Uncategorized

গল্প : নীল রঙের ডায়েরি : দীপু মাহমুদ

অনিরুদ্ধ সেন ছোট কদমগাছের নিচে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখে উদাস দৃষ্টি। তিনি ঠিক নির্দিষ্ট কিছু দেখছেন বলে মনে হচ্ছে না। আবার মনে হচ্ছে তিনি আশপাশের সবকিছু খুব স্পষ্টভাবে দেখছেন।

অনিরুদ্ধ সেনের বয়স পঁয়ষট্টি বছর। লম্বা মানুষ। বয়সের তুলনায় শরীর বেশ সোজা। চুল প্রায় পুরো সাদা। চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা। হাঁটার সময় লাঠি ব্যবহার করেন না। তবে সিঁড়ি ভাঙার সময় রেলিং ধরে ওঠেন।

শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে, যেখানে উঁচু ভবনের ছায়া ধীরে ধীরে ফুরিয়ে এসে পুরোনো আমগাছ, শিউলিগাছ আর নিচু টিনের ঘরগুলোর মধ্যে মিশে গেছে, সেখানে একটি প্রবীণ নিবাস আছে। নাম―ঘাসফড়িং।

নামটা যে মানুষ রেখেছিলেন, তিনি হয়তো বিশ্বাস করতেন বার্ধক্যও এক ধরনের আনন্দ। যখন মানুষ ঘাসফড়িংয়ের মতো মনের আনন্দে লাফিয়ে চলে। তবে এখানে এলে বোঝা যায়, বার্ধক্য অনেক সময় ঠিক মনের আনন্দে লাফিয়ে চলা নয়, দিনের শেষ আলোটুকু নিভে যাওয়ার আগের দীর্ঘ অপেক্ষা।

অনিরুদ্ধ সেন বছর দেড়েক হলো ঘাসফড়িং প্রবীণ নিবাসের বাসিন্দা হয়েছেন। এখানে যারা থাকেন, তাদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে নিয়মমাফিক মানুষ। ভোর পাঁচটায় ঘুম ভাঙে। ছয়টায় হাঁটা। সাড়ে সাতটায় চা। সকালে এক ঘণ্টা পড়াশোনা। দুপুরে খানিকটা ঘুম। বিকেলে বাগানে বসা। রাতে ডায়েরি লেখা।

কেউ যদি দূর থেকে দেখত, মনে হতো মানুষটি যেন নিজের জীবনের ভেতর ছোট্ট ঘড়ি বসিয়ে নিয়েছেন। সবকিছু সেই ঘড়ির কাঁটা মেনে চলে।

শুধু একটি সময় ছাড়া। রাত আটটা। ঠিক রাত আটটায় তিনি নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করেন। টেবিলের ড্রয়ার খুলে নীল কাপড়ে মোড়া ডায়েরি বের করেন। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা পড়েন। নতুন ডায়েরিতে কয়েক লাইন লেখেন।

প্রবীণ নিবাসের অন্য বাসিন্দারা এই সময় তাকে বিরক্ত করেন না। সবাই মনে করেন, এই এক ঘণ্টা অনিরুদ্ধ সেনের ব্যক্তিগত প্রার্থনার সময়।

নিবাসের তত্ত্বাবধায়ক শর্মিলা রায়। কৌতূহল সামলাতে না পেরে একদিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার, এত কী লেখেন?’

অনিরুদ্ধ সেন বললেন, ‘যে মানুষগুলো হারিয়ে যায়, তাদের কোথাও না কোথাও বেঁচে থাকতে হয়। আমি কেবল সেই জায়গাটা বানিয়ে দিই।’

শর্মিলা আর কিছু বললেন না। তার মনে হয়েছে, কবিরা বোধহয় এমন কথাই বলেন।

অনিরুদ্ধ শিক্ষক ছিলেন। বাংলা সাহিত্য পড়াতেন। শুরু করেছিলেন এক প্রত্যন্ত উপজেলার উচ্চবিদ্যালয়ে। পরে কলেজে। দীর্ঘ চল্লিশ বছরের শিক্ষকতা। অবসর নেওয়ার দিন কলেজের অডিটোরিয়ামে ছাত্ররা দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়েছিল প্রায় পাঁচ মিনিট। সেদিন একজন প্রাক্তন ছাত্র বলেছিল, ‘স্যার, আপনি শুধু বাংলা শেখাননি। মানুষকে কীভাবে মনে রাখতে হয়, সেটাও শিখিয়েছেন।’

কথাটা শুনে অনিরুদ্ধ কোনও উত্তর দেননি। কারণ তিনি জানতেন, যাকে তিনি সারা জীবন মনে রাখতে চেয়েছেন, তাকে মনে রাখার ক্ষমতাও হয়তো একদিন হারিয়ে ফেলবেন।

অবসরের পর প্রথম কয়েক বছর তিনি একাই থাকতেন। শহরের পুরোনো বাড়ি। চারদিকে বই। একটা হারমোনিয়াম। একটা ভাঙা টাইপরাইটার। আর ডায়েরি।

প্রতিবেশীরা মাঝে মাঝে বলত, ‘স্যার, একা থাকেন কী করে?’

তিনি হাসতেন। মানুষের সবচেয়ে বড় ভিড় থাকে তার স্মৃতির মধ্যে―এ কথা তিনি কাউকে বলতেন না।

তার কোনও সন্তান নেই। স্ত্রীও নেই। কেউ কেউ ভেবেছে, বোধহয় বিয়ে করতে চাননি। আদতে মানুষ কখনও কখনও বিয়ে না করেও সারা জীবন একজনের সঙ্গেই সংসার করে। পার্থক্য শুধু, সেই সংসার অন্য কেউ দেখতে পায় না।

অনিরুদ্ধের সংসার ডায়েরির ভেতরে। প্রথম ডায়েরি কিনেছিলেন শিক্ষকতার প্রথম বেতনে। দাম ছিল ছেচল্লিশ টাকা। আজও প্রথম পাতায় কালি শুকিয়ে গাঢ় বাদামি হয়ে আছে।

‘১৭ জুলাই, ১৯৮৬। আজ একজন মেয়ের সঙ্গে দেখা হলো। সে বইয়ের ভেতরে শুকনো কৃষ্ণচূড়া রেখে দিয়েছে। আমি ভেবেছিলাম, ফুল শুকিয়ে গেলে তার রং মরে যায়। আজ বুঝলাম, কিছু রং শুকিয়ে গেলে আরও গভীর হয়।’

এই একটি বাক্যের পর থেকে ডায়েরির প্রতিটি পৃষ্ঠা ধীরে ধীরে এক মানুষের দিকে হেঁটে গেছে।

তানিয়া। অনিরুদ্ধ কখনও কারও সামনে নামটি উচ্চারণ করতেন না। তবে প্রতিটি ডায়েরির ভেতরে নামটি এতবার লেখা যে মনে হয়, শব্দটিও একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।

প্রবীন নিবাসে তার সবচেয়ে কাছের মানুষ আবদুল করিম। সাবেক ডাক বিভাগের কর্মচারী। বয়স বাহাত্তর বছর। প্রতিদিন বিকেলে এসে বসেন, ‘স্যার, নতুন কবিতা লিখলেন?’

অনিরুদ্ধ বলেন, ‘কবিতা আর লিখতে পারছি না।’

‘তাহলে পুরোনোটা?’

‘সেটাও লিখে শেষ করতে পারিনি।’

‘তাহলে এতক্ষণ কী করছেন?’

অনিরুদ্ধ হেসে বললেন, ‘একজন মানুষকে ভুলে না যাওয়ার চেষ্টা করছি। সব সময় করি।’

করিম সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে যেন অতীত থেকে বলে উঠলেন, ‘আমরা মানুষকে ভুলে যাই না। আমরা ভয় পাই, একদিন যদি নিজেকেই ভুলে যাই, তখন আর আমাকে মনে রাখবে কে?’

প্রবীণ নিবাসে প্রতি বৃহস্পতিবার একজন তরুণী স্বেচ্ছাসেবক আসে। তার নাম ঐশী। বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞান পড়ছে। সে বয়স্কদের সঙ্গে গল্প করে, বই পড়ে শোনায়, দাবা খেলে।

অনিরুদ্ধকে দেখে প্রথম দিনেই চিনে ফেলেছে, ‘ও মাই গড! কবি অনিরুদ্ধ সেন!’

অনিরুদ্ধ অবাক হয়ে বললেন, ‘আমার লেখা কবিতা এখনও কেউ পড়ে!’

ঐশী হেসে বলল, ‘আমার বাবা আপনার ছাত্র ছিলেন। তিনি আপনার একটা দীর্ঘ কবিতা পুরো মুখস্থ বলতে পারেন।’

বলে ঐশী নিজের দুই হাতের তালু একসঙ্গে লাগিয়ে ঠোঁটে ঠেকিয়ে আবৃত্তি করল, ‘যে চলে যায়, সে সবসময় দূরে যায় না, কখনও কখনও সে আমাদের স্মৃতির ভেতর আরও গভীরে নেমে যায়, নিতল ভালোবাসায়।’

অনিরুদ্ধ চুপ করে আছেন। ঐশীও আচমকা কবিতা বলা থামিয়ে অনিরুদ্ধ সেনের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। অনিরুদ্ধ সেন নিজের ভেতর গহিন অতল থেকে বলে উঠলেন, ‘কবিতাটা লিখেছিলাম অনেক বছর আগে।’

ঐশী বলল, ‘কাউকে ভেবে লিখেছিলেন!’

অনিরুদ্ধ কিছু না বলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিলেন। খানিকক্ষণ পরে বললেন, ‘নাম বললে কবিতাটা ছোট হয়ে যাবে।’

ঐশী আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি। সেদিন রাতে ডায়েরিতে অনিরুদ্ধ লিখলেন, ‘আজ একজন অচেনা মেয়ে আমার পুরোনো কবিতা শুনিয়ে গেল। অদ্ভুত ব্যাপার, মানুষ লেখাকে মনে রাখে, কিন্তু লেখার কারণটাকে কেউ জানে না। হয়তো এটাই ভালো। সব গল্প প্রকাশ পেলে গল্প বাঁচে না।’

প্রবীণ নিবাসে আলোড়ন তোলার মতো কিছু শোনা যায় না। সব খুব গতানুগতিক। সেদিন ব্যতিক্রম হলো। খবর এল, ঘাসফড়িংয়ে নতুন একজন বাসিন্দা আসছেন। নারী। বয়স প্রায় ষাট বছর। এ পর্যন্ত খবর গতানুগতিক। কৌতূহল হচ্ছে, তিনি আলঝেইমার এবং ডিমেনশিয়ার পেশেন্ট। তার অতীত হারিয়ে গেছে।

এই ঘটনা অন্যদের বিশেষ আলোড়িত করলেও অনিরুদ্ধ সেনের কাছে প্রতিদিনের ঘটনার মতো স্বাভাবিক মনে হয়েছে। মানুষ আসছেন চলে যাচ্ছেন।

তবু সেদিন রাতে ডায়েরি লিখতে গিয়ে কেন জানি মন বসছিল না। বাইরে থেকে হালকা বৃষ্টির আওয়াজ আসছে। তিনি শেষ পর্যন্ত শুধু একটা লাইন লিখলেন, ‘আজ সারাদিন মনে হলো, যেন অনেক দূরের কোনও ট্রেন আমার দিকে এগিয়ে আসছে। এখনও দেখা যায় না। শুধু শব্দ শোনা যায়।’

পরদিন সকাল। আকাশে মেঘ। প্রবীণ নিবাসের সামনে একটি সাদা অ্যাম্বুলেন্স এসে থামল। দুজন নার্স খুব সাবধানে একজন মহিলাকে নামালেন। মহিলার চুল প্রায় পুরো সাদা। চোখে এক ধরনের বিস্মিত শূন্যতা। মনে হলো তিনি চারপাশের পৃথিবীটাকে দেখছেন, কিন্তু চিনতে পারছেন না।

রেজিস্টারের কাগজে শর্মিলা নাম লিখছিলেন। অনিরুদ্ধ সেদিকে তাকানোর কোনও ইচ্ছে নিয়ে দাঁড়াননি। তবু অদ্ভুতভাবে তার চোখ গিয়ে আটকাল রেজিস্টার খাতার পৃষ্ঠায়।

নাম: তানিয়া সুলতানা

মুহূর্তের মধ্যে যেন পৃথিবীর সমস্ত শব্দ থেমে গেল। দূরে ঝরে পড়া ফুল। বাগানে ঝাড়ু দেওয়ার শব্দ। রান্নাঘরের থালাবাসনের আওয়াজ। সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত নীরবতা।

অনিরুদ্ধ ধীরে ধীরে মুখ তুলে মহিলার দিকে তাকালেন। চল্লিশ বছর আগের মুখটা আর নেই। সময় তার নিজের মতো করে সব রেখা বদলে দিয়েছে।

তবু মানুষের চোখের গভীরে কিছু আলো থাকে। যে আলো বয়স মুছে ফেলতে পারে না।

তিনি বুঝলেন, তিনি ভুল করেননি। এই মানুষটাকেই তিনি সারা জীবন ডায়েরিতে লিখেছেন।

প্রবীণ নিবাসে তানিয়া সুলতানার প্রথম কয়েকটা দিন যেন কুয়াশার ভেতর কাটল। তিনি খুব কম কথা বলেন। কখনও একই প্রশ্ন দশ মিনিটের মধ্যে পাঁচবার করেন, ‘এটা কোন জায়গা?’ ‘আমি এখানে কেন?’ ‘আমার মা কোথায়?’

তারপর হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে যান। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকেন। এমনভাবে তাকিয়ে থাকেন, যেন দূরে কোথাও এমন কোনও দৃশ্য আছে যা শুধু তিনিই দেখতে পাচ্ছেন।

চিকিৎসক এসে বললেন, ‘রোগ অনেকদূর এগিয়ে গেছে। রিসেন্ট কোনও স্মৃতি প্রায় নেই। পুরোনো স্মৃতিও ভেঙে ভেঙে গেছে। কিছু মুখ, কিছু শব্দ, কিছু অনুভূতি হয়তো এখনও কোথাও থেকে গেছে। তবে সেগুলোতে পৌঁছানোর পথ আর আগের মতো খোলা নেই।’

অনিরুদ্ধ খুব মন দিয়ে ডাক্তারের বলা কথাগুলো শুনলেন। তার মনে হলো, মানুষের মস্তিষ্কও বুঝি একটি শহর। একসময় যে রাস্তাগুলো দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত হতো, ‘সেগুলো একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। বাড়িগুলো এখনও আছে, কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পথ হারিয়ে গেছে।’

সেই সন্ধ্যায় তিনি ডায়েরি খুলে বসে থাকলেন। অনেকক্ষণ কোনও শব্দ লিখতে পারলেন না শেষ পর্যন্ত লিখলেন, ‘যদি কোনওদিন তোমার কাছে পৌঁছানোর সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়, আমি কি একটি নতুন রাস্তা বানাতে পারব?’

পরদিন দুপুরে তানিয়ার সঙ্গে অনিরুদ্ধের দেখা হলো। তানিয়া তখন ছোট্ট কদমগাছে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন।

অনিরুদ্ধ মৃদু গলায় বললেন, ‘আমি কি আপনার কাছে খানিকক্ষণ দাঁড়াতে পারি?’

তানিয়া তাকালেন। মুখে ভদ্র, কিন্তু সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের জন্য যে হাসি থাকে, সেই হাসি ফুটল। ঠোঁটে সেই চমৎকার হাসি ধরে রেখে বললেন, ‘আপনি কি এখানেই থাকেন?’

অনিরুদ্ধ বললেন, ‘হ্যাঁ। আমি এখানেই থাকি।’

‘আপনার নাম?’

এক মুহূর্তের জন্য অনিরুদ্ধের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। চল্লিশ বছরের পরিচয় এক প্রশ্নে মুছে যেতে পারে, এ কথা তিনি কখনও ভাবেননি। খুব আস্তে বললেন, ‘আমার নাম অনিরুদ্ধ। অনিরুদ্ধ সেন।’

তানিয়া কয়েক সেকেন্ড নামটা মনে রাখার চেষ্টা করলেন। তারপর বললেন, ‘সুন্দর নাম।’

এই প্রথম অনিরুদ্ধ বুঝলেন, বিস্মৃতি কেবল স্মৃতি কেড়ে নেয় না, সম্পর্কের বয়সও কেড়ে নেয়। যে মানুষ একসময় চোখের ভাষা বুঝত, সে আবার নতুন করে তারই নাম শিখতে শুরু করে।

অনিরুদ্ধ কাঁধের ব্যাগ থেকে নীল রঙের ডায়েরি বের করলেন। মুখ তুলে বললেন, ‘আপনাকে কি আমার একটা লেখা পড়ে শোনাতে পারি!’

তানিয়া কৌতূহলী হয়ে তাকালেন। মুখে ঝলমলে আনন্দ নিয়ে বললেন, ‘গল্প! আপনি গল্প লেখেন!’

বুকের ভেতর জমে থাকা শ্বাস ছেড়ে দিয়ে অনিরুদ্ধ বললেন, ‘গল্পই হবে হয়তো। আমি ঠিক জানি না। আপনি শুনে বলবেন।’

তানিয়া বললেন, ‘তবে চলুন পুকুরের ওই শানবাঁধানো সিঁড়িতে গিয়ে বসি।’

তারা দুজন পুকুর পাড়ে এসে সিঁড়িতে বসেছেন। তানিয়া বেশ গুছিয়ে বসে বললেন, ‘পড়ুন। আমি শুনছি।’

অনিরুদ্ধ ডায়েরির পৃষ্ঠা উলটে পড়তে শুরু করলেন।

‘‘১৭ জুলাই, ১৯৮৬। আজ লাইব্রেরিতে একজন মেয়েকে দেখলাম। তার হাতে জীবনানন্দের কবিতার বই। বইয়ের ভেতরে শুকনো কৃষ্ণচূড়া। সে বই বন্ধ করতেই ফুলটি মেঝেতে পড়ে গেল। আমি তুলে দিলাম। সে বলল―ধন্যবাদ। আমি কিছু বলিনি। কারণ সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শব্দটি হয়তো ‘ধন্যবাদ’ নয়, তার হাসি।”

পড়া শেষ হলে তানিয়া দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর কেমন যেন চেনা গলায় বললেন, ‘কৃষ্ণচূড়া…’

অনিরুদ্ধ চমকে উঠে বললেন, ‘কী হলো!’

তানিয়া বললেন, ‘আমি… জানি না কেন… মনে হচ্ছে কৃষ্ণচূড়া পছন্দ করতাম।’

অনিরুদ্ধ খুব ধীরে বললেন, ‘হ্যাঁ। খুব।’

তানিয়া নিজের কপালে হাত ছোঁয়ালেন। অনিরুদ্ধর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘অদ্ভুত… মনে হচ্ছে কোথাও দেখেছি।’

পরের মুহূর্তেই সব ভুলে গেলেন। বললেন, ‘আপনি কি কিছু পড়ছিলেন!’

অনিরুদ্ধ আবার পড়তে শুরু করলেন। প্রতিদিন দুপুরে। পুকুর পাড়ের শানবাঁধানো সিঁড়িতে বসে। একই লেখা। একই কণ্ঠে। একই ধৈর্যে।

প্রবীণ নিবাসের মানুষজন তাদের দুজনের ব্যাপারটা খেয়াল করতে শুরু করল।

 আবদুল করিম সাহেব একদিন বললেন, ‘স্যার, উনি তো পাঁচ মিনিট পরই ভুলে যান। আপনি প্রতিদিন একই লেখা পড়ে উনাকে শোনান। তাতে কী লাভ হয়?’

অনিরুদ্ধ হাসলেন। হেসে বললেন, ‘আমি জানি তিনি ভুলে যাবেন।’

‘তাহলে?’

‘ভালোবাসার সব কাজ লাভের জন্য হয় না।’

করিম সাহেব কিছু বললেন না। তবে সেদিন রাতে তিনি মৃত স্ত্রীর ছবি বালিশের পাশে রেখে ঘুমালেন।

এখন প্রতিদিন দুপুরে অনিরুদ্ধ আসার আগেই তানিয়া চলে আসেন। পুকুরের সিঁড়িতে বসে অনিরুদ্ধর আসার প্রতীক্ষা করেন।

অনিরুদ্ধ আসেন। ডায়েরির পাতা থেকে পড়ে শোনান। কখনও তানিয়ার মনে হয় এসব তার জানা, চেনা। আবার ভুলে যান।

তারা দুজন বাগানে হাঁটেন। তানিয়া গাছের নাম ভুল বলেন। শিউলিকে বলেন বেলি, আমগাছকে কাঁঠালগাছ বলেন। বলে নিজেই হেসে ফেলেন। হাসতে হাসতে বলেন, ‘আমার মাথাটা খুব খারাপ, তাই না ?’

অনিরুদ্ধ সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলেন, ‘তা হবে কেন! একদম নয়।’

‘তাহলে! আমি কিছু মনে করতে পারি না কেন?’

‘তোমার মাথার ভেতর অনেক দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা একদিন একদিন করে সবগুলো দরজা খুলব। মাথার ভেতরের বন্ধ জানালাগুলোও।’

তানিয়া শিশুর মতো বিশ্বাস করে ফেলেন অনিরুদ্ধর কথা। এক বৃহস্পতিবার ঐশী এলে তাকে তানিয়া অনিরুদ্ধর কথা বললেন। ভালো লাগার কথাও বললেন।

ঐশী আলাদা করে অনিরুদ্ধের সঙ্গে কথা বলেছে, ‘আপনি কি জানেন, এতে আপনার কষ্ট আরও বাড়তে পারে?’

অনিরুদ্ধ শীতল গলায় বললেন, ‘জানি।’

‘তিনি হয়তো কোনওদিনই পুরোপুরি আপনাকে চিনতে পারবেন না।’

‘তাও জানি।’

‘তবু করছেন?’

অনিরুদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন, ‘একসময় আমি তার জন্য কবিতা লিখতাম। এখন মনে হচ্ছে, কবিতা যথেষ্ট ছিল না। মানুষের পাশে বসে তার ভুলে যাওয়া বিকেলগুলোও ধরে রাখতে হয়।’

অমনি কেন জানি ঐশীর চোখ ভিজে উঠল। সে মনোবিজ্ঞানের বইয়ে স্মৃতি নিয়ে অনেক তত্ত্ব পড়েছে। কিন্তু এই মানুষটিকে দেখে তার মনে হলো, বিজ্ঞানের বাইরেও স্মৃতির আরেকটি ভাষা আছে।

কয়েকদিন পর। অনিরুদ্ধ নিজের ঘরে বসে ছোট্ট একটা বাক্স খুলেছেন। ভেতরে বহু বছরের যত্নে রাখা কিছু জিনিস। শুকনো কৃষ্ণচূড়া। সিনেমার টিকিট। নীল ফিতের টুকরো। বাসের টিকিট। ছোট্ট এক চিঠি, যার শেষ লাইন, ‘ভালো থেকো। আমাদের দেখা না হওয়াই হয়তো ভালো।’

চিঠির নিচে কোনও নাম নেই। অনিরুদ্ধ দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।

অনিরুদ্ধ পরদিন কৃষ্ণচূড়ার শুকনো ফুলটি সঙ্গে নিয়ে গেলেন। তানিয়ার সামনে পুকুরের শানবাঁধানো সিঁড়িতে রাখলেন।

তানিয়া শুকনো ফুলের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। তার আঙুল কাঁপছে। খুব আলতো করে যত্নে ফুলটাকে হাতে তুলে নিলেন।

চোখ বন্ধ করলেন। সহসা তার ঠোঁট নড়ে উঠল, ‘এটার… গন্ধ ছিল…। অদ্ভুত গন্ধ।’

অনিরুদ্ধের নিঃশ্বাস যেন থেমে গেছে। গলার খাদ থেকে ভেজা চোখে বললেন, ‘মনে পড়ছে?’

তানিয়া চোখ খুললেন। শান্ত গলায় বললেন, ‘কিছুই মনে পড়ছে না।’

অসহায় কাতর গলায় অনিরুদ্ধ বললেন, ‘কিছুই মনে পড়েনি?’

তানিয়া কিছু বললেন না। তার দু চোখ উপচে পানি পড়ছে। তিনি কাঁদছেন। কিন্তু বুঝতে পারছেন না কেন কাঁদছেন। কান্না জড়ানো গলায় বললেন, ‘আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।’

‘কেন কষ্ট হচ্ছে?’

‘আমি সত্যি জানি না।’

অনিরুদ্ধ বললেন না যে মানুষের হৃদয় অনেক সময় স্মৃতির আগেই মনে করতে শুরু করে। সেদিন রাতে তিনি ডায়েরিতে লিখলেন, ‘আজ তোমার মস্তিষ্ক আমাকে চিনতে পারেনি। কিন্তু তোমার চোখ চিনেছে। চোখ কখনও কখনও মস্তিষ্কের চেয়ে অনেক পুরোনো সত্য জানে।’

এরপর থেকে তানিয়া নিয়মিত অনিরুদ্ধের জন্য পুকুর পাড়ে প্রতীক্ষা করতে থাকেন। সকাল থেকে খানিক বেলা গড়ালেই নার্সকে জিজ্ঞেস করেন, ‘ওই ভদ্রলোক আসবেন আজ?’

‘কোন ভদ্রলোক?’

‘যিনি গল্প পড়ে শোনান।’

‘ওহ, অনিরুদ্ধ সেন!’

তানিয়া নিজের মনে নামটা আস্তে আস্তে উচ্চারণ করেন, ‘অ…নি…রু…দ্ধ…। অনিরুদ্ধ সেন।’

তারপর হাসতেন। যেন নতুন একটি শব্দ শিখেছেন।

একদিন অনিরুদ্ধ পুকুর পাড়ে আসতে দেরি করলেন। একজন প্রাক্তন ছাত্র দেখা করতে এসেছিল। ঘড়িতে সময় পেরিয়ে গেছে। তানিয়া বারবার পথের দিকে তাকাচ্ছেন। থেমে থাকতে না পেরে নার্সকে ডেকে বললেন, ‘আজ কি গল্পও আসবে না?’

নার্স অবাক হয়ে বলল, ‘গল্প!’

খানিক বাদে নার্স বুঝতে পারলেন অনিরুদ্ধ সেনকে মানুষ নয়―তিনি যেন তাকে গল্প হিসেবেই মনে রেখেছেন।

অনিরুদ্ধ যখন পৌঁছালেন, তানিয়া তখন মুখ গোমড়া করে বসে আছেন। অনিরুদ্ধ আসতেই বললেন, ‘আপনি দেরি করেছেন।’

অনিরুদ্ধ বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছেন। এতদিন পর এই প্রথম তিনি অনুভব করলেন, কেউ তার জন্য প্রতীক্ষা করেছে। তিনি শুধু বললেন, ‘সরি। ক্ষমা করে দাও।’

অমনি তানিয়া হেসে ফেললেন। হেসে বললেন, ‘ঠিক আছে। ক্ষমা। এখন গল্প পড়ুন।’

অনিরুদ্ধ ডায়েরি খুললেন। আজ তিনি এমন এক দিনের কথা পড়বেন বলে ঠিক করেছেন যেদিন প্রথমবার তিনি তানিয়াকে কবিতা পড়ে শুনিয়েছিলেন।

পাতার ওপর আঙুল রেখে তিনি তানিয়ার দিকে তাকালেন। বিকেলের আলো ধীরে ধীরে গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে নেমে আসছে। অনিরুদ্ধর মনে হলো, স্মৃতি ফিরে আসে না। ফিরে আসে দীর্ঘ প্রতীক্ষা। আর সেই প্রতীক্ষার ভেতর দিয়েই মানুষ একদিন আবার তার প্রিয় মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

শীত নেমেছে। সকালের ঘাসে শিশির জমে থাকে। সূর্য উঠতে দেরি করে। বিকেলও দ্রুত ফুরিয়ে যায়। তবু একটা ব্যাপার বদলায় না। প্রতিদিন দুপুরে অনিরুদ্ধ ডায়েরি হাতে পুকুরের দিকে হাঁটেন।

তানিয়া পুকুর পাড়ে অনিরুদ্ধর প্রতীক্ষায় বসে থাকেন। অনিরুদ্ধ এলে বলেন, ‘আজ কোন গল্প?’

অনিরুদ্ধ প্রতিদিন একই উত্তর দেন, ‘আমাদের গল্প।’

তানিয়া হেসে বলেন, ‘আমার তো কিছুই মনে নেই।’

অনিরুদ্ধ বলেন, ‘মনে না থাকলেও গল্প থাকে।’

অনিরুদ্ধ ডায়েরি পড়ছেন। তানিয়া মুগ্ধ হয়ে অনিরুদ্ধর দিকে তাকিয়ে আছেন। অনিরুদ্ধ পড়ছেন, ‘আজ কলেজ ছুটি হওয়ার পর আমরা নদীর ধারে গিয়েছিলাম। তানিয়া বলল, পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর শব্দ কি জানো? আমি বললাম, কবিতা। সে হেসে বলল―না, ফিরে এসো। যে মানুষ কাউকে এই কথাটা বলতে পারে, সে কখনও পুরোপুরি একা হয় না।’

পড়া শেষ হওয়ার পর তানিয়া দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর খুব আস্তে বললেন, ‘নদী…’

অনিরুদ্ধ তাকালেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোন নদী?’

তানিয়া অনিশ্চিত গলায় বললেন, ‘জানি না, কিন্তু… নদীতে নৌকা ছিল না?’

অনিরুদ্ধর আঙুল কাঁপছে। ডায়েরিতে লেখা আছে, ‘ফেরার সময় আমরা নৌকায় উঠলাম। মাঝি বলল, আজ নদী খুব শান্ত।’

অনিরুদ্ধ হতভম্ব চোখে তানিয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন। কেন জানি তানিয়ার ভয় লাগছে। তিনি বললেন, ‘আমি কি ঠিক বলেছি?’

‘হ্যাঁ, তুমি একদম ঠিক বলেছো।’

‘কীভাবে বললাম!’

অনিরুদ্ধ কিছু বললেন না। তিনি বিশ্বাস করতে চাইছেন স্মৃতি দরজা খুলে ফিরে না এলেও অন্তত জানালার ফাঁক গলে ঢুকে পড়ুক।

তারপর থেকে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে শুরু করল। একদিন দুপুরে তানিয়া খেতে খেতে বললেন, ‘আজ কি রবিবার?’

কেউ উত্তর দেওয়ার আগেই তিনি নিজেই বললেন, ‘না… আজ বৃহস্পতিবার। ঐশী আজ আসবে।’

সবাই অবাক হয়ে গেছে। আজ বৃহস্পতিবার। ঐশী এসে ঘটনা শুনেছে। সে মুগ্ধ হয়ে গেছে। তবে অনিরুদ্ধ উচ্ছ্বাস দেখালেন না। তিনি জানেন, আলঝেইমারের পথ সোজা নয়। দুই পা এগুলে এক পা পিছিয়ে যেতে হয়।

সেদিন রাতে অনিরুদ্ধ ডায়েরিতে লিখলেন,

‘আশা খুব সাবধানে ব্যবহার করতে হয়। বেশি হলে মানুষ ভেঙে পড়ে। কম হলে মানুষ বাঁচে না।’

ডিসেম্বরের এক সকাল। ঘাসফড়িংয়ে ডাক্তার সাদেকুল এসেছেন। তিনি আলঝেইমার নিয়ে গবেষণা করছেন।

ডাক্তার অনেকক্ষণ তানিয়ার সঙ্গে কথা বললেন। ছবি দেখালেন। তারিখ জিজ্ঞেস করলেন। নিজের নাম জিজ্ঞেস করলেন। তানিয়ার কাছ থেকে সব প্রশ্নের উত্তর এসেছে এলোমেলো।

ডাক্তার সাদেকুল ইশারায় অনিরুদ্ধকে বাইরে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘আপনি কি প্রতিদিন উনাকে গল্প পড়ে শোনান?’

‘পুরাতন ডায়েরি পড়ে শোনাই।’

‘ডায়েরি পড়ে শোনানো চালিয়ে যান।’

‘তাতে কি কোনও উপকার হচ্ছে?’

ডাক্তার কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, ‘সব উপকার পরীক্ষায় মাপা যায় না। তবে খেয়াল করেছি, উনি আপনাকে নিরাপদ মানুষ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এই নিরাপত্তাবোধ অনেক বড় বিষয়।’

অনিরুদ্ধ মনে মনে ভাবলেন, কখনও কখনও ভালোবাসার সবচেয়ে বড় পরিচয় প্রেম নয়, নিরাপত্তা।

কয়েক দিন পর। অনিরুদ্ধ পুকুর পাড়ে আসতে দেরি করলেন। তানিয়া পুকুর পাড় থেকে ভবনে চলে এসেছেন। যাকে দেখছেন তাকেই জিজ্ঞেস কিরছেন, ‘সেই মানুষটা কোথায়?’

‘কোন মানুষ?’

‘যে আমাকে বাড়ি নিয়ে যায়।’

শর্মিলা অবাক হয়ে বললেন, ‘কোথায় নিয়ে যায়?’

তানিয়া চোখ বন্ধ করলেন। নিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘জানি না…। তবে.. তার সঙ্গে থাকলে মনে হয় আমি বাড়িতে আছি।’

আচমকা শর্মিলার মনে হচ্ছে তার গলায় যেন কিছু আটকে গেছে। এই প্রথম তানিয়া কোনও ফিলিংস এক্সপ্রেস করেছেন।

অনিরুদ্ধ এসে ঘটনা শুনেছেন। কিছু বললেন না। ডায়েরি খুললেন না। তানিয়ার পাশে বসে থাকলেন। দুজনেই চুপচাপ। কেউ কোনও কথা বলছেন না। এমন কিছু নীরবতা আছে, যেখানে ভাষা সত্যি অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়।

শীতের শেষ। ঐশী এসেছে। তার কাছে পুরোনো ক্যাসেট প্লেয়ার। অনিরুদ্ধ অবাক হয়ে বললেন, ‘এটা কোথায় পেলে?’

ঐশী বলল, ‘পুরোনো জিনিসের দোকানে। আপনার কবিতার অনুষ্ঠানগুলোর রেকর্ড খুঁজতে গিয়ে এটা পেয়েছি।’

প্রবীণ নিবাসের কয়েকজন একসঙ্গে বসে আছেন। তানিয়াও আছেন। ক্যাসেট প্লেয়ারের ভেতর পুরাতন ক্যাসেট আছে। ক্যাসেট চালানো হয়েছে। কিছুক্ষণ শোঁ শোঁ শব্দ হলো। তারপর তরুণ অনিরুদ্ধের কণ্ঠ বেজে উঠল,

‘এই কবিতাটি একজন মানুষের জন্য, যার নাম আমি বলব না। কারণ নাম উচ্চারণ করলে কবিতাটি ছোট হয়ে যাবে।’

তানিয়া অমনি মাথা তুলে তাকিয়েছেন। তিনি স্থির হয়ে শুনছেন। কবিতা শেষ হওয়ার পর খুব আস্তে বললেন, ‘এই গলাটা…’

অনিরুদ্ধের নিঃশ্বাস আটকে গেল। ঢোক গিলে বললেন, ‘চেনা লাগছে?’

তানিয়া দুই হাত দিয়ে নিজের কপাল চেপে ধরলেন। তার চোখে যন্ত্রণার ভাঁজ। চেপে চেপে বললেন, ‘আমার মাথার ভেতর খুব শব্দ হচ্ছে…। অনেকগুলো দরজা একসঙ্গে খুলতে চাইছে…। আমি আর পারছি না…।’

তিনি আচমকা কাঁদতে শুরু করলেন। শব্দহীন কান্না। শুধু চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। অনিরুদ্ধ ক্যাসেট প্লেয়ার বন্ধ করে দিলেন।

তানিয়ার কাঁধে আলতো করে হাত রাখলেন। নরম গলায় বললেন, ‘আজ আর কিছু মনে করার দরকার নেই।’

পরদিন অনিরুদ্ধ ছোট্ট কাপড়ের ব্যাগ হাতে এলেন। তানিয়া অবাক হয়ে বললেন, ‘আজ গল্প নেই?’

অনিরুদ্ধ বললেন, ‘আজ গল্পের জিনিসগুলো দেখাব।’

ব্যাগ থেকে বেরোল শুকনো কৃষ্ণচূড়া। নীল ফিতা, সিনেমার টিকিট, ফাউন্টেন পেন, সাদাকালো ছবি। ছবিতে একজন তরুণী। সে হাসছে। পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণ শিক্ষক।

তানিয়া ছবিটা হাতে নিলেন। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। হঠাৎ তার আঙুল ছবির তরুণীর মুখ ছুঁয়ে থেমে গেল। কাঁপা গলায় বললেন, ‘এই মেয়েটা….আমি?’

অনিরুদ্ধের ঠোঁট শুকিয়ে গেল। বললেন, ‘হ্যাঁ। ওই মেয়েটি তুমি।’

তানিয়া ছবির অন্য মুখের দিকে তাকালেন। খুব ধীরে। খুব গভীরভাবে। ফিসফিস করে বললেন, ‘আর… পাশের এই মানুষটা…’

‘আমি…’

‘চিনি…’

কথাগুলো বলতে গিয়ে যেন তানিয়ার ভেতরে প্রবল ঝড় উঠল। তিনি চোখ বন্ধ করে ফেললেন। আচমকা দুই হাত দিয়ে অনিরুদ্ধর হাত শক্ত করে চেপে ধরেছেন।

তানিয়া দ্রুত শ্বাস নিচ্ছেন। তার মুখে আতঙ্ক। আনন্দ আর ব্যথা একসঙ্গে মিশে আছে। তিনি যেন বহু দূর থেকে ভেসে আসা কোনও শব্দ ধরতে চাইছেন। কয়েকবার চেষ্টা করার পর অস্পষ্ট গলায় বললেন, ‘অ… নি…. রু…. দ্ধ…।’

অনিরুদ্ধের মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত ঘড়ি থেমে গেছে। বাইরে বাতাস থেমে গেছে। গাছগুলো নিশ্চুপ। পাতা নড়ছে না। কোথাও কোনও শব্দ নেই। শুধু চল্লিশ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া একটি উচ্চারণ ফিরে এসেছে অবিকল সেই একই ভাবে।

তানিয়া বিস্ময়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, ‘তুমি… এতদিন… কোথায়… ছিলে?’

অনিরুদ্ধ তখনি উত্তর দিতে পারলেন না। চল্লিশ বছরের প্রতীক্ষা, একাকিত্ব, অপূর্ণ কবিতা এসে তার গলায় আটকে গেল। তিনি শুধু তানিয়ার দুই হাত নিজের দুই হাতের মুঠোর ভেতর জাপটে ধরলেন। তারপর খুব আস্তে বললেন, ‘আমি কোথাও যাইনি, তানি। আমি এখানেই ছিলাম। তোমার জন্য লেখা নীল ডায়েরির পাতায়।’

অনিরুদ্ধর হাতের মুঠো থেকে তানিয়া নিজের হাত বের করে আনলেন। অনিরুদ্ধের গাল ছুঁয়ে বললেন, ‘তুমি সত্যিই অনিরুদ্ধ?’

অনিরুদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, তানি। আমি সত্যি অনিরুদ্ধ। তোমার অনিরুদ্ধ।’

তানিয়ার দুই চোখ আবার ভিজে উঠেছে। গলার ভেতর কথা আটকে যাচ্ছে, ‘আমি… আমি তোমাকে ফেলে চলে গিয়েছিলাম?’

অনিরুদ্ধ ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন। বললেন, ‘না, তানি। আমরা কেউ কাউকে ফেলে যাইনি। সময় আমাদের আলাদা করে দিয়েছিল।’

‘আমার কিছুই মনে নেই…’

‘সব মনে রাখার দরকারও নেই। মনে করারও দরকার নেই। সেসব আজ অতীত, তানি। সেখানে ফেরা যায় না। আমরা যাব সামনে।’

তানিয়া লাজুক গলায় বললেন, ‘তবু তোমাকে মনে না রাখা… এটা তো খুব অন্যায় হয়ে গেছে।’

অনিরুদ্ধ আবার তানিয়ার হাত দুটো নিজের হাতে তুলে নিলেন। তানিয়ার উ™£ান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি ভুলে গেছ। ইচ্ছে করে ভোলোনি।’

তানিয়া কাঁদছেন। তাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন বাইশ বছরের সেই মেয়েটি, যে একদিন কলেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলেছিল, ‘যদি আমরা হারিয়ে যাই?’

রাতে খাওয়ার পর ডাইনিংয়ে অনিরুদ্ধকে তানিয়া আটকে দিলেন। বললেন ‘আজ ডায়েরির পাতা থেকে কিছু শোনা হয়নি। এখন শুনতে চাই।’

ঘর থেকে ডায়েরি এনে অনিরুদ্ধ সেই পাতাটি খুললেন, যেটা তিনি লেখার পর আর কখনও পড়েননি। অনেক বছর ডায়েরির এই পাতা ভাঁজ করা ছিল। অনিরুদ্ধ ধীরে ধীরে পড়লেন, ‘‘আজ তানিয়ার বাবা আমাকে ডেকে বললেন, ‘ধর্মের ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই। তোমার চাকরি ভালো, তবে আমার মেয়ের জন্য আমি অন্য স্বপ্ন দেখেছি।’ আমি কোনও তর্ক করিনি। শুধু বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলাম। রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে দেখি, দ্বিতীয় তলার জানালায় তানিয়া কাঁদছে। আমি হাত তুলেছিলাম। সেও তুলেছিল। সেই হাত নামাতে আমাদের চল্লিশ বছর লেগে গেল।’’

অনিরুদ্ধ পড়া শেষ করেছে। তানিয়া মুখ ঢেকে বসে আছে। তার কাঁধ কাঁপছে। অস্পষ্ট গলায় বললেন, ‘আমি… আমি কিছুই করতে পারিনি?’

‘তুমিও চেষ্টা করেছিলে।’

‘আমি কি তোমাকে চিঠি লিখেছিলাম?’

অনিরুদ্ধ ডায়েরির পাতার ভাঁজ থেকে পুরোনো একখানা চিঠি তার হাতে দিলেন। তানিয়া ধীরে ধীরে চিঠি পড়লেন। চিঠির শেষ লাইন পড়ে তার ঠোঁট কেঁপে উঠল। সেখানে লেখা, ‘ভালো থেকো। আমাদের দেখা না হওয়াই হয়তো ভালো।’

তানিয়া মাথা তুলে তাকিয়েছেন। তার চোখ ভেজা। তিনি বললেন, ‘এটা… আমি লিখেছিলাম?’

‘হ্যাঁ। তুমি লিখেছিলে। এটা তোমার হাতের লেখা।’

‘কী ভীষণ নিষ্ঠুর ছিলাম!’

‘না, তানি, তুমি নিষ্ঠুর ছিলে না। তুমি ছিলে অসহায়।’

রাতে তানিয়ার ঘুম এল না। ঘরে আলো জ্বলছে দেখে নার্স ঘরে এসে দেখেন তিনি জানালার পাশে বসে আছেন।

নার্স বললেন, ‘আলো নিভিয়ে দিচ্ছি। আপনি বিছানায় এসে শুয়ে পড়ুন। ঘুমাবেন।’

তানিয়া খুব আস্তে বললেন, ‘ঘুমোতে ভয় করছে।’

নার্স এগিয়ে এসে বললেন, ‘ওমা! ঘুমাতে আজ হঠাৎ ভয় করছে কেন?’

তানিয়া কাতর গলায় বললেন, ‘যদি কাল সকালে উঠে আবার সব ভুলে যাই!’

নার্স কিছু বলতে পারল না। শুধু তানিয়াকে হাত ধরে বিছানায় নিয়ে এসে শুইয়ে দিয়েছে।

পরদিন খুব সকালে তানিয়া গিয়ে দাঁড়িয়েছেন অনিরুদ্ধর ঘরের দরজায়। টোকা দিতেই দরজা খুলে গেছে। তানিয়াকে দেখে অনিরুদ্ধ ভীষণ অবাক হয়ে বললেন, ‘তুমি! এত সকালে!’

তানিয়া ঠোঁটে হালকা হাসি মাখিয়ে বললেন, ‘আজ তোমাকে চিনতে পেরেছি। তাই ভাবলাম, তুমি ঘর থেকে বেরুনোর আগেই আমি আসি।’

অনিরুদ্ধ বললেন, ‘ভেতরে এসো। তোমাকে আজ আমার কিছু দেওয়ার আছে।’

তানিয়া খুব স্বাভাবিকভাবেই অনিরুদ্ধর ঘরে ঢুকে পড়ল। যেন এটা তারও ঘর।

অনিরুদ্ধ আলমারি খুলে বেশ কয়েকটি ডায়েরি টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখলেন। সবগুলো নীল রঙের ডায়েরি। হেসে বললেন, ‘এগুলো সব তোমার।’

বিস্মিত হয়েছেন তানিয়া। তিনি হতবাক গলায় বললেন, ‘এতগুলো! সব আমার কথা লেখা!’

অনিরুদ্ধ বললেন, ‘চল্লিশ বছরেরও বেশি সময়। প্রতিদিন একটু একটু করে লিখেছি।’

তানিয়া টেবিলের ওপর থেকে একটা ডায়েরি তুলে বুকে চেপে ধরলেন। তার চোখে পানি। কেমন ধরা গলায় বললেন, ‘যদি এগুলো আগে পেতাম…।’

অনিরুদ্ধ বললেন, ‘তাহলে হয়তো জীবন অন্যরকম হতো।’

তানিয়া বললেন, ‘আমরা কি খুব দেরি করে ফেললাম, অনিরুদ্ধ?’

অনিরুদ্ধ কিছু বললেন না। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। শিউলিগাছের নিচে কয়েকটি সাদা ফুল ঝরে পড়ে আছে। জানালা থেকে চোখ সরিয়ে তানিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ভালোবাসা কখনও দেরি করে আসে না। মানুষের জীবনই শুধু ছোট হয়ে যায়।’

তখন ঘাসফড়িংয়ের মেইন গেটের সামনে একটা কালো গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে প্রথমে নামলেন একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক। তারপর একজন নারী। তাদের সঙ্গে প্রায় বারো-তেরো বছরের একজন মেয়ে। মেয়েটি কৌতূহলী চোখে চারপাশ দেখছে। তার কাছে জায়গাটি নতুন। তবে এখানে আসার পর সে তার বাবা-মায়ের চোখে অদ্ভুত করুণ ছায়া দেখতে পেয়েছে।

শর্মিলা এগিয়ে গেলেন। ভদ্রলোক নিচু গলায় বললেন, ‘আমি অদ্রি ফাইয়াজ। তানিয়া সুলতানার ছেলে।’

শর্মিলা কী বলবেন নিজের ভেতর গুছিয়ে নিচ্ছেন। বললেন, ‘আপনি আজ প্রথম এলেন। আপনার মা আজ খুব ভালো আছেন।’

অদ্রি অবাক হয়ে বললেন, ‘মা ভালো আছেন!’

শর্মিলা বললেন, ‘অনেক দিনের ভেতর গতকাল তিনি সবচেয়ে বেশি কথা বলেছেন। আজ খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে হাঁটতে বেরিয়েছেন।’

অদ্রি খানিকটা চমকে উঠে বললেন, ‘হোয়াট আ মিরাকল! তাহলে তো মাকে আজই বাড়ি নিয়ে যেতে পারি।’

তানিয়া তখনও অনিরুদ্ধের ঘরে। টেবিলের ওপর অনেকগুলো ডায়েরি ছড়ানো। তানিয়া ডায়েরির পাতায় আঙুল বুলিয়ে বললেন, ‘তুমি এত বছর… প্রতিদিন লিখেছো ?’

অনিরুদ্ধ হেসে বললেন, ‘সব দিন না।’

‘সব দিন না কেন?’

‘কিছু কিছু দিন এত কেঁদেছি যে লিখতে পারিনি।’

তানিয়া মাথা নিচু করে ফেলেছেন। খুব আস্তে বললেন, ‘আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো।’

অনিরুদ্ধ কিছু বলার আগে অনেকক্ষণ তানিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর বললেন, ‘আমি তোমার ওপর কোনওদিন রাগই করিনি। তাহলে ক্ষমা করব কীসের!’

ঠিক তখন দরজায় আওয়াজ হলো। শর্মিলা দাঁড়িয়ে আছেন। তার পাশ দিয়ে অদ্রি ঘরে ঢুকলেন। তিনি তানিয়ার এক হাত ধরে বললেন, ‘মা, চলো বাড়ি যাই।’

তানিয়া ছেলের দিকে তাকালেন। তারপর মাথা ঘুরিয়ে অনিরুদ্ধকে দেখলেন। তাকে দেখতে দুই পৃথিবীর মাঝখানে দাঁড়ানো অসহায় একজন মানুষের মতো লাগছে।

তানিয়া বিস্মিত গলায় বললেন, ‘আমি… যাব!’

অদ্রি বললেন, ‘হ্যাঁ মা। এবার তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাব।’

তানিয়া ফিসফিস করে বললেন, ‘বাড়ি…!’

শব্দটা যেন তার ভেতরে কোথাও ধাক্কা খেল। তিনি ধীরে ধীরে অনিরুদ্ধের দিকে তাকালেন। অনিশ্চিত চোখে বললেন, ‘তাহলে… অনিরুদ্ধ!’

অদ্রি অবাক হয়ে বলল, ‘মানে! বুঝতে পারছি না।’

অনিরুদ্ধ এগিয়ে এসেছেন। তানিয়ার দিকে তাকিয়ে ভরসা দেওয়া চোখে বললেন, ‘যাও, তানিয়া। বাড়ি যাও।’

তানিয়া আচমকা অনিরুদ্ধর হাত শক্ত করে চেপে ধরে বললেন, ‘তুমি যাবে না?’

অনিরুদ্ধ হাসলেন। সেই পুরোনো শান্ত হাসি। বললেন, ‘আমার বাড়ি তো এখানেই, তানি।’

কথা শেষ করতে গিয়ে তার গলা কেঁপে উঠল। তিনি জানেন, এ কথা সত্য নয়। তার বাড়ি কোনওদিনই এই প্রবীণ নিবাস ছিল না। তার বাড়ি ছিল তানিয়ার বাড়ির পাশে।

চলে যাওয়ার আগে তানিয়া টেবিল থেকে একটা ডায়েরি তুলে নিলেন। বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘এটা আমি নিয়ে যেতে পারি?’

অনিরুদ্ধ চুপ করে আছেন। কিছু ভাবছেন। খুব বেশিক্ষণ নয়। অল্প সময়। তিনি সবগুলো ডায়েরি একসঙ্গে করে বেঁধে তানিয়ার হাতে দিলেন। বললেন, ‘একটা নয়, সবগুলো ডায়েরি তোমার। তোমাকে দেব বলেই এতদিন যত্ন করে রেখেছি।’

তানিয়া অবাক হয়ে বললেন, ‘তুমি একটাও রাখবে না?’

অনিরুদ্ধ হেসে বললেন, ‘ডায়েরির সব পাতা আমার মুখস্থ। এতবার পড়েছি।’

গাড়িতে বসে তানিয়া তাকালেন। অনিরুদ্ধ ছোট কদমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক যেন চল্লিশ বছর আগের একজন তরুণ। শুধু চুলগুলোয় পাক ধরে সাদা হয়ে গেছে।

সেই রাতে অনিরুদ্ধ নতুন একখানা নীল রঙের ডায়েরিতে লেখা শুরু করলেন। প্রথম পাতায় লিখলেন,

‘আজ আমার ঘর খালি হয়ে গেছে। সবগুলো ডায়েরি তানিয়াকে দিয়ে দিয়েছি। বুকের ভেতর হালকা বোধ হচ্ছে। এত বছর ধরে আমি যে স্মৃতিগুলো পাহারা দিয়েছি, আজ সেগুলো  মালিকের কাছে ফিরে গেল।’

পুরো শীতে তানিয়ার কোনও খবর পাওয়া গেল না। শীত পেরিয়ে বসন্ত এল। বসন্তের এক বিকেলে অনিরুদ্ধ কদমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেখানে ঐশী এল। মুখ তুলে বলল, ‘স্যার, আজ লিখেছেন কিছু?’

অনিরুদ্ধ আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। মুখ না নামিয়েই বললেন, ‘সব লেখা শেষ হয়ে গেছে।’

ঐশী হেসে বলল, ‘লেখা কি কখনও শেষ হয়?’

অনিরুদ্ধ বললেন, ‘তা হয়তো হয় না। তবে লেখক একসময় থেমে যায়।’

সেই রাতেই ঘুমের মধ্যে নিঃশব্দে অনিরুদ্ধ চলে গেলেন অনন্তলোকে। তার মুখে অদ্ভুত শান্তি। বিছানার পাশে খোলা নীল ডায়েরি। শেষ পাতায় লেখা,

‘তানি, যদি কোনওদিন আবার সব ভুলে যাও, তাতেও দুঃখ নেই। মানুষকে মনে রাখার দায় সব সময় মানুষের নয়। কখনও কখনও ভালোবাসাই স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকে।

আমি আর প্রতীক্ষা করছি না। কারণ প্রতীক্ষা শেষ হয়েছে। আমি কৃতজ্ঞ―তুমি আবারও আমার নাম উচ্চারণ করেছো। এক জীবনের জন্য এই একটি উচ্চারণই যথেষ্ট।’

অনিরুদ্ধর মৃত্যুর ঠিক এক বছর পরে ঘাসফড়িং প্রবীণ নিবাসে একটি কুরিয়ার এল। ছোট একটি বাক্স। ভেতরে বেশ কয়েকটি নীল রঙের ডায়েরি। সঙ্গে চিঠি।

শর্মিলা চিঠি খুলে পড়লেন। চিঠিটি লিখেছেন তানিয়ার মেয়ে ঐন্দ্রিলা।

‘‘মা বাড়ি ফেরার পর মাত্র তিন দিন আপনাদের স্যারের কথা মনে রাখতে পেরেছিলেন। তারপর আবার সব ভুলে যান। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, ডায়েরিগুলো তিনি প্রতিদিন বুকে জড়িয়ে রাখতেন। পড়তে পারতেন না। শুধু বলতেন―‘এগুলো আমার খুব প্রিয় একজন মানুষের।’

মা গত সপ্তাহে মারা গেছেন। ডায়েরিগুলো আপনাদের কাছে ফিরিয়ে দিলাম। কারণ এগুলো শুধু আমার মায়ের নয়। আরও অনেক মানুষের বেঁচে থাকার সাহস হতে পারে।’’

ঘাসফড়িং প্রবীণ নিবাসে গেলে কাঠের একখানা আলমারির দেখা পাওয়া যায়। ভেতরে বেশ কয়েকখানা নীল রঙের ডায়েরি। আলমারিতে লেখা,

‘অনিরুদ্ধ সেন আর তানিয়া সুলতানার ডায়েরি। যারা কাউকে ভুলে গেছেন, কিংবা যাদের কেউ ভুলে গেছে―তাদের জন্য।’

নতুন কেউ প্রবীণ নিবাসে এলে সেবিকারা তাদের সেই ডায়েরি পড়ে শোনায়। প্রবীণেরা অনেক কিছু মনে করতে পারেন না, তবে ডায়েরিতে লেখা কাহিনি তাদের মনে থাকে।

পৃথিবীতে এমন কিছু নাম আছে, যা হয়তো মানুষ ভুলে যায়। তবে মানুষ ভালোবাসা কোনওদিন ভোলে না।

 সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button