Uncategorized

নিবন্ধ : লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা এক কিংবদন্তি-শিল্পীর জীবনভাষ্য : সুমন সরদার

আত্মজীবনী এমন এক সাহিত্যরীতি, যেখানে কোনও ব্যক্তি জীবন-অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে তাঁর স্মৃতি, সাফল্য, ব্যর্থতা ও অনুভূতির কাহিনি নিজেই বর্ণনা করেন। আত্মজীবনী শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ নয়, এর মাধ্যমে সুদীর্ঘ সময়ের পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাও প্রতিফলিত হয়। একজন আত্মজীবনী লেখক নিজ জীবনের ঘটনা যথাসম্ভব সত্য ও নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরেন। তিনি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য বা গৌরবের কথাই তুলে ধরেন না; পাশাপাশি ভুল, ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করেন। আত্মসমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর লেখাকে বিশ্বাসযোগ্য ও মানবিক করে তোলে। আত্মজীবনীর সার্থকতা নির্ভর করে তাঁর ভাষা ও রচনাশৈলীর ওপর। ভাষা যদি সহজ, প্রাঞ্জল, সাবলীল ও আবেগময় হয়, তবে তা পাঠকের মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। এ কথাগুলোর অবতারণা এক জীবন্ত কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌসী রহমানের আত্মজীবনী লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা গ্রন্থটিকে সামনে রেখে। এ গ্রন্থের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা জুড়ে উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো ছড়িয়ে আছে―এ কথা বলাই যায়। ফেরদৌসী রহমানের লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা গ্রন্থের হাসিমাখা শিল্পীর প্রতিকৃতি যুক্ত করে দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ এঁকেছেন আনিসুজ্জামান সোহেল। ছয়শ টাকা মূল্যের এ গ্রন্থটি বেরিয়েছে ঢাকার স্বনামধন্য প্রথমা প্রকাশন থেকে।

দুই

আষাঢ়ের বিকেল। টিপটিপ বৃষ্টি পেরিয়ে বেঙ্গল শিল্পালয়ের কাছাকাছি যেতেই তুমুল বৃষ্টি শুরু। জিজ্ঞেস করার আগেই অভ্যর্থনা টেবিল থেকে জানানো হলো, সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই দোতালায় অনুষ্ঠান। বেঙ্গল শিল্পালয়ের চেনা সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে উঠে গেলাম দ্বিতীয় তলার হলঘরে। প্রবেশদ্বারে থরে থরে সাজানো গ্রন্থের দিকে তাকাতেই মনে পড়ে গেল ছোট্টবেলা থেকে শুনে আসা সেই বিখ্যাত গানটির কথা―‘ও কি গাড়িয়াল ভাই, কত রবো আর পন্থের দিকে চাইয়ারে…।’

হলঘরে তখন হাতেগোনা কয়েকজনের উপস্থিতি ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি উপেক্ষা করে আমন্ত্রিত দর্শক বৃষ্টির ঢলের মতোই প্রবেশ করতে থাকলেন। মনে পড়ল ফেরদৌসী রহমানের গাওয়া ১৩ নং ফেকু উস্তাগার লেন ছায়াছবির ‘এই রিমঝিম বর্ষায় জানি না কী শিহরণ’ গানের সুর-ছন্দ। আমার মনটাও ক্ষণে ক্ষণে শিউরে উঠছিল এই ভেবে যে দুই যুগ পরে কিংবদন্তি শিল্পীকে সামনে থেকে দেখতে পাব। ঠাঁই নিলাম তৃতীয় সারির মাঝামাঝি। পরিচিত কয়েকজন সঙ্গীতশিল্পী, সাহিত্যকর্মী ও সাংবাদিকের দেখা মিললো। দেখা হলো প্রায় সাড়ে তিন দশক পূর্বের একটি দৈনিকের সাবেক সহকর্মী মুফদি আহমেদের সঙ্গে। বাড়ি নীলফামারীর ডোমারে। যাঁকে কেন্দ্র করে বেঙ্গল শিল্পালয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজন, সেই কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী ফেরদৌসী রহমানের কাজিন তিনি। বাইরে তখনও ঝুম বৃষ্টি। বিকেল পাঁচটা চল্লিশে ঘোষণা এল প্রধান অতিথি যানজটে পড়েছেন। তিনি শীঘ্রই এসে পড়বেন।

দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা সত্ত্বেও দর্শকের মধ্যে বিন্দুমাত্র ধৈর্যচ্যুতি ঘটেনি। পৌনে ছটার দিকে হুইলচেয়ারে বসে সদা হাস্যময়ী শিল্পী ফেরদৌসী রহমান হলঘরে প্রবেশ করেন। উপস্থিত দর্শক শ্রদ্ধাবনতচিত্তে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করেন। বেঙ্গল গ্রুপ লিমিটেডের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী পুষ্পস্তবকসহ তাঁকে  অভ্যর্থনা জানান। কণ্ঠশিল্পী অনুপমা মুক্তির কণ্ঠে ফেরদৌসী রহমানের গাওয়া দুটি গান দিয়ে শুরু হলো অনুষ্ঠান। মঞ্চের নিচে দর্শকের মুখোমুখি চেয়ারে বসে দর্শকসারিতে মিশে গেলেন তিনজন―বাংলার কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌসী রহমান, আরেক কিংবদন্তি শিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদী ও কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাপা।

৭ জুলাই, ২০২৬ তারিখে ঢাকার ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে এক জমকালো উৎসবের মধ্য দিয়ে প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ফেরদৌসী রহমানের আত্মজীবনী গ্রন্থ লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচিত হয়। উৎসবে আগত এক ঝাঁক সাংবাদিকের ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দ বৃষ্টির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছিল। যেন কোনও গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসব নয়, উৎসব যতটুকু তা বাংলা গানের এক জীবন্ত কিংবদন্তি ফেরদৌসী রহমানকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা জানানোর উৎসব। তা হবেই বা না কেন! যেখানে স্বয়ং উপস্থিত কিংবদন্তি শিল্পী।

সঞ্চালক মেরিনা ইয়াসমিন শিল্পী কর্তৃক ফেরদৌসী রহমানের একটি অতি সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করার মধ্য দিয়েই মূল পর্বে প্রবেশ ঘটে। কবির বকুল গ্রন্থটি প্রকাশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। আলোচনা করেন রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা ও সৈয়দ আবদুল হাদী। স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রথম আলোর সম্পাদক ও প্রথমা প্রকাশনের কর্ণধার মতিউর রহমান ও বেঙ্গল গ্রুপ লিমিটেডের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের। ফেরদৌসী রহমান তাঁর বক্তব্যে আগত দর্শক-শ্রোতাদের ধন্যবাদ জানান। এটি কোনও গানের অনুষ্ঠান নয়, একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান, তাতেই এত মানুষের উপস্থিতিকে তিনি তাঁর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ বলে বর্ণনা করেন।

লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা গ্রন্থের নামকরণ এসেছে ফেরদৌসী রহমানের নিজেরই গাওয়া ও আনোয়ার উদ্দিন খানের কথা ও সুরে ‘লোকে বলে প্রেম/আর আমি বলি জ্বালা’ এই জনপ্রিয় গানের প্রথম চরণ থেকে। এই নামকরণের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে শিল্পী নিজেই বলেছেন, সঙ্গীতের প্রতি তাঁর যে গভীর অনুরাগ, সেটিই তাঁর কাছে ‘প্রেম’। কিন্তু এই ভালোবাসাকে ধরে রাখতে, একে পরিপূর্ণতা দিতে যে নিরলস সাধনা, ত্যাগ ও কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে জীবনভর, সেটিই তাঁর কাছে ‘জ্বালা’।

১৯৫৮ সালে একই ব্যাচে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন সমাজবিজ্ঞানে ফেরদৌসী রহমান আর বাংলায় সৈয়দ আবদুল হাদী। তাঁরা দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি স্মরণ করেন। শিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী বইয়ের নাম নিয়ে রসিকতা করে বলেন, এই নামের আড়ালে হয়তো অন্য কোনও গল্প লুকিয়ে থাকলেও থাকতে পারে। এই কৌতুকপূর্ণ মন্তব্যই প্রমাণ করে, শিরোনামটি কতটা ব্যঞ্জনাময়।

আকর্ষণীয় অনুষ্ঠানে শ্রুতিনন্দন বক্তব্যে মনোযোগ থাকলেও মাঝেমধ্যে হলঘরের বাইরে টেবিলে সাজানো লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা গ্রন্থটি সংগ্রহের জন্য মনটা বড় ব্যাকুল হয়ে পড়ছিল। অনুষ্ঠান শেষে একটি বই সংগ্রহ করে বের হই। বাইরে তখনও টিপটিপ বৃষ্টি। সূর্যাস্তের পশ্চিমের লাল আভা ঢেকে দিয়েছিল আকাশ ভরা মেঘবৃষ্টিতে। রবীন্দ্রনাথের ‘আষাঢ়, কোথা হতে আজ পেলি ছাড়া/মাঠের শেষে শ্যামল বেশে ক্ষণেক দাঁড়া’ গুনগুন করে গাইতে গাইতে ভিজতে ভিজতে রিকশায় চেপে বসলাম।

তিন

বাংলা ভাষায় সঙ্গীতশিল্পীদের আত্মজীবনী রচনার ঐতিহ্য তুলনামূলকভাবে সীমিত। এই প্রেক্ষাপটে ফেরদৌসী রহমানের মতো একজন কিংবদন্তি শিল্পীর আত্মজীবনী প্রকাশ পাওয়া সঙ্গীত-ইতিহাসের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ফেরদৌসী রহমানের জীবন বিস্তৃত হয়েছে অবিভক্ত বাংলা থেকে শুরু করে দেশভাগ, পাকিস্তান আমল, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৫ বছর পর্যন্ত। এই সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক পরিক্রমার মধ্য দিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও সঙ্গীত সাধনা যেভাবে এগিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে এই আত্মজীবনী কেবল একজন ব্যক্তির জীবন কথা নয়, বরং একটি জাতির সাংস্কৃতিক বিবর্তনের জীবন্ত সাক্ষ্যও বটে।

বাংলা গানের ইতিহাসে ফেরদৌসী রহমান একটি স্বতন্ত্র নাম। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে আধুনিক গান, নজরুলসঙ্গীত, ধ্রুপদী সঙ্গীত, ভাওয়াইয়া ও পল্লিগীতির মতো বিচিত্র ধারায় সমান দক্ষতায় গান গেয়ে তিনি উপমহাদেশের সঙ্গীতপ্রেমী মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য জীবনের নিজস্ব বয়ানই উঠে এসেছে তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালায়। শারীরিক নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও, প্রায় নিঃসঙ্গতার ভেতর থেকে শক্তি সঞ্চয় করে শিল্পী নিজে এই আত্মজীবনী রচনার কাজটি সম্পন্ন করেছেন―যা এই গ্রন্থকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা শিরোনামে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে একজন শিল্পীর জীবনদর্শন। সঙ্গীত কোনও সহজ পথ নয়―এটি ভালোবাসা এবং যন্ত্রণার এক জটিল মিশ্রণ। প্রতিটি সফল পরিবেশনার আড়ালে থাকে বছরের পর বছরের চর্চা, ব্যর্থতার ভয়, প্রতিযোগিতা, সামাজিক প্রত্যাশা আর ব্যক্তিগত ত্যাগের গল্প। ফেরদৌসী রহমান যখন এই দ্বৈততাকে তাঁর আত্মজীবনীর শিরোনামে তুলে আনেন, তখন তিনি আসলে পাঠককে জানিয়ে দেন এই বইটি কেবল সাফল্যের ফিরিস্তি নয়, বরং একজন মানুষের আজীবন সংগ্রাম আর নিবেদনের সৎ স্বীকারোক্তিও।

গ্রন্থে বাংলার বুলবুল, পল্লীসম্রাট, জনদরদী ও সমাজসচেতন শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে লিখেছেন―ফুল সবাই ভালোবাসলেও কজন ভালোবাসে ফুল ফোটাতে। আব্বাসউদ্দীন নিজ হাতে বাগানে ফুলের চাষ করতেন। ফুল ফোটাতেন। তেমনিভাবে গ্রাম থেকে অসংখ্য প্রতিভাবান শিল্পীকে কোলকাতা এনে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। দরিদ্র আত্মীয়-স্বজনের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বাবার সম্পর্কে একটি ঘটনা বলতে গিয়ে লেখক গ্রন্থের ১৫-১৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন―“হঠাৎ একদিন আব্বা আমাদের দুই ভাই বোনকে ডেকে ১০ টাকা করে দিয়ে বললেন, ‘যাও, তোমাদের যা ভালো লাগে, কিনে নাও।’ তখনকার দিনে ১০ টাকা কিন্তু অনেক টাকা। সেই সময় সদরঘাট, পাটুয়াটুলি, ইসলামপুর ও নবাবপুর ছিল বাজার এলাকা। আমরা দুই ভাইবোন খুব খুশিমনে রওনা হলাম বাজার করতে। চষে বেড়ালাম সব চেনা-অচেনা দোকান এবং ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরলাম। এসে দেখি আব্বা অধীর আগ্রহে বসে আছেন আমরা কী কেনাকাটা করলাম, তা দেখার জন্য। দুজনকেই হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন কী কিনলাম আমরা। আব্বাকে অবাক করে দিয়ে আমরা দুজনেই তাকে টাকা ফেরত দিলাম। আব্বা তো এই ভেবে অবাক, কোনও কিছুই কিনলাম না। আমাদের একটিই উত্তর ছিল যে আমাদের তো সবকিছুই আছে, তাই কিছু কেনার ছিল না।” এই একটিমাত্র উদ্ধৃতিতেই স্পষ্ট যে, সন্তানের চাওয়া-পাওয়ার অপূর্ণতা না রাখায় বাবা হিসেবে আব্বাসউদ্দীন কতটা সফল ছিলেন।

রাহুল সাংকৃত্যায়ন তাঁর আমার জীবন-যাত্রা আত্মজীবনী গ্রন্থের ‘প্রাক্কথন’-এ আক্ষেপ করে লিখেছেন―‘আমার জীবন-যাত্রা আমি কেন লিখলাম ? আমি সব সময় এটা অনুভব করে এসেছি যে এরকমই পথ দিয়ে যাত্রা করে আসা অন্য কোনও পথিক যদি নিজের জীবন-যাত্রা লিখে রেখে যেতেন তো আমার খুব উপকার হত―শুধু জ্ঞানের দিক দিয়েই নয়, সময়ের পরিমাণ দিয়েও। আমি মানছি যে, কোনও দুটি জীবন-যাত্রা সম্পূর্ণ একরকম হতে পারে না। তবু এতে কোনও সন্দেহ নেই যে সমস্ত জীবনকেই সেই অন্তর আর বহির্বিশ্বের তরঙ্গে সাঁতার দিতেই হয়।’ রাহুল সাংকৃত্যায়নের আক্ষেপ থাকলেও বর্তমান ও আগামীর সঙ্গীতশিল্পীদের কোনও আক্ষেপ আর রইলো না। কেননা, লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা গ্রন্থে কিংবদন্তি শিল্পী ফেরদৌসী রহমান তাঁর শিল্পী-জীবন, পরিবার, সমাজ ও পারিপার্শিক জগতের বিস্তর চিত্র এতই নিপুণভাবে এঁকেছেন যে, ভবিষ্যৎ সঙ্গীতশিল্পী বিশেষত নারী-শিল্পীরা অতীত অভিজ্ঞতার আলো পেয়ে বেশ উপকৃত হবেন, দিকনির্দেশনাও পাবেন।

শিল্পীজীবনের চাকচিক্যের আড়ালেও একজন মানুষের ভেতরে যে বিশাল এক পৃথিবী থাকে―স্নেহ, শৈশব, পরিবার, হারানোর বেদনা আর প্রাপ্তির কৃতজ্ঞতায় গড়া―তারই এক অনন্য দলিল ফেরদৌসী রহমানের লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা। বইয়ের ভূমিকাতেই তিনি অকপটে স্বীকার করেন, লেখালেখি তাঁর পেশা নয়; তিনি মূলত একজন সঙ্গীতশিল্পী। তবু জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো ব্যক্ত করার এক নীরব তাগিদ তাঁকে বহুদিন ধরে তাড়া করেছে―কখনও মায়ের অনুপ্রেরণায়, কখনও সন্তানের উপহার দেওয়া ডায়েরিতে, কখনও-বা পুরোনো ক্যাসেটের হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বরে। সেই তাগিদের ফসল হিসেবেই জন্ম নিয়েছে এই গ্রন্থ, যেখানে একজন কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পীর আড়ালে উঁকি দেয় এক অসামান্য স্নেহময়ী কন্যার গল্প, এক বোনের গল্প, এক মায়ের গল্প।

মনোবিজ্ঞানের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েড-এর মতে, অপ্রকাশিত অনুভূতি কখনও মরে না, সেগুলো নীরবে আমাদের ভেতরেই বেঁচে থাকে। এ মত অনুসরণে বলা যায়, স্মৃতি কোনও মানুষের কাছে নিছক অতীত নয়, বরং তা তার ভেতরেই নীরবে অবস্থান করে। ফেরদৌসী রহমানের লেখায় এই কথাটির সত্যতা অনুভব করা যায়। ছোট্টবেলার কোচবিহারের ‘হীরামন মঞ্জিল’ থেকে কলকাতার বেনিয়াপুকুর লেন হয়ে ঢাকার নারিন্দা, পাতলা খান লেন আর পুরানা পল্টনের ‘হীরামন মঞ্জিল’ পর্যন্ত বিস্তৃত এক দীর্ঘ পথের প্রায় প্রতিটি বাঁকে তিনি এমন কিছু মুহূর্তের গল্প লিখেছেন, যা কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়―সময়, সমাজ আর সংস্কৃতির জীবন্ত ইতিহাস।

আমার সাহিত্য-জীবন গ্রন্থের শুরুতে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘নিজের জীবন কালের কথায় নিজের জীবনকে গৌণ করে কালকে বড় করে শৈশবের কথা এবং কৈশোরের কথা লিখে সাহিত্য জীবনের কথা লেখার সংকল্প যখন করেছিলাম তখন এ কাজ যে কত কঠিন তা ভেবে দেখিনি। লিখতে বসে মনে হচ্ছে এমন কঠিন কাজে হাত না দেওয়াই ভালো ছিল।’ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো শিল্পী ফেরদৌসী রহমান শৈশবের ঘটনা বর্ণনা করতে দ্বিধান্বিত হননি। গ্রন্থের শুরু করেছেন (পৃ: ১৬) ছোট্টবেলার একটি কৌতূহলী প্রশ্ন দিয়ে। কোচবিহারের বাড়ির উত্তর বারান্দা থেকে সাদা কী যেন দেখে প্রশ্ন করেন ছোট্ট মীর্না (ফেরদৌসী রহমানের ডাকনাম)। মা বলেন, ওটা পাহাড়। বাবা বলেন, কাঞ্চনজঙ্ঘা আর চাচা মিয়া বলেন, ওটা হিমালয়ের চূড়া। এই তিনটি ভিন্ন উত্তর ছোট্ট মীর্নাকে কৌতূহলোদ্দীপ্ত করে তোলে। হিমালয় পর্বতমালার কোনও এক পাহাড়ের চূড়া―যার নাম কাঞ্চনজঙ্ঘা। একই বাস্তবতাকে বড়দের ভিন্ন ভিন্ন নামে আখ্যায়িত করার বিষয়টি শিশু মনস্তত্ত্বে ঠাঁই পাবার কথা নয়। তাই এই প্রশ্নের উত্তর অপূর্ণ থেকে যায়। তবে ছোট্ট মীর্না উত্তর খুঁজে পায় তখন যখন বাবা পুরো পরিবার নিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার কাছাকাছি দার্জিলিং বেড়াতে যান। সত্যের সন্ধানে এই ভ্রমণকে ব্যক্তিসত্তা গঠনের রূপক হিসেবে দেখা যেতে পারে। দার্জিলিং ভ্রমণে টাইগার হিলে সূর্যোদয় দেখতে না পাওয়া, মল রোডে গাধার পিঠে চড়ে দুঃখ ভুলে সেই কাঞ্চনজঙ্ঘার মায়ার টান উপলব্ধি, তোরসা নদীর বিস্ময়―ছোট্টবেলার এইসব খুঁটিনাটি স্মৃতি বইয়ের ভাষাকে সহজ, আন্তরিক ও সিনেমাটিক করে তুলেছে।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, প্রফুল্ল রায় আত্মচরিত গ্রন্থে কিংবা রাসসুন্দরী দেবী আমার জীবন গ্রন্থে জন্মসময় থেকে তাঁদের আত্মজীবনী শুরু করেছেন। শিল্পী ফেরদৌসী রহমান তা করেননি। তিনি ছোট্টবেলার স্মরণকালের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ থেকে শুরু করেছেন। আবার অশোক মিত্র তাঁর আপিলা-চাপিলা গ্রন্থের প্রাককথায় লিখেছেন―‘আনন্দ বা তৃপ্তি হলে শিশু খিলখিল হাসতে শেখে, কিন্তু আনন্দের প্রথম অভিজ্ঞতা কোন মুহূর্ত থেকে, তা সে ব্যক্ত করতে অক্ষম।’ অশোক মিত্রের এই কথা ফেরদৌসী রহমান তাঁর অজান্তেই হয়তো মেনে নিয়েছেন। অপরদিকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর আত্মপরিচয় শুধু তাঁর কাব্যজীবন নিয়ে লিখেছেন। রবীন্দ্র অনুসরণে ফেরদৌসী রহমানের সঙ্গীতজীবনের প্রাধান্য থাকলেও তাঁর আত্মজীবনীতে উঠে এসেছে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রায় আট দশকের পরিবার, সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতা। উঠে এসেছে ’৫০-এর দশকের ঢাকার পরিবেশ। পুরানা পল্টনের বাড়ি থেকে দেখা মতিঝিলের রূপান্তর, ধোপাদের গাধা চরানোর মাঠে গড়ে ওঠা জাতীয় সুইমিং পুল, খোলা মাঠে গড়ে ওঠা ডিআইটি ভবন আর দেশের প্রথম টেলিভিশন স্টুডিও―এই সবকিছুর সাক্ষী হয়ে থাকা লেখক যেন শুধু একজন শিল্পী নন, একজন নীরব ইতিহাস-রক্ষকও বটে।

আত্মজীবনীর সবচেয়ে উজ্জ্বল চরিত্র নিঃসন্দেহে তাঁর বাবা, বাংলার বুলবুল খ্যাত আব্বাসউদ্দীন আহমদ। তবে লেখক সচেতনভাবেই সেই বিখ্যাত শিল্পীসত্তার বাইরে খুঁজে বের করেন মানুষ আব্বাসউদ্দীনকে, পিতা আব্বাসউদ্দীনকে―যিনি ব্যস্ততার মধ্যেও সন্তানের প্রত্যেক বিষয়ে মনোযোগী। যিনি স্ত্রীর মতামত ছাড়া কোনও সিদ্ধান্ত নিতেন না, যিনি ভোরবেলা নিজের হাতে বাগান পরিচর্যা করতেন আবার সন্ধ্যায় দেশের প্রথিতযশা কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠতেন। একজন সন্তানের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি যে বাবার বন্ধুত্ব―এই সহজ সত্যটি তিনি বারবার ফিরিয়ে আনেন লেখায়। স্কুল থেকে ফিরলেই দিনের প্রতিটি খুঁটিনাটি বাবাকে জানাতে হতো, আর বাবা তা শুনতেন আগ্রহভরে, যেন প্রতিটি ছোট্ট ঘটনাও তাঁর কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আত্মজীবনীতে ফেরদৌসী রহমান কখনও কখনও বাবার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন মা লুৎফুন্নেসা আব্বাসকে। শৈশবে বাবা যখন কর্মসূত্রে কলকাতায়, তখন কোচবিহারে সংসার সামলে সেতার বাজানো, রান্নার ফাঁকে সৃজনশীল চর্চা করা মাকে এক নীরব শক্তির প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বাবার মৃত্যুর পর ভেঙে না পড়ে মা নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন লেখালেখি, সমাজসেবা আর সন্তানের সঙ্গীতজীবনে সার্বক্ষণিক সঙ্গ দেওয়ার মধ্য দিয়ে। রাতভর রেকর্ডিংয়ে মেয়ের পাশে থাকা, ইউনেসকো বৃত্তি নিয়ে লন্ডনে গেলে মেয়ের সঙ্গী হওয়া, নাতি-নাতনিদের লালন-পালনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া―এসব ঘটনা ফুটে ওঠে এক বাঙালি মুসলিম নারীর জীবন উৎসর্গের প্রতীক হিসেবে।

মা বিশ্বাস করতেন, বিপদের দিনে একজন নারীর জন্যে সবচেয়ে জরুরি জিনিস সৌন্দর্য বা সম্পদ নয়, বরং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সামর্থ্য। একজন সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রী হিসেবে ফেরদৌসী রহমান নিজেও এই ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, বর্তমান সমাজে নারীর অসহায়ত্বের নানা চিত্র দেখে তাঁর মনে জাগা প্রশ্নগুলো তুলে ধরেছেন অকপটে। ভার্জিনিয়া উলফের বিখ্যাত নারীবাদী প্রবন্ধ অ জড়ড়স ড়ভ ঙহব’ং ঙহি-এর প্রতিধ্বনি যেন এখানে শোনা যায়―একজন নারীর নিজস্ব একটি ঘর থাকা চাই, যেখানে সে নিজের মতো করে বাঁচতে পারে।

বিচারপতি মোস্তফা কামাল (দুলু ভাই) আর কণ্ঠশিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী (তুলু ভাই) এই দুই ভাই তাঁর আত্মজীবনীর আরেক উষ্ণ অধ্যায়। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী দুলু ভাই একের পর এক পরীক্ষায় স্ট্যান্ড করে অবশেষে হয়ে ওঠেন বাংলাদশের প্রধান বিচারপতি, অথচ ছোট বোনের কাছে তিনি চিরকাল থেকে গেছেন কবিতা-আবৃত্তি আর গান শেখানো সেই স্নেহশীল অভিভাবক হিসেবে, যাঁর অনুমোদন ছাড়া কোনও সাফল্যই পূর্ণতা পেত না। অন্যদিকে ফেরদৌসী রহমানও এসএসসি ও এইচএসসিতে স্ট্যান্ড করেছেন। তুলু ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কটি ছিল আরও নিবিড়, প্রায় সমবয়সী বন্ধুর মতো। ছোটবেলার খুনসুটি, একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া-আসা আর সবচেয়ে বড় কথা―ছবিতে একসঙ্গে গাওয়া প্রথম গান থেকে শুরু করে সারা জীবন ধরে দ্বৈত কণ্ঠে খেয়াল-ঠুমরি পরিবেশন করার স্মৃতি বিজড়িত ঘটনাসমূহ গ্রন্থটিকে দিয়েছে ভিন্ন মর্যাদা। ফেরদৌসী রহমান মাত্র আট বছর বয়সে রেডিওতে ‘খেলাঘর’ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ১৯৬০ সালে আসিয়া নামের চলচ্চিত্রে তিনি প্রথম নেপথ্য কণ্ঠ দান করেন। ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর টেলিভিশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন। এছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘এসো গান শিখি’ অনুষ্ঠান করে সবার ‘খালামনি’ হয়ে ওঠেন।

লেখক নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেন এই কারণে যে তিনি বলরামপুরের দাদাবাড়ি আর নানাবাড়ির উষ্ণতা পেয়েছেন সমানভাবে। বলরামপুরের বিশাল কাঁঠালগাছের দোলনা নিয়ে ভাইবোনদের কাড়াকাড়ি, পুকুরে ডুবে যাওয়ার ভয়ংকর মুহূর্ত, দাদাজির স্মৃতিভ্রংশের দিনগুলোয় তাঁর সারল্যময় কথাবার্তা―এসব দৃশ্য গ্রামীণ জীবনের জীবন্ত চিত্রকল্প এঁকে দেয়।

ছোট্টবয়সে ফেরদৌসী রহমানের ব্যক্তিগত স্মৃতির স্রোত মিশে গেছে ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায় ১৯৪৬-এর দাঙ্গা আর ১৯৪৭-এর দেশভাগে। শৈশবের চোখে দেখা সহিংসতার দৃশ্য আজও তাঁকে তাড়া করে ফেরে। ছাদে ইট-পাটকেল জমিয়ে আত্মরক্ষার প্রস্তুতি, প্রতিবেশীর বাড়িতে শেষ মুহূর্তে আশ্রয় নেওয়া আর সবশেষে জানালা বন্ধ রেখে ঘোড়াগাড়িতে চড়ে ঢাকায় এসে পৌঁছানো―এসব যেন এক প্রজন্মের সম্মিলিত উদ্বাস্তু-অভিজ্ঞতার প্রতীক হয়ে ওঠে। ভাষা আন্দোলনের ফাল্গুনী দিনগুলোর উত্তেজনা আর আতঙ্কও তিনি নিজের চোখে দেখার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন গ্রন্থে। তবে এ গ্রন্থে সময়ের বিচারে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি। সময়ের ধারাবাহিকতা খুঁজে বের করার জন্য পাঠককে অধিকতর সচেতন থাকতে হবে বলে মনে হয়।

চার

প্রথাগত কোনও গুরুর কাছে নয়, বরং অসংখ্য ‘চাচা’দের স্নেহভরা তত্ত্বাবধানে ফেরদৌসী রহমানের সঙ্গীতজীবনের যে গড়ে ওঠা―তা এক জীবন্ত সঙ্গীত-ঐতিহ্যের চিত্র। বেদারউদ্দীন, সোহরাব হোসেন, লুৎফর রহমান, মোহিতুল হক এই মানুষগুলো রক্তসম্পর্কে চাচা না হয়েও ছিলেন আপনজনের চেয়ে বেশিকিছু। কেউ শেখাতেন সা-রে-গা-মা, কেউ নিয়ে আসতেন নতুন নজরুলগীতি, কেউ-বা রান্নার ফাঁকে ফাঁকে গান তুলে দিতেন। প্রত্যেক চাচাই তাঁকে ভিন্ন ভিন্নভাবে সমৃদ্ধ করেছেন, আর তিনি সেই চাচাদের বিশাল সঙ্গীত-ভান্ডারকে নিজের ভেতরে ধারণ করে বড় হয়েছেন।

উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর মতো উপমহাদেশখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞের সামনে রাগ ভৈরো পরিবেশন করে তাঁর মুগ্ধতা অর্জন, উস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরুর কাছে ধৈর্য ধরে একটি একটি করে রাগ আয়ত্ত করা―এসব ঘটনা প্রমাণ করে, প্রকৃত শিক্ষা কোনও একরৈখিক পথে আসে না, আসে বহু পথের সম্মিলিত ভালোবাসা থেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাকে ফেরদৌসী রহমান কৃষ্ণচূড়ার বন হিসেবে অভিহিত করেছেন। কেননা, পঞ্চাশ-ষাটের দশকের রমনায়, কার্জন হলের সামনে দিয়ে যাওয়ার পথে দুই ধারের কৃষ্ণচূড়ার লাল-সবুজের মেলা চোখ জুড়িয়ে দিত। যে বিশ্ববিদ্যালয় ভবনে তাঁদের আনাগোনা ছিল, তা আজ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল―এই তথ্যটুকু পাঠককে চমকে দেয়, শহরের রূপান্তরের বিশালতা বুঝিয়ে দেয়। এই কৃষ্ণচূড়ার বনেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আনোয়ার উদ্দিন খানের মতো গীতিকার-সুরকারদের, যাঁদের গান পরবর্তীকালে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে গেছে।

এই কৃষ্ণচূড়া বনে তিনি পেলেন সঙ্গীতজগতের সৈয়দ আব্দুল হাদী, নাজমুল হুদা বাচ্চু, আঞ্জুমান আরা বেগম, জিয়া হায়দার, আসাফউদ্দৌলা প্রমুখকে। আরও পেলেন ড. রফিকুল ইসলাম, রওশন আরা, মওদুদ আহমদ, ইকবাল আনসারী খান, জাহানারা লাইজু, রোজী মজিদসহ আরও অনেককে। মধুর ক্যান্টিনের মধুদা―যাঁকে একাত্তরে হত্যা করা হয়েছিল, তাঁর স্নেহময় স্মৃতিচারণ পড়তে গিয়ে ইতিহাসের নিষ্ঠুরতা আচমকা পাঠকের বুকে এসে বাজে। জাহানারা ইমাম, যাঁকে ‘সুচিত্রা সেন’ বলে ডাকতেন, ফেরদৌসী রহমানের হাত থেকে টেবিল টেনিসের বল কেড়ে নিয়ে গান শোনার আবদার করতেন―এই ছোট্ট দৃশ্য শহীদ জননীর অন্য এক কোমল রূপ পাঠকের সামনে তুলে ধরে। এই অধ্যায়টিকে তিনি স¥রণ করেন এক গভীর কৃতজ্ঞতাবোধে।

বাবা আব্বাসউদ্দীন আহমদকে হারানোর বর্ণনা বইয়ের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী অংশগুলোর একটি। ‘মাকে হারিয়ে কষ্ট পেয়েছি, কিন্তু আব্বাকে হারিয়ে যেন আমার সমস্ত পৃথিবীটাই শূন্য হয়ে গিয়েছিল’―এই স্বীকারোক্তির মধ্য দিয়ে লেখিকা দেখিয়েছেন, একজন শিল্পী-কন্যার কাছে পিতা শুধু অভিভাবক নন, ছিলেন বন্ধু, সমালোচক এবং জীবনদর্শনের শিক্ষক, যাঁর অনুপস্থিতি কখনও পূরণ হবার নয়।

আরেকটি মর্মস্পর্শী ঘটনা বিধৃত হয়েছে শেখ কামালকে নিয়ে। তিনি বাসায় আসতেন। ‘আপা’ বলে ডাকতেন। কখন যে শেখ কামাল তাঁর ছোট ভাই হয়ে উঠেছিল টের পাননি ফেরদৌসী রহমান। গ্রন্থের ২১৬-২১৭ পৃষ্ঠায় ফেরদৌসী রহমান স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন―‘১৫ আগস্টের সেই ভয়াবহ রাতের কথা এখনো মনে পড়ে। ওই দিন আমরা বাসা থেকেই গুলির আওয়াজ পেয়েছিলাম। সেদিনের ঘটনাটি মনে হলে এখনও কষ্ট পাই। বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গে যেন আমার নিজের ভাইকে মেরে ফেলা হয়েছে। অনেক কষ্ট পেয়েছি সেদিন। এত অল্প দিনের মধ্যে সে আমার নিজের ভাই হয়ে উঠেছিল। যতবার আবাহনীর মাঠ দেখি, ততবারই শেখ কামালের কথা মনে হয়। তার একটি সুন্দর নির্মল মন ছিল। তার শিল্পীমনও আমি খুঁজে পেয়েছিলাম।’

১৯৬৬ সালে প্রকৌশলী রেজাউর রহমানের সঙ্গে পরিণয় বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ফেরদৌসী বেগম থেকে হয়ে ওঠা ফেরদৌসী রহমান পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। কানাডা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, থাইল্যান্ড, করাচি, লাহোর, তাসখন্দ, মস্কো, লেনিনগ্রাদ, মরিশাস, ভারতের বিভিন্ন শহর, কাবুল, রেঙ্গুন, লন্ডন, এডিনবরা―পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ানো এই শিল্পীর জীবন যেন একটি বিশাল সাঙ্গীতিক মানচিত্র। মেহদি হাসান, ফরিদা খানম, নূরজাহান, আবিদা পারভিন, ইকবাল বানু, সুরাইয়া মুলতানিকর, রওশন আরা বেগমের মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের বর্ণনা পড়তে গিয়ে মনে হয়, উপমহাদেশের সঙ্গীত-ইতিহাসের একটি জীবন্ত সাক্ষী তিনি। মেহদি হাসানের সঙ্গে দ্বৈত গান রেকর্ড করতে গিয়ে গলার স্ট্যামিনায় হেরে যাওয়ার স্বীকারোক্তি, নূরজাহানের সঙ্গে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সাক্ষাতের রোমাঞ্চ―প্রতিটি বর্ণনায় শ্রদ্ধা আর বিস্ময় মিলেমিশে আছে। তাঁর আত্মজীবনী গ্রন্থে উঠে এসেছে উপমহাদেশের সঙ্গীত জগতের অসংখ্য দিকপালের কথা। উস্তাদ গোলাম আলী খাঁ, বিসমিল্লাহ খান, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, লতা মঙ্গেশকর, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়―এঁদের সঙ্গে সাক্ষাতে এক ধরনের বিস্ময় প্রকাশ পেয়েছে, যেন এসব কিংবদন্তির মুখোমুখি হওয়াও তাঁর কাছে এক অর্জন, তারকাখ্যাতির অহংকার নয়।

ফেরদৌসী রহমানের লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা কেবল একজন কিংবদন্তি শিল্পীর ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা নয়; এটি সঙ্গীতজীবন থেকে পারিবারিক-পারিপার্শ্বিক জগতে একজন নারীর প্রায় আট দশকের আত্মপ্রতিষ্ঠার ইতিহাস। এই গ্রন্থের নামকরণেই লুকিয়ে আছে একজন প্রকৃত শিল্পীর জীবনদর্শনের সারমর্ম―ভালোবাসা ও বেদনার সেই অবিচ্ছেদ্য বন্ধন, যা একজন শিল্পীকে তাঁর সাধনার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও এই আত্মজীবনী রচনা করে তিনি প্রমাণ করেছেন, শিল্পের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কতটা অটুট। অবিভক্ত বাংলার কোচবিহার থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কিংবদন্তি হয়ে ওঠা পর্যন্ত তাঁর জীবনের বর্ণাঢ্য যাত্রা এই গ্রন্থের মধ্যদিয়ে পাঠকের কাছে পৌঁছাবে, যা কেবল সঙ্গীতপ্রেমীদের জন্যই নয়, বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের আগ্রহী পাঠকের কাছে এক অমূল্য সংযোজন হয়ে থাকবে। একজন শিল্পীর জীবনের এমন অকপট ও আন্তরিক বয়ান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসা এবং সেই ভালোবাসাকে ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় নিষ্ঠা ও ত্যাগের শিক্ষা বহন করে নিয়ে যাবে অনেক দূর।

তথ্যসূত্র

১.         লোকে বলে প্রেম আমি বলি জ্বালা, ফেরদৌসী রহমান, প্রথম প্রকাশ জুন, ২০২৬, প্রকাশক প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা।

২.        আমার জীবন-যাত্রা, রাহুল সাংকৃত্যায়ন, প্রথম প্রকাশ এপ্রিল, ১৯৫০, প্রকাশক রাহুল সাংকৃত্যায়ন জন্মশতবর্ষ কমিটি, কলকাতা।

৩.        আত্মপরিচয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশ ১৯৪৪, প্রকাশক বিশ্বভারতী, কলকাতা।

৪.         আপিলা-চাপিলা, অশোক মিত্র, প্রকাশ আষাঢ়, ১৩৬৬, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।

৫.        আমার সাহিত্য-জীবন, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশক পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, গীতিকবি

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button