কান্নাতে যত সুখ : আহমেদ মাওলা

চোখ দুটি দেখেই আবিদের শরীরে শিহরণ জেগে ওঠে। মেয়েটার তাকানোর ভঙ্গিই অন্যরকম। না, এ রকম ধারালো চোখ সে আগে কখনও দেখেনি। যত্ন করে কাজল আঁকা সমুদ্রের গভীরতা এসে যেন ভিড় করেছে তার চোখে। কাজল টানা ভ্রƒযুগলকে মনে হচ্ছে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ এসে থেমে গেছে বুঝি বালিয়াড়িতে। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে বালিয়াড়িতে খালি পায়ে হাঁটতে গেলে শীতল হাওয়ায় সারা শরীরে আরাম বোধ হয়, আবিদের কেন জানি সেরকম অনুভূতি হচ্ছে। নিষিদ্ধ পল্লীর দীর্ঘ গলি পথ সে হেঁটে এসেছে। প্রত্যেকটি ঘরের খোলা দরজায় একেকটি মেয়ে কোমর বাঁকা করে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে সস্তা প্রসাধনের স্পষ্ট আভা। হাতের ইশারায়, চোখের ইঙ্গিতে, ঠোঁটে মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে অনেকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে আবিদকে। বারবণিতাদের এসব ছলাকলার কথা আবিদ বন্ধুদের মুখে অনেক শুনেছে। গলিতে  ঢোকার পর থেকে আবিদের বুক ডিব্ ডিব্ করছে। আগে কখনও সে পতিতা পল্লীতে আসেনি। আজই সে সাহস করে ঢুকেছে। শরীরের ভেতর জেগে ওঠা ভিন্ন এক শরীরের অগ্নিময় উত্তেজনাকে আর কতদিন অবদমিত রাখা যায়! পেটের ক্ষুধা যে কোনো ভাবে নিবারণ করা যায় কিন্তু দেহের ক্ষুধা? ভদ্রঘরের ছেলে আবিদ মনের অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে, লজ্জা-শরমের মুখে একটা থাপ্পড় লাগিয়ে, ভেতরে খুব সাহস সঞ্চয় করে টুক করে ঢুকে পড়েছে। মনে ভয় ছিল একটাই, যদি পরিচিত কেউ দেখে ফেলে? তখন, তখন কী হবে? খারাপ কথা দুর্গন্ধের মতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। দেবরামপুর গ্রামের ওয়াহিদ মাস্টারের ছেলে আবিদ হোসেন নিষিদ্ধ পল্লীতে যায়Ñ এ কথা গ্রামে রাষ্ট্র হয়ে গেলে তার বাবার সম্মানটা থাকবে কোথায়? এসব চিন্তা গলিতে ঢোকার পূর্ব পর্যন্ত তাকে কিছুটা বিমর্ষ করে তুলেছিল। গলিতে ঢোকার পর প্রসাধিত কামিনীদের কৃত্রিম ছলাকলা, আমন্ত্রণ উপেক্ষা করেই এগিয়ে যাচ্ছিল। বুকের ডিব্ ডিব্, ধুপ ধুপ ভাবটা এখন অনেকটা প্রশমিত। আবিদ হোসেন হাঁটছে, ভাবটা এমন যে, সে যেন এ পল্লীতে আসা অভিজ্ঞ ঘাগু মাল। বেপরোয়া, মাস্তান-মাস্তান ভাব, শেয়ানা পাবলিকের মতো ভাব নিয়ে হাঁটছে আবিদ। এরমধ্যে শিস দিয়ে ডাকল একজন, সে পাত্তাই দিল না। আরেকটা মেয়ে হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে বলেÑ ‘কি নাগর! পছন্দ হয় না?’

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা বিচিত্র দেহভঙ্গিমা দেখিয়ে হেসে ওঠে। আবিদের ভেতরটা কেঁপে ওঠে কিন্তু নার্ভাসনেসটা সে বাহিরে দেখাতে চায় না। গলায় ঝোলানো মোটা চেইনটা গেঞ্জির ওপরে নিয়ে আসে। হাতের আঙ্গুলে কায়দা করে ধরা সিগারেটে একটা লম্বা টান দেয়। একগাল ধোঁয়া ছেড়ে দাঁত বের করে একটা কৃত্রিম হাসি হাসে। পাড়ার গলিটা যেখানে মোড় নিয়েছে, সেখানে দাঁড়ানো মেয়েটার চোখে চোখ পড়তেই আবিদের চোখ আটকে যায়। মেয়েটাও অভিজ্ঞ চোখ দিয়ে বুঝে নেয় আবিদের মনের অবস্থা। হাত ইশারায় ডাকতেই আবিদ কাছে গিয়ে মেয়েটির হাত ধরে। উষ্ণ-কোমল হাত। তারপর টেনে ছোট্ট ঘরের ভেতরে নিয়ে গিয়ে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দেয়। বাতি নেভানো ছিল বলে দিনের বেলায়ও ঘরে জমাট অন্ধকার। দরজা বন্ধ করে দেওয়ায় সে অন্ধকার আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। আবিদ কয়েক সেকেন্ড চোখে কিছুই দেখল না। যেন ইচ্ছা করেই সে কোন অন্ধকার জগতে ঢুকে পড়েছে। মেয়েটি অভ্যস্ত হাতে সুইস টিপতেই ঘরে একশ পাওয়ারের লাইট জ্বলে উঠল। আবিদ দেখল, খাটে সুন্দর করে বিছানা পাতা। মেয়েটি আবিদকে টেনে নিয়ে খাটে বসায়। আবিদ যন্ত্রচালিতের মতো খাটে গিয়ে বসলেও তার মধ্যে ইতস্ততা, জড়তা কাটে না। মেয়েটি খিলখিল করে হেসে বলে, ‘পাও তুইল্লা বহেন। বুঝতে পারছি। নতুন আইছেন?’

আবিদের ভেতরটা সত্যি কেঁপে ওঠে। আড়মোড় ভেঙে গলা পরিষ্কার করে বলে, ‘না।’

ভেতরের নার্ভাসনেসটা গোপন করে জিজ্ঞেস করে, ‘নাম কি তোমার?’

‘যমুনা।’

নাম বলেই যমুনা আবার খিলখিল করে হেসে ওঠে। আবিদ লক্ষ করল, যমুনার চোখই কেবল আকর্ষণীয় নয়, যমুনার হাসির মধ্যেও এক ধরনের মাদকতা আছে। হাসলে যমুনার সারা শরীর একই সঙ্গে দুলে ওঠে। মুক্তোর মতো সাদা দাঁতের হাসি বেশ চমৎকার। কাচের চুড়ির মতো রিনিঝিনি অনেকক্ষণ ধরে বুকে বাজে। যমুনা ঘর-গৃহস্থের নিপুণ স্ত্রীদের মতো বলে, ‘খাওয়া-দাওয়া কিছু হইছে?’

তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করে নিজেই বলে, লন, একলগে দু’জনে খাই।’

যমুনার কণ্ঠে সোহাগ ভরা আমন্ত্রণ। যেন কতদিনের মায়াবী সম্পর্ক।

বিয়ে করা বৌ যেখানে স্বামীদের সঙ্গে কণ্ঠের ঝাঁঝ ছাড়া কথা বলে না, সেখানে যমুনার সোহাগী আমন্ত্রণ আবিদকে ক্ষণিকের জন্য হলেও সুখের ছোঁয়া এনে দেয়।

দু’ প্লেটে ভাত, ঝাল মাংস, বেগুন ভাজা, ঘন মসুরের ডাল। আবিদ খুব তৃপ্তি করে খায়। খিদেটা জবর লেগেছিল। বাইরে টেনশন ছিল, তাই আবিদ বুঝতে পারেনি। ভরা খিদা পেটে ছিল বলে আবিদের মনে হলো, এমন সুস্বাদু রান্না সে বহুদিন খায়নি। খাওয়া শেষ করে যমুনা জিগায়Ñ ‘পান, সিগারেট, বিয়ার, মদ এসব কি লাগব ক’ন। একলগে অর্ডার দিই। কামের মাঝখানে শোয়াত্থুন উঠতে বড় ধিকদারি লাগে। যা লাগব কইহালান।’

আবিদ যমুনার টোল খাওয়া মুখের দিকে একবার তাকায়। সিগারেট যা লাগবে সে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। একটা হুইস্কির বোতল হলেই এখন চলে। রান্না ঘরের ফ্রিজ থেকে একটা বোতল এনে যমুনা টেবিলে রাখে। জগে পানি, কাচের গ্লাস আগেই রাখা ছিল টেবিলে। আবিদ চানাচুর থেকে বেছে বেছে বাদামগুলো মুখে দিচ্ছে আর টুকটাক কথা বলছে। যমুনা পরনের শাড়িটা দ্রুত খুলে খাটের কোণায় ভাঁজ করে রেখে দেয়। বক্ষবন্ধনীতে বাঁধা তার সুডৌল যুগল আবিদের ভেতরে বিজলির মতো জ্বলে ওঠে। লতাগুল্মের দিকে তাকিয়ে আবিদ তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে। হাত বাড়াতে গেলে যমুনা খিলখিল করে হেসে উঠে বলে, ‘এই তো, একটু সবুর করুন।’

আবিদের যেন তর সয় না। পারলে বুনো বাঘের মতো এখনই জাপটে ধরে। যমুনা বাথরুমে যায়। তার ফিরতে দেরি হয়। আবিদ এর ফাঁকে কত কি-যে ভাবে।

পাশের ঘরের কাস্টমার পিংকি অথবা কমলা নামের মেয়েটির ওপর উপগত হয়। তাদের কামকলার স্পষ্ট আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। গাঢ় চুম্বন, হাসির ভগ্নশব্দ, দোলায়িত ছন্দ, সবকিছু। পাশাপাশি রুম বলে সবকিছুই স্পষ্ট শোনা যায়। আবিদ শুয়ে শুয়ে ভাবেÑ ‘যমুনা, পিংকি, কমলা’ এদের আসল নাম নয়। একেক কাস্টমারের কাছে একেক নাম বলে তারা। এরা জানে, শহরের লোকজন ফুর্তি করতে আসে। ‘ফুর্তি না-বাল। খালি গতর ঘাঁটে। গতরের মধ্যে সুখ খোঁজে।’

যমুনা বাথরুম থেকে এসেই আবিদের পাশে কাত হয়ে শুয়ে পড়ে। আবিদকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায়। দু’জন আদিম উল্লাসে মেতে ওঠে। নিঃশ্বাস গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়। শরীরেরও যে নিজস্ব একটা ভাষা আছে, আবিদ এই প্রথম বুঝতে পারে। যমুনাই শেখায় কীভাবে শরীর শরীরকে জাগায়। শরীরের ভেতরে জেগে ওঠা শরীর কীভাবে মানুষকে পশুতে নামিয়ে নিয়ে আসে। কামের মহূর্তে মানুষ পরস্পর পশু হয়ে যায়।

 যমুনা দড়ির মতো খাটের ওপরে তড়পায়। আবিদ সত্যি যমুনা কিংবা গঙ্গা নদীর কল্লোলিত ঢেউয়ে দক্ষ মাঝির মতো গাজী গাজী বলে নৌকা চালায়। দাঁড়াশ সাপের মূর্চ্ছাহত সঙ্গমের মতো পড়ে থাকে দু’জন কিছুক্ষণ। তারপর আবার কথার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে আবার নিচে নামে। সাপলুডু খেলা চলতে থাকে। শরীরে শরীর ঘেঁষে কথা বলেÑ ‘না, যমুনা তার আসল নাম না। আসল নাম কি ছিল, সেটা এখন তার মনে পড়ে না। শুধু মনে পড়ে পদ্মার চরে বাড়ি ছিল। ধানি জমি, বাড়ি, ক্ষেতখোলা সব সর্বনাশা পদ্মা রাক্ষসী গিল্লা খাইছে। মা-বাপের চেহারা তার মনে পড়ে না। বানে ভাইস্যা গেছে মা-বাপ। বারো-তেরো বছর বয়সে গ্রামের একজন ঢাকা শহরে বাসার কামে দিয়া গেছিল। হেই বাসায় কাম করছি চার-পাঁচ বছর। তারপর একটু ডাঙ্গর হইলে হে বাসার মালিকের ছেলে একরাতে আমারে…’

যমুনার চোখে কূলভাঙা স্রোতের ঢেউ। একটু কথা বলে আবার কাঁদে। দুঃখ-বেদনা চিরকালই অন্যের হৃদয়েও সঞ্চারিত হয়। আবিদও যমুনার দুঃখে দুঃখী, শোকে শোকাহত হয়। মধ্য রাতে আবার জেগে ওঠে ক্ষুধা। শুধু পেটের ক্ষুধা নয়, দেহের ক্ষুধাও। কামকলার নানা কৌশল জানে যমুনা। শরীর তৃপ্ত করার, সিক্ত করার, শান্ত করার নানা আসন-বিলাস-ব্যসন খুব অল্পদিনে রপ্ত করে নিয়েছে যমুনা।

রাত গড়িয়ে যায়, যমুনার দুঃখের কথা ফুরায় না। এক বাসা থেকে আরেক বাসা, এভাবে বাসার দারোয়ান, গাড়ি ড্রাইভার, বাসার কাজের ছেলের হাতে… যমুনা কাঁদে। তার কণ্ঠস্বর ভাঙা ভাঙা। বুকে পাহাড় সমান দুঃখ। ‘শেষে যে বাসায় কাজ করতাম, সে বাসার দারোয়ান আমারে বিয়া করে। আমি চাইছিলাম সংসার, ছেলেমেয়ে। ছোবহান দারোয়ান আমারে নিয়া সংসার করল পাকা দু’বছর। সন্তান আইলো পেটে। প্রথম সন্তান। আহ্ কি করি, কি করি! মনে বড় আনন্দ। খুব সুখ স্বপ্ন দেখছিলাম আমি। সাত মাসের সময় সিঁড়ি থেকে পইড়্যা সন্তান গেল নষ্ট হইয়া। ছোবহান দারোয়ান আমারে লাত্থি মাইর‌্যা খ্যাদাইয়া দিলো। উপায় না দেখ্যাই বছির রিকশাওয়ালার ঘরে গিয়া উঠলাম। ছয়-সাত মাস তার ধারে ছিলাম। খাওয়ায়-পরায় বছির আমারে কষ্ট  দেয় নাই। কিন্তু রোজ রোজ একেক ব্যাডার লগে আমারে হুইতে হইত। এক ব্যাডারে হাত কইর‌্যা বছিরের ঘরেত্থুন পালাইছি। রোজার ঈদের সময় গাউছিয়া মার্কেটে কাপড় কিনতে গিয়া দেখা অইলো মর্জিনা সর্দারনির লগে। মর্জিনা  যে নিষিদ্ধ পাড়ার সর্দারনি আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি। মর্জিনা বলেছে আমারে কাম দিব। হে কাম যে এই কাম আমি জানতাম না। এখন আমি প্রতি রাতে গতর বেইচ্যা ভাত খাই। গতর বেইচ্যা…’ যমুনা ঠুকরে কেঁদে ওঠে। যমুনার চোখের জলের স্রোতে আবিদ মরা লাশের মতো ভাসতে থাকে।

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares