শোকাঞ্জলি : ভূঁইয়া ইকবালকে মনে করে : সনৎকুমার সাহা

ভূঁইয়া ইকবালকে প্রথম দেখি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সবে তাঁর অধ্যাপনায় হাতেখড়ি। ওখানে তখন আবাসন ব্যবস্থায় প্রত্যেক শিক্ষক বা কর্মকর্তার সপরিবারে থাকার জন্য আলাদা আলাদা বাড়ি। বাড়িগুলো অবশ্য অভ্যন্তরীণ চলাচলের সরু পথগুলোর ধার দিয়ে সাজানো। ভূঁইয়া ইকবাল তখনও একা। তাঁর মতো এমন জনচারেক তরুণ অধ্যাপকের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল ওই রকম এক স্বয়ংসম্পূর্ণ বাড়িতে। আমার পরিচয় তাঁর সঙ্গে সেখানেই। একসঙ্গে ক’দিন এক ছাদের তলায় কাটানো। অজান্তেই আপন-আপন ভালো-মন্দ মেলে ধরা। ধারণাগুলো থেকে যায়।

ওই সময়েই তাঁকে খুব কাছের বলে মনে হয়েছে। কতই-বা বয়স! মেধার পরিচয়ও অজানা। তবু। কোনো ওপর-চালাকি নেই। চোখেমুখে নিষ্পাপ সরলতা। আর একান্ত মানবিক। মনীষী ডক্টর আনিসুজ্জামান তখন ওখানে। তাঁর ব্যক্তিত্বের, আদর্শের ও পছন্দের ছাপ বুঝি কিছু ফোটে। ভালো লাগে। ওই প্রথম-প্রীতির আলো কখনও নেভেনি। যদিও পরে দেখা হয়েছে কালে-ভদ্রে। বোধ হয় বার দু-তিন। টেলিফোনে কথা বলা−সেও ওই রকমই। তবু তাঁর কথা ভাবলেই মনটা প্রসন্ন হয়ে উঠত। সুদে-আসলে সবটা কেড়ে নিলেন আচমকা এভাবে চলে গিয়ে। আমি বয়সে বড়। বেঁচে আছি। আর তিনি নেই!−এর আক্ষেপ আমাকে কুরে-কুরে খায়।

তাঁর চলা-ফেরা, কথা বলা−এ সবেই তাঁর ব্যক্তিত্বের আলাদা ছাপ ধরা পড়ত। হয়তো সবার বেলাতেই নিজের নিজের বৈশিষ্ট্য থাকে। কিন্তু আকর্ষণ বাড়ায় কমজনেরই। মনে হয়েছে, তিনি কিন্তু ওই কমজনের দলে। তাঁর কথা বলায় অন্য রকম মাধুর্য্য একটা ধরা পড়ত। চেষ্টাকৃত নয়। আপনা থেকেই। এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত আন্তরিকতা। ওই কথার মায়ায় জড়িয়ে যেতে ভালো লাগত। বিশেষ করে কানে লেগে আছে, একটু বেশি উত্তেজিত বা অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর কথা বলার স্মৃতি। শব্দগুলো পরস্পরের আকর্ষণে নতুন ব্যঞ্জনা জাগাত। একান্তই তাঁর। উদার মানবিক বোধ ও স্বয়ংক্রিয় সততার সঙ্গে মিশে তা শ্রোতার মনে আস্থার জায়গা একটা তৈরি করে নিত। অনুমান, তিনি সহজেই সবার আপন হয়ে উঠতে পারতেন। কাছে-দূরে সমভাবাপন্ন সবার। তাঁরই মতো আরও একজন ছিলেন কালি ও কলম সম্পাদক আবুল হাসনাত। সমবয়সী। আমাদের পোড়া কপাল! মাত্র ক’মাসের ব্যবধানে দু’জনকেই হারালাম। এ ক্ষতি আমাদের সবার। আত্মপরিচয়ের সুস্থ ধারায় যাঁরা বিকাশের পথ খোঁজেন, বিশেষ করে তাঁদের। তিনি, ভূঁইয়া ইকবাল−নিজে কিন্তু আত্মপ্রচারে নামেননি। যতটুকু জানি, কাজের  জায়গাটা তাঁর ছিল পাদপ্রদীপের আলো এড়িয়ে; কিন্তু প্রাসঙ্গিক বিষয়ের পুরো ধারণা পেতে। আমরা সাধারণত অসম্পূর্ণ, কখনও কখনও কম গুরুত্বপূর্ণ বা বিকৃত দৃষ্টিতে আচ্ছন্ন তথ্যের ওপর ভর করে পছন্দমতো সিদ্ধান্ত (Illicit generalization) খাড়া করি। ভ্রান্তি তাতে প্রশ্রয় পায়। অনেকের মনমতো হলে তার জোরে লঙ্কাকাণ্ডও ঘটে। শুধু বিদ্যাচর্চা পরিমণ্ডলে আটকে থাকে না। সমাজেও ছড়ায়। ‘এ তোমার এ আমার পাপ’ বিপুল আড়ম্বরে সাধারণ মানুষের মনোজগতে খণ্ড খণ্ড জায়গা দখল করে। ‘মাথা নত’ করায় চেতনা জাগাতে নয়, অনাসৃষ্টির হুজুগে ইন্ধন জোগাবার তাগিদে। প্রতিকারে প্রয়োজন−সবটুকু জানা, সবটুকু বোঝা। আবেগ দিয়ে নয়, নিরাসক্ত মনে পূর্ণ দৃষ্টির প্রসারণে। তার জন্য চাই বহুমুখী বাস্তবের বিষয়-সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক উপাত্ত। আরোপিত নয়। ‘যেমন আছ তেমনি আস’−এই ভাবে। তাদের জোগাড় করা গুছিয়ে তোলা দুরূহ। আত্মাবলোপীও। কারণ, কাজের কর্তা যদি অবচেতনেও এতে নিজের অভিরুচির প্রকাশ ঘটান তবে সেই অনুপাতে তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। বিভ্রান্তির অনুপ্রবেশ ঠেকানো যায় না। যাঁরা সব জেনেও এ কাজে হাত দেন, তাঁরা তাই সংখ্যায় নগণ্য। সিদ্ধিলাভ কঠিন। ভূঁইয়া ইকবাল এই রকম ব্যতিক্রমীদের একজন। এবং সফল। গলাবাজিতে নয়, তাঁর সংগৃহীত প্রাথমিক তথ্য দিয়েই তিনি প্রকৃত বাস্তবের দিক-নির্দেশ করেন। অনেক ভ্রান্তি আমাদের কাটে। তিনি আড়ালেই থেকে যান।

তবে আমি আদার ব্যাপারী। জাহাজের খবর খুব কমই রাখি। তাঁর বেশিরভাগ কাজের দিকে নজরটুকুও দিইনি। একটু-আধটু যা দেখেছি তাতেই তাঁর মুন্সিয়ানার পরিচয় আমাকে মুগ্ধ করেছে। বিষয়ের দিকেই পুরো নজর। এবং তা নিরপেক্ষ, সুশৃঙ্খল। সম্পাদনার কাজেও অমন। ডক্টরেট করছেন। গুণবতী গৃহিণী, তিনিও। চোখে পড়ার মতো। আর সবাইকে ডেকে বলার মতো। কিন্তু আমৃত্যু নিস্পৃহই তিনি থেকে গেছেন। রুচির সভ্যতা তাঁর অটুট ছিল আজীবন। চারপাশের লুব্ধ পরিবেশের প্রশ্রয় তাঁকে কখনও বিচলিত করেনি। পাদপ্রদীপের আলো তিনি এড়িয়ে গেছেন। তাতেই কিন্তু ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন। লক্ষ্য করি, দেশে-বিদেশে গুণীজনদের শুধু আস্থা নয়−আন্তরিক প্রীতি ও সহমর্মিতাও তিনি পেয়ে এসেছেন। এসব নিয়ে কোনো আত্মপ্রচারে মাতেননি। আমাদের অহংকার কিন্তু বেড়েছে।

পড়ুয়া হিসেবে আমি অলস ও অন্যমনস্ক। ইদানীং যোগ হয়েছে বিস্মরণ। তাই ভূঁইয়া ইকবালের কাজ যে মুগ্ধতা ছড়ায়, যে গুরুত্ব দাবি করে−তার অনেকটাই এখানে আড়ালে থেকে যাবে। তবু এ কথাটা জোরের সঙ্গে বলি, আমার কাছে তিনি সবসময় এক বিরল আদর্শ। ইঁদুর দৌড়ে কখনও শামিল হয়েছেন শুনিনি। আপন মনে নিজের কাজ করে গেছেন। অশেষ মূল্যবান। কিন্তু জনতোষিণী নয়। ‘আপনাকে জানা’-র রসদ জোগানো। এবং তা পুরোপুরি সবটা জানার ওপর ভিত্তি করে। কোনো ভেজাল যাতে না ঢোকে, সেই জন্য ছিলেন সদা সতর্ক। যে তথ্য আহরণ করেন, তার মূল্য স্বপ্রকাশ। হয়তো কখনও-কখনও নীরস; কিন্তু জরুরি। এবং খাঁটি।

তাঁর রবীন্দ্রনাথ কেন্দ্রিক তিনটে বই আমার দেখা : ১. বাংলাদেশে রবীন্দ্র-সংবর্ধনা (১৯৯৩), ২. রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ (২০১০) এবং ৩. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : পূর্ববঙ্গে বক্তৃতা ১৮৯২-১৯২৬ (২০১৬)। এ সবে রবীন্দ্রভাবনার শুধু নির্ভেজাল প্রকাশ দেখি না; তাঁর প্রতিক্রিয়ার বৈচিত্র্যও দেখি। পশ্চাৎপটে যে সার্বিক বাস্তবতা−রূপে-গুণে, কালের মাত্রায় তার প্রতিফলনও চোখে পড়ে। এবং সবটাই স্থান-কালের প্রেক্ষাপটে হুবহু পুনরাবৃত্ত। সংকলক নিজে কোনো মূল্য বিচার করেন না। সংগৃহীত পাঠ, অনেকটাই দুষ্প্রাপ্য ও দুর্মূল্য−আপন-আপন কথা বলে। প্রতিক্রিয়া যার-যার, তার-তার। তাতে স্থান ও কালের মাত্রা নিঃসন্দেহে ছাপ ফেলে। কোনো একক সিদ্ধান্ত প্রত্যাশিত নয়। কিন্তু বাস্তবের প্রত্যক্ষ স্বরূপ আমরা দেখি। সাড়া দিই প্রত্যেকে নিজের নিজের মতো। তাও কিন্তু সবটুকু আপন-আপন স্বায়ত্তাধীন নয়। অভিজ্ঞতার ধারার ওপর তা দাঁড়িয়ে। চলমান গতি অথবা আপেক্ষিক স্থিতি তার পরিণাম। ইতিহাস আমাদের দেখায় তার প্রত্যক্ষ পরিণতি। তুলনায় শ্রেয় বলে নয়। মিলিত সাড়া দেবার ক্রিয়ায় পছন্দ-অপছন্দের জোর ও প্রভাবের যৌক্তিক অযৌক্তিক ক্ষমতা বা দুর্বলতার প্রত্যক্ষ প্রকাশমানতায় ধারাবাহিক পরিণামফলের তা সমষ্টিতাড়িত প্রতিফলন। ফল নির্দেশ করা ভূঁইয়া ইকবালের লক্ষ্য নয়। ঘটমান বাস্তবের খণ্ড খণ্ড নির্বাচিত নমুনা তিনি সংকলন করেন। উৎসুক পাঠক কালের আয়নায় তাদের দেখেন। হয়তো বিচারও করেন। উপলব্ধির সঞ্চার বাড়ে। নানা দিক থেকে নানা রকম। সব মিলিয়ে সামূহিক বিবেচনার বিস্তার। আবশ্যিকভাবে একরঙা নয়। দ্বন্দ্বের পরিসরও বাড়তে পারে। তবে সামষ্টিক ইতিবাচকতার প্রত্যাশা যে কাজ করে, এমন অনুমান যথার্থ মনে হয়।

যতদূর জানি, বাংলায় মানপত্র পাঠের একটা বাঁধা গৎ পঞ্চাশ বছর আগেও প্রচলিত ছিল। এখন সেটা কেমন, জানি না। সে সময় এমনও চোখে পড়েছে, রেওয়াজ অনুযায়ী মানপত্র লেখায় পটু এমন কেউ ভিন্ন-ভিন্ন মত ও পথের অনুসারী আলাদা-আলাদা বিশিষ্টজনদের উদ্দেশে একাই সব মানপত্র লিখে দিচ্ছেন। অতিশয়োক্তির বন্যা সে সবে প্রচুর বইত। অভ্যাসলালিত ঐতিহ্যে এর প্রকাশ রবীন্দ্রনাথের কালে যে আরও প্রকট ছিল, তা সহজেই অনুমান করা যায়। বাংলাদেশ রবীন্দ্র সংবর্ধনা বইতে তার পরিচয় মেলে। আর উদ্দিষ্ট ব্যক্তিটি যখন রবীন্দ্রনাথ, তখন সেখানে কোনও বিশেষণই অযথার্থ মনে হয় না। তারপরও কোনো কোনোটিতে কিছু কিছু ইঙ্গিত বাস্তবের আভাসও ফুটিয়ে তোলে।

১৯২২-এ রবীন্দ্রনাথ শেষবারের মতো শিলাইদহে আসেন। ঠাকুর এস্টেটের ভাগাভাগিতে তখন তিনি আর সেখানে জমিদার নন। তবু প্রত্যাশিতভাবে গ্রামবাসী ও এস্টেটের কর্মচারীবৃন্দ তাঁকে স্বতঃস্ফূর্ত সংবর্ধনা জানান। সেইসঙ্গে দুটো আবেদনপত্রও পাঠ করেন। কর্মচারীবৃন্দের আবেদনে পড়ি: ‘… ১. বর্তমান ব্যবসা-বাণিজ্যের যুগে প্রায় প্রতি সভ্য দেশেই দাসত্বজীবন হেয় বলিয়া বিবেচিত হয়। আমরাও তাহাই মনে করিয়া থাকি; তবু যে আমরা ইহাতে নিযুক্ত আছি, ইহার কারণ অন্নবস্ত্র সমস্যা।… ২. আমাদের দেশে প্রজাবর্গ তাহাদের জমিদারকে অনেক সময় মহাজনের মতোই উৎপীড়ক মনে করিয়া ভয় যদিও করে, বিশ্বাস একেবারেই করে না।… জমিদারের ন্যায্য স্বার্থরক্ষা কর্মচারীদের পক্ষে সর্বতোভাবে কর্তব্য; পক্ষান্তরে প্রজাগণও তাহাদের আপনাপন ষোলো আনা স্বার্থ বজায় রাখিতে যত্নবান,− সেইখানেই সংঘর্ষ অনিবার্য।… ৩. অশিক্ষিত প্রজাদের ধারণা জমিদার যদিও কোন কোন বিষয়ে উপকার করিতে প্রস্তুত হন, সময় সময় তাহারা মনে করে ইহা বুঝি জমিদারের পক্ষেরই স্বার্থের অনুকূল ইহবে। কর্মচারীপক্ষ বুঝাইবার চেষ্টা করিলেও তাহারা বুঝিবে না, ফলে রেষারেষিটা বৃদ্ধি পায়।…’

পাশাপাশি   ‘অনুগত ক্ষুদ্র প্রজা শ্রী জেহেবালী বিশ্বাস’-এর আবেদনপত্রে পড়ি−‘১. গৃহস্থরা সারাদিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়া মাঠে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটে, তবু তাহাদিগকে দু মুঠো ভাতের জন্য পরের দ্বারস্থ হইতে হয়। কিরূপে তাদের এই দুরবস্থা দূর হইতে পারে এই সভায় তাহার সৎ উপদেশ প্রার্থনা করে। ২. দেশ থেকে হাজার হাজার মণ শস্য সস্তা দরে বিদেশে চলিয়া যাচ্ছে, আর বিদেশ থেকে যা আসছে তাহা তাহাদিগকে অতিরিক্ত মূল্যে কিনিতে হচ্ছে। তার প্রতিকারের উপায় কি, এ সভায় তাহার সৎ উপদেশ প্রার্থনা করে।…’

দুটো আবেদনপত্রই ভূঁইয়া ইকবাল এই বইটিতে সংকলন করেছেন। আমাদের ওই পর্বের সমাজ-ইতিহাস চর্চায় এদের মূল্য অপরিসীম। পরের দশকে রবীন্দ্রনাথ প্রমথ চৌধুরীকে কৈফিয়তের সুরে লিখেছিলেন, জমিদারি ব্যবসায়ে তাঁর ঘেন্না ধরে গেছে। কিন্তু প্রজাদের হাতে মালিকানা তুলে দিলেই সমস্যা মিটবে না। গরিব প্রজারা অচিরেই ঋণগ্রস্ত হয়ে মহাজনদের কাছে সব বিকিয়ে বসে থাকবে। তারপরও সামষ্টিক বিচারে ভূস্বামীদের বিরুদ্ধে শোষণের অভিযোগ খণ্ডন করা যায় না। সমস্যাটা আলাদা আলাদা ব্যক্তির নয়, গোটা কর্মকাঠামোর। ‘শ্রীহট্ট মহিলা সমিতি প্রদত্ত’ আর একটা মানপত্রে এখানে পড়ি: ‘… আমাদের দেশের “অব্যক্তবেদনা বধূউর্ম্মিলা” গণের জন্য কাব্যে, নাটকে, উপন্যাসে, প্রবন্ধে আপনার যে সমবেদনার ধারা প্রবাহিত হইয়াছে; তাহাতে সমগ্র নারীজাতি গৌরবান্বিত বোধ করিয়াছেন এই জন্য আমরা আপনাকে অভিনন্দিত করি।…’ (১৯১৯)। এটিও বিশেষ মূল্যবান। ওই সময়ে এ দেশে নারী সচেতনতার ইঙ্গিত এতে মেলে। যদিও পুরুষতান্ত্রিকতার বিকট দখলদারিত্বে নারীর সমঅধিকার এখনও শোচনীয়ভাবে অনায়ত্ত।

ভূঁইয়া ইকবালের রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ (২০১০) বইটিও সংকলন, সম্পাদন ও গ্রন্থনায় আমাদের সম্ভ্রম জাগায়। তাঁর আপসহীন সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতা এটারও মূল্যবান সম্পদ। কোথাও ফাঁকিবাজি নেই। ওপরচালাকি নেই। বিনয় তাঁকে নির্মোহ রেখেছে। বিষয়বিত্তের সবটা তিনি পূরণ করতে সচেষ্ট থেকেছেন। আমরা অভিভূত হই।

তবে একটা বিষয় ব্যক্তিগতভাবে আমাকে বিব্রত করে। না, পদ্ধতিগতভাবে গ্রন্থকার সম্পূর্ণ সঠিক; কোনো অভিযোগ সেখানে নেই। বলা যেতে পারে, এ বিষয়ীগত; এবং এ নিয়ে কোনো বিতণ্ডাতেও জড়াতে চাই না। প্রশ্নটা হলো, যাঁরা প্রতিভায়, ব্যক্তিমায়ায় ও পরিচয়ে বিশেষ সাম্প্রদায়িক গণ্ডি ভেঙে বিকশিত হন, তাঁদের কোনো সংকীর্ণ ঘেরাটোপে বেঁধে রেখে বিচারে বসলে তাঁরা কি যথাযোগ্য মর্যাদা পান ? কাজী নজরুল ইসলাম, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন−এমনকি তীব্র আপত্তি থাকলেও ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, জসীমউদ্দীন বা এই রকম যাঁদের বৃহত্তম প্রেক্ষাপটে সন্দেহাতীত ও সশ্রদ্ধ স্বীকৃতি−তাঁদের কাউকে সমাজের দোহাই দিয়ে আলাদা করা কি মানবিক ন্যায়বোধের অনুমোদন পায় ? রবীন্দ্র-রচনা নিয়ে ভূঁইয়া ইকবাল সংকলিত আর একটি বই পূর্ববঙ্গে বক্তৃতা ১৮৯২-১৯২৬−প্রথম প্রকাশ ২০১৬। বেশিরভাগ বক্তৃতাই আগে পড়া। এক সঙ্গে পাচ্ছি, এটা বাড়তি লাভ।

আমি তাঁর সাধনালব্ধ অন্য কোনো বই পড়িনি। আসলে ‘সিরিয়াস’ পড়াশোনায় আমি লবডঙ্কা। মেজাজটাও উড়ুউড়ু। সব মিলিয়ে গুরুত্বহীন। তবে ভূঁইয়া ইকবালের মেধার ও পাণ্ডিত্যের অনুরাগী। তাঁর চলে যাওয়া শুধু আমাকে নয়−ধ্রুপদী ধারার পাণ্ডিত্যে যাঁদের বিশেষ আগ্রহ, তাঁদের সবার জন্যে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করে। কখনোই তিনি কাজ ছাড়া থাকেননি। আত্মপরিচয়ে বা বহুমুখী সাহিত্যসাধনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে সাফল্য যাঁদের স্বীকৃতি পেয়েছে, তাঁদের অন্তরঙ্গ সাহিত্যজীবনের একান্ত পাঠের গোপন যোগসূত্র তাঁকে সব সময় আকৃষ্ট করেছে। তাঁদের চিঠিপত্রের আদান-প্রদান, জীবন- যাপনের অভিজ্ঞতা−এগুলোয় তিনি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন। অতি মূল্যবান। কিন্তু কাজ হিসেবে বেশিরভাগ রসকষহীন। খুব কমজনই আকৃষ্ট হন। এসব কাজের প্রকাশ নিয়মিত চোখে পড়ত কালি ও কলমে। পড়তে পেয়ে অনুপ্রাণিত বোধ করতাম। তাতে আকস্মিক ছেদ পড়ল। মনে মনে এর জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আবুল হাসনাতের বেলাতেও অমন। আমাদের অভিজ্ঞতায় দক্ষ হাতে তাঁরা স্বভাবসিদ্ধ অনুশীলনে এতদিন আলো জ্বেলে এসেছেন। হয়তো অন্যরা জায়গা পূরণে এগিয়ে আসবেন। কিন্তু আমাদের ব্যক্তিগত সত্তায় শূন্যতা ঘুচবে না। তাঁদের ব্যক্তিমায়ার স্মৃতি থেকে আমরা মুক্তি পাব না। মুক্তি চাইও না।

এ ছাড়া ভূঁইয়া ইকবালের কাজের একটা উৎস শুকিয়ে যাবার আশঙ্কা এখন ক্রমবর্ধমান। তথ্যপ্রযুক্তিতে বিপ্লবের যুগে চিঠি লেখার চল এখন অস্তাচলের মুখে। বক্তৃতার প্রয়োজনও ফুরোবার পথে। বহু মানুষের বহু দূরে দূরে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ এখন পৃথিবী জুড়ে সম্ভব। প্রযুক্তির ব্যবহারও ক্রমবর্ধমান। কিন্তু যোগাযোগের কোনো কথ্য রূপের স্থায়ী চেহারা আর কি কিছু থাকছে ? হয়তো পদ্ধতিগত নতুন বিন্যাসের প্রয়োজন। তা স্বাভাবিক আকার নেবার আগ পর্যন্ত এই অনিশ্চয়তা বোধহয় কাটবে না। ভূঁইয়া ইকবাল নিশ্চিন্তে আপন কাজ করে যেতে পেরেছেন, এইটুকু যা সান্ত্বনা।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares