গল্প : পুতলা : আনিস রহমান

এরপরও কী কোনও শ্রদ্ধা থাকে কিংবা ভালোবাসা। এরপরও কি সম্পর্কের গভীরে কোনও অলংকার থাকে, নাকি থাকতে পারে ? এরপরও কি বলা যায় এ সম্পর্ক বেলি ফুলের মালায় জড়িয়ে থাকুক।

এক নিঃশ্বাসে এতগুলো ভাবনা রীতিমতো গ্রাস করে নেয় সৌম্যকে। কথাগুলো যেমন-তেমন, কিন্তু প্রীতির ভাবনার যে নেংটো প্রকাশ দেখেছে আজ সৌম্য, তাতে প্রীতিকে আর মানুষ মনে হচ্ছে না কেন যেন। মনে হচ্ছে একতাল মাংসপিণ্ড বৈ ও আর কিছুই নয়। একখণ্ড পাথরও বলতে পারত কিন্তু পাথরেরও নিজস্ব কিছু সৌন্দর্য আছে। পাথরের বুকে হয়ত ফুল ফোটে না। কিন্তু ফুলের বাগানে পাথরের বর্ণিল আয়োজন সৌন্দর্যের ভিড়ে ভিন্ন এক মাত্রা জুড়ে দেয়। সে পাথর যদি হয় রঙ করা কারুকার্যময়, নানা নকশাখচিত, তখন চোখ জুড়িয়ে যায়, মন হয় মুগ্ধ। তাহলে কি আর পাথর বলা যায় প্রীতিকে ? বরং একতাল মাংসপিণ্ড বলাই সঙ্গত। শরীরে মাংসের আধিক্য যেমনি দৃষ্টিকে কদর্য করে তোলে। তেমনি মাংস পচে গেলে জঘন্য দুর্গন্ধ ছড়ায়। বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। তাতে থিকথিকে পোকা বাসা বাঁধে। কাক-কুকুর আর শকুনের ভাগাড়ে ওর ঠাঁই হয়। ওরা খুবলে খুবলে খায় সে পচা মাংস। বিশেষ করে শকুন যেভাবে লাশের চোখ ঠুকরে ঠুকরে একমনে সাবাড় করে দেয়, সে এক বীভৎস দৃশ্য বটে। তখন হৃদয়হীন প্রীতিকে আজ শুধু মাংসপিণ্ড নয়, একতাল পচা মাংস বলেই মনে হচ্ছে সৌম্যের।

তবে কী জ্যোতিষের কথাই আবার ফলে যাচ্ছে না তো!     

জায়গাটি বড্ড প্রিয় ছিল সৌম্যের। দিনভর আড্ডা হতো ওখানটায়। চারদিকে নারকেল গাছের সারি। ঝুমঝুম শব্দ উঠছে শুকনো পাতার ভিড়ে। যেন পাতারা কাঁদছে। এছাড়া কোনও শব্দ নেই। শুনশান নীরবতা শুধু। এরই মাঝখানে একটি জলাধার মানে জলের ট্যাংক। অনেক পুরোনো। এবং অনেক উঁচু। ব্রিটিশ যুগে তৈরি। সেখানে বানরের রাজ্যি। পুরুষ বানর, মাদি বানর, বাচ্চা বানর। শুধু বানর আর বানর। সে সঙ্গে কবুতরের পাখসাট। ছাদে-কার্নিশে, গাছের ডালে, বাড়ির দেয়ালে, মাটির চাতালে, ঘাসের ভিড়ে। চারদিকে কেবলই কবুতর। ষাঁড়ের মতো এসব বানর আর কবুতরের কোনও খোয়াড় নেই। নেই কোনও অভিভাবক। সরকারি জায়গা। সরকারি গাছের নারকেল খেয়ে দিব্যি কেটে যায় বানরগুলোর।

পায়রাগুলো এ ডাল ও ডাল করে। কখনও এ-দেয়ালে, ও-দেয়াল না হয় কারও বাড়ির ছাদের কার্নিশে বসে বসে দিব্যি সময় কাটিয়ে দেয়। কখনও চড়া রোদ্দুর মাথায় নিয়ে ট্যাংকের ছায়ায় এসে বসে। খুব বেশি ক্লান্তি না-এলে ওদের এমনি ওড়াউড়ি চলতেই থাকে। তবে কখনও ক্লান্তি এলে কোথাও বসে পড়ে থপ করে। মুহূর্তেই পাখার ভিড়ে মুখ ডুবিয়ে ঝিমোতে থাকে। কখনও ধ্যানী-মৌনী ভাব নিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। কোথায় যেন অদৃশ্যে কোনও অবয়ব তাকে দেখছে। না-হয় ডাকছে। অবয়বটি বিমূর্ত। চেনা-অচেনার মাঝখানে। ফলে পায়রার চোখে খানিক বিস্ময়ও বুঝি লুকিয়ে থাকে। এমনি সময়ে ঝুমঝুম করে বাতাস যখন মাথা কোটে পাতাদের ভিড়ে তখন সৌম্যও তা উপভোগ করে বিভোর হয়ে। সঙ্গে শীতল, নাদিম, বাচ্চু, রিন্টু এমনি আরও কজন বন্ধু থাকে। ছায়া ছায়া এ ট্যাংকের নিচেই ওদের আড্ডা। একদিনও নাগা নেই। দেরি নেই। রোদ ধরে এলেই এখানে চলে আসে। এক বিকেলে ওদের সঙ্গে এক আগন্তুক এল। উশকোখুশকো চুল। অনেকদিন তেল-জল পড়েনি বোধ হয়। পাঞ্জাবি গায়ে। পায়ে রাবারের চপ্পল। কাঁধে খদ্দরের কাপড়ের এক ঝোলা। তাতে কিছু বই। সংবাদপত্র সাময়িকী, আর কিছু পাথর রাখা আছে। লোকটি পেশায় জ্যোতিষ। রিন্টুর আত্মীয়। বয়সেও অনেক তফাৎ। কিন্তু এ শাস্ত্রের প্রতি আগ্রহ আছে জেনে ওর সঙ্গে সম্পর্কটি রিংকুরও ঠিক বন্ধুর মতো। অনেকদিন থেকেই ওরা খুব কাছের। দেখা হলে দিনভর কেবলই আলাপ জ্যোতিষ শাস্ত্র নিয়ে।

সৌম্য রিংকু ওরা যখন নবম শ্রেণিতে পড়ে, জ্যোতিষ মহাশয় তখন চল্লিশ পেরিয়েছেন সবে। বয়েস কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি ওদের সম্পর্কের মাঝখানে। তাই বয়েসের ফারাক থাকলেও আনন্দ ভাগাভাগিতে কোনও ফারাক হয়নি, কারও সংগে সম্পর্কেও চিড় ধরেনি কখনও। বছর দশেক হলো তিনি দেহ রেখেছেন। বিদায় নিয়েছেন এ ধরাধাম থেকে। কিন্তু মনের জানালা খুলে প্রায়ই উঁকি দেন তিনি। ফিসফিস করে বলেন, যা বলেছি সব ফলে গেছে না ঠিক ঠিক। যা এখনও বাকি আছে তাও ফলে যাবে দেখিস! মনে আছে তো কী কী বলেছি!

জ্যোতিষ বলেছিল, তুইও একদিন পিএইচডি করবি। বড় চাকরি করবি। লেখালেখি করলেও নাম কুড়াতে পারবি। তারপর ? তারপর ? … জ্যোতিষ অনেকটা সময় চুপ থেকে শেষে বলল, একসময় সংসার থেকে বিতাড়িত হবি। বৈরাগ্য জীবনই তোর শেষ আশ্রয়স্থল। তার আগে অনেক লাঞ্ছনা, গঞ্জনা আছে। লাঠির গুঁতোও আছে। সব সয়ে যেতে হবে। তারপরই ডাক পাবি বৈরাগ্য জীবনের। সে জীবনের নাগপাশ থেকে তোর মুক্তি নেই। ডাক আসবেই! ডাক এলে সাড়া তোকে দিতেই হবে। এ মহাকালের ডাক। দায় এড়াবার কোনও সুযোগ নেই।

ছেলেবেলার কথা তেমন একটা গুরুত্ব দিয়ে কখনও ভেবে দেখেনি। কিন্তু আচমকা যখন ওর ডিগ্রি হয়ে গেল। বড় পদে পদোন্নতিও হয়ে গেল। তখন ফের জ্যোতিষের কথা মনে পড়ে ওর, এ পড়ন্ত জীবনে। তখন ওর ভাবনায় থেকে থেকে কেবল জ্যোতিষের কথা আসে।

না-ভেবেই বা উপায় কী! ওর সব কথাই তো ফলেছে সৌম্যের জীবনে। এখন শুধু মহাকালের ডাকের অপেক্ষায়। সে ডাকও বুঝি এবার আসি আসি করছে। কোনও অন্যথা হবে না। নির্ঘাৎ সে ডাক আসবে। ছাড় দেবে না একটুও। তা না-হলে প্রীতি কেমন করে বলল এ কথা! কদিন থেকে টাকার জন্যে রীতিমতো গলা চেপে ধরেছে প্রীতি। সকালে ঘুম ভাঙতেই টাকা। রাতে শোবার আগেও টাকা। এর বাইরে অন্য কোনও কথা নেই। ভাবনা নেই। প্রসঙ্গ নেই। সঙ্গে ছেলেমেয়েদেরও আস্ফালন। ছেলে তো ফেসবুকে লিখেছে, ‘এ বয়েসেই তুমি আমাদের জীবন সংগ্রামে ঠেলে দিয়েছ। জীবন কতটা আলো আর কালোময় তা আমরা বুঝি। কারণ আমরা স্ট্রাগল করে যাচ্ছি। কালোর মুখোমুখি হচ্ছি বারবার। তুমি আমাদের জীবনকে কঠিন করে তুলেছ। কেড়ে নিয়েছ হাসি-আনন্দ সবকিছুই। আমাদের জীবনে আলো নেই। অন্ধকারই আমাদের জীবন। যা তোমার কাছ থেকে পাওয়া এক অনন্য উপহার। আমাদের কাছে জীবন অন্ধকারময় হলেও তোমার মতো স্বার্থপর বাবার চোখে জীবনটা কেবলই রঙিন। বড্ড স্বপ্নময়। তুমি বাবা নামের …।’

এসব সংঘাতের শুরু আসলে একটি ফ্ল্যাট কেনাকে কেন্দ্র করে। নিজের মতো সাজাবে। নিজের মতো গোছাবে। রঙ দেবে। দরোজায় পলিশ দেবে। অনেকদিনের লালিত সব স্বপ্নকে হাতে ধরে ঘরে তুলবে। সে জন্যেই নিজেদের একটি আশ্রয় না হলেই আর নয়। একটু ঠাঁই। নিজেদের একটা ছাদ।

আসলে মেয়েটার কথাই ভীষণ মনে ধরেছে সৌম্যের। একদিন খাবার টেবিলে কথায় কথায় গল্পচ্ছলে ও বলল, বাবা, আমার সব বন্ধুরাই নিজেদের ফ্ল্যাটে থাকে। ওরা যার যার ঘর নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছে। সেসব ঘরে গেলে স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হয়। অথচ আমাদের ঘরে একটা পেরেক লাগাতে গেলেও বাড়িওয়ালার অনুমতি নিতে হয়। কদিন বাদেই তো বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বলবে। অথচ বাবার বাড়িতে নিজের মতো করে একটা ঘর সাজাতে পারলাম না। কথার ফাঁকে ফাঁকে মুখে খাবার তুলে দিচ্ছিল আর এক মনে ওর কথাগুলো বলে যাচ্ছিল মেঘেলা। সৌম্য আর প্রীতির মধ্যে শুধু চোখাচোখি হলো এক পলক। কিন্তু কোনও কথা বলল না কেউ। যেন মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

কথাটা যে একদম ঠিক তা তো অস্বীকারের কোনও জো নেই। সুতরাং এ নিয়ে আর কথা বলে লাভ নেই। বরং মেয়ের আক্ষেপ মর্মে মর্মে ব্যথা ছড়ালো মুহূর্তেই।

প্রীতির এতক্ষণ যেন তর সইছিল না। রুমে এসেই মুখ খুলল, মেয়ে আমাদের কদিন এঘরে আছে। আর একটা সেমিস্টার শেষ হলেই ওর অনার্স শেষ হয়ে যাবে। এরপরেই তো অন্যের ঘরে চলে যাবে।

মেয়ের বিয়ে বুঝি ঠিক করে ফেলেছ। দাঁত খিলাল করার ফাঁকে প্রীতিকে জিজ্ঞেস করল সৌম্য।

বিয়ে ঠিক করব কী! কত ছেলের মা যে মুখিয়ে আছে। আমি একটু হ্যাঁ করলেই প্রস্তাব পাঠাবে চোখমুখ বন্ধ করে।

তাহলে তো সমস্যা বেশ প্রকট, ভাবে সৌম্য।

মেয়ে একটা আবদার করেছে তা না মিটিয়েই ওকে অন্যের ঘরে পাঠাই কী করে। বুকে বড্ড জ্বলুনি হচ্ছে টের পায় সৌম্য। কিন্তু পথ খুঁজে পায় না। চোখেমুখে অন্ধকার দেখে। কিন্তু মাথা থেকে পোকাটা কোনওভাবেই নামাতে পারে না। অফিস, ঘর কিংবা রাতের হাঁটা পথে যখুনি একটু একা হয়ে যায় তখুনি মেয়ের কথাটা মনে পড়ে সৌম্যের। সুযোগ পেলেও প্রীতিও বলতে ছাড়ে না,

কী গো কিছু ভাবলে ?

কী বিষয়ে ?

অই যে তোমার মেয়েকে নিয়ে।

মেয়ের বিয়ের কোনও সম্বন্ধ এসেছে বুঝি!

বিয়ে তো পরে। ওর নিজের মতো একটা ঘর সাজানোর ইচ্ছে অনেকদিনের, সে কথা কী ভুলে গেছ!

ভুলব কেন। এ কী ভোলার মতো কথা। অহরহ আমি পুড়িছ এ ব্যর্থতার গ্লানিতে। কিন্তু উপায় তো বের করতে পারছি না।

তোমার উপায় আর বের হবে বলেও মনে হয় না। বলেই ফটাশ শব্দে ওর শাড়ির ভাঁজ শেষ করে।

আমার মেয়ে যদি ভাড়াবাড়ি থেকেই শ্বশুরবাড়ি যায়, তাহলে আমার লাশ যাবে তোমার ফ্ল্যাটে। এ প্রীতি বেঁচে থাকতে ও মুখো আর হবে না।

মহা মুশকিল! আমার অবস্থা দেখি শাঁখের করাতের মতো। যেতেও কাটছে। আসতেও কাটছে। আমি একা মানুষ কত আর সামলাই!

আমি কি দোকা ? আমিও তো একাই পুরো ঘর-সংসার সব সামলাই। ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার খবর নিই। তাদের টিউশন ফি জোগাড় করি। তুমি তো বেতনটা হাতে দিয়েই খালাস। মরা মাছের চোখের মতো ঠাণ্ডা। জোয়াল তো আমার কাঁধেই রেখেছ। একগ্লাস জলও ভরে খাও না। মশারিটাও আমাকে টাঙাতে হয়। নিজে তো এক পেট গিলেই হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ো। থালাবাটি, বাসন-কোশন ধোয়া-মোছা থেকে সবই আমাকে করতে হয়। ঘরে একটা বাল্ব নষ্ট হলেও আমাকে ধরতে হয়। ফ্যানের ব্লেডগুলো মোছার জন্য পইপই করে—সেই কবে থেকে বলছি! মানুষটার নড়াচড়ার নামগন্ধটি পর্যন্ত নেই। যে মানুষ বেঁচেই মরে থাকে তার কাছে মেয়ে কী আর মড়াগাই-বা কী, কোনও তফাত নেই। এই আধমরা লোকের ঘর করছি আজ ছাব্বিশ বছর ধরে।

এবার সৌম্যের গলায় ভাঙা স্বর বেজে ওঠে; এতক্ষণ তো শুনছি মরেই গেছি। এখন আবার শুনছি মরিনি এখনও আধমরা হয়ে আছি। তাহলে দু-একটা ঘা পড়লেই আবার নড়েচড়ে বসতে পারব এ ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত থাকতে পার।

আধমরা তো মুখ ফসকে বেরিয়ে এসেছে আসলে তুমি মরেই গেছ। মড়ার আবার ঘর কী। মড়ার আবার সখ কী! তবে আমি বলে দিচ্ছি মেয়ের মন ভেঙে তুমি চিতায় গিয়েও শান্তি পাবে না।

বুঝলাম জীবনের ওপর কেবল ডালঘুটুনির ঘুটা পড়েছে। আর দুদিন বাদে শর-মাখন সব তুলে নিয়ে জীবনটাকে একেবারে মাঠা করে ছাড়ব।

এরই মধ্যে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। অফিস থেকে ফ্ল্যাট-বাড়ি কিংবা জমি কেনার ঋণ দেবে। এটা কোনও লিজিং কোম্পানি নয়। নিপাট বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কিছু আয় আছে। তা থেকেই ছোটখাটো ঋণ অনেক আগে থেকেই দেওয়া হচ্ছে। সর্বোচ্চ পনেরো লাখের মতো। ও টাকায় আর কী হবে! ফ্ল্যাটের বুকিং মানিতেই চলে যাবে। সুতরাং এ নিয়ে আর মাথা ঘামায়নি কখনও সৌম্য। এবার সে লোনের স্বাস্থ্য বেশ খানিকটা বেড়েছে। ৫০ লাখ। একশ আশি কিস্তিতে টাকা শোধ দিতে হবে। সুদ সাড়ে সাত পার্সেন্ট। সরল সুদ। চক্রবৃদ্ধির কোনও হাবাজাবা নেই। তারপরও এ নিয়ে মাথা ঘামানোর তেমন সাহস পেল না সৌম্য। দু-কদম এগোতেও পায়ে বল পেল না। কারও সংগে যে আলাপ করবে সে ইচ্ছেও কেন যেন হলো না। যেটুকু বেতন কেটে ছেঁটে হাতে আসে তাতে দিব্যি ওর চলে যায়। কিন্তু ঋণের কিস্তি কাটার পর যা পাবে তা দিয়ে সংসার চালাবে কী করে! এ নিয়ে অনেক ভেবেছে। কিন্তু কোনও কূলকিনারা খুঁজে পায়নি সৌম্য। তবে এ খবর এ-কান-ও-কান হয়ে একদিন ঠিকই প্রীতির কানে পৌঁছে গেল।

যথারীতি জিজ্ঞেস করে যখন জানলো এ নিয়ে কোনও ভাবনা চিন্তা এখনও করিনি। এগোবো বলে দু-কদম পা-ও বাড়াইনি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য এ নিয়ে চিলচিৎকার না করে সদ্য জল থেকে তোলা ইলিশের মতো দুটো লাফ দিয়েই শান্ত হয়ে গেল প্রীতি। মুখে কোনও রা নেই। কোনও উচ্চবাচ্য নেই। পরদিন ক্যাম্পাসে যেতেই সালিম মাহমুদের সঙ্গে দেখা। আম বাগান বাঁয়ে রেখে পথ যেখানে বাঁক নিয়েছে ওখানটায় দাঁড়িয়ে একমনে কী যেন ও দেখছে। পেছন থেকে সৌম্য গিয়ে ওর ঘাড়ে হাত রাখল। আলতো চমকে ফিরে তাকাতেই দেখে সৌম্য। অত মগ্ন হয়ে কী দেখছেন সালিম!

নাঃ একটা পাখি! অদ্ভুত সুন্দর। এর আগে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তা দাদা আপনার ওদিকেই যাচ্ছিলাম। এরপর নানা কথায় কথায় পায়ে পায়ে সৌম্যের ঘরে চলে এল সালিম। কী মনে করে দরোজার ছিটকিনি তুলে দিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসল। কথার আগে একবার ফ্যানের দিকে তাকাল। তুমুল বেগে ফ্যান ঘুরছে। এবার খানিক দম নিয়ে বলল, আজই বোধহয় শেষ দিন। এখনও আপনি আবেদন করেননি শুনলাম।

আবেদন! কিসের!

গৃহলোনের!

কে বলেছে ?

বৌদি বলল, কাল রাতে ফোন দিয়েছিল। বলল, আপনারা নিজেদের জন্য যা করছেন আপনার দাদাকে তার  সঙ্গে যুক্ত করে নিন।

আর কিছু বলেনি প্রীতি ?

যা বলেছে তাতে আপনাকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করে।

কী করব! সব ভেবে দেখেছি ঋণটা শেষ পর্যন্ত গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়াবে। যে টাকা বেতন পাবো তাতে না চলবে সংসার, আবার যে টাকা ঋণ দেবে তাতে না হবে ফ্ল্যাটের দাম। না ঘরকা না ঘাটকা। মাঝখানে পড়ে শুধু চিড়েচ্যাপ্টা হতে হবে। কাজের কাজ কিছুই হবে না।

দাদা অত কিছু ভেবে লাভ নেই। আমাদের দশজনের যা হবে, আপনারও না হয় তাই হবে! এখন চলুন আমার সঙ্গে এক জায়গায় যেতে হবে।

কোথায় ?

ফ্ল্যাট দেখতে!

মাথা খারাপ! হাতে নেই এক পয়সা, আমি ফ্ল্যাট দেখে করবটা কী!

আগে চলুন। দেখুন। ফ্ল্যাটটি পছন্দ হয় কি না।

দেখে আর কী হবে! আজ না শেষ দিন।

আজ না, আগামীকাল শেষ দিন!

কিন্তু পছন্দ হলে তারপর ?

তারপর আর কী, বুকিং দিতে হবে!

সে টাকাই তো নেই!

ও নিয়ে এখন না ভাবলেও চলবে। আগে ফ্ল্যাট দেখুন। পরেরটা পরে।

বলেই সালিম একরকম হাত ধরে হিড়হিড় করে বের করে নিয়ে আসে সৌম্যকে। পথে যেতে যেতে সালিম বলে, কাছেপিঠেই আমি একটা ফ্ল্যাট বুকিং দিয়েছি।

কোথায় ?

উত্তরার শেষ প্রান্তে। তবে উত্তরা আবাসিক এলাকা নয়। বাইরে এবং বেসরকারি প্রকল্প।

মানে প্রাইভেট।

ঠিক ধরেছেন সৌম্যদা।

প্রাইভেট তো নানা হ্যাপা। আমার এক আত্মীয় আজ এগারো বছরেও ফ্ল্যাট বুঝে পায়নি।

উত্তরাতেই! অবাক কণ্ঠ সালিমের।

না ইস্কাটনে। বেচারা পেনশনের সব টাকা ওখানে দিয়েছে। কিন্তু ফ্ল্যাটের মুখ আজও দেখতে পায়নি। জীবদ্দশায় আদৌ দেখে যেতে পারবে কি না ঘোর সন্দেহ!

এখানে কিন্তু তেমন ঝামেলা নেই। এ আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি। আমার খালাত ভাই এক বছর আগে বুকিং দিয়েছে। বড়জোর আর চার মাস লাগবে। ধুমসে কাজ এগোচ্ছে। আমি বাড়িয়ে বলছি কি না আপনি চাইলেই তো নিজ চোখে দেখতে পাবেন।

ফ্ল্যাট নেই। সবই বুকিং দেওয়া হয়ে গেছে। তবে একটা ফ্ল্যাট আছে। কে যেন বুকিং ক্যানসেল করেছে। চার তলায়। পশ্চিমমুখো। রানওয়ে লাগোয়া। বিমান ওঠা-নামার সময় তীব্র শব্দ হয়। কান একেবারে স্তব্ধ হয়ে যায়। তবু আর পিছু হঠতে পারেনি সৌম্য। পেছনে আঁঠার মতো লেগে আছে সালিম। ওর এক কথা, বৌদিকে আমি কথা দিয়েছি। আপনাকেও এখন পাকা কথা দিয়ে যেতে হবে। পিছপা হবার কোনও সুযোগ নেই। তাহলে এটিও হাতছাড়া হয়ে যাবে। অনেক ভেবেচিন্তে সৌম্য বলল, ঠিক আছে কাল আমি বুকিং মানি দিয়ে যাব।

বুকিংয়ের পাকা রসিদ অফিসে জমা দিতে হবে। তা না-হলে আবেদন বাতিল বলে গণ্য হবে। এমনটাই লেখা আছে শর্তে। তড়িঘড়ি প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে পাঁচ লাখ ডেভেলপারের হাতে তুলে দিয়ে তবেই স্বস্তি মিলল সৌম্যের।

ফ্ল্যাটের দাম আর রেজিস্ট্রেশন খরচ মিলে কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। ঋণ পাবে পঞ্চাশ লাখ। তারপর ? তারপর আবার কী! এখন কাঁধে জোয়াল পড়েছে। পথ তো ভাঙতেই হবে। গন্তব্যে না পৌঁছা অবধি মুক্তি নেই দাদা। সালিমের ঠোঁটে আলতো হাসি।

ঋণ মিলল! সঙ্গে মাথায় বাড়ি। কর্তৃপক্ষ কথা রাখেনি। শর্তের বাইরে নতুন শর্ত। এগ্রিমেন্টকে আমলেই নিল না তারা । জীবনের সুখের জন্যে ফ্ল্যাট কেনা। কিন্তু কর্তৃপক্ষের ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে পথের নুলো। ভিখিরি। ধুলো যার সঙ্গী।

তুইও দেখিস ফ্ল্যাটের স্বপ্ন! কত ধানে কত চাল এবার বুঝবি ব্যাটা। ফ্ল্যাটের শখ চিরতরে মিটিয়ে দেবে। ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি বললেও পার পাবে না। তাই এক শ আশি কিস্তিতে যে টাকা আদায় করার কথা তা শুধু মৌখিক সিদ্ধান্তে ঊনআশি কিস্তিতে গিয়ে দাঁড়াল। পেনশনের আগেই তোকে সব টাকা মিটিয়ে দিতে হবে।

সুতরাং এমন কাঁচকি মার দিল যে পেনশনের আগেভাগে ইহলীলা সাঙ্গ হয়ে যেতে পারে যেকোনও সময়। জীবনকে দুর্বিষহ করার যতরকম আয়োজন তার সবই করা হলো নিপুণ হাতে। মানুষের ভেতরে পশুর বসবাস তা প্রমাণ করে দিল ওদের হিংস্র আচরণে! জীবন সাজাতে জীবনে সুর বাজাতে যেখানে একটু সুখের স্বপ্ন দেখেছিল, এখন দুবেলা অন্নের সংস্থান করাই দুরূহ হয়ে পড়েছে। কারণ সর্বসাকুল্যে আঠারো হাজার টাকা মাত্র হাতে আসে। অন্য খরচ বাদ দিলেও ঘর ভাড়াটা জোগাড় হবে কী করে! ফ্ল্যাটভাড়া সাকুল্যে চল্লিশ হাজার। যাই বা না যাই সে ভাড়া তো জোগাতে হবে মাসের শেষে। ঘোর অমানিশা চারদিকে। চোখেমুখে হতাশা নিয়ে যখন নির্ঘুম রাত কাটছে সৌম্যের তখনই এক শুভাকাক্সক্ষী এসে পাশে দাঁড়াল। বলল, ডেভেলপারদের যা অভ্যেস তখন একবারেই পুরো পঞ্চাশ লাখ দেয়া ঠিক হবে না। বরং কাজ যতটুকু এগোবে আপনিও ঠিক ততটুকু হাত বাড়াবেন।

তাহলে এতগুলো টাকা কি ঘরে রাখা ঠিক হবে ?

এখানেও হ্যাপা কম না। লোন নিয়েছে সাড়ে সাত পার্সেন্ট সুদে। অথচ ব্যাংক দেবে মাত্র ছ পার্সেন্ট।

শুভকাক্সক্ষী বলল, পার্সেন্টেজ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন কেন ? আপনার টাকাটা নিরাপদে রাখাটাই তো বড়ো কথা। যখন প্রয়োজন তুলবেন—দেবেন। দু-চার পয়সা যদি বাড়তি কিছু আয় হয় তো হলো! কিন্তু লাভের জন্য যে একেবারে মাথা কুটতে হবে তার কোনও মানে হয় না।

অগত্যা ঠিক হলো টাকাটা ব্যাংকেই পড়ে থাকবে। প্রয়োজন মতো খরচ করবে। মধুমাসে যেমনি ফলের ছড়াছড়ি। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাছির আনাগোনাও বেড়ে যায় কয়েকগুণ। তেমনি সৌম্যের টাকার গন্ধও আর ছড়াতে বেশি সময় নিলো না। ভাই বন্ধু স্বজন শুভাকাক্সক্ষী, কতজন কতভাবে যে বুদ্ধি দিচ্ছে তার শেষ নেই। অগত্যা একজনের সঙ্গে রফাদফা হলো। ও বলল, অতো সাত-পাঁচ ভেবে লাভ নেই। টাকাটা আমাকে দিন। প্রতিমাসে যে লাভ দেবো তাতে আপনার দিব্যি চলে যাবে। ফ্ল্যাটের বাকি টাকাও লাভ থেকেই পুষিয়ে দিতে পারবেন।

ঠিকই চলে গেল। তবে কয়েক মাস। তারপরই করোনা। ব্যবসা প্রায় অচল। সেসঙ্গে টাকা দেওয়াও বন্ধ করে দিল ও। এরপর কয়েক মাস এর-ওর কাছ থেকে ধার নিয়ে চললেও এখন শনিরদশা চরমে। যাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে তাদের শোধ দেয়নি আজও। আর দু-চারজনের দেবার ক্ষমতা থাকলেও তারা দেবে না, এ ব্যাপারে সৌম্য নিশ্চিত। সুতরাং বিমুখ হওয়ার চেয়ে নীরব থাকাটাই সম্মানজনক। ভাবে সৌম্য।

কিন্তু প্রতিমাসের খরচ, বাড়িভাড়া ওরা তো আর নীরব থাকবে না। এবং থাকছেও না। মাস শেষে যার যার পাওনা—পেপারঅলা থেকে শুরু করে মুদিঅলা। ময়লাঅলা থেকে কেয়ারটেকারের সার্ভিস চার্জ ঠিক বুঝে নিতে একটুও পিছপা হয় না। সময়ও দেয় না। ক্যালেন্ডার ধরে নয়, রীতিমতো ঘড়ি ধরে চলে আসে যার যার পাওনা বুঝে নেওয়ার জন্যে।

এগ্রিমেন্টের শর্ত ভেঙে পুরো বেতনটাই যখন কেটে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ, তখন একবার বুকিং ক্যানসেল করার কথা ভেবেছিল সৌম্য। কিন্তু মেয়ের কথা ভেবে, প্রীতির কথা ভেবে শেষ অবধি সিদ্ধান্ত আর পাকা করেনি। তবে টাকা ফেরত নেবার হাঙ্গামা না-থাকলে ঠিকই বুকিং বাতিল করত সৌম্য। কিন্তু এ নিয়ে যখন ডেভেলপারদের সঙ্গে যোগাযোগ করল ওরা সাফ বলে দিল, তিন-চার মাসের আগে টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব নয়। আর ডেমারেজ কেটে রেখে যে ফেরত পাবেন তাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এমডি স্যার সিঙ্গাপুর গিয়েছেন। তিনি না আসা পর্যন্ত বিষয়টা কোনওভাবেই স্যাটেল করা সম্ভব নয়।

কবে ফিরবেন এমডি ?

ঠিক নেই, তিন-চার মাস। প্রয়োজন হলে ছমাসেও গড়াতে পারে। মায়ের চিকিৎসা চলছে ওখানে। জটিল রোগ। তাই দিন-তারিখ বলে-কয়ে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

এ নিয়ে আর দ্বিতীয়বার ও-মুখো হয়নি সৌম্য। অনেক ভেবে দেখেছে ফ্ল্যাট বুকিংয়ের সংগে ও একটা সুন্দর স্বপ্নকেও বুকিং দিয়ে ফেলেছে। বুকিং ক্যানসেল মানে স্বপ্নটাকে ভেঙে ফেলা। ছুড়ে ফেলা। বাড়ির নকশা দেখে কখনও মা-মেয়ে, কখনো মা-ছেলে, কখনও আবার দুভাই-বোন মিলে নানা জল্পনা-কল্পনায় মেতে থাকে। কাগজ-পেন্সিল নিয়ে নকশা বদলের স্বপ্ন আঁকে। কোন বারান্দাটা আরেকটু বড়ো করা যায়, কিচেনের নকশা বদল করে ডাইনিং লাগোয়া করতে হবে। ড্রইং রুমে আলো কম আসে। আরও আলোর পথ প্রশস্ত করতে হবে দিনভর এমনি নানা ভাবনা!

কখনও মেঘেলা বলে ভাইকে, দিঘল তুই কি ড্রইং রুম লাগোয় রুমটি নিবি নাকি আমার পাশেরটা ?

আমি অত দূরে একা একা থাকতে পারব না। তোর পাশের রুমটাই আমাকে দে।

ও রুমটা অবশ্যি ওর মায়ের জন্য রেখেছিল সৌম্য। মা যখন আসবে যাতে নিজের মতো করে থাকতে পারে, সে-ভাবনা থেকেই বাড়তি একটা রুম নেয়া। কিন্তু ছেলের পছন্দ ও রুমটা। তাহলে মা! অনেক ভেবেচিন্তে পরে সিদ্ধান্ত নিল, মা আগে আসুক পরে দেখা যাবে। সিদ্ধান্তটি ঠিক মনোপুত হয়নি সৌম্যের। অনেকটা ইচ্ছের বিরুদ্ধেই এ সিদ্ধান্ত। তা না-হলে শান্তি নষ্ট হবে। অনাসৃষ্টি হবে। কিন্তু সময়-অসময় নেই। যখন-তখন বুকে একরকম কাঁটার খোঁচা অনুভব করে সৌম্য।

কখনও ভাবে মাকে আর স্থায়ীভাবে রাখা যাবে না। অনেকদিনের স্বপ্ন ছিল ওর। একটু ব্যবস্থা করতে পারলেই মাকে ওর বাসায় নিয়ে আসবে। কিন্তু মায়ের ঘরটা দিঘলের পছন্দ। তখন মাকে তো আর নির্দিষ্ট করে কোনও ঘর দেওয়া সম্ভব নয়। দিলে প্রীতির ঘরটাকেই দিতে হয়। নিজের একটা ঘর থাকবে না তা কী হয়। কোটি টাকার ফ্ল্যাট। তারপরও উদ্বাস্তুর মতো থাকতে হবে। আর মাও যখন দেখবে তার আসার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ঘর ছেড়ে দিতে হচ্ছে। অন্য ঘরে চলে যেতে হয় তখন তিনিও আর এখানে থাকতে স্বচ্ছন্দ হবেন না। মানে মাকে নিয়ে ওর স্বপ্ন আর পূর্ণ হবে না।

একরাশ হতাশা ওকে গিলে ফেলে মুহূর্তে। সূর্য যেমন চন্দ্রকে গ্রাস করে। ওর বেলায়ও ঠিক তাই ঘটেছে। ওর স্বপ্ন ভাঙে ভাঙুক, কিন্তু ছেলে-মেয়ের স্বপ্নকে আঘাত করতে চায় না সৌম্য। প্রীতি ওর রুমের নকশা ছেঁটে-কেটে বাথরুমটা আরও বড় করল। ওর দেখাদেখি দিঘল আর মেঘেলাও ওদের ঘর-বাথরুম সবকিছুর নকশা বদল করে নিল। বিভিন্ন কোম্পানির সংগে যোগাযোগ করে হোয়াটসঅ্যাপে বেসিন-কমোড, বাথরুম ফিটিংসের জুতসই পছন্দ ঝালিয়ে নিচ্ছে। কোথায় কোন টাইলস বসবে, দরোজার নকশা কেমন হবে সবই এখন ওদের স্বপ্নের অংশ। ওদের ভাবনার অস্তিত্ব বলা যায়। এরই মধ্যে রুম-বাথরুমের দরোজা-ক্যাটডোর যা কেনার কিনে ফেলেছে। যা অর্ডার দেয়ার অর্ডার দিয়ে ফেলেছে। অর্থাৎ তাদের রোজকার আয়োজন ফ্ল্যাটটাকে লালন করা, তাকে পরিচর্যা করা। ছেলে তো বন্ধুদের কাছে আগাম বিদায় নিয়েই নিয়েছে। কবে নাগাদ নতুন ফ্ল্যাটে উঠবে সে তারিখও ওর বন্ধুদের মুখস্থ। এতকিছু যে ঘটে যাচ্ছে তা জানে না কেবল সৌম্য।

এ নিয়ে কোনও কথা বলতেও চায় না ও। বললেই একগাল কথার তুবড়ি ছোটাবে। তখন নীরবতাকেই কাছে টেনে নিয়েছে সৌম্য। কিন্তু করোনা সংকটে যখন অর্থের জোগানটা বন্ধ হয়ে গেল রাতারাতি, তখন ? এবার ঢিল ছোড়ার মতো কথার তুবড়ি ছোটাতে কেউ কম যায় না। যেমনি প্রীতি, তেমনি ওর ছেলে আর মেয়ে। যেন ফ্ল্যাট বুকিং দিয়ে মস্ত ভুল করেছে সৌম্য।

আমাদের অমন ভুতুড়ে ফ্ল্যাটের দরকার ছিল না। একটা অজপাড়া গ্রামে ফ্ল্যাট কিনেছে। ওই দম বন্ধ জায়গায় কী মানুষ থাকতে পারে! ঘরে আলোর খেলা নেই। রুমগুলো লম্বাটে। আদেখলার মতো বিরাট এক ড্রয়িং রুম বানিয়ে রেখেছে। ও রুমে ফার্নিচার দিয়ে ভরতেই লাগবে কয়েক লাখ টাকা। হার্ট অবদি সিটিতে থেকে এখন কি না যেতে হবে ওই গ্রাম্য ফ্ল্যাটে!

কেউ বলছে, গ্রাম্য আর অজ যাই বলো না কেন, এখন সে ফ্ল্যাটেরও টিকি মিলছে না। যে ঘর ভাড়া দিতে পারে না সে ফ্ল্যাটের টাকা জোগান দেবে কোত্থেকে ? কতবার নিষেধ করেছি। বারণ করেছি। বেজাতটা কথা কানে তুলল তো!

মুখে তোমার আটকাচ্ছে না প্রীতি! কী যা-তা বলছ।

এই লোক, একটা কথাও বলবে না। আমরা যখন বারবার না করলাম ওখানে ফ্ল্যাট কিনো না।

তুমি শুনলে না।

আমরা বললাম, বুকিংয়ের টাকা জলে ফেলে দাও!

তুমি শুনলে না।

আমরা বললাম, সংসার চালাতে পারো না। তখন ফ্ল্যাটের টাকা শোধ দিবে কী করে!

আমরা বললাম, লোনের কিস্তি শোধ দেবার পর মাসের খরচ কীভাবে চালাবে!

তুমি বললে অসুবিধা হবে না।

আমরা বললাম, এখন সব যেভাবে চলছে তা কি চালাতে পারবে ?

তুমি বললে কোনও সমস্যা হবে না।

অথচ এখন মাসের শুরুতে বিশ-বাইশ হাজার টাকা দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে রাখো। এটা কোন ধরনের বিচার।

সব মিলিয়ে মাসে খরচ আছে দেড় লাখ টাকার ওপরে। সেখানে বিশ দিয়েই ক্ষান্ত। বিশ না দিয়ে আমাদের বিষ দাও। সবাই মিলে খেয়ে মরে যাই।

তুমি স্বস্তি পাবে। নতুন করে বিয়ে করে মজা লুঠবে।

আমাদের কপালে আর ফ্ল্যাট নেই। অই মাগির কপালেই এ ফ্ল্যাট লেখা আছে।

এসব কী বলছ তোমরা ?

যা বলছি আলবৎ ঠিক বলছি। বানিয়ে বলছি না। মনগড়া কিছু বলছি না। একরত্তি বাড়িয়ে বলছি না।

ছেলে আরও এককাঠি সরেশ। ওখানে গাড়ি ছাড়া চলবে না। ওই জঙ্গলে সামান্যতম নিরাপত্তা নেই।

রিকশায় যাওয়া-আসা করলে তোমার মেয়ের মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি পড়বে। বখাটেদের যা উৎপাত। তরুণী-যুবতী দেখলেই ওদের চোখ নাচতে থাকে। পিলে চমকায়। ধুকুক-পুুকুর শব্দ ওঠে এবং রিকশার পথ আগলে দাঁড়ায়। গাড়ি ছাড়া একদম সম্ভব না ওই জঙ্গলে চলাফেরা করা। সুতরাং গাড়ি লাগবে। তবে …

তবে একটা গাড়িতে হবে না।

তিনটে গাড়ি লাগবে।

ছেলের একটা।

প্রীতি আর মেয়ের জন্যে একটা।

বাবার জন্যে একটা।

সৌম্য বলে, আমি তো হাইজ্যাকার না। আমি লুটেপুটে টাকা আনি না। সৎ আয়। দু’নম্বরি পয়সা নয় যে চারজন মানুষের জন্য তিনটে গাড়ি লাগবে!

যতদিন বাড়ি হবে না ততদিন অই ফ্ল্যাটে ওঠা যাবে না। ছেলে তার রায় জানিয়ে দেয় বাবাকে। এরপর থেকে শুরু হয় আরেক পীড়ন। সকাল নেই দুপুর নেই। যখন-তখন বিভিন্ন মডেলের গাড়ির ছবি পাঠাতে থাকে দিঘল ওর বাবাকে। এ দেখে ব্যর্থতার গ্লানি কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে থাকে সৌম্যকে।

একদিন না পেরে দিঘলকে কাছে ডাকে সৌম্য—

একটা গাড়ি হলেই তো আমাদের চলে যায় বাবা!

না, একটা গাড়ি সবসময় আমার কাছে থাকবে।

তোর মতো না ভেবে অন্যভাবেও তো ভেবে দেখা যায়। তুই গাড়ি চালাবি। আমি পাশে থাকব। পেছনে তোর দিদি আর মা বসবে।

এগুলো তোমার আটপৌরে ভাবনা। তোমরা বেড়াবে আর আমি শুধু ড্রাইভারি করব। না, ও হবে না। আমার সম্পূর্ণ সেপারেট একটা গাড়ি চাই। সে গাড়ি কেউ এক ফোঁটাও স্পর্শ করতে পারবে না।

এখানেও যদি ক্ষান্ত হতো—তাহলেও মন জুড়াতো সৌম্যের। একটু হলেও স্বস্তি পেত। কিন্তু তা হবার নয়। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে সব ছারখার করে দেবার জন্যেই হয়তো ওরা উঠে-পড়ে লেগেছে। এমনটাই মনে হয় সৌম্যের।

এক সন্ধ্যায় টিভিতে খবর দেখছিল সৌম্য। দরোজায় কলিং বেল। খুলতেই দেখে দিঘল দাঁড়িয়ে। এক ঝোপা চাবি। একবার শূন্যে ছুড়ে দিচ্ছে ফের লুফে নিচ্ছে। এমনি করে বারবার চাবি লোফালুফি চলছে।

কিসের চাবি, কার চাবি ওগুলো ?

অর্কদের গাড়ির চাবি।

অর্কদের গাড়ির চাবি তোর হাতে কেন ?

গাড়ি ড্রাইভ করে এলাম।

তুই গাড়ি চালাতে পারিস!

শুধু পারি না, অনেক ভালো পারি! বিশ্বাস না হয় তো আমার বন্ধুদের ডেকে জিজ্ঞেস করতে পারো। নির্ভর করতে না পারলে কি অমনি অমনি কেউ আমার হাতে গাড়ি ছেড়ে দেয়!

সবকিছু অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে সৌম্যের। তুই গাড়ি ড্রাইভ করতে পারিস, কখনও তো বলিসনি!

তোমাকে বলার কী আছে। তুমি কী আমাদের ওউন করো! তোমার রাজ্যে তুমি থাকো। আমাদের কথা কী একবারও ভেবে দেখো। আমাদের কী ইচ্ছে, কী ভালো লাগে, কখনও কী ভেবে দেখেছ, না জানতে চেয়েছ! ভালো কোনও রেস্টুরেন্টে কতদিন খেতে পারি না। বন্ধুদের কাছে ছোট হয়ে থাকতে হয়। কারও সংগে কিছু শেয়ার করতে পারি না—পকেটে টাকা থাকে না বলে। ওরা সবাই ব্র্যান্ডের জামা-জুতো পরে। আমি একটা টি শার্টও কিনতে পারি না ব্র্যান্ডের। তুমি আর কথা বলতে এসো না।

তোর তো লাইসেন্স নেই। তারপরও ড্রাইভ করিস কী করে; পুলিশ ধরে না!

ধরবে কী—আজই তো টঙ্গি পর্যন্ত ড্রাইভ করে এলাম।

টঙ্গি! ও তো মরণকূপ। ট্রাক-বাস-লরি কী নেই ও রাস্তায়।

সেদিন মাওয়াঘাট পর্যন্ত ঘুরে এলাম। আরও শুনবে ? মাঝে মাঝে পুলিশ যে ধরে না তা নয়। ধরা খেয়েছি কয়েকবার। জরিমানাও গুনতে হয়েছে।

জরিমানা! জরিমানা দিলি কী করে ? সে তো অনেক টাকার ব্যাপার। কোথায় পেলি!

বড় কাকুকে ফোন করি, পাঠিয়ে দেয়।

বড় কাকু! ও জানতে চায়নি কেন ?

বলেছি। ট্রাফিক জরিমানা করেছে।

অতদূর বখে গেছিস।

একে বখে যাওয়া বলে! তুমি ব্যাক-ডেটেড বাবা। আমাদের বিষয় নিয়ে তোমার মাথা না ঘামালেও চলবে।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই এতক্ষণ কথা বলছিল দিঘল। এবার চপ্পলে চটাক্ চটাক্ শব্দ তুলে ওর ঘরে চলে গেল।

সৌম্যের হৃদস্পন্দন কয়েকগুণ যেন বেড়ে গেল মুহূর্তে। ধড়াস্ ধড়াস্ শব্দ হচ্ছে বুকের ভেতর। ট্যারো চোখে খানিক সময় তাকিয়ে রইল ছেলের চলে যাওয়া পথের দিকে। চোখে বিস্ময়! অস্ফুট শব্দে ওর ঠোঁট কেঁপে উঠল, ছেলেটা তো অকালে মারা পড়বে! শুনেছে মরতে মোটেই দ্বিধান্বিত নয় দিঘল। যে জীবনে এত না থাকার বঞ্চনা, না পাওয়ার যন্ত্রণা, সে জীবন না থাকাই ভালো।

তুমি তো মরবে! বাবা-মায়ের কথা কী একবারও ভাববে না। ওরা কী এ শোক সইতে পারবে!

বাবার কোনো শোক-তাপ কষ্টের অনুভূতি আছে বলে তো মনে হয় না। আর ওর একটা লিসন পাওয়া দরকার।

সে লিসন দিতে ও রোজ ভাড়ায় হোন্ডা চড়ে ভার্সিটি যায়।

সৌম্য যত বলে চড়িস না। ও তত বেশি বেশি চড়ে সে হোন্ডায়।

সৌম্য বলে, ওরা ড্রাইভিং জানে না। বেপরোয়া চালায়। ট্রাক-বাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ওরা ছুটে চলে। হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। এক প্যাসেঞ্জার নামিয়ে কী করে আরেক প্যাসেঞ্জার তুলবে শুধু সে ফিকিরে থাকে ওরা। ওতে চড়িস না বাবা।

দিঘল বাবার নিষেধ মানে না। আরও দ্বিগুণ উৎসাহে হোন্ডায় চাপে। আজকাল সৌম্যকে শুনিয়েই রাইডারদের সঙ্গে কথা বলে। যাতে বাবা মানসিক নির্যাতনে ভোগে। এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ কাজ করে ওর মধ্যে।

এর মধ্যে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে, আরও জটিল রূপ নেয়। একদিকে বাড়িভাড়া এখনও জোগাড় হয়নি। ওদিকে হাসপাতাল থেকে ফেরার পর এক হপ্তার দূরত্বে ফের দুটো ধাক্কা গেল সৌম্যের ওপর দিয়ে। শ্বাসকষ্ট হঠাৎ বেড়ে গেল। হাসপাতালে যেতে হয়নি বটে। তবে ঝড়ের মতো প্রায় উড়ে গেল হাজার ত্রিশ টাকা। ওদিকে উত্তরা থেকে পাশের তিন ফ্ল্যাটের ফোন এল পরপর। বলল ওরা,

আমাদের ফ্ল্যাটের কাজ শেষ কিন্তু উঠতে পারছি না আপনার জন্য।

আমার জন্য! সৌম্য অবাক।

হ্যাঁ, আপনার ইট-বালুর কাজ এখনও শেষ করেননি তাহলে আমরা যখন বসবাস করব আপনি সিমেন্ট বালুর কাজ শুরু করলে তখন কী আর থাকা যাবে এ ফ্ল্যাটে!

আরেকজন বলল, আমার দেয়ালে টাইলস্ লাগাব কিন্তু পারছি না আপনার ঘরে এখনও প্লাস্টারই করা হয়নি। তখন আমার টাইলসগুলো ড্যাম খেয়ে খুলে পড়বে যখন প্লাস্টারে জল ঢালা হবে। ভেজাতে হবে। ড্যামের ভয়ে আরো একজন তার দেয়ালে ডিসটেম্পার করাতে পারছে না। কারণ প্লাস্টারের সময় দেয়াল ভিজবে। ডিসটেম্পার নষ্ট হয়ে যাবে।

সে সঙ্গে ডেভেলপারের লোক—এক বছর ধরে কোনও কিস্তি শোধ দিচ্ছেন না। তাই আপনার কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে অনেকদিন। আর রাখা সম্ভব না। শিগগিরই পেমেন্ট করুন।

এমনি যখন অবস্থা তখন ঘর কী আর শান্ত থাকে! প্রীতি একে একে ফ্ল্যাটের এগ্রিমেন্ট, নকশা, দরজার ডিজাইন আঁকা কাগজ, বাথরুম ফিটিংসের লিটারেচার, বিভিন্ন বেসিন-কমোড আর বাথটবের ছবি সবশেষে অফিস লোনের চুক্তিনামা ছুড়ে মারল খাটে, মেঝেতে। কোনওটা আবার সৌম্যের মুখ বরাবর।

তোমার ফ্ল্যাটের গায়ে আমরা পেচ্ছাবও করব না। এখনও সময় আছে ও ফ্ল্যাট ছেড়ে দাও!

তা কী করে হয় প্রীতি! এতদূর এগিয়ে তবে কি ফিরে যাব!

তোমার যখন যোগ্যতা নেই, তখন অত বড়ো বড়ো স্বপ্ন দেখার অধিকারও নেই তোমার। আমাদেরকেও আর স্বপ্ন দেখানোর চেষ্টা করো না!

তোমরা সবাই মিলে আমার মৃত্যু কামনা করো। এভাবে চলতে থাকলে যেকোনও সময় আমার হার্ট কলাপস্ করতে পারে। তাই হোক। এ আমার অন্তর থেকে চাওয়া। আমি মারা গেলে তোমাদের ফ্ল্যাট-গাড়ি সবই হবে এবং নির্ঝঞ্ঝাটে হবে। কোটি টাকার ওপরে হাতে পাবে! এখন আমার মৃত্যু যত তাড়াতাড়ি হয় ততই তোমাদের মঙ্গল!

তোমার পেনশন! পেনশনের লোভ দেখাচ্ছ! কোটি টাকার লোভ দেখাচ্ছ? তোমার অফিসের ওপর আমার কোনও বিশ্বাস নেই! যে ঝামেলাপূর্ণ অফিস! সে অফিসের টাকার স্বপ্ন আমাকে দেখিও না। এ টাকা আমার হাত অবধি আসবে না। তার আগেই লালফিতার টানাটানিতে তোমার পেনশনের টাকার ফাঁসি হয়ে যাবে! যা একটা অফিস আমার। সব মতলববাজে ভরা। তুমিও যেমনি একটা ধড়িবাজ ওরাও তাই। একই গোয়ালের গরু না!

হড়হড় করে খরখরে গলায় কথাগুলো শেষ করে বারান্দায় চলে গেল প্রীতি। শুকনো কাপড় তুলে নিচ্ছে ক্লিপ খসিয়ে।

সৌম্য বিস্ময়ে, শুধু বিস্ময়ে নয়, অপার বিস্ময়ে দেখছিল প্রীতিকে। এ কী বলছে ও। আমার মৃত্যুর বিনিময়ে টাকা! আর সে টাকা ঠিক ঠিক পাবে কি না সে নিয়েও ওর গভীর অবিশ্বাস! সংশয়! কোনও স্ত্রী কী পারে এভাবে স্বামীর মৃত্যুর বিনিময়ে টাকা পেত! সে টাকার সচ্ছল হতে!

বাঙালি স্ত্রী মাত্রই বলবে এ কী বলছ! তোমার মৃত্যুর বিনিময়ে টাকা। ছিঃ ও টাকা আমি চাই না। তুমি বেঁচে না থাকলে, ও টাকা দিয়ে আমার কী হবে। বরং বেঁচে থাকো। সুস্থ থাকো। তাহলে টাকা একদিন ঠিকই হাতে আসবে। ও নিয়ে তুমি ভেবো না! কিন্তু প্রীতি একী বলছে। তার মানে ওর মনে ছিটেফোঁটাও ঠাঁই নেই সৌম্যের জন্য।

তাহলে এ কার সঙ্গে এতদিন সংসার করছে ও। এ প্রীতি তো একদম অচেনা! অন্য কেউ! চেনা প্রীতিকে কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না সৌম্য। বিস্ময়মাখা চোখে তাকিয়ে থাকে ও প্রীতির দিকে। মনে হয় এ-তো কোনও রক্ত-মাংসের মানুষ নয়। মাটির মানুষ। তাই কী কবি বলেছেন, মাটির দেহ মাটি হবে! প্রীতি কী তাহলে আস্তে আস্তে মাটির শরীরে রূপ নিচ্ছে। ওর আদিরূপে ফিরে যাচ্ছে! সৌম্যের কেবল মনে হয়, প্রীতি আস্ত একটা মাটির পুতুল। প্রাণ নেই, মন নেই, হৃদয় নেই। রক্ত নেই, মাংস নেই। নেই প্রাণের চাঞ্চল্য। ধমনিতে নেই রক্তের চলাচল। কেবল একতাল মাটি। শুকনো খটখটে মাটি। সে মাটিতে তৈরি নিষ্প্রাণ এক পুতুল ও। কেবল শরীর আছে। কিন্তু নেই তার কোনও নড়াচড়া। নিছকই পুতুল ও।

মনে পড়ে সৌম্যের ছেলেবেলার কথা। ওদের গ্রামে চৈত্রসংকান্তির মেলায়, বৈশাখি মেলায় এমনি অনেক মাটির পুতুল ওঠে। ভারি সুন্দর দেখতে। ওদের দেশে এসব পুতুলকে ‘পুতলা’ বলে। পুতলা দিয়ে ঘর সাজিয়ে রাখে। শোকেসে সৌন্দর্য বাড়ায় ওরা। কিন্তু জীবনের প্রয়োজনে তাদের কোনও ভূমিকা নেই। তেমনি একটা পুতলার সঙ্গেই কি তবে এতদিন ঘর করল সৌম্য ? ভাবে। কেবলি ভাবে। কিন্তু তল পায় না।

এমনি ভাবনায় যখন মগ্ন সৌম্য। তখন ওর চোখ যায় রাস্তার উল্টোপিঠের গাছ দুটোয়। মাথায় তেমন উঁচু নয় গাছগুলো কিন্তু ঝাপানো পাতা। গভীর সবুজের ভিড়। সারাক্ষণ পাখির চিকির-মিচির। সন্ধ্যায় রীতিমতো ঝুমুর বেজে ওঠে। অন্ধকার ঘনিয়ে না আসা পর্যন্ত সে বাদ্য-ছন্দ বেজে চলে। কোনও ছেদ পড়ে না। অথচ গাছ দুটো আগে ন্যাড়া ছিল। পাতা বলতে ছিল হাতেগোনা কটি। তাতে না ছিল ছায়া, না ছিল পাখির বসবাস। করোনায় মানবজীবন বিপর্যস্ত হলেও পাখ-পাখালি, গাছ-গাছালি ওরা ঠিকই জীবন ফিরে পেয়েছে। ভাবে সৌম্য। মানুষের চলাচল নেই। গাড়ির ধোঁয়া নেই, শব্দ নেই। ঝিরিঝিরি বাতাস চারদিকে। গাছে পাতা নড়ে। ছায়ারা অনেক দূর ছড়িয়ে থাকে। সারাক্ষণ পাখি ডাকে।

আসলে মানুষই বিষাক্ত। ওর হাত যেখানে পড়েছে। পা যেখানে রেখেছে সেখানেই বিষ ছড়িয়েছে। এখন মানুষ সব ঘরবন্দি। চলাচল নেই। গাড়িগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে গ্যারেজের অন্ধকারে। সে সুযোগে পাখিরা ডানা মেলেছে। গাছেরা পাতা ছড়িয়েছে। মন ওর মুহূর্তে পলকা হয়ে যায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে মুগ্ধ চোখে। কী নীল আকাশ! এত সুন্দর নীলিমা কতদিন দেখিনি! ওর চোখেমুখে কোনও বিষণ্নতা নেই। শুধু মুগ্ধতা। বারান্দার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে সে মুগ্ধতা অনুভব করে সৌম্য। তখুনি পেছনে এসে দাঁড়ায় প্রীতি, এক হাতে জলের গেলাস। অন্য হাতে কয়েকটা বড়ি-ক্যাপসুল। চোখ তুলে তাকায় সৌম্য। কোনও বোধ নেই ওর দৃষ্টিতে। অভিব্যক্তিহীন সে চাউনি।

কী হলো ওষুধ খেয়ে নাও; ভাত দেবো। সকালের ওষুধ খেয়েছ ?

মনে করতে পারছি না।

আমি ওষুধ গুনে দেখেছি। রাতে যা ছিল তাই আছে। তার মানে খাওনি। ওষুধটা পর্যন্ত মুখে তুলে না দিলে খায় না।

ওষুধগুলো দাঁড়িয়েই খেয়ে নেয় সৌম্য।

এবার ঘরে এসে বসো, ইনসুলিন দিতে হবে! সৌম্য বাধ্য ছেলের মতো খাটলাগোয়া চেয়ারে এসে বসে।

কোন হাতে দেবো, নাকি পায়ে ?

সৌম্য ইশারায় ডান হাত দেখায়। প্রীতি নিড্ল পুশ করে ওর শরীরে—ব্যথা লেগেছে!

সৌম্য চুপ করে থাকে।

তুমি শুধু বলো ব্যথা! ব্যথা! তাই পাশের বাসার খালাম্মার কাছ থেকে শিখে নিয়েছি। প্রীতির চোখেমুখে তৃপ্তির হাসি। বলো ব্যথা লেগেছে কি না!

সৌম্য নির্বাক!

কী বলছ না যে, ব্যথা লেগেছে ?

মুখে রা নেই। সৌম্য অপলকে তাকিয়ে থাকে শুধু। সে চোখ কী বলে তা বোঝা যায় না। ধোঁয়াটে। তবে ভালো করে তাকালে ঠিকই পড়া যায়, ব্যথা পেয়েছি—তবে শরীরে নয় মনে।

সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares