ধারাবাহিক জীবনকথা : যে জীবন আমার ছিল : ইমদাদুল হক মিলন

সপ্তম পর্ব

একটা সময়ে সমরেশ বসু আমার আদর্শ হয়ে ওঠেন। তাঁর লেখা গল্প উপন্যাস আমাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। যে হাতে তিনি লেখেন গঙ্গা, বিটি রোডের ধারে, শ্রীমতি কাফে, বা কালকূট, ছদ্মনামে অমৃত কুম্ভের সন্ধানে, বা কোথায় পাবো তারে, বা শাম্বর মতো উপন্যাস আবার সেই হাতেই লেখেন বিকেলে ভোরের ফুল, বা ছুটির ফাঁদে। গল্প লেখেন ‘পাড়ি’, ‘মানুষ রতন’, ‘শানাবাউরির কথকতা’, ‘পাপ পূণ্য’, ‘অকাল বসন্ত’, ‘কে নেবে মোরে’। তাঁর লেখার এই বৈচিত্র্য যেমন আমাকে মুগ্ধ করে তেমন মুগ্ধ করে তাঁর জীবনাচরণ। অতিকষ্ট এবং সংগ্রামের জীবন থেকে তিনি যখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে বাস করছেন, তখন তাঁর জীবনযাপন হয়ে ওঠে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তাঁর চেহারা নায়কোচিত। চালচলন পোশাকআশাক নায়কোচিত। এক সিনেমার অনুষ্ঠানে গিয়েছেন, সেখানে আছেন উত্তমকুমার আর সুচিত্রা সেনের মতো চিরকালীন জনপ্রিয় জুটি। সমরেশ বসুর বিভাস উপন্যাস চলাচ্চিত্রায়িত হয়েছে। সেই চলচ্চিত্রের নায়ক উত্তমকুমার। ভারি সুন্দর একটা গান ছিল সিনেমাটিতে। গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। গানের দৃশ্যটি আমার চোখে লেগে আছে। বিভাস চলচ্চিত্রে উত্তমকুমার যে ঘরে থাকেন, সেই ঘরের বারান্দায় এসে পড়েছে চাঁদের স্নিগ্ধ আলো। বারান্দার মেঝেতে বসে থামে হেলান দিয়ে গান গাইছেন প্রেমিক উত্তমকুমার। ‘এতদিন পরে তুমি, গভীর আঁধার রাতে, মোর দ্বারে আজ এলে বন্ধু, ঠিকানা কোথায় পেলে বন্ধু।’ সমরেশ বসুর বাঘিনী উপন্যাসের সিনেমায় নায়িকা ছিলেন সন্ধ্যা রায়। লতা মুঙ্গেশকরের চমৎকার গান ছিল সেই সিনেমায়। ‘যদিও রজনী পোহালো তবু ওই, দিবস কেন যে এলো না’। গঙ্গা সিনেমা করেছিলেন তপন সিংহ। চিত্রশিল্পী, কবি ঔপন্যাসিক, বহুরকম লেখার লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা পূর্ণেন্দু পত্রী করেছিলেন ‘ছেঁড়া তমসুক’।  ‘পাড়ি’ গল্প পাড় নামে সিনেমা করলেন গৌতম ঘোষ। অভিনয় করলেন শাবানা আজমী, নাসিরুদ্দিন শাহ, ওমপুরি, উৎপল দত্ত। বিকেলে ভোরের ফুল কলকাতায় সিনেমা হয়েছিল। ছুটির ফাঁদে হলো ঢাকায়। পরিচালক আমার বাবুলদা, মানে শহীদুল হক খান। কলকাতার নায়িকা আরতী অভিনয় করলেন। কালকূট ছদ্মনামে লেখা নির্জন সৈকতেও সিনেমা হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর পত্র সিনেমা করে বিখ্যাত হয়েছিলেন পূর্ণেন্দু পত্রী। প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে তাঁর তুলনা হয় না। একবার ঢাকায় এলেন পূর্ণেন্দুদা। উঠেছেন ঢাকা ক্লাবে। আমি গিয়ে ধরলাম আমার বইয়ের দুটো কাভার করে দেওয়ার জন্য। তিনি কথাও দিলেন। তারপর বেমালুম ভুলে গেলেন। ইচ্ছে করেই ভুললেন নাকি সত্যিকারের ভুল, আমি বুঝতেই পারিনি।

সিনেমার অনুষ্ঠানগুলোতে জনপ্রিয় জুটিকে পেলে সবসময়ই ফটোগ্রাফাররা ছবি তুলতে ব্যস্ত হন। সেই অনুষ্ঠানেও তাই হলো। সুচিত্রা সেনকে গিয়ে এক ফটোগ্রাফার অনুরোধ করলেন, আপনার নায়ক এখানে আছেন। যদি দয়া করে আপনি তাঁর পাশে দাঁড়ান, তা-হলে আমি আপনাদের কিছু ছবি তুলতে পারি।

সুচিত্রা সেন উত্তমের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললেন, এখানে আমার আরেকজন নায়কও আছেন। সমরেশ বসু। তাঁকেও ডাকুন।

তারপর ছবি তোলা হলো। সুচিত্রা সেনের এক পাশে উত্তমকুমার, আরেক পাশে সমরেশ বসু।

সুচিত্রা সেন কি বলেছিলেন এই কথা, নাকি মাধুবী মুখার্জি! আমার ভুলও হতে পারে। এই দুই নায়িকার যেকোনও একজনের হতে পারে।

সমরেশ বসুকে বলা হতো বাংলা সাহিত্যের যুবরাজ। এই যুবরাজ এক সময় বাড়িতে বসে লিখতে অসুবিধা হয় বলে লেখার জন্য হোটেলে গিয়ে উঠতেন। হোটেলে থেকে নিভৃতে নিজের লেখাগুলো লিখতেন। এই ব্যাপারটা আমাকে খুব আকৃষ্ট করেছিল। ফেব্রুয়ারি বইমেলার আগে প্রকাশকদের এমন চাপে পড়তাম, বাসায় থাকাই যায় না। থাকি গেণ্ডারিয়াতে। ওই এলাকায় আমার অনেক প্রকাশকও থাকেন। গেণ্ডারিয়া থেকে বাংলাবাজার খুব কাছে। যখন তখন প্রকাশকরা চলে আসেন বাসায়। যে কোনও লেখকের জন্য এ এক বিশাল সৌভাগ্যের ব্যাপার। টাকা এডভান্স দিয়ে যাচ্ছেন, সঙ্গে লেখার তাগিদ। পাশাপাশি ছোট্ট দুটো ফ্ল্যাট নিয়ে থাকি। একটায় থাকা খাওয়া বসবাস আরেকটায় লেখালেখি। পাঁচ ছয় শ স্কয়ার ফিটের হবে লেখার ফ্ল্যাটটি। কিছু বইপত্র আর লেখার টেবিল। ভোর ছয়টায় উঠে সেই ফ্ল্যাটে ঢুকে যাই। এক ফাঁকে পাশের ফ্ল্যাটে গিয়ে নাশতা করে আসি। কাজের মেয়েটি চা দিয়ে যায়। তখন বেদম সিগ্রেট খাই। চা সিগ্রেটের সঙ্গে কলম চলছে। দুপুর পর্যন্ত এইভাবে লিখি।

শুনেছি সমরেশ বসুও এইভাবেই লিখতেন। সন্ধ্যার পর আর কলম ধরতেন না। ওই সময়টা আনন্দ করার। আড্ডা আর পানাহারের সময়। আমিও সন্ধ্যার পরে লিখতাম না। অর্থাৎ সমরেশ বসুর সবকিছুই কপি করা।

এই অবস্থা শুরু হয়েছিল নব্বই সালের পর। ঈদের সময় ‘ঈদসংখ্যায়’ লেখার চাপ। বইমেলার সময় প্রকাশকদের চাপ। প্রকাশক এবং পত্রিকার চাপে দিনে ছয় সাত আট ঘণ্টা মাথা গুঁজে লিখি। সংসার চালাবার জন্য প্রকাশকদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিতে শুরু করেছি। কারণ বই বেরিয়ে যাওয়ার পর কোনও কোনও প্রকাশককে দীর্ঘদিন খুঁজে পাই না। বইয়ের একটা দুটো এডিশন শেষ হয়ে গেছে কিন্তু রয়্যালটির টাকাটা ঠিকমতো দিয়ে যাচ্ছেন না। এই কারণে এডভান্স নেওয়া শুরু করেছিলাম। যে পরিমাণ এডভান্স নেব রয়্যালিটি থেকে তা এডজাস্ট হবে।

একই কাণ্ড হয়েছিল পত্রিকাগুলোর ক্ষেত্রে। ঈদসংখ্যা বেরিয়ে যাওয়ার পর লেখার পারিশ্রমিক পেতে জান বেরিয়ে যায়। সেই কারণে পত্রিকা থেকেও এডভান্স নিতে শুরু করেছি। আর এডভান্স নেওয়ার বিপদ হলো, লিখতে বাধ্য। যেমন করেই হোক একটা কাহিনি ফেঁদে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে যেতে হবে। এই করতে গিয়ে বিস্তর ট্র্র্যাস লিখতে হয়েছে।

সমরেশ বসুর ক্ষেত্রেও একই কাণ্ড ঘটেছিল। প্রকাশক আর পত্রিকার চাপে বাড়িতে থাকাই মুশকিল। তিনি গিয়ে উঠতেন হোটেলে। বলতে গেলে পালিয়ে থাকা। বাড়িতে বলা থাকত কেউ যেন না-জানে তিনি কোথায় আছেন।

আমিও ও রকম শুরু করলাম। ব্যাগে কিছু কাপড় চোপড় আর কাগজ-কলম নিয়ে গিয়ে উঠতাম শান্তিনগরের ‘হোয়াইট হাউজ’ হোটেলে। হোটেল মালিক পরিচিত। তিনি সপরিবারে থাকেন আমেরিকায়। মাঝে মাঝে দেশে আসেন। ছিমছাম সুন্দর পরিবেশে হোটেল করেছেন। একজন লেখক তাঁর হোটেলে বসে লিখবেন শুনে রুমভাড়া অর্ধেক করে দিলেন। আমি দু-চার ঘণ্টা লিখি। দু-চার ঘণ্টা ঘুমাই। হোটেল থেকে সন্ধ্যাবেলায় আড্ডা দিতে চলে যাই বন্ধুদের সঙ্গে। আড্ডা দিয়ে হোটেলে ফিরে আসি। তখন তো আর মোবাইল ফোন নেই। বাসায় ল্যান্ডফোন আছে। দিনে একবার বাসায় যোগাযোগ হয়। এক ভিন্ন স্বাদের জীবন।

