প্রচ্ছদ রচনা : হাসনাত আবদুল হাই―সৃজনশীল-মননশীল বহুমাত্রিক লেখক : মুখবন্ধ : আনিসুজ্জামান

একজন লেখককে জানবার প্রকৃষ্ট উপায় তাঁর রচনাবলি পাঠ করা। তিনি যদি বহুপ্রজ হন, তাহলে পাঠক মুশকিলে পড়েন। লেখকের সব রচনা পড়া পাঠকের পক্ষে সম্ভবপর হয় না―বাছাই করে পড়তে হয়। যদি লেখকের নির্বাচিত রচনার সংকলন পাওয়া যায়, তাহলে পাঠকের সুবিধে হয়। এজন্যেই শ্রেষ্ঠ গল্প, শ্রেষ্ঠ কবিতা, নির্বাচিত গল্প বা দশটি উপন্যাস ইত্যাদির এত সমাদর। সেখানেও রচয়িতার এক শ্রেণির রচনার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়। সাহিত্যের একাধিক শাখায় যাঁর বিরচণ, তাঁর জন্যে এ-ধরনের সংকলন তার সৃষ্টিসম্ভারের একটি দিকের প্রতিনিধিত্ব করে মাত্র। সকল দিকের প্রতিনিধিত্বের একটি নিদর্শন রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত সহস্র পৃষ্ঠার ‘বিচিত্রা’।

লেখককে জানবার দ্বিতীয় একটি উপায় হলো তাঁর সম্পর্কে আলোচনা কিংবা তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থের সমালোচনা পাঠ করা। প্রবাসী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের উদযোগ নেওয়া হলে পঞ্চাশবর্ষ বয়স্ক রবীন্দ্রনাথ চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে লিখেছিলেন যে, এই পত্রিকায় আগে কবির সাহিত্যকর্ম সম্বন্ধে অজিতকুমার চক্রবর্তীর সমালোচনা প্রকাশিত হয়ে গেলে তাঁর সম্পর্কে পাঠকের আগ্রহ বাড়তে পারে। লেখক ও পাঠকের মধ্যে সেতুবন্ধ-রচনার কাজে সমালোচনার ভূমিকা যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর এই বক্তব্যে সেই বিষয়টি প্রতিফলিত।

বহুদিন হলো আমাদের সাহিত্যজগতে হাসনাত আবদুল হাই (জন্ম ১৯৩৯) সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছেন। সাহিত্যের নানা ক্ষেত্রে তাঁর অবদান- ছোটোগল্প, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি, প্রবন্ধ ও কবিতা সর্বত্র তিনি আছেন। উপরন্তু তিনি একজন শিল্পসমালোচক ও নন্দনতত্ত্ববিদ। এমন একজনের রচনা নির্বাচন করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা সহজসাধ্য নয়।

হাসনাত আবদুল হাই/এক লেখকের প্রতিকৃতি সঙ্কলন গ্রন্থে অত্যন্ত কুশলতার সঙ্গে তাঁর পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। এতে তাঁর রচনা এবং তাঁর সম্পর্কে অন্যের রচনা সংকলিত হয়েছে। সংকলনে হাসনাত আবদুল হাইয়ের কোনো উপন্যাস অন্তর্ভুক্ত হয়নি, কিন্তু তাঁর একাধিক উপন্যাস সম্পর্কে লেখকের নিজের এবং সমালোচকের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। ফলে উপন্যাস না পড়েও উপন্যাসের বিষয় ও রচনাশৈলী সম্পর্কে পাঠকের স্পষ্ট ধারণা জন্মে।

হাসনাত আবদুল হাই বাংলাভাষার লেখক। তবে ইংরেজিতে তিনি অনেক লিখেছেন এবং তাঁর অনেক রচনা ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। বর্তমান সংকলনগ্রন্থও যে দ্বিভাষিক, তাতে তাই আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। বইটিতে আছে তাঁর সম্পর্কে কবীর চৌধুরী, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আবুল হোসেন ও মাহবুবুল আলম চৌধুরী থেকে শুরু করে মারুফ রায়হান ও হাসান মোস্তাফিজুর রহমান পর্যন্ত সতেরোজন নবীন-প্রবীণের আলোচনা, বলা যায়, তিন পুরুষের পর্যবেক্ষণ। সে আলোচনা কখনও সামগ্রিক, কখনও হাসনাতের সাহিত্য ও শিল্পসাধনার কোনো কোনো দিক নিয়ে। যেমন, সেলিনা হোসেন তাঁকে সামগ্রিকভাবে অবলোকন করেছেন, আবুল হোসেন লিখেছেন তাঁর হাইকু নিয়ে; বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের লক্ষ্য সবার জন্য নান্দনিকতা বইটির উপস্থাপন, মুর্তজা বশীরের বিষয় তাঁর ভ্রমণ কাহিনি। এখানে তাঁর সিকাস্ত, সোয়ালো ও সুলতান উপন্যাসের আলোচনা আছে, আছে শ্রেষ্ঠগল্পের প্রসঙ্গ। অন্যপক্ষে হাসনাতের আলোকচিত্র-প্রদর্শনীর সমালোচনা করতে গিয়ে রবিউল হুসাইন তুলে ধরেছেন সাহিত্যকর্মের বাইরে আরেক শিল্পকর্মে তাঁর নিবিষ্টচিত্ততার পরিচয়। ইংরেজি অংশের প্রথমে আছে হাসনাত সম্পর্কে দুটি লেখা ও দুটি সাক্ষাৎকার। আখতার হামিদ খানের আশীর্বচনটি মনোহর, Xandu সম্পর্কে উইলিয়ম রাদিচি ও শ্রাবণী বসুর আলোচনা চিত্তাকর্ষক, Sultan উপন্যাসটির রাদিচিকৃত ভূমিকা এবং হাসনাতের হাইকু সম্পর্কে সৈয়দ বদরুল আহসানের সমালোচনা হৃদয়গ্রাহী।

হাসনাতের বাইশটি বাংলা রচনা এবং এগারোটি ইংরেজি লেখা এই গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। প্রথমোক্ত ভাগে আছে তাঁর দুটি ছোটোগল্প, দুটি ভ্রমণ কথা এবং হাইকু-বিষয়ক একটি রচনা। এই গল্প দুটি তাঁর শ্রেষ্ঠ গল্প কি না, সে-সম্পর্কে পাঠকের মতভেদ হবে। তবে যিনি এতগুলো ছোটোগল্প-সংকলনের রচয়িতা, তাঁর একটি বা দুটি গল্প বাছাই করা সহজ নয়। ‘বাবুরের প্রার্থনা’ গল্পটির কথা আমার এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। যা নেই, তার আলোচনা ছেড়ে যা আছে, তার কথা বলি। হাসনাতের কলমে এখানে পাই ছোটোগল্পের শিল্পরূপ এবং ভ্রমণকাহিনি রচনা সম্পর্কে দুটি লেখা। দুটিই এই দুই সাহিত্যরূপের বিষয়ে একজন অভিজ্ঞ চর্চাকারীর বয়ান। প্রথমটিতে তিনি অন্য লেখকদের কথা টেনেছেন, দ্বিতীয়টির উপজীব্য মূলত তাঁর নিজেরই লেখা। কিন্তু সরলতা ও আন্তরিকতার গুণে তা হয়ে উঠেছে সকল লেখকেরই পঠনীয় ও শিক্ষণীয়। যে-ভ্রমণকথা শ্রেণির রচনা তাঁকে প্রথম আন্দোলিত করে, যাযাবরের সেই ‘দৃষ্টিপাত’ সম্পর্কে লেখাটিও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও রসগ্রাহিতার চমৎকার পরিচয় বহন করে। ‘নভেরা যেভাবে লেখা হলো’ অতি চমৎকার―কীভাবে একজন জীবিত অথচ নিরুদ্দিষ্ট মানুষের জীবনযাপন ও শিল্পসৃষ্টি সম্পর্কে  জানতে জীবনীমূলক উপন্যাসের লেখক অভিযান চালান, তার বিবরণ এতে যেমন আছে, তেমনি আছে প্রাপ্ত উপকরণ বিন্যস্ত করার স্ব-উদ্ভাবিত কৌশলের পরিচয়। উপাদান কেমন করে উপন্যাস হয়ে ওঠে, বাস্তব ও কল্পনার মিশেল কেমন করে ঘটে, অন্য ধরনের রচনাপ্রণালির জায়গা কেমন করে হয় উপন্যাসে, উপন্যাসের সুপরিচিত গঠনরীতি ভেঙেও কেমন করে রচিত হতে পারে উপন্যাস, তার ব্যাখ্যা খুবই উপাদেয়।

অন্যদের লেখা সম্পর্কেও হাসনাত আবদুল হাইয়ের আলোচনা উল্লেখযোগ্য। মনি সিংহ এবং আবুল মনসুর আহমদের স্মৃতিকথা, আবু জাফর ওবায়দুল্লার কবিতা, রাবেয়া খাতুনের ভ্রমণকাহিনি, সমান্তরালে সেলিনা হোসেনের লারা ও ইসাবেলে আলেন্দের পলা, মনিরা কায়েস ও অদিতি ফাল্গুনীর কথাসাহিত্য―এসব নিয়ে তিনি গুরুত্ব ও রসগ্রাহিতার সঙ্গে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। ইংরেজি অংশে মিজানুর রহমান শেলীর ব্যক্তিত্ব ও রচনার যে পরিচয় তিনি তুলে ধেেরছেন, সে সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। হাসনাত আবদুল হাই অনেকখানি জায়গা দিয়েছেন শিল্পী ও শিল্পকর্মের প্রসঙ্গে। বাংলায় কামরুল হাসান ও দেবদাস চক্রবর্তী সম্পর্কে এবং ইংরেজিতে সুলতান, মুর্তজা বশীর, সৈয়দ জাহাঙ্গীর এবং পাকিস্তানি চিত্রশিল্পী গুলজি স¤পর্কে নৈপুণ্যের সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন আমাদের। চিত্রশিল্প সম্পর্কে আরও লেখা আছে। একটি সপ্রশংস সমালোচনা আছে নাট্যাভিনেতা শিমুল ইউসুফ সম্পর্কে : ‘বিনোদিনী’ নাটকে একক অভিনয়ে অসাধারণ অভিনয়ের পরে এমন প্রশংসা শিমুলের প্রাপ্য হয়েছে।

সাহিত্য-শিল্পের জগতে বাস করেও হাসনাত আবদুল হাই দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবেশ সম্পর্কে সচতেন। ‘সর্র্বকালের শ্রেষ্ঠ বক্তৃতা’য় বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ এবং বাংলা, বাঙালি, বাংলাদেশীতে নাগরিকত্ব, জাতীয়তা ও নৃতাত্ত্বিক জাতিসত্তা সম্পর্কে যে- ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছেন তা হৃদয়গ্রাহী ও যুক্তিপূর্ণ। গ্রাম-বাংলার কঠোর বাস্তবতার ছবি আছে The boy behind the plough    রচনায়। এ ছবি এমনই যা অনেক কথা বলে।

আবার A room without a view যখন পড়ি, তখন ব্যক্তিগত প্রবন্ধের আদলে লেখকের অন্তর্জীবনের গূঢ় উপলব্ধির সঙ্গে আমরা পরিচিত হই।

হাসনাত আবদুল হাই যেমন বহুপ্রজ তেমনি বহুমাত্রিক লেখক। এই সঙ্কলন তাঁকে জানতে আমাদের সাহায্য করবে। আমি নিশ্চিত, অনন্য এই বইটি পাঠকের সমাদর লাভ করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares