লিটল ম্যাগ : লোকবৃত্তে ফ্রাঞ্জ ফানোর শতবার্ষিক পাঠ : সোহেল রানা

ফ্রাঞ্জ ফানোর (Frantz Fanon) জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে শতবার্ষিক স্মরণ সংখ্যা লোকবৃত্ত প্রকাশিত হলো এ-বছর। এটি ছোটকাগজের পরিসরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী সংযোজন। সময়সচেতন প্রকাশনা হিসেবে লোকবৃত্ত শুরু থেকেই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য গড়ে তুলেছে। এ-বিশেষ সংখ্যার মাধ্যমে সে ধারাই আরও গভীর, বৌদ্ধিক মাত্রা পেয়েছে। এটি শুধু একজন লেখক বা দার্শনিককে স্মরণ করার প্রয়াস নয়। উপনিবেশ, বর্ণবাদ, সাংস্কৃতিক আধিপত্য, মানসিক পরাধীনতা, আত্মপরিচয় ও প্রতিরোধের প্রশ্নকে নতুনভাবে পাঠ ও পুনর্বিবেচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন। ফানোর বৈপ্লবিক চিন্তা আজও উত্তর-ঔপনিবেশিক বিশ্বে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। সংখ্যাটির বিভিন্ন প্রবন্ধ ও আলোচনায় গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রকাশিত হয়েছে। এ-সংখ্যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ফানোর তত্ত্বকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনার চেষ্টা। অংশত তুলনামূলক আলোচনায় এ-প্রকাশনা সমৃদ্ধ হয়েছে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। আলজেরীয় বিপ্লবে নারীদের ভূমিকা থেকে শুরু করে উপনিবেশিত মানুষের ‘স্ব-উপনিবেশায়ন’―এমন নানা বিষয় এখানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ঘরানার লেখকদের অংশগ্রহণ পত্রিকাটিকে শিক্ষার্থী ও গবেষক উভয়ের জন্য জরুরি পাঠে পরিণত করেছে।
১.
সম্পাদকীয় থেকেই স্পষ্ট হয় যে, এটি নিছক একটি স্মারক সংখ্যা নয়। ফানোর চিন্তাকে সমকালীন বাস্তবতায় পুনরাবিষ্কারের একটি সচেতন প্রয়াস। সম্পাদক স্বপন নাথ অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করেছেন যে, ফানোর মতো বিশাল ব্যক্তিত্বকে ধারণ করা সহজ নয়। তবু এটি তাঁর নিজস্ব উপলব্ধি ও দায়বোধ থেকে নেওয়া একটি আন্তরিক উদ্যোগ। সম্পাদক আরও বলেছেন, উপনিবেশকে শুধু রাজনৈতিক দখল হিসেবে দেখা হয়নি। মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, মনন ও আত্মপরিচয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত এক গভীর নিয়ন্ত্রণ হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘নয়া-উপনিবেশ’, ‘প্রযুক্তিনির্ভর দখল’ ও ‘মানসিক উপনিবেশ’-এর মতো সমকালীন প্রসঙ্গের সঙ্গে ফানোর ভাবনাকে যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকট বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সম্পাদক ফানোর চিন্তাকে কেবল আফ্রিকা বা পশ্চিমা বৌদ্ধিক পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখেননি। এখানে বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের সংকটের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে। ফলে একাধারে তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ও আত্মসমালোচনামূলক পাঠে পরিণত হয়েছে।
২.
এ-সংখ্যায় সংকলিত প্রবন্ধগুলোতে ওঠে এসেছে, কীভাবে একটি জাতি কেবল ভৌগোলিক বা শারীরিকভাবে নয়; বরং ভাষা ও মনস্তাত্ত্বিক স্তরেও পরাধীন হয়ে পড়ে। ফানোর বৈপ্লবিক চিন্তা এবং শোষিত মানুষের মুক্তির দর্শন আজও কীভাবে সমকালীন প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক, লেখাগুলো মূলত সে দিকই উন্মোচন করেছে। শুরুতেই রয়েছে লেখক তপোধীর ভট্টাচার্যের ‘শতাব্দীর আয়নায় ফানো’ প্রবন্ধ। এতে ফ্রাঞ্জ ফানোর উপনিবেশবাদ, বর্ণবৈষম্য ও আত্মপরিচয় সংকট সম্পর্কিত চিন্তাকে গভীর বিশ্লেষণের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে। লেখক দেখিয়েছেন, কীভাবে ফানোর জীবন, অভিজ্ঞতা ও রচনা―বিশেষত, Black Skin, White Masks এবং The Wretched of the Earth―উপনিবেশিত মানুষের মানসিক মুক্তি ও আত্মমর্যাদার সংগ্রামকে নতুন দিশা দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রবন্ধটি ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয় সংকটের সঙ্গে ফানোর ভাবনাকে সমকালীন প্রেক্ষাপটে যুক্ত করেছে। এটি পাঠককে নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। White illusion ও assimilation-এর মাধ্যমে উপনিবেশিত মানুষকে মানসিকভাবে শাসকের অনুগত করে তোলার বিষয়টিও তিনি বিশ্লেষণ করেছেন। যেমন, তিনি বলেছেন,
‘আমাদের যতই অবাঞ্ছিত বোঝা বলে অপপ্রচার করো না কেন, জাতিসত্তার অবমাননা মেনে নেব না। আতঙ্কের সন্ত্রাসে আমাদের সত্তাকে ডুবিয়ে দিতে পারবে না। এই বোধের জাগরণে আধিপত্যবাদের সমস্ত দানবিক বৈরিতা মোকাবিলা করা সম্ভব। বস্তুত এভাবেই ফানোর ঔপনিবেশিক নিপীড়ন-বিরোধী অবস্থানের সর্বজনীন ও কালাতিগ তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব। আফ্রিকার বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ও অস্তিত্বতাত্ত্বিক অবস্থান থেকেই ফানো তাঁর প্রতিরোধ-প্রবণ অস্মিতার প্রেরণা সংগ্রহ করেছিলেন।’
তাত্ত্বিক গভীরতা, ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ এবং সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতার সমন্বয়ে এটি একটি চিন্তাশীল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ হয়ে উঠেছে।
মোহিত উল আলমের ‘ফ্রাঞ্জ ফানোর বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রাম’ প্রবন্ধে ফানোর বর্ণবাদবিরোধী আজীবন সংগ্রাম এবং কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের আত্মপরিচয় ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনের নানা দিক উঠে এসেছে। তাঁর ব্যক্তি অভিজ্ঞতাজাত প্রসঙ্গ এনে দেখিয়েছেন কালোর প্রতি সাদা মানুষের মানসিক পরিস্থিতি কেমন। ফানোর মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্বগুলো কীভাবে বিশ্বজুড়ে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, লেখক তা এখানে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন।
আজিজুল রাসেল রচিত ‘ফ্রাঞ্জ ফানো ও সর্বাত্মক বিউপনিবেশায়ন’ প্রবন্ধটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। লেখক ফানোর ডিকলোনাইজেশন ধারণাকে শুধু ভৌগোলিক স্বাধীনতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং মানুষের চিন্তা, ভাষা, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় ও মনস্তত্ত্বের মুক্তির একটি সর্বাত্মক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। Black Skin, White Masks এবং The Wretched of the Earth-এর আলোকে তিনি দেখিয়েছেন, উপনিবেশবাদ কীভাবে মানুষের আত্মবিশ্বাস ও শিকড়কে ধীরে ধীরে ক্ষয়িষ্ণু করে দেয়। বাঙালির ভাষা ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে ফানোর চিন্তার তুলনা এনে প্রবন্ধটিকে কেবল তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখেননি। এটি আত্মসমালোচনা ও সাংস্কৃতিক পুনর্বিবেচনার একটি শক্তিশালী দলিলে পরিণত হয়েছে।
এলহাম হোসেন ‘ফ্রাঞ্জ ফানো ও আমাদের উত্তরাধিকার’ প্রবন্ধে ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে ফানোর জীবন, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। বৈষম্য, বর্ণবাদ ও পুঁজিবাদী আগ্রাসন থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে তিনি ফানোর চিন্তা ও সংগ্রামকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করেছেন। লেখকের ভাষায়, ফানোর মূল উপলব্ধি ছিল―মনোজগতের বিউপনিবেশায়ন ছাড়া রাজনৈতিক বিউপনিবেশায়ন অসম্ভব। অর্থাৎ, মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব থেকে মুক্ত না হলে প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়। উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা এবং ঘরের শত্রুদের উত্থান নিয়ে প্রবন্ধের আলোচনাও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমান পুঁজিবাদী ও করপোরেট বিশ্বের অমানবিকীকরণ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে ফানোর দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরে লেখক যথার্থই বলেছেন, ‘উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্য ও তত্ত্ব বোঝাপড়ায় জন্য পাঠকের ফানো পাঠ জরুরি।’
ফয়েজ আলম ‘ফ্রাঞ্জ ফানোর চিন্তায় উপনিবেশ ও বর্ণবিদ্বেষ অবসানে সশস্ত্র সংগ্রাম’ প্রবন্ধে ফানোর সবচেয়ে বিতর্কিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ধারণা―প্রতিরোধী সহিংসতাÑগভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। The Wretched of the Earth-এর আলোকে তিনি দেখিয়েছেন, ঔপনিবেশিক কাঠামো যেহেতু নিজেই সহিংসতার ওপর প্রতিষ্ঠিত, সে শোষণব্যবস্থা ভাঙতে প্রতিরোধও একসময় প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। এখানে সহিংসতাকে শুধু ধ্বংসাত্মক শক্তি হিসেবে দেখা হয়নি। বরং নিপীড়িত মানুষের আত্মমর্যাদা ও অস্তিত্ব পুনরুদ্ধারের একটি উপায় হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পাশাপাশি জাঁ-পল সার্ত্র, আলবেয়ার মেমি ও এমে সেজারের চিন্তার সঙ্গে ফানোর সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে লেখক তাঁর বর্ণবাদবিরোধী অবস্থানকে আরও বিস্তৃত বৌদ্ধিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করেছেন। এ ধরনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ রয়েছে; শরীফ আতিক-উজ-জামান-এর ‘জন্মশতবর্ষে ফানোর সহিংসতা ও সংস্কৃতিতত্ত্বের পাঠ এবং পুনর্বিবেচনা।’ তিনি দেখিয়েছেন যে, সহিংসতা কেবল রাজনৈতিক প্রতিরোধ নয়; এটি সাংস্কৃতিক মুক্তিরও একটি প্রক্রিয়া। স্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের মানসিক রূপান্তরের তিনটি ধাপ―দখলদার সংস্কৃতির অনুকরণ, জাতীয়তাবাদী চেতনায় প্রত্যাবর্তন এবং জনগণের সঙ্গে একাত্ম হয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের দিকে অগ্রসর হওয়া―এখানে খুব সুচারুভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রবন্ধটি মনে করিয়ে দেয়, সাংস্কৃতিক আধিপত্য ভাঙা ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা কখনও পূর্ণতা পায় না। যেমন আতিক-উজ-জামান বলেছেন, ‘ঔপনিবেশিক শাসনে জর্জরিত মানুষ তাদের স্বল্প সম্পদ ও দুর্বল রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে এক ধরনের মানসিক চাপে ভুগতে থাকে এবং আগ্রাসন ও সহিংসতার ভেতর দিয়ে তার অবমুক্তি ঘটে―প্রথমে নিজেদের মধ্যে অপরাধ ও সহিংসতা ঘটানোর মধ্য দিয়ে, পরে তা চালিত হয় স্বাধীনতা সংগ্রামের দিকে। ফানোর দৃষ্টিতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে কৃষকরাই মূলত বিপ্লবী।’
মিহিরকান্তি চৌধুরী ‘ফ্রাঞ্জ ফানো : অবদান ও উত্তরাধিকার’ প্রবন্ধে ফানোর অন্তর্দৃষ্টি এবং তাত্ত্বিক দিকগুলো পর্যালোচনা করেছেন। লেখক দেখিয়েছেন, ফানো সশস্ত্র সংগ্রামকে শুধু প্রতিরোধ হিসেবে দেখেননি; বরং এটিকে শোষিত মানুষের মানবিকতা ও মর্যাদা পুনরুদ্ধারের একটি মনস্তাত্ত্বিক মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতেন। উত্তর-ঔপনিবেশিক দেশগুলোর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে ফানোর সতর্কবার্তার গুরুত্বও এখানে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
মনিরুল ইসলাম ‘জাতীয় বুর্জোয়া প্রশ্নে ফানো’ প্রবন্ধে ফানোর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তৃতীয় বিশ্বের জাতীয় বুর্জোয়া বা শোষক শ্রেণির চরিত্র বিশ্লেষণ করেছেন। পাশাপাশি উপনিবেশ পরবর্তী সমাজে তাদের নেতিবাচক ভূমিকাও তুলে ধরেছেন। সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির পথে এই বুর্জোয়া শ্রেণি কীভাবে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তা এখানে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
মাসুদ আলমের ‘ফ্রাঞ্জ ফানোর দর্শন-বীক্ষণ’ প্রবন্ধটি ফানোর দার্শনিক ভিত্তি অনুধাবনের ক্ষেত্রে পাঠককে সাহায্য করবে। এখানে অস্তিত্ববাদ, মার্কসবাদ, মনোবিশ্লেষণ এবং উপনিবেশ-পরবর্তী তত্ত্বের সঙ্গে ফানোর সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তিনি দেখালেন, ফানোর দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। উপনিবেশবাদ কীভাবে মানুষের বিষয়গততা ও নৈতিক কাঠামোকে বিকৃত করে দেয় এবং সেই সংকট থেকে মুক্তির জন্য সংগ্রাম কেন জরুরিÑতা এখানে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ফলে প্রবন্ধটি ফানোর চিন্তার দার্শনিক গভীরতা উপলব্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠেছে।
সাদাত উল্লাহ খান ‘ফ্রাঞ্জ ফানো : বিপ্লবী প্রতিবুদ্ধিজীবী’ প্রবন্ধে ফ্রাঞ্জ ফানোকে শুধু একজন তাত্ত্বিক হিসেবে উপস্থাপন করেননি। তাঁকে একজন সক্রিয় বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী হিসেবেও দেখিয়েছেন। শোষিত মানুষের পক্ষে ফানোর কলম এবং মাঠপর্যায়ের লড়াই কীভাবে তৎকালীন ও বর্তমান বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষকে আন্দোলিত করেছে, তা এখানে সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে।
উপনিবেশবাদের ধারণাকে তুলনামূলকভাবে বোঝাপড়ায় সহায়তা করবে সামিয়া রহমানের ফ্রাঞ্জ ফানোর লেখায় ‘ইন্টারনালাইজড ওরিয়েন্টালিজম : সাইদ-ফানো সমান্তরালপাঠ’ প্রবন্ধটি। এখানে এডওয়ার্ড সাঈদের Orientalism এবং ফানোর মানসিক উপনিবেশবাদের ধারণার একটি তুলনামূলক পাঠ উপস্থাপন করা হয়েছে। লেখক দেখিয়েছেন, পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্ব কীভাবে প্রাচ্যকে নির্মাণ করে। সেই নির্মাণের ফলে উপনিবেশিত মানুষ কীভাবে ‘অন্যের চোখে নিজেকে দেখার’ মানসিক ফাঁদে আবদ্ধ হয়ে পড়ে তাও তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। আত্ম-উপনিবেশিকীকরণের এই গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়াকে লেখক অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। ফলে পাঠক ফানোর চিন্তার নতুন দিক অনুধাবন করতে সক্ষম হন। লেখক সাঈদ ও ফানোর চিন্তার মধ্যে একটি চমৎকার মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। আত্ম-উপনিবেশিকীকরণের এই জটিল ফাঁদকে তিনি সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আত্ম-উপনিবেশিকরণ অন্যের দৃষ্টির পুনরাবৃত্তি হিসেবে নিজের সত্তাকে দুর্বল করে যা উপনিবেশিত মানুষের আত্মপরিচয় সংকটের মূল উৎস। এই মনস্তাত্ত্বিক অবদমন ও অনুকরণের আগ্রাসন শুধু বাহ্যিক নয়; বরং তা ফানোর মানসিক ভাঙনের তত্ত্বের সঙ্গেও সম্পর্কিত। আত্মসাৎকৃত প্রাচ্যবাদের এই জটিল মনস্তত্ত্ব তিনি তুলে ধরেছেন। ফানোর মানসিক ভাঙনের তত্ত্ব, সাঈদের প্রতিনিধিত্ব বিশ্লেষণ এবং তা হোমি ভাবার হাইব্রিডিটির ধারণার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
সুকান্ত বিশ্বাসের ‘কাজী নজরুল ইসলাম ও ফ্রাঞ্জ ফানো : প্রতিরোধের প্রশ্ন’ প্রবন্ধটি বাংলা সাহিত্য ও ফানোর প্রতিরোধী দর্শনের মধ্যে একটি অভিনব সংলাপ তৈরি করেছে। লেখক দেখিয়েছেন, ভিন্ন ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে অবস্থান করলেও নজরুল ও ফানোর চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন প্রতিবাদ। নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা এবং ফানোর উপনিবেশবিরোধী প্রতিরোধকে পাশাপাশি বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রবন্ধটি বাংলা সাহিত্য ও উপনিবেশ-পরবর্তী তত্ত্বের মধ্যে নতুন ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
স্বপন নাথের ‘আত্ম-বিবেচনায় ফ্রাঞ্জ ফানো পাঠ’ প্রবন্ধে আত্মপরিচয় ও আত্মসমালোচনার প্রশ্ন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ফানোকে পড়া মানে শুধু উপনিবেশের ইতিহাস জানা নয়; বরং নিজের ভেতরের উপনিবেশকেও শনাক্ত করা। প্রবন্ধের ভাষায়―‘আমরা যারা নিজেদের উত্তর-ঔপনিবেশিক, বিউপনিবেশিত মনে করি, তারা কোনো-না-কোনো বয়ান, চিন্তা, ভাবনা বা আদর্শে জন্মগত বা প্রাত্যহিক জীবনচর্চায় আগে থেকেই উপনিবেশিত।’ ফানোর ‘সাদা মুখোশ’ ধারণার আলোকে লেখক ব্যাখ্যা করেছেন, কীভাবে মানুষ অজান্তেই আধিপত্যশীল সংস্কৃতির অনুকরণ করতে করতে নিজের স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে। লেখকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়ায়Ñ ‘উপনিবেশিত জনগোষ্ঠী দখলকারীর ভাষায় কথা বলে, নিজের সংস্কৃতি ভুলে উপনিবেশকের সংস্কৃতিচর্চায় অভ্যস্ত হতে থাকে। ফলে আইডেন্টিটি সংকটে পতিত হয়।’ এমনকি এক পর্যায়েÑ আধিপত্যকামী সংস্কৃতির এই প্রবল চাপে এক ধরনের ‘ছত্রাকগোষ্ঠীর উৎপাতে আমরাও সংক্রমিত হই, নিজস্বতা হারিয়ে ফেলি।’ ফলে প্রবন্ধটি শুধু তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং এটি ব্যক্তিমানুষের আত্মসন্ধান ও মানসিক মুক্তির এক গভীর আহ্বানে পরিণত হয়েছে।
ফ্রাঞ্জ ফানোর রচনা নিয়ে আলোচনা করেছেন, আলম সাইফুল, প্রণবকান্তি দেব, মঈনুল ইসলাম ও মাসুদ রানা। রচনাকেন্দ্রিক আলোচনায় ভাষা, ক্ষমতা, মনস্তত্ত্ব জীবনসংগ্রামের সম্পর্কের ওপর গভীরভাবে আলো ফেলেছেন সমালোচকবৃন্দ। তারা শনাক্ত করেছেন ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি আধিপত্য প্রতিষ্ঠারও একটি শক্তিশালী উপায়। ফলে ভাষা ও পরিচয়ের সংকট বিষয়ে ফানোর ভাবনা অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ফানোর বহু লেখায় উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামে নারীর ভূমিকার স্বীকৃতি পাওয়া যায়। পাঠকদের সেই ধারণার সঙ্গে সংযোগ করতে সাহায্য করবে মঈনুল ইসলামের আলোচনা। আলজেরিয় নারীরা কীভাবে ‘পর্দা’ কে শুধু ধর্মীয় বা সামাজিক প্রতীক হিসেবে দেখেননি। বরং এটিকে প্রতিরোধের একটি কৌশল হিসেবেও ব্যবহার করেছিলেন। ফানোর মনোবিশ্লেষণমূলক চিন্তা নিয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন মাসুদ রানা। এটি ফানোর মনোবিশ্লেষণমূলক ভাবনার গভীর পাঠ। লেখক ফ্রয়েড, লাকাঁ এবং উপনিবেশ-পরবর্তী মনস্তত্ত্বের আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন, কীভাবে বর্ণবাদ মানুষের অবচেতনে হীনম্মন্যতা, বিচ্ছিন্নতা ও আত্মঅস্বীকৃতির জন্ম দেয়। একই সঙ্গে তিনি দেখিয়েছেন, সামাজিক বৈষম্য শুধু বাহ্যিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষের মানসিক জগতেও গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। ফানোর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণকে সমকালীন বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে পাঠকের সামনে নতুন চিন্তার ক্ষেত্র উন্মোচন করেছেন।
এ ছাড়াও রয়েছে ফানো বিশেষজ্ঞ লুইস আর. গর্ডনের সাক্ষাৎকারের লায়লা ফেরদৌসকৃত অনুবাদ। গর্ডনের প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসার প্রেক্ষিতে ফানোর বর্ণবাদ, মনস্তত্ত্ব ও মানবিকতার তত্ত্বগুলো এখানে অত্যন্ত সহজ ভাষায় সংক্ষেপে উপস্থাপিত হয়েছে। ফলে পাঠক ফানোর জটিল ভাবনাগুলো সহজে উপলব্ধি করার সুযোগ পান।
৩.
এ সংখ্যার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। যেমন―পরিভাষাগত অসঙ্গতি। সম্পাদক স্বীকার করেছেন যে, পুরো পত্রিকা জুড়ে ফানোর নাম এবং অন্যান্য পরিভাষার বাংলা প্রতিবর্ণীকরণে (transliteration) বৈচিত্র্য বা ভিন্নতা রয়েছে। যদিও সম্পাদক আশা করেছেন যে পাঠকরা বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। তবে এই সংখ্যার জন্য একটি নির্দিষ্ট শব্দকোষ (glossary) বা ‘স্টাইল গাইড’ অনুসরণ করলে ভালো হতো। এতে মান ও সমতা বজায় থাকত এবং পাঠকদের জন্য বিষয়গুলো বোঝা আরও সহজ হতো। তা ছাড়া পরিকল্পনায় স্ব-স্বীকৃত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকাশনাটি প্রাথমিক পরিকল্পনা পূরণ করতে পারেনি। সম্পাদকের এই সততা অবশ্যই প্রশংসনীয়। যা করা গেলে অপূর্ণ অংশের ঘাটতি পূরণ করত এবং এ কাজের গভীরতা আরও বৃদ্ধি পেত।
তবে চমৎকার এই সংখ্যাটি ‘একাডেমিক টানেলিং’ হিসেবে কাজে লাগানোর জন্য পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে। তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণ অত্যন্ত চমৎকার হয়েছে। তার জন্য এতে কিছু প্রয়োগমূলক দিক অন্তর্ভুক্ত করা যেত। যেমন, শুধু তাত্ত্বিক পুনর্মূল্যায়নে সীমাবদ্ধ না থেকে ফানোর চিন্তাধারা বর্তমান বাংলাদেশে তৃণমূল পর্যায়ের সামাজিক আন্দোলন বা শিক্ষানীতিতে ঠিক কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে কোনও লেখা থাকলে ভালো হতো।
মূলত শিল্প-সাহিত্যের কাগজ কেবল সাহিত্যচর্চার জায়গা নয়। এটি প্রতিরোধ, আত্মসমালোচনা ও মুক্তচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বর্তমান প্রজন্মের পাঠক, গবেষক, শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকদের জন্য এ-ধরনের পত্রিকা সাহিত্যচর্চায় এক নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। যারা ফানোকে জানতে চান, উপনিবেশ ও আত্মপরিচয়ের রাজনীতি বুঝতে চান, কিংবা সমকালকে নতুন চোখে দেখতে চান―তাদের জন্য লোকবৃত্ত এই বিশেষ সংখ্যা এক অনন্য সাধারণ পাঠ হয়ে উঠতে পারে। ভালো-মন্দ মিলে লোকবৃত্ত ফানো শতবার্ষিক স্মরণ সংখ্যা বাংলা সাময়িকীর পরিসরে একটি বৌদ্ধিক সংযোজন। এটি শুধু ফানোকে স্মরণ করে না; বরং পাঠককে নিজের সমাজ, সংস্কৃতি, ভাষা ও আত্মপরিচয় সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। আজকের বিশ্বে যখন নয়া-উপনিবেশ, সাংস্কৃতিক আধিপত্য, বর্ণবাদ ও পরিচয়-সংকট নতুন রূপে ফিরে আসছে, তখন এ-ধরনের পত্রিকা, বুদ্ধিবৃত্তিকচর্চা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
লেখক : প্রাবন্ধিক



