আর্কাইভপ্রচ্ছদ রচনা

আহমদ রফিকের কবিতা

প্রচ্ছদ রচনা : ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক―আবার পড়ি : তাঁর কবিতা

স্মৃতি নয় অসংখ্য মিনার

স্মৃতি নয়, অসংখ্য শিকড়

অথবা শিকড় নয় অসংখ্য মিনার

দেহের ধমনী শিরা স্নায়ুতন্তু পেশির স্থাপত্যে

এঁকে তোলে

সত্তার নির্মেঘ ছবি

দিগি¦জয়ী বর্ণমালা,

হিরণ¥য় চেতনার হরিৎ উত্তাপে

পরিমুক্ত প্রাণের আশ্বাস।

প্রতিটি মিনার যেন দূরান্তের হাতছানি

কিংবা স্বেদক্লান্তিজয়ী সুদীর্ঘ যাত্রার

রৌদ্র-জ্যোৎস্না-ঝড়-বৃষ্টি-নির্বিচার

অনিন্দ্য সঞ্চয়ী দিন, পোড়-খাওয়া

মুগ্ধ ভালোবাসা।

আমাদের করুণ সংসারে

পাহাড় অথবা নদী দীর্ঘশ্বাস ফেলে

দেয় না শুকাতে ভেজা কলাপাতা শাড়ি

কিংবা গামছার কানি

অনন্য সম্পদ।

ঘুম নয়,

ঘুমগ্ন সত্তার পাটভাঙা আঁশটে শরীরে

গোমতি কি ইছামতি জন্ম দেবে

পাড়ে পাড়ে

কোমল সরের মতো ভাসমান নীলাভ পলির

তরঙ্গিত গ্রাম।

আমরা উড়াব আজ ভোরের শিশির―

বাতাসে সুঠাম এক চৈতন্যের ঘুড়ি―

প্রতিটি সকাল সভ্যতার নয়া উপহার,

প্রতিটি জীবন পথচলা পৃথিবীর

শ্রম-স্বেদ-রক্তমাখা

সময় ও সাহসের

উষ্ণ পরিণয়-লব্ধ নিটোল ভুবন।

উদাসীন পৃথিবীটা

আমাদের মহাপৃথিবীটা

বড়ো উদাসীন রয়ে গেল―

পরাক্রান্ত প্রেম জীবনকে, ধরিত্রীকে

পূর্ণতায় ফলবান করতে পারেনি।

আবিসিনিয়ার মরুতীরে ‘লুসি’

কিংবা টেমসের তীরে নামহীন আদিম তরুণী

সঙ্গী অথবা খাদ্যের আশায়

কত যে হেঁটেছে কেউ হিসাব জানে না।

রোদে জলে ক্ষুধাতৃষ্ণা অস্তিত্বের অশেষ যাত্রায়

পায়ে পায়ে আকাশ ছুঁয়েছে,

মৃত্যুভয় পাথুরে যন্ত্রণা

নিত্যসঙ্গী। তবু ক্ষান্তিহীন

সেই যাত্রা কখনও বা শেষ যাত্রা

ইতিহাস, কালের ফসিল।

অন্তহীন সেই সব ক্ষুধাতৃষ্ণা নয়

বরং নিষ্প্রাণ কিছু ফসিল নিয়ে আমাদের সন্ধানী আগ্রহ

ইতিহাস উত্তেজনা

বাস্তবিক প্রাগৈতিহাসিক।

একা, একাকী

প্রতিটি মানুষ তার চেতনায়

বড় একা। কেউ বোঝে, কেউ বোঝে না।

বন্ধু স্বজন পরিবার, তবু

একাকিত্ব ঘোচে না কখনও।

যেমন নদীর নিঃসঙ্গ চলা

আপন মনে একা সারাবেলা

মিশে যেতে চায় সাগরের স্রোতে

একাকিত্ব শেষ করে দিতে।

সময়ের মুঠো থেকে

মানুষই সময়কে এক

সুনির্দিষ্ট মাত্রায় বেঁধেছে

তবুও আমরা সেই সময়ের হাতে বন্দি

অনিচ্ছায়।

আমাদের ইচ্ছাগুলো

সময়ের অন্তহীন স্রোতে

পাড়ি দিতে চায়,

কার টানে কোথায় পৌঁছাবে

কোন শূন্যে অজানায়

সেসব না জেনে।

তবু একদিন

সময়ের মুঠো থেকে মুক্ত মানুষই

জীবনকে, চলমান পৃথিবীকে নতুন মাত্রায়

পৌঁছে দিতে পারে।

দেহের শিকড়ে পাতায়

দেহের শিকড়ে কাণ্ডে সবুজ পাতায়

মাটির সৌগন্ধ খুঁজি, স্পন্দমান

পাঁজরের কঠিন বেষ্টনী

পার হয়ে হৃদয়ের উষ্ণতা ছড়িয়ে

কে যেন চেনার স্বরে অবিরাম ডাকে :

চলে এসো।

সে চেনার সুর স্বর আলোড়িত করে,

ফিরে যাই ঘরভাঙা ঘরের আশ্রয়ে।

প্রতিটি স্নায়ু

স্রোতের প্রবল টানে ভেসে যায়

সবুজ স্বপ্ন আর রক্তিম শিমুল,

জলো বাতাসে তরুণী পৃথিবীর

উত্তেজক ঘ্রাণ

চেতনা মথিত করে। তাকে কাছে পাবার ইচ্ছায়

দেহকোষে ঝড়ের সঞ্চার।

নদীর প্রতিটি ধস-নামা বাঁকে

মানুষের ভিড় চেয়ে থাকে

কোন ঘাট ধরে এরা এগিয়ে চলবে,

ওদের চোখে মুখে প্রত্যাশার দীপ্তি

প্রতিটি স্নায়ুর মূল আবেগে স্পন্দিত।

বিপ্লব ফেরারি, তবু

‘আলো চাই, বড় প্রয়োজন’

আপ্তবাক্য শুনেছি অনেক।

জন্মান্ধ সময় ঘিরে অসুস্থ মনন

হেসে খেলে প্রথাসিদ্ধ রঙিন স্তবকে

বিলাসী বর্ষণ আনে আবহ বার্তার।

উদভ্রান্ত সমকাল নিজেকে চেনে না।

অথবা অতীব চেনা, হয়তো বা তাই

নির্ভুল অঙ্কের

চতুর হিসাবে সব বাতিল ঘোষণা।

আদর্শ সততা প্রেম মূল্যবোধ নিলামে চড়েছে

দুর্মূল্যে আকাশ-ছোঁয়া। কি নেবে দু হাতে

মমতার যত্নে মুড়ে?

বরং বীক্ষণী চোখে উল্টে যাও কীটদষ্ট পাতা

হয়তো পেতেও পারো অশনি সংকেত।

আপাতত বিপ্লব ফেরারি, তবু এ মাটির একক সুপণ্য

বেনামী বন্দরে একা জেগে আছে

প্রত্যাশার বিনিদ্র আশ্রয়ে।

সে হবে নিশ্চিত এক সাধের ঘরণী

জীবনের ধুলোকাদামাটি নিয়ে

শ্রমসিক্ত সময়ের দক্ষ বিনিময়ে।

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button