বইকথা : মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস রক্তে আঁকা ভোর : শরিফুল হাসান

একটা উপন্যাস পড়তে গিয়ে কতবার কাঁদা যায় ? এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস রক্তে আঁকা ভোর পড়তে গিয়ে আমি কতবার কেঁদেছি বলে শেষ করতে পারব না। এটি তো শুধু উপন্যাস নয়, এটি তো মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া এই বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস। সব মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অসাধারণ এক উপন্যাস রক্তে আঁকা ভোর।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের মধ্যরাত থেকে ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় এবং এরপর ১৯৭২ সালের বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ ফেরার পুরো সময়টা এই উপন্যাসে উঠে এসেছে ছবির মতো। 

উপন্যাসের শুরুটা ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাক বাহিনীর গণহত্যার চিত্র যেমন ফুটে উঠেছে তেমনি ঢাকা, চট্টগ্রামসহ নানা স্থানে সশস্ত্র প্রতিরোধের কথাও উঠে এসেছে। এরপর তাজউদ্দিন আহমেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারত চলে যাওয়া, ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠন, খন্দকার মোশতাকের ষড়যন্ত্রসহ প্রবাসী সরকারের নানামুখী তৎপরতার কথা উঠে এসেছে পুরো উপন্যাসে।

আবার মাওলানা ভাসানী থেকে শুরু করে ছাত্রনেতাদের ভূমিকা, তাজউদ্দিন আহমেদকে বারবার চ্যালেঞ্জ করা, সেনাপ্রধান ওসমানী থেকে শুরু করে সেক্টর কমান্ডারদের ভূমিকাও বাদ যায়নি। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিচক্ষণতা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, হেনরি কিসিঞ্জার, পারমাণবিক অস্ত্রবাহী মার্কিন সপ্তম নৌবহর, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা রাশিয়ার ভূমিকা, প্রবাসী বাংলাদেশিদের নানা তৎপরতা সবই আছে উপন্যাসে।

মুক্তিযুদ্ধের এই পুরো সময়টায় পাকিস্তানের জেলখানায় বঙ্গবন্ধুর প্রহসনের বিচার করে ফাঁসির চেষ্টা চলছে, ওদিকে বেগম মুজিব আর হাসিনা-রেহানার বন্দিজীবনের কথাও উঠে এসেছে দারুণভাবে। আবার পাক বাহিনীর বর্বরতা, ইয়াহিয়া-নিয়াজীর ভূমিকা, কোটি শরণার্থীর জীবন, ভারতজুড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, দেশের ভেতরে ঢুকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসী সব অভিযান, মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় বাহিনী নিয়ে মিত্রবাহিনী গঠন, ঢাকামুখী যৌথ অভিযান, পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণ, ১৬ ডিসেম্বরে আমাদের বিজয়, জেলখানা থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন; সব মিলিয়ে পড়তে পড়তে মনে হয়েছে চোখের সামনে আমাদের পুরো মুক্তিযুদ্ধটা দেখছি।

আসলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এমন অসাধারণ উপন্যাস খুব কমই পড়েছি। ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনে বইটা হাতে নিয়েছিলাম। এরপর গত সপ্তায় যখনি ঢাকার বাইরে কোথাও যেতাম আমার হাতে থাকত বইটা। পথ চলতে চলতে পড়তাম। পড়তে পড়তে কাঁদতাম। বিশেষ করে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের শহিদ হওয়ার ঘটনা, অপারেশন জ্যাকপট, ১৭ এপ্রিল প্রবাসী সরকারের শপথ, আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি এমন অনেক বর্ণনায় কোনওভাবেই চোখের পানি থামাতে পারতাম না। কখনও আমার সহকর্মীরা, কখনও গাড়ির চালক ভাই অবাক চোখে আমার কান্না দেখত।

বিশেষ করে মুজিবনগরের আম্রকাননে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের বর্ণনা পড়ে বহুক্ষণ কেদেঁছিলাম। কী অসাধারণ বর্ণনা। ‘আমার সোনার বাংলা’ জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে সৈয়দ নজরুল-তাজউদ্দীন থেকে শুরু করে মুক্তিপাগল সব মানুষ কাঁদছে। বিদেশি সাংবাদিকরা কলকাতার বাঙালি সাংবাদিকদের জিজ্ঞেস করলেন, সবাই কাঁদছে কেন ? কলকাতার বাঙালি সাংবাদিক বললেন, ওরা ওদের জাতীয় সঙ্গীত গাইছে। জাতীয় সঙ্গীত গাইবার সময় কাঁদতে হবে কেন ? এটা তুমি বুঝবে না, এটা কেবল বাঙালিরাই বুঝতে পারে! এই বলে কলকাতার বাঙালি সাংবাদিক নিজেই চোখ মুছতে লাগলেন। এই কথাগুলো যতবার পড়ি, এমনকি এই যে এখন লিখছি সেই লিখতে লিখতেও কাঁদছি। মনে হচ্ছিল এই আমিও সেখানে উপস্থিত। আমিও কাঁদছি। আমিও শপথ নিচ্ছি।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যাদের আগ্রহ আছে তারা বইটা পড়তে পারেন। আসলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার ভীষণ রকমের আবেগ আছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাই যে কোনও লেখা হোক সেটা উপন্যাস কিংবা ইতিহাস আমার পড়তে খুব ভালো লাগে। আমার নিজের সংগ্রহে যত বই আছে তার একটা বড় অংশজুড়ে আছে মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু আমার মনে হতো, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বড় ক্যানভাসে আরও লেখালেখি হওয়া উচিত। বিশেষ করে পূর্ব পশ্চিমের মতো।

১৯৪৭ এর দেশ বিভাগ থেকে শুরু করে সেই সময়টা দারুণভাবে পূর্ব পশ্চিম উপন্যাসে তুলে ধরেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। পূর্ব পশ্চিম, সেই সময় এগুলো পড়ার সময় ভাবতাম, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এমন অসংখ্য গল্প-উপন্যাস হতে পারে। রক্তে আঁকা ভোর আমার তেমনই একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের উপন্যাস মনে হয়েছে। পড়তে পড়তে মনে হবে আপনি অনেক কিছুই জানেন আবার অনেক কিছুই নতুন করে জানছেন, একের পর এক যোগ করে একটা বড় ছবি আঁকছেন। আর এখানেই লেখকের কৃতিত্ব।

ও হ্যাঁ, রক্তে আঁকা ভোর এর লেখক আনিসুল হক। লেখক আনিসুল হক সম্পর্কে আমার খুব বেশি বলার নেই। ১২ বছর প্রথম আলোয় একসঙ্গে কাজ করেছি। আমার খুব পছন্দের মানুষ। লেখক আনিসুল হক আমার যেমন প্রিয় তাঁর চেয়েও বেশি প্রিয় হাসিখুশি আনিসুল হকের ভেতরের মানুষটা।

মুক্তিযুদ্ধের ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য শহিদ আজাদ ও তাঁর মায়ের জীবনের সত্য ঘটনা নিয়ে রচিত তাঁর মর্মস্পর্শী উপন্যাস মা। আমি মনে করি এই অসাধারণ উপন্যাসের জন্যই আনিসুল হককে সারাজীবন ভালোবাসা যায়।

এরপর আনিসুল হক ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পুরো সময়টা লেখার চেষ্টা করছেন ছয়টি উপন্যাসে। শুরু করেছিলেন যারা ভোর এনেছিল লিখে। ২০১১ সালে এটি প্রকাশিত হয়। তখুনি পড়েছিলাম। যতদূর মনে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আম গাছে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী দিয়ে শুরু হয়েছিল উপন্যাসটা। এরপর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের ইতিহাসের দারুণ সব বর্ণনা। পড়তে বেশ ভালো লেগেছিল। এরপর ঊষার দুয়ারে, আলো আঁধারের যাত্রী, এই পথে আলো জ্বেলে, এখানে থেমো না, পরপর ছয়টা বই লিখেছেন তিনি। এই সিরিজের সর্বশেষ বই রক্তে আঁকা ভোর।

রক্তে আঁকা ভোর উপন্যাসটি প্রকাশ করেছে প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা। প্রচ্ছদ করেছেন সব্যসাচী হাজরা। গত বছরের সেপ্টেম্বরে বইটি প্রকাশ করা হয়েছে।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares