Uncategorized

পুরস্কার : শেরপুর সাহিত্য চক্রের সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ প্রদান

সুহৃদ সাদিক

শেরপুর সাহিত্য চক্রর চল্লিশ বছর পূর্তি :

পুরস্কার প্রদান ও সংস্কৃতি উদ্যাপন

বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে স্থানীয় সাহিত্য সংগঠনগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নিতে যেসব সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, বগুড়ার শেরপুর উপজেলার স্বনামখ্যাত সংগঠন ‘শেরপুর সাহিত্য চক্র’ তার মধ্যে অন্যতম। চার দশকের ধারাবাহিক সাহিত্যচর্চা, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে সংগঠনটি ইতিমধ্যে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে স্বমহিমায় ভাস্বর। দীর্ঘ পথচলার এক গৌরবময় মাইলফলক হিসেবে গত ১৫ মে, ২০২৬ বর্ণাঢ্য আয়োজনে পালিত হয়েছে শেরপুর সাহিত্য চক্রের ৪০তম বর্ষপূর্তি উৎসব।

দিনব্যাপী এই আয়োজন শুধু একটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠান ছিল না; বরং এটি ছিল সাহিত্য, সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধের এক মহাসম্মিলন। অনুষ্ঠানে অংশ নেন দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক, গবেষক, কবি, শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং সাহিত্যপ্রেমীরা। সেই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের লেখক ও সাহিত্যকর্মীদের উপস্থিতি আয়োজনকে আরও বর্ণিল ও প্রাণবন্ত করে তোলে।

বর্ণাঢ্য র‌্যালির মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়।

সকালের আলো ফুটতেই উৎসবমুখর হয়ে ওঠে বগুড়ার শেরপুর উপজেলা চত্বর। রঙিন ব্যানার, ফেস্টুন ও সাহিত্যবিষয়ক বিভিন্ন স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে শহরের প্রধান সড়কগুলো। র‌্যালিটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে উপজেলা পরিষদ চত্বরে এসে শেষ হয়। র‌্যালিতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিল ভিন্নধর্মী উচ্ছ্বাস। প্রবীণ সাহিত্যিকদের পাশাপাশি তরুণ কবি, লেখক, শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিকর্মীদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, সাহিত্য এখনও সমাজের মানুষের হৃদয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

র‌্যালি শেষে উপজেলা পরিষদের অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। এতে সভাপতিত্ব করেন বগুড়া সরকারি মজিবর রহমান ভান্ডারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ ড. বেলাল হোসেন। তিনি বলেন, সাহিত্য মানুষের মননকে সমৃদ্ধ করে এবং জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমাজকে মানবিক ও আলোকিত করতে সাহিত্যচর্চার বিকল্প নেই।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক ড. তারিক মনজুর। তিনি বলেন, সাহিত্য কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি সমাজের চিন্তা-চেতনা, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। সাহিত্য মানুষের ভেতরে প্রশ্ন জাগায়, ভাবতে শেখায় এবং নতুন পথের সন্ধান দেয়। তিনি শেরপুর সাহিত্য চক্রর চার দশকের কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে সাহিত্যচর্চার এমন ধারাবাহিক উদ্যোগ জাতীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধক হিসেবে বক্তব্য দেন বিশিষ্ট কবি ও গবেষক ড. অশোক বিশ্বাস। তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান সময়ে তরুণদের মধ্যে সাহিত্যপ্রীতি জাগিয়ে তোলা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে শেরপুর সাহিত্য চক্রর মতো সংগঠনগুলো সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তিনি সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি গবেষণামূলক কাজের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিরাজগঞ্জ সরকারি এম. মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আমিরুল হোসেন চৌধুরী, কবি ও গবেষক প্রফেসর খৈয়ম কাদের, এস.এইচ.ও.এস-এর গবেষণা কর্মকর্তা সৈয়দ শাহনেওয়াজ হোসেনসহ আরও অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। তাঁদের বক্তব্যে সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক উঠে আসে।

আলোচনা সভার পাশাপাশি আয়োজন করা হয় স্বরচিত কবিতা পাঠের। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের কবিরা তাঁদের নতুন ও নির্বাচিত কবিতা পাঠ করেন। কবিতার বিষয়বস্তুতে উঠে আসে দেশপ্রেম, মানবতা, প্রেম, প্রকৃতি, সমাজ ও সময়ের নানা অনুষঙ্গ।

সাহিত্যপ্রেমী দর্শক-শ্রোতারা মনোযোগ সহকারে কবিতা উপভোগ করেন। অনেক তরুণ কবি তাঁদের সৃষ্টিকর্ম উপস্থাপনের সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। প্রবীণ ও নবীন কবিদের এই মিলনমেলা সাহিত্যচর্চার ধারাবাহিকতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অনুষ্ঠানে সাহিত্য আড্ডারও আয়োজন করা হয়। সেখানে সাহিত্যিকরা তাঁদের অভিজ্ঞতা, সৃষ্টিশীলতার নানা দিক এবং সাহিত্যজীবনের স্মৃতিচারণ করেন। এই অনানুষ্ঠানিক আলোচনা নতুন প্রজন্মের লেখকদের জন্য ছিল অনুপ্রেরণার উৎস।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল আট গুণীজনকে সম্মাননা প্রদান। সাহিত্য ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁদের এই সম্মাননা দেওয়া হয়। শেরপুর সাহিত্য চক্র পুরস্কার ২০২৫ লাভ করেন প্রবন্ধ ও গবেষণায় ড. গোলাম মোস্তফা, কবিতায় কুশল ভৌমিক, কথাসাহিত্যে মোহিত কামাল, সাংবাদিকতায় মো. আব্দুল মান্নান, গদ্যসাহিত্যে ড. মো. আমিরুল ইসলাম, কবিতায় এসএম রাহী পুরস্কারপ্রাপ্ত মামুন চৌধুরী, প্রিয় প্রজন্ম বিভাগে বি. এম. হাফিজুর রহমান এবং সুমন মোহন্ত।

সম্মাননাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের হাতে ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেন অনুষ্ঠানের অতিথিরা। এই সম্মাননা শুধু ব্যক্তিগত অর্জনের স্বীকৃতি নয়; বরং সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে তাঁদের দীর্ঘদিনের অবদানকে সম্মান জানানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

সম্মাননাপ্রাপ্তরা তাঁদের বক্তব্যে শেরপুর সাহিত্য চক্রের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাঁরা বলেন, এমন স্বীকৃতি সৃষ্টিশীল মানুষদের আরও উৎসাহিত করে এবং নতুন প্রজন্মকে সাহিত্যচর্চায় উদ্বুদ্ধ করে।

মধ্যাহ্ন বিরতি বাদে সকাল নয়টা থেকে বিকাল সাড়ে চারটা পর্যন্ত একটানা অনুষ্ঠানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। স্থানীয় শিল্পীদের পাশাপাশি আমন্ত্রিত শিল্পীরাও সঙ্গীত, আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশন করেন। বাংলা সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী উপাদানগুলো পরিবেশনার মাধ্যমে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হয়। দেশাত্মবোধক গান, রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলসঙ্গীত এবং আধুনিক বাংলা গানের সমন্বয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে বৈচিত্র্যময়। আবৃত্তিকারদের কণ্ঠে কবিতার আবেগময় উপস্থাপনা উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বিশেষভাবে নতুন প্রজন্মের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, প্রযুক্তির যুগে তরুণদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস কমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সাহিত্য সংগঠনগুলোর দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে।

শেরপুর সাহিত্য চক্রের সভাপতি সুলতান মাহমুদ রনি এবং সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ চৌধুরী রিবর্ণ তাঁদের বক্তব্যে বলেন, চার দশকের এই যাত্রা শুধু একটি সংগঠনের অর্জন নয়; এটি শেরপুরের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসের একটি গৌরবময় অধ্যায়। তাঁরা জানান, সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সাহিত্যচর্চার আগ্রহ সৃষ্টি এবং সৃজনশীল সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

তাঁরা আরও বলেন, ভবিষ্যতেও সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে সংগঠনটি আরও ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেবে। বিশেষ করে তরুণ লেখক ও গবেষকদের জন্য প্রশিক্ষণ, কর্মশালা এবং প্রকাশনার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।

শেরপুর সাহিত্য চক্রর ৪০তম বর্ষপূর্তি উৎসব ছিল সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার এক অনন্য উদ্যাপন। দিনব্যাপী এই আয়োজন প্রমাণ করেছে যে, সাহিত্য এখনও মানুষের মননে শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করে এবং সমাজকে ইতিবাচক পথে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

চার দশকের দীর্ঘ পথচলায় সংগঠনটি যে অবদান রেখেছে, তা শুধু শেরপুর নয়, দেশের সামগ্রিক সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের জন্যও মূল্যবান। গুণীজনদের সম্মাননা, সাহিত্য আলোচনা, কবিতা পাঠ এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে আয়োজিত এই উৎসব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button