অনুবাদ গল্পআর্কাইভবিশ্বসাহিত্য

পুরোহিত অরনে পেনিংগারের হত্যারহস্য : মূল : সেলমা লাগেরলফ

বিশ্বসাহিত্য : অনূদিত গল্প

মূল সুইডিশ থেকে বাংলা ভাষান্তর : লিয়াকত হোসেন

[সুইডেনের স্বনামধন্য লেখক সেলমা লাগেরলফ তার সৃজনশীল লেখনীর জন্য ১৯০৯ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনিই প্রথম নারী যিনি এই সম্মানে ভূষিত হন। তাঁর প্রথম উপন্যাস গোস্টা বার্লিং’স সাগা (১৮৯১) একটি সত্যিকারের ক্লাসিক, এরপর নিলস হোলগারসনের সুইডেনের বিস্ময়কর যাত্রা (১৯০৬-১৯০৭) পাঠকদের মুগ্ধ করেছে। তাঁর লেখা উষ্ণ সুইডিশ শরতের সন্ধ্যার মতো আরামদায়ক, জাদুকরী সৃজনশীলতায় পূর্ণ। সেলমা লাগেরলফের পুরোহিত অরনের হত্যারহস্য বইটি প্রকাশিত হয় ১৯০৪ সালে। মৃত আত্মা ও প্রকৃতি মিলিত হয়ে কীভাবে হত্যারহস্যের সমাধান করে তারই চিত্তাকর্ষক বর্ণনা প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর লেখনীর মাধ্যমে।]

টোরিন

ডেনমার্কের রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক যখন সুইডেনের বোহুসলান কাউন্ট্রি শাসন করতেন, তখন টোরিন নামে এক দুর্বল ও দরিদ্র মাছ ব্যবসায়ী ছিল। টোরিনের একটি হাত নষ্ট, সে হাত দিয়ে মাছ ধরা নৌকা চালানো সম্ভব হতো না। তাই সমুদ্রবন্দর নয় স্থলভাগের জনপদে লবণাক্ত এবং শুকনো মাছ বিক্রি করে ঘুরে বেড়াতো। বছরের খুব একটা সময় বাড়িতে না থেকে মাছ বিক্রি করার গাড়ি নিয়ে ক্রমাগত গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে বেড়াতো।

ফেব্রুয়ারির কোনও এক ঘন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরছিল টোরিন।

সঙ্গে কালো লোমযুক্ত কুকুর গ্রিম, বাড়িতে বেশির ভাগ সময় পায়ের মাঝে মাথা চেপে স্থিরভাবে শুয়ে থাকে। মালিকের কথায় চোখ মেলে তাকায় আর কাউকে পছন্দ না হলে নেকড়ের চেয়েও খারাপভাবে চিৎকার করে। অন্ধকার ও নির্জন রাস্তা। রাস্তায় যেতে যেতে অন্ধকারে কথা বলে টোরিন, ঠান্ডায় সমুদ্র বরফে জমে গেছে। ঘোড়া অথবা স্লেজে করে বাড়ি ফেরা যায়। এখন তো নৌকা বা জাহাজ চালানো সম্ভব নয়, চারদিকে পুরু হয়ে জমে আছে শক্ত বরফ। কুকুরের মনে হয় এই সব শুনতে ভালো লাগছিল না। তাই চুপ করে থাকে ও টোরিনের দিকে পিট পিট করে তাকায়। টোরিন বলে চলে, ‘আমাদের খুব বেশি মাছ অবশিষ্ট নেই, প্রায় সবই বিক্রি হয়ে গেছে।’ 

‘মা বেশ কয়েকদিন ধরে বাড়িতে একা বসে আছে। সে নিশ্চয়ই আমাদের দেখার জন্য আকুল।’ কুকুরটি জেগে উঠে শুয়ে পড়ল এবং কোনও অসন্তুষ্টির চিহ্ন দেখাল না। টোরিন পশ্চিমে সমুদ্রের দিকে যাওয়ার প্রথম রাস্তা ধরে এগিয়ে চলে। ঘোড়ার লাগাম টেনে ঘোড়াটিকে দ্রুত যেতে দেয়। টোরিন নিচু স্বরে কথা বলছিল, কুকুরটি তার কথা শুনেছে কি না তা ভেবে দেখেনি। কিন্তু কথা শেষ করার আগেই কুকুরটি গাড়ি থেকে ভয়ানক চিৎকার করে উঠে। ঘোড়াটি লাফিয়ে একপাশে চলে যায়, এমনকি টোরিনও ভয় পেয়ে যায়, চারপাশে তাকায়, পিছনে কোনও নেকড়ে আসছে কি না। কিন্তু যখন সে দেখতে পেল যে গ্রিমই চিৎকার করছে, তখন সে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে, কিন্তু কুকুরটিকে শান্ত করতে পারেনি। সে তার নাক উঁচু করে আরও ভয়ংকরভাবে চিৎকার করে উঠে।

নির্জন পাহাড় থেকে বেরিয়ে আসছিল নানা ধরনের বৃহৎ পশু।

একই সাথে সে কুকুরটিকে চুপ করানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু চুপ করাতে না পেরে কুকুরটিকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়, কুকুরটি তার পিছু পিছু এগিয়ে গেল না, বরং রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে লাগল যতক্ষণ না টোরিন অন্ধকার সরু পথ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে পুরোহিতের বাসভবনের উঠোনে প্রবেশ করে।

পুরোহিত অরনে পরিবারের সকলের সাথে রাতের খাবার খাচ্ছিলেন।

সেখানে টোরিন ছাড়া বাইরের আর কেউ উপস্থিত ছিল না। পুরোহিত বৃদ্ধ, সাদা চুলের মানুষ, কিন্তু তিনি এখনও শারীরিক ভাবে সমর্থ এবং লম্বা। স্ত্রী পাশে বসে ছিলেন। বছরের পর বছর ধরে তিনি অসুস্থ। তার মাথা ও হাত কাঁপছিল, এবং তিনি প্রায় বধির। পুরোহিত অরনের অন্য পাশে তরুণ ও ফ্যাকাশে চেহারার সহকারী পুরোহিত বসে, যেন পড়াশোনার সময় যে সমস্ত শিক্ষা অর্জন করেছিলেন তা অনুধাবন করতে সক্ষম হননি।

এই তিনজন বসেছিলেন টেবিলের অগ্রভাগে। তাদের নিচে টোরিন এবং তারপর বসেছিল বৃদ্ধ চাকরেরা।  তিনজন চাকরের মাথায় টাক, পিঠ বাঁকানো এবং চোখ জ্বলজ্বল করছিল। দুজনের বেশি দাসী ছিল না। তারা চাকরদের তুলনায় কিছুটা ছোট ও চটপটে, কিন্তু দুর্বল পূর্ণ বয়স্কা বৃদ্ধা।

টেবিলের একেবারে নিচে দুটি মেয়ে বসে। একজন পুরোহিত অরনের নাতনি, বয়স চৌদ্দ বছরের বেশি নয়, ফর্সা চুল ও হালকা পা, মুখ তখনও সম্পূর্ণরূপে তৈরি হয়নি, কিন্তু দেখতে সুন্দর হতে পারে বলে মনে হয়। তার পাশে আরও একটি ছোট মেয়ে, দরিদ্র, পিতৃহীন মাতৃহীন এবং সে সব সময় পুরোহিতের বাড়িতে থাকে।

সবাই নীরবে বসে খাচ্ছিল।

টোরিন এদিক ওদিক তাকায়, কিন্তু খাবারের সময় কারও কথা বলার ইচ্ছা ছিল না। বৃদ্ধরা ভাবত: আমরা যখন খাই, তখন ঈশ্বরের মঙ্গলের জন্য আমাদের ধন্যবাদ জানানো ছাড়া আর কিছুই ভাবা উচিত নয়।

যেহেতু টোরিনের সাথে কথা বলার কেউ ছিল না, তাই তার দৃষ্টি ঘরের উপর-নিচে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তার চোখ বড় চুলা থেকে প্রবেশদ্বার, ঘরের দূর কোণে অবস্থিত উঁচু বিছানার দিকে ও ঘরের চারপাশে বিস্তৃত দেয়াল, বেঞ্চ থেকে ছাদের ধোঁয়া বের হবার ভেন্টিলেশান পর্যন্ত তাকাল, যেখান দিয়ে ধোঁয়া বেরিয়ে শীতের ঠান্ডা প্রবেশ করে।

টোরিন  ছোট  মাছ ব্যবসায়ী, দ্বীপের সবচেয়ে ছোট এবং ভাঙাচোরা কুটিরে থাকে, এই সমস্ত দেখে ভাবে: আমি যদি পুরোহিত অরনের মতো হতাম, তাহলে কেবল একটি কক্ষ ও প্রাচীন কুটিরে থাকতে সন্তুষ্ট হতাম না। আমি অনেক কক্ষবিশিষ্ট একটি বাড়ি তৈরি করতাম, যেমন স্থানীয় মেয়র থাকেন।

কিন্তু টোরিনের চোখ বারবার বিছানার কোনে একটি বড় সিন্দুকের দিকে ঘোরাফেরা করে। সে জানত যে পুরোহিত অরনের সমস্ত রুপার মুদ্রা ঐ সিন্দুকে আছে। এত বেশি আছে যে সিন্দুকটি কানা পর্যন্ত ভরে গিয়েছে। টোরিন দরিদ্র, পকেটে প্রায় কখনও রুপার মুদ্রা থাকে না, তবু সে ঐ টাকা চায় না। সবাই বলে যে পুরোহিত অরনে দেশের বিভিন্ন ধর্মশালা থেকে মুদ্রাগুলো নিয়ে এসেছেন এবং বৃদ্ধ সন্ন্যাসীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে এই টাকা তার জন্য দুর্ভাগ্য বয়ে আনবে।

টোরিন যখন এই চিন্তাভাবনা করছিল, তখন সে দেখতে পেল যে বৃদ্ধা গৃহবধূ ভালো করে শোনার জন্য কানের কাছে হাত তুলেছেন। তারপর পুরোহিত অরনের দিকে ফিরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আজ রাতে তারা কেন রাস্তার ধারে লম্বা ছুরি ধার দিচ্ছে ?’ ঘরের নীরবতার মধ্যে বৃদ্ধা আবার একই প্রশ্ন করলেন, তখন সবাই ভয়ে উপরের দিকে তাকাতে শুরু করে। পুরোহিত কিছু না বলে স্ত্রীকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বৃদ্ধা শান্ত না হয়ে ভয়ে তার চোখে জল এসে গেল, এবং তার হাত ও মাথা কাঁপতে লাগল। টেবিলের শেষে বসে থাকা দুই ছোট মেয়ে উদ্বেগে কাঁদতে শুরু করে। পুরোহিত চুপ করে বসে রইলেন এবং স্ত্রীর হাতে হাত রাখলেন। যতক্ষণ তিনি চুপ করে রইলেন, ততক্ষণ আর কেউ একটি শব্দও উচ্চারণ করার সাহস পেল না।

বৃদ্ধা গৃহবধূই বহু বছর ধরে বাড়িটি আগলে রেখেছেন।

তিনি সবসময় খামারবাড়িতে থাকেন এবং সন্তান, চাকর, সম্পত্তি ও গবাদি পশুর দেখাশোনা করেন। এখন তিনি ক্লান্ত এবং বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন, কিন্তু এটা নিশ্চিত যে খামারে বিপদ এলে তিনি অন্য কারওর আগেই টের পান। বৃদ্ধা আরও ভয় পেয়ে গেলেন এবং তার কুঁচকানো সংকুচিত গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

টোরিন আবার রাস্তায় বেরোলো।

তার কুকুর গ্রিম তখনও পুরোহিতের ঘরের বাইরে অপেক্ষা করছে। টোরিনকে দেখা মাত্রই কুকুরটি তার বোঝার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। টোরিন বলে, তুমি কি সারা সন্ধ্যা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছ ? কিছু খাওনি ? পুরোহিতের নব্বই বছর বয়েস হয়ে গেছে, তার সঙ্গে আবার হয়তো দেখা হবে না! কুকুর কিছুই বুঝলো না, তবে টোরিন ঘোড়াসহ গাড়িটিকে খামার পেরিয়ে রাস্তায় নিয়ে গেল।

সে রাস্তার ধারে সরাইখানায় পৌঁছালো, দেখতে পেল দেয়ালের বন্ধ জানালা দিয়ে আলো আসছে। উঠোনে গাড়ি চালিয়ে গিয়ে সরাইখানার দরজা খুলে দেখতে পায় ভেতরে ভোজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেয়ালের পাশের বেঞ্চগুলিতে বৃদ্ধরা বসে বিয়ার পান করছে, এবং মেঝেতে ছোটরা হেঁটে বেড়াচ্ছে, খেলা করছে এবং গান গাইছে।

টোরিন একটি টেবিলে বসে কিছুক্ষণ স্থানীয় কৃষকদের সাথে কথা বলে।

একটু পরে নোংরা পোশাক পরা একজন পুরুষ এবং একজন নারী দরজা ঠেলে ভেতরে এল। লোকটি টোরিনের পাশে বসে কথা বলতে শুরু করে, তারা বেশ আগেই এখানে আসতে পারত, হঠাৎ করেই তিনজন ক্লান্ত লোক এসে উপস্থিত, জঙ্গলে নাকি তারা পথ হারিয়ে ফেলেছিল। খাওয়া-দাওয়া ও ঘুমানোর পর তারা জানায় এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় এবং ধনী ব্যক্তির খামারে কাজ করতে চায়। এই অঞ্চলে পুরোহিত অরনেই ধনী ব্যক্তি সেটা জেনে তারা চলে যায়। লোকগুলো লম্বা দাড়ি ও নোংরা চামড়ার কোট পরেছিল।

মধ্যরাতের অনেক পরে কয়েকজন সরাইখানা থেকে বেরিয়ে ঘোড়ার উপর চড়ে, বাড়ি ফিরতে হবে। কিন্তু তারা বাইরে বেরিয়ে দেখে চারদিক আলো, আগুনের শিখা উত্তরে আকাশে উঠে গেছে। চিৎকার করে সবাইকে ডাকাডাকি শুরু করে। ততক্ষণে আগুনের শিখা পুরোহিত অরনের খামার বাড়ি গ্রাস করে ফেলেছে। অনেকে দৌড়ে পুরোহিতের বাড়ি এসে কাউকে দেখতে পেল না। বাতাসে পোড়া গন্ধ, আগুনের ধোঁয়া কিন্তু জনমানবের সাড়া পাওয়া গেল না। পুরোহিত অরনে ও তার পরিবার কি ঘুমিয়ে ? নাকি তাদের উপর কোনও দুর্যোগ নেমে এসেছে! সবাই বুঝতে পারল এটা অগ্নিসংযোগ, আগুন লাগানো হয়েছে। কয়েকজন পুড়ে যাওয়া সামনের দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। প্রথম ব্যক্তিটি দোরগোড়ায় পৌঁছে একপাশে সরে গেলেন, ঘরের ভেতর রক্তের বন্যা বয়ে গেছে। দরজার হাতলেও রক্ত। 

কিছুক্ষণ পর মাথায় গভীর ক্ষত নিয়ে দরজা দিয়ে সহকারী পুরোহিত বেরিয়ে এলেন ও টলতে টলতে সবার দিকে এগিয়ে গিয়ে একমুহূর্ত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাত তুলে নীরবতা প্রার্থনা করে বললেন, ‘পুরোহিত অরনে এবং তার পরিবারের সবাইকে তিনজন লোক হত্যা করেছে। তারা ছাদের উপর দিয়ে নেমে এসে বন্য পশুর মতো আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।’ বলতে বলতে তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে আছড়ে পরে মারা গেলেন। পুরোহিত অরনের সিন্দুকটি কোথাও দেখা গেল না। খুনিরা নিয়ে গেছে। ঘোড়ার আস্তাবল থেকে ঘোড়া ও স্লেজটিও নিয়ে গেছে, বরফের উপর দিয়ে স্লেজের দাগ সমুদ্রের দিকে এগিয়ে গেছে। কয়েকজন খুনিদের ধরতে দ্রুত ছুটে বেরিয়ে গেলেন। নারীরা মৃতদের সৎকারের ব্যবস্থা নিলেন।

পুরোহিত অরনের পরিবারের সবাই মারা গেলেও এলসা নামে বারো বছরের মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়া গেল, সে ভয়ে চুলোর পাশে লুকিয়ে ছিল। অনাথ মেয়েটির ব্যাপারে সবাই উদ্বেগ প্রকাশ করায় টোরিন এগিয়ে এসে মেয়েটির ভার নেয়, কারণ পুরোহিত অরনে যতবারই টোরিনের কাছ থেকে মাছ কিনেছেন ততবারই তাকে নিয়ে টেবিলে বসে খেয়েছেন। এলসা তার বৃদ্ধা মায়ের সঙ্গে থাকবে।

মেয়েটি টোরিনের বাড়িতে আসার পর প্রথম কয়েক দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাঁদে। পুরোহিতের পরিবারের জন্য বিলাপ করে। এভাবে চলতে পারে না বলে টোরিনের মা বলেন, তুমি আমার সঙ্গে চলো, ঘাটে মাছ ধোয়ার কাজ করবে।

টোরিনের মার সাথে ঘাটে গেল এলসা এবং সারা দিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অন্যদের মতো মাছ পরিষ্কারের কাজ করল। ঘাটে অধিকাংশই তরুণী এবং হাসিখুশি। এলসাকে নতুন দেখে আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞাসা করে, কেন তাকে দুঃখী দেখাচ্ছে ? এলসা বলে, তিন দিন আগে তিনজন ডাকাত পুরোহিত অরনের পরিবারের সবাইকে হত্যা করেছে। ঘটনার বিবরণ দিতে দিতে সে কেঁদে ফেলে। চোখ মুছে তাকিয়ে দেখে তিনজন ভদ্রলোক তার পাশে দাঁড়িয়ে। তাদের মাথায় বড় বড় প্রশস্ত টুপি এবং গায়ে মখমল ও সিল্কের পোশাক। তাদের মধ্যে একজন ফ্যাকাশে, দাড়ি কামানো এবং গভীর চোখ। দেখে মনে হয় তিনি সবেমাত্র সুস্থ হয়েছেন। এলসা মাছ ধোয়ার কাজ এবং কথা বলা উভয়ই বন্ধ করে দেয়। লোকটি খোলা মুখ এবং প্রশস্ত চোখ নিয়ে দাঁড়িয়ে এলসার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আর এলসা তার দিকে তাকিয়ে হাসল।

‘আমরা তোমাকে ভয় দেখাতে আসিনি’, তিনি বললেন, ‘কিন্তু তোমাকে অনুরোধ করছি, কী দেখেছো আমাদের বলো।’ এলসা কিছু না বলে চুপ করে রইল।

অপরিচিত ব্যক্তিটি আবার বললেন: ‘ভয় পেও না। আমরা স্কটল্যান্ড থেকে এসেছি। শীতের ঠান্ডায় সাগরের জল জমে বরফ হয়ে গেছে। তাই জাহাজ যেতে পারছে না। তবে খুব সত্বর চলে যাব। আমরা খুশি হব যদি তুমি আমাদের তোমার গল্প শুনতে দাও। পুরোহিত অরনের কথা শুনেছি, তবে জানতাম না যে অরনের পরিবারের কেউ জীবিত আছে।’

এলসা আবারও বিস্তারিতভাবে বন্য ডাকাতদের কথা বলে।

‘খুনিরা ছাদের ওপর দিয়ে ঘরে ঢুকে একের পর এক সবাইকে ধারালো ছুরি দিয়ে হত্যা করে। বাড়ির মহিলারা হামাগুড়ি দিয়ে দেয়ালের পাশে লুকিয়ে ছিল, সেখান থেকে তাদের টেনে-হিঁচড়ে এনে হত্যা করা হয়। একে একে পুরুষদের হত্যা করে ও আমার পালিত বোনকে বুকে ছুরি ঢুকিয়ে হত্যা করে।’ অপরিচিত ব্যক্তিরা এলসার সামনে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। তাদের চোখ জ্বলজ্বল করছিল এবং কখনও কখনও তাদের ঠোঁট এমনভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল যে দাঁতের সারি দেখা যাচ্ছিল। কখা শেষ করে এলসা চোখের জল ফেলে। একজন জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি যেহেতু এত কাছ থেকে দেখেছো, তুমি কি খুনিদের চিনতে পারবে ?’ এলসা জানায় আগুনের আভা ও ধোঁয়ায় তাদের ভালো করে চিনতে পারেনি, তবে সে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে যেন তাদের সাথে আবার দেখা হয়।

‘তুমি কী বোঝাতে চাও  ?’ অপরিচিত ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করেন, ‘খুনিরা কি মারা যায়নি ?’

‘আমি এটা ভালো করেই জানি,’ এলসা বলল, ‘যারা খুনিদের তাড়া করছিল তারা বরফের একটি বড় ফাটল পর্যন্ত অনুসরণ করেছিল। পুরো পথ চকচকে বরফের উপর স্লেজের চিহ্ন, ঘোড়ার খুরের চিহ্ন, লোহার শক্ত জুতা পরা লোকদের পায়ের চিহ্ন দেখতে পেয়েছিল। কিন্তু ফাটলের ওপারে কোনও চিহ্ন বরফের উপর ছিল না, তাই অনুসরণকারীরা বিশ্বাস করেছে যে বরফের ফাটলে পড়ে গিয়ে সবাই মারা গেছে।’

‘এলসা, তুমি কি মনে করো না যে তারা মারা গেছে ?’ অপরিচিত ব্যক্তিটি জিজ্ঞাসা করেন।

‘হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি যে তারা ফাটলের গভীরে বরফ গলা জলে ডুবে গেছে,’ এলসা বলল, ‘তবু আমি প্রতিদিন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যে তারা হয়তো পালিয়ে গেছে।’

‘তুমি এই প্রার্থনা কেন করো এলসা ?’ অপরিচিত ব্যক্তিটি জিজ্ঞাসা করেন।

এলসা তার মাথা পিছনে নিয়ে বলে, ‘আমি চাই তারা বেঁচে থাকুক, যাতে আমি তাদের খুঁজে বের করতে পারি। আমি চাই তারা বেঁচে থাকুক, যাতে আমি তাদের বুক থেকে হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে ফেলতে পারি। আমি চাই তারা বেঁচে থাকুক, যাতে আমি তাদের দেহগুলিকে চার টুকরো করে কাটা দণ্ডে ঝুলতে দেখতে পারি। তারা আমার বাড়ি কেড়ে নিয়েছে, আমার স্বজন কেড়ে নিয়েছে, আমার বোনকে কেড়ে নিয়েছে।’

এলসার প্রচণ্ড রাগ দেখে তিনজন স্কটিশ হাসতে হাসতে বন্দরের দিকে চলে গেল। দূর থেকেও এলসা তাদের তীক্ষè হাসির উপহাস শুনতে পেল।

মৃত্যুর আট দিন পর, পুরোহিত অরনেকে গির্জায় সমাহিত করা হয় এবং একই দিনে আদালতে হত্যার তদন্ত শুরু হয়। পুরোহিত এলাকার সুপরিচিত ব্যক্তি ছিলেন, এবং শেষকৃত্যের দিন দ্বীপের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রচুর জনসমাগম হয়। সন্ধ্যার শেষের দিকে টোরিন রাস্তা ধরে এগিয়ে যায়। সারাদিন শেষকৃত্যের ধকল গিয়েছে। ক্লান্ত হয়ে সে গাড়ির বোঝার ওপর শুয়ে পড়ে। ঘটনার দিন তার কুকুর তাকে সতর্ক করেছিল, সে বুঝতে পারেনি, সর্তক হলে এমন হতে পারত না, পুরো পরিবারসহ পুরোহিত অরনেকে হারাতে হতো না। চিন্তার যন্ত্রণা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে সে। আর ঘোড়াটি এদিক-ওদিক এলোমেলো পথে চলতে চলতে পুরোনো অভ্যাসমতো পুরোহিতের উঠোনের সামনে এসে দাঁড়ায়। ঘোড়াটি থামলেই সে উঠে চারপাশে তাকায়।

টোরিন কাঁপতে শুরু করে যখন দেখে, সে এমন একটি বাড়ির সামনের উঠোনে দাঁড়িয়েছে যেখানে মাত্র এক সপ্তাহ আগে লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড হয়েছিল। সে তৎক্ষণাৎ ঘোড়ার লাগাম ধরে ফেলে ঘোড়াকে ঘুরিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে চাইল। ঠিক তখনই কেউ তার কাঁধে টোকা দেয়, পেছন ফিরে দেখে পুরোহিত অরনের বৃদ্ধ ঘোড়াপালক ওলোফ। টোরিন জানে আগুনে পুড়ে মারা গেছে ওলোফ। ভয় পেয়ে যায় টোরিন, বুঝতে পারে না সে কী করবে, ঘোড়াটিকে ছুটিয়ে নিয়ে রাস্তায় নিতে চায়, কিন্তু মুহূর্তেই ঘোড়ার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে লাগাম ধরে স্থির করে দাঁড়াতে বাধ্য করে ওলোফ। বলে, ‘এত তাড়াহুড়া কিসের টোরিন ? পুরোহিত অরনে বাড়ির ভেতর তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।’

টোরিনের মাথায় হাজারো চিন্তা। সে বুঝতে পারছে না সে স্বপ্ন দেখছে নাকি জেগে আছে। ওলোফকে তো গলায় বড় ক্ষত নিয়ে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছে। টোরিন শক্ত হয়ে দাঁড়াল এবং ভাবল এখান থেকে দ্রুত চলে যাওয়াটাই তার জন্য ভালো। কিন্তু ওলোফের হাত থেকে নিস্তার না পেয়ে বলে, ‘এত রাতে পুরোহিতকে বিরক্ত করা ঠিক হবে না, আমি আগামীকাল আবার আসতে পারি।’ এই বলে টোরিন সামনের দিকে ঝুঁকে ঘোড়াটিকে লাগাম দিয়ে আঘাত করে।

‘পুরোহিত অরনে এখনও ঘুমাতে যাননি, তিনি তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।’

টোরিন পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া বাড়ির ভেতর যেতে চাইল না কিন্তু চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে বাড়িঘর তো ঠিকই আছে, আগুন লাগার আগে যেমন ছিল। পুরোহিতের ঘরটি ছাদে খড় এবং তুষার জমে অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। ছাদের গর্ত দিয়ে ধোঁয়া ও স্ফুলিঙ্গ উড়তে দেখতে পেল। শক্তভাবে বন্ধ শাটারের মধ্য দিয়ে আলোর ঝলক তুষারের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে।

‘ভেতরে এসো, টোরিন,’ ওলোফ বলে।

টোরিনের দ্বিধাগ্রস্ত পদক্ষেপ ছিল উঠোন পেরিয়ে কুটিরের দিকে হেঁটে যাওয়ার সময়। দরজা খোলার পর টোরিন চোখ বন্ধ করে ফেলে যাতে ঘরের ভেতর না তাকাতে হয়। পুরোহিতের কথা ভেবে নিজেকে সাহস জোগানোর চেষ্টা করে। টোরিন চোখ খুলে ঘরের দিকে তাকায়, বৃহৎ কেবিনটি ঠিক যেমনটি আগে দেখেছিল ঠিক তেমনই দেখতে পায়। তারপর পুরোহিতকে সশরীরে টেবিলের মাঝখানে জীবন্ত অবস্থায় বসে থাকতে দেখতে পায়, তার স্ত্রী ও সহকারী পুরোহিত উভয় পাশে বসে, যেমনটি আট দিন আগে দেখেছিল। মনে হচ্ছে এই মাত্র তারা খাবার শেষ করেছেন, পিছনে ঠেলে দিয়েছেন প্লেটগুলো। বয়স্ক চাকর-বাকরেরা টেবিলে বসে ছিল, কিন্তু অল্পবয়সী মেয়েদের মধ্যে কেবল একজন।

টোরিন দরজার কাছে অনেকক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, টেবিলে যারা বসেছিল তাদের দিকে তাকাল। তারা সকলেই উদ্বিগ্ন ও বিষণ্ন, পুরোহিতও অন্যদের মতো বিষণ্নভাবে হাতে মাথা রেখে বসেছিলেন।

বললেন, ‘ওলোফ, তুমি কি তোমার সাথে কুটিরে কোনও অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে এসেছো ?’

‘হ্যাঁ,’ ওলোফ উত্তর দেয়, ‘টোরিন, মাছ ব্যবসায়ী, এসেছে।’

তখন পুরোহিত আরও খুশি হয়ে উঠলেন, ‘সামনে এসো, টোরিন, আমি এখানে অর্ধেক রাত ধরে বসে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।’ টোরিন ঘরের ভেতরটা খুঁটিয়ে দেখে, সিন্দুকটি নেই। পুরোহিত জানতে চান, ‘আমাদের খুনিদের কি খুঁজে পাওয়া গেছে এবং শাস্তি দেওয়া হয়েছে ?’

‘না, পুরোহিত অরনে,’ টোরিন সাহস করে উত্তর দেয়। ‘খুনিরা ফাটলের তলদেশে পড়ে গেছে।’

তখন পুরোহিত পুরোনো মেজাজে জ্বলে উঠলেন এবং টেবিল চাপড়ে বললেন, ‘তুমি কি বলছো, টোরিন ? আদালতের আইনজীবীদের কেউ কি বলেনি যে আমার খুনিদের কোথায় খুঁজে পাবে ?’

পুরোহিত কিছুক্ষণ ভ্রƒ কুঁচকে বসে রইলেন এবং বিষণ্ন দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকালেন। তারপর তিনি আবার টোরিনের দিকে ফিরে বললেন, ‘আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাসো, টোরিন। তুমি কি আমাকে বলতে পারো কীভাবে আমি আমার খুনিদের উপর প্রতিশোধ নেব ?’

‘আমি অবশ্যই বুঝতে পারছি পুরোহিত অরনে’, টোরিন বলে, ‘যারা আপনার জীবনকে দুর্বিষহ করে দিয়েছে তাদের ওপর আপনি প্রতিশোধ নিতে চান। কিন্তু ঈশ্বরের পৃথিবীতে আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে আপনাকে সাহায্য করতে পারে।’

পুরোহিত এই উত্তর পাওয়ার পর গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন।

দীর্ঘ নীরবতার পর বলেন, ‘যখন জীবিতরা আমাদের সাহায্য করতে পারবে না, তখন আমাদের মৃতদের নিজেদেরই সাহায্য করতে হবে।’

এই বলে পুরোহিত উচ্চস্বরে প্রার্থনা শুরু করেন। প্রার্থনার পর টেবিলে বসে থাকা একজনের দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করলেন, মেয়েটি তৎক্ষণাৎ বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল এবং পুরোহিত তাকে বললেন: ‘তুমি জানো তোমাকে কী করতে হবে।’ মেয়েটি নমনীয় ভাবে জানায় তার পক্ষে কি এই দায়িত্ব পালন সম্ভব!

‘সত্যিই তোমাকে যেতে হবে,’ পুরোহিত বলেন, ‘তোমার যাওয়া উচিত, কারণ তোমারই প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। তিনি আদেশ দিয়ে বলেন, ‘তুমি এখনই যাবে, এবং একা কাজ করবে না। তুমি জানো যে জীবিতদের মধ্যে দুজন আছেন যারা আট দিন আগে আমাদের সাথে টেবিলে বসেছিলেন।’ পুরোহিতের কথা শুনতে পেয়ে টোরিনও বুঝতে পারে, খুনিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তাকেও নিযুক্ত করা হয়েছে।

ঠিক সেই মুহূর্তে পুরোহিতসহ সবাই কুয়াশার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

গভীরভাবে ভাবতে গিয়ে টোরিন মাথা ঘুরে পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সকালে ঘুম ভেঙে দেখে সে মাটিতে পড়ে আছে, ঘোড়াটি পাশে বোঝা নিয়ে দাঁড়িয়ে আর কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করে তার উপর ঝাঁকুনি দিচ্ছে।

‘সবই কি স্বপ্ন ?’ মাটি থেকে উঠে জনশূন্য খামার ও ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে থাকে টোরিন।

পুরোহিত পক্ষকাল আগে মারা গেছেন।

তারপর এক সন্ধ্যায় টোরিন চাঁদের আলোয় ঘোড়ায় চড়ে বের হয়। সমভূমির ওপর প্রশস্ত এবং খোলা রাস্তা, রাস্তার পাশে বেশ কয়েকটি পাথুরে পাহাড়। পুরো এলাকাটি সাদা, উজ্জ্বল তুষারে ঢাকা। যতদূর দেখা যাচ্ছিল একই মসৃণ সমভূমি এবং একই পাথুরে পাহাড় ছাড়া আর কিছুই ছিল না। টোরিন গাড়ি চালিয়ে উঁচু পাথুরে পাহাড়ের দিকে মোড় নেয়। তারপর সে অদ্ভুত কিছু দেখে চিৎকার করে উঠে।

গাড়ির ভেতর ঘুমিয়ে থাকা কুকুরকে বলে, ঐ যে সমুদ্র! আমাদের সামনে একটি বড় জাহাজ। টোরিন আরও কিছুক্ষণ স্থির থেকে বরফে জমে থাকা বিশাল জাহাজের দিকে তাকাল। এটা কি হারিয়ে যাওয়া জাহাজ, চারপাশে মসৃণ সমতল তুষারপাতের মধ্যে পড়ে আছে।

টোরিন খেয়াল করে দেখে জাহাজের বারান্দা থেকে সামান্য ধোঁয়া উঠছে, তখন সে এগিয়ে গিয়ে জাহাজের ক্যাপ্টেনকে ডেকে জিজ্ঞাসা করে যে, তিনি কিছু মাছ কিনতে চান কি না। তার কাছে কেবল দুটি অবিক্রিত কড মাছ আছে। দিনের বেলায় ঘুরে ঘুরে সব মাছ বিক্রি করে ফেলেছে। জাহাজের ক্যাপ্টেন তার লোকদের সাথে বসেছিলেন, মাছের প্রয়োজন ছিল না। তিনি দিনের পর দিন দ্বীপের ভেতর জাহাজ নিয়ে আটকে আছেন, পাল তুলে সমুদ্রে যেতে পারেননি। ঈশ্বর কেন সমুদ্রের দরজা বন্ধ করে রাখেন বোঝা মুশকিল।

প্রচণ্ড শীত পড়েছে।

জল জমে পুরু বরফের চাঁই হয়ে গেছে। সমুদ্রও যেন পুরু বরফের কাছে তার নীল স্বচ্ছ জলের কথা ভুলে গেছে। এলসা প্রায়ই ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। এক সন্ধ্যায় দেখতে পেল, একজন লম্বা লোক, যার মাথায় চওড়া কাঁটাযুক্ত টুপি, পরনে লম্বা চামড়ার পোশাক, অন্যদের মতো সমুদ্রের পশ্চিম দিকে তাকিয়ে পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এলসা দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে কাঁদে।

লোকটি শহরে ফিরে যাবার সময় কুটিরের সামনে এসে জিজ্ঞেস করে, তুমি কাঁদছো কেন ? এলসা লোকটিকে চিনতে পারল, স্যার আর্চি, স্কটসদের নেতা।

‘জীবনে আমার আর কিছু অবশিষ্ট নেই, আশা আকাক্সক্ষা কিছুই নেই, নিমেষেই সব শেষ হয়ে গেছে’, এলসা বলে।

স্যার আর্চি এলসার কুটিরে এসে তার দুঃখের কথা শুনলেন।

দুঃখের কথা বলতে পেরে এলসার ভেতরটাও হালকা হলো, কিন্তু যখন স্যার আর্চির চলে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এল, তৎক্ষণাৎ কুটিরের দরজা খুলে গেল, টোরিনের মা খুব দ্রুত ভেতরে এলেন। স্যার আর্চি নীরবে বেরিয়ে গেলেন। টোরিনের মা জানালেন, ‘আমাকে ডেকে পাঠানো তোমার ঠিক হয়েছে। আর্চির মতো একজন পুরুষের সাথে কুটিরে একা বসে থাকা একজন কুমারীর জন্য শোভনীয় নয়। আর্চির সম্মান বা বিবেক বলে কিছু নেই।’ এলসা অবাক হয়ে বলে, ‘আমি তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছি ?’ ‘হ্যাঁ,’ টোরিনের মা উত্তর দেন, ‘আমি যখন ঘাটে দাঁড়িয়ে মাছ পরিষ্কার করছিলাম, তখন একটি ছোট মেয়ে এসে বলে, তুমি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছো।’

‘ছোট মেয়ে ? দেখতে কেমন ?’ এলসা জানতে চায়।

টোরিনের মা জানান, তিনি মেয়েটিকে প্রথম দেখেছেন, তবে খুব কাছ থেকে নয়, মেয়েটি খুব সহজেই তুষারের উপর দিয়ে হেঁটে গেছে, কোনও শব্দ শোনা যায়নি। তুষারের ওপর কোনও পদচিহ্নও পড়েনি।

টাউন হলের বেসমেন্ট।

শহরের টাউন হলের বেসমেন্টের তত্ত্বাবধায়ক গৃহিণী একদিন সকালে ঝাড়ু দেওয়ার জন্য দরজা খুলে দেখলেন সিঁড়ির একপাশে একটি মেয়ে অপেক্ষা করছে। মেয়েটি লম্বা, ধূসর পোশাক পরা এবং পোশাকটি কোমরে বেল্ট দিয়ে বাঁধা, মাথার চুল হালকা কিন্তু বিনুনি করা নয়, চুল মুখের উভয় পাশে ঝুলে আছে।

দরজা খোলার পর মেয়েটি উঠে সিঁড়ি বেয়ে হলের ভেতরে গেল। গৃহিণী দেখলেন মেয়েটি এমনভাবে হাঁটছে যেন ঘুমের মধ্যে আছে। চোখের পাতা নিচু, হাত শরীরের সাথে শক্ত করে আটা। মেয়েটির পাতলা ও কোমল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। মুখটি সুন্দর ও স্বচ্ছ, যেন ভঙ্গুর কাচ দিয়ে তৈরি। গৃহিণী তাকে জিজ্ঞাসা করায় বলে, সে একটি চাকরি খুঁজছে এবং তাকে কাজে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করে।

গৃহিণী জানান, এখানে যারা আসে সবই বন্য পুরুষ। সন্ধ্যাবেলা সরাইখানায় বসে বিয়ার এবং ওয়াইন পান করে, হাসি তামাশা করে, এখানে তোমার মতো ছোট্ট মেয়ের কোনও নিরাপদ জায়গা নেই। মেয়েটি চোখ তুলে তাকালো না, সামান্য নড়াচড়াও করল না, উপরন্তু আবারও তাকে কাজ দেবার অনুরোধ করল। সে খাবার বা মজুরি কিছুই চাইল না, শুধু বলল, একটা কাজ চায়।

মেয়েটি সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে নেমে গেল অসহায় মেয়েটিকে দেখে গৃহিণী ডেকে বলেন, ‘এই অবস্থায় তুমি রাস্তাঘাটে এবং অলিগলিতে একা হাঁটলে আরও বেশি বিপদের সম্মুখীন হবে। আজ তুমি আমার সাথে থাকবে এবং কাপ ও থালাগুলি ধুয়ে ফেলো দেখি তোমার জন্য কী করা যায়।’

গৃহিণী তাকে একটি ছোট কক্ষে নিয়ে গেলেন, কক্ষটি হলের  পেছনে।

ভেতরে কোনও পিপহোল বা জানালা ছিল না, তবে ওপরে রেস্তোরাঁর ঘরে দেওয়ালের ছিদ্র দিয়ে আলো এসে পড়েছে। মেয়েটি শান্তভাবে মৃত আত্মার মতো প্রবেশ করে। সারাদিন সেখানেই দাঁড়িয়ে কারও সাথে কথা না বলে কাপ পিরিচ, থালা বাসনগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করে ফেলে। তাকে যে খাবার দেওয়া হয়েছিল তা স্পর্শও করেনি। থালা বাসন ধোয়ার শব্দও কেউ পায়নি।

সেদিন ঘাটে পরিষ্কার করার মতো কোনও মাছ না থাকায় বাড়িতেই ছিল এলসা। চুলায় ভালো আগুন থাকায় ঘরের ভেতরটা উজ্জ্বল ও গরম। কাজের মাঝে হালকা ঢেউয়ের মতো ঠান্ডা বাতাস কপালে এসে লাগে। মুখ তুলে তাকিয়ে দেখে তার মৃত পালিত বোন মেঝেতে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

এলসা স্থির হয়ে বসে পালিত বোনের দিকে তাকিয়ে রইল। প্রথমে ভয় পেয়ে গেলেও ভাবল, আমার বোন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সে মৃত হোক বা জীবিত, তবু আমি তাকে দেখে খুশি। সে মৃত বোনকে বলে, ‘তুমি কি আমার কাছে কিছু চাও ?’

মেয়েটি জানায়, সে সরাইখানায় কাপ এবং থালা-বাসন ধোয়ার দায়িত্ব নিয়েছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি কাজ করতে হয়। এলসা তাকে এই কাজে মাত্র একদিন সাহায্য করতে পারবে কি না ? এলসা বোনকে সাহায্য করবে জানায়। মেয়েটি দরজার দিকে যায়, এলসা তার পিছনে পিছনে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মেয়েটি বলে, ‘তোমায় চাদর পরতে হবে। বাইরে প্রচণ্ড ঠান্ডা ঝড় বইছে।’ তার কণ্ঠস্বর আগের চেয়ে একটু স্পষ্ট ও সুরহীন।

মেয়েটি এলসার থেকে দুই কদম এগিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল।

সন্ধ্যায় গলির ভেতর প্রচণ্ড ঝড়। অবশেষে তারা টাউন হলের কাছে এলে, মেয়েটি বেসমেন্টের সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলসাকে তার পিছু পিছু আসতে বলল। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে, বাতাসে হলের ঝুলন্ত লণ্ঠনের আলো নিভে গেল ও তারা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল। এলসা বুঝতে পারে না কোন দিকে যাবে, তার বোন পথ দেখানোর জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়। হাতটি এত ঠান্ডা যে এলসা ভয় পেয়ে যায়।

লম্বা পথ পেরিয়ে তারা একটা ছোট অন্ধকার ঘরে আসে, ঘরে দেয়ালের ছিদ্র দিয়ে হালকা আলো আসছে। একটা গামলায় ধোয়ার জন্য থালা-বাসন। ‘আজ রাতে এই কাজে তুমি কি আমাকে সাহায্য করবে, এলসা ?’ মেয়েটি বলে। এলসা মাথা নেড়ে সায় দেয়। এলসা চাদরটা খুলে হাতা গুটিয়ে কাজ শুরু করে। মেয়েটি এলসাকে একটু সাবধানে থাকতে বলে, যাতে বেসমেন্টের গৃহিণী বুঝতে না পারে। মেয়েটি যাবার জন্য তৈরি হয়। অবাক হয়ে এলসা বলে, ‘তুমি আমাকে বিদায় জানাচ্ছ ? আর আমাদের দেখা হবে না ?’ এলসা কপালে একপশলা হালকা ঠান্ডা অনুভব করে। মেয়েটি চলে গেছে।

এলসা হ্যাচে দাঁড়িয়ে হলের দিকে তাকাল। লক্ষ করল টেবিলে তিনজন পুরুষ বসে, স্যার আর্চি এবং তার দুই বন্ধু, রেজিনাল্ড ও ফিলিপ।

তারা তিনজন চুপচাপ বসে সামনের দিকে তাকিয়ে মদ্যপান করছিল।

এলসা দেখতে পেল স্যার আর্চি ঘরের ছাদকে ধরে রাখা স্তম্ভগুলির একটির দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি এমন কিছু দেখতে পেয়েছেন যা আগে লক্ষ করেননি। তার পালিত বোন সেই স্তম্ভের পাশে দাঁড়িয়ে স্যার আর্চির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। আগের মতোই ধূসর পোশাক পরে স্তম্ভের আড়ালে ভয়ংকর নিশ্চলভাবে স্যার আর্চির দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে আছে। স্যার আর্চি কেঁপে উঠলেন, তিনি যেখানেই যান ঐ ভয়ংকর চোখ তাকে অনুসরণ করে। 

অন্য দুই জন মদ্যপান বন্ধ করে তথাকথিত আর্চির দিকে ভয়ে তাকায়, তারপর তাদের একজন কাউন্টার থেকে সবচেয়ে বড় পানীয়ের জগটি নিয়ে লাল ওয়াইন দিয়ে গ্লাসগুলো ভরে বলে, ‘পান করো! পুরোহিত অরনের টাকা এখনও আছে। যতক্ষণ পর্যন্ত টাকা শেষ না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা বড় ধরনের ওয়াইনের বোতল কিনতে পারি।’ এলসা বুঝতে পারে তার মৃত বোন কেন তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। স্যার আর্চিসহ ঐ দুই ব্যক্তি পুরোহিত অরনের হত্যাকারী। এলসা অবাক হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় আর তখনই এলসাকে চিনতে পারেন আর্চি।

এলসা যে ঘরটিতে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে গেল

এবং ধীরে ধীরে তার পিছনের দরজাটি বন্ধ করে দিল। বাইরের সরু পথে এসে থামল। দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে সেখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চাদরটি নিজের চারপাশে জড়িয়ে নিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য পা বাড়াল। তাকে মৃত বোনের ইচ্ছানুযায়ী তিন খুনির পিছনে ছুটতে হবে―আর্চি, তথাকথিত ফিলিপ এবং তথাকথিত রেজিনাল্ড। এছাড়া মৃতদের শান্তিতে ঘুমাতে দেওয়ার আর কোনও উপায় নেই।

স্যার আর্চি ঘর থেকে বেরিয়ে সরু পথ ধরলেন। এলসাকে খুঁজে বের করতে হবে, সে সব জেনে গেছে। গলির ভেতর হালকা আলোয় দেখতে পেলেন এলসা দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্যার আর্চিকে দেখে ফ্যাকাশে হয়ে গেল এলসা। চাদর দিয়ে আরও শক্ত করে শরীর জড়িয়ে নিল। এরপর এলসাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

পরের দিন ঝড় থেমে গেছে।

মৃদু আবহাওয়ায় তুষার খুব বেশি কমেনি, কিন্তু সমুদ্রপথ আগের মতোই বন্ধ। আগের রাতে বিশাল ঝড়টি তুষারে জমে যাওয়া জাহাজের ওপর আছড়ে পড়ে, জাহাজটিকে সমুদ্রের ধারে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ঝড়ে জাহাজের দড়ি থেকে ঝুলন্ত ছোট ছোট বরফের টুকরো ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে। মাস্তুলগুলি ভেঙে যাবার উপক্রম হয়। জাহাজের ক্যাপ্টেন সারা রাত ধরে ওপর নিচে হেঁটে বেড়ালেন। তুষার যেন জাহাজকে যেতে দিতে চাইছে না। শক্তিশালী বরফ জাহাজের চারদিকে প্রাচীরে পরিণত হয়েছে।

ধীরে ধীরে ভোর হলো।

এ সময় একজন বরফের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে এল।

ক্যাপ্টেন তাকে ডাকলে, লোকটি জাহাজের ডেকে উঠে আসে। ক্যাপ্টেনের সামনে দাঁড়িয়ে গাম্ভীর্যের সাথে বলে, ‘আমি টোরিন, আজ এখানে মাছ বিক্রি করতে আসিনি। আমি জেনেছি এই জাহাজে এলসাকে জোর করে ধরে আনা হয়েছে। পুরোহিতকে হত্যার পর এলসা আমার বাড়িতেই ছিল।’

ক্যাপ্টেন বলেন, ‘এ যে ভয়ানক অপরাধ, তবে আমি কোনও মহিলার কণ্ঠস্বর শুনিনি। তুমি জানলে কেমন করে ?’

‘এলসার বোন বলেছে,’ টোরিন জানায়।

‘সে কী, সে তো অনেক আগে মারা গেছে!’ ক্যাপ্টেনের কণ্ঠ আতঙ্ক।

টোরিন পূর্ণ দৃষ্টিতে ক্যাপ্টেনের দিকে তাকিয়ে থাকে।  

‘পুরোহিতের খুনিরা কি আমার জাহাজে ?’ ক্যাপ্টেন ভয়ে ভীত হয়ে বলেন। ক্যাপ্টেন আরও বলেন, ‘তুমি কীভাবে জানো খুনিরা এখানে আছে ?’

টোরিন জাহাজের ওপরের বেঞ্চে রাখা একটি বড় ওক গাছের সিন্দুকের দিকে ইঙ্গিত করে বলে, ‘পুরোহিতের বাড়িতে সিন্দুকটি অনেকবার দেখেছি, এতে পুরোহিতের টাকা-পয়সা আছে, খুনিরা সিন্দুকটি পুরোহিতকে হত্যা করে নিয়ে এসেছে।’

‘ওই সিন্দুকটি স্যার আর্চি এবং তার দুই বন্ধু, রেজিনাল্ড ও ফিলিপের,’ ক্যাপ্টেন বলেন।

ক্যাপ্টেন চারদিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন পরে বলেন, ‘কেন ঈশ্বর আমার জাহাজের জন্য সমুদ্রের দরজা বন্ধ করে রেখেছেন ? যেখানে অন্য জাহাজগুলো সমুদ্রে যাতায়াত করছে! কারণ আমাদের জাহাজে খুনি এবং দুষ্কৃতকারীরা রয়েছে।’

টোরিন বলে, ‘এই উপসাগরে বরফ সাধারণত তাড়াতাড়ি ভেঙে যায়, কারণ এখানে সমুদ্রের তীব্র স্রোত আছে। খুনিদের ধরবে বলেই বরফের প্রাচীর জাহাজকে ঘিরে রেখেছে।’

ক্যাপ্টেন সমুদ্রের দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। সকালের সূর্য আকাশের উঁচুতে জ্বল জ্বল করছে, সেই আলোয় ঢেউগুলি উজ্জ্বলতায় প্রতিফলিত হচ্ছে। সামুদ্রিক পাখিরা দক্ষিণ থেকে আনন্দের সাথে চিৎকার করে উড়ে আসছে। মাছগুলি জলের ধারে দাঁড়িয়ে। শিকার করতে আসা পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে পাখা মেলে ভূমির দিকে আসছে।

ক্যাপ্টেন বলেন, ‘টোরিন, তোমার গাড়িতে যদি কোনও মাছ থাকে তবে সেগুলো বরফের ওপর ফেলে দাও, তোমাকে খুনিদের বহন করে কারাগারে নিয়ে যেতে হবে।’ 

এর মধ্যে কয়েকজন নগররক্ষী সৈন্য জাহাজে উঠে এসে খুনিদের বন্দি করে।

এলসা বন্দি অবস্থায় মারা যায়।

গ্রামের মেয়েরা শোকের পোশাক পরে সারিবদ্ধভাবে এলসার মৃতদেহ নিয়ে যায়। মেয়েরা এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে ঝড় ও ঢেউ তাদের পিছনে এসে বরফের চাঁইগুলো ভেঙে ফেলে, সমুদ্রে যাওয়ার সমস্ত পথ খুলে যায়।

(লেখাটি সুইডিশ কপিরাইট আইন দ্বারা সংরক্ষিত ও অনূদিত)

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button