প্রচ্ছদ রচনা―সাহিত্যকর্ম : আলোচনা : মুহম্মদ নূরুল হুদার ‘শোভাযাত্রা…’, পাঠবিক্রিয়া : মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

টি.এস. এলিয়ট তাঁর প্রবন্ধ ‘Tradition and the Individual Talent’-এ লিখেছেন, ‘The progress of an artist is a continual self sacrifice, a continual extinction of personality’

কবি নূরুল হুদার কবিতা সাধারণভাবে বিশ্লেষণ করতে গেলে এ-ধ্রুবপদটি মান্যতা পেয়ে যায়। হুদা তাঁর কবিতাকায়ার যে ব্রহ্মাণ্ড রচনা করেছেন, দুর্বিনীত আত্মক্ষয় না করে তা সাধন করা অসম্ভব। তাঁর কবিতাপাঠক মাত্রই জানেন, কেবল শবদে শবদে বিয়া দিয়েই তিনি তাঁর কবিকৃতি সারেননি, তাঁর কবিতার অগ্নিভ দক্ষিণার পশ্চাতে আছে তাঁর নিজস্ব চিন্তনের জগৎ, আছে কিংবদন্তি ও প্রতীকের মিথস্ক্রিয়া, অতীত আর বর্তমানের  মোহন বুনন, আছে আর্কিটাইপ বা পুরাণপ্রত্ন এবং আশ্চর্যজনকভাবে মিশেল ফুকো-কথিত ‘The empty affirmation that the author has disappeared’-এর ধ্রুবতা।

এইসব, এবং তদুপরি আরও কিছু নিয়ে নূরুল হুদার কাব্যভুবন।

তাঁর একটি মাত্র কবিতার অভ্র ও বিভা উন্মোচনের মধ্য দিয়ে আমরা উপলব্ধির চেষ্টা করব, আত্ম-উন্মোচনে তাঁর যে কন্দুক, কবিতা, তার জন্য তিনি কতটা রক্ত ঝরান, কতটা সম্ভ্রান্ত দক্ষিণা দেন তাঁর কাব্যনির্মিতির অভিপ্রায়কে উৎস থেকে মোহনায় নিয়ে আসতে।

‘শোভাযাত্রা দ্রাবিড়ার প্রতি’। এ-কবিতাটির শবব্যবচ্ছেদ আমাদের আপাতত প্রয়াস। কবিতাটির শিরোনাম নয় কেবল, ‘দ্রাবিড়া’ শব্দটি আমাদের মনোযোগী হতে বাধ্য করে। ভৌগোলিক সংজ্ঞায়নে কবি নূরুল হুদা উত্তরাপথের ঐতিহ্য লালন করেন। আরও বিশ্লেষণাত্মক হলে তাঁকে সমতটবাসী এবং যুগপৎ মাগধী ঐতিহ্যের ধারক বলতে হয়। আমাদের উপমহাদেশবিভক্তির কাল তো নেহায়েত সম্প্রতি। সিন্ধু, আর্য, অসট্রিক, ভোটচীনীয় ও দ্রাবিড়, মূলত এ-কয়টি বিন্যাসে স্থাপিত এ-উপমহাদেশের সভ্যতা সংস্কৃতি-ইতিহাস-ঐতিহ্য পরম্পরা, যা কিছু। নূরুল হুদার অন্বেষা বাঙালিয়ানার সঙ্গে উপমহাদেশের বৃহত্তর জনজীবনের মিথস্ক্রিয়াকে অনুধাবন, অনুসন্ধান, ও তাতে অবগাহন করা, তাঁর পাঠককে সেই অবগাহনে সামিল করা। তাঁকে যে ‘জাতিসত্তার কবি’ বলে চিহ্নিত করা হয়, তাঁর লাঞ্ছন তিনি এভাবেই অর্জন করেছেন।

শোভাযাত্রা। বৈষ্ণবকবিতার অভিসার কথাটির-ই যেন নবায়ন ঘটেছে কবিতাটির শিরোনামের এই শব্দভূষণে, আর ‘দ্রাবিড়’ শব্দটিতে কবি দ্বার খুলে দেন আমরা যাকে দাক্ষিণাত্য বলি, সেই জনপদের। গবাক্ষ থেকে মণিকুট্টিম, তার ঐতিহ্যকে। সঙ্গমসাহিত্য, কর্নাটকী সঙ্গীতের রাগমালা, তার নিজস্ব নৃত্যশৈলীর ভুবন, কাবেরী গোদাবরী তুঙ্গভদ্রার নদীমাতৃকতা, চোলদের নৌযান, মীনাক্ষীমন্দিরের জগমোহন, কাঞ্চীর চিরায়ত বস্ত্রবয়নশিল্পীর দল, এবং হ্যাঁ, মলয়মারুৎ। কানাড়া ছাঁদে কবরীবন্ধনের সাধ ছিল শ্রীরাধিকার, যা বৈষ্ণবকবিদের পদাবলীতে ব্যক্ত হয়েছে। হুদা সেই ‘বিমূঢ় অতীত’-কে মূর্ত করতে চাইছেন এ-কবিতায়।

সতেরোটি স্তবক-পর্যায়ে বিন্যস্ত এ-কবিতাটির সূচনাতেই সকাল, গোধূলি ও দ্বিপ্রহরের ত্রিমাত্রিকতা নিয়ে এসেছেন। তাঁর ‘লোহিত আঁধার’ শব্দবন্ধে আমরা থমকে যাই। হ্যামলেট যে কিতাবপ্রিয়তার চেয়েও স্নিগ্ধ দুর্বলতা দেখেছেন ‘Words, words, words’-এর মধ্যে, যথার্থ যোগ-অন্বিত হলেই শব্দের মধ্যে সেই ব্রহ্মকে শনাক্ত করা যায়। প্রথম স্তবকে শীতরাত্রির বিধুরতা আর বাক্প্রতিমানির্মাণ দেখে আমরা বুঝে যাই, কবির তূণীরে আছে লক্ষ্য অর্জনের সুবেদী তির। অমঙ্গলবোধে আকীর্ণ এই যে তার মুখরা, ‘কে পাপিষ্ঠ মুঠোভরে তুলে রাখে আমাদের বহতা সময়,’ তা ক্রম-উন্মোচিত হবে একটু একটু করে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের কবিতায় ছয়ের দশক, যে দশকের আগ্নেয় প্রতিভূ আমাদের আলোচ্য কবি, মিছে ছলনাকে বর্জন করতে শিখিয়েছে। ছয়ের কবিদের মধ্যে সামান্যলক্ষণ এটি। হাবীবুল্লাহ্ সিরাজীর পংক্তিনিচয় দেখে নিই একবার, ‘আমি ভূগোল ফেলে ইতিহাস হতে পারি। হতে পারি আর এক পৃথিবী।’ কিম্বা এর সঙ্গে মিলিয়ে নিই জাহিদুল হকের নির্মোহ পদাবলী, ‘পেঁজা মেঘ, তুমি ভেজা মেঘ, ডানা মেলে ছুঁয়ে যাও চোখ, এই সন্তাপ ঘোর/ ভাঙন, বিরহ, স্মৃতির নষ্ট গোর।’ হুদার নিজের কবিতায়, অন্যত্র, আমরা দেখি, ‘ঐ আসে জেদী সমকাল’ (মৃত্যু)। তারই সমলয়সম্পন্ন এ কবিতাটির অন্তরা ও আভোগ। আমরা দেখব।

কবিতাটিতে ধ্যানী সন্তের মত কবি কিছু ধ্রুবপদ, শাশ্বত বাণী, Quotable qoutes পুরে দিয়েছেন, যে সুভাষিতমালা আলোকস্তম্ভের মত বিতত নিশাদ্রাবী। একে একে সে-গুলোকে সাজানো গেলে একটি আলোকসেতু নির্মিত হতে পারে :

১. অদৃষ্টই ঠিকানার ভিন্নতর নাম।

২. ফুলের মৌসুম  এলে অকপটে খুলে যায় বৃক্ষের শরীর।

৩. শব্দ নয় শুধু মোম, শব্দ নয় সামগ্রিক অনিত্য দেয়াল।

৪. সময়ের মত দীর্ঘ দুঃখের মিনার।

৫. জীবন নৈকট্য নয়, এ জীবন দূরত্বও নয় জানি আর।

৬. বিনাশের কাল এলে প্রতিটি মানুষ পুন কর্মক্ষম হয়।

৭. রক্ত নয় কোনো দ্বিধা, রক্ত এক অবিমিশ্র জীবন শপথ।

৮. ইতিহাস গড়ে ওঠে ব্রীজে ব্রীজে সময়ের ধ্রুপদ সিঁড়িতে।

কবিতায় বিচ্ছুরিত এ-সকল হৈম সম্ভারের বৈভব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কবিতাটি। পাশাপাশি, কবিতা রচনাকালীন তাঁর স্বদেশ যে ইতিহাসের ভিসুভিয়াস থেকে অগ্নি-উদ্গার দিচ্ছে, তার তাপ এবং সন্তাপ-ও লেগে আছে পরিত্রাহি বেদনার মত।

দুর্বিনীত সে-কালটি ছিল অগ্নিগর্ভময় ও চোরা স্রোতে আতঙ্ক-কলুষের কুলগণ। কালান্তর। একদিকে নতুন স্বাধীন বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখছে, অন্যদিকে নিভৃতে  এক কালসাপ বর্ধিতায়তনিক মাত্রা অর্জন করে চলেছে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যায় যার পরিণতি, যাঁকে নিয়ে হুদা লিখবেন একদিন, ‘ফুরাবে না গঙ্গাধারা, ফুরাবে না বঙ্গভাষী কবিদের নিব,/ ফুরাবে না এই রক্ত, পিতা, তুমি যিসাস মুজিব।’ আমাদের আলোচ্য কবিতায় কবির সন্তরণ যদিও স্বতন্ত্র জলধিতে, তবু ‘যিসাস’ শব্দটির অনুষঙ্গে আমরা এ-মুহূর্তে কবির কবিতায় ইংরেজি শব্দ ব্যবহারের প্রবণতার দিকেও একটু অনুসন্ধিৎসার অবকাশ খুঁজে নিতে চাই।

হুদার বর্তমান কবিতাটিতে, এই-নামীয় কাব্যগ্রন্থটিতে এবং ব্যাপকভাবে তাঁর সমগ্র কাব্যগ্রন্থেই ইংরেজি শব্দকে তিনি প্রিয় কন্দুকের মত ব্যবহার করেন। সম্ভবত অন্য যে-কোনো বাঙালি কবির চেয়ে বেশি। এবং শব্দগুলি দ্যোতনাময় ও তীক্ষè শরের মতই সুপ্রযুক্ত, মণিময় ও বিভূত। এই কবিতাটিতেই গ্রুপ, ট্রাফিক, অ্যামবুশ, শিরাগ্রাফ, তৎসম ও ইংরেজি শব্দের মোহন সমাসবদ্ধতা লক্ষ্য করি। পুরো কাব্যগ্রন্থটিতে অনুরূপ বহু শব্দ পাই, ―ফায়ার, ট্রিগার, টাইমমেশিন, নেমপ্লেট, প্লাকার্ড, প্রিজম, এনাসথেশিয়া, পেশেন্ট, সার্জেন, স্কাইস্ত্রেপার, ইনফ্লেশন, পপুলেশন, এরকম। একদিকে আল মাহমুদ-সৈয়দ শামসুল হকের কবিতায় যখন উঠে আসছে বাংলার হৃৎকমল থেকে উদ্ধৃত আঞ্চলিক শব্দ-মোহর, পাশাপাশি নূরুল হুদা বাংলা কবিতাকে সাজাচ্ছেন ভিনদেশী শব্দের টায়রায়। দুই-ই অনুধাবনযোগ্য, প্রশংসনীয়, স্বাগত।

অতএব আমাদের ব্যাখ্যাধীন কবিতাটিতে যে ব্যারিকেড বুলেট বেয়নেট শব্দের আতিথ্য, যোগ্যতা ও পরিমিতি রয়েছে বলেই সে-শব্দের ঠাঁই নেওয়া। কবিরা শব্দের এপারথেডবিরোধী।

কিছু মৌল প্রশ্ন রেখেছেন কবি, পাঠকের ছদ্মবেশে নিজের কাছেই। আসলে প্রশ্ন বা সংশয় খোঁজার স্থলে উত্তর ও সমাধানকেই প্রকট করতে চান তিনি। ‘কে কবে স্রোতের সাথে ভেসে ভেসে খুঁজে পায় অচেনা ভুগোল’-এর বস্তুনিষ্ঠ উত্তর―সদর্থক হলেও মেটাফিজিকাল জবাব না, না, এবং না। এইখানে কলম্বাসে-শেক্সপিয়ারে পার্থক্য, যে শেক্সপিয়রের নায়ক ব্যাসানিওর (The Merchant of Venice) প্রাচ্যগামী জাহাজ ‘Tosses on the sea’, পৌঁছাতে পারবে কি পারবে না!

‘কে কবে গুঞ্জন নিয়ে অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠে বৃক্ষের গভীরে।’ প্রশ্নটি মৃদু হলেও তাৎপর্যে সীমাহীন। উপনিষদ আমাদের দৃষ্টিপাত করতে শিখিয়েছে হিরন্ময় পাত্রের ভিতরকার সত্য অনুসন্ধানে, কেননা পাত্রের বহিরঙ্গে নয়, সত্য রয়েছে হিরন্ময় পাত্রের গর্ভে। উপনিষদে বৃক্ষের কথা আছে, যে বৃক্ষ ঋজু দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের শেখায় স্তব্ধতার ভাষা, ‘বৃক্ষ ইব স্তব্ধো দিবি তিষ্ঠত্যেকঃ’। হুদার বিনির্মাণে ‘গুঞ্জন’ শব্দটি স্তব্ধতার চূড়ান্ত প্রতিস্পর্ধী হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর বির্নিমাণ নিয়ে পরে আমাদের আরও বিশদ হতে হবে। বিনির্মাণ হুদার কবিতার বিদ্যুৎ।

এ-পর্যন্ত আমরা কবিতাটির বহিরঙ্গ অবলোকন করেছি। এবার এর অন্দরে যাওয়া যাক।

আপাত-দুরূহ পংক্তির পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন পড়বে কবিতাটির অন্তঃস্থ কোরক-উন্মোচনে। এখানে জলস্থলঅন্তরীক্ষ, অতীত ও বর্তমান, সময় আর সময়হীনতা ও সর্বোপরি দেশকালহীন সময়ের অবয়বকে ধরেছেন কবি। Absolute-কে,  Sublime আর Ressurrection-কেও সেইসাথে। তাই রৌদ্রময় আকাশ, নৈরাজ্য, পশুপাখি, মাটির শিকড় ও নক্ষত্র যূথবদ্ধ এখানে। এমনকি ভারহীন মহাকর্ষ, ‘সময়ের মত দীর্ঘ দুঃখের মিনার (‘There is no greater sorrow/ Than to be mindful of the happy time/ In misery’,-দান্তে), এ সমস্ত কিছু উল্লম্ব ও আয়ত হয়ে জড়িয়ে আছে কবিতাটিতে।

কবিতার দশম স্তবকে এসে ‘রাণী’ বলে সম্বোধন করেন যাকে কবি সেখানে মহাজাগতিক তত্ত্ব ‘Big Bang Theory’, যা কিনা মহাবিশ্বকে দূর থেকে দূরে ক্রমবিস্তার দিয়ে চলছে, করেই চলছে, তার প্রত্নচিহ্ন ধরা পড়ে। তাতে কবির উপলব্ধিতে আবার উপনিষদের অমেয় সমার্থকতা। উপনিষদ পরম ব্রহ্মকে বলছে―তিনি ( অর্থাৎ ব্রহ্ম) দূরে এবং নিকটে (‘তদ্দূরে, তদ্বন্তিকে’)। হুদাও জানেন, ‘জীবন নৈকট্য নয়, বা জীবন দূরত্বও নয় জানি আর।’ এ-কবিতায় সিম্বলিজম-এর অনুধ্যান প্রায় অনিবার্যতায় নিয়ে এসেছেন হুদা, ম্যালার্মে-প্রমুখ কবিমনীষী যে প্রস্থানে সতত আস্থাবান ছিলেন। তার সঙ্গে অধিকন্তু যুক্ত হয়েছে মিথ। প্রত্নপুরাণ। মিশেল ফুকো-প্রশংসিত মিথমাহাত্ম্যকে আমরা স্মরণ করে নিই এই সুযোগে, `A certain number of notions that are intended to replace the privilged position and of the author actually seem to preserve that privilege and suppress the real meaning of his disappearance.’ কবিতাটির আদিতে, মধ্যে এবং অন্তে রয়েছে মিথ-এর কারুকাজ ও কলমকারি। ‘হে মৈনাক, শির তোলো তোমার শরীর জুড়ে পুনর্বার নিজেকে সাজাই;, অথবা ‘আদিগন্ত ফেনা তোলে কালোসাপ, কালের তর্জনী/ যেন এ বধ্যভূমি প্রেতাত্মার তীরে তীরে লোহিত আঁধার’ সতত মিথপ্রিয় নূরুল হুদাকে চিনিয়ে দেয়। এবং একই সাথে বিনির্মাণ―Deconstruction-এর নন্দিত রূপকার-ও তিনি। এ-কাব্যের ‘মৃত্যু’ কবিতায় লাবণ্য ছড়িয়েছে দুটি অতুলনীয় বিনির্মাণ।

১ একাকী লণ্ঠন হাতে যে- ‘বামী’ হারিয়ে যায় সিড়িঁর গোড়ায়, আর ২. মৃত্যু নয় তোমাদের দেবতার গ্রাস।’

কুঁড়ি থেকে ফুল ফোটার মত অনায়াস সহজতায় কবিতা আসবে, কীটস্-এর অভীপ্সা এরকম-ই। বিপরীতটাও সত্যি―তিলে তিলে গঠিত হয় কবিতার তিলোত্তমা। সুচারু ধ্যান, সন্তের যোগাভ্যাস, গর্ভধারিণীর আয়াস ও প্রযত্ন এবং অন্তিমে বাক্ ও অর্থের মরমী সংযুক্তি একটি যথার্থ কবিতার জনক। বহু মেধা এর পিছনে ক্রিয়াশীল, যেজন্য কবি ক্রান্তদর্শী নামে আখ্যাত। বর্তমান কবিতাটি সমুদয় নান্দনিক দাবি পূরণ করে পাঠকের শিয়রে জেগে থাকে পদ্মগন্ধে বিধুর মৌমাছির মত। এ-কবিতা নির্মাণ, ও সেই সঙ্গে সৃষ্টি।

চিত্রকল্পনির্মাণেও কবির প্রযত্ন কবিতাটিকে ফুল্লকুসুমিত করেছে। চিত্রকল্পনির্মাণে হুদা বাংলা কাব্যভুবনে বিশিষ্ট, তাই তাঁর কাব্যে রচনার হীরকাঙ্গুলিরূপে উপহার দেন এমতো পংক্তিমালা :

১ ঐশ্বর্য গর্জে ওঠে উজ্জ্বল সকালে।

২. তুমি কোথা গরীয়সী নীরক্ত প্রকোষ্ঠে একা জ্বেলে দাও দীপ।

৩. মুখর পাখির ঝাঁক ফেরে নাই সন্ধ্যায় উপত্যকায়।

৪. এ-নিশীথে জেগে রয় নক্ষত্রের নার্স।

৫.আদিম বটের ছায়া ঝুঁকে আছে চিঠিপড়া দেয়ালের গায়।

৬. একটি বিব্রত পাখি সারাক্ষণ ওড়ে শুধু ঘুরে ঘুরে ওড়ে।

৭. আদিম বটের ছায়া, অপরাহ্ন, তৃণাস্তৃত মাঠ।

৮. প্রিজমের মতো স্থির সারি সারি কণ্ঠ হত বিমূর্ত মানুষ।

৯. আলোর পর্দায় কাঁপি।

১০, আদিগন্ত ফণা তোলে কালোসাপ।

১১. গুরুভার উরু মেলে নিরাসক্ত শুয়ে থাকো তুমি স্বর্ণনিভ।

১২. জোসনায় পড়ে আছে স্বজনের হাড়।

কবিতায় কবি হুদা যে-ব্যাপ্ত চরাচর, ইতিহাস-প্রাগিতিহাস ও মানবসভ্যতার করোটিকঙ্কালকে ছুঁয়েছেন, বাংলা কাব্যজগতে তা পূর্বরহিত। কবিকে অপূর্ব নির্মাণক্ষম হতে হবে, ভারতীয় নন্দনতত্ত্বের নিদান। পরমা সিদ্ধি একমাত্র তাতেই সম্ভব। সমস্ত সংজ্ঞা আর কবিতার স্বরূপবিষয়ক তত্ত্ব-জটিলতা সত্ত্বেও কবিতা তো এখনও প্রকৃতপ্রস্তাবে নিঃসঙ্গ। মাঝে মাঝে প্রকৃত কবিতার কাছে এসে দাঁড়ালেই তা উপলব্ধ হয়। জাগরণ হেমবর্ণ! প্রকৃত সারস উড়ে গেছে। সত্যিকার কবিতা বস্তুত ‘পিঠার পেটের ভাগে ফুলে ওঠা তিলের সৌরভ’, যে সৌরভ  ‘শোভাযাত্রা দ্রাবিড়ার প্রতি’ কবিতার রন্ধ্রে কালপুরুষের শিরা হয়ে প্রবহমান।

আমরা এই কবিতাটির সরণী বেয়ে কবির আমরা তামাটে জাতি, এবং শুক্লা শকুন্তলা-য় অবগাহন করলে জাতিসত্তার কবির স্বারূপ্য হৃদয়ঙ্গম বৃহত্তর অবকাশে করতে পারবো।

শোভাযাত্রা : পরিশিষ্টবচন

কবির শোভাযাত্রা অন্তিম নয়, অন্তহীন, দ্রাবিড়াকে নিয়ে। জীবনানন্দের যেমন কুসুমের মাস শেষ হয় না বনলতাকে নিয়ে। বার বার ঘুরেফিরে আসে নানান নামে, নানান ধামে। হুদা-ও কখনও ক্যামেলিয়া, কখনও গায়ত্রী (‘স্বর্গ চাই না, নামবো নরকে―পঙ্কে/থাকুক জগৎ তোমার আমার বৈরী’! আহা!)  শেফালিকা, প্রিয়াঙ্কা ( যে কিনা ‘না কিশোরী না যুবতী না প্রৌঢ়া না বৃদ্ধা’) নামের বুননে অভিযাত্রিক হন সেই একমেব দ্রাবিড়ার দিকে। Yarrow Revisited-এর মত অতএব। ১৯৭৫-এর পর দীর্ঘ কাব্যপ্রবাসশেষে ১৯৮৪-তে এক দশকের ব্যবধানে ‘দ্রাবিড়ার প্রতি উত্তর তিরিশে’-তে তিনি লেখেন, ‘প্রশান্ত সৌন্দর্য তুমি যদি দেখালেই কেন সঙ্গে নিয়ে এলে নিজের সমাজ?/ সৃষ্টিতে সৃষ্টিতে যদি মিল থাকে, তবে/ তোমার আমার মিল একদিন হবে।’

মিল হয়েছে কিনা আমরা জানতে উৎসুক।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares