প্রবন্ধ : নগরসংস্কৃতির স্বরূপ সন্ধানে : খান মাহবুব

মানবসভ্যতা টিকিয়ে রাখতে ও অগ্রায়নে নগরের সৃজন। সভ্যতার প্রভাতবেলায় শিকারের প্রয়োজনে মানুষ সংঘবদ্ধ হয়। এই যাত্রাপথেই শিকারের অধিক কায়িক শ্রমে অংশ না নিয়ে অতি বুদ্ধিমান কিছু মানুষ শিকারের অস্ত্র ভাড়া দিয়ে নিজেদের আলাদা শ্রেণিতে ভুক্ত করে। কম শ্রমে কৌশলে অধিক আয় করে নিজেদের আলাদা শ্রেণি তৈরি করে। শ্রেণি সংগ্রামের বীজ সেই সময় থেকে প্রোথিত। বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ সময়ের প্রয়োজনে সুযোগ-সুবিধার সম্প্রসারণে নগর সৃষ্টি করে। নাগরিক সুবিধা ও কর্মক্ষেত্রের সম্প্রসারণে নানান শ্রেণি-পেশার মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নগরে বসতি গড়ছে প্রাচীন কাল থেকে।

ভারতীয় উপমহাদেশে হরপ্পা-মহেনজোদারোর মতো প্রাচীন নগর থাকলেও পূর্ববঙ্গে ময়নামতি, পাহাড়পুরের মতো প্রাচীন নগরের নজির কম। পূর্ববঙ্গের নগর গড়ে উঠেছিল নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ-নির্ভর। দেশের বড় নগর ঢাকা (বুড়িগঙ্গার তীরে), চট্টগ্রাম (কর্ণফুলী নদীর তীরে), রাজশাহী (পদ্মা নদীর তীরে), খুলনা, (রূপসা নদীর তীরে) গড়ে ওঠা নগর।

বাংলার প্রাচীন সমাজ যেমন পারস্পরিক বন্ধন-নির্ভর, নগরগুলো তেমন নয়। তবে নগর সংস্কৃতির সূচনায় নগরের মানুষ এত ব্যস্ত ছিল না, এবং বন্ধনটাও এতটা ভঙ্গুর ছিল না।

অবিভক্ত বঙ্গের প্রধান নগর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত কলকাতা ১৬৯০ খ্রি. থেকে ১৮০০ খ্রি. এই সময়কে বলা যায় কলিকাতার ভিত্তিভূমি। এই একশ বছরের মধ্যে কলকাতা হয়ে উঠেছে এক নয়া বাণিজ্যনগরী। সেই বাণিজ্যের টানে শুধু যে ইউরোপীয় বণিকেরাই যাওয়া-আসা শুরু করেছে তাই নয়, নতুন নগরীর দৃষ্টিনন্দন আকর্ষণে বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষার জন্য আসতে শুরু করেছে নব্য ব্যবসায়ী দল। উনিশ শতকে বাঙালি যেন রাতারাতি মধ্যযুগের চণ্ডীমণ্ডপ পার হয়ে এসে দাঁড়ালো ইউরোপীয় সংস্কৃতির উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে।

প্রাগ্রসর মানুষ বুঝতে পারল কাল্পনিক দেব-দেবীর মাহাত্ম্য বর্ণনা নয়, তার চেয়ে বেশি সত্য মানুষের জীবন। সেই সময় নগরজনেরা আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক পোশাকটা খুলে ফেলে মানবতার নতুন পোশাকে আসরে নামলেন। (১)

[প্রণয় কুমার কুণ্ডু, মহানগরী কলকাতা, বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে নগর, সম্পাদক আবদুল মমিন চৌধুরী, উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা, ১৯৯৬ পৃ ২৬৯] যাত্রা শুরু বঙ্গের নগর সংস্কৃতির।

পূর্ববঙ্গের প্রধান নগর ঢাকার গোড়াপত্তনের ৪০০ বছর হলেও আধুনিক নগর সংস্কৃতির এখনও শত বছর পেরোয়নি।

বুদ্ধদেব বসুর লেখায় ১৯৩০ এর দশকের ঢাকার চমকপ্রদ বর্ণনা পাওয়া যায়। বুদ্ধদেবের ভাষায় :

বাস্তবিক কি সুন্দর এই রমনা, রাতের রমনা। তাদের বাড়িটি রমনার একেবারে শেষ সীমান্তে, এর পিছনে আর ভদ্রপল্লি নেই, ঢাকা সড়ক একটু একটু এগিয়েই শেষ হয়ে গেছে, তারপরে একটা শুকনো খাল, এবং সেই খালের ওপারেই খাঁটি পাড়া-গাঁ আরম্ভ হলো (বস্তি নয় ভাগ্যিস) ―মগের মুল্লুক, না, না মগবাজার।

মগবাজার কী অদ্ভুত নাম! (২)

নগরের মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে পরিযায়ী পাখির মতো নগরে ভিড় জমায়। দীর্ঘদিন বসবাস করলেও নগরের সঙ্গে শিকড়ের বন্ধন দৃঢ় নয়। নগরের মানুষ, নগরের ভূমিজ সন্তান নয় বলে, গ্রামীণ জীবনের মতো মায়া-মমতার বন্ধন কম। যদিও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রবণতায় গ্রামেও এখন বিচ্ছিন্নতার সংস্কৃতি ধাবমান গ্রামগুলোর মানুষের বন্ধন আন্তরগরজ থেকে নয়। আত্মিক নয় বরং মেকি ও লৌকিক। সেটাও ক্রমহ্রাসমান। গত ২৫ বছরে গ্রামে যেসব পরিবর্তন হয়েছে তার মধ্যে সবচাইতে চোখে পড়ার মতো দুটো দিক হলো: ব্যাপক বাণিজ্যিকীকরণ ও এনজিও কাঠামোর সম্প্রসারণ। (৩)

 [সূত্র : আনু মুহাম্মদ, বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ ও অর্থনীতি, মীরা প্রকাশ, ঢাকা ২০১৮]

গ্রামীণ জীবন, সাম্প্রতিক সময়ে, হাজার বছরের আবহমান রূপ হারিয়েছে, পরিবেশে ও সমাজ-জামাতে। উন্নয়নের ডামাডোলে গ্রামগুলোতে শহর ঢুকে পড়ছে, গ্রামের মানুষের মধ্যেও শহুরে কূটচাল সংক্রমিত হয়েছে।

আর শহুরে মানুষ এতটাই আত্মকেন্দ্রিক যে, যৌথ পরিবার ভেঙে দিয়েছে নগরসংস্কৃতি। ষাটের দশকেও শহরে কিছু যৌথ পরিবার ছিল। বাড়ির উঠোন ছিল, বাসা-বাড়িতে একাধিক ঘর ছিল। বাড়ির প্রাঙ্গণে জুঁই, জবা, হাসনাহেনা ফুলের গাছ ছিল। এখন নগরের ফ্ল্যাট কালচারে মানুষের চিন্তা ও দৃষ্টি সংকুচিত হয়েছে। পরিবার বলতে আমি, আমার স্ত্রী, সন্তান―ব্যস। মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়ের উপস্থিতি না থাকলেই মঙ্গল। বাড়িতে উঠোন নেই, এক চিলতে বারান্দা, সেটাতেও দাঁড়ানোর জো নেই। বারান্দায় দাঁড়ালেও বিদ্যুতের তার, খুঁটি, উঁচু ভবন―আকাশটা দেখার উপায় নেই। নগরে মানুষের আয়েশ নেই। ভাবনার অবারিত প্রান্তর নেই। শুধুই ঘুম থেকে ওঠা আর কাজে ছোটা এবং ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়া। বিয়ে আর মৃত্যু ছাড়া এখন আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে খুব একটা সাক্ষাৎ হয় না। বাংলার নগরগুলো আর যা-ই করুক মানুষকে দিয়েছে সীমাহীন বিচ্ছিন্নতা। নগরের ইট-পাথরের বাড়িতে মানুষগুলো যেন নগরকীট।

মানুষের ধর্মোৎসবে, আচার-আচরণে, নামে-নিশানায়, খোরাকে-পোশাকে, আর্টে-সাহিত্যে, নাচে-গানে ও আদবে-কায়দায় তাদের কালচারের গণরূপ প্রতিফলিত ও বিকশিত হয়। (৪)

[সূত্র : আবুল মনসুর আহমেদ, বাংলাদেশের কালচার, আহমেদ পাবলিশিং হাউস, ঢাকা ২০১৭ পৃ. ২৫]

নগরের সর্বজনীন কিছু উৎসব যেমন নববর্ষ, বইমেলা। বিজয়দিবস, ঈদ, দুর্গোৎসব ইত্যাদির একটা চালচিত্র থাকলেও নগরের মানুষ বড়ই বিচ্ছিন্ন। সবচেয়ে দুর্গতি হচ্ছে নগরের সভা সেমিনারে মানবিকতা, নৈতিকতা, মূলবোধের কথা বলা হলেও নগরজীবনে এসবের পরিচর্যা কম। নগরের মানুষ বড়ই শঠ্। মুখের কথা ও অন্তরের বিশ্বাসের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব―এটাই নগরসংস্কৃতির বড়ই নিদারুণ বাস্তবতা।

বেঁচে থাকার তাগিদে কখনও বা নিজের অধিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে মিথ্যাচার, ভণ্ডামি ও নানা অনাচার আজ নগরসংস্কৃতির প্রাত্যহিকতায় একাত্ম। কায়দা করে বেঁচে থাকতে গিয়ে, নগরের মানুষগুলো, আমরা অচিন ও স্বার্থপর। সম্প্রতি কবি মোহাম্মদ রফিক জীবনের গোধূলিবেলায় লিখেছেন―গান শুনি, লিখি আর কোন্ স্বার্থপর পৃথিবীতে বসবাস করে গেলাম, সেটা বোঝার চেষ্টা করি। (৫)

[দৈনিক প্রথম আলো ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১]

নগরসংস্কৃতির স্বার্থপরতা কবিকেও দগ্ধ করছে প্রতিনিয়ত। নগর থেকে উড়ে গেছে ঘুঘু, ময়না, দোয়েলসহ হরেকরকম পাখি। সংকুচিত হয়েছে নগরের বাগ-বাগিচা। মাত্রাতিরিক্ত বসতি বেসামাল জীবনযুদ্ধ, দুর্গন্ধযুক্ত নর্দমা, মশা-মাছি, গাড়ির হর্ন, যানজট, যত্রতত্র আবর্জনা নগরসংস্কৃতির অংশ।

বাংলার নগরজনেরা বড়ই কৌশলী। গা বাঁচিয়ে চলার কৌশলে তারা সিদ্ধহস্ত। বিপদ-আপদ, ঝুট-ঝামেলায় শুধু পাশ কাটিয়ে চলা। পরস্পরের প্রতি মানবিক বন্ধন এখানে মেকি। কেউ কারও সুখ- দুঃখের সারথি নয়। সঙ্গ বিরোধে এ নগরে সংস্কৃতি একই বিল্ডিংয়ে পাশাপাশি থেকেও কেউ কাউকে চেনে না। বড় বিচিত্র এ বেঁচে থাকা।

আধুনিক নগরসংস্কৃতি পাশ্চাত্যের দেশ থেকে আমদানি হয়েছে ভারতবর্ষে। তবে ইউরোপীয় নগরসংস্কৃতির অনেক কিছুর সঙ্গে আমাদের কিছু সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য রয়েছে। আঠারো শতকের তিনটি বড় বিপ্লব, যথা: শিল্প বিপ্লব (১৭৬০-১৮০০), প্রজ্ঞাবাদ (ঊহষরমযঃবহসবহঃ) ও ফরাসি বিপ্লব। শিল্প বিপ্লব ইংল্যান্ডে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি, প্রজ্ঞাবাদ জ্ঞানের আলোর বিকাশ করে ইউরোপে মানবকে বিকশিত করে। (৬)

 [সূত্র : রংগলাল সেন, সিভিল সোসাইটি, নিউ এজ পাবলিকেশন্স, ঢাকা, ২০০৬ পৃ. ৪]

নগরের উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গে একটি শব্দের ব্যবহার শুরু হয় সেটা হচ্ছে ‘সিভিল সোসাইটি’। পশ্চিমে ইউরোপের সমাজ চিন্তায় ‘সিভিল সোসাইটি’ শব্দটি সোশিওলজি শব্দের পূর্বসূরি। ইউরোপের সিভিল সোসাইটির সামগ্রিক কার্যক্রম, চিন্তা-চেতনার সঙ্গে আমাদের সিভিল সোসাইটির ঢের ফারাক রয়েছে। পশ্চিমা সিভিল সোসাইটি সমাজমনে বদান্যতা সৌভ্রাতৃত্ব এবং মানবতাবোধ বিকাশের প্রচেষ্টা থাকে। আমাদের সিভিল সোসাইটির ভেতর উদারতা ও সামগ্রিক চিন্তার প্রয়াস কম। এখনকার সিভিল সোসাইটি যেন গ্রামীণ কূটচালের বেড়াজালে বন্দি। ফলে সিভিল সোসাইটি বলতে যাদের চিহ্নিত করা হয় তারা নগরজনদের প্রতিনিধিত্ব করে না প্রায়শ। রাষ্ট্র হচ্ছে রাজনৈতিক সমাজ, সিভিল সোসাইটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সামগ্রিক রূপ। আমাদের সিভিল সোসাইটি সামগ্রিকভাবে ধারণ করতে পারেনি, ফলে সিভিল সোসাইটি নগরসংস্কৃতির স্বরূপ নির্ধারণ করতে পারেনি।

অতীতে সংস্কৃতির মূল আবেদন ছিল মিলন এখন যা বিচ্ছিন্নতার আবাহনে মুখর। নগরে এই বিষয়টির মাত্রা অধিক।

আমাদের সংস্কৃতি এখন নগরবাসী উচ্চবিত্ত এবং কর্পোরেট পুঁজির শাসনে সংকুচিত ও বিকৃত রূপ পরিগ্রহ করেছে।  (৭)

[ সূত্র : বিশ্বজিৎ ঘোষ, বাংলাদেশের সাহিত্য, আজকাল প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৮]

বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে আমাদের হাজার হাজার বছরের দেশজ উত্তরাধিকার জড়িয়ে রয়েছে। জড়িয়ে আছে প্রয়োজনের প্রতিদিনের জীবন সংগ্রামের উত্তাপ ও আনন্দ আকাক্সক্ষা। বাংলাদেশের সংস্কৃতি নতুন বংশের কাছে অস্তিত্বের ঠিকানা সঞ্চার করুক, দূর করুক মানুষের সঙ্গে মানুষের বিচ্ছিন্নতা। এই তো আমাদের চাওয়া, কিন্তু নগর তথা বাংলাদেশের সামগ্রিক সংস্কৃতিতে সেই প্রবাহের বিপরীতে দৃশ্যমান শিক্ষা ও সংস্কৃতি আজ মূলত কর্পোরেট পুঁজির নির্দেশ ও পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হচ্ছে।

পুঁজির দহন গ্রাস করেছে সমাজ ও সংস্কৃতিকে। সবাই যেন এ সমাজে পুঁজির দামে কেনা। অর্থনৈতিক সংগ্রামে লিপ্ত থেকে মানুষ রাজনৈতিক ও মতাদর্শের সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। রাজনীতি আজ কোনও দর্শন বা ধারণাকেন্দ্রিক নয় বরং যেন রাজনীতি একটা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির হাতিয়ার। ফলে কোনও মতবাদ বা দর্শন নয় বরং ক্ষমতাসীনদের সংশ্লিষ্টতায় আর্থিক সমৃদ্ধি মানুষের প্রধানতম রাজনৈতিক দর্শন। বিশেষ এক শ্রেণি কর্তৃক অপর শ্রেণিকে শোষণ করার জন্য সুসংহত রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনে নগরের মানুষ ব্যস্ত। যদিও সাধরণভাবে মনে করা হয় রাষ্ট্র শ্রেণির ঊর্ধ্বে।

গভর্নমেন্ট ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের প্রতিনিধি। কিন্তু আজকের সমাজে অর্থনৈতিক কাঠামো ব্যক্তিগত বিত্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখন ব্যক্তিগত বিত্তই পুঁজিতন্ত্রের কর্মস্থল। রাষ্ট্রযন্ত্রও পুঁজিবাদীদের সমীহ বা সহযোগে চলে। ফলে নগরসংস্কৃতির বড় লক্ষ্য পুঁজির সঞ্চায়ন―কেননা পুঁজি যেসব কিছুর নিয়ন্ত্রকের আসনে সমাসীন। এই প্রেক্ষাপটে দেশজসংস্কৃতির নির্মোহ পরিচর্যা ও মানবিক বোধসম্পন্ন ভেদহীন নগরসংস্কৃতি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নগরে।

নগরের প্রতিটি পেশার মানুষের অপরের দুর্দশাকে পুঁজি করে অর্থ অর্জনের একটা সাধারণ প্রবণতা লক্ষণীয়। চিকিৎসক ও ক্লিনিক মানুষের অসুস্থতাকে সেবা দিয়ে পরিচর্যা করার চাইতে রোগীর কাছে আয় অর্জনে বেশি মনোনিবেশ করে। পুলিশ ভুক্তভোগীর প্রতিকারের চাইতে হয়রানির মাধ্যমে অর্থ অর্জন করতে ব্যস্ত, আইনজীবী মামলার বাদী বিবাদীর প্রতিকারের চাইতে মামলার দীর্ঘসূত্রতার মাধ্যমে পকেটে টাকা ভরতে ব্যস্ত… ইত্যাদি নগরে মানুষের মধ্যে দরদ, সহমর্মিতা এবং পরোপকারী মনোভাব প্রতিদিন ক্ষয়িষ্ণু হচ্ছে। পত্রিকার পাতায় তাই ইতিবাচক সংবাদ হারিয়ে যাচ্ছে। খুন, ধর্ষণ, দখল, রাহাজানি, প্রতারণা পত্রিকার পুরো পাতাজুড়ে ঠাঁই করে নিচ্ছে।

 নগরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে আবার আর্থিক সংযোগ খোলামেলাভাবে বললে ভাগাভাগির একটা যোগসূত্র রয়েছে। বিভিন্ন আর্থিক ও আনুতোষিক সুবিধা অর্জনে গোষ্ঠী স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে একাট্টা হতে দেখা যায়। সে হোক, সরকারি ভূমি/ফ্ল্যাট বরাদ্দ, সরকারি যে কোনও অনুদান আর ব্যবসা বাণিজ্য তো আছেই।

সাম্প্রতিক দু’দশকে বাংলাদেশের মানুষের আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় নগরের মানুষের ভোগ-বিলাস বেড়েছে। মানুষ অনেক বিষয়ে আয়েশিও হয়েছে। ভ্রমণ খাতে এখন নগরজনেরা অনেক অর্থ ব্যয় করে। অনলাইনে খাবার থেকে জামা কাপড় কেনাকাটা করার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নগরের মানুষের রুচি ও সংস্কৃতি উপশহর এমনকি গ্রামেও দেখা দিচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে চাইনিজ খাবার ঘর, অনলাইন ফুড, বিভিন্ন দামি ব্রান্ডের জিনিসপত্রের দোকান এই বর্ণনাকে সমর্থন করে। বাস্তববাদিতার ঘোরে নগরের মানুষের মানবিক ও পরিবার-পরিজন নিয়ে সামগ্রিকভাবে অগ্রায়নের কোনও মনোদর্শন লক্ষণীয় নয়।  গতি, বস্তুবাদী উন্নয়ন, স্বার্থপরতা নগরের প্রতিটি ক্ষেত্রে লক্ষণীয়―রাস্তায় আগে চলতে যেমন যানজট তৈরি করি তেমনি সবাই সব সেবা আগে পেতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করি। পরিবেশের সুরক্ষায় এতটাই উদাসীন যে, পলিথিন বর্জ্য থেকে বাতাসে সিসার পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি নগরের মানুষের অসচেতনতার ফসল।

উন্নয়নশীল দেশে ঘনবসতির ফলে নগর ব্যবস্থাপনা এমনিতেই নাজেহাল দশা তারপর দূরদর্শিতার অভাবে নগরের খাল, ঝিল, নর্দমার সুরাহা কঠিন। নগরজনেরা শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে এতটা একাট্টা যে সরকারি সম্পত্তি বেহাত করলেও এতটুকু কার্পণ্য নেই। নানা ধরনের জটিল রোগ-শোকের উদ্ভব ও বিস্তার নগরজনদের অপরিকল্পিত জীবন-যাপনের ফসল।

 বাংলাদেশে যে নগরসংস্কৃতি বিরাজমান তা বাঙালিয়ানার প্রতিনিধিত্বশীল নয়। ঊনবিংশ  শতাব্দীর প্রথম দিকে বাঙালি শব্দটা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলেও ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালি সংস্কৃতির বীজমন্ত্র গভীরে প্রোথিত নয় এবং ভাষা ও সংস্কৃতি-নির্ভর একটি জাতি হিসেবে আমাদের অধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলন নবরূপ লাভ করে। বায়ান্নর পর বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে একটা বড় মানসিক পরিবর্তন আসে, এর পিছনে ছিল আধুনিক শিক্ষার প্রসার ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ। এ মানসিক পরিবর্তনকেই বদরুদদ্দিন উমর বলেছেন―‘বাঙালির ঘরে ফেরা’ (৮)

[সূত্র : বদরে আলম খান, বাংলার ইতিহাস বাংলার রাজনীতি, পলল প্রকাশনী, ঢাকা ২০১১]

ঘরে ফেরা সংস্কৃতির প্রবহমানতা হওয়ার কথা ছিল কল্যাণ চেতনা, সমাজবোধ, বিবেকবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন মানুষের বেশি বেশি সংযোগ। যে সংযোগের কারণে মানুষের চিত্তলোক সৃষ্টি করে শুভবুদ্ধি, মঙ্গলভাবনা ও মহৎ করে ভাবতে শেখার বাসনা, কিন্তু না সেটা হয়নি এখন বরং পশ্চাৎ পথেই হাঁটছি আমরা।

স্বাধীন বাংলাদেশের সমাজের প্রায় সর্বস্তরে যে আদর্শ ও মূল্যবোধগুলোকে আমরা সবচাইতে ফুটে উঠতে দেখেছিলাম সেগুলোর মধ্যে ছিল উদার জাতীয়তাবাদ ও সুস্থ আন্তর্জাতিকতাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সর্বপ্রকার শ্রেণি বৈষম্য ও শোষণের অবসান। কিন্তু সেই যাত্রার পথ সুগম হয়নি। (৯)

[বশীর আল হেলাল, বাংলা একাডেমির ইতিহাস, বাংলা একাডেমি, মার্চ ২০১৮, ঢাকা, পৃ. ২৬১]

শিল্প কারখানা স্থাপিত হয়েছে, ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে, পুঁজির মালিক ক্ষুদ্র একটি শ্রেণি ও ক্রমবর্ধিষ্ণু শ্রমিক শ্রেণির জন্ম হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। শহরের সঙ্গে শহরের, দেশের সঙ্গে বিদেশের সংযোগ ঘটেছে। সামাজিক ও প্রাকৃতিক কারণে ভূমিহীনদের সংখ্যা বেড়েছে। গ্রাম-সমাজের ভাঙন ও অবক্ষয়ের ফলে মানুষ শহরমুখী হয়েছে। উচ্চ শিক্ষার প্রসার ঘটায় শিক্ষিত বেকার ও মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীর উদ্ভব ঘটেছে। কাঠামোর পরিবর্তনের প্রভাব ফেলেছে সমাজের ওপর কাঠামোতে। সেখানে নতুন প্রশ্ন, নতুন জীবনজিজ্ঞাসা জেগেছে। কাল পরিক্রমায় সেসব জিজ্ঞাসার জবাব খুঁজতে খুঁজতে জনসাধারণ উপরিউক্ত জিজ্ঞাসাগুলোর একটি সমাধান নিজেদের মধ্যে করে নিয়েছিল। সমাজ-মানস যখন পরিবর্তন হলো তখন তার প্রয়োজনে অনিবার্য হলো নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠা। পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে সম্ভব ছিল না নবজাগ্রত শ্রেণিসমূহের আশা-আকাক্সক্সক্ষার বাস্তবায়ন। ফলে বিকাশের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় জন্ম হয়েছে স্পষ্ট আদর্শ নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের । (১০)

[সূত্র : সাঈদ উর রহমান, পূর্ববাংলার রাজনীতি, সংস্কৃতি ও কবিতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২০০৩, পৃ. ৪]

বাংলাদেশের বিকাশ তাই পাকিস্তান থেকে সহসা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া কোনও ঘটনা নয়, এটা পুরোনো কাঠামো ভেঙে নতুন আদর্শে বিশ্বাসী একটি নতুন জাতির অনিবার্য অভ্যুদয়। কিন্তু সেই নতুন জাতির জাতীয় সংস্কৃতির চালচিত্র আজ একত্রীকরণের চাইতে বিচ্ছিন্নকরণের দিকেই অধিক ধাবমান।

দুর্যোগ, দুর্বিপাকে কিংবা করোনার মতো মহামারি কেবল আমাদের সঙ্গ-বিরোধ করেনি, আমাদের চেতনার পাঠশালার পাঠ বিচ্ছিন্নতার প্রতি চলমান―আমরা এমন সমাজ চাইনি।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares