গল্প : মুনিরের আমলকী বন : নাসিমা আনিস

রেললাইনের গা ঘেঁষে একদা এই জায়গার নাম কামারপাড়া হলেও এখন এখানে না পাবেন কামার না পাবেন হাপড়ের হাঁসফাঁস কি হাতুড়ি পেটার শব্দ। বদলে  কিছুটা ঐতিহ্যের দিকে হাত বাড়িয়ে কিঞ্চিৎ অভিজাত নাম নিয়ে হাজার হাজার বহুতল ভবন আকাশ ছুঁয়েছে। ব্যতিক্রম আছে, সেটা নিয়েই কথা। এ পাড়ায় নারকেল গাছওয়ালা সেই দোতলা বাড়িটা যে খুঁজে পাননি সেটা আপনার সৌভাগ্য, খুঁজে পেলে অভ্যাসবশত আপনারও আমার মতো এটা নিয়ে কিছু একটা করতে ইচ্ছা জাগত। ঠিকই ধরেছেন, এটা একটা প্রায় মালিকহীন বাড়ি। মানে বাড়ির মালিকের বহুকাল হদিস না থাকায় মওকা এত কে বা কারা মনের সুখে ভাড়া দিয়ে কামিয়ে নিচ্ছে দুইপয়সা। কিন্তু সাহস নাই নিজের করে নেওয়ার। যাকগে, আমার কি! আমি মনির, অল্প ভাড়ায় থাকতে পারছি, এই যথেষ্ট।

তো আমাদের যৌথ ঘরের পাশে একটা বারান্দা আছে রেলিঙ ঝুরঝুর, লোহালক্কড় বেরিয়ে না পড়লেও পলেস্তারা খুলে খুলে পড়ে, গোড়ালিডোবা বালুময় একমাত্র বারান্দা এ কারণেই পরিত্যক্ত। সত্যি বলছি, দরোজাটা খুলে বারান্দায় যাওয়ার চেয়ে মই লাগিয়ে দোতলায় ওঠা কম শ্রমসাধ্য হতো। মানে বারান্দায় যেতে ভাঙা দরোজা নিয়ে নানা কসরত করতে করতে দু’এক ফোঁটা ঘাম পর্যন্ত নামিয়ে আনা কোনও দরকারি কথা নয়, অনেকের মতো আপনারও মনে হতে পারে। তা হোক, ঘাম আমার বারান্দাও আমার, এইটুকুই আমার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। তো বারান্দায় আমলকী বন (!), আমলকী বনে ঝিরিঝিরি পাতায় বাতাসে দাঁড়ালে এমন একটা আবেশ জড়িয়ে রাখে, যেন ফুলবনে আমি রাজকুমার, ঐ তো একটা রাজপথ! রাজপথে গমনাগমন সারাবেলা। রাজপথের ধারে দুটো মুদি দোকান ঘিরে রিকশার টুংটাং, মটরসাইকেল কিছু। কয়েকটা ভ্যান দাঁড়ায়, হাঁপায়, তাকায়, বনরুটি কলা খায়, একটু দূরে গিয়ে নিশ্চয় কোথাও চা হয়! কাছেই বাইলেন প্রবল হিতাকাক্সক্ষী বুড়া রফিক কমিশনারের শ্যাওলা দাঁত বের করা দোতলা তিনতলা বাড়ি, বুয়া খালাদের জন্য, তাই সারাদিন তাদের যাতায়াত জমজমাট এ পথে। কমিশনারের পেজগি মাথার কত কিছিমের ঘর যে এই বাড়িগুলোতে! শুধু ঘর আর ঘর, এজমালি রান্নাঘর আর পায়খানা কাম গোসলখানা―সবই কোনও এক চিপায়, রীতিমতো আবিষ্কার করতে হয় এগুলো। চিপা করিডোর ভিজা থাকায় অন্ধকার আরও ঘনীভূত, দেয়াল ঘেঁষে ঘেঁষে পানির গ্যালন, অ্যালুমিনিয়ামের কলস, আরও কিছু। ঠোক্কর খায় আগন্তুক, তারা খায় না, আমি একবার খেয়েছিলাম। তাদের চোখ শানদার, রাতে কখনও একটা হিন্দি কি বাংলা সিনেমা ছাড়া চোখের আর ক্ষয় কী, টাচ ফোন আর এমবি কেনার চক্করে এখনও পড়ে নাই, আলহামদুল্লিাহ! শত বুয়া, বুয়াময় সাম্রাজ্য। ময়মনসিং কি জামালপুর কি গফরগাঁও, দু’একজন পথভোলা ভাগ্যতাড়িত বরিশাল কি বগুড়া কি বরগুনা! স্বামীহীন স্বাধীন জীবনযাপন এদের, কদাচ দু’একজন স্বামীসহ বিশেষ বিবেচনায়। যেমন মোহর, দুই পাহীন পঙ্গু স্বামীকে নিয়ে বাস, চলাচল রাজকীয়, তাই তো বলি রাজপথ! এ পথে মোহর আসে যায়, দাঁড়ায়, উচ্চস্বরে কথা কয়। সকাল নটার দিকে চাকা দেওয়া ঘড়ঘড়ে সিটে বসে চলতে থাকে মোহরস্বামী। মোহর তাকে দোতলার ঘর থেকে কোলে করে নামিয়ে বসায় ঐ বস্তুতে। তারপর কিছুটা এগিয়েও দেয় কথা কইতে কইতে, তাও উচ্চস্বরে, স্বামীস্ত্রীর আড়াল নাই বিলকুল। তারপর পথের ’পরে দাঁড়িয়ে দীর্ঘকায় সুঠামদেহী দুবির্নীত মোহরের দাপুটে ভঙ্গিমা চোখে লেগে থাকে সারাদিন, এই না হলে নারী! সাবাস বেহুলা ইন্দ্রের দরবারে, সাবাস! ভাঙা একটা মানবগাড়ি কেমন প্রতাপে চালিয়ে নিচ্ছে দেখুন! আর বাকিরাও স্বপ্ন দেখতে দেখতে কাজে যায়, গ্রামে রেখে আসা মাদ্রাসায় পড়া ছেলে কি মেয়ে দাদি নানির হাওলায়, সদ্য কেনা তিন শতক ভিটার জমির মূল্য পরিশোধ অন্তে রেজিস্ট্রি, তারপর মাথা গোঁজার দোচালা চৌচালা ঘর। আরও আছে পরিকল্পনা, স্বামীকে একটা নিজস্ব ভ্যান কি মুদি দোকান আর নিজের জন্য একটা দুধেল গাই, এসব হলেই ফিরবে, বেহুলা থুড়ি মোহর বলেছে এসব। পাঁচ-ছয় বাড়িতে কাজের বিনিময়ে বারো তের হাজার কামাই, পোশাক কারখানায় কে করে গো চাকরি! খরচ বলতে ঘর ভাড়া, সামান্য রান্নাবান্না। ঈদ বোনাস, বকশিশ এসব তো ফুয়েল স্বপ্ন দানা বাঁধার।

তো ওদের স্বপ্ন লেগে থাকে চোখেমুখে আর সবচেয়ে বেশি পায়ে। দ্রুত চলা পা, দ্রুত চলা হাত। দ্রুততাই জীবন। হ্যাঁ একটু ফাঁকি তো তাতে থাকেই। আপোসে কোনও দিন যা হবার নয় তা নিজেদেরই অঘোষিত আইন, প্রতি সপ্তাহে একদিন করে কামাই, মোহর বলেছে। কুবেরে এত যদিও বলে না, এইডা জান গো খালাম্মা, একটু জিরানের লাইগ্যা কান্দে। পরদিন এসে কিছুই না বলে কাজ করতে থাকলে গৃহিণী চটে বটে, চটুক, কাজের কি অভাব! গৃহিণী ত্যাদোড় হলে বলে, পেট নামছিল গো খালাম্মা পায়খানায়ই বইসা দিন গেছে!

মোহরকে দেখি আমি, স্বপ্ন হাতড়ে মরি নানা পদের আইনি বেআইনি। বাড়ি থেকে আসা সামান্য টাকা গুনি, সামনের মাসে একটা টিউশনি হবে।

তো রাজপথে তারা যেমন দাঁড়িয়ে গল্প করে আমার তেমন আমলকীর বন, মনির বারান্দা। বারান্দা থেকে রাজপথ, মোহর!

গা ঘেঁষে এক বিখ্যাত সমাজসেবীর আমলকী গাছ আমার বারান্দায়। অন্তরা নামে বাড়ির সমাজসেবী আবার উদাসীন কুলশীল কবিও, আপনারা তাঁকে চেনেন। নিশ্চিন্তে মরার জায়গা থাকলে উদাস কবি হওয়াই যায়! দেয়ালে দেয়ালে টিউশানি খোঁজা লাগে না আমার এত! তাঁর অগোচরে এই পরিত্যক্ত বারান্দার অর্ধেকটা তাঁরই আমলকীর দখলে। আমি বলি, এই আমলকীটার মতো পয়মন্ত গাছ পৃথিবীর কোথাও নাই! সত্যি বলছি আমলকী আর মোহর প্রেরণা, আমার ছালবাকলহীন কবিস্বপ্নের। মোহরকে কীভাবে চিনলাম! এত কথা জানাতে পারব না, খারাপ ভাববেন স্বভাববশত! শুধু বলি, প্রাইভেট একটা হাসপাতালে দেখা। স্বামীর পচে যাওয়া দ্বিতীয় পা খানাও উরু থেকে কাটার পর মোহর দেনার দায়ে জর্জরিত, বাড়ি যাওয়ার পথ নাই দেনাদারদের ভয়ে, এই ঠিকানাটা আমিই তখন দিই। গায়েপায়ে জোর থাকলে দাঁড়িয়ে যাবেন তখন দেনাদাররাই আপনাকে ভয় পাবে!

একদিন সকালবেলা কিছু লোক নিচে হট্টগোল করতে লাগল, তারা এই বাড়িটা কিনে নিয়েছে, এ সপ্তাহের মধ্যে আমরা যেন খালি করে দিই। কে কী ভাবল জানি না, আমি আমলকী গাছটার কথা ভাবলাম, তার কী হবে! বারান্দায় কোনও রকম গুঁজে রাখা হাতলছাড়া চেয়ারটায় পাছা লাগিয়ে বসে আমার দিবাস্বপ্ন, কী ভবিষৎ এই স্বপ্ন দেখার! সারারাত ভাবলাম, কিছু পঙ্ক্তির জন্ম হলো। মোহর আর আমলকী নিয়েই সব, আমলকী বনে মোহর! শেষরাতে একটা বুদ্ধি আঁটলাম। পরদিন সকালবেলা উত্তেজনাবশে নীচে নামলাম লুঙ্গি পরে। মুদির দোকানে দশেবিশে মানুষের আগমন ঘটে সকালেই প্রভাত সঙ্গীতের মতো। জানি উৎসুক জাতির কেউ কিছু জানতে চাইবে, অন্তত দোকানদার। তাচ্ছিল্য নিয়ে বললাম, আরে কি বলেন, গত মাসে বাড়ি বিক্রি হয়ে গেছে না সোবহান সাহেবের কাছে! ক্ষমতাসীন এমপি। ঝামেলা করলে কোমরে দড়ি দিয়া নিয়া যাবে, জীবনের জন্য জেলের ভাত কনফার্ম। আমাদের কি, আমরা হইলাম ভাড়াইট্যা, আজ আছি কাল নাই! নির্মীয়মাণ পদ্মা সেতুতে ফেরির ধাক্কা রোজ রোজ, বস্তাপচা এসব খবর বাদ দিয়ে আমার দিকে তাকায় দুইজন।

দোকানি রহস্য নিয়ে হাসে, যেন তার সব জানা আছে।

 গত তিন বছর একজন কুরবান আলির নামে বিদ্যুৎ বিল আসে, আমরা এগারজন সেটা দিই। গ্যাস বিলের বই আছে, সেটাও দেওয়া হয় একই নামে। আমরা বুঝতে পারি আসলে পাড়ার পাতি মাস্তানের চোখ পড়েছে বাড়িটায়। কোরবান আলির নিখোঁজ সংবাদ তারা জেনে গেছে। আহামরি কিছু না, কাঠা দেড়েকের ওপর এক ইউনিটের ব্রিক ফাউন্ডেশনে গড়া দোতলা বাড়ি। বহু বছর কোনও হাত লাগান হয় নাই। ছায়া ছায়া রঙা হতদরিদ্র একটা চেহারা, চিমটি দিলে বালু উঠে আসতেও পারে। সারাদিন ভাবি, আচ্ছা, বড় নেতারা এইটার খবর পাইল না কেন! নাকি পাইছে, পিছনেই আছে! না তারা তো পিছনে থাকার লোক না!

আমার রুমমেট ইমান উদ্দিন শুধু জানে আমার ব্যাপারটা, মানে আমার বানানো জনৈক এমপি সোবহান সাহেবের বাড়ি কেনার ব্যাপারটা, শুনে সে খুশি, কবির মাথায় এত বুদ্ধি! ইমান উদ্দিন গাড়িতে কলম বিক্রি করে, কখনও গ্রন্থ। এককালে সে পকেটমার দলে ছিল। কী করে কী হয়েছে সবটাই বলেছে আমাকে। সব কথার আগে পরে বলে, আপনে কবি মানুষ… এই সব শুইন্যা কী করবেন! বছর কয়েক গা-ঢাকা দিয়ে দাড়িচুল রেখে, নাম পাল্টে মোটামুটি বেঁচে আছে এখন। ঠিক, তার কোনও জাতীয় পরিচয়পত্র নাই। বাড়িতে টাকা পাঠায় প্রত্যেক সপ্তাহে দুই হাজার। নিজের খরচ বলতে মাঝে মাঝে বাংলা সিনেমা আর একটু গাঁজা। গাঁজা সে ঘরে খায় না, খেয়ে আসে। এসে ঘুমায়। মাঝরাতে উঠে ঢাকা দেওয়া পচা ভাততরকারি খায় আর বুয়াকে গাল দেয় তুফান মেইলে। সকালে উঠে পায়খানায় দৌড়ায় ঘন ঘন আর এই বুয়া বিদায় দেয়ার পরামর্শ দেয় জনে জনে। তারপর যথারীতি ভদ্রলোকের মতো ব্যাগ ঘাড়ে বেরিয়ে যায়, দেখা হয় অনেক রাতে।

তো আমলকীর ঝিরঝিরে পাতার সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য, কিংবা মোহর, একটু শয়তানি বুদ্ধির দিয়ে এই কলম বিক্রেতাকে পাঠালাম আমলকী গাছের মালিকের কাছে। কাউকে না পেয়ে দারোয়ানকেই বলে এল এই বাড়ির নতুন মালিক সোবহান সাহেব, সচিব। আপনারা বাড়ির জঙ্গল পরিষ্কার করবেন, খুব মশা।

আমি বললাম, কি হইল! আমি বললাম এমপি, আপনে বললেন সচিব! আর জঙ্গল কই! এইটা তো আমলকী গাছ!

সে কালো দাঁতগুলো বের করে হাসে, বুঝেন না! সচিব এমপি দুই জায়গায় খুঁইজা মরুক! শুনে বাকি সদস্যরাও  বাসস্থান রক্ষার শেষ চেষ্টায় অট্টহাসি দেয়। 

তারপর চুপচাপ। আমলকীতে ফুল আসে মার্চের আলোয়, ফল আসে ঝেঁপে, শান্তি শান্তি। ঝোপঝাড়ে মাথা রেখে রাস্তা দেখি। বাড়িটা আমাদের সোবহান সাহেবের, সচিব কি এমপি, মন্ত্রী হলেই ভালো হতো! এগারজন মেসবাসীর মালিক সোবহান সাহেব। কুরবান আলির দেখা নাকি গত এক দশক কেউ পায়নি, কোথায় মরে হেজে গেছে, যাক সে হারিয়ে যাক জীবনের জন্য! যে লোক ভাড়া নিতে আসে প্রতিমাসে সে কোথা থেকে সোবহান সাহেবের খবর পেয়েছে জানি না। একদিন ফোন দিয়ে বলে, সোবহান সাহেব কে ?

কি জানি এমপি নাকি সচিব, আমাদের নতুন মালিক।

আসছিল!

আমি তো দেখি নাই, তারা বলছে দুইটা পাজেরো নিয়া আসছিল কয়দিন আগে।

কী কয় ?

ডেবলাপারকে দিয়া দিবে নাকি।

এদ্দুর জমি দিয়া ডেবলাপাররা কি করব!

আশ্চর্য, এর পর এই লোক আর ভাড়া নিতে আসে না। তিন মাসে আমাদের ফান্ডে বেশ টাকা জমে যায়। যে কোনও দিন একটা কাণ্ড হতে পারে নতুন, যে কেউ মালিকানা দাবি করে বসতে পারে। আমরা মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে রাখি যে কোনও কিছুর জন্য। বাড়ির সামনে একটু জায়গা পড়েছিল ফালগুনচৈত্রের ধুলাআবর্জনা নিয়ে। মাসুমবিল্লাহ বলল একটা কাজ করি, এখানে একটা চালা দিয়া সবজি দোকান ভাড়া দিই, না হলেও পাঁচ হাজার আসবে, আমাদের বিদ্যুৎ-গ্যাস বিলটা হয়ে যাবে।

সুখই সুখ! এগারজনের টিম। টোটাল ফুটবল।

এত শান্তিতে থেকে একদিন আবার আমলকী গাছের দারোয়ানকে খুব শাসিয়ে আসল একজন, যত্তসব জঙ্গল আমাদের বারান্দায় আসে, মশায় বাঁচি না, পরিষ্কার কর!

আর সেই রাজপথ দিয়ে ময়মনসিং জামালপুর জেলাবাসিনীদের দেখার সময় যেন কমে আসে আমার, স্বপ্ন বড় রাস্তায় পড়ে চলতে শুরু করেছে নাকি! ধমকি খেয়ে আমলকীর ডাল কেটে ন্যাড়া করে দিলে ফর্শা চারধার। টিউশানি থেকে এসে এই দৃশ্যে যতটা খারাপ লাগার কথা ছিল তা কিন্তু হলো না। ফাঁকা বারান্দায় বসে দূর বাড়ির বারান্দায় চোখ রাখি। মোহর কি কিছুটা ধোঁয়াশা!

মুদির দোকানি একদিন বোমাটা ফাটালো। বলে, সোবহান সাহেব আসে ?

কম আসে, ব্যস্ত মানুষ। কেন্!

আপনেরা কয়জন থাকেন!

দশ এগার জন, কেন্!

এত কেন্ কেন্ করেন কেন্! দেখবেন কয়দিন পর!

তারপর সত্যি দিন পনের পর পাড়ার সেই পাতিনেতা আর আমাদের দুইজন এক সঙ্গে এসে পা ফাঁক করে দাঁড়ায় যেন জিপার খুলে পেসাব করে দিলে আমরা ভেসে যাব। তারপর ঘাড় ঘুরায় ঘুরায় কথা কয়। তারা এই বাড়ির মালিক, কাগজপত্র সব ঠিকঠাক। সামনের মাসে নয়, এ সপ্তাহে নয়, কালপরশুর মধ্যে সব সরতে হবে নইলে পুলিশ আসবে।

আমরা হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি, দুঃখে কষ্টে পাঁচজন রাতে ভাত খাই না। মেসের নতুন মালিক দুজন মেস ছেড়ে যায় জিনিসপত্র ফেলে। মাঝরাতে ফেরা ইমানউদ্দিন ভাত খায় আর হাসে, তাইলে এই ঘটনা! ঘরে শত্রু বিভীষণ! মেসের এই দুজনকে কতবার যে খুন করি, বিষ খাওয়াই, বাড়ির নিচে জ্যান্ত পুঁতে সিমেন্ট করে রাখি, কালো বিড়ালটা খালি চকচকা সিমেন্টে বসে কাঁদে, পুলিশ আসে, ধরা পড়ি, হাজতে যাই, কাশিমপুর জেলে চালান হয়, যাবজ্জীবন সাতজনের।

না, সে সব কিছুই হয় না। পরদিন ভোরে খাঁটি মালিক কোরবান আলি হাজির, আমেরিকা থেকে ফিরেছেন কয়দিন আগে। বছর কয় সে দেশের জেলে বাস করতে হয়েছে দেশি ভাইয়ের প্রতারণায়, সেখানে তাঁদের রিয়েল স্টেটের ব্যবসায় গ্রাহক প্রতারণার মামলা।

 কয়েকমাস থাকতে পারব আমরা এখানে, বলতে গেলে এটা আমাদের জন্য তাঁর সহানুভূতির পরাকাষ্ঠা। বাড়িটা ঠিকঠাক করবেন কিছুদিন পর কিংবা নতুন করে, ইনজিনিয়ার দেখার পর বুঝবেন।

বিশ^াসঘাতক শালা দুইটা চলে যেতে চায় চৌকি নিয়ে, আমরা বলি তোমরাও থাক, হঠাৎ কই যাবা, যা হওয়ার হইছে।

মুখ চুন করে ওরা দু’জন ঘুরে বেড়ায় চোখের সামনে, আহারে! ধারদেনার কাদায় আকণ্ঠ ডুবে আছে নাকি, জাল দলিল, পাতিনেতা, কমিশনার আর পুলিশকে দিতে দিতে জেরবার। এই ঘটনায় আমাদের কারও বিমলানন্দ, কারও আবার দুঃখও হয়। দুই নাদান হোঁদলকে নিয়ে এর বেশি আর কী করতে পারি আমরা! আসলে ক্ষমা না করে উপায় কী, আমার আপনার সকলেরই তো কিছু পরিকল্পনা আগাচ্ছিল এই বাড়ি নিয়ে, না!

চলেন বাথরুমের দরোজায় যার যার পরিকল্পনা লিখে রেখে যাই জলে কি কালিতে, ভাবিলোক এক ধাপ এগিয়ে থাকবে! ইমানউদ্দিন আমার কথা মতো প্রথম লিখে আসল। আমি লিখব সবার শেষে।

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত    

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares