উপমহাদেশের শিক্ষক : পবিত্র সরকার

প্রচ্ছদ রচনা : বাংলাদেশের শিক্ষক আনিসুজ্জামান

আমরা যারা আশি বছর পার করেছি, তারা খানিকটা গর্ব করেই বলতে পারি যে, আমরা দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষী, ইতিহাস নির্মাণে আমাদের কারও কারও ভূমিকা যতই নগণ্য হোক। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানও আমাদের মতোই দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষী, এবং আমাদের চেয়ে অনেক বেশি করে ইতিহাসের নির্মাতা তো বটেই। মানুষের সমাজে নানারকমের ইতিহাস আছেÑ বড় ইতিহাস, আরও নানা মাঝারি আর ছোট ইতিহাস। বড় ইতিহাসেÑ মঞ্চের নেপথ্যে তাঁর ভূমিকা তো রীতিমতো গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেশভাগ দেখেছেন, দেশভাগের শিকার হয়েছেন, তৎকালীন পূর্ববঙ্গ এবং পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলন, গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ, রবীন্দ্রনাথ-বিরোধিতার বিরুদ্ধে প্রবল সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, বাঙালির জাতিসত্তার ক্রমবিকাশ, উনসত্তরের উত্তাল বিদ্রোহ, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, শেখ মুজিবের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম, পরে জাতির পিতার হত্যা আর বাংলাদেশের স্বৈরশাসন, গত শতাব্দীর আশির বছরগুলির শেষে গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন, তার পরবর্তী উত্থান-পতন, বিপুল প্রযুক্তি বিপ্লব, ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে চিহ্নিতকরণÑ এক বিশাল সময়-মানচিত্রজুড়ে তাঁর জীবনের ব্যাপ্তি। সে-জীবন একবিংশ শতাব্দীতেও দু-দশক পেরিয়ে যেতে চলেছে। এই উজ্জ্বল জীবনের জয়যাত্রা অব্যাহত থাক।

অন্যদিকে আমরা যারা শিক্ষক, তাঁদের মধ্যেও অধ্যাপক আনিসুজ্জামান অনন্য। কত শিক্ষকই তো আমরা দেখি। বহু শিক্ষক শিক্ষকতার জীবিকাতে এসেই মনে করেন আমার চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে, আমার আর কিছু করার নেই। হয়তো একটি ডক্টরেট ডিগ্রি সম্বল করে তিনি দিনগত পাপক্ষয় করে শিক্ষকজীবন শেষ করেন, আর কোনো লক্ষ্যে তিনি অগ্রসর হওয়ার উদ্যম দেখান না। আবার অবশ্যই কিছু বিরল শিক্ষক থাকেন, যাঁর কাছে শিক্ষকতার সুযোগ একটা ভিত্তি বা আরম্ভ মাত্র। সেখানে থেকে তাঁর অন্তহীন এক-যাত্রা শুরু হয়, অধ্যাপনা থেকে গবেষণায়, সমাজকর্মে, দেশকর্মে। গ্রন্থের পর গ্রন্থে, জ্ঞানচর্চা আর জ্ঞানবিতরণের অব্যাহত এক ধারাবাহিকতা তিনি নির্মাণ করেন নিজের জন্য। তাঁর যেন নিজের সঙ্গে নিজের নিরন্তর প্রতিযোগিতা, কেবলই নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা। সব শিক্ষক শিক্ষা এবং সংস্কৃতিতে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হন না। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এই দ্বিতীয় ধরনের শিক্ষক। ফলে তাঁর শিক্ষকতাকর্ম ক্লাসঘরের বাইরে অনেক বিস্তৃত। যারা তাঁর প্রত্যক্ষ ছাত্র হওয়ার সুযোগ পায়নি তারাও তাঁর গ্রন্থ ও অন্যান্য রচনা পড়ে তাঁর শিক্ষা পেয়েছে বলে দাবি করতে পারি, যেমন আমরা পারি।

আমি জানি, শিক্ষকদের ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং বিস্তারÑ দুইই খানিকটা প্রতিবেশের উপর নির্ভর করে- সামাজিক প্রতিবেশ, পারিবারিক প্রতিবেশ, এবং শিক্ষকের ব্যক্তিগত মনস্তত্ত্ব। হয়তো কোনও কোনও শিক্ষকের কাছে প্রতিবেশ একটু বেশি দাবি করে, এবং তিনিও সেই দাবিতে সাড়া দেওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেন। ফলে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান শুধু বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্রে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে পারেননিÑ সামাজিক, সাংস্কৃতিক, বৌদ্ধিক, রাজনৈতিক নানা আন্দোলনে ও কর্মে নিজেকে বিস্তারিত করেছেন, যা সকলে পারে না। তাই বুঝি বাংলাদেশে যাবতীয় বিচিত্র সভাসমিতিতে তিনিই সবচেয়ে বেশি বাঞ্ছিত ব্যক্তিত্ব, তাঁর একটু উপস্থিতি পেলেই যে কোনও সভা অন্য একটাই সার্থকতার মাত্রা পেয়ে যায়।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সম্বন্ধে তাই নানাদিক থেকে বহুবিধ কথা বলার পরিসর তৈরি আছে। আমি যা বলতে পারি তার চেয়ে অন্যরা নিশ্চয় আরও বেশি করে, আরও পূর্ণাঙ্গভাবে বলার সামর্থ্য রাখেন। তাঁর কাজের সঙ্গে আমার পরিচয় দীর্ঘকালের; কিন্তু, যে-কারণেই হোক, ওই মানুষটির সঙ্গে আমার পরিচয় গত দশ-বারো বছরে ব্যাপ্ত। কিন্তু এই স্বল্প সময়েই তাঁর প্রীতি ও প্রশ্রয়ে আমার জীবন নানাভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে। তাই এই স্বল্প অবকাশে আমি তাঁকে যেভাবে বুঝেছি একে একে তা বলবার চেষ্টা করি। বলা বাহুল্য, এটা কোনও গবেষণামূলক প্রবন্ধ হবে না। বঙ্গভাষী জনগোষ্ঠীর সাহিত্য-সংস্কৃতিতে আনিসভাইয়ের অবদান সম্বন্ধে পৃথক ও পরিপূর্ণ গবেষণা নিশ্চয়ই হতে পারে, আমি তার যোগ্য নই। আমি সাধারণভাবে তাঁর কাজের মূলত তিনটি অভিমুখ লক্ষ্য করি, নিশ্চয়ই অন্যদের কাছে তাঁর আরও দিক ধরা পড়বে। আমার দেখা এই তিনটি পরস্পর-নিরপেক্ষ নয়, একটি অন্যটিকে সমর্থন করে এবং শক্তি দেয়Ñ এবং তারই ফলে আনিসভাই এই সময়ে উপমহাদেশে এক অতি শ্রদ্ধেয় চিন্তা-নেতা হয়ে ওঠেন।

আগে তো তাঁকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের অজানা বা অপেক্ষাকৃত অজানা তথ্যের আবিষ্কারক ও বিশ্লেষক হিসেবে গভীর শ্রদ্ধা করে এসেছি। তখন সম্পর্কটা ছিল শিক্ষক ছাত্রের, তিনি দাতা আমি গ্রহীতা। যদিও বয়সে তিনি আমার চেয়ে মাত্র মাস খানেকের বড়ো, সেকথা অনেক পরে জেনেছি। আমি যদি বয়সে তাঁর চেয়ে দশ বা পনেরো বছরের বড়োও হতাম তবুও তাঁর ছাত্র হতে আমার অসুবিধে হতো না। তাঁর গ্রন্থ আর রচনাবলি আমাকে এক ধরনের ‘দূরশিক্ষা’ দিয়েছে, আর সকলেই জানেনÑ দূরশিক্ষা শিক্ষক-ছাত্রের বয়সের আপেক্ষিকতা মানে না। প্রথমদিকে তাঁর বইগুলো পড়ে মনে হতো এক জ্ঞানবৃদ্ধ ও প্রবীণ মানুষের মুখোমুখি হয়েছি আমি, যাঁর বই পড়লে বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্বন্ধে জ্ঞানের নতুন নতুন দেশের দরজা খুলে যায়। আমার মতে আরও হাজার হাজার বাঙালির শিক্ষক তিনি, তাঁর কাছে আমরা অকুণ্ঠচিত্তে হাত পেতে শিক্ষা ও জ্ঞানের সঞ্চয় গ্রহণ করি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের অনেক নষ্ট কোষ্ঠী উদ্ধার, বাংলা সাহিত্যে সংস্কৃতিতে বাঙালি মুসলমানের দানের মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ এক বিষয়Ñ যা দেশভাগের আগে কিছুটা প্রান্তিকতায় নির্বাসিত ছিলÑ সেই বিষয়ের অতি সমর্থ আলোচক, লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরি থেকে চিঠিপত্র আর দলিলে বাংলা গদ্যের পুরোনো নিদর্শন উদ্ধার, শুধু বাঙালি মুসলমানের নয়, ব্যাপক অর্থে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সমস্ত বাংলাভাষীর আত্মতা আর আত্মপরিচয় সন্ধান, সেই সঙ্গে বাঙালির সাংস্কৃতিক বহুত্বের জিজ্ঞাসা ও স্বীকৃতি, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের মানস ও ঘটনার বিবর্তন, সাহিত্য ও সমাজে বাঙালি নারীর ভূমিকা, রবীন্দ্রনাথ, শহীদুল্লাহ, মুনির চৌধুরী, বাংলাদেশের শিল্পকলাÑ কী হয়নি তাঁর আগ্রহ ও চর্চার বিষয়? দেশে-বিদেশে তাঁর বক্তৃতা ও প্রকাশন, সমস্ত কিছুতেই তাঁর বিপুল গবেষণা, তথ্য ও উপকরণ সংগ্রহ, প্রখর বিশ্লেষণের পরিচয় আছে। তাঁর সহজ ও ভণিতাহীন গদ্যেরও আমি গভীর অনুরাগী। তাঁর অনুবাদ এবং আত্মজীবনীমূলক লেখাগুলিও তো অনবদ্য।

আমাদের ক্ষুদ্র বিচারে মনে হয়েছিল, দেশভাগের পর পশ্চিম বাংলায় সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাস নির্মাণে এ পারে অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের যত না বিশেষজ্ঞের উদ্ভব ঘটেছে তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষজ্ঞ গবেষক উঠে এসেছেন পূর্ববঙ্গে, তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে। প্রবীণেরা তো ছিলেনই। কিন্তু পরবর্তীদের মধ্যে তাঁর নিজের ক্ষেত্রে দুই বাংলাতেই আনিসুজ্জামানের মতো গবেষক দুর্লভ, যেমন দুর্লভ বদরুদ্দীন উমর, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, গোলাম মুরশিদ বা হুমায়ুন আজাদের মতো মননশীল ও বিবেকসম্পন্ন মানুষ। সেলিম আল্ দীনের মতো নাট্যকারও বা আর কোথায় পাই? আরও অনেকের নাম অবশ্যই করা যায়। এই তুলনাটা কোনও বড়ো কথা নয়, যেখানেই কাজ করুন এঁরা সমগ্র বাঙালির সম্পদ হয়ে ওঠেন। আমি আনিসভাইকে এক অখণ্ড সংস্কৃতির উৎপাদন হিসেবেই ধরেছি। কিন্তু একথা অস্বীকার করা সম্ভব নয় যে, পাকিস্তান পর্বে পূর্ববাংলার বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত সমাজে একটা অন্য ধরনের চিন্তা ও সৃষ্টির স্ফূর্তি তৈরি হয়েছিল, তাঁদের দেশে ও বিদেশে গবেষণা ও বিস্তারের সুযোগ অনেক বেশি এসেছিল। পরে পাকিস্তানের সঙ্গে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামে এই আত্মপরিচয়ের এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আরও তীব্র হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে এক নতুন রেনেসাঁসের জন্ম দিয়েছে। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান প্রাগ্বাংলাদেশ পর্বের সেই রেনেসাঁসের ফসল, যিনি আবার বাংলাদেশের জন্মের পর আর-এক নতুন রেনেসাঁসের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

মনস্বিতা আর গবেষণার বাইরেও আনিসভাই বাংলাদেশের মুক্ত-চেতনার এক প্রধান সেনাপতি হয়ে উঠেছেন এবং আমাদের গভীর শ্রদ্ধার দাবিদার হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেন তাঁর প্রজন্মের অনেকের মতো তাঁরও মধ্যে মূর্ত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করার সময়ে যে অসাম্প্রদায়িক উদার মানবিক বোধের উদ্বোধন ঘটিয়েছিলেন, তার অংশীদার হয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রায় সমগ্র বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। উপরে যাঁদের নাম করেছিÑ আনিসভাই তাঁদের মধ্যে প্রথম  সারিতে হাজির। ছিলেন শহিদ মুনীর চৌধুরী, প্রয়াত কবীর চৌধুরী, আছেন আমার অগ্রজ বন্ধু অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। ছিলেন এবং আছেন বহু সংস্কৃতির সেনানী। নাটকে, গানে, সাহিত্যে মননচর্চার এক প্রবল ভিত্তি নির্মাণে তাঁরা আনিসভাইদের যোগ্য সহকর্মী  হয়ে উঠেছিলেন। তাঁরাই পাকিস্তানের আইয়ুব আর ইয়াহিয়াদের শাসনের বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর তুলেছেন, কলম ধরেছেন, রবীন্দ্র-শতবার্ষিকীতে রবীন্দ্রনাথের গানের উপর নিষেধাজ্ঞায় তাঁরই পথে নেমে জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে। এবং তাঁদের সম্মিলিত আন্দোলন আনিসভাইকে এক স্বাভাবিক নেতৃত্বের অধিষ্ঠানে এনে বসিয়েছে। তাঁর এই উদার গণতান্ত্রিক মানবিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্বাস ও চিন্তার জগতে মুক্তবুদ্ধির সহজ আত্মীকরণ। গত শতকের বিশেষ বছরগুলির মাঝামাঝি শিখা পত্রিকার নেতৃত্বে পূর্ববাংলা শুধু নয়, দুই বাংলার মুসলিম সমাজে যে মুক্তচিন্তার সঞ্চার হয়েছিল (যে ধরনের চিন্তা হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মীয় সমাজের পক্ষেও উপকারী হতো), বাংলাদেশের অনেকের সঙ্গে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তার একালের প্রতিনিধি এবং সম্মুখ সারির এক অভিযাত্রী। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তিনি মহৎ, অলীক সংস্কারমুক্ত অথচ মানুষের প্রতি সম্পূর্ণ দায়বদ্ধ, ইহজাগতিকতার সাধনা করে চলেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের শোক আর ক্ষয়ক্ষতি, নানা হুমকি ও আক্রমণ তাঁর মেরুদণ্ড নুয়ে দিতে পারেনি, সে সব পার হয়ে তিনি সমগ্র বাঙালি সংস্কৃতির মানবিক ও ভয়হীন প্রগতিশীলতার মুখ হয়ে আছেন। শুধু তাই নয়, তাঁর কাজ আর ব্যক্তিত্বের স্বাভাবিক সমর্থনে বাঙালি সংস্কৃতির বর্তমান অভিভাবকত্বের দায়টিও যেন তাঁর উপর অত্যন্ত সহজেই বর্তেছে। ফলে এই ঋজু ও প্রসন্ন মানুষটি যেখানেই হাজির থাকেন সেখানেই আমাদের সকলের মাথা ছাড়িয়ে তাঁর মাথাই দেখা যায়।

আর-একটা বিষয়ে আনিসভাইয়ের ভূমিকা আমি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। এই দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের বাংলাদেশ ও ভারত এই দুই দেশের মধ্যে কত সহজে সেতুবন্ধ রচনা করেন তিনি। তাঁর পারাপারের বিশ্রাম নেই, সীমান্ত ডিঙিয়ে তাঁর নিত্যযাত্রা চলে। এ বাংলার বহু মানুষের কাছে তিনি আত্মীয়ের চেয়েও বেশি। এ বাংলার  প্রতিষ্ঠান তাঁর নানা কাজে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা চায়, তাঁকে পুরস্কার দিয়ে কৃতার্থ বোধ করে। পশ্চিমবাংলার যেখানে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে যত বিদ্যাসম্মেলন হোক, এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে কাছের দূরের নানা বিশ্ববিদ্যালয়, কিংবা ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি আয়োগের প্ররোচনায় যত উজ্জীবনী পাঠক্রমের ব্যবস্থা হয়Ñ তার সর্বত্রই উদ্বোধক অথবা অতিথি বা সভাপতি হিসেবে যে নামটির কথা সর্বাগ্রে ভাবা হয় সে নাম আনিসভাইয়ের। আমার জন্মভূমি প্রাক্তন পূর্ববাংলায়। ফলে যে কোনও কারণেই হোক, বাংলাদেশের নানা অনুষ্ঠানে আমার ডাক এলে, আমি তৎক্ষণাৎ বিনাচিন্তায় লাফিয়ে চলে যাই, এবং বাংলাদেশের মাটির গন্ধের সঙ্গে সে দেশের মানুষের প্রবল ভালোবাসা আর আপ্যায়নে স্নান করে ফিরে আসি। জানি না, চব্বিশ পরগনার জন্মভূমির কথা মনে করে  আনিসভাইয়ের মনেও এই রকম আবেগ তৈরি হয় কিনা। তিনিও আমারই মতো এই সব কাজে কখনও কাউকে ফিরিয়ে দেন না, এবং নিজের শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, আমরা বাংলাদেশি বন্ধুদের মতো প্রাণঘাতী সমাদর তাঁকে করতে পারব না জেনেও, উড়ে চলে এসে এখানকার নানা বিদ্যা সম্মেলনে যোগদান করেন। তাঁর উপস্থিতিতে এই বিদ্যা সম্মেলনগুলি অন্য এক ধরনের সম্ভ্রম অর্জন করে, তিনি না এলে যা হতে পারত না। অর্থাৎ তিনি শুধু বাংলাদেশের শিক্ষক নন, তিনি সমগ্র উপমহাদেশের শিক্ষক হয়ে উঠেছেন। এই সম্মান হয়তো একদিন ছিল ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-র, আজ যেন তাঁরই উত্তরাধিকার আনিসভাইয়ের উপর সহজেই বর্তেছে, আর কোনও বিকল্প বা প্রতিযোগী তাঁর ছিল না।

এ খুবই আনন্দের কথা যে, দুই দেশের মধ্যে গভীর সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধের প্রতীক যে মনস্বী, তাঁকে ভারত সরকার ‘পদ্মভূষণ’ সম্মান অর্পণ করেছেন। আমরা এ পারের বাঙালিরাও তাঁর জন্য অহংকার বোধ করি। আমি আশা করব, আরও দীর্ঘদিন তিনি সুস্থ দেহে আনন্দিতচিত্তে আমাদের সামনে প্রগাঢ় জ্ঞানচর্চার যেমন, তেমনই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর মুক্তবুদ্ধি ও স্বচ্ছ ইহজাগতিক জীবনবোধের পতাকাগুলি শক্ত হাতে উঁচু করে ধরে শিরদাঁড়া সোজা  রেখে আমাদের সামনে পথ হাঁটবেন, আমাদের পথ দেখাতে দেখাতে এগোবেন। তাঁকে আমরা গভীর ও নতশির শ্রদ্ধা জানাই।

স্বীকৃতি : এ লেখায় আমার পূর্ববর্তী একটি লেখাও আমি ব্যবহার করেছি।

 লেখক : ভাষাতত্ত্ববিদ; সাবেক উপাচার্য,

রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares