Uncategorized

প্রবন্ধ : বায়স-বৃত্তান্ত : মানবর্দ্ধন পাল

এমন সময় আসে কাকের দল,

খাদ্যকণায় ঠোকর মেরে দেখে কী হয় ফল।

একটুখানি যাচ্ছে সরে আসছে আবার কাছে,

উড়ে গিয়ে বসছে তেঁতুলগাছে।

বাঁকিয়ে গ্রীবা ভাবছে বারংবার,

নিরাপদের সীমা কোথায় তার।

এবার মনে হয়,

এতক্ষণে পরস্পরের ভাঙল সমন্বয়।

কাকের দলের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিবিৎ মন

সন্দেহ আর সতর্কতায় দুলছে সারাক্ষণ।

প্রথম হল মনে,

তাড়িয়ে দেব; লজ্জা হল তারি পরক্ষণে―

পড়ল মনে প্রাণের যজ্ঞে ওদের সবাকার

আমার মতোই সমান অধিকার।

তখন দেখি লাগছে না আর মন্দ

সকাল বেলার ভোজের সভায়

কাকের নাচের ছন্দ।

(পাখির ভোজ, আকাশ প্রদীপ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

বাংলার পক্ষীকুলে এমন কোনও পাখি নেই যা রবীন্দ্র-কাব্যসাম্রাজ্যে রূপায়িত হয়নি। সৌন্দর্য-শোভাময় ও শান্তশিষ্ট স্বভাবের অভিজাত পাখি তো বটেই, অজ্ঞাতকুলশীল ক্রূর স্বভাবের কাকও তাঁর কবিতায় অনুল্লিখিত থাকেনি। প্রখর কবিদৃষ্টি দিয়ে তিনি যেমন কাকের চৌর্যস্বভাব লক্ষ করেছেন তেমনই এর মধ্য থেকে মানবিকতা, পক্ষীপ্রেম এবং দার্শনিকতাও প্রকাশ করেছেন। তাই কাককে বায়স বলে ডাকলে তার অজ্ঞাতকুলশীলতায় একটু আভিজাত্যের পরশ লাগে বৈকি!

শৈশব থেকে আমাদের সবচেয়ে পরিচিত পাখি কাক। বাঙালি শিশুর প্রথম পাখিচেনা বোধকরি কাকের মাধ্যমে। ঊষা থেকে প্রদোষ পর্যন্ত প্রতিদিন কাক আমাদের দৃষ্টিগ্রাহ্য ও চক্ষুসংলগ্ন। গ্রাম বা শহর যা-ই হোক, প্রতিবেশীর মতো এই প্রাণিটি লোকালয়ের চারপাশেই বসবাস করে। সকাল-দুপুর-গোধূলি বাড়ির আশপাশে ডানা ঝাপটায়, ওড়াওড়ি করে, আবর্জনা খোটে, খাদ্যসন্ধান করে। কিন্তু পাখা থাকলেও কাককে আমরা পাখি বলে স্বীকার করি না। কাক ডিম পাড়ে, তা দেয়, বাচ্চা ফোটায়, লেজ আছে, আকাশে উড়তে পারে, সারা শরীর পালকাবৃত এবং পক্ষীকুলের অন্যান্য সব বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও কেন জানি কাককে আমরা পাখি বলি না। হয়তো চিরচেনা, অশিষ্ট, গায়ের রং কালো, ময়লাখেকো, সুযোগসন্ধানী, ছিনতাইকারীর মতো ছোঁ-মারা স্বভাবের বলে আমাদের কাছে কাকের কদর কম! হয়তো সহজলভ্য বলেই কাকের ঊনমূল্য! এ কথা তো সত্য, যে-পাখি যতো বেশি দুষ্প্রাপ্য তার কদর ও বাজার মূল্য তত বেশি। পক্ষীকুলে নিকৃষ্ট ও প্রতারক-স্বভাবের বলেই কাক ব্যঙ্গার্থে ‘কাউয়া’―পতিত রাজনীতিকের প্রতিতুলনা! হয়তো বাঙালি-সমাজে কালো মেয়ের কদর যেমন কম, তেমনই কাকেরও। কাক পোষমানা পাখি নয়, তাই সমাদরে গৃহপালিতও নয়। সেজন্য মানবসমাজে কাকের সমাদর নেই―নিন্দাই তার শিরোভূষণ, নিগ্রহই তার কলঙ্কতিলক। তাই নিন্দুকের চোখে কাকের বর্ণনা এরকম : “আমরা, শহরে কি গ্রামে, কাকদের আপদবালাই হিসেবে দেখে থাকি―ওর মুখ দেখলে যেন পাপ হয়, সারাদিন শুধু কা-কা ডাক আর যত রাজ্যের নোংরা গেলা। এদের গায়ের রং যেমন তোতা পাখির মতো সুন্দর নয়, তেমনি দেখতে শুনতে কি ডাকে-ডোকে বুলবুল পাখির মতো মিষ্টি নয়। এদের কোথায় না দেখা মেলে―বজ্জাৎ আর নোংরার একশেষ। কোনো  পাখির সঙ্গেই এদের মেলে না―সারাদিন কেবল কান ঝালাপালা করা কা-কা!” (মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা, পক্ষী সংখ্যা, পৃ. ৩০৩)। প্রাচীনকালের মুনি-ঋষিরাও কাক সম্পর্কে ভেবেছেন। তাই একটি সংস্কৃত শ্লোকে কাকের রব সম্পর্কে বলা হয়েছে :

তিমিরারিস্তমোহন্তি ভয়সন্ত্রস্ত মানসাঃ।

‘বয়ং কা-কা বয়ং কা-কা’ ইতি জল্পন্তি বায়সাঃ।

চমৎকারিত্ব সত্ত্বেও উপরিউক্ত বর্ণনা একপেশে, পক্ষপাতদুষ্ট। বুদ্ধির প্রাখর্যে, চতুরতায়, সংঘবদ্ধ সহাবস্থানে কাক পক্ষীকুলে অনন্য। একাগ্রচিত্ত এবং পরিশ্রমী হিসেবেও কাক নজরকাড়া। তাই অনেক পক্ষীবিজ্ঞানী কাককে বলেছেন, ‘পবনভুবনের আইনস্টাইন’। কাকের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সেই গল্পটি শিশুকালে আমরা কে না-পড়েছি। গ্রীষ্মের দুপুরে এক তৃষ্ণার্ত কাকের গল্প―কলসির তলানিতে পড়ে-থাকা জল নুড়ি ফেলে-ফেলে কলসির কণ্ঠে তুলে এনে পান করেছিল। কাককে আমরা চতুরতায় চাণক্য, বুদ্ধিমত্তায় হিটলার এবং ধূর্ততায় কিসিঞ্জার বলে জানি। বুদ্ধিবল ও চতুরতা যেমন আছে, বোকামিও কম নয় কাকের। তাই বংশবৃদ্ধির বেলায় দেখা যায়, চালাক কাক কোকিলের কাছে বোকা বনে যায়। নইলে কি আর চোখ ফাঁকি দিয়ে কোকিল ডিম পাড়ে কাকের বাসায়। কেবল ডিম দিয়েই ক্ষান্ত হয় না কোকিল। তা দিয়ে বাচ্চা-ফোটানো এবং লালনপালনের ভারও কোকিল চাপিয়ে দেয় কাকের ঘাড়ে। অবশেষে পালিত সন্তান কোকিল-ছানা যশোদাতুল্য পালক মাকে চিরতরে ত্যাগ করে। কাকের এমন বোকামি ও কোকিলের ধূর্তামি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ‘কাক্কোকিল’ ছড়ায় কাকের জবানিকে শৈল্পিক রূপ পেয়েছে :

ডিম ফুটিয়ে বেজায় ঠকান ঠকেই গেলাম ছি ছি―

কোকিল ছানার পিছেই খেটে ম’লাম মিছামিছি।

পক্ষীকুলের বংশে বায়স আমরা চালাক বটে

জানত কে বা কোকিল এমন বুদ্ধি ধরে ঘটে ?

(মানবর্দ্ধন পাল ও জামিল ফোরকান সম্পাদিত শিশুতোষ আবৃত্তিকোষ, পৃ. ১৭৭)।

দুই

কাকের বুদ্ধিমত্তার অনেক কাহিনি গ্রামবাংলায় চালু আছে―পুকুরঘাটে স্নানরতা নারীর সাবান চুরি, শিশুর হাত থেকে খাবার ছিনতাই, অসতর্ক গৃহিণীর রান্নাঘর থেকে মাছ-মাংসের টুকরো গায়েব-করা ইত্যাদি। আবার বোকামির লোকপ্রিয় গল্পও আছে। মনে কি পড়ে, কাক ও শেয়ালের সেই সরস গল্পটি ? কাকের ঠোঁটে একটি মাংসের টুকরো দেখে চতুর শেয়াল তার রূপের প্রশংসা করে কণ্ঠস্বর শুনতে চায়। অবশেষে কাক ডেকে উঠতেই মাংস পড়ে যায় মাটিতে এবং খেয়ে নেয় প্রতারক শেয়াল। এসব শিশুতোষ লোকগল্প আমাদের বুদ্ধিমত্তা, প্রতারণা, বোকামি, চতুরতা সম্পর্কে সচেতন করে।

কাকের পরিচয় দিতে গিয়ে বাংলাপিডিয়া জানিয়েছে :

‘দেহ চকচকে কালো রঙের এবং অধিকাংশেরই শক্তিশালী কালো ঠোঁটের গোড়া পালকে ঢাকা। কাক সর্বভুক। অত্যন্ত বুদ্ধিমান এই পাখি… মানুষের কণ্ঠস্বর অনুকরণেও দক্ষ। শুধু কা কা নয় সুরেলা কণ্ঠেও ডাকে। এরা যূথচর, মাঝে মাঝে খুব বড় দলেও থাকে, কিন্তু একত্রে ঘুমায় না। প্রত্যেক জোড়ার পৃথক বাসা থাকে।… স্ত্রী ও পুরুষ উভয়ই বাসা তৈরি করে, বাচ্চাদের খাওয়ায়। গাঢ় দাগসহ হালকা সবুজ বা জলপাই রঙের ৫-৬টি ডিম পাড়ে। পালাক্রমে দুজনেই তা দেয়।… একমাত্র দক্ষিণ আমেরিকা ছাড়া কাকদের প্রজাতি প্রত্যেক মহাদেশেই আছে।’ (এশিয়াটিক সোসাইটি, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ২২৩-২৪)।

পাখিকে চেনাজানা এবং পর্যবেক্ষণ করার সৌভাগ্য সবার হয় না। আমরা প্রকৃতির সন্তান হলেও সকলে প্রাণপ্রকৃতি সম্পর্কে কৌতূহলী নই।  তবে কেউ কেউ প্রকৃতির বিহঙ্গকুলের নিবিড় পর্যবেক্ষক। পক্ষী-বিশেষজ্ঞ না-হলেও এক্ষেত্রে কথাশিল্পী বনফুল ব্যতিক্রম। স্বদেশি পাখির ভুবন তিনি ওপরভাসা দৃষ্টিতে দেখেননি―দেখেছেন পরম মমতায় ও গভীর সংবেদনশীলতায়। দেশীয় পাখপাখালি নিয়ে তাঁর একটি অসাধারণ রচনা আছে। তার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে কাক সম্পর্কে তিনি লিখেছেন : ‘কয়েকটা পাখিকে অবশ্য না চিনে উপায় নেই। তারা জোর করে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। যেমন কাক, চিল, শালিক, চড়াই। কাককে আপনারা রোজই দেখেন। কিন্তু জানেন কি তাদের ডাক শুধু কা কা নয় ? কক্ কক্, ক্র ক্র, কোয়াক কোয়াক, এ রকম ডাকও ডাকে সে। কাকরা মাঝে মাঝে বড় সভা করে। দেখেছেন ?’

(পক্ষী সংখ্যা, মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা, পৃ. ২৭৬)।

সন্দেহ নেই, কাকের ডাক তোতা-ময়নার স্বরের মতো মধুশ্রাবী নয় বরং কর্কশ, কর্ণবিদারী ও যন্ত্রণাকর। ফ্যাঁসফ্যাঁসে ভাঙাগলার মানুষকে তাই আমরা ‘বায়সকণ্ঠী’ বলে নিন্দা করি। গ্রীষ্মের নির্জন দুপুরে কাকের ডাক অমঙ্গলকর বলেও গ্রামবাংলায় সংস্কার আছে। তবে কাকের ডাকের ভিন্নতায় যে অর্থের পার্থক্য আছে তা জানিয়েছেন পাখি-বিশেষজ্ঞরা। ‘আউটডোর লাইফ’ থেকে অনুবাদ করে মীজানুর রহমান জানিয়েছেন : ‘পাখির জগতে বুদ্ধিজীবী বলে পরিচিত এই কাকদের আরেকটি মস্ত গুণ এদের কথ্যভাষা। আমাদের আনাড়ি কানে কাকদের ভাষা অর্থহীন মনে হতে পারে, কিন্তু বিখ্যাত কাক বিশারদ বিজ্ঞানী ডুইট চেম্বারলেইন বলেন আরেক কথা। বহু বছরের গবেষণায় তিনি আবিষ্কার করেছেন কাকদের মধ্যে ২৩টি বিভিন্ন শব্দের অস্তিত্ব। তাঁর মতে, খাওয়ার খোঁজ পেলে তারা একরকম শব্দ উচ্চারণ করে, আবার দলকে অথবা একে অপরকে ডাকার সময় ভিন্ন ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করে। এ ছাড়া সতর্কতামূলক সংকেত ও আসন্ন অমঙ্গলসূচক সংকেত এবং প্রেমনিবেদনমূলক ও অন্যান্য কৃতকর্মের জন্য নানা শব্দ কাকেরা ব্যবহার করে থাকে।’

তিনি আরও লিখেছেন : ‘কাকেরা ভাল পোষ মানে যদি তাদের শৈশবাবস্থায় পালন করা যায়। তখন ওদের যা শেখানো যায় তা-ই শেখে, এমনকি তামাশাও।’ (ঐ, পৃ. ৩০৫)।

বুয়েটের স্বনামধন্য অধ্যাপক এবং একাধিক জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত প্রখ্যাত বিজ্ঞান-লেখক জহুরুল হক। তাঁর প্রকৃতি-বিষয়ক একটি স্মৃতিচারণমূলক রচনায় কাক-সম্পর্কিত অনুচ্ছেদটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি লিখেছেন :

“এ বাড়িতে আসার ক’দিন পরেই হঠাৎ একদিন খেয়াল হলো, এখানে কোনও কাক বা শালিক দেখছি না। এ কেমন হলো ? বাংলাদেশের কোনও জায়গায় আমাদের এতকালের চেনা, সেই কা কা ডাকের কাক নেই! গেলো চুকেবুকে দাঁড়কাক, গলার কাছে সাদাটে ধূসর রং, কালো শরীরের জয়নুল আবেদীনের সেই প্রাণচঞ্চল, প্রাণবন্ত কাক নেই ? আমাদের গ্রামের সেই ছটফটে কৃষ্ণকলি, জীবন্ত কিশোরী মেয়েটার কথা মনে হলো, অল্প বয়সেই যার বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল মা বাবা দূরের এক দেশে। ঐ নতুন অপরিচিত পরিবেশে কোনও কাক দেখতে না পেয়ে দুরন্ত প্রাণোচ্ছল মেয়েটি কেঁদে কেঁদে বলছিল তার নিজের ভাষায় : ‘মাগো, মা/ কুন দ্যাশে বিহ্যা দিলি, কাইয়া উড়ে না।’

ভেবে দেখতে গেলে, কাক পাখি হিসেবে এমন কিছু আদরণীয় নয়―ওদের ঐ কর্কশ গলার জন্যে, খাবার চুরি করা বা নিয়ে পালানোর জন্যে। কিন্তু কি আশ্চর্য, যেন জায়গা চিনি কাক দিয়ে; কাকই প্রাণের কথা জানায়।”

(সুখে-দুঃখে আমি, ঢাকার গাছপালা। মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা, বৃক্ষ ও পরিবেশ সংখ্যা, পৃ. ১৯৬)।

প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদ। ভাষা-সাহিত্য, বিজ্ঞান-দর্শন, সমাজতত্ত্ব, রাজনীতি ইত্যাদি অনেক বিষয়ে তিনি বিশেষজ্ঞ। অবাক হতে হয় পাখি সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণ দেখে। দর্শকের চোখে নয়; দার্শনিকের দৃষ্টিতে তিনি কাকের চরিত্র মূল্যায়ন করেছেন। তুচ্ছ কাককে তিনি আজাদীয় শৈল্পিক ভাষায় মনোদার্শনিকভাবে প্রকাশ করেছেন। আগ্রহী পাঠকদের জন্য, একটু দীর্ঘ হলেও, কাক-প্রসঙ্গে হুমায়ুন আজাদের একটি অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করা প্রয়োজন মনে করি। তিনি বাবুই-বুননি বাক্যবন্ধে স্মৃতিময়তার মিশেলে লিখেছেন :

‘কাক বেশ চমৎকার পাখি এবং আমার বেশ পছন্দ। অন্য পাখিদের দিকে তাকালে মনে হয় ওরা নিজেদের ছাড়া আর কিছু বোঝে না; ওরা মনে করে পৃৃথিবীটা ওদেরই জন্যে বানানো হয়েছে। কিন্তু কাককে দেখলে তা মনে হয় না। কাকই একমাত্র পাখি যেটা মানুষের সাথে সক্রিয় সম্পর্কে জড়িত। কাক জানে পৃৃথিবীটা মানুষের অধিকারে। আর কোন পাখি এসে দরোজায় দাঁড়ায়, মানুষের সঙ্গে একটু খাবার ভাগাভাগি করে নিতে চায় ? এ শহরে যদি উড়ন্ত কোনও প্রাণী দেখতে চাই, সে-সুখ কাক ছাড়া আর কে দেয় ? আর সব পাখিরাই রয়েছে একটু অন্যমনস্কতায়, একটু বন্যতায়, আর কাকের রয়েছে পুরোপুরি মনুষ্যত্ব, আর রাজনীতি। যে-ভাবে হঠাৎ এসে থালা থেকে ভাজা মাছটি নিয়ে যেতো কাক, মুড়ি ছুঁড়ে দিলে মাটিতে পড়ার আগেই টপ করে ঠোঁটে ধরে ফেলতো, তা আর কোন পাখি পারে ? শীতকালে তো কাক হয়ে ওঠে মসৃণ সুন্দর। কাকের বাসাও চমৎকার, ডিমও সুন্দর নীল। চমৎকার তাদের সমাজতান্ত্রিক মনোভাব। কাকের বাসা থেকে ডিম পেড়ে বা কাকের ছা নিয়ে এসে শান্তিতে থাকার উপায় ছিলো না। দলে দলে কাক এসে হাজির হতো, ঠোঁকর দিতো ধারালো ঠোঁট দিয়ে। কাকের ন্যায়সঙ্গত প্রতিরোধস্পৃহাকে শ্রদ্ধা না করে পারা যায় না।

“কিন্তু দাঁড়কাক ছিলো একেবারে ব্রাহ্মণ। বেশ বড়ো, চোখে বা ডানায় চাঞ্চল্য নেই; গম্ভীর গলায় ডাকে ‘কা, কা’। বেশি দেখতেও পাওয়া যেতো না। আমার এক বন্ধুর বাবা মারা গিয়েছিলো। একদিন দেখি ধুতি পরে চুল কামিয়ে, একটা পেতলের বাটিতে দুধ আর শবরি কলা নিয়ে এসে বসলো আমাদের বাড়ির পশ্চিমের বুনো বাড়িটির বড়ো আমগাছটির নিচে। সে-গাছের ডালে একটি দাঁড়কাক স্থিরশান্তভাবে বসে তার নিজস্ব বৈদিকে আবৃত্তি করে চলছিলো ধীরগম্ভীর বেদমন্ত্র। তার খেয়াল নেই নিচের বাস্তবতার দিকে : সে পৃথিবীকে কিছু দুরূহ-গভীর বাণী শুনিয়ে যাচ্ছিলো। নিচে উৎকণ্ঠ হয়ে অপেক্ষা করছিলো আমার বন্ধুটি―কখন ওই পক্ষীব্রাহ্মণের চোখ পড়বে শবরি কলা আর ঘন দুধের দিকে। তারপর থেকেই দাঁড়কাক দেখলেই পাখিটিকে খুব মহান বলে মনে হতো আমার, মনে জন্ম নিতো অপার্থিব মহত্ত্বের বোধ। ডানা-ঝাপটানো দাঁড়কাক নয়, শান্ত গম্ভীর দাঁড়কাক ছিলো আমার ছোটোবেলায়। এখন কি আছে ওই মহৎ পাখি, নাকি বিদায় নিয়েছে গ্রাম থেকে ?’ (আমার পাখিরা, ঐ, পৃ. ১৬)।

কবি ও কথাশিল্পী আহমদ ছফা সমাজ-সচেতন লেখক। কাককে তিনি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করেছেন। মানবসমাজে শ্রেণিবিভাজন, শ্রেণিশোষণ আছে, আছে আমাদের সমাজেও। সেই সত্য তিনি কাক-চরিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন পুষ্প বৃক্ষ ও বিহঙ্গ পুরাণ উপন্যাসে। আকৃতিতে সামান্য ভিন্ন হলেও সমগোত্রীয় পাখি পাতিকাক ও দাঁড়কাক। কিন্তু ওদের মধ্যেও আছে স্বার্থের দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং বৈরিতা। আছে দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার ও শোষণ। এক্ষেত্রে সমাজের স্বরূপ উদ্ঘাটনে আহমদ ছফা কাককে রূপক হিসেবে রূপায়ণ করেছেন এবং বর্ণনা করেছেন এর সৌন্দর্যও। তিনি লিখেছেন :

‘আমি ছাদের ওপর তাকিয়ে দেখি একটি দাঁড়কাক বসে আছে। আহা, বড় ভাল লাগল। শহরে কখনো দাঁড়কাক দেখেছি বলে মনে পড়ে না। গ্রামের মানুষ শহরে এলে যেমন আড়ষ্ট হয়ে থাকে, কাকটিও তেমনি এক কোনায় জবুথবু হয়ে বসে আছে। আমি তার দিকে রুটির টুকরো ছুঁড়ে দিলাম। শহরের কাকেরা সে টুকরোগুলো তার মুখের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে খেয়ে ফেলল। আমার মনে বড় লাগল। এভাবেই শহরের মানুষেরা গ্রামের মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে থাকে। তার পরদিন একটার জায়গায় দুটো দাঁড়কাক এল। তারপর থেকে এখানে সেখানে নানা জায়গায় দাঁড়কাক দেখতে লাগলাম। আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগল। গ্রামে কি ভীষণ খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে, নইলে শহরে দলে দলে দাঁড়কাক এমনভাবে ছুটে আসবে কেন ? নদীভাঙা মানুষ যেমন আসে, দুর্ভিক্ষের থাবা থেকে জান বাঁচানোর জন্য হাভাতে মানুষ যেমন আসে তেমনি শহরে দলে দলে দাঁড়কাক আসছে, তার কারণ কী ?’ (পৃ. ৭৮-৭৯)।

একদিন আহমদ ছফা লক্ষ করলেন, কাকরা আর রুটি খাচ্ছে না। সব কাক একযোগে কা কা করে তাঁর ছাদের সীমানা পেরিয়ে আকাশে উড়ে-উড়ে কলরব করছে। তিনি আরও লিখেছেন :

‘এত কাক নানা জায়গা থেকে এসে জুটেছে যে আমার সামনের আকাশটা যেন একটা কাকের সমুদ্র হয়ে গিয়েছে।… দাঁড়কাকেরা পাতিকাকদের কীভাবে মেরে মেরে তাড়িয়ে দিচ্ছে।

আমি তাকিয়ে দেখলাম, আট দশটা দাঁড়কাক একজোট হয়ে যেখানেই পাতিকাক দেখছে খেদিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার পরদিন দেখতে থাকলাম দাঁড়কাকেরা দল বেঁধে জঙ্গি বিমানের মত বেগে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেখানেই পাতিকাক দেখছে হামলা করছে। কাকের জগতেও হিংস্রতা এবং মস্তানি প্রবেশ করেছে। একসময় হয়তো এমনও হতে পারে দাঁড়কাকেরা এই শহর থেকে পাতিকাকদের তাড়িয়ে দেবে।’ (পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ, পৃ. ৭৯-৮০)।

তিন

কাকরা যেমন দুই জাতের―দাঁড়কাক ও পাতিকাক―তেমনই ‘কাক’ শব্দটিও একাধিক অর্থদ্যোতক। অভিধানে কাকের অন্তত পাঁচটি ভুক্তি পাওয়া যায়। তা নিম্নরূপ―

১) কাক : কু (কুৎসিত) + অক/ অ (গমন করা) = কাক। এর অর্থ, যে পাদ-বিকলতাবশত কুৎসিতভাবে গমন করে। বিশেষ্যপদ।

(আরতিল কাক তাক ভখিতেঁ না পারে। বড়ু চণ্ডীদাস)।

২) কাক : কাহার বা কার অর্থে। সর্বনামপদ।

(দণ্ডের উচীত ফল দিমু কাক সাস্তি। কবীন্দ্র পরমেশ্বর)।

৩) কাক : সংস্কৃত শব্দ। কক্ষ > কাখ > কাক।

(অভাগীর কলসি তুলিতে নারি কাকে। বিজয় গুপ্ত)।

৪) কাক : ভগ্নাংশ। এক কড়ার চার ভাগ পরিমাণ।

(টাকা আছে, আনা আছে, কড়া আছে, ক্রান্তি আছে, দন্তি আছে, কাক আছে, তিল আছে। রবীন্দ্রনাথ)।

৫) কাক : ইংরেজি কর্ক (পড়ৎশ) থেকে। কর্কগাছের ছালের তৈরি ছিপি।

(হোমিও-শিশির কাক লাগিয়ে রেখো। বর্তমান লেখক)।

কাকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বদনাম-দুর্নাম ও সুবচন থাকলেও কাক এবং কাকসংশ্লিষ্ট শব্দগুলো বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সুনামের সঙ্গেই বিরাজ করছে। অভিধানে সেসবের অর্থ ও ধ্বনিমাধুর্য মনোহর, হৃদয়গ্রাহী এবং সুখশ্রাবী। ধনাত্মক চেতনা ও কাব্যিক বিচিত্র অর্থানুষঙ্গে কাকসংশ্লিষ্ট শব্দগুলো সাহিত্যমূল্যে শিখরচূড়। কালো, কর্কশ, কদাকার বলে কাক যতই নিন্দিত হোক, বিচিত্র নামের মাহাত্ম্যকথায় কাক অন্য সুশ্রী পাখির তুলনায় প্রশংসাযোগ্য। সেসব আলোচনার আগে আমরা জেনে নিই কাকের সমার্থক শব্দ বা অন্য নামগুলো : বায়স, বলিভুক, পরভৃৎ, গৃহবলিভুক, বৃক, বলিপুষ্ট, অন্যভৃৎ, অণুক, দাঁড়কাক, দ্রোণকাক, দণ্ডকাক, ক্রূররব, কাকাল, কৃষ্ণকাক, পাতিকাক। (যথাশব্দ, মুহম্মদ হাবিবুর রহমান ও সংসদ সমার্থশব্দকোষ, অশোক মুখোপাধ্যায়)। এসব ছাড়াও কাকের আরও কয়েকটি সংস্কৃত ও পৌরাণিক নাম আছে : মৌকুলি, করট, অরিষ্ট, অন্যভুক, সকৃৎপ্রজা, ধাঙ্ক্ষ, আত্মঘোষ, কাকল/ কাকোল।

এই নামবাচক শব্দগুলোর সাধারণ অর্থ কাক। কিন্তু এগুলো যেহেতু সংস্কৃত ও ভারতীয় পুরাণসংশ্লিষ্ট শব্দ তাই এগুলোর যেমন ব্যুৎপত্তি আছে তেমন অর্থের অন্তরে বিচিত্র রহস্যও আছে। সেগুলোর দিকে চকিত দর্শনের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া দরকার।

কাক : এটি সংস্কৃত শব্দ। হিন্দিতে কৌআ। অনেকে বলেন, ধ্বন্যাত্মক শব্দ ‘কৈ’ থেকে কাক এসেছে। কৈ + কন্ = কাক। কাকের ডাক মূলত কা-কা। কিন্তু অঞ্চলভেদে এই ধ্বন্যাত্মক শব্দটি সামান্য ভিন্ন―ক-ক, ক্যা-ক্যা, ক্রক-ক্রক ইত্যাদি হয়। কাকের অঞ্চলভেদে লৌকিক উচ্চরণ কাউ, কাও (যশোর), কাউয়া (চট্টগ্রাম, ঢাকা, ময়মনসিংহ, নাটোর)। বাংলা ধ্বনি-পরিবর্তনের একটি সূত্র আছে, বর্গের প্রথম ধ্বনি সন্ধিতে তৃতীয় ধ্বনিতে রূপান্তর হয়। এই সূত্রে ক > গ হয়ে যায় ও অঞ্চলভেদে কাক হয়ে যায় ‘কাগ’। উদাহরণ : ‘শুকান ডালেতে বসি কু বোলয় কাউ।’ (কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, চণ্ডীমঙ্গল)। ‘বুড়া কাউয়ার মুখে যেন পাকা আম।’

(বিষহরি ও পদ্মাবতীর পাঁচালী, দ্বিজবংশী দাস)।

পরভৃৎ/ অন্যভৃৎ : কোকিল বাসা বানাতে পারে না, পরাশ্রয়ী। সবিশেষ বংশবৃদ্ধির সময় সে পরনির্ভর―কাকের বাসায় ডিম পাড়ে। কাকই সেই ডিমে তা দেয়, বাচ্চা ফোটায়, প্রতিপালন করে। পর বা অন্যের ছানা প্রতিপালন করে বলে কাকের নাম পরভৃৎ বা অন্যভৃৎ।

বায়স : এই শব্দটি ‘বয়স’ শব্দের সঙ্গে যুক্ত। বয়স + অ + অন্ = বায়স। জনশ্রুতি আছে, কাককে দেখে বয়স বোঝা যায় না। পাখি-বিশেষজ্ঞরা বলেন, দাঁড়কাক সর্বোচ্চ ৬৯ বছর বাঁচে। কিন্তু যৌবন ও বার্ধক্যে তার শরীরে কোনও ছাপ পড়ে না। কাক বয়স লুকিয়ে রাখতে পারে তাই তার নাম বায়স। রামায়ণ ও মহাভারতে বহুবার এই শব্দটির উল্লেখ আছে।

মৌকুলি : জানা যায়, কাকের এই নামটি সংস্কৃত ভাষার কবি ভবভূতির উত্তর রামচরিতের দ্বিতীয় অঙ্কের ২৮ নম্বর শ্লোকে আছে। মধু > মহু > মউ > মৌ। মৌ + কুলি = মৌকুলি। কুড়ি > কুলি। কুলি মানে জড় বা একত্র করা। বিচিত্র স্বভাবের কাক অন্য সব জিনিস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে খায় কিন্তু মধু পেলে ঠোঁট দিয়ে জড়ো করে খায়। তাই কাকের আরেক নাম মৌকুলি।

করট : কৃ + অনট = করট। শব্দটি লোকসংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। কাক কর্-কর্ বা ক্র-ক্র রব করে। তাই এর নাম করট।

বলিভুক : বলি (উপকরণ) + ভুক্ (ভুজ্ = ভোজন করা)। বলি ভোজন করে যে = উপপদ তৎপুরুষ সমাস। সংস্কৃতে বলি মানে সংগৃহীত বস্তু। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পুজোর উপকরণ বা উপচারও এক প্রকার সংগৃহীত বস্তু। পথে বা খোলা ময়দানে রেখে-আসা সেই উপকরণ কাক এসে খায়। সেজন্য কাককে বলা হয় বলিভুক। হিন্দুধর্মে সংস্কার আছে, মাতা বা পিতার মৃত্যু হলে পুত্রদের একমাস হবিষ্যি পালন করতে হয়। তখন পুত্ররা স্নান সেরে পূজার উপকরণ পথেঘাটে রেখে আসে। তা কাক ভক্ষণ না-করা পর্যন্ত তারা খেতে পারে না। এর নাম কাকবলি।

বলিপুষ্ট : কাক পুজোর উপকরণ খেয়ে পুষ্টিলাভ করে বলে এর আরেক নাম বলিপুষ্ট। বলি (উপকরণ) দ্বারা পুষ্ট = তৃতীয়া তৎপুরুষ।

অরিষ্ট : শব্দটির ব্যুৎপত্তি―ন + রিষ্ + ক্তি = অরিষ্ট। রিষ্ মানে অশুভ, অকল্যাণ, বিপদ। শব্দটি ঋকবেদে আছে। বেদ-ভাষ্যকার যাস্কের মতে, এর অর্থ নিমগাছ, মদ, অশুভহারক ও কাক। যে অশুভ, অকল্যাণ ও বিপদ দূর করার সংকেত দেয় সে-ই অরিষ্ট। কাক পূর্ব থেকে সেই অশনি সংকেত এবং বিপদনাশের ঘোষণা দেয়।

বৃক : বৃ + কক্ = বৃক। বাংলায় অপ্রচলিত শব্দ। এর আটটি অর্থের মধ্যে কাক অন্যতম।

কাণুক : কাক। অচলিত অভিধাননির্ভর পৌরাণিক শব্দ।

কৃষ্ণকাক : কাকের পালক কালো রঙের। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পৌরাণিক যুগবিভাগ অনুসারে দ্বাপরযুগের অবতার শ্রীকৃষ্ণের গাত্রবর্ণ কালো। তার সঙ্গে তুলনা করে কাককে কৃষ্ণকাক বলা হয়।

ক্রূররব : শব্দটির অর্থ―নৃশংস, নিষ্ঠুর, নির্দয়, কর্কশ, উগ্র ইত্যাদি। কাকের ডাক অত্যন্ত হিংস্র ও হৃৎকম্প-জাগানিয়া বলে এর অন্য নাম ক্রূররব।

সকৃৎপ্রজা : কাকের অন্য নাম। পৌরাণিক এই শব্দটি এখন অপ্রচলিত। প্রাচীন ভারতের অন্যতম প্রাণিতত্ত্ববিদ ছিলেন কাশ্যপমুনি। তার নামে প্রচলিত সংহিতা গ্রন্থটিতে কাককে বলা হয়েছে সকৃৎপ্রজা। সকৃৎ মানে একবার আর প্রজা মানে সন্তান। অর্থাৎ যে মাত্র একবার সন্তান জন্ম দেয়। তাই এক সন্তানের জন্মদাত্রীকে সকৃৎগর্ভা, সকৃৎপ্রজা বা কাকবন্ধ্যা বলা হয়।

ধ্বাঙ্ক্ষ : কাকের স্বর স্বভাবতই কর্কশ। এই কর্কশতা কখনও এমন মনে হয় যে, মৃত্যু সমাসন্ন―মৃত্যুদূত যমরাজ যেন দরোজায় দণ্ডায়মান। কালসময়ের অন্ধকার ঘোষণাকারী যমরাজ যেন কাকরূপে এসেছে। তাই প্রাচীন ঋষিরা এমন কর্কশ ধ্বনিকারী কাককে ধ্বাঙ্ক্ষ বলেছেন।

আত্মঘোষ : কাক যতদূরে বা যেখানেই ডাকুক, কানে আসামাত্রই বোঝা যায় কাকের রব। কণ্ঠস্বর দিয়েই সে নিজের অস্তিত্ব ও পরিচয় ঘোষণা করে। দেখা না-গেলেও রবেই তার পরিচয়। সেজন্য কাকের আরেক নাম আত্মঘোষ।

দণ্ডকাক/দাঁড়কাক : কাক প্রধানত দুই প্রজাতির―দণ্ডকাক বা দাঁড়কাক ও পাতিকাক। সংস্কৃত দণ্ডকাক থেকে তদ্ভব শব্দ দাঁড়কাক। দাঁড়কাক আকৃতিতে বড় ও স্বভাবে অপেক্ষাকৃত ধীরস্থির, শান্ত। তুলনায় পাতিকাক চঞ্চল। দাঁড়কাক নিয়ে প্রাচীন ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ণের সপ্তম কাণ্ডের অষ্টাদশ অধ্যায়ে একটি উপাখ্যান আছে। সেখানে দাঁড়কাকের নাম দ্রোণকাক। এ-প্রজাতির কাককে পুরাণে যমরূপী কাক হিসেবেও কল্পনা করা হয়। মরুত্তরাজের যজ্ঞে মৃত্যুদূত যমরাজ রাবণের ভয়ে দাঁড়কাকরূপ ধারণ করেন।

দ্রোণকাক : দ্রু + ক্ত/ ন-ক = দ্রুণ > দ্রোণ। দণ্ডকাক, দাঁড়কাক। কালো পালকযুক্ত বলে কৃষ্ণকাক বা দগ্ধকাকও বলা হয়। বৈদিক সভ্যতায় এই শব্দটি মদ রাখার পাত্র বোঝাত। অর্থাৎ পানপাত্র। বৈদিক সাহিত্য, ঋকবেদ ও কাঠোপনিষদে এই শব্দটি পাওয়া যায়। সেখানে দ্রোণকাকের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এর দুটি স্বভাব―ঊর্ধ্বগামিতা ও কুটিলতা। এ দুটি স্বভাবই দ্রোণকাকের মধ্যে আছে। পাতিকাকের চেয়ে এরা বেশি উঁচুতে উড়তে পারে এবং হিংস্রভাবে ঠুকরে খাবার কেড়ে নিতে পারে। উদাহরণ : ‘শিবাপুঞ্জে বসাভুঞ্জে গৃধিনীর সঙ্গে।/ঝাঁকে ঝাঁকে দ্রোণকাক পিয়ে রক্ত রঙ্গে।’

(কাঞ্চীকাবেরী, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়)।

কাকল/ কাকাল/ কাকোল : এটি দ্রোণকাকের অন্য নাম। কক্ + নিচ্ (স্বার্থে) + ওল = কাকোল। কক্ মানে লালা। অর্থাৎ কোনওকিছু দেখলেই লালসা জাগে এবং লালা ঝরে। দ্রোণ বা দাঁড়কাকের সব ধরনের খাদ্যেই লোভ জাগে, লালা ঝরে। তা পচাবাসি-টাটকা কিংবা আমিষ-নিরামিষ যা-ই হোক না-কেন। তাই এর নাম কাকল বা কাকোল।

চার

কাক আমাদের নিয়ত-দেখা প্রতিবেশী পাখি বলেই বোধ করি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে প্রাচীনকাল থেকে কাক রূপায়িত হয়েছে পুরাণে-প্রবচনে, বর্ণনায়, তুলনায় এবং উপমা-উৎপ্রেক্ষা- রূপকে―কখনও নিন্দার্থে, কখনও প্রশংসায়। ড. সলিম আলীসহ আন্তর্জাতিক পক্ষীবিজ্ঞানীরা কাকের স্বভাব-চরিত্র ও আচরণ নিয়ে প্রচুর গবেষণা তো করেইছেন, আধুনিক শিল্পী ও কবি-লেখকরাও এই কাজলরঙা পাখিটিকে অনাদর করেননি। রবীন্দ্রনাথের ‘পাখির ভোজ’ কবিতা এবং তেতাল্লিশের মন্বন্তর নিয়ে চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিনের ‘দুর্ভিক্ষের কাক’ এর সাক্ষ্যবাহী। জয়নুলি কাক জাতীয় জীবনে অমঙ্গলের প্রতীক এবং অশনিসংকেত। বাংলার কবিতায়, গানে, প্রবাদ-প্রবচন-বাগধারায় এবং লোকসংস্কৃতির অন্তর্লোকে বায়স প্রতীকী ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত। সেকাল-একালের সাহিত্য থেকে কয়েকটি উদ্ধৃতি :

* দিবসই বাহুড়ী কাউই ডরে ভাঅ। (চর্যাপদ ২)।

* শুকান ডালেতে বসি কু বোলয় কাউ।

(মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, চণ্ডীমঙ্গল)।

* চটক কর্কট টিয়া বায়স পেচক। (ঐ)।

* কাউয়া চিলার নাখাল মোশা ভোমরিয়া ব্যারায়। (গোপীচন্দ্র)।

* বুড়া কাউয়ার মুখে যেন পাকা আম। (দ্বিজ বংশীদাস, বিষহরি ও পদ্মাবতীর পাঁচালী)।

* কাউয়ায় করে কলমল। (অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।

* তুমি ষোড়শী, রূপসী, সরসী, বায়সী। (দীনবন্ধু মিত্র)।

* বায়সকুল আসিয়া নীবার ভোজন করিতেছে। (বনফুল)।

* কাউয়ার দল যেমন কইব্যা খ্যাদায় দেখলে প্যাঁচা। (হাসির গান, নজরুলগীতি)।

* বায়সকণ্ঠ… বিরূপ মনোভাব অনেক সময় প্রকাশ করি। (আলাউদ্দিন আল আজাদ)।

* কাউয়ার মতো মুন্সীবাড়ির দাওয়ায় বসে দেখবো বসে তোমার ঘষামাজা। (আল মাহমুদ)।

বাংলার লোকজ সংস্কারে কাকের ডাক অমঙ্গলের স্মারক, অশুভত্বের প্রতীক―বিশেষত ভরদুপুরের নির্জনতায় কাকের কর্কশ স্বর যেন অশনি সংকেত, যমদূতের বার্তাবহ। চিত্রকলায় জয়নুলি কাক দুর্ভিক্ষের প্রতীক, নিরন্নকালের মৃত্যুদূত! কাক বিচিত্র চিত্রকল্পে উপস্থাপিত বাংলা গানে ও কবিতায়। পৌরাণিক কৃষ্ণ যেমন কালো রঙের প্রতীক হিসেবে কথা ও কবিতায় এসেছে, তেমনই কাকও। কে শোনেনি হেমন্তের সেই পুরোনো গানটি : কাক কালো কোকিল কালো, কালো মাথার চুল…। কিংবা সেই লোকসঙ্গীত : কাউয়ায় ধান খাইল রে/ খেদানের মানুষ নাই। খাওনের বেলায় আছে মানুষ/ কামের বেলায় নাই।

নিন্দুকেরা অবশ্য বাংলার কবিদের নিয়ে অনেক ঠাট্টা-মশকরা করেছেন। বাঙালিমাত্রই কবিস্বভাবের। তারা আবেগপ্রবণ, ভাবুক এবং বাউল চরিত্রের। তাই বাংলায় কাক যেমন অসংখ্য, অতিপ্রজ ও সহজলভ্য তেমনই এ দেশে কবিও অগণন―কেউ কেউ নয়, যেন সকলেই কবি। সেজন্য ঠাট্টাচ্ছলে নিন্দুকেরা ছড়া কেটে বলেন :

‘কাব্য পচেছে কুষ্ঠ রোগেতে, কবিতা হয়েছে বাসি

বাংলাদেশে কাকের চাইতে কবির সংখ্যা বেশি।’

এসব নিশ্চয়ই হিংসুটেদের নিন্দাবচন। তারাও কিন্তু এসব কুবচন কবিতার মাধ্যমেই প্রকাশ করেন। তবে বাংলা কবিতায় কাকপাখি অপাঙ্ক্তেয় নয়। বাংলা কাব্যসাম্রাজ্যের সিংহভাগ জুড়ে আছে বনবিটপী, পুষ্পপত্র ও পাখ-পাখালির মেলা। নিসর্গ-নান্দিকতার ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে কাকের সরব অস্তিত্ব―যেমন রবীন্দ্র-নজরুলে তেমনই জীবনানন্দে। অচেনা, অন্ত্যজ, অবহেলিত প্রকৃতির কাব্যরূপায়ণে জীবনানন্দ যেন এককাঠি সরেস। যেমন স্মৃতিচারণ এবং পর্যবেক্ষণমূলক গদ্যে তেমন আধুনিক বাংলা কবিতায়ও কাকের প্রসঙ্গ উল্লেখযোগ্য। খ্যাতিমান কবিদের রচনা থেকে কয়েকটি বিচিত চরণ :

* কাক বলে অন্য কাজ নাহি পেলে খুঁজি,

বসন্তের চাটুগান শুরু হল বুঝি!

গান বন্ধ করি পিক উঁকি মারি কয়,

তুমি কোথা থেকে এলে ওগো মহাশয় ?

আমি কাক স্পষ্টভাষী, কাক ডাকি বলে।

পিক কয়, তুমি ধন্য, নমি পদতলে;

(কণিকা, রবীন্দ্রনাথ)।

* পাখিওয়ালা বলে, ‘এটা/কালোরঙ চন্দনা।’

পানুলাল হালদার/বলে, ‘আমি অন্ধ না―

কাক ওটা নিশ্চিত,/হরিনাম ঠোঁটে নাই।’

পাখিওয়ালা বলে, ‘বুলি/ভালো করে ফোটে নাই―

পারে না বলিতে বাবা,/কাকা নামে বন্দনা।’

(কবিতা : ৮, খাপছাড়া, রবীন্দ্রনাথ)।

বিশেষজ্ঞদের গবেষণা থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথের ৫৬টি কাব্যগ্রন্থের মধ্যে পাখিবিষয়ক কবিতা আছে ৩০টি এবং বিচ্ছিন্ন পঙ্ক্তি আছে ৮০৩টি। এর মধ্যে তিনটি কাকবিষয়ক কবিতার আংশিক আমরা উল্লেখ করেছি। এসব উদ্ধৃতিতে কাকের প্রতি ভালোবাসা যেমন বিধৃত হয়েছে, তেমনই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও নিরূপিত। খাপছাড়া কাব্যের কবিতাটিতে আছে পাখিওয়ালার প্রতারণা ও হাস্যরসের আবহ। বায়সের মতো কুলমানহীন পাখির প্রতি রবীন্দ্রনাথের বদান্যতা আমাদের বিমোহিত করে।

পাঁচ

রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ। তাঁর অনেক কবিতায় আছে পথে-প্রান্তরে ফুটে-থাকা অবহেলিত নাম-না-জানা অসংখ্য বনজ ফুল এবং গ্রামবাংলার ছোট-বড় বুনো পাখিদের ওড়াউড়ি ও কলকাকলি। সম্ভ্রান্ত সুগায়ক গৃহপালিত পাখি ও সুদর্শন অভিজাত পাখি―ময়না-টিয়া-ময়ূর ইত্যাদি―অনেক কবির বর্ণনায় মিলে। কিন্তু জীবনানন্দের কবিতায় ফুল ও পাখির জগৎ সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। তাঁর কবিতায় ফুলের রং-সৌরভ এবং পাখির দৃশ্যপট ও কূজন সম্পূর্ণ লোকবাংলার সহজিয়া গন্ধমাখা। এই অনাস্বাদিত ও স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত পাখি-পরিবারে সগর্বে মাথা উঁচু করে আছে কাক, শকুন, পেঁচার মতো অন্ত্যজ শ্রেণির পাখিরা। কালো, অসুন্দর ও কর্কশকণ্ঠী পক্ষীকুলই যেন কবিকে আকর্ষণ করেছে বেশি। কবির পাখির সমুদ্রে ডুব দিয়ে জনৈক গবেষক জানিয়েছেন, তাঁর বিভিন্ন কবিতায় আট বার কাকের উল্লেখ আছে। কয়েকটি উদ্ধৃতি :

* আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে―এই বাংলায়

হয়তো মানুষ নয়―হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে;

হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে

(আবার আসিব ফিরে)।

* সন্ধ্যার কাকের মতো আকাক্সক্ষায় আমরা ফিরেছি যারা ঘরে;

শিশুর মুখের গন্ধ, ঘাস, রোদ, মাছরাঙা, নক্ষত্র, আকাশ

আমরা পেয়েছি যারা ঘুরে ফিরে ইহাদের চিহ্ন বারোমাস;

…রৌদ্র নিভে গেলে পাখি পাখালির ডাক

শুনিনি কি ? প্রান্তরের কুয়াশায় দেখিনি কি উড়ে গেছে কাক!

(মৃত্যুর আগে)।

* উঠানের পায়রা শালিক কাক উড়ে-উড়ে বলে :

‘এত দিন নক্ষত্রের তলে রৌদ্রের আকাশে

তোমরা তো ছিলে এই খোড়ো-ঘরে আমাদের পাশে

…’

গৃহবলিভুক পাখি উড়ে বলে, ‘তোমরা কোথায় যাও সত্যি বলতো’

(উঠানের পায়রা শালিক)।

‘আবহমান বাংলা ও বাঙালি’কে উৎসর্গিত কবির রূপসী বাংলা কাব্যের শিরোনামহীন সনেটগুচ্ছে সবচেয়ে বেশি এসেছে কাকের প্রসঙ্গ। কয়েকটি উদ্ধৃতি :

* সন্ধ্যায় যে দাঁড়কাক উড়ে যায় তালবনে―মুখে দুটো খড়

  নিয়ে যায়―(১২ নম্বর সনেট, রচনাবলি, পঞ্চম খণ্ড, ঐতিহ্য)

* আসন্ন সন্ধ্যার কাক―করুণ কাকের দল খোড়ো নীড় খুঁজি

  উড়ে যাবে―(২০ নম্বর সনেট, ঐ)

* সকালে কাকের ডাকে আলো আসে, চেয়ে দেখি কালো দাঁড়কাক

   … করুণ কাকের ডাক

   শুনিয়াছে―সে কত শতাব্দী আগে ডেকেছিল তাহারা যখন।

   (২৯ নম্বর সনেট, ঐ)

* এসেছে সন্ধ্যার কাক ঘরে ফিরে;―দাঁড়িয়ে রয়েছে জীর্ণ মঠ

   (৩৬ নম্বর সনেট, ঐ)

*… একদল দাঁড়কাক ম্লান গুঞ্জরণে

  নাটার মতন রাঙা মেঘ নিংড়ায়ে নিয়ে সন্ধ্যার আকাশ

   দু মুহূর্তে ভ’রে রাখে―… (৩৮ নম্বর সনেট, ঐ)

* আকাশে কমলা রং ফুটে ওঠে সন্ধ্যায়―কাকগুলো নীল মনে হয়;

   (৪৭ নম্বর সনেট, ঐ)

*…  দাঁড়কাক অশ্বত্থের নীড়ের ভিতর

   পাখনার শব্দ করে অবিরাম;… (৪৮ নম্বর সনেট, ঐ)

*… ঠোঁট-ভাঙা দাঁড়কাক ঐ বেলগাছটির তলে

   রোজ ভোরে দেখা দিত―অন্যসব কাক আর শালিকের হৃষ্ট কোলাহলে/তারে আর দেখি নাকো―(৫৫ নম্বর সনেট, ঐ)

* যখন মেঘের রঙে পথহারা দাঁড়কাক পেয়েছে গো ঘরের সন্ধান,

   (৫৭ নম্বর সনেট, ঐ)

* কবেকার মৃত কাক : পৃথিবীর পথে সে তো নাই আজ আর…

  পৃথিবীও নাই আর―দাঁড়কাক একা একা সারা রাত জাগে;

   (৫৯ নম্বর সনেট, ঐ)

জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থের ২৫ নম্বর সনেটটির শিরোনাম ‘দাঁড়কাক’। এই সনেটে কবি পাতিকাক ও দাঁড়কাকের মধ্যে আত্মবোধের আলোকে তুলনা করেছেন। এই দুই প্রজাতির কাকের মধ্যে দাঁড়কাকের প্রতি জীবনানন্দের মমত্ববোধ প্রকাশ পেয়েছে। কবি সনেটের অষ্টক পর্বে লিখেছেন :

খুঁজে তারে মর মিছে―পাড়াগাঁর পথে তারে পাবে নাকো আর;

রয়েছে অনেক কাক এ উঠানে―তবু সেই ক্লান্ত দাঁড়কাক

নাই আর―অনেক বছর আগে আমে জামে হৃষ্ট এক ঝাঁক

দাঁড়কাক দেখা যেত দিন রাত―সে আমার ছেলেবেলাকার

কবেকার কথা সব; আসিবে না পৃথিবীতে সেদিন আবার;

রাত না ফুরাতে সে যে কদমের ডাল থেকে দিয়ে যেত ডাক―

এখনও কাকের শব্দে অন্ধকার ভোরে আমি বিমনা, অবাক

তার কথা ভাবী শুধু; এতদিনে কোথায় সে ? কী যে হল তার,

―তারপর ষষ্ঠকের শেষ দু-পঙ্ক্তিতে কবি লিখেছেন :

―অসংখ্য কাকের শব্দে ভরিছে আকাশ

ভোর রাতে―নবান্নের ভোরে আজ বুকে যেন কিসের আঘাত।

শৈশবের স্মৃতিকাতরতায় মগ্ন কবি মধ্যবয়সে এসে লক্ষ করেছেন, শান্ত ও ধীরস্থির স্বভাবের দাঁড়কাক দ্রুত বিলুপ্তির পথে। তাকে আর সচরাচর দেখা যায় না কদমের ডালে, গৃহস্থের ঘরের চালায় বা গৃহাঙ্গনে। শোনা যায় না তার গুরুগম্ভীর কণ্ঠের ডাক। বিপরীতে কর্কশকণ্ঠী, ক্রূর ও চতুর পাতিকাকের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। লৌকিক বাঙালির পিঠে-উৎসব, নবান্ন বা পৌষপার্বণের দিনে অসংখ্য পাতিকাকের ভিড়ে একটিও দাঁড়কাক না-দেখে কবির মন অজানা আঘাতের যন্ত্রণায় কাতর। পাখির প্রতি ভালোবাসা জীবনানন্দ দাশের কবিতায় অবিসংবাদী―এমন কি কাতরতা আছে কর্কশ কালো দাঁড়কাকের প্রতিও। ভদ্র শান্ত দাঁড়কাকের বিলুপ্তি এবং ক্রুর স্বভাবের পাতিকাকের বৃদ্ধির মধ্যে কি কবি আমাদের সমাজের স্বরূপ প্রত্যক্ষ করেছেন ? নইলে তাঁর হৃদয়ে এত আঘাত ও দুঃখবোধ কেন ?

কেবল কবিতায় নয়; জীবনানন্দের মাল্যবান উপন্যাসেও আছে কাকের বিচরণ। শিল্পিত উপস্থাপনা ও গীতল বর্ণনায় কাক-প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন : ‘ফিকে কফির কোকোর মতো রঙের গলা ফুলিয়ে কত পাতিকাক উড়ে আসত খড়ের চালে, উঠোনে; শন শন করে উড়ে যেতো ঠাণ্ডা জলের ওপর দিয়ে ছুঁই ছুঁই করে কোনও নদীকে, কোনও দীঘিকে, জলের ভেতর ঝাপসা প্রতিফলিত হয়ে, শাঁ শাঁ করে কোথা থেকে উড়ে যেত কোথায়; সকালের কুয়াশার দিক থেকে দূর বিদিকের পানে উড়ে যেত সেই কাকগুলো পৃৃথিবীটাকেই টেনে বার করবার জন্যে, উজ্জ্বল সূর্যটাকে  সবাইকে পাইয়ে দেবার জন্যে। যারা কাক নয়, পাখি নয়, তাদের জন্যেও―ক্ব-ক্ব-ক্ব-ক্ব―যেমন শত চেতনার হাঁকডাক, শালিশি, নির্জনতা।’ একজন প্রকৃত কবির গদ্যে-উপন্যাসেও-যে কবিতার লাবণ্য রাসায়নিক জাদুমিশ্রণে নিহিত থাকে, এভাষা তারই সাক্ষ্য।

ছয়

মুক্তিযুদ্ধসহ একাধিক প্রসঙ্গে শামসুর রাহমানের কবিতায় কাকের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও প্রতীকী ব্যঞ্জনায় তিনি কাককে উপস্থাপন করেছেন :

* গ্রাম্যপথে পদচিহ্ন নেই। গোঠে গরু

নেই কোনো, রাখাল উধাও, রুক্ষ সরু

আল খাঁ-খাঁ, পথপার্শ্বে বৃক্ষেরা নির্বাক

নগ্ন রৌদ্র চতুর্দিকে, স্পন্দমান কাক শুধু কাক।

(কাক, শামসুর রাহমান)।

*… একদা প্রভাবশালী এই কাক খুব

সাধ করে কোকিল হতে চেয়েছিল,…

অথচ কাকের খাসলত আগের মতোই থাকে

নোংরা ঘাঁটে, আস্তাকুঁড়ে ঘোরে দিনরাত

ভীষণ কর্কশ ডাকে যথারীতি,…

(কাক-কাহিনী, শামসুর রাহমান)।

শামসুর রাহমানের ‘কাক’ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক অন্যতম একটি কবিতা। এতে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের কোনও প্রত্যক্ষ প্রতিভাস নেই। তবে কবিতায় যে নির্জনতা, নিস্তব্ধতা ও পশুপাখিহীন রৌদ্রদগ্ধ গ্রামের ভাষিক চিত্র অঙ্কিত হয়েছে তাতে মুক্তিযুদ্ধের সভ্যতা-বিধ্বংসী ভয়াবহতা বিধৃত হয়েছে। তাঁর ‘কাক ও কাহিনী’ কবিতায় আছে কাকের কুৎসিত জীবনাচরণ।

জসীমউদ্দীনের কবিতা ও কাহিনিকাব্যে বিচিত্র ব্যঞ্জনায় বর্ণিত হয়েছে শত প্রজাতির পাখি―ঘরোয়া পাখি, গেঁয়ো পাখি, বুনো পাখি। হাসি-আনন্দ, সুখ-দুঃখ ও প্রেম-বিরহ-বেদনার অনুষঙ্গী এইসব পাখি। উপমা-রূপক-উৎপ্রেক্ষা ও চিত্রকল্পের অনুষঙ্গে আছে কাক, কোকিল, ফিঙে, টুনটুনি, গাঙ-শালিক, ডাহুক, টিয়া, দাঁড়কাক, শকুন, বউ কথা কও, ঘুঘু, হুতুম, হাঁস, মুরগি, কবুতর, ময়ূর, বাবুই, গৃধিনী, কোড়া, পাপিয়া, কপোত―আরও কত নাম-না-জানা পাখি। ‘পল্লীকবি’ অভিধায় অভিষিক্ত জসীমউদ্দীন গেঁয়ো পাখপাখালিকে বড়ই আপন করে নিয়েছিলেন, এমনকি কাককেও। তাই তাঁর বিভিন্ন কবিতায় নিত্য ভিক্ষুকের মতো দ্বারে দণ্ডায়মান কাক উপমা-উৎপ্রেক্ষা ও রূপকে গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপিত হয়েছে। বনবনানী-ঘেরা গ্রামজীবনে বিচিত্রবিধ পাখির সমাবেশ থাকলেও কাক গৃহসংলগ্ন ও প্রতিদিনের জীবনযাপনের সঙ্গে যুক্ত। তাই জসীমউদ্দীনের কবিতায় কাক এসেছে অনিবার্যভাবে। দুটি উদ্ধৃতি :

* ছোট গাঁওখানি―ছোট নদী চলে তারি একপাশ দিয়া

কালো জল তার মাজিয়াছে কেবা কাকের চক্ষু নিয়া;

(নিমন্ত্রণ, ধানক্ষেত)।

* মামার দেশেতে পদ্মপুকুরে রঙিন ঝিনুক ভাসে,

সাদা দাঁড়কাক ঘুরিতেছে বনে কাউয়ার ঠুটীর আশে।

(সোজন বাদিয়ার ঘাট)।

আল মাহমুদের কাকবিষয়ক কবিতাদুটিও বেশ মনোযোগ আকর্ষী :

* হে আমার প্রিয়, পরম চতুর পাখি

তোর কণ্ঠেই শুনি সত্যের সুর,

এই উদ্দাম নগরের হাঁকাহাঁকি

আত্মায় তোর উত্তাল ভরপুর,

ওরে বিহঙ্গ ওরে বিহঙ্গ নীল

আহা, প্রেয়সীর ভুরুর মতন তুই।

চিবুকের পাশে যেন তার কালো তিল

তেমনি আকাশে উড়ন্ত দেখি ওই।

(কাক)

* শুধু গান ছাড়া বুদ্ধির নানা খেলা

শিখবে সে এই চালাক কাকের ভিড়ে,

পার হয়ে মহানগরীর অবহেলা

কণ্ঠ সাধবে প্রভাতের বুক চিরে।

(কাক ও কোকিল)

আল মাহমুদের ‘কাক’ কবিতাটি উপমা, প্রতীক, উৎপ্রেক্ষায় ঠাসা। তুচ্ছ পাখিটিকে তিনি বিভিন্ন কাব্যিক রূপকল্পে উচ্চমানে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ‘করুণ কালের কাক’ কবির প্রিয় পাখি। তার কণ্ঠে সত্যের সুর শুনেছেন। কৃষ্ণ কাকের রং যেন কবির প্রেয়সীর ভ্রƒর কিংবা চিবুক-প্রান্তের কালো তিলের মতো। কাককে ‘নগরের উত্তম নাগরিক’ বলে আখ্যা দিয়ে পাখায় ঠোঁট গুঁজে ঘুমন্ত কাককে তাঁর কবিকল্পনায় মনে হয়েছে ‘খোঁপা বাঁধা কুন্তল’। তাঁর কবিকল্পনা এমন আদিগন্ত-প্রসারী যে, কাকের চোখদুটি ‘যেন বিয়ারের ফোঁটা’ এবং ‘সাহসী কণ্ঠস্বর’ তাঁর কাছে ‘জীবন মনে হয় তরবারি’।

নির্মলেন্দু গুণ তাঁর ‘কাক’ কবিতায় ভিন্নতর জীবনবোধ তুলে ধরেছেন। নষ্ট ডিমের মতো নষ্ট জন্ম যেন এ যুগের মানুষের। জীবনের ভুল, ব্যর্থতা ও বিভ্রান্তি মানুষকে অমৃতের সন্তান থেকে কাকাধম করে তুলেছে। তাই কবির কথায় :

কাকের মুখে তুলে দিয়েছি নষ্ট ডিম,

এ নষ্ট জীবন আমি কার কাছে দেবো ?

বাসন্তী কোকিল হতে গিয়ে

আমি ভুল করে হয়ে গেছি কাক।

অথবা ছিলাম কাক, অপরাধে এই জন্মে

নষ্ট ডিমের মত হয়েছি মানুষ।

(গুগল থেকে প্রাপ্ত)।

সৈয়দ হায়দার লিখেছেন :

মহান আশ্চর্য লাগে, বিষণ্ন বিকেল হাই তোলে

খুঁজে পায় নীড় কাক চিল বিস্তৃত রাত্রির আগে।

(ঝুলন্ত আস্তানা, পক্ষী সংখ্যা, মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা)।

একুশ শতকের বাংলা কবিতার কারিগরেরাও কাকের প্রসঙ্গ চিত্রকল্পে ব্যবহার করেছেন। এঁদের মধ্যে আমিনুল ইসলাম অন্যতম। তাঁর  কবিতায় কাক এসেছে ভিন্নতর অনুষঙ্গে। দুটি উদ্ধৃতি :

* সৃষ্টিকুঞ্জ বৃক্ষশাখে বসেছে ময়ূর

হাজার শ্রাবণে তার ওঠে না পেখম

নাচতে পারে না শুনে জলের নূপুর

পুচ্ছটা নিজের নয়, এই তো কারণ।

(বোবা আকাশের নিচে, লীলাবতী ঘাট)।

* তালিকায় শীতের পাখিসহ ছোট বড়,

বাদামি-কালো বহু বহু পাখি।

সে-তালিকা পাহারা দিচ্ছে এক দাঁড়কাক,

তালিকায় নাম আছে তারও।

(পাখি সংকলন, জলচিঠি নীল স্বপ্নের দুয়ার)।

কাক বুনো পাখি নয়, আবার এককভাবে গ্রামীণ নয়, নাগরিকও নয়। গ্রাম-নগর মিলিয়ে কাকের বসবাস। তবে পক্ষী-বিশেষজ্ঞরা লক্ষ করেছেন, যেখানে বড় গাছ নেই সেখানে কাকের আবাস নেই। মানুষের বসতি আছে, বড়বড় গাছ আছে―তা গাঁ-গঞ্জ যা-ই হোক―সেখানেই কাকের বসবাস। অন্য পাখিদের মতো কাকের ভয়ডর কম। উচ্চ শব্দ ছাড়া সাধারণ তাড়ায় কাক যায় না―সামান্য সরে গিয়ে ফিরে-ফিরে আসে। তাই ছিনতাইয়ের লক্ষ্যবস্তু চোখের আড়াল না-হওয়া পর্যন্ত কাকেরা একাগ্রচিত্ত। হয়তো এ কারণেই ডাস্টবিন ও ভাগার-ঘাঁটা আবর্জনা-বিলাসী হলেও কাকের প্রতি রবীন্দ্রনাথ থেকে একালের কবিদের আকর্ষণের অন্ত নেই।

সাত

বাংলার লোকসাহিত্যের অন্যতম শাখা লোকগান, লোকছড়া ও প্রবাদ-প্রবচন। এসবের মধ্যে কাকের প্রসঙ্গ গ্রামীণ জীবনযাপনের অনুষঙ্গে অনায়াসে যুক্ত হয়েছে। সেকাল-একাল সর্বকালের শিশুতোষ ছড়ায় কাকের চিত্রকল্প ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। কাক বাঙালি-শিশুর প্রথম দেখা, প্রথম পরিচিত পাখি। তাই লোকছড়ায় পাই :

* খোকন খোকন ডাক পাড়ি/খোকন মোদের কার বাড়ি,

আয়রে খোকন ঘরে আয়/ দুধমাখা ভাত কাকে খায়।

* খোকন খোকন করে মায়/খোকন গেছে কাদের নায় ?

সাতটা কাকে দাঁড় বায়/খোকনরে তুই ঘরে আয়।

* কাগারে বগারে! কার কপালে খাও ?

আমার বাপ-ভাই গেছেন বাণিজ্যে, কোথায় দেখলে নাও ?

* অ আ কা কা ডালে বসে থাক্ গা

ইটি উটি খুঁটিনাটি যা পাস্ তা খা।

(গৃধ্ররাজ-বধপালা, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।

* নাচে খঞ্জনা বাটে মাঠে, আর কোকিল গাহে ডালে,

আর কিবা মনে করে কাক বসে আসি চালে।

(পাখির গান, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী)।

* কাক কালো, কোকিল কালো, কালো ফিঙের বেশ

তাহার অধিক কালো কন্যা, তোমার চিকন কেশ।

(লোকগান/ছড়া)।

কাউয়ায় ধান খাইলরে, খেদানের মানুষ নাই।

খাওনের বেলায় আছে মানুষ, কামের বেলায় নাই।

(লোকগান)।

* কেনারাম বেপারির ভৃত্য/বায়সের সাথে করে নৃত্য।

লোকে বলে, এইভাবে/কাকটার মাথা খাবে।

ঢং দেখে জ্বলে যায় পিত্ত।

(এডওয়ার্ড লিয়রের ননসেন্স লিমেরিকের অনুবাদ)।

প্রবাদ-প্রবচন যে কোনও ভাষার লোকসাহিত্যের অন্যতম সম্পদ। প্রাচীনকালের মানুষের সামাজিক জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং বস্তুনিষ্ঠ সত্যের সুসংবদ্ধ প্রকাশ থাকে প্রবাদ-প্রবচনে। এসবের সুনির্দিষ্ট রচয়িতা নেই। আবহমানকাল ধরে সংঘবদ্ধ মানুষই এর স্রষ্টা এবং তা প্রজন্মান্তরে বহমান। কাক নিয়েও বাংলা ভাষায় প্রচুর প্রবাদ-প্রবচন আছে। এর অর্থ ও প্রয়োগসহ কয়েকটি উদাহরণ :

* আশা করেছেন কাও/পাকলে খাবেন ডেও।

কাও―কাক, ডেও―ড্যাঁফল।

(সুদূর পরাহত আশা, যা ফলপ্রসূ হয় না।)

* কাক ও কোকিল একই বর্ণ/কিন্তু স্বরে ভিন্ন ভিন্ন।

(পোশাকে নয়; চরিত্র ও কর্মেই পরিচয়।)

* কাক খায় কাঁঠাল/বকের মুখে আঠা।

(নিজের অপরাধ অন্যের ওপর চাপানো।)

* কাক মরল ঝড়ে/পেঁচা বলে আমার শাপ লাগল হাড়ে হাড়ে। অথবা

ঝড়ে কাক মরল/ফকিরের কেরামতি বাড়ল।

(প্রবল বিপন্ন হলে দুর্বলের অমূলক আত্মপ্রসাদলাভ।)

* কাক সকলের মাংস খায়/কাকের মাংস কেউ খায় না।

(প্রতারক সবাইকে ঠকায় কিন্তু তাকে কেউ ঠকাতে পারে না।)

* কাক নিয়ে গেল কান/তার পেছনে ছুটে যান।

(মূলে খোঁজ না-নিয়ে অন্যের কথায় উত্তেজিত হওয়া।)

* কাকের ছা বকের ছা বা কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং।

(কুৎসিত বা কদর্য হাতের লেখা।)

* কাকের ডিমও সাদা হয়।

(বিদ্বানের সন্তানও গর্দভ হয়।)

* কাকের পিছে ফিঙে লাগা।

(কাউকে অবিরত উত্ত্যক্ত করার পরামর্শ।)

* কাক কাঁকুড় জ্ঞান না-থাকা।

(বস্তুর পার্থক্য না-বোঝা।)

* কাকের বাসায় কোকিলের ছা/জাত-স্বভাবে করে রা।

(কেউ নিজের স্বভাব বদলাতে পারে না।)

* কাকের মাংস কাকে খায় না।

(সমধর্মী বা সমশ্রেণির মানুষ পরস্পরের ক্ষতি করেন না।)

* পাকা আম দেখলে কাকে ঠোকরায়। অথবা

বেল পাকলে কাকের কী ?

(সুন্দরের প্রতি আকর্ষণ সবার। তাই না-পেলেও প্রাপ্তির চেষ্টা করে।)

* ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হয় না।

(টাকা থাকলে কোনও জিনিসের অভাব হয় না।)

* ময়না-টিয়া ছেড়ে দিয়ে খাঁচায় পোষে কাক।

(গুণীর অনাদর, গুণহীনের কদর।)

* ময়ূরপুচ্ছধারী কাক।

(নকলের স্থায়িত্ব কম। প্রতারক অবশেষে হাসির পাত্র হয়।)

* যেদেশে কাক নাই সেদেশে কি রাত পোহায় না ?

(তুচ্ছ বস্তুর অভাবে প্রকৃতির নিয়ম পরিবর্তন হয় না।)

* কাকের ঠোঁটে আপেল। বা সোনার দাঁড়ে কাক বসানো।

(বাঁদরের গলায় মুক্তোমালা বা অযোগ্যকে সুযোগ্য স্থানে বসানো।)

* কাকপক্ষী টের না-পাওয়া।

(সকলের অলক্ষ্যে চুপিসারে কাজ করা যাতে কেউ জানতে না-পারে।)

প্রবাদ-প্রবচন মানুষের ভাষার ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। মানুষের অভিজ্ঞতালব্ধ বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞানের সংক্ষিপ্ত ও নৈতিক বাক্যবন্ধই প্রবাদ-প্রবচন। এর মাধ্যমে চিরকালীন সমাজসত্য নির্মোহভাবে প্রকাশ পায়। যুগ-যুগান্তর ধরে প্রচলিত থাকলেও এর আবেদন কখনও ক্ষুণ্ন হয় না, রসহানিও ঘটে না। বাংলা ভাষার সমৃদ্ধির অন্যতম কুললক্ষণ এই প্রবাদ-প্রবচনের সম্ভার।

বহুবিধ সমাসবদ্ধ বা যমজ শব্দও সমৃদ্ধ বাংলা ভাষার আরেক পরিচয়বাহী অঞ্চল। ‘কাক’ শব্দটি পূর্বপদে যুক্ত হয়ে বেশকিছু শব্দ আছে বাংলা ভাষায়। চমকপ্রদ বিষয় হলো, সেই কাকসংশ্লিষ্ট শব্দগুলোর অর্থ বৈচিত্র্যমণ্ডিত। সেই শব্দগুলোর উদাহরণসহ অর্থ জেনে নেওয়া যাক :

* কাকতালীয় = কাক + তাল + ঈয়। কাক ডালে বসামাত্র তালের পতন।

যদিও কাকের ডালে বসা ও তালের পতনের মধ্যে কোনও সম্পর্ক নেই, তবু এর মধ্যে কার্যকারণ খোঁজার নামই কাকতালীয়।

(সে আসামাত্র কাকতালীয় বৃষ্টি নামল। বর্তমান লেখক)।

* কাকতাড়ুয়া = কাক ও অন্যান্য পাখিকে ভয় দেখানোর জন্য রাখা মানুষের প্রতিমূর্তি। (রেখেছি কাকতাড়ুয়া দিকে দিকে মনের জমিনে। শামসুর রাহমান)।

* কাক-জ্যোৎস্না = শেষরাতের ম্লান জ্যোৎস্না। যে-জ্যোৎস্নায় কাক ভোরের আলো ভেবে জেগে ওঠে। (প্রভাত ভাবিয়া কাক-জ্যোৎস্নায়/জাগিয়া যেমন পাখি গান গায়। নজরুলগীতি)।

* কাকজোছনা = কাক-জ্যোৎস্না > কাকজোছনা।

(কাকজোছনার সাদা কাফনে শরীর ঢেকে রেখে…। ফররুখ আহমদ)।

* কাকতলি = কক্ষতল, বগল।

(কাকতলি জাঁতি খুদ লুকায়্যা রাখিল। মালাধর বসু)।

* কাকতিন্দুক = কুঁচিলা, গাব।

* কাকনিদ্রা/কাকতন্দ্রা = কাকের মতো সতর্ক ঘুম, হালকা নিদ্রা।

(মায়ারূপা কাকনিদ্রা সদা দাশরথির নয়নযুগলে, দাশরথি রায়ের পাঁচালী)।

* কাকপক্ষ = মাথার দুই পাশে কাকের পাখার মতো চুল বা জুলপি।

(শুধু কারও মাথায় কাকপক্ষ অবশিষ্ট কারও মাথায় শুধু টিকি। প্রমথ চৌধুরী)।

* কাকপদ = উদ্ধার চিহ্ন (“ ”) বা লেখার মধ্যে পরিত্যক্ত স্থান বোঝানোর চিহ্ন (* * *)। (কাকপদ, আদ্যোত্তর, মধ্যোত্তর, অন্তোত্তর, বাক্যোত্তর। রবীন্দ্রনাথ)।

* কাকপুচ্ছ = কাকের পুচ্ছের মতো লেজ যার। কোকিল।

* কাকপুষ্ট = কাক কর্তৃক পালিত। কোকিল।

* কাকপেয় = কাক কর্তৃক পেয়।

* কাকবউ = স্ত্রী কাক, কাকী।

(নিবিড় জমাচ্ছে খড়কুটো, কাকবউ ডিম দেবে বলে। শামসুর রাহমান)।

* কাকবন্ধ্যা = কাক যেমন একবার ডিম দেয় ও বাচ্চা ফোটায় তেমনই যে নারীর একটি সন্তান হয় তাকে বলে কাকবন্ধ্যা, সকৃৎপ্রসবা বা সকৃতপ্রসূতিকা।

* কাকবলি = কাককে দেওয়া হয় যে অর্ঘ্য, পূজার উপকরণ বা নবান্নের অংশ।

(অগ্রে দিয়া কাকবলি, সবান্ধবে কুতূহলী, নূতন তণ্ডুল দেয় মুখে। ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর)।

* কাকভীরু = যে কাকের ভয় পায় বা পেচক।

* কাকভুষণ্ডী = পুরাণোক্ত তত্ত্বজ্ঞানী অমর কাক। তিনি ব্রাহ্মণ কিন্তু লোমশ মুনির শাপে কাক হন। রামভক্ত ছিলেন। পুরাণ-প্রসিদ্ধ এই কাক রামচন্দ্রের উচ্ছিষ্ট খেয়ে অমর হন। কাকভুষণ্ডী বহুকাল বেঁচে ছিল বলে দীর্ঘজীবী মানুষদের কাকভুষণ্ডী বলা হয়।

* কাকভূত = প্রেতমূর্তি।

* কাকমাচী = গুড়কাউলী বা গুড়কামাই গাছ।

* কাকযব = শাঁসহীন শস্য, চালশূন্য ধান, চিটা।

* কাকর = সর্বনাম পদ। কাহার, কার।

(গোবিন্দদাস তব দেখত সাচ।/কাকর অঙ্গনে কো পুন নাচ। গোবিন্দদাস পদাবলী, বৈষ্ণব সাহিত্য)।

* কাকরুত = শুভাশুভসূচক কাকের ডাক।

* কাকল = দ্রোণকাক, দাঁড়কাক, কণ্ঠমণি, গলগ্রন্থী, গলগণ্ড রোগ।

* কাকোল = দাঁড়কাক, গরল, কৃষ্ণবর্ণ বিষ।

* কাকা/ কা-কা = কাক, কাকের রব, ধ্বন্যাত্মক শব্দ। পিতার ছোট ভাই, খুড়া, চাচা। (কাক বলে কাকী লো হের দেখ রঙ্গ। মনসামঙ্গল, বিজয় গুপ্ত। কা-কা রবে চঞ্চু নড়ে, মিঠাই মাটিতে পড়ে। পদ্যপাঠ, প্রথম ভাগ)।

* কাকাণ্ড = কাকের ডিম, মাকড়াগাব, ঘোড়ানিম।

* কাকাক্ষী = কাকের চক্ষু।

* কাকচক্ষু = কাকের চোখের মতো স্বচ্ছ ও নির্মল।

(সে যেন গো কাকচক্ষু স্বচ্ছ দিঘিজল। রবীন্দ্রনাথ)।

* কাকশিশু = কাকের ছানা।

(কোকিলের নীড়ে কি রে রাখিলি গোপনে কাকশিশু। মাইকেল)।

* কাকচোখ = কাকচক্ষু > কাকচোখ।

(কাকচোখ জল পদ্মদিঘিতে কবে কোন রাঙা মেয়ে। জসীমউদ্দীন)।

* কাকাতুয়া = পক্ষীবিশেষ, তোতাপাখি। শুকবর্গের পাখি।

(ময়না শালিক টিয়া তোতা কাকাতুয়া। ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর)।

* কাকদন্তি = অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিমাণ।

(ছাগশাবক কাকদন্তির হিসাব পর্যন্ত মিলাইয়া দিতে পারে। রবীন্দ্রনাথ)।

* কাকরি = কাক + অরি। কাকের শত্রু। পেচক, উল্লুক।

* কাকলি/ কাকলী = অস্ফুট মধুর শব্দ, কলধ্বনি, ঐকতান।

(কি ছাড় তাহার কাছে কাকলী-লহরী মধুকালে ? মাইকেল মধুসূদন; কোকিল কেবলি অশ্রঅন্ত গাহিতেছিল―বিফল কাকলি। রবীন্দ্রনাথ)।

(মধুকরের মিনতি মানো, ডাকে বলি, বিহগ কাকলি। নজরুলগীতি)।

* কাকলী = কৃশ (বিশেষণ), কটিভূষণবিশেষ (বিশেষ্য)।

(শুকাইয়া হইয়াছে কন্যা চিকন কাকলী। পূর্ববঙ্গ গীতিকা)।

* কাকালীদ্রাক্ষা = কিশমিশ, শুকনো আঙুর।

* কাকালি = কটী, কোমর।

(কাকালি ডুবিল জলে আঁখি মেলি চাএ। মালাধর বসু)।

(বেথা কাকালি পাইল। মীনচেতন, ঢাকা সাহিত্য পরিষৎ)।

* কাকুবাণী = কাতর বচন, সবিনয় প্রার্থনা।

(পশুর রোদন শুনি নানাবিধ কাকুবাণী। মুকুন্দরাম চক্রবর্তী)।

(জোড়করে মহাবীর করে কাকুবাণী। বঙ্গসাহিত্য-পরিষদ্, কলকাতা)।

* কাকেক্ষু = ইক্ষুর মতো তৃণ, খাগড়া, কাশতৃণ।

* কাকোদর = কাকের মতো উদর, কুৎসিত পেট। গমনকালে উদর বাঁকা করে যায় বলে এই নাম। (পশে যদি কাকোদর গরুড়ের নীড়ে, ফিরে কি সে যায় কভু আপন বিবরে পামর! মেঘনাদবধ, মাইকেল মধুসূদন)।

* কাকছদ = খঞ্জন।

* কাকশীর্ষ = কাকের মতো শীর্ষ (মাথা) যার। বকফুল গাছ।

* কাকজঙ্ঘা = কাঁটাগুড়কাউলী গাছ।

* কাকজম্বু = কাকের মতো কালো রঙের জাম। জম্বু > জাম।

* কাকডুম্বুর = কালো ডুমুর।

* কাকধ্বজ = কাক চিহ্নিত ধ্বজ বা পতাকা।

(কাকধ্বজরথারূঢ়া ধূমের বরণ। ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর)।

* কাকনামা = কাকের আরোহণে গাছের ডাল নত হওয়া। বকফুল গাছ।

* কাকনাসা = বইচ্ গাছ। কাকের নাকের মতো কালো ফল বলে।

* কাকনুছ = ফারসি শব্দ। কিংবদন্তির পাখিবিশেষ।

(কাকনুছ পক্ষী যেন চিতা বিরচয়। আলাওল)।

* কাকফল = নিমগাছ, নিমফল।

* কাকমুদ্গ = ডাকপাখি।

* কাকমর্দ = মাকাল ফল।

* কাকমারি = এক ধরনের গাছ ও তার ফল। এর পাতা পানের মতো, ফল ছোট, ডিম্বাকার ও বিষাক্ত।

* কাকরুহা = কাক ও অন্যান্য পাখির দ্বারা আনা বীজ থেকে উৎপন্ন গাছ, পরগাছা।

কাকলা = সুগন্ধি দ্রব্য।

* কাকলাস/কাকলী = কৃশতনু, রোগা।

* কাকচর = নীচু চর। জলাশয় বা নদীর কাছাকাছি নীচু স্থল।

* কাকভোর/কাক-সকাল = অতি প্রত্যুষ, খুব সকাল, কাকডাকা ভোর।

(কাক-সকালে দুয়ার-খোলা নতুন বধূর ত্রস্ত-চলার মত। সিকান্দার আবু জাফর। সেই কাকভোরে বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষণ ঘুমোতে পারিনি আনন্দে। বুদ্ধদেব বসু)।

* কাকভেজা = সম্পূর্ণ ভেজা।

* কাকময় = অনেক কাকের অবস্থান যেখানে।

(অকস্মাৎ তাকাতেন কাকময় দেয়ালের দিকে। শামসুর রাহমান)।

* কাকস্নান = কাকের মতো স্বল্প জল গায়ে ছিটিয়ে স্নান।

(যেন শিবলিঙ্গের কাকস্নান হচ্ছে। জীবনানন্দ দাশ।)।

* তীর্থের কাক = অন্যের কাছ থেকে কিছু পাওয়ার আগ্রহে অপেক্ষাকারী ব্যক্তি। (তোমার প্রতীক্ষায় বসে আছি যেন তীর্থের কাক)।

* ঝড়োকাক = ঝড়ে বিধ্বস্ত কাকের মতো দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ।

(বন্যার্তরা ঝড়োকাকের মতো আশ্রয়-শিবিরে উঠেছে)।

ময়ূরপুচ্ছধারী কাক = নকল সাজসজ্জাকারী প্রতারক।

(ময়ূরপুচ্ছধারী কাকের চরিত্র যার তাকে বিশ্বাস কোরো না)!

আট

সংস্কৃত ভাষা থেকে আগত একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদের কথা না-লিখলে দায় থেকে যাবে―‘কা কস্য পরিবেদনা’। এই প্রবাদবাক্যটি দ্ব্যর্থবোধক। কারণ বিভিন্ন জনের লেখায় প্রবাদটির বানানভেদ লক্ষ করা যায় : কা কস্য/ কাকস্য; পরিবেদনা/ পরিদেবনা। বাংলা ভাষার বিভিন্ন অভিধানে অর্থভেদসহ দুটি রূপই লক্ষ করা যায়। তবে প্রবাদটির মূলে কাকের প্রসঙ্গ যুক্ত কি না, নিশ্চিত বলা যায় না। কারণ ‘কা কস্য’ অর্থ―‘কে কার’ আর ‘কাকস্য’ মানে ‘কাকের’। অন্যদিকে ‘পরিবেদনা’ (পরি + বিদ + অন + আ) অর্থ―দুঃখ, কষ্ট, অন্তর্জ্বালা, মর্মবেদনা। আর ‘পরিদেবনা’ মানে―বিলাপ, চীৎকৃত ক্রন্দন, বাচালতা, হায়-আফসোস। তাই ‘কা কস্য পরিবেদনা’ প্রবাদের অর্থ দাঁড়ায়―কে কার জন্য বেদনা অনুভব করে ? পক্ষান্তরে ‘কাকস্য পরিবেদনা’ মানে―কাকের কষ্ট বা বিলাপ।

প্রবাদটির মূলে দুটি সংস্কৃত শ্লোকের সন্ধান পাওয়া যায় :

* এক বৃক্ষসমারূঢ়া নানা পক্ষীবিহঙ্গমাঃ

প্রভাতে শো যাস্তি কা কস্য পরিবেদনা।

সরলার্থ : একই গাছে নানা পাখি রাত্রিযাপন করে সকালে উড়ে যায়। কিন্তু কার কী বেদনা কেউ জানে না।

* কস্য মাতা কস্য পিতা কস্য ভ্রাতা সহোদরঃ

কায়ে প্রাণে ন সম্বন্ধঃ কা কস্য পরিবেদনা।

সরলার্থ : মা-বাবা, সহোদর ভাই-বোন কে কার ? দেহের সঙ্গে যেখানে প্রাণের সম্পর্ক নেই সেখানে তারা কে কার বেদনা অনুভব করবে ?

বাংলা ভাষায় প্রবাদটির বিভিন্নার্থক প্রয়োগ :

* যার যখন হ’তেছে সাঙ্গ রঙ্গভূমির অভিনয়, কাকস্য পরিবেদনা…। (পাগলা ঝোরা, ললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়)।

* ক্ষণমাত্র পরিচয় কাকস্য পরিবেদনা। (রামমোহন রায়)।

ওর বিয়েটা দিয়ে দিতে পারলে কোনও কথাই থাকত না। কিন্তু কাকস্য পরিদেবনা! বলি বা কাকে! (রবীন্দ্রনাথ)।

* ম্যালেরিয়া, কলেরা, হর্-রকমের ব্যাধি-পীড়ায় লোক উজোড় হয়ে গেল, কিন্তু কা কস্য পরিবেদনা! (শ্রীকান্ত, তৃতীয় পর্ব, শরৎচন্দ্র)।

*… আমার মতো আমি―কা কস্য পরিবেদনা।

(পৌরাণিক শব্দের অর্থকথন ও বিবর্তন অভিধান। ড. মোহাম্মদ আমীন)।

বাংলা সাহিত্যের রম্যরসরাজ শিবরাম চক্রবর্তী। তিনি ‘কাকস্য পরিবেদনা’ প্রবাদটি তাঁর স্বভাবজাত কৌতুকপ্রিয়তার সঙ্গে অর্থের নবায়ন করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘কাকস্য’ মানে কাকের সঙ্গে, পরিবেদনার ‘পরি’ মানে পরি অর্থাৎ সুন্দর নারী, ‘বে’ মানে বিয়ে, ‘দনা’ মানে দেওয়া যাবে না। কেন না, কাক কালো, কুৎসিত এবং অসুন্দর। সব মিলিয়ে কুৎসিত কাকের সঙ্গে রূপবতী নারীর বিয়ে দেবে না!

সহায়ক গ্রন্থাবলি :

১)         বাঙ্গালা ভাষার অভিধান, প্রথম খণ্ড―জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, কলকাতা।

২)        বঙ্গীয় শব্দকোষ, প্রথম খণ্ড―হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লি।

৩)        বিবর্তনমূলক অভিধান, প্রথম খণ্ড―বাংলা একাডেমি।

৪)        ব্যবহারিক বাংলা অভিধান―বাংলা একাডেমি।

৫)        যথাশব্দ―মুহম্মদ হাবিবুর রহমান, বাংলা একাডেমি।

৬)        সমার্থশব্দকোষ―অশোক মুখোপাধ্যায়, কলকাতা।

৭)        বাগধারা অভিধান―অশোক মুখোপাধ্যায়, কলকাতা।

৮)        নজরুল শব্দকোষ―বাংলা একাডেমি।

৯)        নজরুল-শব্দপঞ্জি―হাকিম আরিফ।

১০)      বাংলার শব্দকথা―ডা. নৃপেন ভৌমিক।

১১)       বাংলাপিডিয়া, দ্বিতীয় খণ্ড―এশিয়াটিক সোসাইটি।

১২)      পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ―আহমদ ছফা।

১৩)      মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা, পক্ষী সংখ্যা।

১৪)      রবীন্দ্র, জীবনানন্দ ও শরৎ রচনাবলির বিভিন্ন খণ্ড―ঐতিহ্য।

১৫)      মুক্তিযুদ্ধের বিচিত ছড়া ও কবিতা―মানবর্দ্ধন পাল ও জামিল ফোরকান সম্পাদিত।

১৬)      কবিতা সমগ্র―আমিনুল ইসলাম, অনন্যা।

১৭) পৌরাণিক শব্দের অর্থকথন ও বিবর্তন অভিধান―ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরি পাবলিকেশন্স।

১৮)      মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা, বৃক্ষ ও পরিবেশ সংখ্যা।

১৯)      জীবনানন্দ-দাশ রচনাবলি, পঞ্চম খণ্ড, ঐতিহ্য।

২০)      খাদ্য, কিন্তু আহার্য নয়―সিরাজ সালেকীন, কথাপ্রকাশ।

২১)      আন্তর্জালিক উইকিপিডিয়া।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button