গল্প : একজন রজব আলি স্যার : হোসেন আবদুল মান্নান

কমপক্ষে তিরিশ বছর পরে নিজের কলেজ শিক্ষককে এমন কপর্দকশূন্য বিচ্ছিরি অবস্থায় দেখতে পেয়ে ফয়সল রীতিমতো অপ্রস্তুত হয়ে যায়। ভিড় ঠেলে খানিকটা এগিয়ে গিয়ে আধময়লা কাপড়চোপড়ে মোড়ানো শ্মশ্রুমণ্ডিত চেহারার এক অশীতিপর বৃদ্ধকে দেখতে পায় সে। এতদিন পরে হলেও তাকে দিব্যি চিনে ফেলল সরকারের পদস্থ চাকরিজীবী ও প্রাক্তন ছাত্র ফয়সল আরেফিন। কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মের ঠিক মাঝখানটায় কিছু মানুষ তাকে ঘিরে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। এমন নানা শ্রেণির যাত্রীর মধ্যে দুয়েকজন রজব আলি প্রফেসরের একসময়ের ছাত্রও যে ছিল এতে কোনও সন্দেহ নেই। রজব আলি বয়োবৃদ্ধ একজন অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষকের নাম। বয়সের ভারে এখন ন্যুব্জ। তার দেহের ভাঁজে ভাঁজে বার্ধক্যের ছাপ পড়ে গেছে। তবু চোখ থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছিল শিক্ষার দ্যুতিময়তা। তিনি ভরদুপুরে স্টেশনে দাঁড়িয়ে পথচারীর কাছে করুণ কণ্ঠে আর্থিক সাহায্য প্রার্থনা করছেন। সশব্দে ও প্রমিত স্বরে উচ্চারণ করছেন,
তার সন্তানরা মানুষ হয়নি, হয়েছে নেশাগ্রস্ত, অমানুষ। সব সহায়-সম্পদ বিনাশ করে বৃদ্ধ শিক্ষককে ঘরছাড়া করে দিয়েছে তারা।
এখন নিজের মাদকাসক্ত ছেলের হাতে লাঞ্চিত হয়ে ক্যানসার আক্রান্ত স্ত্রীকে নিয়ে স্রেফ পথে এসে উঠেছেন প্রবীণ রজব আলি স্যার।
ফয়সল তার স্মৃতির জানালায় দু চোখ মেলে ধরল, যতদূর পেছনে সে দেখতে পায়। জনান্তিকে দাঁড়িয়ে থেকে সে ভাবছিল, আশির দশকের সূচনালগ্নে এই কিশোরগঞ্জ মহকুমা শহরের বিখ্যাত কলেজটির সবচেয়ে স্মার্ট শিক্ষকের মধ্যে একজনের নাম ছিল রজব আলি। চলনে-বলনে, কথনে, পোশাক-পরিচ্ছদে তিনি ছিলেন একদম কেতাদুরস্ত, দশের মধ্যে আলাদা। মাথাভর্তি লম্বা চুলের বাহার, হাঁটার স্টাইল ছিল অনুকরণীয়। প্রবল ব্যক্তিত্ব আর কণ্ঠস্বরের বৈশিষ্ট্যের কারণে তাকে সহজে ছাত্ররা কোনও বিষয়ে এপ্রোচ করত না। যেন এড়িয়ে যাওয়াই অধিকতর নিরাপদ এবং স্বস্তিদায়ক। কিছু জানতে চেয়ে অপ্রত্যাশিত ভৎর্সনাকে আমন্ত্রণ জানাতে তখন কেউ সাহস করত না। আজ কেন তার এমন অধঃপতন, অসম্মান আর অমানবিক পরিণতি ?
দুই
নিজের পরিচয় না দিয়ে ফয়সল তার পকেট থেকে কিছু টাকা নিয়ে তুলে দিলেন স্যারের হাতে। টাকাটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে দু হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে পকেটে রাখলেন রজব আলি স্যার। ফয়সল বিস্মিত হয়ে দেখল, তিনি একজন পেশাদার ভিক্ষুকের মতন করে টাকা নিলেন। তবে কি অনেক দিন ধরে স্যার এ পথে নেমেছেন ? এটাই কি তার শেষ অবলম্বন ? জনতার ভেতর থেকে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে আচমকা ফয়সলের কাঁধে হাত রাখলেন। লোকটা ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে বলল, কী খবর বন্ধু, কেমন আছ ? আমি শহীদুল্লাহ, কলেজে তোমার সহপাঠী ছিলাম। মনে আছে একসঙ্গে ট্রেনে যাতায়াত করতাম। তখনকার দিনের আমাদের অনেক আনন্দদায়ক মধুর স্মৃতি আছে।
ফয়সল হতচকিত হয়ে উত্তর দেয়, হ্যাঁ মনে আছে, তুমি কেমন আছো, কি করছো ? বাসা কোথায় ?
গ্রামের একটা স্কুলে মাস্টারি করতে করতে এখন অবসরের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। শুনেছি তুমি সরকারের অনেক বড় পদে আছো। ইচ্ছে করেই যোগাযোগ করিনি। তাছাড়া তেমন প্রয়োজনও ছিল না।
না না এসো, গল্প করা যাবে। বন্ধু তো বন্ধুই। সে পুরাতন হয় না, বৃদ্ধও হয় না।
এই আমার ভিজিটিং কার্ড, রাখো। হেঁটে হেঁটে প্ল্যাটফর্ম ত্যাগ করার সময় শহীদুল্লাহ্ বলল,
শোনো বন্ধু, লক্ষ করলাম রজব আলি স্যারকে তুমি অনেকগুলি টাকা দিয়েছো। ভালো, একদিন দু’দিন দেওয়া যায়। কিন্তু প্রতিদিন নয়। আমরা বিগত দশ বছর ধরে নানাভাবে তাকে সহযোগিতা করে চলেছি। তিনি তখন শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ-সবল ছিলেন। আমরা একদল প্রাক্তন মিলে তাকে একটা প্রাইভেট চাকরিরও ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। সেলারিও ভালো ছিল। কিছুদিন পরে তিনি কাউকে কিছু না বলে চলে আসেন। তিনি দেখছেন, যে কোনও চাকরি-বাকরির চেয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে তার স্বাচ্ছন্দ্য বেশি। এটা এখন তার নিত্য-নৈমিত্তিক অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। তুমি হয়তো তা জানো না।
এখন তাকে এ পথ থেকে ফেরানোর উপায় কী ? প্রশ্ন করল ফয়সল।
না, মনে হয় না। এখন তার বয়স হয়ে গেছে। এটাই তার নেশা ও পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে স্থানীয় পরিচিত লোকজন তাকে আর সাহায্য করে না। প্রথম প্রথম দুহাত ভরে করত। এখন করে তোমার মতন নবাগত অতিথিরা। তারা ভাবে কতটা অসহায় হলে তিনি এই পথে নেমেছেন।
ফয়সল তার মুখের দিকে তাকিয়ে আশ্চর্যবোধক চাহনিতে জিজ্ঞেস করল, বলো কী ? তিনি যে সন্তানদের কথা বললেন, নেশাগ্রস্ত হয়ে ইত্যাদি ইত্যাদি ?
সব ঠিক আছে। ছেলেরা এখন পৃথকভাবে এটা-ওটা করে চলেছে। তবে তার সাথে নেই। স্ত্রী ক্যান্সার সারভাইভার সবই ঠিক আছে। কিন্তু তিনি তো একটি ঐতিহ্যবাহী সরকারি কলেজ থেকে রিটায়ার্ড হয়ে আমৃত্যু এমনটা করতে পারেন না। এটা আমাদের প্রচলিত সমাজের সঙ্গে যায় না। শিক্ষক কমিউনিটিও তার ওপর যারপরনাই ক্ষিপ্ত ও হতাশ। কাজেই সে আর ফিরবে বলে মনে হয় না। বরঞ্চ হাত পাতার কলঙ্কজনক অধ্যায় ধরেই হয়তো তার জীবনাবসান হবে। সমাজের কাছে প্রফেসর নয়, ভিক্ষুক রজব আলি হিসেবেই তিনি বেঁচে থাকবেন। এটাই বোধকরি তার আল্টিমেট নিয়তি।
ফয়সল হতাশ ও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে কলেজের পুরোনো বন্ধু শহীদুল্লাহর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তার গন্তব্যের দিকে পা বাড়ালো।
তিন
অনেক দিন পরে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ফয়সল আরেফিন তার নিজের জেলাশহরে এসেছে। কিশোরগঞ্জ তার স্মৃতির শহর, প্রীতির জনপদ। নরসুন্দার দুই তীরের গলিপথ তার আজন্মের চেনা। শৈশব-কৈশোর থেকে কলেজজীবন অবধি নিরন্তর গীতিময় ভাবনার আরেক নাম এ শহর। ফয়সল এখন ঢাকার সচিবালয়ে কর্মরত এক সরকারি কর্মকর্তা। মূলত বড় বোনকে দেখার জন্যই তার আগমন। স্টেশনের সন্নিকটেই তাদের বাসা। আজ সকাল থেকেই ভ্যাপসা গরমের মধ্যে আকাশজুড়ে যেন রৌদ্র ছায়ার খেলা চলছে। একটা অটোরিকশা নিয়ে বোনের বাসার দিকে যাচ্ছে সে। ট্রেনে আসবে বলেই এবার তার ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে আসা হয়নি। তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে প্রায়। চারদিকটা হঠাৎ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে আসছে। দমকা হাওয়ার সঙ্গে একপশলা বৃষ্টিও হয়ে গেল। মধ্য-বৈশাখের অসহ্য খরতাপ যেন নিমিষেই জল হয়ে গেল। স্বস্তির ঠান্ডা হাওয়ায় জনজীবনে প্রাণ ফিরে এসেছে। প্রকৃতির লীলা বোঝা দায়।
ফয়সল তার বন্ধু শহীদুল্লাহর কথাগুলো নিয়েই ভাবছিল। সে বিশ্বাস করতে পারছে না, এটা কেমন করে হয়, একজীবনে একজন উচ্চ শিক্ষিত মানুষ কতটা নিম্নগামী হতে পারে ? কতটা বেশরম অসামাজিক হতে পারে ? আজ রেলস্টেশনে রজব আলি স্যারকে না দেখলে তা হয়তো বোঝা যেত না। তার মাথায় রজব আলির টাকা চাওয়ার কৌশলটি সারাক্ষণ ঘুরপাক খাচ্ছিলো। ভাবছিল, মানুষ কি তার অতীত ভুলে যায় ? মানুষের নিঃস্বতা, দীনতা-হীনতারও একটা শেষ আছে।
চার
ফয়সল আরেফিন তার ফেলে আসা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্মৃতি হাতড়ে বেড়াতে গিয়ে রজব আলি স্যারের কথা আরও একবার মনে করল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে ক্লাসরুমে তার কিঞ্চিৎ অহংকারী এবং আত্মাভিমানী বক্তব্যের কথাও স্মরণ করে চলেছে। মনে পড়ছে, আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে মে-জুন মাসের কোনও এক ঝলমলে রৌদ্রময় সকালের কথা। রজব আলি স্যার সূর্য সেন হল থেকে বেরিয়ে ডানে মোড় নিয়ে ধীর ও প্রশান্ত ভঙ্গিতে রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের দিকে আসছিলেন। তখন রাস্তার দু পাশে সারিবদ্ধ কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালে ডালে যেন আগুনের তৈরি ফুল ফুটে ছিল। গোটা পথেই কৃষ্ণচূড়ার ছোট ছোট পাতার বিচিত্র এক গালিচা বিছানো ছিল। আহা, কী কাকতালীয় মুহূর্ত! ঠিক একই সময়ে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ফয়সল আরেফিন তার আবাসিক ঠিকানা হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হল থেকে কলা ভবনের দিকে যাচ্ছিল। আচমকা স্যারকে দেখতে পেয়ে পেছন থেকে এক দৌড়ে গিয়ে তাকে অবনত মস্তকে সালাম এবং পরিচয় দেয় সে। ফয়সল এক নিঃশ্বাসে তার নিজের বিভাগের প্রবীণ শিক্ষকদের কথা জানায়। মনে আছে, সেদিন তিনি সূর্য সেন হলে পরিচিত কারও কক্ষে রাত্রিযাপন করেছিলেন।
সকাল বেলায় সেই পরিপাটি চুল, হাতে ছোট্ট একটা ব্যাগ, স্মার্ট ড্রেসআপ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ও স্বনামধন্য লেখক, কলামিস্ট সৈয়দ বদরুদ্দীন হোসাইনের কক্ষে প্রবেশ করলেন রজব আলি স্যার। দরজার কাছাকাছি গিয়েও ফয়সল আরেফিনের সঙ্গে তার সামান্য আলাপচারিতা যেন শত আশীর্বাদ ও মুগ্ধতাভরা ছিল। এ মুহূর্তে ফয়সল বারবার মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করে চলেছে, সেদিনের সেই পৌরুষদীপ্ত কান্তিময় মুখশ্রীর রজব আলি স্যার কি আজকের লাঠি হাতে ফ্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আর্থিক সাহায্য চাওয়া সে-ই মানুষটি ? এসবের কোনও কূল-কিনারা করতে পারছিল না সে। তার কেমন যেন অস্বস্তিবোধ হচ্ছিল, মাথায় ভোঁ ভোঁ আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল। তাহলে জীবন কি অন্ধকার পথের অজানা সফরের আরেক নাম ?
পাঁচ
গত রাতটা নির্ঘুম কাটায় ফয়সল। তার চোখের আলোয় নিরন্তর খেলা করেছে রজব আলি স্যারের সেই মুখমণ্ডল, কালো গাঢ় চোখ, ভারী কণ্ঠস্বর আর পরিচ্ছন্ন পোশাক-পরিচ্ছদ। কলেজ ক্যাম্পাসের সবুজ ঘাসের মাঝখান দিয়ে ইটের চিকন রাস্তা ধরে তার গুরুগম্ভীর শব্দচয়নে হেঁটে যাওয়ার স্পষ্ট ছায়া দেখেছে সে। পরদিন অপরাহ্নে বোনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঢাকা ফিরে আসার প্রাক্কালে ফয়সল রজব আলি স্যারের পুরোনো উকিল পাড়াস্থ বাসার গলিতে গিয়ে দাঁড়ায়। তখন স্থানটিকে শুনসান নীরব মনে হচ্ছিল। পুকুরের পাড় বরাবর একটু এগোতেই দুটো বেওয়ারিশ কুকুর ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে আসতে দেখে সে ভয়ে পিছু হটে। সে বড় রাস্তায় ওঠে এদিক-ওদিক তাকায়। একটু পরেই কুকুরদ্বয় শান্ত হয়ে যায়। স্থানীয় কোনও বয়স্ক মানুষ খুঁজছিল সে। আগ্রহ করে দুয়েক জনের কাছে জানতে চাইল রজব আলি স্যারের ঠিকানাটা
জানে কি না ? না, কেউ তার বাসার খবর বা পারিবারিক সদস্যদের খোঁজ দিতে পারেনি। তবে একজন বৃদ্ধমতন মুদির দোকানি শুধু এটুকু বলেছে, শুনছি তাইনে তো গেরামে থাকুইন, গেরাম থেক্কাই ট্রেনের সময় হইলে ইস্টিশনে আসেন আর মানুষের কাছে টেকা চাইন।
সে আর কিছু জানে না। ফয়সলের ইচ্ছে ছিল তার নস্টালজিক শহরটা ছাড়ার আগে স্যারের সাথে একটিবার কথা বলে আসা। গতকাল ভিড়ের মধ্যে তার হাতে কিছু টাকা দেওয়া হলেও বলা হয়নি যে, সে ৭৮-৭৯ ব্যাচের তার সেই প্রিয় ছাত্র ফয়সল আরেফিন। যাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রাণিত ও প্রভাবিত করেছিলেন এই মানুষটি। আজও দিব্যি মনে পড়ে, পরীক্ষার রেজাল্ট বের হলে শিক্ষকসহ সবাই খোঁজাখুঁজি করছিলেন, ডাকাডাকি করছিলেন কে সেই ফয়সল আরেফিন, যে সর্ব্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে ?
সেদিন এই রজব আলি স্যারই ফয়সলকে হাত ধরে টেনে নিয়ে প্রিন্সিপালের কক্ষে গিয়েছিলেন এবং ঘরভর্তি মানুষের সামনে অতি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উচ্চারণ করেছিলেন, স্যার, আমাদের কলেজ থেকে একজন হলেও তাকেই আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে দেখতে পাব। ফয়সলের জন্য সকলের শুভকামনা।
সচিত্রকরণ : রজত



