গল্প : ফেরা না ফেরার গল্প : অরূপ তালুকদার

বিশখালী নদী থেকে একটা খাল শুরু হয়ে চলে গেছে একেবারে ভেতরের দিকে। গ্রামের পর গ্রাম ছাড়িয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে শেষ পর্যন্ত মিশেছে গিয়ে ঘুরে যাওয়া নদীর কাছে আর একটা বড় খালে। তারপর নদীতে।

খালের দু’পাশের গ্রামগুলোতে গড়ে উঠেছে জনপদ। ছোটবড় বাড়িঘর। তার মধ্যে ছন দিয়ে ছাওয়া ছোট বা মাঝারি ঘরবাড়ি যেমন আছে তেমনি আছে টিনের দোতলা বাড়ি। সামনে বেশ বড় উঠান। তাতে ফাল্গুন চৈত্র মাসে মই ফেলে ধান তোলা হয়। শামিয়ানা টানিয়ে উৎসবও চলে মাঝে মাঝে। সত্তর দশক বা তার আগে এসব গ্রামাঞ্চলের চেহারা এমনই ছিল।

খালটা যেখান থেকে শুরু হয়েছে তার বাঁ-পাশে বন্দর ও পাশে নদী। সেখানে নদীতীরে দিনের বেলা যাত্রীবাহী ছোট ছোট লঞ্চ থামে দু’তিন বার। পাশাপাশি নৌকার যাতায়াত তো আছেই। খালের ভেতরে লঞ্চ ঢোকে না। বন্দরে সপ্তাহে দু’দিন শনি মঙ্গলবার হাট বসে। লোকজন ভালোই আসা যাওয়া করে। দোকানপাটও আছে বেশকিছু। তবে সন্ধ্যার পরে সব সুনসান হয়ে যায়। কারণ ঐসব অজপাড়াগাঁয় তখন বিদ্যুৎ যায়নি। সব বাড়িঘরে সন্ধ্যার পরে জ্বলে কুপিবাতি, কোনও কোনও বাড়িতে হারিকেন।

নদীতীরের ঐ হাট বসা বন্দরটা ছাড়াও আরেকটা ছোট বাজার বসার জায়গা আছে আরও কিছুটা ভেতরের গ্রামের দিকে। সেখানে আট-দশটা ছোটখাটো দোকানপাট আছে। আছে কিছু ফাঁকা জায়গা মেঠোপথের দু’ধারে, সেখানে বাজারের দিন গ্রামের মানুষ বাড়ির গাছ থেকে পেড়ে কিছু নারকেল সুপারি আর ক্ষেতের তরিতরকারি নিয়ে এসে বেচাকেনা করে।

সন্ধ্যার পরে সব অন্ধকার। দোকানপাটের ঝাঁপ ফেলে বাড়ি চলে যায় দোকানিরাও।

পাশের খালটায় নৌকা চলে প্রায় সারা দিনরাত। কোনও ভয়-ডর নেই। প্রায় সবার বাড়ির ঘাটে বাঁধা থাকে নৌকা। চলাচলের সবচেয়ে বড় অবলম্বন।

খালের এপার থেকে ওপারে যাতায়াতের জন্য আছে বাঁশের সাঁকো। পাঁচ-ছ’টা মোটা বাঁশ পাশাপাশি জোড়া দিয়ে হাঁটার ব্যবস্থা। দু’পাশে উঁচু করে বাঁশের হাতল বাঁধা। খালের এপাশে ওপাশে দু’গ্রামের সীমানা। বাঁ-পাশে লতাবুজিয়া, ওপাশে মৌডুবি।

একাত্তরের জুলাই মাস। মাঝে মাঝে এবার বৃষ্টি হচ্ছে বেশ। তাতে কাদামাখা রাস্তাঘাট আর শুকায় না। তার মধ্য দিয়েই মানুষের চলাফেরার বিরাম নেই।

খালেও প্রচুর জল। জোয়ারের সময় তা আরও ফুলে ফেঁপে ওঠে। জোয়ার-ভাটায় বাড়ে স্রোতের টান।

২৫ মার্চে ঢাকায় যে নারকীয় ঘটনা ঘটল তার খবর এখানে পৌঁছাতে লাগল প্রায় দশ-বারো দিন। এর আগে যে উড়ো উড়ো খবর এসেছে তাতে তেমন গা করেনি কেউ। বিশদ জানা গেল যখন বিশ্রস্ত অবস্থায় মকবুল এলো বাড়িতে। সে এসে পাক সেনাদের নির্বিচারে রাতের অন্ধকারের মানুষ মারা আর ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার বর্ণনা দিল। ভূতে পাওয়া মানুষের মতো পাগল পাগল অবস্থায় নিজের জীবন বাঁচিয়ে আসার কথা যখন সবাইকে বলল মকবুল তখন যারা শুনছিল তারা আতঙ্কে একেবারে অস্থির হয়ে গেল। তারপর একান ওকান হয়ে নানাভাবে সে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল সারা গ্রামে।

এর পরে আর বেশি সময় লাগল না। মানুষের মুখে মুখে ভয়ঙ্কর সব ঘটনার বিবরণ ছড়িয়ে পড়ল সব জায়গায়। মাইল পনেরো দূরে জেলা শহরে আর তার আশপাশের গ্রামগুলোতে ঢাকা আর তার কাছাকাছি স্থানগুলো থেকে প্রচুর মানুষ চলে এল পালিয়ে, কোনওভাবে জীবন বাজি রেখে।

আট-দশ দিন যেতে না যেতেই গাঁ-গেরামের চেহারাটাই যেন পাল্টে গেল। সারা দিনরাত মানুষ ঘুর ঘুর করতে লাগল এবাড়ি ওবাড়ি আর নদীতীরের সেই বাজার এলাকায়। সেখানেই সব খবর পাওয়া যায় নৌকার মাঝি আর লঞ্চে আসা-যাওয়া করা প্যাসেঞ্জারদের কাছ থেকে। যে যার মতো খবর দিচ্ছে এখন এর ওর কাছে তাতে মানুষের ভয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।

দু-তিন দিনের মধ্যেই কিছু দূরের শিববাড়িয়ায় ঘটল ভয়ানক ঘটনা। মাইল তিনেক দূরে বেশ বড় এই বন্দর এলাকায় ঢাকা থেকে আসা এক পাকিস্তানপন্থি দালাল পাক-সেনাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে এসে এক নারকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে ফেলল। একদিন আর একরাতে মানুষ মেরে ফেলল জনাচল্লিশেক। প্রচুর ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিল। লুটপাট হয়ে গেল ছোটবড় বেশকিছু দোকানপাট। তাদের সহায়তা দিল স্থানীয়ভাবে ইতোমধ্যে গজিয়ে ওঠা কিছু রাজাকার। তাদের অত্যাচারে বন্দরের ওপর ও তার আশপাশের মানুষজন জীবন নিয়ে পালিয়ে গেল যে যেদিকে পারল। দু’দিনে সব যেন বিরানভূমিতে পরিণত হলো। পুড়তে থাকা ঘরবাড়ির আগুনের লেলিহান শিখা আর ধোঁয়ার কুণ্ডলি বহুদূর থেকে দেখা গেল।

এর ভেতরে আরও ঘটনা ঘটল। কেউ এসে খবর দিল শিববাড়িয়ার কিছু দূরে যে বিশাল ফলের বাগান সেখানে এসে আস্তানা গেড়েছে সর্বহারারা। দক্ষিণাঞ্চলের বেশকিছু স্থানে তখন সর্বহারাদের খুব দাপট। সে খবরও মিলিটারির কাছে পৌঁছে গেছে। সেখানেও তারা আক্রমণ চালাবার জন্য ইতোমধ্যেই প্রচুর গাছপালা কেটে ফেলে চারপাশ পরিষ্কার করে ফেলেছে। তবে তার মধ্যেও সর্বহারাদের বেশির ভাগই রাতের অন্ধকারে টার্গেট এরিয়ার বাইরে চলে গেল। ফলে মিলিটারির আক্রমণ যখন হলো দু’দিক দিয়ে তখন অনেককেই পাওয়া গেল না। মারা পড়ল গ্রামের কয়েকজন নিরীহ মানুষ। আর চার সর্বহারা।

সর্বহারাদের মূল টার্গেট ছিল রাজাকাররা। সর্বহারা যে গ্রামে ঢুকত, পরে দেখা যেত, সে গ্রামের রাজাকাররা রাতে আর বেরোয় না সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি থেকে জোর করে হাঁস-মুরগি-গরু-ছাগল ইত্যাদি নিয়ে যাওয়ার জন্য। কখনও কখনও মহিলাদের ওপর নির্যাতনও চালাত তারা সুযোগ বুঝে। সেসবও বন্ধ হলো সাময়িকভাবে।

এই অবস্থায় লতাবুনিয়া ও তার আশপাশের গ্রামগুলোর মানুষের রাতের ঘুম আর দিনের স্বস্তি চলে গেল। মাঠের কাজেও কেউ আর মন বসাতে পারছে না। শুধু ভয়। কোথা থেকে মিলিটারি চলে আসবে। ইতিমধ্যে রাজাকার বাহিনীও তৈরি হয়ে গেছে। নদীতীরের বন্দর এলাকাতে তাদের ডেরা। ফলে ওদিকে নিরীহ গ্রামবাসীরা ভয়ে আর যায়ই না। তিন-চারজনকে সেখান থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর ভয় আরও বেড়েছে। সারা গ্রামাঞ্চলজুড়ে থমথমে অবস্থা। রাস্তাঘাটে রাজাকারদের চলাফেরা আর দাপট। সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বের হয় না। কম বয়সি ছেলে আর যুবকরা পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। রাতে মেয়েরা বাড়িতে না থেকে থাকে জঙ্গলে।

এ রকম পরিবেশের মধ্যেই বৃষ্টি মাথায় করে হঠাৎ একদিন পারভেজ চলে এল বাড়িতে। বাবা-মা-বোনরা আগেই চলে এসেছিল। সবে কলেজে ভর্তি হওয়া ছোট ভাইটা এসেছিল তার দু’দিন পরে।

পারভেজের বাড়িতে ফিরে আসা ছিল অনেকটা অভাবিত ঘটনা। পারভেজ নিজে অন্তত সেটাই ভাবে। কারণ এই সময়ে, সেই বরিশাল থেকে যেভাবে সে এসেছে সেটা ভাবতে গেলে গায়ে এখনও কাঁটা দেয়। দু’বার তো পথের মধ্যে প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে এসেছে। ধরা পড়লে আর ফিরতে পারত না।

শহরে বেশ পরিচিত মুখ পারভেজের। নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে থাকে তার উজ্জ্বল উপস্থিতি। সেহেতু শহরে মিলিটারি ওঠার দু’দিনের মধ্যেই তার নাম উঠে গেছে ‘গাদ্দার’-এর তালিকায়। আর এটা জানার  পর থেকেই পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল পারভেজ। শেষ পর্যন্ত নানা কৌশলে বিপদের মধ্য দিয়ে শহর ছেড়ে শহরতলি তারপর গ্রামে পাড়ি দিয়েছে। ঝালকাঠিতে এসে কিছুদিন ছিল সর্বহারাদের সঙ্গে। পেয়ারাবাগানেও ছিল কয়েকদিন। তারপর চেহারা আর পোশাক টোশাক বদলে আবার শহরে গিয়েছিল। কিন্তু ততদিনে শহর আর শহরতলির অবস্থা আরও বেহাল হয়ে গিয়েছে। এখানে সেখানে চেকপোস্ট বসেছে। সেখানে মিলিটারি জোয়ানদের সঙ্গে থাকছে দেশি রাজাকাররা। তাদের চোখ ফাঁকি দেওয়া কষ্ট।

পারভেজের সঙ্গী-সাথীরাও প্রাণের ভয়ে যে যার পথ দেখেছে। দু’তিনজন গেছে কামালদের সঙ্গে নৌকায় সুন্দরবনের দিকে। গন্তব্য ওপারে, সেখান থেকে কিছু অস্ত্রশস্ত্র আর রসদ সংগ্রহ করে আবার ফিরে আসবে সুন্দরবন এলাকায়। রাজাকার নিধন হবে প্রথমে। এদিকে শহরের লোকজন কমে গেছে। যে যেভাবে পারছে পালিয়ে যাচ্ছে গ্রামের দিকে। সন্ধ্যার পরে একেবারে অন্ধকারে ঢাকা ভূতুড়ে শহর।

এই পরিস্থিতিতে কখন ধরা পড়ে যায় পারভেজ সেই ভয়েই শেষ পর্যন্ত গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিন-চার দিন কখনও নৌকায়, কখনও পায়ে হেঁটে মহাবিপদের মধ্য দিয়ে পৌঁছে গেছে মা-বাবার কাছে।

রাতে অন্ধকারের মধ্যে জলঝড় মাথায় নিয়ে ঘরে ঢুকতেই একেবারে কান্নায় ভেঙে পড়ল সবাই। সবার মুখে নানা প্রশ্ন, কেমন করে আসতে পারলে এর মধ্যে ? ওদিকের অবস্থান কেমন, মিলিটারিরা এখনও কি মানুষ মারছে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে ? পারভেজ বুদ্ধি করে সব প্রশ্নের উত্তর একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দিল। পুরো সত্যিকার অবস্থাটা বললে সবার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ভয়ানক আতঙ্ক দেখা দেবে। তবে পারভেজ নিজে ঠিক বুঝতে পারে, এখানেও বেশি দিন সুস্থে থাকা যাবে না। মিলিটারি না এলেও রাজাকারের বাচ্চারা শান্তিতে থাকতে দেবে না।

একসময় পারভেজের ধারণাটাই সত্য হলো। দু’তিন দিনের মধ্যেই পারভেজের বাড়ি আসার খবরটা এ-কান ও-কান হয়ে জায়গামতো পৌঁছে গেল।

সতর্ক হয়ে গেল পারভেজ। বিপদ এখন যে কোনও সময়ে যে কোনও দিক দিয়ে আসতে পারে। দিনের বেলা ঘরের বাইরে আর বেরোয় না। রাতে কখনও থাকে এ-বাড়িতে কখনও বা পাশের বাড়ির রহমত চাচার ঘরে। তবে রাতের ঘুম তেমন আর হয় না। প্রথম রাতে কিছুটা ঘুমালেও মাঝরাতের পর জেগেই থাকে আর প্রস্তুত থাকে কোনও বিপদ এলে পালিয়ে যাবার রাস্তা খোলা রেখে।

এর মধ্যে একরাতে একটা ছোট্ট ঘটনা ঘটল। পারভেজকে খুঁজতে এলো কেউ। দরজায় টুক টুক করে কেউ শব্দ করল যেন। এমনি মনে হলো প্রথমে। ঘরের ভেতরে একটা হ্যারিকেন জ্বলছিল, সেটাকে আড়ালে নেয়া হলো। ওদিকে পারভেজ পেছনের দরজা দিয়ে বাইরে চলে যাবার জন্য প্রস্তুত হলো।

আবারও টুক টুক করে শব্দ হলো বারান্দার দরজায়। পারভেজের আব্বা ওদেরকে ঘরের ভেতর দিকে যেতে বলে দরজার পাশের জানালাটা একটু খুলে বাইরে তাকালেন।

অস্ফুট স্বরে প্রশ্ন করলেন, কে ?

রাতের আকাশে মেঘের আনাগোনা। টিপ টিপ করে বৃষ্টিও পড়ছে কি না, বোঝা গেল না।

খোলা জানালার সামনে কেউ মুখ বাড়াল যেন। আলোছায়ার মধ্যে কারুর অস্ফুট গলা শোনা গেল, পারভেজ ভাই!

জানালার আরেকটা পাল্লা আস্তে খুলে দিলেন পারভেজের আব্বা। তারপর আরেকটু ঝুঁকে বললেন, কে ?

পারভেজ ভাই, আমি শাহনেওয়াজ … দরজা খোলেন, কথা আছে।

পারভেজের আব্বা জানালার পাশ দিয়ে সরে ভেতরে চলে গেলেন। পারভেজকে ডেকে বললেন, তোমাকেই ডাকছে শাহনেওয়াজ নামের কেউ।

এত ভয় পেলে চলবে না। মনে মনে সাহস সঞ্চয় করে জানালার কাছে চলে এল পারভেজ। মুখ বাড়িয়ে দৃষ্টি দিল বাইরে।

কে কথা বলছ!

আমি পারভেজ ভাই, শাহনেওয়াজ। পেয়ারাবাগানের।

শাহনেওয়াজ!… একটু পরে চিনতে পেরে বলল, তোমরা ক’জন এসেছ ?

আমি একা―

ঠিক আছে, দাঁড়াও―

আধো অন্ধকারের মধ্যে দরজা খুলে দিল পারভেজ। ভেতরে ঢুকল শাহনেওয়াজ। সর্বহারা দলের সদস্য। পরনে ওদের সেই কালো প্যান্ট আর কালো জামা। বাইরে বোধহয় বৃষ্টি হচ্ছে। দূর থেকে আসা হ্যারিকেনের আবছা আলোয় কিছুটা ভেজা মনে হচ্ছে। বারান্দার একপাশে রাখা একটা বেঞ্চের পাশের চেয়ারটাকে দেখিয়ে পারভেজ বলল, বসো ওখানে―

পায়ের জুতো ভেজা, সেটার দিকে একবার তাকিয়ে শাহনেওয়াজ বসল গিয়ে চেয়ারে। বসার সময় কোমরে একটু চাপ দিয়ে সোজা হয়ে বসল।

পারভেজ বুঝতে পারল কোমরে গোঁজা আছে আগ্নেয়াস্ত্র।

তারপর বলো, কী বলতে চাইছ―

পারভেজ তাকালো শাহনেওয়াজের দিকে।

শাহনেওয়াজও তাকিয়ে ছিল পারভেজের দিকেই। বলল, আপনাকে সাবধান করতে এলাম। জানেন কিনা জানি না, আপনাদের এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জেলা পিস কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন।

লতিফুর রহমান!

হ্যাঁ। তিনি আজ বন্দরের রাজাকার কমান্ডার কাশেমকে বলে দিয়েছেন আপনাকে ধরে নিয়ে যাবার জন্য।

তুমি জানলে কী করে ?

বন্দরে আমাদের লোক আছে। সে-ই খবর দিয়েছে। দু’এক দিনের মধ্যেই আপনাকে ধরে নিয়ে যাবার চেষ্টা চালানো হবে।

তোমরা এদিকে ক’জন আছ ?

আমরা আটজনের গ্রুপে আছি। আট ন’দিন হয় এদিকে এসেছি।

তোমাদের টার্গেট কি ?

আপাতত দু’টাকে খতম করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই দুটোই সবচাইতে বেশি অত্যাচার চালাচ্ছে এই এলাকায়। ওরা দলবল নিয়ে ক’দিন আগে বন্দরের আশপাশ থেকে তিনজনকে চালান করে দিয়েছে জেলা ক্যাম্পে। দোকানদার আলতাফের বাড়ি থেকে তার বউকে তুলে নিয়ে গেছে। দোকানটাকে ভেঙেচুরে ফেলে দিয়েছে নদীতে। এটা গত মঙ্গলবারের ঘটনা। তারপর থেকে সব দোকানপাট বন্ধ করে সবাই পালিয়ে গেছে।

হঠাৎ আলতাফের ওপর ওরা ক্ষেপল কেন ?

পারভেজের কথা শেষ হতেই শাহনেওয়াজ বলে ওঠে, কাশেম পুরনো শত্রুতা উদ্ধার করছে।

তা-ই হবে হয়ত, পারভেজ বলে, এখন তো এইসব করারই সময়।

শাহনেওয়াজ বলে, শুধু এসবই নয়। এখন যে এখানে সেখানে ডাকাতি হচ্ছে, লুটপাট হচ্ছে, মাঝে মাঝে নারী নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটছে সবই সুযোগমতো করে নিচ্ছে এইসব জানোয়ারগুলো। কেউ কিছু বলতে পারছে না। সবাই মিলিটারি আর রাজাকারদের ভয়ে কুঁকড়ে আছে। ইচ্ছে থাকলেও সব ছেড়েছুড়ে দূরে পালাতেও পারছে না।

তুমি ঠিকই বলেছ―পারভেজ বলে, এভাবে আর কতদিন চলবে কে জানে!

কথার ফাঁকে পারভেজের আব্বা এক হাতে একটা থালায় কিছু খাবার আর আরেক হাতে একটা গ্লাস নিয়ে এসে পারভেজের হাতে দিয়ে বললেন, ওকে দাও―

পারভেজ উঠে খাবারের থালা আর জলের গ্লাস শাহনেওয়াজের হাতে দেয়, নাও, বেশি সময় নষ্ট করো না―

থালা হাতে নিয়ে শাহনেওয়াজ আস্তে বলে, পারভেজ ভাই, আপনার সিদ্ধান্ত কি ? এখানেই থাকবেন নাকি আসবেন আমাদের সঙ্গে ?

তোমাদের অবস্থাটা এখন কেমন ? পরবর্তী স্টেপ কী ? সবার সঙ্গে কি যোগাযোগ আছে ?

না। তেমন যোগাযোগ নেই কারুর সঙ্গে। পেয়ারাবাগানের তিন-চারজন আর ফিরে আসেনি। প্রথম অ্যামবুশেই শেষ। তিন দিন পরে ডেডবডিও পাইনি।

তার পর ? পারভেজ তাকায় শাহনেওয়াজের দিকে।

জানি না। এখন যে অবস্থা তাতে এই সময়ে সবাইকে ডেকে আবার রি-অর্গানাইজ করা যাবে কি না, সে ব্যাপারে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তবু চেষ্টা করব একবার―

দ্যাখো―পারভেজকে চিন্তিত দেখায়―দ্যাখো, কতটা কি করতে পারো―

পারভেজ ভাই―আপনি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দেননি।

বলছি। একটু থামে, তারপর বলে, এভাবে থাকব না। কিছু একটা করতে হবে। তোমাদের সঙ্গেও যোগাযোগ থাকবে।

পারভেজের ভাই সোহেল বোধহয় কাছাকাছি ছিল, আসলে সে শাহনেওয়াজের কথা শুনছিল ঘরের বেড়ার ওপাশে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ সে বাইরে বেরিয়ে আসে। তারপর শাহনেওয়াজের দিকে তাকিয়ে বলে, আমি যাব আপনাদের সাথে। এভাবে আর থাকতে পারছি না। কিছু একটা করতে চাই।

শাহনেওয়াজ একটু চমকে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। কী বলবে বুঝতে পারে না।

পারভেজ বলে, আমার ছোট ভাই।

শাহনেওয়াজের মুখে একটু হাসি ফোটে। বেশ কিছুটা সময় সে তাকিয়ে থাকে সোহেলের দিকে।

কি হয়েছিল কে জানে! সে রাতেই শাহনেওয়াজের সঙ্গে সামান্য কিছু জিনিসপত্র নিয়ে চলে গেল সোহেল। মা-বাবা, ভাই-বোনের কারুর কথাই শুনল না সে। পারভেজও তাকে কিছু বোঝাতে পারল না। মা-বোন অনেক কান্নাকাটি করল। কিন্তু ফেরানো গেল না সোহেলকে।

প্রকৃতপক্ষে শুরুটা বোধহয় এখান থেকেই হলো। এর পরে যে ঘটনাটি ঘটল মাত্র আরেকটা রাত পরে তাতে গ্রামশুদ্ধ যেন তোলপাড় হয়ে গেল।

খাল পারাপারের বাঁশের সাঁকোটার লতাবুনিয়ার দিকে হাতলের সঙ্গে ঝোলানো ডেডবডি পাওয়া গেল রাজাকার কাশেমের। একেবারে ভোরবেলা।

জানা গেল, রাতের অন্ধকারে তাকে কয়েকজন কালো পোশাক পরা সশস্ত্র মানুষ, যাদের মুখ ছিল গামছার মতো কাপড় দিয়ে ঢাকা, অস্ত্রের মুখে ধরে নিয়ে যায় একটা মাঠের মধ্যে তারপর প্রথমে পিটিয়ে পরে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। কাশেমের সঙ্গে যে ছিল তাকেও বেদম মারধর করা হয়েছে। তবে গুলি করার আগে এমনভাবে কান্নাকাটি করেছে যে শেষ পর্যন্ত তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

পরের দিন সে-ই বলেছে এই ঘটনার কথা। তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে হাসপাতালে। তার চোখমুখ থেকে আতঙ্ক তখনও কাটেনি।

ভোরের দিকে দু’চারজন কাশেমের ঝোলানো মৃতদেহ দেখে খবর দিযেছে অন্যান্যদেরকে। সবচাইতে আশ্চর্য বিষয় আরেকটা ছিল―কাশেমের রক্তাক্ত জামার সাথে বুকের ওপর একটা কাগজ ঝুলছিল, তাতে লেখা ছিল : ‘কেউ স্পর্শ করবে না। রাজাকারের মৃত্যু এভাবেই হবে―।’ এ লেখা দেখে সবাই দূরে সরে গেছে। কাছেই যায়নি।

ঘণ্টাখানেক পরে বাড়িতে বসেই  খবরটা পেয়ে গেল পারভেজ। পরিষ্কার বুঝতে পারল, এবার তার পালাবার সময় হয়ে গেছে। এখন পুলিশ আসবে। মিলিটারিও আসতে পারে আজ-কালের মধ্যে।

পারভেজ দ্রুত গুছিয়ে নিল নিজের কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছোট্ট একটা ব্যাগে।

মা-বাবা-বোন সবাই মিলে এবার কান্নাকাটি করছিল। কিন্তু ওর পালাবার ব্যাপারে কেউ বাধা দিচ্ছিল না। কেননা, তারাও মনে মনে চাচ্ছিল পারভেজ এখান থেকে অন্য কোথাও চলে যাক। কিন্তু কারুর মন মানছিল না ছেড়ে দিতে।

দুপুরের পরে আকাশ কালো করে মেঘ জমল আকাশে। ধূসর কালো মেঘের চারদিক দিয়ে যেন হঠাৎ অঝোরধারায় নেমে এল বৃষ্টি বিকেল হতে না হতে। সঙ্গে প্রবল ঝড়ো বাতাস।

পারভেজ এই দুর্যোগের সময়টাকেই বেছে নিল ঘর ছেড়ে চলে যাবার জন্য। এ সময়ে রাস্তাঘাটে লোকজন থাকবে না। ওকে কেউ দেখবেও না। বাবা-মা’কে সাবধানে থাকতে বলে একটা ছাতা নিয়ে রাস্তায় নেমে এল পারভেজ অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। ওপরে যতটাই কঠোর নির্লিপ্ত ভাবটা বজায় রাখুক না কেন বুকের ভেতরে যেন কান্না আর দুঃখের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝেই চোখ ভরে যাচ্ছে জলে। সে জল একসময় মিশে যাচ্ছে বৃষ্টির জলের সাথে।

বড় রাস্তায় উঠল না পারভেজ। ধরল বাড়ির পেছন দিকের বাগান আর তারপরে জঙ্গলের পথ। হাঁটতে হাঁটতে বারবার সোহেলের কথা মনে পড়ছিল। এখন সে কোথায় আছে, কে জানে! ওর মতো ছেলেও নিজের মন আর শরীরের ভেতরের টেনশন আর ভয়কে চেপে রাখতে পারেনি। ছিল ঘরের মধ্যে বদ্ধ খাঁচায় বাঘের মতো। তাই সুযোগ পেয়েই কোনো দিকে না তাকিয়ে খাঁচা থেকে বের হতে চেয়েছে শাহনেওয়াজকে পেয়ে।

পারভেজ বুঝতে পারছিল, কিছুদিন ধরে নানাজনের কাছে পাক মিলিটারি আর রাজাকারদের নির্মম অত্যাচারের কথা শুনতে শুনতে সে ভেতরে ভেতরে ফুঁসে উঠছিল আর তৈরি হচ্ছিল সুযোগ পেলেই এদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার বা এদেরকে খতম করার জন্য। তাহলে কি, কাশেম হত্যার সময় সোহেলও ছিল ? এ প্রশ্নটা পারভেজের মাথায় এল হঠাৎ করেই। কারণ ঘটনাটা ঘটেছে ও শাহনেওয়াজের সঙ্গে যাবার পরপরই।

বৃষ্টি একটু ধরে এসেছে। চারিদিকটা এখনও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির কারণে কুয়াশায় মোড়া মনে হয়। এ গ্রাম পার হয়ে যেতে হবে সন্ধ্যার আগেই। তার পরে আপাতত থাকার জায়গার ব্যবস্থা। সেখানে যেতে হবে অন্ধকারে। ঠিকানাটা বলে গিয়েছিল শাহনেওয়াজ। আপাতত সেখানে গেলে ওদের সন্ধান পাওয়া যাবে। পরের ব্যবস্থা পরে হবে।

বিকেলে চলে গেছে পারভেজ। বাড়ির বাবা-মা-বোনসহ আরও তিন-চারজন মানুষ সবাই যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। রাতে আর কারুর খাওয়া দাওয়া হলো না ঠিকভাবে। বাড়িটা যেন শূন্য হয়ে গেছে। চারদিকে একটা দুঃখ আর কষ্টের আবহ ঘুরে বেড়াচ্ছে সবসময়।

মাঝরাত পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। ঘুম ছিল না পারভেজের বাবা-মা কারুর চোখে। কারুর মুখেই কোনও কথা নেই। মাঝে মাঝে বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসছে ওদের অজান্তেই।

শেষ রাতের দিকে তন্দ্রার মতো এসেছিল। হঠাৎ সেটা কেটে গেল কীসের যেন শব্দে। দুঃস্বপ্ন দেখে যেমন হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় তেমন হলো।

পারভেজের আব্বা কী ভেবে উঠে পড়লেন বিছানা ছেড়ে। বাইরে বোধহয় অন্ধকার কেটে গিয়ে ভোরের আবছা আলো ফুটেছে। যদিও ঘরের ভেতরের অন্ধকার কাটেনি। নিঃশব্দে এসে দাঁড়ালেন বারান্দার জানালার পাশে। সেটা পুরো না খুলেও একপাশের এক চিলতে ফাঁক দিয়ে তাকালেন উঠানের দিকে। দেখলেন, উঠানের এপাশে ওপাশে কিছু মানুষ ঘোরাফেরা করছে। কারুর কারুর হাতে লাঠি। আরও কোনও অস্ত্র আছে কিনা বোঝা গেল না। তাদের দু’জন বসে আছে আবার উঠানের মাঝখানে ফেলে রাখা একটা গাছের গুঁড়ির ওপরে।

পারভেজের আব্বা বুঝলেন, ওরা পাহাড়ায় আছে। ভোরের আলো ফুটলেই ঘরে ঢুকবে। হামলাও চালাতে পারে। এর মধ্যে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যাবার কথা ভাবলেন একবার। কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হলো, পেছনেও যে ওদের লোক দাঁড়িয়ে নেই, সেটা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। তাছাড়া দিনের আলোয় পালাবেনই বা কেমন করে সবাইকে নিয়ে ? সেটা কি সম্ভব ? তখন সবকিছু আরও জটিল হয়ে উঠবে।

জানালা ছেড়ে ভেতরে চলে এলেন তিনি। এর মধ্যে উঠে পড়েছেন পারভেজের মা। মেয়েটা ঘুমাচ্ছে পাশের ঘরে। তাকে আর ডাকলেন না বরং তার রুমের দরজাটা বন্ধ করে দিতে গেলে পারভেজের মা বাধা দিলেন। তারপর নিজে ভেতরে ঢুকে গিয়ে একটু পরে আবার বেরিয়ে এলেন। দরজাটা খুলেই রাখলেন। ভেতরে গিয়ে কি করলেন, কে জানে! মেয়েকে হয়ত কিছু বলে এলেন। এর কিছুক্ষণ পরেই দরজা কড়ানাড়ার শব্দ হলো।

পারভেজের আব্বা স্ত্রীর দিকে একবার তাকালেন তারপর আস্তে উঠলেন। দরজার কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলেন, কে ?

দরজা খোলেন।

কেন ?

দরজা খোলেন। কথা আছে।… খোলেন জলদি

দরজায় আরও জোরে শব্দ হলো।

একটু পরে দরজা খুলতেই ভেতরে ঢুকে পড়ল পাঁচ-ছ’জন প্রায় একসঙ্গে।

পারভেজের আব্বার সামনে এসে দাঁড়াল একজন।

আপনের পোলা দুজন কোথায় ? ডাকেন। আমাগো লগে যাওয়া লাগবে।

কেন ?

লিস্টিতে নাম আছে।

ওরা কেউ বাড়িতে নেই।

নাই! ছিল তো! তেমনই তো খবর দিছে―সত্য কথা কন―

সত্যিই বলছি―ওরা কেউ বাড়িতে নেই।

কোথায় গেছে ?

যে কথা বলছিল তার নাম রশিদ। পাশের গ্রামে থাকে। ঐ এলাকার রাজাকার কমান্ডার।

সে আর কথা না বাড়িয়ে হঠাৎ অন্যদের নির্দেশ দিল, খুইজ্যা দ্যাখ্ তো―

সঙ্গে সঙ্গে এঘরে ওঘরে খোঁজাখুঁজি শুরু হলো।

পারভেজের আব্বা মনে মনে মেয়েটার জন্য শঙ্কিত হয়ে উঠলেন। তাকালেন একবার স্ত্রীর দিকে। চোখেমুখে ভয়ের ছায়া। মিনিট পনের দাপাদাপি করে পারভেজের বাবার সামনে আবার এসে দাঁড়াল রশিদ।

বহুত সেয়ান। আগে আগেই ভাগছে দুইওডা। মাইয়াডাও নাই―

রশিদের ক্রুদ্ধ চেহারা ফুটে উঠল তার চোখে মুখে। কথার ভাষাও পাল্টে গেছে। তাইলে―

বেবাক ভাংচুর কইর‌্যা ফালাই, পাশ দিয়ে বলে উঠল আরেকজন, তারপর জ্বালাইয়া দি বাড়িঘর ?

না। এ্যাহন না―

তাইলে, আপনে লন আমাগো লগে। পোলারা আইয়া সারেন্ডার করলে ছাড়া পাইবেন। বলল রশিদ।

আমি কেন যাব ? আমি যাব না―

তাই তো, উনি কেন যাইবেন? পোলারা … কাতরকণ্ঠে বলে উঠলেন পারভেজের মা পাশ থেকে।

হেই রকমই অডার আছে। পোলাগো না পাইলে বাপরে নিয়া আইবা―

এটা কোনও কথা হলো ?

হ, এডাই কতা―তেরিবেড়ি কইরেন না, অ্যামনে না গেলে বাইন্ধা লইয়া যামু―

বাবারা, বোঝার চেষ্টা করো―পারভেজের মা সামনে এগিয়ে এলেন।

বোজাবুজির কিছু নাই, ওই―

পাশের কাউকে ডাকল রশিদ। দড়ি ল’―

ঠিক আছে, কিংকর্তব্যবিমূঢ় পারভেজের আব্বা রশিদের দিকে তাকালেন। বললেন, ঠিক আছে, এখন কোথায় যেতে হবে ?

বন্দরের ক্যাম্পে―

খাটের পাশের আলনার কোনায় ঝোলানো পাঞ্জাবিটা হাতে নিয়ে বললেন, চলো―

বলেই স্ত্রীর দিকে তাকালেন একবার তারপর ঘরের চারিদিকে। মনে মনে ভাবছিলেন মেয়েটার কথা। কোথায় লুকিয়ে আছে, কে জানে! আবার বেরিয়ে না আসে―

পারভেজের মা দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলেন এবার। কেঁদো না সুফিয়া, আল্লাহ চায় তো নিশ্চয়ই ফিরে আসব আমি। সবাই সাবধানে থেকো।…কই চলো―

বলতে বলতে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলেন। বাইরে এসেই আর দাঁড়ালেন না সোজা হাঁটা ধরলেন বড় রাস্তার দিকে। তার দু’পাশে আর পেছনে রশিদ রাজাকারের দল।

চারিদিক ঘিরে একটা অস্থির আতঙ্ক বিরাজ করছে। রাত দিন কখন আসে আর যায়, কেউ যেন টের পায় না। মাঝে মাঝেই বৃষ্টি হচ্ছে, মেঘে আকাশ ছেয়ে থাকছে। তার মধ্যেই মানুষ চলাফেরা করছে। কেউ কাউকে এখন আর বিশ্বাস করে না। বাজার এলাকার দোকানপাট সব বন্ধ। লঞ্চ চলাচলও বন্ধ হয়ে গেছে। রাতের অন্ধকারে মানুষ চলাচল করছে নৌকায়।

বাজারে ক্যাম্প বসেছে। তার ধারকাছ দিয়ে কোনো মানুষ চলাফেরা করে না। মাঠেও কাজ করছে না কেউ। সব মিলিয়ে একটা অস্বাভাবিক পরিবেশ যেন লতাবুনিয়া আর তার আশপাশের গ্রামগুলিকে গ্রাস করে ফেলেছে।

পারভেজের আব্বাকে যেদিন ধরে নিয়ে গেল রশিদের দল সেদিন আশপাশের মানুষ একেবারে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। ভয়ে কে কোথায় গেল বোঝা গেল না।

কিন্তু তার পরের দিন রাতে ঘটল  একটা অলৌকিক ঘটনা। শেষ রাতের দিকে সারা গায়ে জলকাদা মাখা বিস্রস্ত অবস্থায় কোনও রকমে বাড়িতে ফিরে এলেন পারভেজের আব্বা। বাড়ির সবাই তখনও শোকগ্রস্ত। নির্ঘুম কাটে রাত। ভয়ে আর দুশ্চিন্তায় সবাই আধমরা প্রায়।

স্বামীকে চোখের সামনে দেখেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না পারভেজের মা। মেয়ে কান্না ভুলে তাকিয়ে আছে বোবার মতো।

ঘরে ঢুকে কিছুটা আত্মস্থ হয়ে সবাইকে তাড়া দিলেন। আধঘণ্টা সময়, এখান থেকে পালাতে হবে সবাইকে। নাহলে সবার কপালে দুঃখ আছে। কেউ বাঁচব না আমরা।

পারভেজের মা মিনিটখানেক স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেলেন অন্যদিকে। যাবার সময় মেয়েকে বলে গেলেন, তোর আব্বাকে কিছু খেতে দে। তারপর একটু গুছিয়ে নে, শুনলি তো আধঘণ্টার মধ্যেই পালাতে হবে এখান থেকে। আমি আসছি। বলতে বলতে দোতলায় চলে গেলেন তিনি। হয়তো যতটুকু পারবেন এই সময়ের মধ্যে তাড়াহুড়ো করে গুছিয়ে নেবেন।

সবার মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন উঠে আসছে, আবার কবে ফিরে আসতে পারব এই বাড়িতে ? নাকি এই বিদায়ই হবে চিরজনমের বিদায়! এই মাতৃভূমিতে আর কোনো দিনই ফিরে আসতে পারব না―এই কথাটা মনে হতেই বুকের ভেতর থেকে কান্নার দমক উঠে আসতে চাইছে বারবার। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে বাধভাঙ্গা চোখের জলে।

সময় চলে যাচ্ছে। এটা-ওটা গোছাতে গোছাতে অতি সংক্ষেপে সব ঘটনার কথা বলছিলেন পারভেজের আব্বা। সংক্ষেপে যা এই রকম : তাকে নিয়ে গিয়ে হাত বেঁধে একটা চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয় বন্দরের ক্যাম্পে। পাহারায় রাখা হয় এক অবাঙালি সিপাহি আর স্থানীয় চৌকিদারকে। তারপর রশিদ তার দলবল নিয়ে আবার কোন্ এক অপারেশনে বেরিয়ে যায়। যাবার আগে বলে যায়, বিকালে স্যারেরা আসলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আপাতত উনি এভাবেই থাকবেন। খাবার দাবারের কিছু ব্যবস্থা হবে দুপুরে।

কিন্তু সেই দুপুর হতে হতে রীতিমতো দুর্বল হয়ে পড়লেন পারভেজের আব্বা। চৌকিদারকে ইশারা করলেন একবার কাছে আসতে। প্রথমে কিছুটা দোনামোনা করে পরে এলো। তাকে কাছে পেয়ে বললেন, আমার পকেট থেকে টাকা নিয়ে কিছু খাবার কিনে আনো।

একবার সিপাইটার দিকে তাকিয়ে পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে বেশকিছু টাকা তুলে নিয়ে বাইরে গিয়ে একটা রুটি নিয়ে এলো। রুটিটা দিয়ে চৌকিদার বাকি টাকা নিজের পকেটে রেখে দিল।

চৌকিদারের টাকা নেয়া দেখে সিপাইটা খপ করে তার হাতটা ধরে ফেলল। তারপর চোখ গরম করে সেই টাকা চাইল। চৌকিদার কোনো কথা না বলে পকেট থেকে কিছু টাকা তুলে দিয়ে দিল সিপাইটাকে। সিপাই তার হাত ছেড়ে দিয়ে টাকা নিয়ে নিল। চৌকিদার রাগ করে বাইরে চলে গেল কাউকে কিছু না বলে। এই সুযোগটাই নিলেন পারভেজের আব্বা। একসময় সিপাইটাকে ইশারায় কাছে ডেকে বাংলা উর্দু মিশিয়ে বললেন যে সে ভালো খাবার আর পানি ইত্যাদি এনে দিলে তাকে অনেক টাকা দেবেন। বাড়িতে টাকা আছে, ঘণ্টা দু’য়েকের জন্য ছেড়ে দিলে সে টাকা উনি নিয়ে আসতে পারবেন। এ কথা শুনে সিপাইটার চোখ লোভে চকচক করে উঠল। বলল, আভি নেহি, রাতমে।

পারভেজের আব্বা বললেন, বিকালমে তো তোমহারা স্যার আযায়গা।

নেহি। স্যার কাল আয়েগা। রাতমে নেহি আতা―

আউর কোই তো রহেগা―

হাম দেখ লেঙ্গে। ভাগায়গা সব শালেকো―

বিকেলের দিকে রশিদ আর তার দলবল এল। ক্যাম্পে কোনও গোলমাল নেই দেখে সবাই মিলে নেশাভাং করে হৈহুল্লোড় করল সন্ধ্যা পর্যন্ত। সন্ধ্যার পরে রাত নামতেই তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে ছুটল। বোঝা গেল বেশি রাত পর্যন্ত নিজের বাড়ির বাইরে থাকতে চাইছে না কেউ। কিছু একটা ভয়ের ব্যাপার আছে, সেটা ওদের কথাবার্তা থেকেই বোঝা গেল। যাবার আগে রশিদ সিপাইটাকে সতর্ক করে দিয়ে গেল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেও, বাড়ি ফেরার আগে সে জানে না যে, তার সাক্ষাৎ মৃত্যু ওত পেতে আছে তার বাড়ির কাছের আমবাগানের ভেতরের রাস্তায়। কাল ভোরে আমগাছে পাওয়া যাবে তার ঝুলন্ত লাশ।

এদিকে মাঝরাতের দিকে বৃষ্টি শুরু হলো আবার। সঙ্গে প্রবল হাওয়া। এর মধ্যেই পারভেজের আব্বাকে ছেড়ে দেয়া হলো। বলা হলো, সময় দু’ঘণ্টা, তার মধ্যেই চলে আসতে হবে। পারভেজের আব্বা হ্যাঁসূচক মাথা দুলিয়ে বেরিয়ে এলেন ক্যাম্পের বাইরে। তারপর দ্রুত পায়ে চলে এলেন বাড়ির দিকে। তবে খুব সাবধানে এগোলেন যাতে কারুর সঙ্গে পথে আবার দেখা না হয়ে যায়। দেখা হলেই ঝামেলা বাধার সম্ভাবনা থাকবে।

ক্যাম্প থেকে ফিরে আসার গল্পটা শেষ করেই পারভেজের আব্বা আধঘণ্টা হতে না হতেই আবার চাপা গলায় তাড়া লাগালেন সবাইকে দেরি না করার জন্য।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে মাইল দু’য়েক গিয়ে এ গ্রাম ছাড়িয়ে আরেক গ্রামে গিয়ে উঠতে হবে এক আত্মীয়ের বাড়িতে। তারপর যা হয় হবে। রাতের মধ্যে ছাড়িয়ে যেতে হবে এই গ্রাম।

ভাগ্য বোধহয় এখন কিছুটা সাহায্য করছে, এমনি মনে হলো ওদের সবার। কারণ মাঝরাতের বৃষ্টিবাদল আর হাওয়ার দাপট আস্তে আস্তে কমে গেছে। এখনও আকাশে যদিও মেঘ জমে আছে, কিন্তু বৃষ্টি নেই। কাদামাখা মেঠোপথ আর কোথাও কোথাও উঁচু-নিচু ভাঙাচোরা হেরিংবন্ডের রাস্তা দিয়ে প্রাণভয়ে ভীত পলায়মান তিনটি প্রাণী যেভাবে পড়িমরি করে নিজ গ্রামের সীমানা পার হয়ে এতদূর চলে এসেছে তা হয়তো কিছুতেই সম্ভব হতো না যদি দুর্যোগময় ঝড়বাদলের রাত হতো।

এক গ্রামের সীমানা ছেড়ে অন্য গ্রাম শুরু হচ্ছে। মাঝখানে বৃষ্টি আর জোয়ারে ডোবা ভরা খালের জলে থৈ থৈ আদিগন্ত জোড়া মাঠ। মাঝখান দিয়ে দূরে মিলিয়ে যাওয়া মাটির রাস্তা। আধো আলো ছায়ামাখা অন্ধকারে সেই পথ ধরে অনেকটাই হাঁটা হয়েছে। আর যেন পারছিলেন না পারভেজের আম্মা সুফিয়া বেগম। মেয়ে ফাতিমার অবস্থাও কাহিল। আর পারভেজের আব্বা আনিস সাহেব তো অজানা ভয় আর ত্রাসের মধ্যে হাঁটছিলেন, বলা যায়, শুধু মনের জোরে। কিন্তু শরীরে ঠিক কুলাচ্ছিল না।

এদিকে ভোর হয়ে এসেছে। ধীরে ধীরে অন্ধকার কেটে যাচ্ছে। মহাজাগতিক রশ্মি ছড়িয়ে পড়েছে চরাচর জুড়ে। সূর্য এখনও ওঠেনি। একসময় দূর গ্রামের দিকে চলে যাওয়া রাস্তাটার একপাশে ঝড়ে পড়ে যাওয়া একটা গাছের ওপর অবসন্নের মতো বসে পড়লেন সুফিয়া বেগম। একটু পরে ফাতিমাও। কিছু দূরের গাছ গাছালির পাতার ফাঁকে দু’য়েকটা পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ শোনা গেল। ভোর হচ্ছে।

শরীরের কষ্টটা একটু লাঘব হতেই বাবা-মা’র মন জুড়ে চলে এল দুই সন্তানের চিন্তা। এখন তারা কোথায় কীভাবে আছে, কে জানে! এসব চিন্তা মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতেই বুক ঠেলে গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। যেন পাথর চাপা শোকের আবহ বেরুবার পথ পেল একটু। ফাতিমা বসে আছে মাথা নিচু করে। এলোমেলো চুলের গোছা মুখমণ্ডল প্রায় ঢেকে দিয়েছে। এর সঙ্গে আবার যোগ হয়েছে বাড়িঘরের চিন্তা। কে জানে, হয়তো বাড়িঘর এবার লুটপাট করে ছত্রখান করে দেবে সব। এতদিনের সাজানো সংসার তছনছ হয়ে যাবে। তারপর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেবে। বিরানভূমিতে পরিণত হবে সবকিছু।

অনিশ্চিত গন্তব্যে যাত্রা করে নানা দুশ্চিন্তায় বেশ কিছুটা সময় আনমনা হয়েই রাস্তার ওপর দাঁড়িয়েছিলেন পারভেজের আব্বা। সময় ঠিক পাচ্ছিলেন না। তবে সকাল হতে যে আর বেশি দেরি নেই সেটা বুঝতে পারছিলেন। আরও ভাবছিলেন অন্ধকার থাকতে থাকতেই, লোক চলাচল শুরু হবার আগেই পৌঁছাতে হবে ওই গ্রামের বাড়িতে। এ এলাকাতেও কোনও বিপদ আছে কি না, সে চিন্তাটাও মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছিল মনের মধ্যে।

হঠাৎ একসময় লক্ষ্য করলেন আকাশের একদিকে লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে। বুঝলেন সূর্য উঠছে, সকাল হতে আর বেশি দেরি নেই।

কিছুটা সন্ত্রস্ত হয়েই যেন তাড়া দিলেন বসে থাকা মা-মেয়েকে, আরে, তাড়াতাড়ি চল। সময় নেই

শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে মেয়ের হাত ধরে উঠে দাঁড়ালেন সুফিয়া বেগম।

এত কি চিন্তা করছ! পারভেজের আব্বা যেন অভয় দিলেন, যা হবার হবে। ভয় করে আর কি হবে ? ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধে গেছে, তারা বসে থাকবে না। এইসব জালিমদের কবল থেকে এ দেশের মানুষ একদিন মুক্ত হবে। আর আমরা ফিরি আর নাই ফিরি, বাঁচি আর না-ই বাঁচি দেখো, এ দেশ একদিন স্বাধীন হবেই।

একটু সময়ের জন্য থমকে দাঁড়ান সুফিয়া বেগম, তাকান একবার স্বামীর মুখের দিকে, তারপর মেয়ের হাত শক্ত করে ধরে এগিয়ে যান সামনের দিকে।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares