আর্কাইভপ্রবন্ধ

প্রবন্ধ : একটি অনালোচিত প্রগতিশীল সাময়িকী : মাসিক জয়তী : রবিউল হোসেন

মাসিক জয়তী (এপ্রিল-মে ১৯৩০) ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র (১৯২৬) কনিষ্ঠতম সংগঠক আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪) সম্পাদিত একটি সাহিত্য সাময়িকী। সাময়িকীটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতো। ‘সাহিত্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠা বাঙালি মুসলমানের সমাজেতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। গত শতকের বিশ ও ত্রিশের দশকে এ অঞ্চলের মুসলমান মানসে আধুনিক জ্ঞান-কর্ষণার প্রতি যে আগ্রহ সৃষ্টি হয় তারই পরিণামে গঠিত হয় ‘সাহিত্য সমাজ’। কলকাতা ফেরত কতিপয় শিক্ষক ও ছাত্রের কর্মপ্রচেষ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হলে প্রতিষ্ঠিত হয় সংগঠনটি। মুসলমান সমাজকে অন্ধত্ব, কুসংস্কারাচ্ছন্নতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, অশিক্ষা তথা সার্বিক পশ্চাৎপদতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করে মুক্তবুদ্ধি ও জ্ঞানচর্চার পথ দেখানোই ছিল ‘সাহিত্য-সমাজে’র লক্ষ্য। সংগঠনটির কর্মকাণ্ড পরবর্তীকালে ‘বুদ্ধির মুক্তি’র আন্দোলন হিসেবে পরিচিতি পায়। ‘সাহিত্য-সমাজ’-এর মুখপত্রের নাম ছিল শিখা (১৯২৭)। ‘সাহিত্য-সমাজ’ বারো বছর টিকেছিল। কিন্তু এর যুক্তিসিদ্ধ কর্মকাণ্ডের প্রভাব ছিল ব্যাপক। কাজী আনোয়ারুল কাদীর (১৮৮৭-১৯৪৮), কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০), আবুল হুসেন, কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১), মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-১৯৫৬), আবদুল কাদির প্রমুখ ব্যক্তি ‘সাহিত্য-সমাজ’-এর কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ‘সাহিত্য সমাজে’র আদর্শকে এগিয়ে নিতে আবদুল কাদিরের সম্পাদনায় বৈশাখ ১৩৩৭ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় জয়তী। পত্রিকাটি দীর্ঘ জীবন লাভ করেনি। কিন্তু এটির সম্পাদকীয় ঔজ্জ্বল্যে মুগ্ধ ছিলেন সমকালের বিদগ্ধজনেরা। এজন্য ‘সাহিত্য সমাজে’র শততম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে শিখার ধারার কিন্তু কম আলোচিত এই মাসিক সাময়িকীটির সাহিত্যিক-সামাজিক অবদান পর্যালোচনা করার প্রয়াস করা হবে।  

উনিশ শতকের শেষ দশকে বাংলায় জাতীয়তাবাদের (যদিও তা অনেকটাই হিন্দু প্রভাবিত) বিকাশ খ্রিস্টান রাষ্ট্রশক্তির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। শাসকগোষ্ঠী বিষয়টি বুঝতে পেরে পরিকল্পিতভাবে তা দমন করতে ১৯০৫ সালে বাংলা ভাগ করে পূর্ব-বাংলা ও আসামকে নিয়ে একটি এবং পশ্চিম বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সমন্বয়ে আরেকটি প্রদেশ সৃষ্টি করে। দেশভাগ বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। স্বাতন্ত্র্যবাদী মুসলিমরা এতে খুশি হলেও সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে দেশভাগের ফলে তেমন কোনও প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। এদিকে শিক্ষা-সংস্কৃতি-রাজনীতি-অর্থনীতি প্রভৃতি প্রায় সকল ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকা হিন্দু-সম্প্রদায় তাদের ভবিষ্যৎ  অনিশ্চয়তাপূর্ণ ভেবে এ ভাঙনের বিরোধিতা অব্যাহত রাখে। এক পর্যায়ে আন্দোলনের তীব্রতায় ভীত হয়ে সরকার ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করে। এ ঘটনার ফলে নবগঠিত রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে সদ্য উন্নতিকামী বাঙালি মুসলমান সমাজ মারাত্মকভাবে আহত হয়। কেননা এই কয়েকটি বছরের মধ্যেই তারা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি করে ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখে। তাই বঙ্গভঙ্গ রদ অবচেতন মনে হলেও পিছিয়ে পড়া মুসলমান সমাজ-মানসে আঘাত হানে। এরূপ পরিস্থিতিতে সমাজনেতারা স্ব-সমাজের মুক্তি দিতে সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক-সাংগঠনিক প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। জন্ম হয় ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতি’র (১৯১১)। এর আগেই ১৯০৬ সালে মুসলমানদের রাজনৈতিক সংগঠন ‘মুসলিম লীগ’ জন্ম নিয়েছে। ‘সাহিত্য-সমিতি’ গঠন তাই কালের প্রেক্ষাপটে অসম্ভব ছিল না। তবে সমিতির কৃতিত্ব হলোÑ এর সভ্যবৃন্দের একটি বৃহৎ অংশ অসাম্প্রদায়িক চারিত্র্য বজায় রেখে মুসলমান সমাজের মুক্তি-সন্ধানে সক্রিয় ছিলেন।১

সমিতির মুখপত্র হিসেবে ১৯১৮ সালে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকার প্রকাশ ও মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬), কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন প্রমুখের ‘সাহিত্য-পত্রিকা’কেন্দ্রিক আধুনিকতামুখী সাহিত্যিক-সামাজিক আন্দোলনের সূচনা মুসলমান সমাজের সম্মুখে আলোকবর্তিকা হিসেবে আবির্ভূত হয়। ১৯২৩ সালে ‘সাহিত্য-পত্রিকা’র প্রকাশ বন্ধ হয়ে গেলে এঁদেরই একটি অংশ কলকাতায় সওগাত (নবপর্যায় ১৯২৬) এবং অন্য অংশটি কর্মোপলক্ষ্যে ঢাকায় এসে পূর্ব-অভিজ্ঞতার আলোক ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ গঠন ও মুখপত্র শিখা প্রকাশ করেন। শিখা প্রকাশের সঙ্গে আবদুল কাদিরের সংশ্লিষ্টতা ছিল। প্রথম বর্ষের প্রকাশক হিসেবে তাঁর নাম ছাপা হয়। ‘সাহিত্য সমাজে’র আরও তিনটি সহযোগী পত্রিকা ছিল―তরুণপত্র (১৩৩২), অভিযান (১৩৩৩) ও জাগরণ (১৩৩৫)। আবদুল কাদিরের মতে, পত্রিকা তিনটি প্রকাশের নেপথ্যে ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আবুল হুসেনের হয় অর্থানুকূল্য না হয় প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছিল।২ মাসিক জয়তী পত্রিকাটিকে শিখার সহযোগী পত্রিকা হিসেবে অভিহিত করা না হলেও এটির সম্পাদকীয় চারিত্র্য ও প্রকাশিত প্রবন্ধাবলি সে দায়িত্ব অনেকটাই পালন করতে সক্ষম হয়। 

জয়তী প্রকাশের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আবদুল কাদির নিজে কিছু বলেননি। সমকালে যাঁরা তাঁর ঘনিষ্ঠ ছিলেন তাঁদের তরফ থেকেও বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে পত্রিকাটির সম্পাদকীয়, সূচি ও সময় বিবেচনায় নিয়ে বলা যায় যে, এটির সম্পাদনার ক্ষেত্রে তিনি ‘সাহিত্য সমাজে’র আদর্শ ও উদ্দেশ্য স্মরণ রেখেছিলেন। আবুল ফজল লিখেছেন―‘জয়তীর ছিল সাহিত্যের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক আর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী বদলেরও আন্দোলন।’৩ পত্রিকাটির ঠিকানাÑ সম্পাদক কর্তৃক ২৪/বি বুদ্ধু ওস্তাগর লেন, কলকাতা থেকে প্রকাশিত এবং মেট্কাফ প্রেস, ১৫ নয়ানচাঁদ দত্ত স্ট্রীট, কলকাতা থেকে মুদ্রিত। প্রথম সংখ্যা ‘বৈশাখ ১৩৩৭’ চিহ্নিত ছিল। কার্যালয়Ñ ১৪৪ কড়েয়া রোড়, কলকাতা। দাম―প্রতি সংখ্যা তিন আনা, বার্ষিক দু টাকা চার আনা। তৃতীয় বর্ষ, প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হবার পর এটি বন্ধ হয়ে যায়। জয়তী প্রথম ৬ মাস নিয়মিত প্রকাশিত হয়; সপ্তম থেকে দ্বাদশ পর্যন্ত ২ মাসে ১টি করে অর্থাৎ যুগ্ম সংখ্যা হিসেবে; পরের বছর ৩ মাসে একটি করে সংখ্যা বের হয়। এবারও সংখ্যা গণনা করা হয় পূর্বের নিয়মে। এরপর শেষ সংখ্যা বের হয় ১৩৩৯ সালের বৈশাখ মাসে। সংখ্যাটিকে গণনা করা হয় তৃতীয় বর্ষ প্রথম সংখ্যা হিসেবে। এভাবে পত্রিকাটির মোট ১৪টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়।

সমকালের প্রতিষ্ঠিত ও শ্রতিশ্রুতিশীল অনেকের লেখা জয়তীতে প্রকাশিত হয়েছিল। ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত ছিলেন তাঁদের অধিকাংশের লেখা পত্রিকাটিতে প্রকাশিত হতে দেখা যায়। এছাড়া এটিতে লিখেছিলেন প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬), অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৭১-১৯৫১), মোহিতলাল মজুমদার (১৮৮৮-১৯৫২), ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৬১) প্রমুখ খ্যাতিমান লেখক। বারীন্দ্রকুমার ঘোষ (১৮৮০-১৯৫৯), দিলীপকুমার রায় (১৮৯৭-১৯৮০) পত্রিকাটির জন্য আশীর্বাণী পাঠিয়েছিলেন।

বিচিত্র বিষয় জয়তীর পাতায় আদৃত হয়েছে। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, অনুবাদ কবিতা, গান, নাটক, প্রবন্ধ, ‘সাহিত্য সমাজে’র সভাপতিদের ও অতিথিদের অভিভাষণ, চিঠিপত্র এবং গ্রন্থালোচনা প্রভৃতি বিষয় জয়তীর সূচিভুক্ত হয়েছে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে উঠেছে এর প্রবন্ধ গৌরব ও ‘সম্পাদকীয় পাঁজি’―যা পত্রিকাটির প্রগতিশীল চারিত্র্য বুঝতে সহায়তা করে। জয়তীর পাতায় সবচেয়ে বেশি আপ্যায়িত হয়েছেন আবদুল ওদুদ ও নজরুল ইসলাম। এ পর্যায়ে সম্পাদকীয়, সাহিত্য-শিল্প, রাষ্ট্র ও রাজনীতি বিষয়ক প্রবন্ধসমূহের আলোকে আমরা জয়তীর সাহিত্যিক ও সামাজিক ভূমিকা নির্ণয়ের চেষ্টা করব।

জয়তীর তরুণ সম্পাদকের ওপর নজরুলের প্রভাব ছিল। দুজনই স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন দেখতেন। আবদুল কাদির ভারতবর্ষের সমকালীন সমাজসমস্যা―বিশেষ করে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি নিয়ে জয়তীতে আলোচনা করেছেন; নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাগুলোর সমাধানের পথ সন্ধান করেছেন। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য তিনি হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে উভয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করেছেন। আবার স্বাধীনতা আন্দোলনে ভারতবর্ষীয় মুসলমান সমাজের নিস্পৃহতার জন্য তিনি কষ্ট পেয়েছেন। একই সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি মুসলমানদের অংশগ্রহণ কামনা করেছেন। উপর্যুক্ত বিষয়গুলো আলোচনায় এনে আমরা সহজেই সম্পাদকীয় উদ্দেশ্য ও পত্রিকাটির চারিত্র্য অনুধাবন করতে পারি। জয়তীর সম্পাদকীয় উদ্দেশ্য অনুধাবনের জন্য প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়ের পূর্বাপর বিশ্লেষণ জরুরি। ‘স্বাদেশিকতা ও মুসলমান’ শীর্ষক সম্পাদকীয় অংশে লেখক বলেন:

রাজা রামমোহনের পর হইতে বহু সংগ্রাম, বহু বিক্ষোভ, বহু নৈরাশ্যের মধ্য দিয়া বাংলার তথা ভারতবর্ষের হিন্দু-সমাজভুক্ত বহু কর্মী দেশের পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করিয়া আসিতেছেন। তাঁহাদের মিলিত প্রচেষ্টাতেই আজ ভারতবর্ষের মুক্তি আন্দোলন এত বিস্তৃত ও শক্তিশালী হইয়া উঠিয়াছে।

হিন্দু সমাজের পাশাপাশি বসবাস করিয়াও কেন যে ভারতবর্ষের মুসলমান সমাজ বর্তমান রাষ্ট্রনৈতিক আন্দোলনে পূর্ণভাবে যোগ দিতে বা তৎপ্রতি সহানুভূতিশীল হইতে পারিতেছে না, কেন যে মুসলমান সমাজে অন্তত দুই চারিটিও স্বদেশ-হিতৈষী গগণচুম্বী প্রতিভা জন্মগ্রহণ করিতেছে না, তাহার কারণ নির্দেশ করিতে গেলে আমাদের পূর্ব ইতিহাস, পরিপার্শ্ব, প্রয়োজন ও বিভিন্ন প্রচেষ্টার কথা পর্যালোচনা করিয়া দেখিতে হয়।… মুসলমান জনসাধারণের মনোভাব ও জীবনগতি আশাজনক নহে, তাহাদের আবহাওয়ার কোনো পরিবর্তনই সম্ভবপর হইতেছে না। দুর্ভাগ্যবশতঃ এমন কোনো প্রতিভাবান স্বদেশপ্রেমিকও এ-সমাজে আবির্ভূত হইতেছেন না―যিনি বহু বিরুদ্ধতায় অবিচলিত থাকিয়া এই সমাজকে অনধীন জীবনের সন্ধানী করিয়া তুলিতে পারেন। রাষ্ট্রীয় মুক্তির জন্য যে এদেশীয় মুসলমান কোনোদিন কোনো আয়োজন করে নাই, এ কথা সত্য নহে; কিন্তু সে সমস্ত আয়োজন বহু মোহ-ব্যস্ততা-সংকুল ছিল বলিয়া জয়-মণ্ডিত হইতে তো পারে নাই-ই, অধিকন্তু আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিকে বিকৃত করিয়া দিয়া গিয়াছে―যেই বিকৃতি আজ পর্যন্ত সত্যকার স্বদেশ হিতৈষণার মন্ত্রে দীক্ষিত হওয়ার পথে বারবার আমাদিগকে প্রতিবন্ধকতা করিতেছে।

আলোচ্য সম্পাদকীয়তে তিনি ওহাবিদের প্রসঙ্গ টেনেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ওহাবিদের ইংরেজ বিদ্বেষ মুসলমান সমাজকে আধুনিক শিক্ষা-সংস্কৃতি-রাজনীতি থেকে পিছিয়ে দিয়েছে। আর হিন্দুরা সে সুযোগ গ্রহণ করে সর্বক্ষেত্রে মুসলমানদের থেকে এগিয়ে গেছে। আবার হিন্দুরা যখন স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু করলেন ঠিক তখন মুসলমানরা ইংরেজমুখী হয়ে রইল। এর ফলে স্বদেশী আন্দোলনের কালে মুসলমানদের অংশগ্রহণ ছিল সামান্য। এ সময় তারা যথাযথভাবে দেশপ্রেমিক হয়ে উঠতে পারেনি। তিনি আরও লিখেছেন:

দেশের মুক্তি প্রয়োজন―আমাদের জীবনকে সহজভাবে বিকশিত করার জন্য; আমাদের ধনসম্পদ বৃদ্ধি, মুক্ত জ্ঞানলাভ, সভ্য জীবন যাপন, কোনো কিছুই পরিপূর্ণরূপে হইতেছে না―কেননা বিদেশী সরকার আমাদের পথে বহু বাধা সৃষ্টি করিতেছে,―অতএব আমাদের চাই রাষ্ট্রীয় মুক্তি। এই মন্ত্রে দীক্ষিত হইয়া, কোনো প্রকার মোহ দ্বারা পরিচালিত না হইয়া, আমাদের নেতৃবৃন্দ দেশের মুক্তি-সংগ্রামে নামিতে পারিতেছেন না বলিয়াই আমাদের চিত্তের আজ এই বিকৃতি।

আলোচ্য সম্পাদকীয়তে স্বদেশী আন্দোলনের সীমাবদ্ধতাগুলোর প্রতিও দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে। এ আন্দোলনের বড় ত্রুটি ছিল এর নেতৃস্থানীয়দের ‘হিন্দুভারত’ গঠনের স্বপ্ন। যা ওহাবি আন্দোলনের নিয়ন্তাদের মতোই নিন্দনীয়। তবে ‘বর্তমান স্বাধীনতা-আন্দোলনে ভারতবর্ষীয় কোনো জাতি বা সম্প্রদায়ের কোনো বিশেষ স্বার্থ বা মোহ জড়িত নাই।’ এজন্য সম্পাদক কামনা করেছেন:

দেশের বর্তমান স্বাধীনতা সংগ্রামে হিন্দু যেমন তার পূর্বকৃত সমস্ত দোষত্রুটি সংশোধন করিয়া লইয়া শুদ্ধচিত্তে নামিয়াছে, তেমনি মুসলমানও যদি তার পূর্বেকার বহু-প্রয়াসের বহু-বিক্ষোভকে ভুলিয়া গিয়া না নামে, তবে ভবিষ্যতের ইতিহাসে তার কথা কলঙ্কের অক্ষরেই লিখিত হইবে।… ইহাকে উপেক্ষা করিলে আমাদের কল্যাণ নাই; ভবিষ্যৎ দুর্গতির অন্ত নাই।

 জয়তী’র প্রথম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যার সম্পাদকীয়েরও মূল বক্তব্য ভারতবর্ষের স্বাধীনতা। তবে এবারের বক্তব্য আরও বেশি শাণিত।  এখানে বলা হয়েছে যে, ‘ভারতের মুক্তি অর্থ বহু-সম্প্রদায় অধ্যুষিত ভারতবর্ষের বহু-বন্ধনে আড়ষ্ট মানুষের সর্বাঙ্গীণ মুক্তি―রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা একটি বন্ধনের বিমুক্তি মাত্র।’ ‘সর্বাঙ্গীণ মুক্তি’ অর্থে এখানে বোঝানো হয়েছে জনসাধারণের চিত্তের মুক্তি―যা সম্ভব হবে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি সাধনার মধ্য দিয়ে। এখানে তিনি দেখিয়েছেন যে, ভারতবর্ষে হিন্দু মুসলমানের বিরোধ বর্তমানে যে আকার ধারণ করেছে তা আর কোনও স্বার্থগত নয়; ‘মজ্জাগত’। তাই ভবিষ্যতের ভারত সম্পর্কে তিনি লিখেছেন:

নানক-কবীর-আকবর-দাদু-দারা-রামমোহন প্রমুখ মধ্যযুগীয় সাধকবৃন্দ বিভিন্ন সভ্যতার সমন্বয়ে ভবিষতের বিরাট ভারতীয় জাতি গঠনের যে মহিমময় স্বপ্ন দেখিয়া গিয়াছেন তাহাকে কার্যে পরিণত করা ভিন্ন এ সমস্যার অন্য সমাধান নাই।… সেই সভ্যতার স্রষ্টা ও উত্তরাধিকারী হইবে―হিন্দু বা মুসলমান জাত নহে―ভবিষ্যতের ভারতীয় জাতি।

 বলাবাহুল্য, জয়তীর অন্যান্য সংখ্যার সম্পাদকীয়গুলোতেও বারবার ভারতবর্ষের স্বাধীনতার কথা, এক জাতি গঠনের কথা, হিন্দু-মুসলমান মিলনের কথা বারবার উচ্চারিত হয়েছে। জয়তীর উচ্চারণকে অভিনন্দন জানাতে সম্পাদকের নিকট বারীন্দ্রকুমার ঘোষ লেখেন―‘এস, নব-যুগের নবীন মুসলিম, নূতন জগৎ রচনায় ‘জয়তী’র শঙ্খ হাতে নাও।’ অভিনন্দন পত্রটি প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যায় ছাপা হয়।

জয়তীর সমাজসংশ্লিষ্ট রচনাগুলোর বিষয় ভাবনার সঙ্গে পত্রিকাটির সম্পাদকীয় নীতির সাদৃশ্য চোখে পড়ার মতো। আমরা জানি, পত্রিকাটির প্রকাশকালে ভারতবর্ষে স্বাধীনতা আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিল। সেখানে জাতীয়তার প্রশ্নে হিন্দুরা সর্বভারতীয় হয়ে ‘ভারতীয় ন্যাশনাল কংগ্রেস’-এর (১৮৮৯) আহ্বানে ঐকমত্য পোষণ করলেও মুসলমানরা বিশেষ করে বাঙালি মুসলমান সমাজে এ বিষয়ে কোনও স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। ‘মুসলিম লীগ’ও এ বিষয়ে কোনও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হয়। এমতাবস্থায় ভারতীয় জনগোষ্ঠীর বিশেষ করে মুসলমানদের করণীয় নির্ধারণে পরামর্শ নিয়ে এগিয়ে আসেন মাহবুব-উল আলম, আবুল হুসেন, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, হেমন্তকুমার সরকার, শচীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য প্রমুখ লেখক। বিষয়বস্তু ও উদার দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এঁদের রচিত প্রবন্ধগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে।

মাহবুব-উল আলম রচিত ‘রাষ্ট্রীয় সভ্যতার প্রগতি’ শীর্ষক প্রবন্ধটি জয়তী’র প্রথম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। রচনাটিতে লেখক প্রাচীন কাল থেকে বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত ভারতবর্ষের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাজনীতি নিয়ে যুক্তিপূর্ণ আলোচনা করে দেখিয়েছেন যে, ‘ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যের’ উদ্বোধনই পারে একটি জাতিকে তথা ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা এনে দিতেÑ যা আধুনিক যুগ পূর্ব ভারতে ছিল না। কিন্তু ‘পৃথিবীব্যাপী মানুষের একই অখণ্ড অনুভূতির অভাবে’র কারণে রাষ্ট্র এ পথে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই যে ‘অখণ্ড অনুভূতি’ যাকে প্রাবন্ধিক ‘জাতীয়তাবাদ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, তার জয় ঘোষণার পরও তিনি সকলকে সতর্ক করে লিখেছেন―‘যদি ভারতের জাতীয়তাবাদ ব্রিটিশের জাতীয়তাবাদের মূর্তি গ্রহণ করে তাহাতে মানুষের লাভ কী।’

আবুল হুসেন রচিত ‘আমাদের রাজনীতি’ শীর্ষক রচনাটি অবিভক্ত ভারতবর্ষে বাঙালি মুসলমানের রাষ্ট্রচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। প্রবন্ধটি ‘সাহিত্য সমাজে’র পঞ্চম বার্ষিক অধিবেশনে পঠিত হয়। পূর্ববতী রচনার মতো রাজনীতিতে ‘ব্যক্তি’র বিকাশ প্রসঙ্গে মাহবুব-উল আলম প্রদত্ত চিন্তা-দর্শনের সঙ্গে আবুল হুসেনের ‘জাগ্রত ব্যক্তিত্বে’র মিল রয়েছে। এ সময় পর্বে মুসলিম লীগ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার অব্যাহত রাখলেও ‘দ্বি-জাতি তত্ত্বে’র কোনও পূর্বাভাস না থাকায় সচেতন মুসলমান সমাজ তখনও সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদে আস্থাশীল। আবুল হুসেনও তার ব্যতিক্রম নন। তিনি লিখেছেন―“বর্তমান ভারতে মুসলমানের রাজনীতি বা হিন্দুর রাজনীতি বা মুসলমান রাষ্ট্র বা হিন্দু রাষ্ট্র বলে কোনো কথা হতেই পারে না। অতএব, ‘আমাদের রাজনীতি’ বলতে বুঝতে হবে―ভারতের কোলে যাঁরা জন্মেছেন বা আশ্রয় নিয়েছেন তাঁদের ‘রাজনীতি’।” কিন্তু এ পথের ‘প্রধান অন্তরায় হচ্ছে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ। এ বিরোধের উৎপত্তি মূলত ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠিত রাজনীতি।’ তিনি আরও লিখেছেন :

‘সাহিত্য-সমাজে’র তরুণ বন্ধুদের নিকট আমার নিবেদন এই যে, রাষ্ট্রীয় অধিকার মানুষের বড় অধিকার, সে অধিকারকে সার্থক ও চরিতার্থ করতে না পারলে মানব জীবনের কোনো সাধনাই সাফল্যমণ্ডিত হয় না, কাজেই সে অধিকারকে আয়ত্ত করবার সাধনার চেয়ে কোনো সাধনাই মহত্তর হতে পারে না।

প্রথম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘হিন্দু-মুসলমান সমস্যা’ শীর্ষক অপর রচনায়ও ডা. শ্রীভূপেন্দ্রনাথ দত্ত সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতি ও স্বাধীনতার প্রশ্নে ‘এক-জাতীয়ত্বে’র ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। যেখানে কোনও ধর্ম-সম্প্রদায় বিভাজন থাকবে না। থাকবে কেবল ‘একদল শিক্ষিত লোক যাঁহারা নিরপেক্ষভাবে ভারতের ইতিহাসকে পাঠ করিবেন ও করাইবেন। তাহা হইলে উভয় সম্প্রদায়ের মিলন সহজ হইবে।’

আধুনিক ভারতে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধের কাল থেকে বাংলা সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতার চাষ শুরু হয়। কিন্তু স্বাধীনতাকামী ভারতবর্ষের প্রশ্নে, হিন্দু-মুসলমানের মিলনের প্রশ্নে প্রসঙ্গটি গুরুত্ব দিয়ে ভেবে দেখা দরকার পড়ে। রচিত হয় অসংখ্য সাহিত্যকর্ম। কেননা সাহিত্য-শিল্প চিরন্তনের সাধনাক্ষেত্র। এখানে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার কোনও স্থান নেই। অর্থাৎ লেখক মুসলমান না হিন্দু, সাহিত্যে চিত্রিত সমাজ ও ভাষা বিশেষ সম্প্রদায়ের অনুকূলে যায় কি নাÑ তা নির্ণয় করে সাহিত্যকর্ম মূল্যায়ন করা অর্থহীন। অথচ আমাদের সাহিত্য বিচারে এ ত্রুটিও প্রশংসিত হচ্ছে। ফলস্বরূপ আমাদের সমাজচিন্তায় ও রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। বিষয়টি স্মরণে রেখে জয়তীতে লিখেছিলেন কাজী আনোয়ারুল কাদীর, কাজী মোতাহার হোসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, আবদুল কাদির প্রমুখ ‘সাহিত্য-সমাজ’ভুক্ত লেখক-চিন্তাবিদ। আনোয়ারুল কাদীর লিখেছেন:

হিন্দু-মুসলমান সমস্যা ক্রমেই জটিলতর হয়ে উঠেছে। এই সমস্যা সমাধানের যে সব চেষ্টা হচ্ছে তা বিশেষ সফলতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে না। সব চেষ্টায় এমন ভাবে বিফল হবার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে মনে হয়েছে―এই সংঘর্ষের জন্য সাহিত্যও অনেকখানি দায়ী।

জাতি বা সম্প্রদায়গত ঈর্ষা জিনিসটি কারও কারও পক্ষে মুখোরচক হতে পারে কিন্তু যে-সাহিত্যের দ্বারা কোনোরূপ বিরোধ সৃষ্টি হয় সে সাহিত্যের অন্য অনেক গুণ থাকা সত্ত্বেও দেশের কল্যাণ হিসাবে তার মূল্য খুব বেশি নয়। সাহিত্যে ব্যক্তিগত বা সম্প্রদায়গত গাল-মন্দ বা কোনোরূপ অশ্লীলতা রুচি ও বিচারবুদ্ধি সম্বন্ধে সন্দেহই জাগিয়ে দেয়।… এর জন্য প্রকৃত সত্যসন্ধ উদার মানবপ্রেমিক সাহিত্যিকের আবির্ভাব চাই। (সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা) 

তাঁর মতে, বাংলা সাহিত্যে চরিত্র সৃষ্টিতে ও সাহিত্য সমালোচনায় মুসলমানের প্রতি অবিচার করা হয়েছে, এবং তাতে করে যে প্রেমের অভাবের পরিচয় দেওয়া হয়েছে তা যে হিন্দু-মুসলমান বিরোধের জন্য কিছুটা দায়ী সে বিষয়ে কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের কালে এই হিংসার পথ পরিহার করতে না পারলে আমাদের জন্য দেশের কল্যাণচিন্তা করা হবে অলীক বস্তুর মতো। অন্যদিকে মুসলমান হয়তো অনেক বিষয়ে রুচি বিকারের পরিচয় দিচ্ছে। তাকেও শুধরাতে হবে। যদি না শুধরায় তবে তা হবে তার জন্য দুর্ভাগ্য। সৎ সাহিত্য সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি লিখেছেন:

বর্তমানকালে সাম্প্রদায়িকতা, হিন্দু-মুসলমান, একথাগুলিকে বাদ না দিলে সৎসাহিত্য ঠিক মতো গড়ে উঠবে না। সাহিত্যিক এসব সম্বন্ধে আচ্ছন্ন দৃষ্টি নিয়ে কোনো শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি সম্ভব করে তুলতে পারবেন না।

হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ, পড়শির প্রতি অবিশ্বাস, অপ্রেম, এত বড় দুর্ভাগ্য থেকে মুক্তির চেষ্টা করা সবার দরকার। প্রার্থনা―ভগবান যেন এই দুর্ভাগা দেশকে চির লাঞ্ছনা থেকে মুক্তি দিয়ে সত্য ও প্রেম, জ্ঞান ও কল্যাণের দিকে অগ্রসর হবার মতো শক্তি দেন, হিন্দু মুসলমান সবাই যেন পূর্ণ প্রস্ফুটিত মানুষ হতে সক্ষম হয়। (সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা)

সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা চাষের বিরোধিতা করে আবদুল ওদুদের লেখা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ হলো―‘বাংলা সাহিত্যে জাতীয়তার আদর্শ’। রচনাটি জয়তী’র দ্বিতীয় বর্ষ চতুর্থ-ষষ্ঠ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। আবদুল ওদুদের মতে, সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তি ও অতীতের মোহ ত্যাগই পারে আমাদের সাহিত্যের গতিপথ তৈরি করতে। প্রবন্ধটিতে তিনি লিখেছেন:

সত্যকার জাতীয় জীবনের উদ্দেশ্যে দুটি কর্ম ও চিন্তাধারার কথা সহজেই মনে পড়ে―প্রথমটি, হিন্দু-মুসলমান সমস্যার সমাধান চেষ্টা, দ্বিতীয়টি, জাতীয় জীবন সুনিশ্চিত অর্থনেতিক ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত করা।… আর প্রাচীনত্বের অভিমান নয়, সত্যাশ্রয়ের প্রয়োজনই আমাদের জন্য অত্যন্ত বেশি―আমাদের সাহিত্য, বীর্যবন্ত জাতীয় জীবন, সব ক্ষেত্রেই।

উপর্যুক্ত বিষয়াদি ছাড়াও জগৎ ও জীবনের বিচিত্র বিষয় নিয়ে জয়তীতে প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। জয়তী দীর্ঘ জীবন লাভ করেনি। কারণ―আর্থিক সামর্থ্যরে অভাব। অধিকাংশ বাংলা সাময়িকপত্রের জীবন এভাবেই শেষ হয়। তবু আমরা বলতে পারি যে, পত্রিকাটির সম্পাদক বিশ শতকের প্রথমার্ধে নবজাগরণের যে বাণী আত্মস্থ করেছিলেন তার যথার্থ ধারক হয়েছিল জয়তী। তাই আজ প্রায় শতবর্ষ পরে জয়তী ও এর সম্পাদক আবদুল কাদিরকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।      

তথ্যনির্দেশ ও টীকা

১. মুসলমান-মানসে ‘সাহিত্য-সমিতি’র প্রভাব অবদান এতটাই ব্যাপক হয় যে, প্রতিষ্ঠানটির জীবনকাল দুটি পর্যায়ে বিভক্ত না করলে সংগঠনটির অবদান মূল্যায়ন করা সহজ হবে না। এক. প্রতিষ্ঠার পর থেকে ‘লাহোর প্রস্তাব’ (১৯৪০) পর্যন্ত এবং দুই. উক্ত প্রস্তাব অনুযায়ী দেশভাগ অবধি। উল্লেখ্য, ১৯১৯ সালে এ.কে. ফজলুল হক (১৮৭৩-১৯৬২), সৈয়দ নাসিম আলী (১৮৮৭-১৯৪৬), আমিনুর রহমান প্রমুখ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ‘সাহিত্য-সমিতি’তে যোগ দেন। সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধীরে ধীরে সমিতিরও চারিত্র্য বদল হতে থাকে। এবং তা সম্পন্ন হয় ‘লাহোর প্রস্তাব’ পাসের মধ্য দিয়ে। এরপর অর্থাৎ দ্বিতীয় পর্যায়ে অন্যান্য অধিকাংশের মতো সমিতির নেতৃবৃন্দও দেশভাগের পক্ষে অবস্থান নেন। ফলে রাজনীতিতে সাময়িকভাবে স্বাতন্ত্র্যবাদীদের জয় হয়। কিন্তু সচেতন সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক কর্মীরা এ ফাঁদে পা দেননি।

২. ‘তরুণপত্র’, আবদুল কাদির সম্পাদিত আবুল হুসেন রচনাবলী (পরিশিষ্ট), বর্ণমিছিল, ১৯৭৬

৩. ‘কয়েকটি স্বল্পায়ু পত্রিকা সম্পর্কে’, সমকাল, শ্রাবণ ১৩৬৮, পৃ. ৯৫২

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button