শব্দবিন্দু আনন্দসিন্ধু : মানবর্দ্ধন পাল

ভাষা-গবেষণা ধারাবাহিক
আঠারোতম পর্ব
[প্রাচীন ভারতীয় আলঙ্কারিকরা শব্দকে ‘ব্রহ্ম’ জ্ঞান করেছেন―শব্দ যেন ঈশ্বরতুল্য। পাশ্চাত্যের মালার্মেসহ নন্দনতাত্ত্বিক কাব্য-সমালোচকদেরও বিশ্বাস, শব্দই কবিতা। শব্দের মাহাত্ম্য বহুবর্ণিল ও বহুমাত্রিক। বাংলা ভাষার বৃহদায়তন অভিধানগুলোর পাতায় দৃষ্টি দিলেই তা প্রতিভাত হয়। আগুনের যেমন আছে অসংখ্য গুণ, তেমনই ভাষার প্রায় প্রতিটি শব্দেরও আছে অজস্র অর্থের সম্ভার। কালস্রোতে ও জীবনের প্রয়োজনে জীবন্ত ভাষায় আসে নতুন শব্দ, তা বিবর্তিতও হয়। পুরনো শব্দ অচল মুদ্রার মতো ব্যবহার-অযোগ্য হয়ে মণি-কাঞ্চনরূপে ঠাঁই নেয় অভিধানের সিন্দুকে।বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার সমুদ্রসম―মধুসূদনের ভাষায় : ‘ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন’। বৈঠকি মেজাজে, সরস আড্ডার ভঙ্গিতে লেখা এই ‘শব্দবিন্দু আনন্দসিন্ধু’। ব্যক্তিক ও নৈর্ব্যক্তিক―সবকিছু মিলিয়ে শব্দের ভেতর ও বাইরের সৌন্দর্য-সৌগন্ধ এবং অন্তর্গত আনন্দধারার ছিটেফোঁটা ভাষিক রূপ এই ‘শব্দবিন্দু আনন্দসিন্ধু’ ধারাবাহিক।]
পালা
সাঙ্গ হলে মেঘের পালা শুরু হবে বৃষ্টি-ঢালা,
বরফ-জমা সারা হলে নদী হয়ে গলবে॥
―(গীতবিতান, পূজাপর্যায়, ৬০৬ নম্বর গান)
রবীন্দ্রনাথের এই গানের বাণীতে ‘পালা’ শব্দের অর্থ কী ? বাক্যের ভাব অনুধাবন করলে বোঝা যায়, এখানে পালা মানে পর্যায়, ক্রম বা একের পর এক। আবার যদি বলা হয়, আজ পাশের বাড়িতে নৌকাবিলাস পালা হবে―তখন বোঝানো হয়, কাহিনিমূলক গানের আসর। গ্রামের দরিদ্র মানুষটি বলল, এবার ঘরের পালা বদলাতে হবে। তখন বুঝতে হবে, ঘর দাঁড় করিয়ে রাখার খুঁটি। এবার পালা পশু কোরবানি দিব―এ কথার অর্থ, যা পালন করা হচ্ছে। মাছচুরিতে গিয়ে ধরা পড়ার ভয়ে ইন্দ্র শ্রীকান্তকে বলল, এবার পালা! ―এই ‘পালা’ মানে, পলায়ন কর। উল্লিখিত বাক্যগুলোতে আমরা লক্ষ করি, ‘পালা’ শব্দটির বানান এবং উচ্চারণে কোনও তফাৎ নেই কিন্তু প্রয়োগভেদে একেক বাক্যে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করছে। এই অর্থান্তর ও বিচিত্র ভাবান্তরের মধ্যেই বাংলা ভাষার মহত্ত্ব।
‘পালা’ শব্দটির অর্থ বিচিত্র ও ব্যাপক। বাংলা ভাষায় পাঁচ প্রকার পদের বিচারে লক্ষ করা যায়, ‘পালা’ কখনও ক্রিয়াপদ, কখনও বিশেষ্য, আবার কখনও বিশেষণ পদ। পশুপালা গ্রামীণ সংস্কৃতি―এই বাক্যে ‘পালা’ ক্রিয়াপদ। পালা পশুর প্রতি মায়া বেশি―এখানে ‘পালা’ পদটি বিশেষণ। আবার ‘পালা না-লাগালে ঝড়ে ঘর পড়ে যাবে’―এই বাক্যে ‘পালা’ বিশেষ্য পদ। এসব আমাদের সবার স্কুলে-পড়া জানা বিষয়। এছাড়া পালা শব্দটির আরও অনেক অল্পজানা এবং অজানা অর্থ আছে। আভিধানিকদের আশ্রয় নিলে এর নিম্নোক্ত অর্থ পাওয়া যায় : পালন করা, পলায়ন করা, খুঁটি, ছোট গাছ, স্তূপ, পালাগান, পর্যায় বা ক্রম, পর্ব, তুষার, শিশির, দাঁড়িপাল্লা বা পরিমাপ যন্ত্র, ডাল বা শাখা-প্রশাখা ইত্যাদি। পালা শব্দটির ব্যুৎপত্তি : পাল্ (ধাতু) + আ (প্রত্যয়) = পালা (কৃৎ প্রত্যয়)। আর পালকে ধাতু বা ক্রিয়ার মূল হিসেবে না-ধরে অর্থবোধক শব্দ বা নামপদ হিসেবে বিবেচনা করলে তা হবে তদ্ধিত প্রত্যয়।
পালা শব্দটির উৎস ও অর্থান্তর বিবেচনা করে বাঙ্গালা ভাষার অভিধানে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস আটটি ভুক্তি নির্ধারণ করেছেন। আর হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্গীয় শব্দকোষে ছয়টি ভুক্তির উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া বাংলা একাডেমির বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান-এ আরও একটি নতুন ভুক্তি আছে। সব মিলিয়ে এগুলো নিম্নরূপ :
১) পালা : সংস্কৃত শব্দ। বিশেষ্য পদ পল্লব > পালা। গাছের শাখা-প্রশাখা বা ডালপালা অর্থে। হেমন্তকালে জলাশয়ের মাছ রক্ষার জন্য, কেউ যাতে বড়শি বা জাল ফেলে মাছ ধরতে না-পারে, যে কাঁটা গাছের ডাল বা কঞ্চিসহ বাঁশ পুঁতে রাখা হয় তাকেও পালা বলে।
২) পালা : সংস্কৃত পর্যায় শব্দ থেকে পালা। পর্যায় > পারা > পালা। র > ল। এর অর্থ ক্রম, অনুক্রম বা ধারাবাহিকতা, পরম্পরা, সময় নিরূপ। উদাহরণ : ‘পালাক্রমে ছয় ঋতুর উদয়।’ (ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত)। ‘এখন এল অন্য সুরে অন্য গানের পালা।’ (রবীন্দ্রনাথ)।
৩) পালা : সংস্কৃত পঞ্চালী শব্দ থেকে পালা। বিশেষ্য পদ। একটি সংস্কৃত কাব্যছন্দের নাম ‘পঞ্চালী’। প্রাচীন কালে দেবতার মাহাত্ম্যকথা বা ধর্মীয় সঙ্গীত সাধারণত এই ছন্দে রচিত হতো। উদাহরণ : ‘এত দূরে পালা সাঙ্গ শুন সর্ব্বজন/ মুখ ভরি বল হরি পাপ বিমোচন।’ (ঘনরাম চক্রবর্তী, ধর্ম্মমঙ্গল)।
৪) পালা : সংস্কৃত ‘প্রালেয়’ থেকে পালা (অমরকোষ)। বিশেষ্য পদ। অর্থ : হিম, শিশির, তুষার। উদাহরণ : তাহাকে তাঁহারা পালা বলিতেন। (রাজনারায়ণ বসু)।
৫) পালা : সংস্কৃত ‘পালিত’ থেকে পালা। পাল + আ = পালা। পালন, রক্ষণ, পোষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, মানুষ করা, জীবজন্তু পোষা ইত্যাদি।
৬) পালা : পলায়ন করা। ক্রিয়াপদ। উদাহরণ : ‘না পালাব আমি।’ (কৃত্তিবাসী রামায়ণ)।
৭) পালা : স্তূপ, গাদা, স্তূপাকার করা, একত্র করা। বিশেষ্য পদ। উদাহরণ : ‘আশধানের (আউশধান) পালা’। (নীলদর্পণ, দীনবন্ধু মিত্র)।
৮) পালা : স্তম্ভ, খুঁটি, ঘরের আশ্রয়। বিশেষ্য পদ। উদাহরণ : ‘ভাঙ্গিয়া পড়িল ঘর ঘুনে খাইল পালা।’ (মীনচেতন, ঢাকা সাহিত্য-পরিষদ্)।
* পালা : দাঁড়িপাল্লা অর্থে। বিশেষ্য পদ। উদাহরণ : কেবল ধামায় ক্যান, পালাই উইঠা বসব। (নরেন্দ্রনাথ মিত্র)।
উল্লিখিত নয়টি ভুক্তির মাধ্যমে আমরা ‘পালা’ শব্দটির অর্থ ও ভাববৈচিত্র্যের ধারণা পাই। বাংলা সাহিত্যে শব্দটির প্রয়োগের ইতিহাস প্রাচীন। আদি মধ্যযুগের কাব্যের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমরা বিষয়টি লক্ষ করি। বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন থেকে বৈষ্ণব সাহিত্য, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ও মঙ্গলকাব্যে এর বিচিত্র প্রয়োগের নিদর্শন পাওয়া যায়। সেকাল থেকে ‘পালা’ শব্দের বহুবিধ ব্যবহার একালের একুশ শতকের লেখক ও কবিদের রচনায়ও ধারাবাহিকভাবে চলছে। তবে মধ্যযুগের সাহিত্যে এর প্রয়োগ যেমন বহুমুখী তেমনটি একালে নেই। বিশেষত ক্রিয়াপদ ‘পালন করা’ অর্থে এর প্রয়োগ বহুমাত্রিক। বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।
* কেমনে কাহ্নের বোল পালিবোঁ। (পালন করব অর্থে, বড়ু চণ্ডীদাস)।
* বচন আহ্মার পাল এ। (পালন করে অর্থে, ঐ)।
* পালিল বড়ায়ি মোর পূর্ব্ববচনে। (পালন করল অর্থে, ঐ)।
* পুষিয়া পালিয়া সুত গৌরী-কোলে করিল আধান। (লালন-পালন অর্থে, কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী)।
* পিতা হইয়া পাল্য প্রজাগণ। (পালন করল অর্থে, ঐ)।
* না করিব অন্যথা পালিব সতত। (পালন করব অর্থে, কবীন্দ্র পরমেশ্বর)।
* এ মোর বচন যদি পালিবারে পার। (পালন করতে অর্থে, সৈয়দ সুলতান)।
* পালিলাম পুত্রবৎ। (পালন করলাম অর্থে, কৃষ্ণরাম দাস)।
* বাতুল আতুর যথ/ পালিলেন্ত অবিরত…। (প্রতিপালন করলেন অর্থে, দৌলত উজির বাহরাম খাঁ)।
* পালিহ আমার সুতা দেব চক্রপানি। (পালন করো অর্থে, মালাধর বসু)।
* পালিলে বনের বাঘ পোষ নাহি মানে। (প্রতিপালন অর্থে, রূপরাম দাস)।
মধ্যযুগের সাহিত্য মানেই কবিতা-আক্রান্ত, পদ্যময় ও অন্ত্যমিলযুক্ত। তাই ক্রিয়াপদে পালন, লালন-পালন, প্রতিপালন অর্থে বিচিত্রবিধ ক্রিয়াপদের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। তবে এই বৈচিত্র্য ক্রিয়ার কাল ও পুরুষভেদে হয়। অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ―ক্রিয়ার কালের এই তিনটি রূপ এবং উত্তম মধ্যম ও নামপুরুষের তিনটি রূপের ভিন্নতায় হয় এই রূপান্তর। লক্ষ করা যায়, চন্দ্রবিন্দু যুক্ত পালিবোঁ, পালিলুঁ এবং পালিহ, পালিলেন্ত, পালএ, পালিবেক ইত্যাদি ছাড়া আর সব ক্রিয়াপদই বর্তমান বাংলা ভাষায় ব্যবহার হচ্ছে। মধ্যযুগের সাহিত্যে ব্যবহৃত এসবের মধ্যে একালের সাধুভাষার ক্রিয়াপদ অঙ্কুরিত হওয়ার সাক্ষ্য পাওয়া যায়। সাধুভাষার সেই ক্রিয়াপদগুলো সংক্ষিপ্ত হয়ে একালে চলতিভাষার ক্রিয়াপদে রূপান্তরিত হয়েছে। যেমন―পালিবোঁ > পালিব > পালব, পালিল > পালল, পালিয়া > পেলে, পালিবার > পালবার > পালার, পালিলাম > পাললাম, পালিলে > পাললে ইত্যাদি।
কেবল ‘পালন করা’ অর্থে নয়; সেকালে পালা শব্দটি ‘পলায়ন’ অর্থেও ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়েছে। যেমন :
* বনে বনে পালাইআঁ রাধা যবেঁ জাএ। (পলায়ন করা অর্থে, বড়ু চণ্ডীদাস)।
* তবেসিঁ মনের মোর দুখ পালাএ। (দূর হওয়া অর্থে, ঐ)।
* প্রাণ লৈয়া পালাহ তুমি না করিহ রনে। (পালাও অর্থে, মালাধর বসু)।
* আবু জেহেল বোলে পালাইল মোর ডরে। (পলায়ন করল অর্থে, সৈয়দ সুলতান)।
* আপন মনের বাঘে যাহারে খায়/কোনখানে পালালি বাঁচা যায়। (পালিয়ে অর্থে, লালন শাহ)।
তাছাড়া মধ্যযুগের কাব্যে পালাইলেঁ (পলায়ন করলে), পালাউ (পালাও),
পালাউক (পলায়ন করুক), পালাত্যে (পলায়ন করতে), পালাসী (পালাচ্ছে), পালাহ/পালাহা (পলায়ন কর) ইত্যাদি। এই ক্রিয়াপদগুলোর ব্যবহার আধুনিক সাহিত্যে নেই―অচলিত ক্রিয়াপদ হিসেবে তা এখন প্রাচীন রূপের ঐতিহ্যের নিদর্শন এবং অভিধান-বন্দি।
একমাত্র তৎসম বা সংস্কৃত শব্দসহ সব ধরনের শব্দেরই বিবর্তন বা রূপান্তর আছে। প্রাচীন ক্রিয়াপদগুলোও তেমনই পরিবর্তিতরূপে আধুনিক বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই আমরা লক্ষ করি, সেগুলোই সাধুভাষা হয়ে চলিত ভাষায় রূপ লাভ করেছে। যেমন―পালাইলেঁ > পালাইলে > পালালে, পালাউ > পালাও, পালাউক > পালাক, পালাত্যে > পালাতে, পালাহ ইত্যাদি। এবার আমরা আধুনিক কবি-লেখকদের রচনা থেকে ‘পালা’ শব্দটি বিভিন্ন অর্থে প্রয়োগের কয়েকটি বাক্য উদ্ধৃত করি।
* দোল যাত্রাতে শ্রীযুত বাবু রাঘবরাম গোস্বামীর পালা…। (আখ্যানমূলক গীত অর্থে, দর্পণ পত্রিকা)।
* যখন আসধানের পালা সাজাতো বোধ হতো যেন চন্দন বিলে পদ্মফুল ফুটে রয়েছে। (স্তূপ অর্থে, মনীশ ঘটক)।
* মাঘ মাসে ধানের পালায় পালায় উঠানে পা দেবার জায়গা থাকে না। (ঐ, মনোজ বসু)।
* বার হয়েছি আই. এ.-র পালা সেরে। (পর্ব অর্থে, রবীন্দ্রনাথ)।
* তোমাদের পালাগানে কি আমি দোয়ারকি করতে পারি! (আখ্যানগীতি অর্থে, নজরুল ইসলাম)।
* সদস্যরা পালাক্রমে এই স্কুলে শিক্ষকের কাজ চালিয়ে যাবেন। (পর্যায় বা একাদিক্রমে অর্থে, বেগম পত্রিকা)।
* সেদিন ছিল বৈকালিক পালাজ্বরের দিন। (নির্দিষ্ট সময়ে পালাক্রমিক জ্বর অর্থে, শরৎচন্দ্র)।
* বাঙালির পালাপার্বণের অন্ত নেই। (বিবিধ উৎসব, বর্তমান লেখক)।
মূলত ‘পাল্’ ক্রিয়ার মূল বা ধাতু থেকে এই ক্রিয়াপদগুলোর সৃষ্টি। এর সঙ্গে বিভিন্ন প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ক্রিয়াপদ তৈরি হয়। যেমন―পাল্ + আ = পালা (পালন করা), পাল্ + অন = পালন (রক্ষণাবেক্ষণ), পাল + ইত = পালিত (যা পালন করা হয়েছে), পাল্ + আও =পালাও (পলায়ন কর), পাল্ + আনো = পালানো (পলায়ন ক্রিয়া), পাল + অনীয় = পালনীয় (পালনের যোগ্য), পাল্ + অক = পালক (পালনকর্তা), পাল্ + য = পাল্য (যা পালন করা কর্তব্য), পাল্ + আই = পালাই (পলায়ন করি), পাল্ + ই = পালি (পালন করি) ইত্যাদি। উত্তম পুরুষে সাধারণ বর্তমান কালের রূপ ‘পালাই’। এর দ্বিত্বরূপও পাওয়া যায় : ‘তাদের মন কেন পালাই-পালাই।’ (পালাতে পারলে বাঁচি এমন অবস্থা)। রবীন্দ্রনাথের এই বাক্যের অর্থ ঠিক পালানো নয়―অন্তরে পালানোর ইচ্ছা এবং সুযোগ অন্বেষণ।
‘পালানো’ শব্দটি যখন ক্রিয়াপদ না-বুঝিয়ে ব্যক্তিবাচক বিশেষ্য ও বিশেষণ বোঝায় তখন তার লিঙ্গার্থক রূপও পাওয়া যায়। যেমন―পালিত > পালিতা, পালক > পালয়িতা/ পালয়িত্রী, পালনার্থী > পালনার্থিনী, পালনকারী > পালনকারিনী, পলাতক > পলাতকা ইত্যাদি। পলাতকারা সর্বদাই রহস্যময়ী―তাদের চরিত্র মরীচিকার মতো ভ্রান্ত প্রত্যক্ষণে পরিপূর্ণ―সোনার হরিণের মতো চিরচঞ্চল এবং অধরা। তাই নিজেই মনে-মনে রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে-গাইতে এ-পর্ব থেকে পালাই :
যে কেবল পালিয়ে বেড়ায়, দৃষ্টি এড়ায়, ডাক দিয়ে যায় ইঙ্গিতে,
সে কি আজ দিল ধরা গন্ধে-ভরা বসন্তের এই সঙ্গীতে॥
বন্ধু
বন্ধু, কিসের তরে অশ্রু ঝরে, কিসের লাগি দীর্ঘশ্বাস।
হাস্যমুখে অদৃষ্টেরে করব মোরা পরিহাস॥
রিক্ত যারা সর্বহারা সর্বজয়ী বিশ্বে তারা,
গর্বময়ী ভাগ্যদেবীর নয়কো তারা ক্রীতদাস।
হাস্যমুখে অদৃষ্টেরে করব মোরা পরিহাস॥
… … … … …
বন্ধুভাবে কণ্ঠে সে মোর জড়িয়ে দেবে বাহুপাশ―
বিদায়কালে অদৃষ্টেরে করে যাব পরিহাস।।
―৬০ সংখ্যক গান, নাট্যগীতি, রবীন্দ্রনাথ।
বন্ধুর অর্থ কী, সংজ্ঞা কী ? কাকে আমরা বন্ধু বলি ? রবীন্দ্রনাথের উল্লিখিত গানটিতে বন্ধুর একটি মৌলিক চরিত্র সম্পর্কে বলেছেন―‘বন্ধুভাবে কণ্ঠে সে মোর জড়িয়ে দেবে বাহুপাশ’। প্রীতির স্নিগ্ধতায় গলায় জড়িয়ে ধরে যে, শারীরিক অনুপস্থিতি সত্ত্বেও হৃদয়ে সার্বক্ষণিক উপস্থিতি যার, সে-ই তো সত্যিকার বন্ধু। অন্য এক গানে তিনি বলেছেন : ‘ফুলের গন্ধ বন্ধুর মতো জড়ায়ে ধরিছে গলে’। গলায়-গলায় এই মিলনে প্রকাশিত হয় মিতালি। মিতালির মধ্যেই মৈত্রীর প্রকাশ। শব্দার্থকোষ এবং অভিধানে বন্ধুর সমার্থক শব্দ পাওয়া যায় : মিত্র, সুহৃৎ, সখা, মিতা, সুহৃদ্বর, দোস্ত, আলি, ইয়ার। স্ত্রীলিঙ্গার্থে : সখী, বন্ধুনী, সই, বঁধু, বঁধুয়া, সজনী, সহচরী, সাঙাতনী। (যথাশব্দ, মুহম্মদ হাবিবুর রহমান। সমার্থ শব্দকোষ, অশোক মুখোপাধ্যায়)।
বন্ধু শব্দটির উৎসমূল ‘বন্ধ্’। বন্ধ্ থেকে বন্ধ। বন্ধ থেকে বন্ধন (বন্ধ্ + অন = বন্ধন)। অর্থ : বন্ধন করা, বাঁধন, আটক, অবরোধ, যা দিয়ে বাঁধা যায়। সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক বিষয়টি চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন : ‘বন্ধু এসেছে বন্ধ থেকে। এ বন্ধ দরোজা বন্ধের বন্ধ নয়, বাজার বন্ধেরও বন্ধ নয়, হরতালের অপর নাম বন্ধ সে নয়। এ বন্ধ চাক্ষুষ রূপে দারোগার হাতে বন্ধন! অন্তর্গত অর্থে প্রাণের বন্ধন। আর এই প্রাণের বন্ধন থেকেই শব্দটা গড়া গেছে―বন্ধু।’ (কথা সামান্যই, পৃ. ১৪৬, সাহিত্য প্রকাশ)।
বন্ধু শব্দটির বহুমুখিনতা এবং অর্থব্যাপকতা অনেক। কেবল সংস্কৃত বা বাংলা ভাষায় নয়; ভারতীয় পুরাণেও এর নিদর্শন মিলে। নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর পুরাণকোষ-এ বন্ধকর্তা, বন্ধন, বন্ধুপালিত, বন্ধুমান―এই চারটি শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। তা থেকে জানা যায়, বন্ধকর্তা ও বন্ধন শিবের এক হাজার আটটি নামের মধ্যে দুটি নাম। টীকাকার নীলকণ্ঠের মতে, বন্ধকর্তা সংসারের বিনির্মাতা ও তিনি বন্ধন সৃষ্টি করেন। তাঁর সৃষ্ট জীবকুলকে তিনি মায়ার বন্ধনে আবৃত করেন বলেই শিবের এই নাম। আর বন্ধন শব্দের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সংসারে যে মায়ার বন্ধন সৃষ্টি হয় তা ভ্রান্তিস্বরূপ। তাই শিবের নাম বন্ধন। বন্ধু শব্দের টীকায় বলা হয়েছে, দ্বাদশ মন্বন্তরে যারা রাজা হবেন তাদের প্রধানত পাঁচটি গণে ভাগ করা হয়েছে―হরিত, রোহিত, সুমনা, সুপর্ণা ও সুপার। এই পাঁচটি গণে দশজন করে দেবতা আছেন। এর মধ্যে রোহিতগণের একজন দেবতার নাম বন্ধু। মৌর্যবংশের রাজা অশোকের পৌত্রের নাম বন্ধুপালিত। তিনি আট বছর রাজত্ব করেন। বন্ধুমান হলো পুরূরবার বংশধারায় কেবলার পুত্র। (পুরাণকোষ, চতুর্থ খণ্ড, পৃ. ২৫-২৬)।
বন্ধুর পৌরাণিক টীকাভাষ্য ও ব্যাখ্যা জ্ঞানের জগৎ বাড়ায় ঠিকই কিন্তু আমাদের মতো সাধারণের সেসবের প্রয়োজন সামান্যই। তবে এর পৌরাণিক তাৎপর্য ছাড়াও আরও অর্থ এবং টীকাভাষ্য আছে। শব্দটির ব্যুৎপত্তি, বন্ধ্ + উ = বন্ধু। মূলত এর অর্থ, যে স্নেহ দ্বারা বন্ধন করে―প্রীতিবন্ধক। অন্যান্য অর্থ : সগোত্র, জ্ঞাতি, স্বজন, রক্তের সম্বন্ধযুক্ত জন, পিতামাতার সম্পর্কিত ব্যক্তি, পিতা, মাতা, ভ্রাতা, স্বামী, অবিদ্যা, বন্ধুজীববৃক্ষ, রোহিণীনক্ষত্র, সহচর, বঁধু, সখিজন, স্নিগ্ধজন। (বাঙ্গালাভাষার অভিধান, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস ও বঙ্গীয় শব্দকোষ, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়)। এত সব অর্থের মধ্যে বন্ধু শব্দের প্রধান অর্থ মিত্র, সখা, সুহৃদ। সংস্কৃত সাহিত্যে অন্য সব অর্থের প্রয়োগ ছিল কিন্তু মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে এই অর্থেই বন্ধু ব্যবহার হয়ে আসছে। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক :
* পদব্রজে লইয়া বন্ধু জনে। (বিশেষ্য, সুহৃদ অর্থে, মালাধর বসু)।
* কৃষ্ণরস আস্বাদয়ে দুই বন্ধু সনে। (ঐ, সখা অর্থে, কৃষ্ণদাস কবিরাজ)।
* দশঘরে দশ বন্ধু দিলে নিমন্ত্রণ। (ঐ, স্বজন অর্থে, মুকুন্দরাম চক্রবর্তী)।
* তুহ্মি কর সুখে রার্জ্জ লৈয়া বন্ধুবর্গ। (ঐ, বন্ধুমহল অর্থে, কবীন্দ্র পরমেশ্বর)।
* যদি স্বামীর বশীভূতা থাকি তবে বন্ধু দুঃখিত হইবেন। (ঐ, প্রেমিক অর্থে, চণ্ডীচরণ মুনশী)।
* রাজকুমারের অতিশয় বন্ধুত্ব জন্মিল। (ঐ, মিত্রতা অর্থে, বিদ্যাসাগর)।
* রাজধর্মে ভ্রাতৃধর্ম বন্ধুধর্ম নাই। (ঐ, বন্ধুত্বভাব অর্থে, রবীন্দ্রনাথ)।
* বন্ধুবর নিকটস্থ তরুকুঞ্জের মধ্য হইতে অট্ট হাস্য করিয়া উঠিল। (ঐ, বিশিষ্ট বন্ধু অর্থে, প্রমথ চৌধুরী)।
* বন্ধুজ ও প্রভুপুত্র জাহাঙ্গীরকে পুত্রাধিক স্নেহের চক্ষে দেখিতেন…। (ঐ, বন্ধুর পুত্র অর্থে, কুহেলিকা, কাজী নজরুল ইসলাম)।
উল্লিখিত উদ্ধৃতিগুলোতে বন্ধু শব্দের প্রধান অর্থ―সুহৃদ, মিত্র বা সখা। কিন্তু বিশিষ্ট অভিধানগুলোতে লক্ষ করা যায়, অর্থবৈচিত্র্য ও ভাবানুষঙ্গে বন্ধু শব্দটি বহুমুখী। সেই বৈচিত্র্যময় অর্থের বিস্তার সম্পর্কে যৎসামান্য খোঁজখবর নেওয়া যাক।
বৈষ্ণব পদাবলির মূলকথা জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলন। সেখানে শ্রীরাধিকা জীবাত্মার প্রতীক এবং ঈশ্বর পরমাত্মার প্রতীক। এই দুই সত্তার মিলনাকাক্সক্ষা চিরন্তন। তাই প্রেমিকারূপ জীবাত্মা সর্বদাই প্রেমিকরূপ পরমাত্মার সঙ্গে মিলনপিয়াসী। জীবাত্মা পরমাত্মাকে বন্ধুরূপে একান্ত ঘনিষ্ঠভাবে পেতে চায়। এই সূত্রে নরোত্তম দাসের পদাবলিতে পাই : ‘বন্ধুরে লইয়া কোরে রজনী গোঙাব সই/ সাথে নিরমিনু আশাবর।’ একেশ্বরবাদী ব্রাহ্মধর্মের সাধনসঙ্গীতেও পাওয়া যায় অনুরূপ কথা : ‘তুমি নাথ তুমি বন্ধু, নিশিদিন তুমি আমার।’ এই বন্ধুরূপ ঈশ্বরের স্বরূপ বর্ণনা করতে গিয়ে কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী লিখেছেন : ‘সুরঙ্গ অরুণ বন্ধু অধর আনন ইন্দু/ নীলকণ্ঠ শিরোপরি জটা।’ শাক্তসাধক জটাধারী নীলকণ্ঠ শিব বন্ধু বলে আখ্যায়িত।
সংস্কৃত সাহিত্যে বন্ধুর বহুবিধ সংজ্ঞার্থ পাওয়া যায়। গীতায় বলা হয়েছে, ‘শোণিতসম্বন্ধবিশিষ্ট জন’ যারা, তারা বন্ধু। অর্থাৎ রক্ত-সম্পর্কের স্বজন ব্যক্তিরাই বন্ধু। অভিজ্ঞান শকুন্তলম-এ কবি কালিদাস লিখেছেন : ‘অত্যাগসহনো বন্ধুঃ, সদৈবানুমতঃ সুহৃৎ। একক্রিয়ং ভবেন্মিত্রং, সমপ্রাণঃ সখামতঃ।’ এর সরল বঙ্গানুবাদ করলে হয় : ‘দুজনের মধ্যে একে অন্যকে ত্যাগ যার অসহনীয় তিনি বন্ধু। সর্বদা একে অন্যের অনুমত জন সুহৃদ। উভয়ে এক প্রাণ বা অভিন্নহৃদয় হলে তারা সখা।’
সখ থেকে সখা, মিত্র থেকে মিতা। তাই বন্ধুর প্রতিশব্দ সখা ও মিতা। এই বন্ধন অপরিত্যাজ্য। বন্ধুত্ব রক্ষার জন্য পরিচর্যা চাই, সযত্ন-লালিত প্রয়াস চাই। তাই প্রয়োজন বন্ধুকৃত্য। অভিধানে বন্ধু শব্দের বহুবিধ অর্থ আছে। এমন অর্থও আছে যা এখন প্রাচীন মুদ্রার মতো অচল―কেবল অভিধান-বন্দি। বন্ধুর তেমনই একটি অর্থ ‘স্নিগ্ধজন’। একালে অচল হলেও সংস্কৃত সাহিত্যে এর প্রয়োগ ছিল। মেঘদূতের কবি কালিদাস তাঁর ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম’ নাটকে লিখেছেন : ‘স্নিগ্ধজনসংবিভক্তং হি দুঃখং সহ্যবেদনং ভবতি।’―এর ব্যাখ্যায় সৈয়দ শামসুল হক লিখেছেন : ‘… স্নিগ্ধজনের ভেতরে অর্থাৎ বন্ধুতে বন্ধুতে বিভেদ বিভক্তি ঘটলে বড় গভীর দুঃখ সইতে হয়।… আমি তো বয়সের এই প্রান্তে এসে দেখি, সন্তাপিত হওয়াটাই বন্ধুত্বের বড় প্রমাণ। একমাত্র প্রমাণ। বড় কঠিন প্রমাণ! বন্ধুত্ব হারালেই তবে বোঝা যায় বন্ধুত্ব ছিল। একটা সম্পর্ক ছিল, একটা বন্ধন ছিল যা হিতকর। প্রাণের একটা বিনিময় ছিল যা মধুর। অস্তিত্বের একটা আরাম ছিল যা শীতল।’ (কথা সামান্যই, পৃ. ১৪৬, সাহিত্য প্রকাশ)।
বন্ধুত্ব রক্ষার জন্য উভয় হৃদয়ের শক্ত বন্ধন চাই। তবু এর মধ্যে ফাটল ও ভাঙন ধরে বলে বন্ধুবিচ্ছেদ ও বন্ধুবিরহ বহুল প্রচলিত শব্দজোড়। বন্ধুত্বে বিরহ ঘটলে অদূরে মিলনের আলো এবং ইঙ্গিত থাকে। কিন্তু বিচ্ছেদের ভবিষ্যৎ কেবলই তমিস্রায় আবৃত―সন্তাপ ছাড়া তখন আর কিছুই প্রাপ্তব্য নেই! সেই সন্তাপে থাকে কেবল দহন এবং জ্বালা। তাই চণ্ডীমঙ্গলে পাই : ‘এত সাধের বন্ধুয়া আমার দেখিলে না চায় ফিরিয়া।’ এই পরম বিরহের বাণী বৈষ্ণব সাহিত্য ও মঙ্গলকাব্যের সাঁকো পেরিয়ে চিরন্তন হয়ে চলে এসেছে আধুনিক সাহিত্যে। তাই রবীন্দ্রনাথের গানে পাই : ‘ভালোবাসিলে যদি সে ভালো না-বাসে, কেন সে দেখা দিল।’ তৎসম বন্ধু থেকে তদ্ভব শব্দ বঁধু। আর বঁধু থেকে বঁহু, বঁহু থেকে বৌ/বউ। কালপরিক্রমায় বন্ধুর বিবর্তন : বন্ধু > বঁধু > বঁহু > বৌ/বউ। চণ্ডীমঙ্গলে যে ‘বন্ধুয়া’ শব্দটি পাই তার বিবর্তিত রূপ―বঁধুয়া। ‘বন্ধু’ আমাদের দেশে লোকজ বাংলায় হয়ে গেছে ‘বন্দ’। তাই মৈমনসিংহ গীতিকায় পাই : ‘বৈদেশে পাঠাইয়া বন্দে থাকিব কেমনে।’ কিংবা বাউল গানে আছে : ‘বন্দে মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে…।’
লক্ষযোগ্য যে, ‘বন্ধু’ শব্দের নাসিক্য ধ্বনি দন্ত্য-ন লোপ পাওয়ায় বঁধু ও বঁধুয়ার কাঁধের ওপর সিন্দাবাদের ভূতের মতো চন্দ্রবিন্দু চেপে বসেছে। বিষয়টি সরসভাবে বর্ণনা করেছেন সৈয়দ শামসুল হক। তিনি লিখেছেন : ‘প্রীতির বন্ধনেই বাঁধা পড়ে বঁধু। বন্ধুর দন্ত্য-ন হরণ করে চন্দ্রবিন্দু যোগে সে বঁধু। মনে হতে পারে নারী। কিন্তু না। নারী হলে সে আমার বঁধুনি বটে। তবে এ কালে স্ত্রীবাচক শব্দ ঘুচিয়ে দেয়াই যখন যুক্তি ও সমতার কথা, তখন নারীবন্ধুও আমার বঁধুই বটে। আর সেই বঁধু যখন আমার ঘরে আসেন বিয়ের মালা গলায় পরে, তখন তিনি বধূ। চন্দ্রবিন্দু ঝরিয়ে তিনি বধূ। বধূ ঘরে তুলতে নিমন্ত্রণপত্রে যেন তার বানানের ভুলটি আমরা না করি। কেউ কেউ অবশ্য বঁধুকে বধূ করে দু’দিনেই দেখি ভুল একটা করেই ফেলেছি। বঁধু সে চাঁদের আলোয় ভালোই ছিল, দিনের আলোয় সে দারোগার বেশ ধরেছে।’ (কথা সামান্যই, সাহিত্য প্রকাশ, পৃ. ১৪৬)।
প্রসঙ্গক্রমে এবার রবীন্দ্রনাথের দিকে একটু চোখ ফেরাই। তিনি কবিতায় গানে গদ্যে বহুবার বন্ধু শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তবে গানে তিনি বন্ধুর চাইতে বঁধু এবং বঁধুয়া শব্দই বেশি ব্যবহার করেছেন। কয়েকটি নমুনা উপস্থাপন করি :
* বঁধু, কোন্ আলো লাগল চোখে! (চিত্রাঙ্গদা)
* বঁধু, তোমায় করব রাজা তরুতলে, (প্রেম, ৩৬৮ নম্বর গান)
* বঁধু, মিছে রাগ করো না, করো না। (প্রেম ও প্রকৃতি, ৫৮ নম্বর গান)
* বঁধুয়া, অসময়ে কেন হে প্রকাশ। (নাট্যগীতি, ৮৬ নম্বর গান)
* বঁধুয়া, হিয়া-’পর আও রে! (ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী, ৬ নম্বর গান)
* বঁধুর লাগি কেশে আমি পরব এমন ফুল (নাট্যগীতি, ৯৯ নম্বর গান)
* বন্ধু, কীসের তরে অশ্রু ঝরে (নাট্যগীতি, ৬০ নম্বর গান)
* বন্ধু, রহো রহো সাথে (প্রকৃতি, ৮৫ নম্বর গান)।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে বহু রূপে, বিভিন্নভাবে, বহুকৌণিক দৃষ্টিতে বন্ধুর স্বরূপ বিশ্লেষণ করতে চেয়েছেন। দুটি গদ্যেও―একটি অণু প্রবন্ধ এবং একটি স্মৃতিচারণমূলক―তিনি বন্ধু সম্পর্কে তাঁর ব্যক্তিগত ভাবনা প্রকাশ করেছেন। বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার সীমানা সূক্ষ্ম সুতোয় বিভাজিত। সহজে এর পার্থক্য নির্ণয় করা যায় না। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন : ‘বন্ধুত্ব আটপৌরে, ভালোবাসা পোশাকী। বন্ধুত্বের আটপৌরে কাপড়ে দুই-এক জায়গা ছেঁড়া থাকিলেও চলে, ঈষৎ ময়লা হইলেও হাশি নাই, হাঁটুর নীচে না পৌঁছিলেও পরিতে বারণ নাই। গায়ে দিয়া আরাম পাইলেই হইল। কিন্তু ভালোবাসার পোশাক একটু ছেঁড়া থাকিবে না, ময়লা হইবে না, পরিপাটি হইবে।… আমাদের ডান হাতে বাম হাতে বন্ধুত্ব। আমরা বন্ধুর নিকট হইতে মমতা চাই, সমবেদনা চাই, সাহায্য চাই ও সেই জন্যই বন্ধুকে চাই।… বন্ধুত্ব বলিতে তিনটি পদার্থ বুঝায়। দুই জন ব্যক্তি ও একটি জগৎ।… ইহা ছাড়া আর একটি কথা আছে―প্রেম মন্দির ও বন্ধুত্ব বাসস্থান। মন্দির হইতে যখন দেবতা চলিয়া যায় তখন সে আর বাসস্থানের কাজে লাগিতে পারে না, কিন্তু বাসস্থানে দেবতা প্রতিষ্ঠা করা যায়।’ (বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা, বিবিধ প্রসঙ্গ, রবীন্দ্র-রচনাবলী, ১৪শ খণ্ড, পৃ. ৭২০-৭২১, ঐতিহ্য)।
একটিমাত্র অনুচ্ছেদে লেখা দেড় পৃষ্ঠা আয়তনের ব্যক্তিগত ভাবোচ্ছ্বাসময় ছোট্ট একটি প্রবন্ধ ‘বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা’। অথচ ব্যঞ্জনায় সামুদ্রিক গভীরতা এবং ভাবসম্পদে ও বর্ণনায় হিমালয়ের শিখরস্পর্শী। কেবল পার্থিব উপমা-প্রতীক ও তুলনার মাধ্যমে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার মতো বিমূর্ত দুই আত্মিক সত্তাকে বোধগ্রাহ্য করেছেন রবীন্দ্রনাথ। পরের স্মৃতিচারণমূলক লেখাটি লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়তে যাওয়ার সময়ের। স্বজন-বান্ধবহীন সদ্য প্রবাসজীবনে কবি খুঁজে পেয়েছেন একজন সপ্রাণ ও মনোময় বন্ধু। তাঁর নাম উইলিয়াম রোদেনস্টাইন। এই বন্ধুপ্রাপ্তি ও বন্ধু-সাহচর্য তাঁর ঊষর প্রবাসজীবনে প্রাণরস জুগিয়েছিল। সেই স্মৃতিচারণে রবীন্দ্রনাথ ভালো বন্ধুর চরিত্রও বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি লিখেছেন : ‘আমার সৌভাগ্যক্রমে একটি সুযোগ ঘটিয়া গেল―আমি একজন বন্ধুর দেখা পাইলাম। বাগানের মধ্যে গোলাপ যেমন একটি বিশেষ জাতের ফুল, বন্ধু তেমনি একটি বিশেষ জাতের মানুষ। এক-একটি লোক আছেন পৃথিবীতে তাঁহারা বন্ধু হইয়া জন্মগ্রহণ করেন। মানুষকে সঙ্গদান করিবার শক্তি তাঁহাদের অসামান্য এবং স্বাভাবিক।… বন্ধু হইতে গেলে সঙ্গদান করিতে হয়।…
‘আমি এখানে যে বন্ধুকে পাইলাম তাঁহার মধ্যে এই আনন্দ পাওয়া ও আনন্দ দেওয়ার ক্ষমতা আছে। এইরূপ বন্ধুধনে ধনী লোককে লাভ করার সুবিধা এই যে, একজনকে পাইলে অনেককে পাওয়া যায়। কেননা, ইঁহাদের জীবনের সকলের চেয়ে প্রধান সঞ্চয় মানুষ-সঞ্চয়।’ (বন্ধু, পথের সঞ্চয়, রবীন্দ্র-রচনাবলী, ১৩শ খণ্ড, পৃ. ৭০০, ঐতিহ্য)। রবীন্দ্রনাথের বন্ধু-বিষয়ক গানে আছে ভাবসাগরের আত্মিক উৎকর্ষ। সেই সুর ও বাণী থেকে পদ্মবনের মধু নিঃসৃত হয়। সুর সৃষ্টি করে মায়াজাল, বাণী সৃষ্টি করে ভাবুকতা। তাঁর দুটি গদ্যের উদ্ধৃতি থেকে আমরা পাই দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি। মানুষে-মানুষে প্রীতির বন্ধনের মাধ্যমে আত্মিক সম্মিলনের চিরন্তন সারাৎসার রবীন্দ্রনাথ তুলে ধরেছেন বন্ধু-বিষয়ক গদ্যে।
শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত জীবনের বাঁকেবাঁকে আমাদের বহু বন্ধু মিলে। বাল্যবন্ধু, শিক্ষাজীবনের পর্বে পর্বে নতুন বন্ধু, কর্মজীবনে বন্ধু! প্রৌঢ়ত্বেও মানুষের নতুন বন্ধু হয়―এমন কি বার্ধক্যেও। জীবনের প্রান্তে এসে মন-প্রাণময় ও মধুময় বন্ধুও মিলে, মনে আফসোস হয়, আহা, এমন বন্ধু কেন সারা জীবনের জন্য পেলাম না! সামাজিক মানুষ হিসেবে জীবনের ঘাটে ঘাটে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে কত মানুষের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়, পরিচয় হয়। এই পরিচয় থেকেই প্রণয়। প্রণয়ের অপর নামই তো ভালোবাসা। ভালোলাগা থেকেই জন্ম নেয় ভালোবাসা। যা বন্ধুত্বের জন্যে কেবল প্রধান নয়, একমাত্র শর্তও বলা যায়। তারপর থাকে পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভরসা। তাতে কোনও নারী-পুরুষ নেই, লিঙ্গভেদ নেই। তবে বন্ধুর জগৎ জীবনের পর্বে পর্বে পালটায়, পরিবর্তন হয়―সময়ের প্রয়োজনে। বন্ধু আসে, বন্ধু যায়। জ্ঞানীরা বলেন, সখে-সখে সমতা থাকলে সখা হয় আর মতে-মতে মিল থাকলে হয় মিতা। মিতা শব্দটি মিত্রতা শব্দেরই পরিবর্তিত রূপ―যেমন সখী থেকে সই। রবীন্দ্রনাথের গানেও পাই : ‘ওলো সই, আমার ইচ্ছে করে তোদের মত মনের কথা কই।’
বন্ধু অনেক রকম হয়―অনেকভাবে হয়। তবে বন্ধুত্বের সম্পর্কটি কেবলই হৃদয়-সঞ্জাত এবং মনোনির্ভর। প্রকৃত বন্ধু সম্পর্কে আমরা ইতিমধ্যে মহাজনদের অনেক কথা আত্মস্থ করেছি। বন্ধুর প্রতি বন্ধুর পারস্পরিক দায়-দায়িত্ব আছে। এ-সম্পর্কে হাজার তিনেক বছর আগে নীতিশাস্ত্রজ্ঞ চাণক্য পণ্ডিতই বোধ করি সেরা কথাটি বলে গেছেন। প্রকৃত বন্ধুর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তিনি যা লিখেছেন তার বঙ্গানুবাদ : ‘উৎসবে, ব্যসনে, রোগে-শোকে, রাজদ্বারে, দুর্ভিক্ষে, রাষ্ট্রবিপ্লবে, শ্মশানে যে থাকে সে-ই প্রকৃত বন্ধু।’
বর্তমান যুগের আলোকে এর অর্থ―আনন্দ-উৎসবের দিনে, ভোজনসভায়, অসুখে, দুঃখে, মামলা-মোকদ্দমায়, দুর্ভিক্ষের সময়, রাষ্ট্রীয় গোলযোগ কিংবা যুদ্ধাবস্থায় এবং অবশেষে মৃত্যুর পর শ্মশানের শেষ কৃত্যানুষ্ঠানে যাকে সঙ্গী হিসেবে পাওয়া যায় তিনিই প্রকৃত বন্ধু। বন্ধুর এর চেয়ে সুন্দর সংজ্ঞা আর হতে পারে বলে মনে হয় না।
আমাদের প্রতিজনের জীবনে কারওরই বন্ধুর সংখ্যা কম নয়। অথচ এমন মানবিক, হৃদয়বান, জীবনবাদী ও পরোপকারী বন্ধু আমাদের কজনের আছে ? নেই-যে, এমন নয়! তবে একালের কুটিল ও স্বার্থপরতার বাণিজ্যিক যুগে তেমন বন্ধু পাওয়া সত্যি সৌভাগ্যের বিষয়―যা রবীন্দ্রনাথ কপালগুণে পেয়েছিলেন বিলেতে!
আমাদের কৈশোরে-তারুণ্যে ফেসবুক, ই-মেইল, ইন্টারনেট, ফ্যাক্স এসব ছিল না। এমন কি ছিল না ঘরে ঘরে টেলিফোন! সেলফোন তো দূরের কথা―জেলা শহরে ল্যান্ডফোনও ছিল কদাচিৎ, কোথাও! কেবল বড় অফিস ও ভি আই পি কর্মকর্তাদের বাসভবন ছাড়া অন্যত্র ল্যান্ডফোনই ছিল সোনার হরিণ। তাই আমাদের শৈশব-কৈশোরের বন্ধুরা ছিল আশপাশের, এলাকার এবং স্থানীয়। নিতান্ত-সীমিত নিজ অঞ্চলের সমবয়সী ছাড়া আমাদের পক্ষে বাইরের কারও সঙ্গেই বন্ধুত্ব স্থাপন করা সম্ভব ছিল না! সুতরাং কৈশোরে আমরা ছিলাম নিতান্তই কূপমণ্ডূক―অর্থাৎ কুয়োর ব্যাঙ। তখন কি আর জানতাম, আমাদের মত কূপমণ্ডূকদের জন্যই রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন :
‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া
মনের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।’
তবে আমাদের সময় আঞ্চলিকতার বাইরে গিয়ে অপরিচিতদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবার একটি মাধ্যম ছিল―পেনফ্রেন্ড বা কলমবন্ধু। একে পত্রমিতাও বলা হতো। বিষয়টি ছিল পত্র-পত্রিকা থেকে ঠিকানা সংগ্রহ করে চিঠি লেখার মাধ্যমে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা। আমি কৈশোরে দুজনের সঙ্গে এরকম পত্রমিতালি করেছিলাম। সেই সাতকাহন আপাতত থাক। বন্ধুত্বের আরেকটি ভিন্নমাত্রার সম্বোধন লক্ষ করা প্রগতিশীল রাজনীতিতে―কমরেড। মতাদর্শের ঐকমত্যে তারা পরস্পরকে ‘কমরেড’ বলে সম্বোধন করে। তাই সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতায় শুনি সেই আহ্বান―‘কমরেড, নবযুগ আনবে না ?’ কিংবা সমাজ-রূপান্তরের লক্ষ্যে বিপ্লব-পিয়াসি কবি সুকান্তর কবিতায় :
বন্ধু, তোমার ছাড়ো উদ্বেগ, সুতীক্ষè কর চিত্ত―
বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি, বুঝে নিক দুর্বৃত্ত।
[চলবে]সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



