
বিশ্বসাহিত্য : অনূদিত গল্প
বাংলা ভাষান্তর : বিদ্যুত খোশনবীশ
[তামান্না ইসার নতুন প্রজন্মের একজন আফগান লেখক। শরণার্থী হিসেবে তিনি বর্তমানে লন্ডনে বসবাস করেন। তিনি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং একই সাথে নবীন ও প্রচারবঞ্চিত লেখকদের প্ল্যাটফর্ম Untold Narratives-এর গবেষক ও অনুবাদক। তাঁর ছোটগল্প My Bastards, The Cross of Freedom, এবং The Last Aged Zygote of Humanity ফার্সি ভাষায় আফগানিস্তান, ইরান ও জার্মানির বিভিন্ন সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। তামান্না ইসার-এর এই গল্পটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাসিত।]দেখার আকাক্সক্ষা তার নেই। এমনকি সে অন্ধ হতেও রাজি। চারপাশের উঁচু উঁচু ভবনগুলোর দিকেও সে তাকাতে চায় না, কারণ চকচকে এই ভবনগুলোর সাথে তার মাতৃভূমির ধ্বংসস্তূপের কোনও মিল নেই। ভবনগুলো দৃষ্টির আড়ালে রাখতে পারলেই স্বদেশ থেকে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা এবং পরদেশে অচেনা হয়ে পড়ার তিক্ত অনুভূতিগুলো তার আত্মার গভীরে প্রবেশ করতে পারে না। সে একজন জন্মান্ধ মানুষের মতো হতে চায়, চায় বলেই সে চারপাশের দৃশ্যগুলোকে গ্রহণ করে না, চার তলার একটি রুমে থাকলেও কখনও বাইরে তাকায় না। যতটুকু সম্ভব বিছানার তোষকটিকে সে মেঝেতে বিছিয়ে রাখে, যাতে মাতৃভূমিতে ফেলে আসা নিজের ঘরের একটি আবহ তৈরি করা যায়। সূর্যের কিরণ প্রতিদিন যখন এই রুমে প্রবেশ করে সে জানালার পর্দাগুলো আরও সরিয়ে দেয়, যাতে বহুতল ভবনের এই রুমটি কিছুটা হলেও তার ফেলে আসা ঘরের রূপ ধারণ করতে পারেÑ যেখানে সূর্যের আলো জানালা গলে ঢলে পড়ত হাতে-বোনা কার্পেটের ওপর। এই অস্থায়ী হোটেলরুম ছেড়ে বাহার যতবারই রাস্তায় নেমে আসে ততবারই অন্ধ হওয়ার বাসনা তার মধ্যে পোক্ত হয়ে ওঠে। যদি সে অন্ধ হতো তবে রাস্তার মানুষের করুণাভরা চাহনি তাকে দেখতে হতো না, কারণ চাহনিগুলো তাকে নিতান্ত এক পালক-পোড়া পাখি হিসেবেই দেখে, দেখে একজন করুণাপ্রার্থী শরণার্থী হিসেবে।
দুপুর দুইটা। বাহার বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। হোটেল লবিতে বিছানো লাল কার্পেটের ওপর দিয়ে হেঁটে সে কাচের দরজার সামনে দাঁড়ায়। দরজাটি ঘড়ির কাঁটার মতো ঘোরে। বাহার চারপাশটা দেখে নেয়। সুটকেস হাতে লোকজন আসছে, যাচ্ছে। সে কাচের দরজার দিকে আবারও ঘুরে দাঁড়ায়, গায়ের পোশাক ও হিজাবটা টেনে ঠিক করে নেয়, তারপর মাথা নিচু করে দরজার ওপাশে পা বাড়ায়। হোটেলের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া সরু রাস্তাটি ধরে সে হাঁটতে শুরু করে। বাহারের ইচ্ছে হয় সাইকেল লেন ও মূল রাস্তার ডিভাইডারে ফুটে থাকা ফুলগুলোর দিকে তাকাতে। মাথা তখনও নোয়ানো, কাঁপতে থাকা চোখের পাতা দুটি সে ওপরে তোলে। কিন্তু ফুল দেখার আগেই তার চোখে পড়ে নিজ নিজ ধ্যানে মগ্ন কিছু মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। কারও হাতে ছাতা, কারও হাতে নেই। কেউ তার সাথে হাঁটছে, কেউ উলটো দিকে। কেউ তার চেয়ে দ্বিগুণ উচ্চতার, কেউ তার চেয়ে খাটো; কারও চুল সোনালি, চোখ নীল; কারও বা কালো চুল, চোখ বাদামি। ঠিক তখনই সোনালি চুলের দীঘল দেহি এক নারী বাহারের সামনে এসে পড়ে। ভিড়ের অন্য মানুষগুলোর চেয়ে সে একটু আলাদা। ঠোঁটে লাল লিপস্টিক, হাঁটছেন মধ্যবয়সী এক পুরুষের হাত ধরে। কিছুটা ভয় পেয়ে বাহার আবারও তার দৃষ্টি নত করে। ফুটপাথে টুপ টুপ করে পড়তে থাকা বৃষ্টির শব্দেই সে স্বস্তি খুঁজে নেয়।
বাহারের অন্ধ হওয়ার আকাক্সক্ষা বেশ অনেক দিনের। আজ নিয়মিত গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর সেই আকাক্সক্ষা আরও চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। অপরাহ্ণের এই বৃষ্টি সত্ত্বেও বিশেষ সেই স্থানটিতে তার উপস্থিতি সে মিস করতে চায় না। আধঘণ্টার এই উপস্থিতি এমন এক স্থানে যেখানে সে নিজেকে নিরাপদ ভাবে; যেখানে কেউ বা কোনও কিছুই তার হৃদয়ে উপচে পড়া শান্তিকে বিঘ্নিত করতে পারে না। বাহার অবনত মস্তকেই হাঁটতে থাকে। বাসের দরজা খোলার শব্দ জানান দেয় সে বাসস্টপে পৌঁছে গেছে। লাল রঙের যাত্রী ছাউনির নিচে যে পাঁচ-দশজন মানুষ প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকে আজও তারাই আছে। দূরত্ব বজায় রেখেই বাহার অপেক্ষা করে, বাসে ওঠার সময় তাদের তাচ্ছিল্যভরা চাহনির সম্মুখীন সে হতে চায় না।
বাস থেকে নেমে বাহার আবারও হাঁটতে শুরু করে। এখানকার বাড়িগুলো জমজ সহোদরের মতো, কোনও অমিল নেই, যেন একটির সঙ্গে আরেকটি জোড়া লাগানো। বাড়িগুলো যদি নম্বরবিহীন হতো কিংবা সাদা রঙের গাঢ়ত্বে পার্থক্য না থাকত, তা হলে নতুন যে কেউ ভেবে নিতÑ ইংরেজরা বুঝি সবাই মিলে এক বাড়িতেই থাকে। রেডবাড গাছের ছায়া আর ফুলের মৃদু সুবাসে বাহার বুঝতে পারে রাস্তার শেষ প্রান্তে চলে এসেছে, রাস্তা পার হতে হলে মাথা তুলতে হবে। সে দ্রুত দুই পাশ দেখে নেয়। চশমার কাচে জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটা তার দৃষ্টি ঝাপসা করে দিয়েছে। রাস্তা পার হয়ে ওড়নার কোনা দিয়ে মুছে সে আবারও চশমা পড়ে নেয়। কোটের হাতা একটু টেনে নামিয়ে ফুটপাথ দিয়ে ধীরে ধীরে সে এমনভাবে হাঁটতে থাকে যেন আর কোনও পথচারী নেই। অন্য কারও উপস্থিতি সে অনুভব করে না, যেন জনমানবহীন এক শহরে সে-ই কেবল হাঁটছে, তার সঙ্গী শুধু শীতল বৃষ্টি।
বেশ কিছুদিন ধরেই বাহার কানে না শোনার ভান করছে। সে তার কানকে এমনভাবে প্রস্তুত করেছে যে, সে শুধু তাই শুনবে যা সে শুনতে চায়। বিষয়টি এমন যেন তার চারপাশের কেউই কোনও কথা বলে না। হাঁটতে হাঁটতে কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে সে ঐতিহ্যবাহী আফগান গান শোনে, যে গানগুলো তার কল্পনাকে ডানা মেলতে দেয়, যে গানগুলো তাকে বিশ্বাস করায় সে নিজ দেশে ফিরে গেছে। বাহার একই গতিতে হাঁটতে থাকে, বৃষ্টিভেজা শীতল বাতাস তার বুকে শিহরণ জাগায়। তার দৃষ্টি এখনও অবনত। মায়ের উপদেশ ও সমাজের বিধিনিষেধ তার মনে প্রতিধ্বনিত হয়Ñ নারীদের মাথা নিচু রাখা উচিত, নম্র হওয়া উচিত। সে তার মাথা আরও নত করে, যেন পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ তার মাথাকে টেনে ধরেছে, যেন তার ঘাড়ে কোনও অস্থি নেই, যেন এক টুকরো নরম চামড়া দিয়ে দেহের সাথে তার মাথা গেঁথে রাখা হয়েছে।
কাঁধ ঝুঁকিয়ে, এক হাত ওড়নায় ও আরেক হাত পার্সে রেখে বাহার নীরবে ভিড়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যায়। সে নিজের পথ বদলায় না, বরং অন্যরা সরে গিয়ে তাকে পথ করে দেয়। তার বাম পাশের রাস্তাটি গাড়ির শব্দে কোলাহলপূর্ণ আর ডান পাশের রাস্তা ঘেষে একটি কবরস্থানের পাথরের দেয়াল ও লোহার বেড়া। এই অংশটুকু নিস্তব্ধতায় মোড়া। কেবল কাকেদের ডাক শোনা যায়, সমাধিস্তম্ভে বসে তারা এমন কিছু বলাবলি করে যা বাহার বোঝে না। বাহার এতটাই দেয়াল ঘেঁষে হাঁটে যে মাঝেমধ্যে তার হাত দেয়ালে ঘষা খায়। সে এভাবেই হাঁটে যাতে তার অদৃশ্য বর্মটি অন্যের ধাক্কায় বিচ্যুত না হয়। বাহার মাথা তুলে সামনে তাকায় শুধু এতটুকু নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে সে পথ হারিয়ে ফেলেনি।
অবশেষে বাহার ঢালু রাস্তার একেবারে শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়ায়, কবরস্থানের প্রবেশমুখের এই জায়গাটি অনেকটাই নিরিবিলি। বৃষ্টির ফোঁটা আলতোভাবে তার গালে ঝরে পড়ছে। গেটের সামনে সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। শত বছরের বেশি পুরোনো এই কবরস্থান। লোহার বেড়ার ফাঁক গলে বাহার ভেতরে তাকায়, ক্ষয়ে যাওয়া একটি সমাধিস্তম্ভে খোদাই করা তারিখগুলো দেখার চেষ্টা করে সে। সমাধিস্তম্ভটিও কবরস্থানের মতোই প্রাচীন। আগাছা আর লম্বা ড্যান্ডেলিয়ন ফুলগাছে আধা-ঢাকা সমাধিটি বাহারকে ভাবিয়ে তোলেÑ মানুষ যদি ড্যান্ডেলিয়নের মতো অমর হতো, যেভাবেই হোক, যেখানেই হোক, ইচ্ছেমতো গজিয়ে উঠে অপূর্ণ স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পারত!
দীর্ঘশ্বাস ফেলে কবরস্থান পেরিয়ে ডান দিকে চলে যায় বাহার। চারপাশে তাকানোর চেয়ে বৃষ্টির ফোঁটা দেখতেই তার বেশি ভালো লাগে। কবরস্থানের পর এই তিন রাস্তার মোড়ে এলে সে সবসময়ই ইতস্তত বোধ করে। এখানকার বাড়িগুলো প্রায় একই রকম, ফলে হারিয়ে যাওয়ার ভয় তার মধ্যে কাজ করে। তবু আশা তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আগের নির্জন পথের চেয়ে এই এলাকাটি বেশি কোলাহলপূর্ণ। রাস্তার দু পাশেই ক্যাফে আর দোকানপাট। তবু সে মাথা তোলে না, শুধু চোখের পাতা সামান্য তুলে রাখে যাতে কারও সাথে ধাক্কা না লাগে। বাহার যখন কল্পনার ভেলায় ভাসছে, এক ফোঁটা বৃষ্টি তার ঠোঁটে এসে পড়ে। সে ক্ষুদ্র ফোঁটাটিকে জিভে নেয়, স্বাদ আস্বাদন করে, কিন্তু এই স্বাদের কোনও নাম সে দিতে পারে না। তার কাছে বৃষ্টি হলো আকাশের পবিত্র অশ্রুধারা। সে বিস্মিত হয়, মাথা নিচু করে থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একটি ফোঁটা তার ঠোঁটে এসে পড়ল!
হঠাৎ তার নাকে গ্রিল করা মাংসের গন্ধ আসে, কানে আসে মানুষের মৃদু গুঞ্জন। মাথা না তুলেই সে বুঝতে পারে কোনও এক রেস্তোরাঁ অতিক্রম করছে। তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠে আর সে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়। ডানে মোড় নিয়ে সে একটি তোরণ আচ্ছাদিত সরু গলিতে প্রবেশ করে। দুই পাশে উঁচু উঁচু জানালা, জানালার কাচে ফুলের নকশা, জানালার ওপাশে সারি সারি রেস্তোরাঁ। বাহার আরও দ্রুত হাঁটতে শুরু করে। গন্তব্যের যত কাছাকাছি আসে, সে তত গভীরভাবে শ্বাস নিতে থাকে। তার শরীর দৃঢ়, চোখে উত্তেজনার দীপ্তি আর হৃদস্পন্দনও বাড়তে থাকে। অবশেষে সে পৌঁছে যায় কাক্সিক্ষত রাস্তায়। নির্জন রাস্তা। দু পাশে সারি সারি গাছ, কিছু গাছের ডালপালা ছাঁটা, যেন শোক প্রকাশের জন্যই তাদের এমন করে কেটে রাখা হয়েছে। কিন্তু এবার ওপরের দিকে মাথা তুলে তাকাতে বাহার আর ভয় পায় না। সে তার চশমা খুলে নেয় এবং এমনভাবে এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে যেন বহুদিন দেখা না হওয়া কোনও প্রিয়জনকে খুঁজছে। সে বলে ওঠে, ‘আমি এসে গেছি’ এবং শেষ কয়েকটি পদক্ষেপের গতি সে আরও বাড়িয়ে দেয়।
বৃষ্টিভেজা লাইলাক গাছের পাশেই দরজাটির অবস্থান। বাহার দরজার সামনে দাঁড়ায়, তার মুখে হাসিও নেই, বিষাদও নেই। এই দরজাই তার গন্তব্য। সে দেখছে, আবার দেখছেও না। সে শুনছে, আবার শুনছেও না। লাইলাক গাছটির মতোই সে স্থির, অনড়। সে এমনভাবে আবারও দরজার দিকে তাকায়, যেন এবারই প্রথম দেখছে। কালো দরজা, জংধরা তালা ও চারপাশে বিবর্ণ দেয়াল। দরজাটি তার স্বদেশের কোনও বাড়ির দরজার মতো। এজন্যই প্রতিদিন বিকেলে আধঘণ্টা এই দরজার সামনে সে দাঁড়িয়ে থাকে। এই দরজাই তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় আফগানিস্তানে তার পুরোনো জীবনে। সে পলকহীন তাকিয়ে থাকে এবং প্রতিদিনকার কথাগুলোই এমনভাবে বলে যেন দরজার ওপাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
‘দরজা! এই অচেনা দেশে তুমিই একমাত্র সুন্দর দৃশ্য, তুমিই আমার মাথা তুলে তাকাবার কারণ। শুধু চোখ দিয়ে নয়, মনের চোখে দেখার তুমিই আমার অনুপ্রেরণা। তোমার হয়তো জিভ নেই, কিন্তু এই বধির নীরবতায় ও অচেনা দেশে তুমিই আমার সাথে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে কথা বলো। দেখো, আমি এসেছি, আবারও আসব। বারবার ফিরে আসব। কথা দিচ্ছি, কোনও এক দিন আনন্দভরা হৃদয় ও হাসিমাখা মুখে তোমার সামনে দাঁড়াব। সেদিন সবকিছু কিংবা কিছুই নয়-এর মধ্যে আমি হারিয়ে যাব না। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি আবার ভয়ও পাচ্ছিÑ এই প্রতিশ্রুতি আমি কীভাবে রক্ষা করব! এমন কোনও শরণার্থী কি আছে, যার হৃদয় আনন্দে ভরপুর, মুখে হাসি; যে তাচ্ছিল্যের মাঝে নিখোঁজ হয়নি?’
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলার সময় বাহারের চোখ ঝাপসা হয়ে যায়, গলায় দলা বাঁধে চাপা কান্না। তবু নির্ধারিত আধঘণ্টা সে দাঁড়িয়ে থাকেÑ একেবারেই নিশ্চল হয়ে। এতটাই নিশ্চল যে, বৃষ্টি না হলে কোনও পাখি এসে হয়তো তার মাথা কিংবা কাঁধে বাসা বেঁধে ফেলত। সে ভিজে গেছে, যেন অন্য এক সময়ের স্মৃতি বহনকারী এক ভাস্কর্য। গভীর নীরবতায় সে তার অতীত সত্তাকে ঈর্ষা করতে শুরু করেÑ একজন নারী হিসেবে কঠিন দিনগুলো, সংগ্রাম, দুঃখ, আনন্দ, ব্যর্থতা আর স্বদেশের সমৃদ্ধি; এর সৌন্দর্য, পারিবারিক বন্ধন আর সহস্র স্মৃতি। সে বিড়বিড় করে বলে, ‘আমি এমন এক তৃণভূমির বাতাসে শ্বাস নিয়েছি যার রং ছিল সবুজ ও বাদামি; ঐ তৃণভূমি শিশির সিক্ত ও অগ্নিদগ্ধ; ওখানে চাষ হয় আলুবোখারা ও গুলি। ওটাই আমার ঘর, আমার স্বদেশ। তার আলিঙ্গনেই আমি বেঁচে ছিলাম। আর এখন এই শূন্যতার মাঝে কে আমি?’
বাহার অকৃতজ্ঞ হতে চায় না, তবু কেন তাকে এই বিচ্ছেদ ও যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে? রাস্তাটি এখনও নীরব-নিস্তব্ধ। কিছুক্ষণের জন্য হলেও এখানকার সবকিছু মিলে বাহারকে সংক্ষিপ্ত শান্তি উপহার দেয়। সে এক পা থেকে আরেক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ায়। তার মনে পড়ে যায় তিন বছর আগের গ্রীষ্মের এক বিকেলের কথা। সবেমাত্র সে কাবুলের নতুন বাড়িতে উঠেছে। লম্বা গ্যারাজের কালো দরজা পেরিয়ে, উঠোন অতিক্রম করে, সিঁড়ি বেয়ে সে তার রুমের দিকে এগুচ্ছিল। ঘরে ঢোকার ঠিক আগে জানালার কাচে সূর্যের প্রতিফলিত আলোর ঝলক তার চোখে পড়ে। সে বারান্দার দিকে এগিয়ে যায়, রেলিং ধরে অস্তগামী সূর্যের দিকে সে ঝুঁকে পড়ে। তার দৃষ্টি চলে যায় পর্বতমালার দিকেÑ এক সারির পেছনে আরেক সারি পাহাড়। পাহাড়ের ঢালে জমে থাকা বরফ তখনও গলে যায়নি, দিনের শেষ আলোয় সেগুলো রত্নের মতো ঝলমল করছিল। কিন্তু বাহার ঘরের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়, সে নিজেকে বলেÑ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার প্রয়োজন নেই, এমন দৃশ্য তো প্রতিদিনই দেখা যাবে। এই ভাবনা নিয়েই বাহার ঘরে ফিরে আসে। ঘরটি তখনও ফাঁকা: এক পাশে শুধু একটি খাট আর অন্য পাশে ছোট একটি বুকশেলফ ও টেবিল। বাহার ঘরে ঢুকতেই সূর্যের তির্যক আলো দেয়ালে তার ছায়াকে দীর্ঘ করে তোলে। নিজের ছায়ার সাথে তার নাচার ইচ্ছে হয়। বাতাসে চুল দোল খায়, বাহার নাচে, আর দেয়ালে নেচে ওঠে তার ছায়াটিও। কিছুক্ষণ পর সে হঠাৎ থেমে যায় আর তড়িঘড়ি করে ওড়নাটা ঠিক করে নেয়। চারিদিকে তাকিয়ে সে বোঝার চেষ্টা করে কোনও প্রতিবেশী তাকে দেখে ফেলল কি না। সে নিজেকে ঘরের এক কোনায় আড়াল করে ফেলে আর নিজের এমন কাণ্ডে হেসে ওঠে। সে ও তার ছায়া একে অন্যের স্বাধীনতাকে যেন হিংসে করছে। সে আরও কিছুক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে থাকে, গভীরভাবে শ্বাস নেয়। সে চায় না কোনও দুশ্চিন্তা তার আনন্দকে নষ্ট করে দিক। সে আবারও হাসে। তার গাল দুটো লাল হয়ে ওঠে, চোখে দীপ্তি। মাতৃভূমির নিজ ঘরে ওই মুহূর্তে পুরো পৃথিবীটাই হয়ে উঠেছিল বাহারের, আর তার স্বপ্নগুলোও যেন হয়ে উঠছিল জীবন্ত।
সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ



