্য ভূমিকাকে তাই অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। বলা বাহুল্য একই সঙ্গে এর স্রষ্টাকেও।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক



