গল্প : অস্পষ্ট সত্য : সুশান্ত মজুমদার

চৌরাস্তার মোড়ে মামুলি বাসটা থেকে জুয়েল যখন নামে, আকাশে তখনও আগুন। নিষ্করুণ খর বাতাসেও গরমের হল্কা। বড়ই নির্দয় এবারের পাকা ভাদ্র। ঘামে সারা শরীর ঠাণ্ডা হয়ে আছে। এখুনি ছায়াময় কোনও ঠাণ্ডা পুকুরের পানিতে ঝাঁপ দিতে পারলে ভালো হয়। ভিজলে দীর্ঘক্ষণ পর শরীর বুঝি স্বস্তি ফিরে পাবে। নিজের ওপর বিতৃষ্ণা জমে উঠতে উঠতে মুহূর্তে তা হালকা হয়ে আসে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে পাড়াগাঁয় কোনও এক মুক্তিযোদ্ধার মতামত গ্রহণে কেন সে রাজি হলো ? তাহলে গ্রামে আসা লাগে না। উহু, অফিসের কেউই তাঁর ওপর কাজটা চাপিয়ে দেয়নি। ছুটি নিয়ে বাড়ি যাচ্ছে, পল্লী অঞ্চলের উপযুক্ত কোনও আইটেম যদি লিখে আনা যায়Ñকাজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আর কী। নির্ভার মনে তখন বাসস্ট্যান্ডের উদ্দেশে সে যাত্রা করেছিল। না, বিরক্তির কী আছে! মন ঘুরিয়ে আনে জুয়েল। মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে চরম ত্যাগের শ্রেষ্ঠ কীর্তি, একাত্তরে লাখ লাখ মানুষ জীবন দিতে পারলে আবহাওয়ার দোষে এই স্বাধীনতার বিষয়ে অ্যাসাইনমেন্টে অনীহা দেখানো কেন ? শহরের পাজি গরম এই মৌসুমে গ্রামও দখল করেছে। আকাশ ফকফকা, সামান্য একফালি মেঘও নেই। গা জুড়ানো সেই আরাম বাতাস মাঠঘাট খালবিল ছেড়ে বুঝি নিরুদ্দেশ। ক্ষেত-খামারের উদার হাওয়া, গাছের ডালের দুলুনি, শুকনো পাতার ঘূর্ণি, দীঘির পানির তিরতির কাঁপনÑকিছুই আর দেখা যায় না। গরমে চরাচর সিদ্ধ হতে হতে সবুজও যেন ফ্যাকাসে। এদিকে আসতে আসতে বাসে যাত্রীদের মাথার ফাঁক দিয়ে জুয়েল লক্ষ্য করেছে, থানা সদর থেকে ভেতরের পুরো রাস্তা যাচ্ছেতাই ভাঙচুরে ভর্তি। ঝাঁকুনিতে বুড়ো বাসের কলকব্জা এই বুঝি খুলে পড়ে। রাস্তার দু’পাশের আগের সেই বয়সি বড় বড় গাছগুলো লোপাট।

জুয়েল এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে, এই যে গ্রামে মানুষ ধরে মুক্তিযোদ্ধা খুঁজে পাওয়া যত সহজ, বাক্যালাপ শুরু তত দুরূহ। ঢাকা ছেড়ে মাওয়ার পদ্মার ফেরিতে দাঁড়িয়ে পয়লা মোবাইল ফোনে সে মামার সঙ্গে বাতচিৎ করে। একবেলার জন্য হলেও সে সানপুকুরিয়ায় আসছে। কাজ ছোট, এসে সব বলবে, মামার সহায়তা দরকার। হঠাৎ ফোন পেয়ে মামা উল্লাসে তখুনি ভাগ্নেকে উড়াল দিয়ে চলে আসতে বলেন, পারলে ফোনের মধ্য দিয়ে সে এসে পড়ুক। কত কথা জমে আছে, স্নেহের ভাগ্নেকে কতদিন দেখে না। এদিকে মামির চোখে ছানি পড়ছে, প্রিয় ভাগ্নের জন্য ভালো ভালো কত পদের রান্না স্থগিত রেখে হাত তাঁর অলস হয়ে পড়ে আছে। শুনে জুয়েলের মধ্যে জোর ধাক্কা লাগে। মামার কথার মানে দাঁড়ায় এমনÑজুয়েল নিশ্চয় ক’দিন থাকবে। জম-জমাট আনন্দ হবে। কিন্তু হাতে সময় কই তাঁর, মাত্র চারদিনের ছুটি। মনে মনে স্থির করেছে, সরাসরি মামাবাড়ি পৌঁছে দিনের প্রথমে সবার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ, পরের বেলা এক মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে বাক্যালাপ সেরে এই দিনেরই আলো থাকতে থাকতে সে নিজের শহরে ফিরবে। নির্ধারিত এই ইচ্ছা ফোনে জানালে মামা এতেও রাজি; কী আর করা, ভাগ্নেকে চর্মচক্ষে কিছুক্ষণ তো দেখা যাবে। আর মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে কথাবার্তা, এমন কী কঠিন, তাঁদের গ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা আছে, সাহসের সঙ্গে একাত্তরে পাকিস্তান আর্মি, রাজাকারদের বিরুদ্ধে দারুণ লড়াই করেছে। সবাই তাঁর ঘনিষ্ঠ।

দেখ কাণ্ড, সানপুকুরিয়ায় জুয়েল পৌঁছেছে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা হবে। জার্নির ধকলে শরীর তাঁর ধীরে ধীরে ছেড়ে দিচ্ছে। মামা গ্রামের দক্ষিণ তল্লাটের এক মুক্তিযোদ্ধা আফাজ আলিকে সামনে বসিয়ে আসছি বলে সেই যে হাওয়া এখন তাঁর চেহারার নিশানি নেই। তাঁর ধাত হচ্ছে বাগাড়ম্বর করা। অমন অভ্যাসের স্বর কোনও পড়শির উঠোন, কানাচ বা গাছপালার আড়ালে শোনা যাচ্ছে না। এদিকে দিনের বাকি আলো ফুরিয়ে বিকেল মরে আসছে। ক্রমে ডালপালা ধরে ছায়া ছড়িয়ে পড়ছে। দিনটা ফুরিয়ে গেলে তাহলে দাঁড়াবে কি, থাকো সানপুকুরিয়ায়, নির্ঘুম একটা রাত, মামাবাড়ির ন্যাপথালিনের গন্ধভর্তি বিছানায় এপাশ-ওপাশ করা এক চরম অস্বস্তি। রাত ছিঁড়তে থাকবে বাদুড়ের সাঁই সাঁই ডানার আওয়াজ। ঝিঁঝিঁ আর পোকামাকড়ের কিটির কিটির প্রতাপে আরও ঘন হয়ে উঠবে কালিবিষ অন্ধকার।

নিজের ওপরই নাখোশ হয় জুয়েল। কোথায় এখন ভৈরবের পাশে তাঁদের ছোট্ট মফস্সলে ইয়ারদোস্ত নিয়ে সে থাকত আড্ডায়। প্রায় বছর দেড় পর ছুটির সুবাদে বাড়ি আসার আমোদ-ফুর্তি গোড়াতেই গুবলেট। তাঁর পথ চেয়ে মা অপেক্ষায় আছে। ভাবতেই কষ্টের কাটাকুটি টাটিয়ে ওঠে। কেন যে তাঁর আসার আগাম খবর মাকে সে জানাতে গেল ? না, মাত্র একটা রাত গ্রামে কাটানো নিয়ে খেদ-আক্ষেপ, হা-হুতাশের কিছু নেই। নিষিদ্ধ কোনও বাড়িতে সে তো আসেনি। কেবল মামাবাড়ি নিয়ে সে বেজার, কেন জানি এই বাড়িটা তাঁর ভালো লাগে না। আগের চলাচল অনুপযোগী সেই কাদামাটির সুযোগবঞ্চিত এলাকা আর নেই। সহজে শহর ঢুকে পড়েছে ঘরে-ঘরে ঘাটে-মাঠে। পল্লীবিদ্যুতের কল্যাণে টিভি বলো, ডিভিডি বলো, ডিস লাইন পর্যন্ত কত কিসিমের অশেষ বিনোদন দোচালা-চৌচালার ভেতর বারান্দা-দরজা-বেড়া-ছাউনি ধরে ধেই ধেই নৃত্য করছে। ছেলেমেয়েদের গায়ে পায়ে পরনে এখন হালফ্যাশন। কী নেই, খুঁজলে বুঁদ হওয়া নেশার উপকরণও পাওয়া যেতে পারে। বিদেশি সাহায্য সংস্থার অর্থায়নে গ্রামে নতুন নতুন রাস্তা, তার ওপর দিয়ে তেজি যুবকেরা মোটরসাইকেল দাবড়ে বেড়াচ্ছে। বেড়াক, গাঁ-গঞ্জ তাঁরা তছনছ করলে তাঁর কী, সে বাইরের লোক।

জুয়েল জানে, হতাশা-বিতৃষ্ণা অপেক্ষা করছে সামনে, মামা যখন ভাগ্নেকে বসিয়ে নীরস বাচালতা চালু করবেন। কী থাকবে না তাঁর কথার প্যাঁচালে, কত অবান্তর প্রসঙ্গ : ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, কোন্ পেয়ার মোহাম্মদ না ইয়ার মোহাম্মদ, তাঁর সঙ্গে খুব মাখামাখি দিলপিয়ারা বন্ধু, মামার কাছে নারকেলের তিনগণ্ডা চারা চেয়েছে। এ-বাড়ির নারকেলের ফলন নাকি বেশি বেশি। কী করা, মামা দুই ডজন চারা ভ্যানগাড়িতে চেয়ারম্যান বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। অনাবশ্যক ফালতু এই বকবকানি সে কেন শুনবে ? জুয়েলের কোনও দরকারে আসবে ? দেখ, জানোয়ার সাইজের গাট্টাগোট্টা মামাতো ভাই প্রতিবারের মতো জুয়েলের ডানে-বামে সেঁটে বাড়তি তাপের জোগান দিয়ে যাবেÑসরিয়ে দিলেও কিছুতেই নড়বে না। তাঁদের হাবলা নজর সরে নাÑজুয়েল ভাইকে দেখেও নাকি শান্তি। এই গাভুরদের খুব ইচ্ছা, তাঁদের আব্বা রাজি হলে ঢাকায় সর্বক্ষণ ভাইয়ার সঙ্গে গিয়ে থাকা। কত মজার মানুষ, দিন-দুনিয়ার বহু খবরের ভেতর-বার ভাইয়া জানে। সে কেবল ছুঁয়ে দিলে জ্ঞান-বুদ্ধি মাথার খুপরিতে ঝিলিক দিয়ে ওঠে। কী অসম্ভব চামচামি কথা। শুধু গায়ে না, মাথামোটা মামাতো ভাই দুটির বড়টা বোঝা মনে করে বই-পুস্তক আগেই ফেলে দিয়েছে। ছোটোটা পঁচাশি পার্সেন্ট পাস করা ছাত্রছাত্রীর মধ্যে এসএসসিতে ইংরেজি-অঙ্কে ফেল করেছে। মামার উচিত তাঁর স্নেহের এই বলদজোড়াকে চাষের কাজে জুড়ে দেয়া। আর মামি, জটিল কোনও অসুখে ভুগে ভুগে এখন সে পাটখড়ি। ঠোঁটে আঠামাখা এই মানুষটার জন্য সত্যিই জুয়েলের দুঃখ হয়। মামাবাড়ির এই একজন কাহিল শরীর নিস্তেজ নজর ধরে হলেও গৃহস্থালির দেখভাল করছেন। মামির ওই শুকনো মুখে বুঝি লেপটে আছে দোজখ ভোগ মর্মপীড়া। জুয়েলের মায়ের চেয়ে সামান্য বয়সে ছোট হালকা-পাতলা গড়নের মামি জুয়েলকে দেখে নিজেকে আড়ালে কেন সরিয়ে রাখতে তৎপর সে বুঝতে পারে না।

কী কাণ্ড, মামা দেখি সত্যি সত্যি অদৃশ্য। সেই-ই এই মুক্তিযোদ্ধাকে ডেকে এনেছে। তাঁর প্রতি ভক্তিশ্রদ্ধা রেখে অন্তত দু-চারটা কুশল কথাও সে বলতে পারত। রহস্য কী! চায়ের ছাপরার বাঁশের বেঞ্চের একপাশে আফাজ আলিকে নিয়ে ঠায় সে বসা। দু’জনেই চুপ, কেবল হঠাৎ হঠাৎ পরস্পর মুখ চাওয়াচায়ি সেরে নজর এদিক-ওদিক করা। জুয়েল এই চায়ের ছাপরায় নতুন, ষাট-পঁয়ষট্টি বছরের, নাকি তাঁর চেয়ে বেশি বয়স্ক আফাজ আলির কাছেও সে নতুন, কিছুতেই তাই ইতস্তত ভাব সে কাটিয়ে উঠতে পারছে না। নিজে উদ্যোগী হয়ে কোন্ কথা দিয়ে সে আলাপ শুরু করবে বুঝতে পারছে না। পোড়-খাওয়া মানুষ, বোধ-বুদ্ধিতে পাকা, অধিকন্তু প্রকৃত এই মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে কথোপকথনে জুয়েল সময় নিচ্ছে।

ক্ষয়াটে, সবুজ ছোপ ধরা ইটের পুরোনো পথের বাঁ পাশের বুড়ো নারকেল গাছের গোড়া লাগোয়া এই চায়ের ছাপরা। পাড়াগাঁর ভেতর দারুণ আয়োজন বৈকি। আগেরবারই এসে সে জেনেছে, সিডরের ভীষণ প্রলয়ের পর সাহায্য নিয়ে আসা শহুরে স্বেচ্ছাসেবক, কি সাহেব-সুবের কণ্ঠের পিপাসা মেটাতে রাতারাতি ছাপরাটা চালু হয়। তখন থেকে এটা চলছে। সকালের রোদ পড়ে যাওয়ার আগে, আবার বিকেলে, সন্ধ্যায়, পরে রাত ৮টা ৯টা অব্দি ছাপরার উনুনটা জ্বলে। দিনের বাকি সময় ছাপরাটা বন্ধ। গ্রামের খাটুয়েদের অত বাড়তি শখ কই যে হাত-পা কুঁড়ে রেখে চা খাবে আর গুলতানি মারবে। রোদ পড়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পাটজোয়ানরা হাজিরÑকথা চালাচালি করে তাঁর মুখে ফেনা তুলে ফেলে। হাসিতামাশার সঙ্গে তাঁদের হাতে থাকে চায়ের গ্লাস। রাতে হেরিকেনের সলতে জ্বলে, তবে চিমনির ঘষা কাচের ভেতরের আলো এতটাই টিমটিমে যে কারও মুখ পরিষ্কার দেখা যায় না। দেখ অবস্থা, ফুরানো বেলার ছায়ার কারণে এখুনি বুঝি আফাজ আলির মুখ ধরা প্রায় অসম্ভব। হতে পারে, ওই নীরব গম্ভীর মুখে এমন নিজস্ব স্মৃতি জমা আছে যে তা কেবল কথা দিয়ে খুঁড়ে বের করা মুশকিল।

জুয়েলকে বলা হয়েছে, মাইলখানেক দূরে গ্রামের ঝোপ-ঝাড়ভর্তি উত্তর ডাঙ্গায় সামান্য জায়গার ওপর মুক্তিযোদ্ধা আফাজ আলির সাধারণ বাস। তাঁকে হরহামেশা তাই হাতের কাছে বা আলোচনা, খোশগল্প, বৈঠকে পাওয়া দুষ্কর। নিরর্থক সময় ফুঁকে দেয়া ভেরেণ্ডাভাজের মতো যখন-তখন হাটে-পথে তাঁকে দেখা যায় না। বাড়ির কামলা পাঠিয়ে তাই আফাজ আলিকে মামার ডাকতে হয়েছে। পয়লা সে নাকি পাত্তা দেয়নিÑঅসময়ে এখানে আসার ব্যাপারে তাঁর গরজ ছিল না। কেন আসবে ? ঢাকা থেকে কোন্ মামার কোন্ শহুরে ভাগ্নের আগমন, এত বছর পর উনার পদধূলি, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাক্যবাজি করে স্বাধীনতাকে উদ্ধার করবেন। ফাজলামি, বিরক্ত সে, কিছুতেই এখানে আসতে সম্মত না। গ্রামে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা কম না, উচ্ছন্নে যাওয়া কত নেতাফেতা, তাঁদের থেকে বানোয়াট কেচ্ছা শুনে গেলে হয়। মামার তাগড়া কামলাটি মহানাছোড়বান্দা, আফাজ আলিকে না-নিয়ে সে যাবে না, ঘাড়ে নিয়ে হলেও পথ পাড়ি দেবে। টানাটানির এক পর্যায়ে না-এসে আর আফাজ আলির উপায় কী।

জানা গেছে, এই বয়সেও মানুষটা নিষ্ঠার সঙ্গে মেহনত করে, মাটির ঢেলায় মুগুর মারে, ক্ষেতের আগাছা উপড়ে ফেলে, সংসারের নিতান্ত তুচ্ছ কাজেও সে আঙুল নিষ্ক্রিয় রাখে না। জীবনের বাকি এককালে এসে ঠেকা এই মুক্তিযোদ্ধার এখন প্রাণধারণে রোপা-বোনা-ফলানোর কাজে তাকত খরচ করার কথা না। আফসোস, তাঁর একমাত্র রোজগারি শক্ত-সোমত্ত ছেলেটা আকস্মিক অজানা এক অসুখে মারা যায়। চেহারা-মনে-শরীরে তখন থেকে আফাজ আলি চুরমার। সহ্যাতীত দুঃখে মন ঘায়েল হলে ভেতরের জোর ধীরে ধীরে আলগা হয়ে যায়। ধসের চাপে শরীরের শাঁসেও ঘাটতি পড়েÑআরও রুগ্ণ হয়ে আসে সে।

আরে, নীরবে ঘাড় গুঁজে বসে থেকে থেকে আফাজ আলির বুঝি ঝিমুনি ধরেছে। ধুর, জুয়েল নিজেই বিরক্ত হয়। খামোকা মামার জন্য অপেক্ষা, কারণ কি, আলাপ করবে সে, দায়িত্ব তাঁর, এখানে মামা-খালু-চাচার করার কী আছে! ওই তো আফাজ আলি চোখ খুলেছেন। এবার চোখজোড়া অপলকে তাঁর মুখের ওপর সে ধরে রাখলে ঘাবড়ে যায় জুয়েল। ওই পানসে কমজোরি নজরের পেছনের সম্বল দিব্যদৃষ্টির আলোয় জুয়েলকে বোধহয় নিড়িয়ে নিচ্ছে সে। হয়তো ভাবছেন, হঠাৎ এই যুবকের তাঁকে নিয়ে আগ্রহের কারণ কী হতে পারে!

চায়ের ছাপরায় বসার পরপরই জুয়েল আশপাশ যথাসম্ভব দৃষ্টি ফেলে দেখেছে। পেছনে নলবন, কাঁটা ঝোপ, হেজিপেজি লতাপাতার দখলে যাওয়া সরু খাল, তার তলের থিকথিকে কালচে কাদার মধ্যে পড়ে আছে কোনও গ্রাম-মনুষ্যির পরিত্যক্ত একটা ডিঙ্গি নৌকো। নৌকোর আগা-গলুই অংশ এখনও সামান্য উঁকি দিচ্ছে, নিচু প্রান্ত কাদার গভীরে গেঁথে আছে। নৌকোটা বাতিল, আদৌ আর ব্যবহারে আসবে না। এতদিন কাঠই পচে গেছে। মন্দ কাদা-পানি শুষে নিয়েছে কাঠের শক্তি। বাকি কি, সামান্য টিপ পড়লেই কাঠামো আলগোছে মচ্ করে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। ছাপরার চারপাশে হালকা নোনা গন্ধ। কাছের কোনও বাড়ির উঠোনে সাতবাসি ভেজা খড়কুটো হয়তো রোদে দিয়েছিল, বাতাসে এখনও তার দুর্ভোগ ভাসছে। আচ্ছা, দিনের কাজ সেরে যে-সব জোয়ান ধীর পায়ে ছাপরায় বসার জন্য এল তাঁরা একে একে এড়িয়ে গেল কেন ? ওই তো সামনের কালভার্টের ওপর এখন তাঁরা আড্ডা দিচ্ছে। ব্যাপার কী! বিস্ময়ের সর জমার আগেই জুয়েল গ্লাসের চা শুষে নিতে নিতে মুরব্বি আফাজ আলির উদ্দেশে প্রশ্ন ছেড়ে দেয়Ñ‘আপনি মনে হয় একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারটা শুনেছেন ?’

আফাজ আলি চুপ, টুঁ-শব্দটিও নেই। তাঁর চেহারা দেখে মনে হয়, জুয়েলের প্রশ্নটার ওপরই সে যেন চেয়ে আছে। সম্ভবত মানুষটির চা পানের অভ্যাস নেই, কাপে ঠোঁট রেখে ঝোলটানার মতো সে আওয়াজ করছে। এই বয়সে মাথার বাকি চুল রুক্ষ ও এলোমেলো। মুখময় সাদা দাড়িÑকপালে হিজিবিজি ভাঁজ। পাতলা মাংসের গাছপাথুরে চোয়াল চুপসানো। বুঝি আলো নিভে আসা মুখে বহুদিন ধরে ছাইছায়া জমেছে।

আফাজ আলির কি আদৌ কথা বলার ইচ্ছা নেই ? নাকি যুদ্ধের জন্য লক্ষ লক্ষ প্রাণের মৃত্যু, ওই জীবন দানের গৌরব থেকে মানুষ সুফল না-পাওয়া, সেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এতদিন পর বলাবলি তাঁর পছন্দের না। এই মুক্তিযোদ্ধার রঙজ্বলা লুঙ্গি, গায়ের ঢোলা জামা দেখে জুয়েল নিশ্চিতÑদিনকাল তাঁর সুবিধার না, কষ্টেসৃষ্টে গোঁজামিল দিয়ে বাকি বয়স তিনি টেনে নিচ্ছেন। এমনও হতে পারে, মুক্তিযুদ্ধের একচল্লিশ বছরে সহায়-সম্পত্তি অর্থবলশূন্য মানুষটি অভাবের ছোবলে নীল হয়ে পুরোপুরি নিজেকে আড়ালে সরিয়ে নিয়েছেন। শুকনো খটখটে সাংসারিক দশার মধ্যে থাকতে থাকতে কোনও কিছুতেই আর উৎসাহ নেই। এমনও হতে পারে, জুয়েল থাকে ঢাকায়, রাজধানীর যুবক, চাকরিসূত্রে পত্রিকার জন্য কথা বলবে, কি বলতে সে কি বলে ভেবে ভেতর থেকে বুজে আছেন।

আফাজ আলি সহসা নড়ে ওঠেন। সোজা হয়ে পিঠের কাঁপুনি তিনি নিচে নামিয়ে দেন। ডান হাতের আঙুল দ্রুত বাঁ বাহু, পরে ওই বাঁ হাত তুলে ঘাড়ের ওপর অংশ চুলকাতে থাকেন। খানিক পরে তিনি ঠাণ্ডা, যেন কিছুই হয়নি। তাঁর ঠোঁট থেকে অস্পষ্ট আওয়াজ খসে আসেÑ‘চিডুর মিডুর।’

কী বলে ? জুয়েলের এসব শব্দ অজানা, আগে শোনেনি, তাহলে অর্থোদ্ধার সে কেমনে করে ? হতে পারে, আঞ্চলিক বা স্থানীয়ভাবে চিডুর মিডুর শব্দটি চালু আছে, এর মানে এলাকার মানুষই জানে। ফাঁপরে পড়া ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে জুয়েল চেয়ে আছে দেখে আফাজ আলি নিজের গরজে ব্যাখ্যা দেয়ার মতো করে বলেনÑ‘মনে কয় বুঝতি পারেননি, তাই না ? ধরেন, এই আচে, হই চই ফেলানোর মতো কইরে আচে, আবার নাই, হঠাৎ হঠাৎ কাড়া-নাকাড়া বাজানোর মতো আর কি।’ বলে, আফাজ আলি কণ্ঠ চুপ রেখে চিডুর মিডুর প্রসঙ্গে গিঁট এঁটে দেন। ধীরে ধীরে তাঁর মাথা নেমে আসে, পিঠ বাঁকা হয়, থুতনি বুক বরাবর ঝুলে পড়ে।

এই মানুষটির ছাড়া ছাড়া বাক্যের মধ্যে বুঝি রহস্যে ভরা। ধুর, মারফতি গোছের তত্ত্বকথা জুয়েলের ভালো লাগে না। বরাবর সে সোজা-সিধা বোঝে, তাই-ই বুঝতে চায়। হঠাৎ তাঁর মাথার নিচের মোটা-চিকন ছোটো-বড় তার ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সাময়িক আলোড়নমাত্র সন্দেহ করে আফাজ আলি কি বিষয়টা তাঁর মতো করে চিডুর মিডুর ভাবছেন ?

আশ্চর্য, মানুষটা ক্ষণে ক্ষণে তল্লাশি করার মতো দৃষ্টি জুয়েলের উদ্দেশে ফেলছে কেন। কি সে হদিস করছে ? নাকি আফাজ আলির ভাব, উল্টাপাল্টা জামানার এমন ছেলেপেলে ঢের দেখেছে সে, এরা পোকায় খাওয়া, জোয়ানি রক্তে দোষ, চরিত্রের বারোআনা মেকি, অতএব এদের লাগাম টানবে কে ? ভিজে বেড়াল সেজে থাকা এই বিটলেদের বাপ-চাচার দলাদলি, আস্ফালন, তাঁদের হারাম কামাই আর ক্ষমতার দম্ভে দেশের নাভিশ্বাস উঠছে।

ভাবতেই জুয়েলের বিবেচনা থেকে আপত্তি উঠে আসেÑনা, খাঁটি এই মানুষের ভাবনা-চিন্তা তাঁর মতো অবিকল নাও হতে পারে। সর্বক্ষণ মৃত্যুসঙ্গী মুক্তিযুদ্ধ খুশি-আনন্দিত-তৃপ্ত হওয়ার মতো বিষয় যখন ছিল না, তখন পলকশূন্য চাহনির নেপথ্যে হয়তো ধরা পড়ছে যুদ্ধদিনের সারি সারি অমলিন স্মৃতি, মরণপণ সাহসী লড়াই, সহযোদ্ধাদের সহিষ্ণু মুখ, কষ্টের ক্যাম্পজীবন। মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ এলে একজন মুক্তিযোদ্ধার অনিবার্যভাবে এসব খুব মনে পড়ারই কথা।

ওই তো নিজের থেকে আফাজ আলির প্রৌঢ় শুকনো মাথাটা সামান্য নড়ে উঠেছে। অনেকটা অন্যমনস্কের ঘোরে চায়ের খালি গ্লাসটা তিনি ফিরিয়ে দেন। সহসা কোনো একটা বোধের নাগাল পেয়ে ধীরে ধীরে তিনি জেগে উঠতে থাকেন। তাঁর কণ্ঠের মৃদু স্বর এলোমেলো ঝরতে থাকলে তা কুড়িয়ে নিতে জুয়েলকে মনোযোগী হতেই হয়।

Ñ‘কয়ডা-দালাল শয়তানের বিচার হবেনে ? কয়ডার ?’

জবাব দেয়ার উৎসাহ নিয়ে জুয়েল বসা অবস্থায় ঘষে ঘষে আফাজ আলির কাছাকাছি হয়।Ñ‘কেন, সরকার তো বিচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ট্রাইব্যুনাল হয়েছে। একে একে অনেককে ধরবে।’

জেঠা-বয়সির গলা থেকে উত্তর আসে না। কোনও নড়চড় নেইÑআফাজ আলি চুপ। নিজের মধ্যে ডুব দিয়ে আবার তিনি কি হারিয়ে গেছেন ? হয়তো জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ের তরঙ্গে ভেসে ভেসে অসংখ্য স্মৃতির কাছে তিনি যাচ্ছেন অথবা ঝাপসা হয়ে আসা স্মৃতি সাফ-সুতরো করতে সাধ্যমতো মাথা খাটাচ্ছেন। যুদ্ধে শত্রুর মোকাবিলা করে যে তেজ-শক্তি-ধারালো বুদ্ধি অর্জন করেছিলেন তার অনেক কিছুই এখন তুচ্ছতাচ্ছিল্য-অযত্ন-অবহেলার কারণে জং ধরা। বরং মুক্তিযুদ্ধের পরের সিংহভাগ সময়ে ছিল দালাল রাজাকার-স্বাধীনতা বিরোধীদের রাজত্ব। বহাল তবিয়তে তাঁরা মাতব্বরি করেছে। ওইসব দুশমনের বিচার-আচার নিয়ে এতদিন পর সন্দেহ করে আফাজ আলি আলাপ-সালাপে বুঝি বীতশ্রদ্ধ।

গরম জুয়েলের সহে এসেছে। মামার এখনও খোঁজ নেইÑলাপাত্তা তিনি। জুয়েল জানে, মামা মানুষ চরাতে ঘাগু, কথার মারপ্যাঁচেও ঝানু। তবে মামার অহেতুক হামবড়া ভাবের আসন তাঁর কাছে কোনওদিনই পোক্ত নয়। আচ্ছা, মামার এখন যে বয়স, বিয়োগ করলে একাত্তরে হৃষ্টপুষ্ট চোখকান খোলা বুঝপড় যুবকই সে ছিল ? জুয়েলের আপাদমস্তকে মুহূর্তে ঝা-ঝিন শিহরণ বহে যায়। এতদিন এমন জিজ্ঞাসা তাঁর মধ্যে কেন ক্রিয়া করেনি ? তাঁর মামা আর এই আফাজ আলি একই ইউনিয়নের মনুষ্যি, পরস্পর চেনাজানা, আটপৌরে মানুষটি বুকের মধ্যে অনিঃশেষ দেশপ্রেম নিয়ে যদি মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারে তবে ঝক্কি-ঝামেলামুক্ত পরিবারের সন্তান হয়ে মামা কেন যায়নি ?

আফাজ আলির কি সত্যি সত্যি ঝিমুনি এসেছে ? ঢুলুঢুলু ভাবের কারণে একাত্তরের ঘাতকÑদালালের বিচার নিয়ে তাঁর ধারণা কি মগজে কাজ করছে না ? হতে পারে, বয়সের দুর্বহ চাপে, কি অনুচ্চারিত তীব্র পুত্রশোকের ভারে কিংবা রোগা-কাহিল শরীরের জন্য কথা বলতে তাঁর কষ্ট হচ্ছে। ওই যন্ত্রণার পীড়ন লাঘবের জন্য তিনি বুঝি দম নিচ্ছেন।

অকস্মাৎ তাঁর কণ্ঠ ফুঁড়ে স্বর উঠে আসে। ওই উচ্চারণ খেদ-কাতর আক্ষেপের মতো শোনালে জুয়েলকে কান সতর্ক রাখতে হয়।

Ñ‘ঢাকার কয়ডা বুইড়া দালালরে ধরলে হবেডা কী! ঢাকা নিয়া দ্যাশ না। একাত্তরে পুরো দ্যাশেই ছিল শত্রুতে ভর্তি। গেরামে তহন বহুত অত্যাচার হইচে। দালালও বেশি। এমন কোনও গেরাম নাই যে মাইনষে মরে নাই। হাট-বাজার, মাঠঘাটÑসবখানে মাইনষের রক্ত আর খুনি দালালগো চোটপাট। আমাগো এই গেরামে এহন যে চ্যায়ারম্যান, তাঁর বাপ ছিল আজরাইল, ভয়ঙ্কর দালাল। পাকবাহিনীরে পথ দেহায়ে এদিকি আনচে। ছেইলেপেলেরে ডর দেহায়ে রাজাকার বানাইচে। এই শয়তানডার বুইড়া হাড় মনে কয় বহুত পাকা। এহনও বাইচ্চা আচেÑমরে নাই। পুরোনো এই চ্যায়ারম্যান পোলার মাইয়া, মানে ওই বুইড়া দালালের নাতনিরে মহব্বত কইরা বিয়া করচে এক আওয়ামী লীগ নেতার পোলায়। মহাধুমধামের বিয়া। কন, স্বাধীনের সময়ে খুনখারাবি করা এমন গুনাগারের বিচার ক্যামনে হবে ? বেবসা কও, বাণিজ্য কও একসঙ্গে, উঠ-বস একসঙ্গে, বিয়াথা কইরে এ-ওর কুটুম হইচে। এইগুলারে ধরবে কেডা ? নয়া কিসিমের সম্পর্ক। দালাল, শান্তি কমিটির মাতব্বর এহনকার নেতাউতার আত্মীয়। বিচার-আচার, আমার মন খচখচ করে, বিশ্বাস হতি চায় না। আচ্ছা, মাইনষে খুব বলাবলি করে, এহন মন্ত্রী, তাঁর মাইয়ার এমুন দালালের ছেইলের সঙ্গে বিয়া হইচে ?’

জুয়েল নিভে যায়। এই প্রশ্নের কোনও উত্তরই তাঁর জানা নেই। আফাজ আলি থেকে চোখ সরিয়ে নেয় সে। কাদায় পড়ে থাকা নৌকোর মাথাটা ঘিরে আসা হালকা আঁধারের কারণে আর পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। আশপাশে চাহনি ফেললে নজর ফিরে আসে। গাছপালার পাতা কি নড়ছে, না ইশারা দিয়ে তাঁকে ডাকছেÑবোঝার উপায় নেই। পাশের অজানা গাছটাকে বেঁটে মুণ্ডুহীন মনে হচ্ছে।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares