মহানির্মাণ মহা জীবন নির্মাণের : এক সাবলীল সময়স্রোত : আশরাফ জুয়েল

গল্প শুনতে পছন্দ করে মানুষ। এ আগ্রহ সুপ্রাচীন। মানুষের এই আগ্রহের ফলেই কাহিনির উদ্ভব, সেখান থেকে উপন্যাস। এর আক্ষরিক অর্থ হলো উপযুক্ত বা বিশেষ রূপে স্থাপন, একটি উপাদানকে বিবৃত করার বিশেষ কৌশল, পদ্ধতি বা রীতিনীতিই হচ্ছে উপন্যাস। এ হলো, গদ্যে লিখিত এমন এক বিবরণ বা কাহিনি যার ভেতর দিয়ে মানব-মানবীর জীবনযাপনের বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়ে থাকে। ব্যুৎপত্তিগত এবং আভিধানিক অর্থ বিশ্লেষণের মাধ্যমে বলা যায়, মানব-মানবীর জীবন যাপনের বাস্তবতা অবলম্বনে যে কল্পিত উপাখ্যান পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় করার জন্য বিশেষ বিন্যাসসহ গদ্যে লিপিবদ্ধ হয় তা-ই উপন্যাস। যেহেতু উপন্যাসের প্রধান উপজীব্য মানুষের জীবন তাই উপন্যাসের কাহিনি হয় বিশ্লেষণাত্মক, দীর্ঘ ও সমগ্রতাসন্ধানী। দৈনন্দিন জীবনযাপনের ভাষায় তথা গদ্যে কাহিনি লেখার উদ্ভব ঘটে ইতিহাসের এক বিশেষ পর্বে। খ্রিস্টীয় চৌদ্দো-ষোলো শতকে ইউরোপীয় নবজাগরণ বা রেনেসাঁসের ফলে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয় জ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা, বিজ্ঞান ও যুক্তিনির্ভরতা, ইহজাগতিকতা এবং মানবতাবাদ। ক্রমে যা হয়ে ওঠে শিক্ষিত সামজের সচেতন জীবনযাপনের অঙ্গ। রেনেসাঁসের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করে সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠিত হলে বিজ্ঞান ও দর্শনের অগ্রগতি বাধাহীন হয়ে ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় বাণিজ্য পুঁজির বিকাশ আরম্ভ হলে সমাজে বণিক শ্রেণির গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় এবং রাজা, সামন্ত-ভূস্বামী এবং পুরোহিতদের সামাজিক গুরুত্ব হ্রাস পেতে থাকে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ভাগ্যনির্ভরতা পরিহার করে মানুষ হয়ে ওঠে স্বাবলম্বী, অধিকার-সচেতন এবং আত্মপ্রতিষ্ঠায় উন্মুখ। এভাবে ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব, রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ এবং আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ঘটনা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্র চর্চার পথ, খুলে দেয়। সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিমানুষ এবং ব্যক্তির জীবনই হয়ে ওঠে সাহিত্যের প্রধান বিষয়। এভাবেই ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সমাজ পরিবর্তনের পটভূমিকাতেই উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে উপন্যাসের।

মহানির্মাণ এক মহান নায়কের সৃষ্টিপথের প্রারম্ভিক পদচারণা। বাঙালিজাতির হাজার বছরের ইতিহাসে ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ এক আলোকবর্তিকা। তাঁর কর্মকাহিনি এবং জীবন বাঙালি জাতির কর্মচালিকা হিসেবে কাজ করে, ভবিষ্যতেও করবে। বাংলাভাষার কবি এবং কথাসাহিত্যিক অমিত গোস্বামী, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’-এর কলকাতা জীবনের ওপর এক অসাধারণ সাহিত্য নির্মাণ করেছেন। উপন্যাসটি কলকাতা এবং ঢাকাÑ উভয় জায়গা থেকেই প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশে অমর একুশে গ্রন্থমেলা- ২০২০- এ প্রকাশ করেছে, অন্বেষা প্রকাশনী এবং পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় প্রকাশ করেছে পালক পাবলিশার্স।

মহানির্মাণ নিয়ে লেখক অমিত গোস্বামী বলছেনÑ ‘পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর আবির্ভাব এক বৈপ্লবিক আত্মপ্রকাশ। বাংলাদেশের বাঙালি তো বটেই ভারতের বাঙালিও এই মানুষটির প্রসঙ্গ উঠলে ধর্ম নীতি বা বিশ্বাস দূরে সরিয়ে দিয়ে শ্রদ্ধায় মাথা নত করেন। মূল কারণ তার অর্জন। ভারত সাহায্য করেছিল এ কথা মেনে নিয়েও বলা যায় একটা দেশের জন্ম দেওয়া একজন নেতার একক কৃতিত্ব পৃথিবীর ইতিহাসে প্রায় দুর্লভ। এই অসম্ভবকে সম্ভব করার পেছনে কারণ বর্ণনা করে প্রচুর শব্দ খরচ করা হয়ে গেছে এর মধ্যে। বঙ্গবন্ধুর জীবনকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা ও তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ এতজন এতভাবে করেছেন যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কিছু লেখা নিতান্তই চর্বিতচর্বন হয়ে যাবে বলে আমার মনে হতো। তার ওপরে বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও কারাগারের রোজনামচায় তার সাহিত্যিক মুন্সিয়ানা প্রতিভাত। শহিদ আলতাফ মাহমুদের ও সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জীবনকাহিনি নিয়ে উপন্যাস আলতাফ ও হুমায়ূন লিখে ফেলেছি ঠিকই কিন্তু সেখানে তাদের পরিবারের সাহায্য ছিল। আলতাফ মাহমুদ বা হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের কৃতী সন্তান হলেও জাতির পিতা বা আপামর বাঙালির আবেগের মূল উৎসস্থল ছিলেন না। এহেন জাতির পিতার জীবনের কোনো অংশ নিয়ে লেখার ন্যূনতম স্বপ্ন দেখার স্পর্ধা আমার ছিল না। সে স্বপ্ন দেখিনি কোনোদিন।’ এই বয়ান থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই উপন্যাস রচনার পেছনে কথাসাহিত্যিক অমিত গোস্বামীর উদ্দেশ্য।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষে মহানির্মাণ এক ব্যতিক্রমী কাজ, এটা বলা যায়। বঙ্গবন্ধুর কলকাতা জীবন, অর্থাৎ তাঁর রাজনৈতিক জীবনের উন্মেষপর্বকে উপন্যাসের অবয়বে অন্য এক মাত্রা দিয়েছেন সুদক্ষ কথাশিল্পী অমিত গোস্বামী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য নিজের সর্বোচ্চ দিয়েই তিনি লড়ে গেছেন, যার শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন তাঁর কলকাতা-জীবন থেকে। গোপালগঞ্জ থেকে ফরিদপুর, সেখান থেকে কলকাতা, কলকাতা থেকে ঢাকা; বাংলার পথেপ্রান্তরে তিনি দৌড়ে বেড়িয়েছেন, এই সমস্ত যাত্রাপথে তিনি মানুষের জন্য কথা বলেছেন, লড়াই করেছেন। কথাসাহিত্যিক অমিত গোস্বামী সেসব সূত্র ধরে এগিয়েছেন, তাঁর সৃষ্টি মহানির্মাণ। এই নির্মাণে তিনি চরিত্র হিসেবে নিয়ে এসেছেন, মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, কাজী নজরুল ইসলাম। শেখ মুজিবুর রহমান, একজন প্রাজ্ঞ নেতা হয়ে উঠতে পেরেছেন তার পেছনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অবদান অনস্বীকার্য। ইসলামিয়া কলেজ থেকে কলকাতার পথে তিনি পাঠ নিয়েছেন রাজনীতির। মিশেছেন মানুষের সাথে, তাদের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন নিঃসংকোচে। বঙ্গবন্ধুর জীবনে তার পিতা-মাতার চারিত্রিক দৃঢ়তা তার চরিত্র গঠনের মূলস্তম্ভ। কিন্তু একই সঙ্গে বলতে হবে তার স্ত্রীর তার প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও অকুণ্ঠ সমর্থন। বিনা প্রশ্নে ভরসা রেখেছেন বঙ্গবন্ধুর সব কাজকর্মে। বঙ্গবন্ধু সবসময়েই স্থির ছিলেন তার সংকল্পে। মহানির্মাণ পাঠ করার মধ্য দিয়ে আমরা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক উন্মেষের সাথে সাথে পরিচিত হই দেশ বিভাগোত্তর কলকাতার দাঙ্গাপীড়িত সময়ের সাথে। ১৬ আগস্ট ১৯৪৬ যা দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং নামক কুখ্যাত দাঙ্গা নামে পরিচিত সে সম্পর্কে যে সাক্ষ্য দেয় তা হলো দাঙ্গার প্ররোচনা ও সূত্রপাত ঘটায় হিন্দুরা এবং এর পেছনে জনৈক বিখ্যাত বাঙালি কংগ্রেস নেতার সূক্ষ্ম চালে। অথচ এখনও প্রায় সব হিন্দু এবং বেশ বড় সংখ্যক মুসলমানদের ধারণা আছে যে, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের হিন্দু মহাসভার প্ররোচনায় গোলমালের সূত্রপাত যা দাঙ্গায় গড়ায় মুসলমানদের নৃশংস হিন্দু নিধনে এবং হিন্দুদের রক্ষাকর্তার ভূমিকা নেন কংগ্রেসী কিছু নেতা। লেখক অমিত গোস্বামীর অনুসন্ধানী দৃষ্টি সেই সময়কালকে সুনিপুণভাবে তুলে আনতে সক্ষম হয়েছেন।

উপন্যাসের ভূমিকায় কবি কামাল চৌধুরী বলেছেন :

‘বাঙালি জীবনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাকালের বাতিঘর। তাঁর জীবন ও কর্ম ধ্রুপদী উপন্যাস ও মহাকাব্যিক জীবনবোধকে ছাপিয়ে গেছে। কবিতা, গল্প-উপন্যাস, প্রবন্ধ ও সঙ্গীতে তিনি আজ আমাদের সৃজন ও মননচর্চার সুবিশাল পটভূমি। তিনি বাঙালির আবেগ ও শক্তির উৎসÑ তাঁর অনমনীয় নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। ১৯৪৬, ১৯৪৭, ১৯৪৮, ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭০, ১৯৭১ সংগ্রাম আন্দোলনের প্রতিটি পর্বে তাঁর প্রাজ্ঞ ও সাহসী নেতৃত্বের অভিজ্ঞান ছড়িয়ে আছে। পাকিস্তানি শাসকদের অত্যাচার, নির্যাতনকে উপেক্ষা করে অকুতোভয়ে তিনি এগিয়ে গেছেন। এই উপমহাদেশে ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব তাঁর। মাত্র ৫৫ বছরের স্বল্পায়ু জীবনে তিনি বাঙালি জনমানসে রূপকথার মহানায়কের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, অন্যদিকে অকাল ও নির্মম মৃত্যুতে পরিণত হয়েছেন চিরকালীন শোকের প্রতীকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবনকাহিনি রচনা তাই দুরূহ এক কাজ।

এই কাজে শামিল হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট কবি, কথাশিল্পী অমিত গোস্বামী। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব-এর কলকাতার জীবন নিয়ে এ উপন্যাস রচনা করেছেন। অমিত বহুপ্রজ, সব্যসাচী লেখক। কবিতা গল্প উপন্যাসে তাঁর সমান দক্ষতা। বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তিনি হৃদয়ে লালন করেন। ইতোমধ্যে শহিদ আলতাফ মাহমুদ ও হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে তিনি ২টি উপন্যাস রচনা করেছেন। বাংলাদেশের বেদে সমাজ নিয়ে বেবাইজান নামে তাঁর একটি নৃতাত্ত্বিক উপন্যাসও প্রকাশিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে একটি অখণ্ড জীবন-উপন্যাস লেখার চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে অমিত অবহিত। সেজন্য তিনি বঙ্গবন্ধুর কলকাতার জীবনকে বেছে নিয়েছেন।

আমরা জানি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রাজনৈতিক মানস গঠনে কলকাতার জীবন বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের (বর্তমানে মাওলানা আজাদ কলেজ) ছাত্র ছিলেন তিনি। সেখান থেকে ১৯৪৭ সালে বি.এ. পাস করেছেন। ১৯৪৬-এর ভয়াবহ দাঙ্গার সময় তাঁর সাহসী ভূমিকার কারণে অনেক হিন্দু-মুসলমান রক্ষা পেয়েছে। সারাজীবন তিনি যে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির চর্চা করেছেন, তাঁর সূত্রপাত তখন থেকেই। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের উত্তাল সময় তিনি খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। সান্নিধ্য পেয়েছেন সে সময়ের বিশিষ্ট রাজনীতিকদের। বস্তুত কলকাতার জীবনকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনের প্রস্তুতি-পর্ব বলা যায়।’

মহানির্মাণ উপন্যাসে কথাসাহিত্যিক অমিত গোস্বামী সময়কে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন। দেশবিভাগ পূর্ব সময়ে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন তরুণ মুজিবের মনে এক স্থায়ী দাগ সৃষ্টি করেছিল। তিনি সেই ক্ষতকে মনের গহিনে আড়াল করে রেখে কাজ করে গেছেন মানুষের জন্য, দেশের জন্য ক্রমশ হয়ে উঠেছেন এক দক্ষ রাজনীতিবিদ।

কথাসাহিত্যিক অমিত গোস্বামীর মহানির্মাণ-এর মাধ্যমে পাঠক, বঙ্গবন্ধুর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সঠিক চিত্র পাবেন এ কথা বলা যায় নিঃসন্দেহে।

লেখক : কবি ও সাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares