গল্প : অলৌকিক ঘোড়া ও চর ভাঙার গল্প : ইমদাদুল হক মিলন

জানালার ওপাশ থেকেই যেন ডাকটা এল। ঘোড়ার ডাক। এই ডাককে বলে ‘হ্রেষা’। সেই  হ্রেষাধ্বনিই শুনতে পেলাম। তাতেই ঘুম ভেঙেছে। ঘরে একটাই জানালা। চারদিকে ঢেউটিনের বেড়া আর মাথার ওপর একই টিনের চালা। ছোট্ট ঘর। ঘরে একটা চৌকি। সেই চৌকিতেই শুয়ে আছি। অন্যের সঙ্গে রুম শেয়ার করতে পারি না বলে আমার জন্য স্পেশাল ব্যবস্থা করা হয়েছে। টিমের অভিনেতা অভিনেত্রী আর ক্রুরা পাশাপাশি তিনটা ঘরে জায়গা পেয়েছে। গাইবান্ধার এই চরে আমরা এসেছি চরের মানুষদের নিয়ে ডকুমেন্টরি করতে। সঙ্গে অল্প কয়েকটি চরিত্রের একটা নাটকও বানিয়ে নিয়ে যাব। সব মিলিয়ে সতেরোজনের টিম।

চরের নাম কোচখালির চর।

নভেম্বর মাস মাত্র শুরু হয়েছে। এখনও শীতের দেখা নেই। চরে এসে পৌঁছেছি সাড়ে বারোটার দিকে। তখন বেশ রোদ ছিল, গরমও ছিল। নদীতীর থেকে হেঁটে আসতে আসতে ঘেমে গিয়েছিল সবাই। গতকাল গাইবান্ধা শহরে এসে ‘এসকেএস’ রিসোর্টে ছিলাম। গাইবান্ধা পিছিয়ে থাকা শহর। সেই শহরের একটু বাইরের দিকে এত সুন্দর রিসোর্ট ভাবাই যায় না! ছবির মতো সাজানো। থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ফাইভ স্টার হোটেলের মতো। মনোরম লেক আছে  ভেতরে। সবুজ গাছপালায় খুবই দৃষ্টিনন্দন। আর সারা রাজ্যের পাখি যেন এই রিসোর্টে। বিকেল থেকে যে শুরু হলো পাখির ডাক, চলল সন্ধ্যার অনেকটা পর পর্যন্ত। ভোররাত থেকে আবার শুরু হলো। বিছানায় শুয়ে শুয়ে অনেকক্ষণ পাখির ডাক শুনেছি আমি। সাতটার দিকে উঠতে গিয়ে শুনি, চারদিক থেকে আশা ভোঁশলের রবীন্দ্রসঙ্গীত ভেসে আসছে। ‘তুমি কোন কাননের ফুল, কোন গগনের তারা’। মিক্সড অ্যালবাম। সঙ্গে অন্য শিল্পীদের গানও ছিল। মুগ্ধ হয়ে শুনলাম একঘণ্টা। ঠিক আটটায় গান বন্ধ হলো। তার মানে রিসোর্টের এদিক ওদিক স্পিকার লাগান আছে। গেস্টদের মনোরঞ্জনের জন্য সকালবেলা গানের ব্যবস্থা। গতকাল সন্ধ্যায় দেখেছি পশ্চিমদিককার স্টেজে বাউল গান হচ্ছে। শুনলাম এলাকার বাউল শিল্পীরা এসে প্রতিসন্ধ্যায় গান করেন ওই স্টেজে। সব মিলিয়ে খুবই রুচিশীল ব্যবস্থা।

ডকুমেন্টরি আর নাটকের ডিরেক্টর বলে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ আমাকে খুবই খাতির তোয়াজ করেছেন। চারতলায় ভিআইপি রুম দিয়েছেন। রুমের দক্ষিণ দিককার দেয়ালটা কাচের। পর্দা সরালে দেখা যায় লেক, লেকের ওপারকার বাগান, তার ওপারে রিসোর্টের দেওয়াল ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত সবুজ শস্যের মাঠ আর কিছু গাছপালা। হালকা কুয়াশা জমেছিল মাঠ প্রান্তরে আর গাছের ডালপালায়। সূর্য ওঠার পর ধীরে ধীরে কেটে গেল। মধুরংয়ের আলোয় ভরে গেল চারদিক। কাচের এপাশ থেকে মন ভরে সেই দৃশ্য দেখেছি।

গোসল ব্রেকফাস্ট ইত্যাদি সেরে টিম নিয়ে বেরোতে বেরোতে প্রায় সাড়ে দশটা বেজে গেছে। ঢাকা থেকে দুটো মাইক্রোবাস নিয়ে এসেছি। এক মাইক্রোবাসে আমি জামান দীন ইসলাম আর ড্রাইভার মতি। অন্য মাইক্রোবাসে ক্যামেরাম্যানসহ অন্য ক্রুরা আর রেকর্ডিংয়ের যন্ত্রপাতি। অভিনেতা অভিনেত্রী নেব গাইবান্ধা থেকে। এখানে ‘সারথী থিয়েটার’ নামে একটা গ্রুপ আছে। গ্রুপের কর্ণধার জুলফিকার চঞ্চল আমার বিশেষ পরিচিত। ওর গ্রুপে কাজ করে তুখোড় সব অভিনেতা অভিনেত্রী। কাল বিকেলে তাদের নিয়ে মিটিং করেছি। চঞ্চল নিজে খুব ভালো অভিনেতা। সঙ্গে আছে হিমুন লতা তৌহিদা পূর্ণতা দেবী জয় তানহা সাকিব তুলনা মীম নিহা। আরেকটা বিশেষ সুবিধা হয়েছে, কোচখালির চরেও লতাদের বাড়ি আছে, জমি আছে। ওরা থাকে গাইবান্ধা শহরের বাড়িতে। আমরা কয়েকদিন শুটিং করব বলে ওর মা আর ভাই গতকালই চলে এসেছেন চরের বাড়িতে। আমাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ওখানে।

‘এসকেএস’ রিসোর্ট থেকে বেরিয়ে আধঘণ্টার পর বালাশিঘাট। সেখান থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় চল্লিশ মিনিটের পথ কোচখালির চর। বালাশিঘাট খুবই জমজমাট এলাকা। প্রচুর দোকানপাট, বড়োসড়ো একটা বাজারই যেন। নদী এদিকটায় অনেকটা শীর্ণ। ওপারে সাদা বালির চর। ব্রহ্মপুত্রের পানি দিন দিন কমছে।

দুটো মাঝারি সাইজের নৌকা নেওয়া হয়েছে। হই হুল্লোড় আর আনন্দ করতে করতে যাত্রা শুরু হয়েছিল সাড়ে এগারোটার দিকে। আরামদায়ক নৌকা। একটা প্লাস্টিকের চেয়ার দেওয়া হয়েছে আমাকে। চেয়ারে বসে নদী আর চর দেখছিলাম। যতই এগোয় নৌকা ততই রোমাঞ্চিত হই। এই এলাকায় আগে কখনও আসিনি। বাংলাদেশের অনেক নদীর মতো ব্রহ্মপুত্রেরও মরণদশা দেখে দুঃখ হচ্ছিল। মাঝে মাঝে নৌকা বাঁক ফিরছে অনেকটা ঘুরে। চঞ্চল বলল, নদীর পানি কমে গেছে। তলা থেকে ঠেলে উঠছে নতুন নতুন চর। নৌকা ঠেকে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এজন্য এভাবে ঘুরে যেতে হচ্ছে।

এদিক ওদিক শুধু চর আর চর। গাছপালা নেই। কোথাও কোথাও কাশ আর ঝাউয়ের চারা বড় হচ্ছে। ধান বাদামের চাষ হচ্ছে। কোনও কোনও চরে, নদীর ধারে রঙিন প্যান্ডেল খাটিয়ে পিকনিকে এসেছে ফুর্তিবাজ মানুষ। হিন্দি গান বাজছে মাইকে।

হিমুন বলল, বর্ষায় ব্রহ্মপুত্র তার চরিত্র ফিরে পায়। ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। গত বছরের বন্যায় সব চর ডুবে গিয়েছিল। পাঁচ সাত ফুট পানি উঠেছে একেকটা চরে। মানুষের ঘরবাড়ি ডুবে গেছে। মাচা বেঁধে থাকতে হয়েছে তাদের। গরু ছাগল ঘোড়া মহিষ হাঁস মুরগি সব নিয়ে কী যে কষ্টের সময় গেছে মানুষগুলোর! আর এখন দেখুন সেই ব্রহ্মপুত্রে পানিই নেই। ছোটবড় মিলিয়ে বহু চর এদিকটায়। কোনও কোনও চর ভেঙে যাচ্ছে। আবার জেগে উঠছে নতুন নতুন চর। কোচখালির চরে যেতে যেতে আপনি দুরকম দৃশ্যই দেখতে পাবেন। এক চর ভাঙছে আরেক চর জেগে উঠছে।

আমাদের সঙ্গে একজন কবি আছেন। তাঁর নাম সরোজ দেব। গাইবান্ধা শহরেই বাড়ি। বয়স্কমানুষ। লম্বা চুলদাড়ি সব পাকা। খুবই আমুদে ধরনের মানুষ। ছেলেমেয়েরা সবাই তাঁকে ‘দাদু’ বলে ডাকে। খুবই স্নেহের গলায় তিনি সবাইকে তুই তোকারি করেন। গলার আওয়াজ সুন্দর। কথাও বলেন সুন্দর করে। বাচনভঙ্গি মিষ্টি। টকটকে লাল একটা পাঞ্জাবি পরেছেন সরোজদা। কাঁধের ঝোলায় দুয়েকটা জামাকাপড় নিয়েছেন। গায়ের চাদর নিয়েছেন। নৌকায় উঠেই হিমুন তাঁকে বলেছিল, দাদু, চাদরটা পরে নাও। ঠাণ্ডা লাগবে।

পাঞ্জাবির ওপর পুরনো শাল জড়িয়ে সরোজদা উদাস হয়ে কী ভাবছেন। হয়ত নদী আর চরের দিকে তাকিয়ে ভেতরে ভেতরে তাঁর খেলা করছে কোনও কবিতার লাইন।

হিমুনের পুরো নাম অমিতাভ দাস হিমুন। সাংবাদিকতা করে। খুব ভালো আবৃত্তিকার। গাইবান্ধা শহরের ছেলেমেয়েদের আবৃত্তি শেখায়। শহরের সম্মানীয় মানুষ সে। কথাও বলে ভারি চমৎকার করে। মুখে হাসিটা লেগেই আছে।

খানিক পরেই হিমুন যেমন বলেছিল তেমন দৃশ্য চোখে পড়ল। ব্রহ্মপুত্রের পুবদিকটায় এসে নদী চলে গেছে তিন দিকে। এতক্ষণ হাওয়া তেমন জোরদার ছিল না। এখন সমুদ্রের হাওয়ার মতো হাওয়া। ঢেউ উঠেছে নদীতে। নৌকা দুলছে। দূরের এক চরের দিকে যাচ্ছি আমরা। ওটাই বুঝি কোচখালির চর! সেদিকটায় গিয়ে মাঝি আবার ডানদিকে নৌকা ঘুরালো।

না, আগেরটা কোচখালির চর না। পানির চরিত্র মাঝিরা ভালো জানে বলে এভাবে ওদিকটায় এগিয়ে নৌকার মুখ ঘুরিয়েছে। খানিক দূর এসে দেখা গেল উত্তর থেকে দক্ষিণে যাচ্ছে স্রোত। ব্যাপক স্রোত। এতক্ষণ এই রকম স্রোত দেখা যায়নি। তারপরই দেখা গেল হাতের ডানদিকে পুরনো উঁচু চর আর বাঁ দিকে জেগে উঠছে নতুন চর। সেই চরের সাদা বালি রোদে ঝকঝক ঝকমক করছে। এখনও জনবসতি গড়ে ওঠেনি। আর উঁচু পাড়ের চর মোমের মতো গলে গলে পড়ছে নদীতে। অর্থাৎ পাড় ভাঙছে। ভাঙনের কবলে পড়া চরে প্রচুর গাছপালা। কলাগাছই বেশি। কাশবন আছে, ঝাউয়ের চারা আছে। সেসব ভেঙে ভেঙে পড়ছে নদীতে। মানুষ তাদের ঘরবাড়ি সরিয়ে নিয়ে গেছে আগেই। নির্জন অসহায় চর নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। একদিকে ভাঙা, আরেকদিকে গড়া। আমার মনে পড়েছিল একটা গানের লাইন। ‘নদীর একূল ভাঙে ওকূল গড়ে, এই তো নদীর খেলা’।

চোখের সামনে নদীর এরকম খেলা দেখে হতবাক হয়ে থেকেছি।

কোচখালির চরে নেমে কিলোমিটার খানেক  ভেতরে লতাদের বাড়ি। চারদিক তাকাতে তাকাতে হেঁটে যাচ্ছিলাম। চর উত্তর দক্ষিণে লম্বা। লতা বলল, বিশ বাইশ কিলোমিটারের মতো লম্বা হবে। প্রশস্ত দশ বারো কিলোমিটার। জনবসতি চরের পেট বরাবর, আর চারদিক ফাঁকা। সেখানে চাষবাস করে মানুষ। তাও পুরোটা করে না। মানে করতে পারে না। কিলোমিটারের পর কিলোমিটার জায়গা খালি পড়ে আছে। সেখানে কাশ আর ঝাউবন। চরের মানুষ ওদিকগুলোয় তেমন যায়ই না। সব মিলিয়ে পঁচাশিটি পরিবারের বাস। লোকসংখ্যা পাঁচশোর কাছাকাছি। গরু ছাগল হাঁস মুরগি আছে প্রত্যেকেরই, ঘোড়াও আছে। ঠেলাগাড়ির মতো চাকা লাগান, ঘোড়া জুতে দেওয়ার হালকা ধরনের গাড়ি আছে। ওই গাড়িতে মালপত্র টানাটানি করা হয়। ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত একটা সরকারি প্রাইমারি স্কুল আছে। চরের ছেলেমেয়েরা সেই স্কুলে পড়ে। দুজন শিক্ষক আছেন কিন্তু তারা এখানে থাকেন না। গাইবান্ধা সদর থেকে পালা করে এসে স্কুল চালান। টিনের চালা বেড়ার মসজিদঘর আছে। দুতিনটা চায়ের দোকান আছে, মুদি দোকান আছে। জ্বর সর্দিকাশির ওষুধ মুদিদোকানে বিক্রি হয়। ডাক্তার দেখাতে হলে সদর ছাড়া উপায় নেই।

প্রত্যেক বাড়ির সামনে খড়ের গাদা। রোদেপোড়া মানুষগুলোর চেহারা দেখলে বোঝা যায়, শিশু কিশোর নারী পুরুষ বৃদ্ধ প্রত্যেকেই কর্মঠ। জমি চাষ করছে, ধান বাদাম ফলাচ্ছে। গরু ছাগল হাঁস মুরগি আর ঘোড়ার তদারকি করছে। কর্মচঞ্চল পরিবেশ।

লতাদের বাড়ির উত্তর দক্ষিণে অনেকগুলো টিনের ঘর। অর্থাৎ গায়ে গায়ে লাগানো বাড়ি। সাদা বালির উঠোন। কোনও কোনও ঘরের পাশে কলাগাছের ঝাড়। চল্লিশ পঞ্চাশটা ঘর হবে এরকম। তার পশ্চিমে পঁচিশ তিরিশ বিঘা পরিমাণ লম্বা আর দশ বারো বিঘা পরিমাণ প্রশস্ত একটা নিচু জায়গা। বর্ষায় বোধহয় এদিকটা দিয়ে নদীর পানি প্রবাহিত হয়। তার ফলে জায়গাটা এই রকম। পশ্চিম পাশটা আবার উঁচু। ওরকম চল্লিশ পঞ্চাশটা বাড়ি। টিনের ঘর। গরু রাখার গোয়াল আর মানুষের কর্মব্যস্ততা। এতবড় চরটির এই হচ্ছে মূল চেহারা। লাল সবুজ রংয়ের স্কুল ঘরটি বন্ধ পড়ে আছে।

আমাদের দেখে খুব যে একটা উৎসাহিত হলো চরের মানুষ, তেমন মনে হয়নি। লতাদের বাড়িতে  সাড়া পড়েছে। তাও রান্নাবান্না আর খাওয়া দাওয়ার। আমার চিফ অ্যাসিস্ট্যান্ট জাকারিয়া জামান। তার সঙ্গে আছে দীন ইসলাম। এই দুজন আর ক্যামেরাম্যানকে নিয়ে সেই রোদের মধ্যেই ঘণটাখানেক ঘুরে ঘুরে চরের জীবনযাত্রাটা লক্ষ্য করলাম। আজ শুধু দেখে রাখা। শুটিং করব কাল সকাল থেকে। স্ক্রিপ্ট করা আছে। লোকেশান দেখার পর কিছু কিছু অংশ চেঞ্জ করতে হবে। দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ করে ঘণ্টা দুয়েক সেই কাজ করেছি।

খাওয়াটা হয়েছে চমৎকার। নদীর তাজা মাছ। কাতল মাছটা ছিল খুবই স্বাদের। সঙ্গে ছোট ছোট অনেক মাছ। লতার মায়ের রান্না অসাধারণ। তিনি মানুষটাও খুব ভালো। হাসি মুখের মায়াবী ধরনের চেহারা। একে স্নেহপরায়ণ মা, অন্যদিকে হাসিমুখের মানুষ। এই দুইয়ের ফলে তার সামনে বসে খেয়ে খুবই পরিতৃপ্ত হয়েছি।

বিকেলে দলবল নিয়ে চরের যতটা সম্ভব ঘুরে দেখলাম। নানা রকমের মজা আর গল্পগুজবে কেটে গেল। সোলার সিস্টেমে প্রত্যেক বাড়িতেই জ্বলে আলো। তবে রাত ন’টার দিকে অন্ধকার হয়ে যায় চারদিক। সন্ধ্যার পর চায়ের দোকানে বসে খানিক টেলিভিশন দেখে সবাই। চা খায়, আড্ডা দেয়। আটটার মধ্যে বাড়িতে এসে খেয়েদেয়ে ঘুম। কোচখালির চরে তখন হাওয়ার শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই।

এই জীবনযাত্রাটাই ডকুমেন্টরিতে তুলে আনতে চাই। চরের মানুষের সঙ্গে কথা বলব। নারী পুরুষ শিশু কিশোর বৃদ্ধ যাদের যাদের সঙ্গে কথা বলব, চঞ্চল হিমুন আর লতা তাদেরকে ঠিক করেছে। লতার ভাইয়ের প্রভাব অনেক। আমরা তাদের বাড়ির অতিথি। সুতরাং লোকজন বেশ স্বতঃস্ফূর্ত।

সারথী থিয়েটারের অভিনেতা অভিনেত্রী যারা আছে তাদের নিয়ে একঘণ্টার নাটকটা করব। একটা চ্যানেলের সঙ্গে কথা পাকা করে এসেছি। নাটক তৈরি হয়ে গেলেই এডিট করে, মিউজিক লাগিয়ে জমা দিয়ে দেব। যে কোনও ছুটির দিনে প্রাইম টাইমে নাটক ওরা চালিয়ে দেবে। সেই নাটকের স্ক্রিপ্টও করে এনেছি। কপি দিয়ে দেওয়া হয়েছে শিল্পীদের। তারা ডায়লগ মুখস্থ নিয়ে ব্যস্ত। গল্পটা এই রকম যে, শহর থেকে কয়েকজন মানুষ এসেছে এক চরে। সেই চরে তিনদিন থাকবে। এই তিনদিনে তাদের উপলব্ধি কী রকম ? শহরে তারা কী ধরনের জীবন কাটায় আর এই নিভৃত চরের মানুষের জীবন কেমন ? একই দেশে বসবাসকারী দুটো শ্রেণিকে দেখানো হবে নাটকে। যে যার জায়গা থেকে সমস্যাগুলো উপলব্ধি করবে। একজন অসুস্থ হবে, তাকে নিয়ে ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে নাটক শেষ হবে।

রাতেরবেলা নাটকের স্ক্রিপটা নিয়েও কিছু কাজ করেছি। ঘুমাতে ঘুমাতে এগারোটা বেজে গেছে। ততক্ষণে চাঁদ উঠেছে। খোলা জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসেছে ঘরে। সঙ্গে আসছিল হু হু করা হাওয়া। খুবই ভাল লাগছিল আমার। অদ্ভুত একটা আনন্দ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ছিলাম।

ঘুম ভাঙল ঘোড়ার ওই চিঁ হিঁ হিঁ ডাকে। ঠিক জানালার ওপাশ থেকেই যেন এল ডাকটা। খুব জোরে না, মৃদু।

 এত রাতে ঘোড়া ডাকছে কেন ?

চরে ঘোড়া অনেক আছে দেখেছি। সেই ঘোড়া কোনওটা না কোনওটা ডাকতেই পারে। ওই নিয়ে ভেবে লাভ কী! আবার ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম। ঘুম এল না। ভাবলাম, বেরোই একটু ঘর থেকে। চাঁদের আলোয় কেমন দেখাচ্ছে ঘুমিয়ে পড়া চর, একটু উপলব্ধি করি। জানালার কাছে কোন ঘোড়া ডাকছে তাও দেখি। কিন্তু জানালা দিয়ে তাকিয়ে  ঘোড়া দেখতে পেলাম না। কোনও গৃহস্থ কি তাহলে তাদের ঘোড়া ছেড়ে দিয়েছে! ছাড়া ঘোড়া আমার জানালার সামনে এসে একবার ডেকেই কি অন্যদিকে চলে গেছে! এমন তো হতেই পারে!

ঘোড়ার ডাক নিয়ে আর ভাবলাম না। ঘর থেকে বেরিয়ে নদীর দিককার খোলা জায়গাটায় এসে দাঁড়ালাম। তখন চোখে পড়ল ঘোড়াটাকে। এদিকটায় সবুজ মাঠ। মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ঘোড়া। কিন্তু বড় ঘোড়া না। ঘোড়ার বাচ্চা। অশ্বশাবক। বোধহয় অল্প কয়েকদিন বয়স হবে। এই শাবকই কি ডেকেছিল! ধীরে ধীরে শাবকটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, শাবকটি চিঁ হিঁ হিঁ করে একবার ডাকল। যে ডাকে আমার ঘুম ভেঙেছিল ঠিক সেই রকম ডাক। তারপর দেখি শাবকটি ধীর পায়ে উত্তর দিকে হাঁটা ধরেছে। কিছু না ভেবে আমিও তার পিছু পিছু হাঁটতে লাগলাম। কোনও কারণ নেই তবু হাঁটছি।

কারণ নেই বলাটা বোধহয় ঠিক হলো না। কারণ অবশ্যই একটা আছে। তা হলো আমার মধ্যে নিশ্চয় একটা কৌতূহল তৈরি হয়েছে। আমি আসলে দেখতে চাইছি, এইটুকু অশ্বশাবক রাত দুপুরে একা একা হেঁটে কোথায় যায় ? এ পর্যন্ত দুবার তার ডাক শুনেছি। দুবারই ডাকটা খুব করুণ মনে হয়েছে। মনে হয়েছে গভীর কষ্টের ডাক যেন ডাকছে। সেই ডাকে লুকিয়ে আছে ভারি বিষণ্ন এবং বেদনার সুর। ধীরে ধীরে হাঁটছে সে আর মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাচ্ছে।

চাঁদ এখন মাথার ঠিক উপরে। ব্রহ্মপুত্রের স্রোতের মতো হাওয়া বইছে। নদী বয়ে যাওয়া শব্দ আর হাওয়ার শব্দ ছাড়া কোনও শব্দ নেই। চরের বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি থেকে অনেকটা দূরে চলে এসেছি। ফলে ঘুমভাঙা শিশুর কান্নার শব্দ পাওয়া যায় না। গরু ঘোড়ার শব্দ পাওয়া যায় না। ম্যা ম্যা স্বরে ডাকে না কোনও ছাগল। রাত জাগা পাখির ডাক তো নেই।

এই একটা বিষয় চরে এসে লক্ষ্য করেছি, চরে পাখি বলতে গেলে নেই। মাথার ওপর দুয়েকটা চিল দেখেছি। কাকও দেখেছি খুব কম। বিকেল শেষ হয়ে আসা আলোয় দেখেছিলাম নদী আর আকাশের মাঝখান দিয়ে ঝাঁক বেঁধে উড়ে যাচ্ছে পরিযায়ী পাখি। এছাড়া কোনও পাখি আমার চোখেই পড়েনি।

শাবকটি যেদিকে হাঁটছে সেদিকটায় বেশ কিছু গাছপালা আর কলাগাছের ঝাড়। এমনিতেই নির্জন চর। তারপর এদিকটা আরও নির্জন। চাঁদের আলো থাকার পরেও কেমন একটু গাছমছমে পরিবেশ। একে মধ্যরাত, চরের সব মানুষ ঘুমে আর আমি গভীর কৌতূহল নিয়ে এইটুকু এক অশ্বশাবকের  পেছন  পেছন হেঁটে যাচ্ছি! দেখতে চাইছি কেন ওই নির্জন গাছপালার দিকে যাচ্ছে শাবকটি! এইটুকু শাবক মাকে ছেড়ে কেন একা একা এতদূর চলে এসেছে! কেনই বা ওভাবে হেঁটে যাচ্ছে! ভাগ্যিস এই চরে শেয়াল নেই। তাহলে নিশ্চয় বড় বিপদে পড়ত শাবকটি। শেয়ালের দল এতক্ষণে ছিঁড়েখুঁড়ে খেত তাকে।

কোচখালির চরে আমি কয়েকটা কুকুর দেখেছি। নেড়ি কুকুর। স্বাস্থ্য ভালো, তবে খুবই নিরীহ ধরনের। মানুষের পায়ে পায়ে ঘুরে ঠিকই কিন্তু মোটেই হল্লাচিল্লা করে না। হয়ত সদর থেকে কখনও কোনও গৃহস্থ একজোড়া নর আর মাদি কুকুর নিয়ে এসেছিল এই চরে। বংশবৃদ্ধি করে তারা সংখ্যায় বেড়েছে। কুকুরেরা সাধারণত রাতের বিভিন্ন প্রহরে ডাকাডাকি করে। কুকুরের চরিত্রই এমন। চোর ছ্যাচরের হাত থেকে গৃহস্থদের সাবধান করে। অচেনা লোক দেখলে সন্দেহের ডাক ডাকে। আশ্চর্য ব্যাপার, আজকের এই রাত দুপুরে চরের একটা কুকুরেরও আওয়াজ নেই। মানুষের মতো তারাও যেন গভীর ঘুমে।

কলাবনের ওদিকটায় এসে শাবকটি দাঁড়াল। আকাশের দিকে মুখ তুলল। তারপর সেই আগের মতোই করুণ বিষণ্ন স্বরে, গভীর বেদনার স্বরে পর পর তিনবার ডাকলো। কিন্তু এবারের ডাক চিঁ হিঁ হিঁ হিঁ না। আমি পরিষ্কার শুনতে পেলাম, অতি করুণ সুরে এক মানবশিশু যেন তার মাকে ডাকছে। মা মা মা মা, মা মা মা মা, মা মা মা মা। যেন অসহায় শিশুটিকে ফেলে তার মা কোথাও হারিয়ে গেছে। আর সেই শিশু রাত দুপুরে চরের নির্জন প্রান্তে সেই মাকে খুঁজে ফিরছে।

এই সময় অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটল। আকাশের অনেক ওপর থেকে চাঁদের আলো ভেঙে কী যেন একটা উড়ে আসতে লাগল চরের দিকে। প্রথমে পাখির মতো দেখাচ্ছিল, পরে আমি পরিষ্কার দেখতে পেলাম একটা বিশাল আকৃতির ঘোড়া উড়ে আসছে। সাদা ঘোড়া। তার পাখা দুটোও ধবধবে সাদা। চাঁদের আলোয় সব রংই ছাইরং মনে হয়। লাল কালো সাদা সবুজ যাইহোক, সবই হয় অ্যাশ কালার। কিন্তু এই পাখাঅলা ঘোড়াটির রং স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ধপধপে সাদা। আমার মতো শাবকটিও সেই দৃশ্য আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল। গভীর আনন্দের ডাক ছেড়ে কলাবনের দিকে দৌড় দিল।

আমি তখন আর যেন নিজের মধ্যে নেই। অদ্ভুত এক ঘোর তৈরি হয়েছে শরীরে আর মনে। আমি কোথায় আছি, কী করছি, কিছুই মনে রইল না। খানিক আগে গাছমছম করেছে। একটু একটু ভয়ও যেন পাচ্ছিলাম। সেই গাছমছমে অনুভূতি আর ভয়ের লেশমাত্রও নেই এখন। শাবকটির পিছু পিছু আমিও দৌড়ে গেলাম গাছপালার বনের দিকে।

ততক্ষণে ডানাঅলা সাদা ঘোড়া কলাবনে এসে নেমেছে। সেদিকটায় গিয়ে আমি একটা ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়েছি। তাকিয়েছি সামনের দিকে। দেখি কলা আর অন্যান্য গাছপালার মাঝখানে ছোট্ট একটুকরো মাঠ। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে মাঠটুকু। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে ডানাঅলা সাদা ঘোড়া। রূপকথায় এই ধরনের ঘোড়ার কথা পড়েছি। এই ঘোড়াকে বলে ‘পঙ্খিরাজ’। চোখের সামনে রূপকথার সেই পঙ্খিরাজ দেখতে পাচ্ছি আমি!

দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।

ওদিকে শাবকটি যেন তার মাকে ফিরে পেয়েছে, এমন ভঙ্গিতে পঙ্খিরাজের তলপেটের কাছে গিয়ে ঢুঁ দিচ্ছে। মায়ের দুধ পান করছে। আর মা গভীর মমতার চোখে মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে আছে শাবকের দিকে। শাবক দুধ পান করছে আর মাঝে মাঝে আগের মতোই ঢুঁ মারছে মায়ের পেটে। আদরের মৃদু শব্দ করছে।

কতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখেছি মনে নেই। এক সময় দুধ পান শেষ করল শাবক। মায়ের মুখের সামনে এসে দাঁড়াল। গভীর মমতায় মা তার মুখ মাথা গলা চেটে চেটে আদর করতে লাগল। পঙ্খিরাজের বিশাল সাদা ডানা চাঁদের আলো পুরোপুরি আটকাতে পারেনি। ডানার ফাঁক ফোকর দিয়ে চিরকিকাটা জ্যোৎস্না পড়েছে মাঠের ঘাসে। নদী থেকে আসা পাগল হাওয়ায় সেই ফিন ফিনে ডানা একটু একটু দুলছে। সঙ্গে দুলছে ঘাসের ওপর পড়ে থাকা জ্যোৎস্না।

খানিকপর শাবককে শেষবারের মতো আদর করল পঙ্খিরাজ। ধীরে ধীরে এগোতে লাগল নদীর দিকে। শাবকটিও যাচ্ছে তার পিছু পিছু। নদীর কিনারে গিয়ে শাবকের দিকে একবার মুখ ফিরিয়ে তাকাল পঙ্খিরাজ। আমি পরিষ্কার দেখতে পেলাম তার দুচোখ বেয়ে দর দর করে নেমেছে কান্না। চোখের জল ফেলতে ফেলতে নদী কিনার থেকে আকাশের দিকে উড়াল দিল সে। এদিকে মা তাকে ছেড়ে যাচ্ছে দেখে শাবকটি যেন করুণ সুরে কাঁদতে লাগল। তার চিঁ হিঁ হিঁ ডাক যেন এখন বুকফাটা কান্না। মাকে উড়াল দিতে দেখে শাবক পাগলের মতো ছুটে গেল নদীর কিনারে। আর তখনই নদীর বুকে ভেঙে পড়ল তিরের অনেকখানি বেলেমাটি। যে জায়গাটুকু ভেঙে পড়ল ঠিক ওখানটাতেই দাঁড়িয়েছিল শাবকটি। ভাঙনের সঙ্গে সেও পড়ে গেল নদীতে। পুরো ঘটনা চোখের সামনে নাটক সিনেমার দৃশ্যের মতো দেখলাম আমি! ছুটে গিয়ে যে শাবকটিকে বাঁচাবার চেষ্টা করব সেই ক্ষমতা  ছিল না। আমার পা যেন পুরোটা গেঁথে গেছে চরের মাটিতে। সেই পা টেনে তোলার ক্ষমতা নেই। সময় কেটে যায় সময়ের মতো।

আসলেই কি আমি আমার চোখের সামনে এইসব ঘটতে দেখেছি! নাকি পুরোটাই স্বপ্ন! পুরোটাই বিভ্রম! রাত দুপুরে ঘর থেকে আমি বেরিয়েছি ঠিকই, হয়ত বা ঘোড়ার ডাক শুনে বেরোইনি। খোলা মাঠে ওরকম ঘোড়ার বাচ্চা আমি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখিইনি! তারপরের যে অলৌকিক ঘটনা, আকাশ থেকে পঙ্খিরাজের নেমে আসা, শাবককে দুগ্ধ পান করিয়ে ফিরে যাওয়া আর শাবকটি নদীতে পড়ে হারিয়ে যাওয়া এসবই হয়তো আমি কল্পনা করেছি। যেহেতু কল্পনাপ্রবণ মানুষ আমি। নাটক লিখি বা তৈরি করি। নানারকম ঘটনা ভেবে ভেবে লেখা সাজাই। এও হয়ত আমার তেমনি এক কল্পনার ফল। আসলে এসবের কিছুই ঘটেনি।

নিজের ঘরে ফিরে এসে আবার ঘুমাবার চেষ্টা করেছি। ঘুম আসেনি। মসজিদ ঘর থেকে ফজরের আজানের শব্দ ভেসে এসেছে। ধীরে ধীরে জেগে উঠেছে চরের মানুষ। নাটক সিনেমায় কাজ করা মানুষদের একটুবেলা করে ওঠার অভ্যাস। কিন্তু আমরা আজ সকাল সকালই উঠেছি। যত তাড়াতাড়ি কাজ শুরু করা যাবে ততই মঙ্গল। কাজ এগোবে দ্রুত।

নাশতা শেষ করে চা খেতে খেতে আমার খুব ইচ্ছা করছিল রাতের ঘটনাটা সবাইকে বলি। বললে সবাই বেশ মজা পাবে। হাসি ঠাট্টাও করবে কেউ কেউ। লতা ভালো গান গায়। হয়তো পঙ্খিরাজ শব্দটা শুনে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত গানের কয়েকটা লাইন গেয়ে শোনাবে। ‘ছেলেবেলার গল্প শোনার দিনগুলো এখন কত দূরে, আজ আসে না রাজার কুমার পঙ্খিরাজে উড়ে’।

তার মানে আজকালকার দিনে রূপকথার পঙ্খিরাজের গল্প শুনলে ছেলেবেলার স্মৃতিতে ফিরে যাওয়া সম্ভব ঠিকই, কিন্তু পঙ্খিরাজে চড়ে রাজার কুমার তো আর আসবে না। কোনও পঙ্খিরাজও আসবে না কোচখালির চরে তার ফেলে যাওয়া শাবককে দুধ খাওয়াতে। আমার বলা পুরো গল্পটাই হাস্যকর হয়ে যাবে। তারচেয়ে না বলাই ভালো।

সকাল এগারোটার দিকে ঘটল এক বিস্ময়কর ঘটনা। আমরা শুটিং শুরু করেছি ঠিক আটটায়। ক্যামেরাম্যানকে আগেই বলে রেখেছিলাম সে যেন সূর্য ওঠার আগেই ভোরবেলার কিছু শট নিয়ে রাখে। নদীর ওপারে সূর্য উঠছে, এরকম একটা শট নেয়। আর যেন নেয় সূর্য ওঠার পরে চরের জীবনযাত্রা যেভাবে শুরু হয়, সেই রকম কতগুলো শট। খুবই কর্মঠ এবং মেধাবী ক্যামেরাম্যান আমার। কাজগুলো সে ঠিকমতোই করেছে। শুটিং শুরু করার আগে শটগুলো আমাকে দেখিয়েছে। দেখে খুশি হয়েছি। যেমন চেয়েছি, তেমনি নিয়েছে শটগুলো। ভেরি গুড।

রোজিনা নামে অল্পবয়সি এক গৃহবধূর সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে শুরু হল ডকুমেন্টরির মূল কাজ। বধূটির রোদেপোড়া কর্মঠ চেহারা। তবে চেহারায় মিষ্টতা আছে। আর তার দাঁতগুলো ভারি সুন্দর। নদী থেকে সদ্য তোলা চাপিলা মাছের মতো ঝকঝকে। সেই দাঁত দেখে মুহূর্তের জন্য আমার মনে পড়েছিল কাল রাতের সেই ধপধপে সাদা পঙ্খিরাজের কথা। নিজেরই আসলে আমার বিশ্বাস হচ্ছে না, কল্পনায় এমন ঘটনা কেন ঘটবে ? হ্যাঁ, এই চরে ঘোড়া আছে। অতি নিরীহ ধরনের গৃহপালিত ঘোড়া। গৃহস্থলোকের মাল টানাটানির কাজ করে। সেইসব ঘোড়া দেখে এমন কল্পনা তো করার কথা না।

শুটিংয়ের সময় ঘন ঘন চা খাই আমি। নিজে যেহেতু স্মোকার না, সেহেতু আমার ইউনিটে ধূমপান নিষেধ। কেউ সিগ্রেট খেতে পারবে না। তবে চা খাবে যার যতবার ইচ্ছা। আয়নাল নামে একজনের ইন্টারভিউ করব। কিন্তু মধ্যবয়সী মানুষটিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শুটিংস্পটে ভিড় করে আছে বাচ্চাকাচ্চা আর উৎসাহী কিছু নারীপুরুষ। আয়নালের তেরো চৌদ্দ বছর বয়সী ছোট ছেলেটি আছে। সে উত্তরদিককার কলাবন দেখিয়ে বলল, বাবা ওদিকটায় গেছে। এখনই চলে আসবে। তার জন্য অপেক্ষা করার ফাঁকে চা খাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পর চিন্তিত ভঙ্গিতে হেঁটে এল আয়নাল। তাগড়া জোয়ান মানুষ। পরনে লুঙ্গি আর ময়লা নীল রঙের টিশার্ট। মাথায় ছোট করে ছাঁটা চুল। মুখভর্তি কালো দাড়িগোঁফ। বয়স হবে পঞ্চাশের ওপর কিন্তু চুল দাড়ি একটাও পাকেনি।

দূর থেকে আয়নালকে দেখেই ইউনিটের লোকজন উৎফুল্ল হল। ওই তো এসে পড়েছে। ক্যামেরাম্যান তৈরি। ইন্টারভিউ করবে হিমুন। সেও তৈরি। কিন্তু আয়নাল এসে বিষণ্ন গলায় বলল, আমার মনটা ভালো নেই। কথাবার্তা বলতে ভালো লাগবে না এখন।

কী হয়েছে আয়নাল সাহেব ? আপনাকে এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন ? কাল বিকেলেও তো দেখলাম আপনার উৎসাহই সবচাইতে বেশি! বসেন। এককাপ চা খান। তারপরে যদি কথা বলতে ভালো লাগে বলবেন, না লাগলে বলবেন না।

লতা বলল, অসুবিধা নেই। মনিরুল চাচা রেডি আছে। তার ইন্টারভিউটা এই ফাঁকে করে ফেলেন।

আয়নাল জলচৌকিতে বসে চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, শুটিং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শেষ করে চলে যান আপনারা।

কেন ? কী হয়েছে ?

এই চর থাকবে না।

ইউনিটের লোকজন এবং চরের যারা ছিল আয়নালের কথা শুনে সবাই আমরা হতভম্ব। চর থাকবে না মানে ?

ভেঙে যাবে। এই চর কিছুদিনের মধ্যেই ভেঙে যাবে। ব্রক্ষ্মপুত্র এই চর গিলে খাবে।

মুহূর্তে আতঙ্ক তৈরি হল মানুষজনের মধ্যে। এ ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগল। নানা রকমের আলোচনা শুরু হয়ে গেল। লতা উদ্গ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল, কেন আপনার মনে হচ্ছে এই চর ভেঙে যাবে ?

আয়নাল উদাস চিন্তিত গলায় বলল, ভাঙন শুরু হয়ে গেছে।

বলেন কী ?

হ্যাঁ গো মা। ওই কলাবনের দিকে গিয়েছিলাম। দেখে এলাম ভাঙন শুরু হয়ে গেছে। আর একটা ঘোড়ার মরা বাচ্চা ভেসে এসেছে ভাঙনের দিকে। অল্প কয়েকদিন বয়স হবে বাচ্চাটার।

শুনে ভেতরে ভেতরে আমি কেঁপে উঠলাম। মুহূর্তের জন্য দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইল। নদীর ওদিকটায় ভাঙন শুরু হয়েছে… ঘোড়ার মরা বাচ্চা … বয়স অল্প কয়েকদিন …। অদ্ভুত ব্যাপার। এরকমই তো ঘটতে দেখেছি কাল রাতে! আয়নালের কথার সঙ্গে তো সব মিলে যাচ্ছে! চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম, ভাঙন শুরু হয়েছে বুঝলাম, ঘোড়ার মরা বাচ্চার সঙ্গে ভাঙনের সম্পর্ক কী ?

সম্পর্ক একটা আছে। চরের যারা প্রবীণ আর বৃদ্ধ ঘটনাটা তারা জানেন।

আমরাও জানতে চাই আয়নাল সাহেব। একটু খুলে বলুন তো!

চায়ে চুমুক দিয়ে আয়নাল বলল, এই চরের বয়স হবে চল্লিশ বছরের মতো। তার আগে আমরা ছিলাম অন্য চরে। সেই চর যখন ভাঙতে শুরু করে, তখন এই চর জেগে উঠছিল। ওই চর থেকে এখানে এসে বাড়িঘর করলাম আমরা। কারণ  হলো, এই চরটাও একদিন আমাদের ছিল। একবার এই চর ভেঙে গেছে। অনেক বছর পর আবার জেগে উঠেছে। তার চল্লিশ বছর পর আবার ভাঙন শুরু হয়েছে। নদীর মালিক সরকার আর চরের মালিক চরের বাসিন্দারা। নতুন করে জেগে ওঠার পর মালিক হয়ে গেলাম আমরা। আমার দাদা একশো দশ বছর বেঁচেছিলেন। তাঁর শিশুবয়সে প্রথমবার তাঁরা এই চরে এলেন। ঘরবাড়ি জমিজমা করলেন। চল্লিশ বছর কেটে গেল। তারপর আবার ডুবে গেল চর। আমরা চলে গেলাম অন্য চরে। আবার যখন জাগল তখন আমরাই মালিক। নতুন করে এসে বসবাস শুরু করলাম। কিন্তু এই ভাঙনের সঙ্গে একটা অলৌকিক ঘটনা আছে। দাদার মুখে শুনেছি। চোখের সামনে সেই ঘটনা আমার দাদা দেখেছিলেন। দাদার আমল থেকেই গরু ছাগলের সঙ্গে ঘোড়া পালনও শুরু হয়েছিল চরে। আমার দাদার বাবা এক জোড়া ঘোড়া কিনে আনলেন। ধানের বোঝা টানতো সেই ঘোড়া। ধীরে ধীরে বংশবৃদ্ধি হলো। একঘোড়া থেকে অনেক ঘোড়া। একবার এক মা ঘোড়ার বাচ্চা হয়েছে। বাচ্চা হওয়ার দিনদশেক পর মা গেল মারা। বাচ্চাটা তখন রাত দুপুরে এমন করুণ সুরে ডাকতো, মনে হত এই বাচ্চাটা ঘোড়ার বাচ্চা না, মানুষের বাচ্চা। মা হারানো শিশু রাত দুপুরে ঘুম ভেঙে মাকে না পেয়ে কাঁদছে। এক চাঁদনী রাতে আমার দাদার ঘুম ভেঙেছে, শোনে ঘোড়ার বাচ্চাটা সেভাবে কাঁদছে। প্রথমে কান্নার শব্দটা ছিল কাছে। ধীরে ধীরে সেই কান্না চলে যাচ্ছে দূরের ওই কলাবনের দিকে। দাদা ভাবলেন, বাচ্চাটা একা একা কোনদিকে হেঁটে যাচ্ছে, একটু দেখে আসি। ঘর থেকে বেরোলেন। বেরিয়ে দেখেন মাঠ ভেঙে বাচ্চাটি উত্তরদিকে হেঁটে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাচ্ছে আর ওরকম মা মা করে কাঁদছে। দাদাও হাঁটতে লাগলেন তার পেছন পেছন। কলাবনের ওদিকটায় যাওয়ার পর দেখা গেল আকাশ থেকে সাদা একটা ঘোড়া উড়ে এল। পঙ্খিরাজ ঘোড়া। এসে বাচ্চাটিকে দুধ খাওয়াল, আদর করে নদীর কিনারে গিয়ে আবার আকাশে উড়াল দিল। বাচ্চা মা মা করতে করতে ছুটে গেল  পেছন  পেছন। নদীর কিনারে গিয়ে দাঁড়াতেই সেই জায়গার মাটি ভেঙে পড়ল নদীতে। সঙ্গে পড়ে গেল ঘোড়ার বাচ্চাটিও। ওই যে শুরু হলো ভাঙন, মাসখানেকের মধ্যে পুরো চর ব্রক্ষ্মপুত্রে বিলীন হয়ে গেল। কলাবনের দিকে এবারও শুরু হয়েছে ভাঙন। আর এবারও দেখা গেল ঘোড়ার মরা বাচ্চা। সুতরাং আমার মনে হয় এই চর আর থাকবে না। এই চর ভেঙে যাবে।

আয়নালের কথা শুনতে শুনতে কোন ফাঁকে আমি আমার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়েছি, টের পাইনি। চা কখন শেষ হয়েছে, তাও টের পাইনি। মানুষজন সবাই স্তব্ধ হয়ে আছে আর আমি পায়চারি করছি। এ কী করে সম্ভব ? আয়নাল যা বলল হুবহু সেই ঘটনাই তো কাল রাতে আমি চোখের সামনে ঘটতে দেখেছি। এখন আমি নিশ্চিত, ভুল কিছু দেখিনি। যা দেখেছি তা বাস্তব। কাল রাতে ঘটেছে। পৃথিবীতে বহু রহস্যময় ঘটনা ঘটে, যে ঘটনার কোনও ব্যাখ্যা নেই। অনাদিকাল থেকে বহু রহস্য লালন করে আসছে এই পৃথিবী। মানুষের সাধ্য নেই সেইসব রহস্য উন্মোচন করার। এইসব রহস্যের কাছে বিজ্ঞান অকার্যকর।

আমার অভিজ্ঞতার কথা আমি কাউকে বলিনি। ক্যামেরাম্যান খুবই স্মার্ট। আয়নালের কথা পুরোটাই সে রেকর্ড করেছিল। ডকুমেন্টরিতে সেই অংশটা খুব কাজে লেগেছে। কারণ তার কথাই সত্য হয়েছিল। সেই রাতের ওই ঘটনার চল্লিশ দিনের মধ্যে কোচখালির পুরো চর ভেঙে যায়। ওপারে জেগে ওঠে অন্য চর। সেই চরে গিয়ে বসত গড়েছে এই চরের মানুষ। নতুন চরটির নামও রেখেছে ‘কোচখালির চর’।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares