একাত্তরের স্মৃতি : আমি কেন বীরাঙ্গনা হলাম : সুরমা জাহিদ

পপি রানী

সবাই আমাকে বীরাঙ্গনা বলে গাল দেয়। কেউ একবারও ভাবেনি আমি কেন বীরাঙ্গনা হলাম। আমি কি ইচ্ছে করে ধরা দিয়েছি? আমি অনেক দিন অনেক জায়গায় পালিয়ে থেকে ছিলাম। কিন্তু শেষ রক্ষা আমি পাইনি। কেন পাইনি। কেবলমাত্র রাজাকারদের জন্য। একদিন ভর দুপুর, খাঁ খাঁ করছে রোদ। এমন সময় এক দল মিলিটারি এসে আমাদের বাড়িতে হামলা করে। সমস্ত গ্রামজুড়ে মিলিটারি ছড়িয়ে ছিটিয়ে হাঁটাহাঁটি করছে। দূরে পালাবার কোনো অবস্থা নেই। তখন বুদ্ধি খাটিয়ে ঘরের চালের ওপর আমি উঠে বসে আছি। আমাদের ঘরটা ছিল দোতলা। টিন দিয়েই দোতলা বানানো। অনেক উঁচু ছিল ঘরটা। আমার মনে হলো চালটা অনেক উঁচু, তাই মাটি থেকে এত ওপরে দেখা যাবে না। তাই এই খাঁ খাঁ রোদের মাঝে মান-ইজ্জত বাঁচানোর জন্য টিনের চালের ওপরে উঠে বসে আছি। প্রায় তিন চার ঘণ্টার মতন। একে তো কড়া রোদ তার ওপর আবার টিন। আগুনের মতো গরম। তবুও বসে আছি তিন চার ঘণ্টা। যখন মিলিটারিরা চলে গিয়েছে, বাড়ি ঘরে লোকজন আসতে শুরু করেছে, তখন আমি চাল থেকে নেমে আসি। নামার পর দেখি, আমার পা জ্বলছে। আমি মাটিতে পা ফেলতে পারছি না, দাঁড়িয়েই থাকতে পারছি না। আমি পড়ে যাচ্ছি। তখন দাদি দূর থেকে দেখে দৌড়ে এসে আমাকে ধরে ফেলেন। দাদি দেখেন, পায়ের নিচে বড় বড় ফুসকা পড়ে গিয়েছে। এই পোড়া পা নিয়ে অনেক দিন অনেক কষ্ট করেছি।

আরেক দিনের কথা বলি, সেদিন মঙ্গলবার ছিল। আর কিছুই বলতে পারবো না। মঙ্গলবারটা মনে আছে, এই কারণে যে, মঙ্গলবার আমাদের হাঁট বসতো। হাঁট বসতো মূলত বিকেলে। সকাল থেকেই মানুষ হাঁটে যাওয়া শুরু করতেন। হাঁটের দিন দুপুরের পরে খুব বয়স্ক আর বাচ্চা ছাড়া গ্রামে কোনো পুরুষ ও ছেলে মানুষ থাকতেন না। সবাই বাজারে চলে যেতেন। সেই মঙ্গলবারেও ব্যতিক্রম হয়নি। মনে হয় দুইটা কি তিনটা বাজে। মূল কথা ভর দুপুর, আমি খেতে বসবো, এমন সময় শুনি, পালাও পালাও বলে একটা শব্দ। মাঝে মাঝে আবার বলছে মিলিটারি আসছে। এ কথা শুনে দাদি বলেন যা, কোথাও গিয়ে পালিয়ে থাক। কোথায় যাব দিশে বিশে না পেয়ে শোলার (পাটকাঠি) স্তূপের ভেতরে লুকিয়ে যাই। সেদিনও জানে বেঁচে যাই। তার পরদিন আবার মিলিটারি আসে। সেদিনও বাড়ির পেছনে থাকা পুকুরে কয়েক ঘণ্টা ডুব দিয়ে থাকি। আমাদের পুকুরটার চারপাশ ছিল জঙ্গলে ভর্তি। পুকুরপাড়ে সাপ আছে তাও আবার জানা। তারপরও জীবন বাঁচানোর কথা চিন্তা না করে মান-ইজ্জত রক্ষা করার জন্য পুকুরে ঝাঁপ দিলাম। আমি যখন পুকুরে ঝাঁপ দিই তখনই আমার পায়ে একটা সাপ পেঁচিয়ে ধরে। আমি সাপ ফেলব না মিলিটারিদের ভয়ে পালাব। সত্যি কথা বলতে কি, তখন বাঁচার চিন্তা না করে মান-ইজ্জত রক্ষা করা ছিল জরুরি। তাই আমি পুকুরে ঝাঁপ দিলাম। ঝাঁপ দিয়ে আমি পানির ভেতরে চুপচাপ থাকতে পারছি না। পুকুর ছিল খুব গভীর। তার ওপর এক পায়ে সাপ পেঁচিয়ে আছে। আমি একটু নড়াচড়া করেছিলাম। তখন রাজাকার চাঁন মিঞা বুঝতে পারে আমি পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছি। সে আমাকে ধরিয়ে দেয় মিলিটারিদের হাতে। তারা আমাকে তুলে নিয়ে যায় তাদের ক্যাম্পে।

এ পর্যন্ত বলার পর পপি কান্নায় ভেঙে পড়ে। সে কোনো কিছুতেই নিজেকে সামাল দিতে পারছে না। চার পাঁচ ঘণ্টার পর কিছুটা স্বাভাবিক হয়। তারপর আরও কিছু বলেন। দুইজন রাজাকার আমাকে ধরিয়ে দিয়েছেন মিলিটারিদের কাছে। আমাকে যখন ধরে ফেলেছে তখন আমি জোরে চিৎকার দিয়ে বলি আমাকে ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও। আমার চিৎকার শুনে ঘর থেকে আমার দাদি, আমার দাদির বোন আর এক চাচি দৌড়ে বাইরে আসে। তাঁরা এসে দেখেন, মিলিটারিরা আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তখন আমার দাদি গিয়ে মিলিটারিদের হাতে পায়ে ধরে কান্নাকাটি করে, আমাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য দোহাই দেয়। এক হাতে মিলিটারিরা আমাকে ধরে রেখেছে আর এক হাতে আমার চাচি আমাকে ধরে টানছেন। এমনিভাবে দু’জনেই আমাকে টানাটানি করছে। আর দাদি তাদের পায়ে ধরে রেখেছেন। এক সময় আমি, যে মিলিটারি আমার হাতে ধরে রেখেছিল তার হাতে জোরে কামড় দিই। তখন সে আমাকে ছেড়ে দেয়। আমি তখন এলোপাতাড়ি দৌড় দিই। দৌড় দিয়ে বেশিদূর আমি যেতে পারিনি। আমি পড়ে যাই। তারপর আর কিছু বলতে পারি না। যখন আমার জ্ঞান ফিরে তখন আমি মিলিটারি ক্যাম্পে বন্দি। আমার পা সাদা গজ কাপড় দিয়ে বাঁধা। প্রথমে বুঝতে পারিনি কি হয়েছে। পরে আস্তে আস্তে দেখি পা-টা নাড়াতে পারছি না। অনেক কষ্ট করে উঠে বসি। বসে দেখি, একটা ছোট ঘর। ঘরের একটা দরজা আছে, কোনো জানালা নেই। আমার থেকে একটু দূরে আরও কয়েকজন মহিলা চুপচাপ বসে আছে। আমি তাদের সঙ্গে কথা বলছি। কিন্তু তারা আমার সঙ্গে কোনো কথা বলছে না। চুপ করে বসে আছে। আমি আরও চেষ্টা করছি, শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে আমি চেষ্টা করছি পা-টা নাড়াতে কিন্তু পারছি না। অনেক ব্যথা করছে। ব্যথা সহ্য করতে পারছি না। আমি কান্নাকাটি শুরু করে দিই। তখন পাশ থেকে একজন ছোট করে বলছেন, চুপ কর। তারপরও আমার কান্নাকাটি বন্ধ হচ্ছে না। তারপর আবার বলছে, আস্তে, আস্তে। এই কান্নার শব্দ যদি বাইরে যায় তবে সবারই বিপদ হবে। এই কথা শুনে আমি কান্না থামিয়ে দিই। একটু চুপ থেকে আমি জানতে চাইলাম এটা কোথায়? জায়গার নাম কী? কিন্তু তারা কোনো উত্তর দিচ্ছে না। এমন অনেক কথাই আমি বলি আস্তে আস্তে। তারা একেবারে চুপ। আরও কিছুক্ষণ পর আমি পানি খেতে চাইলাম। তখনও তারা চুপ। আমি বারবার যখন পানি পানি করছি, তখন তাদের মাঝ থেকে একজন বলছেন, এখানে পানি নেই। এই ঘরে কোনো খাবার নেই। আমি চুপ হয়ে গেলাম।

আমি নড়াচড়া করতে পারছি না। শুধু আমার চোখ দু’টো এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। দেখছি ঘরের ভেতরের অবস্থা। খুবই ছোট ঘরটা, সরু একটা দরজা শুধু। কোনো জানালা বা ফুটা নেই। এমন ঘরতো আমি আগে আর দেখিনি। আন্দাজ করতে পারছি না যে এখন সকাল, দুপুর, বিকেল না রাত তা বোঝা যাচ্ছে না। জায়গাটাই বা কোথায়? এমন সময় দরজায় শব্দ হচ্ছে। বুঝতে পারলাম দরজাটা বাইরে থেকে আঁটকানো ছিল। খুলে কেউ ভিতরে আসছে। মনে মনে বেশ খুশি হলাম, আমার সমস্যার কথা বলতে পারবো। তখন কতই বা বয়স হবে আমার, ১৫ কি ১৬ বছর হবে। এখনকার মতো বুদ্ধি জ্ঞান তো আর হয়নি। দরজা খুলে একজন মহিলা আর একজন পুরুষ ঘরের ভেতরে ঢোকে। তাদেরকে দেখে আমি বলি, আমার পায়ে অনেক ব্যথা, শরীরে অনেক জ্বর, আমি পানি খাব। তারা একজন আমাকে পানি খেতে দিলেন। আমার পানি খাওয়া শেষ হলে আমাকে উঠতে বলেন। আমি অনেক চেষ্টা করেও উঠতে পারছি না দেখে তারা দুইজন আমাকে তুলে বাইরে নিয়ে যায়। বাইরে নিয়ে যাওয়ার পর যে দৃশ্য দেখলাম, তা দেখে আমি ভয়ে প্রস্রাব করে দিয়েছি। আট দশজন বড় বড় লোক তাদের শরীরে কোনো জামা কাপড় নেই। তাদের সবারই হাত পেছনে বাঁধা। দুই একজনের চোখও বাঁধা। তাদের শরীর দিয়ে রক্ত ঝরছে, তাজা রক্ত টপটপ করে পড়ছে। একেক জন মিলিটারি আসছে আর তাদেরকে মারছে। তাদের হাতে ধারালো একটা অস্ত্র ছিল সেই অস্ত্র দিয়ে একটা টান দিচ্ছে, আর সঙ্গে সঙ্গে শরীরের মাংস বের হয়ে রক্ত ঝরছে। আরেকজন মিলিটারি এসে তাদের সেই কাটা জায়গায় লবণ মরিচ লাগাচ্ছে। আর তারা জবাই করা মুরগির মতো ছটফট করছে, চিৎকারও করতে পারছে না। এসব দেখে আমি বেহুঁশ হয়ে যাই। একটু পরে হুঁশ ফিরে আসে। আমি শুনতে পাচ্ছি কয়েকজন কথা বলছে। অনেক পরে বুঝতে পারি আমার পা নিয়ে কথা হচ্ছে। শুনতে পেলাম আমার পায়ের অবস্থা খুব খারাপ। আরও শুনছি আমার পায়ের চিকিৎসা করা হচ্ছে যে কারণে, সেটা হলো তাদের সুবিধার জন্য। পা-টা ভালো করে বেঁধে দিলেন ডাক্তার, ওষুধও দিলেন কিছু।

তারপরের ঘটনা আর ঘটনা ছিল না। দিন নেই রাত নেই যে কোনো সময় যে কোনো বড় মিলিটারি বাইরে থেকে এলেই আমাকে নিয়ে হাজির করা হতো। আমি তো হাঁটতে পারতাম না। কয়েকজন এসে আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেত তাদের সেই ঘরে, যে ঘরে বসে তারা মদ খেতো, নারীদেরকে নিয়ে উল্লাস করতো, আর প্ল্যান করতো যুদ্ধের। একটা পা আমার একেবারেই অচল। এ অবস্থায় দিনরাত আমার ওপর নির্যাতন চালাতো।

তারা যখন আমাকে নির্যাতন করতো, তখন আমি যদি কোনো উহ্্, আহ্্ শব্দ করতাম বা নড়াচড়া করতাম তখন আরও বেশি কষ্ট দিয়ে নির্যাতন করতো। যদি তারা বুঝতে পারতো যে আমি বেশি কষ্ট পাচ্ছি তবে তারা আরও বেশি কষ্ট দিতো। আমি যখন বুঝতে পেরেছি যে, আমার কষ্টে তারা বেশি আনন্দিত হয় তখন থেকে আমি চুপ হয়ে যাই। আমি আর তাদেরকে অনুরোধ করি নাই যে, আমাকে ছেড়ে দাও, আমাকে একটু দয়া করো। এক সময় বুঝতে পেরেছি যে তারা আমাকে ছাড়বে না, শুধু শুধু তাদের কাছে অনুরোধ করে লাভ নেই।

দেশে যুদ্ধ শুরু হলো। দীর্ঘ নয়টি মাস যুদ্ধ হয়েছে। আমি নির্যাতনের শিকার হয়েছি সাড়ে পাঁচ মাস। আমার বয়সের তুলনায় আমি অনেক বেশি অসুস্থ। তারও দু’টি কারণ আছে। একটি হলো অতিরিক্ত নির্যাতন। আর অপরটি হলো পায়ে গুলি লেগেছে। সঠিক চিকিৎসা করতে না পারায় আমার পা-টা অচল হয়ে গিয়েছে। শুধু এই দু’টি কারণে আমার জীবনে আর আলো জ্বলেনি, মনে ফুল ফোটেনি। আর দশটি নারীর মতো না। সাড়ে পাঁচ মাস অন্ধকার জীবন পার করে যখন ছাড়া পাই তখন মনের ভেতরে কত আশা ভরসা নিয়ে ফিরে এলাম নিজের গ্রামে, নিজের পরিবার পরিজনের কাছে। আমাকে দেখে কেউ খুশি হয়নি। খুশি হবে দূরের কথা টিটকারি দিয়ে কথা বলে, যে দিক দিয়ে হেঁটে যাই, সেই মাটিও নাকি অপবিত্র হয়ে যায়। সেই অন্ধকারের দিনগুলোর গ্লানি আমি সারা জীবন টেনে আসছি। বাকি জীবন আরও টানতে হবে।

অনেকে আমার নিকট জিজ্ঞাসা করে, তাদের বিচার চান না। আমি বলি, আমি কার বিচার চাইবো? কতজনের বিচার চাইবো? কে কার বিচার করবে? যারা আমাকে নির্যাতন করেছে তাদেরকে আমি চিনি না, জানি না। আর কার কাছে আমি বিচার চাইবো? আমার জীবনতো শেষ কোনদিনই। আমার সন্তানেরও বয়স কম হয়নি। আর কবে বিচার হবে, আমরা মরে গেলে? যারা বিচার করার করুক। অসম্মানিত হয়ে বেঁচে থাকার যন্ত্রণা যে কত তা কি কেউ বোঝে? বোঝে না।

আমার মেয়ে বলে, ‘মা এমন জন্মের চেয়ে জন্ম না নেওয়াই ভালো। জন্ম মৃত্যু তো আর আমাদের হাতে না। মা, জন্ম যেহেতু তোমার হাতে না, তুমি তো মেরে ফেলতে পারতে। মা, তুমি তো জান, আমার জন্মের সবকিছু, তবে কেন মেরে ফেলনি। একজন ভিখারিরও একটা ঘর থাকে, বাপ-দাদার একটা ভিটা থাকে, বাপ দাদার পরিচয় থাকে। বাপ, দাদা গরিব, ভিখারি, চরিত্রহীন, লম্পট, যাই হোক না কেন, তবুও তো পরিচয় থাকতো, একটা ঠিকানা থাকতো। মা, যখন কখনও একা থাকি তখন শুধু মনের ভেতরে এসব প্রশ্ন জাগে। মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছে করে, কেমন ছিল আমার বাপ, তার কি পরিচয়? আমার বাবা কি মুসলিম, হিন্দু না খ্রিস্টান। আমি মুসলমানের জন্ম, না অন্য কোনো ধর্মের। আচ্ছা, আমার বাবা কি জানেন যে তার একটা সন্তান আছে। তার নির্যাতনের কারণে আমার মায়ের গর্ভে এসেছি আমি। আচ্ছা, বাবা নামে সেই জানোয়ারের মনে কি একবারও প্রশ্ন জাগে না যে, সে এত শত নারীর ইজ্জত নিয়ে খেলা করেছে, তাই তার সন্তান আসতে পারে বা এসেছে কি না। যখন এসব ভাবি তখন আমার মাথা ঠিক থাকে না। আবার ভাবি, যদি এমন হতো, কোনো এক সময় সেই বাবা নামের জানোয়ারটি আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলতো, আমি তোমার জন্মদাতা পিতা, কি বিচার করবে কর, আমি মাথা পেতে নিব। তখন আমি কি করবো। আমি কি তাকে তোমার কাছে নিয়ে আসবো।’

এসব আর ভাবতে পারছি না।

আমি নাকি বীরাঙ্গনা

আমার বয়স যখন ১৩/১৪ বছর তখন দেশে যুদ্ধ শুরু হয়। সেই বয়সটা প্রতিটি মানুষেরই সুন্দর মধুর থাকে। আমারও তাই ছিল যুদ্ধের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। দেশে যুদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল আমার জীবন যুদ্ধ। আমি তখন স্কুলে যাই। লেখাপড়া করি। গ্রামের সকলের সঙ্গে খেলাধুলা করি। বাড়িতে বেশ আছি। আমরা ছিলাম সাত বোন তিন ভাই। আমি ছিলাম সবার ছোট, বেশ আদরের। বাড়ির সবার ইচ্ছে ছিল আমি অনেক লেখাপড়া করবো। যুদ্ধ শুরু হলো। লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। গ্রামগঞ্জ থেকে সব পুরুষ মানুষ দলে দলে যুদ্ধে যাচ্ছে। এক সময় আমাদের বাড়ি থেকেও যুদ্ধে গিয়েছেন আমার বড় ভাই, তাঁর নাম জামাল আর ছোট কাকা, নাম ফরিদ। চাচাতো তিন ভাইসহ পাশের বাড়ি থেকে অনেক লোক যুদ্ধে গিয়েছে। আমার আব্বাও যেতে চেয়েছিলেন। ছোট চাচা বললেন, আপনি যদি যুদ্ধে চলে যান তবে বাড়িতে আর কোনো পুরুষ মানুষ থাকবে না। তা ছাড়া আপনার যে বয়স, যুদ্ধ করাতো কষ্ট হবে। (মরিয়ম আমার বড় বোনের নাম) আর মরিয়ম অসুস্থ, বাচ্চা হবে দিন ঘনিয়ে আসছে। এসব বলার পর আব্বা আর যুদ্ধে যায়নি।

দেখতে দেখতে আমাদের গ্রামেও মিলিটারিরা ঢুকে পড়েছে। আমাদের গ্রামের কয়েকটি গ্রাম পরেই মিলিটারিরা ক্যাম্প করেছে। আর আমাদের দুই তিন বাড়ি পরেই মুক্তিবাহিনীরা ক্যাম্প করেছে। যুদ্ধের প্রথম দিকের কথা। একদিন রাতের ঘটনা। আমার বোনের বাচ্চা হবে। তাই আমি আর আমার আরেক বোনসহ পাশের বাড়ির এক চাচিকে নিয়ে আমরা দাইমাকে আনতে যাচ্ছি। তখন দেখি বেশ কয়েকজন লোক একটা জায়গায় বসে কথা বলছে। প্রথমে আমরা ভয় পেয়ে অন্য রাস্তায় চলে যাচ্ছিলাম। যারা বসে কথা বলছিলেন তারা বুঝতে পেরেছে যে, আমরা ভয় পেয়ে সরে যাচ্ছি। তখন তারা আমাদের কাছে আসে এবং জিজ্ঞাসা করে, আমরা কোথায় যাচ্ছি। তখন বুঝতে পারি তারা মুক্তিযোদ্ধা। তারা আমাদেরকে সাহায্য করে। তখন দেখি ঐখানে দুই তিনজন মহিলা। আমি জিজ্ঞাসা করি এই যে মহিলা, তারা কারা? তারা উত্তর দেন, আমরা যুদ্ধ করি। তখন জানতে পারি, মহিলারাও যুদ্ধ করে। তখন থেকেই মনে মনে ভাবতে থাকি, আমিও তো যুদ্ধ করতে পারি। কেন আমি ঘরের ভেতরে বসে থাকবো। সেই রাতেই আমার বোনের একটা ছেলে হয়। এর দুই তিন দিন পর হঠাৎ একদিন আমাদের গ্রামের বাড়িতে মিলিটারি আসে এবং অনেক ক্ষয়ক্ষতি করে। আর বেশ কিছু মহিলা, যুবতী মেয়েদেরকে ধরে নিয়ে যায়। সেই দিন আমার বোনকে মিলিটারিরা নির্যাতন করে। সে তখন আঁতুড় ঘরে, দুই তিন দিন হয় তার বাচ্চা হয়েছে। এই অবস্থায় তাকে কয়েকজন নির্যাতন করে। অতিরিক্ত নির্যাতনের ফলে সেই বোনটা মারা যায়। তাকে যে নির্যাতন করেছিল তা আমি দেখেছিলাম। যখন মিলিটারিরা আমাদের বাড়িতে আসে তখন আমি আমার বোনের সঙ্গেই ছিলাম। আমি তার বাচ্চাটা কোলে নিয়ে বসেছিলাম। যখনই বুঝতে পেরেছি যে, মিলিটারি আসছে, তখন আমি ঘরের ভেতরে একটা ধানের গোলা ছিল, তার ভেতরে লুকিয়ে আমি সব দেখি।

সেই দিনই আমি মনে মনে ভাবি, আমিও যুদ্ধে যাব। একদিন আমি একা একা মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে গিয়ে বলি, আমি যুদ্ধ করতে চাই। তখন তারা আমাকে বলে, তোমাকে ট্রেনিং করতে হবে। বাড়িতে এসে আমি মাকে বলি যুদ্ধের কথা। মা রাজি হলো না। তখন সেই ক্যাম্প থেকে একদিন ইকবাল নামের একজন এসে আমাকে  খোঁজে। তখন ইকবালের সঙ্গে মায়ের কথা হয়। ইতোমধ্যে আমার বোনটাও মারা যায়। মা ইকবালকে বুঝিয়ে বলেন, আমি যদি ট্রেনিং এর জন্য বাড়ি ছেড়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যাই, তবে আমার বোনের বাচ্চাটাকে কে দেখবে? মা আমাকে যুদ্ধে যেতে দিবে না। আর আমিও যুদ্ধে যাব। এই নিয়ে মা মেয়ের মাঝে বেশ ঝগড়া হচ্ছে। একদিন মাকে না বলে আমি চলে যাই ঐ ক্যাম্পে। ঐ ক্যাম্প থেকে আমাকে অনেক বুঝিয়ে বলেন, কিন্তু তাতেও আমি রাজি না হওয়ায় ঐখানকার কমান্ডার আমাকে বলেনÑ তুমি আমাদেরকে সহযোগিতা কর। আমি জানতে চাইলাম কীভাবে কি করবো। তখন কমান্ডার বলেন, আমরা যখন যা বলবো তা তুমি করতে পারবে? আমি বলি, পারবো। তখন ক্যাম্প থেকে তারা বলেন, তুমি এখন বাড়িতে যাও, সময়মতো আমরা তোমাকে ডাকবো। আমি বাড়িতে চলে আসি। তার দুই তিন দিন পর আমাকে ডেকে পাঠান ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য। আমি ক্যাম্পে যাওয়ার পর তারা আমাকে বলেছে তারা বাজার করে দিলে আমি রান্না করে দিতে পারবো কি না। আমি রাজি হয়ে যাই। তার পর থেকে আমি তাদের রান্না করা শুরু করে দিই। অসুস্থ হলে তাদের সেবা করি। এটা সেটা ফুট ফরমাশ করি। আর বাচ্চাটাকে দেখাশোনা করি। এভাবে চলেছে প্রায় দুই তিন মাস।

এরই মাঝে গ্রামের লোকদের চোখে পড়ে যায় আমার কাজ। এ কথা কেমন করে যেন মিলিটারিদের কান পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। একদিন ভর দুপুর। আমি গোসল করতে যাচ্ছিলাম পুকুরের দিকে। হঠাৎ করে কোন দিক দিয়ে যেন একদল মিলিটারি এসে আমাকে ঘিরে ধরে। আমি তো ভয়ে দিশেহারা। এখান থেকে আমাকে তুলে নিয়ে যায় স্থানীয় ক্যাম্পে। ক্যাম্পের  ভেতর নিয়ে আমার চোখ এবং হাত বেঁধে ফেলে। তারপর সারা রাতভর চলে আমার ওপর অত্যাচার নির্যাতন। পরদিন সকালে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় অন্য জায়গায়। তখনও আমার চোখ হাত বাঁধা। পরনে কোনো কাপড় ছিল না। অনেকক্ষণ গাড়ি চলেছে। তারপর আমাকে নামানো হয়। হাত চোখ বাঁধা অবস্থায় একটা ঘরের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। কে বা কারা আমার চোখ খুলে দিয়েছে তা আমি বলতে পারবো না। চোখ খোলার পর বেশ কিছুক্ষণ পর্যন্ত আমি কিছুই দেখতে পাইনি। পরে যখন দেখতে পেলাম, তখন দেখি আমি একটা ঘরের ভেতরে। পরে জানতে পারি, এটা যশোর জেলখানা। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত সেই জেলখানায় বন্দি ছিলাম। যশোর যেদিন মুক্ত হয়েছে সেই দিনই আমি ছাড়া পাই। যশোর মুক্ত হলে মুক্তিবাহিনীরা জেলখানার গেট খুলে দেয়। তখন আমরা সবাই বের হয়ে আসি। যত দূর মনে পড়ে, সন্ধ্যার দিকে জেলখানার গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। আমরা বের হতে হতে কিছুটা রাত হয়ে যায়। তাই আর বাইরে বের হয়ে কোথাও যেতে পারিনি। আমার সঙ্গে আরও চার পাঁচজন ছিল। সবাই আমরা রাস্তার পাশে বসেছিলাম।

যখন আমি ছাড়া পেয়েছি তখন আমার পরনে ছিল একটা পাঞ্জাবি। আর কোনো কাপড় ছিল না। জেলখানা থেকে  বের হয়ে দেখি অনেক শীত। সারা রাত রাস্তায় বসে থেকে রাত পার করি। সকালে আলো ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দেখি, শত শত মানুষ। আমরা বাড়িতে যাব। আমাদের হাতে কোনো টাকা পয়সা ছিল না। তখন আমরা হাঁটা শুরু করি। ঠিক  মতো হাঁটতে পারছিলাম না। আমার ওপর অতিরিক্ত নির্যাতন করা হয়েছিল। অতিরিক্ত নির্যাতনের কারণে আমার ভেতরে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিছু দূর যাওয়ার পর আমি আর হাঁটতে পারছিলাম না। তখন আমাকে একজন দুই টাকা দিয়েছিলেন। সেই টাকা দিয়ে আমি বাড়িতে যাই।

মনে বড় আশা নিয়ে আমি আমার বাড়িতে যাই। বাড়িতে গিয়ে দেখি, বাড়ি ঘর বলতে কিছুই নেই। আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। খালি ভিটা পড়ে আছে। কেউ বলতে পারে না আমার বাড়ির লোকজন কোথায়। তারপর আমি আমার এক ফুপুর বাড়িতে যাই। সেই বাড়িতে আমাকে রাখেনি। তারপর আরেক ফুপুর বাড়িতে যাই, সেখানেও আমাকে রাখেনি। দুই ফুপুর বাড়িই ছিল আমাদের বাড়ির কাছাকাছি। তখন রাত হয়ে গিয়েছে। আমি আবার আমাদের বাড়িতে ফিরে আসি। তখন অন্ধকার নেমে এসেছে। আমি পাশের বাড়িতে গিয়ে একটু আশ্রয় চেয়েছিলাম। আবার কিছু খাবারও চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা আশ্রয়-খাবার কোনোটাই দেয়নি। আমাকে গালি দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে। তখন আমি কোথায় যাব। কোথাও আশ্রয় না পেয়ে সেই রাতটা সেই বাড়ির গরুর ঘরের ভেতরে থাকি। সকালে সবাই ওঠার আগেই আমি গ্রাম ছেড়ে চলে আসি।

আমি তখন আমার নানার বাড়িতে যাই। নানি আমাকে আশ্রয় দিয়েছে ঠিকই। কিন্তু বাড়ির অন্যেরা চাচ্ছে না আমি তাদের বাড়িতে থাকি। তখন নানি আমাকে তার বাবার বাড়িতে নিয়ে যায়। নানি আমাকে সে বাড়িতে রেখে আসে। নানি চলে আসার পর সে বাড়ির লোকজন আমাকে রাখতে রাজি হলো না। তারা বলেছিল, তোমাকে কয়েকটা টাকা দিই, তুমি টাকা নিয়ে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাও। আমরা চাই না তোমার জন্য আমরা সমস্যায় পড়ি। তুমি যদি এখানে থাক তবে অনেক অশান্তি হবে। শুধু শুধু অশান্তি হোক তা আমরা চাই না। তখন আমি কোথায় যাব। আমি হাঁটবো কীভাবে, আমি তো সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারি না, কীভাবে হাঁটবো। আর কোথায়ই বা যাব। তারপরও উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে থাকি। আমার অবস্থা দেখে একজন আমাকে পরামর্শ দিলেন, যদি তুমি বাঁচতে চাও দেশ ছেড়ে চলে যাও। তোমার মা-বাবাকে যদি ফিরে পাও তার পরও তারা তোমাকে আশ্রয় দিবে না। তার চেয়ে ভালো তুমি দেশ ছেড়ে চলে যাও। এক সময় আমিও চিন্তা করে দেখি, সে ঠিক কথাই বলেছে। দেশ ছেড়ে চলে যাওয়াটাই ভালো। তারপর লোকজনকে জিজ্ঞাসা করতে করতে আমি ভারতে চলে আসি। ভারতে গিয়েই একটা আশ্রয় খুঁজতে থাকি। প্রথম প্রথম কয়েকদিন রেল স্টেশনে থাকি।

 লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares