একশ শোয়াশ কেজি ওজনের গড় উচ্চতার একজন মহিলার বডিটা স্কেলেটারে তুলে দিচ্ছে শয়তানটা ব্যাপক যত্নে। চলমান সিঁড়ির দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে বিশাল বপুর নারী। বিস্ময় তার সম্ভাব্য পতিত হওয়া আশংকা নিয়ে। পড়ে গেলে কী হতো! আপাতত এই তার ক্ষণস্থায়ী কাজ; বিস্ময়বোধ। বডি তো স্বামীর জিম্মায়! পিছনে জর্জেট জামা ভেদ করা তিনস্তরবিশিষ্ট পিঠস্থ চর্বি, দেখছে কে? স্বামী শয়তানটাই! যত অসৎ পয়সায় বানানো চর্বি। আর সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে নিলুফারের মস্তিষ্ক কাজ করছে কোমর ধরে রাখা লোকটার শয়তানির সালতামামির হিসাব কষে, পাল্টা শয়তানির খসড়া করে। একই সঙ্গে এও ভাবছে, ইস, মহিলা কি আর মুরগির রানে টান দিতে দিতে জানত মোটা হলে চলতে এত কষ্ট! বেচারা নারী!

কত রকমের অভিশাপ দেওয়া যায় লোকটাকে! মাসের পর মাস ভেবেছে আর দিয়েছে! কিন্তু অভিশাপে কি হয়! আর এখন! সত্যি কখনও মওকা পাওয়ার কথা ভাবেইনি সে। আর পেলেই কি, ঠিকঠাক মস্তিষ্কটা কাজ করলে তো! হ্যাঁ, দেখা হবেই জানলে কি একটা সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র করে রাখত না!

 দেড় হাজার টাকার নামজারি, বিশ হাজার টাকায় করে দিয়েছে মহি মিয়া, তাও যত রকমের কষ্ট দেওয়া যায়, দিয়েছে। বারে বারে এক কথা, আরে, আপনের ভাগে তো জমিই নাই, সবাই মিউটেশান কইরা নিয়া নিছে, আপনের ভাগে নাই জমি! এত লেট কেউ করে! টেবিলের নিচে হাত রেখে টাকা গোনে আর যেন বলছে, দুষ্টু মেয়ে!

খবিস একটা, ছুঁচো, ইতর। শালার জন্ম বস্তিতে, বাপঠিকানাহীন! মনে মনে হাজারবার আওড়েছে না! মনের শান্তি! এইটুকু করতে দিন নিলুফারকে!

মাস দেড়েক আগে নিলুফার অসুস্থ স্বামীকে পাশে বসিয়ে ভ্যাবাচেকা খায়, বলে কি লোকটা, জমি নাই! বছরখানেক আগে সবার সঙ্গে করলে দশ হাজার টাকায় করা যেত নামজারি, নেতৃত্বে ছিল গুণবান একজন আমলা। কিন্তু তখন তো তার ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশানই হয়নি টাকার সংকটে। পিছিয়ে পড়েছে সত্যি!

শীতকাল তো বেশ কিছুদিন ধরেই কিন্তু সেদিন যেন শীত তাদের ধরে ফেলেছে নাকি পেড়ে ফেলেছে! ভূমি অফিস থেকে বাইরে এসে ভয় পেয়ে যাওয়া স্বামী বলে, যা চায় দিয়ে করে ফেল নিলু! এদের সাথে পারব না আমরা, এরা খুব খারাপ, নরকের কীটের অধম! গু থেকে পয়সা কামড়ে তুলতে জানে এরা! আমাদের জীবন মূল্যবান, ওদের কাছে বেশিদিন বন্ধক রাখা যাবে না।

 মাথা খারাপ! সে তো বলে জমিই নাই, লাখের কমে হবে না! অন্য রাস্তা দেখি, বাসায় চল।

বাসায় এসে বেজায় মন খারাপ। দেশি একজন আমলা আছে অর্থ মন্ত্রণালয়ে। সামান্য পরিচয়। তবু তার শরণাপন্ন হলো। তিনি দেখছি বললেন, কিন্তু মাস গড়ালেও কিছুই দেখলেন না। আরও কিছুদিন গড়িয়ে মানে দিনটাকে শক্ত করে গড়াতে দিল নিলুফার। মনে আশা কিছু ঘুষের আশায় মহি মিয়াই ফোন দিবে। তাই দেয় নাকি! জানে তো শিকার আসবেই, ব্যাপক অভিজ্ঞতা না শালাদের! নিলুফারই এবার ফোন দিল মহি মিয়ারে।

ভাই কাজটা করে দেন, বোঝেন তো রিটায়ার মানুষ, আমি গৃহিণী।

আরে ভাই আপনে তো বুঝতেই চান না, জমিই নাই, সব আগের জনেরা নিয়া নিছে! কঠিন কাজ! দেখি, দুপুরের পরে আসেন কথা বলি উপরে।

উৎকণ্ঠা আর বিরক্তি নিয়ে দুপুরের পর যায় দু’জনে। তাদের নাড়ি নক্ষত্র পরিচয় নেয় ধাপে ধাপে। ছেলেমেয়েদের পরিচয় পেয়ে তার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বলে, দুরূহ কাজ পঞ্চাশ দিয়েন।

আমার বিল্ডিঙের লোকেরা যে দশ দিয়া করছে আপনের কাছেই ভাই।

তাদের তো সমস্যা ছিল না। তারা আপনের জন্য জমি রাখে নাই। অন্য কেউ হইলে এক লাখ চাইতাম।

ভাই বিশেই কইরা দেন।

দেখি। কত আনছেন!

দশ আনছি।

দেন।

টেবিলের নিচে যত্ন করে টাকা গোনে। পা ফাঁক করে পকেটে টাকা ঢুকায়, যেন ধ্বজভঙ্গ শিশ্ন ঢুকাচ্ছে, অশ্লীল!

মাস খানেক পর ফোন দেয়, কাজ হইছে আসেন।

আনছেন?

হ্যাঁ।

কাজ হইছে?

হ্যাঁ, বহুত মেহনত করলাম, খরচের ওপর খরচ! আমার কোনো লাভ রইল না!

দুইটা কাগজ দেয়। হাতে নিয়ে নিলুফার টাকা দেয়। স্বস্তির নিশ^াস ফেলে। গাল আর দিবে না, যা দিয়েছে, দিয়েছে। না, এতটা স্বস্তিরও না। বলে, আপনি আরও দুইটা কাগজ পাবেন, ঐ ছেলেটা রেডি করে রাখবে দশ দিন পর আইসা নিয়া যাইয়েন।

ঠিক আছে বলে বটে ভিতরে খচখচ করে কাঁটা। শালায় তো টাকা নেয়ার আগে বলল না যে কাজ আছে এখনও! কিন্তু নিলুফার শুনেছে এই শ্রেণিরা ঘুস নেয় কাজ করে দেয়। টালটিবালটি করে না।

মহি মিয়া এবার গল্প জুড়ে দেয় সে কত ভালো আছে। খচখচে ভাব নিয়েও তার গল্প শোনে, আজ একাই এসেছে, কাজও হয়ে এসেছে, শালার গল্প একটু শোনাই যায়! খবিশের মতো লাগত এতদিন, আজকে কম লাগছে, কাজ হয়ে আসছে তো! খুটে খুটে তারে দেখে  নিলুফার আর তার কথা খুব শুনছি ভাব করে মাথা দোলায়। দামি শার্ট, নতুন চকচকে বেল্ট। অহ, কর্তার বেল্টটা পাল্টাতে বলতে হবে। নতুন বেল্ট ব্যক্তিত্বের ওপর ছাপ ফেলে। মেয়েদের যেমন স্যান্ডেল কিংবা হাত ব্যাগ!

বাসায় ফেরার পথে অষ্টব্যঞ্জন থেকে নান আর গ্রিল কেনে। একটু স্বস্তি যখন লাগছে হালকা একটু উদযাপন করাই যায়! রিকশায় উঠে শালাকে আরেক দফা এনালাইসিস। পরনের কাপড়, জুতা, চকচকে বেল্ট, ছেলে ভূঁইয়া একাডেমিতে, মেয়ে নর্থসাউথে। ‘ছেলেটা একটু ডাল, তো বউয়ের শখ ছেলে ব্যারিস্টার হবে, মানে ব্যারিস্টার ছেলের মা হইতে চায় সে। মেয়েটার মাথায় বুদ্ধি আছে, ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে চান্স পাওয়া তার জন্য কোনো ব্যাপারই না, বলল, বাবা নর্থসাউথ একটা স্ট্যাটাস আর তাড়াতাড়ি বাইর হইয়া চাকরি করব।’

দিন দশেক বাদে ফোন, Ñ ভাইরে ভাই আপনের কাজ করতে গিয়া জানডা বাইরায় গেছে। কাগজ নিয়া যান আর দশ হাজার আইনেন।

আত্মবিশ^াস অনুরোধমিশ্রিত নির্দেশ।

মাথাটা একটা চক্কর দেয়। ঐ বিশ জোগাড় করতেই তার জান শেষ, লোকটা বলে কি!

সব শুনে কর্তা বলে, দিয়ে দাও, না হলে দিবে না, খারাপের খারাপ সে, খচ্চর। নিলুফারের মাথায় আগুন। বলে, শোনেন, আপনে না মুসলমান! কি বলেন এ সব!

মনে মনে একটা গালি দেয় যার অর্ধেকটা নিলুর নিজের উপরেও পড়ে, পড়ে না! সেই তো হাতে করে ঘুষ দিয়া আসছে। মেরুদণ্ড সোজা করে তো বলতে পারে নাই, দিমু না ঘুস কি বালটা হবে হোক!

 কেউ বলবেন এত টাকা দিয়া ফ্ল্যাট কিনলেন আর এই কয়টা টাকা নিয়া এমন করতেছেন ক্যান নিলুফার! আপনের টাকাও কি সাচ্চা! জি টাকা সাচ্চা, পঁয়ত্রিশ বছর সরকারি চাকরির পেনশান বেচা টাকা। ছেলের টাকায় ভাত খাই।

ফ্ল্যাট কিনতেও কম তিতা! ডেভেলপার শালায় শেষ মুহূর্তে এসে মানে রেজিস্ট্রির আগের দিন গলায় পাড়া দিয়ে এক লাখ বের করে নিবে বাজে একটা কারণ দেখিয়ে, মানতে হয় তাও। অর্ধেক তো কিনেছে ল্যান্ড ডোনারের কাছ থেকে। ল্যান্ড ডোনার সব সময় বলত আপনে আমার বোন, কোনো সমস্যা হইলে এই ভাই আপনার জন্য জীবন দিয়া ফেলবে। তো ডেভেলপারের এই খাচড়ামির কথা বলল ল্যান্ডডোনারকে প্রবল মন খারাপ নিয়ে। ভাই আমার গোনা টাকা! ডেভেলপার তো অকারণ ছাদের কমিউনিটি রুম বাবদ এক লাখ চায়। কি করব! সব শুনে ল্যান্ড ডোনার বলে, আপা আমিও কিন্তু তাহলে এক লাখ টাকা পাই, ফিফটি ফিফটি না!

আকাশ ভেঙে পড়ে, এত দেখি শিয়ালের কাছে মুরগা ভাগা দেওয়ার মত! উপমা ভুল! তবে খাল কেটে কুমির আনা! নিজের চুল নিজে ছিঁড়ে গুনতে বসা! তিতার তিতা!

এবার কর্তা ফোন দেয় মহি মিয়ারে। বলে, ভাই, আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, আপনি এমন করবেন না, দুপুরে সে যাবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিয়ে দিয়েন।

এই কথা সেই কথা তারপর বলে আইচ্ছা প্রফেসর সাহেব দিয়ে দিব, আমার গাঁটের থেকে কিছু গেল আর কি! আপনের স্ত্রী দেখি ছেলেমানুষ!

যথারীতি লাঞ্চের পর হাজির নিলুফার। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বসে আছে একা। সব কাগজ দিল, সই করাল। এবার খাজুরা গল্প করতে চায়, আপনে তো দেখি ছোট মানুষের মত, আরে এত সামান্যে কি শরীর খারাপ করতে হয়!

ঠিক তিন দিন বাদে ফোন দেয় নিলুফারকে। ধরে না। আবারও তিন দিন বাদে রাত দশটায় ফোন, ধরে না। মহিলা মানুষ সে, অত রাতে কী কথা তার সাথে!

সাতদিনের মাথায় আবার ফোন মহি মিয়ার, কেমন আছেন? একদিন চা খাইতে আসেন। এখন তো কোনো ঝামেলা নাই! খালি কাজেই আসবেন! বাসা তো কাছেই!

নিলুফার বলে, হ্যালো, হ্যালো, কি যে অবস্থা নেটওয়ার্কের! তারপরও ফোন আসে, কথা নিলুফার বলবে না।

তার মাস খানেক পর ঈদের মার্কেটে স্কেলেটারে, বউসহ। ধুমসি মাগি বউ একটা, আগলে নিয়ে মহি মিয়া অন্য দিকে মুখ করে চলে যায়। চেনে না আর কি!

কিন্তু নিলুফার তো স্কেলেটারের গোড়ায় দাঁড়িয়েই ঠিক করে ফেলেছে! উঠে আসে দোতলায়। কাছে গিয়ে মুটকিকে দেখিয়ে দেখিয়ে বলবে, আরে মহি ভাই! কি অবস্থা, এই ঝড়জলের মধ্যে শপিং! কি কাণ্ড! হ্যাঁ সেদিন রাতে ফোন দিলেন, ইস্ অতো রাতে ফোন দিলে কি ধরা যায়! বোঝেন না, স্বামী থাকে পাশে। ফোন দিবেন বিকালে, সন্ধ্যায় ঠিক ঠিক পৌঁছে যাব সেই হোটেলে। আর এখন সত্যি খুব কাজ টাজ নাই, চাকরি বাকরি ছেড়ে দিয়ে বেকার। বোঝেন তো হাতে টাকা পয়সা একদম নাই। আচ্ছা বিকাশ নাম্বার তো আছে! ওখানেই পাঠাবেন! সেদিনের দশ হাজার পেয়েছি, অনেক ধন্যবাদ।

তিনতলার স্কেলেটরে উঠে গেল নিলুফার ঝড়ের বেগে।

বাটার দরোজার সামনে হাসিতে ফেটে পড়ল নিলুফার, তারপর একটু কান্নাও, থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে। কী হলো এটা! অহ গড কীভাবে শালাকে ফাঁসিয়ে দিলাম! বউ একটা ঘুসি দিলে তো শালা ছাতু হয়ে যাবে!

দিবে না, ঘুসি দিবে না, দেখছেন মাগির ভূঁড়িটা! ওইটা বানাইছে কি দিয়া!

না, মন যতটা ভালো হওয়ার কথা তত হলো না।

ঠিক তিন দিন বাদে রাত এগারটার পর ফোন, নিলুফারের কাছেই। অচেনা নাম্বার, দ্বিধা করে করে রিসিভ করে স্বামীর কানে ধরে। হ্যালো বলার সঙ্গে সঙ্গে ওপার থেকে বলে, অপরিচিত নাম্বার হলে স্ত্রীকে ধরতে দেন না, তাই না প্রফেসর সাহেব! ভালো। Ñ কে বলছেন, মহি মিয়া! Ñ হ্যাঁ হ্যাঁ মহি। কিন্তু আপনার স্ত্রী যে দিনে-দুপুরে পর পুরুষের সাথে হোটেলে কাটায় সে খবর রাখেন তো!

মহি মিয়ার কাছে এত দিন প্রফেসর সাহেবের যে ভাবমূর্তি তাতে, ‘কি যে বলেন মহি সাহেব, না না এ সব কি বলছেন’ ইত্যাদি হওয়ার কথা। বদলে খেঁকিয়ে উঠলেন প্রফেসর, বাস্টার্ড ঘুষখোর, ফোন রাখ হারামজাদা! কাল তোর ছবি দিয়ে ইত্তেফাকে নিউজ করাব, কে এই চরিত্রহীন ঘুষখোর মহি মিয়া, তোর ছবি, ভিডিও সব আছে আমার মোবাইলে, দাঁড়া!

আহ্, বহুদিন পর নিলুফারের জানে শান্তি শান্তি লাগে।

যেমন শান্তি লাগছিল একটু আগে ঘুমাতে গিয়ে দেখল নাতো ততটা তো শান্তি লাগছে না! মোবাইলের ঐ অতটুকুন ছবি দিয়ে তো কিছু হবে না! শয়তানদের বডি তো আকাশ পাতাল সব ছেয়ে ফেলেছে, এরা সংখ্যায় তো শত কি হাজার নয়, লক্ষ লক্ষ!

হাল ছাড়লে তো হবে না নিলু, ওরা লক্ষ হলে আমরা তো কোটি কোটি, স্বামী স্ত্রী এক হলে কোটি কোটি হয়, তাই না!

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares