শোকাঞ্জলি : সদ্য প্রয়াত কবি নূরুল হকের সাক্ষাৎকার : ‘সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়’

গত ২২ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন কবি নূরুল হক। স্নিগ্ধ ব্যক্তিত্বের ভিন্নমাত্রার এই কবি জীবদ্দশায় যেন ছিলেন আত্মগোপনরত এক সাধক। কোলাহল থেকে দূরে থেকে মানুষের অন্তর্গত ক্রন্দন, উল্লাস, রীরংসা ও চিত্তপ্রবহমানতাকে তিনি ধারণ করেছেন অনুচ্চ উচ্চারণে। তাঁর কবিতায় আছে প্রাণিত হবার পূর্ণ আয়োজন। ষাটের দশক থেকে কবিতা লিখছেন তিনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য বই একটি গাছের পদপ্রান্তে, সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়, মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা এবং এ জীবন খসড়া জীবন।

 ১১ নভেম্বর ২০১৯ ও ১৮ অক্টোবর ২০২০ তারিখে ‘বাংলা একাডেমি’র পত্রিকা উত্তরাধিকার দপ্তরে সরকার আমিনের কক্ষে তিনি গল্প করতে আসেন। অনির্ধারিত সেই আড্ডা দুটিকে সরকার আমিন সম্প্রচার করেন তাঁর ফেসবুকে; লাইভে। সেই আড্ডার অনুলিখন করেছেন আশফাকুজ্জামান।

.  নূরুল হক ভাই, আপনার জš§ কত সালে ?

. .   সরকারি জš§, না নিজের জš§ ?

.  আপনার নিজের জš§।

. .   আমার নিজের জš§ হলো ২৫ নভেম্বর ১৯৪৪ সাল।

.  কোথায় জš§ হয়েছিল ? নানিবাড়িতে ?

. .  জš§ হয়েছিল নেত্রকোনা জেলায়, বাবার বাড়িতে। বালালী গ্রামে।

.  কয় ভাইবোন আপনারা ?

. .   দুই ভাই। বোন নেই।

.  ছোটবেলা কোথায় কেটেছে ?

. .   হাইস্কুল পর্যন্ত গ্রামেই কেটেছে। বাবা বাড়িতে থাকতেন। বাড়িতে মসজিদ ছিল। বাবা সেই মসজিদের ইমাম ছিলেন।

.  তার মানে বাড়িতে একটি ধর্মীয় পরিবেশ ছিল।

. . ধর্মীয় পরিবেশ ভয়ংকরভাবে ছিল। কারণ, বাবা মসজিদের ইমাম ছিলেন। বাবার বাবা, তাঁর বাবার বাবা, তাঁর বাবা এই ম

সজিদের ইমাম ছিলেন। অন্ততপক্ষে তিন থেকে চার পুরুষ এমন ছিল।

.  আপনি আর ইমাম হতে পারেননি!

. .  না, আমি আর ইমাম হতে পারিনি। আমার ছোট ভাইও পারেনি। আমি হলাম অধ্যাপক।

.  অধ্যাপক কি বাংলা বিভাগের ?

. .  বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক।

.  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন ?

. .  হ্যাঁ। ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি।

.  ১৯৬৯ সালে পড়াশোনা শেষ করেছেন। সৈয়দ আকরম হোসেন স্যার কি একই সময় শেষ করেছেন ?

. .  আমি ১৯৬৯ সালে শেষ করি। আমার এক বছর আগে করেন সৈয়দ আকরম হোসেন।

.  আপনারা তাহলে কাছাকাছি বয়সের।

. .  উনি আমার দুই বা এক বছরের সিনিয়র। সঠিক জানি না।

.  ইন্টারমিডিয়েট কোথায় পড়েছেন ?

. .  ময়মনসিংহ নাসিরাবাদ কলেজে।

.  ইমাম সাহেব আপনাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে দিলেন ?

. .  ইমাম সাহেব পড়তে দিয়েছেন। প্রাইমারি পাস করলে মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিয়েছিলেন।

.  মাদ্রাসায় কত দিন পড়েছেন ?

. . এক বছর পড়ি। বাড়িতে এসে মাকে বললাম স্কুলে পড়ব।

.  মা সমর্থন করলেন ?

. .  মা সমর্থন করলেন। তারপর বাবা স্কুলে ভর্তি করে দিলেন।

.  ইমাম সাহেব তো বেশ উদার মানুষই ছিলেন। উনি কি সুফি ছিলেন ?

. .  হ্যাঁ, উদার মানুষ ছিলেন। মোটামুটি সুফি বলা চলে।

.  ঢাকায় কখন এলেন ?

. .  ১৯৬৩ সালে এইচএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই।

.  তখন কি হলে থাকতেন ?

. .  হ্যাঁ হলে থাকতাম।

.  কবিতার সঙ্গে কখন যোগাযোগ হলো ?

. .  কবিতার সঙ্গে কখন যোগাযোগ হলো, ওপরে যিনি আছেন, তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে জানতে পারবেন। একেবারে থ্রি, ফোর, ফাইভ থেকে কবিতা শুরু। এ সময় ‘কবিতা লেখার শেখার খাতা নামে’ একটি পাণ্ডুলিপি লিখেছি। হারিয়ে গেছে। যেন অন্যকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য কবিতা লিখেছি (হাসি)।

.  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলে আপনার কি কবিবন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে ?

. .  কবিবন্ধুরা হলো আবুল হাসান, হুমায়ুন কবির আমার ক্লাসমেট ছিল। সে ১৯৭২ বা ৭৩ সালে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে। আবুল হাসান ছিল আমার ইয়ারমেট। সে ইংরেজি বিভাগে। আমি বাংলা বিভাগে।

.  গুণদার সঙ্গে আপনার দেখা হয়নি ?

. .  আমার বাড়ি নেত্রকোনা। দেখা হতো। ষাটের দশকে একটা সংকলনের জন্য আমার কবিতা নিয়েছিল।

.  রাজনৈতিক কবিতা বলতে যা বোঝায়, সে অর্থে আপনার কবিতা তো অনেকটা অন্তর্মুখী। এই অন্তর্মুখিতার কারণ কী ?

. . অন্তর্মুখী কবিতায় রাজনীতি থাকতে পারে। অন্তর্মুখিতার কারণ কী, সেটা বলা খুব কঠিন। কথা তো ভেতর থেকেই বলতে হয়, সে অর্থে তো অন্তর্মুখীই হবে। কথা তো বাইরে থেকে বলতে পারব না।

.  যেটা বলতে চেয়েছি, কিছু রাজনৈতিক পরিস্থিতি কবিকে উত্তেজিত করে।

. .  কিছু রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমাকে উত্তেজিত করেছে। ২০১৪ সালে শাহবাগের ছাত্র বিক্ষোভ নিয়ে লেখা একটা কবিতার বইও আছে। বইটা জনপ্রিয় হয়েছিল।

.  ১৯৭১ সালে কোথায় ছিলেন ?

. .  ১৯৭১ সালে অধ্যাপনায় যোগদান করি। তারপর সরকারি চাকরি ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে চলে যাই। ছাত্রদেরও নিয়ে যাই। একটা কোম্পানির কমান্ডারও ছিলাম।

.  আপনি তো এটা কখনও জাহির করেননি।

. .  এটা জাহির করার কিছু নেই। আমার বাবা ইমাম ছিলেন। তিনি বলতেন, রাস্তা দিয়ে তুমি এমনভাবে হাঁটবে না যেন তোমাকে দেখে মানুষ রাস্তা ছেড়ে দেয়। তুমি এমনভাবে সভার মধ্যে ঢুকবে না যাতে তোমাকে সভাপতি বানিয়ে ফেলে। এমনভাবে মসজিদে ঢুকবে না যাতে ইমাম বানিয়ে ফেলে।

.  একটা জীবন নিরিবিলি কাটিয়ে দিলেন। জীবনটা আপনার কাছে কেমন লাগে ?

. .  অসাধারণ। মানুষের সংস্পর্শে গেলেই মনে হয় শেষ। যতক্ষণ একা থাকা যায়, ততক্ষণ সুন্দর, মনোরম, অসাধারণ!

.  আপনি নিজেকে খুবই সন্তুষ্ট মানুষ মনে করেন ?

. . অনেক। এর কোনও পরিমাপ করা যাবে না।

.   তথাকথিত স্বীকৃতির কথা ভাবেন না ?

. .  স্বীকৃতি দিয়ে কী হবে ? আমাকে যদি নোবেল পুরস্কার দেয়, তাহলে কি আমার লেখার মান বেড়ে যাবে? মানুষ আরও বেশি পছন্দ করবে ?

.  আপনার ভাবনা তরুণদের জন্য খুবই শিক্ষণীয়। অধ্যাপনা কোথায় শুরু করেছিলেন ?

. .  ১৯৭০ সালে নেত্রকোনা কলেজে শুরু করেছিলাম।

.  ঢাকায় কবে এসেছেন ?

. .  এত কি মনে থাকে ? ১৯৮৫ সালে চলে যাই ভোলা। ভোলা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহিলা কলেজে আসি।

.  মিল্লাত আলীকে পেয়েছিলেন ?

. .  মিল্লাত আলীকে পাইনি। তিনি আমার আগে ছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে সরাসরি ঢাকায় চলে আসি।

.  অধ্যাপনা-জীবন শেষ করলেন কবে ?

. .  সম্ভবত ২০০৬ সালে।

.  এখন কোথায় বসবাস করছেন ?

. .  মোহাম্মদপুরের শেখেরটেকে।

.  ভাড়া বাড়ি ?

. .  ভাড়াবাড়ি না। কায়ক্লেশে একটা ফ্ল্যাট কেনা হয়েছে।

.  আপনার ছেলেমেয়েদের সম্পর্কে যদি কিছু বলেন।

. .  আমার মেয়েটা সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করে। নাম হলো চরু হক। মেয়েটা বড়। তারপর দুটি ছেলে। একজনের নাম সাব্বিরুল হক। সে আমেরিকায় থাকে। ইকোনমিকসে ডক্টরেট করছে। ছোট ছেলেটা আর্কিটেক্ট। ঢাকায় থাকে।

.  আপনার স্ত্রী সম্পর্কে যদি কিছু বলেন।

. .  ২০০৩ সালে ছেড়ে গেছেন।

.  আপনার পছন্দ ছিল ?

. .  না, গার্জিয়ানরা ঠিক করেছিলেন।

.  আপনার জীবনে তাঁর কেমন ভূমিকা ছিল ?

. .  আমার জীবনে অনেক ভূমিকা ছিল। আমি যা কিছু করেছি, সবকিছুতে সহায়তা করেছেন।

.  একটা সুখময় জীবন ছিল আপনার।

. .  তা তো বটেই।

.  স্ত্রীকে হারানোর পর কেমন আছেন ?

. . এক বছর খুব বিপর্যস্ত ছিলাম। কারণ, তাঁর ওপর খুব নির্ভরশীল ছিলাম। কেউ স্ত্রী হারালে বুঝতে পারবে। আপনি হয়তো হারাননি। আমি চাই না যে হারান। স্ত্রী হারালে এত অসহায় হতে হয় যে তা বলার না। একটা বছর খুব খারাপ ছিলাম। পরে একসময় ঠিক হলো। এটা জীবনেরই ধর্ম।

.  আপনার কবিতায় বার বার বৃক্ষ আসে। বৃক্ষকে কীভাবে দেখেন ? মনে হয় একটু আলাদাভাবে দেখেন।

. .  আমি প্রাকৃতিক। ভালোবাসি প্রকৃতি। আর এভাবে কবিতায় বৃক্ষ আসে।

.  আপনার প্রিয় কবিদের সম্পর্কে যদি বলেন।

. .  এক নম্বর প্রিয় কবি হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। দুই নম্বর প্রিয় কবি হলো পাবলো নেরুদা। লোরকাও আমার একজন অন্যতম সেরা কবি।

.   জীবনানন্দ দাশকে কেমন লাগে ?

. .  জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়েছি। ভালো লেগেছে।

.  কবিতার কাছে আপনার প্রত্যাশা কী ?

. .  জীবনের কাছে যা প্রত্যাশা, কবিতার কাছে তা-ই প্রত্যাশা।

.  কোন ধরনের কবিতা আপনার ভালো লাগে ?

. . যখন কেউ চিন্তা না করে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লেখে, সেটা ভালো লাগে।

.  ভালো লাগছে যে ‘বাংলা একাডেমি’তে চাকরি করার সুবাদে আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় হলো। আমি আপনার কবিতা খুব পছন্দ করি।

. .  যারা ফেসবুক চর্চা করে, তারা এসে আপনার কথা বলে। একবার আপনার কবিতার খুব আলোচনা হয়েছিল।

.  অনেক সিনিয়র কবি আপনাকে শ্রদ্ধা করেন। অনেকে বলেন যে নূরুল হককে তাঁর মতো থাকতে দাও। এটা একধরনের স্বীকৃতি। নূরুল হক ঠিক বাজারের কবি নন। একটু নির্জনতাময় ও স্নিগ্ধতার কবি। এখন কীভাবে দিন কাটছে ?

. .  কখনও বসে থাকি। সকালে সূর্য ওঠার আগে ঘুম ভাঙে। ফ্রেশ হয়ে বাইরে যাই। ঘণ্টা হিসাবে রিকশা ভাড়া করে ঘুরে বেড়াই।

.  মানুষের মধ্যে ঘুরে আসেন।

. .  না, মানুষের মধ্যে না। বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে চলে যাই।

.  তখন নিজের সঙ্গে নিজের আড্ডা জমে ?

. .  নিজের সঙ্গে আড্ডা হয় কি না জানি না। নিরিবিলি থাকতে পছন্দ করি।

.  নূরুল হক ভাই, প্রায় ১৪ মিনিট কথা হলো আপনার সঙ্গে। ফেসবুক হলো আমার মাধ্যম।

. .  ফেসবুকের মাধ্যমে আপনি আমার জন্য যা করেছেন, সে ঋণ পরিশোধ করতে পারব না।

.  না, তেমন কিছু করিনি। আমার ভালোবাসার কথা জানিয়েছিলাম। আমি অবাক হয়েছি, প্রচুর মানুষ আপনাকে ভালোবাসে। শালুক পত্রিকা, সংবাদ-এ আপনার কবিতা ছাপা হয়েছে।

. .  নতুন-পুরোনো যারা আমার সঙ্গে পরিচিত হয়, তারা দেখলাম পছন্দ করে।

.  প্রায় ১৫ মিনিট কথা বললাম। এখন শেষ করি।

সরকার আমিন অতঃপর তার লাইভ শেষ করার পর্বে বলেন, প্রিয় বন্ধুরা, আজ যাঁরা এই ইন্টারভিউ দেখছেন, তাঁরা এ কথা জেনে রাখুন, বাংলা কবিতায় নূরুল হকের একটা আলাদা জায়গা আছে। আলাদা জায়গা শ্রেষ্ঠ জায়গা নাও হতে পারে। কিন্তু আলাদা জায়গা। এটি তিনি তাঁর সারা জীবন ধরে অর্জন করেছেন। এ অর্জন ছিল খুব নিরিবিলি। তাঁকে আমরা হইচইয়ের মধ্যে কখনও পাইনি। বলা যেতে পারে তাঁকে আমরা আবিষ্কার করেছি। হক ভাই, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

১১ নভেম্বর ২০১৯

লাইভ ২

‘জীবনের কোনও লক্ষ্যের প্রয়োজন নেই। জীবন নিজেই একটা লক্ষ্য’

সরকার আমিন : ফেসবুকের প্রিয় বন্ধুরা, আপনারা যারা লাইভে কবিকে দেখছেন তাদের বলে রাখি যে, আমার বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কবি হচ্ছেন নূরুল হক। কিছুদিন আগে নূরুল হক ভাইয়ের কবিতা সমগ্র বেরিয়েছে ‘চৈতন্য প্রকাশনী’ থেকে। আপনারা যারা কবিতা পছন্দ করেন তারা যদি তার কবিতা পড়েন তাহলে বুঝতে পারবেন তিনি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি―বাংলাদেশের প্রধানতম কবিদের একজন হলেন কবি নূরুল হক। আজ তাঁকে পেয়েছি উত্তরাধিকার দপ্তরে। আমরা খুবই খুশি। আসুন তাঁর সাথে আড্ডা দিই। আশা করি, অনেক কথাই আমরা তাঁর কাছ থেকে জানতে পারব।

.  হক ভাই, আপনি দার্শনিক কৃষ্ণমূর্তির কথা বলছিলেন। কবে তাঁর ভাবনার সাথে পরিচয় হলো ?

. .  সন তারিখ ঠিকভাবে বলতে পারব না। সম্ভবত সেটা ছিল আশির দশক। ভোলা যাওয়ার সময় লঞ্চে কোনো একটা পত্রিকায় ধ্যান সম্পর্কে একটা আলোচনা দেখলাম। এটা পড়তে পড়তে কৃষ্ণমূর্তির বইয়ের নাম জানতে পারলাম। পত্রিকার লেখাটাতে কিছু অপ্রত্যাশিত কথাবার্তা দেখলাম। একটু হতচকিত হলাম। তারপর ঢাকায় এসে বিভিন্ন জায়গায় খুঁজে তাঁর কয়েকটা বই পেলাম।

.  মনে পড়ে কী বই পেয়েছিলেন ?

. .  প্রথম যে কী বই পেয়েছিলাম ঠিক মনে পড়ে না। তারপর কৃষ্ণমূর্তির প্রায় সব বই সংগ্রহ করেছিলাম।

.  বইগুলো কি এখনও আপনার কাছে আছে ?

. .  আছে মনে হয়।

.  কৃষ্ণমূর্তির কোন দিকটা আপনাকে বিস্মিত করেছিল ?

. .  জীবনকে বোঝার বিষয়টা হলো কৃষ্ণমূর্তির মূল প্রতিপাদ্য। জীবনকে বোঝা হলো প্রতি মুহূর্তেই জীবন আছে। এটা যে বের করে নিতে পারে সে জীবনটাকে পায়। তা না হলে মানুষ স্মৃতি, অতীত নানা কিছু নিয়ে হয়রান হয়ে পড়ে। জীবনের মূল রসটা পায় না। কৃষ্ণমূর্তির এটাই হলো মূল কথা।

.  অতীতকে কি বাদ দিতে পারব ?

. .  অতীতকে বাদ দিতে বলিনি। যদি এখন একটা গাছ দেখি এর সঙ্গে অতীতের কোনো গাছের তুলনা করার দরকার নেই। এখন বসে আছি এটাই জীবন। অতীত এখানে আনার দরকার নেই।

.  ভবিষ্যৎকে কীভাবে দেখব ?

. .  বর্তমানকে যদি উপভোগ করতে পারেন, এখানে যদি আনন্দ পান, এখান থেকেই জš§ হবে ভবিষ্যতের। বর্তমান থেকেই ভবিষ্যতের জš§ হয়। আলাদাভাবে ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই।

.  কবিতা লেখার সময় কি এ দর্শন আপনার কাজে লেগেছে ?

. .  কাজে লেগেছে কি না এভাবে বলব না। সাম্প্রতিক কালের লেখাগুলোর মধ্যে ওই দৃষ্টিভঙ্গি আছে বলে মনে হয়। প্রতি মুহূর্তেই জীবনকে কীভাবে পাচ্ছি সেটাই ভাবি।

.  এর মধ্যে এক ধরনের শান্তি আছে।

. .  শান্তি আছে কি না সেটা বড় কথা না। প্রতি মুহূর্তের জীবনকে পাওয়াটাই বড়। শান্তির লক্ষ্য নিয়ে কিছু করলে শান্তি আসবে না।

.  শুধু এই মুহূর্তকে নিয়ে ভাবা কি এক ধরনের আত্মসমর্পণ না ?

. .  না, এটা সমর্পণ না। এটা সামনে এগিয়ে যাওয়াকে উজ্জীবিত করে। প্রতি মুহূর্তের মধ্যে থাকা আত্মসমর্পণ না। এটা আরও জেগে ওঠা।

.  শুনেছি কৃষ্ণমূর্তি জীবন ও মৃত্যুকে আলাদা করে দেখেন না।

. .  রিকশা দিয়ে শাহবাগ পার হয়ে এসেছি। ওখানেই আমার মৃত্যু হয়ে গেছে। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যু ও জীবন চলতে থাকে। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুকে না পেলে জীবনকেও সে পাবে না।

.  তাহলে তো লক্ষ্য থাকার প্রয়োজন নেই ?

. .  লক্ষ্য দিয়ে কী করবেন ?

.  স্কুলে শেখান হয় জীবনের লক্ষ্য কী। 

. . জীবনের কোনও লক্ষ্যের প্রয়োজন নেই। জীবন নিজেই একটা লক্ষ্য।

.  জীবনকে নিয়ে কোনও পরিকল্পনা করেছিলেন ?

. . না। জীবন যেভাবে এসেছে সেভাবে চলে গেছে।

.  কবিতা জীবনের একধরনের বিবরণ না ব্যাখ্যা ?

. .  কবিতা জীবনের বিবরণও না, ব্যাখ্যাও না। এক একটা মুহূর্তের মধ্যে উপস্থিত হই। কিছু মুহূর্তে অবাক হই। সে মুহূর্তে কিছু শব্দ, কথা দিয়ে দেয় সেটা লিখি। এটাকে কবিতা বলি।

.  জীবনের কোনও দর্শনের প্রয়োজন আছে ?

. .  দর্শন দিয়ে কী হয় জানি না।

.  তাহলে আলাদাভাবে দর্শনের প্রয়োজন নেই ?

. .  আলাদাভাবে দর্শনের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। এগুলো যারা জ্ঞানী তারা বলতে পারবেন।

.  জ্ঞানকে কেন আপনার কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয় ?

. .  জ্ঞান হলো অনেক দিন শিখেছি। বুঝেছি। মাথায় সঞ্চিত হয়ে আছে। এখন যদি একটি গাছকে দেখতে যাই তাহলে এখনকার গাছটাকে দেখতে পাব না। পূর্ব ধারণা একে আচ্ছন্ন করে দেবে। জীবনকে পেতে জ্ঞান সব সময় বাধাগ্রস্ত করে।

.  বলা হয় যে, যত অভিজ্ঞতা বাড়ে তত জ্ঞান বাড়ে। এটা কি ঠিক ?

. .  অভিজ্ঞ হলে জীবনের কোনও কাজে আসে বলে মনে করি না।

.  তাহলে মানুষ জ্ঞানের জন্য লালায়িত কেন ?

. .  জগৎ এভাবেই চলে আসছে। মানুষ এটা নিয়ে চলতে পছন্দ করে এ জন্য।

.  মানুষের মধ্যে যে বিভেদ, মারামারি, ভিন্নতা এসব তো জ্ঞানের জন্য হয়েছে।

. .  হ্যাঁ জ্ঞানের জন্য হয়েছে।

.  পৃথিবীতে আজ যত সংকট তার জন্য জ্ঞান দায়ী। আপনি কি মানবেন কথাটা ?

. .  তা তো অবশ্যই।

.  মানুষের প্রধান সমস্যা হচ্ছে বিভক্তি। জাতীয়তা, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা বিভিন্ন নামে মানুষকে বিভক্ত করা হয়েছে। আপনার কি মনে হয় না একটা পরিচয় নিয়ে মানুষের থাকা উচিত ?

. .  মানুষের ক্ষেত্রে কেন পরিচয় শব্দটা আসতে হবে সেটাই তো বুঝি না।

. পরিচয় শব্দটাও মানুষের জন্য সমস্যা তৈরি করে।

. .  হ্যাঁ সমস্যা তৈরি করে।

.  একজন মন্তব্য করেছে নূরুল হক ভাইয়ের কবিতা গভীরতা বিস্তারী। আপনি কি গভীর কবিতা লেখেন ?

. .  গভীর কি ভাসমান জানি না। একটা মুহূর্তে যে অনুভূতি তৈরি হয় সেটা কবিতায় আসে। গভীর-অগভীর নিয়ে কিছু ভাবি না।

.  শিশু যেমন জšে§র আগে বোঝা যায় না সে কেমন। কবিতা কি সেরকম কিছু ? জšে§র পর বোঝা যায় কেমন।

. .  কবিতা নিয়ে এত চিন্তার কী আছে? এসব ভাবারই প্রয়োজন নেই। যে কোনও মুহূর্তে একটা ভাবনা এসেছে সেটা নিয়েই কবিতা লিখেছি।

.  কবিতা কী উপকার করে মানুষের ?

. .  কবিতা মানুষকে ধান, চাল অর্থ সম্পদ দেয় না। নিজের সত্তার সামনে মুখোমুখি করে।

.  কবিতা কি বুঝতে হবে ? এর কি দরকার আছে ?

. .  কবিতাটা হতে হবে। যখন পড়বে তখন যেন কবিতাটা হয়। বোঝা না বোঝায় কিছু আসে যায় না।

.  পাঠক কবিতা বুঝতে চায়। বোঝা তো সম্ভব না। চা পান করার পর কি স্বাদটাকে বুঝাতে পারা যায় ?

. .  কবিতা যারা বুঝতে চায় তারা এ প্রশ্নের উত্তর ভালো দিতে পারবেন―(হাসি)

প্রিয় দর্শক যারা আমাদের সঙ্গে আছেন সবাইকে বলতে চাই নূরুল হক ভাই ও আমি একমত হয়েছি যে কবিতা বোঝার বিষয় না।

.  এখন কি গৃহবন্দি আছেন? আজই কি বের হলেন ?

. .  না, মাঝে মাঝে বের হই। ঘুরে ফিরে দেখি। দেখেন না, আমি মাস্কও পরি না।

.  মাস্ক পরেন না কেন ?

. .  মাস্ক পরি না এ জন্য যে জীবনের প্রায় শেষ পর্যায়ে এসেছি। কয়েক বছর ভুগে মরা খুব যন্ত্রণার। করোনায় যদি ৮ বা ১০ দিনের মধ্যে মারা যাই সেটা অনেক ভালো। করোনা নিয়ে আমি চিন্তিত না―(হাসি)

.  অনেক তরুণ কবি আমাদের এ লাইভে যুক্ত হয়েছেন। তাদের জন্য যদি কিছু বলেন।

. .  তেমন কিছু বলার নেই। তারা যে আমার সঙ্গে শরিক হয়েছেন এটাই অনেক প্রাপ্তি। এভাবে তারা বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হবেন এটাই আশা করি।

সরকার আমিন : বন্ধুরা, আমার পরম সৌভাগ্য যে নূরুল হক ভাই আমাদের উত্তরাধিকার দপ্তরে এসেছেন। তাঁর সঙ্গে অনেক কথা হলো। এতক্ষণ আপনারা আমাদের সঙ্গে ছিলেন। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে শেষ করছি। সবাই ভালো থাকবেন।

১৮ অক্টোবর ২০২০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares