গল্প : ক্যাম্পে : ফয়জুল ইসলাম

অপারেশন সার্চলাইটের পরপরই, এপ্রিলের শেষের দিকের কোনও একদিনে, দিলালপুরের রাধে-গোবিন্দ মন্দিরের উল্টোদিকে যে বিশাল বাড়িটা রয়েছে সেটা ফেলে রেখে পীতাম্বর বসাকরা চলে গেছে। তারা কোথায় পালিয়ে গেছে তা কেউ জানে না―হয়ত তাদের পৈতৃক নিবাস ভাঙুরাতে, হয়তবা কৃষ্ণনগরে অথবা কোলকাতায়। সেই থেকে পরিত্যক্ত বাড়িটাতে রাজাকার-ক্যাম্প গড়ে তুলেছে পাবনা শহরের শান্তিকমিটির সভাপতি ইসমত মওলানা। প্রায় একশ বছরের পুরনো বাড়িটার পুবদালানের সিঁড়িতে এই মুহূর্তে বসে আছে মোসলেম এবং আবুল। তারা পাতার বিড়ি টানতে টানতে নজর রাখছে চারদিকে। আজ দুপুর থেকে শুরু হয়েছে তাদের নজরদারীর দায়িত্ব ―পাকিস্তান-আর্মির জওয়ানরা যাকে বলে ‘সেন্ট্রি ডিউটি’। মোসলেম আর আবুল অবশ্য ফৌজি কায়দায় মাটিতে রাইফেলের কুঁদো বসিয়ে রেখে ঠায় দাঁড়িয়ে নেই―সিঁড়িতে তাদের থ্রি নট থ্রি রাইফেল হেলান দিয়ে রেখেই হাত-পা ছড়িয়ে দিয়ে বসে আছে তারা। তাদের পরনে আছে খাকি রঙের একটা জামা, চল্লিশ সুতোর মোটা একটা লুঙ্গি আর খাকি রঙের কনভার্স জুতো, জুতোর সঙ্গে অবশ্য মোজাটোজা কিছুই নেই। এবাদে মাস গেলে তাদেরকে বেতন-ভাতা হিসেবে মাত্র পঞ্চাশ টাকা দেওয়া হয়। এসব গরিবানা হালের কারণে তাদের অবশ্য বিন্দুমাত্র অভিযোগ নেই। শহরের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে তারা প্রতিদিন  সোনাদানা, মালপত্তর আর ক্যাশ লুট করতে পারছে বলে তারা বেজায় খুশি। কাজেই পাকিস্তানের ভাঙন আটকানোর জন্য তারা তাদের প্রাণপাত করে দিচ্ছে―গোপালপুর-দিলালপুর-পাথরতলা এলাকাতে মহোৎসাহে অভিযান চালিয়ে পুরুষদের ধরে আনছে, তুলে নিয়ে আসছে কিশোরী থেকে শুরু করে মধ্যবয়স্ক মেয়েদের, খবর নিচ্ছে যে মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা কোনও বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে কি না, ইত্যাদি। এসব কাজে তাদের কোনও ক্লান্তি নেই। তাদের মতো পাতি রাজাকারদের কমান্ডার শমসের মৃধা বলে, পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য ঘুম হারাম করে দিতে হবে। পুণ্যভূমি রক্ষা করাটা  তো আর সোজা কোনও কাজ নয়! সেই শমসের মৃধার জন্যই অপেক্ষা করছে মোসলেম আর আবুল।

গেরিলাযোদ্ধারা আগস্টে ভারতীয় সীমান্ত পার হয়ে পাবনায় ঢুকে পড়েছে; পাকিস্তানি আর্মি আর রাজাকারদের বিরুদ্ধে জায়গায় জায়গায় শুরু করে দিয়েছে তাদের চোরাগোপ্তা হামলা। সেই থেকে পাবনা শহরের বিভিন্ন পাড়ায় এবং গ্রামে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া, মানুষ খুন করা আর ধরপাকড় জোরদার করেছে পাকিস্তানি সৈন্য এবং তাদের দোসর রাজাকাররা। পীতাম্বর বসাকদের বাল্মিকী-আমলের এই বাড়িটার ছ’টা ঘর সেই থেকে বন্দি দিয়ে ভরে গেছে। ক্যাম্পে আটকে রাখা বন্দিদের পেটান, তাদের নখের নিচে সুঁই ফুটিয়ে দেওয়া, হাতে ইট ঝুলিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা, পায়ুপথে ডিম দেওয়া বা মেয়েদের ধর্ষণ করার ভেতরে সীমাহীন একটা আনন্দ আছে বটে! কিন্তু সেইসঙ্গে বন্দি-ব্যবস্থাপনার দায়-দায়িত্বটাও তো মোসলেম আর আবুলদের মতো পাতি রাজাকারদেরকেই গ্রহণ করতে হয়। কাজটা সোজা কিছু হলে তো কথাই ছিল না! এই যেমন, পুবদালানের সর্ব দক্ষিণের ঘর থেকে এই মুহূর্তে কোনও একজন পুরুষ বন্দির ম্রিয়মাণ কণ্ঠের আর্জি শোনা যাচ্ছে―‘ভাই! মুতপের যাব!’; উত্তরের দালানের কোনও একটা ঘর থেকে একই সময়ে ভেসে আসছে খুনখুনে কোনও নারীর চিৎকার―‘ঐ! লোটির ছাওয়ালরা! ক্ষিধে পায়ছে আমাগারে। দুইফর গড়া সারে বিকেল হয়ে গেল! খাবের দিবু কি দিবু লয় ?’ বন্দিদের এসব আর্জি বা চিৎকারে সব সময় যে কাজ হচ্ছে এমনটা বলা যাবে না! এসব হারামখোরদের তো আরাম করে শুয়ে থাকা আর মজাসে মুরগি-মুসাল্লাম খাওয়ার জন্য ক্যাম্পে ধরে আনা হয়নি! তবু তো এরা মানুষ―তাদেরকে খেতে হবে, মুততে হবে, হাগতেও হবে! ভেজালটা এখানেই! বাণী সিনেমাহলের পাশের রেস্টুরেন্ট অথবা এলাকার বাসাগুলো থেকে এদের জন্য নিয়ম করে রুটি আর ভাজি তুলে না আনলে চলে না, তাদের পায়ে বেধে রাখা রশিটশি খুলে সার্ভিস ল্যাট্রিনেও নিয়ে যেতে হয় তাদেরকে, ল্যাট্রিনের মুখে দাঁড়িয়েও থাকতে হয় ঠায়। বন্দিদেরকে এভাবে খুব সাবধানে পাহারা না দিয়েও তো উপায় নেই! হয়েছে কী―ক’দিন আগে, এই ক্যাম্পে, দু’টো বাজে ঘটনা ঘটে গেছে―ল্যাট্রিন থেকে বেরিয়ে সোজা ইঁদারায় ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মাহুতি দিয়েছে জবা নামের পাথরতলার একজন হিন্দু কিশোরী; আর মুকতাদির নামের একজন তরুণ―গোবিন্দার, করেছে কী― মোসলেমকে এক ধাক্কায় মাটিতে ফেলে দিয়ে, আঁচড়ে―পাঁচড়ে আমগাছ বেয়ে, দেয়াল টপকে পালিয়ে গেছে জেলা স্কুলের পেছনের পুকুরটার দিকে। মোসলেমদের কমান্ডার শমসের মৃধা তখন দায়িত্বজ্ঞানহীনতার জন্য মোসলেমকে চড়-থাপ্পড় মেরেছিল; তারপর প্রশ্ন করেছিল―এ ভেড়াচুদা! তোক রাইফেল দেওয়া হয়ছে কীসের জন্যি ? রাইফেলের নল দিয়ে নিজির পেটের সব কিরমি বাইর করে আনার জন্যি নেকি ? এ প্রশ্নের উত্তর তো সকলেরই জানা―রাইফেলের গুলি থাকে কোথে, কোথের চাবি থাকে শমসেরই হাওলায়! কাজেই অকুস্থল থেকে পলায়নপর কোনও বন্দিকে গুলিবিহীন রাইফেল দিয়ে খতম করতে পারার কোনও প্রশ্নই ওঠে না! ব্যাপারটা তো এমন নয় যে লাঠি নিয়ে গোবিন্দার তরুণকে দাবড়ায়নি মোসলেম! তরুণের গতির সঙ্গে পারা যায়নি আরকি!

পুবদালানের সর্ব দক্ষিণের ঘরটা থেকে যে পুরুষ বন্দি এখন আর্জি জানাচ্ছে―‘ভাই! মুতপের যাব!’, বারান্দায় বসা আবুল বিড়ি টানতে টানতে উত্তর দিচ্ছে তাকে, ‘শুয়োরের বাচ্চা! মুত আটকা রাখেক! ইট্টু পরেই শমসের ওস্তাদ আসপিনি; রড দিয়ে বাড়ে এমনিই তোক মুতা ফেলাবিনি তহুন!’ আর উত্তরের ঘরগুলোর দিকে তাকিয়ে বেয়াদব এক মধ্যবয়স্কা বন্দির উদ্দেশে মোসলেম গলা ফাটিয়ে বলছে, ‘চুপ করে থাকেক শালির বিটি শালি! আরেকবার ‘ক্ষিদে, ক্ষিদে’ করলি পরে তোর গুদের মধ্যি শিসি ভরে দেবনে! কাইল যিন কার গুদে শয়লা বাগুন ঢুকাইছিলাম আমি! খানকি মাগীর নামও মনে পড়তেছে না! সবগুলেনেক দেখতি একই রকমেরই লাগতাছে আজকাইল! তাজ্জব কথারে ভাই!’

মোসলেম আর আবুলের এসব আস্ফালনের মাঝে তাদের ঠিক পেছনের ঘরটা থেকে ভেসে আসে  কোনও পুরুষের গমগমে আওয়াজ, ‘আসরের ওয়াক্ত পার হয়ে যাচ্ছে। হাত-পা’র বান্ধন খুলে দে তো! নামাজডা পড়ে লেই!’ এবার কথা বলছে জেলাপাড়ার পাটের ব্যবসায়ী সাতাত্তর বছর বয়স্ক মোহাম্মদ রসুল। এই মোহাম্মদ রসুলকে নিয়ে যন্ত্রণা হয়েছে মোসলেম, আবুল আর তাদের কমান্ডার শমসের মৃধার। পাবনা শহরের শান্তি কমিটির সভাপতি ইসমত মওলানা তাদেরকে বলে পাঠিয়েছে, রাজাকারদের কেউ যদি মোহাম্মদ রসুলের গায়ে হাত তোলে তবে সেই সীমা লঙ্ঘনকারীর খাপরিতে ইসমত মওলানা নিজের হাতে পিস্তলের বুলেট ভরে দেবে! এই মহব্বতের কারণ বুঝতে পারে না মোসলেমরা। তারা কেবল এ দু’জন মানুষের পারস্পরিক ঘৃণার উৎস সম্পর্কে জানে। দিলালপুর-গোপালপুর- পাথরতলার দশজন মানুষ বলাবলি করে, দূরকৈশোরে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মাঠে জেলাপাড়ার মোহাম্মদ রসুল এবং তার ছোট ভাই মোহাম্মদ সালামের সঙ্গে বিস্তর ফুটবল খেলেছে পাথরতলার ইসমত মওলানা। সেই সূত্রে সদ্ভাবই ছিল তাদের মধ্যে। কিন্তু দেশভাগ নিয়ে ভিন্ন অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে গেছে তাদের ভেতরের লেনাদেনা। লর্ড মাউন্টব্যাটেন ১৯৪৭ সালের ১৭ আগস্টে দেশভাগের তফসিল ঘোষণা করলে মুসলিম লিগের তরুণ-সদস্য ইসমতের নেতৃত্বে এই এলাকার হিন্দুদের বাড়িতে আক্রমণ চালায় জঙ্গি মুসলিমরা। মোহাম্মদ রসুলদের পড়শি শ্রীনাথ সাহার বাড়িতেও তারা ভাঙচুর করতে গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পায়, শ্রীনাথ সাহার বৈঠকখানার বারান্দায় চেয়ারে বসে গড়গড়া টানছে তেপ্পান্ন বছর বয়স্ক মোহাম্মদ রসুল আর তাকে ঘিরে আছে সশস্ত্র একদল হিন্দু-মুসলিম তরুণ। মোহাম্মদ রসুলের দোনলা বন্দুকটা শোয়ান ছিল তার নিজের কোলের ওপরেই। জঙ্গি মুসলিমদের দলনেতা ইসমতকে শান্ত কণ্ঠে বলেছিল মোহাম্মদ রসুল, ‘হেন্ থেন্ চলে যা ইসমত! শ্রীনাথ কাকিমা আমার দুধমা লাগে।’ সে তথ্যটা অবশ্য জানাই ছিল ইসমতের। তবু ইসমত যুক্তি দিয়েছিল : এই ভূমি পবিত্র হবে হিন্দুদের রক্ত বইয়ে দিলে! ইসমতের এসব যুক্তির পিঠে কিছু হয়ত বলেছিল ঘাড়ত্যাড়া মোহাম্মদ রসুল। সেটা অবশ্য কেউ আর মনে রাখেনি! জনশ্রুতিতে কেবল রয়ে গেছে এটুকু: বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে গড়গড়া রেখে সটান দাঁড়িয়ে গিয়েছিল মোহাম্মদ রসুল এবং সে তার দোনলা বন্দুক তাক করেছিল ইসমতের দিকেই। ইসমতের সহপাঠী মোহাম্মদ সালাম অর্থাৎ মোহাম্মদ রসুলের ছোট ভাই গোল পাকিয়েছিল সবচাইতে বেশি―রোষে উš§ত্ত মোহাম্মদ সালাম তার একনলা বন্দুক থেকে ফাঁকা গুলি ছুড়েছিল দু-দুবার; চিৎকার করে ইসমতকে বলেছিল, ‘তোর চেলাচামুণ্ডাগুলেনেক হেন্ থেন্ চলে যাবের ক হারামজাদা!’ এসব হুমকিতে ইসমত যে সেদিন ভয় খেয়ে গিয়েছিল―এমন মন্তব্য করাটা ঠিক হবে না। সে আসলে ধন্ধে পড়ে গিয়েছিল এই ভেবে―রসুল ভাই, সালাম বা তাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মুসলিম তরুণেরা আসলে কোন পদের প্রাণী ? কেন তারা পীতাম্বর বসাক, রজত মজুমদার, খোকা স্যানাল―এদেরকে বধ করবে না ? এদের পাছায় লাথি মেরে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের এলাকা থেকে খেদিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকিয়ে দেবে না কেন ? কেনইবা দখল করতে চাইবে না এদের জায়গাজমি, স্বর্ণালঙ্কার; ভোগের জন্য তুলে নিয়ে যাবে না এদের অল্পবয়সি মেয়েদেরকে ? এসব ভাবনার ভেতরেই পরবর্তী রণকৌশল খুঁজে ফিরছিল ইসমত; ভাবছিল, আজ বিরোধে জড়ালে তাদেরও লোকক্ষয় ঘটে যাবে নির্ঘাৎ। তার চাইতে মোহাম্মদ রসুলদেরকে শায়েস্তা করতে সে পরে আসবে, প্রস্তুত হয়েই। সদলবলে পাথরতলায় ফিরে যাওয়ার সময় সে পালের গোদা মোহাম্মদ রসুলকে বলে গিয়েছিল, ‘আমাক টার্গেট করে আপনেরা বন্দুক তুইললেন ? হিসেবডা তা’লি পরে খুলাই রইলে ভাইজান! টাইম হলি পরে হিসেব বুঝে লেবনে।’

এসব আজ থেকে চব্বিশ বছর আগের কথা! এর ভেতরে দেশ ভাগ হয়েছে, পূর্বপাকিস্তানে দুটো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেছে―তার একটা হলো ভাষা আন্দোলন এবং অন্যটা উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। পূর্বপাকিস্তানের তাবৎ মানুষ ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের আগ পর্যন্ত পাকিস্তানের শাসককুলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে দপদপ করে জ্বলেছে। কাজেই তখনও মোহাম্মদ রসুল বা মোহাম্মদ সালামের সঙ্গে হিসেবের সমাপ্তি টানেনি বা টানতে পারেনি ইসমত মওলানা। মোসলেম আর আবুল মনে করে, ১৯৪৭-য়েই ভারতের এসব দালালদেরকে নিকেশ করে দেওয়াটা উচিত ছিল। সেটা না হয় তখন করা যায়নি! কিন্তু এই ১৯৭১-এ যখন নাফরমান বাঙালিরা লড়ছে পাকিস্তানের অখণ্ডতা ভেঙে দেওয়ার জন্য তখন মোহাম্মদ রসুলকে হাত-পা বেঁধে আচ্ছাসে পেটালে কী ক্ষতিটা হয়, হোক সে শহরের সম্মানীয় একজন মানুষ, হোক সে মহাপরহেজগার, হোক সে মক্কা-মদিনার হিজরতি ? নাফরমান মোহাম্মদ রসুলের নখটখ উপড়ে ফেলার জরুরি কাজটা বাদ রেখে এখন কি না, মোসলেম আর আবুলকে তার নামাজ পড়ার ব্যবস্থা করে দিতে হবে ? এটা কেমন ধারার আব্দার ? আসরের নামাজ সেরে আবার না গতকালের মতো বলে বসে সফেদ দাড়িওয়ালা বুড়ো, ‘ঐ হারামজাদাক খবর দে ইবার!’ কোন হারামজাদার কথা বলা হচ্ছে ? ‘ক্যা, তোরে ঐ ইসমত মওলানার কথা কচ্ছি! উয়েক জলদি আইসপের ক। তার সঙ্গে জরুরি কথা আছে আমার!’

গতকাল  মোহাম্মদ রসুলকে ক্যাম্পে ধরে আনার সময় থেকে সে এন্তার এসব ঝামেলা করে যাচ্ছে! তাই নীচু স্বরে মোসলেমকে আবুল বলে, ‘ঐ শালার গাদ্দার বুড়ে কলি পরেই কি আমারে পিস কমিটির চেয়ারম্যান সাহেব হেনে আসপিনি নেকি? এইসব পুকামাকড়―মুক্তিযোদ্ধারে বাপ-দাদা-চাচা-মামা-খালুরে সঙ্গে কথা কতি নাচে না ইসমত মওলানা! পাকিস্তান রক্ষা করার জন্যি মেলা কাম রয়ছে তার!’

‘তয় ঐ বুড়ে ভামেক ধরে পিটাতি নিষেধ করা হলে কিসের জন্যি ? তুইই ক ?’ আবুলকে জিজ্ঞাসা করে মোসলেম। মোসলেমের এই অকাট্য প্রশ্নের কোনও উত্তর অবশ্য আবুলের কাছে নেই। সে কেবল বোঝে, বড় বড় মানুষদের চিন্তাভাবনা এতই জটিল থাকে যে তা ধরতে পারাটা আসলেই কঠিন!

পুবদালানের সর্ব দক্ষিণের ঘরটাও ক্যাম্পের আর সবগুলো ঘরের মতোই বন্দিতে ঠাসা। শেকল তোলা আছে ঘরটায়, তালাও মারা আছে। মোসলেম উঠে গিয়ে তালাটা খুলে ঘরটায় ঢোকে; বান্ধন থেকে মুক্ত করে দেয় মোহাম্মদ রসুলের হাত-পা। কলপারে গিয়ে ওজু সারে মোহাম্মদ রসুল। আবুলের গামছাটা পুবদালানের বারান্দায় বিছিয়ে সে আসরের নামাজ আদায় করে নেয় এবং নিজে থেকেই সে ঘরে ঢুকে পড়ে। আবার তার হাত-পায়ে বেড়ি পড়ায় আবুল।

ঘরটার চারপাশে তাকিয়ে আবুল দেখতে পায়, গেল রাত ধরে নির্যাতনের পর যে ন’জন পুরুষ-বন্দিকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মেঝেতে তারা ছুড়ে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল তাদের কেউ মাটিতে কুঁকড়ে পড়ে আছে, দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে কোঁকাচ্ছে কেউবা। আহত বন্দিদের দুরবস্থা দেখে মনে মনে হাসছে আবুল; ভাবছে―মোসলেম আর তার বাঁশের লাঠি আর লোহার রডের ক’টা বাড়িতেই কাবু হয়ে গেল শালার ধলতাগুলো! এ তো কিছুই নয়! শারীরিক নির্যাতনের বেলায় শমসের ওস্তাদের হাত তাদের হাতের চাইতে হাজার গুনে ভালো―সে যখন বন্দি পেটায় তখন একটুকুও মায়াদয়া করে না! আর শমসের ওস্তাদ দিনকে দিন অভিনব সব কায়দা যোগ করছে, যেমন, কারও নখের নীচে সুঁচ ঢুকিয়ে দিতে বা পায়ের পাতায় হান্টার দিয়ে বাড়ি মারতে অথবা পুরুষাঙ্গে ইট বেঁধে দাঁড় করিয়ে রাখাতে বা সাঁড়াশি দিয়ে নখ উপড়ে ফেলতে এই ক্যাম্পে তার কোনও জুড়ি নেই! এসব কায়দা সে রপ্ত করেছে নূরপুর ডাকবাংলোর অস্থায়ী সেনানিবাস থেকে। সেখানে আস্তানা গেড়েছে ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের এক ব্যাটালিয়ান পাকিস্তানি  সৈন্য। ব্যাটালিয়ানটার যেসব অফিসার আর সৈন্যরা ইন্টারোগেশন সেলে কাজ করে তারাই শমসের ওস্তাদের সাক্ষাৎগুরু। আবুল ভাবে, মাগরেবের নামাজের পরপরই চলে আসবে শমসের ওস্তাদ, তারপর পুবদালানের দু’টো ঘরে রাখা মোট ছাব্বিশ জন পুরুষ-বন্দিকে শায়েস্তা করার কাজে সে হা-রে-রে-রে করে লেগে যাবে। তখন কি আর বাহ্যজ্ঞান অবশিষ্ট থাকবে এদের ? পরিকল্পনা মতো আজ নির্বাচিত ক’জন বন্দিকে শমসের ওস্তাদের ডিম দেয়ার কথা। আবুল ভাবে, মানুষের পায়ুপথে গরম ডিম ঢোকানোর ব্যাপারটা আজ সে হাতেকলমে শিখে নেবে। শমসের ওস্তাদ বলেছে, মোসলেম, লালু, রজব, ল্যাংড়া ছটকু আর আবুলের উচিত হবে বন্দি-নির্যাতনের নানান কায়দা শিখে ফেলা। নুরপুর সেনানিবাসের  লেফটেন্যান্ট কর্নেল সালেকিন, যে কিনা, পশ্চিম পাঞ্জাবের গুজরানওয়ালার মানুষ, বারবার তার বক্তৃতায় নাকি ব্যাখ্যা করেছে যে পূর্বপাকিস্তানের বাঙালিরা সকলেই হেঁদু―ন্যাড়া হলেও হেঁদু! কাজেই খুন আর ধর্ষণের প্রক্রিয়াতে এখানকার বাঙালিদেরকে পুরো মুছে না দেয়া পর্যন্ত এদের বিরুদ্ধে ইয়াহিয়া-সরকারের যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে। তাই শান্তি কমিটির সভাপতি ইসমত মওলানা এবং রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার শমসের মৃধা চায়, তাদের বাহিনীর ভেতর থেকে সাচ্চা সৈনিক তৈরি হোক, বাঙালিদেরকে ধরে ধরে অত্যাচার বা খুন বা ধর্ষণ করতে যার হাত-পা কুণ্ঠিত হবে না মোটেই।

মোহাম্মদ রসুলকে ফের বেঁধেছেদে, ঘরে তালা মেরে আবুল গিয়ে বারান্দায় বসে, মোসলেমের পাশে। বিড়ি ধরিয়ে কুঁচকির দীর্ঘমেয়াদি দাদ চুলকাতে চুলকাতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তার মুখমণ্ডল। মুচকি হাসিতে মোসলেমকে সে বলে, ‘চল যাই ব্যাটা! উত্তরের দালানে যাই। বেলতলা থেকে আইজ কচি যে দুই বুনেক তুলে লিয়ে আইসলেম তাগারে একটু দলাই-মলাই করে আসিগে!’ আবুলের এই খায়েশের সঙ্গে একমত প্রকাশ করে মোসলেম কেননা প্রথা অনুযায়ী আজ সন্ধ্যের পরেই নুরপুরের অস্থায়ী সেনানিবাসে চালান করে দিতে হবে এই দুপুরে ধরে নিয়ে আসা অল্পবয়সি, সুন্দরীদেরকে। তার আগেই নারী-বন্দিদের ভেতরের সেরা সুন্দরী দু’বোনকে একবার নেড়েচেড়ে দেখলে মন্দ হয় না! অবশ্য নাড়াচাড়া করাটাই সার হবে কেননা নিয়ম বেঁধে দেওয়া আছে, সুন্দরী মেয়েদেরকে রাজাকারেরা ছোঁবে না, পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনীর অফিসারদের মনোরঞ্জনের জন্য পাঠান হবে তাদেরকে। আর দুনিয়ার বদখত মেয়েরা থাকবে রাজাকারদের ফুর্তিফার্তা করার জন্য; বদখতদের ভেতরে একটু বেশি চলনসইদেরকে পয়লাতেই খাবে শমসের ওস্তাদ, পরে যাবে আবুল-লালু-মোসলেমরা।  

মধ্য-আশ্বিনের সন্ধ্যে নামছে। পীতাম্বর বসাকদের প্রায় একশ বছরের পুরনো দালানকোঠা আর গাছগুলোর ফাঁকে ফাঁকে জমাট বাঁধতে শুরু করেছে অন্ধকারের সর। আলো-আঁধারীতে বাড়িটাকে ভূতুড়ে বলেই মনে হচ্ছে। গেল পরশু বোম মেরে পাওয়ার হাউস বিকল করে দিয়েছে মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা।  সেই থেকে আর পুরো শহরে বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করা সম্ভব হয়নি। বন্দিশালার উত্তর আর পুবদালানের ঘরগুলোতে কুপিবাত্তি বা হারিকেনও জ্বালায়নি মোসলেমরা। দু’দিন পরেই যারা মারা পড়বে তাদের জন্য খামাখা কেরোসিন তেল খরচ করার তো কোনও মানে হয় না! নির্যাতনের সময় বৈদ্যুতিক বাতি বা কুপিবাত্তি বা হারিকেনের আলোর ব্যবস্থা থাকলেই হলো! সন্ধ্যের পর থেকে শুরু হয়ে রাতের দিকে নির্যাতন তুঙ্গে ওঠে বলেই বাতির প্রয়োজনটা পড়ে। তা হলে বন্দিদের শারীরিক প্রতিক্রিয়াগুলো দেখা যায় ঠিকঠাকমতো, মজাও পাওয়া যায়। এই মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে, কুঁচকি চুলকাতে চুলকাতে উত্তর-দালানের পশ্চিমের ঘরটার তালা খুলছে আবুল। কুপিবাত্তি জ্বালিয়ে নিয়েছে মোসলেম। সেই সামান্য আলোর অনেকটাই ঢুকে যাচ্ছে অন্ধকারের পেটের মাঝে। দেখা যাচ্ছে, সচকিত হয়ে নড়েচড়ে বসছে অন্ধকারের গহ্বরের ভেতরে পড়ে থাকা চৌদ্দজন নারী। কমজোর আলোতে মেঝেতে বা খাটে পড়ে থাকা মেয়েগুলোর অবয়ব দেখে তাদেরকে পরিষ্কারভাবে চিনতে পারা যাচ্ছে না―ছিন্নভিন্ন, বিবর্ণ ব্লাউজ-পেটিকোটে অর্ধনগ্নাদেরকে দেখতে একই রকম লাগছে। তারা সবাই বিধ্বস্ত, ক্লান্ত, এলোমেলো হয়ে আছে তাদের চুল; তাদের ঠোঁটের কোণে লেগে আছে রক্তের শুকনো দাগ; কিলঘুসি, কামড়, বেত আর লাঠির আঘাতের চোটে নীল হয়ে আছে তাদের গণ্ড, গলা, বুক আর পিঠের উš§ুক্ত অংশ। কুপিবাত্তির আলোতে তাই এদের সকলের দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকায় মোসলেম আর আবুল। স্মৃতির সঙ্গে মেয়েগুলোর চেহারা আর শরীরের গঠন মিলিয়ে নিয়ে বেলতলা থেকে তুলে আনা দু’বোনসহ নতুন তিনজন তরুণীর দিকে তাদের দৃষ্টি স্থির হয়।

আবুল ভাবে, পঁচিশে মার্চের পর থেকে পাবনা শহরের বেশির ভাগ মানুষজন গ্রামের দিকে পালিয়ে গেল, আর এই তিনজন মেয়ের পরিবার অবরুদ্ধ এই শহরে কী এমন জরুরি কাজ করছে ? তাদের কি কোথাও পালিয়ে যাওয়ার জায়গা নেই? অবশ্য তা’তে করে মোসলেম বা আবুলের লাভই হয়েছে বরং―অপরিসর খাটের এক কোণে জবুথবু হয়ে বসে থাকা দু’বোনের বুকে, পেটে, জঙ্ঘায়, পাছায় সুখ করে হাত চালাতে পারছে তারা দু’জন; প্রতিরোধের পরও তাদের ঠোঁটে, স্তনবৃন্তে চুমু খাওয়ারও জন্য জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। দুবোনের চাইতে একটু কম আকর্ষণীয় তরুণীকে তারা ভয়ে স্পর্শ করছে না কেননা নিয়মমাফিক আজ রাতেই এই মেয়েটাকেই ভোগ করবে শমসের ওস্তাদ। এদিকে দুবোন আপত্তিতে প্রবলভাবে নড়াচড়া করছে পলোর ভেতরে আটকে যাওয়া কোনও বাইনমাছের মতো। বাধা পেয়ে তাই মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে মোসলেম আর আবুলের। কিন্তু সুন্দরীদেরকে চড়থাপ্পড় মারলে তাদেরই বিপদ! ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের ব্যাটালিয়ানটার লিউটিনেন্ট কর্নেল বা ক্যাপ্টেন বা লিউটিনেন্ট বা স্টাফ সার্জেন্টদের দল চায় না যে ফুলের পাঁপড়ি এক ফোঁটাও জখম হোক। কাজেই অনিচ্ছাতে হলেও তরুণী তিনজনকে নিষ্কৃতি দিয়ে বাকি হেঁদিপেঁচিগুলোর দিকেই নজর দেয় মোসলেম আর আবুল।  মেঝেতে শুয়ে থাকা কোঁকড়া চুলো, দীঘল কালো চোখের ইন্দুমতীর শরীরে হামলে পড়ে মোসলেম।  গেল সপ্তাহে সিঙের শ্মশান-এলাকা থেকে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে কচি এই মেয়েটাকে। আর বেটেখাটো, মোটা ধাঁচের লতিফার পাছা টিপতে লেগে যায় আবুল। প্রায় এক মাস আগে থেকে এই ক্যাম্পে বন্দি করে রাখা হয়েছে তিরিশোর্ধ লতিফাকে। স্বভাবতই সারা শরীর  মোচড়ান প্রবল প্রতিবাদ আসছে আক্রান্ত নারীদের দিক থেকে। তাই তাদেরকে বেত দিয়ে আচ্ছাসে পেটানো হয়। তারা নির্জীব হয়ে পড়লে তাদের ওপরে বিনা বাধায় পালা করে উপগত হয় মোসলেম আর আবুল, গেল রাতের মতো করে, তার আগের রাতের মতো করে। অবাধ্য মেয়ে দু’টোর শরীরে বেত, দাঁত আর ধারালো নখের আরও ক’টা গভীর দাগ পড়ে যায়। 

ইন্দুমতী আর লতিফাকে ধর্ষণ করার পরে উত্তর-দালানের ঘরটায় তালা মেরে  দেয় মোসলেম। আবুল আর সে পশ্চিম-দালানের বারান্দায় গিয়ে বসে পড়ে জিরায়; বিড়ি ধরায় মহাতৃপ্তিতে। তখনই বাড়িটাতে ঢোকে শমসের মৃধা, লালু, ল্যাংড়া ছটকু আর রজব। তাদেরকে ঢুকতে দেখে হারিক্যানের আলোটা উসকে দেয় মোসলেম। বারান্দায় হাতল দেয়া একটা কাঠের চেয়ারে বসে পয়লাতে মোসলেমকে প্রশ্ন করে তাদের কমান্ডার শমসের মৃধা, ‘তোক যে কয়ে গিলেম, ছাওয়াল হোক আর মিয়েই হোক, কয়ডা হেঁদু ধরে লিয়ে আসতি, সেই কামডা কি তুই করিছিস ?’

নাহ্! সেই কাজটা করতে পারেনি মোসলেম। এর পেছনে তার যুক্তিটা খুবই স্পষ্ট। সে উত্তর করছে, ‘একঘর হেঁদুও তো আর এই শহরে রইলে না! ঐ শালার মালাউনের বাচ্চারা সব পলা রয়ছে গিরাম সাইডে, পশ্চিমবঙ্গেও নেকি ভাগে গেছে কেউ কেউ। তো হেঁদু খুঁজে পাব কোন্  থেন্ আমি ?’

কাজেই যে উষ্মাটা তৈরি হয়েছিল শমসের মৃধার কণ্ঠে তা দপ করে নিভেও যায়। সে চিন্তিত সুরে বলে, ‘এই কথাডা তো শান্তিকমিটির সভাপতি ইসমত মওলানা আর ক্যান্টনমেন্টের পাঞ্জাবি সার্জেন্টেক বুঝানে যাবিনানে! খুন করার জন্যি, তা না হলিও লাগানির জন্যি প্রত্যেক দিন তারে হেঁদু দরকার। তারা কয়, কাফের খুন করলি পরে সুজা বেহেস্তে চলে যাওয়া যাবিনি। ঠিকই কয় তারা!’

হিন্দু পুরুষ ধরে নিয়ে গেলে জব্বর খুশি হয় পাকিস্তান আর্মির ব্যাটালিয়ানটার লিউটিনেন্ট কর্নেল সালেকিন! তাদের জন্য বরাদ্দ হয় বাড়তি শারিরিক অত্যাচার। আর হিন্দু মেয়ে  পেলে তো কথাই নেই; বলবে―‘এই সালে হিন্দুলোগ ১৯৪৭-এ অমৃতসরে, দিল্লিতে আমাদেরকে খুন করেছিল! সে কথা আমরা ভুলিনি!’ তখন লিউটিনেন্ট কর্নেল সালেকিন সাবাসি দেবে শমসের মৃধাকে, ‘তুই তো দেখি আমাদের পবিত্র পাকিস্তানের আসলি সিটিজেন!’ বিনিময়ে ক্যান্টনমেন্টের মেসে বসে মুরগি-মুসাল্লাম খাওয়া যায়, একটু শারাব মেরে দেয়া যায়, লুটের মাল থেকে উপহার হিসেবেও মেলে কিছু না কিছু।

পাঞ্জাবিদের মনোতুষ্টির জন্য  মোসলেম আর থোতারে রজবকে শমসের মৃধা দায়িত্ব দেয় হিন্দু পাকড়াও করে নিয়ে আসতে, একজন হলেও সই! রজব তোতলাতে তোতলাতে শমসের মৃধাকে বলে, ‘যাচ্ছি! তয় হেঁদু খুঁজে না পালি পরে কিন্তুক আমারে কুনু দোষ থাকবি নানে!’ 

‘হ্যাঁ! হ্যাঁ! হয়ছে! প্যাঁচাল দিসনে এহুন, যা!’ বিরক্তি নিয়ে উত্তর দেয় শমসের মৃধা।   

শমসের মৃধার নির্দেশ মতো থ্রি নট থ্রি রাইফেল কাঁধে নিয়ে হিন্দু ধরে আনার অভিযানে বেরিয়ে যায় মোসলেম আর থোতারে রজব। তারা বেরিয়ে গেলে শমসের মৃধাকে লালু প্রস্তাব দেয়, ‘কচ্ছিলেম কী উস্তাদ―তা’লি পরে কাইল একবার রামচন্দরপুর হয়ে দ্বীপচরের দিক যাবনে। কী কন আপনে? খবর পাইছি, ঐদিক কিছু মালাউনের বাচ্চা পলা রয়ছে!’  

‘আচ্ছা! তা’লি পরে ভালই হবিনি। মেলা দিন হয়ছে কুনু হিন্দু মাগীক চাখে দেখি নেই! বুঝলু তো ? এহন চলেক, হারামখোরগুলেক পিটায়ে ইট্টু হাতের সুখ করে লেই! এক কষ্ট করে তুরা নতুন সব মক্কেল ধরে লিয়ে আসলু আর তাগেরে যুদি আমি নিজির হাতে বাতাসা-কদমা না খাওয়াই তা’লি পরে ক্যাম্বা হবিনি ?’ এই বলে পশ্চিম-দালান থেকে নেমে গিয়ে পুবদালানে ওঠে শমসের মৃধা।  

পুবদালানের সর্ব উত্তরের ঘরটা ব্যবহৃত হয় টর্চার সেল হিসেবে। টর্চার সেলের দরজার তালা খুলে ফেলে আবুল। হারিক্যানের আলোতে দেখা যায়, গেল পরশু দইবাজার থেকে ধরে আনা বাইশ-তেইশ বছরের একজন যুবক কড়িকাঠের সাথে বাঁধা মোটা দড়িতে ঝুলছে। তার নাম খবিরুদ্দি। শূন্যে ভেসে আছে খবিরুদ্দির দীর্ঘ শরীর। ঝুঁকতে ঝুঁকতে বুকের ওপরে ঠেকে আছে তার থুতনিটা। তার সারা গায়ে দাগ কেটেছে মোটা চাবুক; রক্ত জমাট বেধেছে তার খোলা বুক, পিঠ এবং এলোমেলো লুঙ্গিতে। বাঁশ এবং লোহার রড দিয়ে তাকে বেধড়ক পেটানোর ফলে কালশিটেও পড়ে আছে তার সারাটা মুখমণ্ডলে; ফুলে ঢোল হয়ে আছে তার চোখ, মুখটা। শূন্যে ঝুলতে থাকা যুবকের কাছে গিয়ে তার গলার কেরোটিড ধমনীতে শমসের মৃধা হাত রাখে। জীবনের উপস্থিতি জানাতে তার ধমনীটা আর ধুকপুক করছে না। শমসের তাই ঘোষণা দেয়, ‘পাকিস্তানের আরেকজন শত্রু খতম হলে! গুলি খরচ করা লাগলে না আর। বুঝলু তো ? শালাক নামা ফেলা দড়িত্ থেন্, আমগাছের তলাত্ গাড়ে থ গা যায়ে।’ 

শমসের মৃধার নির্দেশ অনুযায়ী দড়ি খুলে লাশটা নামিয়ে নিয়ে যায় লালু আর ল্যাংড়া ছটকু মিলে। তার পরপরই টর্চার সেলে হাত পিছমোড়া করে বাধা অবস্থায় একজন কিশোর আর দু’জন যুবককে নিয়ে আসে আবুল। কিশোরকে ধরে আনা হয়েছে বেলতলা থেকে। তার অপরাধ―বাড়ির পেছনের একটা খড়ের গাদায় হেলান দিয়ে বসে সে মনের সুখে জোর ভলিউমে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান শুনছিল―পাকিস্তানের শত্রু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বাঁধা গান! কত বড় গুর্দা এই কিশোরের! অন্যদিকে আবুলের সন্দেহ―যুবক দু’জনই আসলে মুক্তিযোদ্ধা! নিশ্চয় ভারত থেকে গেরিলাযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে পাবনা শহরে তারা ঢুকেছে চোরাগোপ্তা হামলা চালানোর জন্য। কফিলুদ্দিন পাড়া থেকে ধরে আনা যুবক তিন রাস্তার মোড়ের ওপরে আবুলদেরকে হাঁটতে দেখে ছুটে পালাতে গিয়েছিল। মুক্তি না হলে, মনে কোনও দুরভিসন্ধি না থাকলে এভাবে  কেউ দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে নাকি ? আবুল আরও জানাচ্ছে, দ্বিতীয় যুবক কালাচান্দপাড়ার বাসিন্দা। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো এই যে গতকাল শুক্রবার জুম্মার নামাজের পরে মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে সে তার দু’জন প্রতিবেশীকে বলেছিল যে ‘দখলদার আর দখলদারের তাবেদার―এ দু’জনের ওপরেই ঘৃণা বর্ষিত হোক!’ দ্বিতীয় যুবক যদি ভারতের চরই না হবে, তার পেছনে যদি মুক্তিযোদ্ধাদের মদদই না থাকবে তবে পাকিস্তান-বিরোধী প্রচার করার মতো এতবড় স্পর্ধা তার আসবে কোথা থেকে? 

আবুলের যুক্তিগুলো খারিজ করতে পারে না রাজাকার―কমান্ডার শমসের মৃধা। সে বুঝতে পারে, এই তিনজনকেই জিজ্ঞাসাবাদ করে দেখা প্রয়োজন। সে ভাবে, কেঁচো খুঁড়তে তো সাপও বের হয়! গেরিলাদের গোপন আস্তানাগুলো এখনও খুঁজে বের করতে পারেনি তারা। এ নিয়ে তাদের ওপরে নাখোশ হয়ে আছে শান্তি কমিটির সভাপতি ইসমত মওলানা। ইসমত মওলানা গুঁতো খেয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জমিরের কাছ থেকে―‘কুত্তার বাচ্চাদেরকে ধরতে এত দিন লাগে নাকি ? বাণী সিনেমা হলের ওপরে মাদারচোতরা বোম মেরে পালিয়ে গেল আর তাদের গোপন আস্তানার কোনও খবরই  বের করতে পারলেন না আপনারা ?’ শমসের মৃধা ফের ভাবে, আবুলের সন্দেহ সঠিক হলে তো শমসের মৃধারা বেঁচে যায়; আর তা না হলেও ক্ষতি নেই কোনও―এই ব্যাটা দু’টোকে আচ্ছাসে পিটিয়ে-টিটিয়ে এক্কেবারে সোজা করে দেওয়া যাবে। শমসের মৃধা এখন বুঝে গেছে, এই শহরের বেশির ভাগ বাঙালিই শেখ মুজিবুর রহমানের সৈনিক, তলে তলে সবাই গেরিলাযোদ্ধা বা তাদের নেটওয়ার্কের অংশ। কাজেই আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ কোনও বাঙালিকেও পেটান বা খুন করাটা পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রাখার জন্য জরুরি।

হাত নিসপিস করছে শমসের মৃধার কেননা আজ সারা দিন সে পাকিস্তান-বিরোধী কাউকেই মারধর করার সুযোগই পায়নি। শান্তিকমিটির নানান সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য তাকে ব্যস্তই থাকতে হয়েছে দিনের বেলাটায়। তা না’হলে আজ সকালের দিকটাতে ক্যাম্পে এসে বন্দিদের ওপরে ডাণ্ডা চালানো যেত! তাও ভালো যে সন্ধ্যেবেলায় সুযোগটা মিলে গেল! তাই আবুলদের সঙ্গে কথা বলে সময় নষ্ট না করে সোজা যে কাজে নেমে যায়। দেয়ালের সঙ্গে লাইন করে দাঁড়ানো বিভিন্ন বয়সের তিনজন পুরুষের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় শমসের মৃধা। পয়লাতে বেলতলার কিশোরকে নিয়ে সে পড়ে। কিশোরকে জিজ্ঞাসা করে সে জানতে পারে, আবুলের অভিযোগ সত্য―এই কিশোর আর স্কুলে যাচ্ছে না বলে তার সময় কাটছে না। তাই সে রেডিওতে গান শুনছিল। শমসের মৃধা রাগে জ্বলতে জ্বলতে বলে যে এই পবিত্র ভূমির বিরোধীদের বেতার কেন্দ্রের কোনও অনুষ্ঠান শোনা তো আসলে রাষ্ট্রদ্রোহিতারই সামিল! তারপর আবার বেতারকেন্দ্রটা গড়ে উঠেছে পাকিস্তানের চিরশত্রু ভারতের মাটিতে! কাজেই শমসের মৃধা নিজের হাতের চওড়া পাঞ্জা দিয়ে কিশোরের ডান গালে প্রচণ্ড শক্তিতে একটা চড় বসায়। তাল সামলাতে না পেরে রোগাদুবলা কিশোর মেঝেতে ছিটকে পড়ে যায়; পড়ে গিয়ে ‘মা-মা’ ডাকতে ডাকতে সে কাঁদতে শুরু করে দেয়। বিরক্ত হয়ে আবুলকে নির্দেশ দেয় শমসের মৃধা, ‘এ জঞ্জালডা হেটা তো হেন্ থেন্!’ তাই বেলতলার কিশোরকে দক্ষিণের ঘরে ফের আটকে রাখতে যায় আবুল।

কফিলুদ্দিনপাড়া আর কালাচান্দপাড়া থেকে ধরে নিয়ে আসা যুবক দু’জনের মাঝে বাগ্মীর ওপরেই বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে আছে শমসের মৃধা। কে না জানে, মানুষজনের সামনে পাকিস্তান-সরকার এবং রাজাকারদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো সহ্য করা হবে না ? তবে এই সাহস কালাচান্দপাড়ার যুবকের এল কোথা থেকে ? তার কি মাথায় গণ্ডগোল আছে নাকি ? একবারও কি তার মনে হয়নি, কেউ না কেউ ব্যাপারটা রাজাকারদের কাছে ফাঁস করে দেবে ? কাজেই কালাচান্দপাড়ার যুবকের ফণা গুঁড়িয়ে দিতে হবে এবং তার একমাত্র উপায় হলো তার পায়ুপথে ডিম ঢুকিয়ে দেওয়া। শমসের মৃধার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য লালু ছুটে যায় বসাকদের হেঁসেলে এবং সে লাকড়ির চুলাতে ছ’টা ডিম সেদ্ধ বসায়। দ্বিতীয় যুবক অর্থাৎ কফিলুদ্দিনপাড়ার যুবকের আচরণ নিয়ে এবার আলোচনা করতে বসে শমসের মৃধা। সে মনে করে, পাকিস্তানের শান্তিপ্রিয় জনগণের ভেতরে কেউই তাদের জানমালের রক্ষাকারী রাজাকারদেরকে দেখে ছেঁচড়ে দৌড় লাগাতে যাবে না কখনও! তবে এই শালির ছাওয়ালের ব্যাপারটা কী ? নাশকতা চালানোর জন্য তার কাছে কি পিস্তল বা গ্রেনেড ছিল ? পালিয়ে যাওয়ার সময় কোথায় সে তার অস্ত্রশস্ত্র ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে ? অগাস্ট থেকে এসবই তো ঘটছে এই পাবনা শহরে―বলা নেই কওয়া নেই ইঁদারাপট্টি বা জজকোর্টের পিছে গ্রেনেড এসে পড়ল! কে বা কারা কাজটা করল তা আর ধরাই গেল না! শমসের মৃধার এসব কথাবার্তা শুনে আতঙ্কিত হয়ে যায় কফিলুদ্দিনপাড়ার যুবক। নানানভাবে  সে শমসের মৃধাকে বোঝাতে চায়, রাজাকারদের সামনাসামনি পড়ে গিয়ে সে আসলে ভীষণ ভড়কে গিয়েছিল; পালানোর জন্য দৌড় মেরেছিল তাই। কিন্তু এ যুক্তি খাটছে না কেননা রাজাকাররা পূর্বপাকিস্তানের মুসলিমদেরই মায়ের পেটের ভাই এবং তাই তাদেরকে দেখে আতঙ্কিত হওয়ার সুস্পষ্ট কোনও কারণই থাকতে পারে না! অর্থাৎ কথা এই যে কফিলুদ্দিনপাড়ার যুবককেও ডিম দিতে হবে। 

শমসের মৃধার বিচারকার্য যখন চলছে সেই ফাঁকে ক্যাম্পে হাজির হয় মোসলেম আর থোতারে রজব। দিলালপুর, গোপালপুর আর চারতলা-এলাকায় যে শখানেক হিন্দুদের ঘর রয়েছে সেখানে কেউই নেই! তথ্যটা নতুন কিছুই নয়। তবুও মেজাজ খারাপ হয়ে যায় শমসের মৃধার। গলা ফাটিয়ে সে চেঁচাতে থাকে, ‘একটাও হেঁদু খুঁজে পালু না তোরা। তো হাতের সুখ মেটাব ক্যাম্বা করে? বাল কামানির জন্যি তোরে বেতন দিয়ে, রেশন দিয়ে পুষা হচ্ছে নাকি ?’ এই বলে সে থোতারে রজবের কানশা’র ওপরে জোরসে একটা চাটি বসায়। ব্যথায় কুঁকড়ে যায় রজব। মোসলেম ভাবে, এবার আর বাঁচার কোনও কায়দা বাকি নেই―নিশ্চিত এবার মোটা বেতের বাড়ি পড়বে তার পাছার ওপরে! তবে তার আশঙ্কা সম্ভব হয়ে ওঠার আগেই হেঁসেল থেকে ছুটতে ছুটতে একটা ছোট পাতিলে আধা ডজন সেদ্ধ ডিম নিয়ে টর্চার সেলে ঢোকে লালু। কাজেই যুবক-বন্দদেরকে নিয়ে ফের ব্যস্ত হয়ে যায় শমসের বৃধা।

পায়ুপথে ডিম দেয়ার কায়দাকানুন মোসলেম-আবুলরা অনেকবারই লক্ষ করেছে বটে। তাই বিনাবাক্য ব্যয়ে তারা কালাচান্দপাড়া থেকে ধরে আনা যুবককে উপুর করে মেঝেতে শুইয়ে দেয়, তার লুঙ্গি কোমরের কাছে জড়ো করে দিয়ে নিতম্বের দু’ভাজ দু’দিকে শক্তি দিয়ে টেনে ধরে রাখে তারা। সেখানে গরম ডিম বসিয়ে মোটা বেত দিয়ে সর্বশক্তিতে চাপ দেয় শমসের মৃধা। যুবকের পায়ুপথে ডিম ঢুকে যায়। এভাবে সেখানে মোট তিনটে ডিম ঢোকায় সে। একইভাবে কফিলুদ্দিনপাড়ার যুবকের পায়ুপথেও পরপর তিনটে গরম ডিম ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ব্যথায় কুঁকড়ে যায় যুবক দুজন, তাদের চোখ ফেটে পানি নামে। তবে অভিজ্ঞতা থেকে মোসলেম জানে, বিপত্তি কেবল শুরু হলো! মিনিট দশকের ভেতরে যুবকদের পায়ুপথ থেকে রক্ত বের হতে থাকবে। দ্বিতীয় পর্যায়টা ভয়ঙ্করই হবে কেননা পিছমোড়া অবস্থায় হাত বাঁধা থাকবে বলে বন্দীরা আর তাদের পায়ুপথ থেকে ডিম বের করতে পারবে না এবং তার ফলে তাদের পেট ফুলে ঢোল হয়ে যাবে শেষ পর্যন্ত। আপনা থেকেই ডিম বের হয়ে যাওয়ার মতো পায়খানার চাপ কখন তৈরি হবে তা তো আর কেউই বলতে পারবে না! আর চাপ তৈরি হলেই যে ডিম বেরিয়ে আসবে সেটাও বলা শক্ত! আবুল বুঝতে পারে, এসব উটকো ঝামেলা থেকে বাঁচতে হলে আজই যুবক দুজনকে নূরপুরের অস্থায়ী সেনানিবাসে চালান করে দিতে হবে। ওখানকার জল্লাদদের হাত থেকে কেউই ফেরেনি কোনও দিন, এরাও ফিরবে না। এভাবে যুবক দু’জনকে সহজেই নিজেদের কাঁধ থেকে ঝেরে ফেলাটা সম্ভব। তা না’হলে হেগে-পেদে তারা নষ্ট করে ফেলবে ক্যাম্পটার পরিবেশ! আর পয়-পরিষ্কারের কাজ এসে পড়বে সেই মোসলেমদের ওপরেই।

ক্যাম্পের আশেপাশের এলাকাগুলোতে যে একজনও হিন্দু খুঁজে পাওয়া যায়নি―এ ব্যাপারটা মেনে নিতেই পারছে না রাজাকার-কমান্ডার শমসের মৃধা! এ কারণে আতঙ্কিতও হয়ে পড়ছে মোসলেম আর থোতারে রজব; ভাবছে, এবার ওস্তাদের কিলঘুষি অবধারিত! এমন একটা পরিস্থিতিতে থোতারে রজব বুদ্ধি করে শমসের মৃধার মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে চায়। শমসের মৃধাকে সে স্মরণ করিয়ে দেয়, ‘ওস্তাদ! আইজ তো বেলতলার থেন্ তিনডে মিয়ে ধরে লিয়ে আসা হয়েছে। তার মধ্যি দু’ডে খুব সোন্দর। কর্নেল সাহেব আর ক্যাপ্টেন সাহেবের জন্যি তাগারে তুলে রাহা যায়।’ 

‘আর তিন লম্বরডা ?’

‘তা দিয়ে ভালই চলে যাবিনি আপনের!’

‘হেঁদু ?’

আবারও বিপদে পড়ে যায় রজব। সে আরও বেশি করে তোতলাতে তোতলাতে বলে, ‘পালেম না তো ওস্তাদ!’

‘ধুর! বাল!’―এই বলে তেড়েফুঁড়ে পশ্চিম-দালানে তার খাসকামড়ার দিকে রওনা দেয় শমসের মৃধা। দৌড়ে গিয়ে উত্তর-দালানের সর্ব পশ্চিমের ঘর থেকে তিন নম্বর সুন্দরীকে টেনেহিঁচড়ে বের করে নিয়ে আসে রজব; তারপর মেয়েটাকে চড় মারতে মারতে, ঠেলতে ঠেলতে সে ঢুকিয়ে দেয় শমসের মৃধার খাসকামরায়। রজব মনে মনে ভাবে, পাঞ্জাবি আর পাঠান সৈন্যদের যুক্তিমতো এদেশের সবাইই তো হিন্দু! এ কথা মেনে নিলে ‘হিন্দু নারী খুঁজে যাওয়া গেল না’ বলে শমসের মৃধার খুব একটা আক্ষেপ থাকার কথা নয়!

দোঁতো হাসিতে রজব মোসলেমকে বলে, বেলতলা থেকে তুলে আনা তিন নম্বর মেয়েটার আজ বারটা বাজবে! মেয়েদের শরীরের পায়ুপথে গমনের ব্যাপারটা বেজায় পছন্দ শমসের ওস্তাদের! এসব নিয়ে আলোচনা শুরু হতেই শমসের মৃধার খাসকামরা থেকে আঁচড়াপাচড়ি, দুপক্ষের গালাগালি, চড়চাপড়ের আওয়াজ আর নারীকণ্ঠের আর্তচিৎকার বারান্দায় উপচে পড়তে থাকে। দেঁতো হাসিতে রজবকে মোসলেম বলে, এটা খুব মজার ব্যাপার যে শমসের ওস্তাদের লাগাতার তাণ্ডবের পরে নতুন আনা মেয়েগুলোর জড়তা ভাঙতে শুরু করে। এতে করে মোসলেম-রজবদের মস্তবড় একটা লাভই হয়ে থাকে―ক্রমান্বয়ে বিষ কমতে থাকে মেয়েগুলোর, ধর্ষণের ক্ষেত্রে তাই ভেজালও কম হয়। কাজেই এই মুহূর্তে শমসের ওস্তাদকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারা যাচ্ছে না!

রাতের খাবার সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া আছে লালুকে। এশার ওয়াক্ত হয়ে যাচ্ছে বলে সে বসাকদের বাড়ির পাশেই রাবুদের বাসায় রওয়ানা দেয়। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি দিন রাতের খাবার হিসেবে রুটি আর সবজি ভাজি তৈরি করে দেয় রাবুর মা। বিনিময়ে, লালু করাল করেছে, সে শমসের ওস্তাদ বা শান্তিকমিটির সভাপতি ইসমত মওলানাকে মোটেই বলে দেবে না যে মে মাস থেকে নিঃখোঁজ হয়েছে কিশোর রাবু, নিশ্চয় সে নাম লিখিয়েছে মুক্তির খাতায়!

খাসকামড়ায় বেলতলার নতুন মেয়েটাকে দলাই-মলাই করেই চলেছে শমসের মৃধা! আল্লায় জানে, ক’বার হলো! প্রতিরোধকল্পে মেয়েটা চিৎকার করছে তারস্বরে আর শমসেরের বাপ-মা তুলে গালিগালাজও ঝারছে থেকে থেকেই। তখন বসাকদের বাড়িতে ঢোকে সাদা পাঞ্জাবি, পাজামা আর জিন্নাহ টুপি পরা ইসমত মওলানা। সঙ্গে সঙ্গেই রাজাকার বাহিনীর উপস্থিত সদস্যরা অস্ত্র হাতে লাইনে খাড়া হয়ে তাকে অভিবাদন জানায়। ইসমত মওলানা সোজা গিয়ে বসে পশ্চিম-দালানের বারান্দায় পেতে রাখা কাঠের চেয়ারটায়; বসেই হুকুম দেয় শমসের মৃধাকে খবর দিতে। তার গলার আওয়াজ পেয়ে লুঙ্গির ভাঁজ ঠিকঠাক করতে করতে, পরনের পাঞ্জাবির বুকের দিককার বোতামগুলো লাগাতে লাগাতে হন্তদন্ত হয়ে বারাদ্দায় এসে দাঁড়ায় শমসের মৃধা। শ্রদ্ধায় নিচু হয়ে আছে তার মাথা। ইসমত মওলানা তাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘রসুল ভাইজান ক্যাম্বা আছে ?’

‘আপনের কথামতো তাক মোটেই মারধোর করা হয় নাই হুজুর!’

‘ভাইজানেক হেনে লিয়ে আয়। হাত-পা’র দড়িটড়ি সব খুলে লিয়ে আসপু। বেত্তমিজি করবু না কিন্তুক!’

তারপর দেখা যায়, পশ্চিম-দালানের বারান্দায় ইসমত মওলানা এবং বৃদ্ধ মোহাম্মদ রসুল সামনাসামনি চেয়ারে বসে আছে। থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মোসলেমরা শুনতে পাচ্ছে, শান্ত স্বরে মোহাম্মদ রসুলকে প্রশ্ন করছে ইসমত মওলানা, ‘কোনে গা ঢাকা দেছে আপনের পেয়ারের ছোট ভাই সালাম ? তার সাথ তো কিছু পুরেন হিসেব-নিকেষ ছিলে আমার!’

‘আটান্ন বছর বয়স্ক একজন মানুষ কোনে যাচ্ছে না যাচ্ছে তা কি আর আমাক কয়ে যাবি নেকি ?’ চরম বিরক্তি নিয়ে বলে মোহাম্মদ রসুল।

‘অসুবিধে নেই! খুঁজে বাইর করে লেবনে! ইবার কন ভাইজান, সালামের দুই ছাওয়াল মেহেরপুরে গেছে কী করতি ? স্কুলে যিডা পড়ে সিডাও নেকি গেছে, শুইনলেম ?’

‘ক্যা? তুই জানিসনে যে মেহেরপুরে উয়েরে নানির বাড়ি ?’

‘নেকি ভারতে গিছিলে যুদ্ধের ট্রেলিং লিতি ?’

‘হবেরও পারে! সিডা কবের পারলেম না।’

‘আচ্ছা আপনের কওয়া লাগবি নানে। আমিই আপনেক সুম্বাদখেন তা’লি পরে দেই।’ 

পাবনা শহর থেকে নগরবাড়িঘাটে যাওয়ার পথে পুষ্পপাড়া হাট পড়ে। পাকিস্তানি সৈন্যদের একটা ক্যাম্প রয়েছে সেখানে, হাটের সাথেই।  সেখানে এক প্ল্যাটুন অর্থাৎ জনা তিরিশেক সৈন্য অবস্থান করে সবসময়। সপ্তাহ দুয়েক আগের এক সন্ধ্যেবেলায় হাটটাতে পাকিস্তানি সৈন্যদের চৌকিতে আক্রমণ চালিয়েছিল মুক্তিবাহিনীর দু’টো স্কোয়াডের মোট কুড়িজন গেরিলা। ক্যাম্পটাতে যে দুলাই থেকে আসা একটা স্কোয়াডের দশজন পাকিস্তানি সৈন্য ট্রানজিটে রয়ে গিয়েছিল তা জানা ছিল না গেরিলাদের। কাজেই চৌকিতে গেরিলাদের হিট এন্ড রান অপারেশন শেষপর্যন্ত পরিণত হয়েছিল সম্মুখযুদ্ধে। চল্লিশজন পাকিস্তানি  সৈন্যের বিরুদ্ধে কুড়িজন মুক্তিযোদ্ধা সেই রক্তক্ষয়ী সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। অপ্রস্তুত ছিল বলে মুক্তিবাহিনীরই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল বেশি। ইসমত মওলানা মোহাম্মদ রসুলকে জানায়, সেই রাতে মুক্তিবাহিনীর যে চারজন খতম হয়েছিল তার ভেতরে রয়েছে মোহাম্মদ সালামের আঠারো বছরের বড় ছেলে সাইফ।

ভাতিজার মৃত্যুসংবাদ শুনে শোকে মূক হয়ে পড়ে মোহাম্মদ রসুল! উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ওপরের পাটির দাঁত দিয়ে সে চেপে ধরে রাখে তার নিচের ঠোঁট। তার দু-চোখের কোণে চিকচিক করে ওঠে অশ্রু।

ইসমত মওলানা মোহাম্মদ রসুলকে বলে, ‘ভাইজান! আপনেরে পরিবারডা না আসলেই পাকিস্তানের শত্রু! মনে আছে, ১৯৪৭ সালে, আমরা যহুন জেলাপাড়ার শ্রীনাথ সাহার বাসা অ্যাটাক করিছিলেম তহুন আমার বুকে দোনলা বন্দুক তাক করেছিলেন আপনে ? আর আপনের ছোট ভাই ফাঁকা গুলি ছুড়িছিল পর্যন্ত! ভাগ্যি ভালো যে সে আমার বুকের পর গুলি বিঁধা দেয়নি!’

‘ও হ্যাঁ! মনে পড়েছে―নিরীহ একজন মানষের পর জোর খাটাবের গিছিলু তুরা!’

‘চল্লিশ বছরের আগের হিসেবডা তো ইবার কোলোজ করা লাগে ভাইজান!’

ইসমত মওলানার কথা শুনে থমকে যায় মোহাম্মদ রসুল। ক’সেকেন্ড পরেই সে ইসমত মওলানার শীতল চোখে চোখ রেখে বলে, ‘তা’লি পরে ডুয়েল হয়ে যাক―তোর হাতে একখেন পিস্তল থাকবি, আমার হাতে আরেকখান। রাজি তুই ? তোর সাথ আমার হিসেবেও শ্যাষ করার দরকার।’

‘নাহ্্ ভাইজান! সিডা হচ্ছে না! আপনের হাতের টিপ যে খুব ভাল সিডা সগ্গলেই জানে। কাজেই সেই ঝুঁকি আমি লেব লয়!’ এ কথা বলার পরে রাজাকার কমান্ডার শমসের মৃধাকে একটা গুলিভরা পিস্তল নিয়ে আসতে বলে ইসমত মওলানা। একছুটে ইসমত মওলানার খাসকামরা থেকে শমসের মৃধা পুরনো একটা ব্রাউনিং পিস্তল নিয়ে আসে। ইসমত মওলানা যখন পিস্তলটা কক করে ফেলে তখন তাকে মোহাম্মদ রসুল বলে, ‘তা’লি পরে এশার নামাজডা আদায় করেই লেই। মাগরিবের নামাজ কাজা হয়ে গেছে। কী কইস তুই ?’

‘ব্যাপারডা ভালই হতে! কিন্তুক আমাক আবার এহুনই নুরপুর ডাকবাংলোত যাওয়া লাগবি। সার্জেন্ট বেগ আমার জন্যি বসে থাকপিনি। কিছু মনে করেন না ভাইজান!’    

চেয়ারটাতে বসে বসেই কলেমা তয়্যেবা পাঠ করে আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে মোহাম্মদ রসুল। তারপরই তার বুকের ঠিক মাঝখানে পিস্তল থেকে ক্লোজ রেঞ্জে পরপর তিনটা গুলি চালায় ইসমত মওলানা। গুলি খেয়ে চেয়ার থেকে হুমড়ি খেয়ে মেঝেতে পড়ে যায় মোহাম্মদ রসুল। রক্ত মেখে লাল হয়ে যেতে থাকে তার সাদা পাঞ্জাবি আর নীলচে লুঙ্গি। ইসমত মওলানার দিকে তাকিয়ে তবু ক্রুর হাসিতে, ফ্যাঁসফেসে গলায়, সে টেনে টেনে কেবল বলতে পারে, ‘অসুবিধে নেই! আমি বীজ বুনিছি।’ বোঝা যায়, দম বন্ধ হয়ে আসছে তার।

একথা শুনে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে ইসমত মওলানা। মোহাম্মদ রসুলকে উদ্দেশ করে সে একই রকমেরই একটা কথা বলে, ‘বীজ আমিও বুনিছি ভাইজান। সিডা অবশ্য আপনে আর দেখে যাতি পরতিছেন না! ’

তারপরই জান কবজ হয়ে যায় মোহাম্মদ রসুলের। মোহাম্মদ রসুলের শরীরটা নিথর হয়ে গেলে ক্যাম্প থেকে বের হয়ে যায় ইসমত মওলানা। যাওয়ার আগে রাজাকার-কমান্ডার শমসের মৃধাকে সে বলে যায়, ‘আমি ক্যান্টমেন্টে গিলেম। গাদ্দারগুলেক তুই টিরাকে গুছা লিয়ে আয়।’

একটু পরেই নির্বাচিত ক’জন পুরুষ ও নারী বন্দীকে শমসের মৃধা নুরপুর ডাকবাংলোর অস্থায়ী সেনানিবাসে দিয়ে আসতে যাবে। পীতাম্বর বসাকদের বাড়ির উত্তর-পূর্ব কোণের আমগাছটার নিচে পুঁতে ফেলা হবে মোহাম্মদ রসুলের লাশটা। কাজটা করবে মোসলেম আর আবুল মিলে। 

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares