গল্প : দ্বিতীয় সত্তা : বাদল সৈয়দ

তিনি কমলাপুর রেল স্টেশনে পা রেখেই বুক চেপে ধরে হুড়মুড় করে পড়ে গেলেন। জ্ঞান নেই।
তাঁকে আমি চিনি না। চট্টগ্রাম থেকে আসার সময় পাশের সিটে বসেছিলেন। দুয়েকটা কথা হয়েছে, তারপর আমি কিছুক্ষণ ইয়ারফোন লাগিয়ে গান শুনে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ট্রেনে আমার ঘুমের সমস্যা হয় না। মাঝখানে আখাউড়ায় একবার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। টয়লেট সেরে আবার ঘুম দিয়েছিলাম। তখন দেখেছিলাম, ভদ্রলোকও ঘুমাচ্ছেন। বেশ বয়স্ক মানুষ। বেশভূষায় বোঝা যায় আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো নয়। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। দাঁতে পান খাওয়ার কারণে লালচে দাগ।
তিনি এখন অজ্ঞান অবস্থায় স্টেশনের প্লাটফর্মে পড়ে আছেন। কেউ ভ্রুক্ষেপ করছে না। সারা রাত জার্নি করে সবাই বাড়ি ফেরার জন্য অস্থির। শুধু কুলি ও ভিখারি জাতীয় কিছু লোক তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। একবার ভাবলাম, আমিও চলে যাই। পরক্ষণেই মনে হলো, এরকম অসুস্থ একজন মানুষকে ফেলে যাওয়া কি ঠিক হবে ? এদিকে আবার আমার জরুরি একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। মতিঝিলে এক ব্যবসায়ীর সাথে একটি কাজ পাওয়া নিয়ে কথা বলার জন্য অনেক কষ্টে অ্যাপয়েন্টমেন্টটি নিয়েছি। ব্যবসার অবস্থা ভালো না। হিমশিম খাচ্ছি। তাই কাজটি আমার খুব দরকার। সময়মতো না গেলে তিনি বিরক্ত হবেন। তাই অনিচ্ছা নিয়ে হাঁটা দিলাম। তারপর আবার মন থেকে বাধা পেলাম। এ অবস্থায় একজন মানুষকে ফেলে রেখে চলে যেতে মন সায় দিচ্ছে না। পায়ে পায়ে আবার তাঁর কাছে ফিরে এলাম। আশেপাশে দাঁড়ানো কয়েকজনকে বললাম, ‘ভাই, আমি উনাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাই। আপনারা যদি উনাকে সিএনজি পর্যন্ত নিয়ে যেতে সাহায্য করেন ভালো হয়।’
ঠিক সে সময় কোত্থেকে যেন আরেকটি ট্রেন ঢুকেছে। কুলিরা সব সেদিকে ছুটলো। তারা গরিব মানুষ, রোজগার বাদ দিয়ে অন্যের উপকার করার সময় নেই। শুধু একজন কুলি রয়ে গেল। অল্পবয়স্ক সামান্য খোঁড়া এক ভিখারি এসেও হাত মেলালো। তিনজনে মিলে ধরাধরি করে তাঁকে স্টেশনের বাইরে নিয়ে একটি সিএনজিতে তুললাম। তারপর সোজা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সি।
সেখানে প্রচণ্ড ব্যস্ততা। একজনের পর একজন রোগী আসছে। আমাদের রোগীর অবস্থা দেখে একজন তরুণ ডাক্তার দ্রুত তাঁর বুকে দু হাতে প্রচণ্ড চাপড় দিতে লাগলেন। অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারলাম, ভদ্রলোককে সিপিআর দেওয়া হচ্ছে। সম্ভবত তাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ সিপিআর দেওয়ার পর ভদ্রলোকের জ্ঞান ফিরল। তিনি মৃদু কণ্ঠে বললেন, পানি, পানি…।
রোগী কিছুটা সুস্থির হওয়ার পর ডাক্তার বললেন, ‘উনার ইসিজি করাতে হবে।’ তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি উনার কে হন ?’
আমি উত্তর দিলাম, ‘আমি আসলে উনার কেউ না। একই ট্রেনের যাত্রী ছিলাম। ঢাকা এসে পৌঁছানোর পর উনি অজ্ঞান হয়ে গেলে আমি হাসপাতালে নিয়ে এসেছি।’
‘উনার নাম, ঠিকানা জানেন ?’
‘আমি কিছুই জানি না। ট্রেনে উনার সাথে আমার তেমন কথা হয়নি। দুজনেই ঘুমিয়েছিলাম।’
‘ওহ!’ ডাক্তারকে একটু হতাশ মনে হলো। তারপর বললেন, ‘ঠিক আছে, উনি আরেকটু স্টেবল হলে সব জেনে নেওয়া যাবে। তার আগে ইসিজি করিয়ে নেই।’
আমি বললাম, ‘ঢাকায় একটা কাজে এসেছি। এখন কি আমি চলে যেতে পারি ?’
‘অ্যাট লিস্ট ইসিজি করা পর্যন্ত থাকুন। এর মধ্যে উনার আত্মীয়স্বজনকে খবর দেওয়া যাবে।’
মতিঝিলে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট সকাল এগারোটায়। এখন বাজে প্রায় নটা। একটু টেনশনে পড়ে গেলাম। আমার তো এখানে আটকে থাকা চলবে না। তারপরও ডাক্তার সাহেবের অনুরোধ ফেলতে পারলাম না। রয়ে গেলাম।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার সাহেব ইসিজি রিপোর্ট হাতে এসে বললেন, ‘উনার মায়ো কার্ডিয়াল ইনফ্রাকশন হয়েছে। মানে হার্ট অ্যাটাক। এনজিওগ্রাম করতে হবে।’
আমি কিছুটা অস্থির কণ্ঠে বললাম, ‘আমি তো আর থাকতে পারব না। উনার কারও খোঁজ পাওয়া গেছে ?’
‘আমি উনার সাথে কথা বলেছি। আমরা আপাতত হার্ট অ্যাটাকের ইমারজেন্সি ওষুধ দিয়েছি। তাই কিছুটা সুস্থ বোধ করছেন। উনি বললেন, স্কুল টিচার ছিলেন। চার বছর আগে রিটায়ার করেছেন। সমস্যা হচ্ছে তাঁর তেমন কেউ নেই। বিয়ে করেননি। এক ভাই সৌদি আরব থাকেন। তাঁর সাথে অনেক দিন যোগাযোগ নেই। এছাড়া খবর দেওয়ার মতো আর কেউ নেই।’
‘কোনও বন্ধু বা অন্য আত্মীয়স্বজন নেই ?’
ডাক্তার মৃদু হেসে বললেন, ‘কথায় বোঝা গেছে উনি একজন দরিদ্র মানুষ। গরিবের বন্ধু বা আত্মীয় থাকে না।’
‘উনি ঢাকা এসেছিলেন কেন জানেন ?’
‘উনার পেনশন বেনিফিট অনেক বছর ধরে আটকে আছে। চট্টগ্রাম অফিস বলেছে ঢাকা এজি অফিসে যোগাযোগ করতে। তাই পাড়ার দোকানদার থেকে ধারকর্জ করে ঢাকায় এসেছেন।’
‘এনজিওগ্রাম করতে টাকা লাগবে না ?’
‘বেশি লাগবে না। সরকারি হাসপাতালে তিন হাজার টাকার মধ্যেই তা করা সম্ভব।’
আমি একটু আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। মাস্টার সাহেবের কাছে টাকা না থাকলে বিপদ। তিন হাজার টাকা আমার কাছে অনেক টাকা। ডাক্তার সাহেব যেন আমার মনের কথা বুঝতে পেরে বললেন, ‘চিন্তা করবেন না। প্রতিটি হাসপাতালে চিকিৎসকরা নিজেদের টাকায় একটি পুওর ফান্ড চালান। এনজিওগ্রামের খরচের ব্যবস্থা সেখান থেকে করা যাবে।’
আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, ‘তাহলে কি আমি যেতে পারি ?’
ডাক্তার বললেন, ‘এক কাজ করুন, আপনি আপনার কাজ শেষ করে আসুন। এর মধ্যে আমরা এনজিওগ্রাম করে ফেলি। ফোন নাম্বার দিয়ে যান। আপনাকে রেজাল্ট জানাব।’
আমি অস্বস্তি নিয়ে বললাম, ‘আমার কি আর আসার দরকার আছে ? উনার চিকিৎসা নিয়ে তো আমার কিছু করার নেই।’
‘তাও ঠিক। আপনি এসেই বা কী করবেন ? আচ্ছা, যান। তবে ফোন নাম্বার দিয়ে গেলে খবরটা দিতে পারতাম। এত কষ্ট করে উনাকে হাসপাতালে নিয়ে এলেন, আপনাকে উনার আপডেট জানানো উচিত। রোগী ভর্তি করাতে অবশ্য একজনের রেফারেন্স লাগবে। আচ্ছা, আমার রেফারেন্সেই মাস্টার সাহেবকে ভর্তি করাব।’
আমি ডাক্তার সাহেবকে ফোন নাম্বার দিয়ে মতিঝিলের উদ্দেশে রওনা দিলাম। ডাক্তার সাহেবও তাঁর ফোন নাম্বার দিলেন। তাঁর ব্যবহারে মনে হলো অনেক দিন পর একজন ভালো মানুষের দেখা পেলাম।
মতিঝিলে আমার কাজটি হলো না। যিনি ডেকেছিলেন তিনি একথা সেকথা বলার পর বললেন, ‘শফিক সাহেব, আমাদের চট্টগ্রাম অফিসে দুপুরের খাবার সাপ্লাইয়ের দায়িত্ব আপনাকে দেওয়া সম্ভব না। আপনার পাঠানো স্যাম্পল খাবার ওখানকার লোকজন পছন্দ করেনি। তাই আমাদের নতুন ভেন্ডর খুঁজতে হবে।’
আমি মরিয়া হয়ে বললাম, ‘স্যার, আমাকে আরেকবার ট্রাই করার সুযোগ দেওয়া যায় ?’
তিনি উত্তর দিলেন, ‘আসলে চট্টগ্রামের এরিয়া ম্যানেজার আপনার খাবারের মান নিয়ে খুব বাজে রিপোর্ট দিয়েছেন। আমাদের অফিসের নিয়ম হচ্ছে, এরিয়া চিফ কোনও ব্যাপারে অমত করলে হেড অফিস সেটাকে খুব গুরুত্ব দেয়। এটা না করলে রিজিওনাল অফিসগুলো ভালো চলবে না। তাই আপনাকে আর কোনও সুযোগ দেওয়া সম্ভব না।’
আমার ব্যবসা হচ্ছে দুপুরে বিভিন্ন অফিসে খাবার সাপ্লাই দেওয়া। আগে অনেক ক্লায়েন্ট ছিল। করোনার পর অনেক অফিস বন্ধ হয়ে গেছে বা লোক ছাঁটাই হয়ে গেছে। তাই এখন হাতেগোনা কয়েকজন ক্লায়েন্ট নিয়ে ধুঁকছি। বড় আশা ছিল এ অফিসের ব্যবসাটা পেলে উঠে দাঁড়াব। এদের বিশাল ব্যবসা। চট্টগ্রামেই কাজ করে প্রায় তিনশ লোক। আমি জানি আমার খাবারের মান মোটেও খারাপ নয়। সম্ভবত চট্টগ্রামের এরিয়া ম্যানেজার নিজের লোককে ব্যবসাটা দিতে চান। তাই আমাকে বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন।
মন খারাপ করে বেরিয়ে এলাম। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। মাস্টার সাহেবকে হাসপাতালে টানাটানি করতে গিয়ে সকালে কিছু খাওয়া হয়নি। তাই একটা সস্তা হোটেল খুঁজছি, এমন সময় ডাক্তার সাহেবের ফোন এল।
‘শফিক সাহেব, আপনার রোগীর অবস্থা তো খুবই খারাপ। হার্টে চারটা ব্লক ধরা পড়েছে। খুব দ্রুত রিং পড়াতে হবে, নয়ত যে কোনও মুহূর্তে খারাপ কিছু ঘটে যেতে পারে।’
আমার এখন এগুলো শোনার মুড নেই। তারপরও জিজ্ঞেস করলাম, ‘এতে কত খরচ পড়বে ?’
‘সবচেয়ে সস্তা রিং লাগালেও কমপক্ষে তিন লাখ টাকার মতো লাগবে। সমস্যা হচ্ছে, আমাদের পুওর ফান্ড থেকে এত টাকা দেওয়ার সুযোগ নেই। তারপরও ওখান থেকে হাজার বিশেক টাকা ম্যানেজ করে দিতে পারব। আমি নিজে দশ হাজার টাকা দেব। সাধারণ এমবিবিএস ডাক্তার হিসেবে এর বেশি দেওয়ার সাধ্য আমার নেই।’
‘ভাই, আপনাকে ধন্যবাদ, কিন্তু আমার এক টাকাও দেওয়ার ক্ষমতা নেই।’
‘তাহলে বাকি টাকার কী হবে ? আরও তো দুই লাখ সত্তর হাজার টাকা লাগবে। ডাক্তার সাহেবকে খুব উদ্বিগ্ন মনে হলো।
আমি বললাম, ‘ভাই, এটা নিয়ে আমি আর মাথা ঘামাতে চাইছি না। আমার নিজেরই খুব টানাটানি চলছে।’
‘মাত্র তিন লাখ টাকার জন্য মাস্টার সাহেব মারা যাবেন ?’ ডাক্তার হাহাকার করে উঠলেন।
আমি কোনও কথা না বলে ফোন কেটে দিলাম। তারপর গাবতলির উদ্দেশে সিএনজি খোঁজা শুরু করলাম। সেখান থেকে চট্টগ্রামের বাস ধরব। জ্যাম ঠেলে গাবতলিতে আসতে আসতে প্রায় দুটো বেজে গেল। বাসে উঠব এমন সময় মনে হলো, কাজটা কি ঠিক হচ্ছে ? একটা অসুস্থ মানুষকে ফেলে চলে যাওয়াটা ঠিক হচ্ছে ? টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করতে পারব না, অন্তত মারা যাওয়ার সময় তো পাশে থাকতে পারি। নিঃসঙ্গ মৃত্যুর চেয়ে ভয়ংকর আর কিছু নেই।
দোনোমোনো করতে করতে বাস থেকে নেমে এলাম। তারপর রওনা দিলাম হাসপাতালের দিকে। ডাক্তার সাহেব আমাকে দেখে বেশ খুশি হলেন। বললেন, ‘ভাই আপনি আসায় খুব ভালো লাগছে।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘মাস্টার সাহেব কেমন আছেন ?’
‘ভালো না। সিসিইউতে ভর্তি করিয়ে দিয়েছি। জ্ঞান আছে, তবে দ্রুত রিঙের ব্যবস্থা না করলে বিপদ হতে পারে। আমি সারাদিন বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে টাকা জোগাড়ের চেষ্টা করেছি। কারও হাতেই তেমন টাকা নেই। তারপরও আরও ত্রিশ হাজার টাকার ব্যবস্থা হয়েছে।’
‘তার মানে আরও দুই লাখ চল্লিশ হাজার টাকা লাগবে ?’ আমি তেতো গলায় বললাম।
‘জি,’ ডাক্তার সাহেব উত্তর দিলেন।
আমার মাথায় হঠাৎ একটি বুদ্ধি এল। খুব উৎসাহ নিয়ে বললাম, ‘আচ্ছা, উনি তো শিক্ষক ছিলেন। আমরা কি তাঁর প্রাক্তন ছাত্রদের কারও সাথে যোগাযোগ করতে পারি ?’
ডাক্তার মহা উৎসাহে লাফিয়ে উঠে বললেন, ‘গ্রেট আইডিয়া। এজন্যই তো আপনাকে আসতে বলেছিলাম। দুজন থাকলে বুদ্ধি বের করা সহজ। বলে না, একের বোঝা দশের লাঠি।’
‘ঠিক, উনার ছাত্ররা দায়িত্ব নিলে কাজটা সহজ হয়ে যাবে।’ আমি বললাম।
‘আচ্ছা, যাই জিজ্ঞেস করে আসি, কোনও প্রাক্তন ছাত্রের নাম্বার আছে কি না ?’
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার সাহেব ফিরে এলেন। তাঁর চেহারায় দুশ্চিন্তা। বললেন, ‘উনার ছাত্রদের সাথে তেমন যোগাযোগ নেই। শুধু একজনের নাম বললেন, মোকাম্মেল হোসেন। জুবিলি ব্যাংকের বেশ বড় অফিসার, তবে উনি এক্সাক্ট পদবি জানেন না। কোথায় পোস্টেড তাও জানেন না। তাঁর নাকি পেনশন ক্লিয়ার করার জন্য সাহায্য নিতে এ ভদ্রলোকের কাছে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। কীভাবে তাঁকে খুঁজে বের করতেন আল্লায় জানে।’
আমি হতাশ কণ্ঠে বললাম, ‘এই ব্যাংকার ভদ্রলোককে কীভাবে বের করা যায় ?’
ডাক্তার সাহেব মোবাইলে কাকে যেন ফোন করতে করতে বললেন, ‘দাঁড়ান। জুবিলি ব্যাংকে আমার এক বন্ধু আছে। তাঁকে জিজ্ঞেস করি মোকাম্মেল সাহেবকে চেনে কি না ?’
ওপ্রান্তে কেউ একজন ফোন রিসিভ করেছেন। তিনি কী বলছেন শুনতে পারছি না, কিন্তু ডাক্তার সাহেবের কথা শুনতে পাচ্ছি।
‘সাব্বির, কেমন আছিস ?’
‘তুই কি তোদের ব্যাংকের মোকাম্মেল সাহেব নামে কাউকে চিনিস ? চিটাগাং বাড়ি।’
‘কী বললি! ডিএমডি ?’
‘ওহ! শিট! কানাডা চলে গেছে ?’
‘ফোন নাম্বার জানিস ?’
‘জানিস না। হ্যাঁ, জরুরি দরকার ছিল। কারও কাছ থেকে উনার নাম্বার পাওয়া যাবে ?’
‘যাবে না! আচ্ছা, রাখি। ভালো থাকিস।’
ডাক্তার সাহেব ফোন নামিয়ে হতাশ কণ্ঠে বললেন, ‘মোকাম্মেল সাহেব জুবিলি ব্যাংকের ডিএমডি ছিলেন। কিন্তু বছর খানেক আগে চাকরি ছেড়ে ফ্যামিলিসহ কানাডা চলে গেছেন। আমার বন্ধুর কাছে তাঁর ফোন নাম্বার নেই। তার জানা মতে কারও কাছে নেই। কারণ মোকাম্মেল সাহেব কী কারণে যেন রাগ করে চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে গেছেন। তাই কলিগদের সাথে যোগাযোগ রাখেন না।’
মাস্টার সাহেবকে সাহায্য করার শেষ সুতোটিও ছিঁড়ে গেল।
দুজনে হতাশ হয়ে হাসপাতালে বসে আছি। ডাক্তার মাঝে মাঝে একে তাকে ফোন করছেন সাহায্যের আশায়। কিন্তু কেউ অচেনা একজন স্কুল শিক্ষককে সাহায্য করতে রাজি হলেন না। হঠাৎ তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, ‘তিনি বললেন, ‘ভাই, আমার এক দূর সম্পর্কের মামা আছে। বিশাল ব্যবসায়ী। তাঁকে একটা ফোন করি, কী বলেন ? দুই-তিন লাখ টাকা তাঁর হাতের ময়লা।’
আমি খুব উৎসাহ নিয়ে বললাম, ‘করেন, ভাই, করেন।’
তিনি বললেন, ‘লাউড স্পিকারে দিচ্ছি। আপনিও শোনেন।’
কয়েকটি রিং হবার পর ওপারে তা রিসিভ করা হলো।
‘মামা, আসসালামুলাইকুম। আমি ইমতিয়াজ বলছি, ডাক্তার ইমতিয়াজ। আপনার ফুপাতো বোনের ছেলে।’
‘ওহ! ইমতিয়াজ, কেমন আছ ?’
‘ভালো, মামা। একটা দরকারে ফোন করেছি।’
‘বলো।’
ডাক্তার সাহেব সংক্ষেপে পুরো ঘটনা বর্ণনা করে বললেন, ‘মামা, টিচার ভদ্রলোকের চিকিৎসার জন্য কিছু সাহায্য করা যায় ?’
আমি লাউড স্পিকারে শুনতে পেলাম, মামা উত্তর দিলেন, ‘তুমি ডাক্তারি ছেড়ে সমাজসেবায় নামলে কখন ?’
ডাক্তার সাহেব একটু থতমত খেয়ে বললেন, ‘মামা, নরমালি আমি এ কাজ করি না। মানুষটার জন্য খারাপ লাগছে তাই…।’
মামা তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘দেখো ইমতিয়াজ, তোমার কাজ চিকিৎসা করা, রোগীর জন্য টাকা তোলা না। সে হার্টের রোগ বাঁধিয়েছে, এর পরিণতি তাকে মেনে নিতে হবে। ইফ ইউ হ্যাভ ক্যান্সার, ইউ হ্যাভ টু ডাইজেস্ট ইট।’ বলেই তিনি ফোন কেটে দিলেন।
ডাক্তার সাহেব অপমানে কেঁপে উঠলেন। আমি কিছু না বলে তাঁর পিঠে হাত রাখলাম। কিছু কিছু সময় আছে যখন সান্ত্বনা দিলে অপমান আরও বাড়ে। তখন কথা বলতে নেই, শুধু চুপচাপ পিঠে হাত রাখতে হয়।
এমন সময় একজন ওয়ার্ড বয় ছুটতে ছুটতে এসে বলল, ‘স্যার, আপনাকে সেকান্দর স্যার ডাকে।’ ছুটে আসায় সে হাঁপাচ্ছে, চোখে জান্তব ভয়।
ডাক্তার একটু অবাক হয়ে বললেন, ‘কোন সেকান্দর ?’
ওয়ার্ড বয় ফিসফিস করে বলল, ‘কব্জিকাটা সেকান্দর। তার দলের এক লোক হার্ট অ্যাটাক খাইছে, তারে মেডিকেলে আনছে। সে আপনারে ডাকে।’
মুহূর্তে ডাক্তার সাহেবের চেহারা কালো হয়ে উঠল, সেখানে তীব্র আতঙ্ক। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই, সেকান্দর সাহেবটা কে ?’
ভয়ে নীল হয়ে যাওয়া ডাক্তার বললেন, ‘বিরাট মাস্তান। বিপক্ষের লোককে খুন করে কব্জি কেটে উল্লাস করে। তাই সবাই তাকে কব্জিকাটা সেকান্দর ডাকে। বুঝতে পারছি না সে কেন ডাকছে। তার ডাক মানেই খারাপ কিছু।’
‘স্যার, তাড়াতাড়ি আসেন, সে আমারে থাবড় দিয়া বলছে, এক দৌড়ে ডাক্তার ইমতিয়াজ না ফিমতিয়াজ তারে ডাইক্যা নিয়া আয়। দেরি করলে হান্দাইয়া দিমু।’ ওয়ার্ডবয় এখনও হাঁপাচ্ছে।
অগত্যা ডাক্তার ইমতিয়াজ উঠলেন, তাঁর পা কাঁপছে। আমি পায়ে পায়ে তাঁর পেছনে হাঁটা শুরু করলাম। তিনি বললেন, ‘ভাই, আপনি না আসাই ভালো। এই লোক ভয়ংকর। খারাপ কিছু ঘটবে। আপনিও বিপদে পড়বেন।’
আমি ভীতু মানুষ, কিন্তু কেন জানি ডাক্তার সাহেবকে বিপদের মুখে একা ছেড়ে দিতে ইচ্ছা করল না।
সিসিইউতে দেখলাম অনেক লোকের ভিড়। এটা রেস্ট্রিকটেড এরিয়া, কিন্তু কব্জিকাটা সেকান্দরের লোকজন তা মানছে না। দল বেঁধে ভেতরে ঢুকে হইহল্লা করছে।
ডাক্তার ইমতিয়াজ ঢুকতেই শ্যামলা রঙের বেশ লম্বা এক লোক এগিয়ে এল। তার পরনে জিনস, কালো পলো শার্ট, দুহাতে বেশ কয়েকটি ব্রেসলেট, পায়ে কেডস। সে বলল, ‘আপনি ডাক্তার ইমতিয়াজ ?’
‘জি।’ ডাক্তারের কণ্ঠ কাঁপছে।
‘ওই বুড়া কে ?’ লোকটি সামান্য দূরে একটি বেডে শোয়া মাস্টার সাহেবকে দেখিয়ে বললেন।
‘উনি একজন স্কুল শিক্ষক। আজ ভোরে ভর্তি হয়েছেন। আমি তেমন চিনি না। শুনেছি চট্টগ্রাম থাকেন।’
‘তারে এইখানে আনছে কে ?’
ইমতিয়াজ ভয়ে ভয়ে আমাকে দেখিয়ে দিলেন। এবার কব্জিকাটা সেকান্দর আমার উপর চড়াও হলো, ‘বুড়া আপনার কে হয় ?’
‘কেউ না। কাল একই ট্রেনে চট্টগ্রাম থেকে এসেছি। সকালে কমলাপুর স্টেশনে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ায় হাসপাতালে নিয়ে এসেছি।’ খেয়াল করলাম ভয়ে আমার গলাও কাঁপছে।
‘বুড়ার অবস্থা কেমন ?’ এবারের প্রশ্ন ডাক্তার ইমতিয়াজকে।
‘ভালো না। চারটা রিং পরাতে হবে।’ ডাক্তার বললেন।
‘হসপিটাল ব্যবস্থা করবে নাকি সব ওষুধপত্র বেচে দিছেন ?’
অপমানে ডাক্তার সাহেব কেঁপে উঠলেন। কিন্তু সম্ভবত অপমানের কারণেই তাঁর ভয় কিছুটা কেটে গেছে। আত্মমর্যাদায় কেউ আঘাত করলে এরকম হয়। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, ‘আমাদের হাসপাতালে এ ধরনের রোগীর ডাক্তারি সেবা এবং কিছু ওষুধপত্র ফ্রি হলেও রিং পরানোর খরচ দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। আপনি চাইলে চেক করতে পারেন।’
‘শালার ফকিরা হাসপাতাল। তা এখন কী করবেন, বুড়ার কাছে টাকা-পয়সা আছে ?’
‘না, নেই। আমরা চেষ্টা করছি জোগাড় করার।’
‘হাহাহাহা। আপনি হাজি মহসিন হইছেন ? কত টাকা জোগাড় হইছে ?’
‘ষাট হাজার।’
‘কত লাগবে ?’
‘সবচে কম দামি রিং লাগালেও তিন লাখ।’
‘বাকি টাকার কী হবে ?’
ডাক্তার সাহেব বললেন, ‘চেষ্টা করছি জোগাড় করার।’
‘থালাবাটি নিয়া বইস্যা পড়েন। হাসপাতালে মানুষের মন নরম থাকে। জোগাড় হয়া যাবে। হাহাহাহা।’
একই সাথে তার দলের লোকেরা হো হো হাসিতে গড়িয়ে পড়ল। কে যেন শিসও দিল।
ডাক্তার ইমতিয়াজ অপমানে আবার কেঁপে উঠলেন।
‘ওই ফকিরা রিং বাদ দিয়া ভালোটা পরাইলে কত খরচ ?’
‘এগুলোই জোগাড় করতে পারছি না, দামি রিঙের কথা ভেবে লাভ কী ?’
ডাক্তার সাহেব আগুনচোখে কব্জিকাটা সেকান্দরের মুখের উপর বললেন। এখন তিনি মোটেও ভয় পাচ্ছেন না। ‘যা হওয়ার হবে’ এ ধরনের জেদ তাঁর চেহারায়। কিন্তু ভয়ে আমার জান শুকিয়ে গেছে। এই মাস্তানের সাথে মুখে মুখে কথা বলা কী পরিণতি ডেকে আনে চিন্তা করতেই চোখে অন্ধকার দেখছি।
‘কত লাগবে সেটা কন, মিয়া।’ কব্জিকাটা সেকান্দর ডাক্তারকে কড়া ধমক দিল।
‘ছয়-সাত লাখের মতো লাগবে।’
‘এত দাম লাগবে কেন ? সরকার না রিঙের দাম কমাইছে ? মাস্তানি করলেও আমি দিনদুনিয়ার খবর রাখি, ডাক্তার সাহেব।’
‘সরকারি দামে এজেন্টরা বিক্রি করে না। ষাট হাজার টাকার রিং বিক্রি করে এক লাখ টাকায়।’
‘সব শালা ডাকাত।’ কব্জিকাটার কথা শুনে আমার মনে হলো এক বুড়ি আরেক বুড়িকে বলছে, ‘তুই বুড়ি।’
আমরা চুপ করে রইলাম। মাস্তানটা নাকের লোম ছিঁড়ছে। আমার গা ঘিনঘিন করছে। আশেপাশে হাসপাতালের অন্য কর্মীরা চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে কথা বলছে না। মনোযোগ দিয়ে কয়েকটি নাকের লোম ছিঁড়ে সেকান্দর তার এক সাগরেদকে বলল, ‘বাইট্টা, ডাক্তারকে আট লাখ টাকা দে। বলা তো যায় না শেষ সময়ে দেখা গেল টাকা বেশি লাগতেছে। তখন ডাক্তার পড়ব বিপদে, তার তো ফকিরা অবস্থা। সাথে ক্যাশ আছে না ?’
‘আছে, আছে।’ বাইট্টা মাথা নাড়িয়ে বলল।
সেকান্দর ইমতিয়াজের দিকে তালিয়ে বলল, ‘জীবনে বহুত খুন করছি। বদলা হিসেবে একটা মানুষের জান বাঁচাইতে চাই। রাখেন, টাকাটা রাখেন। বুড়ার চিকিৎসা করান।’
আমরা হতভম্ব। ডাক্তার শুধু আমতা আমতা করে বললেন, ‘আপনি, আপনি, টাকা…,’
‘টাকাটা রাখতে বলছি রাখেন ডাক্তার সাহেব।’
‘কিন্তু…,’
‘বেশি কথা বলবেন না, ডাক্তার, রাখেন টাকা।’
আট লাখ টাকা হাতে নিয়ে আমরা যখন হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছি তখন কব্জিকাটা বলল, ‘ডাক্তার সাহেব, আপনি ভালো মানুষ। নইলে বেওয়ারিশ রোগী নিয়া কেউ মাথা ঘামায় না। কোনও সমস্যায় পড়লে আমারে জানাবেন, যে ঝামেলা করবে তার কব্জি কাইট্টা তারেই খাওয়ামু। বাইট্টা, ডাক্তাররে আমার ফোন নাম্বার দে।’
রিং লাগানোর এক সপ্তাহ পর মাস্টার সাহেব হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেন। এই কদিন আমি তাঁর সাথেই ছিলাম। চট্টগ্রাম ফিরে যাওয়া হয়নি। গিয়ে অবশ্য করব কী ? কাজবাজ তো নাই। তবে ঢাকায় থাকতে গিয়ে পকেটে যা ছিল তাও শেষ হয়ে গেল। ভাগ্য ভালো যে, ইমতিয়াজ সাহেব মেডিকেল হোস্টেলে ছাত্রদের একটি রুমে থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। নিজের টাকায় এতদিন ঢাকা থাকা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
মাস্টার সাহেব ছাড়া পাওয়ার পর ঠিক হলো, একদিন ঢাকায় হোটেলে থেকে পরদিন মাস্টার সাহেবকে নিয়ে চট্টগ্রাম ফিরব। এখন টাকার সমস্যা নেই। তাঁর চিকিৎসার পর লাখদেড়েক টাকা বেঁচে গিয়েছিল। ডাক্তার সাহেব কব্জিকাটা সেকান্দরকে ফোন করে তা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সে উত্তর দিয়েছে, ‘বুড়ারে পঞ্চাশ হাজার টাকা দেন। তার এখন ভালো খানাখাদ্য দরকার। বাকিটা আপনার কাছে রাখেন। গরিব রোগীর কাজে খরচ করবেন।’
হাসপাতাল থেকে যখন বিদায় নেব তখন ডাক্তার সাহেব বললেন, ‘আপনি আমাকে খুব ভালো মানুষ ভেবেছেন। কব্জিকাটা সেকান্দরও তাই ভেবেছে। আসলে আমি ভালো মানুষ না। পাঁচ-দশ টাকা বেশি ভাড়া চাইলে রিকশাওয়ালার নাক ফাটিয়ে দেই। বাসায় ছোট একটা কাজের ছেলে আছে, তাকে কথায় কথায় মারধর করি। কিছুদিন আগে এক রোগীকে পেটানোর কারণে বিভাগীয় তদন্ত চলছে। চাকরি থাকে কি না ঠিক নেই।’
আমি অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
চট্টগ্রাম ফিরে আসার মাসখানেক পর এক সন্ধ্যায় মাস্টার সাহেবকে দেখতে গেলাম। তিনি বেশ সুস্থ। আমাকে দেখে বললেন, ‘কেমন আছেন ? সেই যে বাসায় পৌঁছে দিয়ে গেলেন, আর তো দেখতে এলেন না।’
আমি লজ্জিতভাবে বললাম, ‘খুব ব্যস্ত ছিলাম, তাই আসা হয়নি। আপনি কেমন আছেন ?’
‘বেশ ভালো। এখানে হাজি মীর আহমেদ নামের এক বড় সওদাগর আছেন। তিনি তাঁর গ্রামের বাড়ি বোয়ালখালিতে একটি স্কুল করেছেন। আমাকে অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড মাস্টার হিসেবে চাকরি দিয়েছেন। শারীরিক সমস্যা আছে বলে সপ্তাহে চারদিন যেতে হয়। রবিবার থেকে বুধবার। ত্রিশ হাজার টাকা বেতন দেন। এতে আমার ভালোভাবে চলে যায়। একা মানুষ, খাওয়ার লোক তো নাই। তবে অন্য টিচারদের বেতন ঠিকমতো দেন না বলে বদনাম আছে। আমারটা কিন্তু মাসের এক তারিখেই দেন।’
‘যাতায়াতে সমস্যা হয় না ?’
‘বোয়ালখালি তো খুব কাছে, বাসে যেতে চল্লিশ মিনিট লাগে। কষ্ট হবে কেন ? ওহ! ভালো কথা, আমার পেনশনও ক্লিয়ার হয়ে গেছে ?’
‘তাই নাকি! আমি অবাক হয়ে বললাম, এত সহজে ক্লিয়ার হয়ে গেল!’
‘হ্যাঁ, কয়েক দিন আগে চাঁটগা অফিসের বড় সাহেবের সাথে দেখা করলাম। তিনি সেদিনই ক্লিয়ার করে দিলেন। অথচ এই লোক আগে কত ঘুরিয়েছেন! মানুষের মন বড়ই বিচিত্র। কখন কী রূপ নেয় তা একমাত্র আল্লাহ পাক জানেন।’
‘আপনি তো তাহলে বেশ ভালো আছেন।’ আমি হাসতে হাসতে বললাম।
তিনিও হেসে বললেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। তা, আপনার ব্যবসা-বাণিজ্য কেমন চলছে ?’
‘ভালো না। আপনাকে বলেছিলাম, আমি ক্যাটারিং বিজনেস করি। অফিসে অফিসে খাবার সাপ্লাই দেই। ব্যবসার অবস্থা বেশ খারাপ। একটি অফিসে বড় একটা অর্ডার ফাইনাল হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় ম্যানেজার বাগড়া দেওয়ায় তা হচ্ছে না। এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানের মালিককে অনুরোধ করার জন্য ঢাকা যাওয়ার সময় আপনার সাথে ট্রেনে দেখা হয়েছিল। তিনিও লোকাল ম্যানেজারের কথার বাইরে যাবেন না বলে দিয়েছেন।’
‘এই লোক রাজি হচ্ছে না কেন ?’
‘বুঝতে পারছি না। প্রথমে ভেবেছিলাম ঘুষ চায়। সেটা দেওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছিলাম। রাজি হয়নি। সম্ভবত নিজের লোক ঢোকাতে চায়।’
‘তাঁর সাথে আবার দেখা করেন।’
‘ভাবছি যাব, কিন্তু আমাকে দেখলে বিরক্ত হন।’
‘তারপরও যান, ঠেকা আপনার।’
‘ঠিক আছে কাল একবার শেষ চেষ্টা করব।’
‘সাথে আমাকে নিয়ে যাবেন ? কাল বৃহস্পতিবার। আমার ছুটি আছে।’
আমি মাস্টার সাহেবের কথায় খুব অবাক হলাম। বললাম, ‘আপনি গিয়ে কী করবেন ?’
‘কিছু তো করতে পারব না। শুধু অনুরোধ করতে পারব। বুড়া মানুষের অনুরোধে অনেক সময় কাজ হয়।’
‘এক্ষেত্রে মনে হয় হবে না।’ আমি হতাশ কণ্ঠে বললাম।
‘না হলে কী আর করা। তবু যাই আপনার সাথে।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে। কাল সকাল দশটায় আপনাকে তুলে নেব।’
পরদিন সকালে সেই কোম্পানির অফিসে গেলাম। চট্টগ্রাম অফিসের ম্যানেজারের নাম রিয়াজ আহমেদ। বয়স চল্লিশের মতো, কিন্তু তাঁকে দেখতে আরও বেশি বয়স্ক মনে হয়। অর্ধেক চুল পেকে গেছে। সম্ভবত সবসময় সবার উপর বিরক্ত থাকার কারণে বয়স বেড়ে গেছে। লোকটা সুবিধার না। স্বভাবচরিত্রও ভালো নয় বলে গুজব আছে। তবে কাজেকর্মে নাকি খুব ভালো। তাই মালিক তাঁকে শুধু সহ্য করছেন তা না, তিনি তাঁর কথা ছাড়া এক পাও বাড়ান না।
রিয়াজ সাহেব আমাদের দেখে খুবই বিরক্ত হলেন। কঠিন ভাষায় বললেন, ‘আরে ভাই, আপনাকে তো বলেই দিয়েছি খাবার সাপ্লাইয়ের কন্ট্রাক্ট আপনাকে দেওয়া সম্ভব না। তারপরও দুদিন পর পর এসে বিরক্ত করেন কেন ?’
আমি খুব বিব্রত হয়ে বললাম, ‘স্যার, আমাকে ক্ষমা করবেন, কিন্তু ব্যবসাটা পেলে আমার খুব উপকার হতো।’
‘কিন্তু আমাদের উপকার হবে না। কারণ আমরা আমাদের কর্মীদের ভালো খাবার খাওয়াতে চাই। এটাই কোম্পানির পলিসি। আপনার খাবারের মান ভালো না।’
‘স্যার, আমাকে আরেকবার সুযোগ দেন, আমি আরেকবার স্যাম্পল সাপ্লাই দেই।’
‘কেন ভাই ভ্যাজর ভ্যাজর করছেন। বললাম তো আপনাকে দিয়ে আমাদের চলবে না। ডেইলি তিনশ লোককে খাওয়ানো আপনার কাজ না। যান, এখন যান। এরকম বেহুদা আর আসবেন না।’ রিয়াজ সাহেব দাঁত কিড়মিড় করে বললেন।
মাস্টার সাহেব এতক্ষণ চুপ ছিলেন। সম্ভবত আমার অপমান তাঁর সহ্য হলো না। তিনি কিছুটা কঠিন কণ্ঠে বললেন, ‘চলেন, যাই। এখানে কাজ হবে না।’
রিয়াজ সাহেব তাঁর দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালেন, মাস্টার সাহেবও তাঁর দিকে পালটা তাকালেন। হঠাৎ মনে হলো তাঁর চোখে খুবই হালকা লাল আভা জ্বলে উঠেই মিলিয়ে গেল। সম্ভবত রিয়াজ সাহেবের ব্যবহারের কারণে তাঁর চোখে আগুনের ফুলকি ফুটছে। আফটার অল, শিক্ষক মানুষÑঅভদ্র আচরণ নিতে পারেন না।
ক্লান্ত পায়ে সে অফিস থেকে বের হয়ে এলাম। আমার মন খুব খারাপ। এমন সময় ফোন বেজে উঠল, অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি, রিয়াজ সাহেব ফোন করেছেন। তা রিসিভ করতেই তিনি বললেন, ‘আপনি কি চলে গেছেন ?’
উত্তর দিলাম, ‘আপনার অফিসের বাইরেই আছি, স্যার।’
‘তাহলে উপরে আসুন। কন্ট্রাক্ট সাইন করে যান। কাজটা আপনাকে দেওয়া হলো।’
আমি যারপরনাই বিস্মিত হয়ে মাস্টারের দিকে তাকালাম। তাঁর চোখে প্রশ্ন। আমি বললাম, ‘উনি কাজটা দিতে রাজি হয়েছেন। অফিসে যেতে বলছেন। বুঝলাম না কী কারণে সিদ্ধান্ত বদল করলেন।’
‘তাই নাকি ? চলেন, তাহলে যাই।’
কেন জানি মনে হলো ম্যানেজারের সিদ্ধান্ত বদলের ঘটনা তাঁকে খুব একটা অবাক করেনি। কেন কে জানে ?
এরপর কয়েক দিন নতুন ব্যবসার জোগাড়যন্ত্র নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিলাম। তারপর একদিন তুমুল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রাতে মাস্টার সাহেবের সাথে দেখা করতে গেলাম। তিনি আমাকে দেখে খুশি হলেন। বললেন, ‘আরে সাহেব, আপনি তো আবার গায়েব হয়ে গেলেন।’
আমি হাসতে হাসতে বললাম, ‘নতুন খাবার সাপ্লাইয়ের অর্ডার নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম।’
‘ভালো, ব্যস্ত থাকা ভালো। আজ আমার সাথে খেয়ে যাবেন। খানা অবশ্য সামান্য। ডিম ভুনা, ডাল আর ভাত।’
‘না, না, আমি বাসায় গিয়ে খাব।’
‘আরে সাহেব, গরিবের সাথে একদিন খেয়ে যান। তাছাড়া বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, সহজে থামবে বলে মনে হয় না। খেয়েদেয়ে ধীরেসুস্থে যান। তার আগে গা মুছুন, আপনি তো ভিজে গেছেন।’ বলতে বলতে তিনি একটি গামছা এগিয়ে দিলেন।
এমন সময় দপ করে বিদ্যুৎ চলে গেল। মাস্টার সাহেব একটি হারিকেন জ্বালালেন। সেটির সলতে মনে হয় শেষের দিকে। টিম টিম করে জ্বলছে। তাতে ঘর আলোকিত না হয়ে কেবল ছায়া ছায়া ভাব তৈরি হয়েছে।
তিনি বললেন, ‘চা খাবেন ?’
‘না, চা খাব না। বলছেন যখন একসাথে ভাতই খাব। তার আগে আমার একটি প্রশ্ন ছিল।’
‘কী প্রশ্ন ?’ তিনি অবাক হয়ে বললেন।
আমি তাঁর দিকে তাকালাম। হারিকেনের আবছা আলোয় তাঁকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। পরিষ্কার কণ্ঠে বললাম, “আপনি অসুস্থ হওয়ার পর প্রথম সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন ডাক্তার ইমতিয়াজ। তিনি নিজেই আমাকে বলেছেন, তাঁর অনেক সমস্যা আছে। রিকশাওয়ালা, বাসার বাচ্চা কাজের ছেলে, সবাইকে তিনি মারধর করেন। এছাড়া একজন রোগীকে মারধরের কারণে তাঁর চাকরি নিয়ে টানাটানি চলছে। তারপর আপনাকে সাহায্য করল কব্জিকাটা সেকান্দর, সে কীরকম লোক তা ব্যাখ্যা করার দরকার নেই। আপনার পেনশনের ব্যাপারটা দেখুন, যে অফিসার আপনাকে বছরের পর বছর ঘুরিয়েছেন, তিনি আপনি ঢাকা থেকে আসার পর একদিনেই সব ক্লিয়ার করে দিলেন! আপনার স্কুলে অন্যান্য শিক্ষকদের বেতন মীর আহমেদ সওদাগর ঠিকমতো দেন না, অথচ আপনার বেতন মাসের এক তারিখেই দেওয়া হয়। আমার ব্যবসাটি পাওয়ার ব্যাপারটিও বিস্ময়কর। ম্যানেজার সাহেবের কোনওভাবেই আমাকে কাজ দেওয়ার কথা না। আমি নিশ্চিত ছিলাম, তিনি তাঁর ভাগিনার জন্য কাজটি ঠিক করে রেখেছিলেন। কিন্তু আপনিসহ যাওয়ার পর তিনি আমাকে কাজটি দিলেন। সবগুলো ঘটনা একটি প্যাটার্ন তৈরি করছে। তা হলো যেভাবেই হোক আপনি মানুষের চিন্তা বদলে দিতে পারেন। ‘না’-কে ‘হ্যাঁ’ করতে পারেন। এটা কীভাবে সম্ভব ?”
মাস্টার সাহেব অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর বললেন, ‘আমার এরকম ক্ষমতা নেই।’
আমি তীক্ষè কণ্ঠে বললাম, ‘অবশ্যই আছে। আপনি আমাকে ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করুন।‘
‘বলতে হবে ?’
‘অবশ্যই।’
এই প্রথম তিনি আমাকে নাম ধরে ডাকলেন, বললেন, ‘শফিক সাহেব, আপনি আমাকে সেদিন কমলাপুর থেকে হাসপাতালে নিয়ে না গেলে আমি হয়তো বাঁচতাম না। আপনার কাছে আমার ঋণ আছে। জান বাঁচানোর ঋণ। তাই আপনাকে আমার সত্য বলতে হবে।’
‘বলুন।’ আমি উদগ্রীব হয়ে বললাম।
‘আমি যখন কমলাপুর স্টেশনে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম তখন বাইরের মানুষের কাছে আমি অচেতন হলেও ভেতরে ভেতরে আমি চেতন ছিলাম।’
‘কী বলছেন আপনি!’
তিনি হাত বাড়িয়ে আমাকে থামিয়ে বললেন, “সেই চেতন অবস্থায় আমার একবার ঘুম আসছিল, একবার ভাঙছিল, মনে হচ্ছিল আমি তুলোর মতো ভাসছি। আমার চারিদিকে সাবানের ফেনার মতো বুদবুদ। সে বুদবুদের রং হালকা নীল। ভাসতে ভাসতে আমি এগিয়ে চলেছি, আমার সারা গায়ে নীল ফেনা। এমন সময় দেখলাম আমাকে ঘিরে একজন খুব বুড়ো মানুষও ভাসছেন। যেন আমাকে সঙ্গ দিচ্ছেন। আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘আপনি কে ?’ তিনি আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ভাসতে লাগলেন। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কে ?’ এবারও জবাব এল না। মনে হলো দীর্ঘক্ষণ ভাসার পর আমরা একটি বিশাল সোনালি গেইটের সামনে থামলাম। এই প্রথম আমার পাশে ভাসমান বৃদ্ধ হতাশ গলায় বললেন, ‘গেইট তো বন্ধ, ওপারে যেতে পারবি না। তুই অসময়ে এসেছিস। তাই তোকে ফিরে যেতে হবে। খুব আনন্দময় একটি জগতে ঢোকার সুযোগ হারালি রে। আফসোস, বড় আফসোস। এখন তোকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়াও তো ঝামেলা। আচ্ছা, আমার চোখের দিকে তাকা, দেখি কী করা যায়।’ আমি তাঁর চোখের দিকে তাকালাম, হঠাৎ সেখানে লাল আগুনের বিস্ফোরণ হলো। আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘আমার চোখে আগুন দেখে ভয় পেয়েছিস ? ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আবার এখানে ফিরে আসার সময় যাতে তোর টাইমিং ভুল না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য আমাকে তোর সাথে থাকতে হবে। সে ব্যবস্থা করলাম। যা, এবার ফিরে যা।’ তারপর আমার জ্ঞান ফিরল হাসপাতালে। দেখলাম একজন ডাক্তার আমার দিকে খুব বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছেন। সম্ভবত তাঁর নাইট ডিউটি ছিল, এখন বাসায় যাওয়ার কথা। এ সময় জরুরি রোগী আসায় খুব রেগে আছেন। তিনি কাছে আসতেই নিজে থেকে আমার চোখ তাঁর চোখের দিকে ঘুরে গেল এবং আমার ভেতর থেকে আমি না, অন্য কেউ বলে উঠল, ‘আমাকে বাঁচান।’ এই ডাক্তারই হচ্ছেন ইমতিয়াজ সাহেব। এরপর সিসিইউতে শুয়ে আছি। বাইরে আপনারা টাকা জোগাড়ে ব্যস্ত। আমি জানি এত টাকা জোগাড় করার সাধ্য আপনাদের নেই। এমন সময় দেখি এক ষন্ডামার্কা লোক সিসিইউতে খুব হল্লা করছে, একবার তো পিস্তল বের করে কাকে যেন হুমকি দিল। তার রোগী ছিল আমার পাশের সিটে, সে হইচই করতে করতে আমার দিকে তাকাল, ঠিক তখন আমার ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠল, ‘আমার চিকিৎসার জন্য টাকার বন্দোবস্ত করুন।’ লোকটি কব্জিকাটা সেকান্দর। এরপর আশা করি পরের ঘটনাগুলো আর ব্যাখ্যা করতে হবে না। আপনি বুদ্ধিমান লোক বুঝে নেন।”
আমি স্তব্ধবাক হয়ে বসে আছি। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। এমন সময় দপ করে হারিকেন নিভে গেল। মনে হয় সলতে শেষ। ভয়ে আমার শরীর কেঁপে উঠল, তা সামলে নিয়ে বললাম, ‘তার মানে আপনি বলতে চাইছেন, কমলাপুরে অচেতন অবস্থায় যে বৃদ্ধকে কল্পনা করেছিলেন তিনি আপনার ভেতরে বাস করছেন! সব অসম্ভবকে সম্ভব করছেন ?’
‘কল্পনা নয় শফিক সাহেব, আমি তাঁকে সত্যি সত্যি দেখেছিলাম। হ্যাঁ, তিনি আমার মাঝে বাস করছেন।’
‘এটা কীভাবে সম্ভব!’
‘সব তাঁর লীলাখেলা, বাবা। আমি কিছু জানি না।’ বলতে বলতে মাস্টার সাহেব ঢুকরে কেঁদে উঠলেন।
এরপর মাস্টার সাহেবের কাছে আমি আর যাইনি।
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



