বইকথা : ফাগুনের অগ্নিকণা: হারানো ইতিহাসের খোঁজে : সোহানুজ্জামান


বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে মনি হায়দার পরিচিত নাম। যাঁরা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ধারার কথাসাহিত্য সম্পর্কে টুকটাক খোঁজ রাখেন, তাঁদের কাছে পূর্বোক্ত বাক্যটি সত্যতায় ধরা দিবে। কারও-কারও কাছে তা না-ও দিতে পারে। কারণ পাঠ-অভ্যাসের একটা সংকট এই ‘সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে’ বেশ রয়েসয়েই ধরা দিচ্ছে। মনি হায়দারের কথাসাহিত্য-জগতের সাম্প্রতিক সংযোজন তাঁর ফাগুনের অগ্নিকণা উপন্যাস। উপন্যাসটি একার্থে আত্মজীবনীমূলক। কিন্তু এই উপন্যাসের আত্মজৈবনিকতার চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই উপন্যাসটি লেখা হয়েছে ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক- ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। যে ইতিহাস আমাদের নিজস্ব ইতিহাস-জগতে বিদ্যমান; কিন্তু তার একটি অংশ (মমতাজ বেগমদের মতো যাঁরা) চর্চা ও সঠিক আলোচনার অভাবে ম্রিয়মাণÑএমন একটি অধ্যায় তিনি উপন্যাসের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ইতিহাসের এই অধ্যায় যদিও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী বিষয়ও বটে। অর্থাৎ, মনি হায়দারের এই উপন্যাসের বিষয় এই অর্থে দাঁড়ায়: ভাষা আন্দোলনে এক নারীর আন্দোলন- সংগ্রামকে মুখ্য করে পরিমিত ক্যানভাসে ইতিহাসের সুলুকসন্ধান-প্রক্রিয়া। এই কারণে কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে রচিত আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ব্যক্তি ছাড়িয়ে সমষ্টিতে পৌঁছোতে পেরেছে। বিষয়টি বাংলা সাহিত্যে প্রথম নয়, কিন্তু দ্বিতীয় বা তারপরে হওয়ার পরেও এর একটি বিশেষ অবদান অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু কেন আছে তা খুঁজে দেখা জরুরি।
বাঙালির ইতিহাস নেই বলে কেউ কেউ আক্ষেপ করেছেন। তাঁদেরকে বলা উচিত, ইতিহাস আছে; কিন্তু লোকজন তা বেবাক ভুলে বসে আছে। মনে যে কারও একেবারেই নেই, বিষয়টি তা নয়; কিন্তু মনে রাখার দরকার এখন আর কেউ বোধ করে না। ইতিহাসের বিস্মৃতি-বিষয়ে সবচেয়ে ভালো কথা বলেছেন যে ব্যক্তি তিনি উনিশ শতকের প্রাদেশিক রেনেসাঁর দান ও পশ্চিম-প্রভাবিত লেখক-দার্শনিক বঙ্কিচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি তাঁর বিখ্যাত ইতিহাসবিষয়ক প্রবন্ধ ‘বাঙ্গালার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি কথা’ প্রবন্ধে ইতিহাস-চর্চার নতুন দিক উন্মোচন করেছিলেন। তিনি জানাতে চেয়েছিলেন যে, ইংরেজ উপনিবেশের নিবিড় তত্ত্বাবধানে যে ইতিহাস-প্রকল্প নির্মিত হয়েছিল, সেই ইতিহাসের নানারূপ ফাকফোঁকর রয়ে গেছে। যে ইতিহাস ইংরেজ আমলের বাংলার জনসমাজ ও জনপরিসরের বিপরীতে নির্মিত হয়েছে। যে ইতিহাসের ভেতরে মানুষ নেই। সেখানে ‘কাল্ট ফিগারের’ ক্রমাগত সৃষ্টির ভেতর দিয়ে ইতিহাস-প্রকল্পের নির্মাণ হয়েছে। যে বিষয় নানা কারণে প্রকৃত ‘বাঙলার ইতিহাস’ হয়ে উঠতে পারেনি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ইতিহাসচর্চা বিবেচনায় মনি হায়দারের সৃষ্ট চরিত্র মমতাজ বেগম তেমনই এক চরিত্র। যে চরিত্রের ভেতরে স্বাধিকারের বীজ সম্পূর্ণরূপে বপিত থাকলেও কোনও এক অজানা কারণে তাঁর কথা যেন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের মূলধারার ইতিহাস বেবাক চেপে গেছে, ইতিহাস হয়ে পড়েছে ‘চাপা পড়া ইতিহাস’। মমতাজ বেগমও এই ধারায় চাপা পড়ে গেছেন। এই চেপে যাওয়া আর ‘চাপা পড়া ইতিহাসকে’ টেনে সবার সামনে হাজির করাই আমি মনে করি ঔপন্যাসিকের একটি বড় কাজ হয়েছে। তিনি তা বেশ জোরের সঙ্গেই উপন্যাসে করেছেন বলে মনে হয়েছে।
প্রথমেই এই উপন্যাসের নামকরণ নিয়ে আলোচনা করব। এই উপন্যাসের নামকরণ নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্যকর্মের নামকরণের মাধ্যমে সাহিত্যকর্মের প্রাথমিক প্রস্তাব যেমন হাজির করা সম্ভব হয়; তেমনি পাঠকের কাছেও এই নামকরণের বিষয়টি নানা রকম অনুসন্ধিৎসু প্রশ্নমালা নিয়ে হাজির হয়। প্রথাগত নামকরণের পদ্ধতিই মনি হায়দার এক্ষেত্রে গ্রহণ করলেন। ঋতুবৈচিত্র্য কেবল আবহাওয়া-জলবায়ু আর প্রকৃতির বিষয় হিসেবে ‘বাঙালের’ কাছে আসে না; ঋতুর বহুমাত্রিক ব্যবহার হরহামেশাই চোখে পড়ে আরও বিচিত্র রূপে। বস্তুজগতে মূর্ততায় নানা ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব আছে। আবার বিমূর্ততার বিবেচনায় সাংস্কৃতিক জগতের দিক থেকেও বাংলাদেশে ঋতু বিয়ষটা বেশ গুরুত্ব বহন করে। প্রাচীন আমলে তার নিদর্শন কম। যেহেতু শিল্প-সাহিত্য- সংস্কৃতির নিদর্শনও খুব কম। কিন্তু সেই যুগ বাদ দিলেও মধ্যযুগের সাহিত্যে ঋতুর ভূমিকা অনস্বীকার্য। মধ্যযুগের সাহিত্যের ‘বারমাইস্যার’ মতো বিষয় ঋতুর সঙ্গেই সম্পৃক্ত। আধুনিক যুগে, বাংলাদেশ পর্বের ইতিহাসে, ভাষা আন্দোলনের বিষয়কে উপস্থাপন করা হয়েছে; এবং তা বহুল জনপ্রিয় হয়েছেÑএমন কবিতা-গল্প- উপন্যাসে ফাল্গুন তাৎপর্যবাহী। আল মাহমুদ, জহির রায়হান কিংবা আরও অনেক সাহিত্যিকই ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে লেখা সাহিত্যকর্মে ‘ফাল্গুন’ প্রসঙ্গটি হাজির করেছেন। বিশেষ করে ঐতিহাসিকভাবে ভাষা আন্দোলন যে সময়কে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছিল, সে ছিল ফাল্গুন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন নিয়ে জহির রায়হান রচিত প্রথম উপন্যাসের নামকরণ তিনি করেছিলেন ফাল্গুনকে সঙ্গে নিয়ে। আবার আল মাহমুদের কবিতায়ও এই ফাল্গুন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে সংস্থাপিত হয়েছে, রঙে আর ভাবাদর্শের মিলে। এই ধারায় আরও উদাহরণ দেওয়া যাবে।
ঠিক এই একই পথ বেছে নিয়েছেন মনি হায়দার। তিনি এই উপন্যাসের শিরোনাম দিয়েছেন ফাগুনের অগ্নিকণা। এক্ষেত্রে তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে। প্রকৃতি এই সময় ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। এবং এর রূপের দৃশ্যগত বৈশিষ্ট্য আগুনের মতো বাস্তব ধারণার বৈশিষ্ট্যে স্পষ্ট হয়। যদিও বাস্তবে এই ব্যাপারটা আগুনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। কিন্তু আবার আলঙ্করিকভাবে সত্য। মনি হায়দার এক্ষেত্রে দেখা গেল যে, ফাল্গুনের যে দৃশ্যগত বাস্তবতা সেই বাস্তবতার সঙ্গে একুশের ভাষা আন্দোলনের রূপগত বৈশিষ্টের একটি মিল তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। মানে তিনি ফাল্গুনের মতো এমন শান্ত-সুনিবিড় সময়ে যে অগ্নিগর্ভ ভাষা আন্দোলন সংঘটিত হলোÑসেই আন্দোলনকেই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেছেন। এই কারণে আমি বলব যে, নামকরণে একটি প্রথাগত ভিত্তি ঔপন্যাসিক গ্রহণ করার পরও এই নামকরণের বিষয়টি বিশেষ হতে পেরেছে। পাঠক উপন্যাসের শিরোনাম পাঠ করে একটু হলেও ভাবনার সঙ্গে বিচার করবেন।
এই উপন্যাসের ভিত্তি-বিষয় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। এই আন্দোলনের গুরুত্ব কোথায় তা আর এখানে বিশেষভাবে বলার দরকার নেই। নিজ গুণেই এই আন্দোলনের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক- ঐতিহাসিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। কিন্তু মনি হায়দার তাঁর অগ্রজ সাহিত্যিকদের মতো করে এই বিষয়কে উপস্থাপন করেননি। তিনি ঢাকায় সংঘটিত আন্দোলনকে নিয়ে উপন্যাস রচনা করেননি। অর্থাৎ এই উপন্যাসে বিধৃত ভাষা আন্দোলন-বিষয় ঢাকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়নি। এ কথা অবশ্যই এখন ইতিহাসের সত্য আর স্বীকৃত যে, ভাষা আন্দোলনের অগ্নিস্রোত সেই সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। ইতিহাসে সত্য ও স্বীকৃত হওয়ার পরও এই বিষয় ঠিকঠাকভাবে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে লিপিবদ্ধও যে হয়েছে, এই কথা জোরের সঙ্গে বলার জো নেই। কারণ কথা বলতে হলে তো উদাহরণ থাকা লাগবে। সেই উদাহরণ পরিমাণগত দিক থেকে খুবই কম।
বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয় ইতিহাস নির্মাণের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেও। বাংলাদেশে প্রায় ক্ষেত্রেই জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাস রচনার বেলায় ঢাকাকে কেন্দ্র করে ইতিহাসের ঘটনাক্রম সাজানো হয়। ঢাকাকেন্দ্রিক নেতৃত্ব ও নেতৃবৃন্দের ভূমিকাকে বিশেষ চোখে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়েছে। ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যদি এই ধরনের কোনও আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেও এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুবরণও করেÑসেই ক্ষেত্রে দেখা যাবে যে, তা বেশ কম গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার একটি রেওয়াজ চালু আছে। ফলে এই কথা বেশ জোরের সঙ্গে বলতে হবে যে, মনি হায়দার ইতিহাস রচনা না করলেও বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে প্রতিনিধিত্ব করেছেন উপন্যাস রচনার মাধ্যমে। এবং এক্ষেত্রে তিনি প্রান্ত বা মফসসলের আন্দোলন-বিষয় এবং এর সঙ্গে সম্পৃক্ত নানা বিষয় নিয়ে এসেছেন। এটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের আলোচ্য উপন্যাসের ভাষা আন্দোলনভিত্তিক ঘটনাবলি মফসসলে সংঘটিত হয়েছে। এই মফসসল ঢাকার অদূরবর্তী বন্দরনগরী নারায়ণগঞ্জ। নারায়ণগঞ্জকে মফসসল বলা হলো। এখন যদিও এই বিষয় যে কারও জন্য মানতে বেশ কষ্টকর হবে। সেই পরিস্থিতি আদতে এখন তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই সময়ে এই বিষয়টি তৈরি হয়নি। যাই হোক, এই মফসসল আসলে কতটা মফসসল ছিল, সেই বিষয় পঞ্চাশের দশকের ঢাকার বিবরণের সঙ্গে মিলিয়ে পড়ার মাধ্যমে আমরা পেতে পারি। এবং যে সময় ভাষা আন্দোলন হচ্ছে, তখন ঢাকা থেকে কোনও খবর যে এক মুহূর্তে নারায়ণগঞ্জে পৌঁছোবে, তার জো সেই সময়ে ছিল না। কিন্তু ঢাকার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের একটি দৈনন্দিন যোগাযোগের বিষয় ছিল। উপন্যাসেই এই বর্ণনা তৈরি হয়েছে। ফলে খবরাখবর আসতে পারত। যোগাযোগও রাখা যেত। কিন্তু তা তাৎক্ষণিকতায় নয়। এই বিষয়ই বোধ হয় এই ধারার উপন্যাস, প্রান্তিক পর্যায়ের উপন্যাস, রচনার বিষয়টিকে আরও বেশি বেগবান করেছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক বাস্তবতা বিবেচনায়, ভাষা আন্দোলন-বিষয়ে, উপন্যাসের ঘটনাস্থল নিয়ে আলাপ জরুরি।
এই উপন্যাসে প্রচলিত একপাক্ষিক আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক বয়ানকে খারিজ করে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সামষ্টিক রাজনৈতিক- ঐতিহাসিক বয়ানকে গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকৃত প্রস্তাবে সেটি ঔপন্যাসিক নিজে জেনে বুঝে করেছেন, কি করেননিÑসেটি আমাদের কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়। বিবেচ্য বিষয় এই যে, বিষয়টি যেভাবেই হোক, ঘটে গেছে। এই কারণে, এই উপন্যাসে আধিপত্যহীন প্রকৃত ও সামষ্টিক রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক বয়ান অনুসৃত হয়েছে। এটি যে মনি হায়দার করলেন প্রথম, ব্যাপারটি এমন নয়। যেহেতু এই ধারাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক- ঐতিহাসিক পরিসরে বেশ সংকীর্ণ; ফলে তাঁর এই সংযোজনের অবশ্যই গুরুত্ব আছে। কিন্তু মাঝেমধ্যে প্রচলিত ইতিহাসও সাজিয়েছেন তিনি। রফিক, শফিক, সালাম, বরকতের রক্তভেজা ইতিহাস প্রান্তিক মানুষের রক্তভেজা ইতিহাসের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। কারণ আদতে এঁরা সবাই ঐ একই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিল একই কালে। একই সময়ে। এক্ষেত্রে বলা যায় মনি হায়দার আধিপত্যবাদী আর প্রান্তিক ইতিহাসের ভেতরে একটি সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেছেন এবং শেষাবধি তিনি তা করতে পেরেছেন। এবং সাহিত্যের ভেতর দিয়ে হলেও ইতিহাস-ঐতিহাসিকতা প্রসঙ্গে এটি বেশ জরুরি কাজ হয়েছে, তা বলাই যায়।
রাজনৈতিক আদর্শ প্রথমত একক ব্যক্তি বহন করে; কিন্তু তা সমষ্টির দরকারে বেশ কার্যকর হয়Ñসেটা নেতিবাচক হতে পারে কিংবা ইতিবাচক। এই ইতিবাচকতা ও নেতিবাচকতার উদাহরণ বৈশ্বিক রাজনীতির ঘরে বেশ ভালো উদাহরণ হয়ে আছে। কারণ রাজনৈতিক ভাবাদর্শের যে বিষয় জনপরিসরে অবস্থিত মানুষের ভেতরে গ্রন্থিত হয়; তা একক ব্যক্তির ভাবাদর্শিক নেতৃত্বে যেমন হতে পারে, তেমনি তা একাধিক ব্যক্তির মাধ্যমেও হতে পারে। কিন্তু বিষয়টিকে জনপরিসরে বিদ্যমান সকল ব্যক্তির ভাবাদর্শিক চিন্তা-চেতনার প্রভাবে হতে পারেÑএমন সিদ্ধান্ত এককভাবে গ্রহণ করা যায় না। মমতাজ বেগম এই উপন্যাসে এই বিষয়টি সক্রিয় রেখেছেন। অর্থাৎ তিনি ইচ্ছে করলে ভাষা আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারতেন। এটিও তাঁর জন্য একটি রাজনৈতিক অবস্থান হতে পারত। এবং বিষয়টি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক ভূগোলের বিবেচনায় এবং অবস্থানগত দিক থেকে দোষের হতে পারে। কিন্তু ব্যক্তির অবস্থানগত রাজনৈতিক দর্শন-চর্চার জায়গা থেকে এটি ভুল বিষয়Ñএই কথা রাজনৈতিক নৈতিকতার বিবেচনায় বলা কাম্য নয়, বলতে গেলে উচিতও নয়। যদিও মমতাজ বেগম এই কাজ করেননি। তাঁর এই রাজনৈতিক দর্শন-চর্চার যে অবস্থান, তা তাঁর নিজস্ব পছন্দ। তিনি তা গ্রহণ ও বর্জন করেন করতে পারেন। জনগণ মানে ‘ম্যাস পিপল’ সেইটা বিচার করে। যদিও মমতাজ বেগম সেই সময়ের বিবেচনায় ইতিবাচক রাজনৈতিক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।
মমতাজ বেগম যে রাজনৈতিক দর্শনে সেই সময় বিশ্বাস করলেন, আস্থা রাখলেন এবং এই বিশ্বাসের জন্য সেই সময়ে সক্রিয় একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনে মাতলেনÑএই সব বিষয় কি সেই সময়ের রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র-কাঠামোর ভেতরে বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় সংস্থাসমূহ এক বাক্যে মেনে নিল ? এর উত্তর হবে এক বাক্যে, না। এই উপন্যাসে ফ্রাঞ্জ ফানোর বিউপনিবেশায়ন সম্পর্কিত বেশ কিছু রাষ্ট্রীয় ধারণা সত্য হয়েছে। ফানো এবং এই ধারার তাত্ত্বিকরা বারবার বিউপনিবেশায়নকে একটি সহিংস প্রপঞ্চ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। যদি উপমহাদেশের ইতিহাসের দিকে নজর দেওয়া যায়, তো এই সত্যের অনেক উদাহরণ আমাদের থাকবে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন থেকে ১৯৪৭ সালের আগস্ট পর্যন্ত ঔপনিবেশিক নানা আইনি ও প্রশাসনিক বিষয় ভারতবর্ষের প্রচলিত ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়। এবং এই বিষয়টি মান হিসেবে রাষ্ট্রে স্থির হয়। যেমন পুলিশ ব্যবস্থা। পুলিশকে ঔপনিবেশিক আমলে রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক ভাবাদর্শ রক্ষার জন্য ব্যবহার করা হতো। ভারত-ভাগ হওয়ার পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলোতে পুলিশের ভূমিকা তাহলে অন্যরকম হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দেখা গেল যে, এই একই কাজ পুলিশ করছে, যে কাজ পুলিশ ব্রিটিশ আমলে করত। এমন আরও কিছু বিষয় এই উপন্যাসে আছে। সেই বিষয় পাঠককে নিশ্চয় দারুণভাবে ভাবাবে।
আরেকটি প্রসঙ্গ পশ্চিমের সেক্যুলারিজম নিয়ে। যার সংযোগ পুবের লোকজনের সঙ্গেও ঘটেছিল। মমতাজ বেগমের সেক্যুল্যার চিন্তা আদর্শ একান্তই তাঁর নিজের। এবং বলা চলে তাঁর সেক্যুলারিজম পশ্চিমের খাঁটি সেক্যুলারিজমকেই বহন করেছে। এবং যে কোনও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জনগণের জন্যও বিষয়টি জরুরি। যে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, মান্নাফের জন্য তাঁর প্রেম-দরদই কি তাঁকে পূর্ব বাংলায় নিয়ে এসেছিল ? ব্যাপারটা এমনই ছিল।। কিন্তু ব্যাপারটাতে তাঁর চারপাশের মানুষের কোনও ক্ষতি হয়নি। বরঞ্চ সমষ্টির কল্যাণের জন্য তাঁর আদর্শ নানা কারণে ভালো হয়েছে। ফলে সেক্যুলার চিন্তা-আদর্শ নিয়ে যে ভাবনার বিষয় তিনি জারি রেখেছেন এই উপন্যাসে, তা পশ্চিমের আদি অকৃত্রিত্রম সেক্যুলার চিন্তা হিসেবে দানা বেঁধেছে।
এই উপন্যাসে মমতাজ বেগম একা নন; সঙ্গে তাঁর পরিবারও এই আন্দোলনে অসক্রিয়তায় সম্পৃক্ততা দেখিয়েছে। এর পরের উদাহরণ একটু অন্যরকম হলেও ব্যবহার করব। বাংলা সিনেমায় বিপ্লবী নায়ক চরিত্রের সক্রিয় বিপ্লবকালে দেখা যায় যে, নায়ক-পরিবার ভিলেন কর্তৃক ধৃত হয়। এবং বিষয়টি নানাভাবে নায়কের আদর্শ থেকে সরে আসতে মাঝে মাঝে ভূমিকা পালন করে। এই উপন্যাসে এই কাজটিও করা হয়েছে। এবং একই সঙ্গে তাঁর চিন্তার বিপরীতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা-কাঠামোয় বিদ্যমান লোকজনদের দিয়েও মমতাজ বেগমকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে মমতাজ বেগমের সঙ্গে থেকে গেছে সাধারণ মানুষ। এবং এই মানুষ জেগে ওঠা মানুষ। আর আবার এই জনগণের জাগরণের পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছেন মমতাজ বেগম নিজে।
এই উপন্যাসের বিভিন্ন পর্যায়ে ভাষা আন্দোলনই যেন সক্রিয় চরিত্রের ভূমিকায় আসীন হয়েছে। কিন্তু যে শিরোনাম এই উপন্যাসের, তা সম্পর্কে নামকরণের বিষয় আলোচনায় কিছু কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আরও কিছু যেন রয়ে গেছে। সেই রয়ে যাওয়া মূলত একজন নারী। তিনি মমতাজ বেগম। যাঁর জীবনের কাহিনি কেবল বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, তাঁর নিজের জীবনের ঘটনাই একটি উপন্যাস হয়ে বসে আছে। ইতিহাস পাঠ করে তাঁর সম্পর্কে যেটুকু জানা যায়, তাতে কেবল উপন্যাস নয়, একটি মহাকাব্যিক উপন্যাস রচনা তাঁকে ঘিরে করা সম্ভব। তাই বলতে হয়, মনি হায়দার মমতাজ বেগমকে ফাগুনের ‘অগ্নিকণা’ বলছেন। যে ‘অগ্নিকণা’ কেন্দ্র ঢাকা থেকে দূরবর্তী অবস্থায় অবস্থান করে তাঁর নিজস্ব জনপরিসরের মানুষজনকে একসঙ্গে নিয়ে জাতীয় আন্দোলনের সম্পূর্ণতা নির্মাণে বৃহৎ ভূমিকা পালন করেছিলো। তাঁর নিজের জীবনও নানা কারণে ঘটনাবহুল, বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ।
এই উপন্যাসের গল্প বলার পদ্ধতি কালানুক্রমিক নয়, বিক্ষিপ্ত। পাঠককে একটা নির্দিষ্ট ঘটনা ক্রমাগত বলে যাওয়ার মতো পদ্ধতি তিনি ব্যবহার করেননি। অর্থাৎ আদি-মধ্য-অন্ত্য সম্পর্কিত যে ভিক্টোরীয় উপন্যাস বয়ান-প্রকল্প, তা তিনি না মেনে একটি বিকল্প বয়ান-প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। উপন্যাস পাঠ করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, এই উপন্যাসের সব শেষের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে সবার আগে। যদিও অনুক্রমের বিবেচনায় তা ঠিক নয়। কারণ বর্তমান থাকে প্রথমে, তারপর অতীত; আর ভবিষ্যতের হিসেব তো সবার পরে। কিন্তু উপন্যাসে মমতাজ বেগমের কথা প্রথমেই না বলে ভাষা আন্দোলনকে সবার আগে বর্ণনা করা হয়েছে। আর এর পেছনে ঘটে যাওয়া কাহিনি অতীতের হওয়া সত্ত্বেও ভাষা আন্দোলনের বয়ানের সঙ্গে সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে। যদিও প্রকৃত প্রস্তাবে এই উপন্যাসের সব ঘটনাই অতীতের। কিন্তু পাঠক বর্তমানময়তায় মশগুল হতে বাধ্য হয় উপন্যাস-পাঠের পরপরই। এটিকে আমি বলব, উপন্যাসের বর্তমানময়তার কৌশলে পাঠককে উপন্যাসের সঙ্গে রাখার মতো বিষয়। এবং পাঠক সর্বদা সজাগ হয়ে প্রস্তুত থাকে নতুন কিছুর জন্যে। বিষয়টি বেশ দারুণ।
একটি সিনেম্যাটিক অ্যাপ্রোচ উপন্যাসে প্রযুক্ত থেকেছে সর্বদা। যে পাঠক এই উপন্যাস পাঠ করবেন, তার সামনে অনেক ছবি ক্রমাগত চলতে থাকবে। একটির পর একটি। এবং এই সব ছবি এক করলে বিভিন্ন ঘটনাসম্বলিত সমন্বিত সিনেমায়নের বিষয়ই স্পষ্ট হবে। ইতিহাসের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনাংশের এই নির্মিতি আবার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নির্মাণের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। যেখানে কেবল উপন্যাস তৈরি হবে না। বরঞ্চ উপন্যাসের চেয়ে বেশি কিছু তৈরি হয়। পাঠক কেবল উপন্যাস পড়ে উপন্যাসের স্বাদ পাবে না। উপন্যাস-পাঠের পরপরই উপন্যাসের চেয়ে সিনেম্যাটিক অ্যাপ্রোচের বিষয়টি নানা কারণেই উপভোগ করবে, এই কথা হলফ করে বলা যায়।
শেষ কথা। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন নিয়ে উপন্যাসের সংখ্যা বেশ কম। কিন্তু এরও কারণ বোধ হয় আছে। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের পর এত দ্রুত অন্য আন্দোলনগুলো ঘটে গিয়েছিল যে, সেই সমস্ত আন্দোলন-প্রভাব ভাষা আন্দোলনের ঘটনাকে কিছুটা হলেও পেছনে ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু এটাও সত্য যে, ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নির্মাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এই বিষয়ে কোনও দ্বিমত অবশ্যই নেই। কিন্তু আমরা ঘটনাপ্রবাহের এবং সেই ঘটনাপ্রবাহে প্রভাবিত হয়ে সাহিত্য রচনার বিষয় নিয়ে আলাপ করছি। সেই ধারা আর ধারণাকে বহুদিন পরে হলেও সাহিত্যের মাধ্যমে জনসমাজের দরজায় নিয়ে এসেছেন মনি হায়দার।
উপন্যাসটি মহাকাব্যিক নয়। আকার-আয়তনে কম, কিন্তু বেশ সংহত। ফলে ক্ষুদ্রের ভেতরে বৃহতের বাতায়ন ঔপন্যাসিক তৈরি করতে পেরেছেন। এটি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এবং বাংলাদেশের জাতীয় রাজনৈতিক- ঐতিহাসিক ইতিহাসের ধারাকে কেন্দ্র করে এই উপন্যাস রচনার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়



