সুশীলের মুক্তিযুদ্ধ : সুজন বড়ুয়া

শিশুসাহিত্য : কিশোর গল্প

সুশীল আজ ঘুম থেকে উঠেছে সবার আগে, একেবারে ভোরে ভোরে। দেরি করলে সব কাজ পিছিয়ে যায়। কলের পাড়ে লম্বা লাইন পড়ে, হাতমুখ ধোয়া আর খাবার জল আনতে ঠেলাঠেলি করতে হয়। এতগুলো মানুষের জন্য একটি মাত্র শৌচাগার। যে আগে যাবে তার সুযোগ আগে। এটাই নিয়ম।

আজ আবার রেশন তোলার দিন। সকালের কাজকর্ম সেরে রেশনের জন্য লাইন দিতে হবে। তার ওপর আজ একটি বিশেষ কাজে যাবে বলে ভেবে রেখেছে সুশীল। মাকে আগেই বলে রেখেছে, রেশন নিয়ে এসেই কৃষ্ণনগর শহরে রওনা হবে। কৃষ্ণনগর জেলা স্টেডিয়ামে আজ নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। ক’দিন ধরে শোনা যাচ্ছিল, বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠন করেছে। আজ কৃষ্ণনগর জেলা একাদশের সঙ্গে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রথম খেলা। সুশীল যে করেই হোক এ খেলা দেখতে চায় এবং ইতিহাসের সাক্ষী হতে চায়।

মা সুশীলের ফুটবলপ্রীতির কথা জানেন। সুশীল ভালো ফুটবল খেলে। বাড়িতে থাকতে বিকেলে ওকে বেঁধে রাখা যেত না। কিন্তু এই শরণার্থী শিবিরে আর খেলার সুযোগ কোথায় ? তাছাড়া যুদ্ধে যেতে পারেনি বলে ছেলে সব সময় কেবল মনমরা হয়ে থাকে। তাই সুশীলের কৃষ্ণনগরে ফুটবল খেলা দেখতে যাওয়ার ইচ্ছেটা মা মেনে নিয়েছেন, যদিও সুশীলের বাবার শরীরের অবস্থা ভালো নয়।

সুশীলদের বাড়ি চুয়াডাঙ্গায়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলাদেশজুড়ে গণহত্যা, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের ওপর নির্যাতন শুরু করলে সুশীলরা সপরিবারে ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হয়। সাজানো সংসার ফেলে সীমান্ত ডিঙিয়ে চলে আসে ভারতে।

সুশীলরা দুই ভাই। বড়ো ভাই সুভাষ কলেজে ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। সুশীল এবার ক্লাস টেনে উঠেছিল। বাবা জওহর লাল সাহা ছোটখাটো ব্যবসা করতেন, বাজারে ওদের একটি কাপড়ের দোকান ছিল। এপ্রিলের ২৫ তারিখ রাতের অন্ধকারে কারা যেন দোকানটা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিল। পরদিনই দুই ভাই বাবা-মাকে নিয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। কিছুটা বাসে, কিছুটা গরুর গাড়িতে চড়ে ভেঙে ভেঙে ওরা প্রথমে আসে মেহেরপুর। সেখান থেকে পশ্চিম দিকের বুড়িপোঁতা খালপাড়া সীমান্ত দিয়ে ঢোকে ভারতে। ভারতের নদীয়া জেলার বেতাই গ্রামে এসে শরণার্থী শিবিরে ঠাঁই হয় ওদের।

বেতাই গ্রাম তখন লোকে লোকারণ্য। প্রতিদিনই বানের স্রোতের মতো আসছে শরণার্থী। এই স্রোতের সঙ্গে মিশে সুশীলরা কোনো রকমে আশ্রয় পায় একটি স্কুলঘরে। কিন্তু পথ চলার ধকলে বাবা-মায়ের শরীরের অবস্থা ভীষণ গুরুতর। ক’দিন পর মা একটু সুস্থ হয়ে উঠলেও বাবার তেমন উন্নতি হয় না। তবু এর মধ্যে একদিন বড়ো ভাই সুভাষ বলে, বাবাও সেরে উঠবেন। কিন্তু মা-বাবা আপনারা শুনন, আমি একটি কথা বলতে চাই। সুশীল আপনাদের সঙ্গে থাকুক, আমাকে আপনারা বিদায় দিন। এখানে বসে থেকে থেকে আমার শুধু সময় নষ্ট। আমি দেশের জন্য কাজ করব। যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে যাব।

বাবা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলেন। মায়ের মুখেও রা সরেনি। সুভাষ আগে থেকেই ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছিল। বাবা-মাকে প্রণাম করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সুশীলকে বলে, তুই মা-বাবার কাছে থাক ছোটো। দু’জনের একসঙ্গে যুদ্ধে গিয়ে কাজ নেই। তুইও চলে গেলে বাবা-মাকে দেখবে কে ?

ব্যস, সুশীল আটকা পড়ে গেল। ছোটো হওয়ার যুক্তিতে হার মানতে হয় ওকে। অথচ ভেতরে ভেতরে ওরও যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছে প্রবল। ওর চেয়ে কম বয়সিও অনেকে শরণার্থী শিবির থেকে যুদ্ধে চলে গেছে এরই মধ্যে। সেখানে দাদা বড়ো, দাদা তো যাবেই। ওকে আর আটকায় কে ? সুতরাং বুড়ো মা-বাবাকে নিয়ে সুশীলই পড়ে রইল শরণার্থী শিবিরে। ছোটো সুশীল যেন দাদার চেয়েও বড়ো হয়ে গেল সেদিন।

এদিকে দাদা সুভাষ চলে যাওয়ার পর স্কুলের আশ্রয়টা চলে গেল সুশীলদের। স্কুলে কতদিন আর পড়াশোনা বন্ধ রাখা যায় ? একদিন স্কুল ছেড়ে দিতে বলা হলো ওদের। তারপর ওদের ঠাঁই হলো রাস্তার পাশে খালি পড়ে থাকা ড্রেনের পাইপে। বড়ো বড়ো একেকটি গোল পাইপ দখল করে নিল একেকটি পরিবার। পাইপের দু’পাশ ফাঁকা। ঝড়ো বাতাসে ভেতরে বৃষ্টির ছাঁট ঢুকে পড়ে প্রায়ই। রোদ তেতে উঠলে গরমের কষ্ট। এর মধ্যে অসুস্থ বাবাকে সারিয়ে তোলা খুব কঠিন। বাবার বয়সী দু’-একজন লোক আশেপাশে মারা যান প্রতিদিনই। মৃত্যু এখানে নিত্যঘটনা। ওষুধ পথ্য খাদ্য পুষ্টি এসবের টানাটানি তো লেগেই আছে। তবে বাবার সেবা-যত্নে মায়ের ক্লান্তি নেই। বাইরের দৌড়ঝাঁপ সব সামলায় সুশীল।

ক’দিন পর একটু স্বস্তি এল সুশীলদের। সামনের খোলা মাঠে লম্বা সারি করে তৈরি হলো শরণার্থীদের অস্থায়ী বসত। বাঁশ বেত ছন দিয়ে বানানো লম্বা বাড়িতে ছোটো ছোটো ঘর। একটি পরিবারের জন্য দেওয়া হলো একটি ঘর। এর একটি ঘরে ঠাঁই হলো সুশীলদের। 

এখন এ ঘরেই থাকে তিনজন। থাকে মানে কোনওমতে দিন পার করে। ঘরের মেঝের এক পাশে রাত দিন একটি চাটাই পাতা। বাবাকে প্রায়ই শুয়ে বসে থাকতে হয়। দুর্বল শরীর, খুব একটা হাঁটতে পারেন না। ঘরের সামনে বাইরের দিকে রান্নার দুটি উনুন বসান। লাকড়িই জ্বালানি। উনুন জ্বালালে বেজায় ধোঁয়া ছড়ায়। পোড়া পোড়া গন্ধে কেমন নাক জ্বলে। এখানে পালা করে রাঁধতে হয় সবাইকে। রেশনের চাল ডাল মিশিয়ে মা কোনোমতে খিচুড়ি বানিয়ে আনেন দিনে একবার। তা খেয়েই দিন পার করে ওরা।

বদ্ধ ঘরে গুমোট অবস্থা। আলো বাতাস নেই বললেই চলে। ঘরে ঘরে দেখা দিয়েছে খোস পাঁচড়া চুলকানি আর চোখ ওঠা রোগ। এখানে এই দুই রোগের নাম হয়েছে ‘জয় বাংলা রোগ’। তার ওপর শুয়ে থাকতে থাকতে বাবার পিঠে ঘা হওয়ার জোগাড়। সুশীলের মাঝে মাঝে অসহায় লাগে। কী করবে ভেবে পায় না। তখন ভাবে, এই অবস্থা নিশ্চয় বেশি দিন থাকবে না। দেশ স্বাধীন হলেই মুক্তি।

আজ আগেভাগে রেশন তুলে নিয়ে এসেছে সুশীল। ঘরে এসে দুটো খেয়ে এগারোটার দিকে বেরিয়ে পড়ল। বেতাই থেকে কৃষ্ণনগর শহরের দূরত্ব কম নয়। বাসে গেলে ঘণ্টা দুই লাগে। নতুন পথঘাট। হাতে সময় নিয়ে রওনা হওয়া ভালো। তিনটায় খেলা শুরু হওয়ার কথা। তার আগে কৃষ্ণনগরে পৌঁছতেই হবে।

দুইটার আগেই কৃষ্ণনগর শহরে এসে নামল সুশীল। বাস থেকে নেমে স্টেডিয়াম খুঁজে নিতে বেগ পেতে হলো না তেমন। লোকজনকে জিজ্ঞেস করে করে পায়ে হেঁটে দশ মিনিটেই পৌঁছে গেল স্টেডিয়ামে। তারপর কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে নিল একটি।

ভেতরে ঢুকে দেখে গ্যালারি প্রায় কানায় কানায় পূর্ণ। চারদিকে সাজসাজ ব্যাপার। সুশীলের বুকে এক মধুর শিহরণ। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই বিদেশের মাঠে আমার দেশের ফুটবল দল খেলছে। যদিও প্রীতি ফুটবল প্রদর্শনী, তবু এর গুরুত্ব অনেক। এটি শুধু খেলা নয়, বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বার্তা গণমানুষের মাঝে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া ও তাদের সমর্থন আদায় করা। আর এ খেলা থেকে উপার্জিত অর্থ মুক্তিযুদ্ধের জন্য পৌঁছে দেওয়া হবে বাংলাদেশ সরকারের কাছে। সুশীল মনে মনে ভাবে, এমন একটি স্বপ্নযাত্রার খেলা টিকিট কেটে দেখতে এসেছি আমি। সশরীরে যুদ্ধে যেতে না-পারলেও এটাই আমার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ। আহ্, কী ভালো লাগা! আনন্দে বুকটা যেন নেচে ওঠে সুশীলের।

নদীয়া জেলা ক্রীড়া সমিতির উদ্যোগে এই আয়োজন। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ৩৫ জন সদস্য। সবাই খেলার জন্য এখানে এসেছে কলকাতা থেকে। খেলা শুরুর পূর্ব মুহূর্ত। খেলোয়াড়রা সারি করে একে একে মাঠে নামল। অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু, সহ-অধিনায়ক প্রতাপ শঙ্কর হাজরা, কাজী সালাউদ্দিন, এনায়েতুর রহমান, নওশেরুজ্জামান, খোন্দকার নূরন্নবী, অমলেশ সেন, আইনুল হক, কায়কোবাদ, খোকন, তসলিমকে দেখা যাচ্ছে মাঠে। সঙ্গে আছেন নদীয়া জেলা প্রশাসক ডি কে ঘোষ-সহ কয়েকজন কর্তাব্যক্তি। খেলোয়াড়দের পরনে সবুজ শর্টস ও সবুজ গেঞ্জি আর হাতে লাল বর্ডার। যেন জাতীয় পতাকার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে এই জার্সি  তৈরি।

ভারতের জাতীয় পতাকা ওড়ানো হলো। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের খেলোয়াড়রাও একটি জাতীয় পতাকা নিয়ে দাঁড়াল। তারা যেন আগে থেকেই দেশের মানচিত্রখচিত লাল সবুজ পতাকা ওড়ানোর জন্য প্রস্তুত। কিন্তু নদীয়া জেলা কর্তৃপক্ষ আপত্তি করে বসল, এ কী করে সম্ভব ? যে দেশ এখনও স্বাধীনতা লাভ করেনি, তার পতাকা কি এভাবে ওড়ানো যায় ?

বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা এ কথা মানতে নারাজ। স্বাধীন বাংলার ফুটবল দল যদি খেলতে পারে, তবে পতাকা কেন ওড়ানো যাবে না ? ওড়াতে দিতে হবে। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের প্রবল প্রত্যাশায় শেষ পর্যন্ত অনুমতি মিলল। এবার শুধু পতাকা ওড়ানোই হলো না, অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টুর নেতৃত্বে পতাকা নিয়ে পুরো মাঠ প্রদক্ষিণ করল বাংলার দামাল ছেলেরা। ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে মুখর করে তুলল নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর স্টেডিয়াম। তাদের হাতে বাতাসে পতপত করে উড়ছে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত হলদে সবুজ পতাকা। এরই মধ্যে উঠে দাঁড়িয়েছে পুরো স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শক। হাততালি আর উল্লাসে ফেটে পড়ল স্টেডিয়াম। দেখে সুশীলের বুক ফুলে উঠল গর্বে। চোখের কোনা বেয়ে গড়িয়ে পড়ল আনন্দের অশ্রু। চোখ মুছতে মুছতে সুশীল ভাবে, আহ্, কী সুখ! এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত দেখার সৌভাগ্য কয়জনের হয় ? বিরল সৌভাগ্যবান আমি।

রেফারির বাঁশি বাজল, খেলা শুরু হলো। আক্রমণ পাল্টা আক্রমণে এগিয়ে চলল খেলা। বাংলার খেলোয়াড়রা নদীয়ার খেলোয়াড়দের ছেড়ে কথা বলছে না। দু’দলই বল দখলের চেষ্টায় মরিয়া। ছোটো ছোটো পাসে নিজেদের মধ্যে বল দেওয়া নেওয়া করে খেলছে বাংলার ছেলেরা। দৃষ্টিনন্দন খেলায় মন ভরিয়ে দিল সবার। তবে দুই এক গোলে শেষ হলো প্রথমার্ধ।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে আক্রমণের জোর বাড়ায় স্বাধীন বাংলা দল। গোলের ব্যবধান কমাতে সক্ষম হয় একটু পর। দুই দুই গোলে খেলা চলল অনেকক্ষণ। শেষ পর্যন্ত গোল হলো না আর। সমান দুই দুই গোলেই শেষ হলো খেলা। বাংলার পক্ষে গোল করেছে এনায়েত ও বদলি খেলোয়াড় শাহজাহান। হার জিতের পাল্লা রইল সমান। প্রীতি ফুটবল প্রদর্শনী প্রীতিময়তায় ভরিয়ে দিল মন দর্শকদের। ইতিহাসে খোদিত হয়ে গেল ২৫ জুলাই ১৯৭১ দিনটি।

খেলা শেষ হতে হতে প্রায় পাঁচটা। বুক ভরা ভালো লাগা নিয়ে স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে এল সুশীল। বেতাইয়ের বাস ধরল সঙ্গে সঙ্গে। শরণার্থী শিবিরে পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেল।

কিন্তু ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে সুশীল অবাক। ভেতরে লোকজনের জটলা। কেন, কী হয়েছে ? সুশীল হতচকিত। সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে সামনে তাকাতেই ভিড়ের মধ্যে শোরগোল উঠল, এই তো, সুশীল এসেছে, সুশীল এসেছে।

সুশীল ব্যস্ত হয়ে বলল, কী হয়েছে, কী হয়েছে ?

পাশের ঘরের সুবেন্দু কাকা বললেন, সুশীল, তোমার বাবার অবস্থা খুব খারাপ, ওনার শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেছে, দেখো, দেখো।

সুশীল ততক্ষণে বাবার কাছে পৌঁছে গেছে। বাবা মেঝেতে বিছানো চাটাইয়ের ওপর শোয়া। শ্বাস নিচ্ছেন চোখ বড়ো বড়ো করে। বাবার কপালে হাত রাখে সুশীল। বলে, বাবা আমি এসেছি। একটু সময় দেন আমাকে। আপনাকে এভাবে যেতে দেব না। আমি ডাক্তার নিয়ে আসছি।Ñবলেই ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সুশীল।

 সচিত্রকরণ : তাইয়ারা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares