আমার আনিসুজ্জামান স্যার : এখন সকলের স্যার : মালেকা বেগম

প্রচ্ছদ রচনা : বাংলাদেশের শিক্ষক আনিসুজ্জামান

আনিস স্যারের স্নেহ-প্রীতি এবং অভিভাবক-স্বরূপ পথপ্রদর্শন আমার জীবনের ৫০ বছরের বেশি সময়জুড়ে দীপ্তি ছড়াচ্ছে। আমার এবং আমার জীবনসঙ্গী মতিউর রহমানসহ পরিবারের ছেলেমেয়ে- জামাই-বউমা ও নাতি- নাতনিদের প্রতি তাঁর এবং বেবীভাবির আন্তরিক অভিভাবকত্ব এবং স্নেহ-প্রীতির সৌরভ ছড়ানো বহু স্মৃতি আমাদের জীবনকে উদ্দীপ্ত করে চলেছে।

সেসব ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ পাঠের বিড়ম্বনায় পাঠকদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাবো না। নিজের আগ্রহ-তাড়না তো আছেই, তার ওপর শব্দঘর সাহিত্য-সংস্কৃতির মাসিক পত্রিকা শব্দঘর-এর সম্পাদক মোহিত কামালের উপর্যুপরি আদেশ ও তাগাদায় শিক্ষক আনিসুজ্জামানের ৮০ বছরপূর্তিতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

অষ্টাদশী তরুণী আমি ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্নাতক ক্লাসে ছাত্রী হলাম। সেই বছর থেকে ১৯৬৬ সালে এম.এ. পাস করার সময়কালে আনিস স্যারকে প্রথমে, এবং শেষে পেয়েছি। স্যারের সঙ্গে নানাসূত্রে সামান্য পূর্ব-পরিচিতি ছিল। আমার বড়ো ভাই-বোনদের মধ্যে পঞ্চম ভাই অধ্যাপক আব্দুল হালিমের আদর্শিক বন্ধু হিসেবে, আবার বড়ো বোন মমতাজ বেগমের (বিশ্ববিদ্যালয়ের, বাংলা বিভাগের) শিক্ষক হিসেবে এবং সর্বোপরি আমার খালাতো ভাই বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী-র সূত্রে আনিস স্যার-কে পারিবারিক পরিমণ্ডলের একজন ভাই ও শিক্ষক বলে গ্রহণ করেছিলাম।

বিভাগে  ভর্তি হওয়ার প্রথম থেকেই তাঁর এবং অন্যান্য সকল শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের পরিচয় জেনে নিয়েছিলাম। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে যাঁরা সে-সময় চর্চা করতেন তাঁদের অধিকাংশ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক-শিক্ষক। শিক্ষার্থীরা তাঁদের স্নেহে, পরিশীলিত শিক্ষা পরিচর্যায়, বাংলা সংস্কৃতি চর্চায় আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম। মনে পড়ছে ১৯৬৩ সালে বাংলা বিভাগ আয়োজিত ‘ভাষা ও সহিত্য সপ্তাহ ১৩৭০’ অনুষ্ঠানের কথা। অনুষ্ঠানটির ব্যবস্থা-পরিচালনায় সার্বক্ষণিক দায়িত্বে ছিলেন রফিকুল ইসলাম স্যার এবং আনিসুজ্জামান স্যার। আনিস স্যারের উদ্যোগে-পরিশ্রমে প্রকাশিত হয়েছিল ভাষা ও সহিত্য সপ্তাহ ১৩৭০Ñ স্মরণিকা। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল সেই অনুষ্ঠানে প্রাচীন সাহিত্যের একটি পাঠ আবৃত্তি করার। তবে এখন বুঝি সেই আবৃত্তি নেহায়েতই সাদামাটা পাঠ ছিল। আনিস স্যারের লেখা কাল নিরবধি বইটির ২৫ পরিচ্ছেদে এই বিষয়ক স্মৃতি-চারণ থেকে এই বিষয়ে চমৎকার ও বিস্তারিত অজানা অনেক তথ্য জানলাম।

শিক্ষক শুধু বইয়ের শিক্ষা দেন না। তিনি সমাজ-সংস্কৃতি-সাধনা ও অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা জগতের বাইরের বিস্তৃত পরিমণ্ডলে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চাকে ছড়িয়ে দেন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তেমনি একজন শিক্ষক, যিনি শিক্ষাকেন্দ্রে, সাংস্কৃতিক চর্চাকেন্দ্রে, সঠিক রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনচর্চা বিষয়ে নির্ভয়ে সঠিক পথ-নির্দেশ করেন, তিনি শিক্ষক। পাঠকেন্দ্রের বাইরেও সকলের শিক্ষক। স্যারের কথা শোনার জন্য তাঁর ৮০ বছরের জীবনের প্রায় ৫৫ বছরই আমরা কেড়ে নিয়েছি বা বলা যায় দখল করেছি সোৎসাহে। আর তিনি নিজের জ্ঞান অর্জন, সাম্যবাদের শিক্ষাগ্রহণ, ও সাহিত্যচর্চা শুরু করতে করতে ১৯৫০-এ পত্রিকা প্রকাশের সাধনায় জড়িয়ে গেলেন সারাজীবনের বন্ধু গাজী শাহাবুদ্দিন আহমেদ, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী প্রমুখ আরও বহুজনের সঙ্গে। তাঁর এই সাহিত্য সাধনার সৌরভ আমরা উপভোগ করছি কাল নিরবধি।

তিনি আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক। যখনই কোনো বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি করার প্রয়োজন হয়েছে তখন আনিস স্যারের দ্বারস্থ হয়েছি। তিনি আমার পিএইচডি থিসিসের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। সেই সময়ে তাঁর দেওয়া স্বাধীনতার সুযোগ পেয়ে আমি নির্ভয়েÑ নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে পেরেছিলাম। শিক্ষক হিসেবে উদার-মানবিক-স্নেহ-প্রীতির বন্ধনে তিনি সকল শিক্ষার্থীদের আবদ্ধ করেছেন।

তাঁর কাছে অনেক আবদারের অন্যতম আবদার জানিয়েছিলাম এবং জানিয়েই চলেছি আবদার যে, আমি কিছু লেখালেখি, গবেষণা করার শুরুতে তাঁর উপদেশ-বুদ্ধি নিয়ে শুরু করতে চাই। তিনি প্রায় সব আবদারই পূরণ করেছেন। নারী আন্দোলন, নারীর কথা, মুক্তিযুদ্ধে নারী ইত্যাদি বহু বইয়ের বিষয়ে তাঁর পরামর্শ আমাকে আনন্দ দিয়েছে। দুই-তিনটি বইয়ের সম্পাদনায় তিনি তাঁর নামের সঙ্গে আমার নাম সংযুক্ত করার অনুমতি দিয়ে বাধিত করেছেন। সেজন্য তাঁকে নিবেদন করছি শ্রদ্ধার্ঘ্য।

শিক্ষক আনিসুজ্জামান শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক নন। শিক্ষকের শিক্ষক হিসেবেও তিনি শ্রদ্ধেয়। তাঁর শিক্ষার অবদান শিক্ষায়তন ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে নানাক্ষেত্রে। তিনি যে-কোনো উপলক্ষে যে-কারও আমন্ত্রণ অনুরোধ না বলতে পারেন না। আমরা অনেকেই নানাভাবে ব্যাখ্যা করি, মন্তব্য করি সেই সম্মতি এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তাঁর উপস্থিতি নিয়ে। সুস্থতা, অসুস্থতা, প্রশস্ত-অপ্রশস্ত কোনো কিছু তিনি মানেন না। আদর্শগত স্থান থেকে তাঁকে কেউ সরাতে পারেনি। এসব ক্ষেত্রেও তিনি দেশের এবং দশের শিক্ষক।

বাংলাদেশের নারী আন্দোলনে যুক্ত থাকার সূত্রে সাহিত্যে সমাজে নারীর অবদান বিষয়ে চর্চার ক্ষেত্রে তাঁর বই-প্রবন্ধ-পরামর্শ আমাদের পথ দেখিয়েছে।

আমি শেষ করছি ব্যক্তিগত একটি রসালো কথায়। আমার স্বামী মতিউর রহমান আনিস স্যারকে সব সময় মহাত্মা বলে। স্যার, মালেকার স্যার আপনি আমারও স্যার হয়ে গেলেন।

আনিস স্যার মূলত সকলেরই স্যার। আপনার ৮০তম বর্ষ  পেরিয়ে ৮১ বছরে পা রাখার শুভলগ্নে আমার, আমাদের ও পরিবারের  সকলের শ্রদ্ধা গ্রহণ করবেন।

  লেখক : অধ্যাপক, নারী অধিকার কর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares