লিটল ম্যাগ : মননরেখার ‘চিলমারী বন্দর’ সংখ্যা : হুমায়ূন আজম রেওয়াজ

‘ওকি গাড়িয়াল ভাই, কত রবো আমি পন্থের দিকে চায়া রে’―

ভাওয়াইয়া গানের কিংবদন্তি শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে গাওয়া এই কালজয়ী গানটির মাধ্যমে চিলমারী বন্দর ব্যাপকভাবে পরিচিত। বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য প্রাচীন নদীবন্দর চিলমারী বন্দর। বাংলাদেশের উত্তর জনপদের এই বন্দরের সুবর্ণ অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সমকালীন বাস্তবতার বিশদ আলোচনা-অনুসন্ধানে প্রকাশিত হয়েছে মননরেখার ‘চিলমারী বন্দর’ সংখ্যা। রংপুর থেকে প্রকাশিত মননরেখা দুরবগাহ এবং প্রায় অধুনা বিস্মৃত ‘চিলমারী বন্দর’কে যেন শতবর্ষের বিস্মৃতি থেকে জাগিয়ে তুলল। এমন একটি প্রান্তিক ইতিহাসকে তুলে আনা খুবই শ্রমসাধ্য কাজ―অনেকটা মাটির সুগভীর স্তরে হারিয়ে যাওয়া ঘুমন্ত ইতিহাসের কীর্তি-নিদর্শন খুঁড়ে বের করে আনার মতো। এর জন্যে শ্রমনিষ্ঠা, বুদ্ধিদীপ্ত পরিকল্পনা, অনুসন্ধান-গবেষণা-জরিপের প্রয়োজন হয়। এই দুঃসাধ্য কাজটিই সফলভাবে সম্পন্ন করল মননরেখা। বাংলাদেশের আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে এটি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। এটি মননরেখার ৮ম সংখ্যা। এর আগেও ষান্মাসিক এই সাহিত্যপত্রিকাটি নজরকাড়া ও ব্যতিক্রমধর্মী কিছু কাজ করেছে এবং পাঠকপ্রিয়তাও পেয়েছে। মননরেখার ‘মোনাজাতউদ্দিন সংখ্যা’, ‘নওশাদ নূরী সংখ্যা’ ‘আহমেদ ইলিয়াস সংখ্যা’ ‘বাংলাদেশের নারী কবি সংখ্যা’সহ সাম্প্রতিক সংখ্যাগুলো নিঃসন্দেহে ভালো কাজ। আর একটি বিষয় না বললেই নয়, বর্তমানের নানাবিধ সংকটের মাঝেও মননরেখা নিয়মিত প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছে এবং পাঠকের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা উত্তরোত্তর বাড়ছে।

বাংলাদেশের আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে ‘চিলমারী বন্দর’ সংখ্যাটি অত্যন্ত মূল্য বহন করে। প্রকৃতি-ইতিহাস-ঐতিহ্য- সাহিত্য-সংস্কৃতির সমন্বয়ে চিলমারী নামক সুপ্রাচীন নদী বন্দরটিকে অভিনবভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। কাজটি প্রথাগত ইতিহাস চর্চার পথ ধরে নয়, মননরেখা বরং দেখিয়ে দেয়, চিলমারীর মতো বন্দরগুলোকে ঘিরে যে রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের পরম্পরা রয়েছে সেটাই হতে পারত আমাদের ইতিহাসচর্চার প্রধান এক ধারা। আজও সে রকম হয়ে ওঠেনি। চিলমারী জনপদ ও বন্দরের ইতিহাস-গাথা শত শত বছরের পথ পাড়ি দিয়েছে তার প্রাণপ্রকৃতি, অর্থনীতি এবং সাহিত্য-সংস্কৃতিকে নিয়ে একই ছন্দে। এতে চিলমারী নিয়ে প্রাচীন প্রাগজ্যোতিষ-মোঘল জামানার চিত্র আছে, ১৮ শতকের রেনেলের মানচিত্র আছে, মন্টেগোমারীর চমকপ্রদ বয়ান আছে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি রালফ ফিচ-মধুসাধু খাঁ’র ধ্রুপদী অভিযাত্রা আছে। আছে শত শত বছরব্যাপী ভাঙনের চিত্র। হাল আমলে কলকাতাবাসিনী বঙ্গ-নন্দিনীর শেকড়ের স্মৃতি নিয়ে রোমন্থন আছে―এমনকি চরের কৃষাণীর মিষ্টি কুমড়ো চাষের গল্পও আছে। আসাম, পূর্ব বাংলা আর ব্রহ্মপুত্রপাড়ের প্রাণপ্রকৃতি; উত্তরের খাদ্যসংস্কৃতি আছে। ৪৩২ পৃষ্ঠার অসামান্য এই সংকলন আমাদের ইতিহাসচর্চার গুরুত্বপূর্ণ এক সম্পদ হয়ে উঠেছে।

সংখ্যার শুরুতেই রয়েছে চিলমারী অঞ্চলের প্রায় শতবর্ষী একজন শিক্ষক―দেলোয়ার মাস্টারের সঙ্গে আলাপচারিতা। ঔপনিবেশিক ভারত, পাকিস্তান জামানা থেকে বর্তমানকাল―তিন যুগকেই দেখেছেন। অনেকদিন পরে কেউ জানতে চাইল বলে নানা ঘটনার বয়ান করেছেন দরদ দিয়ে। যার মধ্যে ১৯৪০ সালে কলকাতা থেকে স্টিমারযোগে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের চিলমারী বন্দর হয়ে আসাম যাওয়ার কাহিনিও রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে কয়েকজনের স্মৃতিচারণ।

ভূগোল ও নদীকে সামনে রেখে চিলমারীর ইতিহাস জানা যায় এই সংখ্যার ইতিহাস অংশে। আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিওলজির গবেষণা অনুযায়ী, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা অববাহিকা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নৌপথ, প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে গড়ে উঠেছিল এবং উপমহাদেশ জুড়ে পরিচিতি লাভ করেছিল নদীর আশীর্বাদে। এই বন্দরের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা দিয়ে চীন ও ভারতবর্ষ থেকে রোমান ও আরবরা মধু, সুগন্ধি, রেশমী বস্ত্র ও মণি-মুক্তা ইত্যাদি পণ্য নিয়ে যেত। এটি ছিল মধ্যযুগের পাঠান ও মুঘল আমলের পূর্ব ভারতের অন্যতম একটি নদী বন্দর। ব্রিটিশ ভারতে এই বন্দরের আধুনিকায়ন হয় যাত্রীবাহী স্টিমার ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশ ভারতে চিলমারী কেবল ব্যস্ত বাণিজ্যকেন্দ্র নয়, গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দরও।

জেমস রেনেল তার বেঙ্গল অ্যাটলাসে চারটি বড় শহরের সঙ্গে বাংলা, আসাম ও বিহারের বিভিন্ন নৌবন্দরের যোগাযোগ পথ দেখিয়েছেন। শহর চারটি হচ্ছে― কলকাতা, ঢাকা, মুর্শিদাবাদ ও পাটনা। চার শহর থেকেই চিলমারীর যোগাযোগ-পথ ও দূরত্ব নির্দেশ করেছেন তিনি। মূলত শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্র হয়ে ঢাকা থেকে গোয়ালপাড়া নৌপথে ছিল চিলমারীর অবস্থান। চিলমারী বন্দর গুরুত্ব পায় অবিভক্ত ভারতের পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের মধ্য দিয়ে। ব্রহ্মপুত্র নদের দফায় দফায় ভাঙন সত্ত্বেও, বাংলা ও আসাম, কোচবিহার ও ভুটানের নৌযোগাযোগের সন্ধিস্থল ছিল চিলমারী। ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ চিলমারীর জন্য বয়ে আনে রাজনৈতিক সংকট। যে চিলমারী বন্দর, দফায় দফায় ভাঙন সত্ত্বেও, বাংলা ও আসাম, কোচবিহার ও ভুটানের নৌযোগাযোগের সন্ধিস্থল ছিল, সেটা বলতে গেলে রাতারাতি ‘প্রান্তিক’ জনপদে পরিণত হয়।

ঐতিহ্যবাহী চিলমারীর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার ইতিহাসের প্রাচীন আলেখ্য। এ বন্দরকে ঘিরে যেমন দেখতে পাওয়া যায় যুদ্ধের অসংখ্য ঘটনাবলি তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প সাহিত্য এবং ধর্মচর্চার এক উর্বর ক্ষেত্র গড়ে ওঠারও ইতিহাস পাওয়া যায় সহজেই। ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে ব্রহ্মপুত্র বেয়ে উজানে কামরূপ ও আসাম অভিমুখে যে সমর নায়কেরা একে একে অভিযান পরিচালনা করেছেন―এদের প্রায় সকল অভিযানের প্রথম প্রতিরোধস্থলটি ছিল চিলমারী কিংবা এর কাছাকাছি কোনও স্থান। চিলমারীতে মুঘলদের জাহাজ নির্মাণ কারখানা ছিল। কাশিমবাজার জমিদার বংশের রানি স্বর্ণময়ীর সময়ে চিলমারী বাজারে দেশি-বিদেশি অনেক ব্যবসায়ী এসে বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন যাদের মধ্যে মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা ছিলেন উল্লেখযোগ্য। চিলমারীর সঙ্গে রংপুর জেলা সদরের স্থলপথে যোগাযোগ ব্রিটিশ আমলেই স্থাপিত হয়েছিল। প্রাচীন চিলমারীর আর্থ-সামাজিক ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণ নিঃসন্দেহে ব্রহ্মপুত্র। উপমহাদেশের দীর্ঘতম এই নদীর আক্ষরিক অর্থেই শত উপ ও শাখা নদী বেয়ে ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন’ যে কোনও জনপদে যাতায়াত সম্ভব ছিল। কিন্তু এভাবে নদীপথ বেয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত তো অন্যান্য জনপদ থেকেও সম্ভব। চিলমারীর বিশেষত্ব ছিল এর ভৌগোলিক অবস্থান―পাহাড় ও সমতলের সন্ধিস্থলে অবস্থিত। প্রাচীন চিলমারীর কোল ঘেঁষে বয়ে চলা ব্রহ্মপুত্রের সমতল ও পাহাড়ি চরিত্রের ভেদরেখা ছিল চিলমারী অঞ্চল। যেমন উজানে, তেমনই ভাটিতে যেতে হলে চিলমারী এলাকায় এসে নৌকা বদল করতেই হতো। যদি একই নৌযান চলাচল, রসদ যাচাই ও পুনর্ভরণের স্থান ছিল এই চিলমারী। তাই ভাটিতে বৃহৎ বঙ্গ এবং উজানে আসাম, তিব্বত, ভুটান, নেপাল যাতায়াতে নৌ তো বটেই, কোনও কোনও ক্ষেত্রে স্থল যোগাযোগপথেও চিলমারী ছিল অনিবার্য বিরতিস্থল ও বাণিজ্যকেন্দ্র। যে কারণে মুঘল আমলেও বৃহত্তর রংপুর, কোচবিহার, গোয়ালপাড়া তথা প্রাচীন কামরূপ অঞ্চলে একমাত্র জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্র ছিল চিলমারী। শুধু বাণিজ্য নয়, সামরিক দিক থেকেও প্রাচীন চিলমারী অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ বাণিজ্যের মতো সামরিক ক্ষেত্রেও পাহাড় থেকে সমতল কিংবা সমতল থেকে পাহাড়ে যাওয়ার আগে এটাই শেষ বন্দর। এরপর ধুবড়ি বা বিলুপ্ত কামতা ও রাঙামাটি বন্দর বা শহর মুঘল শাসনামল জুড়ে ‘ফ্রন্টিয়ার’ মাত্র।

তাই, ভৌগোলিক অবস্থান ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের বিবেচনায় সুদূর অতীত থেকেই এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ব্রিটিশ শাসিত ভারতে এই বন্দরের সচলতা ছিল উল্লেখ করার মত। শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য নয়, চিলমারী বন্দর ছিল উত্তর-পশ্চিম ভারতের সাথে যোগাযোগ ও বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট। কলকাতা থেকে চিলমারী বন্দর হয়ে আসামে নিয়মিতভাবে দুটি স্টিমার চলাচল করত। স্টিমারে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করা হত। এছাড়া ছিল লঞ্চ ও নৌকা যোগাযোগ। কুড়িগ্রাম জেলায় উৎপাদিত পাট চিলমারী বন্দর থেকে নারায়ণগঞ্জ হয়ে বিলেতে যেত। চিলমারীতে গড়ে উঠেছিল নামিদামি পাট কোম্পানির ক্রয়কেন্দ্র। অন্যান্য পণ্যেরও বেচাকেনা হতো। বন্দরের আশপাশে গড়ে উঠেছিল ধান, গম, সরিষা, বাদাম, তিল, তিসি, কাউন ও ভুট্টার গুদাম। একসময় চিলমারীর কাঁসা ও পিতলের তৈজসপত্র দেশের সীমানা পেরিয়ে সমাদৃত ছিল বিদেশেও। সব মিলিয়ে সোনার অক্ষরে মোড়া ছিল চিলমারী বন্দরের অতীত দিনগুলো। সময়ের বিবর্তনে সোনার বরণ খানিকটা ফিকে হয়ে গেলেও বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এই বন্দরের গুরুত্ব অব্যাহত থাকে।

অনেকেরই জানা যে, ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী চিলমারী প্রাচীনকাল থেকেই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিকট একটি তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত। প্রতিবছর চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টম দিনে (অশোকাষ্টমী) চিলমারী নদী বন্দরের ঘাটে এবং সন্নিহিত ব্রহ্মপুত্র তটে দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার পুণ্যার্থীরা এসে হাজির হন। এখানে ব্রহ্মপুত্রের পবিত্র জলে স্নানতর্পণ শেষে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যান। স্নানতর্পণ উপলক্ষে পূর্বে এখানে একটি বৃহৎ মেলার আয়োজন হতো। এই অষ্টমী স্নান নিয়েও নাতিদীর্ঘ আলোচনা আছে।

এই সংখ্যায় চিলমারীর মুক্তিযুদ্ধের বিস্তৃত আলোচনা আছে। সেখানে দেখা যায়, ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় চিলমারীতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দুটি কোম্পানি অবস্থান করছিল, একটি বেলুচ রেজিমেন্ট, অপরটি মিলিশিয়া বাহিনী। কর্নেল তাহের ছিলেন ১১ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কম্যান্ডার। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তিনি কয়েকজন অসীম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে চিলমারীর উল্লেখিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অবস্থানে এক দুঃসাহসী সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নৌযুদ্ধ ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। নৌযুদ্ধের ইতিহাসে চিলমারী অপারেশন একটি উজ্জ্বলতম অধ্যায়।

কুড়িগ্রাম জেলা শহর থেকে ৩৫ কিমি দক্ষিণে ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে চিলমারী বন্দর অবস্থিত। অনেকেরই বাস্তব-কল্পনার মিশেলে গড়া মানসভূমি হয়ে প্রাচীন এই বন্দর বিরাজ করে। বাস্তবেই ভৌগোলিক বিবেচনায় এই বন্দরের গুরুত্ব সমধিক। একইভাবে এই অঞ্চলে জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থান প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম নদ ব্রহ্মপুত্রের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। চিলমারীর ভূপ্রকৃতি বিশেষ বৈচিত্র্যপূর্ণ। দেশের বৃহত্তম নদ ব্রহ্মপুত্র চিলমারীর ওপর দিয়ে প্রবাহিত। অপর একটি নদী তিস্তাও চিলমারীর প্রান্ত দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এই দুটি শক্তিশালী নদ-নদী চিলমারীর ভূপ্রকৃতি ও এর প্রকার নিয়ন্ত্রণে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সমগ্র চিলমারী এলাকাই ব্রহ্মপুত্রবাহিত বালি ও পলি দ্বারা গঠিত। কালের পরিক্রমায় ভাঙা-গড়াই এর চিরন্তন বৈশিষ্ট্য। কর্ষিত ভূমিতে কৃষি চাষাবাসই প্রধান কাজ। কৃষিকাজে অধিক উৎপাদনশীল ধানের চাষের ফলে প্রাচীন ধানের প্রজাতিসমূহ প্রায় বিলীন হবার পথে। ফলে পূর্বেকার প্রজাতিসমূহ যেমন বিলুপ্ত হওয়ার পথে তেমনি শখের ধান কালিজিরা, পোলাও চালের ধান বিলুপ্ত হবার পথে। অর্থনৈতিক কৃষিপণ্য হিসেবে খাদ্যশস্য, ফলমূল, শাক-সবজি, মসলা প্রভৃতির চাষও করা হয়। প্রাকৃতিক উদ্ভিদ ও প্রাণীর জায়গায় এখন হাইব্রিড ফসল, খামারের গৃহপালিত জীবজন্তু স্থান নেওয়ায় প্রাকৃতিক জীব বৈচিত্র্যের ক্ষেত্র সীমিত হয়ে পড়েছে।

বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, ব্রহ্মপুত্রের ভয়াবহ ভাঙনে চিলমারী বন্দর কোথাও থিতু হতে পারেনি। শতাব্দীকালেরও আগে সেই বন্দর ছিল কয়েক মাইল পুবে জামালপুর জেলার উত্তর-পশ্চিমের শেষ উপজেলা দেওয়ানগঞ্জের কাছাকাছি। ব্রহ্মপুত্র তার গতিপথ বদল করেছে। চিলমারী বন্দর ক্রমাগত পিছু হঠেছে উজানে। নদীর নাব্য হ্রাসের কারণে জাহাজ-স্টিমার চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে বহু আগেই। পাটের চাষ ও বাজার দুটোই কমে গেছে। ফলে বন্দরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখন অনেকটাই সংকুচিত। শুধু সীমিত আকারে চলছে নৌকায় যাত্রী পরিবহন―রৌমারী, রাজীবপুর, কোদালকাটি, অষ্টমীরচর বা বালাসীতে। নদীর ভাঙাগড়ার খেলা বারবার চিলমারী জনপদের মানুষকে উন্মূল করেছে। ভিটেমাটি হারিয়ে তাঁরা নয়া বসতি গেড়েছে পেছনে, অন্য গ্রামে। কেউ কেউ উলিপুর, রাজারহাট, কুড়িগ্রাম বা রংপুরে গিয়েও বসত গেড়েছে।

চিলমারী বন্দরকে ঘিরে রয়েছে অনেক চিত্তাকর্ষক ইতিহাস। পাল রাজাদের আমল থেকেই ব্রহ্মপুত্রের এই নৌরুট ছিল সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। মুঘলরা বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে আধিপত্য বজায় রাখার জন্যে নৌপথ নিয়ন্ত্রণে রাখে। এজন্য তারা মাঝে মাঝে ব্রহ্মপুত্র-যমুনায় সামরিক অভিযান পরিচালনা করত। তারা যুদ্ধজাহাজ তৈরি ও মেরামতকেন্দ্র স্থাপন করেছিল এই অঞ্চলে। সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মীর জুমলার বাহিনীর চিলমারী আগমনও স্মরণীয় হয়ে আছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে উপমহাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক বাঁক বদলের আন্দোলনে চিলমারীর মানুষের সংশ্লিষ্টতা উল্লেখ করার মতো। বিশেষ করে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে চিলমারীর বীরোচিত সম্মুখযুদ্ধ সমরবিদ্যায় স্মরণীয় ইতিহাস হয়ে আছে। যে বন্দর ও জনপদ একসময় ছিল গর্বের, নদীভাঙন, নাব্যসংকট ও নানা প্রতিকূলতায় তা আজ যেমন মৃতপ্রায়, তেমনি প্রজন্মের মানসপটেও অনেকটা বিস্মৃত, অবহেলিত। সমৃদ্ধ চিলমারী অঞ্চল একসময় মঙ্গা আর স্থবির জীবনের প্রতীক হয়ে পড়েছিল। নিত্য অভাব আর কর্মহীনতা ছিল সাধারণ্যের জীবনের প্রাত্যহিক সহচর। অভাব যদিও কাছছাড়া হয়নি তবু এখন পরিস্থিতি আবার কিছুটা বদলেছে। মাথা তুলে বাঁচার প্রত্যয় এই অঞ্চলের মানুষের। শিক্ষায়-দীক্ষায়, প্রযুক্তির ব্যবহারে, বিকল্প কর্মক্ষেত্রে তারা আবার থিতু হওয়ার চেষ্টা করছে। নানা পেশার সঙ্গে যুক্ত প্রচুর সংখ্যক শ্রমিক ঢাকা-চট্টগ্রামে গিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে।

আশার কথা, চিলমারী বন্দরকে আবার নতুন আঙ্গিকে সাজিয়ে তোলার আয়োজন চলছে। ২০১৬ সালে সরকার এই বন্দরকে নতুন নৌ-বন্দর ঘোষণা করেছে। চিলমারী নৌ-রুটটি আবার আন্তর্জাতিক নৌ রুট হিসেবে চালু হবে। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্য উন্নয়নের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। চিলমারী নদী বন্দর হবে পায়রা সমুদ্র বন্দর থেকে নৌপথে ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে আঞ্চলিক যোগাযোগের একমাত্র নৌরুট। বন্দরটি পুনরায় সচল করে তোলা গেলে এতে এলাকায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, তার ব্যাপ্তিÍ ছড়িয়ে যাবে। কুড়িগ্রাম জেলার পাশপাশি জাতীয় অর্থনীতির সমৃদ্ধি ঘটবে, সন্দেহ নেই। এখন প্রয়োজন সরকারের নয়া পদক্ষেপসমূহের দ্রুত বাস্তবায়ন।

বাংলাদেশ সরকার কুড়িগ্রামে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কথা বলছে যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নতুন দ্বার উন্মোচন করবে। এতে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের দিগন্ত বিস্তৃত করতে পারে, আসাম, মেঘালয় সহ ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় সেভেন সিস্টার্স খ্যাত রাজ্যগুলোয়। শুধু ভারত নয়―ভুটান, নেপাল ও চীনের সাথে বাণিজ্যের সম্ভাবনা ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠার ফলে চিলমারী বন্দরের নবজাগরণ হতে পারে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০২০ থেকে ২০২৫) নদী বন্দর উন্নয়ন প্রসঙ্গে নদী বন্দরসমূহের উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন উন্নয়ন কৌশলে (২০২১-২০৪১) এ বড় ও ছোট নদীসমূহের আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থা ৬৪ জেলায় সংযুক্তির উল্লেখ রয়েছে। এ সংযোগ সমুদ্র বন্দরের সাথে যোগসূত্র তৈরির মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের সুযোগ তৈরি করবে।

আগেই বলেছি, দেশের প্রায় দুর্গম ও প্রান্তিক অবস্থানের একটি মৃতপ্রায় বন্দরকে নিয়ে কাজ করা কঠিন। তার যা কিছু সমৃদ্ধি সব অতীত, চোখের বাইরে। বর্তমানে বন্দর বলতে মৃতপ্রায় নদী, জীর্ণ ঘাট বা খাঁখাঁ বালুচর―সেখানে কিছুই মিলে না। নির্ভরযোগ্য বইপত্র, সরকারি-বেসরকারি নথিপত্র ও পর্যাপ্ত তথ্য-পরিসংখ্যানের প্রকট অভাব পদে পদে। তবু বিবিধ সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই মননরেখার চিলমারী বন্দর সংখ্যাটি অসংখ্য তথ্যের সমাবেশে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। মননরেখার এই প্রচেষ্টা বাংলাদেশে অঞ্চলভিত্তিক ইতিহাস-ঐতিহ্য লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে আগামী দিনে আরও বিস্তৃত অনুসন্ধানে খানিক উৎস বা উৎসাহ জোগাবে। এমন একটি মূল্যবান কাজ করার জন্য মননরেখা সাহিত্য পত্রিকা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।

সবশেষে আমাদের প্রত্যাশা, চিলমারী বন্দরের অতীতের গৌরবময় ঐতিহ্য-সমৃদ্ধি স্মরণে রেখে শুরু হোক নতুন করে এগিয়ে যাওয়া। সময়োপযোগী ও সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে উত্তরের এই ঐতিহ্যবাহী বন্দর-জনপদের আবার সমৃদ্ধি ফিরে আসুক। মননরেখার জন্য শুভ কামনা।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares