কবিতা

নাদিয়া জান্নাতের কবিতা
জঙ্গলে বর্ষাযাপন
বর্ষাকালে জঙ্গল দেখেছি কিন্তু জঙ্গলে বর্ষা দেখি নাই। বর্ষাযাপনের জন্য নীরবতা দরকার। বনের সুডৌল পথ ঘাট, হাত-পা ছড়ানো অন্ধকার রং অনভ্যাসে কতটা দুর্গম তা আজ শুনলাম। শুনতে শুনতে একটা আয়েশি অজগর কানের পাশ দিয়ে হিসহিস করে চলল, আর আমরা জড়োসড়ো হয়ে উঠে গেলাম। তীব্র ভয়ের এই বোধ এটা মূলত কল্পনায়। জানলাম হাতির মতো অজগর সাপও তুমুল স্মার্ট। হাতি এবং সাপের আধুনিকতায় আমার আগ্রহ নাই।
আগ্রহ একটি স্বাধীন শব্দ। স্বাধীনতা শব্দটি জৈবিক ও আদিম। আদিম সমস্ত কিছুই আধুনিক। অচিন জঙ্গলে একটি আধুনিক বর্ষা আমার দেখা হয় নাই। বর্ষা ভাবলে আমি ভাবতে পারি মৃত কোনও বাড়ি, সাদা কাপড়ে জড়ানো ভারী কোনও বাতাস, যে বাতাসে দপ করে নিভে যাবে পিদিম।
হৃদয়াক্রান্ত শিহরণ এবং ঘন ঘন ক্রন্দন, এরা সাংকেতিক। সাংকেতিক ভাষা উপেক্ষা করে যারা বর্ষায় ডুবে যায় তারা ভাগ্যবান।
.
রন্ধনপ্রণালী
আমাদের দুইজোড়া লোভাতুর চোখ চিংড়ি রান্নার দিকে এক নাগাড়ে তাকিয়ে আছে। চিংড়িগুলো আগুন পেয়ে থকথকে লাল এখন। চুরাশি হাজার রঙের ভেতর থেকে এই মুহূর্তে মালাইকারির রং আমাদের সবচেয়ে পছন্দ। লবণ-হলুদ খাঁটি দুধের সাথে মিশে থকথকে হয়ে যাওয়ায় তার ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র।
আমরা এখন দোটানায় ভুগছি। রান্নাঘরের জানলা থেকে অপ্রতিহত সবজির বাজারটাকে দেখছি বারবার। মাছ রান্না শিখতে চাইলে একটু চতুর হতে হয়। বাঁধভাঙা অপরাহ্ণে আমাদের মুখে হাসি লেগে ছিল। তীর্থপথে ছড়িয়ে ছিল মালাইকারি।
রাত নামলে, পরস্পরের প্রতি কুশলতা নিয়ে আমরা আমাদের রান্নাঘরে ফিরতে চাই।
—- —- —-
অলভী সরকারের কবিতা
দোলাচল
ছেড়ে দিয়ে বসে আছি সমৃদ্ধ সুরম্য সময়;
ক্ষমায় ক্রমশ ক্ষমতাহীন হয়েছে মানুষ।
বাচালতা পাখিদের দোষ কি না জানে না শস্য
অথবা বিপন্ন শাখার শোরগোল। বাতুলতা
কতটা বর্ণবাদী ? মহুয়ামথিত মুদ্রাদোষে,
বিদ্বেষে বিকোয় মগজ ও শরীর। কবিদের
মৃত্যুর পর খেরোখাতা অমরতা পায় নাকি ?
জনান্তে জেগেছে জোনাকি, ফুরিয়েছে সবুজাভ
রাত্তির। অপঘাতে বৃক্ষের জীবনাবসানের
ইতিহাস অলিখিত রয়েছে বলে মহিরুহ
মহোৎসবের সমার্থক সৎকারে পায় না
সমাধি। চতুর্দশপদী কবিতার দুর্নিবার
দ্ব্যর্থক বিস্ময় তোমাকে শহরের উপকণ্ঠে
টেনে-হিঁচড়ে আনে। বহেড়া পাতার ব্যবধান
অবিশ্বাসে হতে পারে দুর্ভেদ্য স্ফটিক দেয়াল।
হতেই পারে! আমরা দাঁড়িয়ে আছি দোলাচলে,
মাঝখানে বায়বীয় দুরতিক্রম্য অন্তরায়।
দৃষ্টিতেও রয়েছে বাধা! রয়েছে কি ? নাও যদি
থাকে, মনে মনে অচেতনে কতটা অগ্রগামী
শিরদাঁড়াপরিত্যক্ত বিভক্ত মানবসন্তান ?
দু-এক পা এগিয়ে কয়েক পা পিছিয়ে যাওয়া
আমাদের সভ্যতার শোভা। সমস্ত পুড়ে যাক!
ক্ষুধা আর লোভের মুক্তি চায় খাণ্ডবদাহন;
পোড়ো জমিতে কাল ইন্দ্রপ্রস্থের গোড়াপত্তন।
.
কোতোয়ালি থানা
তিন রাস্তার মোড়ে তোমাদের বাড়ি,
তিন বাড়ি দূরে গেলে কোতোয়ালি থানা।
জেব্রা ক্রসিংয়ে পার হই আড়াআড়ি,
তোমার বাড়ির পাশে সুতো কারখানা।
রং মেলে বসে আছে রকমারি আঁশ,
বাতাসে উড়ছে ক্ষীণ ক্ষতি ও ক্ষরণ,
জানালা খোলাই আছে ? ফেলি নিঃশ্বাস।
তোমাকে দেখার কোনও না থাক কারণ!
কে হাঁটে তোমার দিকে ? কে গাইছে গান ?
তাকিয়ো না ভালো ছেলে, এ নিষিদ্ধ ভূমি!
পণ রেখে আড়চোখে হও নিষ্প্রাণ,
কী লাভ বাড়িয়ে বলো বিপুল সুনামি ?
এড়িয়ে হট্টগোল, গাদাগাদি ভিড়
সাদা ক্যানভাস দেখি আড়ালে আড়ালে;
কিসে যে কখন তুমি হও অস্থির!
আহা, সব এলোমেলো অগোছালো ছেলে!
তোমাকে সামনে পেলে দেব খুব বকে।
পাহারায় বসে আছি ভালো নয় সেটা!
হিংসুটে নাম দেবে ও পাড়ার লোকে,
সরিয়ে রাখোনি কেন স্কেচের খাতাটা ?
এত বেখেয়ালি হলে শনি-রোববার
দুষ্টু প্রেমিকা এসে দিতে পারে হানা।
আগেভাগে টুকে রাখো ফোন নাম্বার;
তিন বাড়ি পরেই তো কোতোয়ালি থানা!
—- —- —-
সুমন শামসের কবিতা
মানুষ বেচার এজেন্সিতে মন বিনিয়োগ
মানুষকে ভুলতে হলে বিক্রি করে দিতে হয় তাকে।
ছটাক লিটার কেজি বা সেরে।
নাইনটি নাইন অথবা হরেক মাল হরেক দামে।
ঠিকায় কিংবা নিলামে।
বেচে দিতে হয় একটা সম্পূর্ণ মানুষকে স্মৃতির দামে।
শক্ত চোয়াল এই মানুষের বাজারে বেচে দিতে হয় মানুষকে,
প্রত্যাশা দিয়ে দুঃখ কিনে।
তবু আমি মানুষ বেচি সতেরো শতক অভিমানে।
মানুষ বেচার এজেন্সিতে আমার শুধু মন বিনিয়োগ।
মানুষ যেজন মাড়িয়ে গেছে পথ বেপথে চোখের শহর,
বেচব যে তার পায়ের আওয়াজ। বেচব আমি
ভুলে যাওয়া মানুষটাকে জুয়ার চালে জিতে গিয়ে।
মানুষ বেচার এই বাজিতে আমার আঙুল ব্যর্থ তো নয়।
মানুষ বেচার স্বভাব আমার চিরদিনের।
মানুষ বেচে দুঃখ কিনি রোজই আমি সুখ বিকিয়ে।
.
মেসার্স শোক স্টোর্স
শোক বিক্রি হয় এখানে।
কড়া লিকারে মেশানো হয় মানুষের অনুপস্থিতি।
স্মৃতির চিনিতে টুংটাং বাজে চামচের অনুনাদ।
বিপন্ন ঘুঙুরের কান্নার মতো।
মেনু লিস্টে এখানে পাবেন বিভিন্ন শোক ও শূন্যতার দাম।
পার্সেলে হোম ডেলিভারিও দেওয়া হয়।
আত্মহত্যা ও অ্যাকসিডেন্টের শোক, গুম ও খুনের শোক,
ধর্ষণ ও নির্যাতনের শোকসহ
সব শোকে আপনি পাবেন ধামাকা অফার।
ডাউন পেমেন্টেও পেতে পারেন আপনার পছন্দের শোক।
একটি কিনলে একটি ফ্রি, তাও পাচ্ছেন।
আসুন আমাদের সুলভ মূল্যের মেসার্স শোক স্টোর্সে।
—- —- —-
ফিরোজ শাহর কবিতা
তার দেহাবশেষ
১
ক. আত্মাহুতি
মাটির চুলা বানিয়ে
কুয়াশা জ্বাল দিচ্ছে মা
লাকড়ি
ফুরিয়ে গেলে
কেটেকুটে প্রস্তুত রাখে নিজেকে
খ. হিমালয়
আইসক্রিম
হাতে নিয়ে
মেয়ের কাছে
দৌড়াতে দৌড়াতে গলে যাচ্ছে বাবা।
গ. কাঠঠোকরা
কাঠঠোকরার
বানানো সুড়ঙ্গপথে বাদামি রঙের বেদনা
পিঁপড়েদল
মুখে করে
নিয়ে যাচ্ছে গাছের টুকরো টুকরো হৃদয়।
ঘ. দর্পণ
বৃষ্টির ফোঁটার
সামনে
ঝরে পড়ে মুখ
আয়না ফেটে বেরিয়ে আসে একটি আকাশ।
.
২
ক. জলপাখি
ডাঙায়
পালক রেখে
ডিমের ছায়ায়
সাঁতার কাটে হাঁস।
খ. উধার
পাশাপাশি
দুটি চুলা
একজন
অন্যজনকে আগুন ধার দিচ্ছে
পাতিলে
ফুটছে ভাত…
গ. জন্মঘর
দেহের
রান্নাঘরে
সেদ্ধ হচ্ছে মানুষ
সব দৃশ্যে কুয়াশা
খাদে পড়ে যাচ্ছে বাস।
ঘ. প্রস্থান
তোমার
প্রস্থান ঠেকাতে
ঘুমের সময়
বিছানার পাশে
শরীর থেকে
খুলে রাখি চোখ।
—- —- —-
অরবিন্দ চক্রবর্তীর কবিতা
ভারচ্যুতি
জীবৎকাল, তুমি, সিলভিয়া প্লাথ
এবং এক ডজন ডাক্তার
মৃতের সংখ্যা কি ফুরোয়?
জ্বর উঠল, তুমিও
এলে দেহের ভেতর ঈর্ষা-সহচর
ভীষণ কল্লোলের আলে গিয়ে
দাঁড়ালাম―ফোটে নিরোগ
তাজা পেনিসিলিন ছিটকে
ধমনি-অতিরিক্ত একার নৃত্য
ওইদিন অ্যাম্বুলেন্স এল
সঙ্গে, বাহ্বা-ফেরত এক প্লাটুন চিকরিচামিলি
বৃত্ত কেটে নাম বেরিয়ে গেল―
মুর্দাফরাশ
পৃথিবীর ভেতর-বাহিরে এত নিরাময়কেন্দ্র!
অথচ, অবসাদের জন্য কোনও যাত্রী-ছাউনি নেই!
ওদিক রক্ত ভাঙে সাইরেন-জ্যামিতিক।
তরঙ্গঘোড়া
তরঙ্গ করা ঘোড়া বাঁক নেয়―
দিকে ভেক্টর
ক্রোধ অভিমুখ
পাশেই―গ্যালারি ও পাইনবন
একাকার
এবং
খুব ঝঞ্ঝা ও ভীষণ সমুদ্র
পার্শ্বসকল তাড়িত, মগ্নও
এমন
দুর্বিনীত ঘোড়া তোমার কাছে দ্বিপিতৃক
কোনটি ডার্বি জিতবে ?
রঞ্জক জানে কে ঢেউ তৈরি করে বাঁচে!
—- —- —-
স্নিগ্ধা বাউলের কবিতা
ফিরে গেলে মন কথা বলে
বৃষ্টিরা কথা বলতে পারলে
আমি কবিতা লেখা বন্ধ করতাম…
বৃষ্টিরা কাঁদতে শুরু করলে
আমি হেসেই কুটিকুটি হতাম
বৃষ্টির বৃহস্পতিবার এলে
আমি খিচুড়ি বসাতাম
বৃষ্টিরা রাতে এলে
আমি এসি বন্ধ করতাম
বৃষ্টিরা সকালে এলে
জানালায় চোখ পেতে দিতাম
দুপুর কাঁপিয়ে বৃষ্টি নামলে
বইয়ের পাতায় ডুবে যেতাম
স্বপ্নে বৃষ্টি এলে শৈশবে ফিরে আমার মন
অতীতের ঘরে বসে থাকে পরিবার
যৌথ দেশলাই বাকশের মতো শলাকায়
বাড়ন্ত বৃষ্টিতে নামছে ভবিষ্যতের একাকীত্ব―
বৃষ্টিতে নেমে আসছে আমার দুঃখ
রোদের বিপরীতে ভাসছে রংধনু
প্রতিদিনের বৃষ্টি দেখা যাচ্ছে না আয়নায়,
ঘোলাটে বর্ষা জ্বলে যাচ্ছে বাহানায় বাহানায়…
.
শুকনো পাতার জীবন
না থাকার ম্লেচ্ছতায় শিকড় ছুঁইতে চায় শুকনো পাতাগুলো; ঝিনুকের বিবমিষা জমিয়ে রাখি আমি; মুক্তার প্রদাহে কারও না থাকাটা তো শবাহারী―মৃতদের মতো অস্পৃশ্য আর ফেরার আতঙ্ক বয়ে বহুকাল সবাই।
না থেকে জেনেছি নিজের গান আর কান্নায় ভেঙে পড়ছে জীবন! পৃথিবীরে বাঁচাতেই আমাদের না থাকা প্রয়োজন।
—- —- —-
—- —- —-
রিমঝিম আহমেদের কবিতা
বুনো আঠালির গান
তোমাকে কিছুটা দিই যে জল নিয়ত করি পান
আমার পথের কিছু তোমাকেও দিয়ে হাঁটি রোজ
ফুটে থাকা কিছু ফুল মালা গেঁথে পরাই তোমাকে
যা আঁকি সকালরাত্রি, অন্যমনে কথার ত্রিভুজ
তুমি নাই, নাকি আছো থাকা আর না-থাকা মিশেলে ?
এই ভ্রমে দিন কাটে পাখিরাও দেয় কুমন্ত্রণা
অঘুমের পাদদেশে ঝরে যায় স্বপ্নকুঁড়ি, পাতা
স্তব্ধ হাওয়া লেগে আছে, সারা গায়ে গোধূলির ফণা
নিকষ আয়ুতে রেখে নির্জীব চোখের হাহাকার
তোমাকে-আমাকে বাঁধে এ বিশ্বসংসারপারাবার
.
অসমাপ্ত জন্মের ছাই
এখন শিশিরের সময়। প্রার্থনার চেয়ে গভীর নৈঃশব্দ্য। চোখ বুজলেই দেখি, শেকড়েরা মাটি ছেড়ে নির্বাসন শেখে। পাথরে পাথরে জমে ওঠে অসমাপ্ত জন্মের ছাই।
কত উপনিষদ ঘুমিয়ে থাকে ঘাসের নিচে, কত পাখিডানা ছুঁয়ে যায় ঋতুর অব্যক্ত শরীর। তবু মানুষ কি কখনও নিজের ভেতর এক মুঠো বসন্ত ফলাতে পেরেছে ?
—- —- —-
পিয়াস মজিদের কবিতা
দিকশূন্যদুপুর
বেশ কুয়াশা লালমনিরহাটে
ডিসেম্বর যেহেতু
মেইন শহরে ঢুকতে মোস্তফী বলে একটা জায়গা পড়ে
কিন্তু তাই বলে সুবিনয় মুস্তফীর কথা মনে আসে না মোটেও
বরং কবি নাদিয়া জান্নাতের নাম ভাসতে থাকে মনে
নাদিয়া বন্ধু, লালমনিরহাটে থাকে
লালমনিরহাট নাদিয়ায় থাকে
ধরলা নদী ধীর
নাদিয়ার ছেলে আরণ্যক মেঘমল্লার অস্থির
সে জন্মেছে দুই বছরের একটু বেশি হলো
মৃত্যুসংবাদ আসে মেঘের মতো হঠাৎ
বৃষ্টির সম্ভাবনা নাই আকাশে
নতুন বেগুন আর ফুলকপি আছে খেতে
বিশ্রামরত বাছুরপ্রতিম একটা দুপুর
ছোট ছোট ছাগল দেখে
আনন্দ-আকুল নাদিয়ার পুত্র আরণ্যক মেঘমল্লার,
ধ্রুপদ তার ডাকনাম
টিউবওয়েলের পানি, বোতলের পানি, নদীর পানি
এক লালমনি, কত রকম পানি!
রেলস্টশনে পাতা ঝরে আছে
সবুজ আর হলুদ
আরও শুকিয়ে যাবে
লালমনি ও দুনিয়া ছাড়তে হবে
ট্রেনে লালমনিরহাট ভিড়বে কমলাপুরে
দুপুরের রোদ আর ছায়া মরে যায়
গির্জায় গোধূলি ধাক্কা খায়
লাল লাল কত গির্জা লালমনিরহাটে
ক্রিসমাস আসছে
প্রভুর মহিমা ছড়াবে দিক-দিগন্তরে
নাদিয়া ও আরণ্যক স্বমহিমায় লালমনিরহাট রয়ে যায়
একটা বাস রংপুরের দিকে মোস্তফীতে থামবে
কেউ কেউ নামবে সেখানে
কেউ আবার কাউনিয়ায়
বেশির ভাগই রংপুরে ঢুকবে
লালমনিরহাট ক্রমশ কুয়াশায় ঢেকে যাবে।
.
স্বপ্নের চুমু বা চড়
[সাজিদ-কে]
একটা অ-লেখা কবিতার কাছে
অসহায় ঝুঁকে থাকি,
অক্ষরের অভিশাপ থেকে ছিটকে আমি
সূর্যের ধারণা জন্মের
কিছুক্ষণ আগে
তোমার ভেতর তৎপর
চাঁদ হতে না পেরে
দেখেছি হয়তো,
নারীর বেশি
এলোচুলের নদী।
ঝড়ের আগে বয়ে চলা
ঝড়ের আঁধার
আমাকে কোলে করে
নাচের ক্লাস তছনছ শেষে,
লতায়-পাতায় ঘনিয়ে থাকা গানে ঝুলে থাকছি কাল-আবহমান।
—- —- —-
চামেলী বসুর কবিতা
বহুমাত্রিক দ্বিধা
তুমি এই সময়ের বহুমাত্রিক দ্বিধা
হয়তো তোমার আয়ুধ শরীর জুড়ে
শুয়ে থাকে চৈত্রের মাঠ;
ভাপ উঠা ঊষর সকাল―
তুমি
জালছেঁড়া অগণন মাছের
ডানাভাঙা রহস্যের হাহুতাশ বেচে
ঘরে ফেরো ক্লান্ত বিকেল সমেত!
হয়তো তোমার চোখে
জ্বলে ওঠে দুরারোগ্য ক্ষুধা
পতিত প্রেম―
তুমি অবনত হও
শিরদাঁড়া সংকলনে-প্রচ্ছদে-জল রঙে ডুবে যাক
শীতল সরীসৃপ অথবা বালিকার গলিত ঊরুর সাবলীলতা।
.
বিভ্রম
পাতা উলটাতেই দেখি বিবর্ণ সে মুখ―
স্মৃতির ক্ষয়িত রেখা আঁকড়ে আছে
ভাস্বর অক্ষর
প্রবল শীতে
সে এসে দাঁড়ায় নতজানু
কার্মাত ঠোঁটে জাগে ভোরের শিশির
সময়ের কবরে আঁকি বিভ্রম আখ্যান―
তুমিই সে ধারলো পালক
এ হৃদয় উপড়ে দেখো
কতটা কেটেছো আড়াআড়ি
মনকাটা দাগ।
—- —- —-
ডালিয়া চৌধুরীর কবিতা
কোথায় তারে বসাই
বিকেল কড়া নেড়েছিল দরজায়
অপ্রস্তুত আমি খুলিনি,
আলোটা কৃষ্ণচূড়া লালে
এমনভাবে দখলে রেখেছিল
কোথায় তারে বসাই,
সন্ধ্যা গাঢ় হলো বাইরের দরজায়।
রক্তিম আয়োজনের ঘনীভূত রোদ
ছড়িয়ে করিডোরে,
দূরবর্তী জীর্ণ বনের ভারী আওয়াজ
বাতাসে ভেসে অব্যর্থ দীর্ঘশ্বাসে
দীর্ঘ পরিভ্রমণ শেষে
সময়ের রঙে গোধূলির জটাজালে,
প্রতিধ্বনিময় অতীতের উন্মাদনায়
বিষাদ বেজে ওঠে বুকের গিটারে।
বিকেল কড়া নেড়েছিল দরজায়,
শূন্যতার মতো আকাশ ধরে
বিস্তৃত নীলের ব্যথিত আবহে
অপাঙ্ক্তেয় এত সব সরঞ্জামে
কোথায় তারে বসাই,
সন্ধ্যা গাঢ় হলো বাইরের দরজায়।
.
নীল
সাগরের মতো তোমার শরীরের
ভাঁজে ভাঁজে নীলের চলাচল,
তোমার হৃদয় আকাশ নীলে
মেঘ জল জ্যোৎস্না, সূর্যের ওঠা ডোবা।
আমি দেখেছি তোমার চোখে
নীল প্রজাপতির ওড়ে চলা
ঠোঁটের প্রলেপে নিষিক্ত নীল শিশির,
যদি তোমায় বলে ডাকি নীল।
যদি চাই আর একটু প্রশ্রয়,
আঙুলের তারে প্রণয়ের সেতারে
তৃণ গুল্মলতা দ্বীপের নীলে
ঘর গৃহস্থালি জীবনের আশ্রয়,
যদি নিশ্বাসের উষ্ণ নির্যাসে
স্পর্শের এলানো চুলে
মগ্ন হতে চাই দিনলিপি পাঠে।
যদি ঘ্রাণ নিতে চাই নীলকণ্ঠীর,
ফুলের পাপড়িতে মুখ ঘষে ঘষে
যদি নিজেই হয়ে যেতে চাই নীল।
—- —- —-
মাহফুজা অনন্যার কবিতা
পাথেয়
ঘৃণাকে কখনও ব্যাগে তোলা হয় না
প্রতিশোধকেও রাখা হয় না ভ্রমণমানচিত্রে
তবু জীবন―
এক অদ্ভুত স্টেশনমাস্টার
ছেঁড়া টিকিটের পেছনে লিখে দেয়
কিছু কালো ধূমকেতুর ঠিকানা।
পথের ধুলো জানে
আলো একা হাঁটতে জানে না;
তারও প্রয়োজন হয় অন্ধকারের ভাঙা লাঠি
তাই কিছু বিষ, কিছু ক্ষত, কিছু দহন―
পকেটে নয়,
সময়ের গোপন সেলাইয়ে লেগে থাকে;
আর মানুষ,
নিজেরই ছায়ার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে দিতে
দূরের কোনও করুণ নক্ষত্রে ক্ষমার ভাষা খুঁজে নেয়!
.
করাতকল
মানুষ―যেন করাতকল
স্পর্শের কাঠে ধার শানায়
ফিরে আসে কেবল
করাতের গুঁড়োর মতো হৃদয়―
অরণ্য তখনও নির্বাক
শুধু ভেতরের পাখিরা বাসা বুনতে ভুলে যায়!
মানুষের মুখ―চলমান করাতের দাঁত
বিশ্বাস; কাঠের শিরায় আটকে থাকা শেষ সবুজ
মানুষের সান্নিধ্য―অদৃশ্য চেরাইঘর;
ফিরে আসে শুধু
করাতের তলে গুঁড়ো হয়ে যাওয়া হৃদয়ের খণ্ডঋতু।
মানুষের প্রেম―অবিকল করাতকল
ভুল বানানে মায়া সেখানে
পাতলা তক্তায় পরিণত হয়
আর রক্ত, শরীর―
শুধু বার্ষিক বলয়ের হিসাব রাখে।
—- —- —-
অতনু তিয়াসের কবিতা
২১ জুলাই মাইলস্টোন
বুকের ভেতর দাউ দাউ জ্বলছে আগুন!
হাপর চালিয়ে সে আগুন উসকে দিচ্ছে কেউ।
বারবিকিউ হয়ে যাচ্ছে আমাদের স্বপ্ন!
আর সানন্দে নৈশভোজ সেরে পরম তৃপ্তিতে
কোমল পানীয়তে চুমুক দিচ্ছেন সদাহাস্যোজ্জ্বল মহাজন!
ঘাতক জুলাই, চৈতন্যের বাগান থেকে এইসব ঝরে যাওয়া
আধফোঁটা ফুলেদের নাম মুছতে পারবে না কখনও
পুড়ে যাওয়া হৃদয়ের চির হাহাকার
প্রতিধ্বনিত হবে অপার্থিব ছায়ায় ছায়ায়
বিস্মৃতিপ্রবণ এই বাংলার প্রান্তরে
বিক্ষত পোড়া মুখে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকবে
বোবা আর্তনাদের মতো একটি মাইলস্টোন।
.
প্রস্থান
একে একে যাচ্ছে সবাই চলে
খুব নীরবে কোনও কিছু না বলে
কেউ আগে যায় কেউ বা কিছু পরে
আমিও একদিন যোগ দেব সেই দলে।
মায়া-মমতা, ভালোবাসা, প্রীতি, স্নেহ
কোনও বাঁধনেই বাঁধা থাকে না কেহ
হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি অহরহ
সবই ফুরায় লীন হলে এই দেহ।
সারা দিনমান হা-পিত্যেশ, সংগ্রাম
ব্যস্ত ছোটাছুটি দিবস-যাম
যতই ব্যর্থ যতই সফলকাম
আমিও হব মুছে যাওয়া এক নাম।
—- —- —-
সাকিরা পারভীনের কবিতা
হত্যাকারীরা নিকটেই থাকেন
না
আমার লজ্জা করে না
ঘাসফুলের দোহাই দিয়ে বলছি
নদীর আলুলায়িত প্রবাহের কোনও লজ্জা নাই
ফুলপদ্মরাগে জড়ানো মিশ্রিত সজ্জায়
লজ্জা নাই
অগুনতি নক্ষত্ররচিত কালপুরুষের
কোনও লজ্জা নাই
ছায়াপথে কোনও দাগ নাই
আমার লিবাস ভরা পরিমল
আর অনাহার
অনাগত সন্তানকে হত্যা করার পর
আমার ভাতের থালায়
দিগন্ত বিস্তৃত অনাহার
আমি পেট ভরে ভাত-ভুত খাই
টের পাই
হত্যাকারীরা নিকটেই থাকেন
.
নামানুষ
আজ
বসে আছি দুপুর মাথায় নিয়ে
দুপুরের একচিমটি নান্দনিক ঘ্রাণ
রোদের একটা বিহ্বলতা
বসে থাকার আনন্দন, মীড়
দুপুরী ফুলের রেহায় হুহু… ঢুকে পড়েছে কাদা
পরাগায়িত সবুজ গমক্ষেত ধেয়ে আসছে পরাজিতদের দিকে
থোকা থোকা মধুমঞ্জরীও এদিকে ওদিকে
উদালের রক্তলাল খাদে মিহিকালো বীজগুচ্ছের দিকে
উড়ে আসছে এক বা ততোধিক মুণ্ডুুহীন পলাশের বন
আমার চোখ খুবলে তুলে নিয়ে গেল
একটি উড়ন্ত র্যাটলস্নেইক
স্টেশন মাস্টারের বাঁশি চুরি গেল
আমার ছোট্ট ময়না পাখিটার ননীদেশে
হেসে খেলে পানের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে মানুষ
আমি চোখের মাথা খেয়ে বসে আছি
আমি আর কিছু দেখতে পাচ্ছি না মানুষ
হাতুড়ির বাড়িতে থেঁতলে যাচ্ছে মাথার খুলি
সারি সারি মৃত ডলফিন
ঘিরে ধরেছে আমার নৌকার গলুই
ডুবে যাচ্ছে স্রোতে আমি আর কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না
আর যাই হই আর কোনওদিন মানুষ হতে চাচ্ছি না
—- —- —-
ঋষিণ দস্তিদারের কবিতা
জামগাছ
রাস্তার একপাশে স্কুল
দেয়ালের ভেতরে বাইরে ছায়াময়
রাস্তায় ঝরে পড়ছে জুন মাস
ঝরে যাচ্ছে পাতার স্বপ্ন
পুতিজামের বেগুনি মন দিনরাত
সুনসান ক্লাস ব্ল্যাকবোর্ডে খসখস চক
কান ধরে এক পায়ে, বারান্দায়
মেধাকে ভেঙচি কাটছে ক্লাস-সিক্স
কালো পিচ খানিক রঙিন হবে―
এই অধিকার দাবি করছিল
প্রজাপতি মুথা ঘাস নরম পাথর
নেভি-ব্লু ট্রাউজার শার্টে বেগুনি দাগ
একপেয়ে ক্লাস-সিক্স আজও
সেই ছায়ার ঈশ্বর।
.
উজ্জ্বলতা
টুথপেস্ট যেটা বাছলেন
লাল সবুজ নীল অথবা জেল
যেমনই হোক টুথব্রাশ-সোজা অথবা বাঁকা
বাহারি কেতার নয়তো সস্তা দর
ফেনা তো শেষ অবধি একই, সেই সাদাই!
এমন সফেদ বুজকুড়ি আঙুল ও মনকে
ভরসা দিচ্ছে বহুকাল ধরে, প্রবোধ দিচ্ছে শুদ্ধতার
আর মাড়িকেও, দাঁতের দৃঢ় বিশ্বাসের দিকে
কোনও এক পরিচ্ছন্ন গল্পের ঢঙে―
যে অনুভূতি ঘোলা আয়নার চিরদিনের চেনা।
এটুকু বলে মাজন-বিক্রেতা দেশলাই জ্বালাল
অন্ধের উজ্জ্বল হাসিটুকু দেখতে পাই―
দেখতে পাই, ঠোঁটের শুকনো বিড়িতে
থরথর কেঁপে উঠছে মুখাগ্নির মুহূর্ত।
—- —– —-
ওবায়েদ আকাশের কবিতা
বৃষ্টি, পূর্বাপর
শুকনো পাতার ওপর ঘুমুতে গিয়ে বুঝি
কতকাল আগে বৃষ্টি পড়েছিল―
প্রচণ্ড রৌদ্রে পত্রলিপি জেগে উঠেছে―গাছের পাতায় পাতায়
অক্ষরগুলো দক্ষিণ থেকে এসে
এ অরণ্যে
আমাকে ঘুম পাড়াতে চায়―
এমন সময় তুমি এলে―
অক্ষরগুলো পাশাপাশি বসে যে শব্দগুচ্ছ তৈরি হলো
তাতে একদিকে তীব্র খরস্রোতা নদী আর
অন্যদিকে শান্ত নিরিবিলি হ্রদ প্রতিপক্ষে দাঁড়িয়ে গেল
আর কারও মুখ চাওয়াচাওয়ি বন্ধ করতে যখন
অঝোর ধারায় বৃষ্টি শুরু হলো
বোসবাড়ির মেয়েরা নাইতে নেমে শান্ত হ্রদ অস্থির করে তুলল
পাতাঝরা অরণ্যে কোথাও মেঘ ছিল না, তবু
হঠাৎ এত বৃষ্টি কোথা থেকে এল ?
যদিও তোমার আমার সম্পর্কের ভেতর
কিছুই নয় অগ্নিস্বরূপা
.
বিনির্মিত ধ্যানবিন্দু
শীতার্ত বর্ষায় তোমাকে আগুনের পাশে বসতে দিয়ে
আহার খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছিলাম―
কাঠের আগুনের পাশে উজ্জ্বল তোমার মুখ
সমগ্র শহর আলোকিত করে আমার অপেক্ষায় আছে
ফিরে এসে দেখি দৃষ্টিছেঁড়া নক্ষত্রমণ্ডলী
জেগে আছে সহস্র সহস্র আলোকবর্ষ দূরে
তোমার নাম নিয়ে তারা ব্যবহার করছে সৌর-ব্রহ্মাণ্ডের
বিস্তৃত অনন্ত প্রান্তর―
তোমার মুখ থেকে আলো নিয়ে তারা নির্মাণ করেছে সুরক্ষা প্রাচীর
এদিকে, বৃত্তান্ত বর্ণনার আগেই তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি―
তোমার হারিয়ে যাবার নিস্তব্ধতা আমাকে দেখছে―
তোমার চারদিক ঘেরা অন্ধকার আমাকে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে
চেয়েও ধরতে পারছে না বলে ঘামছে মাটি
আমি ভেজা মাটিতে দাঁড়িয়ে পা পিছলে আগুনের দিকে ফিরছি
বৃন্তচ্যুত অগ্নিদৃশ্যের পাশে তুমি নেই বলে
পুনর্বার নির্মাণ করছি তোমার মুখ―
এদিকে কারা যেন আমার নির্মাণসামগ্রী ছিনিয়ে নিতে এসে
আমাকেও নিয়ে এসেছে নির্জন অন্ধকারবেষ্টিত
এক নিভৃত মোহনায়―
তোমার নামে গড়ে ওঠা নব্য এক নগর বন্দর প্রান্তর
এখনও প্রগাঢ় রহস্যময়―
——————–
সৈকত হাবিবের কবিতা
আসুন, আমরা কথা বলি
আসুন, আমরা কথা বলি, কথা বলি স্বদেশ কিংবা দুঃস্বপ্ন বিষয়ে। অথবা বমন, রমণ কিংবা ধর্ষণ বিষয়ে।
আর কথা ? কথা কাহাকে বলে ? কথা কি খাদ্য খায়, পান করে কিংবা কথা
আমাদের কী কল্যাণ করে ?
তবু, আমরা কথা বলি কথা বিষয়ে; রামশ্যামযদুমধু কিংবা রাজনীতিক
কিংবা কথা বলা যাক তাদের ভাঁড়ামো বিষয়ে।
আর আসুন, আমরা স্বপ্নের কথা বলি।
অবশ্য কথা বলতে বারণ বুদ্ধদেবের। তিনি বলতেন, কথা কোনও কল্যাণ করে না, তাই চুপ করো; ধ্যানমগ্নসমাহিতস্তব্ধ করো নিজেকে।
তবু, আসুন, আমরা কথা বলি, কোনও কাজ নয়, কেবলি কথা; দিন-রাত্রি, স্বপ্নে-নিদ্রায়, মরণে ও ক্ষুধায়…
আমাদের স্বপ্ন নেই আর মুক্তির কিংবা দ্রোহের; সকল দুঃস্বপ্নে, অনাচারে, পৃথিবী বিনাশেও আমাদের কিছু যায় আসে না আর। তাই শুধু কথা, আমরা শুধু কথা বলব, কথার তুবড়ি ফুটিয়ে ছুটিয়ে দেব ঘোড়া। কেননা, আমাদের করার নেই কিছুই আর।
কেবলই কথা, কথা, কথা, কথার ফুলঝুরি…
.
মঙ্গলপ্রভু বললেন অমঙ্গল বিষয়ে
মঙ্গলে ভোর হচ্ছে।
ভোরের বিভূতি পড়েছে ছড়িয়ে। চরাচরে নৈঃশব্দের হিমেল সঙ্গীত।…বহুকাল পর ছিঁড়ে গেল নৈঃশব্দ্যের জাল। কেঁপে উঠল রক্তিম মাটি, গভীর ঘুম থেকে যেন আচমকা জাগরণ―সরব সব অদৃশ্য প্রাণ। কেঁপে কেঁপে ভেসে এল গমগমে শব্দের বাণ―
মঙ্গলপ্রভু বললেন অমঙ্গল বিষয়ে :
‘ছিলাম বহুকাল শব্দহীন। হায়, সেই দিন বুঝি এল ফুরিয়ে। নিকট পৃথিবীও গেছে কবেই বুড়িয়ে। হে আমার মঙ্গলপ্রাণিরা, আমরা কি ছিলাম না আমাদেরই মতো, এই গ্রহজন্মের পর, এতদিন ? বুঝি ফুরিয়ে এল দিন! নিজের মাতৃগ্রহ যারা খুঁড়েছে এতদিন, ছিঁড়েছে জরায়ু যারা তার, কী এক অমঙ্গলে, তারা আসছে মঙ্গলে। তাদের থাবায়, এই প্রথম, মহা-ভীত আমি আজ। সবুজ গ্রহ নিঃশেষ লোলজিব এই মানুষেরই হাতে। ছিঁড়বে এবার তারা মঙ্গলের বুক। দ্যাখো, কেমন বর্বর যন্ত্রঘর্ঘর শুরু হয়ে গেছে দিকে দিকে!
হে আমার সন্তানেরা, তোমাদের কোন পাপে এ অমঙ্গল আজ, এল মঙ্গলে।’
আবার স্তব্ধ সব, বিষণ্ন তার উজ্জ্বলতা, হননভয়ে কম্পিতা, হিম-চুপচাপ শূন্যতা।
——– —————– ——————
মুজিব ইরমের কবিতা
বন্ধু ফুল
কোন বনে যে ফুটলো কুসুম জিগাই জনে জনে
মনটা আমার হারিয়ে গেছে হলুদ বনে বনে।
বন্ধু আমার থাকে দূরে জারুল ফুলের দেশে
বন্ধুর লাগি ঘুরে বেড়াই পাগল পাগল বেশে।
কোন হাওরে হিজল ফুল জলের উপর ঝরে
বন্ধুর লাগি মনটা আমার ওলট পালট করে।
বন্ধু তুমি আইসো ঘরে ফুল ফুটেছে বনে
কুর্চি ফুলের গন্ধ লুকাই আমার মনে মনে।
চম্পা বলে ডাকল লোকে বন সুন্দরী ফুল
আমার ভেতর বন্ধু তুমি বাঁধাও হুলুস্থুল।
ফুল ফুটেছে হলুদ হলুদ ফুল ফুটেছে লাল
তুমি ছাড়া বন্ধু আমার কে বুঝিবে হাল।
ফুলে ফুলে কান্না লিখি ফুলের অধিক মন
কুলহারা এক বনুয়া পাখি বলছে আপনজন।
.
বিজু ফুল
বিজু ফুল ফুটিয়াছে পাহাড়ে পাহাড়ে
মন বলে যাই…
শটি বনে ফুটিয়াছে আশ্চর্য কুসুম
মন বলে
পালাই পালাই…
বিড়ালনখা ফুলের ঝাড়ে যাই
দেখে আসি
অনাদরে ফুটেছে পুটুস…
আমার বেদনা বেশি
তারে আমি যতনে লুকিয়ে রাখি
কাঁঠালি চাঁপা ফুলের মতো
পাতার আড়ালে…
তোমার রয়েছে জানা
মুছিও ডেউয়া ফুলে আমার বেদনা।
— —– —— —–
সাখাওয়াত টিপুর কবিতা
কবির মৃত্যুর কথা
কবিকে শান্তিতে ঘুমানোর জন্য একটা কবর দাও
যেন কোনও মনুষ্য পায়ের ছাপ না জাগে, এমন কি
যেন কোনও পাখির শব্দও কবির কুহরে না পৌঁছায়।
কবি যে শব্দের জন্মদাতা, ধবল ধাত্রীর কোলে একদম
এতিম কবিতা রেখে কবি কামিনীর কোলে ঘুমাবে এখন।
নাক, কান আর গলা সিল করে দাও মুক্ত আবাবিল
বাঁশের চেলার পরে পাটি আর মাটি দিয়ে ঢিবি দাও
যেন লতানো ঘাসের ডগা কবরের ছাদে অনায়সে বাড়ে।
কোনও পথচারী যদি টের পায় ত্রস্ত্র এমন শহরে কবি
চিৎপাতহীন ঘুমায় মাটিতে, সেদিন বেহেশত শান্তি পাবে
যদি কেউ কবর মাড়িয়ে যায় তার পা কাঁপবে না সহজে।
কবি কি রাষ্ট্রের জরায়ু ছিঁড়ে অকস্মাৎ বেরুবে কখনও?
ভোতা দাঁত আর নিরুত্তাপ ঠোঁট ছাড়া কবির কিছুই নেই
কবিকে ঘুমাতে দাও কোলাহল, সুপ্ত ট্রেন আর কাশফুল
না হলে আকাশ ভাঙবে কপালে, নমিত চোখের জলে!
.
বেদনার কোনও আম্মা-আব্বা নাই
মলিন মুখের চেয়ে আর নিরাপদ ভাষা কিছু নাই
মানুষ হাসলে কেবল দাঁতের ফাঁকে দুঃখ দেখা যায়।
কান লাল হলে মানুষের চোখ ছোট হয়ে আসে
না হলে জিহ্বার কটাক্ষ কেন রেখাপাত করে?
কপালে যে ভাঁজ পড়লে শুধু মানুষ কাঁদে না
দূর হতে সবাই জেনেছে সেটা ময়লা সময়ে।
দু ঠোঁট বলেছে, বেদনার কোনও আম্মা-আব্বা নাই
কত কথা নিয়ে হাসতে হাসতে কান্না বাতাসে মেলায়।
— —- —–
জাফর আহমদ রাশেদের কবিতা
আঁচল বোঝে
যখন বসি মন খারাপ করে
বাতাস আসে, আঁচল খসে পড়ে।
কোথাও কোনও ছায়ার রোদে
আঁচল ঠিকই বোঝে―
যতটা বোঝে তত বোঝে না,
এমনি এক ছেলে
গাছের ছায়া আর কেউ না,
সেইখানে কী খোঁজে
কোন স্বপ্নে কী বেদনায়
দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্তি এলে
গাছের ছায়া নড়ে
ঠিক তখনই আলতা রঙের
আঁচল খসে পড়ে।
.
চোখের ভাষার নিচে
কোনও কোনও চোখের সামনে থেকে সরে যেতে হয়।
চোখের ভাষার নীচে
নরম জলের পিছে
যদি শুয়ে থাকে প্রতিশোধ
ক্রীড়া করে গূঢ় প্রতিরোধ
তাহলে ফেরার পথ
করে নিতে হয়।
যদি দেখো কোনও পথে বাধা
মনে হয় দিকে দিকে ধাঁধা
তাহলে সে চোখের পিরিচে নিয়ে মুখ
মরে যেতে হয়।
— —- ——
ভাগ্যধন বড়ুয়ার কবিতা
জঙ্গল সলিমপুর
‘জঙ্গলে মঙ্গল’―একদিন কথাটা বলেছিলেন আচ্ছু জনিক,
মধুপুরের অরণ্যপুত্র।
বনে থাকে বৃক্ষ, পাখি, পশু,
আর বোজা-চোখের মানুষ।
কিন্তু আগ্রাসী মানুষ যখন ন্যাড়া করে বন,
তখন পাঁজর-হা-করা পাহাড় হয়ে যায় জঙ্গল সলিমপুর!
মাথা উঁচু করা বৃক্ষ ভুলে যায়―
তার শাখায় ছিল পাখিদের কিচিরমিচির, ঋতুর উৎসব।
করাতের শব্দে পাখি আর ফিরে আসে না;
বক বিলের ধারে দাঁড়িয়ে
এক পা উঁচু করে দেখে―
পরিবারের কতজন নেই আর!
ঝিঁঝির সঙ্গীতে পাতায় পাতায়
যে নৃত্য ছিল, তা আজ অবলুপ্ত।
নগর-মাস্তান, নদীভাঙা মাঝি, ভবঘুরে, কৌশলী ভিক্ষুক―
সবাই সদলে আশ্রয় নিয়েছে জঙ্গল সলিমপুর।
কারও বসতি, কারও ব্যবসা,
কারও রাজনীতি, কারও প্রতিপত্তি―
কথিত সাম্যের প্রকৃষ্ট উদাহরণ এখানে!
স্বার্থের বণ্টন নিয়ে প্রত্যহ সমঝোতা-স্মারক;
বিভাজিত মুনাফা জমা হয় সংশ্লিষ্ট কোষাগারে।
জঙ্গল দেখলেই পশুরাও ভয় পায় এখানে;
পালায় যেদিকে চোখ যায়,
নয়তো মৃত্যু আসে অকালেই।
যে জঙ্গলের কোনও নাম নেই,
কিংবা এখনও তাকে জঙ্গল বলা সমীচীন নয়―
নগরে-বন্দরে রটে গেছে তার নাম
জঙ্গল সলিমপুর।
.
নিজস্ব পরিধি
নিজস্ব পরিধি, ভিন্ন পথ;
যৌথবেলা উপস্থিত হলে, অভিন্ন টানাপোড়েন।
একদিন, বহুদিন, বহুকথা―
কেন মনে পড়ে? কেন মন পোড়ায় ?
একই শহর, চেনা লেন ধরে আনাগোনা;
কথা নেই, ভাব বিনিময় নেই ইশারায়।
মেঘের প্রচ্ছন্ন ছায়া ব্যক্ত করে
অনেক দিনের পুরোনো গল্প।
কেন টান পড়ে মনে, অপ্রাপ্তির বেদনায় ?
কথা হয় মনে মনে;
যেমন জমেছে আবেগ পাঁজরের ভাঁজে।
মনে নেই বহু যৌথক্ষণ,
কখনও কি বলেছি প্লাবিত আবেগের কথা ?
ভেসে এসে ভালোবাসা মেঘ হয়ে ভেসে গেল;
বৃষ্টি হলো।
শ্রাবণের জোয়ার এলে গল্পগুলো কাগজের নৌকা হয়;
হৃদিজলে ভাসে…
শহর অচেনা হয়, আমি কি এখনও ভাবী প্রিয় মুহূর্ত যাপন ?
উদ্যাপনের কালে চেনা হাত ধরে হেঁটে যাই পথের মায়ায়…
—- —– ——
শাহ্্নাজ মুন্নীর কবিতা
স্তব্ধতা
তোমার সঙ্গে দেখা হয় হাটে বাজারে, মানুষের দমবন্ধ ভিড়ে
যেখানে সবাই শুধু কথা বলে অনর্থক, অনবরত, অবিরাম
সকলের ঠোঁট নড়ে, সকলেই শুধু বলে
যেন এক অনন্ত টক শো চলছে তো চলছেই আদিগন্ত চরাচর জুড়ে
এই উদ্দাম বাকপ্রবাহের তীব্র স্রোতে
আমার নিরীহ মন্থর বাক্যগুলো কোথায় যেন ভেসে গেছে
কারা যেন কথা দিয়ে সূক্ষ্ম জাল বুনছে মৌনতার মাছগুলো ধরবে বলে
তুমি কি স্তব্ধতার ভাষা বোঝো ? শব্দহীনতার সুষমা খোঁজো ?
উচ্ছিন্ন নিঃশব্দের পথে কেন যেতে চাও ?
কথার নেপথ্যে যে এক ঝলক নীরবতা লুকিয়ে থাকে তা কি টের পাও ?
.
পরাজয়
মাঝে মাঝে পরাজিত হওয়া ভালো, পরাজয়ে না ডরে বীর, তার গতি ধীর
জীবন্ত লাভা স্রোতের মতো, উভচর কচ্ছপের মতো, লক্ষ্যে যে থাকে স্থির।
মাঝে মাঝে জেতাও ভালো, ক্রমে ক্রমে আসে যে আলো তার ম্লান মুখশ্রী ঘিরে
বিজয়ের ক্ষণিক চমক খুব চেনা লাগে, শত কোটি অপসৃয়মাণ মানুষের ভিড়ে
মাথা নুয়ে বিমর্ষ মুখে কম্পমান পায়ে পরাজিত হেঁটে যায় নির্দয় নগরে
তার দুই হাত যেন নিভন্ত লণ্ঠন, মগজের প্রতিটি স্মৃতি কোষে ধুলার ঘূর্ণন
মানুষ কেবলই অহমিকার মশাল জে¦লে দম্ভের বাজি পুড়িয়ে জয়ের ভান করে,
মৃত্যু জানে শুধু পরাজয়ই শাশ্বত। বাকি সব ক্ষীয়মাণ, ক্ষণভঙ্গুর, আপাত।
—- —- —–
টোকন ঠাকুরের কবিতা
ত্রিছত্র
স্বপ্নের ভেতরে দীর্ঘ, দীর্ঘ গগনডাঙা
আমি ও আমার বাইসাইকেল উড়ে যাচ্ছিলাম
মনে হলো, নিজেকে একবার ডাকি, কিন্তু
কী নামে ডাকব? ভাই ? বোন ? বন্ধু? কী হই
আমি আমার ? কীইবা আমার নাম ?
খ.
সৌন্দর্য, আমাকে তুই ঘুরিয়ে মারলি পথসুড়ঙ্গে
বছরের পর বছর
সৌন্দর্য, আমাকে তুই পুড়িয়ে মারলি, কী ক্ষতি
করেছিলাম তোর?
গ.
এক জাদুকরকে আমি চিনি, জাদুকরের নাম―ঘোর
সে এমন (দুর্দান্ত) চোর
চুরি করে নিয়ে যায় বয়স, আমি ভুল করে
(ঘোরের পাল্লায় পড়ে, জাতীয় সনদপত্রে)
৪১ না লিখে, লিখে দিছি ১৪ বছর…
.
ব্রোকেন ফ্যামিলি
দেখলাম, পাখি। কিন্তু পাখি নয়, পাখির ছদ্মবেশে পাখাওয়ালা এক পোকা: কুটকুট কুটকুট করে কামড়ে চলেছে মাথার মধ্যে। মাথার মধ্যে ডানা ঝাপটাচ্ছে হাওয়া, হাওয়ার প্রশ্রয়ে বাঁশি বাজে চিরকাল। বাজে গান, আনচান আনচান… বাঁশি শুনে আর কাজ নাই, বরং চিন্তা হচ্ছে, কী কারণে যে পোকা কুটকুট করে কামড়াচ্ছে! ফলত, বাক্য জড়িয়ে যাচ্ছে, বাক্য ছড়িয়ে যাচ্ছে, বাক্য হামাগুড়ি দিচ্ছে, শব্দ ছটফটাচ্ছে। আর এই সুযোগে নৈঃশব্দ্য কী কী ঘটাচ্ছে ?
সব জানে অনুভূতির মা। অনুভূতি আমার মেয়ে, আমাদের মিচ্যুয়াল সেপারেশন চলছে।
ফাইনালি, বিচার বিভাগের মর্জি, অনুভূতি কার কাছে থাকবে…
—– ——- ——-
পারভেজ আহসানের কবিতা
পাতার সংসার
‘পাখিরা শহর পছন্দ করে না’
―হুমায়ূন আহমেদ
মানুষের ভেতর মৃত পাথর
মস্তিষ্কে যোগ ও বিয়োগ
ঝুলন্ত দড়িতে ভারসাম্যের খেলা
কোলাহলে নির্জনতার ছায়া।
পাখিরা খোঁজে জলের প্রকরণ―
যূথবদ্ধ সঙ্গীত―
আরণ্যক ঘ্রাণ―
ডানার উচ্ছ্বাস।
এক চিত্রকর আঁকছে বৃক্ষসমাজ।
.
উঠোন
খাঁখাঁ রোদ―সোনার চাদরে ঢেউ
খাঁচাবন্দি পাখি―বাতাসে উড়াল
মুখে সাঁটানো কাপড়―ভয়শূন্য আওয়াজ
ভাঙা বৈঠা ও গলুই―পাল তোলা নাওয়ের ক্ষিপ্রতা
ঘুটঘুটে অন্ধকার―আলোর প্লাবন
ছিঁড়ে দোলাচল
রক্তে জন্ম নেয় বুনো ষাঁড়―
ভাঙে জোয়াল
মানুষেরা পায় একান্ত উঠোন।
— — —
মতিন রায়হানের কবিতা
নিষিদ্ধ গন্ধম
সময় সুযোগ পেলেই জীবনকে দিন হার্দ্য প্রণোদনা
এই যেমন ধরুন, হুটহাট কোথাও বেরিয়ে পড়লেন…
কোনও এক সবুজ গ্রামের পাশ দিয়ে যেতে যেতে
প্রস্ফুটিত গোলাপি রংখচিত শুভ্র ভাঁটফুলের
উতল গন্ধে কী অদ্ভুত মোহিত হলেন!
কিংবা পাশের বরুণগাছ থেকে যখন একজোড়া
সবুজ টিয়ে লাল ঠোঁট ফাঁক করে শব্দ তুলে দিল এক
দিগন্তমুখী উড়াল তখন আপনি আনন্দচিত্তে
বিস্ফারিত চোখে রচনা করলেন এক অনিন্দ্য চিত্রকল্প!
কিংবা কখনও কোনও আকাশস্পর্শী পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে
নামিয়ে আনলেন কালিদাসের কৃষ্ণ মেঘমালা
আর ময়ূরের পেখমতোলা নৃত্যে বাজালেন বৃষ্টির নূপুর
তখন যে কোনও সুদর্শনা নারী আপ্লুত আবেগে লিখে ফেলবে
মায়াময় প্রেমের কবিতা!
একটু ভাবুন তো, আপনি হলেন এই কবিতার প্রথম পাঠক!
ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে শব্দে শব্দে তুললেন প্রণয়ের অনিবার্য ঢেউ!
এমন রোমাঞ্চকর প্রণোদনা মাঝে মাঝে নিজেকে দিন
দেখবেন, পৃথিবী কী সুন্দর হয়ে উঠছে!
আচ্ছা ধরুন, কোনও সমুদ্রে সৈকতের কথা
বিশাল আকৃতির একেকটি সফেন ঢেউ আছড়ে পড়ছে বালুতটে
তরঙ্গিত আপনি―তুমুল উচ্ছ্বাসে প্রিয়জনের হাত ধরে
পা ভিজিয়ে ভিজিয়ে হাঁটছেন আর নোনাগন্ধে
মাঝে মাঝে উঠছেন কেঁপে
ঠিক তখন কেউ যদি পেছন থেকে ডাক ছাড়ে
আপনি কি ফিরে তাকাবেন ?
নাকি নিমগ্ন চোখে ঘন ঝাউবনে খুঁজবেন
একান্ত সময় ?
সিদ্ধান্তটা একান্তই আপনার!
আমি কেবল আপনাকে জীবন উদ্যাপনের কথা
আজ শুধু মনে করিয়ে দিলাম!
কারণ একদিন আমার যৌবন গভীর ভালোবেসে
আমাকে বলেছিল : এই নাও তোমাকে দিলাম
বেহেশত থেকে আনা এক নিষিদ্ধ গন্ধম!
.
সম্ভোগ
আজ
বৃষ্টির ছাটে
ভিজে যায় তোমার মুখ
ভিজুক, আরও ভিজুক অলকগুচ্ছ
ঠোঁট ও চিবুক, স্তনবৃন্ত―তোমার অসুখ
ক্ষণে ক্ষণে জ¦লে দেহ―যেন বিদ্যুল্লতা-প্রায়
পান করি সোমরস, অস্থির উন্মন দেহতরি-বিভা
ওহে বাৎসায়ন, রতিগৃহে কে ঢোকে? রতিপতি?
যত আছে গূঢ়সূত্র পাঠ করি আজ যৌথ রণে
দ্যাখো, কামজ কুসুম ফুটেছে, নেশাতুর
ঘ্রাণ তার―কী অধীর গুঞ্জরণ মক্ষিকার
তরঙ্গিত সময় ঘাই মারে প্রাণে
দেহ-উদ্যানে বেনোজল
আজ বুনো উৎসব
ক্যাম্পফায়ার
আগুন
— —– —-
শাহীনা সোবহানের কবিতা
দ্বিধা
উড়ছে খড়কুটো
মন উড়ন্ত।
অপেক্ষা মধুর,
কখন ছুঁয়ে দেবে
ভূমিপূত্রকে।
মেঘ ছোঁবে
উচাটন বাতাস।
নারকেলের ধবধবে
বরফির মতো
বৃষ্টিতে ঝরবে
ছোট ছোট বরফ খণ্ড।
উড়ন্ত খড়কুটো
নিপতিত।
মানুষ কই?
.
বিবশ বেলা
ছোঁয়াছুঁয়িহীন বিবশ বেলা।
কথাতেই আনন্দ,
উজাড় করা বেদনায়
গল্পের সাঁতার।
অন্ধকারের অজ্ঞাতবাস থেকে
অরুন্ধতীর আলোয়।
চন্দনের সঙ্গে কোজাগরী রাত।
একটা নাউ দুলবে
উড়ির চরের পাশে মেঘনায়,
দীর্ঘ আকাক্সিক্ষত ভূকম্পনে।
দূরের পল্লিতে শিশুরা পড়বে
‘অ-তে অজগর ঐ আসছে ধেয়ে’,
মোমের আলো কাঁপবে অস্থির
অদৃশ্য ভয়ে।
তীরে বয়সী বৃক্ষ
নত অনিশ্চিত আশায়,
সর্পিল পথ
মসৃণ, একাকী-নির্জন।
প্রাচীন নগরীর
পথের দুদিক থেকে
হেঁটে আসবে
মৃদু, দ্বিধাগ্রস্ত পায়ে একজন;
অন্যজন সাহসী পদভারে।
মুখোমুখি চন্দনের সুবাস-
স্বপ্ন নয় তো?
যুগল নক্ষত্র,
বাতাসে দোলা সবুজ কচি গাছ।
— —- —
তারিক সুজাতের কবিতা
প্রিয় জন্মভূমি
[উৎসর্গ: কবি দাউদ হায়দার, শ্রদ্ধাস্পদেষু]
মেঘ দিয়ে বুনেছি তোমাকে
যে-মেঘ অনন্ত অসীমের পথ
পাড়ি দিয়ে এসে বলে,
তুমি-যে সুন্দর!
এত ভার বুকে নিয়ে
নীলের সমুদ্রে এই উদাস উড়াল,
দলে দলে ভাসে―ডানা ঝাপটায়
দূরের আকাশে লীন অতিথি পাখিরা
ভেজা চোখ মুছি আমি
রোদের রুমালে!
কোথায় আমার দেশ
মায়ের আঁচলে বাঁধা স্নেহের সংসার
শিমুল তুলোর মতো মেঘবন্দি খামে
এক ফোঁটা অশ্রুবিন্দু পাঠালাম
হে আমার বিপন্ন স্বদেশ
তোমার শরীরময় জমাট রক্তের দাগ
ত্রিশ লক্ষ শহিদের স্মৃতি নিয়ে জাগে
জেগে ওঠে বাংলাদেশ, জাগে―
বৃষ্টি ও বারুদে
আরও একবার জাগে…
যখন তোমার মুখ জ্বলে ওঠে
লাল সবুজের রক্তমাখা পতাকায়
তুমি-যে সুন্দর
হে আমার প্রিয় জন্মভূমি!
.
পথের পুরাণ
পথ একটাই―
বিপরীতমুখী
সারি সারি গাড়ি
যে যার গন্তব্যে দিচ্ছে পাড়ি
জীবন একটি―
গন্তব্যের কাছে পৌঁছে
মনে পড়ে সূচনার দিন
এত ভুল―তবু অমলিন
আকাশটা প্রসারিত―
সমুদ্রের আলিঙ্গনে
মেঘ ভাসে নীল নীলিমায়
ঢেউ আসে ঢেউ যায়
একটাই পথ
একটি জীবন
একাকী পথিক
কে কার অধিক ?
—– —— —–
জাফর সাদেকের কবিতা
মন্দিরায় নেমেছে ভোর
তবু আঁকছি ক্লিয়োপেট্রার চুম্বিত রাত
রাতের নাইটি খুলে গেলে কী লুকাও নগ্নভোর
কার ঊরুর উল্কিতে এঁকেছে জখম
এমন দ্বিধার প্রশ্ন নিয়ে আমিও হেঁটেছি পথ
পরাজিত সিজারের মতো একজনম
এগলি ওগলি হয়ে ফেরার পথ খুঁজতে খুঁজতে
পৃথিবীর সব পথ জড়িয়ে ধরেছে অতলার স্রোতে
নদী স্বাধীন হলেও অন্তরে রাখে মেঘের সংক্রমণ
এই একাকিত্বের দায় কখনও ছোঁয়াচে রোগ
খণ্ডিত হতে মৃত্যু নামক দেহজ মন্দিরায়
কে গাইছে তোমার সেই কামজ অধ্যায়
সে-পাখির নাম বলে দিলে আমিও খুঁজে নেব
সংক্রামিত হবার বিহ্বল বনপথ
.
জলের গুণনামা
এখানে স্নানের ভূমিকায় জলের প্রশংসা করি না কেউ
অথচ তুমি সকালের ভেজা এলোকেশে
হেমন্তের ভোরের পদ্মের মতো কী অপরূপ
সকাল থেকে আজ তুমি স্নান নিলে বার তিনেক
সন্ধের স্নানের পর বললে―
আজ জলের গুণনামা পাঠ করব খুব
রাত্রির অবগাহনে আরেকবার হব শীতার্ত কাঁপন
আমরা জলের স্তুতি করতে তখন
বেছে নিলাম আগামী বর্ষায় কেমন হবে প্রিয় নদীর যৌবন
প্রথম কামার্ত স্নানের কুঞ্জ-রাগ খুঁজতে গিয়ে
কেমন হবে এবার মেঘেদের কত্থক
আমাদের চিন্তাকে বর্তমানে স্পর্শ করতে
রাত্রির শরীরে পেলাম পাঁচ পার্বণের স্নানের জল
অথচ পুরোরাত আমরা মরুর মতো তৃষ্ণার্ত ছিলাম
— —- —
খালেদ হোসাইনের কবিতা
পিতার মুখ
প্রার্থনায় নিমজ্জিত মায়ের দু চোখ ভরা জল
রঙিন জায়নামাজে মা আমার কী যে অবিচল
দিনানুদৈনিক কাজ, সংসারের, যৌথ পরিবার―
অবেলায় স্নান শেষে রুদ্ধ করে প্রাত্যহিক দ্বার
কাজা নামাজের পর দু হাত বুকের কাছে নিয়ে
কী এমন চাও, তুমি? সংসার ভরা পুতে-ঝিয়ে!
যতটুকু সচ্ছলতা, বলা চলে, সন্তোষজনক
তোমাকে রাখেনি ঘিরে? যতটুকু জানি, কিছু শখ
মিটিয়েছ পরিবার-পরিজন নিয়ে। বই পড়ো,
কবিতার খাতা খুলে অনুভূতিপুঞ্জ নিয়ে গড়ো
আশ্চর্য মায়াবি এক অলৌকিক স্মৃতির স্বদেশ।
তবু কেন কাঁদো তুমি, ও আমার মা, ও জননী ?
এত কেন নিরুচ্চার, কেন নেই তাহাদের ধ্বনি ?
‘অসময়ে হৃত পিতা, চোখে যেন উঁকি দেন তিনি
মানব-জন্মের জন্য আমি তার কাছে চিরঋণী।’
.
কুয়াশার মতো মৃদু মেঘগুলো
কুয়াশার মতো মৃদু মেঘগুলো পুঞ্জীভূত হয়ে
ভারী হতে হতে হলো নিরঙ্কুশ নিকষ আঁধার
বাতাস মাতাল হয়ে ছিন্নভিন্ন করছে প্রকৃতি
মনুষ্য-নির্মিত যত ঘরবাড়ি নগর-বিন্যাস।
জলও যেন জল নয়, পিপাসা মিটাতে ব্যর্থ খুব
খাদ্যও ধর্তব্য নয়, বিবমিষা জাগে বারংবার
যেদিকে তাকাই দেখি, মারী আর মড়কের থাবা
রুচির মরণ দেখে আকাশে মিছিল করে চিল,
তারা সব ধেয়ে আসেÑবিষাক্ত সমুদ্রের ঢেউ
শ্বাস রুদ্ধ করে ফেলে, মুক্তির প্রত্যাশা-ব্রত হাত
আশ্বাস পায় না খুঁজে, শান্তি নেই বিশ্ব-চরাচরে
চোখের পাপড়িগুলো মরা পাতাদের মতো ঝরে।
ফুলগুলো ফুল নয়, যেন হন্তা তান্ত্রিকের চোখ
তবু জানি, শেষ হবে আদিগন্ত প্রসারিত শোক।
— —- —–
আমিনুল ইসলামের কবিতা
আমাকে জাগিয়ে রাখে শ্রাবণের অন্ধপূর্ণিমা
আকাশ-শাওয়ার খোলা ট্যাক্স ফ্রি ঝরে জলধারা
ডাহুক দম্পতি আর বৃক্ষরাজি ভেজে গণস্নানে
শিউলির কটি ধরে ভেজাহাতে হাওয়া দেয় নাড়া
তাই দেখে বেণুবন ঝুঁকে পড়ে সমবেত গানে।
মৃত্তিকার জননাঙ্গে অঙ্কুরিত জীবনের বীজ
শিশুর উঠোনে তাই বাড়িতেছে সবুজ সম্ভার
চলনবিলের ঘরে হাসিতেছে বয়দা সিরিজ
আমারও সময় ছিল, আজ নেই, আইলবান্ধার।
গেরস্ত ঘুমিয়ে, তার স্বপ্ন ছুঁয়ে হেমন্তের দিন
শিউলির স্বপ্নমুখে ধাবমান শরতের সীমা
কাশবনে স্বপ্ন সাদা; এই শুধু আমি স্বপ্নহীন
আমাকে জাগিয়ে রাখে শ্রাবণের অন্ধপূর্ণিমা।
বাতাস শোনায় আজ―বিরহের আসলে কী মানে
বিপ্রতীপ সংখ্যালঘু―আমিও যে মিলনের রাতে
সেদিন বুঝিনি আমি, বুঝি আজ ফিরোজার গানে
‘অঝোর ধারায় বর্ষা ঝরে সঘন তিমির রাতে।’
.
বীজ না ভূমি
তোমার বুকেই পড়েছিল―জানে তো সবাই
তথাপি তো উঠেনি অঙ্কুর।
ব্যর্থতার দায় সরিয়ে লাফাচ্ছো যে এত,
চিমটি দিয়ে মেপেছো কি উর্বরতার থিতি ?
তোমার তো কৃষিজ্ঞান, সনদে প্রমাণ;
সেও তো ছিল না কোনও হাইব্রিডের বীজ!
উপরন্তু, জৈবসারে পুষ্ট বীজতলা।
তবু এই পলিমাটির দেশে
কে যে তারে ব্যর্থ করে, তুমি বলো,
রঙচোরা বালি, নাকি পাষাণের কণা ?
তোমার বুকে না পড়ে, ধর, যদি বিহঙ্গীরও
ঠোঁটে পেত ঠাঁই,
শস্যময় হতো নাকি
দারুচিনি দ্বীপ কোনও চোখের আড়ালে ?
দেবতাগণেরও হয়; আমি তো কেবল
এক বদ্বীপ নিবাসী,
মৃত্তিকার নেশা লালশোণিতের স্রোতে;
কাদাধুলো ছোঁবে না এই গা,
এই খত দিইনি তো কোনও মহাজনে!
তাহলে আর কাম কী কারণ নির্ণয়ে!
তারচেয়ে সেই ভালো―কণ্ঠভোটে মেনে নাও এই তো ঘটনা।
— —– ——
শাহীন রেজার কবিতা
চাঁদ ছোঁয়া রাত
অযত্নে সম্পর্ক মলিন হয়; ধুলো জমে―
ধরো জানালার শরীর বেয়ে বেড়ে ওঠা মানিপ্লান্টটা তোমার অগোচরে
কার্নিশ ঘেঁষে আকাশ ছুলো―
তুমি ছেঁটে ফেলা ছাঁড়া
তাকে আর কি নামিয়ে আনতে পারবে
হাতের নাগালে ?
ভালোবাসায় যুক্ত হলে অবহেলা
তা শুধু বাড়ায় তিক্ততা―
এ-ই যে জীবন,
কাশফুল ফুটে থাকা মধ্যাহ্ন;
তোমার অবহেলায় তা পরিণত হতে পারে
শ্রান্ত বিষণ্ন গোধূলিতে
অবহেলাযুক্ত যে ভালোবাসা
তা শুধু কান্না ছড়ায়
না এমনভাবে ভালোবেসো না
তার চেয়ে দূরে যাও ভুলে যাও
আর স্মৃতিতে জেগে থাকুক
চাঁদ ছোঁয়া একটি বোশেখী রাত
এবং স্পর্শে কাতর কিছু মধ্যদুপুর।
.
আষাঢ় এবং রবীন্দ্রনাথ
যে উড়ে এল তার নাম মেঘ নয়
শুভ্রতায় ঢাকা সে দেহ তবে কি রবীন্দ্রনাথ
সফেদ দাড়িগুলো সারা রোদ ভাসল আকাশে
অতঃপর রাত্রির অবসরে তার ধূসর গমন
সে ঘন হলো এবং পরিপক্ক শব্দফল হয়ে
মেঘফল হয়ে নেমে এল
নদী ও মৃত্তিকায়
আষাঢ়ের প্রথম দিনে এভাবেই জল হলেন রবিবাবু, কবিতা হলেন
আজি হতে শতবর্ষ আগের সেই সে কবিতাখানি
কী নিপুণ উৎসাহে পৃথিবী ভেজালো
কবি ভিজলেন কবিতা ভিজলো এবং তাহার রমণী পদ্মায়, বজরাতে নয় ফেরির শরীরে; কী অদ্ভুত বিরহী ভঙ্গি দেহসৌষ্ঠবে
আষাঢ় এলে বিষাণের সুর সঙ্গীতে, প্রকৃতি
এবং কবিতায় নদীদের আনাগোনা, শব্দ উৎসব
ইলিশ আয়োজন চারদিকে
আষাঢ়ষ্য প্রথম দিবসে আকাশে রবীন্দ্রনাথ আর তার মৃণালিনী ইলিশের ঘ্রাণ হয়ে পদ্মায়, কদম সঙ্গী যেন জলে ও সবুজে।
— —– ——
মারুফ রায়হানের কবিতা
কবিতা
সেদিন প্রথম থমকে দাঁড়িয়েছিলাম, শৈশবের কোনও এক খরদুপুরে। অনেকখানি ফাঁকা জায়গা, কোনও ভবন নেই। অদূরে ফুলগাছ, বেশ পুষ্ট আর যৌবনবতী। নিশ্চয়ই ওতে পাখিরা আসে। আর হাওয়ারা বয়ে যেতে যেতে খানিকটা থমকে দাঁড়ায়।
আমিও থমকে দাঁড়ালাম। ওখানে কোনও ভবন নেই। শূন্য স্থান কেন এতটা জায়গা জুড়ে! জানলাম ভবন আছে, তবে মাটির ওপরে নয়, নীচে। এক কক্ষবিশিষ্ট ভবন। একজন করেই তার বাসিন্দা। সেই প্রথম জানলাম, আমার জন্যেও অমন একটি অদৃশ্য ভবন রয়েছে। শুধু আমার নয়, স্বজন বন্ধু সবার জন্যেই অমন বিধান।
সেদিনই প্রথম জানলাম, একদিন আমাকেও কেউ আর খুঁজে পাবে না। কোথাও থাকব না আমি। এই চিরসত্য জানবার পরই কি কিছুকাল স্তব্ধ ছিলাম? বিস্মিত ও ব্যথিত ছিলাম? ওই স্তব্ধতা, ওই ব্যথা ও বিস্ময়ের নামই কবিতা!
একবার, প্রথমবার, এক রাতে আমার ভেতরে অগ্ন্যুৎপাত হলো। তার কিছুক্ষণ আগে ভিন্নতর এক সত্তার নগ্নতা আমি ছুঁয়েছিলাম, প্রথমবারের মতো। যুগপৎ কোমল ও কঠিন, সরল ও জটিল গন্ধম স্পর্শ করে, মুঠোয় অধিকার করে নিয়ে আমার পতন হলো। না, ভুল বললাম ঊর্ধ্বারোহণ হলো। জেগে উঠল অগ্নিগিরি, বেরুতে লাগল লাভা, আর মনে হলো এক অলৌকিক জ¦রে আমি পুড়ে যাচ্ছি। রাত শেষে দিন, দিন গড়িয়ে দুপুর, তারপর সন্ধ্যা হলো। ওই জ¦র আমাকে অস্থির করে তুলল। ক্ষুধা ও পিপাসারই মতো, তবে অচেনা আগ্রাসী ওই জ¦রের উত্তাপ যদি কবিতা না হয়, তাহলে কবিতা কী!
তারপর এল সেই আশ্চর্য সকাল। অনেক বছর পর। চেনা পৃথিবীর নয়, যেন অন্য কোনও গ্রহ থেকে এলো সেই নারী, হেঁটে এসে ঠিক আমার সামনে দাঁড়াল। না, সে কোনও অপার্র্থিব নারী নয়, রক্তমাংসেরই; আমার শহরেরই যে কোনও নারীর মতন। তবু সে পৃথক, এবং একক ও অনন্য। আমি তার প্রেমে পড়লাম। চোখে চোখ রাখলাম। চোখ ভেদ করে আরও দূর দেখতে চাইলাম। একের পর এক পর্দা সরে যেতে লাগল, স্পষ্ট হতে থাকল একেকটি পরিসর। একবার মনে হলো আমি প্রবেশ করেছি যুদ্ধধ্বস্ত ক্লেদজ কোনও রক্তাক্ত নগরীতে, আরেকবার মনে হলো নক্ষত্রলোক ছাড়িয়ে আমি উড়ে চলেছি অত্যন্ত রহস্যময় ও নান্দনিক মায়ার জগতে।
সেই থেকে, আমার সত্তার গভীর তলদেশ থেকে গলগল করে বেরুতে শুরু করল কবিতা: শব্দ সুর রং ছন্দ বিজলি অনুভূতি ধ্বনি বৃষ্টি রোদ শিশির ঝরনা তুষার হিমবাহ…। মৃত্যু পর্যন্তই অনিবার্য এই সতত উৎসার।
.
দীপ্র দ্বিপ্রহর, একা নারী
জীবনের মাঝদুপুরে ছায়া নেই, নেই তীব্র রোদ
প্রগল্ভতা-শেষে আজ থেমে গেছে প্রেমিক সরোদ
উড়ে উড়ে আসে তবু মধুপ্রেমী মাছি ও মৌমাছি
উদাসী সংসারী এক এসেছিল বেশ কাছাকাছি
নিজের বাসনা ভালো-লাগা নিয়ে নিজেরই সন্দেহ
চুম্বনের চেয়ে টানা ঘুম আর ক্যাপসুল চায় দেহ
কখনও সখনও যদি লাগে-টাগে একটি পুরুষ
ভাবা যাবে পরে কে হবেন ভালো, দেশি নাকি রুশ
অবসরে অবসন্ন মনে পাত্র চাই বিজ্ঞাপন
উপেক্ষার অন্ধকারে প্রেমিকের প্রণয়জ্ঞাপন
দীপ্র ভাটিপথে দ্বিপ্রহরে কোথায় জীবনসঙ্গী
ভাবের চাইতে ভালো ভাবমূর্তি সূক্ষ্ম সুখভঙ্গি
বিবাহ প্রস্তাব থাক মুলতুবি শৃঙ্খলের শর্ত
পুনর্বিবাহের বাঁকে স্তরে স্তরে থাকে চোরা গর্ত।
—– —— ——-
জুয়েল মাজহারের কবিতা
কবিতার আয়নাপথ
প্রচলের বিপক্ষে দাঁড়াও আর
সবকিছু উলটো করে ভাবো
ভাবো, তোমার কবিতাগুলো
চলে গেছে অন্য কারও বইয়ের পাতায়
ভাবো, কবিতা-আসরে অন্য কেউ
নিজের কবিতা ভেবে পড়ে যাচ্ছে তোমার কবিতা
তবু তুমি নির্বিকার
দর্শকসারিতে বসে প্রশংসায় দিচ্ছ করতালি
ভাবো যদি এ-রকম হয়, তবে অবাক হয়ো না
পরিযানপথে শুধু অক্ষরের কলহাস্য
অক্ষরের ক্ষতরেখা, অস্ফুট রোদন থেকে যায়
কবিতাকে নিজের ভেবো না। ভাবো,
মৃত্যুর ভেতরে তারা জাত আর নিয়তিলিখিত
সময়ের ফসফরাসে, অন্ধকারে, কবিতার আয়নাপথ জ্বলে
শুকনো পাতার নিচে
সূর্যরেণু-লাগা ঘাসে প্রস্তুত কবিতা ও কবির সমাধি
অভ্রপথ দূরে বসে চলো দেখি―
কবির মৃত্যুর পর কোন কবিতারা
সময়ের অন্য পাড়ে মেঘে মেঘে বাজায় দুন্দুভি ?
.
পান্দোরার ডালা খোলার পর
আলিঙ্গন শেষ হলো
আপাতত বলছি বিদায়
একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তোমাকে দেখলাম
মনে হলো, চেহারার এক পরত নীচে
অন্য চেহারা তুমি লুকিয়ে রেখেছো
আমাদের চারপাশে কত কত ঘটনার বীজ
আস্তিনে ছুরির মতো লুকানো রয়েছে
আপাতসত্য থেকে, সত্যের লুকানো আদল
একদিন উঠে আসবে বুদ্বুুদের মতো
ডালিমফলের মতো আপনা থেকে খোসা ফেটে
সত্যের কড়া-রং দানা একদিন সর্বত্র ছড়াবে
একদিন তোমাকে অবাক করে
খুলে যাবে পান্দোরার ডালা
সৌম্য আদল ফুঁড়ে উঁকি দেবে
মায়ামুখ পিশাচের, পূতনার আসল চেহারা
প্রেমিকের বালিশের নীচে একদিন
তুমিও দেখতে পাবে অন্য কোনও অভিসারিণীর
ভুল করে ফেলে যাওয়া একটি চুলের কাঁটা,
বালিশে লেপটে থাকা দীর্ঘ কালো চুল
বলো বলো, আস্তিনে লুকানো ছুরিটি নাকি
নাম-না-জানা প্রমীলার পান্দোরা-বিস্ময়
কে বেশি যাতনাময়, জ্বালাময়, পরিহাসময় ?
——– ————- —————–
রেজাউদ্দিন স্টালিনের কবিতা
ওরা বাড়ি ফিরছিল
ওরা বাড়ি ফিরছিল
কখনও দৌড়ে কখনও হেঁটে
একটা বিষাদ-নদীর বুক চিরে
এগুচ্ছিল
অনেকদূর কিন্তু ওদের মনে হলো
কত কাছে
পৃথিবীর বিখ্যাত সব শহর থেকে স্মৃতিস্বপ্নের
ঝুড়িভর্তি শব্দ নিয়ে ছুটছিল
পেছনে পারমাণবিক চুল্লি
সামনে বজ্রনারীর নৃত্য
মাঝে মাঝে ফণা তুলছে ঢেউ
ভ্রƒক্ষেপহীন দৌড়ে বাড়ি ফিরছিল
বুকের মধ্যে লুকানো সেই অমূল্য
ঘরে ফেরার খাতা
স্বাধীনতার গানে ভরা পৃষ্ঠা
পৃথিবীর সমান দামি
দীর্ঘশ্বাসে দৌড়াচ্ছে ওরা
কখনও বুক দিয়ে দৌড়াচ্ছে কখনও হামাগুড়ি দিয়ে
সামনে দিগন্তের পর্দায় ভেসে উঠছে
শত বছরের গ্লানি আর লজ্জার ছায়াছবি
ঝাপসা হয়ে যায় চোখ
মাতৃভূমি প্রিয় মাতৃদেশ অন্ধকারে
কবিতার জোনাক সাক্ষী
ওরা বাড়ি ফিরছিল একা
দান্তে যেভাবে ফিরেছিল ফ্লোরেন্স থেকে পিতৃভূমিতে
মধুসূদন প্যারিস থেকে কলকাতায়
লোরকা নিউ ইয়র্ক থেকে আন্দালুসিয়ায়
সেজেয়ার ফ্রান্স থেকে মার্তিনিকে
ওরা বাড়ি ফিরছিল কত বছর ধরে কেউ জানে না
একটা অসীম মাথায় নিয়ে ফিরছিল ওরা
নক্ষত্রের উপর পা ফেলে ফেলে
হয়তো একশো বছর
কিংবা তারও কিছু বেশি সময়
বাড়ি ফিরছিল
একটা আগুন-নদীর বুক চিরে
একটা বরফ-নদীর বুক চিরে
একটা রক্ত-নদীর
.
কেউ জানে না
বন্ধু হব-বন্ধু হলো স্বর্ণঈগল ঈগল হলে আকাশ দেবে গাছের ছায়া আকাশগাছে সূর্য ধরে সূর্য পেড়ে রাত্রি খাবে কমলালেবু ক্ষুধার্ত চাঁদ এদিক ওদিক ঘুরতে থাকে মেঘবাগানে ফলজ কোনও বৃক্ষ তো নেই কেবল ধুধু মাটির টানে ভাটার টানে ভিড়ব কোথায় কোন অসীমে বন্ধু হলে দিগন্তে এক রংধনু হয় উড়ব তখন ফিনিক্স পাখি এলিয়েনদের ডাকব কাছে আসবে সসার ফুটবে তারা বন্ধু হব সাইবর সে ?―
———– —————– —————–
কুমার চক্রবর্তীর কবিতা
এসো বেয়াত্রিচে, আজ
ঝিনুকের মতো তুমি খুলে যাও আপন খেয়ালে
সৌন্দর্য এমন হবে, রহস্যের বেদনার ভার,
তুমি হবে একাকার মরকতমণির শোভায়
শুক্তিটির ফাঁক থেকে দেখে নেব মুক্তাটি তোমার।
তোমার মনের লেখা পাঠ করি নৈঃশব্দ্য বিলোলে
উদ্যান-সঙ্গীত আজ করে তোলে চিত-উতরোল
তুমি তাকে লীলাময় গান করো অধরের ছলে
সে তোমাকে ছুঁয়ে যাক, হোক আজ চিত্তটি দোদুল।
ফেলে-আসা জীবনটাই ছিল ঠিক জীবন তোমার
এখন তো আছো তুমি ছাইমাখা, গুপ্ত মনোভারে
অশ্রুপাখি ডানা ঝাপটিয়ে হয় নিশ্চুপ আবার
তার বুকে খেলা করে বেদনারা অসীম পাথারে।
এ জীবনে ছায়া আসে, জমে মেঘ অন্ধকার ভার
গাছগুলি জানে না তা গায় শুধু বাতাসের তান
মুক্তাটি হারিয়ে তুমি ভোগো নাকো গুপ্ত মনোভারে,
এসো বেয়াত্রিচে, আজ গাই একে অপরের গান!
.
আমার দেশ
মানুষ ছাড়াই আমি বাঁচি
যখন তোমরা কেউ থাকো না, অদৃশ্য একের পর এক বল্লম ছুড়ে মারে
তখন ভাষা নিয়েই আমি থাকি, আর বলি কথা একা একা।
ভাষাই আমি আর আমার অনন্ত।
যখন চরাচর মনুষ্যহীন, চড়ুইটিও চিত্রবৎ,
আর নদীটির হৃদয় থেকে বেরিয়ে আসে কান্নার ভাটিয়ালি
তখন সমভূমির একটি পথরেখা ধরে আমি এগিয়ে চলি শূন্যমার্গের দিকে,
তখনি হে প্রকৃতি, মাতৃসদন, তুমি খুলে দাও অনাথের জন্য একটি বৃষ্টিঘর
আমি বিশ্রাম নিই আর দেখি, শোভা আর ছায়া!
এই ঝুরঝুরে অস্তিত্বের কালে
কুকুরবন্ধুরা সব আড়ালে হাসে দাঁত কেলিয়ে,
তখন সখা আমার, হে দীনবন্ধু, আমি তোমাদের ভুলি না,
রাখি হৃদয়ের সন্ধ্যাধারায় যারা একদিন একটি ধ্বনি দিয়ে,
একটি স্পর্শ দিয়ে, আমাকে করে তুলেছিল একখণ্ড জলভারানত মেঘ।
জীবন হলো একটি মুহূর্তের স্মরণীয়তা
আর দেশ হলো ভাষা, প্রকৃতি আর প্রেম, যা একটি
ভূগোলহীন সার্বভৌমত্ব বিস্তার করে রেখেছে আমার আত্মার পদ্মপত্রে।
—————- ———————– ———————
সরকার মাসুদের কবিতা
আশা
কথা ও নীরবতার মাঝখানে ছোট নদী
প্রবাহিত হয়। আমাদের স্বপ্নগ্রস্ত মাথার ভেতর ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ে বিরতিহীন;
তার সাথে দীর্ঘ হাসিমুখ আলাপের পরে
সেই হাসি লেগে থাকে অনিবার সেলফোনে!
ভালোবাসার গোড়ায় দুই বেলা
পানি দেয় আশা,
আর বাঁচিয়ে রাখে আমাদের স্বপ্নকুসুম।
আমাদেরকে জীবিত রাখে আয়নার মায়া
এলাচের গন্ধ ভালোবেসে আমরা বাঁচি
মলভারাতুর নালা-নর্দমার পাশে!
একটা পাথরের আয়নার সামনে
বসে থাকি, নিঃসঙ্গ!
আমার ভাবাতুর নৈঃশব্দ্যের খুব কাছে
গড়িয়ে গড়িয়ে আসে একটা হলুদ ষড়ভুজ!
.
হিজলডোবার ছবি, স্নিগ্ধ পানাফুল
তোমরা যখন গণতন্ত্রের কথা বলো
আমার মাথা ঝিমঝিম করে
তোমরা যখন মানবাধিকারের কথা বলো
আমার কানের ভেতর পি-পি পি-পি করে
শব্দ হয়! তোমরা আবার সমাজতন্ত্রের
কথা বলো, ব্যক্তিগত সুবিধা-অসুবিধার
কথা বলো;
আমার চোখে ভাসে কুয়াশার নদী!
আর যখন তোমরা বিপ্লবের কথা তোলো
আমার মাথার পেছনে এসে জমা হয়
একরাশ মেঘ!
কিন্তু তোমরা যখন ভালোবাসার কথা বলো
আমি দেখতে পাই একটা শান্ত
হিজলডোবার ছবি, স্নিগ্ধ পানাফুল!
—————- ——————— ———————-
মিনার মনসুরের কবিতা
ঢের হয়েছে দেখা মানুষের মুখ
[নূরজাহান বেগম, সতত ক্রুশবিদ্ধ মা আমার]
যাবার কি সময় হলো তবে ? শিয়রে কার হাত ? কে চুমু খায় এই পোড়া চোখে ? জংধরা চুল ধরে কে আবার টানাটানি করে ? যখন যৌবন ছিল অঢেল শুয়েছি আমি মানুষের পাশে―গু-মুতের শয্যায়। কী বিপুল আকাক্সক্ষার আতরে ডুবে ছিল মন! আমারই জঠর থেকে, কী আশ্চর্য, মেলছে ডানা প্রজাপতি! এক দুই তিন…। স্বপ্নের শিশিরে বোনা তার রংধনু পাখা।
সব রং উবে গেছে। বুড়িগঙ্গার খল জলে ভাসে পচা ভাত, ঘটি-বাটি, দানপত্র, বিবর্ণ অ্যালবাম আর যত গুপ্ত খতিয়ান। গু-মুতের শয্যায় শুয়ে আছি। পোকারা কিলবিল করে শূন্য জঠরে। বলি, বাবারা বসন্ত বৃথাই গেল। ঘুঘুরাই খেয়ে গেল সব ধান! দরোজার কড়া নাড়া বন্ধ বহুদিন। কবর ভিন্ন কোনও গ্রহ নয়। কিসের এত হাঁকডাক তবে ?
ঢের হয়েছে দেখা মানুষের মুখ! তোমরাই থাকো পাশে। নিষ্পাপ ক্ষুধা ছাড়া আর কোনও কটু গন্ধ নেই তোমাদের মুখে। আমার তো কিছু নেই এই ছেঁড়াখোঁড়া দেহখানি ছাড়া। এসো প্রিয় তেলাপোকা, এসো নেংটি এসো ধেড়ে, এসো ছারপোকা…।
.
ক্যামেরার মুখ আকাশের দিকে
বাইরে তুমুল হট্টগোল। কে যেন পচে-গলে পড়ে আছে বদ্ধ ঘরের ভেতরে! ‘কোন ঘরে ? কোন ঘরে ?’ ক্রুদ্ধ জনতা ছুটতে থাকে দিগ্বিদিক। নিন্দার ঝড় বয়ে যায় অন্তর্জালে। সভ্য সমাজে এমন অসভ্যতা! ইটপাটকেল উড়তে থাকে―ইটের ভাটার মতো পুড়তে থাকে উন্মত্ত নগরীর গনগনে আকাশ-বাতাস।
সন্তানের লাশ কাঁধে উ™£ান্ত মা দাঁড়িয়ে আছেন ব্যস্ত সড়কের মাঝখানে। কপর্দকশূন্য বাবা নিরুদ্দেশ। রুদ্ধশ্বাস সংবাদশিকারিরা ছুটছেন জীবনের মায়া তুচ্ছ করে (যেন তারাই যিশু এ ক্রুশবিদ্ধ ধরিত্রীর!)। ক্যামেরার মুখ আকাশের দিকে। ছেঁড়া কাগজের মতো উড়ছে বোমা। শব্দের চেয়ে দ্রুত বেগে ছুটছে আত্মঘাতী ঘৃণার মিসাইল। অসুর-বন্দনা ঘরে ঘরে!
টলমল পায়ে সাকুরার সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে রুদ্র বিড়বিড় করে : ‘আজও আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই। আজও আমি…।’ নিশ্চিতই কেউ মরে পড়ে আছে বদ্ধ ঘরের ভেতরে! ‘কোন ঘরে ? কোন ঘরে ?’―জন্মান্ধ জনতা মাতম করে!
—————- —————— ——————-
ওমর কায়সারের কবিতা
উজানের পথ সাঁতরে
ভুলে গেলি তুই ওই নদীটার নাম
পার হয়ে এলি উজানের পথ সাঁতরে
ঝরা পাতাদের কান্নার সুর শুনে
পৌঁছে গেছিস তারাহীন এক রাত্রে।
বাতাসে ভাসছে বিলাপের মতো গান
আমার এখানে মন খারাপের তিথি
অন্ধ কোকিল ভাসিয়ে দিচ্ছে সুর
বুকে নিয়ে কিছু লাল পলাশের স্মৃতি।
দস্যি ছেলেটা বাউলের পিছু পিছু
ঘুরে ঘুরে আর কুড়ায়নি চাল-চুলো
একটা গানের অন্তরা ভুলে গিয়ে
গায়ে মেখেছিল বিপথের রাঙা ধুলো।
সময় চলেছে খুনঝরা পথে পথে
মত্ত হাওয়ায় হতে পারেনি তো থিতু
দিন যায় আর রাত আসে কেঁপে কেঁপে
বছরের ফাঁদে ধরা পড়ে সব ঋতু।
.
মৃত্তিকার অন্ধ শ্রমিক
বেলমন্টের ফুটপাথে রোদের কড়া প্রহরার মধ্যে আমি অসংখ্য মৃত কেঁচোর সন্ধান পেয়েছি। তারা শুকিয়ে ফসিলের মতো হয়ে গেছে। ঘাসের তলার গোপন ও করুণ আশ্রয় থেকে ওরা কেন যে উপরে উঠেছিল। ওদের অতিসংবেদী ত্বকে প্রলম্বিত মধ্যাহ্নের কোনও পূর্বাভাষ কী আদৌ ধরা পড়েনি ? ওরা কতদূর যেতে পারে ? কতটা গভীরে ? আর্দ্রতারও কি কোনও তল আছে ?
ক্রমশ খরার দিকে ধাবমান প্রান্তর খুঁড়ে খুঁড়ে কেন আরও গভীরের দিকে যেতে পারল না মৃত্তিকার এই সব অন্ধ শ্রমিক।
নাকি তারাও বীজতলার শূন্যতার পাশে কবি ও কৃষকের মতো শুধু অপেক্ষায় থাকে। কখন আকাশ ফের ঘনীভূত হবে বৃষ্টির সংকেতে।
———————— ————– ——————
আসাদ মান্নানের কবিতা
অন্ধকারে যারা নাচে
তখন নদীর জলে ছিল আগুনের ঢেউ―
আগুনে সাঁতার কেটে পাড়ি দেয় কেউ কেউ
ভূমধ্যসাগর আর ওই গহন নীলিমা;
পাতালে মাতাল হাঁটে, যেন কবি তসলিমা
নাসরিন একদিন হেঁটে হেঁটে পার হয়
নানা পথ-ঘাট―নিন্দুকেরা কত কথা কয়!
জীবন আসলে এক কালো ইঁদুরের নাম
শিকারি বিড়াল তারে দেয় বিয়ের পয়গাম :
ইঁদুর মারার কলে ধরা বিড়ালের ছানা
পাতার আড়ালে শুয়ে খুব ক্লান্ত; একটানা
শিকারের চোখে তার ঘুম নেই বহুদিন
রক্তের নদীতে সূর্য ডোবে বিশাল রঙিন।
চারিদিকে মৌনতার সাপ হিস হিস করে
ঘণ্টা বাজে বেলা শেষ : কেউ বাঁচে কেউ মরে;
যে মরার মরে যাবে, যে বাঁচার বেঁচে যাক;
কবির মৃত্যুর পর কবিতারা বেঁচে থাক―
এমন প্রার্থনা যে করে করুক আমি ভাই
তেমন করি না; আমার মনের জোর নাই।
যারা অমাবস্যা ভালোবাসে সব পারে তারা,
পূর্ণিমাকে খুন করে ওরা খুব আত্মহারা;
মা ও মাতৃভূমি চড়া দামে যে দেয় ইজারা
সে বর্বর দুরাচারী খুনি কেন দেশ ছাড়া ?
কেউ বলে মাতৃগামী, কেউ বলে জানোয়ার :
নদী জলে ভাসমান আগুনের হাহাকার।
বিরূপ কালের স্রোতে বীর তীরন্দাজ বেশে
মায়ের কসম খেয়ে দেশটাকে ভালোবেসে
এস সবে রণাঙ্গনে কিংবা বনে নির্বাসনে;
ডাকাতের ঘর যাতে পূর্ণ হয় ধনে জনে
এমন বাসনা মনে মহাশূন্যে কারা নাচে ?
আলোর উদ্যান ছেড়ে অন্ধকারে যারা আছে।
.
প্রেমের এলিজি
তখন ফুলের মধ্যে ফুল ছিল গন্ধ ছিল―
হৃদয়ে পাপিয়া;
মানুষে মানুষ ছিল মায়া ছিল প্রেম ছিল আকাশ ব্যাপিয়া।
এখন ফুলের মধ্যে ফুল নেই―ভুলফুলে
গন্ধের আকাল;
মানুষে মানুষ নেই, আছে হিংস্র জীবজন্তু, সুবেশী মাকাল।
সবাই ঘুমিয়ে আছে শান্তিঘুমে ক্লান্তিমেঘ অশান্তির ডেরায়;
কেন যে প্রেমের দেবী দেবতার কোপানলে ধুলোতে গড়ায়!
ভেনাস আমার দিকে কান পেতে চুপচাপ তাকিয়ে রয়েছে;
আমি যেন আমি নই অন্য কেউ, যে নিজের আগুনে পুড়েছে।
চারিদিকে মৌনতার কোলাহলে চোখে পাতা কুয়াশার জাল;
অন্ধ কূপে ডুবে আছে পূর্ণিমায় অলৌকিক আলোর মাতাল।
আগুন জড়িয়ে গায়ে যে প্রেমিক নাচতে ছিল নেশার জগতে―
নারীময় নদী ছিল যার বুকে, সে এখন হাঁটে মরু পথে।
————– ——————— ———————
মাহমুদ কামালের কবিতা
কোথাও স্টিমার নেই
চোখ বুজে দেখি
অপার সৌন্দর্য
বুক কেঁপে ওঠে
তারুণ্যের বন্ধ চোখে
যথারীতি তীব্র আলো
ফুলের বাগানে ফুল
নাকি পুষ্পময় তুমি
প্রৌঢ় চোখ খুলতেই
ঢেউহীন নদী
শূন্য ঘাট
ফেরি নেই
কোনও স্টিমার নেই
.
আমি কে ?
আমি কে ?
এই প্রশ্নের উত্তর
অতটা সহজ নয়
আমি সাধু নাকি শয়তান
জ্ঞানী নাকি মূর্খ
প্রেমিকের মতোই বিপ্লবী
নাকি সৌন্দর্য হত্যাকারী
শঠ, প্রবঞ্চক নাকি বোকা
আমি কি মানুষ ?
নিজেকে চিনতে চিনতে
দুপুর পেরিয়ে বিকেল
সান্ধ্যভাষার মতো
আসন্ন সন্ধ্যায়
প্রশ্নটি এখনও অমীমাংসিত
আমি তবে কে ?
—————– —————— ——————
গোলাম কিবরিয়া পিনুর কবিতা
সন্ধ্যাভাষা নিয়ে সন্ধ্যাকাল
এখন সন্ধ্যাবেলায়―
সন্ধ্যাভাষা নিয়ে সময় কাটাচ্ছি!
কারও ভাষা বুঝতে পারছি না!
সন্দীপককে নিয়েও সন্দিহান হয়ে পড়ছি!
গোয়ালঘরে গোয়ালাকে দেখে মনে হচ্ছে,
সে গোরুচোর!
ময়ূরকে দেখে মনে হচ্ছে,
ওটা দাঁড়কাক―ময়ূরপুচ্ছ পরে দাঁড়িয়ে আছে!
যারা জোছনার দিকে তাকিয়ে আছে,
মনে হচ্ছে―তারা ভয়ানক রকম জোচ্চোর!
দাঁত বের করে যারা হাসছে,
মনে হচ্ছে―তারা দাঁতাল!
দলেবলে আগুন নেভাতে যারা আসছে,
মনে হচ্ছে―দলেবলে ঘোঁট পাকিয়ে,
নিরীহদের ঘরবাড়ি পোড়াবে!
সন্ধ্যাভাষা নিয়ে সন্ধ্যাকাল পার হতে পারছি না!
রাত্রিভাষা নিয়ে সুচিভেদ্য অন্ধকার কাটাবো কীভাবে ?
.
চোখে ঘুম আসছে না
আগে চকিতে থাকতাম
এখন খাটে,
আগে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে ঘুমাতাম―
এখন জাজিম লাগে
জাজিমের ওপর তোশক!
ঘুম আসে না তবু!
আগে তালপাতার পাখায় চলত―
এখন ফ্যানের বাতাসেও চলে না,
এসিও লাগে!
ঘুম আসে না তবু!
ঘুমের ওষুধ খেয়েও ঘুম আসছে না!
ঘুম কি রাগ করে চলে গেল?
ঘুমের জন্য এত আথালি-পাথালি করি,
তবু ঘুম আসছে না!
আগে চোখ বুজলেই ঘুম আসত
ছিল কী শান্তির ঘুম!
ঘরের পাশেই সজিনা ফুল দেখতে দেখতে
সন্ধ্যারাতে চোখে ঘুম নেমে আসত,
এখন মধ্যরাত পার হয়ে যাওয়ার পরও
শেষ রাতেও ঘুম আসে না!
কত কিছু সংযোজিত হলো ?
কী কী বিয়োজিত হলো হিসেব রাখছি না!
ক্ষুদ্র মৃৎপাত্রে এক সরা দুধভাত খেয়ে
যে শান্তির ঘুম ঘুমাতাম,
সেই শান্তির ঘুমকে কোন প্রহরীরা প্রহার করছে ?
———– ——————- —————–
সোহরাব পাশার কবিতা
সন্ধে নামছে
সন্ধে নামছে শহরে
হলুদ রোদের শব্দ-স্নিগ্ধ হাওয়ায়
পাতাদের ক্লাসিক পিয়ানো
পাখিরা ফিরছে
মানুষের খুব রাত হয়
নিঃসঙ্গ পথের গ্রীবা
কার যেন মসৃণ মুখ মনে পড়ছে
মেঘভাঙা জ্যোৎস্না ওড়ছিল
বকুল ছায়ায়
স্মৃতির গুঞ্জন
কেউ কোথাও দাঁড়িয়ে আছে
রাত্রির খুব নিচে একাকী
স্বর-ব্যঞ্জনের মাধুরী;
কী যে নিবিড় স্পর্শের মায়া
তোমাদের গলিতে কি জ্যোৎস্না ঢুকে পড়েছে!
প্রতিবার তোমার দিকেই যাই
চোখে নরম নদীর গন্ধ
মির্জা গালিবের আয়নায়
ঝরে কি নক্ষত্রের ফুল ?
রাত্রির পাঁজরে ঘুম-বৃষ্টির শিহরণ
তোমাকে প্রথম উন্মোচন করে তীব্র
ভালোবাসা―দীর্ঘদিন পর তার কর স্পর্শ করে
যেভাবে রোদ্দুর ঘাসের ঠোঁটে গড়িয়ে পড়ে
তুমি বৃষ্টির ভেতর পুড়তে থাকো মধুর আগুনে।
.
তোমার সঙ্গ
তোমার সঙ্গ নির্জন,
তুমুল আগুনবৃষ্টি
দোলনচাঁপা ভোরগুলি
অন্য ভোরে হাঁটছে;
ভিন্ন পথ হাঁটার জীবন
প্রসন্ন যাপন নেই মানুষের
বিভাজিত শিল্পছায়ার তীব্র কোলাহল
নির্জন কুসুম ওড়ে
বৃষ্টি চোখের তরঙ্গ
রাস্তার মোড়ে মোড়ে অজস্র মেঘবাড়ি
মাথা নিচু ছায়া হাঁটে-নিঃসঙ্গ করুণ,
ব্যবচ্ছেদ-প্রণয় দুপুর
অনিদ্রার পরিভাষা গোপন এলিজি
জানালায় ঝুলে থাকে
মৃতদের সাক্ষাৎকার নৈঃশব্দ্যের সংলাপ
অব্যবহৃত বুনো পথে দীর্ঘ রাত্রির ভ্রমণ;
ভালোবাসা বপন পদ্ধতি-উষ্ণতার
নির্মিত ছায়ার দুর্বোধ্য অনুবাদ
অবিশ্বাস্য দুঃস্বপ্নের সংস্করণ
ফুলশূন্য কাঁটা পড়ে আছে।
————- —————— —————
জাহিদ হায়দারের কবিতা
আত্মজীবনীর অংশ
তখন সন্ধ্যা। বাতাস বিষণ্ন।
অদূরে মেঘেরা আনন্দিত। যাপনে শ্রাবণ।
যুবকের ঘোষণা শুনছে পড়শিরা :
একটা হারানো সংবাদ। নাম শামা। বয়স একুশ-বাইশ।
সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেছে নিজের কোথাও।
নাম্বার একদুইতিনচারপাঁচছয়সাতআট।
দেয়াল থেকে দেয়ালে, ডালের সঙ্গী পাতায়,
জানালার শিকে আর শূন্যতায় নিবেদন ক্ষতবিক্ষত।
কোনও পড়শির কানে নামধ্বনি অন্য ভাবে নত।
‘হিন্দু ? এ পাড়ায় আসল কবে ? শ্যামা তো আমাদের দেবী।
দেখেছিস তাকে ?’ ‘কখনও দেখিনি দিদি।’
সকালের রৌদ্রে, সামনে চা আর খবরের কাগজ।
হারানো বিজ্ঞপ্তিতে : শামা। দৃষ্টিতে জগৎ ত্রিমাত্রিক।
পাড়ায় দেখেছি তাকে একবার। কপালে লাল টিপ। পরনে তাঁতের শাড়ি।
হাতে কাঠের চুড়ি আর সবুজ ব্যাগ। ভেতরে থাকতে পারে চে’র স্বপ্ন।
সহজ মুখের মেয়ে। সহজ পায়ে হেঁটে রিকশায় উঠে গেল।
হয়তো তাকে পাওয়া যাবে কোনও বনভূমির কামিনীছায়ায়।
কেউ নয়, শামা জানে শুধু স্রোতশীলা নদীটার নাম,
তীরে বসে আছে একা কথা বলা ঢেউয়ের মায়ায়।
অথবা সমুদ্রতীরে শুঁটকি পল্লির শিশুদের সঙ্গে তাড়াচ্ছে কাক।
হতে পারে, কিষানির সঙ্গে কুড়াচ্ছে ঝরে পড়া ধান।
মর্গের সম্পদে গেছে যুবক, বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন।
ব্যর্থতার নৈঃশব্দ্যের ভেতর, ফরমালিনের গন্ধের ভেতর,
আশা আর ভয় যৌথ উদ্যোগে দেখেছে ঘুমন্ত মুখ,
পায়ের আঙুলে জীবনের ঝুলন্ত নাম।
নিয়তিনিয়মে সভ্য সারি সারি লাশ দেখে
গাছের ছায়ায় এসে নিচু স্বরে কজন সন্দেহের বুদ্ধিতে
কিছুটা সফল ভেবে বলে, যেন প্রসঙ্গ নতুন,
‘হয়তো চলে গেছে গোপন প্রেমিকের সাথে।
বাসার লোকেরা সত্য বলছে না।’
বন্দরে সীমান্তে চলে গেছে সন্ধানের ছবি আর বর্ণনা।
নদীতে ভেসে ওঠা কাকে ঠোকরানো গলিত লাশ তরুণীর নয়।
নারীর দালালদের চলাফেরা দেখছে আতস কাচ।
বেশ্যালয়ে গোয়েন্দার মৃদুহাসি তৎপর,
ছবিতে মিলছে না যৌনজীবিকার মুখ।
নিজেকে প্রশ্ন করি, যদি না করি, মনে হয় ঘুমানো এক মানুষ।
শামা কি কোথাও লিখে গেছে?
: ঘেমে যাচ্ছে দেখার সব অভিজ্ঞতা,
পরাজয়ের সঙ্গদিন বড় হচ্ছে,
হাসছে পুঁজির উষ্ণরেখা। উড়ছে স্বপ্নের ছাই।
দেখছি, আধুনিকতার ঋতুভিত্তিক পোশাক বদল।
শুনেছি, নতুন সুদূরের খোঁজে নতুনেরা চলে যাচ্ছে।
শামা হারায়নি, পালায়নি কোথাও।
.
মন্ত্র
আয়না পবিত্র
তুমি যতক্ষণ না সামনে দাঁড়াও।
আমাকে বিবর্ণ করে
তুমি কোন প্রতিবিম্বে উজ্জ্বল ?
আমি কি ব্যথার অনুষঙ্গ তার ?
———- —————— ————— –
নাজমুল হাসানের কবিতা
অন্তরালের মুখ
কত মুখ ছিল ছায়া হয়ে খুব কাছে। তারা আজ আর নেই!
চ’লে গেছে দূরে, না জানিয়ে কবে!
মায়াবি কুয়াশা নয়, ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সূচীভেদ্য পথে…।
সুমেরু বৃত্তের নীলাভ অরোরা নৃত্যরত চোখে
কার অপার্থিব ছোঁয়া পেয়ে ক্ষণকাল ছিল ভুলে খেলাচ্ছলে…
শীতার্ত ও রোমাঞ্চিত, এসেছিল দীর্ঘ যাত্রা শেষে
চেয়েছিল আশ্রয় এই পর্ণ কুটিরে;
এখনও উজ্জ্বল উষ্ণ উপস্থিতি তার,―সৌরভ বাগানে, নির্জন অলিন্দে
যখন ছিল সে রুগ্ণ ও শায়িত নিদ্রাহীন।
মধ্যরাতে শিউলি ফুলের ধবল পেলব গায়ে চাঁদের আলোয়
মূর্ছিত চেতনা হেঁটে যায় সন্তর্পণে ঘুমন্ত উঠানে;
কাঙাল স্বভাবে দুষ্ট দুটি পায়ে শত বঞ্চনা ও ক্লেশ তুচ্ছ করে।
তবু প্রার্থনায় সে অনড়, সব শুভকামনা মন্ত্র উচ্চারণে
গান গায় নীলকণ্ঠ পাখির সুরেই… শরৎ মেঘে ভেসে।
আদুরে নিষিক্ত প্রেম, লুকিয়ে রাখে মুখ অন্তরালে
অনুসন্ধানে আজন্ম ব্যপ্ত ঘরে ও বাইরে; আপন গহিনে।
শেষ যাত্রার আগে করাঘাত করে রুদ্ধ দরজায়
বায়ুভূত আকাক্সক্ষার অযুত কঙ্কাল জেগে ওঠে মহাশ্মশানে
দিনের আলোয় ধীর পায়ে হেঁটে যায় কবন্ধের সারি দূর লোকালয়ে!
.
ফেরারি যৌবন
ভোর হবার আগেই ভেঙে যায় নিদ্রাহীন ক্লিষ্ট দীর্ঘ রাত!
রাতের প্রহরী লিখে রাখে সোনালি হরফে
এক আদ্যোপান্ত অপোগণ্ড জীবনের নাতিদীর্ঘ দুর্বোধ্য ফিরিস্তি…
আশাহত দিন তবু গোধূলির রেণু হয়ে ছড়িয়ে যায়
প্রত্যন্ত পল্লির ধূলিময় মেঠো পথে!
প্রতিটি স্তরেই ভূমিশয্যা, আর ভুল সমীকরণের জট
অমিল ছন্দের স্বেচ্ছাচারী কেটেছে জীবন প্রতি পদক্ষেপে
তবু আত্মগরিমায় বলীয়ান এক দেবদূত
যার ভাগ্যলিপি আগুন হরফে লেখা
এক রাতে প্রবল অবাধ্য ঝড়ে, ছিঁড়েখুঁড়ে উড়ে গেছে কবে
এলোমেলো বিশৃঙ্খল বন্ধনহীন সময়!
ছুটছে ঝটিকা ট্রেন, পিছু নেয় বাইরে আবাল্য শৈশব তার
নগ্ন পায়ে ফেরারি যৌবন উতপ্ত বালুতে হেঁটে যায় একা
প্রথম শ্রাবণে অঝোর বৃষ্টিতে মুছে গেছে মনস্তাপ
বঞ্চনার খেদ, সাগরের নুনহাওয়া মেখে শেষ রাতে
ফিরেছিল বিপরীত স্রোতে শ্রান্ত, অখ্যাত শহরে ভীষণ ক্ষুধার্ত!
ঘর আর পর নিয়ে কখনও ছিল না উৎকণ্ঠা তার।
নিখোঁজ হবার পর কেটেছে স্বাচ্ছন্দ্যে দিবারাত্রি কাব্য পাঠে!
তারা ভরা ভোরের আকাশ চলে গেছে তাকে একা ফেলে
আশাহত, অনির্দিষ্ট ঠিকানায়…!
—————- ———————- ——————–
হাসান হাফিজের কবিতা
চলো আত্মা চলো মন
মৃত্যুচিন্তনের সঙ্গে বসবাস করছি ইদানীং।
শ্বাস ফেলছে ঘাড়ের ওপর, উপলব্ধ হয়।
নিঃশব্দে কখন তার কাজটুকু করে ফেলবে
আগেভাগে অনুমান আসলেই মহা মুশকিল।
জাগতিক তন্দ্রাঘোর ছিন্ন হবে মুহূর্তেই
ঈর্ষা মোহ লোভ কাম ফুৎকারে উড্ডীন হবে
ধরাধামে তিষ্ঠানোর আর কোনও অবকাশ নাই,
অসমাপ্ত জলছবি হয়ে থাকলো পঙ্গু এ জীবন
শুধু হাহাকারই সত্য নিষ্ফলা রোদনই ধ্রুব
এই মর্ত্য ধুলো ঘাস অন্তরীক্ষ পাখির কূজন ছেড়েছুড়ে
চলো মন চলো আত্মা অগস্ত্যযাত্রায়
একদা যে স্রোতঃস্বিনী ছিল আজ বন্ধ্যা বালিয়াড়ি
চরাচরে শূন্যতা-জখম এক জ¦লজ¦লে সত্য হয়ে আছে
ও মৃত্যু মরণসখা তোমার বন্ধুতা কেন সুনিবিড়
তুমি আছো বলেই তো বেশি বেশি জীবন-বন্দনা
তুমি চির অবসান অনন্তের পথরেখা সুদূর বিধুর
অদৃশ্য হয়েও তুমি স্পন্দমান প্রকৃতই অলক্ষ্য সুন্দর।
.
অনুনয় সবিনয়
একবার আলগোছে ডেকেই দ্যাখো না
প্রসারিত করব হাত
ঘন উষ্ণ আলিঙ্গনে
স্পন্দনের সূক্ষ্ম মিহি
অনুভব সংবেদন
বিনিময়, মিথষ্ক্রিয়া যা-ই বলো
নিশ্চিত জুড়িয়ে দেবে
তাপিত এ প্রাণ
তৃষিতের জন্যে একটু দয়া করো
স্বস্তি শান্তি ভিক্ষা দাও
নামঞ্জুর কোরো না এ বিনীত আরজ
একবার শুধু তুমি ফিরে তাকালেই
যুদ্ধ হত্যা বিভীষিকা রক্তপাত
বন্ধ হবে সব প্রগতির সুরেলা উৎসব
এস এসো ভালোবাসা
চলে এসো মানবতা
ধরিত্রীকে বাসযোগ্য করে তোলো প্রিয়…
————– ———————- ——————–
শামীম আজাদের কবিতা
এ বার্ড বিয়োন্ড দ্য বর্ডার
পৃথিবী যে আমার জন্য গালে হাত দিয়ে অপেক্ষা করবে না
যখন জানলাম
তখন থেকেই জীবনের সালুনে নিজের বুদ্ধিমতো
আনকোরা অ্যাসপারাগাস আর তরকারিতে তানপুরা না বাজিয়ে
নতুন ঝোল দিয়ে মেনু নবায়ন করলাম।
কবিতা ও স্টোরি টেলিং-এর সাথে এবার শেক্সপিয়ার অ্যান্ড চিপস যুক্ত হলো।
এরপর সবাই আরও কিছু মেইন যোগ করলে
নানা ধরনের পরামর্শ দিলেও
পুরোনো ডি এল রায় ডেজার্ট রয়ে গেল, রেখেই দিলাম।
পালটানো মেনুতে দেখি ঝাঁপিয়ে পড়েছে মানুষের পাল
বুকিং নিয়ে কুল পাচ্ছি না
এপ্রিল-মে এলে কদম ও বর্ষা ছাড়াই আড্ডা জমছে যা!
ভোজ শেষে কস্টা কফি কিংবা চমৎকার চায়ে চুমুক দেওয়ামাত্রই
আমি গেয়ে উঠি ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি…’
তখন দেখি আমার সঙ্গে বাকিরাও বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়
আর আমার চোখজোড়া ভিজে সুরমা কুশিয়ারা হয়ে
টেমসের তীরে এসে ‘কমপ্লিট ওয়ার্কস অব শামীম আজাদ’ হয়ে যায় ॥
.
সব চেয়ে উৎকৃষ্ট
এই ঘন একাকীত্বে অন্ত্রে একুশ ও একাত্তর বাজে দ্বিগুণ ত্রিগুণে
আমরা কুয়াশা ও অন্ধকার গোলার্ধ পেরুতে থাকি
আহত, বিক্ষুব্ধ ও জাগ্রত খুনে।
শাস্ত্রের বদলানো বিবৃতিতে, অধগামী লিটারেচারের অত্যাচারে
আঘাতে আঘাতে বছরের পর আরেক বছরে।
কে যেন আমাদের জন্য ছায়া পুতে রেখেছিল!
এখন তার একটু খানি হলেও চাই
সময়ের বালি কিংবা বকুলের
ফুল কিংবা ফাগুনের, ধান কিংবা ধলেশ্বরীর
আর ক্যাটালগ দেখার সময় নাই।
এখান হতেই তো শুরু করা যায়
রোদের লাল রঙ্গন থেকে কিছুটা দূরে এই প্রভাতের পাটে
যেখানে রয়ে গেছে পাখি ও পর্বতের যৎসামান্য-কিঞ্চিৎ শ্বাস
ঋতুর ঝঞ্ঝাট ছাঁটা ডিসেম্বরের ডাল এই তো সে গাছ
বাংলায় রক্তজবা ইংরাজিতে হিবিস্কাস।
কাতর চোখে, বেফানা আর্তনাদে আমরা অনেক ক্লিষ্ট
তবু বুঝি সেই ছায়া সেই সময়ই ছিল উৎকৃষ্ট ॥
———- ————— —————-
ফারুক মাহমুদের কবিতা
হৃদয়ে রহো
(উৎস: রবীন্দ্র-অনুরাগিণী রাণু মুখোপাধ্যায়)
আমার ঘুমের গন্ধে, নিশিথে, তোমার নাকি ঘুম ভেঙে যায়!
তোমার স্পর্শের ঘ্রাণ সচিত্র জাগিয়ে রাখি উঁচু-নিচু ঘুমের ভেতর
ছাড়িয়া নিকট-সীমা―চলে আসি শত গুণ কাছে
সাঁতারের মরুতেষ্টা। যেন―ঢেউয়ের পশ্চাতে ঢেউ
হোক-না প্রবীণ বৃক্ষ! তবু, শরীরে জড়িয়ে রাখে
অণুবয়সের লতা, পাখিদের দাম্পত্যজীবন
শাখাপত্রে চোখ তোলে অহরহ চুমুর বাতাস
আকাক্সক্ষা নির্মল হলে, দুটি বয়সের মধ্যস্থানে
‘পঁয়তাল্লিশ’ বড় কোনও ব্যবধান নয়
নতুন বন্দিশ যদি―প্রাণ পায় পুরোনো সেতার
স্তনোদগমের বয়স। কি-যেন কী ভেবে
‘রবিবাবু’ সম্বোধনে পাঠালাম সাহসের মুগ্ধশব্দচিঠি―
কেন আমি আনন্দের ক্রমাগত জলে
ডুবে যাই। ভেসে উঠি। বিষাদের চাপাজ্বরে পুড়ি শৈত্যের দহনছোঁয়া দেহ-মনে স্থায়ী হতে চায়
‘ভানুদাদা’, অপেক্ষা করো না
যথেষ্ট সময় করে চৈত্রের বৃষ্টির মতো একদিন ঠিক এসে যাব
মন এক আশ্চর্য ভ্রমণ। ইচ্ছেটি বাড়িয়ে দেখো―
প্রেমের অমল শক্তি উচ্ছলিত আমাদের অশ্রুপুণ্যস্রোতে
.
কথার অনেক পথ হেঁটে
‘ভানুদাদা’ সম্বোধনে তোমাকে ডাকার সর্বস্বত্ব
শেষাবধি আমিই পেলাম
নতুন পাতার মতো হাসির সঙ্গে হাসি মিশিয়ে
বলেছিলে, ‘এই নামে কেউ
কখনও ডাকেনি। আর, ডাকলে এখন আর জবাব দেব না।’
বাড়ির দেওয়া আমার নাম
‘প্রীতি অধিকারী’
প্রীতি-অধিকারে
ডেকেছিলে ‘রাণু’ সম্বোধনে
তোমার নামের স্বত্ব পেয়ে
আমার নামের স্বত্ব দিয়ে
আমাদের কী-যে সুখ হলো!
জগৎ-সংসারে এর তুল্য কিছু নেই
—————- ——————- —————–
নাসির আহমেদের কবিতা
স্বপ্নের ভেতর দিয়ে
আশ্চর্য উদ্যানে ঢুকে বিস্ময়ে নির্বাক!
রকমারি পুষ্পে সুশোভিত
সৌরভে-ঔজ্জ্বল্যে যেন স্বর্গপুরী!
অগণিত প্রজাপতি-রঙিন ডানায় ছাওয়া সবুজ প্রান্তর।
মাথার ভেতরে রাশি রাশি প্রজাপতি
স্নায়ুর গভীর স্তরে সাতরঙে শৈল্পিক কোলাজ!
মুগ্ধ বিহ্বল একা হেঁটে যাচ্ছি অচেনা উদ্যানে
যেন হাজার বছর ধরে হাঁটছি নন্দনপথে জীবনানন্দের ধীর পায়ে!
অকস্মাৎ দেখি সেই স্বপ্নপুরী মুহূর্তে উধাও!
স্নায়ুকোষে ঢুকে গেছে ঝাঁক ঝাঁক
আরশোলা আর তেলাপোকা!
তাদের বিষ্ঠার বিশ্রী গন্ধে বমি ওক দিতে থাকে!
একটা সুন্দর ল্যান্ডস্কেপে
ভোরের রক্তিম সূর্যের সমান বৃত্ত ছুঁয়ে ছিল যে উদ্যান
মুহূর্তেই ধূসর মরুর শূন্যতায় সে উদ্যান!
প্রজাপতি মুছে গিয়ে স্নায়ু থেকে তেলাপোকা, আরশোলা ভয়াল গুঞ্জনে নেমে আসে মৃত্তিকায়।
.
শাশ্বত তোমার সত্য
ক্লান্তি এবং নৈরাশ্যের থেকে
তুমিই আমার অন্তর্লোকে সহসা বিস্ফোরণ!
যে জগতে তুমি প্রবেশ করালে, এ আমার কাছে অচেনা এবং রহস্যময়―যেন তুমি প্রেম! অথচ অচেনা!
প্রশান্তি তুমি কী অপরিসীম আনন্দ-মায়া!
রূপকথা থেকে উড়ে আসা পরি অবুঝ শিশুকে যেভাবে ভোলায়―মোহ মুগ্ধতা তারও বেশি ঘোর
ইহলোক থেকে যেন পরলোকে অচেনা স্বর্গ দেখি!
পরিতৃপ্তির সুখ পান করি তোমার নামেই
আত্ম উন্মোচনের পিপাসা তুমি ? সক্রেটিস কি তোমারই অন্বেষণে হে সত্য হেমলক পানে-মৃত্যু অনিচ্ছুক!
অস্তিত্বের সংজ্ঞায় চির সংহতি তুমি ? মিলনের গূঢ় রহস্যমায়া প্রেমিকের চোখে!
অথচ তোমাকে পাইনি কোথাও!/ ধ্যানে কেটে গেল দীর্ঘ জীবন! ধর্মগ্রন্থে, তীর্থস্থানে―এমনকি এই
আত্মগুহায়! অবশেষে দেখি বুকের বাঁপাশে স্পন্দিত
তুমি ধমনির ধ্বনি! আমি কি আমার আত্মমুগ্ধ ধ্যানী ?
———— —————— ————-
শিহাব সরকারের কবিতা
আমার ভেতরের চুপ
নির্লজ্জ নারীরা ভেতরের চুপ তছনছ করে
ভাঙো, ভাঙো, ভাঙতেই থাকো
এ কবিতা কখনওই আমার নয়,
কবিতার বৈঠকে মিলেমিশে একাকার মূকাভিনয়।
শ্বাসনালি চেপে ধরেছে রাক্ষসী কাঁকড়ার দাঁড়া
আজন্ম ধ্যানে ডুবে আছে বাল্মীকি,
ছন্দছুট কবিতা পালাতে পালাতে বালুতেই হারায়
দূরে কেন যাবে ? গুপ্ত সুড়ঙ্গের চাঁদে বিভোল সাহারা।
বেশরম নারী মূলত উপদ্রব, উত্যক্ত করে ভোর রাতে
যদিও বনজ্যোৎস্নায় জমে চাঁদভাসী মেলা
ওরা ঘুমকে পাঠায় দানবের কার্নিভালে।
পুরুষের হৃৎপিণ্ড হয় ফালা ফালা মন ভোলানির করাতে।
রাক্ষসী চন্দ্রিমার কুহকে দ্যাখো পৃথিবী আজ অচেনা
বেদুইন নারীরা নৃত্য করে ঘাসে কোরাসে,
নূপুরের নিক্বণে ওরা সকলেই হাওয়ার শিমুলে ভাসে।
.
প্রত্নসন্ধানীর ধূপ
অহনা মায়াজাল বুনিছে, শুকতারা বাড়ায় পিপাসা
খুঁজে যাই আমি হারানো সব গুপ্ত ঠান্ডা মোহর
এত ছন্দছুট গীত, কোলাহল, সাইমুম গুপ্ত নহর
আমার ভেতরের চুপ নিঃশব্দে মরে যায়।
লাশ কাঁদে হেঁটে যাই আমি ক্রোশ ক্রোশ
যাযাবর নারী কী দেখে কাঁদে, কে জানে
বোঝে ওরা আমার বেকুবি, ওরা সঞ্জীবনী জল টানে
খায়, গায়, ডুবে তলিয়ে হারাতে থাকে।
বাজছে দারবুকা, বেন্দির, মাকাম যত বালু তেপান্তরে
আমার ভেতরের চুপ কেবলই সমাধি খোঁজে
এই তাহলে ধ্রুব ? সত্য পেয়েছে ঘ্রাণে প্রত্নসন্ধানীর ধূপ
জেনেছি কীভাবে জাগে আমার ভেতরের চুপ।
————- ——————- ————–
আবিদ আনোয়ারের কবিতা
প্রাণায়াম
জীবনও বাগান বটে, আমি সেই বৃদ্ধ বাঞ্ছারাম
ক্রমাগত আয়ু খুঁজি অনাগত নাতি ও পাতায়,
কুঁড়ির সুস্বাস্থ্য চেয়ে কত ঘুম করেছি হারাম,
বুঝেছি অমোঘ সত্য: মুমূর্ষুও প্রণোদনা চায়।
সোঁদাগন্ধী মাটি আর গন্ধময়ী তরুণী নাতবউ
বয়স্ক শিরায় বোনে সঞ্জীবনী আরকের মতো
কী যে এক স্বপ্নবীজ―সব তার বুঝি কি আদৌ ?
তবু দেখি সেরে ওঠে চুপিসারে বার্ধক্যের ক্ষত।
প্রিয়জন সদকা দেয়, বিরক্তরা জালালি খতম,
ফেসবুক সয়লাব হয় বন্ধুদের শুভকামনায়,
কখন বিদায় নেব এই নিয়ে দ্বিধান্বিত যম―
এভাবেই সুখে-দুখে দিনগুলো দিব্যি কেটে যায়।
জীবন্মৃত টিকে আছি আমি সেই বৃদ্ধ বাঞ্ছারাম
মরে গিয়ে নড়ে উঠি, কুড়িয়েছি বাঁচার দুর্নাম।
.
গুঁতোগুঁতি
গোমেধ যজ্ঞের চেয়ে কোরবানিতে গরু মরে ছহিসালামতে,
কেননা মোল্লার ছুরি ঢের ভালো আগুনের চেয়ে…
সত্য কি না জানতে চেয়ে গরুদের কাছে
‘হাম্বা’ ছাড়া অদ্যাবধি আর কোনও জবাব মেলেনি।
গরু বড় শিষ্ট প্রাণি
পুরানের মুনি থেকে গাবতলীর সুরুজ বেপারি
সকলেরই কথা শোনে পরম নিষ্ঠায়,
পারে তো জবাইকালে
‘আল্লাহু আকবার’ ব’লে নিজেই নিজের গলা পেতে দিতে চায়
যেমন একদা তারা স্বর্গে যাবে সে-আশায়
অকাতরে ঝাঁপ দিত লোলজিহ্বা হোমের আগুনে!
কথাশিল্পী বনফুল গল্পচ্ছলে জানিয়েছিলেন
গোমাংসের স্বাদ খোলে কোন রেসিপিতে
তা নিয়ে বিতর্ক চলে গরুদের মহতি সভায়,
মতানৈক্যে তার্কিকেরা শিং নেড়ে ক্ষণস্থায়ী কলহ বাধায়…
এছাড়াও বাল্যকালে আমি নিজে অনেক দেখেছি
প্রভুদের বিনোদন দিতে পাতানো লড়াইয়ে
তারা খুব বড়জোর ‘প্রীতিখেলা’ খেলে!
পক্ষান্তরে মানুষেরা গোত্রভুক্ত হয়ে
গরু নিয়ে তর্কে মেতে নিজেরাই গুঁতোগুঁতি করে।
—————- ——————— —————
মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতা
যুদ্ধে কোনও জয় নেই
যুদ্ধে কোনও জয় নেই, শুধু পরাজয়;
ভালোবাসা জয় করে অজেয় অভয়।
কাকে তুমি শত্রু করে নিজে শত্রু হও ?
মানুষ, তুমি তো নিজে অমানুষ নও।
জলেস্থলে নীলিমায় ভালোবাসা চাষ,
ত্রিভুবনে প্রাণি আর প্রাণের নিবাস।
প্রাণে প্রাণে সখ্য সত্য যদি চিরদিন
প্রাণে প্রাণে বিনিময়ে শোধ সব ঋণ।
অর্থ নয় কীর্তি নয় প্রতিপত্তি নয়,
ভালোবাসা বিনিময়ে মানুষের জয়।
এক বিশ্ব এক প্রাণ ভুবনসন্তান
জীবে জীবে বরাভয় জীবে পরিত্রাণ।
যুদ্ধে কোনও জয় নেই, যুদ্ধে শুধু ঘৃণা;
জন্মে জন্মে ভালোবাসা বিজয়ের বীণা।
.
না বিপ্রাণিক
যার যা ধর্ম
তা পালন যেমন সুসিদ্ধ,
যার যা অধর্ম
তা ত্যাগও নয় কিন্তু অসিদ্ধ;
শুধু দৃশ্য বা অদৃশ্য
সীমারেখাটাই থাক,
বিপ্রাণিক স্পর্শদোষে
কেউ যেন না হয় নাপাক;
না সঙ্গদোষ
না রঙ্গদোষ
না অনঙ্গ দোষ
প্রাণে প্রাণে গ্রহণ-বর্জন
হোক বিনিময়ী বিসর্জন;
সব ধর্ম কেন অধর্ম হবে ?
প্রাণিক সব ধর্মের তো জয় হবে;
মানব, তুমি তো নও বিমানবিক;
প্রাণি, তুমি তো নও বিপ্রাণিক;
তাহলেই, হে তৈলাসক্ত বিমানব,
তুমিও নিশ্চিত হয়ে যাবে মানব-অধিক;
না, এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে
প্রাণি কখনও হতে পারে না বিপ্রাণিক।
————— —————— —————-
মতিন বৈরাগীর কবিতা
নতুন মানুষ বানাই
ছোট্ট সোনালি পাখিটা পাখায় নিয়ে উড়ালের অহংকার
চলে গেল দিনের শেষের আলোটুকু নিয়ে
আর একটা নিশাচর যখন ফিরে পেল চোখের আলোক
তখন চারিদিকে ঘন অন্ধকার
পিছু পিছু রক্তমুখী মহামারি হেঁটে এল সংসারের দিকে।
আকাশ গলগল করে ঢেলে দিল কালোর প্লাবন।
জমাটবাঁধা সবুজ দূর-পাহাড়ে ছায়ার মতো হাহাকার
প্রতিরূপ নিশীথের দিকে―
নীলকণ্ঠের প্রতিকারী হাতে থমকে আছে ভাঙা ত্রিশূল।
মহামারির পদধ্বনি দক্ষের সংসারে।
বেহুলার চোখে ঘুম নামে নিয়তির মতো কাঁপে লোহার বাসর,
সব বাদুড় বেরিয়ে পড়েছে, এখন উড়বে।
ধারালো দাঁতগুলো আঁধারেও ঝলকায় গৃহস্থালি নির্জীব নিস্পন্দ
এক শিল্পী ছুড়ে ফেলে রঙের তুলি
নিজে নিজে বলছে এত দৃশ্যের জায়গা নেই
আমার ইজেলে;
তার চেয়ে এসো
মাটি দিয়ে নতুন মানুষ বানাই
.
স্মৃতির উদ্ভাস
আর যদি সেই জায়গাটা খুঁজে পাওয়া যায় কখনও
আশপাশ কণ্টকাকীর্ণ না হয় কিংবা গোখুর না হাঁটে
সেই শিরীষ গাছটা এখনও থেকে গেছে নিশানার মতো
সেই নদী যেটা ছিল খরস্রোতা
এবং সেই নদীতীর থেকে পঞ্চাশ কদম দূরত্বটা আর
সেই স্মৃতি ঠিকঠাক সক্রিয় থাকে আগের মতন
তাদেরকে গোর দেয়া হয়েছিল খুব গোপনে
পাঞ্জাবি জ্বালিয়ে দিচ্ছিল গ্রাম মুক্তি মুক্তি বলে
পাঞ্জাবি খুঁজছিল মুক্তির স্বপ্ন
আর সেসব অনেক দিন হয়ে গেছে, তুমি বললে :
আমি বললাম আমার তো মনে হয় সে কেবল সেই দিন
আর আমি সবকিছু থেকে পালিয়েছিলাম
আমি বলছিলাম, কিচ্ছু জানি না, কেউ জিজ্ঞেস না করতেই
আর যখন দেখি সেই তারা নিজের দিকে টানছে সব
পাঞ্জাবির মতো
আমি বলছি আমি ওসবের কিচ্ছু জানি না
কেউ জিজ্ঞেস না করলেও।
———— —————– —————-
নির্মলেন্দু গুণের কবিতা
স্ত্রী
রান্নাঘর থেকে টেনে এনে স্তনগুচ্ছে চুমু খাও তাকে।
বাথরুমে ভেজানো দরোজা খুলে অনায়াসে ঢুকে যাও,
সে যেখানে নগ্নদেহে স্নানার্থেই তৈরি হয়ে আছে―
আলোকিত দুপুরের কাছে, মনে রেখো, তোমার রাত্রি নেই,
অন্ধকার বলে কিছু নেই।
বিবাহিত মানুষের কিছু নেই যত্রতত্র স্ত্রী-শয্যা ছাড়া,
তাতেই শয়ন করো, বাথরুমে, পুজোঘরে, পার্কে, হোটেলে―
সন্তানের পাশ থেকে টেনে এনে ঠোঁটগুচ্ছে চুমু খাও তাকে।
তার প্রতিটি উৎফুল্ল লগ্নে এক-একটি চুম্বন,
প্রতিটি রক্তিম মুখে এক-একটি নিশ্বাস দিতে হবে।
সভ্যতা ধবংস হোক, গুরুজন দাঁড়াক দুয়ারে,
শিশুরা কাঁদতে থাক; যমদূত ফিরে যাবে
এবং অভাব দেখো লজ্জা পেয়ে ম্লান হবে কিশোরীর মতো।
যেমন প্রত্যহ মানুষ ঘরের দরোজা খুলেই
দেখে নেয় সবকিছু ঠিক আছে কি-না, তেমনি প্রত্যহ
শাড়ির দরোজা খুলে স্ত্রীকেও উলঙ্গ করে
দেখে নিতে হয়, ভালো করে দেখে নিতে হয়;
জঙ্ঘায়, নিতম্বে কিংবা সংরক্ষিত যোনির ভেতরে
অপরের কামনার কোনও কিছু চিহ্ন আছে কি-না।
.
ক্যান্টনে নিরিবিলি
এইখানে এলে মনে হয় তুমি
সবচেয়ে বেশি নেই।
তোমাকে ক্ষণিক পাবার জন্য
এখানেই তবু আসি,
মুগ্ধ পরান যতদূর চায়
ততদূর ভালোবাসি।
একটি চেয়ার উবু হয়ে থাকে
টেবিলে মুখের মতো,
মনে পড়ে যায় নতমুখী তুমি
চুম্বনে কম্পিত।
এইখানে এলে মনে হয় তুমি
সবচেয়ে বেশি নেই।
ভীরু হাতে কত আদর শিখেছি
এইখানে এলে বুঝি,
কত বেদনার ভালোবাসা নিয়ে
তোমাকেই তবু খুঁজি।
প্রাণ গুঁজে দিই ছবির ভেতরে
আগুনে পোড়াই হাত,
করতল খোঁজে মৎস্যকন্যা
তুমি যদি এঁকে দাও।
এখানে এলেই মনে হয় তুমি
স্তব্ধ প্রতিমা, স্মৃতি।
এইভাবে রোজ বসে থাকি একা
জেসমিনে ডোবে ঠোঁট,
ইঁদুরের মতো কেটে কেটে খাই
বিরহের করপুট।
তুমি নেই তাই কমেছে আদর
শুধায় না কোনও জন,
আমার চেয়েও ভালোবেসেছিল
নিরিবিলি ক্যান্টন ?
এইখানে এলে মনে হয় তুমি
সবচেয়ে বেশি নেই।
.
— — — —
সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক



