
বিশ্বসাহিত্য : অনূদিত গল্প
বাংলা ভাষান্তর : জাহিদুল ইসলাম সবুজ
[জাপানের কথাসাহিত্যিক হারুকি মুরাকামির জন্ম ১৯৪৯ সালে। তাঁর উপন্যাসের সংখ্যা সম্ভবত চৌদ্দটি। আর ছোটগল্পগ্রন্থ ছিল পাঁচটি। তবে ২০২৩ সালের ৬ এপ্রিল প্রকাশিত হয় তাঁর ষষ্ঠ গল্পগ্রন্থ দি ফার্স্ট পার্সন সিঙ্গুলার (মূল জাপানি ভাষায় গ্রন্থের শিরোনাম ইছিবানসু তানসু)। এক মলাটে আটটি গল্প। গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে বিশ্বের তাবৎ পত্রিকা আলোচনায় মেতে ওঠে। মূল জাপানি ভাষা থেকে সব কটি গল্পের ইংরেজি অনুবাদ করেছেন ফিলিপ গ্যাব্রিয়েল। বিশ্বসাহিত্যে মুরাকামির গল্পগ্রন্থটি বিস্তর আলোচনায় স্থান করে নিয়েছে। বিশ্বের প্রথম সারির প্রায় সব সাহিত্য পত্রিকা গল্পগুলো নিয়ে আলোচনা করেছে। দি নিউ ইয়র্কার, গার্ডিয়ান, দি টাইমস থেকে শুরু করে বিভিন্ন পত্রিকায় এ গ্রন্থ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। সঙ্গীত, স্মৃতি এবং স্ফীত জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছানোর মানসিক দর্শন গল্পগুলোর অবকাঠামো তৈরি করেছে।]এপ্রিলের এক সুন্দর সকালে টোকিওর ফ্যাশনেবল হারাজুকু এলাকার একটি সরু গলিতে হাঁটতে হাঁটতে একশ পারসেন্ট পারফেক্ট মেয়েটিকে পাশ কাটিয়ে গেলাম।
সত্যি বলতে কি, সে দেখতে তেমন গুড লুকিং নয়। আলাদা নজরকাড়া কেউও নয়। পোশাক-আশাকেও চোখে পড়বে এমন কেউ নয়। ঘুম থেকে ওঠার পরও তার চুলের পেছনের দিকটা বেঁকে আছে। বয়সে আর খুকিটি নয়, বয়স নিশ্চয়ই তিরিশের কাছাকাছি; ঠিক অর্থে বলতে গেলে, তাকে আর ‘মেয়ে’ও বলা যায় না। তবুও পঞ্চাশ গজ দূর থেকেই আমি জানি সে আমার জন্য একশ পারসেন্ট পারফেক্ট গার্ল। যখন তাকে দেখি তখন আমার বুকের মধ্যে রিমিক্স কাওয়ালি বাজে আর মুখটা শুকিয়ে যায় মরুভূমির মতো।
একেকজনের একেক রকম মেয়ে পছন্দ, কারও চিকন পায়ের গোড়ালি, কারও বড় চোখ, কারও-বা সুঠাম আঙুল, নয়তো কোনও কারণ ছাড়াই সেই সব মেয়ের প্রতি অনেকে আকৃষ্ট হয়, যারা প্রতি বেলার খাবার ধীরে ধীরে সময় নিয়ে খায়। আমারও নিজস্ব পছন্দ আছে। কখনও কখনও রেস্টুরেন্টে বসে পাশের টেবিলে বসা মেয়েটির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকি, কারণ তার নাকের গড়ন আমার পছন্দ।
তবে জোর করে কেউ বলতে পারে না যে তার জন্য পারফেক্ট মেয়ে―তার কল্পনার সঙ্গে মিলে। নাকের ব্যাপারে আমার অবসেশন থাকলেও, আমি নাকের গড়ন মনে রাখতে পারি না। এমনকি মেয়েটির নাক ছিল কি না তাও মনে থাকে না। আমি নিশ্চিতভাবে যা মনে রাখতে পারি তা হলো, সে কোনও অসাধারণ সৌন্দর্যের কেউ ছিল না। বিষয়টা বড়ই অদ্ভুত!
আমি একজনকে বলি, ‘কাল রাস্তায় একশ পারসেন্ট পারফেক্ট মেয়েটির দেখা পেয়েছি।’
‘অ্যাঁ ? সে জিজ্ঞেস করল, নিশ্চয়ই মেলা সুন্দরী ?’
‘নট রিয়েলি।’
‘তাইলে যেমন খোঁজো তুমি ?’
‘ঠিক বলতে পারছি না। তার ব্যাপারে কিছু তো মনে পড়ছে না তার চোখের আকৃতি অথবা বুকের।’
‘অদ্ভুত!’
‘হুঁ। অদ্ভুত!’
এরই মধ্যে সে বিরক্ত হয়ে বলল, ‘ধুর মিয়া, কী করলা ? কথা বললা ? ফলো করলা ?’
‘না, শুধু তার পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া দেখলাম।’
সে হাঁটছিল পূর্ব থেকে পশ্চিমে আর আমি পশ্চিম থেকে পূর্বে। এপ্রিলের খুব সুন্দর এক সকাল।
ইস! তার সঙ্গে যদি কথা বলতে পারতাম আধা ঘণ্টাই যথেষ্ট ছিল; শুধু তার সম্পর্কে জানতে চাইতাম, তাকে নিজের সম্পর্কে বলতাম, আর আসলে আমি কী করতে চাই অর্থাৎ ভাগ্যের ফেরে ১৯৮১ সালের এপ্রিলের সুন্দর সকালে হারাজুকুর গলিপথে একে অপরের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মতো বিষয়টা তাকে ব্যাখ্যা করতাম। এ আলাপ অবশ্য উথালপাথাল প্রেমালাপে ভরপুর হতো, ঠিক যেন পৃথিবী শান্তিতে ভরে থাকার সময় তৈরি করা একটি প্রাচীন ঘড়ি।
কথা বলার পরে, আমরা কোথাও লাঞ্চ করতাম, সম্ভবত ওডি অ্যালেনের কোনও সিনেমা দেখতাম, কোনও হোটেলের বারে থেমে ককটেল খেতাম। ভাগ্যের জোরে আমরা হয়তো শয্যাসঙ্গীও হতে পারতাম।
সম্ভাবনা হৃদয়ে কড়া নাড়ে। দূরত্ব আমাদের মধ্যে এখন পনেরো গজে এসে থেমেছে।
ক্যামনে তারে অ্যাপ্রোচ করব ? আর কীই-বা বলার আছে আমার ?
‘শুভ সকাল, মিস। দুঃখিত, হঠাৎ থামালাম। আপনার যদি সময় না থাকে, কোনও সমস্যা নেই তবু জিজ্ঞেস করছি, আধা ঘণ্টা কথা বলা যাবে কি ?’
হাস্যকর গ্রাম্যতা। যেন বা আমি বিমা কোম্পানির দালালের গলা শুনছি।
‘মাফ করবেন, কিন্তু কথা হলো যে আপনি কি আমাকে জানাতে পারেন আশপাশে কোনও লন্ড্রি আছে যারা সারা রাত জেগে কাপড় কাচে।’
না এটাও হাস্যকর, আমি তো কাচার জন্য কোনও কাপড় নিয়ে আসিনি। এমন কথাই-বা কে বিশ্বাস করবে।
সম্ভবত সবচেয়ে নির্জলা সত্য যেটা বলতে চাই, ‘শুভ সকাল! আপনি আমার জন্য একশ পারসেন্ট পারফেক্ট গার্ল।’
না, সে এটা বিশ্বাস করবে না। অথবা সে বিশ্বাস করলেও, আমার সঙ্গে কথা বলতে নাও চাইতে পারে। সে বলতে পারে, ‘দুঃখিত, আমি হয়তো তোমার জন্য শতভাগ নিখুঁত মেয়ে হতে পারি, কিন্তু তুমি আমার জন্য শতভাগ নিখুঁত ছেলে নও।’ এমনও হতে পারে। আর যদি সেই পরিস্থিতিতে ফেলি, তাহলে সম্ভবত আমি খান খান হয়ে যাব। এই ধাক্কা থেকে আমি কখনই উঠতে পারব না। আমার বয়স ৩২, আর বয়স বাড়লে যা হয় আর কী।
আমরা ফুলের দোকানের পাশ দিয়ে যাচ্ছি। মৃদু একটা উষ্ণ বাতাস আমার শরীরে ঝাপটা দিয়ে গেল। ভেজা রাস্তায় আমি গোলাপের গন্ধ পেলাম। তবু তার সঙ্গে কথা বলার সাহস করতে পারছি না। সে সাদা সোয়েটার পরে আছে, আর তার ডান হাতে একটা পরিষ্কার সাদা খাম, খামে কোনও ডাকটিকিটের ছাপ দেখা যাচ্ছে না। কাউকে হয়তো চিঠি লিখেছে, লেখার সময় ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখের সঙ্গে লড়াই করে সারা রাত লিখেছে এমন। খামটিতে তার জমানো সব গোপন কথা থাকতে পারে।
আমি আরও কয়েকটা পা ফেলি আর ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখি সে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেছে।
এখন, আমি তো জানি আমার তাকে কী বলা উচিত ছিল! সেটা লম্বা বক্তৃতা হতে পারে, যদিও, আমার পক্ষে ঠিকঠাকভাবে তেমনটা বলে যাওয়া কষ্টসাধ্য, প্যারারও। যেসব ধারণা নিয়ে এসেছি সেগুলো কোনওভাবে খুব একটা বাস্তবসম্মত নয়।
‘ভালো কথা। রূপকথার গল্পের মতো এটা শুরু হতো। এক ছিল এক রাজা আরেক ছিল… আর শেষ হতো একটা দুঃখের গল্প হিসেবে, আপনার কী মত ?’
এক দেশে ছিল এক ছেলে আর এক মেয়ে। ছেলেটার বয়স আঠারো আর মেয়েটার ষোলো। ছেলেটা দেখতে আহামরি ছিল না আর মেয়েটাও যে বিশেষ সুন্দর ছিল তাও না। আর দশটা সাধারণ নিঃসঙ্গ ছেলেমেয়ের মতোই ছিল। তারা পুরো হৃদয় দিয়ে বিশ্বাস করেছিল যে বিশ্বের কোথাও না কোথাও তাদের জন্য ১০০% নিখুঁত ছেলে ও ১০০% নিখুঁত মেয়ে বাস করে। হুঁ, তারা মনে করেছিল আশ্চর্য কিছু একটা ঘটবেই। আর তা ঘটেও ছিল।
একদিন রাস্তার এক কোণে আচমকা তাদের দেখা হয়ে গেল।
ছেলেটি বলল, কী সুন্দর! আমি কত কাল ধরে তোমাকে খুঁজছি। তুমি হয়তো বিশ্বাস করবে না তুমি আমার জীবনের সে।
মেয়েটি তাকে বলল, ‘আর তুমিই তো আমার চরম চাওয়ার সেজন। আমার শয়নে-স্বপনে তোমারই ছবি এঁকেছি।’
তারা পার্কের বেঞ্চে বসে হাত ধরে একে অপরকে নিজেদের গল্প ঘণ্টার পর ঘণ্টা বলে। তখন তারা আর একাকী নয়। পরস্পরের পরিপূরক দুজন দুজনকে খুঁজে পেয়েছে। ১০০% নিখুঁত কাউকে খুঁজে পাওয়া এবং নিজের করে পাওয়া কী যে চমৎকার ব্যাপার! এটি অলৌকিক ঘটনা, একটা মহাজাগতিক অলৌকিক ঘটনা।
তবে তারা যখন বসে কথা বলছিল একটুখানি সন্দেহের বীজ দানা বেঁধেছিল তাদের হৃদয়ে। কারও স্বপ্ন এভাবে এত সহজে সত্যি হওয়া ঠিক ?
তাদের কথায় যখন ছেদ পড়ল, তখন ছেলেটি মেয়েটিকে বলল, ‘চলো, তবে নিজেদের পরীক্ষা করে দেখা যাক। যদি আমরা সত্যিই একে অপরের জুটি হই, তাহলে কোনও না কোনও সময়, কোনও না কোনও জায়গায় নিশ্চিতভাবে আবার দেখা হবে। আর যখন সেটা হবে, আমরা জানতে পারব যে আমরা একশ পারসেন্ট পারফেক্ট দুজনের জন্য, তখনই সেখানেই বিয়ে করে ফেলব। তুমি কী মনে করো ?’
‘হ্যাঁ, ঠিক তাই করা উচিত হবে।’
অতঃপর তারা আলাদা হয়ে গেল। মেয়েটা পূর্বে আর ছেলেটা পশ্চিমে গেল।
যে পরীক্ষায় তারা রাজি হয়েছিল, তা একেবারেই অপ্রয়োজনীয় ছিল। তাদের এটি করা উচিত হয়নি একদম, কারণ তারা সত্যিই একে অপরের আর জনমে হংসমিথুন ছিল এবং তাদের দেখা হওয়াটা একটা বিস্ময়কর ঘটনাও ছিল। কিন্তু বয়স কম ছিল বলে, তাদের পক্ষে এটা বোঝা অসম্ভব ছিল। ভাগ্যের নিরুত্তাপ ও উদাসীন ঢেউ তাদের নির্দয়ভাবে এদিক সেদিক ছুড়ে ফেলতে থাকে।
কোনও এক শীতে, তারা দুজনেই ভয়ংকর সিজনাল সর্দিতে আক্রান্ত হয়, এবং সপ্তাহজুড়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে শৈশবের সব স্মৃতি হারিয়ে ফেলে। যখন ঘুম থেকে জাগে তখন দুজনের মাথা ছিল একেবারে খালি, ঠিক তরুণ ডি. এইচ. লরেন্সের শূকরছানার মতো দেখতে মাটির ব্যাংকটি যেমন ছিল।
দুজনেই বুদ্ধিমান, দৃঢ় প্রতিজ্ঞ আর বয়সে তরুণ ছিল। অনেক চেষ্টা করে তারা আবার সেই জ্ঞান ও অনুভূতি অর্জন করতে সক্ষম হয় যা তাদের সমাজে পূর্ণাঙ্গ সদস্য হিসেবে ফিরে আসার যোগ্যতা দেয়। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ তারা সত্যিকারের সুনাগরিক হয়ে ওঠে, তারা জানত কীভাবে পাতাল ট্রেনের এক লাইন অন্য লাইনে যায়, তারা পোস্ট অফিসে জরুরি চিঠি পাঠাতে সম্পূর্ণরূপে সক্ষম ছিল। তো, তারা আবারও প্রেম অনুভব করে, কখনও হয়তো ৭৫%-এর মতো যা ৮৫% পর্যন্তও হয়।
প্রচণ্ড গতিতে সময় কেটে গেল। শিগগিরই ছেলেটির ৩২ আর মেয়েটির ত্রিশ হলো।
এপ্রিলের এক সুন্দর সকালে। দিন শুরু করতে এক কাপ কফির খোঁজে ছেলেটি পশ্চিম থেকে পূর্বে হাঁটছিল। আর তখন মেয়েটি একটি জরুরি চিঠি পাঠাতে পূর্ব থেকে পশ্চিমে হাঁটছিল। কিন্তু একই সঙ্গে টোকিওর হারাজুকু পাড়ার সরু রাস্তা। রাস্তার একেবারে মাঝখানে তারা একে অপরকে অতিক্রম করেছে। তাদের হারানো স্মৃতির ক্ষীণ ঝিলিকমাত্র তাদের হৃদয়ে জ্বলে উঠেছিল। দুজনেই বুকে একটুখানি কাঁপুনি অনুভব করল। আর তারা বুঝে গেল,
সে আমার জন্য একশ পারসেন্ট পারফেক্ট গার্ল।
সে আমার জন্য একশ পারসেন্ট পারফেক্ট বয়।
কিন্তু সেই স্মৃতির আলো ছিল ভীষণ দুর্বল। তাদের চিন্তাভাবনাও আর চৌদ্দ বছর আগের মতো ছিল না। কিছুই না বলে তারা একে অপরকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল, ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল, চিরতরে।
খুব দুঃখের গল্প, তাই না ?
হ্যাঁ, ঠিক তাই, এই কথাগুলোই আমার তাকে বলা উচিত ছিল।
সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত



