গল্প : একটি গেইম কিংবা কামিনী গাছের চারা : রুমা মোদক

আমার হাতে গাছ বাঁচেনা, মা বলেছিলেন কথাটা।

আজ আমার বিয়ে। আজ এই গেইমটা না খেললেও পারতাম।

সন্ধ্যাপিসির ছেলের জন্মদিনে ফুলকো লুচি আর পায়েস খেয়ে ফেরার সময় সেদিন হঠাৎ বৈশাখের দমকা বাতাসে ফুঁ দিয়ে নেভানো জন্মদিনের মোমবাতির মতো নিভে গেল বিজলি বাতি। দেখতে না পারা ভবিষ্যতের মতো গাঢ় অন্ধকার আর সাথে অঝোর বৃষ্টি নেমে এলে আমরা বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে পড়ি। বৃষ্টির ছাঁট থেকে বাঁচতে সন্ধ্যাপিসির পিড়াপিড়িতে বারান্দার রেলিং ছেড়ে  ঘরে ফিরতে গেলে হঠাৎ নাকে ধাক্কা দেয় তীব্র একটা ঘ্রাণ। সন্ধ্যা পিসি বলেন, কামিনী ফুল। যাইবার সময় নিয়া যাইস, ডাল ভাইঙ্গা দিমুনে। সেই রাতে বৃষ্টি থামার পর সন্ধ্যা পিসি ডাল ভাঙতে গেলে মনির চাচা বাঁধা দেন, তোমার মায়ে না কইছে রাতে কামিনী ফুলের গন্ধে সাপ আসে! 

আমার হাতে গাছ বাঁচেনা। কারও কারও এমন হাত থাকে। মা বলেছিলেন।

আজ আমার ত্রিশোর্ধ জীবনের একটা বিশেষ দিন। আজ গেইমটা না খেললেও চলত। বাবা-মা-ভাই-বোন এমনকি সোহানেরও বুক থেকে একটা অপরাধবোধের দমবন্ধ হিমালয় পাহাড় ভেঙেচুরে গুড়িয়ে হাওয়া করে দিয়ে দম ফেলে হালকা হবার দিন। আমি কাউকে অপরাধী বানাইনি, অভিযোগও করিনি কোনোদিন কারও বিরুদ্ধে। তারা নিজেরাই নিজেদের জীবন গুছিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়ায় স্বার্থপরতা দেখিয়েছে, আর তার ফাঁদে যতটা না আমার কাছে,তার চেয়ে অনেক বেশি নিজেদের কাছে অপরাধী হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ভাই, বোন দুজন আর সোহান। আর বাবা মা, আমার একলা থাকার অসামাজিক জীবনের জন্য আমি  তাদের দায়ী না করলেও, প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছে চারপাশের সমাজ। ফলে তারাও ফোন করে, কিংবা ছুটিছাটায় আমি বাড়ি গেলে তারা অসহায় অপরাধীর মতো ব্যবহার করে আমার সাথে। আমি যতই, এই রিয়ার ছেলেটা যে খুব দুষ্ট হয়েছে খেলনা পাঠালেই ভেঙে গুড়িয়ে দেখে ভেতরে কি আছে, কিংবা রায়ানের ছেলেটাকে যে পড়ার টেবিল থেকে ওঠানোই―ইত্যাদি অপ্রয়োজনীয় প্রসঙ্গ এনে পরিবেশ হালকা করতে চাই, তারা ততই কুণ্ঠিত চেহারায় আমার পাতে আরেকটু ছোট মাছের চচ্চড়ি তুলে দিতে দিতে, লুকিয়ে চোখের জল মোছেন। বাবা মশারির শেষ কোনার দড়িটা হুকে লাগাতে লাগাতে বলেন, মারে তোর জীবনটা আমরাই শেষ করে দিলাম। গত দশ বছর ধরে আমি ক্রমাগত তাদের বলে গেছি তোমরা কেন আমার জীবন নষ্ট করবে বাবা, আমি তো এখনও চাইলে একটা বিয়ে করে ফেলতে পারি―যদি এটাই হয় জীবন নষ্ট না করার একমাত্র উপায়। কিন্তু মা,বাবা আমার এ কথায় ভরসা করে  নিজেদের ক্ষমা করতে পারেন না। তাদের প্রচলিত ধ্যান এবং ধারণা আমার কথায় ভরসা রাখে না। ত্রিশের কোঠা পার হয়ে কোন মেয়ে বলে, আমি চাইলেই বিয়ে করতে পারি এদের গত জীবনের অভিজ্ঞতা কিংবা তাদের জ্ঞাত বাস্তব অভিজ্ঞতা কিছুই তার পক্ষে সায় দেয় না। আমার মধ্যে বাস্তবেও তার কোন প্রচেষ্টা না দেখে তারা আরও হতাশায় নিমজ্জিত হয়।

পরদিন সন্ধ্যায় মনির চাচা নিজেই ডাল নিয়ে আসেন আমাদের বাসায়। বাবা ভেতর থেকে দাবার বোর্ড নিয়ে আসেন আর মা খটখট করে চামচ নেড়ে দুধ চা বানান। শহরে একমাত্র আমাদের বাড়িতেই মনির চাচা আর সন্ধ্যা পিসির অবাধ যাতায়াত। দুজনে বিয়ে করার সাথে সাথে বন্ধ হয়ে যায় তাদের গানের স্কুল গীতবিতান। কেউ আর ছেলেমেয়েকে গান শিখতে পাঠায় না সেখানে। মনির চাচা মরতুজ হাজির দোকানে ম্যানেজারের চাকরি নেয় আর সন্ধ্যাপিসি ঘরে বসে কাপড় সেলাই করে। দুই পরিবারের দরজাও বন্ধ হয়ে যায় দুজনের জন্য। শুধু আমাদের বাড়ির দরজাই খোলা থাকে। মা, বাবা,সন্ধ্যাপিসি আর মনির চাচা একসাথে উদীচী করতেন শহরে। সন্ধ্যায় টাউনহলের রিহার্সালে সন্ধ্যাপিসি আর মা কোরাস গাইতেন, বাঁধ ভেঙে দাও বাঁধ ভেঙে দাও… ভাঙো… । মনির চাচা হারমোনিয়াম ধরতেন আর বাবা তবলা। রাতে টিভিতে ‘এইসব দিনরাত্রি’ সিরিয়ালে ডলি জহুরের কণ্ঠে রেজওয়ানা বন্যা সুর তুলত, আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে…। মা আফসোস করতেন বাবার সাথে, ইস সন্ধ্যার গলাটা একদম বন্যার মতো আছিলো।

আসলেই কিন্তু আমি চাইলেই একটা বিয়ে করে নিতে পারি। অনেকেই আগ্রহ দেখায়, হয়তো এর নানাবিধ কারণ থাকতে পারে। প্রথমত আমি দেখতে-শুনতে খারাপ নই, সেটেল ম্যারেজে মানুষ সাধারণত যা খোঁজে। বয়স পঁয়ত্রিশ হলেও দেখায় পঁচিশ। হয়তো পঁয়ত্রিশ দেখালেও কিংবা দেখতে শুনতে খারাপ হলেও পারতাম। আমার পেশার ভারের কারণে বিয়ে হয়নি শুনে অনেকেই নানা কিসিমের প্রস্তাব নিয়ে আসে। আমি যে এই বাহ্যিক দেখা বা বয়স নিয়ে মাথা ঘামানোর অস্থিরতায় ভুগি না, অনেকেই  বোঝে না।

তবে দুজনের সাথে আমি অনেক দূর কথা এগিয়ে ছিলাম। প্রথম জনের সাথে ফেসবুকেই পরিচয়। বড় আমলা। কেমন আছেন বলেই আলাপের শুরু। কই থাকি, কী করি! অফিস শেষে আমার অঢেল সময়। তারও। কি করে হয়! কেঁচো আমিই খুঁড়তে গিয়েছিলাম। অসুখী দাম্পত্য আর নিঃসঙ্গতার প্রথাগত কেসসা। উপস্থাপনের চতুরতায় আমি বিশ্বাসও করে ফেলেছিলাম। অনেক দূর এগিয়ে ছিলো কথা। ফোন নম্বর দেওয়া-নেওয়া। ফোনে একদিন সে আবৃত্তি করে শোনালো আমি ভালোবাসি মেঘ, চলিষ্ণু মেঘ …। অদ্ভুত ভরাট কণ্ঠ। বিশ্ববিদ্যালয়ে তুখোড় আবৃত্তি করত ছাত্রজীবনে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আবৃত্তি দলের দলনেতা ছিল। আর বয়ে বেড়ানো যাচ্ছে না দাম্পত্য। অচিরেই ডিভোর্স দেবে, আমরা সিদ্ধান্ত নেব। এমন এক পর্যায়ে একদিন তার বউ মেসেজ দিলো, নিজামের সাথে আপনার কী সম্পর্ক ? আপনি জানেন, তার বউ বাচ্চা আছে? ব্যস। আমি সমস্ত কিছু ডিলিট করে দিলাম তাকে। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসআ্যাপ, ভাইভার এমনকি কললিস্টেও ব্লক করে দিলাম নম্বর। কোন যোগাযোগের সুযোগ রাখলাম না। যে সম্পর্কের জন্য তৃতীয় পক্ষ কৈফিয়ত চাইতে পারে, সেটা কোনোভাবেই দ্বিপাক্ষিক বোঝাপড়া হতে পারে না। আমার বয়সে এবং অবস্থানে অন্তত এ ব্যাপার নিয়ে কৈফিয়ত দেয়ার মতো আত্মমর্যাদাহীন গন্তব্যে আমি যাব না।

আমার হাতে লাগানো কোন ফুলগাছের চারা বাঁচে না। কেন যেন। এই সরকারি কোয়ার্টারের বারান্দায় খুব যত্ন করে বাগান সাজিয়েছি। কত রকমের গাছ!

মনির চাচার দেয়া কামিনী ফুলের ডালটা মায়ের লাউয়ের মাঁচার পাশেই খুব যত্নে লাগিয়ে দিই আমি। সকাল-বিকাল পানি দিই। গোয়ালপাড়া থেকে লুকিয়ে গোবরও নিয়ে আসি সার দিতে। কিন্তু গাছ বাড়ে না। মায়ের লাউয়ের মাচা হলুদ ফুলে ছেয়ে যায়, আমি দেখি আমার কামিনী চারার নিচের দুই ডাল কেমন বাদামী বিবর্ণ হয়ে গেছে। আমি ডাল দুটো ভেঙে আবার পানি দিয়ে ঘরে পাটিগণিতের বই খুলে বসি। একটি বানর তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে দুই ফুট ওপরে উঠলে আবার পিছলে একফুট নিচে নেমে যায়। মায়ের লাউয়ের মাচানে কচি লাউ ঝুলে, তুমুল বৃষ্টি আসে, সাথে বাতাস―ইলেকট্রিসিটি অফ হয়ে যায়। আমি অপেক্ষায় থাকি একদিন তুমুল কামিনীর গন্ধ ধাক্কা দেবে নাকে। কিন্তু সেইদিন আর আসে না। গাছের সবগুলো ডাল একে একে মরে ঝরে যায়। দাঁড়িয়ে থাকে প্রাণহীন কাণ্ড। মা বলেন, এত পানি দেয় কেউ গাছে! গাছটা পানিচাপা লেগে মরে গেছে, এত পানি দিছিস ক্যান?  আমার জানা হয়, প্রয়োজনের অতিরিক্ত যত্ন নিতে হয়না কোনোকিছুর―গাছেরও না সম্পর্কেরও না। মা সান্ত্বনা দেন, মন খারাপ করিস না, কারও কারও হাতে গাছ হয় না। রাশি লাগে। আমি লাগাইয়া দিমুনে। দেখিস কেমন তড়তড়িয়ে বাড়ে।

কৌতুহলবশে এই গেইম খেলা। প্রস্তাবটা আমারই। যখন জানি, এই গেইম-টেইমে এখন আর কিছুই আটকাবে না। এত আনন্দচ্ছলে ভাসছিলাম। পুরোনো প্রেমে দ্বিতীয়বার পরে আমি শুধু জীবনের থই খুঁজে পেয়েছিলাম তা নয়, ফিরে পেয়েছিলাম বিশ্বাস,ভরসা, অভ্যাস আর নিজেকে প্রতারিত না ভাবার এক দিগি¦জয়ী অনুভূতি। আমার মনে হচ্ছিল এক জীবনে আর কিছু না পেলেও চলবে আমার। এক দুদিনের সম্পর্ক তো ছিল না সোহানের সাথে। আটটি বছর। জীবনের প্রথম আবেগ, প্রথম অপেক্ষা, প্রথম স্পর্শ। ওর বিয়ে আমাকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছিল। কেড়ে নিয়েছিল বেঁচে থাকার স্পৃহা। সেই নিঃস্পৃহতা কাটিয়ে স্বাভাবিকতায় ফিরতে আমার সময় লেগেছিল বেশ কয়েকটা বছর। এর ফাঁকে নিজেদের পছন্দের মানুষের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে নিয়েছে রিয়া আর রায়ান।  

সোহান আবার যখন ফিরে এল জীবনে, আকুল হয়ে আমাকে চাইল! ক্ষমা চাইল, আমি খড়কুটোর মতো ভেসে গেলাম। স্মৃতির আর অভ্যাসের এই তোড়ের জন্য যেন আমি অপেক্ষায় ছিলাম। সোহানের এই ফিরে আসা কেবলই কী সোহানের ফিরে আসা ? আমার বিশ্বাসের ফিরে আসা, প্রতারিত হওয়ার কষ্ট মুছে যাওয়া। অনেক, অনেক কিছু।

আমি কি আত্মবিশ্বাসেই না সোহানের হাতটা ধরে বললাম, তাইলে চলো আমরা আমাদের এতদিনের না বলা কথাগুলো বলে ফেলি। অনেক কথা জমে গেছে দশ বছরে। দশ বছর! জমানো কথা নয় শুধু, অভিমান অভিযোগ, প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি সবকিছুই তো। একদা যা দুজনে ভাগাভাগি না করে পারতাম না।

আমরা দুজন যে দুজনের কথা জানতাম না তা নয়। তবুও বিয়ের রাতে যে এই গেইম খেলার সিদ্ধান্ত নেই, সেদিন জানতাম এটি শুধু গেম, গেমই শুধুই। সোহানও ব্যাপারটাকে খুব সিরিয়াসলি নেয়নি, এক কথাতেই রাজি হয়ে যায়। তার একটাই কারণ ছিল এই যে আমরা দুজনেই জানতাম যে আমরা দুজনেই দুজনের সবকিছুই জানি। পুনঃযোগাযোগ আর আজ এই বিয়ের অন্তর্বতী সময়ে আমরা উজাড় করে দিয়েছি আমাদের সকল জমানো কষ্টের ভার। যেন যথোপযুক্ত সমব্যথীর অভাবে আমরা দুজনই ছটফট করছিলাম এতকাল।

যে দিন ফেসবুকে সোহান আমাকে প্রথম আবিষ্কার করল, সেদিন থেকেই ব্যক্তি আমাকে পুনঃআবিষ্কারের প্রাণান্ত চেষ্টা তার। কেমন আছো সুহাসিনী, আমার ভেতরের কোথায় গিয়ে যে ধাক্কাটা লেগেছিল―স্বর্গ, মত্যর্, পাতাল তোলপাড় করে। আমার সব জমিয়ে রাখা অভিযোগ, অভিমানগুলো ঝুরঝুরিয়ে ভেঙে পড়ছিল সেই মুহূর্তেই। অথচ ভেতরের এই ঝুরঝুরে আমাকে লুকিয়ে ওপরে দিব্যি আমি নির্বিকার ছিলাম, না আমার এই ভেঙে পড়া সোহানের কাছে স্বীকার করা যাবে না কোনোমতেই। সোহাগ হাল ছাড়েনি, কথা বলবে না রাজনন্দিনী, কথা বলবে না সুহাসিনী ?

সেন্ট্রাল লাইব্রেরির বারান্দায়, লাইব্রেরি ওয়ার্ক সেরে হানিফ চাচার চা খেয়ে ক্লান্তি তাড়াতে কি নিয়ে যেন হাসতে হাসতে ভেঙে পড়ছিলাম আমরা। আমি, স্বাতী, অপু, শিউলি আমরা বন্ধুরা। কোথা থেকে দলে ভিড়ে যায় সোহান। অপলক তাকিয়ে থাকে আমার দিকে, সবার আড়চোখ যায় সোহানের দিকে। টায়ার্ড লাগছে, কাল ইনকোর্স আছে, লকার গোছাতে হবে ইত্যাদি অযৌক্তিক অজুহাত দেখিয়ে সবকয়টা কেটে পড়ে। সোহাগ আমার হাত টেনে নিয়ে বসে পড়ে লাইব্রেরির বারান্দায়। এত সুন্দর করে হাসো তুমি!  আজ থেকে তোমাকে ডাকব সুহাসিনী।

ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র সোহান নোট নিতে এসে সিনিয়র আমার প্রেমে পড়ে গেল। নোটের গোছা ফটোকপি করে ফিরিয়ে দিয়ে যেতে যেতেই আমার হাতের মোবাইল ‘কিককিক’ করতে থাকত। অদ্ভুত সব মেসেজ। ওয়ান টু থ্রি, ওয়ান ফোর থ্রি। আমি প্রথমটায় বুঝতাম না, ভাবতাম ভুল করে―। ফোন ব্যাক করে জুনিয়র সোহানকে ধমক দিতাম, এই ছেলে তোর ফোন থেকে উল্টাপাল্টা মেসেজ আসছে। দু-চারদিন লেগেছিল ওর সাহস সঞ্চয় করতে। তারপর বলেই দিল একদিন, মোটেই উল্টাপাল্টা নয়। ওয়ান টু থ্রি মানে আই লাভ ইউ…। ওয়ান মানে আই, ফোর মানে এল ও ভি ঈ লাভ, থ্রি মানে ওয়াই ও ইউ। আমি থ মেরে গিয়েছিলাম, ধমকে দিয়েছিলাম, ছেলে জানিস আমি তোর সিনিয়ার ? আপনি এখনও এসব মান্ধাতা ধ্যান ধারণায় বিশ্বাস করেন! ওর বলার দৃঢ়তায় আমার ধ্যান-ধারণা ঝড়ে উপড়ে যাওয়া টিনের চালার মতো উড়ে গিয়েছিল।

হা হা হা, আমার হাসির দমকে বানেছা দৌড়ে আসে, আমি লজ্জা পেয়ে যাই। কতদিন পর এভাবে হাসছি! বানেছা আমার গৃহকর্মী। খুব খুশি আজ। তার আপামণির বিয়ে। আপামণির জন্য বাজারে দোকানে আশেপাশের ফ্ল্যাটে বুয়াদের বৈকালিক আড্ডায় কম কৌতুহল সহ্য করতে হয় না তাকেও। কোন দাওয়াতি নেই, মেহমান নেই। তবু টেবিলে সারি সারি খাবার সাজিয়ে ভরিয়ে দিয়েছে।

সোহান মনে করিয়ে দেয়, আমরা কিন্তু দু’জনে দু’জনের সব কথা বলব বলে পণ করেছি। হ্যা নিশ্চয়ই, তুমি তো বিয়ে করে নিলে আমি পড়লাম মহা ফ্যাসাদে। এতদিন এটা সেটা বলে মাকে আটকে রেখেছি, কিন্তু এখন যে নিজের পায়ের তলাতেই মাটি নেই। খুব অসহায় অবস্থায় পড়ে গিয়েছিলাম সোহান। সোহান আমার মুখে উড়ে আসা চুলগুলো সরাতে সরাতে বলে, সরি রাজনন্দিনী। আমি জানি, আমি জানি আমি সরি বলাতে মোটেই ফিরে আসবে না চলে যাওয়া দশটা বছর। তবু আজ বলতে দাও, সরি।

আমি আসলে সোহানকে অপরাধ বোধ থেকে মুক্তি দিতে চাই। যেন কিছুই হয়নি, কোন দোষই করেনি সোহান, মাঝখানের এই দশটা বছর একটা কুহক মাত্র। গাছের কথা বলি, এই যে বাগানটা দেখো, নিজের হাতে নার্সারি থেকে চারা কিনে কিনে এনে লাগিয়েছি। বানেছা জৈব সার কিনে আনে। ও-ই যত্ন নেয়। আমি শুধু তাগাদা দিই। এবার আর গাছগুলো মরতে দিব না।

কলাভবন থেকে রেজিস্ট্রি বিল্ডিং, আমি গোঁ ধরে দাঁড়িয়ে থাকি, কী অসম্ভব এই চৈত্রের রোদে হেঁটে যাওয়া। আমার রিক্সাই লাগবে। খালি রিক্সা ডেকে এনে সোহাগ সিনেমায় দেখানো রাজমহলের প্রহরীর মতো ইশারা করে বলল, উঠুন রাজনন্দিনী, ধন্য করুন। আমি সুলতানা রাজিয়ার বেশে উঠে রাজনন্দিনী নামটা ধন্য করি। সোহান ঠিক আগের মতো আমার গলায় ঠোঁট বুলায়, রাজনন্দিনী। আমি দশ বছরের অতল ফুঁড়ে স্পর্শের কাল ডিঙিয়ে যাই। তীব্র জেগে ওঠে নারী হবার আকাক্সক্ষা আমার। দশটা বছর যার সন্ধান পাইনি আমি।

সোহান সিগারেট ধরায়। তীব্র অন্ধকারে ওর সিগারেটের আলো দূরবর্তী জাহাজের মাস্তুলের মতো অস্পষ্ট আলো ছড়ায়। আমি ওকে কপট রাগ দেখাই, তুমি তো আগে সিগারেট খেতে না সোহান। এ অভ্যাস কবে হলো? সোহান আয়েশি টান দিতে দিতে আমার কাঁধে যে হাত বিস্তার করে তার নাম বোধ হয় অভ্যাস। যে অভ্যাসের খোঁজে আমি সোহানের কাছে চলে এসেছি খুব সহজে। সোহান বলে, আর বলো না সেবার যখন নিউইয়র্ক গেলাম, পুরোনো বন্ধু-বান্ধব অনেক। এক মাসে অভ্যাসটা হয়ে গেলো।

এই বয়সে এক মাসে অভ্যাস হয়ে যায়? বয়স-কালে হলো না! জানো তোমার এই সিগারেট না খাওয়ার অভ্যাসটা আমার ভালো লাগত, মুচকি হেসে ওকে অভয় দিই,  তবে এখন এই খাওয়াটাও দেখতে ভালো লাগছে কিন্তু।

সোহান সিগেরেটের ফিল্টারটা চায়ের কাপে গুঁজে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে, দ্বিতীয়বার যার সাথে সম্পর্ক হলো তাকে বিয়ে করলে না কেন ? কেন যে করলাম না! ও তো নেহাল। চেন তুমি, বলেছি তোমাকে ওর কথা। ক্লাসে আমার সাথে পড়ত। ওকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। নেদারল্যান্ডসে একসাথে ট্রেনিং এ আবার দেখা। নেহাল অবাক হয়নি। যেন আমি এটাই করব ও জানত। সেই ক্যাম্পাস জীবন থেকে বিরতিহীন প্রেম নিবেদন করছিল নেহাল।  আমি তখনও অবিবাহিত দেখে খুব অবাক হয়েছিল। সেদিন আমি ওকে ট্রেনিং শেষে রুমে ডাকলাম, ও  এল। বিকেল পাঁচটায়। একসাথে কফি খেতে  গেলাম এসি ঘেরা দোকানটায়। বিকেল বিকেল বেশ খালি চারদিক। দুই কাপ কফির অর্ডার দিয়ে চুমুক দেয়ার আগেই প্রস্তাব করলাম, বিয়ে করবে আমাকে ? নেহাল যেন প্রস্তুত ছিল, ঠিক সেভাবেই নিয়েছিল কথাটা। কফির কাপ টান দিয়ে নিজের দিকে নিতে নিতে বলেছিল, কবে কখন করতে চাও ?

নেহালকে ছেড়ে আসতে তোমার কষ্ট হয়েছে? সোহানের কণ্ঠে কী কৌতূহল ?  না কষ্ট হয়নি। আসলে কয়েক কদম হাঁটার পরই আমি বুঝতে পেরেছিলাম তাল মিলছে না। প্রথম যৌবনের মোহ আর প্রাজ্ঞতার বোঝাপড়া এক নয়। মোহ থাকলে তবু বোঝাপড়াটা করে নেয়া যায়। মোহ কেটে গেলে বোঝাপড়াটাও আর হয়ে ওঠে না। নেহালও টের পেয়েছিল সেটা। নিশ্চয়ই ক্যাম্পাসের তরুণী, আমাকে সে খুঁজে পাচ্ছিল না কিছুতেই, অথবা তার ভেতর থেকেই হারিয়ে গিয়েছিল সেই তরুণী। বিয়ের সিদ্ধান্তে যেমন অবাক হয়নি, ছেড়ে আসার সিদ্ধান্তেও মোটেই অবাক হয়নি। 

আহা বেচারা! সোহানের কণ্ঠে নেহালের জন্য করুণা ঝরে। আমি ওর করুণায় হুল ফুটাই। জানো নেদারল্যান্ডসেই সে আমার সাথে রুম ডেটিং করতে চাইল। ভাবতে পারো, কী হ্যাংলা!  সোহান মুখের কথা কেড়ে নেয়, তুমি আসলেই মান্ধাতা আমলের মেয়ে। একটা পুরুষ তোমার প্রেমে পড়েছে। শরীর চাইতেই পারে। খুব স্বাভাবিক।

হ্যা খুব স্বাভাবিক। আমিও অস্বাভাবিক ভাবি না সোহান। কিন্তু বুঝতে হবে তো, যাকে চাইছে সে মানসিকভাবে তৈরি হয়েছে কিনা! সেটা না বুঝেই প্রস্তাব দেওয়া যায়? প্রেমে শরীর থাকবে, কিন্তু তাতে ভেতরের স্বতঃস্ফূর্ততাও থাকতে হবে নিশ্চয়ই। তোমার সাথে সম্পর্কের কত বছর পর শরীর হয়েছিল মনে আছে?

সে আর বলতে! সোহান দুহাতে বেষ্টন করে আমাকে আরও কাছে টানে। কপালে চুমু খায়। সিগারেটের গন্ধ ছাপিয়ে ওর গায়ের পুরোনো গন্ধ আমাকে মাতাল করে। মনে হয়, এতগুলো বছর এই প্রাণহীন অহল্যা-শরীর কেবল অপেক্ষায় ছিল দশরথপুত্র রামের স্পর্শের। আমার চোখ যায় বারান্দার কোণের গাছগুলোতে। রোড লাইটের ছিটকে আসা অনিচ্ছুক আলোতে কি পাতাগুলোকে অন্যরকম দেখায় ? হলদেটে হয়ে যাচ্ছে নাকি পাতাগুলো! বানেছা নিয়মিত পানি দেয় না নিশ্চয়ই। বিয়ের পর মা বাবার কাছে যাব, সোহানদের বাড়ি যাব। কয়েক দিন আমিও ব্যস্ত অফিসের কাজ গোছাতে। আমার হাতে গাছ বাঁচে না। যতবার যত গাছ লাগিয়েছি, বাঁচাতে পারিনি। কোনটা মরেছে বেশি পানিতে শেকড় পচে, কোনটা পানির অভাবে। না না এই গাছগুলো বাঁচাতেই হবে। সকালেই বানেছাকে একটা ঝাড়ি লাগাতে হবে।

সন্ধ্যা পিসি মারা গেছেন ক্যান্সারে। মনির চাচার পরিবার দুই ছেলেমেয়ে সহ মনির চাচাকে তারপর বাড়ি নিয়ে গেছে। আবার বিয়ে করিয়েছে। খুব পরহেজগার বউ। গানের ধারে কাছেও নেই। ছেলেটা মাদরাসায় পড়ে। মেয়েটা যদিও স্কুলে যায়, মনির চাচার ভাইদের ইচ্ছে আঠারো হলেই বিয়ে দিয়ে দেবে। এবার ঈদের ছুটিতে গিয়ে ভোরবেলা হাঁটতে হাঁটতে বাড়িটা খুঁজে বের করেছিলাম, যে বাড়িটায় সন্ধ্যা পিসি আর মনির চাচা ভাড়া থাকত। কামিনী ফুল গাছটা থাকলে একটা ডাল নিয়ে আসব। আমার বারান্দার বাগানটা তখন সবে শুরু করেছি। যেখানে গাছটা ছিল, সেখানে টিনের চালা তুলে তার নিচে পানির মটর। ঘরর ঘরর করে বাজছে। কী আশ্চর্য, মরি মরি করে কামিনী গাছটা এখনও টিকে আছে। একটা সতেজ ডাল ভেঙে নিলাম চুপচাপ। বাড়িটা আগের মতোই। বারান্দায় গ্রিলে স্তর-পড়া ময়লা, মাকড়সার ঝুল। কী ঝকঝকে করে রাখত সন্ধ্যাপিসি সবকিছু। আচ্ছা মানুষ চলে গেলে কি তার পায়ের ছাপ, হাতের তালুর রেখার দাগ কোথাও কোন কোণে লেগে থাকেনা?  সব মুছে ফেলা যায়? ঘরের ভেতর থেকে কড়া রসুন ফোঁড়নের গন্ধ। চলে আসার সময় সব ছাপিয়ে তবু সন্ধ্যা পিসির গায়ের কামিনী ফুলের গন্ধ নাকে ধাক্কা দেয় আমার।

আমাকে মেসেঞ্জারে নক করেই যাচ্ছিল সোহান। আমার নীরবতা কতটা সরব বুঝতে পারেনি ও। ভাবত বুঝি অভিমান অভিযোগকেই আঁকড়ে আছি আমি! তাই কি ভেবেছিলে সোহান, সেরকম কঠিন মেয়ে হলে জীবনটা আর এরকম হয় ? ঠিক বৈষয়িক হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে জীবন গুছিয়ে নিতাম কবেই। আমি বোধহয় ফিরতে চাইছিলাম সোহানের কাছেই। সোহান যখন ফোনের ও-প্রান্ত থেকে বলত, রিমি হাতটা একটু দেবে ? আমি ঠিক কলাভবনের বারান্দায় ফিরে যেতাম, ডাকসু ক্যাফেটেরিয়ায়। সবার চোখ আড়াল করে যেভাবে আমার হাত ধরে বসে থাকত সোহান টেবিলের নিচে। সেই শিহরণ আমাকে জাগিয়ে দিত।

সোহান ফিসফিসিয়ে ডাকত, রিমি রিমি। দশ বছরের আড়মোড়া ভেঙে জাগত আমার শরীর। মনে হতো সোহান আরিফদের বাড়ির চিলেকোঠায় একে একে ভাঙছে আমার লজ্জার আড়। আমি বুঝতে পারতাম জাগছে আমার নারী শরীর। 

নেহালও আসলে আমাকে মুখ বুজে মেনে নিচ্ছিল। এই মেনে নেয়ার মাঝে কোন আনন্দ নেই। ও এখন মনের মতো বউ খুঁজে সংসার করবে। আমাকে দিয়ে ওর সংসার হচ্ছিল না। বলতে পারো ওকে মুক্তি দিয়েছি। তবে তোমাকে না পেলে মুক্তি দিতাম কিনা আমি জানিনা। সত্যি জানি না।

সোহান আমার হাত মুঠো করে ধরে। আমার কান্না পায়। খুব মিস করতে আমাকে ?

হ্যা করতাম তো। সোহান এবার তোমার কথা বল। তোমার ডিভোর্স হলো কেন ?

একদম মিলতো না। বাচ্চার দিকে তাকিয়ে মেনে নিচ্ছিলাম। ও কোনোদিন আমার কোনও ইচ্ছে পছন্দ অপছন্দের তোয়াক্কা করত না। কোনদিন আমাকে বুঝতে চায়নি। এক ফোঁটাও না।

চাকরি নিয়ে শহরটাতে যাবার পর যোগাযোগ তো ছিল সোহান, কথা ছিল একটু গুছিয়েই বিয়ে করব দুজন। হঠাৎ তুমি নাই হয়ে গেলে কী করে ?

আমি চাইনি, সোহান বলে। মেয়েটাকে ভালোবাসিনি শুরু থেকেই। তবু জড়িয়ে গেলাম। মুখোমুখি ফ্ল্যাটে থাকত মেয়েটা। যখন তখন চলে আসত ফ্ল্যাটে, আমি ব্যাচেলর একটা ছেলে, একা থাকি। আরে বড়লোকের বিগড়ে যাওয়া মেয়ে। অসহ্য একটা ক্যারেকটার। এমন জ্বালতন করত। না করলেও শুনত না।

প্রেমে পড়েছিলে তার ? আমি নরম কোমল গলায় জিজ্ঞেস করি।

না। একদম না। সোহানের কণ্ঠের দৃঢ়তা আমাকে ভূমিকম্পের মতো চমকে দেয়।

তবে বিয়ে করলে যে! আবশ্যিক এই প্রশ্নটা যেন না চাইতেই মুখ ফসকে বেরিয়ে পড়ল মুক্ত হাওয়ায়। খোলা বারান্দায়।

আরে মেয়েটা প্রেগন্যান্ট হয়ে গেল। আমি পারলাম না এড়াতে। বাধ্য হলাম।

মুহূর্তে আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরিয়ে নিয়ে গেল তুমুল সুনামির ঢেঊ।

আজ আমার বিয়ে। আজ আমি এই গেমইটা না খেললেও পারতাম। এখন আমি কী করব! সোহানকে এই মুহূর্তে বের হয়ে যেতে বলব ?

আমার হাতে গাছ বাঁচে না। বারান্দার গাছগুলোর পাতাগুলো কী শৈশবের কামিনী ফুলগাছের পাতার মতো বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে! 

লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares