কবিতা

দিলারা হাফিজ
প্রতিদিন গৃহহীন ঘরে
সবাই জানে
স্বামী মরে গেলে বিধবার
নিজের কোনও আর ঘর থাকে না!
ঘুম থাকে না আঁখির পল্লবে
মলিন চেহারায়―অনিদ্রার রোগীর যেন
রঙিন লেবাস থাকতেও নেই!
হেসে কথা বলা নেই―এক জনমের দুখি চেহারা নিয়ে
সন্তানের দাওয়ায় বসে থাকবে মা
সংসারের চাবির গোছা নিয়ে যাবে ছাওয়ালের বৌ!
আহারে ক্ষুধামন্দা ও অমনোযোগী হবে
ক্ষণে ক্ষণে বিরহ-বিলাপে-জল-ঝরা রোগে
চোখের কোণে ঘা হবে―
শীত-বর্ষা-গরম ঘুরেফিরে আসবে যাবে
কিছুই যেন তাকে স্পর্শ করবে না আর!
ভাঙা কুলার মতো পরিত্যক্ত পড়ে থাকবে ধূলিধূসর-বস্তু
কেননা, তার সব চাওয়া-পাওয়া চলে গেছে মৃতের কবরে!
নইলে কিসের জন্যে সর্বংসহা ধরণী হবেন তিনি?
—- —– ——

মেহেদী ইকবাল
সম্পর্ক
সম্পর্ক অনেকটা পানির মতো
কখনও প্রকাশ্য কখনও অপ্রকাশ্য
তরল হলে কখনও স্বচ্ছ কখনও অস্বচ্ছ, ঘোলা
থাকে সম্ভাবনা দূষণের দুর্গন্ধযুক্ত কদর্য কালো
কঠিন সে থাকে না বেশিদিন
ভালোবাসার আঁচ পেলে গলে যায় গলে যায়!
তবে সবচে জটিল আর রহস্যময়
সম্পর্ক বায়বীয়
অদৃশ্য থাকে সে ঘনিষ্ঠ হয়ে
তবে সেও কিন্তু ভারী হলে কালো মেঘ কালো মেঘ
বৃষ্টি হয়ে ঝরে যায়!
সম্পর্ক অনেকটা পানির মতো
জানি ভিন্ন নাম জীবনের
তবে তা
কখনওই স্থায়ী নয়!
———– —————— ——————–

জাফর সাদেক
বঞ্চিত বীজ
আহা কী পিশাচ পুরুষ তোমার
দেহকে ভক্ষণে নেবার পরে আশায়
অঙ্কন করছে নখর শকুন
লোভের বীজে কী ভয়ংকর জেনেটিক কোড
উত্থিত গাছকে জানতেÑপুরোটা হৃদয়
অথচ গোপন রাখতে চাইত আসন্ন ভ্রƒণের বিকাশ
ঝড়ের রাতে পথে এসে জেনে গেছো
উপড়ে গেছে কটা সরল শিশু-শিমুল
সে-পথে সঙ্গম-আসক্ত মৃতকে কেউ বলুকÑ
বঞ্চিত বীজেই গোপন বন্ধনে ফুলেল উত্থান
ওখানে পাখিদের গুঞ্জন আছে থেমে
দৃশ্যমান ভালোলাগায় মেঘেদের গর্ভপাত
—————– ————————– ———————-

মাহবুবা ফারুক
সহজলভ্য হয়ে গেলে
শুনেছ তো একটা শিউলি ঝরে গেছে ?
তার জন্যে গাছের কি কোনও বিলাপ ছিল ?
নিঃশব্দ হাহাকার অথবা ধরে রাখার আকুতি ?
না, ছিল না।
ঝরানোর তাগিদ ছিল।
আর
মাটির বুকে ওম ছিল
গ্রহণ করার সুখ ছিল ছিল সুবাস মাখা প্রণয়
সে-ই জানে গাছের জন্ম নেওয়ার বেদনা।
গাছেরা ফোটাতে জানে ফুল ঝরাতেও জানে
তাই তাদের পিছুটান থাকে না
মাটির বুকে লেখা হয় আনন্দ বেদনার উপন্যাস।
—————- ————————– ————————-

ফরিদ তালুকদার
দেয়াল বাতি
ছিলাম না কিছুতেই
থাকব-ও না কোথাও
বুক পকেটের কিছু ভবঘুরে সময়
খরচ করেছি যত্রতত্র যেমন ইচ্ছে!
কেউ নিয়েছে কিঞ্চিৎ
কেউ নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে অলক্ষ্যে
কেউ তাড়িয়ে দিয়েছে দূরদূরÑ
শঙ্খমালার বুকের আগুন নিভাতে গিয়ে বারবার
জেনেছি ও আগুন শুধু অন্যকে পোড়ায়, নিজে পোড়ে না কিছুই!
পৌরাণিক প্রহসনে জ্বলেছে জীবন
দেখেছি মুখোশি মঞ্চে ঢের, গুহার আবর্তন!
দেয়ালে লিখে না কিছুই দেয়াল বাতি, পুড়ে পুড়ে এক জীবন!
ফুরোলে লেনদেন, প্রশ্ন কেন তবে আর?
যা পেয়েছি, যা পাব, সে তো ঐ-
মদের বোতলে ভীষণ এক শূন্যতা জমাট!
——————— ————————- ————————

জেনিস মাহমুন
না
অরণ্য একটি প্রতীক। তোমার চেতনা শান্ত হয়েছে তার
অবভাসে। বহুভাসে। শহর থেকে অরণ্যের দূরত্ব অনেক।
অরণ্য থেকে প্রতীকের দূরত্ব বিপুল।
বিষাদ-শহর ত্যাগ করে। তুমি শান্তির কাছে গেলে। অরণ্যে
কিছু প্রত্যক্ষ-বৃক্ষ দেখে প্রতীকের মহার্ঘ হারিয়ে ফেললে।
অরণ্য অতিক্রম করে বন-প্রান্তের একটি রেল সড়কে উপনীত
হলে। এখন একটি বিষাদমুখী ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছো।
জীবন একটি প্রতীক। তোমার থেকে জীবনের দূরত্ব অনেক।
জীবন থেকে প্রতীকের দূরত্ব বিপুল। প্রতীক অতিক্রম করো
না।
——————— —————————- —————————

হাসনাইন সাজ্জাদী
কবিতার অভিযাত্রা
চর্যাপদের গুহাবনে যখন
সিদ্ধাচার্যের কণ্ঠে ভেসে আসত ধ্যানের ধ্বনিÑ
অক্ষর তখন কেবল আচারি,
অর্থ ছিল গুপ্ত,
মানুষের মন ছিল পথের যাত্রী।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের বংশীতে
যখন প্রথম প্রেম ও প্রকৃতি মিলে
বাংলার মাটি নরম হলোÑ
রাধার অশ্রু আর কৃষ্ণের মায়ায়
কবিতার শরীরে এল রক্তের চলন।
মঙ্গলকাব্যের পালা গাইতে গাইতে
গ্রামবাংলার উঠানে ছড়িয়ে পড়ল
ধর্ম, ন্যায়, ভক্তি আর জনমানুষের কাহিনিÑ
চণ্ডী, মনসা, ধনঞ্জয়
সবাই মিলে গড়ল
লোকজ আকাশের প্রথম মহাকাব্য।
বৈষ্ণবসাহিত্যের নরম বুকে
রাধাকৃষ্ণ-প্রেম উন্মত্ত হয়ে উঠলÑ
মানুষ শিখল হৃদয়ের ধর্ম,
শিখল দহনকে ফুলের মতো বহন করতে।
নাথসাহিত্যের স্বর যখন বললÑ
‘যে নিজেকে চেনে, সে-ই ব্রহ্ম’Ñ
বাংলা কবিতা পেল অন্তর্জাগরণের প্রথম শিখা।
মধ্যযুগের পুথিসাহিত্যে
লোকজ জ্ঞান, উপাখ্যান, রাজনীতি, ধর্ম
সব মিলল খড়ের ঘরে, তালপাতার পাতায়Ñ
কবিতার হাত শেখাল
সহজ কথায় গভীর পৃথিবী লেখা যায়।
মাইকেল এলেন বজ্রের মতো-
বাংলাকে দিলেন মহাকাব্যের ডানায় উড্ডয়ন।
অমিত্রাক্ষরের ঘোড়ায় চড়ে
কবিতা শিখল বিজয়ের ভাষা।
রবীন্দ্রনাথ-
তিনি এলেন এক নক্ষত্র হয়ে।
কবিতা তাঁর কাছে মানবধর্ম,
প্রকৃতির ভাষা, আত্মার দেশ।
বাংলা তখন প্রথম বুঝল-
কবিতা মানে মুক্তির ব্যাকরণ।
নজরুল এলেন আগুন হাতে।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে হৃদয়ের বিদ্রোহ
গর্জে উঠল ছন্দে ছন্দে।
বাংলা কবিতা তখন গান শেখে, রাগ শেখে,
মানুষের মুক্তি শেখে
উল্লাস ও দ্রোহের সংমিশ্রণে।
জীবনানন্দ দাশ-
অন্ধকার, নীরবতা, কুয়াশা আর জোনাকি
তাঁকে তৈরি করল অন্য এক পৃথিবী।
বাংলা কবিতা পেল
স্বপ্ন দেখার আরেক জানালা।
শামসুর রাহমান-
শহরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানুষের
স্বাধিকার, স্বাধীনতা, আত্মজাগরণের
সবচেয়ে উজ্জ্বল কবিতাগুলো লিখে গেলেন।
এবং তারপরÑ
সময়ের নতুন বাঁকে আসে
আমার বিজ্ঞান-কবিতা।
পরমাণুর মাঝে, মহাবিশ্বের ঘূর্ণিতে,
এআই-এর কণ্ঠে, কোয়ান্টামের নীলেÑ
কবিতা খুঁজে পায়
নতুন সত্য, নতুন দৃশ্যপট,
বিশ্বমানবতার নতুন উচ্চারণ।
চর্যাপদের ধ্যান থেকে
বিজ্ঞানের দীপ্ত ভবিষ্যৎÑ
এই দীর্ঘ যাত্রায় বাংলা কবিতা
একটাই কথা বলেছে বারবার:
‘মানুষের যাত্রা যত দূরেই যাক,
কবিতাই তার অন্তরের আলো,
অস্তিত্বের চিরন্তন মানচিত্র।’
——————— ————————— —————————–

জাকির জাফরান
শোনো পুঁইপাতা
৬
হৃদয়ে কংক্রিট নিয়ে হেলেঞ্চার দেশে নাকি ভ্রমণ নিষেধ।
অনেক সূর্যাস্ত হলে তবে, হৃদয়ে সবুজ সমাহিত হলে, আমাদের পর্যটন শুরু হয়। প্রায় অন্ধকারে, মায়াবী কলমিলতা, অতীতের মৃদু ব্যর্থতার মতো পায়ে বাজে। যত ইচ্ছে মেঠোপথ, যত ইচ্ছে নিঃশব্দ লাঙল, এগিয়ে চলেছে অস্তাচলে, সান্নিধ্যের তীরে।
আমি বিস্তারিত হতে থাকি নীল রাত্রির ভেতর।
বিস্তারিত হতে হতে, তুলসীপাতার গন্ধ থেকে আশ্চর্য বেগুনে, ঝিঙে ফুলে, আর পেয়ারার অনন্ত অম্বরে ভেসে ভেসে, মিশে যাই তোমার শরীরে।
রাত্রির বেগুন ক্ষেতে হংসের মৈথুন জেগে থাকে। যেন কারও জন্মপরিচয় বহুদিন পর জানা গেছে এই হেলেঞ্চার দেশে এসে।
৭
সারারাত চালকুমড়াকে বুকে নিয়ে ঘুমালাম। ঘুম ভেঙে দেখি বউ। কুমড়ার ফুলে ফুলে ঢাকা তার বুক। মটরশুটির মতো অধনিমীলিত দুটি চোখ। আর মহাজাগতিক ধূলিকণা তার চুলে।
এরকম কুহেলিকা দেখে ভাবি, কী যেন ঘটেছে কাল রাতে!
কুমড়ার বিজন জানালা দিয়ে কারা তবে দেখেছিল চাঁদ? গোপনে ক্রন্দন করে করে স্তম্ভিত হয়েছে কারা? বিশ্বাসে ও বন্যতায় আপসহীন যে রাত, মনে হয় তার সমস্ত বিহ্বল বাতাসের আনাগোনা ছিল এই ঘরে।
শুয়ে শুয়ে আদিম জানালা দিয়ে দেখি, শত শত বেগুন বাংলার লাঠিয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। অপেক্ষায় আছি, কখন যে বীরত্ব দেখাবে।
আজ অপেক্ষায় আছি, অনেক ওষ্ঠের ভেজা চুম্বন পেরিয়ে এই বিস্রস্ত নগরে, কখন কুমড়ো তার নগ্নতা দেখাবে।
——————– —————————– —————————-

আদিত্য নজরুল
অমল
তার হাতের আঙুল-
সদ্য বাচ্চা দেওয়া লাল গাভীর বাটের মতো পরিপুষ্ট…
দুই গাল জুড়ে থৈথৈ
মুগ্ধতা ছড়ানো টোলের পুকুর
চোখের দৃষ্টিতে ভরে আছে
ভাইয়ের প্রতি বোনের স্নেহের মমতা..
তার মাথার শাড়ির
নায়রি আঁচল
ফুটে আছে কদমের ফুল হয়ে!
মেয়েটির দিকে
একটু তাকালে
বুকের ভেতর নেমে আসে পৃথিবীর যাবতীয় স্তব্ধতা…
মেয়েটির রূপসৌন্দর্য্য দুধের সরের মতো অকূলপাথার…
—————– ————————– ———————–

সুকুমার মণ্ডল
বটগাছ
গ্রামের মুখে ওই যে অনন্ত বটগাছ সযত্নে ঝুরি নামিয়েছে, পাখিরা ঠোঁটে কিচিরমিচির নিয়ে তার কোটরে ঢুকছে, বেরোচ্ছে। এইমতো ছায়ার নীচে আজ শুয়ে পড়ি, ঢুলে যাই। পাশের পুকুরে পাতা ও ফল পড়ছে টুপটাপ। চোখের সম্মুখে ভেসে আসছে কৈশোর, যৌবন, যাবতীয় জরা। এত ভার বইতে হলে শিকড় কতদূর ছড়িয়ে দিতে হয়, ভাবি। ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যা নেমে এলে গ্রাম থেকে মা ও কাকিমারা গাছের সম্মুখে প্রদীপ জ্বালাতে আসে।
—————— —————————- ——————————

মোরশেদুর মিল্লাত
ফিরে পাওয়া
আবার বসব আমি জানলার পাশে
কিংবা উঠানের আমগাছের তলে
বিকেলের আলোতে বা কবিতার ছলে
আমার ঘাঘট নদীতীরে, সাদা কাশে।
ডায়রি-বই সাথে, আর কলম হাতে
নিভৃত সুনসান অথবা কলকল
কেবল স্নিগ্ধতা, নয় কোনও কোলাহল
আবার বিমুগ্ধ হবো আমি, সাঁঝ রাতে।
সম্বিৎ ফিরে পাওয়া সাধনা আমার
আবার না হারাক সময়ের ভেলায়
নিজেকে না হারাই ফের অবহেলায়
আকাশ-পাহাড়ই হোক স্বপ্ন-খামার।
ফের হাসবো আমি পূর্ণিমার আলোয়
কাটবে দারুণ সময় মন্দ-ভালোয়।
————— ———————— ————————–
মাহফুজ রিপন
তিন তাসের মানুষ
পরবাসী বিকেলে মনটা শুধু কাঁদে
হৃদয়ের চৌহদ্দি পেরিয়ে উঁকি দেয়
গেরস্থের গোবরলেপা উঠোন।
ঘোর লাগা লাল ঘোড়ায় চেপে
হাজির হই দিঘলিয়ার মাঠে।
গহিনে কাব্যফুল দু চোখে মাছের ম্যুরাল
বুকেতে হাহাকার করে তিন টিক্কার পাত্তি।
ঢোলেতে বাড়ি পড়ে মেঘারানি গান ধরে
সব স্মৃতি মনে পড়ে জীবনের আবোল-তাবোল।
তিন তাসের মানুষ পড়ে আছি নীল নদের তীরে
বুকেতে বাপের ভিটা, চোখে গোবরলেপা উঠোন।
——————– ————————- ————————

রানা হোসেন
বৃষ্টির কাব্য
কেউ কেউ হয়তো বৃষ্টির ভালোবাসা বোঝে না
বোঝে না ফুলের ওপর বৃষ্টি পড়ার সৌন্দর্য
অনেকে বোঝে না কদম ফুল বৃষ্টিতে ভিজে
লুকিয়ে চুরি করে পাড়ার মজাটা কী?
যেই রমণীর জীবনে কেউ
ফুল দিয়ে ভালোবাসার কথা জানিয়েছে
দাঁড়িয়ে ছিল বৃষ্টির দুপুরে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে
শুনেছে পাখির গান, দেখেছে নীলাকাশ, সে হয়তো বোঝে
পুকুরে বৃষ্টি পড়ার আনন্দ কী?
সে বোঝে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখার ভালোবাসা।
বৃষ্টিতে দেখেছিলাম শহরের কোনো খাদে রাজহাঁসের খেলা
সে রাজহাঁস হয়তো বৃষ্টির ভালোবাসা বোঝে
রাজহাঁস পায় হাঁটু পানিতে বৃষ্টি পড়ার আনন্দ
বোঝে হয়তো বৃষ্টির কাব্য।
তুমুল বৃষ্টিতে কারও কারও স্মৃতি নাড়া দেয় ?
দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারের পাতায়
তারিখ খ’েস পড়ে নানা স্মৃতিতে…
আমি খুঁজে পাই ফেলে আসা দিন।
কোনও একদিন শামীমদের বাড়ির গলি দিয়ে
আলম ভাইদের গাছের পেয়ারা খাওয়ার কথা
আমগাছ থেকে আম পড়বে কখন আমি কুড়িয়ে নেব
বৃষ্টির কী অপরূপ আনন্দের ছেলেবেলা।
বৃষ্টির রাতে মায়ের হাতের পিঠা খাওয়া
আজও যেন ঘ্রাণ ভাসে, অল্প বয়সের কাদা পানিতে
অথবা বৃষ্টির হাঁটু পানিতে লাফালাফি
কাগজের নৌকা নিয়ে বন্ধুদের ছুটাছুটি
তরুণ বয়সের আম চুরির বৃষ্টির বিকেল
বুঝে না বুঝে বৃষ্টিতে অন্যের গাছের পেয়ারা খাওয়া
সে কী অপরূপ ফেলে আসা দিন, মিষ্টি স্মৃতি।
বৃৃষ্টি আহ বৃষ্টি, দাউ দাউ রৌদ্রের মধ্যে বৃষ্টি, শিয়ালের বিয়ে
বলে বন্ধুদের হই চই
কৃষকের শুকানো জমিনে বৃষ্টির জলে মাটির ঘ্রাণ
কৃষাণীর হাসিমাখা মুখ
বৃষ্টির রাতে পায়েসের ঘ্রাণে কত সুখ।
বৃষ্টি আসুক সমস্ত শহর জুড়ে, সবুজ শ্যামল বাংলাদেশে
বৃষ্টি আসুক সমস্ত পৃথিবী জুড়ে, চোখ জুড়িয়ে দেখি
বৃষ্টি কেউ বুঝুক আর নাই বুঝুক গাই বৃষ্টির গান
ধুয়ে যাক সকল ক্লান্তি, দুঃখ ব্যথা, যন্ত্রণা,
আজ বাজে শুধু বৃষ্টির কাব্য।
—————– —————————- ————————-

নীলাঞ্জন বিদ্যুৎ
বৃক্ষ, কবিতা কিংবা মানুষের স্বীকারোক্তি
প্রথম যে দানা জিভে তুলেছি সানন্দে
প্রাণরস জাগানিয়া তা বৃক্ষের ফল;
যে সৌন্দর্য আনে প্রথম মুগ্ধতা
তা ফুল, বৃক্ষের উচ্চকিত শোভা।
জীবনে প্রথম পাঠ পল্লবঘন সে তরুমূলে
রৌদ্রক্লান্ত ছুটেছি মধ্যাহ্নে কোনও বৃক্ষের ছায়ায়।
রাত্রিযাপনের যে কুঠুরি
তা বৃক্ষের উদার দাক্ষিণ্য;
তৃতীয়ার চাঁদের মুদ্রায় যে ধনুক
শ্বাপদ প্রতিরোধের হিরন্ময় হাতিয়ার
বৃক্ষের মহিমা ছাড়া তা কিছুই নয়।
আকাশ-সমুদ্র তোলপাড় করে,
তোমাকে বলেছি ‘ভালোবাসি’
সবুজের তুমুল প্রশ্রয় ছিল না সেখানে?
মৃত্যুতাড়িত মুহূর্তে বরাভয় যার হাতে
মৃত সঞ্জীবনী, সে লাজুক উদ্ভিদের নাম।
হঠাৎ অনন্তে পাড়ি দেব যে ভেলায়
চিতার আগুনে অপেক্ষমাণ সে ভেলা
কি কাঠের নয়? বলো,
অস্বীকার করব বৃক্ষের সে কোন মহিমাকে?
মূলত মানুষ নই
জেনে নাও আমি হন্তারক,
আমার দু হাতে বৃক্ষ হননের এত পাপ
কবিতা কি পেখম ছড়াবে কখনও এ হাতে!
—————- ———————— ————————–

দিপংকর মারডুক
কারা যেন বনের লাল পাখিরা
খোলা চোখে কিছু দেখতে পাই না, কারণ এই অপ্রত্যাশিত নাগরিক বৃষ্টির জন্য আশেপাশে কেউ নাই বদ্ধ ধোঁয়া, সিসাময়েড বাতাস আর অবশিষ্ট ব্যাসের গভীরতা ছাড়া অথচ বহুবার অব্যাহত শিল কড়ই আমাকে কেন্দ্রীভূত করে রেখেছে বিস্ফোরিত করে দিয়েছে কাকলি’র তর্জনী থেকে হস্তমৈথুন অবধি জানি, কারা যেন এর জন্য পাহারা দিত! বনের লাল পাখিরা সকল গবেষণার দৌড়ে অবিবেচিত হওয়া গোঙানিরা সবুজ পাথরে উজ্জ্বল মেঘ নিবেদন করেছি তবু; এবং প্রজনন করেছি সুগঠিত পিচ্ছিল জিরাফফুল যেহেতু গ্রাম থেকে গ্রাম ঘুরে বেড়িয়েছি উচ্চবিলাসী ভূমিতে নয়, আকাশে নয়।
——————- ————————— ———————–
সচিত্রকরণ : রজত



