Uncategorized

প্রবন্ধ : কবিতার স্বপ্ন এক কবির অধরা জীবন : নূর কামরুন নাহার

সবাই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।

এই কেউ কেউ কারা, তাদের জীবন কেমন, তাদের ভাবনাই বা কি, কেনই বা তারা কবি ? মাইকেল যখন বলেন―‘কে কবি―কবে কে মোরে ? ঘটকালি করি, শবদে শবদে দেয় বিয়া যেই জন’, শব্দের সাথে শব্দের মিলনেই কি তবে কবিতার জন্ম ? কিন্তু তারও আগে কোথায় থাকে কবিতা, কবিই বা কখন বুঝতে পারে সে হবে শব্দেরই চাষি। কবিতার জন্মেরও আগে কবির ভেতর কি ঘটে কোনো রসায়ন? সেটাই কি কবিতার ঘোর? বোধহয় কবিতার ঘোর জন্ম হয় কবি হবারও অনেক আগে, শৈশবের চোখে, কৈশোরের দিনযাপনে।

কবি আবিদ আজাদের কবিতার স্বপ্ন  একশত ছাব্বিশ পৃষ্ঠার এক নাতিদীর্ঘ আত্ম্নকথা এই বইয়ের শৈশব-কৈশোরের বর্ণনার মধ্যে ঢুকে আছে কবিতার গোপন আকিঞ্চন, কবি হবার ঘোর, স্বপ্ন, এক তরুণের মফসসল ছেড়ে রাজধানীতে আসা, জীবনের নিবিড়তম উপলব্ধি।

শুরুটাই হয়েছে এভাবে―

‘লিখত আশু, আশুতোষ ভৌমিক, আমার বাল্যবন্ধু। আর আমি পড়েছিলাম স্বপ্নে, কবিতার লাল চুলের কাচা স্বপ্নে। বলা চলে, প্রচণ্ড রহস্যকাতর অল্প বয়সের এক প্রচণ্ডতর কবিতার প্রেম আরেক অল্পবয়স্ক কবিকে আমার প্রতি ভীষণ বন্ধুবৎসল করে তুলেছিল। অন্যভাবে বললে বলা যায়, কবিতা তার অসম্ভব সুন্দর ও চালাক আঙুলের ইশারায় একবয়সী অনেক বালক থেকে নিষ্ঠুর কায়দায় আলাদা পথে ডেকে নিয়ে যাচ্ছিলো দুটি বালককে।’   

এ আলাদা পথই মূলত কবির পথ।

রবার্ট ফ্রস্ট যেমন তাঁর The Road Not Taken কবিতায় বলেছেন―

‘Two roads diverged in a wood, and I―

I took the one less traveled by,

And that has made all the difference..’

তেমনি এক অন্য পথে হাঁটছিল এক বালক, এক ক্লান্ত ও চিররুগ্ণ কিশোর, ‘আমি এঁকেবেঁকে চলে যাচ্ছিলাম চারদিকে। শেষমেষ পড়েছি কবিতার আসল খপ্পরে, দুরারোগ্য স্বপ্নে।

কবিতার স্বপ্নে উঁকি মারছিলাম আমিও একা।’

শৈশবের সেই মফসসল তখন কেমন ছিল সেই বালকের কাছে? সেটাও ছিল এক ঘোর, কিশোরগঞ্জের সবকিছুই উঁকি মেরে সে দেখছিল ঠিক সাধারণ চোখে নয়, এক কবিরই চোখে―

‘কিশোরগঞ্জ, ছোট্ট এক পূর্বাঞ্চলীয় টিনের দোচালা শহর, কুয়াশার মতো দীর্ঘ একটা আঙুলের আংটির মধ্যে বসানো একটা নীল পাথরের মতো স্বচ্ছ এক মফস্বল আমাকে আমার শৈশবের মধ্যে তার খোয়াওঠা রাস্তার লাল ধুলো আর ঘাসের ছোট ছোট মহান ফুলের নির্ভেজাল দাপটে ত্রস্ত করে ফেলতে থাকে। আর আমি, এক অকাল-নিঃসঙ্গ বালক পরিপার্শ্বের অবিরাম তুলকালাম ঘাসের ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকি ভোরের সুরঙ্গের ভিতর দিয়ে দুপুর পার হয়ে সন্ধ্যা ও রাত্রির ঘুম ও স্বপ্নের একাকিত্বে।’

আঙ্গুলের আংটির ভেতর বসানো নীল পাথরের মতেদা স্বচ্ছ এই এক মফসসলই আবিদ আজাদ ভালোবাসা। শিরায় শিরায় ধারণ করেছিলেন এর সবটুকু―এ শহরের ধূলি, গাছপালা, ফুল, জীবনের শব্দ, নিঃসঙ্গ ভাবনা।

‘কিশোরগঞ্জের কপালে বুঝি কুয়াশার ঝাপসা গাছপালার সিঁথির ফাঁকে শীতের খড়ি ওঠা রৌদ্র ও গোধূলির গুঁড়ো একটু বেশিই জুটত।’

‘শ্লথ দুপুরগুলিই ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয়। এই সময় রাস্তার উচ্ছন্ন ধুলো ভিজিয়ে শান্ত করে দিতে আসত মিউনিসিপ্যালিটির মহিষটানা ঝর্নাগাড়ি। ‘ঝর্নাগাড়ি’ নামটা আমার দেয়া।’

‘সন্ধ্যার ঠিক আগেভাগে একজন বুড়ো এসে জ্বেলে দিত এইসব বাতি। তার সঙ্গে থাকত টিনভর্তি বরাদ্দকৃত কেরোসিন, চিমনি মোছার ন্যাকড়া আর বাঁশের ছোট্ট একটা মই। কালো কাঁধে সন্ধ্যা নিয়ে আসত সেই বুড়ো। রাস্তার খুঁটিবাতিগুলোর চিমনি মুছে বাতি জ্বেলে হারিয়ে যেত সন্ধ্যার গভীরে। তখন ঘরে ঘরে জ্বলে উঠত হারিকেন, তেনাতাগার সন্তের কুপি।’

‘মনে পড়ে, হারিকেনের আলোয় পড়তে বসে একেক দিন ঘুমের ঢলক নামত চোখে। নামতার মুখস্থ ঘরগুলি শ্যাওলায় পিছল ঘাটলার মতো পেরিয়ে যেত শৈশব।’

এরকম সকাল, দুপুর, সন্ধ্যার ভেতর এক কিশোর আর কিশোরকে সাথে নিয়ে ঘুরত, পড়ত কবিতা, ভেতরেও তাকে তাড়া করে ফিরতো কবিতা। কবিতা ঠিক কখন বসত গড়ে তার তার ভেতরে, কবিতার এই ভাঙচুর, এই আচ্ছন্নতা কখন নিজস্ব ভূমিতে গেঁথে নিতে থাকে এক স্বপ্নাতুর বালক তা যেন ঠিক করে বলাও যায় না। জীবনের সবটুকু কি এমন কুয়াশার বা রোদের সকাল, এমন মন্থর দুপুর, চিমনিওয়ালার কাঁধে নিয়ে আসা একা শান্ত সন্ধ্যা অথবা নামতা মুখস্থ করা এক বালকের চোখের ঘুম। জীবন কি এত নিস্তরঙ্গ হবার কোনও সুযোগ রাখে? জীবন তো সবসময়ই দেখায় নানা বর্ণ। তাই একটা যৌথ পরিবারে সবসময়ই থাকে ঝড়, যেমন জীবনেও থাকে রোদ, বৃষ্টি আর মেঘ।

‘তুফান এসে বাড়ির ভেতর আমাদের সংসারের খিড়কি-দরজাগুলিকেও একেকদিন সশব্দ করে তুলত। তখন প্রচণ্ড হৈচৈ হতো। দুমদাম শব্দে হাঁড়িপাতিলের যাতায়াত হচ্ছে, গ্লাস ভাঙছে, ঘরের ভেতর থেকে পাখপাখালির মতো উড়াল দিয়ে এসে উঠানে পড়ছে কাঁথা, বালিশ, তোষক, রাজাই, শাড়ি, মশারি, লুঙ্গি―আমি শব্দ পেতাম। এরকম মন-গুমরো করা তুফান মাঝে মাঝেই আমাদের বিশাল বাড়ির ভেতরে মানুষজনদের মধ্যে ঘূর্ণি তুলে দেউড়ি পার হয়ে চলে যেত প্রায়ই।’

এই ঝড়-তুফান একটা যৌথ পরিবারকে ছিন্ন করে দিয়েছিল। কোনও একদিন বিমাতার নানা গঞ্জনাকে আর সহ্য না করে সংসার থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসেছিল তার পিতা আর তখনই কিশোরগঞ্জের মফসসল শহর হয়েছিল তার বাল্যের শহর। যার পরতে পরতে এক বালক মিতালি পেতেছিল কবিতার সাথে। কিন্তু এই একটা শহরই নয়, তার কবিতার ভূমি আসলে তৈরি হচ্ছিলো আরও গভীর কোনও বিষয়ে।

‘সারা শৈশব আমি পেয়েছিলাম এই রকম সবিশেষ বিষণ্নতার পাঠ।’

তার বিষণ্নতার মূল উৎস মা, একটা যৌথ পরিবারের নানা জটিলতা, সম্পর্কগুলোর রহস্যময় মায়া ও অন্ধকার, একটা গ্রাম ও একটা মফসসল শহরের সহজ যোগাযোগ ও টানাপোড়েনের মধ্যে বেড়ে উঠা ফুফুর কোলে বসে ছড়া শোনা, সংসারের ধুলো না লাগা শিকেয় তোলা দাদুর পুথিগুলো, এক করুণ মেয়েলি  গীতের সুরের মিশেলে দাদুর পুথি পাঠ, সেই শিশুমনেই বুঝে ফেলা দাদা আর বাবার মধ্যকার সম্পর্কের করুণ সুতোর স্পর্শ, সবকিছুই এক কবিকে গড়ে তুলেছিল―

‘আমাদের সংসারের গভীর ভিতরকার মেঘলা গল্পগুলি হয়তো কখনোই আনন্দের ছিল না। ছিল একরোখা বিষণ্নতার―তবু সেই বিষণ্নতার মধ্যেও আমরা পেয়ে যেতাম একসাথে বসে শোনার অনিঃশেষ আনন্দের খোঁজ। সেই আনন্দ ও বিষণ্নতার বীজের ভিতর থেকেই তো নতুন পাতাসহ ফেটে বেরুতে থাকে মানুষের ব্যক্তিগত পুরাণের চারা। আর উশারায় বসে দেখতাম বৃষ্টি।’

‘দাদার গল্প, বাবার গল্প, দাদুর গল্প এইসব ছিন্নবিচ্ছিন্ন পারিবারিক গল্প শৈশবে সব শিশুর মনে যে মন-বিষ করা একটি আবহ তৈরি করে দেয় তার মূল্য প্রত্যেক মানুষের জীবনের এক অতুলনীয় ঐশ্বর্য।’

‘পুরনো কাঁঠাল কাঠের একটি চেয়ারের স্মৃতির কি অপরিসীম ক্ষমতা! এক শিশুর মনের নরম পদার্য় কত কিছুর ছায়া পড়ে রোদ পড়ে―সেই ছায়া সেই রোদ মুছেও যায়। সময় লাগে না। কিন্তু ক্ষয়িষ্ণু একটি চেয়ারের স্মৃতি কিছুতেই মোছে না।’

এই সংসারের জটিল আবর্ত, এর ভেতরের আলো-অন্ধকার, শোক-তাপ, উজ্জ্বলতা, আনন্দ, হাসি, খুঁড়ে চলা সম্পর্কগুলো সবকিছু নিয়েই কবিতার এক স্বপ্ন তৈরি হয়, মানবজমিনের চাষাবাদে পোক্ত হয় কবিতার ভূমি। এই যে মানবজমিনের চাষ এর ভেতরেই আবার সেই কবিতার স্বপ্নেরও চাষ।

‘সেই মানুষ, আমার পিতামহ, আবদুল মজিদ সরকার, তার ছিল কাঠাচারেক জমির বিলাস। আমার মনে হতো, স্বপ্নের চাষাবাদ করতেন তিনি।

‘আমি কি তাহলে মানুষের সেই স্বপ্নের ধারাবাহিক চাষাবাদের উত্তরাধিকারকেই কাঁধে তুলে নেবার জন্যে তৈরি হচ্ছিলাম ?’

‘কবিতা কি তবে সেই নিঃসঙ্গের উত্তরাধিকার ?’

হ্যাঁ, ভেতরে ভেতরে তৈরি হচ্ছিল এক কবি। সে যে কবিতার দিকেই হাঁটছে, কবিই যে সে হবে এর একটা বড় ঘোষণা বোধহয় নিজের ভেতর আগেই হয়ে যায়। কবিকে তো হতে হয় আত্মবিশ্বাসীও। যে জীবনানন্দ বলেছেন ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’, তিনিই তো আবার বলেন―

‘তার প্রতিভার কাছে কবিকে বিশ্বস্ত থাকতে হবে; হয়তো কোনো একদিন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতার সঙ্গে তার কবিতাবৃত্ত  প্রয়োজন হবে সমস্ত চরাচরের জীবের হৃদয়ে মৃত্যুহীন স্বর্ণগর্ভ ফসলের ক্ষেতে বুননের জন্যে।’

সেরকম একটা বুনন তো অর্হনিশ চলে কবির ভেতর। কবি তো আত্মবিশ্বাসী থাকে তার কবিতার ভূমির কাছে, কখনও তার সৃষ্টির দীর্ঘজীবিতা বা অমরত্ব নিয়েও। রবি ঠাকুর যেমন আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলেন―

‘আজি হতে শতবর্ষ পরে

তুমি পড়িছো বসে আমার কবিতাখানি/কৌতূহল ভরে।’

এরকম একটা আত্মবিশ্বাস আর গভীর এক পর্যবেক্ষণই তাকে কবিতার দিকে আরও নিবিড়ভাবে টেনে নিয়েছিল। সেই যে কিশোরগঞ্জের রেলগাড়ি, স্টেশন প্ল্যাটফর্ম, প্লাটফর্মের সামনের পুকুর এবং ইঞ্জিনের পাশের খুশকি ওড়া চুলের কিশোরীর হাফপ্যান্টের ফাঁকে উকি দেওয়া ঘা, ফুলতলির কালভার্টের নিচে খলবলিয়ে উঠা মাছ সব ঢুকে তার কবিতার স্বপ্নের ভেতর―

‘প্লাটফরমের সামনে বিশাল রেলপুকুর। সারা দিন সিল্কের থানকাপড়ের মতো আকাশ ভেসে থাকে সেই রেলপুকুরের জলে। রেল ইঞ্জিনের হোঁস-হোঁস কাশি। ওয়াক্ করে হঠাৎ ধোঁয়ার বমির তোড়। কয়লাখেকো স্টিম ইঞ্জিন যত খায় তত নষ্ট করে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে গুঁড়ো গুঁড়ো ঢেলা ঢেলা কয়লা। সেই কয়লা কুড়িয়ে কালো ধুলোয় বস্তাভরে বিক্রি করতে নিয়ে যায় বালক। খুশকি-ওড়া চুলে ইঞ্জিনের পাশে ঘুরঘুর করে কিশোরী। ময়লা হাফপ্যান্টের ফাঁকে উঁকি মারে ঊরুতের সুন্দর গোল পুরানো ঘায়ের দাগ।’

‘এক সকালবেলা, দেখেছিলাম, ফুলতলির কালভার্টের নিচে, বিল থেকে এসে আলোর স্রোতের মধ্যে ঝাঁকে ঝাঁকে লাফিয়ে পড়ছে মাছ। সেই মাছের ঝলকানির দৃশ্য কোনোদিন ভুলব না। জালভরা কাঁচা রোদ্দুর আর মাছের অপরূপ দাপাদাপির শব্দ শুনতাম আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।’

এই সব দেখা না-দেখার ভেতর সময় পরিপক্ক হচ্ছিল। তার ভালো লাগত স্কুলের নামে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়া। রেলব্রিজের নিচের পাথর বোঝাই মরা নরসুন্দা নদী, লাল-নীল-বেগুনি দলকচুরির ফুলের লেলিহান আগুন-চোখ এক শীতে পাওয়া লাল সিল্কের শার্ট এসবই জীবনের নানা সূক্ষ্ম সূক্ষ্মাতি উপকরণ। এসব কিছুর সাথেই আবার জড়িয়ে যায় এক কিশোরের যৌন চেতনাবোধ, সাবালক হয়ে ওঠা। নিজের সাথে নিজের খেলা। পাপ অথবা আনন্দের গড়িয়ে পড়া বোধ, এসব কিছুই তো কবিতা থেকে বিচ্যুতি নয় বরং কবির মধ্যে ছায়ার মতো মিশে থাকে এই সব মনো আর শরীরী বোধ।

‘প্রত্যেক কিশোরের জন্যই বোধ হয় তার যৌনচেতনা উন্মেষের প্রথম অভিজ্ঞতাগুলি অন্যরকম। নিজের মধ্যে নিজেকে খাটিয়ে আনন্দ লাভের এ এক অপূর্ব প্রাকৃতিক পদ্ধতি। বোধ হয় কোনো কিশোরকেই এ অতিব্যক্তিগত বিষয়টি শিখিয়ে দিতে হয় না। আবিষ্কারের ঝাঁকুনিটা মোটেও কম নয়। চোখ বুজে, কিংবা চোখ-না বুজে জগৎ সংসারের সবচেয়ে গোপন ও মোহনীয়া আকাক্সিক্ষতার অজস্রতাকে নিজস্ব শরীরের মধ্যে লুকানো অদৃশ্য মনোযন্ত্রে টেনে এনে তার সঙ্গে লিপ্ত হবার কৌশল রপ্ত করে নিয়েছি আমিও অচিরেই।’

‘নিজেকে ব্যবহারের মধ্যে এক ধরনের অক্লান্তির মজা আছে―আবার দুর্বিনীত অনুশোচনাও এ নিঃসঙ্গ খেলার আরেক অবধারিত দোসর―টের পাচ্ছি অবিলম্বে। টের পাই প্রতিবার। যখন, ঐ নিঃসঙ্গতম কাজে লিপ্ত হই―নিজের মধ্যে নিজে কুঁকড়েমুকড়ে যেতে যেতে আবার আগুনের জিহ্বার মতো দীর্ঘ হয়ে উঠতে উঠতে দেখি, শরীরের অগম্য আমন্ত্রণ বয়ঃসন্ধির আকাশে খুলে দিচ্ছে আকাশের ওপারের অনেক আকাশ, মেঘস্তরের ভিতরে বহুদূর মেঘের ঝাউপল্লি।’

আকাশের ওপারে যে আকাশ খুলে যায়, শরীরের গলিঘুপচিতে যে রহস্য ডাক দেয় তার ভেতর ঝাপ দেওয়া এক কিশোরের ভেতরে আবার ‘অল্প বয়সের একটি মেয়ের যৌন-কেলেংকারির সংবাদ ও তার নিশ্চুপ শাস্তির দাগ তামার পয়সার পোড়া দাগের মতো’ লেগে থাকে। এখানে আরও লেগে থাকে কবিতার প্রতি সম্মোহন, একটা সাহিত্য পত্রিকা পথিক বের করার স্বপ্ন, ডিক্লারেশন পাবার জন্য ঘুষের টাকা জোগাড়ে বোনের তেলতেলে খাসিটাকে চুরি করে বিক্রি করে দেওয়া, আবার ধরা পড়ে বাবার মার খাওয়া, প্রতারিত হওয়া, পত্রিকা আর কোনওদিন আলোর মুখ না দেখা, কবি জসীমউদ্দীনের সাথে ভোরের বাতাসে মাঠের আইল ধরে হেঁটে যাবার আনন্দ স্মৃতি, ‘কিশোরগঞ্জের সাহিত্য মজলিস ও কিশোরগঞ্জের সাহিত্য সংসদে’র সঙ্গে সম্পৃক্ততা। এ সবই মূলত জীবনের খণ্ডচিত্রের সাথে সৃষ্টির এক নিবিড় কোলাহল। ঠিক এসব কিছুর সাথেই আবার―

‘আমাদের কাঁচা ও লোভাতুর হাত থেকে হাতে ঘুরে বেড়াতে থাকে ছোট ছোট লাল মলাটের চটি বই। শ্রমজীবী মানুষের অনন্যোপায় মুক্তির কররেখা সাম্যবাদের অতিদূর নক্ষত্রের আগ্নেয় উদ্ধৃতিভরা সেসব চটি বই ক্রমে আলাদা করে ফেলতে থাকে আমাদের। প্রেমে-পড়ার মতো অবস্থা অনেকটা। কিশোর তার প্রথম প্রেমের কাছে যেমন অপরিণামদর্শী ও লাজুক, কবিতা ও মার্কসবাদী রাজনীতির চৈনিকপন্থার গোপনতার টানে আমি ও আশু তেমনি মন্ত্রপূত হয়ে পড়ি নিঃসঙ্কোচ ও নিঃশঙ্ক।’

কবিতার পাশে রাজনীতি, কবিতার স্বপ্নের সাথে মানুষের মুক্তির স্বপ্ন। এ এক অন্য কবিতা। শ্রমের আর মানুষের অধিকারের দাবি প্রতিষ্ঠার রক্তাক্ত কবিতা। এবং সেসময়ই আবার আধুনিক কবিতার জগতের অপ্রতিরোধ্য দুর্বার টান। জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ, উত্তরাধিকার এ দুটি বই ‘উন্মোষোমুখ যৌবনে প্রথম জানালা খুলে দেয়, কি এক অটল দুরভিসন্ধি’ নিয়ে কবিতার দিকে দুর্বোধ্য ইশারায় ডেকে নেয়। 

‘মনে হলো, কবিতা আমার মাতৃভূমি, আর আমি যেন সেই মানচিত্র খুঁজে খুঁজে প্রয়োজনীয় সংকেতগুলি একটু একটু বুঝতে পারছি।’

এভাবে কখন কবিতার জন্ম হয় একবারে ভেতরে, গহিন ভেতরে তা কি কবিও ঠিক নির্ধারণ করতে পারেন ? কবিতার জন্ম মুহূর্ত কোনটি ? এ এক অনাদি জিজ্ঞাসা, কুয়াশার মতো এক গভীর রহস্য। বুদ্ধদেব বসুও তাই বলেন 

‘কবিতার জন্মকথা সম্পূর্ণরূপে অনাবৃত হয় না কখনো, তার একটা অংশ চিরকাল গোপন থেকে যায় আর সেই অংশটাই আসল। কোনো কবিতা যেদিন উপ্ত হ’লো, তারপর থেকে কতকাল তার গর্ভবাস চলবে, এমনকি সেটি আদৌ কখনো ভূমিষ্ঠ হ’তে পারবে কিনা, এই মোটা হিশেবটাও কোনো বিজ্ঞান ক’ষে উঠতে পারে না, কবির নিজের পক্ষেও তা ধারণাতীত। (বুদ্ধদেব বসু)

কবিতার জন্মের এ রহস্যময়তা আজন্ম। কবিতার ঘোরও হচ্ছে আগুনের দিকে পতঙ্গের ঝাপ। জন্মের মুহূর্তের কোনও হিসেব নেই তবে সৃষ্টি মাত্র কেঁপে কেঁপে উঠা আর আরও আরও নতুন সৃষ্টির কম্পমান হৃদয়ের ধ্বনি শুনে যাওয়া। শক্তি চট্টোপাধ্যায় যাকে বলেছেন―

‘কবিগণেরও আছে দুর্গম, দুর্ভেদ্য, গূঢ়চিন্তা ও অভাবনীয় জটিলতা। আর আবিদ আজাদ যেন তখন খেলে যাচ্ছে সেই বালক বয়সের সেই ব্রিজে উঠে স্লিপার পার হবার খেলা।

‘একেকটা স্লিপারে পা রাখি আর মনে হয় একেকটা নতুন বিস্ময়ের স্লিপারে পা রেখে দাঁড়িয়েছি। পা কাঁপে, বুক টলমল করে আমার।’

আবিদের তরুণ বয়সটাও সেই সৃষ্টির উল্লাস আর উত্তাপে কম্পমান, অস্থির আর প্রতিনিয়ত খুড়ে চলার। এই কবিতার উত্তাল সময়েই আসে আবার ঊনসত্তরের অগ্নিমাখা উত্তাল দিন―

‘উনসত্তরের গণ-আন্দোলনে যখন কাঁপছে সারা বাংলাদেশ, কাঁপছে কিশোরগঞ্জও, তখন, আমরাও শরীরে সময়ের ভূমিকম্পের গন্ধ ও ঝাঁকুনি নিয়ে হয়ে গেছি উদয়াস্ত মিছিলের অনুসারী; আবার মিছিলের সারিতে দাঁড়িয়েই তিন বন্ধু মিলে কবিতার সপ্রতিভ আড়ালও সৃষ্টি করে নিতাম সহজেই।’

‘উত্তাল ঊনসত্তরের দিন আর রাতগুলো ছিল এমনি ঢেউয়ের মতো। আর আমি এবং আমরা যেন দীর্ঘ ও রুদ্ধশ্বাস সমুদ্রপার, অস্থির তীরভূমি। আমাদের ওপর এসে আছড়ে পড়েছে ঢেউয়ের পর ঢেউ। আমাদের ওপর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে চলে গেছে গর্জনশীল ঢেউয়ের মিছিল।’

‘সময়টা বড় দারুণভাবে মোড় নিচ্ছিলো। সেই মোচড়ের ঝাঁকুনিও প্রবল। গা-গতরে দুলুনি। দুলুনি আর অবসাদ। অবসাদ আর নিজের দিকে ঘুরে দাঁড়াবার টান। আমার মতো, বাংলাদেশের জীবনেও তখন সেই অদৃশ্য টানের হাঁসফাঁস। বাইরে ধূলি, মানুষ, স্লোগান, মিছিল, বারুদ, মৃত্যু, ঊনসত্তরের রক্ত, সব মিলিয়ে এক নিরবচ্ছিন্ন কোলাহল, আর ভিতরে-ভিতরে চূড়ান্ত একরোখার নিজের চরম একাকিত্বে জেগে-ওঠার এ-এক প্রচণ্ড সুসময়, এ-এক অকথ্য দুঃসময়।’

এই রকম একটা সময় পার করে জীবনের দিকে আবার ফিরতে হয়, ফিরতে হয় বাস্তবতার কাছে। আর কবিতার স্বপ্নটা ছেড়ে যায় না বরং রক্তে সুচ ফোটার মতো আরও স্বপ্ন ঢোকায়, মনকাটার ঝোপে কাটা ফুটে রক্ত বের হবার মতো আর যখন মন বলে―

‘আর কোনো উপায় নেই রেণু মিয়া, বুঝলে ? রক্তের ফোঁটাটা চুষে খেয়ে ফেলো এবার, কিংবা জিভে চেটে মুছে ফেলো। খাও, চেটে খাও, নিজের রক্ত চুষে খেয়েই মানুষ বাঁচে।’ 

মানুষ কি শুধু নিজের রক্ত চুষে খেয়ে বাঁচে, নাকি স্বপ্নই চুষে খায় মানুষকে অথবা স্বপ্নকে চুষে খেয়েই জীবনের দিকে বারবার পাল তোলা, পাল ছেঁড়া, পাল তোলা। তবে এরকম কবিতার স্বপ্ন নিয়েই মফসসল শহরকে পিছে ফেলে আবিদ আজাদ উঠে পড়েন ঢাকাগামী ট্রেনে। পিছনে পাতাবাহার ও কামিনীঝোপের ভিতর লাল বারান্দায় পাতা থাকে একটা লম্বা হাতলঅলা টুল, গাড়ি এগোয়, রেলব্রিজ পার হয় এক কিশোর, পার হয়ে যায় তার কৈশোর, ইস্টিশন মাস্টারের কোয়ার্টারভরা মোরগফুল, তারপর একসময় দেখে―

‘ইস্টিশনের শিশিরখচিত কাঁটাতার, কুয়াশা, ছিড়ে উঠছে সূর্য … … ধীরে ধীরে প্লাটফর্মে ঢুকছে ভোরের মেইলের মতো দিনগুলি, খুলে গেছে একটি গাড়ির দরজা। রৌদ্রোজ্জ্বল ব্যানার আর বেদনার ভিতর দিয়ে সারা রাত জার্নি করে আসা ঘুম-মলিন চোখ নিয়ে মাথা বের করে হাত নাড়ছেন রাজধানী থেকে আগত কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভানেত্রীর মতো ভোর, আরো একটি নতুন দিনের ভোর।’

আল মাহমুদের যেভাবে বেড়ে উঠি শেষ করতে করতে যেমন আমরা দেখতে পাই এমনি একটা দৃশ্য―ঢাকাগামী মেল ট্রেনটা তখন আউটার সিগন্যালের কাছে সিটি দিচ্ছে। যে ট্রেন আমাকে আত্মীয়তা ও মানুষের প্রতি নির্ভরতার শেষ স্টেশন থেকে চিরকালের জন্য তুলে নিয়ে নিরুদ্দেশের দিকে পাড়ি জমাল।

কবি হবার স্বপ্নই হয়তো আবিদকেও ডেকে নিয়েছিল মফসসল শহর থেকে বিশাল ঢাকায়―

‘১৯৭০ সাল। আমি পা রাখলাম এক স্তব্ধতা থেকে আরেক তপ্ত স্তব্ধতায়। কম্পমান একটা শিশিরের মতো এক ছোট্ট মফস্বল থেকে এসে পড়লাম মস্ত শহরে। এই ঢাকা শহর তখন আমার কাছে জরি-চুমকির মতো ঝলমলে কবিতার রাজধানী।’

[আমার কথা/কবিতা সমগ্র)

এক আত্মপ্রত্যয়ী কণ্ঠ আমরা পাই কবি আল মাহমুদের বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ গ্রন্থেও―

‘আমি কবি হবার জন্যই শহরে এসেছিলাম।’

কবিতার স্বপ্ন তাকে ঢাকায় এনেছিল অথবা জীবন আর জীবিকা নিয়ে এসেছিল কিন্তু সেই শহরকে আবিদ আজাদ কোনওদিন ভোলেননি। লিখেছেন কবিতা।

‘শুকনো হাওয়ায় মনে পড়ে নিউটাউন… নিউটাউন…/ঘুমের ভেতরে এখনো কিশোরগঞ্জ, গরুগাড়ি/সূর্যাস্ত পিছনে ফেলে যায় ফোঁসা, খড়, হাঁটবার/অনাথবাবুর বাড়ি, ভাঙাঘাট, দেয়াল…/দেয়াল…’

তার ভেতরে সবসময় এক মফসসল শহর জেগে থাকে, জেগে থাকে এক বালকের প্রতিবিম্ব।

‘একটা ছোট্ট শহর―এতদিন যে ছিল আমার কাছে নির্জন আঙুলের হালকা লাল-নীল বেগুনি-ফিরোজা ও কমলারঙের একটা পাথরঅলা গোল আংটির মতো কখন, ঘুমের ভিতর, তরতর করে বনভূমির মাথায় লাফিয়ে উঠে সেই আংটিটাই আজ আকাশে ভরা-পূর্ণিমার গোল চাঁদ হয়ে গেছে-কুয়াশায়।’

‘দেখি অনেক নিচে সাদা জল। টলমল করছে আর একটি বালক। সেই জলের ভেতরকার বালক, দেখতাম কেমন মন্ত্রমুগ্ধের মতো জলের নিস্তরঙ্গতার ভেতর থেকে একলা-একলা উঁকি মারছে।’

এই যে এত কিছু পার হওয়া, তারপরও মানুষের জীবনের আসল সংজ্ঞা কী ? কবিতাই বা কী ? ভেদ করা কি যায় সে রহস্য, কখন কবিতা আসে আর কখন কবিতা হয়ে ওঠে এই প্রশ্নেরও কি মীমাংসা মিলে। মিলে না। তবু এক কিশোর কবিতার স্বপ্নে পড়েছিল, সে ঢাকায় কবিতা নিয়ে এসেছিল। সে বেঁচেছিল কবিতারই স্বপ্নে। জীবনে যে কী পেয়েছিল, কবিতাকে বোধহয় পেয়েছিল। কবিতাকে সে ধরেছিল শক্তমুঠিতে কিন্তু জীবন ? না, জীবনকে যেন শক্ত মুঠিতে বাঁধতে পারেনি। কিছু অধরা স্বপ্ন নিয়ে যেন অনেকটা আগেই নিভেছিল জীবনের সলতে। তাই হয়তো সে নিজেই লিখেছিল― 

‘মানুষের জীবনের আকাশ এক ঘুটঘুট্টি ডাইনি। সেই ডাইনি সবই খায়। খায় জ্যোতির্ময় তারা। খর্খরে চাঁদের ধুলো ও চুন। খায় সব নাম।’

শুধু বেঁচে থাকে মানুষের কুয়াশাময় স্বপ্ন।

 লেখক : কবি ও কথাশিল্পী

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button