বিরানব্বই সালের কথা। ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি। আমার গেণ্ডারিয়া বাসার ঠিকানা জোগাড় করে সিনেমার একজন পরিচালক এলেন একদিন। নম্র বিনয়ী ভদ্রলোক। নাম মঈনুল ইসলাম। ববিতা, জাফর ইকবালকে নিয়ে একটি সুন্দর প্রেমের ছবি করেছেন। ছবিটি বাণিজ্য সফল। আমার লেখা মঈনুল সাহেব নিয়মিত পড়েন। তাঁর খুব ইচ্ছা আমাকে দিয়ে কাহিনি আর চিত্রনাট্য লিখিয়ে সিনেমা করবেন। বিশ হাজার টাকা এডভান্স নিয়ে এসেছেন।

তখনকার দিনে সিনেমার চিত্রনাট্য লেখবার কিছু ‘কেতা’ ছিল। লেখককে ভালো একটা হোটেলে তুলতেন পরিচালক বা প্রডিউসার। তাঁর থাকা খাওয়া পান করার অভ্যাস থাকলে পান করানো সবকিছুর দায়িত্ব তাদের। লেখকের দায়িত্ব শুধু লিখে যাওয়া। লেখা শেষ হলে বাকি পারিশ্রমিক সঙ্গে সঙ্গেই দিয়ে দেওয়া হয়।

চিত্রনাট্য লেখার এইসব কাহিনি আমি শুনেছি। তখনকার যাঁরা খুব জনপ্রিয় সিনেমার কাহিনিকার বা চিত্রনাট্যকার, তাঁরা এইভাবে হোটেলে বসে লেখেন। বিষয়টির প্রতি আমার একটা আকর্ষণও ছিল। মঈনুল সাহেবের কথায় রাজি হয়ে গিয়ে উঠলাম ‘হোয়াইট হাউজ’ হোটেলে। তিনি আমাকে রুমে তুলে দিয়ে, অন্যান্য সব ব্যবস্থা করে দিয়ে চলে গেলেন। প্রতিদিন সন্ধ্যায় এসে খোঁজ খবর নেবেন কতটা এগোল লেখা।

তখনও পর্যন্ত আমি জানিই না চিত্রনাট্য কেমন করে লিখতে হয়! টেলিভিশন নাটক লিখেছি। ধরে নিয়েছি লেখার পদ্ধতিটা ওরকমই। কিন্তু জমজমাট কোনও কাহিনিই খুঁজে পাই না। টেবিলে কাগজ-কলম সাজানো। ঘন ঘন চা খাই আর সিগ্রেট টানি আর হোটেল রুমে পায়চারি করি। কখনও চিৎ হয়ে শুয়ে থাকি নরম বিছানায়। কিন্তু গল্প খুঁজে পাই না।

একদিন কাটে, দুদিন কাটে একটা লাইনও লিখতে পারি না। মঈনুল সাহেব সন্ধ্যার দিকে এসে খবর নেন অথবা ফোন করেন। তাঁকে বুঝ দিই, এই তো হচ্ছে ভাই, অনেক দূর এগিয়েছি। তিনি কতটা বিশ্বাস করেন, কতটা করেন না বুঝতে পারি না। ভদ্রলোক মানুষ, লিখে খাতা কতটা ভরিয়েছি তা তো আর চেক করতে পারেন না। তবে রুমে এসে আড়চোখে লেখার টেবিলের দিকে তাকান। আমি সারাজীবন রুলটানা কাগজে লিখি। রুলটানা খাতা কিনে আনি রজনী চৌধুরী রোডের অরুণের লাইব্রেরি থেকে। এক শ ষাট পৃষ্ঠার খাতা গুছিয়ে রাখা টেবিলের ওপর। সেই খাতায় লেখা হয়েছে কি হয়নি তা কি কোনও ভদ্রলোক চেক করে দেখতে পারেন! তবে তিনি বোধহয় অনুমান করছিলেন, লেখা এগোচ্ছে না। দুয়েকবার কাহিনি জানতে চেয়েছেন, আমি গুছিয়ে বলতে পারিনি। আবোল তাবোল বলে বুঝ দিয়েছি।

দুদিন পর এক ঘটনা ঘটল।

কয়েকমাস আগে, বর্ষাকালে সিলেটে একটি বইমেলা হয়েছিল। সেই বইমেলা উপলক্ষে ‘শিখা প্রকাশনী’ থেকে আমার উপন্যাস বেরিয়েছে। উপন্যাসের নাম তুমি আমার। ‘নীলু’ নামের এক অসহায় দরিদ্র যুবককে নিয়ে লেখা। বড়লোক আত্মীয়র বাড়িতে আশ্রিত থেকে পড়াশোনা করে। অত্যন্ত সৎ এবং নিরীহ যুবক। মায়াবী মুখখানি। মিথ্যে কাকে বলে জানে না। অন্যদিকে এই বাড়ির মালিকের ইউনিভার্সিটি পড়া মেয়েটি একটু দুরন্ত স্বভাবের। দুজনের সম্পর্ক নিয়ে আবেগপূর্ণ লেখা। পরে এই উপন্যাস নীলু নামে বাংলাদেশ টেলিভিশনে নাটক হয়। অভিনয় করেন জাহিদ হাসান আর বিপাশা হায়াত। যায়যায়দিন সাপ্তাহিক পত্রিকাটি তখন অনেকগুলো ক্ষেত্রে লেখক শিল্পী, পরিচালক গায়কদের বর্ষসেরা পুরস্কার দিতেন। ‘নীলু’র নাট্যকার হিসেবে আমি পুরস্কার পেয়েছিলাম।

শিখা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম বাহার। বয়সে আমার চেয়ে ছোট। বিদেশ থেকে এসে বাবার ব্যবসা বুঝে নিয়েছেন। সিলেটের বইমেলায় বাহার ও অন্য প্রকাশকরা আমাকেও নিয়ে গেলেন। সিলেটের বিখ্যাত ‘মুসলিম সাহিত্য হল’ এ বইমেলার আয়োজন। দশ পনেরোটি বইয়ের স্টল হয়েছে। জনসমাগম বিপুল। একে বর্ষাকাল, তার ওপর সিলেট হচ্ছে বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা। সারারাত ঝুমঝুম করে বৃষ্টি হয়। দিনেরবেলা রোদ। তখনও পর্যন্ত বছরে আমার বই হাজার বারো শ’র বেশি বিক্রি হয় না। কিন্তু সিলেট বইমেলা উপলক্ষে লেখা বইটি তুমি আমার কয়েক মাসে সোয়া দুই হাজার কপি বিক্রি হয়ে গেল। প্রকাশকরা চমকিত এবং বিস্মিত। চর চর করে আমার দাম চরতে লাগল। কদর বেড়ে গেল প্রকাশকদের কাছে। নতুন নতুন প্রকাশক আসতে লাগলেন পাণ্ডুলিপির জন্য।

সিলেটের সেই বইমেলায় একটি বিশেষ আয়োজন ছিল আমাকে নিয়ে। ‘লেখক পাঠক মুখোমুখি’। পাঠকরা প্রশ্ন করবেন, লেখক জবাব দেবেন। সেই অনুষ্ঠানে এক যুবক একটি বিচিত্র অনুরোধ করল। যুবকটির নাম জুয়েল। সে কলেজে পড়ে। হলভর্তি দর্শক স্রোতার মাঝখান থেকে সে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘আমি একটি মেয়ের সঙ্গে প্রেম করি। তার নাম তানিয়া। আপনি যদি আপনার কোনও উপন্যাসে নায়ক নায়িকার নাম জুয়েল আর তানিয়া রাখেন তা-হলে আমরা খুব খুশি হবো। আপনি কি আমার এই অনুরোধটা রাখবেন ?’

আমি হাসতে হাসতে কথা দিলাম, রাখব। হলভর্তি মানুষ আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল। হোয়াইট হাউজ হোটেলে মঈনুল সাহেবের জন্য চিত্রনাট্য লেখার কাজে এসে কেন যে জুয়েলের কথা মনে পড়ছিল বুঝতে পারি না।

পরদিন সকাল এগারোটার দিকে রিসেপশন থেকে ফোন এল, স্যার, আপনার সঙ্গে মিস্টার বাহার দেখা করতে এসেছেন।

বুঝলাম আমার প্রকাশক বাহার। কিন্তু সে কী করে জানল আমি এখানে আছি ?

বাহারকে রুমে ডাকলাম। সে বলল, দু-তিন দিন ধরে খুঁজে আমাকে পাচ্ছে না। ফলে অনুমান করেছে আমি এই হোটেলে গা-ঢাকা দিয়ে লিখছি। কারণ আগেও দুবার এই হোটেলে থেকে লিখেছি। আমার হাতে বিশ হাজার টাকা গুঁজে দিয়ে বলল, বইমেলা এসে গেছে, আমাকে একটা চার পাঁচ ফর্মার উপন্যাস লিখে দিন।

সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথা থেকে মঈনুল সাহেবের চিত্রনাট্য লেখার বিষয়টি উধাও হয়ে গেল। আগের দিন থেকে সিলেটের সেই জুয়েলের কথা মনে আসছিল। বাহার চলে যাওয়ার পর গোসল করে, রুমে খাবার আনিয়ে খেয়ে অত্যন্ত খোশমেজাজে সিগ্রেট টানতে টানতে আচমকাই লিখতে শুরু করলাম। প্রথম দু-তিনটি লাইন লিখলাম কিছু না-ভেবেই। ‘বিনু ডান পা টেনে টেনে হাঁটছে। ব্যাপারটা হঠাৎ করেই খেয়াল করল জুয়েল। অবাক হলো, কী হয়েছে ?’ গরগর করে লেখা এগোতে লাগল। ক্রমশ একটি ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনি হয়ে দাঁড়াল। জুয়েলের প্রেমিকা তানিয়া এসে হাজির হলো। কাহিনি ভাবিইনি, কলমই যেন তৈরি করছে কাহিনি। আমি যেন কিছু জানিই না। লেখা হয়ে যাচ্ছে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা।

সেই সন্ধ্যায় মঈনুল সাহেব এসে দেখেন আমি টেবিলে মাথা নিচু করে লিখছি। দেখে তিনি খুশি। ভাবলেন নিশ্চয় তাঁর চিত্রনাট্য বহুদূর এগিয়ে গিয়েছে। চা খেয়ে হাসিমুখে বিদায় নিলেন। একটানা চার দিন উন্মাদের মতো লিখে শেষ করলাম উপন্যাস। নাম দিলাম ভালোবাসার সুখ দুঃখ। যে কোনও লেখা শেষ হলে এক ধরনের স্বস্তি হয় লেখকের। এ ক্ষেত্রে স্বস্তির চেয়ে আমার অস্বস্তি হতে লাগল বেশি। প্রকাশকের কাজ তো করে ফেলেছি, সিনেমার পরিচালকের কাজের কী হবে ? বিশ হাজার টাকা এডভান্স দিয়েছেন। হোটেলেও নিশ্চয় আট দশ হাজার টাকা বিল হয়ে গেছে। অঙ্কটা বেশ বড়। সিগ্রেট টানতে টানতে ভাবলাম, সত্য কথাটা আজ মঈনুল সাহেবকে বলে দেব। তারপর আজই হোটেল ছেড়ে বাসায় চলে যাব। কিন্তু মঈনুল সাহেব আজ আসবেন কি না তা তো জানি না। ফোন করলাম তাঁকে। সন্ধ্যায় তিনি এলেন। চা খেতে খেতে ঘটনা তাঁকে বললাম। ‘আপনার কাজটা আমি করতে পারিনি মঈনুল ভাই। চেষ্টা কিছুটা করেছি, হয়নি। এই ফাঁকে ছোট একটা উপন্যাস লিখেছি। কাহিনিটা এই রকম …।’ কাহিনি শুনে তিনি মুগ্ধ। আরে, এই গল্পই তো আমি সিনেমা করতে পারি। এটাই আপনি চিত্রনাট্য করে দিন।

ঠিক আছে, করে দেব। কিছুদিন সময় দিন। হোটেলে থাকতে হবে না। বাসায় বসে নিজের মতো কাজটা করে আপনাকে জানাব।

হোটেলের বিল পরিশোধ করে মঈনুল ভাই চলে গেলেন। কিন্তু ভালোবাসার সুখ দুঃখ সিনেমাটি তিনি করতে পারেননি। তার আগেই আমেরিকায় চলে গেলেন। অসুস্থ হয়েছিলেন। মাসখানেক পর আমার বাসায় ফোন করে বললেন, তাঁর পক্ষে হয়ত কাজ করা সম্ভব না। শরীর খারাপ যাচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই টাকার প্রসঙ্গটা তুললেন না। এত ভদ্রলোক মানুষ! তবে তাঁর টাকা আমি ফেরত দিয়েছিলাম। পুরোটাই, হিসেব করে। তিনি নিতে চাননি। জোর করেই দিয়েছি।

তিরানব্বই সালের বইমেলায় ভালোবাসার সুখ দুঃখ এক ইতিহাস তৈরি করল।

তখন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক প্রফেসর মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ। বইমেলায় তিনি একটা নতুন পদ্ধতি চালু করলেন। প্রতি সপ্তাহে ‘বেস্ট সেলার’ তালিকা প্রকাশ করা হবে। কোন বই সবচাইতে বেশি বিক্রি হয়েছে সেই তালিকা। প্রথম সপ্তাহে ভালোবাসার সুখ দুঃখ বেস্ট সেলার হলো। পত্রিকাগুলো নিউজ করল। তখন বাংলাদেশে একটাই টেলিভিশন চ্যানেল, ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন’। বইমেলা নিয়ে প্রতিরাতেই সংবাদ প্রচার করে বিটিভি। সেই সংবাদেও এল ভালোবাসার সুখ দুঃখর কথা। বেশ একটা হইচই শুরু হলো বইটি নিয়ে। ফার্স্ট এডিশন ছাপা হয়েছিল সোয়া দুই হাজার। বেস্ট সেলার হয়ে গেছে শুনে রাতারাতি বইটি আমি আবার রিরাইট করলাম। চার ফর্মা থেকে বই হয়ে গেল পাঁচ ফর্মা। বিশ না পঁচিশ টাকা দাম। পরের সপ্তাহে সেকেন্ড এডিশন হলো। ছাপা হলো পাঁচ হাজার কপি।

তখনও পর্যন্ত আমার কোনও বইয়ের পাঁচ হাজারি এডিশন হয়নি। আশ্চর্য ব্যাপার, দুদিন পর বাহার হাসিমুখে বইমেলায় আমাকে বলল, বই শেষ। আজ থার্ড এডিশন ছাপতে দিচ্ছি। বইমেলায় যেরকম চাহিদা দেখছি আর মফস্সল থেকে যেভাবে অর্ডার আসছে, থার্ড এডিশন দশ হাজার ছাপব।

শুনে আমি বিস্মিত। মুখে কোনও কথা জোটে না।

থার্ড এডিশন দশ হাজার ছাপা হলো। রাতারাতি এই পরিমাণ বই বাইন্ডিং করা অসম্ভব। পাঁচটি বাইন্ডিং কারখানায় বাইন্ডিং করতে দেওয়া হয়েছে। বাইন্ডিং ব্যাপারটা সহজ নয়। বাইন্ডিং করে বই কয়েক দিন চাপা দিয়ে রাখতে হয়। আঠা শুকাবার ব্যাপার আছে। কাঁচা বই বাজারে নিয়ে এলে বাইন্ডিং খুলে যাবে। কিন্তু উপায় নেই। বই নিয়ে যে কাণ্ড শুরু হয়েছে, প্রকাশক কাঁচা বই-ই বাজারে নিয়ে আসতে লাগলেন। আক্ষরিক অর্থেই ভালোবাসার সুখ দুঃখর জন্য বইমেলায় ‘শিখা প্রকাশনী’র স্টলে পাঠকরা লাইন ধরছেন প্রতিদিন।

তারপর প্রতি দুদিন তিন দিন পর পর দশ হাজার করে ছাপা হতে লাগল ভালোবাসার সুখ দুঃখ। বইমেলায় হইচই পড়ে গেল।

আমার টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করে ইবনে হাসান খান নামে মহাউদ্যমী এক যুবক। যেমন স্মার্ট তেমন কর্মঠ। নিজের কয়েকজন বন্ধু নিয়ে বইমেলায় তারা ‘বিনোদন’ নামে একটা স্টল করেছে। বাংলা একাডেমির পশ্চিম উত্তর পাশে, পুকুরের ধারে সিঙ্গেল ইউনিটের স্টল। সেখানে শুধু আমার বই বিক্রি হয়। একজন লেখকের একক স্টল। আমি সেই স্টলে বসে অটোগ্রাফ দিই। স্টলের সামনে ব্যাপক ভিড় হতে লাগল। সেবারের বইমেলা উপলক্ষে আমার আরেকটি প্রেমের উপন্যাস বেরিয়েছে সুপুরুষ নামে। এই উপন্যাসটির কোনও খবরই নেই। বিক্রি হচ্ছে শুধু ভালোবাসার সুখ দুঃখ। আশপাশের দোকানে কোনও ভিড়ই নেই, সব ভিড় বিনোদনের স্টলে।

পাশের স্টলের মালিকরা একদিন বিদ্রোহ করলেন। মহাপরিচালকের কাছে গিয়ে নালিশ করলেন আমার নামে। আমি বিনোদনের স্টলে বসি বলে তাদের বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে। মহাপরিচালক সাহেব দলবল নিয়ে এসে ওদিকটায় ঘুরে গেলেন। অত্যন্ত হৃদয়বান মানুষ তিনি। আমার কাঁধে হাত দিয়ে হাসিমুখে বললেন, ‘তুমি স্টলটায় না বসলে! পুরো মেলায় ঘুরে বেড়ালে। পাঠক তো তোমার অটোগ্রাফ নেবেনই।’

স্যারের কথায় আমি স্টল থেকে বেরিয়ে গেলাম। হাসান আর তার বন্ধুরা রাগ করে বিনোদনের স্টল বন্ধ করে দিল। আমার মনটা খুবই খারাপ হয়েছে। মেলায় থাকলামই না। বাসায় চলে এলাম। পরদিন সকালে হাসানের সঙ্গে আশপাশের স্টলের আরও তিন চারজন মালিক আমার বাসায় এসে হাজির। গতকাল আমি মেলা থেকে চলে আসার পর, বিনোদনের স্টল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর একজন লোকও নাকি ওদিকটায় যায়নি। এ কদিন যা-ও কিছু টাকা তারা বিক্রি করেছেন, গতকাল তাও করতে পারেননি। সুতরাং অনুরোধ নিয়ে এসেছেন আমি যেন বিনোদনের স্টলটায় বসি। প্রকাশকরা লিখিতভাবে এই অনুরোধ বাংলা একাডেমির মহাপরিচালককেও জানাবেন আজ। পুরো ব্যাপারটা ম্যানেজ করার জন্য তাঁরা হাসানকে ধরেছেন। হাসান সবাইকে নিয়ে হাজির হয়েছে আমার বাসায়।

গভীর আনন্দ নিয়ে সেই বিকেলে গেলাম বইমেলায়। যথারীতি আগের চিত্র। উপচে পড়া ভিড় ওদিকটায়। পাঁচ সাত শ কপি ভালোবাসার সুখ দুঃখ শুধু বিনোদনের স্টল থেকেই প্রতিদিন বিক্রি হতে লাগল। সন্ধ্যার দিকে বাহার একবার করে এসে ঘুরে যায় আর খবর দেয়, আরও দশ হাজার কপি ছাপতে দিয়েছে।

দুদিন পর ভয়ঙ্কর এক ঘটনা জানাল বাহার। একদল যুবক এসে তার কাছে ফ্রি ‘ভালোবাসার সুখ দুঃখ চেয়েছে। বাহার দিতে রাজি হয়নি বলে ওই দলের একজন তাকে রিভলবার ঠেকিয়েছে। উনিশ বিশজনের দল। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বাহার প্রত্যেককে এক কপি করে বই দিয়ে দিয়েছে।

ছুটির দিনে বইমেলা ব্যাপক জমজমাট। এমন ভিড় হলো একদিন, এমন চাপ পড়ল বিনোদনের স্টলে, মানুষের চাপে স্টলটি ভেঙে পুকুরে পড়ে গেল। সঙ্গে আমিও পড়লাম। হাসানরা টেনে তুলল। বইপত্রও কিছু পড়েছে পুকুরে। ভেজা কাপড়ে আমি বাসায় ফিরে এলাম। হাসান খুবই বুদ্ধিমান ও করিতকর্মা যুবক। পরদিন বইমেলায় গিয়ে দেখি স্টলের সামনে শক্ত দুটো বাঁশ আড়াআড়ি করে বেঁধে ব্যারিকেড তৈরি করেছে সে। আর আমার সেইফটির জন্য পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করেছে। আমি স্টলে ঢোকার পরেই দেখি চারজন পুলিশ স্টলের দুপাশে দাঁড়িয়ে আছেন। পুলিশ পাহারায় আমি মাথা নিচু করে অটোগ্রাফ দিই। কমিশন বাদ দিয়ে টাকা গুনে রাখে হাসান। ততদিনে ভালোসার সুখ দুঃখ চল্লিশ হাজার কপির উপর বিক্রি হয়ে গেছে। ওদিকে কানাঘুষা চলছে কথাসাহিত্যে সার্বিক অবদানের জন্য আমি নাকি এ বছর বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাবো।

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয় ২০ ফেব্রুয়ারি বিকেলবেলায়। মঞ্চে নাম ঘোষণা করবেন বাংলা একাডেমির সভাপতি গাজী সামছুর রহমান। তিনি পণ্ডিত ব্যক্তি। বিটিভিতে আইন বিষয়ক অনুষ্ঠান করে ব্যাপক জনপ্রিয়। মঞ্চের সামনের মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ। বসার জায়গা নেই। মাঠের তিন দিকে শত শত লোক দাঁড়িয়ে আছে। পুবদিককার কোণে দাঁড়িয়ে আছি আমি। আমার সঙ্গে আমার ছোটভাই খোকন আর তার কয়েকজন বন্ধু। খোকন তখনও আমেরিকায় থাকে। কয়েকদিন আগে দেশে এসেছে।

গাজী সামছুর রহমান সাহেব নাম ঘোষণা শুরু করলেন। প্রবন্ধ ও গবেষণা শাখায় পুরস্কার পেয়েছেন ড. মুনতাসীর মামুন। গাজী সামছুর রহমান সাহেব অত্যন্ত রসিক মানুষ। মামুন ভাইয়ের নাম ঘোষণার পর তিনি বললেন, ‘কথাসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য যিনি এ বছর বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন তিনি নিতান্তই “বালক”। তার নাম ইমদাদুল হক মিলন।’ সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো করতালি। বিশাল একটা ঢেউ যেন বয়ে গেল মেলা প্রাঙ্গণের ওপর দিয়ে। আমাকে ঘিরে খোকনরা তো আছেই, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমার বন্ধুবান্ধবরা। যুক্ত হয়েছেন কিছু পাঠক অনুরাগী আর প্রকাশকরা। আমার অবস্থা তখন বিয়ের বরের মতো। কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে আছি। খানিক পর আমার প্রিয় মানুষটির সঙ্গে দেখা হলো। তিনি মঞ্চের ওদিকটায় একাকী দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমার নাম ঘোষণা হওয়ার পর থেকে কাঁদছিলেন। আমার মেজবোন পলিও ছিল বাংলা একাডেমিতে। তার চোখেও ছিল আনন্দের কান্না।

বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়ার প্রভাবও গিয়ে পড়ল ভালোবাসার সুখ দুঃখর ওপর। বইয়ের বিক্রি আরও বেড়ে গেল। পুরো মেলায় বইটি বিক্রি হলো সাতষট্টি হাজার কপি। বাকি দশ মাসে বিক্রি হয়েছিল আরও বিশ হাজার কপি। অর্থাৎ এক বছরে বিক্রি সাতাশি হাজার কপি।

ভালোবাসার সুখ দুঃখ তারপর তেরো পর্বে সিরিজ নাটক হয়েছিল বিটিভির জন্য। তৈরি করেছিলেন মোহাম্মদ বরকতউল্লাহ। আমার মেয়ে দুটো ছোট তখন। দুজনেই অভিনয় করেছিল সেই নাটকে। দুজনেরই প্রথম অভিনীত নাটক। পরে ওরা বেশ কিছু নাটকে অভিনয় করেছে। বড়মেয়ের নাম নির্বাচিতা হক, ডাকনাম একা। আর ছোটটি শুভেচ্ছা হক, ডাকনাম লেখা। লেখা হুমায়ূন আহমেদের বেশ কিছু নাটকে অভিনয় করেছে। আমার নাটকে তো করেছেই। মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বার সিনেমাটিতেও অভিনয় করেছিল লেখা। অভিনয়ের জন্য দুই মেয়েই কিছু পুরস্কার আর সম্মাননা পেয়েছে। তারপর একটা সময়ে অভিনয় ছেড়ে লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেছে।

সেবারে প্রকাশিত সুপুরুষ উপন্যাস অবলম্বনে নাটক লিখেছিলাম। তখন মাত্র প্যাকেজ নাটকের যাত্রা শুরু হয়েছে। প্যাকেজের প্রথম নাটকটি করেছিলেন আতিকুল হক চৌধুরী। নাটকটি ছিল আরেফিন বাদলের লেখা। দ্বিতীয় নাটক করলেন শহীদুল হক খান। উপন্যাসের নাম সুপুরুষ। নাট্যরূপ দিতে গিয়ে নামটা আমি বদলে দিলাম। নাম রাখা হলো ‘কোথায় সে জন’। আজিজুল হাকিম আর শমী কায়সার অভিনয় করলেন। শমীর চরিত্রটি ছিল যমজ বোনের। একই রকম দেখতে দুটো মেয়ে। সিনেমার ভাষায় ‘ডাবল রোল’ যাকে বলে। আমার ‘যুবরাজ’ ধারাবাহিকে তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শমী কায়সার। ‘কোথায় সে জন’ বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। ফলে এক্ষেত্রেও আমার ডিমান্ড বেড়ে গেল। বহু নাট্য নির্মাতা নাটক লেখার অনুরোধ নিয়ে আসেন। বেশ কিছু নাটক আমি লিখেছিও। একপর্যায়ে নাটক লেখার জন্যও এডভান্স দিতে লাগলেন প্রডিউসাররা। চাপ সামলাতে না-পেরে কারও কারও টাকা ফেরতও দিয়েছি।

২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩ সাল। সকাল থেকে শুরু হয়েছে বইমেলা। সকাল থেকেই প্রচণ্ড ভিড়। প্রকাশকের কাছ থেকে ১০০০ কপি ভালোবাসার সুখ দুঃখ এনে রেখেছে হাসান। সকাল থেকেই বিক্রি হচ্ছে বই। আমি অটোগ্রাফ দিয়ে যাচ্ছি। চার জন পুলিশ পাহারায় আছে। আজ স্টল সামলাবার জন্য হাসানের বন্ধুরাও আছে প্রায় সাত আটজন। দুপুরে ঘণ্টা দুয়েকের বিরতি। সেই বিরতিও মানছেন না ক্রেতারা। আমি এক ফাঁকে হাসানদের আনা বিরিয়ানি একটু খেয়ে নিয়েছি। বিকেলের দিকে ভিড় আর সামলানোই যায় না। একটার পর একটা ভালোবাসার সুখ দুঃখর কপি আসছে হাতে। কোনও দিকে না-তাকিয়ে শুধু সই দিয়ে যাচ্ছি। মেলা শেষ হয় রাত আটটায়। আটটা বাজার কয়েক মিনিট আগে লক্ষ্য করলাম, মধ্যবয়সি এক এক ভদ্রমহিলা স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। বললাম, ‘দিন আপনার বইটা।’ তিনি রুক্ষগলায় বললেন, ‘আমি আপনার বই নিতে আসিনি। দুয়েকটা কথা বলতে এসেছি।’

‘বলুন।’

‘আপনার বইটা শুরুর দিকেই আমি নিয়ে গেছি, পড়েও ফেলেছি। এসব ছাইপাঁশ আপনি কি লিখছেন ? এটা কোনও লেখা ? যে আপনি যাবজ্জীন লিখেছেন, নিরন্নের কাল লিখেছেন, কালোঘোড়া, পরাধীনতা, ভূমিপুত্র লিখেছেন, সেই আপনার এই অধঃপতন!

আমি হতভম্ব হয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। তিনি আগের মতোই রুক্ষ কণ্ঠে বললেন, ‘দেশে এখনও সাহিত্যের প্রকৃত পাঠক অনেক আছেন। তাঁদের কথা ভুলে যাবেন না। এইসব ছাইপাঁশ লিখে আর অল্পবয়সি ছেলেমেয়ের মনোরঞ্জন করে, এইভাবে অটোগ্রাফ দিয়ে সাহিত্যের কোনও উপকার হয় না।’

মহিলা আর দাঁড়ালেন না। হন হন করে হেঁটে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেলেন। আমার হাতে তখন ১০০০ কপি ভালোবাসার সুখ দুঃখর সর্বশেষ কপিটি। ৯৯৯ কপি বই সকাল থেকে শুধু বিনোদনের স্টলেই বিক্রি হয়েছে। যে কপিটি আমার হাতে সেটা একজন ক্রেতা নিতে গিয়ে ফেরত দিয়েছেন। কারণ বইটির বাইন্ডিং উল্টো হয়েছে। সেই বই রেখে আমি উদাস ভঙ্গিতে স্টল থেকে বেরিয়ে এলাম। সাধারণত মেলা থেকে বেরোবার সময় আমার সঙ্গে পাঠক প্রকাশক আর তরুণ লেখক অনেকেই থাকেন। তাঁদের এড়িয়ে সেদিন আমি একা একা মেলা থেকে বেরিয়ে এলাম। বাংলা একাডেমির রমনা এলাকা থেকে হেঁটে হেঁটে এলাম গেণ্ডারিয়াতে। এতটা দূর পথ কখন হেঁটে এলাম মনেই রইল না। সারাটা পথ শুধু সেই মহিলার কথাগুলো মনে পড়ছিল। যেন চারদিক থেকে তীক্ষè কাঁটার মতো তার বাক্যবাণে আমি জর্জরিত হচ্ছিলাম। সেই রাতে একটা মিনিটের জন্যও ঘুমাতে পারলাম না। এতদূর হেঁটে আসার ক্লান্তি আমাকে স্পর্শই করল না।

বিনোদনের স্টলে মাঝে মাঝে শহীদুল ইসলাম মিন্টু নামে এক যুবক এসে আড্ডা দিয়ে যেত। আমি খুবই ভালোবাসি ছেলেটিকে। ‘আজকের কাগজ’ গ্রুপ থেকে খবরের কাগজ নামে একটি সাপ্তাহিক বেরোয়। মিন্টু সেই কাগজের সাংবাদিক। অল্পবয়স কিন্তু তুখোড় ছেলেটি। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমরা কথা বলি, আড্ডা দিই। মিন্টু মাঝে মাঝে আমার গেণ্ডারিয়ার ফ্ল্যাটেও আসে। কিছুদিন আগে বাংলাদেশে ভয়ঙ্কর একটি ঘটনা ঘটেছে। সিলেটের কমলগঞ্জ এলাকার ছাতকছড়ায় দ্বিতীয় বিয়ের কারণে মিথ্যা ফতোয়া দিয়ে গ্রামের মসজিদের ইমাম একটি মেয়েকে মধ্যযুগীয় কায়দায় বুক অবদি মাটিতে পুঁতে এক শ একটি পাথর ছুড়ে মেরেছে। মেয়েটির মা-বাবাকে এক শ একটি করে ‘দোররা’ মেরেছে। মেয়েটির স্বামীকেও দিয়েছে একই শাস্তি। পরে দুঃখে অপমানে মেয়েটি আত্মহত্যা করে।

সেই মেয়ের নাম ‘নূরজাহান’। ফতোয়াবাজ মাওলানার নাম মান্নান মাওলানা। এই ঘটনা ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ, ডেইলি স্টার, দৈনিক সংবাদ আর বাংলাবাজার পত্রিকায় প্রচুর রিপোর্ট বেরোল নূরজাহানের ঘটনা নিয়ে। সিলেটের স্থানীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে যুক্ত হলেন ঢাকার সাংবাদিকরা। রিপোর্টের পর রিপোর্ট বেরোতে লাগল। বাংলাবাজার পত্রিকার বিখ্যাত সাংবাদিক ফজলুল বারী, ভোরের কাগজ এর প্রণব সাহা, আকমল হোসেন নিপু প্রমুখ দুর্দান্ত সব রিপোর্ট করলেন। বিনোদনের স্টলে বসে আড্ডা দিতে দিতে শহীদুল ইসলাম মিন্টু এক দিন বলেছিল, ‘নূরজাহান’কে নিয়ে উপন্যাস লেখেন মিলন ভাই।’ সেই নির্ঘুম রাতে মিন্টুর কথা বার বার মনে পড়ছিল। ‘নূরজাহান’কে নিয়ে উপন্যাস লেখার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম পরদিন থেকে। ভদ্রমহিলা যে ধিক্কার আমাকে দিয়ে গেছেন, দেখি চেষ্টা করে সেই ধিক্কার কিছুটা কাটাতে পারি কি না।

‘নূরজাহান’ সংক্রান্ত পত্রিকার সব রিপোর্ট সংগ্রহ করতে লাগলাম। যতটা খোঁজ-খবর করা সম্ভব করতে লাগলাম। নূরজাহানের ঘটনা ঘটেছিল সিলেট অঞ্চলে। সেই অঞ্চলের ভাষা আমার জানা নেই। আর এই উপন্যাস বিশ্বাসযোগ্য করে লিখতে হলে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। নূরজাহান বা তার চারপাশের মানুষের মুখে শুদ্ধ ভাষার ব্যবহার একেবারেই মানানসই হবে না। ভাষার কারণে উপন্যাসটি মেকি হয়ে যাবে।

কী করণীয় ?

বেশ কয়েকদিন ভাবলাম এই নিয়ে। তারপর একদিন মনে হলো, বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামেই তো আছে নূরজাহানের মতো মেয়েরা। নানাভাবে নিগৃহীত হচ্ছে তারা। গ্রামাঞ্চলে নারী নির্যাতন চলে নানা পদ্ধতিতে। শহরের নির্যাতন একরকম, গ্রামেরটা অন্যরকম। শহরে বসে আমরা অনেক সময় কল্পনাও করতে পারি না কত রকমভাবে নির্যাতিত হন গ্রামীণ নারীরা। আর মান্নান মাওলানারাও আছে বহু গ্রামে। নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ধর্মের দোহাই দিয়ে বহু রকম নির্যাতন তারা নারীর ওপর চালায়। বিরানব্বই তিরানব্বই সালের বাংলাদেশে মসজিদের ইমাম যা বলতেন, তাই মেনে নিত গ্রামাঞ্চলের মানুষ। শহরের মানুষও কি নিত না ? নিত। তবে গ্রামের তুলনায় কম।

মান্নান মাওলানার কুদৃষ্টি ছিল নূরজাহানের ওপর। তার দৃষ্টি এড়াবার জন্যই হতদরিদ্র মা-বাবা রাতারাতি বিয়ে দিয়েছিল নূরজাহানকে। সেই স্বামী কিছুদিন পর উধাও হয়ে যায়। কয়েকমাস নূরজাহানের মা-বাবা মেয়ের সেই স্বামীর জন্য অপেক্ষা করে। তারপর মেয়েটিকে দ্বিতীয় বিয়ে দেয়। যেকোনওভাবেই এই বিয়ে বৈধ। ধর্মীয়ভাবেও, সামাজিকভাবেও। কিন্তু নিজের স্বার্থ হাসিল হলো না-বলে মিথ্যে ফতোয়া জারি করে মান্নান মাওলানা নূরজাহানকে ঠেলে দিল মৃত্যুর দিকে।

একটা সময়ে আমার মনে হলো, নূরজাহানকে আমি একটি প্রতীকী চরিত্র হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। বাংলাদেশের নির্যাতিত নারীর প্রতীক সে। দেশের যেকোনও অঞ্চলের যেকোনও গ্রামেই তাকে আমি প্রতিষ্ঠিত করতে পারি।

নূরজাহানকে আমি নিয়ে এলাম বিক্রমপুরে, মেদিনীমণ্ডল গ্রামে। এই অঞ্চল, এই গ্রাম আমি আমার চেহারার মতো চিনি। এই অঞ্চলের মানুষের নিত্যকার জীবন, ভাষা, বিশ্বাস আর কুসংস্কার সব আমার জানা। ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতি ও মানুষের চেহারা কেমন করে বদলায়, জীবন আচরণ কেমন হয়, গাছের পাতার রং কেমন হয়, কোন ঋতুতে কোন ফসল, মাঠের চেহারা কেমন, সব আমি চোখ খুলে বা বন্ধ করে পরিষ্কার দেখতে পাই। ছেলেবেলার বারোটি বছর একটানা কেটেছে মেদিনীমণ্ডলে। জীবনের এই এতটা দিন ধরে মেদিনীমণ্ডলে আসা যাওয়া। নাড়ি পোঁতা আছে সেই গ্রামের এক মেন্দাবাড়িতে। নাড়ির টান আমাকে উতলা করে। এত নিখুঁতভাবে বোধহয় আমি নিজেকেও চিনি না, যতটা চিনি মেদিনীমণ্ডল গ্রামটিকে। সুতরাং নূরজাহান লেখার জন্য মেদিনীমণ্ডলের চেয়ে বড় পটভূমি আর কী হতে পারে ? গ্রামের প্রতিটি বাড়ি, প্রতিটি মানুষ, খালবিল নদী, মাঠ গাছপালা আর ঝোপঝাড়, সব আমার কাছে জীবন্ত।

‘নূরজাহান’কে এই পরিবেশে নিয়ে এলাম। তার চারপাশে জড়ো হলো আমার অতিচেনা বহু বহু চরিত্র।

নূরজাহান লিখতে শুরু করলাম। শহীদুল ইসলাম মিন্টু সেই উপন্যাস ধারাবাহিকভাবে ছাপতে লাগল সাপ্তাহিক খবরের কাগজ পত্রিকায়। পত্রিকার সম্পাদক কাজী শাহেদ আহমেদ। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক। শাহেদ ভাই আমাকে খুবই ভালোবাসেন। আমি কিস্তির পর কিস্তি নূরজাহান লিখে গেলাম। লিখতে গিয়ে দেখি কত বিস্মৃত ঘটনা মনে আসছে। কত ভুলে যাওয়া চরিত্র উঁকি দিচ্ছে স্মৃতির ভেতর থেকে। শুদ্ধ বাক্যের ফাঁকে ফাঁকে ব্যবহার করে যাচ্ছি বিক্রমপুরের আঞ্চলিক শব্দ। পাঠকের সুবিধার জন্য শব্দটির অর্থ ব্র্যাকেটে লিখে দিচ্ছি। লেখার সময় কোনও দিকে খেয়াল থাকে না। মন চলে যায় মেদিনীমণ্ডলে। চরিত্রগুলো চলাফেরা করে চোখের সামনে। তাদের হাসি কান্না, সুখ দুঃখ, প্রতিদিনকার জীবন বন্দি হতে থাকে আমার শব্দের খাঁচায়।

দবির গাছি ছিল কান্দিপাড়ার লোক। অঘ্রানে পৌষ মাসে কাঁধে রসের ভার নিয়ে বিলের ওদিক দিয়ে হেঁটে আসত। কুয়াশার ঘোমটা পরে আছে গ্রামগুলো। মাঠের ঘাস আর শস্যচারা সারারাত ধরে শিশিরে ভিজেছে। খোলা জায়গার মাটিও ভিজেছে একই ভাবে। কী শীত! কী শীত! কোনও কোনও ক্ষেতের ধানকাটা হয়ে গেছে। বিলের দিককার কোনও কোনও ক্ষেতে তখনও চলছে ধানকাটা। কাটা ধানের আঁটি থাক থাক করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বাড়ির উঠোন পালানে। পাকা ধানের অপূর্ব গন্ধ চারদিকে। সব ক্ষেতের ধান কাটা হয়নি। ভোরবেলার এই শীতে কাস্তে হাতে সেই সব ক্ষেতে গিয়ে নামছে গৃহস্থলোক। তাদের সঙ্গে আছে চর থেকে ধান কাটতে আসা ধানশ্রমিক। দুপুর পর্যন্ত একটানা ধান কাটে তারা। দুপুরে ভাত তামাক খেয়ে আবার গিয়ে নামে ক্ষেতে। বিকেলের দিকে কাটা ধান আঁটি বেঁধে বাড়িতে নিয়ে আসে। পরদিন ভোররাতে ওঠে ‘ধান পাড়ায়’। অর্থাৎ পা দিয়ে পাড়িয়ে পাড়িয়ে ধান মলন দেয়। ধান কেটে আর এইভাবে ‘পাড়িয়ে’ পাঁচ ভাগের একভাগ পায় শ্রমিকরা, বাকি চারভাগ গৃহস্থের। জমি যদি বর্গা দেওয়া থাকে তাহলে এই চারভাগ আবার দুভাগ হবে। একভাগ পাবে জমির মালিক আরেকভাগ বর্গাদার।

বুজির জমিগুলো বর্গা দেওয়া থাকত। আত্মীয়-স্বজনরাই বর্গা নিয়ে চাষ করত। মায়ের দুই ফুফাত ভাই মন্নাফ হাওলাদার আর দলিল মাতবর বুজির জমিগুলো বর্গা নিতেন।

নবান্ন উৎসবটাকে ওদিককার গ্রামগুলোতে বলা হতো ‘খোদাই শিরনি’। ধানকাটা আর পাড়ানো হয়ে গেলে গোলায় সেই ধান তুলে গৃহস্থলোক আমোদ ফুর্তি করত। গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে নতুন চাল এনে, নগদ টাকা চাঁদা এনে মাঠের ধারে রান্নাবান্নার আয়োজন করত। বেশ একটা উৎসব। রান্নাটা হতো বিকেলের দিকে। নতুন চাল দুধ আর আগের বছর তুলে রাখা খেজুরের গুড় এইসব দিয়ে পায়েস রান্না হতো। গ্রামের লোকজন শিশু কিশোর চারদিকে ছুটোছুটি করছে। আনন্দের হাওয়া বয়ে যাচ্ছে মানুষগুলোর মধ্য দিয়ে। কেটে নেওয়া ধানের খড়নাড়া পড়ে আছে ক্ষেতে। কোনও কোনও ক্ষেতে নাড়া পোড়াবার জন্য আগুন দেওয়া হয়েছে। সাদা ধোঁয়া উড়ে যাচ্ছে আকাশের দিকে। বিলে দেখা যাচ্ছে নাড়ার আগুন। খড়নাড়া আর ধোঁয়ার গন্ধের সঙ্গে ‘খোদাই শিরনি’ রান্নার বিশাল ডেগ থেকে আসছে মনোহর গন্ধ। সূর্য ডুবে গেছে আগেভাগে। ঘেরাটোপ ফেলতে শুরু করেছে কুয়াশা। কী অপূর্ব সময়!

ধানকাটা শেষ করে নিজেদের ভাগের ধান বস্তায় করে নিয়ে যেত চৌরারা। দুতিন চার পাঁচ বস্তা ধান পেত ভাগে একেকজন। এক বস্তা হয়ত চরে নিয়ে গেল, বাকিটা গোয়ালিমান্দ্রার হাটে বিক্রি করে নগদ টাকা নিয়ে যেত।

এই ধানশ্রমিকদের নিয়ে উপন্যাস লিখেছিলাম ভূমিপুত্র। ধানের ভাগ নিয়ে মালিকপক্ষ বেপারিদের সঙ্গে শ্রমিকশ্রেণি বেলদারদের বিরোধের কাহিনি। বর্ষায় পাট কাটত বেলদাররা। সেই পাট ‘জাগ’ দিয়ে পাটখড়ি থেকে আলাদা করে, ধুয়ে বিক্রির উপযোগী করে বেপারিদের বুঝিয়ে দিত। বিষয়গুলো অনুপঙ্খভাবে ছিল ভূমিপুত্র এ। আর ছিল বেলদার বাড়ির যুবতী কন্যা আর বউদের বেপারিদের হাতে নিগৃহীত হওয়ার কাহিনি। কুদ্দুস বেপারির সন্তান গর্ভে ধারণ করেছিল বেলদারকন্যা অজুফা। সেই অবৈধ সন্তান বাদলা। বাদলা মামার সংসারে ঠাঁই পেয়েছিল। এই কিশোরটির মৃৃত্যুর কথা লিখতে গিয়ে আমার কলম থেমে গিয়েছিল। ছেলেটিকে কবর দেওয়ার জন্য উঁচু মাটি খুঁজে না-পেয়ে পদ্মার স্রোতে তাকে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কাদের যখন বাদলার লাশ পদ্মায় ভাসিয়ে দেয়, নিজের বুকে চেপে থাকা বেদনার কথা মৃত বাদলাকে বলে আর কাঁদে, উপন্যাসের এই অংশটি লিখতে গিয়ে কী জানি কোন বেদনায় আমি অনেকক্ষণ কেঁদেছিলাম।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ভূমিপুত্র উপন্যাসটি পছন্দ করতেন।

ধানকাটা শেষ হওয়ার পর গ্রামের বাড়িগুলোতে শুরু হত পিঠা বানাবার উৎসব।  কত রকমের যে পিঠা বানাতেন আমার বুজি। পাটিসাপটা, দুধকুলুইচা, দুরকমের ভাপা। বিক্রমপুরের বিখ্যাত পিঠা বিবিখানা, সেউই কুলুই আর রসের পিঠা।

রসের পিঠা মানে চিতইপিঠা বা খাজের পিঠা খেজুরের রসে ভিজিয়ে রাখা। খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে একটু লালচে লালচে করে চিতই পিঠা বা খাজের পিঠা সারারাত সেই রসে ভিজিয়ে রাখতে হয়। সকালবেলা খাওয়া হবে পিঠা। গরম করতে হয় না। ভিজানো পিঠা ঠাণ্ডাই খেতে হয়।

চিতই পিঠা সবারই চেনা। ‘খাজের পিঠা’ও চিতই পিঠার মতোই চাউলের গুঁড়োয় পরিমাণমতো পানি মিশিয়ে তৈরি করতে হয়। চিতই ভাজতে হয় মাটির খোলায় আর ‘খাঁজের পিঠা’ মাটির খাঁজে। কুমোররা তৈরি করত ‘খাঁজ’। মাটির হাঁড়ি আর বাসনকোসন যেভাবে তৈরি করে ঠিক সেইভাবে। থালার চেয়ে বড়, চারপাশে কানা তোলা চ্যাপ্টা জিনিসটায় ছোট ছোট গোল আর লম্বা ছাঁচ। চিতই পিঠার মসলা ওই ছাঁচে ফেলে ঠিক চিতই ভাজার মতো ভাজতে হয়। আসলে ‘ছাঁচ’ জিনিসটাকেই বিক্রমপুরে বলে ‘খাঁজ’। খাঁজের পিঠা হচ্ছে চিতইয়ের ক্ষুদ্র সংস্করণ।

ভিজানো পিঠা দুধে ভিজিয়েও করা যায়। দুধে ভিজিয়ে করবার জন্য শীতকাল না-হলেও চলে। তবে শীতকালে করা ভালো এই জন্য যে, গরমকালে সারারাত দুধে ভিজে পিঠা কখনও কখনও টক টক হয়ে যেতে পারে। ফলে শীতকালেও দুধে ভিজানো পিঠা তৈরি করা হতো কোনও কোনও বাড়িতে।

আমাদের বাড়িতে রস নিয়ে আসত দবির গাছি। বাঁশের ভারের দুপাশের দড়ির সিকায় একটা বড় আরেকটা মাঝারি ঠিলার ওপর আরেকটা ঠিলা বসানো ভার কাঁধে কান্দিপাড়া থেকে বিলের ওপর দিয়ে হেঁটে আসত সে। চার ঠিলা ভর্তি রসের ভারে বাঁকা হয়ে যেত মধ্য বয়সি লোকটি। লুঙ্গি কাছামারা, মাজায় শক্ত করে বান্ধা পুরোনো গামছা। ঊর্ধাঙ্গে ছেঁড়াকোড়া রঙের গেঞ্জি। শীতের ভয়ে পুরোনো চাদর নিয়েছিল বাড়ি থেকে বেরোবার সময়। ভার বহনের ক্লান্তিতে শীত কেটে গেছে। চাদর এখন গলায় প্যাঁচান। দুদিন আগে বুজি বলে দিয়েছেন আজ এক মণ রস কিনবেন তোয়াক বানাবার জন্য। সেই রস নিয়ে আসবে দবির গাছি। গাছির অপেক্ষায় আমি গিয়ে দাঁড়িয়ে আছি বারবাড়িতে। তখনও নাশতা করিনি। দবির গাছি রস নিয়ে এলে বাটিতে অনেকখানি কাঁচা রস নিয়ে সেই রসে মুড়ি ভিজিয়ে চামচে তুলে তুলে খাব। ওটাই সেদিনকার সকালের নাশতা।

দবির গাছি আসবে নোয়াব আলী নানার ছাড়াবাড়ির ওই সরু রাস্তাটা দিয়ে। আমাদের বাড়ি থেকে দু-তিন শ গজ দূরে হবে সেই ছাড়াবাড়ি। ওইটুকু জায়গাও পরিষ্কার দেখা যায় না। কুয়াশায় একেবারে ঢেকে আছে। কুয়াশাকে আমরা বলি ‘খুয়া’। ‘খুয়া’ পড়ছে। অর্থাৎ কুয়াশা পড়েছে। সেইসব সকালে ‘খুয়া’ পড়ত গাঢ় হয়ে। সেই কুয়াশার ভেতর থেকে ছায়ার মতো বেরিয়ে আসত দবির গাছি। তেমন উঁচু লম্বা মানুষ নয়। পরিশ্রমী শরীর। পায়ের গোছা দুটো রোদেপোড়া কালো শরীরের তুলনায় একটু যেন বেশি মোটা। গাছিদের পা মোটা হয়।

নূরজাহান প্রথম পর্ব পড়ে আমার বন্ধু শিমুল ইউসুফ বলেছিল ওই কথা। ‘গাছিদের পা মোটা হয়।’ শিমুল বিখ্যাত অভিনেত্রী। আমাদের সময়কার কিংবদন্তিতুল্য নাট্যকার সেলিম আল দীন শিমুলকে উপাধি দিয়েছিলেন ‘মঞ্চকুসুম’। বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা ও নাট্য নির্দেশক নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু শিমুলের স্বামী। বাচ্চু ভাইকে শুধু মুক্তিযোদ্ধা আর নাট্যনির্দেশকই বলা যাবে না। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের তিনি এক পুরোধা ব্যক্তিত্ব। ঢাকা থিয়েটারের কর্ণধার। সেলিম আল দীন আর নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর জুটি বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের ক্ষেত্রে ইতিহাস হয়ে গেছে।

শিমুলও বিক্রমপুরের মেয়ে। ওঁদের গ্রামের নাম ‘শমসপুর’। শিমুলের বোনজামাই বিখ্যাত আলতাফ মাহমুদ মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন। এই মহান ব্যক্তিত্বের বহুকীর্তির একটি হচ্ছে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটির সুর করা। প্রথমে সুর করেছিলেন আব্দুল লতিফ। পরে করেছেন আলতাফ মাহমুদ। তাঁর সুর করা গানটিই এখন গাওয়া হয়। আলতাফ মাহমুদের মেয়ে শাওন আমাকে ‘মিলন মামা’ বলে ডাকে। দেখা হলে ‘মিলন মামা’ বলে গলা জড়িয়ে ধরে। ওইসব মুহূর্তে আমার চোখে পানি আসে। আলতাফ মাহমুদের মেয়ে আমাকে মামা ডাকছে! এত বড় প্রাপ্তি আমি কোথায় রাখি!

শিমুল ছোটবেলা থেকেই বিখ্যাত। শিশুবয়স থেকেই গান করে। পরম করুণাময় তাঁকে যেমন অভিনয় দক্ষতা দিয়েছেন তেমনি দিয়েছেন কণ্ঠ। আমাদের কিশোর বয়সে রেডিওতে শিমুলের গান বাজত ‘ঝর এলো, এলো ঝর। আম পড়, আম পড়।’ কী জনপ্রিয় গান। এই বিখ্যাত শিল্পী একদিন আমার বন্ধু হবে, আমাদের সম্পর্ক হবে তুইতোকারি। শিমুলের বন্ধুত্বের চেয়েও বড় হয়ে উঠবে তাঁর মায়ের মতো স্নেহ দিয়ে আমাদের আগলে রাখা, এই জীবনে কখনও তা কল্পনা করিনি। কল্পনা ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো কত ঘটনা যে ঘটেছে জীবনে!

টিনের একসেরি একটা মগ ছিল দবির গাছির। সেই মগ দিয়ে রস মেপে দিত। নূরজাহান উপন্যাস শুরু হলো দবির গাছিকে নিয়ে। নূরজাহানের বাবা। ধীরে ধীরে জড়ো হতে লাগল অন্য চরিত্রগুলো। হামিদা, নূরজাহান, আলী আমজাদ, মান্নান মাওলানা, মজনু, মরনি, আতাহার, পারু, মাকুন্দা, কাসেম। বৃদ্ধা এক ভিখারিনী আসত বুজির কাছে। কোমর থেকে শরীর বাঁকা। লাঠি ভর দিয়ে দিয়ে আসত। এক-দুমুঠ চাল বুজি তার আঁচলে দিয়ে দিতেন। কখনও ভাত খাওয়াতেন। এই মহিলার আদলে তৈরি হলো ছনুবুড়ি। মোমের মায়ের বিধবা ছোট বোনটির নাম ছিল ছনু। পানি ভেবে ‘মাইট্টা তেল’ খেয়ে মারা গিয়েছিল সে। বোনের সংসারে থাকত। সন্তানাদি ছিল না। এই বাস্তব ঘটনার সঙ্গে কল্পনার অনেকখানি মিশেল দিয়ে তৈরি হলো ছনুবুড়ির চরিত্র। আজিজ গাঁওয়ালের মা, বানেছার শাশুড়ি। হাজামবাড়ির পাগল মেয়ে তছি পাগলনি হয়ে গেল আরেক বড় চরিত্র। পাগল মেয়েটি ধর্ষণ প্রক্রিয়ায় উদ্যত হওয়া রিকশাঅলাটিকে খুন করে। তারপর সে তার জীবন বদলে ফেলে। তার দিন হয়ে যায় রাত, রাত হয়ে যায় দিন। মাথা ন্যাড়া করে কাঁথা মুড়ি দিয়ে দিন কাটায় সে, পুলিশের ভয়ে। চরিত্রটি বাস্তব, ঘটনা কাল্পনিক। আলার মা ধরনি। তাদের বাড়ির তালগাছে অজস্র বাবুই পাখির বাসা। বাবুই পাখির বাসার সঙ্গে কোথায় যেন গর্ভবতী নারীর সাদৃশ্য। বাস্তব চরিত্রগুলোর সঙ্গে কল্পনার মিশেল, মেদিনীমণ্ডল গ্রামটিকে কেন্দ্রে রেখে লেখা হলো নূরজাহান। এই উপন্যাসের একটি চরিত্র পারু। আমার কল্পনার নারী। তার ভালোবাসা যেমন তীব্র, ঘৃণাও তেমন। নিজের শরীর বাঁচাবার জন্য লোভী পুরুষদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া হাসু একসময় পুরুষে রূপান্তরিত হচ্ছে। এই চরিত্রটি তৈরি করে আমি বেশ আনন্দ পেয়েছিলাম।

কত ঘটনা নূরজাহান নিয়ে। লিখছি, লিখছি। উপন্যাস শেষই হয় না। আনন্দ পাবলিশার্সের কর্ণধার বাদল বসু এসেছেন ঢাকায়। ৩৮ বাংলাবাজারের দোতলায় আলতাফ হোসেন মানে আমাদের মিনু ভাইয়ের ‘পার্ল পাবলিকেশন্স’ এর শো রুম। সেখানে বসে চা খাচ্ছেন। আমি গিয়েছি। বাদলদার সঙ্গে আগেই পরিচয় ছিল। কথায় কথায় বললেন, নূরজাহান উপন্যাসটি তিনি ছাপবেন। আনন্দ পাবলিশার্স বই ছাপবে, এ তো বিশাল সৌভাগ্যের ব্যাপার। তৎক্ষণাৎ রাজি। কিন্তু উপন্যাস লেখা শেষ হয় না। মাসের পর মাস কেটে যায়। বাড়িতে ফোন করে বাদলদা প্রায়ই তাড়া দেন। এক সময় তাঁকে বললাম, উপন্যাস শেষ হচ্ছে না, বড় হয়ে যাচ্ছে। বাদলদা বললেন, ‘কোনও একটা জায়গায় এনে “প্রথম পর্ব” শেষ করো। উপন্যাসটি আমরা না হয় দুই পর্বে ছাপব।’

বাদলদার কথামতো ‘প্রথম পর্ব’ শেষ করলাম ’৯৫ সালের মাঝামাঝি। আগস্ট মাসে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে বই বেরিয়ে গেল। ওঁরা বইয়ের প্রিন্টার্স লাইনে মুদ্রণ সংখ্যা উল্লেখ করে। বই ছাপা হলো পাঁচ হাজার। দ্বিতীয় মুদ্রণ হলো এপ্রিল ১৯৯৬। মুদ্রণ সংখ্যা তিন হাজার। দেশ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বেরোল ‘চোখের পলকে দ্বিতীয় মুদ্রণ।’

‘প্রথম পর্ব’ বেরিয়ে যাওয়ার পর আমি কেমন যেন গাছাড়া হয়ে গেলাম! নূরজাহান আর লিখছি না। আবোল তাবোল প্রচুর লেখা লেখি কিন্তু নূরজাহান লিখি না। ‘প্রথম পর্ব’ নিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুনছি বিভিন্ন মহলে। দেশ পত্রিকায় দীর্ঘ আলোচনা লিখলেন লেখক দেবাশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়। উপন্যাসের ব্যাপক প্রশংসা করলেন। সানন্দা পত্রিকা তারাশংকর, বিভূতি, মানিক, সমরেশ বসু এই চার মহান ঔপন্যাসিকের ফেলে যাওয়া মুকুট আমার মাথায় শোভা পেতে পারে ধরনের মন্তব্য করল। পড়ে আমি হতবিহ্বল হয়ে গিয়েছিলাম। এই ধরনের প্রশংসা গ্রহণ করা প্রায় অসম্ভব। ঔপন্যাসিক অমর মিত্র লিখলেন উপন্যাসটি নিয়ে। অনেক পরে লিখলেন বাংলাদেশের বিখ্যাত লেখক, ইংরেজির অধ্যাপক ও চিন্তাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। লেখার শিরোনাম ছিল ‘সময় অতিক্রম করা গল্প’। আনিসুজ্জামান স্যার উজ্জ্বল মুখ নিয়ে বইটি হাতে নিলেন। শেষ পৃষ্ঠায় গিয়ে তাঁর মুখে ছায়া পড়ল। তখনই কিছু বললেন না, পরে আমাকে তিনি বলেছিলেন, আনন্দ পুরস্কারের জন্য নূরজাহান এর কথা তিনি ভেবেছিলেন। তিনি পুরস্কার কমিটির সদস্য। কিন্তু পর্বে ভাগ করা উপন্যাসের জন্য আনন্দ পুরস্কার দেওয়া হয় না। এই জন্য স্যারের উজ্জ্বল মুখ ছায়ায় আক্রান্ত হয়েছিল।

প্রশংসার জোয়ারে তীব্র বেগে ভাসতে থাকার ফলে নূরজাহান দ্বিতীয় পর্ব আমি আর শুরুই করতে পারছিলাম না। দম বন্ধ করা ভয়ে আক্রান্ত হয়ে আছি। দ্বিতীয় পর্বটি, প্রথম পর্বের মতো লিখতে পারব তো ? এই ভয়ে ছয় বছর কেটে গেল। ‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’ তখন সেগুন বাগিচায়। সেখানে এক অনুষ্ঠানে গেছি। এক বয়স্ক ভদ্রলোক অতিক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে আমাকে ধরলেন। নূরজাহান প্রথম পর্ব পড়ে বসে আছি, বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে দ্বিতীয় পর্বের খবর নেই। পাঠককে এইভাবে বসিয়ে রাখার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে ?’

লজ্জায় আমি আর মুখ তুলতে পারি না। যেন কেউ খুব জোরে আমার দুগালে দুটো চড় মেরেছে। নূরজাহান দ্বিতীয় পর্ব লিখছিলাম না বলে টুকটাক অভিযোগ প্রায়ই শুনছিলাম কিন্তু ওই ভদ্রলোকের মতো করে কেউ এভাবে চড়াও হননি। কয়েকদিন খুব ভাবলাম ভদ্রলোকের কথা। তারপর লিখতে শুরু করলাম। এবার ছাপার জায়গা দিল দৈনিক জনকণ্ঠ। জনকণ্ঠ এর সাহিত্য পাতায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা হতে লাগল নূরজাহান দ্বিতীয় পর্ব। এই কাগজটায় লিখতে আমার খুব ভালো লাগছিল। পত্রিকার মালিক সম্পাদক আতিকুল্লাহ খান মাসুদ মেদিনীমণ্ডলের ‘খাঁইগো’ বাড়ির ছেলে। মেদিনীমণ্ডলের মানুষজন যে উপন্যাসের চরিত্র সেই উপন্যাস ছাপা হচ্ছে মেদিনীমণ্ডলেরই মালিক সম্পাদকের পত্রিকায়! এ আমার জন্য এক বিশেষ আনন্দ।

‘প্রথম পর্ব’ প্রকাশের ছয় বছর পর ‘দ্বিতীয় পর্ব’ লিখতে শুরু করেছিলাম। টানা দুবছর লিখেছি। প্রথম পর্বের তুলনায় অনেক বড়। একটা নির্দিষ্ট জায়গায় এনে জনকণ্ঠর লেখা শেষ করলাম। তারপর দুটো অংশ আলাদা আলাদা শিরোনামে ‘ঈদসংখ্যায়’ লিখলাম। একটা অংশের নাম ছিল ‘বাবুই পাখির জীবন’, আরেকটি অংশের নাম ‘কাঁচা বাঁশের পালকি’। দুর্ভাগ্য কাকে বলে, দ্বিতীয় পর্বেও নূরজাহান শেষ হলো না। লিখতে লিখতে মনে হচ্ছিল আরও অনেক অনেক কিছু লেখার বাকি রয়ে গেছে। ‘তৃতীয় পর্ব’ও লিখতে হবে।

নূরজাহান দ্বিতীয় পর্ব লেখার কিছুদিন আগ থেকে পরের অনেকগুলো দিন পর্যন্ত সময়টা আমার কিছু কারণে এলোমেলো যাচ্ছিল। জীবনের কোনও কোনও বাঁকে সত্যিকার অর্থেই ভূত চাপে মানুষের মাথায়। আমার মাথায় সেরকম এক ভূত চেপেছিল। ব্যবসার ভূত। নাটক তৈরির একটা কোম্পানি খুলে বসেছিলাম। ফলে লেখালেখি থেকে কিছুটা যেন দূরে সরে গিয়েছিলাম। ‘প্রথম পর্ব’ লেখার পর ‘দ্বিতীয় পর্বের’ ক্ষেত্রে যে সময়টা লেগেছিল ‘তৃতীয় পর্ব’ লিখতে সময় লেগে গেল তারচেয়ে অনেক বেশি। প্রায় নয় বছর। এ পর্বটি বড়ও হলো বেশ। ‘প্রথম পর্বের’ প্রায় ডাবল। সব মিলিয়ে সাড়ে বারো শ পৃষ্ঠার উপন্যাস। বইয়ের শেষদিকে ‘লেখকের বক্তব্য’ হিসেবে পাঁচ পৃষ্ঠার একটি রচনা জুড়ে দেওয়া হলো। উপন্যাস লেখার পটভূমি, ভাষা ইত্যাদি নিয়ে আমার বক্তব্য। তারপর দেওয়া হলো ‘যে সব বই ও পত্র পত্রিকার সাহায্য নেওয়া হয়েছে’ তার একটি তালিকা।

নূরজাহান তৃতীয় পর্ব লেখার শুরুটাই করতে পারছিলাম না। দিনের পর দিন কেটে যায়। বুকে কী রকম চাপ ধরা এক অস্থিরতা। রাতের পর রাত ঘুমাতে পারি না। অসহায় লাগে। লিখতে না পারার কষ্ট কী এই রকমও হয়!

একদিন ভোররাতে উঠে গোসল করলাম। স্ত্রী ঘুমাচ্ছেন। মেয়েরা ঘুমাচ্ছে তাদের রুমে। সুনসান নীরবতা ফ্ল্যাটে। গরমের দিন। গোসল করে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর অনেকক্ষণ আমার আর কিছু মনে নেই। একটা সময়ে দেখি নিঃশব্দে কাঁদছি। দরদর করে চোখের পানি পড়ছে গাল বেয়ে। বুক ভাসানো কান্না যাকে বলে তাই। আমার চোখে বোধহয় পানি একটু বেশি। গাল বেয়ে নামা কান্নায় সত্যি সত্যি বুক ভিজে যাচ্ছিল। কেন এই কান্না ? কোন দুঃখ বেদনায় বা লিখতে না পারার কষ্টে কান্না, কিছুই আমি বুঝতে পারছিলাম না! কতক্ষণ এভাবে কাটল বুঝতে পারিনি। পর্দার আড়াল থেকে ভোরবেলার আলো দেখা যাচ্ছিল। চোখ গাল বুক মুছে নিঃশব্দে বিছানায় এলাম। স্ত্রী কিছু টেরই পেলেন না। সেদিনই সকাল দশটার দিকে লিখতে বসেছি। তারপর দেখি লেখার ঘোর তৈরি হয়েছে নিজের মধ্যে। তরতর করে লিখে যাচ্ছি নূরজাহান তৃতীয় পর্ব।

লেখার প্রথম লাইন হয়ে গেলে আমি আর আটকাই না। তবে প্রথম লাইন লিখতে অনেক সময় লাগে। কখনও কখনও মাসের পর মাস কেটে যায়। পরিকল্পনা করার লেখাটির প্রথম লাইন আর লেখা হয় না। নূরজাহান উপন্যাসের শুরুর লাইনটা ছিল এই, ‘শেষ হেমন্তের অপরাহ্ন বেলায় উত্তরের হাওয়াটা একদিন বইতে শুরু করল।’ ‘দ্বিতীয় পর্বের’ প্রথম লাইন, ‘শীতকালের ফিঙেপাখি কেমন করে ওড়ে!’ আর ‘তৃতীয় পর্ব’ শুরু হলো এই লাইনটি দিয়ে, ‘ভরা বর্ষার পানি ভেঙে ওপারের জঙ্গলে যায় বিশাল এক দাড়াশ সাপ।’

              নূরজাহান দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশের পর বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় দৈনিকের সাহিত্য পাতায় আমার পরিচিত এক ‘হাফপণ্ডিত’ একটি সমালোচনা লিখেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘এই উপন্যাসে নূরজাহান কোথায় ? বেশির ভাগই তো অন্য চরিত্র ?’

ভদ্রলোককে ‘হাফপণ্ডিত’ বললাম এই কারণে যে, তিনি জানেন না একটি বড় উপন্যাসে প্রথম পর্বটি হয় অনেকটাই ভূমিকার মতো। চরিত্রগুলোকে চেনান এবং কাহিনি এগিয়ে নেওয়া। দ্বিতীয় পর্বটিতে হয় উপন্যাসটি বিস্তৃত করার কাজ। অর্থাৎ চারদিকে ছড়ানো। নতুন নতুন চরিত্র এসেও ভিড় করে। ঘটনা ছড়ায় ভিন্ন ভিন্ন খাতে আর শেষ পর্বে এসে চরিত্রগুলোর পরিণতি দেওয়ার কথা ভাবেন লেখক। ঝাঁকিজালের মতো ছড়ানে কাহিনিটি গুটিয়ে আনেন। আমি এভাবেই উপন্যাসটি লিখেছি।

সেদিনের পর থেকে আমি আর অন্য কোনও লেখা লিখিনি। একটানা লিখে গেছি নূরজাহান শেষ পর্ব। একদিকে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখছি আর আমার দীর্ঘদিনের সহকারী শাহীন কম্পোজ করে চলেছে। আমি লিখি হাতে, কম্পিউটারে লিখতে পারি না। লেখক জীবনের শুরুতে হাতের লেখা গোটা গোটা ছিল। এখন এমন পর্যায়ে গেছে, নিজের লেখা নিজেই অনেক সময় পড়তে পারি না। একমাত্র শাহীনই পারে।

উপন্যাস শেষ করার পর কয়েকটা দিন খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। কেমন যেন এক শূন্যতা নিজের ভেতর। বহু বছর ধরে কী যেন সঙ্গে ছিল, কী যেন হারিয়ে গেছে! পরে বুঝতে পারি কষ্টটা হচ্ছে নূরজাহান লিখে শেষ করার জন্য। সব মিলিয়ে প্রায় আঠারো বছর ধরে উপন্যাসের চরিত্রগুলো আমার সঙ্গে ছিল। লেখা শেষ হওয়ার ফলে তারা আর সঙ্গে নেই। আমি কেমন নিঃসঙ্গ হয়ে গেছি!

এই রকম অনুভূতি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়েরও হয়েছিল। কোথায় যেন তিনি লিখেও ছিলেন। বোধহয় সেই সময়, বা পূর্ব পশ্চিম, বা প্রথম আলো লিখে শেষ করার পর এই রকম অনুভূতি হয়েছিল তাঁর।

তারপর নূরজাহান তৃতীয় পর্ব একসঙ্গে আমি পড়তে শুরু করলাম। এতদিন পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে গেছি, চ্যাপ্টারগুলো পড়েছি কিন্তু একসঙ্গে পুরোটা পড়া হয়নি। শাহীন পুরোটার প্রিন্ট বের করে দিয়েছে। পড়তে গিয়ে শরীর হিম হয়ে গেল। এ কি ? এই পর্বের ভাষা তো বলতে গেলে পুরোটাই বিক্রমপুরের আঞ্চলিক ভাষা। পর্বটি লেখা হয়েছে সম্পূর্ণই আঞ্চলিক ভাষায়। প্রথম দুই পর্বের ভাষার সঙ্গে এই পর্বের ভাষার অনেকখানি অমিল। পাশাপাশি এও মনে হলো, উপন্যাসটির জন্য এই ভাষাই যথাযথ। তাহলে আগের পর্ব দুটোর কী হবে ?

অনন্যা প্রকাশনী তৃতীয় পর্ব ছাপতে শুরু করল। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি বইমেলায় নূরজাহান তৃতীয় পর্ব বেরিয়েও গেল। কিন্তু আমার বুকে তো ভাষার পাথরটি চেপে বসেছে। কী করবো এখন ?

প্রথম পর্বটি নিয়ে বসলাম। তিন চার মাস ধরে কেটে কেটে, কেটে কেটে তৃতীয় পর্বের ভাষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাষাটি তৈরি করলাম। তারপর বসলাম দ্বিতীয় পর্ব নিয়ে। একইভাবে এই পর্বের ভাষাও ঠিক করলাম। আট নয় মাস লেগে গেল পুরো কাজটা শেষ করতে। লাল কালিতে আমার কাটা কপিগুলো মাসের পর মাস ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কারেকশন করল শাহীন। শিল্পী ও লেখক ধ্রুব এষ এই কাটা কপিগুলো একদিন দেখলেন। দেখে বিস্মিত! ‘পর্ব দুটো তো আপনি আবার নতুন করে লিখেছেন মিলন ভাই।’

এ আসলে এক রকম নতুন করেই লেখা। অনন্যা প্রকাশনী তারপর তিন পর্ব একত্র করে প্রকাশ করল। রয়্যাল সাইজে পৃষ্ঠা সংখ্যা ৯৭৬। আলাদা আলাদা তিন পর্ব তো ছেপেছেই। সেই যে ভদ্রমহিলা তিরানব্বই সালের বইমেলায় বলেছিলেন ‘প্রকৃত সাহিত্যের পাঠক দেশে আছে।’ নূরজাহান প্রকাশের পর আমি তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করলাম। পর্বগুলো তো চলছিলই, অখণ্ড সংস্করণটিও কোনও কোনও পাঠক নিতে লাগলেন। ১৮০০ টাকা দামের বইটি প্রথম তিন বছরে তিনটি সংস্করণ হলো। ২০১২ সালে এই উপন্যাসের জন্য আমি দিল্লি থেকে বড় একটি সাহিত্য পুরস্কার পেলাম। ‘আইআইপিএম সুরমা চৌধুরী স্মৃতি আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার’। ভারতীয় দশ লক্ষ রুপি পুরস্কারের অর্থমূল্য। ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে কোলকাতার ‘আনন্দ পাবলিশার্স’ প্রকাশ করল ‘নূরজাহান প্রথম অখণ্ড আনন্দ সংস্করণ’। ১০০০ রুপির বইটির তৃতীয় মুদ্রণ হলো ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে।

উপন্যাসটির কথা যখনই ভাবি তখনই সেই ভদ্রমহিলাটির কথা আমার মনে হয়। তিনি তাঁর নামটি সেদিন বলেননি। পরে তাঁর সঙ্গে আর কখনও দেখাও হয়নি! তবে তিনি যদি সেদিন ওভাবে না বলতেন তাহলে হয়ত নূরজাহান লেখার কথা আমার মাথায় আসত না। আমি সেই নাম না জানা মানুষটির কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।

[চলবে]

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares