সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

পঞ্চপিতা – হরিপদ দত্ত

September 20th, 2016 7:47 am
পঞ্চপিতা – হরিপদ দত্ত

উপন্যাস

পঞ্চপিতা

হরিপদ দত্ত

 

তিনিই জন্মদাতা।

তিনিই ভয়ত্রাতা।

তিনিই কন্যাদাতা।

তিনিই বিদ্যাদাতা।

তিনিই অন্নদাতা।

তাই তিনি পঞ্চপিতা, পিতৃভূমি, পরমেশ্বর। তিনি পঞ্চপুরুষের আদি অখ- রূপ। আদি পিতা, স্বয়ম্ভু তিনি। নিজেই স্রষ্টা। কোটি বৎসর পূর্বে মহাসমুদ্র থেকে তার উত্থান। মৃত্তিকা তার মেদ। বৃক্ষ, তৃণ তার কেশ, নদী তার রক্তশিরা। ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের দীর্ঘকায় যিনি, তিনি আবার দেবতা শিবের মতো অর্ধনারীশ্বর। অর্ধেক নারী। অর্ধেক পুরুষ। পুত্রগণ, প্রপুত্রগণ, প্রকন্যাগণ শ্রুতিধর কাকেশ্বরের মুখে এমনি প্রবচন শুনে বিস্মিত। বহু রাত, বহু দিন, বহু বৎসর অতীতের আকাশে লুকিয়ে থেকে তিনি আবার এসেছেন এই লোকালয়ে। শ্রোতাগণ বিশ্বাস করে কাকেশ্বর পূর্বজন্মে কাকপক্ষী ছিলেন। তাই তিনি জাতিস্মর। কাকেশ্বর দাবি করেন অন্য এক জন্মে পলাশি যুদ্ধের সময় তিনি রবার্ট ক্লাইভের গুপ্তচর ছিলেন। তার যাতায়াত ছিল যেমনি কলকাতা দুর্গে, তেমনি মুর্শিদাবাদের নবাব সিরাজের দরবারে। নদিয়ার কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজবাড়ির দুয়ারও ছিল তার জন্য উন্মুক্ত।

কৌতূহলি প্রজারা দূর-তফাতে দাঁড়িয়ে দেখত কে একজন আপাদমস্তক কালো পোশাকে ঢাকা ইরান থেকে আগত খোজাদের মতো লম্বাটে চেহারার মেয়ে মানুষ নবাববাড়ির সদর দরজা অতিক্রম করছে। এটি যে ছদ্মবেশী কাকেশ্বর তা কেউ বুঝতেই পারত না। নবাব সিরাজ জানতেন কাকেশ্বর তারই বিশ্বস্ত লোক। কিন্তু বিশ্বাসঘাতককে চেনা কি সহজ? এতটুকু বলার পর কাকেশ্বর ঠাঠা হেসে উঠেন। প্রাচীন এবং নবীনগণ পরস্পর মুখ দেখে। হাসি মাখিয়ে কাকেশ্বর বলেন, কালো পোশাকে ছদ্মবেশ ধরে নবাব মহলে প্রবেশ করতেন তিনি, এমনভাবে হাত দুটো দোলাতেন যেন মর্ত্য নয়, অমর্ত্যরে বায়স।

আর ঠিক তখনই ঘনায়মান সন্ধ্যার আবছা আঁধারে প্রাচীন বটগাছটির রহস্যময় গুচ্ছ শেকড়ের অন্ধকার ফোকর থেকে প্রেতের ঠান্ডা নিশ্বাস বের হয়। পর মুহূর্তেই বিদ্যুতের ঝলকের মতো একটি লম্বা আফগান তরবারির শরীর ঝলকে ওঠে। উপস্থিত সমবেত প্রাচীনগণের শরীরে মৃত্যুভয়ের স্রোত বয়ে যায়। কাকেশ্বর তাদের জানান এ নিশ্বাস পলাশির যুদ্ধে নিহত নবাবের রাজপুত্র সেনাপতি মোহনলালের। আবছায়া আঁধারে যে তরবারি বিদ্যুতের মতো ঝলকে ওঠে তা হচ্ছে মোহনলালের তরবারি। কাকেশ্বর এমনও দাবি করেন যে, এই বটবৃক্ষ হচ্ছে পলাশির যুদ্ধক্ষেত্র আম আর পলাশ বনের পশ্চিম সীমানার যুদ্ধ সাক্ষী সেই বটবৃক্ষটির বংশধর। গঙ্গা-ভাগীরথীর প্রবল বন্যাস্রোত বটের একটি বীজ ভাসিয়ে এনে এখানে প্রজন্ম সাধন করেছে। এখনও স্বর্গদূতের আনীত স্বর্গবৃক্ষের আদি সাক্ষী।

‘আমরা শুনেছি যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগের সময় নবাব সিরাজ একটি বটগাছের আড়াল থেকে, মিরজাফরকে অবলোকন করছিলেন, তবে কি এটি সেই বটেরই বংশধর?’ প্রাচীন ধরিত্রী দাস এর উত্তর জানতে চায়। তখন সমবেতগণ অজাগতিক সেই শীতল নিশ্বাস আর ভৌতিক তরবারির ঝলকের ভয়ার্ত শিহর থেকে মুক্তি পায়।

কাকেশ্বরের স্বর ফিসফিস করে, ‘আজও নবাবের আত্মা ছায়ামূর্তি ধরে সেই যুদ্ধের সময় ক্লাইভের কামানের গোলায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া বটগাছটির টিবির মতো চিহ্নের পাশে জোনাক রাতে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে।’

‘কেন, কেন?’ সমস্বর প্রশ্ন আসে।

‘কেন না নবাবের সোনার সুতায় নকসা করা পাদুকাজোড়ার একটি সেই বটের তলায়ই তিনি হারিয়েছিলেন, কাকেশ্বর আকাশে চোখ তুলে বিড়বিড় করেন, ‘যুদ্ধ শেষে যে রাত আসে সে রাতে আকাশে চাঁদ ছিল না, ঘোর অমাবস্যা, সাক্ষী ছিল কেবল অন্ধকার রাত।’

তারপর নীরবতা নেমে আসে। অনতিদূর থেকে বাতাস বয়ে আনে ফসলের গন্ধ। কাকেশ্বর ভয়ে ফিসফিস স্বরে বলে, ‘আমি এক নারীর কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছি, তোমরা কি পাচ্ছ?’

‘কই, না তো?’ নীচু গলায় উত্তর দেয় ধরিত্রী দাস।

‘ওই দেখ মাঠের শেষ প্রান্তে ইরানি পোশাক পরা কে একজন দাঁড়িয়ে আছেন। চেন ওকে? কোন সে রমণী?’

‘সত্যি তো? কে তিনি সোনার পোশাকে দাঁড়িয়ে আছেন? ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছেন কেন? কেউ কি তাকে হারিয়ে ফেলেছে?’

‘ইনি নবাব সিরাজের বেগম লুৎফা, আজও তিনি স্বামীকে খুঁজে বেড়ান। তার হাতে রয়েছে নবাবের হারিয়ে যাওয়া একপাটি জুতো। গলায় পান্নার তজবি?, কথাটুকু শেষ করে কাকেশ্বর ওঠে দাঁড়ান। কাকের ডানা ঝাপটানোর মতো শব্দ হয়। কাকেশ্বরের দেহ অদৃশ্য অজাগতিক হয়ে যায়। অনতিদূরের মাঠ প্রান্তের নারী মূর্তিটিও আর নেই। গভীর স্তব্ধতা নেমে আসে চারদিকে।

রাত আরও গভীর হয়। চাঁদ ডুবে গেলে আকাশের রাত জমাট বেঁধে তলদেশে মাটির সঙ্গে নিবিড় হয়ে দুর্বোধ্য হয়ে যায়। নিশিপতঙ্গেরা মাটির ছিদ্রপথে বেরিয়ে এসে ডাকতে থাকে। কালো বাতাসে প্রেতাত্মার নিঃশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। তখনি ধরিত্রী দাস দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে ফিসফিস কথা কয়, ‘তোরা সবাই জানিস আমাদের আদিপিতাগণ মাতা এবং পুত্র-কন্যাদের সঙ্গে নিয়ে নবাব সিরাজের হত্যার পর ভয় পেয়ে গভীর রাতে পলাশি ছেড়ে গঙ্গা-ভাগীরথী পেরিয়ে পদ্মা-মেঘনার দেশে চলে আসে।’

‘এর সাক্ষী কে?’ সমস্বরে দাবি ওঠে।

এক চোখ অন্ধ দমনকে বলে, কেন, আমি কি নই?’

তখন দমনক ধরিত্রী দাসের দিকে একচোখে তাকিয়ে তার কথামালা বর্ণনা করতে থাকে, ‘আমার পিতামহ যে কাপালিকের চেলা ছিল তার মাতা ছিল নগরবেশ্যা। সেই বেশ্যার পুত্রটি ছিল এক ইরানি বণিকের অবৈধ সন্তান। সে কিনা আবার নগর আলিওয়ার্দীর বেগম মহলের খোজা প্রহরী। যুদ্ধের ভিতর বেগম মহল থেকে সে হারিয়ে যায়। সে-ই দেখেছিল ভয়ার্ত প্রজাগণ ভাগরথী নদী পার হতে গিয়ে নৌকাডুবিতে অনেকে মরেছে। যারা ছিল জীবিত তারাই নদী পার হয়ে ক্লাইভের সৈন্যদের ভয়ে নদী তীরের গভীর জঙ্গলে হারিয়ে যায়। তারাই পদ্মা-মেঘনার তীরে বসত গড়ে।’

সমবেতগণ তখন শিউরে ওঠে। যুদ্ধ পলাতকেরাই যে তাদের পূর্বপুরুষ এমন বিশ্বাসে স্থিত হয় তারা। দমনক সেই পুরানকথা বলে চলে। সেই খোজা প্রহরী নবাবের পরাজিত বন্দি সেপাইদের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত সেপাইদের লাশ ভাগীরথীর স্রোতে নিক্ষেপের কাজ করে তিন দিবস। সেই খোজা, মৃতদেহ নিক্ষেপের শেষ দিন সন্ধ্যাকালে দেখেছিল যে ইরানি দরবেশের লাশ নদীতে নিক্ষেপ করা হয়, সেই লাশ জিন্দা হয়ে তজবিহ হাতে জলের ঢেউয়ের উপর পা ফেলে নদী অতিক্রম করছে। তার কালো পাগরি থেকে রক্ত ঝরছে। আলখাল্লার রং রক্তবর্ণ।

সেই অলৌকিক পুরুষ নদীর পূর্বতীরে নামাজের ভঙ্গিতে দু’হাত প্রসারিত করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। কতক্ষণ? কেউ জানে না, কেননা তখন রাতের অন্ধকার নামে। দমনক এমন দাবিও করে যে, সেই অলৌকিক শক্তির অধিকারী দরবেশের পিছু নিয়েছিল যে দলটি তারা দমনক বা ধরিত্রী দাসদেরই হারিয়ে যাওয়া বংশধর। তারা এমনও শুনেছে সেই হারিয়ে যাওয়া দলটি আপন ধর্ম এবং মূর্তি পূজা পরিত্যাগ করে দরবেশের কাছে ইসলাম ধর্ম কবুল করেছে।Print

তবে তারা এখন কোথায়? এমন কলরবের ভেতর হাহাকার ওঠে। যেন মহাসময়ের বহু যোজনপথের ধূসর একজগৎ। শরীরের কোন রক্তধারা কোথায় কোন নতুন রক্তধারার সঙ্গে মিশে গেছে খুঁজে পাওয়া কারও সাধ্য নয়। দূর আসমানে তখন তারা জ্বলে। তারারা পৃথিবীর সাক্ষী থাকে। শস্যভূমি, বীজের অংকুরোদ্গম, প্রাচীন বৃক্ষের ক্ষয়, পাখির বিষ্ঠা থেকে পরিযায়ী বীজের পরিভ্রমণ এবং নতুন অরণ্য-উপনিবেশ গড়া, সবই মনুষ্যগুলোর চোখে অবোধ্য-রহস্য। তাই এই গ্রামে স্মৃতি হারায় না। পূর্বপুরুষের স্মৃতি ধারণ করে তারা নবান্নে, নববর্ষে। তাদের তারা স্মরণ করে। নবান্ন নিবেদন করে, বসন্তের নবপুষ্প পল্লবে অর্ঘ্য সাজিয়ে মৃত পূর্বপুরুষের আবাহন করে। ওরা বিশ্বাস করে আদি-পিতা-মাতাগণ পাখি-পঙ্গ-চাঁদ-সূর্যের আলোর রূপ ধরে এসে উত্তরপুরুষের নৈবেদ্য গ্রহণ করে আশীর্বাদ করে যায়।

তাই রাত আরও গভীর হলে সমবেতগণ অন্ধকারের ভেতরই বর্ষার জল ভেঙে হাঁটার মতো যে-যার বাড়ি ফিরে যায়। ধরিত্রী দাস তখন একাকী। বাড়ির মানুষগুলো ঘুমিয়ে পড়েছে। কালো আলখাল্লা পরা প্রাচীন দরবেশের মতো অন্ধকার রাত নিস্তব্ধ। কিন্তু বাতাস ছিল বলে তেপান্তরের দীঘল শস্য ভূমি থেকে বিন্নিধানের রেণুর ঘ্রাণ বাবুই পাখির ঝাঁকের মতো উড়ছিল। ধরিত্রী দাসের মনে হয় মিথ্যে বলেনি কাকেশ্বর। এই পবিত্র শস্য ভূমির মাটিই তাদের পঞ্চপিতা, পিতৃভূমি, পরমেশ্বর। এই পঞ্চপিতার দেশই উর্বর করেছে মৃত আদি পিতা-মাতার অস্থি, কংকাল, দেহাবশেষ। তাদের পুনর্জাগরণ ঘটে শস্য-দানার অংকুরোদ্গমের ভেতর। তাই বুঝি ধরিত্রী দাসের চোখে জল নামে। পলাশির যুদ্ধ পলাতক নতুন আশ্রয় সন্ধানী আদি পুরুষ আর রমণীদের মুখ স্মরণ করতে চায় সে। মেলাতে পারে না। তারপরও মনে হয় তার হৃৎপিণ্ডে, ধমনিতে ওরা মিশে আছে ঈশ্বরের মতো।

 

॥ দুই ॥

ধরিত্রী দাস বিশ্বাস করে পৃথিবী-মাতার সে দাস। সেবক। শস্য ফলানো আর মাতা-বসুমতীর সেবা করা। একই কাজ। এই বিশ্বাস যে তার অন্তরে স্থাপন করেছে সে হচ্ছে জাতিস্মর কাকেশ্বর। নবাব সিরাজের বিরুদ্ধে ক্লাইভের হয়ে সে যে ছদ্মবেশে গুপ্তচরের কাজ করেছে পূর্বজন্মে, তার সেই দাবি মেনেও এই অলৌকিক কথক মানুষটিকে ঘৃণা করতে পারে না। ধরিত্রী দাসের বিশ্বাস, কোনো না কোনো জন্মে পলাশি যুদ্ধের পাপের ফল কাকরূপ নিয়ে সে নিশ্চয়ই ভোগ করেছে। আজ তেপান্তরের মাঠে গ্রামবাসীর সঙ্গে কাজ করতে এসে সে মধ্যমাঠে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন বট গাছটির দিকে তাকায়। ওই গাছে আত্মঘাতী কিংবা দুর্ঘটনায়-অপঘাতে মৃত মানুষের প্রেতাত্মা বসবাস করে। কংকালের হেঁটে বেড়ানোর কথাও শুনেছে সে। কাকেশ্বরের মুখের বয়ানই সে গ্রামবাসীকে শোনায়। এ যেন বাল্মীকির রসায়ন পাঠ।

পলাশির পরাজয় এবং নবাবের হত্যাকাণ্ডের পর যে সব সেপাই ভাগীরথী পেরিয়ে পুতুল নবাব মিরজাফরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এই অঞ্চলে সমবেত হয়েছিল, ক্লাইভের বাহিনী আর মির জাফরের বাহিনী তাদের তাড়া করে ধরে এনে এই বটগাছের তলায় সারবদ্ধ দাঁড় করিয়ে অগ্নিকামানের গোলায় জ্বালিয়ে দিয়েছিল। অর্ধ দগ্ধ লাশগুলো স্তূপীকৃত পড়েছিল বটের তলায়। সে এক বিশাল কংকালের পাহাড়। গভীর রাতে সেই কংকালগুলো জেগে উঠতো। ওরা যুদ্ধপ্রশিক্ষণের ভঙ্গিতে এই তেপান্তরের মাঠে ছুটে বেড়াতে গেলে গ্রামের অনেকেই সেসব কংকাল-সেপাইদের দেখতে পায়।

এবার কথক দমনক ধরিত্রী দাসকে হারিয়ে দিয়ে নিজের বয়ান খুলে ধরে। আমি শুনেছি কোনো কোনো শুক্লপক্ষের পূর্ণিমা তিথির জোছনাকালের গভীর রাতে মির কাশিমের ঘোড়ার পায়ের শব্দ আজও শোনা যায় মুর্শিদাবাদের পথে-প্রান্তরে। শুধু শোনা কেন, নগরবাসীরা নাকি স্পষ্ট দেখেছ উন্মুক্ত তরবারি হাতে নবাবের হত্যাকাণ্ডের সাক্ষীকে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করতে।

একথা শোনামাত্র ধমকে ওঠে ধরিত্রী দাস। সে বলে, পলাশি যুদ্ধের পর ফরাসি সম্রাটের প্রতিনিধি হয়ে বণিকের ছদ্মবেশে যে রাজপুরুষ মুর্শিদাবাদে এসেছিলেন, আমি তার বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে পারি। তিনি এসেছিলেন যে ফরাসি গোলান্দাজ বাহিনী নগরের পক্ষ নিয়ে ক্লাইভের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় তাদের সম্পর্কে খোঁজ নিতে। তিনিই দেখেছিলেন নবাব সিরাজ আর মিরকাশিমের অশ্বারোহী ছায়া মূর্তিকে ধুলো উড়িয়ে ভাগীরথী নদীর দিকে ছুটে যেতে। ভগবানগোলার যে ঘাটে পলাতক নবাব ইংরেজ সৈন্যদর দ্বারা ধৃত হয়েছিলেন, ক্ষণকাল সেখানে ছায়া মূর্তিদ্বয় নিশ্চুপ দাঁড়িয়েছিল। পূর্ণিমার চাঁদ ডুবে গেলে সেই ছায়ামূর্তিও অদৃশ্য হয়ে যায়।

এক ত্রিসন্ধ্যার আবছায়ায় গুপ্তচর কাকেশ্বরের প্রেত শরীরের মুখোমুখি হয়েছিলেন নবাব বেগম লুৎফুন্নেছা। যুবতী বেগমের কোলে তার শিশু সন্তান। বেগমকে চিনতে পারে কাকেশ্বর। তিনি জানতে চান, ‘বেগম সাহেবা, আপনি এখানে? আমরা জানতাম ক্লাইভের আদেশে নির্বাসন যাত্রাপথে ধলেশ্বরী নদীতে নৌ দুর্ঘটনায় আপনার সলিলসমাধি হয়েছে, তবে কেন ফিরলেন মুর্শিদাবাদে?

‘নবাবের শিশু সন্তানকে তার কাছে ফিরিয়ে দিতে’, অজাগতিক স্বরে উত্তর দেন বেগম।

‘আপনি অদৃশ্য হয়ে যান বেগম সাহেবা, মুহম্মদি বেগ আপনাকে উন্মাদ হয়ে খুঁজছে। আপনাকে পাবার আশাই বন্দি নবাবকে বিষাক্ত ছোরার আঘাতে সে হত্যা করেছে। বড় নিষ্ঠুর সে, বড় নির্দয়।’

‘কাকেশ্বর, আমি তোমাকে যেমনি জানি গুপ্তচর হিসাবে, তেমনি জানি নারীলোভী মুহম্মদি বেগকে। আমার শরীর এখন অজাগতিক, তাই বিশ্বাসঘাতক আমাকে স্পর্শও করতে পারবে না।’

‘বেগম সাহেবা আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি ক্ষমাপ্রার্থী।’

‘তোমার পাপের ক্ষমা নেই কাকেশ্বর। এই বাংলার মাটিতে তোমার, মিরজাফরের, মুহম্মদি বেগের যুগ যুগ ধরে জন্ম হবে। কেননা নিহত নবাবের লাশ হাতির পিঠে চাপিয়ে প্রজাদের মনে ভীতি সঞ্চারের জন্য যেদিন নগরী প্রদক্ষিণ করানো হচ্ছিল, সেদিন লাশবাহী হাতির পেছনে মিরজাফর, মুহম্মদি বেগ এবং তুমিও ক্লাইভের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে নগর প্রদক্ষিণ করেছিলে। কি উচ্চ ছিল তোমার কণ্ঠ! কি কর্কশ!’

এবার ধরিত্রী দাসের গলা বুঁজে আসে। সে উচ্চস্বরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। ধরিত্রী দাস একথা বলে বিলাপ করতে থাকে যে, যেদিন কাকেশ্বরের মুখে সে এই কাহিনি শুনছিল, সে দিন ছিল সূর্যগ্রহণের কাল। রাক্ষস রাহু সূর্যকে গ্রাস করলে সারা দুনিয়া রাতের মতো কালো ছায়ায় ডুবে যায়। আসমান থেকে মৃত আর অর্ধমৃত পাখির ঝাঁক উল্কার মতো লুটিয়ে পড়ছিল মাটিতে। ছিন্ন পালকে ঢাকা পড়েছিল শস্যভূমি। পালকে পালকে রক্তের ফোঁটা।

মানুষ ভয়ার্ত হয়ে পড়েছিল এ কারণে যে, আগুনের ডানা মেলে ফেরেশতাদের মতো অলীক এক পুরুষ আকাশ থেকে মাটিতে নেমে এসে নবাবের শিশু সন্তানকে বেগমের কোল থেকে তুলে নিয়ে পুনরায় আকাশেই অদৃশ্য হয়ে যায়। ভয়ার্ত প্রজাগণ মিরজাফরের আদেশে ছুটে যায় সিরাজের হত্যাকাণ্ডের প্রকোষ্ঠের দিকে। ওরা দেখতে পায় জমাট রক্তে পতঙ্গরা উড়াউড়ি করছে। নিহত নবাবের লাশটি যে টেনে হিঁচড়ে বারান্দা পর্যন্ত আনা হয়েছিল, তার আলামত স্পষ্ট। সিঁড়িতে রক্তের চিহ্ন। মিরজাফর তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘যা ঘটেছে সে মহান আল্লাহর ইচ্ছাতেই ঘটেছে, তোমরা দুঃখ করো না, বরং আল্লাহর গুণকীর্তন করো এই কারণে যে, তিনি তোমাদের অত্যাচারী নবাবের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছেন।’

প্রজাগণ নির্বাক। কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তারা শূন্য নবাব মহলের দিকে বারকতক দৃষ্টি ফেলে ভাগীরথী নদীর পথে হাঁটতে থাকে। সবাই নদীতে নেমে স্নান করে ভেজা কাপড়ে বিলাপ করতে করতে গ্রামে ফিরে যায়। সাতদিন পর হঠাৎ এক সকালে তারা ভাগীরথীর তীরে নৌকা থেকে নামতে সাধক রাম প্রসাদকে দেখতে পায়। ওরা বিস্মিত! ওরা ভীত!

রক্তবর্ণ পোশাক পরিহিত শ্মশ্রুমণ্ডিত সাধক রামপ্রসাদ শ্যামা সংগীত গাইতে গাইতে শোকাহত স্তব্ধ নগরীতে প্রবেশ করেন। এ গান তার নিহত হতভাগ্য নবাবের উদ্দেশ্যে। মিরজাফর আর ক্লাইভের সৈন্যরা নগর থেকে তাকে তাড়িয়ে দেওয়ার আগে পর্যন্ত নগরীর প্রজাদের কাছে সাক্ষ্য দিয়ে জানান, কেন তিনি আজ নগরে এসেছেন।

নৌপথে নবাব সিরাজ কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদ ফিরেছিলেন। গঙ্গার ঘাটে নাইতে নেমে রামপ্রসাদ গাইছেন শ্যামা সংগীত। মুগ্ধ নবাবের নৌকা তীরে ভেড়ে। মাঝি-মাল্লারা জানায় ইনিই হচ্ছেন রাম প্রসাদ। নবাব তার সাধক-গায়ক প্রজার নাম জানতেন।

‘সাধক, তুমি যাবে আমার দরবারে? মন্দির গড়ে দেব। দরবারে তুমি গান শোনাবে। লখনৌর গায়ক আছে আমার দরবারে। যাবে তুমি আমার সঙ্গে? নবাব সিরাজ জানতে চান।

রামপ্রসাদ অবাক হয়ে নবাবকে দেখেন। চিনতে পারেন।

কিছুটা ভড়কে গেলেও সামলে নিয়ে রামপ্রসাদ নবাবকে সেলাম ঠুকে বিনীতস্বরে বলেন, আমাকে ক্ষমা করবেন বাংলার নবাব, আমার মা কালী কি মুসলমান রাজাদের দরবারে যেতে রাজি হবেন?’

‘কি বলছ সাধক, আমার দরবারে হিন্দু মন্ত্রী আছে, সেনাপতি আছে, তাদের জন্য আছে মন্দির, তাছাড়া আমি যে বাংলার হিন্দু-মুসলমান সব প্রজারই নবাব, আমার আবার জাত-ধর্ম কি?’

‘আমায় ক্ষমা করুন নবাব বাহাদুর, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রও আমাকে ডেকেছেন, যাইনি, সংসার ছাড়া পাগল মানুষ আমি, মায়ের মন্দির ছেড়ে কোথাও আমি যাব না। এযে আমার দুর্মতি। অধর্ম।’

‘কোনোদিন যদি মন পাল্টায় তবে যেও সাধক,’ এমন বাক্য শুনে রামপ্রসাদ যখন গঙ্গার জল থেকে দৃষ্টি তোলেন, তখন দেখতে পান নবাবের ময়ূরপংখী নৌকা মধ্যনদীতে। নবাব দাঁড়িয়ে আছেন। দৃষ্টি চন্দননগরের ফরাসি কুটিরের সুউচ্চ মিনারে।

আজ নবাব সিরাজের রক্তে রঞ্জিত মুর্শিদবাদের রাজপথে উদভ্রান্তের মতো ঘুরছেন রামপ্রসাদ। আক্ষেপ হচ্ছে নবাবের জন্য। মনে পড়ে নবাবের শেষ কথাটি। তাই বিড়বিড় করে বলেন, ‘হতভাগ্য নবাব, আমি তো আজ মন পাল্টেই আপনার কাছে এসেছি নবাব, আপনি নাই, কে শুনবে আমার গান? আমি যে অনুশোচনার আগুনে পুড়ছি।’

‘আমি কি দুখেরে ডরাই?

দুখে দুখে জনম গেল, আর কত দুখ দেও, দেখি তাই॥

আগে পাছে দুখ চলে মা, যদি কোনখানেতে যাই।

তখন দুখের বোঝা মাথায় নিয়ে, দুখ দিয়ে বাজার মিলাই॥’

ধরিত্রী দাসের চোখ থেকে এখন সাধক রামপ্রসাদ এবং দেবীকালী হারিয়ে যায়। কেননা সংসার নিরাসক্ত, জীবন নিরাসক্ত, যুদ্ধ নিরাসক্ত, রাজা-প্রজা নিরাসক্ত রামপ্রসাদের কাছে মা কালীর মতোই পলাশি ঘোর কালো অন্ধকারে ডুবে যায়। পলাশির আম্র আর পলাশ গাছের পত্র-পল্লব ক্লাইভের কামানের গোলায় ছিন্ন-ভিন্ন, আগুনে পোড়া। এসবই কালী সাধকের কাছে দুঃখ। সিরাজের রক্ত ছিটানো রাজপথে দুঃখের বোঝা মাথায় নিয়ে দুঃখ বিলাসী সাধক সংসারনিরাসক্ত রামপ্রসাদ অনন্তকাল ঘুরে বেড়াবেন স্বপ্ন-কুহকের ভিতর। কেননা দুঃখ বিজয় তো পলাশির পরাজয়ের মতই আদিগন্ত মহাকাল রামপ্রসাদের কাছে।

ক্লাইভের গুপ্তচর কাকেশ্বরের পাপ ধরিত্রী দাসের চোখে যে গোলকধাঁধার জটিল মেঘ তৈরি করে, সেই মেঘের আড়ালে বসেই বুঝি মানুষটিও শুনতে পায় সিরাজ-শূন্য মুর্শিদাবাদের খাস মহল, বেগম মহল আর শূন্য অস্ত্রভাণ্ডরের ভাঙা দুয়ারে ভাগীরথীর দমকা বাতাস কান্নার মতো শীতল দীর্ঘশ্বাস ফেলছে কেমন করে। তাই তার মনে হয় মহাকালের সাক্ষী এই ভাগীরথীর বুকে যে স্রোতে বইছে তা জলধারা নয়, সিরাজের বুকের রক্তধারা।

 

॥ তিন ॥

পতঙ্গ-মানবদের বংশবৃদ্ধি ঘটছে ফড়ফড়িয়ে। চাই শস্যভূমি। নতুন ভূমি। যেখানে শস্যভূমি নেই অথচ খাদ্যের স্তূপ পাহাড় তৈরি করে আছে সেই নগরে ওরা যেতে চায় না। নগর ভীতি ওদের রক্তে মিশে আছে। সেই যে অনাগত কালে ওরা গ্রাম ছেড়ে শহরে যাবে, আর ফিরবে না শস্য ভূমিতে, সেই কালের হিসেব ওরা জানে না। রেলগাড়ি আর স্টিমারের গল্প ওরা শুনেছে, রূপকথারই মতো। তাই নগর এখন তাদের রূপনগর। এখনও শুনেছে সেই নগর আসলে দৈত্য-দানবের দেশ।

নতুন শস্যভূমির উদ্ধারপর্ব স্বপ্নে ভাসে। তাই তারা সমবেত হয় তেপান্তরের মাঠের শেষে মজে যাওয়া জলা-জঙ্গল, সাপ-খোপের জায়গাটায়। ওরা শুনে আসছে বংশ-পরম্পরায়, এই জলা-জঙ্গল আসলে একটি সরা নদী। কেমন করে মরল নদী? ধরিত্রী দাসের জ্ঞাতি ভাই চণ্ডরব সেই কাহিনিই শোনায় ভূমি উদ্ধারকারীদের। কেননা সে প্রচণ্ড উচ্চস্বরে কথা বলে তাই তার নাম চণ্ডরব। সিপাহি বিদ্রোহের সময় দিল্লির সম্রারাটের একদল অনুগত সৈন্য যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বঙ্গে পলায়ন করে। নতুন সৈন্য সংগ্রহ করে নতুন করে প্রতিরোধ যুদ্ধের জন্য। নৌপথে সৈন্য সংগ্রহ করতে করতে উত্তরের পাহাড়ের উদ্দেশ্যে নতুন যুদ্ধ ঘাঁটিতে ফিরছিল তারা। সম্রাট বন্দি ইংরেজের হাতে। তার বীর যোদ্ধা দুই পুত্রের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয় দিল্লিনগর ফটকের লৌহদণ্ডে ফাঁসি দিয়ে।

তাই উত্তর-পূর্ব পার্বত্য সীমান্তে চলছে প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি।

কিন্তু হায় দুর্ভাগ্য, হায় নিয়তি! ইংরেজ সৈন্যরা তাদের অবরুদ্ধ করে ফেলে। যুদ্ধে পরাজিত হয় বিদ্রোহী সিপাহিগণ। শত শত, হাজার হাজার সিপাহিকে হত্যা করে এই নদীতে ফেলে দেয়া হয় লাশের স্তূপ, লাশের পাহাড়। নদীর স্রোতে যায় বন্ধ হয়ে। কংকালের স্তূপে বালি ঢাকা পড়ে নদী যায় ভরাট হয়ে। এই সেই স্থান। সিপাহিদহ।

চণ্ডরব উচ্চস্বরে গ্রামবাসীদের জানায়, এই জলা-জঙ্গলের তলায় চাপা পড়ে আছে সিপাইদের কংকাল। কোন কোন গভীর অন্ধকার রাতে নির্বাসনে মৃত সম্রাট বাহাদুর শাহের নামে কংকালেরা জয়ধ্বনি দেয়। তারা ইংরেজ সৈন্যদের মাথার খুলি দিয়ে গেন্ডুয়া খেলে। সারারাত এ খেলা চলে। ভোর হবার পূর্বে তারা বাতাসে মিলিয়ে যায়।

তবে কি এমন মৃত্যুপুরীতে কেউ শস্যভূমি উদ্ধারের প্রত্যাশা রাখে। কৌতূহলী আর ভয়ার্তগণ দ্রুত গ্রামে ফিরে আসে। অন্ধকার রাতের কাল কৃষ্ণপত্র এলেই রাত জেগে ওরা সেই সিপাইদহের দিকে কান পেতে থাকে। কেউ কেউ সিপাইদহ থেকে ভেসে আসা ফিসফিস কথাও শুনতে পায়। কি কথা হয় বিদ্রোহী প্রেত সিপাইদের মধ্যে? নিশ্চয়ই বর্তমান নিয়ে নয়। কেননা প্রেতের দুনিয়ায় তো মাত্র একটি কাল আছে। অতীত। অতীতকাল। সিপাইদহের প্রাচীন অন্ধকারের দুনিয়া থেকে জেগে উঠে তারা তো প্রাচীন পৃথিবীর রূপকথাই বলে। তাদের মধ্যে মাত্র একজনই আছে যে ঢাকা শহরের বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে মাঝে মধ্যে ব্রহ্মপুত্র নদতীরবর্তী গ্রামের সিপাইদহে আনোগোনা করে।

এবার চণ্ডরব থামে। সিপাইদহের জলা-জঙ্গলের দিকে চোখ ফেলে খানিক নীরবতা পালন করে। দমনকের দিকে তাকিয়ে পুনরায় তার বয়ান করে। সে শস্যদেবতার নামে সাক্ষ্য দিয়ে জানায়, পদ্মা-নদীর নৌযুদ্ধে আহত হয়ে বিদ্রোহী যেসব সেপাই বুড়িগঙ্গা বেরিয়ে নবাব খাজাদের ঢাকা শহরে অন্য অনেকের মতো আত্মগোপন করেছিল, তাদের শেষরক্ষা হয়নি। ইংরেজের পোষা ঢাকার নবাবের পাইক-বরকদন্দাজেরা তাদের ধরে ফেলে। ঢাকার নবাব ধৃত বিদ্রোহীদের ইংরেজের হাতে তুলে দেন। ইংরেজ সৈন্যরা তাদের বাহাদুর শাহ পার্কের পামগাছে বেঁধে গুলি করে হত্যা করে এবার চণ্ডরব ফিসফিসিয়ে বলে, ‘যে সব পথশিশুরা গভীর রাতে পার্কে ঘুমোতে যায় তাদের সেই সব প্রেত সেপাই মশারি খাটিয়ে দেয়। ভোরে ঘুম ভাঙার পূর্বেই সেই মশারি অদৃশ্য হয়ে যায়। সে এক যাদুর খেলা।’

‘তাই নাকি, এ তো ভূতের গপ্পো?’ দমনকের স্বরে উত্তেজনা।

চণ্ডরব হেসে ওঠে, ‘জান কি, এক প্রেত সেপাইতো একদিন ইঁচড় পাকা গাঁজাখোর এক ছোকড়ার হাতে ধরা পড়ে যায়, মশারি খাটানোর সময়। কিন্তু বুঝতে দেয়নি সে যে প্রেত।’

‘তারপর? তারপর কি হলো? জলদি বল।’

তারপর প্রেত সেপাই সারারাত সিপাহী বিদ্রোহের কথা, তার নিজের কথা বলে আর অনতিদূরের প্রাচীন পাম গাছটি দেখিয়ে বলে, এ-গাছেই বেঁধে ইংরেজ সৈন্যরা তাকে গুলি করে হত্যা করে। আর ছেলেটি তখন বুঝতে পারে তার পাশের মানুষটি ভূত, তাই সে চিৎকার করে ওঠে এবং চোখের পলকে প্রেত সেপাইয়ের শরীর বাতাসে মিশে যায়। ভয়ার্ত ছেলেটি ছুটতে থাকে পার্ক পেরিয়ে সদরঘাটের দিকে।

চণ্ডরব জোনাক রাতের অপেক্ষায় থাকে। তিন দিন তিন রাত পেরিয়ে তবেই জোনাক নামে। বাড়ি থেকে বের হয়ে চণ্ডরব তেপান্তরের মাঠের দিকে হাঁটতে থাকে একাকী। ভয় ভয় করলেও ফকফকা জোনাক তার সাহস যোগায়। তেপান্তরের মাঠের বাঁকা তালগাছের পাশে এলেই তার পা থেমে যায়। পেছনে সে কি কারও পায়ের শব্দ শুনলো? ঘাড় ফিরিয়ে সে দেখতে পায় সাদা কাপড়পরা এক যুবতী বৌ তাকে পাশ কেটে সিপাইদহের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই গভীর রাতে এ কোন নারী বিধবার পেশাকে জলা-জঙ্গলের ভয়ংকর সিপাইদহের দিকে যাচ্ছে? এই অবস্থায় সে যেন ঘোরে পতিত হয়।

‘কে তুমি? কোন গাঁয়ের কি? যাচ্ছ কোথায়?’ বলতে বলতে লম্বা পা ফেলে চণ্ডরব। সে তার স্বভাবসিদ্ধ উচ্চস্বরে জানতে চায়, ‘ওই প্রেতের দহে কেন যাচ্ছ? বড় ভয়ংকর স্থান।’

কিন্তু নিরুত্তর বৌটির পাশে পৌঁছাতে পারে না চণ্ডরব দ্রুত হেঁটেও। তার ইচ্ছে হয় জোর করে ঘোমটা টেনে বৌটির মুখ দেখে। হঠাৎ সিপাইদহ থেকে গুলির শব্দ হয়। বাতাসের শো শো শব্দ হয় ক্ষণমুহূর্ত। মেয়েটির পাশে এসে দাঁড়ায় চণ্ডরব। চণ্ডরব বুঝতে পারে মেয়েটি গর্ভবতী, উঁচু উদর। ঘোমটার আড়াল থেকে ফিসফিস্ শব্দে কথা কয় মেয়েটি, ‘ফিরিঙ্গি সেপাইদের ব্যারাক থেকে আমার সেপাই স্বামী ছুটিতে বাড়ি এলে আমি গর্ভবতী হই। ব্যারাকে ফিরে যাবার পূর্বে আমার স্বামী দিল্লির সম্রাটের নামে প্রতিজ্ঞা করে বলে যায় ফিরে গিয়ে বিদ্রোহ করবে। সম্রাটের বিজয় শেষেই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বাড়ি ফিরলেই যেন আমি সন্তান প্রসব করি। একজন পিতার এই প্রতীক্ষা বড় দীর্ঘ।’

‘তোমার স্বামী কি বাড়ি ফিরেছিল’?

‘না, ফেরেনি। বিদ্রোহ আর যুদ্ধের ভেতর তাকে ফিরিঙ্গি সৈন্যরা এখানে হত্যা করে ওই সিপাইদহে লাশ ফেলে দেয়। জোনাক রাতে আমি আমার স্বামীর সাক্ষাতে এই মৃত্যুপুরীতে বারবার আসি।’

‘মৃত স্বামীর সঙ্গে কি তোমার সাক্ষাৎ হয়?’

‘নিশ্চয়ই, আমার কথা ভোলেনি সে। আমরা পুরাতন দুনিয়ার গল্প করি। যেহেতু আমার স্বামী যুদ্ধ জয়ের শেষে ঘরে ফিরে আসতে পারেনি, তাই আমার গর্ভের সন্তানও ভূমিষ্ঠ হতে পারেনি। এ যেন এক অভিশাপ।’

‘শত বৎসর পেরিয়ে গেছে, আজও কি তোমার সন্তান প্রসবের প্রহর আসেনি? আর কতকাল ওকে গর্ভে বয়ে বেড়াবে? আর কত প্রতীক্ষা?’

‘আমার স্বামী বলেছে এমন দিন আসছে যেদিন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ধলেশ্বরী আর শীতলক্ষ্যা তীরের মানুষ অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে, সেদিনই আমার সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে। কেননা অনাগত সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য আমার মৃত স্বামীও ছায়ামূর্তি ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মিশে যাবে, কিন্তু কেউ তাকে চিনবে না।’

‘কোন যুদ্ধের কথা বলছ তুমি?’ চণ্ডরবের এমন প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে আকাশে একখ- মেঘ চাঁদকে ঢেকে ফেলে। চরাচরে নেমে আসে অন্ধকার। সেই অন্ধকারে একাকার হয়ে যায় অজাগতিক নারী।

চণ্ডরব এবার উচ্চস্বরে কাকেশ্বরের নাম করে গ্রামের দিকে ছুটতে থাকে। গ্রামটা তখন ঘুমকাতরতা ভেঙে জেগে ওঠে। যে নারী রাতের তৃতীয় প্রহরে সন্তান প্রসব করেছিল, রক্তভেজা বিছানায়, সে-ই কেবল অচেতন হয়ে থাকে। ঘুম তাড়–য়ারা বুঝতে পারে চণ্ডরব জাতিস্মর হয়ে গেছে। অবশিষ্ট রাত তারা তাকে ঘিরে থাকে।

চণ্ডরব তার গল্প বলতে থাকে। আমি পলাশির যুদ্ধের শেষাবধি মিরজাফরের ঘোড়ার সেবক ছিলাম। সেই ঘোড়া সঙ্গে করে নবাব সিরাজের হারানো ঘোড়ার সন্ধান করতে থাকি। কেননা নতুন নবাব মিরজাফরের এই ছিল নির্দেশ। কিন্তু পাইনি। ভাগীরথী নদীর জেলেরা বলেছে নবাবের ঘোড়া নাকি ভাগীরথীর তীরে এসে পঙ্খিরাজ ঘোড়া হয়ে যায়। সেই ঘোড়া ভাগীরথীর স্রোতের চিহ্ন ধরে বেগম মহলের নারীদের সন্ধানে আকাশে অদৃশ্য হয়ে গেছে। কেননা কেউ জানে না ভাগ্যহতাবন্দি নারীদের কোথায় নৌপথে নির্বাসন দেয়া হয়েছে। এই, নদী-খালের দেশ ওটা। দিগন্তবিস্তৃত শস্যভূমির দেশ।

এবার থামে চণ্ডরব। তার দুচোখে ঘুমকাতরতা নেমে আসছিল। বিড়বিড় করে কথা বলছিল সে। গ্রামবাসীর বিশ্বাস নিশিরাতের প্রেতাত্মা চণ্ডরবের ঘাড়ে সওয়ার হয়েছে। প্রেতাত্মাই তাকে কথা বলাচ্ছে। মাত্র একবারই চোখ খোলে চণ্ডরব। চোখ বিস্ফারিত। তারপর আবার বুঁজে আসে। এবার কান্নার মতো ইনিয়েবিনিয়ে চণ্ডরব তার কথা বলে। ‘সিপাইদহের প্রেতাত্মারা আমাকে ডেকেছিল। বিদ্রোহী নিহত সেপাইর বিধবা গর্ভবতী স্ত্রীর পেছনে হেঁটেছি আমি। সেও অদৃশ্য হয়ে যায়। আমি যুদ্ধের বাজনা শুনেছি। ইংরেজ সৈন্যদের নরমু- ছেদন দৃশ্য দেখেছি। স্তূপ জমে ওঠে সিপাইদহে বিদ্রোহীদের কাটা মুণ্ডে। তখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে। মেঘের গর্জন। আমি রক্তের স্রোতে সাঁতার কাটছি। কূল নেই। কিনারাও অদৃশ্য। আমি ডুবতে থাকি। ডুবছি…ডুবছি…ডুবছি।’ চ-রবের শরীর ভেঙে পড়ে ঘুম কাতরতায়। হয়ত প্রেতাত্মা তাকে মুক্তি দিচ্ছে।

 

॥ চার ॥

পরদিন ধরিত্রী দাস রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কামানের কথা বলে। কাকেশ্বর তাকে যে বয়ান দিয়েছিল তাই হুবহু বর্ণনা করে গ্রামবাসীদের কাছে। ধরিত্রী দাস একথাও জানায় যে, কাকেশ্বর তার পাপ স্বীকার করেছে। কেননা সে নবাব সিরাজের বিরুদ্ধে গুপ্তচর বৃত্তি করেছে ক্লাইভের পক্ষে। তার পাপের কারণেই পঞ্চপিতা পরমেশ্বর মানুষকে কেবল দানই করেন না, দুঃখও প্রদান করেন। সেই পাপ আর দুঃখের স্মৃতিচিহ্ন হচ্ছে কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কামান। এ হচ্ছে পঞ্চপিতার অক্ষয় কলঙ্ক।

ঝড়-বৃষ্টির ভেতর পলাশির যুদ্ধ শেষ। নবাবের বিরুদ্ধে ক্লাইভের পক্ষে যুদ্ধ করার জন্য রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের যে সৈন্যরা এসেছিল তারা ইংরেজের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে ফিরে চলেছে। ক্লাইভ খুশি হয়ে কৃষ্ণচন্দ্রকে যে পাঁচটি কামান উপহার দেন, সৈন্যরা তা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে রাজবাড়ি। চারটিকে পারলেও একটি কামান কিছুতেই টেনে নিতে পারছিল না। মাঝপথে সেটিকে তারা পরিত্যাগ করে রাজবাড়ি ফিরে যায়। পরদিন রাজা রাজবাড়ির হাতিশালের সবচেয়ে শক্তিশালী দুটো হাতি পাঠান কামান টেনে নেয়ার জন্য। কিন্তু শত চেষ্টায়ও হাতিরা একচুলও নড়াতে পারল না কামানটি। এ যে অভিশপ্ত কামান। হতভাগ্য নবাবের রক্তেভেজা।

রাজার পরামর্শে রাজপুরোহিত এসে গণনা করে দেখে কামানটির গায়ে লেপটি আছে নবাবের সেনাপতি মোহনলাল আর মির মর্দানের কলজের অদৃশ্য রক্ত। রাজপুরোহিতের পরামর্শে নর-বলির ব্যবস্থা করেন রাজা। কেননা ইংরেজের কামান রক্ত চায়, তাজা রক্ত। তখন ক্লাইভের হাতে বন্দি নবাবের আহত এক সৈনিককে ক্ষুধিত লৌহের উদ্দ্যেশে বলিদান করে রক্ত ছিটিয়ে দেয়া হয়। তারপর ইংরেজের পলাশি যুদ্ধের স্মৃতিবাহী রক্তপিপাসু কামান গভীর রাতে সাপের মতো হেঁটে রাজবাড়িতে প্রবেশ করে। কিংবদন্তি এই, রাজবাড়িতে ঈশ্বর জ্ঞানে পলাশির কলংকিত কামানটিকে রাজা বরণ করে নেন। গোপাল ভাঁড়কে সাক্ষী রেখে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র কামানটির সামনে করজোড় হয়ে মাথা নত করে উচ্চারণ করেন, ‘হে লৌহ দেবতা, তুমি শ্বেতবর্ণ দেবতা ইংরেজের দান, তুমি মহাপবিত্র, তুমিই আমার ঈশ্বর।’

ধরিত্রী দাস এবার খানিক নীরবতা পালন করে। এক সময় ফিসফিসিয়ে বলে, ‘আজ রাজা কৃষ্ণচন্দ্র নেই, আছে রাজবাড়ি, আছে সেই সব কামান। তোরা কি জানিস, আজও পলাশি যুদ্ধের দিবসগত রাতে নবাবের নিহত সৈন্যদের আত্মা ফিরে আসে সেই কামানের ঠিকানায়। ছায়ামূর্তি ধরে খোঁজে তাদের নবাব সিরাজকে। কলঙ্কিত কামানেরা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। নবাব নেই।

সমবেতদের মধ্যে হাহাকার ওঠে। স্বজনের মৃতদেহ দাহ শেষে শ্মশান থেকে ফেরা শোকাহতদের মতো নীরবে ওরা ঘরে ফেরে। কেননা তারা ভূমিদাস। শস্যভূমিতে মন পড়ে আছে। পঞ্চপিতার সন্তান ওরা। তিনিই তাদের এই সমুদ্রসারি নব্য পালন ভূমি এবং প্রাচীন অচল সুউচ্চ শৈলভূমি বেষ্টিত দেশে জন্ম দিয়েছেন। তিনি অগ্নিভয়, শত্রুভয়, জরা-মৃত্যু ভয়ের ত্রাতা। বংশরক্ষার জন্য তিনি দান করেছেন কন্যাদের। দান করেছেন শস্য ফলনের বিদ্যা। তিনিই জীবনদায়ী অন্নদাতা। কিংবদন্তির রাজন্যবর্গ, সিংহাসন, যুদ্ধ, রক্তপাত এবং ভয়করের রূপকথার যে দুনিয়া, তার সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে জড়িয়ে আছে শস্যভূমি আর দিনান্তের পিদিমজ্বলা গৃহকোণের অন্য এক জগৎ। দুটো দুনিয়ার মিশ্রণ তাদের অন্তরে জড়িয়ে আছে নদীর জল আর বৃষ্টির জলের একাকার হয়ে থাকার মতো রহস্যের ভেতর। এ রহস্য বড় জটিল। দুর্লঙ্ঘ্য।

তাই তো ধরিত্রী দাস ঘুমের বিছানায় স্বপ্ন দেখে। পঞ্চপিতা পঞ্চরূপ ধরে ধরিত্রী দাসকে নির্দেশ দিচ্ছেন, ‘পলাশির যুদ্ধ-পলাতকের বংশধরেরা, তোরা ভীরু, দুর্বল। নবাব সিরাজকে রক্ষা করতে পারলি না তোরা। বিনাযুদ্ধে নবাবের বুকের রক্তে ভেজা মাটিতে পা ফেলে রাতের আঁধারে পালিয়ে এলি তোরা। অন্ধকার অমাবস্যার দেবী, মৃত্যুর  দেবী কালীর পূজা করে শ্মশান ভূমিতে দাঁড়িয়ে; ভয়জয়ের বর প্রার্থনা কর তোরা। ব্যর্থ হলে মৃত্যু তোদের বংশপরম্পরায় তাড়া করে বেড়াবে।’

পঞ্চপিতার পঞ্চরূপ অন্তর্হিত হলে ঘুম কেটে যায় ধরিত্রী দাসের। হু হু করে কেঁদে ওঠে। নবাব সিরাজের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হয় সে। নবাব তাদের ক্ষমা করুন। তখনই তার মনে হয় বাইরের অন্ধকার রাতের বুক ফালা ফালা করে নবাব সিরাজের অশ্বখুরধ্বনি শুনতে পাচ্ছে সে। ধরিত্রী দাস উঠে বসে। দুয়ার খুলে অন্ধকার উঠোনে এসে দাঁড়ায়। বাতাস তার নাকে কি নিহত নবাবের খুনের তাজা রক্তের গন্ধ ছিটিয়ে দিচ্ছে? হঠাৎ সে অনতিদূরে একটি অশ্বের ছায়ামূর্তি দেখতে পায়। অশ্ব দ্রুত ছুটে যাচ্ছে প্রান্তরের দিকে। ভয়ে তার শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে। দ্রুত পা ফেলে বিছানায় ফিরে আসে ধরিত্রী দাস। কবরের অন্ধকার গুহার ভেতর থেকে কি নবাব জেগে উঠেছেন? গঙ্গা-ভাগীরথী পেরিয়ে তার হারানো রাজ্যের পদ্মা-মেঘনার তীরে ঘোড়ায় চড়ে তরবারি হাতে ক্লাইভের উদ্দ্যেশে ছুটে বেড়াচ্ছেন? ওই যে, ওই যে নবাব ঘোড়ার পিঠে। স্পষ্ট দেখছে ধরিত্রী দাস। চাঁদহীন অন্ধকার রাতে একটি আলোর বৃত্ত ঘিরে আছে নবাবের শরীর। সেই অলৌকিক আলোয় নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বদন-মুবারক নয়, বরং পৃষ্ঠদেশ দেখতে পায় ধরিত্রী দাস। ওখানে লালবর্ণ বৃত্ত। ওকি সূর্য! নাকি জমাট রক্তচিহ্ন?

আরে একি! নবাবের ঘোড়ার খুর কি দেবে যাচ্ছে নরম মাটিতে? একি কারবালার হোসেনের অশ্বের ভাগ্য! সিমারের অশ্বখুরধ্বনি কি শোনা যাচ্ছে? ক্লাইভের ঘোড়া কি ছুটে আসছে নবাবকে নিশানা করে? নবাব, নবাব, বলে আর্তনাদ করে ওঠে ধরিত্রী দাস। পর মুহূর্তেই সে বুঝতে পারে সবই তার মতিভ্রম। কেউ কোথাও নেই। কিন্তু ভয় তাকে সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরেছে। এখনও অশ্বখুরধ্বনির প্রতিধ্বনি অনুরণিত!

রাত পোহালে ধরিত্রী দাস ছুটে যায় গ্রামে। বর্ণনা করে তার স্বপ্নের কথা। শ্মশান কালীর পূজা না করলে যে ভয় মুক্তি ঘটবে না তা জানায় সে গ্রামবাসীকে। পূজা না হয় হলো, তাই বলে এই ভয়ংকর শ্মশানে? এসে যে দুষ্ট আত্মার বাসভূমি। বাতাসে মৃত্যুর ঘ্রাণ! কখনও কায়া ধরে, কখনও ছায়া হয়ে নরকের লীলা কীর্তন করে তারা। তারপরও মানুষগুলো ভয়কে জয় করতে চায়। শস্যের মাটি আঁকড়ে উবু হয়ে পড়ে থাকা মানুষগুলো শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে চায়। তাদের পূর্ব-পুরুষেরা ভয়ে জড়সড় হয়ে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে হাতির পিঠে নবাব সিরাজের লাশ প্রতিশোধ আর প্রতিরোধ ভুলে নিরাসক্ত হয়ে দেখতে গিয়ে যে মহাপাপ করেছে তার প্রায়শ্চিত্ত করতে চায়। কিন্তু এই মহাপাপের কি প্রায়শ্চিত্ত হয়?

তাই ঘোর অমাবস্যার রাত দুপুরে লোকালয় শূন্য নির্জন নদী তীরের শ্মশানে জ্বলে উঠে মশাল। ধ্রিম ধ্রিম শব্দে বাজে রুদ্র দেবীর বুক কাঁপানো বাজনা। নিশাচর পাখি আর পশুরা থমকে যায়। অন্ধকারে ওদের জোড়া জোড়া চোখ জ্বল জ্বল করে। বাতাসে ডানার শব্দ। প্রেতভয়ে সাহসী মানুষগুলোও গুটিয়ে যায়। ওরা জানেনা কোন দুঃসময় সমাগত।

মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে প্রেত-প্রেতিনীর শীতল নিঃশ্বাস পড়ে সমবেতদের শরীরে। অনতিদূরে ওরা দেখতে পায় প্রেতনৃত্য। পিশাচী, ডাকিনী, যোগিনীদের ভয়ংকর মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে লোলজিহ্বা। রক্তরস ঝরছে টসটস। ভয় তাড়–য়ারা মু- আর চণ্ড নামের ভয়ংকর দৈত্য বিনাশিনী দেবী চামুণ্ডাকে দেখতে পায়। ওরা দেখে পায় খড়গ হাতে আপন মুণ্ড পেছন করে রক্তমাখা মুণ্ড হাতে ছিন্নমস্তা দেবী সামনে দাঁড়িয়ে। ভয়কর অন্ধকার বর্ণের সেই দেবীকে প্রণিপাত করে গ্রামবাসী।

‘হে ভয়করের দেবী, মৃত্যুর দেবী, আখরা ভূমি দাস। গ্রামের শস্যভূমির রাইরের জগৎ আমাদের অচেনা। শস্যভূমি হারাবার ভয়ে আমরা গ্রামান্তরে যাইনি। নবাব সিরাজকে আমরা রক্ষা করতে পারিনি। আমাদের ভয় হরণ কর। লাঙল ধরার হাত আমাদের অস্ত্র ধরার হাতে পরিণত কর। দূর-গ্রামান্তরে যাবার সাহস দান কর। নবাব হত্যার পাপ থেকে মুক্তি দাও তুমি দেবী। নবাবকে পরিত্যাগ করে পলায়নের পাপ মোচন কর।’

তারপর ছাগবলির রক্ত কপালে ধারণ করে গ্রামবাসী রাতের শেষ প্রহরে গ্রামে ফেরে। তাদের বিশ্বাস দৃঢ় হয় যে, এবার নারীদের গর্ভে পঞ্চপিতা এমন বীর যোদ্ধা ক্ষত্রিয় শিশু সন্তান জন্ম দেবেন, যারা ভূমিপুত্রদের ক্লাইভের ইংরেজ জাতির অরাজকতা, উপদ্রবের ক্ষত হতে রক্ষা করবে। নিশ্চয়ই তারা তাদের প্রিয় নবাব হত্যা আর বিদ্রোহী সিপাহীদের খুনের প্রতিশোধ নিতে পারবে। যে ইংরেজ বণিক আর নীলকর লালমুখে বাঁদর ইংরেজ সাহেব নিষ্ঠুর অত্যচার করে, তাদের দেশ ছাড়া করতে পারবে নিশ্চয়ই। এ-নাহলে বৃথাই তাদের পূজা।

দ্বিপ্রহরে নদীঘাটের পঞ্চবটীর ছায়ায় বসে অতীত সময়ের গোলকধাঁধায় ডুব দেয় তারা। চণ্ডরব উচ্চস্বরে বলে, ‘কেন আমরা এই দেশে আগত ইংরেজ, পর্তুগিজ, ফরাসিদের মতো সাতসমুদ্দুর পেরিয়ে পালতোলা জাহাজ নিয়ে বাণিজ্যযাত্রা করতে পারি না? কেন আগুনে-কামান, বন্দুক বানাতে পারি না? ইংরেজগণ পারলে বাঙালি কেন পারবে না?

ধরিত্রী দাস আক্ষেপ করে উত্তর দেয়, ‘আমাদের আত্মা মাটি আর শস্যবীজ দিয়ে তৈরি, মাতা শস্যভূমি বুকে আগলে রেখেছে আমাদের। আমাদের মাটির বন্ধন ছিন্ন হবে না?

‘মাতা শস্যভূমি কি আমাদের তার অন্ধ ভালোবাসার কোল থেকে মুক্তি দেবেন না? দেবী কালী কি ভয় দূর করবেন না? নিশ্চয়ই করবেন। আমরা কি ভয় মুক্তির জন্য ছাগবলির রক্ত কপালে ধারণ করিনি?’ দমনকের এমনি কথায় চমকে ওঠে সবাই।

 

॥ পাঁচ ॥

চারপাশে ছড়িয়ে আছে কে অলৌকিক মায়াজাল। নানা বৃক্ষশোভিত দেশ। রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ আর শব্দের মতো পঞ্চগুণের মাদক রূপে রূপে অপরূপ। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র আর শীতলক্ষ্যার মতো মায়াবতী পঞ্চনদী। সবুজ-পেলব পঞ্চপল্লব ছাওয়া আম্র, অশ্বত্থ, বট, পাকুড় আর যজ্ঞডুমুর গাছের আদিগন্তবন। অশ্বত্থ, বট, বিল্ব, আমলকী আর অশোক বৃক্ষের শীতল ছায়ার পঞ্চবটী। ধান্য, মুগ, মাষ, যব, তিল-সর্ষপের মতো পঞ্চশস্যের ভূমির বন্ধন যে বড় রহস্যের। এই জটিল বন্ধন যে আচ্ছেদ্য পলাশির অভিশপ্ত, পরাজিত, পলাতক জনগোষ্ঠীর মুক্তির যে গোলকধাঁধায় ডুবন্ত। মানুষগুলো বাস করে এক রূপকথার জগতে। দেবী কালীর বরাভয়ও তাদের চিত্তের দুর্বলতা দূর করতে পারে না। দিন গিয়ে রাত এলে ফসলের ক্ষেত, তেপান্তরের মাঠ, গাছ-গাছালি, বিল-ঝিল নদী-নালা দেবী কালীর গাত্র বর্ণের মতোই ঘন অন্ধকার মানুষ সমেত দুনিয়াটা গ্রাস করে। নিশাচর পাখি, পতঙ্গ আর পশুর সঙ্গে প্রেতাত্মার মৃত্যু শীতল ডাক শোনা যায়। আর যখন জোনাক পড়ে তখন স্তব্ধ নির্জনতা অন্য জগতের ইঙ্গিত দিয়ে যায়। বৃক্ষ অরণ্যের ছায়া বাতাসে দোলা খেলে অশরীরী আত্মা যেন ভয় দেখায়। সবুজ কচি ফসলে পূর্ণ ভূমিতে দিনের আলোয় যারা মুগ্ধ দৃষ্টিতে প্রার্থনার ভঙ্গিতে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তারাই রাত নামলে সেই সবুজ রংকে ভূতের কালো শরীর ভেবে ভয়ে থিরথির করে। এত আতঙ্ক আসে কেন?

আজ তারা বিগত দিনের এক সাহসী পুরুষের কথা স্মরণ করে। দীর্ঘকায় কালো বর্ণ মানুষটিকে তারা দেখেনি, আয়নায় বাঁধানো তার বিবর্ণ ছবি দেখেছে। নীলকণ্ঠ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ইংরেজের সৈনিক। তার হারানো মেডেলের রহস্য আজও এই তল্লাটের মানুষ ভুলতে পারেনি। লোকে বলে ভৌতিক মেডেল। মনিপুরের যুদ্ধে যে বাহিনী নেতাজি সুভাষ চন্দ্রের আজাদ হিন্দ বাহিনীকে হারিয়েছিল, সেই বাহিনীতে ছিল নীলকণ্ঠ। এ বিজয় কি নীলকণ্ঠের বিজয়? এ পরাজয় কি নেতাজীর পরাজয়?

নীলকণ্ঠের প্রপুত্র বা ছেলের ঘরের নাতি গৌরবের সঙ্গেই যুদ্ধ কাহিনি বর্ণনা করে। জাপানি যুদ্ধ-বিমানের কথা এভাবেই সে বর্ণনা করে যে, মনে হয় পৃথিবীতে জীবিত সেই তার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী। নীলকণ্ঠের যোগ দেবার কথা ছিল নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজ সে শুনেছিল সুভাষ বসুর সেই আহ্বান- ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি দেব তোমাদের স্বাধীনতা।’ আজাদ হিন্দ বাহিনীর সেনাপতি কর্নেল শাহ নেওয়াজ খাঁ’র যুদ্ধের ডাকও শুনেছিল সে। কিন্তু কানে শুনলেও মর্মে প্রবেশ করেনি সেই ডাক। সে ইংরেজ বাহিনীতে যোগ দেয় নেতাজির বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য। এ যে রাজার প্রতি প্রজার ধর্ম। আত্মপ্রতারকের রাজভক্তি।

নীলকণ্ঠের প্রপুত্র বিজয়ীর মতো হাত তুলে উচ্চস্বরে বলে, আমার ঠাকুর্দা আজাদ হিন্দের একজন আহত সৈন্যকে বুকে তিনবার গুলি করেছিল, তারপর পাথর দিয়ে মাথা গুড়িয়ে দিয়েছিল। কেন দিয়েছিল, জান? গুলি খেয়েও ওই ব্যাটা বলছিল ‘ভারত মাতা কি জয়!’

শ্রোতাগণ বহু বৎসর ধরে শুনে আসা পুরাতন কাহিনির ভেতর রূপকথা খুঁজতে থাকে। বয়ান শেষে নামে নীরবতা। সেই নীরবতা ভাঙে ধরিত্রী দাসের প্রপুত্র নিত্যানন্দ। তার কাহিনি বর্ণনার ঢং অনেকটা ঠিক কবিয়ালদের মতো। সুর তোলা। ‘আমার পিতামহ ধরিত্রী দাস গত হয়েছেন বহু বৎসর আগে। আমরা বংশ-পরম্পরায় তার বর্ণিত কাকেশ্বরের জন্ম-জন্মান্তরের গল্প ধানের গোলার মতো অন্তরে সঞ্চিত রেখেছি। সেই পলাশির যুদ্ধ, নবাব সিরাজ, সিপাহি যুদ্ধ আর সিপাইদহের কাহিনিও ভুলিনি আমরা। এ স্মৃতি আমাদের অক্ষয়।’

নীলকণ্ঠের প্রপুত্রকে হঠাৎ ধমকে দিয়ে নিত্যানন্দ দাবি করে নীলকণ্ঠ ছিল বিশ্বাসঘাতক, বেঈমান। কেননা সে স্বাধীনতাযোদ্ধাকে হত্যা করেছে ইংরেজের ক্রীতদাস হয়ে। মৃত মিরজাফরের আত্মাই পুনর্জন্ম নিয়েছে নীলকণ্ঠ নামে। ইংরেজের দান সেই কলঙ্কিত মেডেল সে কারণেই প্রেতাত্মার ভর করে রহস্যজনকভাবে অদৃশ্য হয়ে গেছে। এ দৃশ্য বড় রহস্যের।

পঙ্গু অবস্থায় দীর্ঘবছর বিছানার পড়ে থেকে শেষে মৃত্যু ঘটে। নীলকণ্ঠের মৃতদেহের বালিশের তলায় পাওয়া যায় মেডেলটি। পুত্র-কন্নারা জানতো মেডেল রক্ষিত আছে কাঠের সিন্দুকের লক্ষ্মীর গোপন ভাণ্ডারে। সেই খুদে ভাণ্ডারে সিঁদুর লাগানো মহারানি ভিক্টোরিয়ার মুখাঙ্কিত একটি রূপোর টাকা। টাকা তো নয়, যেন রূপের ভগবান।

কাকেশ্বরের যাদুবিদ্যার প্রাচীন দুনিয়া কোথায় যে হারিয়ে গেল। যদি পুনর্জীবন হতো তার তবে নিত্যানন্দ খোঁজ পেতো সেই তামার মেডেলটির। তবে কি নীলকণ্ঠের প্রেতাত্মা ভর করেছে তাতে? না হলে কেন রহস্যের খেলা খেলছে? নীলকণ্ঠের মৃত্যুর পর একরাতে তার পুত্রটি মিথ্যা স্বপ্ন দেখেছিল? নীলকণ্ঠ তার পুত্রকে স্বপ্নে আদেশ করছে যেন ইংরেজের দান মেডেলটিকে দেবতাজ্ঞানে পূজা করা হয়। পুত্র এতে পিতার আদেশ মতো সেই মেডেলকে ঈশ্বরজ্ঞানে পূজা করতে কখনও ভুল করেনি। কিন্তু যেদিন এক ছদ্মবেশী প্রত্ন-চোরাকারবারী এসে লাখ টাকার বিনিময়ে তা তার হাতে তুলে দেয়ার লোভ দেখায়, লোকটি পিতৃস্মৃতি ভুলে যায়। নির্ধারিত দিন লোকটি ফিরে এলে সিন্দুক খুলে অবাক হয়ে যায় নীলকণ্ঠের পুত্র। মেডেলটি অদৃশ্য। কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। এ তো ভৌতিক মেডেল।

জানাজানি হলে চারদিকে রটে যায় যে, নীলকণ্ঠের মেডেল যক্ষের ধন হয়ে গেছে। তাকে পাহারা দেয় কালনাগিনী। কিন্তু হঠাৎ এক সন্ধ্যায় নীলকণ্ঠের পুত্রবধূ ধূপ-প্রদীপ জ্বালাতে গিয়ে দেখতে পায় মেডেলটি ঝুলছে তার মৃত শ্বশুরের আয়নায় বাঁধানো বিবর্ণ ছবিতে। ভয় আর উত্তেজনায় চিৎকার করে ওঠে নীলকণ্ঠের পুত্রবধূ। এ ঘর ও ঘর থেকে বৌ-ঝিয়েরা ছুটে এলে নীলকণ্ঠের পুত্রবধূ যা দাবি করে তা অসত্য প্রমাণিত হয়। কোথাও মেডেলটি নেই। তারপর থেকে কেউ আর কোনোদিন মেডেলটির হদিস পায়নি। ওরা বুঝতে পারে না এ কোন নির্মম ছলনা।

এক আলোজ্বলা অমাবস্যা রাতে আধঘুম আধ জাগরণে নীলকণ্ঠের প্রপুত্র দেখতে পায় তার মৃত পিতামহের ছায়ামূর্তি ঘরে ঢুকেছে। কি যেন খুঁজছে। ছায়ায় তৈরি মুখ হলেও প্রপুত্র পিতামহকে চিনতে পারে। লোকটি এবার সে ছাতনা-পড়া ঘোলাটে পুরানো ছবিটার সামনে দাঁড়ায়। ইংরেজ সৈনিকের পোশাক পরা ছবি। ইংরেজ রাজত্ব রক্ষার বিশ্বাসী গোলাপ। স্বদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীর হত্যাকারী।

প্রপুত্র স্পষ্ট শুনছে ফিসফিস করে ছায়ামূর্তটি বলছে, ‘কোথায় আমার মেডেল? কোথায় যুদ্ধ পুরস্কার?’ হ্যাঁ। সে তার পিতার মুখ থেকে শুনেছে তার ঠাকুর্দার মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে চিতায় উঠিয়ে মুখাগ্নি করা মাত্র লাশটি ওঠে বসে চিতার উপর এবং চিৎকার করে বলে-‘যুদ্ধের মেডেল কোথায় আমার?’

আজ প্রপুত্রের মনে হয় ইংরেজের দান মেডেলটি প্রেত শক্তি অর্জন করেছে। তাই সে মাঝে মধ্যে তার মৃত মালিককে খুঁজতে আসে এই বাড়িতে। খুঁজে না পেয়ে ঘরঘর পায়চারি করে বেড়ায়। হয় তো যুদ্ধের কথা মনে পড়ে মেডেলটির। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। মনিপুর সেক্টর। আজাদ হিন্দ বাহিনী। ইংরেজ বাহিনী। কি ভয়ংকর যুদ্ধ। ইংরেজ রাজত্ব রক্ষার্থে যে যুদ্ধে জীবনদান করতে পারলে মানবজন্মের পূর্ণ সার্থকতা আসে, সেই যে যুদ্ধ। একবারও কি মেডেলটির মনে পড়ে না সেই যুদ্ধছিল নীলকণ্ঠের জন্য পরাধীন মাতৃভূমির বিরুদ্ধে যুদ্ধ? বেঈমানের যুদ্ধ? কলঙ্কিত পাপপঙ্কিল এক বিজয়। মানুষগুলোর ঘোর কাটে না মেডেলটিকে নিয়ে। ওদের ঘোর সেদিনই ভাঙে যেদিন শুনতে পায় প্রপুত্র তার ঠাকুর্দার চিতা থেকে তুলে আনা দেহাবশেষ কপালের একখ- হাড় পবিত্র নদী গঙ্গায় বিসর্জনের জন্য খুঁজতে গিয়ে পুরানো টিনের সুটকেসটি খুলে ফেলে। ভয় আর উত্তেজনায় শরীর কেঁপে ওঠে তার। ঘামতে থাকে। চিত্তবিকল ঘটতে থাকে।

প্রপুত্রের কাঁপতে থাকা হাতে ওঠে আসে নীলকণ্ঠের কপালের হাড়। এ যেন যাদুকরের হাতে স্থির হয়ে থাকা আত্মঘাতী মানুষের মাথায় খুলি। কপালের হাড়টি সে খুঁজে পায় নীলকণ্ঠের খাকি রং-এর জীর্ণ সেনাউর্দির ভাঁজের ভেতর। পিতা জীবিত থাকলে নিশ্চয়ই জানতে পারতো কখন কি জন্য টিনের সুটকেসে উর্দির সঙ্গে কপালের হাড়টি রাখা হয়েছে। মৃত্যুরপূর্বে পিতাকে সে আক্ষেপ করতে শুনেছে যে, ঠাকুর্দার হাড়টি গঙ্গার বিসর্জন করা গেল না। আরও শুনেছে সিপাই পিতার স্মৃতির একটি উর্দির কথা।

গভীর রাতে খোলা জানালার ভিতর দিয়ে গড়িয়ে পড়া জোছনার আলোর প্রপুত্র দেখতে পায়, নীলকণ্ঠের কপালের হাড়টি মাকড়সার মতো পিলপিল করে খাড়া মাটির দেয়াল বেয়ে উঠা-নামা করছে। সেনাউর্দিটি শূন্যে ঝুলে হেল-দোল করছে। সত্যি সে ভয় পেয়ে যায়। একি তার ঠাকুর্দার প্রেতাত্মার কাজ? তার মৃত ঠাকুর্দার আত্মা কি অতৃপ্ত কামনা নিয়ে এই ঘরে বন্দি হয়ে আছে? স্বর্গে কিংবা নরকে কোথায় স্থান পায়নি?

এই রহস্যের কথা জানাজানি হলে গ্রামবাসী এই সিদ্ধান্তে আসে যে, মৃত্যুর পর নীলকণ্ঠের যে প্রেতজীবনের শুরু তা থেকে কখনও মুক্তি ঘটবে না। তার মৃত আত্মা পাপাত্মায় পতিত হয়েছে। কেননা সে স্বদেশের স্বাধীনতা যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। গ্রামবাসীর এই বিশ্বাস প্রপুত্রের মনে মৃত নীলকণ্ঠের প্রতি ঘৃণা তৈরি করে। দাউদাউ জ্বলে ঘৃণার আগুন।

‘নীলকণ্ঠের বংশধর, তোর শরীরে যে পলাশি যুদ্ধের মিরজাফর আর মনিপুরের যুদ্ধের আজাদ হিন্দ বাহিনীর দুজন ইংরেজ বাহিনীর বিশ্বাসঘাতকের রক্ত মিশে আছে,’ সমস্বরে গ্রামবাসী এ কথা বললে প্রপুত্র কেঁদে ফেলে। প্রেতের কান্নার মতো।

‘আমি আমার পূর্বপুরুষের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই’, গ্রামবাসীর উদ্দেশ্যে এমনি কাতরতা প্রকাশ করলেও তারা নিরুত্তর।

 

॥ ছয় ॥

এক পূর্ণিমা রাতে তেপান্তরের মাঠের উপর দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দিল্লির শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ, বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা এবং আজাদ হিন্দ্ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে অশ্বপৃষ্ঠে ছুটতে দেখে নিত্যানন্দ। শীতকাল নয়। তবু তার মনে হয় আসমান আর জমিনের মাঝখানে কুয়াশার ঘন একটি পর্দা ঝুলে আছে। তিনজন অশ্বারোহী নিকটবর্তী হতেই পর্দাটি দু’ভাগ হয়ে যায়। অশ্বারোহীগণ তার ভিতর ঢুকে যাওয়া মাত্র পর্দা জোড়া লেগে যায়। কিন্তু তখনও নিত্যানন্দের কানে অশ্বখুরধ্বনি আছড়ে পড়ছিল। বাতাসে লোবানের গন্ধ।

তাই সে প্রত্যাশা করে প্রাচীন পৃথিবীর জাতিস্মর কাকেশ্বর তার সামনে এসে দাঁড়াক। অথচ কাকেশ্বর কিংবদন্তির ভিতর হারিয়ে গেছে সেই কবে। আজ আর ধরিত্রী দাস, দমনক কিংবা। চণ্ডরবও নেই। কে ব্যাখ্যা দেবে এসব অজাগতিক রহস্যময় দৃশ্যের? দিতে পারত অজানা কোন মুলুক থেকে ফসলের মৌসুমে গ্রামে আসা পটুয়ারা। ওরা তো যাযাবর। হঠাৎই উদয় হয় আবার হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়। পটের ছবি দেখিয়ে গান গেয়ে গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরে শস্যদানা কিংবা পয়সা কুড়িয়ে কোথায় যে হারিয়ে যায়, কেউ জানে না। ওরাই জানে চেরাগি ফকিরের হদিস। যাযাবর পটুয়ারা।

যেই নারী স্বামীর আগে খাইয়া ঘুম যায়,

সেই নারী সবার আগে নরককুণ্ডে যায়।

যেই নারী যপযপাইয়া পায়ের শব্দে চলে,

সেই নারীর স্বামী মরে নিশি অকালে।

শিব, দুর্গা, লক্ষ্মী ঘর ছাড়ে নারীর পাপে,

সংসার বিনাশ পাগলা শিবের অভিশাপে।

কোন স্বপ্নের কোন অর্থ ফকির তা জানে। কোন দৃশ্যে কোন বিপদের আলমত, তাও জানে ফকির। নিত্যানন্দ কেন বীর যোদ্ধাদের ঘোড়ার পিঠে দেখল, যারা মৃতদের জগতের বাসিন্দা, এর ব্যাখ্যাকার গ্রামে খুঁজে পায় না নিত্যানন্দ। তাই সে আতঙ্কের মধ্যে দু’দিন কাটিয়ে দূর গাঁয়ে চলে যায় চেরাগি ফকিরের খোঁজে। সে জানতে চায় পূর্ণিমা রাতের সেই দৃশ্য তার কোনো দুর্ভাগ্যের ইংগিত কিনা। ভাগ্য ভালো সে খুঁজে পায় ফকিরকে।

চেরাগি ফকির তার পঞ্চশিখার চেরাগ জ্বালিয়ে নিত্যানন্দকে অন্য কথা বলে। সে জানায় অতীতের কোনো মৃত পিরের কথা। সাদা ঘোড়ার পিঠে চড়ে সেই পির এই মুলুকে এসেছিলেন আরবের মরু আর পাহাড় পেছনে ফেলে। মৃত্যুর পর সেই পির তার মুরিদের দেখা দিতেন সুরত ধরে। কেউ হয়ত দেখতে পায় তিনি ঘোড়ার ওপর সওয়ার হয়েই নামাজ পড়ছেন, হয়ত দেখল তিনি নিজের কবর-মাজারের পাশে বসে আছেন ইবাদতের ভঙ্গিতে। হাতে তসবি।

হতাশ নিত্যানন্দ বাড়ি ফিরে আসে। পথে সে অচেনা একজনের মুখে শুনতে পায় চেরাগি ফকির জিন সাধক। জিনেরা আদম সুরত ধরে ফকিরের আদেশ পালন করে। চাষের কাজ করে দেয়। মানুষ তাকে শ্রদ্ধা করে এই কারণে যে, উপকার করে একটা পয়সাও হাত পেতে নেন না। জনশ্রুতি এই, চেরাগি ফকিরের ঈমান পরীক্ষার জন্য খোদা তার প্রথম শিশুপুত্রকে দুনিয়া থেকে তুলে নেন। ফকিরের চোখে একফোঁটাও পানি নেই। খোদার ইচ্ছাকে মেনে নেন তিনি।

ইবাদত-বন্দেগিতে মসগুল চেরাগি ফকিরের কুদরতি ক্ষমতার সাক্ষী তার স্ত্রী। একদিন সে হঠাৎ দেখতে পায় ধ্যানমগ্ন ফকিরের জ্বলন্ত চেরাগের পাঁচটি নলের ভেতর থেকে পাঁচজন জিন বেরিয়ে আসছে। ওদের শরীর আগুনের তৈরি।

রাতে ঘুম নামে না নিত্যানন্দের। ছটফট করে। হঠাৎ তার কানে আসে বাইরের অন্ধকারে ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ। বালিশের উপর মাথাটা উঁচু র্ক না, কোথাও কোনো শব্দ নেই। বালিশে মাথা নামাতেই আবার সেই শব্দ। নিত্যানন্দ বিছানায় উঠে বসে। অন্ধকারে হাতড়ে দুয়ার খুলে বাইরে আসে। নিস্তব্ধ রাত। ঝিঁঝি ডাকে। খালের পারে যে জঙ্গল বেত আর ভাঁট ঝোপ সেখানে উড়ন্ত জোনাকি জ্বলছে। হাজার হাজার। কি বিস্ময়। জোনাকিরা গাঙের স্রোত তৈরি করেছে। ঢেউ আর ঢেউ। জলের ঘূর্ণি জোনাকিদের এমন খেলা তো জীবনে আর কখনও দেখেনি। কেউ দেখেছে এমন কথাও শোনেনি।

এটা শোনো প্রেতরহস্য নয়তো? হঠাৎ একটি কালো ডানার পতঙ্গভূক নিশিপক্ষি জোনাকির নদীতে সাঁতার দেয়। পাখির ডানার ঝাপটায় জোনাকির জলঘূর্ণি ছিটকে পড়ে এদিক ওদিক। মাত্র কয়েক মুহূর্ত। অদৃশ্য হয়ে যায় জোনাকিরা। বেত আর ভাঁট ঝোপ রাতের ভেজা ঘন রঙে থিক্থিক্ করে। বাড়ির বাইরের কাঠবাদাম গাছের অন্ধকার মগডালে ঝপাৎ ঝপাৎ শব্দ হয়। হয়ত উড়ন্ত পেঁচা নেমে পড়েছে গাছের ডালে। মুখে শিকার করা নির্বিষ সাপ।

তারও তিনদিন বাদে নিত্যানন্দ পুনরায় ছুটে যায় চেরাগি ফকিরের বাড়ি। ফকির তাকে ভালোভাবে নিরীক্ষণ করে গম্ভীর গলায় বলে : তুই বিধর্মী, কিন্তু নেকবান্দা, তাই আসছে বুধবার সন্ধ্যায় আমার কাছে আসবি। একা কিন্তু। সেদিন মহররমের দিন। সেদিনই আমার পুত্রের ইন্তেকাল ঘটে, হ্যাঁ সেদিনই আসবি। ভুলবি না, একা কিন্তু।’

আলপথ, জলা-জঙ্গল ঘেরা কয়েকটি গ্রামের দীর্ঘ আঁকাবাঁকা পথ মাড়িয়ে একটা ঘোরের ভেতর নিত্যানন্দ সন্ধ্যা নামার পূর্বেই চেরাগি ফকিরের আস্তানায় হাজির হয়। ফকিরের মুখ বিষণ্ন। কারবালার নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের ঘটনার স্মৃতি তার বুকের ভেতরটা রক্তাক্ত করে। তার উপর ঠিক এই মহররমের দিনেই ফকিরের পুত্র বিয়োগ ঘটে।

‘ফকির, পুত্রের মৃত্যুর কথা কি এখন আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে?’ নিত্যানন্দ খুবই বিনীতস্বরে কথাটা বলে।

‘তা ঠিকই ধরেছিস বাবা, কিন্তু অধিক কষ্ট পাচ্ছি হোসেনের মৃত্যুতে, গোনাহগার সিমার তাকে এই মহররমের দিনেই ফোরাত দরিয়ার তীরে হত্যা করে’, বলতে বলতে হু হু কান্নায় ভেঙে পড়ে ফকির। এ যেন এক অর্বাচীনের কান্না।

নিত্যানন্দ নিথর হয়ে পড়ে যেন দাঁড়িয়ে থাকা একটি লাশ। চেরাগি ফকির বুঝতে পারে। নিত্যানন্দকে দাওয়ায় বসতে দিয়ে বেলা ডুবে যাবার অপেক্ষায় থাকার কথা বলে অদৃশ্য হয়ে যায়। নিত্যানন্দ ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ বলে কান্নার সুরে ফকিরের সুর তুলে জিকির পড়ার মতো শব্দ শুনতে পায়। কোথা থেকে, কোনদিক দিয়ে শব্দগুলো ভেসে আসছে বুঝতে পারছে না। নিত্যানন্দের মনটা কেমন উলটপালট হয়ে যায়। নিহত হোসেন বুঝি তারও কত আপন, হয়ত সেই সব দেবতাদের মতোই একজন, যে তাদের গ্রামের ঘরে ঘরে নিত্য পূজা পায়। তাই সে সেই অজ্ঞাত দেবতাকে চোখ বুঁজে প্রণিপাত করে।

কখন তার সামনে চেরাগি ফকির সটান দাঁড়িয়ে স্তব্ধ হয়ে থাকে কতক্ষণ, বুঝতেই পারেনি নিত্যানন্দ। চোখ খুলে সে থতমত খেয়ে যায়। নিশ্চুপ ফকির অপলক তাকে দেখছে। এক সময় অনুচ্চস্বরে বলে, ‘তোর চোখে কি পানি? কারও জন্য শোক করবি না। আমিও অবশ্য, শোক করি, কিন্তু তাতে কবরের ভেতর মানুষের, কষ্ট পায়। আত্মা কষ্ট পায়।’

নিত্যানন্দ চোখ মোছে। বিড়বিড় করে মা বলে তা শোনা যায় না। চেরাগি ফকির খানিক স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু তার ঠোঁট নড়ে। আসলে তার মনের ভেতর জিকিরের ঘোর তখনও কাটেনি। এই ঘোরের ভেতর ফকির আসমানে চোখ তোলে। তার চোখ বিস্ফারিত। একি আলামত আসমানে? ঘূর্ণায়মান একটি অগ্নিগোলক ছুটে বেড়াচ্ছে আসমানে। কিয়ামত কি ঘনিয়ে আসছে? নূহের কিয়ামতের কথা মনে পড়ে তার। সে একটি কিসতি খোঁজে যার মধ্যে আশ্রয় নিয়ে রক্ষা পায় খোদার নেক বান্দারা। কেবল রক্ষা পায়নি নুহের অবাধ্য এক বেদ্বিন পুত্র।

তারপর একসময় নিত্যানন্দকে পাশে বসিয়ে সেই পূর্ণিমা রাতের অশ্বারোহীদের কথা পাড়ে। এসব দৃশ্যের রহস্যময় দুনিয়ায় প্রবেশ করে ফকির। এর সানে-নজুল কি? নিত্যানন্দ সম্মোহিত হয়। চেরাগি ফকির তাকে এমন এক দুনিয়ার সীমানায় নিয়ে যায় যেখানে নিত্যানন্দ আলো-অন্ধকারের এক গোলক ধাঁধায় পতিত হয়। কেননা দিন সমাগত। রক্তের বান বয়ে যাবে। হাজার হাজার নরকংকাল চারদিকে ছুটে বেড়াবে। তাদের শুকনো হাড়ে হাড়ে সংঘাতের ফলে যে শব্দ হবে তা নর-বলির বাজনার ভয়ংকর শব্দে ওই আসমান আর এই জমিনে কম্পনের সৃষ্টি হবে। গৃহগুলো আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। মানুষের কাফেলা ছুটবে দিগদিগন্ত, দিগি¦দিক। বিচ্ছিন্ন হবে পরস্পর থেকে। হাজারজনের কাফেলা পরিণত হবে শতজনে। কেউ হবে সঙ্গীহীন, একাকী। সঙ্গীদের রক্ত আর মৃতদেহ মাড়িয়ে ওরা যেখানে পৌঁছবে, এক সে অচেনা দুনিয়া। ওখানেও মৃত্যু ওত পেতে থাকবে।

চেরাগি ফকিরের আস্তানা পেছনে ফেলে নিত্যানন্দ যখন গাঁয়ের উদ্দেশ্যে ছুটতে থাকে তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নামে। ঘরের বাইরে জনমনিষ্যির গতাগম্য নেই। সে ভয়ার্ত, কিন্তু দিগ্ভ্রান্ত নয়। মনে হয় চেরাগি ফকির তার পথের সঙ্গী। ওরা পরস্পর কথা বলছে। আসলে নিত্যানন্দ নিজের সঙ্গেই কথা বলছে। তার আরও মনে হয় মাঝপথে তৃতীয় কেউ তাদের সঙ্গী হয়েছে। তৃতীয় ব্যক্তির কণ্ঠস্বর অচেনা। কিন্তু অলৌকিক। এমনি কণ্ঠস্বরের কথা সে গ্রামের কবিয়ালদের মুখে শুনেছে। সেই কথা এ দুনিয়ার নয়, বরং অন্য দুনিয়ার। দৈব। সেই দৈবকণ্ঠই তাকে শোনাচ্ছে, ‘বহু দূরে নগরের আসমানে গভীর রাতে যে আলোর আভা ক’দিন ধরে দেখা যায় তা আসলে গৃহদাহ। নগর জ্বলছে। সেই অগ্নি রেখায় সীমানায় যে বজ্রপাতের শব্দ ওঠে তা দানবের অট্টহাসি। আসমান ফালাফালা হয়ে যায় সেই হাসিতে। হাসির ভাঙা টুকরো হাজার হাজার অগ্নিগোলকের মতো শব্দ নিক্ষেপ করে সব বিচূর্ণ করে দেয়।

 

॥ সাত ॥

পঞ্চপিতা পিতৃভূমির পিলসুজগুলো একে একে নিভে যায়। অনাদিকালের অন্ধকারে মানুষগুলো পতঙ্গের মতো যেন গুহা নিবাসে অদৃশ্য হয়ে যায়। গ্রামে ফিরে নিত্যানন্দ তাদেরকে কি যাদুকরের মতো সম্মোহিত করেছে? ওরা অজানা, অদেখা, সমাগত কোনো ভয়ংকর পরিস্থিতির কাছে কি আত্মসমর্পিত হতে রাতের অন্ধকারে নিঃসাড় হয়ে গেলো? পলাশির পলায়নের স্মৃতি ওদের ভয়ার্ত করেছে? দিবারাত্রি দীর্ঘপদ যাত্রা, পথিমধ্যে দুস্যদের আক্রমণ, ক্ষুধা-তৃষ্ণা, নির্ঘুম কি তাদের বুকের ভেতর সাহসের বীজ অংকুরিত করেনি? মনে হয় পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-ব্রহ্মপুত্র আর শীতলক্ষ্যাবিধৌত দেশে এসে পললভূমিতে স্বল্পশ্রমে অধিক স্থূল জন্মাতে গিয়ে আলস্যদোষে তন্দ্রালু হয়ে পড়েছে? তাই কি তারা শস্যভূমি কর্ষণ এবং বীজ বপনের সমার্থক মনে করে নারী সম্ভোগ আর সন্তান বীজ বপনের বিষয়টি? আত্মশক্তি অর্জনের সাধনা পরিত্যাগ করে তারা দেবী কালীর কাছে ভিক্ষার পাত্র নিয়ে দাঁড়ায় কেন শক্তি লাভের জন্য? ওদের কি শক্ত হৃৎপিণ্ড নেই?

একদিকে ভয় আতঙ্ক, অন্যদিকে অনিদ্রায় ছটফট করে রাত নিঃশেষ করে দেয় নিত্যানন্দ। গাঁয়ে যে গুজব রটিয়ে গেছে কেবা কারা, শহর জ্বালিয়ে দিয়ে নরমুণ্ডে গেন্ডুয়া খেলতে খেলতে পাকিস্তানি পাঞ্জাবি সেপাইরা গ্রামের দিকে ছুটে আসছে, একি তবে সত্যে পরিণত হবে? বাঙালিরা পাকিস্তান ভাঙতে চায়, এ সত্য যেমনি আজ তাদের কাছে গোলকধাঁধা বলে মনে হচ্ছে, হিন্দুস্থান ভেঙে পাকিস্তান তৈরির সময়ও একই গোলকধাঁধায় পড়েছিল পলাশির পলাতকেরা। ওরা তো পঞ্চপিতা, পরমেশ্বরের সন্তান। কেঁচোর মতো মাটিতে জন্মে মাটির অন্ধকার নিরাপদ আয়েই জীবন কাটাতে চায়। মাটি বিচ্ছিন্ন হয়ে কেঁচো যেমনি বাঁচতে পারে না তেমনি পলল মাটির এই শস্যভূমি বিচ্ছিন্ন হলে ওরা হারিয়ে ফেলবে অস্তিত্ব। মাটির এই মায়াজাল বড় জটিল, বড় রহস্যময়।

অথচ নিত্যানন্দ শুনেছে ইংরেজেরা শস্যভূমি চাষ ছাড়াও দিব্যি বেঁচে থাকে। তারা সাতসমুদ্দুর পেরিয়ে এ দেশে এসেছিল বণিক হয়ে। হয়ে গেছে রাজা। ওরা রেলগাড়ি বানিয়েছে, বানিয়েছে জাহাজ, নিজেদের দেশ পেছনে ফেলে, শস্যভূমি পরিত্যাগ করে পলাশির আম্রকাননে যুদ্ধ করেছে। শস্যভূমির মায়া ওরা কোন যাদুশক্তিতে পরিত্যাগ করেছিল? উত্তুঙ্গ সমুদ্র কি মন্ত্র দিয়েছিল কানে?

না, পঞ্চপিতার পঞ্চবর্ণের শক্তি ছিন্ন করার সাহস শক্তি নিত্যানন্দের নাই। এই মাটির মায়া যে রহস্যে ঘেরা। কিন্তু নগর ছেড়ে যদি পাঞ্জাবিরা সত্যি গাঁয়ে হামলে পড়ে তখন তো পালাতেই হবে। গৃহকোণের এই চোখ ছলছল করা মমতা, চিরচেনা বংশ-পরম্পরার ওম নেওয়া এই ফসলের মাটি ফেলে কোথা পালাবে সে? আপন ঘুমের বিছানা ছেড়ে কবে গ্রামান্তরে কোন আত্মীয়ের ঘরে একরাত কাটিয়েছে, মনে পড়ে না তার। কাটালেও আপন চাঁটাইয়ের বিছানার বাইরে হয়ত চোখের পাতা এক হয়নি ক্ষণমুহূর্তের জন্য। কি আত্মহননের অশ্ব মায়া, কি মমতার নিষ্ঠুর যাদুস্পর্শ!

অথচ অলঙ্ঘনীয় ভাগ্য বিপর্যয়ের সেই দিন আসে। গণহত্যার দিন। গৃহদাহের দিন। পলায়নের দিন। প্রাচীন নবী মুসার অনুসারীদের মতো। এ যেন এক ঐশ্বরিক অলঙ্ঘনীয় মন্দভাগ্য। সবই যেন পূর্বনিধারিত। ‘তখন ইস্রায়েল-সন্তানেরা বালক ছাড়া কমবেশ ছয় লক্ষ পদাতিক পুরুষ রাত্রি শেষ হইতে সুক্কোতে যাত্রা করিল। তাহাদের সহিত মিশ্রিত লোকদের মহা-জনতা এবং শেষ ও গো, অতিবিস্তর পশু প্রস্থান করিল। পরে তাহারা মিসর হইতে আনীত ছানা ময়দার তাল দিয়া ভারী শূন্য পিষ্টক প্রস্তুত করিল। কারণ তাহারা মিসর হইতে বহিষ্কৃত হইয়াছিল। ইস্রায়েল-সন্তানেরা চারিশত ত্রিশ বৎসর কাল মিসরে প্রবাস করিয়াছিল। এই চারিশত ত্রিশ বৎসরের শেষে, ঐদিনে সদাপ্রভু ঈশ্বরের সমস্ত বাহিনী মিসর দেশ হইতে বাহির হইল।… এইরূপে সদাপ্রভু ইস্রায়েল সন্তানদিগকে মিসর দেশ হইতে বাহির করিয়া আনিলেন।… আর মোশি লোকদিগকে কহিলেন, এই দিন স্মরণে রাখিও, যেদিনে তোমরা মিসর হইতে, দাসগৃহ হইতে বহির্গত হইলে।… যে দেশ তোমাদের দিতে সদাপ্রভু ঈশ্বর তোমার পিতৃপুরুষদের কাছে দিব্য করিয়াছিলেন, সেই মুগ্ধমধুপ্রবাহী দেশে তোমাকে আনিবেন।’

‘লোকেরা পলাইয়াছে, মিসর রাজকে এই সংবাদ দেওয়া হইলে, তিনি আপন রথ প্রস্তুত করাইলেন এবং পলাতক লোকদের পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন।  ফেরাউন যখন নিকটবর্তী হইলেন তখন ইস্রায়েল সন্তানেরা অতিশয় ভীত হইল এবং ক্রন্দন করিল। সদাপ্রভু ঈশ্বর মোশিকে কহিলেন, তুমি আপন ষষ্টি তুলিয়া সমুদ্রের উপরে হস্তবিস্তার কর, সমুদ্রকে দুই ভাগ কর, তাহাতে ইস্রায়েল সন্তানেরা শুষ্ক পথে সমুদ্র মধ্যে প্রবেশ করিবে।’

‘মোশি সমুদ্রের উপরে আপন হস্তবিস্তার করিলেন, তাহাতে সদাপ্রভু ঈশ্বর পূর্বীয় বায়ুদ্বারা সমুদ্রকে সরাইয়া দিলেন ও শুষ্কভূমি করিলেন, তাহাতে জল দুইভাগ হইল। আর ইস্রায়েল-সন্তানেরা শুষ্ক পথে সমুদ্রমধ্যে প্রবেশ করিল, এবং তাহাদের দক্ষিণে ও বামে জল প্রাচীর স্বরূপ হইল। তখন ফেরাউনের সকল অশ্ব ও রথ এবং অশ্বারূঢ়গণ ধাবমান হইয়া সমুদ্রের মধ্যে প্রবেশ করিল। কিন্তু রাত্রির শেষ প্রহরে সদাপ্রভু ঈশ্বর অগ্নি ও মেঘস্তম্ভে থাকিয়া মিসরিয় সৈন্যদের উপর সমুদ্র ঠেলিয়া দিলেন। তাহাতে ফেরাউনের যে সকল সৈন্য তাহাদের পশ্চাতে সমুদ্রে প্রবিষ্ট হইয়াছিল, তাহাদের একজনও অবশিষ্ট রইল না। তখন নবি মোশি ও ইস্রায়েল-সন্তানেরা সদাপ্রভু ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে গান করিলেন, কেননা তিনি ফেরাউন সৈন্যদর সমুদ্রে নিক্ষেপ করিলেন।’ বাইবেল, ওল্ড টেস্টমেন্ট।

নিষ্ঠুর ফারাউ সৈন্যরা যেমনি নবি মুসার অনুসারীদের দাসত্ব মুক্তির সংগ্রামকে ধ্বংস করার জন্য মিসর থেকে বিতারণের উপায় হিসাবে হত্যা আর বন্দি করার তা-বে মেতে ওঠে, তেমনি পাকিস্তানি সৈন্যরাও পঞ্চপিতা পিতৃভূমির সন্তানদের হত্যা ধর্ষণ আর অগ্নিসংযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে। রাজগোখরোর মতো আগুন-ফণা ঊর্ধ্বগামী হয়। অগ্নিবিষ উগরে দেয়। মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হবার পর এই তারা প্রথম শিখল প্রাণের মায়ার চেয়ে পরম সত্য অন্য কিছু নয়। তারা গৃহত্যাগ করে মায়ের গর্ভনাড়ি ছেঁড়ার মতো। শিশুরাই কেবল নির্বিকার। বোধশূন্য বলে ওরা শোকহীন। যারা সদ্য কিশোর তাদের কারও কারও মনে স্বপ্ন উঁকি দেয় দূরযাত্রার আনন্দে।

পূর্ব-পুরুষের স্মৃতিধারকেরা বিগতকালের কোনো এক যুদ্ধের রূপকথায় অথৈ সাঁতার দেয়। হতে পারে সে যুদ্ধ মহাভারত কিংবা রামায়ণের। কারও স্মৃতি পৃথিবীর বয়ানে মরু কারবালার। কিন্তু শোকের চেয়ে সেই বিশ্বাসকে ওরা আঁকড়ে ধরে যেখানে কল্পিত নরক কিংবা দোজখ, স্বর্গ নয়তো বেহেশত জ্বল জ্বর করে জ্বলে চোখের আয়নায়।

গৃহত্যাগ কিংবা গ্রাম ত্যাগের পূর্বরাত ঘনিয়ে আসে। এমন রাতের অভিজ্ঞতা কারও থাকার কথা নয়। রূপকথায়ও তারা শোনেনি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নামে না তো মৃত্যুর দেবীর থালে বলি দেয়া ছাগশিশুর খণ্ডিত কালো মু- ঝনঝন শব্দে আকাশ থেকে ঝরে পড়ে। ওরা বিস্মিত হয় নিশিপক্ষিয় অন্ধকার ডানা ঝাপটানোর শব্দে। নির্বোধ শিশু ছাড়া কারও চোখে ঘুমের বিকার নেই। অন্ধকার রাতে সবার চোখ জোনাকির মতো জ্বলে আর নেভে। চিরচেনা মানুষগুলো মুখোমুখি হলে চমকে ওঠে। ওরা ভুলে যায় সেই ঝিলিকমারা চোখ সাপের নয়, বরং প্রিয় মানুষের। কারও মুখে কোনো জিজ্ঞাসা নেই। ওরা বুঝি কোনো কিছুর অস্তিত্বই অনুভব করে না, কেবল যাত্রার পূর্বরাতের আঁধার। এ আঁধার কি দুর্লঙ্ঘ্য? যাত্রাপথ কি চিহ্নহীন আদিম অরণ্য- উত্তর অজ্ঞাত। বিদ্রোহীদের ভাবের আদান প্রদান হয় ভাষার বদলে ইঙ্গিতে। ওরা সত্যি ভাষাহীন ইতরপ্রাণিতে বদলে গেছে। আপন নারীর সঙ্গে দেহমিলনের যে প্রাত্যহিক অভ্যাস কিংবা সন্তান স্নেহের জৈব তাড়না তা কি কেড়ে নিয়েছে এই যাত্রাপর্বের শেষ রাত? মধ্যরাতে ওরা পরস্পর অচেনা হয়ে যায়। পরস্পরের প্রতি বিশ্বাসও হারিয়ে যায়। একে অন্যকে হত্যাকারী বলে ভ্রম হয়। আসলে আতঙ্কে সবাই দৃষ্টিভ্রম আর মতিভ্রম হয়ে যায়।

রাত ফুরিয়ে ছায়াচ্ছন্ন আলো নামে। বাস্তুভিটা পরিত্যাগকারীগণ বিস্ফারিত চোখে প্রভাতের দুনিয়াটা দেখে। ওরা যেন মৃত্যুদ-প্রাপ্ত অপরাধী, যাদের ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে দিতে এগিয়ে আসছে জেলখানার ফাঁসুড়েগণ। ওদের পায়ের শব্দ স্পষ্ট শোনা যায়। তাই তারা নির্বিকার, অস্তিত্বহীন। অচেনা অন্য দুনিয়ায় অস্তিত্ব স্তব্ধতার ঢেউয়ের আঘাতে ডুবে আছে।

ওরা কেবল গণহত্যাই নয়, স্বাধীনতা ঘোষণা, ঘোষকের নাম এবং মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ যে গুজবের মতোই শুনেছে, সে সবও মতিভ্রমে ঘোর আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। মানুষগুলো অতীন্দ্রিয় জগতে যেন ভাসমান এবং দোলায়মান। শূন্যে ভাসছে ওরা। সেই শূন্য থেকে নেমে আসার ক্ষমতা অচেনা-অদেখা অশরীরীরা কেউ যেন কেড়ে নিয়েছে। কি ভয়ঙ্কর দুঃসময়। অপার এক দৈব সমুদ্র!

সূর্য ওঠার পূর্ব মুহূর্তে গ্রামের মানুষগুলো বাস্তুভিটা থেকে উঠোনে পা ফেলে। ওরা শ্মশান কিংবা গোরস্থানে লাশ বহনকারীদের মতো নীরব। জীবিতদের চেয়ে মৃতদের শরীরের বোঝা অধিক। তাই তারা নতমস্তক। কিন্তু বাস্তুভিটার বাইরে যে বিস্তীর্ণ শস্যভূমি তার পাশে এলেই আচমকা সমস্বরের আর্তনাদ ওঠে। জন্ম-জীবন-মৃত্যুর এই চিরচেনা দুনিয়া অদৃশ্য।

দুই শতাব্দীকাল পেরিয়ে পলাশির উদ্বাস্তুগণ দ্বিতীয় উদ্বাস্তু ভূমির সন্ধানে আদিগন্ত শস্যভূমি আর দিগন্ত রেখার ওপারে সবুজবৃক্ষের দিগ্বলয়ে দিকে স্থির দৃষ্টি ফেলে ভূমিতে হাঁটু ভেঙে বসে হাত তুলে অন্তিম প্রার্থনায় মগ্ন হয়, ‘হে পঞ্চপিতা পিতৃভূমি পরমেশ্বর, আমরা হতভাগ্য, অভিশপ্ত। তাই তোমাকে পরিত্যাগ করে চলে যাচ্ছি। তুমি আমাদের সন্তানের জন্য দিয়েছিলে নারী, খাদ্যের জন্য ভূমি। সে সব অস্বীকার করে কাপুরুষের মতো পালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু পুনরায় আমরা ফিরে আসব। হে পিতা, তুমি আমাদের শক্তি দাও, তুমি আমাদের অস্ত্র দাও, তোমার জন্য বুকের রক্ত দেবার সাহস দাও।’

তারপর সূর্যকে সাক্ষী রেখে ওরা পা ফেলে ওরা ক্রন্দনহীন, কিন্তু চোখে জল। সে জল সূর্য তাপে শুকিয়ে যাবে, এই তাদের বিশ্বাস। তাই দিগন্ত রেখার মতো দীর্ঘ কাফেলা এগিয়ে চলে। ওদের পঞ্চাৎভাগ কেবল দৃশ্যমান।

 

॥ আট ॥

জনমানবহীন মহাকালের মৃত নক্ষত্রের মতো প্রাণশূন্য এই গ্রামে রাত নামে। আর তখনই অজাগতিক প্রাণের পুনর্জাগরণ ঘটে। প্রাচীন দেহাতীত আত্মারা পলাশির পলাতক। বিগতকালের মানুষ তারা। ওদের স্মরণে আছে তারা যে প্রাচীন রাঢ় ভূমির সন্তান। আত্মরক্ষার্থে কেবল সমতটেও আগমন। তারা এটাও জানে তাদের গ্রামত্যাগী উত্তরপুরুষেরা বরেন্দ্রভূমির দিকে চলে গেছে। পরিত্যক্ত গ্রামে ওরা ফিরে আসুক এমন প্রত্যাশা তাদের। কেননা দেহাতীত হয়েও তারা ভুলতে পারে না প্রচুর বারিপাতের এই দেশকে। সমুদ্রবাতাসে তুলে আনা বৃষ্টি তাদের দান করেছে শস্য। মলয় পর্বতের মলয় বাতাস এনেছে বসন্ত। আজও তাদের স্মরণে আছে প্রচুর জলের কারণে কি চমৎকার গজিয়ে উঠত ধানের গাছ। গোধূলিতে গরুগুলো গোয়ালে ফিরলে সুখস্বপ্নে বিভোর হয়ে যেত তারা। নারীরা পুরুষের দিকে কামদৃষ্টি ফেলে চুলে মাখতো তিলের তৈল। পঞ্চপিতার এই সমতটভূমি যারা পরিত্যাগ করেছে তাদের জন্য তারা শোক করে।

এই জলা-জঙ্গলের ভূমিকে কারা শস্যক্ষেত্রে পরিণত করেছিল? তারা নয় কি? কাদের জন্য? উত্তরপুরুষের জন্য। প্রাচীন আত্মাগণ শত শত বৎসর পূর্বের পলাশির পলায়ন বিষয়ে সপ্তকা–রামায়ণ ফেঁদে বসে। এই নব্য আবাসনে এসেই তারা পঞ্চপিতার দর্শন পেয়েছিল। তাই তারা এখন পলাতক উত্তরপুরুষদের জন্য অজাগতিক কান্নায় ভেঙে পড়ে। এই কান্না শব্দশূন্য এবং অশ্রুহীন। কষ্টসাধ্য রাত ঘনিয়ে এলে প্রাচীন আত্মাগণ দৃশ্যান্তরে চলে যায়।

এবার একাত্তরের গণকবর থেকে জেগে ওঠে নিহতগণ। ওরা সংখ্যায় ছিল একচল্লিশজন। মৃত্যু তাদের গণনাকারী। বৃদ্ধ, যুবক, নারী এবং শিশু। আসলে একচল্লিশটি চলন্ত সজীব কংকাল, হাঁড়ের খাঁচা। ওরা অপেক্ষায় ছিল কখন একাদশির চাঁদ আকাশে উঁকি দেয়। আসলে চাঁদ ছিল মেঘের আড়ালে। দিবসটি ছিল পহেলা মে। শ্রমজীবী মানুষের প্রিয় দিবস। এক সময় মেঘ অদৃশ্য হয়ে যায়। তখন ঝলমল করে একাদশির বিস্ময়কর উৎপল-চাঁদ। ঠিক ফুটন্ত পদ্ম। এমন বিস্ময়ের চাঁদ আর কবে দেখেছে ওরা?

গাঁয়ের প্রথম যে মুক্তিযোদ্ধা বাইশ বছরের তাজা যুবক, যাকে ব্যায়নেটের খোঁচায় হত্যা করে অন্য চল্লিশ জন নিহতের সঙ্গে গণকবরে পুঁতে দেয়া হয়, সে নিহত প্রৌঢ় অধ্যাপকে সামনে এগিয়ে গিয়ে প্রণিপাত করে বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করে, ‘স্যার, দুনিয়ায় জীবদ্দশায় আপনি কখনও ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করবেন না, সেই কারণে পাকিস্তানি সেপাইরা আপনাকে ব্রাস ফায়ার করে হত্যা করে। কাফের শব্দটি বারবার উচ্চারণ করে দুশমনেরা আপনার লাশ গণকবরে নিক্ষেপ করে। যে ঈশ্বরের কারণে আপনাকে হত্যা করা হয়, সেই ঈশ্বরের সঙ্গে মৃত্যুর পর পরলোকেও কি সাক্ষাৎ ঘটেনি?’

অধ্যাপকের কংকাল তখন দুলে ওঠে। হাড়ে হাড়ে ঘর্ষণের শব্দ হয়। তার মাথার খুলির দু’পাটি দাঁতে এমনই শব্দ তৈরি হয় যে, মনে হয় স্টেনগান থেকে ব্রাস ফায়ার হচ্ছে। অধ্যাপকের কংকাল মুক্তিযোদ্ধারা কংকালকে উত্তর দেয়, ‘মৃত্যুর পর আমার দৃষ্টিশক্তি এমন মহাশক্তি অর্জন করে যে, আমি মহাশূন্যের বিগ ব্যাং, অন্ধকার মহাগহ্বর ছাড়িয়েও কোটি কোটি সৌরম-ল দেখতে পাই। কিন্তু কোথাও তোমাদের ঈশ্বরের সাক্ষাৎ পাইনি, তুমি নিজে কি পেয়েছ?’

মুক্তিযোদ্ধার কংকাল নিরুত্তর। কিন্তু আচমকা কারও কান্নার শব্দ হয়। নারীকণ্ঠ। কে কাঁদে? সেই ধর্ষিতা নারীÑ যে ছিল গর্ভবতী। সৈনিকের ধর্ষণের পর তার গর্ভ চিরে ভ্রƒণটিকে বের করে এনে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুন করে গর্ভধারিণীকেও হত্যা করে। গণকবরের কংকালেরা দেখতে পায় একটি নারী কংকাল, কোলে তার ভ্রƒণকংকাল। একজন কৃষক-কংকাল জানতে চায়, ‘তুমি কাঁদছ কেন? জান না মৃত্যুর পর নারী-কংকালের কান্না নিষিদ্ধ?’

‘পরকালেও নারীদের কি পুরুষের ধর্ষণ থেকে মুক্তি নেই?’ নারী কংকাল জানতে চায়।

নিরুত্তর সবাই। ঠিক তখনই তেপান্তরের দিক থেকে কংকাল-সভায় সবচেয়ে সম্মানিত কংকাল ব্রহ্মকংকাল এসে হাজির। মন্দিরে পূজা করার সময় গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। ব্রাহ্মণ-বর্ণের বলেই সে বর্ণশ্রেষ্ঠ। কংকাল-জীবনেও তাই। অপরাপর কংকালেরা তাকে প্রণিপাত করে। এবার সে ধীবর কংকালকে ডেকে বলে, ‘শোন মেছোভূত, আর্যব্রাহ্মণ্য স্মৃতিশাস্ত্র তোকে মানতে হবে এই পরকালেও, ভুলে যাসনি মৃত্যুর পরও তুই অন্ত্যজ জাতি, মৎস্য সংগ্রহ আর আহার আজ থেকে নিষিদ্ধ এই মৃতদের জাগতে।’

ঠিক তখনই পঁচিশে মার্চের রাতে যে শিল্পপতিকে হত্যা করা হয় তার কংকাল তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে কংকাল-সভায় উপস্থিত হয়। কংকাল শিল্পপতি গুরুগম্ভীর গলায় সমবেত কংকালদের উদ্দেশ্যে বলে, ‘তোমরা শোন, শ্রমিকদের জন্য ইহকালে যে বিধান, পরকালেও তাই, এই পরকালে আন্দোলন নিষিদ্ধ, কোনো দাবি নয়, কেবল আনুগত্য, অন্যথায় কংকালকে পরিণত করা হবে পিশাচে, শ্মশানে মড়া খেয়ে তবেই বাঁচতে হবে।’

এবার কংকালদের প্রেত নিঃশ্বাস পড়ে। জোরে বাতাস বইতে থাকে। সেই বাতাস কংকালের মুণ্ডে আছড়ে পড়লে চোখ আর মুখের ছিদ্রপথে প্রেত-বাঁশির শব্দ তোলে। কংকালেরা তা-ব মৃত্যু শুরু করে দেয়। তখনই এই প্রাণশূন্য গ্রামে চাঁদের আলো আরও ঘন হয়ে নামে। দূরকাছের গাছগাছালির ফাঁকে আগুনে পোড়া বাড়িগুলোর শূন্য ভিটায় প্রেতের আলো জ্বলে ওঠে। নীল আলো। কংকালদের নৃত্যও শেষ হয়। এক পলকে অদৃশ্য হয়ে যায় কংকালরা।

আকাশের চাঁদ হেলে যাচ্ছে। জোনাক কিছুটা বিবর্ণ হয়ে যায়। চারদিক স্তব্ধতা। আরও পরে নিশ্চল স্তব্ধতা ভাঙে। আকাশ থেকে নেমে আসে এমন এক অজাগতিক শব্দ, যার মধ্যে তরঙ্গ নেই। এই তরঙ্গহীন অজাগতিক শব্দের দুনিয়ায় হঠাৎ আবির্ভাব ঘটে দশটি ছায়ামূর্তির। ওদের ছায়া আছে কিন্তু অশরীরী। জন-মানবশূন্য এই বধ্যভূমিতে এরা কারা? ওরা কি জৈন তীর্থঙ্কর? হ্যাঁ, তারা। বহু শতাব্দী পেছনে ফেলে বিগতকালের এই তীর্থঙ্করদের দলটি অজাগতিক রূপ নিয়ে পরিব্রাজনে বেরিয়েছেন। তাম্রলিপ্তি, পুন্ড্রবর্ধন, রাঢ়ভূমি পেরিয়ে সমতটের বরেন্দ্রভূমি পরিভ্রমণ করেছেন। করতোয়া, আত্রাই, মহানন্দা, তিস্তা তীরবর্তী গ্রামগুলো ঘুরে ও কোথাও জৈনদের খুঁজে পাননি তারা। জৈনরা দেশান্তর কিংবা ধর্মান্তর?

কোথায় গেল জৈনরা? এরা কি কোনো দৈব বিপাক প্লাবন কিংবা মহামারীতে নিঃশেষ হয়ে গেল? প্রাচীন প্রেতাত্মারা সাক্ষ্য দেয় যে, কৃচ্ছ্রসাধনের এই ধর্ম তাদের কাছে আত্মনিগ্রহ ভিন্ন অন্য অর্থ ছিল না। জীব হত্যা নিষিদ্ধ, কীট-পতঙ্গ-কেঁচো হত্যাও মহাপাপ। শস্যভূমি কর্ষণের ফলে যে পতঙ্গ বা কেঁচো নিহত হয় তাও পাপ। তা হলে শস্য ফলবে কি করে? গৃহে খাদ্য থাকলেও অর্ধাহার বিধান। কংকালসার দেহ কি সুখ-প্রশান্তি দান করে? তাই তারা পূর্ব-পুরুষের ধর্ম ত্যাগ করে কেউ পুতুল পূজক, কেউবা ইরান-তুরান-আরবের পিরের ধর্ম গ্রহণ করেছে।

এসব সাক্ষ্য তীর্থঙ্করদের অশরীরী ছায়ামূর্তিকে ভেঙে খান খান করে দেয়। ওরা দমকা বাতাসের শব্দের মতো হাহাকার করে ওঠে। তখন তারা তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের জন মহাশোকে পতিত হয়। ঠিক তখনই একাদশির চাঁদ ডুবে যায়। রাতের শেষ প্রহরের আঁধার নামে। জনশূন্য বধ্যভূমির এই মৃত্যুর দেশে ছায়ামূর্তির ভগ্নাংশগণ অদৃশ্য হয়ে যায়।

রাত পোহায়। রোদের আলো চুষে নেয় গণহত্যার লাশের গন্ধ। গণকবরের ভেতর তিনটি গুহাপথ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ছড়ানো ছিটানো কাঁচা মাটির উপর শেয়াল কিংবা হিংস্র মাংসাশী সরীসৃপের তীক্ষ্ণনখযুক্ত পদচিহ্ন। দলা দলা মাটি আলে বাসী জমাট রক্তে তৈরি মণ্ড। নির্বিকার উড়ে যায় কাকেরা। মাংসাশী হলেও গণহত্যার দিনে মাংসের এই প্রাচুর্যের সুসময়ে ওরা অনাহার ব্রত পালন করছে।

গণকবরের তৃতীয় গুহা মুখে একটি হাত দেখা যায়। হাতের মাংস খুবল নেয়া হয়েছে। অর্ধমুষ্টিবদ্ধ আঙ্গুল। দুপুরের এই বধ্যভূমির গ্রামে রোদ দোল খায় গাছের পাতায়। ওই তেপান্তরের মাঠে রোদের মরীচিকার খেলা চলে। মরীচিকার ভেতর পা ফেলে কে যেন একজন আসছে গণকবরের দিকে। কেউ জলভ্রমে পড়েনি তো? মনে হয় কে যেন পরনের ধুতি কাপড় হঁটু অবধি তোলা, ফতুয়া গায়ে, কাঁধে গাদা বন্দুক তুলে জলভ্রমের মরীচিকার জলভেঙে এগিয়ে আসছে।

গণকবরের ভেতর মৃত্যু নিদ্রায় যারা আচ্ছন্ন হয়ে আছে, মৃত্যুর পূর্বে যার আগমনের প্রতীক্ষায় ছিল তারা তাদের কাছেই আসছেন তিনি। তার শ্বেত বসনের উপর অলৌকিক আলো ঝলমল করে। অথচ সেই বসন থেকে উঠে আসা ঘ্রাণে মৃত্যুর গন্ধ। গণকবরের পাশে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। তার দৃষ্টি কবরের তিনটি সুড়ঙ্গের অন্ধকারে গড়িয়ে পড়ে। মাংস খুবলে খাওয়া যার হাতটি সুড়ঙ্গ পথে বেরিয়ে আছে, কবরে আবৃত তার লাশটি তিনি দেখতে চান। কিন্তু তার ইচ্ছা পূরণ হয় না। কবরে মৃত্যু ঘুমে আচ্ছন্নদের উদ্দেশ্যে এবার তিনি আপন পরিচয় দান করেন, ‘আমি চট্টগ্রামের সূর্যসেন, যাকে তোমরা জানতে মাস্টারদা নামে, আমি তোমাদের একথা জানাতে এসেছি যে, ফাঁসির মঞ্চ থেকে আমার যেমনি পুনরুত্থান ঘটেছে একাত্তরের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার জন্য, ঠিক তেমনি এই গণকবরের অন্ধকার থেকে তোমাদের আত্মার পুনর্জাগরণ ঘটবে মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মার ভেতর। পুনর্জারণের সময় সমাগত, তোমরা জেগে ওঠ।’

ঠিক তখনই একটি অতি উজ্জ্বল আলোর বৃত্ত নেমে আসে গণকবরের উপর। ভূকম্পনের মতো বিশাল কবরটি কেঁপে ওঠে। অজাগতিক সূর্যসেন হাঁটতে থাকেন। তার শরীর তেপান্তরের অগ্নিময় সূর্যালোকের ভেতর অদৃশ্য হয়ে যায়। আলোর পর্দাটি তারপর দুলতে থাকে। দোলায়মান পর্দা থেকে ঝরে পড়ে অজস্র আলোর কণা।

 

॥ নয় ॥

পলাশির পলাতকদের বংশধরেরা যেদিন করতোয়া পারে আশ্রয় নেয়, সেদিনই মহাউত্থানের মহাকাল পুনরুত্থান ঘটায় ভাষা শহীদ বরকত আর গণঅভ্যুত্থানের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হকের। তাদের আত্মা গণকবরের আত্মাদের সঙ্গে প্রবেশ করে সীমান্তযুদ্ধের মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মার ভেতর। এই যে আত্মার ভেতর আত্মার প্রবেশ, তা এই জাগতের নয় বরং অতীন্দ্রিয় জগতের জটিল রহস্য। এই রহস্যের মায়াজালের ভিতরই দিনের পর দিন, রাতের পর রাত মহা বিপর্যয়ের ভিতর আঘাতের পর আঘাতে ছিন্নভিন্ন-বিচ্ছিন্ন হতে হতে নিরুদ্দেশ যাত্রীদের একটি অংশ করতোয়ার পারে পৌঁছে। আসলে এই স্থান সভ্যতা বিচ্ছিন্ন নদীর একটি আদিগন্তবিস্তারী জলমানব বর্জিত নদীর চর। যাত্রীগণ তীর্থমহিমাখ্যাত করতোয়ার স্বচ্ছ জলস্রোতে দীর্ঘদিন পর পবিত্রস্নান করে। আহা! নদী নয় তো স্বর্গের নদী অলকানন্দা। দেবতাদের স্নানভূমি।

‘বৃহৎপরিসরা পুণ্যা করতোয়া মহানদী’। মহাভারতের তীর্থযাত্রী পা-ব পুত্রগণ এ নদীতে অবগাহন করেন। যুদ্ধ পলাতকেরা এই যে পুণ্যস্নান করে তা বাইবেলের নিব যিশুর মতো। ব্যাপটিস্টদাতা পুণ্যাত্মা জন নবিত্ব লাভের পূর্বে যিশুকে পবিত্র নদী জর্ডন দরিয়ায় পুণ্যস্নান করান। তখন পবিত্র আত্মা কবুতরের রূপ ধরে যিশুর মস্তকে বসার পর তা তার আত্মায় প্রবেশ করে। কর তোয়ার পুণ্যস্নানে পঞ্চপিতা পিতৃভূমির সন্তানেরা পথিমধ্যে প্রিয়জন হারানোর শোক সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করে। কেননা পঞ্চপিতার পবিত্র আত্মা তাদের আত্মায় প্রবেশ করে সবার অজান্তে।

সে কারণেই তারা জানতে পারে চট্টগ্রামের শহীদ সূর্যসেনের পুনরুত্থান ঘটেছে, ক্রশে বিদ্ধ যিশুর কবর থেকে তৃতীয় দিবসে পুনরুত্থানের মতো নয়, বরং অর্ধ শতাব্দীকাল পর। ওরা শুনেছে গারো পাহাড়ের কোলঘেঁষে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অজ্ঞাত কোনো অরণ্যে মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিংক্যাম্পে এক প্রভাতকালে সূর্যসেনের আবির্ভাব ঘটে। নিত্যানন্দই সেই বয়ান শুরু করে পদ্মাপুরান পাঠের সুরে।

তরুণ মুক্তিযোদ্ধাগণ দেখতে পায় দীর্ঘকায় এক ব্যক্তি তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। প্রত্যেকের চোখ তখন সাপের চোখের মতো ঝিলিক দিয়ে ওঠে। দুশমনের গুপ্তচর নয় তো? কিন্তু মানুষটির মুখে হাসি। তিনি জানান তার আগমন ঢাকা সেনানিবাস থেকে। তিনি সিপাই মাসুদ। দুশমনেরা জানে গভীর রাতে অতর্কিত আক্রমণে অন্যান্য সঙ্গিদের সঙ্গে আমার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু গোলাবারুদ ফুরিয়ে গেলে কৌশলে আমি পালিয়ে আসি। আজ এসেছি তোমাদের উন্নত ট্রেনিং দিতে এবং যুদ্ধে অংশ নিতে। সাক্ষ্য হিসেবে তিনি তার দুই হাঁটু আর হাতের কুনুইয়ের দীর্ঘ ক্রোলিং করে সেনানিবাস ছাড়ার চিহ্ন দেখান। ঠিক যেমনি যিশুক্রশে বিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর তিনদিন গর্তে কবর থেকে পুনরুত্থানের পর শিষ্যদের সামনে ক্রশের ক্ষতস্থান দেখিয়ে নিজের সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।

টানা একমাস ট্রেনিং শেষ শেরপুরে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেয় মুক্তিযোদ্ধা দলটি। সারারাত চলে যুদ্ধ। শেষ রাতে যুদ্ধ থেমে যায়। পরাজিত পাকবাহিনী বেশ ক’জন সঙ্গীর লাশ ফেলে পলায়ন করে। মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ধ্বনির ভেতর সিপাই মাসুদ এগিয়ে আসেন। তিনি যোদ্ধাদের অসীম সাহসের প্রশংসা করে যা বলেন, তাতে সবাই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়ে। আসমানের দিকে তাকিয়ে সিপাহি মাসুদ বলেন, ‘বন্ধুগণ, আমি মাসুদ নই, আমি তোমাদের সূর্যসেন, ইংরেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বন্দি অবস্থায় যে ফাঁসিতে প্রাণ দেয়। আমার অতৃপ্ত আত্মা তাই বারবার ফিরে আসে ন্যায়ের যুদ্ধে। এবার আমার বিদায়ের সময় সমাগত। মনে রাখবে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ কিন্তু বিজয়ের মধ্য দিয়েও শেষ হয় না। বিদায় বন্ধুগণ। গণযুদ্ধ জিন্দাবাদ।’

নির্বাক বিস্মিত যোদ্ধাগণ দেখতে পায় সিপাহি মাসুদের দেহের রূপান্তর ঘটে একপলকে। সূর্যসেন। বিপ্লবী সূর্যসেন। সূর্যসেন হেঁটে যান আকাশের শূন্যতায় পা ফেলে। ধীরে ধীরে তার শরীর সূর্যের আলোর পর্দার ভেতর অদৃশ্য হয়ে যায়।

নিত্যানন্দের বয়ান শেষ হলে কে একজন চেরাগি ফকিরের কথা স্মরণ করে। কিন্তু নিত্যানন্দ স্মরণ করতে চায় সেই সব পঞ্চপিতার পুত্রদের, যারা যুদ্ধে গিয়ে এখনও কোনো সংবাদ পাঠায়নি প্রিয়জনদের। তারপর যখন দূর গ্রাম থেকে এই উদ্বাস্তুদের জন্য গোপনে খাদ্য নিয়ে আসা গ্রামবাসীদের দেখতে পায়, তখন এই নরক জীবনের কষ্টের কথা স্মরণ করে তারা হাহাকার করে ওঠে। এক দিকে এই নির্জন চরে পশুর মতো জীবন আর অর্ধাহার তাদের ধৈর্য্যরে সীমা ভেঙে দিতে চায়। গ্রামবাসীরা উদ্বাস্তুদের যুদ্ধের রূপকথার গল্প বলে। তবু ওরা সীমান্ত পারি দিতে চায়। ওরা সীমান্তের ওপারের রূপকথা শুনেছে। ওখানে খাদ্যের শত শত পাহাড়-পর্বত। দেবতা শিবের জটা থেকে প্রবাহিত অমৃত ধারার গঙ্গা দেবভূমি হিমালয় থেকে পতিত হচ্ছে ওই দেশের মাটিতে। ওই পবিত্র ভূমিতে পা দিলেই যেন সব দুঃখ-শোক বিলীন হয়।

খাদ্য বিতরণকারীরা নদীর দীর্ঘ চরের বালিময় চিহ্নহীন পথে হারিয়ে যায়। পূর্ণচরণ, ভবদেব, নিত্যানন্দ, গিরিশ, কামাখ্যা চরণ এবং অন্যসব উদ্বাস্তুগণ নিশ্চুপ হয়ে যায় কখনই, যখন কপালের দোষের সীমানা খুঁজেও পায় না। যখন সন্ধ্যা নামে তখন আলোহীন অন্ধকার ঝুপড়ির ভেতর নীরবতা ভেঙে ইনিয়ে-বিনিয়ে কেঁদে ওঠে গিরিশের যুবতী বৌ ভগবতী। সে তার তিন মাসের অসুস্থ মৃতপ্রায় শিশুকন্যাকে অন্ধকার রাস্তায় পরিত্যাগ করে এসেছে। গিরিশের মনে হয়েছিল শিশুটি আর জীবিত নেই। সে স্তনের দুধও পরিত্যাগ করেছে, নেতিয়ে পড়েছে বৌ’র কোলে। গিরিশ তার নিজের স্ত্রীর পথক্লান্ত শরীরকে পৃথিবীর চেয়ে ভারি এই মৃত শিশুর বোঝা থেকে মুক্তি দিতে চায়। এ তো জন্মদাতা পিতার নয়, বরং রক্ষাকর্তা স্বামীর ধর্ম।

‘আমার কাছে তুলে দে বৌ, ওটা মরে গেছে,’ বলতে বলতে স্ত্রীর কোল থেকে শিশুটিকে টেনে তুলে নেয় শোকহীন পিতা। নরকযাত্রী দলটির সবার পিছনে ছিল ওরা। অন্ধকার অজানা পথে দল থেকে হারিয়ে যাবার ভয় মৃত্যুভয়ের চেয়েও ভয়ংকর। এরই মধ্যে দু’জন হারিয়ে গেছে। হয়তো আর হারিয়ে যাওয়া দলটিকে ওরা কোনোদিন খুঁজেই পাবে না। তাই গিরিশের কাছে যখন মনে হয় শিশুটির শরীর শীতের জলের মতো ঠাণ্ডা এবং বুকে কানচেপে ধরেও হৃৎপিণ্ডের আলামত খুঁজে পায় না, সে তখন আর জন্মদাতা পিতা থাকে না, শ্মশানচণ্ডাল হয়ে যায়। কাঁই আঁধারে পথের পাশে সে একটি প্রাচীন বেলগাছের তলায় শিশুটিকে পরিত্যাগ করে। কান্নারতা স্ত্রীর মুখে এক হাতে চেপে ধরে অন্যহাতে ওকে টানতে টানতে এগিয়ে চলে। কাফেলার অনেক পেছনে ওরা। ওই পেছনেই মৃত্যুর পদধ্বনি। আতঙ্কের আঁধার।

গিরিশের স্ত্রীর কান্না দেখে পূর্ণচরণও কেঁদে ওঠে। সে তার বিবাহযোগ্য কন্যা মালতিকে হারিয়েছে। নৌকা করে নদী পার হবার পথে অন্য নৌকার একদল সশস্ত্র পুরুষ তার কন্যাকে জোর করে তুলে নেয়। নারীর বিনিময়ে প্রাণ, এই নিষ্ঠুর যুক্তিতে পূর্ণচরণ এবং অপরাপর যাত্রীরা দম বন্ধ করে পড়ে থাকে।

পূর্ণচরণের কান্না আর বিলাপ শুনে এগিয়ে আসে নিত্যানন্দ। ফ্যালফ্যাল চোখে নিত্যানন্দকে দেখে পূর্ণচরণ। নিত্যানন্দ বলে, ‘পূর্ণ রে, কান্দিস না, এখন কান্দাকাটির সময় না। যুদ্ধ থামলে দেশে ফিরে দিন রাত কান্দিস।’

পাশের ঝুপড়ির জহিরুল শেখ পূর্ণচরণের ঝুপড়িতে প্রবেশ করে, কিয়ামতের কথা, হারিয়া দোজখের কথা বলে, আর বরে আল্লাহ রাসুলের বান্দার ঈমান পরীক্ষার কথা। শেষে বলে, ‘পূর্ণভাই, কান্দা থামা, খোদা বেরাগী হবে, মেয়েকে ফিরা পাবি, খোদার উপর ছেড় দে ভাই।’

হ্যাঁ, জহিরুলের খোদা আর পূর্ণচরণের ভগবান, এই জটিল রহস্যের ভেতর হারিয়ে যেতে যেতে এক সময় পূর্ণচরণের কান্নাও ফুরিয়ে পূর্ণচরণ অপলক তাকিয়ে থাকে জহিরুলের চোখে। তখন আকাশে চাঁদ উঁকি দিয়েছে বলেই জোনাকের আভা পড়েছিল জহিরুলের চোখে-মুখে। পূর্ণচরণের মনে হয় জহিরুলের চোখের মনি দুটো এক জোড়া পূর্ণিমার চাঁদ। জীবনে এই প্রথম জহিরুলকে চিনতে চায় পূর্ণচরণ। হাজার বছর বংশপরমপরায় পাশাপাশি গ্রাম-পাড়ায় বসবাস করছে, বিবাদ দ্বন্দ্ব যে হয়নি এমন নয়, তবে অবিশ্বাস বা ঘৃণা করেনি কোনকালে। সুখে-দুখে, পালা-পার্বনে, প্রতিদিনের জীবনে ভালোবাসার অভাব হয়নি। তারপরও মনে হয় পূর্ণচরণ সম্পূর্ণ চিনতে-বুঝতে পারেনি জহিরুল শেখকে। কোথাও একটা ফাঁক থেকেই গেছে হাজার বছরেও। জটিল রহস্যময় সেই ফাঁক। দুর্ভেদ্য।

সত্যি তাই। পূর্ণচরণরা কি জহিরুলদের চিনতে পেরেছে? জানতে পেরেছে? জহিরুলরা কি এইভাবে জেনেছে যুগযুগান্তর প্রতিবেশি হয়ে, বসবাস করেও, পূর্ণচরণদের? একে অন্যের আল্লাহ-ভগবান, পরব, পূজা, রোজা সবই তো দূর থেকে দেখা। মনের ভিতর যে খোদা আর ভগবান তা কি তারা একে অন্যের বিশ্বাসের গভীরে প্রবেশ করে চিনতে পেরেছে? কোনদিন চেনার চেষ্টা করেছে? চেনা-জানার ভেতর অদৃশ্য যে ফাঁক রয়েছে তা কি ওরা বুঝতে পেরেছে পরস্পরের ঘরে বসে রান্না ভাত খেয়েও? একটি যুদ্ধ, ভয়ংকর মানবিক বিপর্যয়, সেই সত্যের, সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দুটো মানুষকে আজ দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তারা বুঝতে পারে এতকিছুর পরেও তারা একে অন্যের কাছে অচেনাই রয়ে গেছে। সেই অক্ষমতা, সেই অপরাধবোধ তাদের দুটো মানুষের চোখে জল গড়ায়। প্রশ্নটা ওদের গোলকধাঁধায় ঠেলে দেয়।

রাতে ঘুম আসে না জহিরুলের। চাঁটাইয়ের বিছানার তলায় করতোয়া নদীর চরের ঠান্ডা বারি। কাশফুল গাছের বেড়ার ফাঁকে চরের জোনাক লেপটে আছে। গাছ-গাছালি শূন্য কাশবনে ছাওয়া চা বাতাস দোল খায়। অনতিদূরের করতোয়ার জলে হয় তো ঢেউ খেলে। সেই বাতাস নদীর জলে ভিজে এসে চরের কাশ ঝোপে লুটিয়ে পড়ছে। তারই মৃদু শন্ শন শব্দ শুনতে পায় জহিরুল। আর কতদিন, পোড়া ভিটে আর গণকবরের গাঁয়েই ফিরে যাবে সে। আবার নতুন ঘর বানাবে। নিত্যানন্দ রাও ফিরে যাবে। সে তাদের হিন্দুস্থানে যেতে দেবে না। ওই দেশে গেলে কেউ আর ফেরে না। সেই ছোটবেলা, মনে আছে আজও, দেশ ভাগের পর যারা গ্রাম ছেড়ে গেছে তারা কি আর ফিরে এসেছে? না, ফেরেনি। ওই দেশটা রাক্ষসী, মানুষকে গিলে খায়। যে যায়, সে আর ফেরে না। ইচ্ছে থাকলেও আর ফেরা হয় না। মরণকালে সেই আক্ষেপটাই টিকে থাকে। আর সব শেষ হয়ে যায়।

 

॥ দশ ॥

সন্ধ্যা নামলে গিরিশের বৌ ভগবতীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় গেল বৌটি? ডাকাডাকির পরেও সাড়া মেলে না। গুজব রটেছে, এই করতোয়ার চরে জলপেত্নিরা ঘুরে বেড়ায়। প্রতি বর্ষায় নৌকাডুবিতে যে সব মেয়ে মানুষের অপমৃত্যু ঘটে তারা সবাই জলপেতিœ হয়ে যায়- জনশ্রুতি এই, কোন এক জেলে যুবককে এই চরেই গলার নলি ছিঁড়ে খুন করে রক্ত চুষে খেয়েছিল এক জলপেত্নি। যুবক জেলের গলায় দাঁতের দাগ মিলেছিল। বোকা জেলে বুঝতে পারেনি। একা অমাবস্যা রাতে মাছ ধরতে এসে পেত্নি ফাঁদে ধরা দেয় সে। আকাশে সে রাতে চাঁদ না থাকলেও তারা ছিল। গাছগাছালি শুন্য চরে তারার আলোয় হঠাৎ জেলের সামনে এসে দাঁড়ায় জলপেত্নি সুন্দরী যুবতীর বেশে। সে জানায় যুবক জেলেকে সে চেনে এবং জলবাসে। স্বামীকে ফাঁকি দিয়ে গাঙের পাড়ে তার খোঁজেই এসেছে সে তাই।

বোকা জেলে পেত্নি কথায় বিশ্বাস করে। সে ভেবেছে হয়তো এই যুবতী বৌ তাকে গাঁয়ে মাছ নিয়ে ফেরি করতে দেখেছে। লোভ সামলাতে পারেনি। পেত্নির মিলনের আহ্বানে সাড়া দেয়। পাশে যেতেই পেত্নি তাকে দু’হাতে জাপটে ধরে। একি! বৌটির শরীর মরা মাছের মতো ঠাণ্ডা কেন? শরীর থেকেও মাছের গন্ধ ছুটছে। সে তখন বুঝতে পারে বৌটি মানুষ নয়, জলপেত্নি, তখন পালবার পথ ছিল না। পেত্নির পেশির প্রচ- চাপে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। জলপেত্নি তার বুকে চরে বসে বাঘের থাবার মতো নখ দিয়ে গলা ছিঁড়ে ফেলে এবং দাঁত বসিয়ে দেয় রক্ত নেমে আসা গলায়। পরদিন জেলেরা তার মৃতদেহ গাঙের চরে পড়ে থাকতে দেখে। প্রাণ শূন্য। শরীর রক্তশূন্য।

তবে কি করতোয়ার জলপেত্নি তুলে নিয়ে গেছে ভগরতীকে? বহুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর নদীর কিনারায় অজ্ঞান অবস্থায় ভগবতীকে খুঁজে পাওয়া যায়। ঝুপড়িতে তুলে আনার অনেক্ষণ পর জ্ঞান ফেরে ভগবতীর। সে তখন দাবি করে নদীর দিকে সে তার রাস্তায় ফেলে আসা মৃত সন্তানের কান্নার শব্দ শুনেছে। সেই কান্নার শব্দ অনুসরণ করতে করতে সে নদীর তীরে এসে পড়ে। সে এমনও বলে, জলের কিনারে তার সন্তানকে বসে থাকতে দেখেছে। বিড়বিড় করে ভগরতী বলে, ‘আমি আমার মেয়েকে বুকের দুধ খাওয়াতে গিয়েছি, কি ক্ষুধা তার, কতদিন দুধ পায়নি! আমার বুকে অনেক দুধ জমেছিল। দুধ খাওয়ার পর আমার মেয়ে নদীর জলে নেমে হেঁটে হেঁটে কোথায় যেন হারিয়ে গেল।’

গিরিশ তাকে বুঝায় এসবই তার মতিভ্রম। তার মেয়ের মৃত্যু ঘটেছে। আবার অন্য মনে ভাবে, হয়তো মৃত মেয়ের আত্মা নতুন রূপ নিয়ে মায়ের বুকের দুধ খেয়ে গেছে। এই অতৃপ্ত শিশু মাকে মুক্তি দেবে না। তাই গিরিশ বলে, ‘বৌ, তোর হারানো মেয়ে একদিন তোর পেটে আবার ফিরে আসবে। যুদ্ধ শেষ হলে আমরা গাঁয়ে ফিরে যাব, তুই, পঞ্চপিতার ইচ্ছায় আবার মা হবি। তিনি চাইলে কি না হয় বল?’

‘যে যুদ্ধ আমার বুকখানি খালি করেছে তাকে পঞ্চপিতা যেন ক্ষমা না করেন, আমি অভিশাপ দিলাম’, ভগবতীর কান্না থামে, থামে না মনস্তাপ। মনস্তাপের ভিতর কতনা কথা।

তারপরও তার ঘুম আসে। করতোয়ার ভাটার স্তব্ধ জলের যত ঘুম। ঘুমের ভিতর সে স্বপ্ন দেখে। বসন্ত বউরি পাখি হয়ে মেয়ে ফিরে আসে মায়ের কাছে। মাথায় লাল ফোঁটা শরীর ঘন সবুজ। সেই পাখি মাকে দেখে। বারবার দেখে।

রাত পোহালে গৃহহারাদের বস্তিতে রূপ কথা চাল-জল নিয়ে আসা ভিন গাঁয়ের মানুষগুলো। প্রাচীন লোকটি হারানো এক পুঁথির বয়ান বলে যায়। সেই পলাশির যুদ্ধের কথা। নবাব সিরাজের কথা। আর বলে অন্তিম যাত্রার কথা। বলে, কিভাবে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তারা। এই জনশ্রুতি তারা বংশপরমপরা স্মৃতিতে বয়ে বেড়াচ্ছে। বিচ্ছিন্ন দলটিকে যে পির-আওলিয়ার সঙ্গে এসেছিল, তার কথা পাড়ে। কিভাবে ধর্ম বদলে পির তাদের মুসলমান করে দেয়, তাও জানায়।

সেই পিরের নামে শপথ নিয়ে প্রাচীন ব্যক্তি বলে, সেই পিরবাবা কবরের ভিতরও জাগ্রত। স্বপ্নে তার দ্বারাই আদিষ্ট হয়ে তারা করতোয়ার চরে এই ঘরছাড়াদের খুঁজে পায়। তারই নির্দেশে খাদ্যের যোগান দিচ্ছে। এ যেন কুদরতি কিসসা।

কেন ছুটে যাচ্ছে, তাদের দিকে ফিরে না-তাকিয়ে করতোয়ার চরে আশ্রয় নেয়াদের কাছে কেন আসা? এ কোন খেলা?

‘এর শানে-নজুল আমরা জানি না, পির বাবার ইচ্ছাই পূরণ করছি’, প্রাচীন ব্যক্তি এমনটাই দাবি করে।

আর তখনই স্তব্ধতা ভেঙে নিত্যানন্দ হাউমাউ কেঁদে ওঠে, ‘আমরাও পলাশির পলাতক। আমরা শুনেছি আমাদের দলবিচ্ছিন্নদের এক দরবেশ উদ্ধার করে তার অনুগামী করেছিল, তারা কোথায়? তোমাদের পূর্ব পুরুষেরাই কি ছিল সেই হারানো কাফেলা?’

তখন কি এক গায়েবি শক্তির ইঙ্গিতে চারদিকে কান্নার রোল উঠে। প্রতিটি মানুষ যেন বর্ষা প্লাবিত উত্তাল ঢেউয়ের করতোয়ায় ডুবতে থাকে। একটা প্রবল ঝড় ওঠে। যেন সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। বুঝি নিঃস্ব হয়ে যায় ঘরছাড়াগণ। একটা জিজ্ঞাসার প্রবল ঢেউয়ের আঘাতে তারা জ্ঞানশূন্য হয়ে যায়। ভিনগাঁ থেকে আগতগণ এবং ঘড়ছাড়াগণ বাক্যহারা। একি পঞ্চপিতা আর কবরের ভেতর জাগ্রত দরবেশের জটিল কোনো খেলা? শত শত বছর পর পথহারা বিচ্ছিন্নদের সঙ্গে পুনর্মিলন? পুনর্মিলনের এই কি রহস্য?

একি বাইবেলের সেই ভ্রাতার ভাগ্য, যে মরুভূমিতে হারিয়ে গিয়েছিল এবং হারিয়ে যাওয়া ভ্রাতা তার হারানো ভেড়ার বদলে ভেড়া পেয়েছিল, ঘরছাড়াগণ কি পাবে? পশুদের তারা স্বেচ্ছায় পরিত্যাগ করেছিল শস্যভূমি পরিত্যাগের মতো। কিন্তু পোষা কবুতরেরা নিজেরাই প্রতিপালকদের পরিত্যাগ করে। কবুতরেরাও কি দেশান্তর?

কয়েক মুহূর্তের ভেতর এই মহামিলন চোরা অবিশ্বাস আর সন্দেহের গোলকধাঁধা তৈরি করে। এই যে দুটি জনগোষ্ঠী একটি যুদ্ধের ভিতর দিয়ে একে অন্যকে আবিষ্কার করে, এতে সত্যমিথ্যা দোল খায়। কেননা বিচ্ছিন্ন নবাব সময়ের কোনো সাক্ষ্য নেই। যা আছে তা হচ্ছে জনশ্রুতি আর কিংবদন্তি। কেননা ওরা দেখতে পাচ্ছে কেবর ধর্মেই নয়, পোশাকে এবং ভাষায়ও তারা বদলে গেছে। উত্তরাঞ্চলে আর দক্ষিণ অঞ্চলের ভাষার ভেদ। সমতটের বাংলা আর পুন্ড্রবর্ধনের বাংলা মুখের বুলি আলাদা। এ যেন বাইবেল বর্ণিত ‘বাবিলে ভাষাভেদ।’

‘সমস্ত পৃথিবীতে এক ভাষা একরূপ ভাষা ছিল। পরে লোকেরা পূর্বদিকে ভ্রমণ করিতে করিতে শিনিয় দেশে বসতি করিল। পরে এক নর ও উচ্চগৃহ নির্মাণ করিল এবং ভূমন্ডলে ছিন্নভিন্ন হইল। নীচে যাহারা ছিল তাহাদের সঙ্গে উচ্চ বসবাসকারীদের ভাষার ভেদ জন্মাইল। অসন্তুষ্ট সদাপ্রভু মনুষ্য সন্তানদের ভাষা ভেদ জন্মাইলেন। ফলে একজনের ভাষা অন্যজন বুঝিতে পারিল না। এইভাবে ঈশ্বর সমস্ত পৃথিবীর ভাষার ভেদ জন্মাইলেন এবং ভূমণ্ডলে পরস্পর হইতে বিচ্ছিন্ন করিলেন।’ [ওল্ড টেস্টমেন্ট, বাইবেল]

তবে কি তারা অভিশপ্ত জাতি? তা না হলে তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হলো কেন? কেন, পরস্পরের ধর্মবেধ আর মুখের বুলির ভেদ সৃষ্টি হলো কেন? এমন ভাবনার ভেতর হঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে আসে। এতক্ষণ মহামিলেনের যে উচ্ছ্বাস বইছিল তা হঠাৎ থেমে যায়। তারা পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করে। এ যেন বোবা এবং প্রাণশূন্য দৃষ্টি। ঠিক তখনই নিত্যানন্দের আদি পুরুষদের কথা মনে পড়ে। কাকেশ্বর, ধরিত্রী দাস, দমনক, চণ্ডরব আর নীলকণ্ঠ যেন ছায়ারূপ কায়া হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। কেবল নিত্যানন্দ নয়, ঘরছাড়াগণ কোন এক যাদুস্পর্শে ঘোরাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ওরা স্পষ্ট দেখতে পায় আদি পুরুষেরা তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। সেই আদি পিতাগণ সমস্বরে অতীন্দ্রিয় এক দুনিয়া থেকে যেন বলছেন, ‘প্রপুত্রগণ, তোমরা ধন্য, কেন না তোমাদের বিচ্ছিন্ন আত্মা আর রক্ত আজ এক মহামিলনের মধ্য দিয়ে পবিত্র হলো। তোমরা আনন্দ কর, কাউকে অবিশ্বাস করোনা। নিজেদের এবং অপরদের ধর্ম আর সুখের বুলিকে ধন্য কর। তোমরা ধন্য।’

এমনটাও কথা হয়, রক্ত সম্পর্কের বাস্তুহারাদের আগতগণ নিজ গ্রামে নিয়ে যাবে এবং উৎসব করবে। বাস্তুহারাগণ রাজি হলেও পরিত্যক্ত ভিট বাড়িতে ফিরতে ব্যাকুল। কিন্তু বহুদূর থেকে ভেসে আসা কামানের অস্পষ্ট গর্জনে ওরা ভয় পেয়ে যায়। এমনও প্রত্যাশা তাদের, বাস্তুহারাদের যে প্রিয়জনেরা যুদ্ধে গেছে তারা ফিরে আসুক এবং সঙ্গে থাকুক। তারপর যাত্রা।

পথিমধ্যে লুণ্ঠিত কন্যার পিতা চোখের পাতা ভিজিয়ে তার হারানো কন্যার কথা পাড়ে। সে রামায়ণের বনবাস কালে রামচন্দ্রের স্ত্রী রাবণ কর্তৃক অপহৃতা সীতাদেবীর দুর্দশার কথা বলে প্রলাপ বকে। যদি কোন দিন তার কন্যাকে মুক্তিযোদ্ধারা উদ্বার করে ফিরিয়ে দেয় তবে কি সে তাকে গ্রহণ করতে পারবে? সতীত্ব হারানোর সন্দেহে অগ্নি পরীক্ষা করবে না কি সে? যদি পরীক্ষায় হেরে যায় কন্যা, তবে কি পিতা তাকে হত্যা করবে? অস্বীকার করবে? যিশুকে মৃত্যুর পূর্বে শিষ্যের অস্বীকারের মতো?

একদিকে গৃহহীন আর স্বজন হারাদের মহাশোক এবং অন্যদিকে বহু শতাব্দী পর বিচ্ছিন্ন রক্তধারার সঙ্গে পুনর্মিলনের আনন্দে এক মহাঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে ওরা। আচ্ছন্নতা কাটলেই ওরা সিদ্ধান্তে আসে যে, পলাশির সেই আদি মহাযাত্রা যা ছিল স্বর্গ তেকে মর্ত্যে বিতাড়িত আদম-হাওয়ার অজানা মর্ত্যযাত্রার মতো অনিশ্চিৎ এবং দুঃখময়, স্মৃতিধরেরা সেই প্রাচীন কিংবদন্তি বলবে পরস্পর সপ্তদিবস সপ্তরাত। ফুরাবে না, সে এক মহাকাব্য, মানুষের দুর্ভোগ অথচ নতুন স্বপ্নের হাাজর পৃষ্ঠার কাব্যকথা। পঞ্চপিতা পিতৃভূমি পরমেশ্বর তার সাক্ষী থাকবেন। একটি জনগোষ্ঠীর সেই রূপকথা ফুরাবে না, হাজার আরব্য রজনী ফুরালেও।

 

॥ এগার ॥

পঞ্চপল্লবে আচ্ছাদিত এই গ্রম। আম্র, অশ্বত্থ, বট, পাকুড় আর যজ্ঞডুমুর। এই পঞ্চ বৃক্ষের সবুজ পল্লব। তাছাড়া রয়েছে পঞ্চবটী। অশ্বত্থ বট, বেল, আমলকী আর অশোক বৃক্ষ রচিত অরণ্য। পঞ্চবটী আর পঞ্চপল্লবের সন্তানেরা বিচ্ছিন্ন রঞ্জধারার পুনর্মিলনের উৎসব শেসে যুদ্ধবিজয়ের বাজনার দূরাগত ধ্বনি শুনতে শুনতে পরিত্যক্ত গ্রামে ফিরছে। সঙ্গী হয়েছে বিধর্মী অথচ রক্ত সম্পর্কে জ্ঞাতি ভ্রাতাগণ। কি কি সঙ্গে করে এনেছিল, আর ফেরার সময় কি কি ফেলে যাচ্ছে করতোয়ার বালিময় নির্জন চরে, যাত্রীগণ তা নিয়ে বলাবলি করছে। উলুখাগড়ার ঝুঁপড়ি, মাটির লালভাঙা বসনপত্র, জীর্ণ-ছিন্ন কিছু বসন। আর কি? ক’মাসের গাঙের বিশাল চরার মতোই চিকমিক স্মৃতি। বর্ষা আসলে তখন যদি বন্যা হয় তবে এই চর হারিয়ে যাবে জলের তলায়। বন্যার স্রোত ভাসিয়ে নেবে সব। হয়তো নতুন বালির ঘন জমাট তলায় চিরদিনের মতো হারিয়ে যাবে স্মৃতির সব চিহ্ন। তাই যাত্রিগণ বারবার ফিরে দেখে স্থানটিকে। কারও কারও মনে হয় করতোয়ার এই তীর্থপটে পবিত্রস্নান শেষে পাপ মক্ত হয়ে ওরা ঘরে ফিরছে। ওরা শুদ্ধ শরীরের মানুষ। পাপ শূন্য।

হারানোর বুঝি কিছু নেই। কেননা পঞ্চপিতার দান করা ভূমিতে ফিরছে তারা। তাড়া আছে। প্রবল উত্তেজনা আছে মনে। হঠাৎ তাদের মনে হয় ওই যে সঙ্গী হয়েছে চারজন যুবক, চালের বস্তা মাথায়, তারাই বড় প্রাপ্তি। একটি যুদ্ধ চিরদিনের মতো হারানো অন্ধকার অতীত রক্ত সম্পর্কের সঙ্গে পুনর্মিলন ঘটিয়ে দিয়েছে তাদের। দুনিয়ায় এমন প্রাপ্তি আর কিসে হয়? নিশ্চয়ই অন্য কিছুতে নয়। এটা ওদের বিশ্বাস।

পথ চলতে চলতে চারজন সঙ্গীর একজন বলে, ‘নিশ্চয়ই আমরা বাবা দরবেশের ইচ্ছায় তোমাদের গ্রাম চেনার জন্য কিছু খাদ্য সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি। বাবা দরবেশ কবর থেকে সবই দেখছেন।’

পূর্ণচরণ কেমন ঘোরের মধ্যে পড়ে যায়। অদৃশ্য কেউ যেন তার কণ্ঠে বসে বলে দিচ্ছে, ‘তোমাদের বাবা দরবেশ হচ্ছে আমাদের দেবতা শিব, মিথ্যা হলে আমার জিহ্বা পচে যাবে।’

তখন চারজন যুবক সঙ্গীর একজন বিড়বিড় করে রামাই পণ্ডিতের শূন্যপুরাণ পাঠ করে-

ধর্ম হৈলা যবনরূপী শিরে পরে কাল টুপী

হাতে ধরে ত্রিকচ কামান

ব্রহ্ম হৈলা মুহম্মদ বিষ্ণু হইলা পেগম্বর

মহেশ হইলা বাবা আদম

দেখিয়া চণ্ডি তা কী তেঁই হইল হায়া বিবি।

তখন বিদ্যুতের ঝলক ছড়িয়ে পড়ে যাত্রীদের শরীরে-চেতনায়। তারা সঙ্গী বিধর্মী অথচ আপন রক্তবাহী তার যুবকের মুখের দিকে তাকায়। আচমকা অচেনা একটি ঢেউ আছড়ে পড়ে তাদের উপর। একি অভিন্ন রক্তধারার ঢেউ? সেই ঢেউ ডুবিয়ে দেয় ধর্মের ভেদ। ধর্মে ওরা আলাদা, কিন্তু অভিন্ন জিন আর রক্তধারার অধিকারী। সেই রক্তধারা ফুটন্ত লাল জবাফুলের গাছ হয়ে তাদের চলার রাস্তার দু’ধারে বাতাসে দোল খায়। সেই রক্ত জবা ফুলই চিনিয়ে নিচ্ছে পথ। ঠিক যেমনি ঘরে ফেরার আগের দিন ওরা হারানো বংশধরদের গাঁয়ের পথে হাঁটতে গিয়ে রক্তজবা ফুলে ছাওয়া পথ দেখেছিল। কি ফুল, আর কি ফুল, বাতাসে দুলছে।

সেদিন কি ঘটেছিল ওই গাঁয়ে? বাস্তুহারাগণ ওই গাঁয়ে পৌঁছলে অসময়ে আজানের ধ্বনি পড়ে। সারা গাঁয়ে কোলাহল ওঠে। দুই শতাব্দী পর হারানো বংশধরেরা। ফিরে এসেছে আপন রক্তের ঠিকানায়। কেউ বলে দেয়নি। রমণীগণ আজানের আওয়াজ না-থামতেই উলুধ্বনি দিয়ে ওঠে। আজান এবং উলুধ্বনি একাকার হয়ে যায়।

করতোয়া চরের স্মৃতির ভেতর হাঁটছে মানুষগুলো।। পথ সুগম নয়; বরং দুর্গম। যুদ্ধশেষের দেশ। পথ-ঘাট সাঁকো, খেয়া, রেল, নদীপথ সব লণ্ডভণ্ড। পদতল ভরসা। রাস্তার দু’ধারের গাঁয়ের যুদ্ধ পলাতকেরা ঘরে ফিরেছে। ভিটে পোড়া। এমন কোনো বাড়ি নেই যেখানে নতুন কবর নেই। এ যেনো কবরের দেশ। একটি টিনের চালের আধাখোলা প্রাইমারি স্কুলের পাশে এলেই সন্ধ্যা নামে। কাফেলাটির রাত্রি যাপনের ঠিকানা। কিন্তু ঘরে ফেরার তাড়না বড় অসহ্য।

রাত নামে। চাঁদহীন কাঁই আঁধারের রাত। চিড়ে-মুড়ি সঙ্গের পানীয় যা ছিল তাতেই পথক্লান্ত মানুষগুলোর ভরসা। রাত গভীর হয়। একফালি চাঁদ উঁকি দিয়েই দ্রুত কালো আসমানে হারিয়ে তলিয়ে যায়। এ চাঁদ বড় কৃপণ। দয়া নেই। যুদ্ধশেষের এই কবরের দেশটার প্রতি বুঝি মমতাও নেই। দূর থেকে আচমকা গুলির আওয়াজ ভেসে আসে। দুরাগত গুলির শব্দ ক্রমেই নিকটবর্তী হতে থাকে। স্কুল ঘরে আশ্রয়প্রার্থীগণ জেগে ওঠে। ওদের চোখে চোখে জোনাকির ঝিলিক। ওরা ভয়ার্ত। যুদ্ধশেষের দেশে পুনরায় যুদ্ধ কেন? ওরা পরস্পর জড়াজড়ি হয়ে দৃষ্টি ফেলে আছে কাঁই-আঁধারের ডোবা সামনের মাঠ আর শূন্য ফসলের ক্ষেতে। ওখানে সশস্ত্র একদল যোদ্ধার ছায়া মূর্তি ছুটাছুটি করছে। গুলি ছুড়ছে। অস্ফুট আর্তনাদের শব্দ। কিন্তু বাতাস মৃদু বইলেও তা ছির শীতল। ছায়ামূর্তিদের দম ফেলার শব্দ বাতাসে ভাসে। বাতাস আরও শীতল হয়ে ওঠে। এবং কালচে ঘন।

আচমকাই গোলাগুলি থেমে যায়। আশ্চর্য এই, ছায়ামূর্তিগুলো পলকেই অদৃশ্য হয়ে যায়। চারদিকে মৃত্যুর স্তব্ধতা নামে। মাটির পতঙ্গদের থেমে থেমে ডাক শোনা যায়। এক সময় তাও থেমে যায়। ভয়ার্তগণের নিদ্রাশূন্য রাত কাটে। রাত পোহালে দূর কাছের মানুষেরা স্কুল ঘরে মানুষের আলামত শুনে ছুটে আসে। ওদের গাঁয়ে যুদ্ধশেষের দেশের দুর্ভিক্ষের ঘ্রাণ। তবু তারা ওই দূরযাত্রীদের জল-মুড়ি খেতে দেয়। রাতে ছায়ামূর্তিদের যুদ্ধের রূপকথা শুনে তারা ফিসফিস স্বরে যা জানায় তার মর্মার্থ হচ্ছে, এক ভয়ংকর যুদ্ধ। তিনমাস পূর্বে এখানে মুক্তিযোদ্ধা আর হানাদারদের যুদ্ধ বেঁধেছিল। দু’পক্ষেরই বহু সৈন্য মারা পড়ে। তারপর থেকেই গ্রামবাসী মাঝেমধ্যে এখানে ভৌতিক যুদ্ধের শব্দ শুনতে পায়। তারা বিশ্বাস করে যেহেতু মৃতগণ জানাজা ছাড়াই গণকবরে প্রবেশ করে যুদ্ধের দু’দিনপর, তাই তাদের প্রেত ছায়ামূর্তি ধরে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।

তিনদিন তিনরাত ক্রমাগত পায়ে হেঁটে পঞ্চপিতার সন্তানেরা গাঁয়ে সীমানায় পা ফেলে। এরই ভেতর বাস্তুত্যাগীরা যে যার ভিটায় ফিরে এসেছে। বাঁশবনে শব্দ হয়, পুড়ে ফেলা ভিটায় পুনরায় চৌচালা, দু’চালা ঘর ওঠবে। বাঁশ, বেত, শন আর তালপাতার। গৃহনির্মাণ বিদ্যায় মানুষ আর পাখিরা এক হয়ে যায়। নিত্যানন্দ, পূর্ণচরণ আর গিরিশেরা গাঁয়ে ফিলে প্রতিবেশীগণ ছুটে আসে। ভগ্ন শরীর, জীর্ণ বস্ত্র, কংকালের মতো মানুষগুলো গাঁয়ে ফেরার পর অপরাপর কংকালসার মানুষগুলো তাদের চিনতে ভুল করে না। দৃষ্টি আর স্মৃতি তাদের বিভ্রম ঘটায় না।

সবার মুখে রূপকথা। দৈত্য-দানবের গল্প। শ্রোতা নেই, সবাই বক্তা। যে যার দুর্ভোগ আর মৃত্যুর সংবাদ বাতাসে ছড়িয়ে দেয়। শেষে হারানো মানুষ আর গৃহপালিত পশু-পাখির শোকে হাজাকার করে ওঠে। এ যেনো আরব্যরজনীর গল্প। ফুরাতে চায় না। বুঝা যায় এই দুঃসময়ের স্মৃতি ওরা কোনোকালে ভুলবে না। বংশ পরম্পরায় মনে রাখবে। অথচ যুদ্ধের কথা বললেও আশ্চর্য, স্বাধীনতার কথা বলে না। ক্ষণ মুহূর্তের জন্য ওরা স্বাধীনতাকে ভুলে যায। কেননা দুর্ভোগ, মৃত্যু, গৃহদাহ আর উদ্বাস্তু-যাত্রা মানুষগুলোকে রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ আর শব্দের মতো পঞ্চগুণে দগ্ধ করেছে, কিন্তু স্বাধীনতাটা ঠিক ঈশ্বরের মতো, দেখাও যায় না, স্পর্শও করা যায় না। এ যেন স্বপ্নে দেখা সরল সমুদ্রে লুকানো মুক্তো।

মনে হয় বহু শতাব্দী পর মানুষগুলো ঘুমের বিছানায় অচেতন হয়ে পড়ে। এত সুখ নিদ্রা নয়, যেনো মৃত্যুর পূর্বের দীর্ঘ অচেতন-আচ্ছন্নতা। কিন্তু যাদের মৃত্যুর মতো নিদ্রা-আচ্ছন্নতা স্পর্শ করতে পারেনি, তাদের একজন পূর্ণচরণ। হস্তান্তরের দু’জন বৃদ্ধ জেলে দূর গ্রাম থেকে তার অপহƒতা কন্যা মালতিকে নিয়ে হাজির হয়। পিতা চিনতে পারে না কন্যাকে। কন্যাতো নির্বাক-নির্বিকার। মালতির শরীর কংকালসার, চোখ জোড়া বিস্ফারিত, সারা শরীর ময়লায় ছোপছোপ, জীর্ণ শাড়ি। ভয়ংকর বিস্ময় এই, ওর শরীরের সব মাংস এক জায়গায়ই জমাট বেঁধে বিশাল স্তূপ হয়ে আছে। সেই জায়গাটির নাম উদর। গর্ভভূমি। যেন সব কিছুই যাদুবিদ্যার দুনিয়ার বিষয়। জটিল বিষয়।

বৃদ্ধ জেলেরা পূর্ণচন্দ্রকে জানায় তার মেয়েকে তারা ঘাটে বাঁধা জেলে ডিঙির পাঠাতনে অজ্ঞান অবস্থায় দেখতে পায়। তার শাড়ি এবং পাটতন ছির রক্তে চটচটা। জ্ঞান ফিরলেই তারা ওকে জেলে পাড়ায় নিয়ে আসে এবং সব বৃত্তান্ত জেনে নেয়। জেলেরা চেষ্টা করেছির যুদ্ধ চলাকালনি মালতিকে পিতার কাছে ফিরিয়ে দিতে। শত বিপদ মাতায় নিয়েও গ্রামে এসেছিল জেলেরা। দেখতে পায় গ্রামশূন্য। তাই যুদ্ধ থেমে যাবার অপেক্ষায় থাকে। অথচ যুদ্ধ থামতে নয়টি মাস কেটে যায়। যেন হাজার বছর।

পিতা চূর্ণচরণের কাছে ঘরে ফেরা আপন ঔরসজাত কন্যা অস্ত্রহাতে উদ্ধত পিতৃঘাতক হয়ে যায়। পূর্ণচরণ মৃত্যু ভয়ে ভীত। ভয়ার্ত গলায় মালতিকে সে নানা প্রশ্ন করে। মেয়ে নির্বাক। জেলেরা জানায় ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের দিন যে বিজয় দিবস আসে, সেদিনই এই সংবাদ শোনার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ বাকরুদ্ধ হয়ে যায় মালতি। কেবর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। পিতা পূর্ণচরণ সারা বাড়ি এবং গ্রামে কেবল মৃত্যুর ঘ্রাণ খুঁজে পায়। গর্ভবতী কুমারী কন্যা যে মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে জন্মের চিহ্ন নিয়ে তার সামনে দাঁড়াবে, এ ছিল তার বোধ এবং বিশ্বাসের অগম্য। সে একবারই মাত্র আর্তনাদ করতে পেরেছিল, কিন্তু কাঁদতে পারেনি। ঈশ্বর তার চোখের গাঙে এক বিন্দুও জল অবশিষ্ট রাখেনি।

 

॥ বার ॥

সেই কবেকার কথা। পূর্ণচরণ সবে কৈশোর অতিক্রম করছে। সাত মাইল হেঁটে গাঁয়ের বন্ধুদের সঙ্গে নদী পেরিয়ে খ্রিস্টান পাড়ায় গিয়েছিল ‘যিশু লীলা’ দেখতে। ‘কৃষ্ণলীলার’ মতোই যাত্রাপালা। যিশুর জন্ম থেকে ক্রমে মৃত্যু পর্যন্ত তার বিস্তার। কৃষ্ণলীলার সুরে গানের মধ্যে সব ঘটনার বর্ণনা। চোখে জল নামে যীশুর দুঃখভোগে।

‘যিশু খ্রিস্টের জš§ এইরূপে হইয়াছিল। তাঁহার মাতা মরিয়ম যাকোবের পুত্র যোসেফের প্রতি বাকদত্তা হইলে তাহাদের সহবাসের পূর্বে জানা গেল তাহার গর্ভ হইয়াছে পবিত্র আত্মা হইতে। আর যোসেফ তাহাকে গোপনে ত্যাগ করিবার মানস করিলেন। এমন সময় ‘ঈশ্বরের এক দূত স্বপ্নে তাহাকে দর্শন দিয়া কহিলেন, ‘দায়ুদ বংশধর যোসেফ, মরিয়মকে গ্রহণ করিতে ভয় করিওনা, কেননা তাহার গর্ভে যাহা জšি§য়াছেন, তাহা পবিত্র আত্মা হইতে হইয়াছেন, তুমি তাহার নাম যিশু রাখিবে, তিনি ঈশ্বরের পুত্র।’ [বাইবেল-নিউটেস্টমেন্ট]

কিন্তু পূর্ণচরণকে ‘ঈশ্বরের দূত এসে জানায়নি যে,তার কন্যার গর্ভে পবিত্র আত্মা হতে একটি শিশুর আগমন ঘটেছে? তবে কে সে? এই অনধিকার, অবৈধ অনুপ্রবেশ? নিশ্চয়ই এই শিশু পবিত্র আত্মা নয়, বরং অপবিত্র আত্মা থেকে এসেছে। শয়তান, ডেবিল।

‘মালতি, তোর মা আমাকে কোনো সুপুত্র দান করার পূর্বেই মারা গিয়েছে, আমি তাকে ক্ষমা করেছি, কিন্তু তোর গর্ভে যে এসেছে সে অপবিত্র প্রেতাত্মা, আমি তাকে ক্ষমা করিনি, পঞ্চপিতা পরমেশ্বরও ক্ষমা করেননি, পঞ্চপিতার এই পবিত্র ভূমিতে ভূমিষ্ঠ হবার অধিকার তার নেই, আমার নিষ্ঠুরতার জন্য ক্ষমা কর মা’, বলতে বলতে কেঁদে ফেলে পূর্ণচরণ।

উদাস চোখে মালতি বিড়বিড় করে। যেন সে পিতার কথা শুনতেই পায়নি। অথচ পিতা পূর্ণচরণের মনেহয় সে ভগবানের ইচ্ছায়ই এতটা নিষ্ঠুর হয়েছে। কেননা সমস্ত দেব-দেবী তার মেয়েকে পরিত্যাগ করেছে।

এবার মালতির চোখ বিস্ফোরিত হয়। নরমু- হাতে দণ্ডায়মান দেবী কালী হয়ে যায় সে। পিতাকে শুনিয়ে সে তার মৃত মায়ের উদ্দেশ্যে বলে, ‘তুমি জানতেও চাইলে না কে কখন কেমন করে আমার কুমারী পেটের জবর দখল নিয়েছে। সূর্য সাক্ষী রেখে বলছি, যে আমার পেটে এসেছে তাকে আমি ঘৃণা করি, নিজেকেও। কেননা এটি কুক্ষণের জন্মপাপ।’

তারপর পিতা কন্যার মধ্যে দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা হয় না। এক সময় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ওর চোখ। কণ্ঠে যেনো কোনো দৈববাণী, ‘বাবা, যে আমাকে গর্ভবতী করছে তার চেয়েও আমি নিষ্ঠুর, কেউ যেন আমার সঙ্গে ছলনা করছে, বলছে আমি যেন করুণাময়ী মা হই, কিন্তু সেই ছলনাময়ীকে আমি ঘৃণা করি, কেননা আমি নিষ্ঠুর তার চেয়েও, যে আমাকে ধর্ষণ করে গর্ভবতী করেছে।’

যে সব অসুস্থ অশক্ত বৃদ্ধ উপারান্তর না দেখে গাঁয়ে পড়েছিল কিংবা প্রিয়জন যাদের যুদ্ধের বলি হিসেবে ভিটে বাড়িতে পরিত্যাগ করে গ্রামান্তর হয়েছিল, তাদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তারা স্বচক্ষে দেখেছে নরহত্যা এবং ধর্ষণ শেষে নারী হত্যা। তারা বিশ্বাস করে নিহত নারীরা পিশাচিনী হয়ে গেছে। ওরাই ভয় করেছে পূর্ণচরণের মেয়ে মালতির উপর। তাই সে অস্বাভাবিক আচরণ করছে। নিজের ইচ্ছায় নয়, পিশাচিনীদের নির্দেশে।

এক ত্রিসন্ধ্যায় পূর্ণচরণ দেখতে পায় বাড়ির পাশে খেজুর তলায় তার মেয়ে অন্য এক অচেনা মেয়ের সঙ্গে কথা বলছে। পূর্ণচরণ তাকে চিনতে পারে না। কে জানে কার বাড়ির ঝি-বউ! দু’জনের মধ্যে যে কথাবার্তা চলছে তা ছিল প্রায় শব্দশূন্য কিংবা ফিসফাস। পূর্ণচরণ এগিয়ে গেলে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায় মেয়েটি। সেদিনই রাতে হঠাৎ পূর্ণচরণ দেখতে পায় জোনাকপড়া বারান্দায় মালতির চুল বেঁধে দিচ্ছে একটি অচেনা বৌ। কে? পূর্ণচরণ জানতে চেয়েছিল। কিন্তু জোছনার পর্দার আড়ালে পলকে আত্মগোপন করে মেয়েটি। পূর্ণচরণের দৃষ্টির ভেতর জ্যোৎস্নার কুয়াশা।

তারও তিন চারদিন বাদে। পোড়া ভিটায় আশ্চর্য প্রদীপের যে দৈত্য রিলিফের টিনের চালা তুলে দিয়ে যায়, তাতে মেয়েকে নিয়ে শুয়েছিল পিতা। মাঝরাতে কিছু একটার শব্দে ঘুম ভেঙে গেলে পূর্ণচরণ দেখতে পায় মালতি তার ভরাট পেটে হাত রেখে খোলা দুয়ার ঠেলে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। পূর্ণচরণ খুব সাবধানে মেয়েকে অনুসরণ করে। রাতের কত প্রহর, পূর্ণচরণের অজানা। হয়তো মালতিরও।

কাঁই আন্ধারে মালতি ছায়ামূর্তি হয়ে যায়। পূর্ণচরণের ইচ্ছে থাকলেও মেয়ের পাশাপাশি হতে পারে না। এই স্তব্ধ নির্জন রাত তাকে শাসন করে। ভয় দেখায়। ধীরে ধীরে একটা ঘোর তাকে ঘিরে ধরে। রোদে পড়া কাদামাটি যেমনি বিভিন্ন আকার নিয়ে ফাঁটল ধরে, ঠিক তেমনি অখ- এই রাত জমাট বেঁধে এক একটা মূর্তিতে রূপান্তর ঘটে। সেই সব চলমান মূর্তি মালতিকে ঘিরে ধরে। ওরা ফিসফিস করে কথা বললেও পূর্ণচরণ তাদের কথা স্পষ্ট শুনতে পায়। আশ্চর্য এই, মালতিও তাদের সঙ্গে কথা বলছে। ওদের কথাবার্তায় পূর্ণচরণ বুঝতে পারে ওরা সেসব নারীর প্রেত্মা, যারা যুদ্ধকালে ধর্ষণ শেষে নিহত হয়েছিল। ওরা কি বলছে?

‘মালতি, তুই আমাদের কাছে ফিরে আয়, এই স্বাধীন দেশে তোকে আর তোর গর্ভের সন্তানকে কেউ কখনো স্বীকৃতি দেবে ন, দেশটাকে দুনিয়ার মানুষ স্বাধীন বলে স্বীকৃতি দিলেও তোকে নয়।’

‘কেনো দেবে না, কেনো?’

‘কেননা, আদম-হাওয়ার গন্ধম ফল খাওয়ার পাপ তোর শরীর বহন করছে। বরং নরক যন্ত্রণার চেয়ে আমাদের মউতের দুনিয়াই তোর জন্য শান্তি। দেখ কত শান্তি আমদের, লোভ হয় না?’

আর তখন পাথুরে এক কঠিন আচ্ছন্নতার ভেতর হঠাৎ আর্তনাদ করে ওঠে পূর্ণচরণ এসে তার বুকে মৃত্যু শীতল অশরীরী একটি হাতের স্পর্শ পায়। জ্ঞান হারায় সে। জ্ঞান ফিরলে দেখতে পায় মেয়ে তার মাথায় হাত রেখে স্তব্ধ বসে আছে ঘরের ভেতর। পিতা এবং মেয়ের মধ্যে তখন যে দৃষ্টির বিনিময় ঘটে তা আজানা কোনো দুনিয়ার মতো দুর্বোধ্য। জটিল এবং ভয়ংকর। মালতি নয়, বরং পূর্ণচরণ ভয় পায়। প্রতিবেশি ভবদেব তখন হাতের হারিকেনটা মাটিতে নামিয়ে বসে পড়ে। কেননা, সে-ই রাত গভীরের আর্তনাদ শুনে মাঠ থেকে উদ্ধার করে মালতি আর পূর্ণচরণকে। ভবদেব না থাকলে হয়তো ভয়কর কিছু ঘটতো।

খানিক নীরবতার পর পূর্ণচরণকে আচ্ছন্নতা থেকে মুক্তির জন্য ধান শূন্য গোলাঘর আর বিরান ফসলের মাঠের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় ভবদেব। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে এবং ফসল ক্ষেতে শষ্যদেবীর ডাকের কথা বারবার বলতে থাকে ভবদেব। পূর্ণ কি সে ডাক শুনতে পার না?

এবার শেষরাতে হ্যারিকেনের আলোর বাইরে হ্যারিকেনেরই পড়ে থাকা ছায়ার ভেতর চোখ ফেলে পূর্ণচরণ বিড়বিড় করে, ‘ফসল শূন্য ক্ষেতে শস্যদেবী নয়, প্রেমের ডাক শোনা যায়।’

‘ওসব কিছু না পূর্ণচরণ, একদিন কেউ আর নিশিডাক শুনতে পাবে না,’ পূর্ণচরণকে অভয় দিয়ে মালতির দিকে তাকিয়ে ভবদেব বুঝতে পারে মেয়েটি ঘুমিয়ে পড়েছে, হযতো তার পেটের শিশুটিও।

‘প্রেতের কান্না কোনোদিন থামবে না ভবদেব, কেন জানিস? যারা যুদ্ধে মরে গিয়ে শ্মশান পায়নি, প্রেত তর্পণ পায়নি, গোর পায়নি, জানাজা পায়নি, তাদের আÍার শান্তি নাই, তারাই প্রেতমূর্তি ঘুরে বেড়ায়, হাসে, কাঁদে,’ পূর্ণচরণ বিড়বিড় করতে করতে পুনরায় চোখ বন্ধ করে। তার একটি হাত পাশেই ঘুমন্ত মেয়ের ভারিপেটে নেতিয়ে পড়ে। কি প্রশান্তি। মাতা মরিয়মের পবিত্র গর্ভভূমি। ঘুমন্ত ঈশ্বরপুত্র।

মালতি মনুষ্যপ্রেতিনীতে পরিণত হয়। দিনের আলো তার অসহ্য। শীতের সাপের মতো দিনের আলো তাকে অন্ধকার ঘরের গুহার মতো কোনো শীতঘুমে আচ্ছন্ন করে রাখে। রাত নামলেই ওঠে দাঁড়ায় সে। পড়শিরা ওকে পরিত্যাগ করেছে। ঘৃণায় নয়, বরং ভয়ে। মালতি যেন হঠাৎ কালনাগিনী হয়ে যায় সবার চোখে। তার দেখা পাওয়া মানে মৃত্যু ছোবল।

তাড়িয়ে দিতে পারেনি, বরং পিতা পূর্ণচরণ মেয়েকে মাত্র একবারই গরা টিপে খুন করতে চেয়েছিল। পারেনি। আচমকা ঘরে ঢুকে পড়েছিল নিত্যানন্দ। কন্যা হত্যার এই ব্যর্থতা পূর্ণচরণকে গাছ-পালা, লতা-পাতার মতো চেতনাশূন্য প্রাণে পরিণত করে। তার ব্যর্থ হত্যার মাত্র চার দিন পর এক সন্ধ্যায় মালতি পরিণত করে। তার ব্যর্থ হত্যার মাত্র চার দিন পর এক সন্ধ্যায় মালতি কুয়াশায় ডুব দিয়ে পিতার সামনে দিয়েই রশি হাতে আত্মহত্যার জন্য ঘর থেকে বের হয়। আত্মবিস্মৃত পিতাও দেখে, সবই বুঝতেও পারে, কিন্তু বাধা দিতে পারে না। সে অন্য দুনিয়ায়। নির্বিকার। বোবা। নি:সাড়। জবেহ করা মু- বিচ্ছিন্ন পশুর নিষ্প্রভ চোখের মতো তার চোখের মতো তার চোখ জোড়া কেবর দেখে। প্রতিক্রিয়া শূন্য।

চেতনাবিচ্ছিন্ন পিতা মেয়েকে অনুসরণ করে সেই আম গাছের তলায় এসে দাঁড়ায়, যে গাছে ওঠে মেয়ে ডালে রশি বাঁধার চেষ্টা করছে। সন্ধ্যার ছায়ার মতো আঁধারে পিতা ও কন্যার চোখাচুখি হয়। ডাল এবং গলায় রশিটা বেঁধে মাত্র একবার পিতার দিকে তাকায় মালতি। সে কি পিতাকে কিছু বলতে চায়? এমন কি প্রত্যাশা করে, পিতাও কিছু বলুক? অথচ এই সত্যচিরকাল অজানাই থাকবে। কেননা জš§দাতা স্তব্ধ-নির্বিকার নির্বাক।

এক সময় সারাটা আগমাছ কেঁপে ওঠে। সন্ধ্যার আবছায়া আঁধার ফালাফালা হয়ে যায়। ঝুলে পড়েছে মালতি। তার শরীর দোলখায়। জলে সাঁতার দেয়ার মতো মাত্র একবার হাত-পা নড়ে ওঠে। অপলক দৃষ্টিতে, নির্বিকার শরীরে একজন পিতা কেবল দেখছে ঝুলন্ত কন্যার উদর কতটা স্ফীত। পিতা কি নিঃশব্দ অদৃশ্য অজাগতিক কোনো বজ্রপাতের দ্বারা প্রাণ শূন্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে?

তারপর সন্ধ্যার আঁধার যখন আরো জমাট বাঁধে এবং মালতির ঝুলন্ত শরীর দুলতে দুলতে স্থির হয়ে আসে, তখনই পূর্ণচরণের সারাটা শরীর হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে। সে আর্তনাদ করতে চায়, কিন্তু পারে না। সে এক দৌড়ে মালতির শরীরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়। পারে না। শরীর তো এক অজ্ঞাতনামা দেবতার প্রাচীন ক্ষতবিক্ষত পাথরের দণ্ডায়মান মূর্তি। একটা রক্তচোষা বাদুড় অন্ধকার আকাশ ভেঙে ওড়ে যায় কোথাও। নিশি শিকারি ক্ষুধার্ত সাপের গন্ধ বতাসে ছড়িয়ে পড়লেও দীর্ঘ চলমান শরীর আঁধারে একাকার হয়ে থাকে। আকাশে উল্কপাত। থৈ থৈ করে রক্ত জন্মে বিছানায়।

 

॥ তের ॥

পঞ্চপিতার এই গ্রামে মালতির লাশ শ্মশানের আগুনও পায় না, গোরস্থানের মাটিও না। লাশের অভ্যন্তরে অদৃশ্য আর একটি লাশ। পৃথিবীর কেউ ওকে চেনে না, দেখেওনি কোনোদিন। তার পিতা অজ্ঞাতধর্মও অজ্ঞাত। একের অভ্যন্তরে দুই। যুদ্ধ পলাতক কুমারী নারীর ধর্ষণ, গর্ভধারণ এবং আত্মহননের লাশের বিধান মানুষের শাস্ত্রে নেই। তাই নদীর অতল জলের গহনে নিক্ষিপ্ত হয় মালতির লাশ। একের ভেতর দুই।

কিন্তু মালতির লাশ নদীতে যারা নিক্ষেপ করে তারা দেখতেও পায় না কি করে মৃত মালতি তার পেটে মৃত শিশুর ভ্রƒণ নিয়ে নদীর তলদেশ দিয়ে হেঁটে চলেছেন দিনের পর দিন, রাতের পর রাত বিরামহীন হেঁটে হেঁটে মালতি একদিন সমুদ্রের অতলে অদৃশ্য হয়ে যায়। সেই অদৃশ্য জগতে মালতির রূপান্তরও ঘটে বারটি পূর্ণিমা আর বারটি অমাবস্যা রাত কাটিয়ে। মালতি মৎস্যকন্যা হয়ে যায়। মৎসকন্যা মালতি দীর্ঘ সাঁতারের পর একদিন তার চিরচেনা নদীতে চলে আসে। সে খোঁজে তার পিতা পূর্ণচরণকে। কিন্তু সাক্ষাৎ ঘটে না। হয়ত সময়ের পূর্ণতা আসেনি। কবে আসবে?

পূর্ণচরণ প্রতিজ্ঞা করেছে সে আর কোনোদিন নদীর জলে নামবে না। কেননা এই নদীর জলেই তার মেয়ের লাশ গ্রামবাসী ভাসিয়ে দিয়েছে। তাই নদীর সঙ্গে তার আড়ি। কিন্তু মৎস্যকন্যা মালতি তো তার পিতার সাক্ষাৎ চায়। কিন্তু মেলে না। অথচ গ্রামবাসীদের অবাক করে দিয়ে নদীর জেলেরা জানায় তারা এক মৎস্যকন্যাকে নদীর জলে সাঁতার কাটতে দেখেছে। একবার নয়, বেশ ক’বার। এমনটা ঘটেছে জোনাকপড়া রাতে। যতবারই কাছে যেতে চেয়েছে ততবারই জলের তলায় হারিয়ে যায় মৎস্যকন্যা। তজ্জব এই, যারা পূর্ণচরণের মেয়ে মালতিকে দেখেছে তারা দাবি কছে মৎস্যকন্যার মুখখানা পূর্ণচরণের মেয়ে মালতির মুখের সদৃশ। সে মালতিই, অন্য কেউ নয়।

কিন্তু ফালগুনের শেষ পূর্ণিমা রাতের পর আর কখনও নদীতে মৎস্যকন্যার মুখ দেখতে পায়নি জেলেরা। মৎস্যকন্যার পাঁচালি পূর্ণ-র কানে গেলে ছটফট করে সে। নিজের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে একদিন জোনাকে পূর্ণচরণ গাঙের তীরে ঘুরে বেড়াতে থাকে। তার মৎস্যকন্যা মেয়ের মুখটা যদি এক পলক দেখতে পেতো! প্রার্থনার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে সে। সামনে জোনাকপড়া গাঙে কলাপাতার শিরের মতো মৃদু ঢেউ ভাঙে। মনে হয় তার মেয়ে মালতির ঢেউ খেলানো চুল। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে পূর্ণ-র। বিড়বিড় করে বলে ‘স্বর্গশিশুর রূপ ধরে আমার কছে ফিরে আয় মা। যুদ্ধের কত গল্প জমে আছেরে মা আমার বুকের ভেতর। কি ভয়ঙ্কর যুদ্ধরে মা মালতি।’

জোনাক রাত গাঙের জলে আরও গভীর হয়। নিস্তব্ধতা আরও ঘন জমাট বাঁধে। পূর্ণচরণ বুঝতে পারে তার মেয়ের মৎস্যকন্যা রূপ আসলে জনরব। পুনরায় মনে হয়, হয়ত মিথ্যে নয়, প্রেতাত্মা তো কত রূপই ধরে। তারপর নির্জন রাত ভেঙে সে যখন ঘরে ফিরবে বলে হাঁটতে থাকে, নদীর তীর ছেড়ে, তখন চাঁদ আকাশের পশ্চিম কোণে কাঁত হয়ে পড়ে। আলোময় জোনাক ছায়ার বর্ণ নেয়। হঠাৎ পেছনে সে কারও পায়ের শব্দ শুনতে পায়। এক পলকই সে দেখতে পায় কে একজন ঘোমটায় মুখ ঢেকে উল্টো দিকে দ্রুত হাঁটছে। তার পেছনটাই দেখতে পায় পূর্ণ। পলকে সেই ছায়াশরীর অদৃশ্য হয়ে গেলে কারও ঠান্ডা নিশ্বাস তার পিঠ স্পর্শ করে। ভয় পেয়ে যায় পূর্ণচরণ।

পূর্ণচরণ হাঁটতে থাকে। দূর থেকেই হঠাৎ সে দেখতে পায় তার বাড়িটা আগুনে পুড়ছে। আকাশে আগুনের ঢেউ। কেবল তার নয়, ওই দূরে জহিরুল শেখদের পাড়ার দিকেও আগুন। ঘরপোড়া গন্ধ তার নাকে লাগে। আশ্চর্য এই, আতঙ্কিত কোনো জনকোলাহল নেই। সে একটু থমকে দাঁড়িয়ে পুনরায় হাঁটতে থাকে। বাড়ির খুব কাছাকাছি এসেও সে আগুন দেখতে পায়। আরও একটু এগিয়ে গেলেই বাড়ির লাগোয়া বাঁশ ঝোপের ভেতর থেকে একটি সাদা রং বিড়ালকে বেরিয়ে এসে তার সামনে হাঁটতে দেখে সে। বিড়ালের ছায়া নেই। দু’চোখে দুটি সূর্য।

ততক্ষণে আকাশের কোণে চাঁদ একেবারে হেলে পড়েছে পুকুরের স্বচ্ছজলে ডুবতে থাকা পিতলের থালার মতো। আঁধার আরও ঘন হবার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু অন্ধকার দুর্ভেদ্য নয়, পানসে রং। সেই পানশে জলো-জলো অন্ধকারে বাঁশের ঝোপের খুব কাছে এলে হঠাৎ আগুন অদৃশ্য হয়ে যায় বর্ণহীন বাতাসের মতো। একি! পূর্ণচরণ তো তার উঠোনে দাঁড়িয়ে। ওই অন্ধকারও তার রিলিফের টিনের ঘরের চাল দেখতে পায় সে। জলের উপর রোদপড়া রঙের মতো ঠিক। মাথা উঁচু করেও জহিরুল শেখদের পাড়ার দিকে কোনো আগুনের চিহ্নই দেখতে পায় না সে। তবে কি অলৌকিক অগ্নিকা- দেখতে পেয়েছে পূর্ণচরণ? যুদ্ধের আতঙ্ক-স্মৃতি কি তাকে প্রতারণা করছে? আজও কি সেই আতঙ্ক তার বুকে বেঁচে আছে?

কিন্তু এটা কে? কে বসে আছে তার আবছায়া অন্ধকার বারান্দায়? অবিকল মালতির মতো। স্নান শেষে বারান্দায় বসে রোদে পিঠ পেতে যেমনি প্রতিদিন চুল শুকাতো মালতি। তবে কি মালতির প্রেতাত্মা? পেত্নিরা তো রাতের বেলাতেই পিঠভরতি খোলাচুল ছড়িয়ে অন্ধকারের শীতলতায় ভেজা চুল শুকায়! আর এক পাও এগোতো পারে না পূর্ণচরণ। সে নির্বাক এবং মরা গাছের দণ্ডায়মান কা-মাত্র। যেন এক সত্য-মিথ্যার গোলকধাঁধার দুনিয়া।

মাত্র এক মুহূর্ত। হঠাৎ পিঠভরতি চুল বাহুড়ের ডানার মতো ছড়িয়ে ঠান্ডা বাতাস পূর্ণচরণের সারা শরীরে ছিটিয়ে দিয়ে, অদৃশ্য হয়ে যায় প্রেতমানবী। পূর্ণচরণের মুখে অস্ফুট শব্দ-‘মালতি’। তখন বাড়ির বাইরের বাঁশঝোপে বাতাস দোল খায়। অট্টহাসি আর কান্নার মিশেলে ধারালো শব্দ তরঙ্গ আছাড় খায় ঘোর অন্ধকারে।

তারও কিছুক্ষণ পর রাত পোহায়। কাকজ্যোৎস্নার ঘোলাটে বর্ণ আলো গলিত পানসে আঁধারে ছড়াতে থাকে। পূর্ণচরণ ঘরে ডুকে তাজ্জব! মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পিতার স্মৃতির কাছে ফেলে রেখে যাওয়া মালতির বাসি কাপড়। মৃত মেয়ের পিতা ভয়ে ভিজে থিক্থিক্, অথচ যতদিন বেঁচেছিল ততদিন সেই কন্যাই ছিল তার শান্তি আর সাহসের বৃক্ষছায়া। তাই সে এখন ছায়াশূন্য, রিক্ত।

মৃত নয়, বরং জীবিত মেয়ের চিরচেনা শরীরের ঘ্রাণ তখন স্পষ্ট অনুভব করে পিতা পূর্ণচরণ। জোরের আলো খোলা চৌকাঠের তলায় গড়াগড়ি খায়। পূর্ণচরণ স্পষ্ট দেখে মেয়ের একগোছা ছেঁড়া চুলের দলা গড়াগড়ি খাচ্ছে মেঝেতে। সেই চুল তুলে নেয় পিতা। এদিক ওদিক তাকায়। নিরুদ্দেশ থেকে ঘরে ফেরার পরও বিষণ্ন মালতি টেনে টেনে মাথার চুল ছিঁড়ে ঘরের বেড়ার এখানে ওখানে গুঁজে রাখতো। তবে কি তার মেয়ে হারানো সেই চুলের খোঁজে আজ ফিরে এসেছিল? সে চুলতো ওর অস্তিত্বের চিহ্ন।

আরও অনেক পরে মাঠের দিকে হেঁটে যায় পূর্ণচরণ। যুদ্ধ-শেষের ফসলের মাঠে বীজ বুনেছে। অংকুরিত হচ্ছে বীজেরা। হলদেটে সবুজ। সূর্যের আলো আর মাটির সঙ্গে অংকুরের প্রসব যন্ত্রণা এবং জন্মের আনন্দের খেলা চলে। এ খেলা রহস্যময়, কেননা মাটিতে পূর্ণচরণ মেয়ে মালতির ছেঁড়া চুলের গন্ধ খুঁজে পায়। দু’হাতের তালুতে মাটি চেপে ধরে পূর্ণচরণ। হাতের তালুর নীচে ধানের অংকুর নিশ্বাস ফেলে। চোখ বুঁজে পূর্ণচরণ বিড়বিড় করে, ‘পঞ্চপিতা, আর কত, আর কত কষ্টের খেলা খেলবে আমাকে নিয়ে? আমি তো খুব ক্ষুদ্র, বড় নির্বল।’

নিত্যানন্দ সবই জানে। পূর্ণচরণকে নিয়ে সে যেতে চায় বহুদূরের সেই গ্রামে, যেখানে পলাশির পলাতকদের হারিয়ে যওয়া অবশিষ্ট মানুষগুলোর নিবাস। করতোয়া নদীর কথা মনে পড়ে তার। সেই নির্জন চর আর আত্মগোপনের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে সে পূর্ণচরণের সামনে। তাদের রক্তধারা বইছে যে বিধর্মীদের ধমনীতে, সেখানে যেতে চায় সে। শত শত বছর পূর্বের সেই বিচ্ছিন্ন হবার স্মৃতি আর শ্রুতি তাকে আন্দোলিত করে। আদি স্মৃতিবাহী মন পাখি হতে চায়। চলুক পূর্ণচরণও তার সঙ্গে। পলাশির আম বাগানের ঘ্রাণ হয়ত পাবে ওদের শরীরে।

পূর্ণচরণ রাজি হয় না। সে যেতে চায় পির-দরবেশের ওরশ দিবসে। পিরের প্রধান মুরিদের চৌদ্দতম বংশের যিনি আছেন, তাকে নাকি বাবা দরবেশ ওরশের পূর্বরাতে সাক্ষাৎদান করেন। সে সব গায়েবি কথা শুনতে পেলে নিশ্চয়ই পূর্ণচরণ তার মেয়ে হারানোর দুঃখ সহ্য করার সাহস পাবে। তার মতো মেয়েও প্রেতজীবন থেকে পাবে মুক্তি। দরবেশ বাতলে দেবেন মুক্তি আসানের পথ।

প্রেতাত্মার মুক্তির পথ খুঁজে পায় না পূর্ণচরণ। পির বাবা তাকে যা জানান তাতে সে যতটা হতাশ, তার চেয়ে ভীত হয়ে পড়ে অধিক। কেননা, আত্মঘাতিনীর মুক্তির উপায় নেই। সে অনন্তকাল ভয়ঙ্কর প্রেততৃষ্ণায় কাতর হয়ে ছুটে বেড়াবে এই দুনিয়ায়। তার যেমনি নেই বেহেশত, তেমনি নেই দোজখ। তা হলে কি করবে পূর্ণচরণ? এক এক সময় মনে হয় মুক্তিটা আত্মঘাতিনী মেয়ের নয়, বরং তার নিজের জন্য প্রয়োজন। দিন-রাত প্রেতকন্যা পিতার উপর তার ক্রোধ বর্ষণ করেই চলেছে, এক একবার ঘাতকমূর্তি নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। কন্যা তো এখন মৃত্যুর দূত!

এবার পূর্ণচরণ গাঁয়ের পুরোত ঠাকুরের বিধানকেই মেনে নেয়। আয়োজন করে প্রেত তর্পণের। প্রেতপি- দান করে। কিন্তু সবই বৃথা। প্রেতিনী তাকে মুক্তি দেয় না। ঘুমের বিছানায় অন্ধকার ঘরে অগ্নিচোখ দেখতে পায় সে। পায়ের শব্দ, চুড়ির ঝন ঝন আওয়াজ শুনতে পায়। ঘরের বাইরে অট্টহাসি কিংবা কান্নার শব্দ কানে আসে তার। ফসলের ক্ষেতে কাজ করতে গেলে নির্জন দুপুরের রোদের মরীচিকায় খুব কাছে ভয়ঙ্কর স্মৃতি দেখতে পায় সে পলক মাত্র। ত্রিসন্ধ্যায় পূর্ণচরণ সুবচনী দেবীর মূর্তিও দেখে। কোলে তার মৃত শিশু। অবিকল মালতির মুখ। দেবী আর পেত্নীর রূপ ভয় দেখায় তাকে।

 

॥ চৌদ্দ ॥

পূর্ণচরণ এখন মৃত কন্যার প্রতি দয়া-মায়া-করুণা দেখাতে চায় না। সে বুঝতে পারে মালতি কন্যা থেকে প্রেতিনী হয়ে গেছে। সন্তান থেকে ঘাতক। বাৎসল্য থেকে ভয়ঙ্কর। পিতা আর সন্তানের মধ্যে বহমান ভাবরসেরস্রোতে শুকিয়ে নিঃসাড় বালির পাহাড় হয়ে গেছে। প্রতিহিংসার আগুন জ্বলছে দাউ দাউ। জাগতিক পিতা অজাগতিক কন্যার সঙ্গে বৈরিতায় জিততে চায়। পিতা মুক্তি চায় ভয়ঙ্করের হাত থেকে। অথচ আত্মঘাতিনী কন্যাও চায় প্রেত জীবন থেকে মুক্তি। পিতা আর কন্যার এই জটিল লীলা বড়ই দুর্ভেদ্য। কেউ জানে না মুক্তির ঠিকানা।

আসে কৃষ্ণপক্ষ। আসে অমানিশি। চন্দ্রকলা অদৃশ্য। ঘোর অন্ধকার। যেন অথৈজলের নদীর নিশ্চিদ্র-নিশ্চেতন তল। অন্ধকার বিছানায় পড়ে আছে পূর্ণচরণ। চোখ খোলা। একটা পাথুরে ভয় তার শরীরে ঠান্ডা জল ঢেলে দেয়। হঠাৎ কারও পায়ের শব্দ শুনতে পায় সে। ঘরের ভেতর নাকি বাইরের উঠোনে? বুঝতে পারে না। আচমকা একটি অগ্নিগোলক ঘরের চালে একপলক জ্বলেই নিভে যায়।

কি? কে? এমন প্রশ্ন কণ্ঠে এসেই তরল হয়ে যায়। পূর্ণচরণ দেবতা কিংবা ঈশ্বরের নামও ভুলে যায়। অন্ধকার ঘরের ভেতরটা আলোয় ভরে যায়। সেই আলোর ভেতর থেকে দিগম্বর স্ফীত উদরের একটি নারীমূর্তি বেরিয়ে আসে। প্রেতিনী নয়, স্বয়ং তার কন্যা মালতি। তার কন্যা মৃত না জীবিত, এমনটা ভুলে যায় পূর্ণচরণ। সে কেবল ফিসফিস স্বরে উচ্চারণ করে, ‘মালতি, আমি তোর বাবা, উলঙ্গ কেন? লজ্জা নেই মেয়ের? বাবার লজ্জা নেই?’

‘পূর্ণচরণ, লজ্জা-ঘৃণা-ভয়ের বাইরের অন্য এক দুনিযার মানুষ আমি, আজ আর আমি তোমার মেয়ে মালতি নই, বরং প্রেতিনী, তোমাকে খুন করলেই আমার আত্মা মুক্তি পাবে,’ ফিসফিস স্বরে কথা বলে মালতি। কথা আর শব্দের তরঙ্গ বাতাসে নাচে।

কিংকর্তব্যবিমূঢ়, নির্বাক, ভয়ার্ত পূর্ণচরণ। বহু চেষ্টার পর বিড়বিড় করে সে বলে, ‘তোর বাবার কি অপরাধ? কি পাপ করেছে বাবা?

‘জন্মদাতা হয়ে যে কন্যাকে রক্ষা করতে পারে না শয়তানের হাত থেকে, সেই কন্যার পিতৃকুল, পিতৃভক্তি, পিতৃশোক থাকে না, থাকে কেবল পিতার প্রতি ঘৃণা আর প্রতিহিংসা, অজাগতিক স্বরে কথা বলে মালতি। সে পিতার বিছানার পাশে বসে। তার নিশ্বাস থেকে প্রবল ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে আসছে ক্রমাগত। যেন মৃত্যুহিম।

তার কন্যা জীবিত না মৃত সেই বোধ হারিয়ে ফেলে পূর্ণচরণ। তার ডান হাত যখন স্পর্শমাত্র পায় মালতির, সাপের ছোবলের বিষ যেন ছড়িয়ে পড়ে রক্তের শিরায়। আর্তনাদ করতে গিয়েও থমকে যায় পূর্ণ। সে ছটফট করতে থাকে এবং মুখে বিড়বিড় শব্দ, ‘মাছের শরীরের মতন তোর শরীর এত ঠান্ডা কেন? তুই কি প্রেতিনী? মৎস্যপ্রেতের কন্যা? ভুলে গেলি আমি তোর পিতা?’

‘আমি যে নদীর গহিন তলার ঠান্ডা জলে রাতদিন হেঁটেছি,’ বলতে বলতে অট্টহাসিতে ভেঙে পড়ে মালতি। পূর্ণচরণের আত্মা কেঁপে ওঠে।

‘কে, কে তুই? বল তুই কে?’

‘এই দুনিয়ায় আমি তোমার মেয়ে, অন্য দুনিয়ায় কেউ না, সেই দুনিয়ায় পুরাতন দুনিয়ার সম্পর্ক মরীচিকা মাত্র।’

পূর্ণচরণের জগৎ কেঁপে ওঠে। সে বুঝতে পারে প্রবল প্রতিহিংসার দুটো ধারালো নখের শক্ত থাবা তার গলায় চেপে ধরেছে। সে বুঝতে পারে মৃত্যু তার ভবিতব্য। কিন্তু এতটা আতংকিত যে, আত্মরক্ষার চেষ্টা থেকে সে অনেক দূরে ছিটকে পড়ে। পূর্ণচরণ কেবল শুনতে পাচ্ছে তার প্রেতকন্যার ভয়ঙ্কর জিজ্ঞাসু কাঁপা কাঁপা কণ্ঠস্বর, ‘আমি পিতৃরক্ত পান করতে চাই, সেই রক্তই আমাকে মুক্তির পথ চিনয়ে দেবে। তুমি দান কর পিতৃরক্ত আর আত্মা।’

কিন্তু মৃত্যু যন্ত্রণা যখন তার হৃদপিণ্ডে একটার পর একটা পদাঘাত করছে এবং পিষে দলা পাকিয়ে দিচ্ছে, তখনই সে রক্ত বমনের মতো একটা আর্তনাদের অস্ফুট শব্দ করে। তখনই পূর্ণচরণ অনুভব করে তার প্রেতকন্যা অন্তর্হিত হয়েছে। কেবল বিগতকালের কন্যার কৈশোরের কণ্ঠ ভেসে আসছে কানে, ‘বাবা, আর কখনও আমি তোমাকে কষ্ট দেব না।’

না, কোথাও কেউ নেই। কিন্তু জীবিত পিতা আর মৃত কন্যার মধ্যে এই মৃত্যু আর জীবনের খেলার রহস্য চিরকাল দুর্বোধ্যই থেকে যাবে। কেননা এই ঘটনার পর মৃতকন্যা আর কখনও জন্মদাতার সামনে এসে দাঁড়ায়নি। হয়ত আর কখনও দাঁড়াবেও না। পিতাকে সে মুক্তি দিয়েছে বাতাসে ছিটিয়ে দেয়া এই শেষ বাক্য দিয়ে যে, ‘বাবা, জীবনের ওপারের দুনিয়ায় গিয়েও তোমার কন্যার কাছে অজানাই রয়ে গেল, একজন ধর্ষিতার অবৈধ গর্ভ, পাপের দুয়ার, নাকি রক্তাক্ত স্বাধীনতাযুদ্ধ, কোন্টি গৌরবের?’

প্রেতকন্যার হাত থেকে মুক্তির পর এই প্রথম পূর্ণচরণ এত উচ্চস্বরে দীর্ঘক্ষণ কান্না করল। ধর্ষিতার পিতা হিসেবে দুনিয়ায় মানুষ আর ত্রিভুবনের ঈশ্বরের কাছে আজ তার লজ্জা, ঘৃণা, হীনতা-দীনতার জয় হলো। পঞ্চপিতার শরীর এই পলল মাটি ছুঁয়ে সে শান্তির জন্য প্রার্থনা করে।

সেই রাতেই গ্রামের মানুষ আচমকা গিরিশের বাড়ির চাতাল থেকে কারও বিলাপ শুনতে চায়। বুঝতে পারে এ কান্না ভগবতীর। অবশ্য এমন কান্না অভূতপূর্ব নয় এই পঞ্চপিতা-পিতৃভূমিতে। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই পিতৃভূমিতে রয়েছে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় গোরস্থান। ত্রিশ লাখ কবর, নতুন কবর। এত অল্প সময়ে এত কবরগুহা খননের নিদর্শন আর কোথাও নেই। জল আর নদীর দেশ বলে কথা। যদি হতো মরুভূমি? দুইশ’সত্তুর দিনে ত্রিশ লাখ মানুষের তাজা রক্তে ভরাট হয়ে যেতো পৃথিবীর সব বড় শুকনো নদী। সাতকোটি মানুষের কান্নায় নোনাজলে ডুবে যেতো দশকোটি বৎসর পূর্বে মরে যাওয়া মরুসাগর।

মানুষ আবার ভুলেও যায় বিলাপ। বিস্ময়কর নিস্তব্ধতা নামে কখনও এই কবরে দেশে। পোড়া ভিটের ছাইয়ের স্তূপের দেশে। সন্ধ্যা নামতেই ওজুর পানির টুপটাপ, ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, তারপর নামাজের স্তব্ধতা নামে। সেই স্তব্ধতা ভাঙে আরও পরে, কিংবা ভাঙে না কখনও। যেন অনন্তকালের জন্য প্রকৃতি আর মানুষের এই নীরবতা করুণাময়ের কাছে আত্মসমর্পিত হয়। তখন প্রতিটি চোখ গোধূলির আলোয় ছলছল করে। টলটল করে। যমযম কূপের শান্ত পানির মতো।

অন্যদিকে মাটির তুলসী দেবীতে নয় মাসের তৃষ্ণায় মৃত তুলসী গাছের কংকালের পরিবর্তে একটি শিশু তুলসী গাছের মাটির রসে প্রাণের সংযোগের কি অক্লান্ত চেষ্টা! পরিত্যাগকারীগণ ফিরে এসেছে। তাই সন্ধ্যার আবছায়ায় ঐশ্বরিক গন্ধ ছড়ানো ধূপের ধোয়ায় চার পাতার চারা ওঠে। ক্ষুদ্র একটি তুলসীর চারা যেন শক্তিমান হতে হতে সন্ধ্যার অন্ধকারে হারিয়ে যায়।

গিরিশের যুবতী বৌ ভগবতী অনেক খুঁজে একটি তুলসীর চারা মরা তুলসী গাছটার জায়গায় পুঁতে দিয়ে জলে চোখ ভিজিয়ে হাতের লোটার জল ঢেলে দেয় চারার উপর। তার বিশ্বাস এই তুলসী চারা তার হারানো শিশুকন্যা। সে ফিরে এসেছে মায়ের কাছে তুলসীর চারার রূপ নিয়ে। তার পুনর্জন্ম হয়েছে মাটির গর্ভগৃহে।

গিরিশকে ভগবতী কথাটা বলে। চোখ মুছে জানায়, ‘আমার মেয়ে অতসী ফিরে এসেছে তুলসী গাছ হয়ে। প্রতি সন্ধ্যায় চারা গাছটায় ধূপ জ্বালাতে গিয়ে ওর মুখমালা দেখতে পাই।’

বৌকে গিরিশ প্রবোধ দিতে চায়, যদিও কষ্টটা তার বুকেও বাজে, ‘ভগবতী, তোমার মরা মেয়ে একদিন আসবে তোমার পেটে, তুলসীর চারাটা দেবী তুলসী, তোমার মেয়ে নয়, বুঝতে চেষ্টা কর।’

ভগবতী উত্তর দিতে পারে না। ঠিক তখনই নিত্যানন্দ হন্তদন্ত হয়ে ছুটতে ছুটতে গিরিশের উঠোনে এসে দাঁড়ায়, ‘বুঝলি, গিরিশ, আমার লালু ফিরে এসেছে। একেই বলে বিশ্বাসের টান।’

গিরিশ বুঝতে একটু সময় নেয়। লালু হচ্ছে নিত্যানন্দের পোষা কুকুর। যুদ্ধ শেষের প্রায় সাতমাস পর তার বাড়ি ফেরা। এতদিন সে কোথায় ছিল? নিশ্চয়ই সুখে ছিল না। শুকিয়ে গেছে, রোম ও কিছুটা ঝরে গেছে। গলায় রশি বাঁধা। বুঝা যায় কেউ তাকে আটকে রেখেছিল। মুক্তি পেয়েছে। স্বাধীন হয়নি। নতুন প্রভুর বদলে পুরাতন প্রভু। এ ফেরা প্রভুত্বের কাছে ফেরা।

‘লালু ফিরলে আমার অতসীও ফিরবে’, বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে ভগবতী। এ-কান্না বর্ষার আকাশের জলজ মেঘের মতো কান্না।

কবে ফিরেছিল অতসী? সেই উদ্বাস্তু সময়ে। করতোয়ার তীরের চরে। ভগবতীকে ডেকেছিল। ধরা দেয়নি। ভগবতীর স্বপ্নে আছে যে, নিশ্চয়ই এই দুনিয়ায়ও আছে সে। কিন্তু কোথায় আছে তার মেয়ে? স্বামী বলেছে পুনরায় তার গর্ভে ফিরবে সে। যে গর্ভগৃহ ছেড়ে দুনিয়ার জমিনে এসেছিল একদিন, সেই শূন্য ঘরে এখনও ফিরছে না কেন তার মেয়ে? প্রতীক্ষায় রয়েছে গর্ভগৃহ। কত আয়োজন।

অতসী মরেনি। নির্দয় ভীরু পলাতক পিতা তাকে মৃত ভেবে রাস্তায় পরিত্যাগ করেছিল পিতৃত্বের ভার লাগবের জন্য। কিন্তু কোথায় খুঁজবে অতসীকে। পুরুষটাকে কি সে সঙ্গে নিয়ে যেতে পাবে? কতবারই তো বলেছে, রাজি হয়নি। একা একটা মেয়ে মানুষ কোন নিরুদ্দেশে তালাশ করবে তাকে?

রূপী বৈরাগিনীর কথা মনে পড়ে ভগবতীর। যুদ্ধের ভেতর গ্রাম ছেড়ে কোথায় চলে গেছে, আজও ফেরেনি। সে গাইতো রাধার বিরহের গীত। ‘আমি মথুরা নগরে প্রতি ঘরে খুঁজিব কোথায় নিঠুর হরিÑ ওই তো বুঝি রূপীর গীত শুনতে পাচ্ছে ভগবতী। হ্যাঁ, স্পষ্ট কানে বাজে।

গিরিশের বুকটাও খলবল করে, মেয়েটার জন্য। সত্যি কি মেয়েটার মৃত্যু ঘটেছিল? ভয়ার্ত পলাতক মন ভুল করেনি তো? যদি সে অজ্ঞান অবস্থায় পথের ধারে পড়েই থাকে, কেউ কি তাকে তুলে নিয়ে গেছে? নাকি বনের পশুরা খুবলে খেয়ে নিয়েছে? গিরিশের চোখে জল আসে। আক্ষেপে মন তার ভেঙে পড়ে। মনেও তো ঠিক পড়ছে না কোন গাঁয়ের পথে পরিত্যাগ করেছিল মেয়েকে। এ যেন স্মৃতিভ্রমের নিষ্ঠুর এক দুনিয়া। অন্ধকার, কি নির্মম আঁধার।

 

॥ পনের ॥

বর্ষা প্রায় এসেই গেছে। প্রাক বর্ষার বৃষ্টি হয়। পঞ্চপল্লবের এই গ্রাম আবার রূপ বদলায়। আম, বট, পাকুড়, ডুমুর গাছে সবুজ পাতা। বেল, আমলকী আর অশোক গাছে ছাওয়া এই গ্রাম যেন রামায়ণের সীতার বনবাসের অরণ্য। গ্রামের পঞ্চবটীতে পাখিরা উড়াউড়ি করে। স্মৃতিভ্রষ্ট হতে চায় এই গ্রাম। যুদ্ধের দুর্ভোগের রক্তাক্ত স্মৃতি। কিন্তু পারে না। কারবালার যুদ্ধ আর কুরুক্ষেতের যুদ্ধ একাত্তরের যুদ্ধের সঙ্গে একাকার হয়ে নতুন এক মহাকাব্য হতে চায়। কেবল যুদ্ধ, মৃত্যু, দুর্ভোগই নয়, যুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত ভালোবাসাও ঝরাপাতার বনে বসন্ত ডেকে আনতে চায় কিশলয় জাগাতে চায়। কিন্তু সময়টা এক গোলকধাঁধা যে!

কামাখ্যাচরণের মেয়ে আরতিয় সদ্য বিবাহিত স্বামী জয়দেব ওই যে যুদ্ধের ভেতর স্ত্রীকে ফেলে পিতা-মাতার হাত ধরে সীমান্ত পেরিয়ে গেছে, সে আর ফেরেনি। এতবড় সীমান্ত, কোন পথে পরিবারটি নিরুদ্দেশ হয়েছে, এ গ্রাম ও গ্রামের কেউ জানে না। অনেক খুঁজেছে কামাখ্যাচরণ, হদিস পায়নি তাদের। এখন এই সদ্য বিবাহিতা মেয়েকে নিয়ে কি করবে সে? জানা থাকলে না হয় সীমান্ত পেরিয়ে মেয়েকে রেখে আসতো তার শ্বশুর ঘরে। কিন্তু কোন ঠিকানায়?

সব সংবাদই রাখে পাশের গাঁয়ের যুদ্ধ ফেরৎ তপন। একদিন পারেনি, সাহস ছিল না। আরতিকে নিয়ে পালিয়ে যেতে সাহস পায়নি। চোখের সামনে বিয়ে হয়ে যায় আরতির, ঠেকাতে পারেনি। গরিবের ছেলে বলে মেয়েকে বিয়ে দিতে রাজি হয়নি কামাখ্যা। অথচ আজ কতইনা সহজে পাওয়া যায় আরতিকে। হাত বাড়ালেই মেলে। একটা যুদ্ধ, গণহত্যা, দুর্ভোগ। সব বদলে দিয়েছে তপনের।

আরতিকে আজ জোর করে ঘরে তোলার সাহসও আছে তার। এতদিন যা ছিল না। কিন্তু আজ আর মনটা সায় দেয় না। আরতি বিবাহিতা, যদিও ওর কুমারিত্ব হরণ সে-ই করেছিল প্রথম। তবু অন্য একটা পুরুষ আরতির শরীরের সমস্ত অজানা রহস্যকে উন্মোচন করে গেছে বহুবার। একটা গোপন প্রতিহিংসা সাপের জিহ্বা দেখায়।

ইচ্ছে জাগে একবার খোঁজ নিয়ে আসে আরতির। কিন্তু তার তো এখন সময় কম। সব মানুষ ছুটছে শহরে। বাণিজ্য, চাকরি, শিক্ষা, এ যেন এক গোলকধাঁধা। একটা বিবাহিতা, নিরুদ্দিষ্ট স্বামীর বাসি শরীরের মেয়ের কাছে ছুটে যেতে ইচ্ছে হয় না। স্বাধীন দেশের শহর তাকে ডাকে। একটা গ্রাম্যপ্রেমে মন আর ভরে না। ভবিষ্যতের কত স্বপ্ন উঁকি দেয় মনে। বুঝতে পারে এই যে গ্রাম ছেড়ে নগরে ছুটে যাবার প্রতিযোগিতা তা শিখিয়েছে একটা যুদ্ধ আর বিজয়। বন্যার জল ঘরে ঢুকে পড়লে ঘরকুনো ব্যাঙের দশা তার। সাঁতরাতে ইচ্ছে করে অন্য আরও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। পুলিশ, সেনাবাহিনী কিংবা রক্ষীবাহিনী। কোথাওনা কোথাও একটা কিছু জুটে যাবেই।

একটা যুদ্ধ। ভালোবাসার আবেগেরও রূপ বদলে দিয়েছে। কাছে পেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু মনটা সায় দেয় না। কখনও মনে হয় যে মেয়েকে ফেলে রেখে স্বামী নিরুদ্দেশ হয়ে যায়, সে হচ্ছে বাসি-ছেঁড়া রংচটা একটি কাপড় মাত্র। আবার এটাও বুঝতে চায়, অন্য পুরুষের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যাওয়া প্রেমিকা কি অশুচি হয়ে যায়? উত্তরটা বড় জটিল।

অন্যদিকে কামাখ্যাচরণ বড় আক্ষেপে পড়ে। কোনো যে সেদিন তপনের হাতে তুলে দেয়নি আরতিকে। সে বুঝতে পারে আরতির স্বামী জয়দেব আর কখনও ফিরবে না। এদিকে আবার দেশের পরিস্থিতি ভালো নয়। ভীরু বাঙালিকে পাঞ্জাবিয়া সাহসী ডাকাত বানিয়ে গেছে। লাজুক বাঙালি পাঞ্জাবিদের কাছে শিখেছে নারী ধর্ষণ। এসব ভয়ের কথা কামাখ্যাকে শুনতে হয়। কখন কি ঘটে যায়।

এক দুপুরে রাস্তায় পেয়ে যুদ্ধের কথা শোনার অছিলায় তপনকে বাড়ি ডেকে নিয়ে আসে কামাখ্যা। আরতির সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে অবাক হয়ে যায় তপন। আরতির চোখে বিচ্ছেদের কাতরতা নেই, স্বামী নিরুদ্দেশের উদ্বেগও নেই। একজন মুক্তিযোদ্ধা অবাক হয় বই কি! এ যেন অবিশ্বাস্য। সে বুঝতে পারে এই যুদ্ধটা লাজুকলতা একটি বাঙালি মেয়েকে কতটা বদলে দিতে পারে। ভেঙেচুরে পাল্টে দিতে পারে।

‘ভালো আছ আরতি? ভালো তো?’ উত্তরটা জানা থাকলেও আরতির মুখ থেকেই শুনতে চায় তপন। অথচ তাকে অবাক করে দিয়ে আরতি নির্বিকারভাবেই বলে, ‘যুদ্ধে গেলা, সবাই বলে খুব সাহস তোমার।’

‘গরিবি আর কত সহ্য হয়? বাপ-দাতারা তো চিরকাল গরিবির বশ্যতা মেনেই জীবন কাটান, যুদ্ধের কাছেই জানলাম, স্বাধীনতার কাছেই শুনলাম, গরিবিটা পাপ। তাকে প্রশ্রয় দেয়া এক মহাপাপ।’

‘আমিও জানলাম, যে পুরুষ বৌ ছেড়ে পালায় তাকে ঘৃণা করতে, তাই চোখের জলের কথা আর মনে নেই। চোখের জল আরতির পরাজয়।’

‘আরতি, তোমার বুঝি অন্য কথা নেই?’ কত কথা লুকানো থাকে মানুষের বুকে। ‘না, নেই। একদিন ছিল, আজ আর নেই। এটা তুমি বুঝ না কেন?’

তপন আর কথা বাড়াতে পারে না। আরতির এই বদলে যাওয়া তাকে অবাক করে। তার খুব জানতে ইচ্ছে করে স্বামী ছেড়ে যাওয়ার এই অপমান কি করে সে সহ্য করছে? আরও ইচ্ছে হয় জানতে আরতি কেন তার বিষয়ে এত নির্বিকার। যুদ্ধ থেমে যাবার মতো আরতির যুদ্ধও কি থেমে গেছে? তপন গোলক ধাঁধায় পড়ে। তপন আরও বিস্মিত হয় এটা দেখে যে, মুখে নয়, শারীরিক ভাষায় তপনকে বিদায় জানিয়ে আরতি ঘরে ঢুকে যায়। হয়ত তপনের আরও কিছু কথা বলার ছিল কিংবা শোনার। অথচ তাকে পথে নামতে হয় এমন এক যোদ্ধার মতো যার বন্দুকের গুলি ফুরিয়ে যায় যুদ্ধ অসমাপ্তই থেকে যায়, বিজয়ের চেয়ে রণেভঙ্গ দিয়ে আত্মগোপনই শ্রেয় হয়ে ওঠে।

অথচ এই আরতি তপনকে নিয়ে পালাতে চেয়েছিল। সন্ধ্যায় গাঁয়ের নির্জন পঞ্চবটী তলায় হাজির হয়েছিল আরতি। তপনও এসেছিল। কিন্তু সে ছিল পঞ্চবটীর গাছের আড়ালে দাঁড়ানো। হাজার চেষ্টায়ও সামনে এগিয়ে হাত ধরতে পারেনি আরতির। মেয়েটির হাত ধরে পলায়নের ইচ্ছের হঠাৎ মৃত্যু ঘটে। সে হঠাৎ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। হঠাৎ মরুভূমির কথা মনে আছড়ে পড়ে তার। তৃষ্ণা ক্ষুধা। মরীচিকা। তারপর মরুবালিতে লুটিয়ে পড়ে প্রাণত্যাগ। দুটো কংকাল। একটি নারী, অপরটি পুরুষ। শিউরে উঠেছিল তপন। এক অনিশ্চিত বিভীষিকাময় যাত্রা!

আড়াল থেকে আরতিকে তপন দেখছিল এক সন্ধ্যার ঘনায়মান ছায়াচ্ছন্নতার। অপেক্ষার বিষে শরীর পুড়ে যাচ্ছে একটি যুবতীর। সে কাঁদছে। চুল ছিঁড়ছে নিজের হাতে। অস্ফুটস্বরে বিড়বিড় করে কি সব বলছে। তপন পারেনি আড়াল ভেঙে আরতির সামনে এসে দাঁড়াতে। তারপর সন্ধ্যার অন্ধকার যখন আরও ঘন হয়, তখন সে শুকনো পাতায় পায়ের মচমচ শব্দ শুনতে পায়। সে শব্দও হারিয়ে যায়। একটা নারী ছায়ামূর্তিকে অন্ধকার গ্রাস করে। চরাচর নিস্তব্ধ। নিশি পাখি গাছের ডালে ডালার শব্দ তোলে। বাতাস দোল খায় পাতায়। কারও দীর্ঘশ্বাস যেন নির্জনতাকে খান খান করে জমিন থেকে আসমানে একাকার হয়ে যায়।

আসমানের ওই দিকচক্রকালে কয়েকটা তারা জ্বলে। আয় তখন দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে থাকে তপন। মুখে অস্ফুট শব্দ। না। সে আরতির নাম উচ্চারণ করতে পারে না। কিন্তু আরতি কোথায়?

সে তার একটা হাত জাপটে ধরতে চায়। নিয়ে যেতে চায় অন্য কোথাও। কিন্তু আরতি নেই। তপনকে ঘন অন্ধকার গ্রাস করে। সে যেন ওই মহাকাশের মহাশূন্যের ঘোর অন্ধকার কৃষ্ণগহবরে নিক্ষিপ্ত হয়।

রাতের দ্বিতীয় প্রহরে আকাশে চাঁদ উঠলে তপন আবিষ্কার করে সে পড়ে আছে গাঁয়ের হাই স্কুলের বারান্দায়, যেখান থেকে মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়েছে। কিন্তু আর এগোতে পারেনি শহরের কলেজের পথে। দারিদ্র্য তার পায়ে শেকল আটকে দেয়। সেই পায়ের শেকলটাকেই ভাঙতে চায় সে আজ। গণহত্যা, গ্রামে হানাদারদের হামলে পড়া, চিরকালের ঘরকুনো গ্রাম্য মানুষগুলোর পেছনে শান্তির বেহেশত পূর্ণ কুটির ফেলে গ্রাম থেকে গ্রামান্তর আর সীমান্তে ছুটে বেড়ানোর স্মৃতি রক্তে মিশে গেছে। তাই আজ তপনও যেতে চায় আরবের তেলের দেশে। ওখানে মরু সাইমুমের বাতাসে উড়ে বেড়ায় পেট্রোল ডলার। ধরতে না-পারলেই জীবন অর্থহীন।

ওই তো গাঁয়ের নঈমুদ্দিনের বড় ছেলে বিদেশি জাহাজে করে সমুদ্র পারি দিয়েছে চাকরি নিয়ে। ছোট ছেলেটা শহরের কলেজে পড়তে গেছে ডাক্তার নাকি ইঞ্জিনিয়র হবে বলে। আবু বকরের দুই ছেলেই কোথায় কোন শিল্পকারখানার বাজারে মুদির দোকান দিয়েছে।

তপন শেষটায় মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দেখিয়ে যোগ দেয় রক্ষী বাহিনিতে। সবুজ রং পোশাক। কাঁধে চাইনিজ রাইফেল। দাঁপিয়ে বেড়ায় ডাকাত আর নকশালদের খোঁজে। তপনের বাবা রক্ষীর বাবা। বুক চেতিয়ে চলে। গাঁয়ে তার কদর বাড়ে।

এসব জানার কথার নয় আরতির। তবু কানে আসে। অবাক ঘটনা। একদিন পিতাকে প্রায় জেদ ধরেই পাঠিয়ে দেয় তপনদের বাড়ি। তপনের পিতার কাছ থেকে অনেক বলে-কয়ে নিয়ে আসে তপনের সাদাকালো একটি ফটো। তপনের পিতাও আনন্দ পায়। অনেক ছবির মধ্যে ছেলের একটি ছবি আরতির পিতার হাতে তুলে দেয়। পিতার বিশ্বাস ছেলের এই ছবি ঘরে ঘরে থাকা দরকার, জাতির পিতার মতো।

তপনের প্রতিকৃতি। সাদাকালো। লম্বা চুল। মুখভরতি দাড়ি-গোঁফ। কাঁধে রাইফেল। মুক্তিযোদ্ধা। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। আরতিদের মাটির দেয়ালে ঝুলছে। আয়নায় বাঁধানো। আরতি সকাল-সন্ধ্যা ছবির পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। পিতা-মাতা দেখে মেয়ে সেই ছবিতে শুকনো ফুলের বাসী মালা পরিয়ে দিয়েছে। যেন মৃত, বিগতকালের প্রিয় কোনো মানুষ। এমন একজন মানুষ যে প্রাচীর পৃথিবীর শেষ স্মৃতি।

 

॥ ষোল ॥

গ্রামের মানুষ চোখ কপালে তুলে শুনতে পায় রিলিফ চোর আর কম্বল চোরেরা নাকি স্বাধীনতাও চুরি করেছে। এই চুরির শানে-নজুল কেউ বুঝে, কেউ বুঝে না। সেই চোরদের দেশের এখানে ওখানে রাতের অন্ধকারে খতম করে বেড়াচ্ছে যারা, তারা নাকি নকশাল। এ আবার কি? নকশাল না খেঁকশিয়াল তা জানার মাথার ঘিলু কয়জনের? সেই নকশালদেরই পাল্টা খতমে নেমেছে জলপাই রংঅলা রক্ষী বাহিনী। কথাটা কানে গেলে কেমন থমকে যায় তপনের পিতা অধরচন্দ্র। স্ত্রীকে কাছে ডেকে ফিসফিস করে অধরচন্দ্র বলে, ‘লোকে কি বলে শুনেছ? তোমার ছেলে নাকি মানুষ খুনের চাকরি করে?

অধরের স্ত্রী চন্দ্রমুখী সামনে যেন সেই লাশটি দেখে যা সে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে করতোয়ার চরে আশ্রয় নেবার যাত্রাপথে পড়ে থাকতে দেখেছিল। খুব ভয় পায় সে। কেননা ইতিমধ্যে গ্রামের নানা গুজবে মনটা তার ভালো নেই। গুজবের পেছনে ছুটেই সে গিয়েছিল কামাখ্যাচরণের বাড়ি। গুজবটা যে গুজব নয়, বরং সত্য তা সে নিজ চোখে দেখে এসেছে। স্বামী পরিত্যক্তা আরতিকে ‘মাতঙ্গী পেত্নী’ ধরেছে। কিংদন্তির সেই পেত্নী। কোথাকার পেত্নী তা কেউ জানে না। কিন্তু বংশ-পরম্পরায় এই অঞ্চলে সে বিরাজমান। স্বামীর মৃত্যুর পর সে আত্মঘাতী হয়েছিল। সুযোগ পেলেই সদ্য বিবাহিতা নারীর উপর ভর করে সে। আরতিকেও ভর করেছে। না হলে আরতি তপনের যুদ্ধের ছবিকে স্বামী জ্ঞানে সেবা করে কেন?  সে নিজেকে বিধবা দাবি করে এবং জীবিত তপনকে মৃত স্বামী বলে প্রচার করে। এ যেন বিধবার একাদশী পালন।

অথচ পিতা ছাড়া কন্যার এই আচরণের অর্থ সবার কাছে অজ্ঞাত। পিতা কামাখ্যা জানে তার মেয়ে কোনো মনোরোগে আক্রান্ত নয়, যা করছে সবই সুস্থ মনে। কিন্তু পিতা যা জানে না তা হচ্ছে আরতির মনের গোপন রহস্য। এটা কি তপনের প্রতি তার ঘৃণা, নাকি পিতার প্রতি প্রতিশোধ? এই জটিল প্রশ্নের উত্তর জানার কথা নয় কামাখ্যার।

ছুটিতে এসে বিষয়টি শুনতে পায় তপন। সেই ছুটে যায় আরতির কাছে। নির্বিকার আরতি তাকে স্পষ্ট করে জানায়, এ ছবি তার মৃত স্বামীর। মৃত স্বামীর স্মৃতি নিয়েই সে বেঁচে থাকবে। তপন তার মুক্তিযোদ্ধাবেশের ছবিটি তুলে আনতে চেয়েছিল। পারেনি। আরতি তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে দিতে বলে, ‘আমি বিধবা, মৃত স্বামীর সঙ্গে আমার অনেক কথা হয়, সে-ই আমাকে বেঁচে থাকার সাহস যোগায়।’

তপন বাড়ির পথ ধরে একথা ভাবে যে, আরতি পাগল হয়ে গেছে। সেই রাতেই সে সিদ্ধান্ত নেয় আরতিকে বিয়ে করবে। পিতাকেও জানায়। সেবার বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেবার কথা মনে পড়ে অধরচন্দ্রের। কিন্তু এবার যে ফিরিয়ে দেবার সাহস নেই কামাখ্যাচরণের এ কথা না বুঝার কথা নয় অধরের। তার মনের ভেতর অহংকারের নেউল ল্যাজ নাড়ায়। যতই ভূমির মালিক হোক অধর, তার মেয়ে যে স্বামী পরিত্যক্তা। বিয়ে হওয়া মেয়েকে বৌ করে ঘরে তুলতে মনটা সায় দেয় না।

তবু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে নিত্যানন্দ আর গিরিশকে সঙ্গে করে অধরচন্দ্রের বাড়ি হাজির হয়। প্রকৃতপক্ষে তারা বুঝতে চায় আরতি উন্মাদ কিনা। দীর্ঘক্ষণ কামাখ্যার সঙ্গে কথা বলার পর আরতির সঙ্গেও কথা হয়। কিন্তু কেউ বুঝতে পারে না আরতিকে। আরতি কি মানসিক বিকারে আক্রান্ত, না কি সবার প্রতি অবিশ্বাস? কিন্তু যখন তারা বাড়িটি পরিত্যাগের জন্য ওঠে দাঁড়ায় তখনই আচমকা কেঁদে ওঠে আরতি, ‘একজন বিধবা আর স্বামী পরিত্যক্তা অন্যজনের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে?’

এর উত্তর কারো জানা নেই। তাই তারা তপনের উপরই ছেড়ে দেয় বিষয়টি। সমস্ত বৃত্তান্ত শুনে তপন বুঝতে পারে, তার উপর আরতির জটিল একটি অভিমান আছে। ওর জীবনের আজকের যে বিপর্যয় তার জন্য আরতি তপনকেই দায়ী করছে। সেদিন ওকে নিয়ে তপনের নিরুদ্দেশ হবার ব্যর্থতাকে ক্ষমা করতে পারেনি আরতি।

রক্ষী বাহিনীর পরিবার-বিচ্ছিন্ন ব্যারাকে বসবাসের জীবনটা তপনের জন্য নতুন। ঠিক তেমনি ছিল যুদ্ধের প্রশিক্ষণ শিবিরও। খাপ খাওয়াতে শরীর এবং মনের লড়াই লাগে। তাছাড়া দিন-রাত অপরাধী এবং অপরাধের ভিন্ন এক দুনিয়ায় ডুবে থাকতে থাকতে এক এক সময় তার মনে হয়, পুরানো জীবনে আর বুঝি ফেরা হবে না। পারিবারিক জীবন আর সৈনিকের জীবনের ব্যাখ্যাটাই বুঝি আলাদা। অন্যদিকে আরতিকে নিয়ে এক জটিল ভাবনা। বুঝি এর কোনো ব্যাখ্যা নেই, সমাধানও নেই।

ব্যারাকে এক সকালে তপনের হঠাৎ মনে হয় পিতা এবং পুত্রের অজান্তেই ওরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফসলের মাঠকে ঘিরে কৃষক পিতার যে জীবন তা থেকে সে বুঝি দূরে সটকে পড়েছে, বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে মাটি থেকে। কৃষক জীবনের অপমৃত্যু ঘটিয়েছে একটি মাত্র চাইনিজ রাইফেল। রাইফেল তো প্রাণ নেয় অথচ মাটি সৃষ্টি করে প্রাণ।

অথচ যুদ্ধের সময় এমনটা মনে হয়নি। একটা স্বপ্ন ছিল, অন্ধ একটা উত্তেজনা ছিল, যার ব্যাখ্যা ছিল না। যুদ্ধে কোনো জীবনদান, এই নিয়ে ছিল মনের টানাপড়েন। কখনও স্থির সিদ্ধান্তও ছিল। যুক্তিও ছিল। তবে যুক্তির চেয়ে আবেগের ভারটা ছিল অধিক। তখন না-বুঝলেও এখন বুঝছে।

অথচ আজ রাতে যে পাঁচজন সশস্ত্র রক্ষী এবং একজন স্থানীয় ইনফর্মার খোলা মাঠ ভেঙে এগিয়ে যাচ্ছে তাদের যাত্রার কোথায় শেষ তা জানে না তপন। জানে কি কমান্ডার? তারপর সেই হতদরিদ্র একটি বাড়ি। চালাঘর থেকে টেনে বের করা হয় যে ছেলেটিকে, তাকে চেনে কি তপন? কমান্ডার এক ঝলক তার চোখে টর্চের আলো ফেললে তপনের মনে হয় ছেলেটিকে কোথায় যেন দেখেছে সে। মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং ক্যাম্পে কি?

দু’হাত এবং চোখ বেঁধে ছেলেটিকে টেনে নেয়া হচ্ছিল। কোথায়? কমান্ডারই জানে। দ্রুত পায়ে হাঁটছে ওরা ছয়জন এবং একজন বন্দি। আশ্চর্য, ছেলেটি নির্বিকার। যা ঘটছে এবং ঘটবে তা যেন ঈশ্বর কর্তৃক পূর্বনির্ধারিত। যেমনটা ঈশ্বরপুত্র যিশুর জন্য নির্ধারিত ছিল।

‘পরে তাঁহারা গেৎশিমানী নামক এক স্থানে আসিলেন। যিশু আপন শিষ্যদের কহিলেন, আমি যতক্ষণ প্রার্থনা করি, তোমরা এখানে বসিয়া থাক। পরে তিনি আরও কহিলেন, আমার প্রাণ মরণ পর্যন্ত ক্ষুধার্ত হইয়াছে। তোমরা জাগিয়া থাক। পরে যিশু অগ্রে গিয়া ভূমিতে পড়িলেন। এবং প্রার্থনা করিলেন, ‘পিতা: সকলই তোমার ইচ্ছা, আমার নিকট হইতে এই পানপাত্র দূর কর, তবে তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হউক।’ পরে তিনি আসিয়া দেখিলেন শিষ্যগণ ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। তখন তিনি তাহাদের জাগাইয়া কহিলেন, সময় উপস্থিত, মনুষ্যপুত্র পাপীদের হস্তে সমর্পিত হইবেন। দেখ যে প্রিয় শিষ্য আমাকে পাপীদের হস্তে অর্পণ করিবে সে আমার নিকটে আসিতেছে। পরে সে আসিল এবং যীশুকে চুম্বন করিয়া শত্রুদের চিনাইয়া দিল।’

– রাইবেল নিউ টেস্টমেন্ট

তপন বুঝতে পারে তারা ওই বন্দি নকশার ছেলেটিকে নিয়ে একটি নদীর দিকে এগোচ্ছে। নদীর পাড় খাড়া। নীচে প্রবল স্রোতে। বাতাস স্রোতে ভাঙে। শব্দ হয়। চরাচর অন্ধকার নির্জন। কাছে-ভিতে কোনো বাড়ি নেই। কমান্ডারের হাতে টর্চের আলো। এর বাইরে সবই গোপন রাখে রাতের অন্ধকার।

দু’রাত দুচোখের পাতা এক হয়নি তপনের। চোখ বুঁজলেই ভেসে ওঠে গ্রাম্য এক হতদরিদ্রের পর্ণকুটির। একটি যুবকের অতল জলের দেশে হারিয়ে যাওয়া। রক্ত আর জলের গন্ধে কি জলের ক্ষুধার্ত প্রাণীরা ছুটে এসেছিল? জলে ছড়িয়ে পড়া রক্তে কি মানুষের গন্ধ সন্ধ্যাকালের প্রদীপজ্বলা তুলসীতলায় ধূপের গন্ধের মতো তো তার শরীরের ঘ্রাণের সঙ্গে একাকার হযে গিয়েছিল? এতো এক রূপকথা। শোনাতে পারতো পৃথিবীর মাত্র একজনকেই। আরতি, আরতিকে। কেননা আরতি মানুষের নিষ্ঠুরতাকে চেনে।

কি করছে আরতি এখন? একটি হত্যাকাণ্ডের রক্ত-গন্ধ সারা শরীর এবং মনে ছড়িয়ে দিয়ে বিনিদ্র তপন। হয়ত আরতি রাত গভীরের ঘুমের ভেতর স্বপ্ন দেখছে। পলাতক স্বামীর খোঁজে সীমান্তের দিকে হেঁটে যাচ্ছে সে। সীমান্তের কাঁটাতার। পথ বন্ধ। নয় তো দেয়ালে ঝুলে থাকা একজন মুক্তিযোদ্ধার ছবির দিকে তাকিয়ে আছে। যে মুক্তিযোদ্ধাকে মৃত ঘোষণা করে শুকনো ফুলের মালা পরিয়ে দিয়েছে, আরতি কি জানে সে একজন ঘাতক। একটি হত্যাকাণ্ডের পর ব্যারাকে ফিরে মাছের মতো শরীরে আর আত্মায় খুনের তাজা রক্তের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে বিষ হয়ে?

 

॥ সতের ॥

পঞ্চবটী পঞ্চপল্লবের সন্তান তপন গ্রামে ফিরছে। আজ আর তার গায়ে লেপটে নেই লাল রক্ষীর পোশাক। উর্দিটা গায়ে নেই বলেই বুঝি সে আজ ভারমুক্ত। রাতের শেষ লোকাল ট্রেনে ফিরছে সে। আকাশটা ভালো নেই। এই বৃষ্টি, এই বৃষ্টিহীন, বাতাসহীন গুমট আবহাওয়া। শেষ ট্রেনে বলেই ফাঁকা ফাঁকা কামরা থেকে এই মফস্বল স্টেশনে হাতেগোনা ক’জন যাত্রীই নামে। স্টেশনে পা দিয়েই তপন বুঝতে পারে কিছুক্ষণ আগে হালকা বৃষ্টি হয়েছে। প্ল্যাটফর্ম ভেজা। কাঁচা রাস্তায় রাতের বেলা রিকশা থাকার কথা নয়। আধা অন্ধকার কাঁচা রাস্তায় পা ফেলে সে। আকাশে চাঁদ নেই, তারা জ্বলে নিঃশব্দে। হাতে ছোট ব্যাগ। একাকী যাত্রী। তিন মাইলের পদযাত্রা।

এক শ’গজও হাঁটতে হয়নি। হঠাৎ পেছনে পায়ের আওয়াজ শুনতে পায় সে। কে যেন আসছে। পেছনে তাকিয়ে বুঝতে পারে নাÑ খর্ব, না-দীর্ঘ একটি যুবক আসছে। পরনে সাদা কোর্তা। আঁধার আলোয় কোর্তার রং স্পষ্ট দেখায়। লম্বা পা ফেলে যুবকটি তপনের পাশাপাশি হয়। যুবকই বলে, ‘আমি মানিকগঞ্জের মোতালেব, খালুর বাড়ি যাচ্ছি।’

‘কোন গ্রাম? কে খালু?’ তপন জানতে চায়।

‘আজাহার উদ্দিন, হাইস্কুল টিচার, গ্রাম সুলতানপুর,’ যুবকটির উত্তরে বেশ মার্জিত স্বর। শহুরে ভদ্রঘরের বলেই মনে হয়।

তপন সেই স্কুল শিক্ষককে চেনে, তার শিক্ষক, কিন্তু যুদ্ধকালে গণহত্যার শিকার। তাদের পাশের গ্রাম। তপন তার প্রয়াত শিক্ষকের জন্য আক্ষেপ করে। যুবকটি নিরুত্তর। তপন পেছন ফেরে। এবার স্পষ্ট দেখে যুবকের মাথা ও মুখের খানিকটা ঢাকা গায়ে জড়ানো চাদরে। লাল চাদর। তপন আকাশ দেখতে দেখতে বলে, ‘বলা যায় না বৃষ্টি নামতে পারে।’

‘যতজোর বৃষ্টিই হোক, তুমি ভিজবে, কিন্তু আমার শরীর থাকবে রোদে শুকনো জমিনের মতো’, মানিকগঞ্জের মোতালেব হাসে। সেই হাসি কেমন বিদ্রুপের মতো ঠেকে তপনের কানে। কিন্তু কেন এই বিদ্রƒপ?

‘তুমি জি না ফেরেশতা যে বৃষ্টিতে ভিজবে না’? তপন কৌতূহলের সঙ্গে জানতে চায়। কেননা এমন দাবি কোনো মানুষই করতে পারে না।

‘আমি ইনসান, মাটির তৈরি, আগুনের তৈরি ফেরেশতা নই, স্মরণ কর আমাকে তুমি চিনতে পারবে’, আবারও হাসে মোতালেব নামের দাবিদার অজ্ঞাত যুবক।

তপন এবার হাঁটার গতি থামিয়ে ঝুঁকে পড়ে যুবকটির মুখ দেখতে চায়। পারে না। আকাশের চাঁদ তখনও মেঘের আড়ালে। মেঘ সরলেই জোনাক। কিন্তু রাতের সঙ্গী যুবকটিকে বেশ সন্দেহ হচ্ছে তপনের।

কি করে তাকে সে চিনবে? মানিকগঞ্জের মোতালেব নামে তার তো চেনা কোনো লোক নেই। মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং-এর সময় মুন্সীগঞ্জের এক যুবকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল। নাম জাহিদুল। তবে আর কোথায় সাক্ষাৎ ঘটতে পারে? রক্ষীবাহিনীর হেডকোয়ার্টার সাভারে কি? মনে পড়ছে না। সে গোলকধাঁধায় পড়ে।

‘এই যে তুমি দাবি করছ আমি তোমাকে চিনি, আবার বলছ বৃষ্টিতে তোমার শরীর ভিজবে না, এসব কি ইয়ার্কি নয়?’ তপনের গলা ভারি শোনায়। সে ছেলেটিকে আলতুফালতু কেউ ভেবে তার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে চাইছে লম্বা পা ফেলে।

কিন্তু পারে না। কাঁচা সড়কের দু’পাশের গাছ-গাছালির শেষে ফাঁকা মাঠ। ওখানে পৌঁছতেই হাল্কা একখ- বাতাস গড়িয়ে যায়। সেই বাতাস তপনের শরীর ছুঁয়ে গেলে সে তাজ্জব বনে যায়, এ যেন পৌষের ঠান্ডা বাতাস। পেছন ফিরতেই তার চোখে পড়ে রাতের আঁধারকে ছিঁড়ে যুবকটির শরীর থেকে হিমায়িত বস্তু থেকে সৃষ্ট কুয়াশার মতো জলীয় বাষ্প বের হচ্ছে। এবার সত্যি ভয় পেয়ে যায় তপন। সঙ্গী যুবকটি বুঝতে পারে। তাই সে বলে, ‘একটু বাদেই মেঘ সরে গেলে চাঁদ উঠবে, চাঁদের আলোয় আমরা পরস্পকে চিনতে পারব। তুমি চিন্তা করো না। অবিশ্বাসের কারণ নেই।’

তপন মনের দ্বিধা মুছে ফেলতে চায়। ভাবে, সবই হয়ত এই আলো-আঁধারী রাতে নির্জন পথের গোলক ধাঁধা। তাই সে নিরুত্তর থাকে। এবার যুবকটি জানতে চায়, ‘তুমি কি আর্মিতে আছ? হাঁটা চলায় বুঝা যায়।’

‘হ্যাঁ, আর্মিতে ঠিক আর্মি নয়, আধা আর্মি, রক্ষী বাহিনীতে’, তপন উত্তর দেয় এবং পুনরায় জানতে চায়’, কেমন করে বুঝলে তুমি?’

‘বুঝব না মানে? আমি তো মুক্তিযুদ্ধের কে-ফোর্সে ছিলাম’, যুবকটির উত্তর নির্বিকার, নিরুত্তাপ। মুখে রহস্যময় হাসি।

‘আমি যে জেড-ফোর্সে ছিলাম, কি আশ্চর্য দেখ, আমরা দু’জনই মুক্তিযোদ্ধা, অথচ কেউ কাউকে চিনতেই পারছি না, খুব শান্তস্বরে উত্তর দেয় তপন এবং কিছুটা কৌতূহলিও হয়।

‘বলছি না চাঁদের জোনাক আমাদের মুখে পড়লেই আমরা পরস্পরকে চিনতে পারব, কেউ কাউকে চিনতে না পারলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধটাই যে বড় মিথ্যা হয়ে যাবে,’ যুবকটির এমনি সুরের কথায় তপন যেন খেই হারিয়ে ফেলতে চায়। বুঝতে পারছে না সঙ্গী ছেলেটির কণ্ঠস্বর হঠাৎ বদলে গেল কেন। এই স্বর-বিবর্তনের কি অন্যকোনো রহস্য আছে?

মেঘের ভগ্নাংশটা কখন যে আসমানের চাঁদকে মুক্তি দেয় তা সঙ্গী যুবকটি জানলেও তপন জানে না। তাই খুব কম সময়ের ভেতর সঙ্গী যুবক তপনকে বলে, ‘যোদ্ধা বন্ধু, এবার থাম, চাঁদের মেঘ মুক্তির সময় সমাগত, আমরা পরস্পরের মুখ দেখব। এনা হলে বৃথাই আমাদের সহযাত্রা।’

ঠিক তখনই চাঁদের মেঘ-রাহুগ্রাস মুক্তি ঘটে। লক্ষ-কোটি আলোর বিন্দু চাঁদের শরীর ভেঙে ছুটে আসে দু’জন নিশিযাত্রীর দিকে। আলোর বিন্দুরা লেপটে যায় ওদের মুখে। মুখ থেকে লাল বর্ণচাদর সরে যায় যুবকের। তপন ঝুঁকে পড়ে তার মুখে। চিনতে চায়। চেনে না। চেনা চেনা মনে হয়। কোথায় যেন দেখেছে। একবার নয়, বেশ ক’বার।

‘যোদ্ধা বন্ধু, হ্যাঁ তুমি অবশ্যই আমার বন্ধু, তুমি আমাকে প্রথম দেখেছিলে ট্রেনিং ক্যাম্পে, কথাটা যদি মিথ্যে হয় তবে বাঙালির সাবধানতা যুদ্ধও কোনোদিন সত্যের সন্ধান পাবে না,’ যুবকটি এবার মাথা নাড়ে। চোখ দুটো তারার মতো মিটমিট করে। অথচ সে আলো লক্ষ্য-কোটি আলোকবর্ষ দূরের। এর সীমানা খুঁজে পাওয়া তপনের পক্ষে অসম্ভব।

তপন নির্বাক। নিশিসঙ্গী যুবক এবার তপনের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং ফিস্ফিস্ করে বলে, ‘বন্ধু, শেষরাত তুমি আমাকে দেখেছিলে ধলেশ্বরী নদীর তীরে। তোমরা পাঁচজন রক্ষী। পাঁচটি গুলি। আমার শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায়, তারপর আমার দেহ হারিয়ে যায় নদীর গহিন তলায়, মনে আছে’?

তপন প্রাচীন মিশরের ফারাউনদের ঈশ্বরের পাথরের মূর্তি হয়ে যায়। যেন নিষ্প্রাণ ঈশ্বর। সেই ঈশ্বর অপলক দৃষ্টিতে দেখে যুবকটিকে। চিনতে পারে। এই সেই নকশাল যুবক। নিহত যুবক নিক্ষিপ্ত হয়েছিল ধলেশ্বরীতে। ফারাউ-ঈশ্বরের পাথরের চোখ ঝরে পড়ে মাটিতে। চোখের মণি আলোহীন।

এবার যুবকটি উড়ন্ত পাখির ডানার মতো দু’হাত প্রসারিত করতেই তার শরীরে জড়ানো লাল চাদর মাটিতে পড়ে যায়। তার বুকে পাঁচটি গুলির ক্ষত। বঙ্গোপসাগরে পাঁচটি দ্বীপ। সেই ক্ষতস্থান নির্দেশ করে যুবক বলে, ‘এই পাঁচটি গুলির চিহ্নে একটি তোমার রাইফেলের। তারপর আমি নদীর অতলে। কিন্তু তোমরা জানলা, কোনো বিপ্লবীকে হত্যা করা যায় না। তাই আমার পুনরুত্থান ঘটে ধলেশ্বরীর অতল জলের গহ্বর থেকে। বিশ্বাস করো, অবিশ্বাসী হইও না।’

আর ঠিক তখনই সূর্যপিণ্ডের মতো গোলাকার একটি অগ্নিময় আলোর বৃত্ত সেই নিশিযাত্রীকে ঘিরে ধরে। পলকে সেটি নিরাকার হয়ে যায়।

‘বিশ্রামদিন অবসান হইলে, সপ্তাহের প্রথমদিনের প্রভাতে মগদলীনী মরিয়ম ও অন্য মরিয়ম যীশুর কবর দেখিতে আসিলেন। মহা-ভূমিকম্প হইল এবং কবর মুখ হইতে- পাথরখানা স্বর্গদূত আসিয়া সরাইয়া দিলেন। স্বর্গদূত রমণীদের কহিলেন, ‘ক্রশে হত যিশু এখানে নাই, মৃত্যুর তৃতীয় দিবসে তাহার পুনরুত্থান ঘটিয়াছে। গিয়া শিষ্যদের বল, যিশু মৃতদের মধ্য হইতে উঠিয়াছেন। তাহারা সংবাদ দিবার জন্য দৌড়াইলেন। পথে যিশু তাহাদের সম্মুখবর্তী হইলেন এবং কহিলেন, দেখ আমার হাত ও পায়ে ক্রশের ক্ষত চিহ্ন। অবিশ্বাস করিওনা, বরং বিশ্বাস কর, মৃত্যু হইতে আমার পুনরুত্থান ঘটিয়ছে।’

– বাইবেল, নিউ টেস্টামেন্ট

ফারাউদের পাথর মূর্তির ঈশ্বর থেকে রক্তমাংসের মানুষে পরিণত হতে আরও অনেক সময় কাটে তপনের। যিশুর শিষ্যদের মতোই যুবকটির পুনরুত্থানের বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে তপন গ্রামের দিকে ছুটতে থাকে। নিশ্চয়ই সে আজ সাক্ষ্য দিয়ে গ্রামাবাসীদের জানাবে, কি করে একজন শহিদ বিপ্লবীর পুনরুত্থান ঘটেছে এই দেশের মাটিতে।

কিন্তু গ্রাম-সীমানায় পৌঁছেই এই রাতকে সাক্ষী রেখে সে মাটির উপর বসে পড়ে। একটা অপরাধবোধ তাকে সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরে। সেদিন সেই নিষ্ঠুর রাতে ধলেশ্বরীর তীরে যে হত্যাকা- ঘটে তার জন্য অন্য কেউ নয়, সে-ই একমাত্র দায়ী। ঠিক তখনই সে দেখতে পায় পাখির মতো দুটি ডানা দু’দিকে ছড়িয়ে একটি মানবমূর্তি তার সামনে দিয়ে পূর্ব প্রান্তে দৌড়ে যাচ্ছে। আর তার পায়ের পাতা থেকে অজস্র আগুনের ফুলকি ঘাসের উপর ছিটকে পড়ছে। ঘাসতো নয়, যেন তারাফুল।

বাড়ি পৌঁছলে পিতা-মাতা তাকে মহানন্দে বরণ করে নেয়। অনেকদিন পর মায়ের ছেলে মায়ের কাছে ফিরে এসেছে। কিন্তু তপন নির্বিকার। সে জানে একরাতে ধলেশ্বরীর তীরে যা ঘটেছে তা যেমনি কোনোদিন কারও কাছে প্রকাশ করতে পারবে না, ঠিক তেমনি বাড়ির পথে যে অতীন্দ্রিয় জগতে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল তাও চিরকাল থাকবে অপ্রকাশ্য। বরং সে প্রত্যাশা করে মা তাকে আরতির কথা বলুক। অনেক কিছু বলুক অবলীলায়।

মা নয়, বাবাই তাকে আরতিয় কথা বলে। কামাখ্যা যে আরতিকে শহরে নিয়ে গিয়ে বড় ডাক্তার দেখিয়েছে, তাও ছেলেকে জানায় অধরচন্দ্র। ডাক্তার বলেছে আরতির এই অবস্থার জন্য কোনো ভূত-প্রেত দায়ী নয়, বরং ব্যর্থপ্রেম আর স্বামীর বিশ্বাসঘাতকতাই দায়ী। এটা তার মনের অসুখ। সে একটা অবাস্তব সুখের কল্পনার রাজ্যে ডুবে আছে। অন্যদিকে প্রেমিক কিংবা স্বামীকে না পাওয়ার হতাশা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। এ বড় জটিল রোগ। কথাটা ভাবতেই কষ্টে বুকটা ভেঙে পড়ে তপনেরÑ কি করবে সে?

 

॥ আঠার ॥

দেশে দুর্ভিক্ষের পায়ের শব্দ ভূতের শরীর দেখায়। স্বাধীনতার স্বপ্ন ভাঙছে মানুষের। হতাশার অনাবৃষ্টিতে পুড়ছে মাঠ-ঘাট। নিরাশার ছোঁয়াচে রোগের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে ঘরে ঘরে, জনে জনে। ঘরে ঘরে যুদ্ধজয়ের স্বাধীনতা বানের জলের মতো তৈ থৈ করে, কিন্তু খাদ্যের খরায় জ্বলছে দেশ। স্বাধীনতার চেয়ে দৈর্ঘ্য-প্রস্থে লম্বা হয়ে গেছে পেটের ক্ষুধা। যে অস্ত্রে পাঞ্জাবিদের তাড়ানো যায় সেই অস্ত্র ক্ষুধার কাছে আনত হয়। খাদ্যের সন্ধানে যারা ছুটছে শহরে তারা কেউ আর গ্রামে ফিরছেনা। যারা ফিরছে তারা মানুষ নয়, কংকাল। কংকাল যাত্রা চলে গ্রাম থেকে শহরে, শহর থেকে গ্রামে। হানাদারদের অস্ত্রের চেয়ে ক্ষুধার অস্ত্রের ক্ষমতা অধিক। মানুষের মাথা নত হয়ে আসে খাদ্যের অভাব। তপন গ্রাম ছেড়ে পালাতে চায় ব্যারাকে। ওখানে খাদ্যের স্তূপ। ছুটি কাটিয়ে দ্রুত ফিরতে চায় সে শহরের ব্যারাকে। মনের ভিতর হীনতা-দীনতা আর স্বার্থপরতার কোলাহল শুনতে পায় সে স্পষ্ট। তাই যাবার আগে অন্তত একবার আরতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আসুক তপন। না, তপন যাবে না। যাবে না কখনও।

তপন জানে না কী ভয়ঙ্করের পদধ্বনি নরবলীর বাজনার মতো ধ্রিম ধ্রিম বাজছে। হানাদারের আগুনে বোমায় শস্যভূমি আর খাদ্যভাণ্ডার পুড়ে খাক হয়ে গেছে। ইঁদুরেরাও ক্ষুধার্ত। গর্তের অন্ধকারে ওদের শিশুরা মরছে। ইঁদুর শিশুদের কংকালের স্তূপের ভেতর মতিভ্রমে আক্রান্ত ইঁদুর পিতামাতাগণ। খাদ্য ভেবে সন্তানদের কংকালের হাড়ে তীক্ষ্ণ-শানিত দাঁত বসিয়ে কটকট শব্দে কাটছে। গর্ত ছেড়ে বের হলেই ওরা দেখতে পায় পঞ্চপিতা পরমেশ্বরের সন্তানদের কংকালের দল তেপান্তরের মাঠের দিকে ছুটছে। প্রত্যেক কাঁধে ছিন্নভিন্ন চটের বস্তা, বস্তার ভেতর শূন্যতার বাতাস থৈ থৈ করে।

ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের অতি দীর্ঘ পঞ্চপিতার শরীরের মৃত্তিকা উদর তার কংকাল সন্তানেরা শ্বাপদ জন্তুর শানিত নখের মতো হাজার হাজার নখ দিয়ে খুঁড়ছে। না, পাতাল-গুহা তৈরি করেও খাদ্যের কণা মাত্রের সন্ধান পাচ্ছে না। আসমান-জমিন-পাতালের মতো দীর্ঘ গায়েবি আজদাহা সাপের মতো অতিদীর্ঘ ক্ষুধা। দোজখের সাপ আজাদাহার কু-লায়িত শরীরের ভেতর ঢুকে গেলে ভয়ঙ্কর পেষণে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে হাড়-মাংস-হৃৎপিণ্ড। কোথায় যাবে ক্ষুধায় উম্মাদেরা? ওরা ছুটছে দিগ্বিদিক জ্ঞানহারা হয়ে। ক্লান্ত শরীর, যা কংকালের রূপ, তা নেতিয়ে পড়ছে পথে-প্রান্তরে। শকুন-শোয়ালের অট্টহাসি। উদরপূর্তির পর অধিক খাদ্য গ্রহণের মাদকতার সুখনিদ্রার ভেতর ওরা হাসছে। ওদের হাসির রোল জাতীয় সংগীতের বাজনার মতো শব্দতরঙ্গ তৈরি করছে।

তপন পালাতে চায় এই ক্ষুধার সাম্রাজ্য ছেড়ে। সে ব্যারাকে যাবে। ওখানে খাদ্যের চেয়ে অনেক বেশি অস্ত্রের চকচকে যৌবনবতী শরীর। মারণাস্ত্র ঠিক যেন কামাঙ্ক নারীর লোভনীয় স্তন-গোপনাঙ্গ। পথভ্রম হয় তার। নিশাকালের কালো বেড়ালের ভ্রমে পড়ে সে। সে বুঝতেই পারে না কখন ছুটতে ছুটতে আরতিদের দীঘল উঠুনে এসে দাঁড়িয়েছে। ওরা সম্পন্ন কৃষক। খাদ্যাভাব থাকলেও তীব্রতা নেই। লুণ্ঠনের ভয়ে যৎসামান্য খাদ্য লুকিয়ে রেখেছে। সেই গোপন ভাণ্ডারের খবর ঈশ্বরও জানেন না।

আরতির পিতা কামাখ্যাচরণ ভুল করে। ভেবেছে খাদ্যদস্যু। কিন্তু পরমুহূর্তে তার ভুল ভাঙে। এ যে তপন! এক সময় তুচ্ছ থাকলেও আজ কামাখ্যার কাছে সে শক্তিমান। কেননা সে আজ ক্ষমতাবান, শস্ত্রপানি, অস্ত্রধারী। পঞ্চপিতা পরমেশ্বরের রক্ষক, লালরক্ষী।

কন্যা এগিয়ে এলে পিতা আত্মগোপনে চলে যায়। মাতাও। নির্বাক আরতির পেছনে পেছনে ঘরে ঢুকে যায় তপন। আশ্চর্য এই, আরতির মনে হয় একটি বুনো খরগোশ পথের কুকুরের তাড়া খেয়ে তার পেছনে পেছনে ঘরে ঢুকে পড়েছে আত্মরক্ষার্থে। তাই সে তাকে করুণা করতে চায়।

‘তোমার ট্রেনের সময় হয়ে এল যে, শুনেছি ট্রেনে খুব ভিড়,

শহরে ছুটছে মানুষ নঙ্গরখানার তালাসে’, নির্বিকার গলা বাজে আরতির।

কথাটা যেন তপন শুনতেই পায়নি। তার দৃষ্টি পিঁপড়ের মতো হেঁটে বেড়ায় মাটির দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা ছবিটার ওপর। একজন মুক্তিযোদ্ধার ছবি। সে চিনতে পারে না আত্মপ্রতিকৃতিকে। তাই সে কেবলই বিড়বিড় করে, ‘বলিভিয়ার জঙ্গল, গেরিলা যুদ্ধ, চে-গুয়েভারা।’

‘স্কুলের ইংরেজি স্যারের মুখে গুয়েভারার নাম শুনেছি, কিন্তু এই ছবি তার নয়’, আরতির কণ্ঠস্বর ধর্মযাজকের মতো শোনায়।

‘তবে কার, কার ছবি?’

‘একজন পলাতক কাপুরুষের, যুদ্ধ পোশাকে আত্মগোপনকারী কাপুরুষ, হ্যাঁ সে মহাপুরুষ নয়, কাপুরুষ।’

‘আমি কি ওকে দেখেছি কখনও? চিনি কি?’

‘না, দেখনি, চিনবেও না।’

‘কেনো’? প্রশ্নটা করেই মাথা আনত হয় তপনের। সত্যি সে ছবিটি চেনে না। আত্মপ্রতিকৃতি তার কাছে অজ্ঞাত। কেননা আরতির সামনে তখন সে অজ্ঞাত কল্পলেকর অথৈ জলে ডুবে আছে।

আরতি আচমকা হেসে ওঠে। হাসির সেই শব্দ-তরঙ্গ আকাশের বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো আছড়ে পড়ে তপনের কানে। তার সারা অস্তিত্ব কেঁপে ওঠে। আবার সে কল্পলোকের অতর জল-গহ্বর থেকে জেগে ওঠে।

আক্ষেপের সঙ্গে আরতি বলে, ‘সত্যি কি বিস্ময় এই যুদ্ধ! বাবা বলেন, মানুষ নাকি মতিভ্রমে পড়েছে। আমি কি অতশত বুঝি বল?’

মুখে ভাষা নেই তপনের। দীর্ঘ নিশ্বাস পড়ে আরতির, ‘তুমি নিজেই নিজের ছবিটা চিনতে ভুল করছ, অবশ্য আমিও, আমি কি নিজেকে চিনি ঠিকঠাক মতো? কোনোদিন চিনতে পারবো?’

এবার তপন একটা কিছু বলতে চায়। পারে না। আরতিই বল, ‘সেদিন সন্ধ্যায় পালিয়ে যাবার জন্য আমার কাছে আসার সাহস ছিল না তোমার। আজ পালাবার দরকার নেই, তাই সাহস করে এসেছ, ধন্যবাদ।’

‘আরতি, আমি তোমার কাছে আসব বলে আসিনি, শহরে যাচ্ছি, কে এখানে আমাকে টেনে আনলো বুঝতে পরছি না’, এবার গল্গল্ করে কথা বলে তপন, কিন্তু চোখ তার আরতির মুখে নয়, বরং দেয়ালের আপন ছবিতে। ছবিটা সে এবার স্পষ্ট চিনতে পারছে। ছবির কথাটা সে যা মা-বাবার মুখেই শুনেছিল। কিন্তু আরতি কেন তার যোদ্ধাবেশের ছবি নিয়ে এল, এই রহস্য তার কাছে এখনও অজ্ঞাত।

‘কেন এসেছ, কই বললে না তো?’ আরতি জানতে চায়।

‘আমি তো আসিনি? আমাকে কেউ নিয়ে এসেছে।’

‘কে সে? সঙ্গে করে আনল, অথচ বুঝলে না কার সঙ্গে হাঁটছ, অবাক।’

‘বুঝেছি, ওই যে দেয়ালে টাঙানো ছবিটা, ওটাই তোমাকে টেনে এনেছে তপন।’

‘হতেও পারে, আবার তোমার ধারণা ভুলও হতে পারে আরতি।’

এবার আরতি নীরব হয়ে যায়। খানিকভাবে। বাইরের উঠোনে চোখ। নিঃসঙ্গ একটি চড়ুই হাঁটা হাঁটি করে। তার মনে পড়ে কিছু পাখি হেঁটে হেঁটে খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে, আবার কিছু পাখি লাফিয়ে লাফিয়ে পতঙ্গ কিংবা খাদ্যকণা খুঁজে বেড়ায়। উঠোনের পাখিটা দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলে দীর্ঘনিশ্বাস পড়ে তার। দৃষ্টি ফেরায় ঘরের ভেতর। তপনের ছবিটার ওপর দৃষ্টি মাকড়সার মতো হেঁটে বেড়ায়। তপনের উদ্দেশ্যে নয়, নিজের সঙ্গেই যেন কথা বলে আরতি, ‘ওই যে যোদ্ধার ছবিটা, সে মৃত। জীবিত নেই। পোশাকে কেবল যুদ্ধের চিহ্ন, কিন্তু জীবিত নয়। সাহসী পুরুষের মৃত্যুর স্মৃতি দেয়ালে ঝুলছে।’

কথাগুলো শোনে তপন। বুঝতে পারে, এসব কথা অভিমানের নয়, বরং ঘৃণার। ঘৃণার ভিতরও প্রতিশোধ আছে। আরতি কি সে কারণেই তার ছবিটা সংগ্রহ করেছে? তুলে নেবে নাকি দেয়ালে ঝুলানো ছবিটা? ছবিটার ওপর শুকনো ফুলের মালা পরানো। ফুলের ভেতর মৃত্যুর ঘ্রাণ। শুকনো ফুলতো মৃত্যুরই প্রতীক। তা হলে আরতির অস্তিত্বের ভেতর কি তার মৃত্যু ঘটেচে? এই যে বসে আছে সামনে, আরতি কি ভাবছে সে একটি প্রাচীন মমীর সামনে বসে আছে? তার আত্মার যাদুঘরে মমীটিকে সংরক্ষণ করছে সে প্রাচীন প্রেমের চিহ্ন হিসেবে? কেননা মমী তো প্রাণহীন। প্রাণের মৃত খাঁচা মাত্র।

‘আরতি, স্বামী তোমাকে ছেড়ে গেল কেন?’ তপনের প্রশ্নটি আচমকা হলেও দীর্ঘ প্রস্তুতি ছিল, স্পষ্ট বুঝা যায়।

‘সে তো আমারও প্রশ্ন, যদি কোনোদিন সাক্ষাৎ পাই নিশ্চয়ই আমি জানতে চাইব কেন আমাকে ছেড়ে গেল সে’, উত্তর দিতে গিয়ে আরতির ঠোঁট একটুও কাঁপল না। বাতাসশূন্য অরণ্য রেখার মতো।

তপন নিশ্চুপ। তার প্রশ্ন ফুরিয়ে যায়। বাইরের শূন্য উঠোনের দিকে চোখ ফেলে আরতি অনুচ্চস্বরে হয়তো নিজেকেই বলে, ‘দুর্ভিক্ষের ভেতর গ্রামের মানুষের যেমনি স্বাধীনতার স্বপ্ন ভেঙে গেছে, আমার স্বামীও হয়তো আমার শরীরে নতুন কোনো স্বপ্ন খুঁজে পায়নি, তুমি কি আমার শরীরে আশ্চর্য কোনো স্বপ্ন পেয়েছিলে? পাওনি বলেই সে রাতে আসার কথা থাকলেও আসনি।

কথাটা শুনে চমকে ওঠে তপন। গলা শুকিয়ে আসে। নিজেকে আড়াল করার জন্য বলে, ‘আমার কথা রাখ, তোমার স্বামী কি তোমার শরীর ছাড়া মন খুঁজে পায়নি? তুমি বুঝতে পারনি সত্যি?’

‘হয়ত খুঁজেই দেখেনি। তুমি কি খুঁজেছিলে তখন? খুঁজতে কি চেয়েছিলে একটি মেয়ের শরীরের কোনো গোপন আড়ালে লুকিয়ে থাকে মন?’ এবার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে আরতির। আঁচলে মুখ ঢাকে। কষ্টের চেয়ে লজ্জা হচ্ছিল ওর বেশি। একজন নয়, দুটো পুরুষই তাকে ঠকিয়েছে। যে ঠকে সে তো হেরে যায়। হারার মধ্যে বিষের মতো অপমান।

একটা ঘোরের ভেতর যেমনি তপন ঢুকে পড়েছিল আরতিদের বাড়ি, ঠিক তেমনি এক আচ্ছন্নতায় ডুবতে ডুবতেই নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে। সে হাঁটতে থাকে দ্রুত স্টেশনের উদ্দেশ্যে। ব্যারাকে ফিরবে। সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করে আছে একটি চাইনিজ রাইফেল। করুণা নয়। প্রেম নয়। মমতা নয়। ভালোবাসা নয়। হিংসা প্রতিহিংসা। শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে, স্বাধীনতা রক্ষার নামে হত্যার বদলে হত্যা। রক্তের বদলে রক্ত।

 

॥ উনিশ ॥

জোনাককালে গ্রাম্যহাট দীর্ঘ হয়। হাটুরেরা ঘরে ফিরতে একটু দেরি করে। তাড়াহুড়ো থাকে না। ফকফকা জোনাকে পথঘাট খুব পরিষ্কার দেখায়। কৃষ্ণপক্ষে সন্ধ্যার অন্ধকার জমাট বাঁধার আগেই বাড়ির পথ ধরে মানুষ। সাপ আর ভূতের ভয় বলে কথা। যুদ্ধের পর এমনিতে ভূতেদের খুব বাড়বাড়ন্ত/পাঞ্জাবিরা বাঙালি খুন করে যেমনি বাংলাভূতের সংখ্যা বাড়িয়েছে, ঠিক মুক্তিযোদ্ধারাও তেমনি রাজাকার আর পাঞ্জাবি সেপাই খুন করে রাজাকার ভূত আর পাঞ্জাবি ভূতদের আমদানি করেছে। রাজাকার আর পাঞ্জাবি ভূতেরা বহুৎ খতরনাক।

যুদ্ধশেষে আশি হাজার পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দি মুক্তি পেয়ে দেশে ফেরে সঙ্গে কয়েক হাজার পাঞ্জাবি ভূত। ওরা অশরীরী। তাই অজাগতিক শরীরে ওরা মরু আর পাথুরে পর্বতের দেশে ফিরে যায়। তাদের সঙ্গী হয়েছিল বাঙালি রাজাকার ভূতেরাও। সেখানে পৌঁছতেই পাকিস্তানি ভূতের সর্দারের ডাক পড়ে। তার স্পষ্ট কথা, ‘বাঙাল ভূতেরা, তোরা এই মুহূর্তে পাকিস্তানের পাক পবিত্র মাটি ছেড়ে যায়। তোদের শরীর কাল বর্ণ, তোদের বাংলা ভাষা কুফরি ভাষা, কাফেরের বুলি, তোরা কুল্লেমোমিন ছিলি না ষোলআনা।’

জনৈক রাজাকার ভূত, যে ছিল একদিন দেশের বড় উজির, সে প্রতিবাদ করে, ‘কেন এমন করে বলছিস? আমরা কি তোদের জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে, জিহাদে যোগ দিয়ে মুক্তিবাহিনীর হাতে কোতল হইনি? পরাজিত হয়ে সব ভুলে গেলি?’

পাকিস্তানি ভূত সর্দার গর্জে ওঠে, ‘মাত করো বেঈমানকা বাচ্চা, হট যাও ইহাছে, শালা তুমকো মারডালা।’

তারপর ডাকা হয় বাংলাদেশের যুদ্ধে নিহত পাঞ্জাবি ভূতদের। তাদেরকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়, ‘তোরা বাঙালদের সঙ্গে যুদ্ধে হেরেছিস, পাকিস্তানের ইজ্জত খুইয়েছিস, তোরা নোংরা, নষ্টার বাঙাল মেয়েদের জ্বিনা করেছিস, তোরা কাফের নারীদের জোর করে ধর্ষণ করে পাক শরীর নাপাক করেছিস, তাই এই পাক মাটিতে তোদের জায়গা নেই।’

তখন সমস্বরে পাঞ্জাবি ভূতেরা চিৎকার করে ওঠে, ‘আমরা পাকিস্তানের জন্য লড়াই করে শহিদ হয়েছি, বলা হয়েছিল ধর্ষণ জায়েজ, তবে এমন ব্যবহার কেন করছ?’

‘কোনো তর্ক নয়, এ দেশ ছেড়ে তোরা পালা’, ভূত সর্দারের এই নির্দেশ পেয়ে রাজাকার আর পাঞ্জাবি ভূতেরা সমস্বরে কান্না করতে করতে অজাগতিক শরীরে বাংলার মাটিতে ফিরে আসার জন্য তৈরি হয়ে যায়।

তাদের প্রতি ভূত সর্দারে শেষ নির্দেশ, ‘তোরা বাঙালদের দেশে ফিরে যা, ওদের স্বাধীনতার সাধ মিটিয়ে দে, নেতাদের খতম কর, ওই দেশকে পুনরায় পাকিস্তান বানানোর চেষ্টা কর। মনে রাখিস, মরলে শহিদ, বাঁচলে গাজী।’

জোনাকপড়া ফকফকা রাতে হাঁট থেকে ফিরতে ফিরতে এভাবেই ভূতের গল্প বলছিল গ্রামের হাইস্কুলের মাস্টার ইরফান আলি। শ্রোতা মাত্র দু’জন। ভবদেব আর নূর আলি। দু’জনই শ্রোতা, বক্তা কেবল মাস্টার। মাস্টার তাদের দুর্ভিক্ষের কথা বলে। আর বলে পলাতক রাজাকারদের গর্ত ছেড়ে বেরিয়ে আসার কথা। ভবদেব আর নূর আলি অবাক হয়ে সবই শোনে আর বোকা বনে যায়। রাস্তার বাঁক ভাঙতেই মাস্টার থামে। কেননা ডানদিকে ঘুরলেই তার বাড়ি। তার তিনেট বাড়ি পরেই নূর আলি বাড়ি। মোটকথা সামনের দীঘল মাঠটা একাকী পেরেতে হবে ভবদেবের। মাস্টার ভবদেবকে অভয় দিয়ে বলে, ‘ভবদা, ডরাবে না তো? খুলির মাঠটা পেরোতে পারবে তো? লোকে নানা কথা বলে, ভূত-প্রেত দেখে রাত বিরেতে। কিছুনা, মনের ভুল। আল্লার নাম স্মরণ করে চলে যাও। সোজা হাঁট পেছনে তাকাবে না কিন্তু।’

একটু মনের ভেতর খোঁচা যে লাগেনি তা নয়। তবু জোর দিয়ে ভবদেব উত্তর দেয়, ‘ভয় নাই মাস্টার, রামনাম নিয়ে চলে যাব। রাম নামে সাত ভূত পালায়।’

এক সময় একাকী হয়ে যায় ভবদেব। জোনাক তো নয় যেন শীতলক্ষ্যা পারের পোদ্দারদের প্রাচীন শিমুল গাছটা থেকে চৈতের দুপুরে ফাটা ফলগুলো থেকে বাতাসের দোলায় আসমান থেকে মাটিতে উড়ে উড়ে নামছে সাদা শিমুল তুলোর বৃষ্টি। সামনেই দীঘল মাঠ। এখন সে খুলির মাঠে। যুদ্ধশেষে গ্রাম পলাতকেরা ফিরে এসে দেখতে পায় এই মাঠেই পড়ে আছ সাতটি মাথার খুলি। কাদের খুলি, কেমন করে মাঠে এল, কেউ তা জানে না। আশ্চর্য এই, মাঠে কোথাও মেলেনি নরকংকাল। কংকাল থাকলে বুঝা যেত পাঞ্জাবিরা দূর গ্রাম থেকে তুলে এনে মাঠে দাঁড় করিয়ে গুলি করে সাতজন মানুষকে খুন করেছে। কারও কারও অনুমান নির্জন এই মাঠে শেয়ালেরা হয়ত কোথাও থেকে খুন হওয়া মানুষের মাথাগুলো নিয়ে এসেছে যুদ্ধের সময়। শেষটায় খুনিগুলো নদীর পারে নিয়ে গর্তে পুঁতে দেয় এলকাবাসী। সেই থেকেই খুলির মাঠ।

কিছুদূর এগিয়েই ভবদেব থেমে যায়। চারদিক তাকায়। গাছ-গাছালি বাঁশঝাড় মিলিয়ে কালোরেখার বৃত্ত হয়ে আছে মাঠটি। উত্তরের দিকে একটি খেজুর গাছ। তার গোড়ায় কুটিশ্বর গাছের ঝোপ। রাতশিকারী কি যেন কি একটি লম্বা ডানাওয়ালা পাখি নিঃশব্দে নেমে পড়ে মাঠে। কি যেন কি একটা শিকার পায়ের নখরে চেপে ধরে উড়ে যায় উত্তর-পশ্চিম কোন বরাবর। দূর থেকে ভেসে আসে শেয়ালের হাঁক। আবার থেকেও যায়। মাথার উপর থেকে সদাই-পাতির বাঁশের ঝাঁকটা মাটিতে নামিয়ে আনে ভবদেব। লবণের পোটলা। মসুর ডাল। পিঁয়াজ। সরষের তেল। কাঁচের বোতলে কেরোসিন। চালের দরকার নেই। নিজের ক্ষেতের পোড়াবিন্নি ধানের চাল রয়েছে মেটে কলসিতে। কিনতে হয় না। বরং ধান বেচে দেয় হাঁটে নিয়ে।

পুনরায় পা ফেলে ভবদেব। সে বুঝতে পারছে না মাঠটা এত দীর্ঘ মনে হচ্ছে কেন তার। এই জোনাক রাতে খুলির মাঠটা কি তাকে ভয় দেখাচ্ছে? আকাশে চোখ তোলে সে। কেবল চাঁদই নয়, তারাও জ্বলে আকাশে। হঠাৎ বাতাস বয়ে যায় মাঠে। ভবদেবের শরীর ছুঁয়ে বাতাস ছুটে যায় দূরের কালো জোনাক পড়া মাঠের শেষ প্রান্তের গাছ-গাছালির দিকে। ভবদেবের পা দ্রুত হতে চায়। কিন্তু গতি বাড়ে না। মাস্টারের কথাগুলো মনের ভেতর হেঁটে বেড়ায়। তখনই সে হঠাৎ দেখতে পায় কালো আলখাল্লা পরিহিত একদল লোক কোথা থেকে এসে যেন মাঠে ঢুকে পড়ে। ওরা মাঠের মাঝখানে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে যায়। দৃশ্যটা দেখেই থেমে যায় ভবদেব। সবগুলে মানুষের একই রং পোশাক কেন? আলখাল্লাই পরেছে কোনো তারা?

হঠাৎ ঠক্্ঠক্্ শব্দ। ভবদেব দেখতে পায় সাতটি খুলি দিয়ে অচেনা মানুষগুলো জোছনার ভেতর গেন্ডুয়া খেলছে। একটা খুলি যখন আর একটা খুলির সঙ্গে আঘাত খেতে থাকে তখন লোহায়-লোহায় ঘর্ষণের মতোই শব্দ ওঠে। ভবদেব এবার সত্যি ভয় পেয়ে যায়। সে বিড়বিড় করে রামনাম নিতে থাকে। ক্ষমতা হারানো মন্ত্রের মতো তার মুখে রামনামও বুঝি গুণ হারিয়ে ফেলে। উচ্চস্বরে সে কিছু বলতে চায় কালো কোর্তার লোকদের। কিন্তু পারে না। গলা ছেড়ে কোনো শব্দই বের হতে পারছে না/ভবদেব এই দীঘল মাঠটা ছেড়ে পলাতে চায়। অথচ পারে না। মাথার উপর হাটের সদাই-পাতির বোঝাটা সে দু’হাতে শক্ত করে ধরে।

এক সময় লোকগুলো খেলা বন্ধ রেখে ভবদেবকে ঘিরে দাঁড়ায়। ওদের সাতজনের হাতের তালুতে বসানো সাতটি খুলি। ওদের মধ্যে একজন গম্ভীরস্বরে বলে, ‘আমাদের চিনবে কি করে? যুদ্ধের সময় তো গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলে। আমরা তিনজন পাঞ্জাবি সেপাই, বাকিরা বাঙালি রাজাকার। পাকিস্তান ভেঙেছে যে ইসলামের দুশমনেরা, ওরাই আমাদের খুন করে। আমরা তোমাদের শান্তি দেব না, তোমাদের আজাদীকে খান খান করে দেব। রক্তে ভাসিয়ে দেব এই দেশ। রাজাকারদের পুনরায় ক্ষমতায় আনব।’

এবার তারা মাথার খুলিগুলো মাটিতে রেখে আলখাল্লার আড়াল থেকে হাতের খণ্ডিত হাড় বের করে আনে। এক হাতে হাতের হাড়, অন্য হাতে মাথার খুলি। কাঁসর বাজানার মতো খুলিতে হাতের হাড় দিয়ে গায়ের তাল তুলতে থাকে শব্দ করে। তাদের কণ্ঠে পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত-পাক সাদ জামিন সাদ…। হাফিজ জলন্ধরীর রচিত সংগীত। ভবদেবের মনে হয় মৃত্যু দুয়ারে। পাঞ্জাবি প্রেতাত্মাদের নির্দেশে ভয়ে ভয়ে মাথার ঝাঁকাটা মাটিতে নামিয়ে আনে সে। তাদের কণ্ঠের সঙ্গে মিলায়। কিন্তু মিলছিল না।

হঠাৎ সংগীত থামিয়ে অট্টহাসিতে ভেঙে পড়ে পাঞ্জাবি সেপাই আর রাজাকারদের প্রেতাত্মা। ওরা বৃত্ত ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে। পুনরায় মুক্তিযোদ্ধাদের মাথার খুলি দিয়ে গেন্ডয়া খেলা শুরু করে দেয়। ভবদেব পালাতে চায়। ছুটতে চায়। কিন্তু ছুটতে কোন দিকে? ছোটার মতো গায়ের জোর, মনের বল কি আছে তার? মনে হয় প্রেতাত্মারা তার শরীরের সব রক্ত চুষে নিয়ে গেছে। এই অসাড় শরীর নিয়ে পালাবার জো নেই। সে এতটাই ভয়ার্ত হয়ে যে, ইচ্ছে করে প্রেতাত্মাদের কাছে হাত জোর করে ক্ষমা চাইতে। প্রাণের বিনিময়ে পাকিস্তান ভাঙার অপরাধের জন্য সে পাঞ্জাবি প্রেতাত্মাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে চায়। ওরা ক্ষমা করুক তাকে। সে নিজে তো অস্ত্র হাতে তুলে নেয়নি। সেদিন পলাতক। তবে দোষ কি তার? পর মুহূর্তেই মনে হয়, না সে ক্ষমা চাইবে না। কেন ক্ষমা চাইবে সে? বরং যুদ্ধে যোগ না দিয়ে পালিয়েছিল বলে আক্ষেপে ভেঙে পড়ে সে। বরং সে বিড়বিড় করে শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ক্ষমা চায়। ক্ষমা করুক ওরা তাকে।

ঠিক তখনই সে দেখতে পায় মাঠশূন্য। কেউ কোথাও নেই। জোনাক রাত ফক্ফক্ করে। এবার সে হাঁটার চেষ্টা করে। বুঝতে পারে না রাত কত প্রহর। হঠাৎ তার কানে আসে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ। কিন্তু কিছুই দেখতে পায় না। মুহূর্তের জন্য দাঁড়িয়ে পুনরায় হাঁটতে থাকে। সত্যি সে এবার পশ্চিম প্রান্ত থেকে তার দিকে ছুটে আসতে দেখে একজন অশ্বারোহীকে। জোনাকরাতের অশ্বারোহী। ভবদেব মাঝখানে। চারপাশে বৃত্তের মতো ঘুরছে ঘোড়সওয়ার মাথায় পাগড়ি। রাজপোশাক। হাতে উন্মুক্ত তরবারি। জোছনায় ঝিলিক মারে তরবারিটি। এ কোন যুগের কোন রাজপুরুষ!

এ যেন এক যাদুমন্ত্রের দুনিয়া। এ দুনিয়ার সঙ্গে এর কেনো মিল নেই। দৃশ্যমান দুনিয়াটার পলকে অদল বদল ঘটে। ভবদেব যেন জমে পাথর হয়ে যায়। সে স্পষ্ট দেখতে পায় তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে অশ্বারোহী একজন রাজপুরুষ। তার হাতের তরবারি ডগায় ঝুলছে একটি নরমুণ্ড। ঠিক সেই কবে শোনা। ইরফান মাস্টারের মুখে শোনা কারবালার গল্পের মতো। সীমারের বর্শার ডগায় হোসেনের মস্তক! হায় হোসেন।

আমাকে চিনতে পারছিস? আমি বাংলার দু’দিনের নবাব মীর জাফর জানিস আমার তরবারির ডগায় কার কর্তিত মুণ্ডু? নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার’, বলতে বলতে মীর জাফর অট্টহাসিতে ভেঙে পড়ে। ভবদেব দেখতে পায় নবাব সিরাজের কর্তিত মস্তক থেকে টস্টস করে তাজা রক্তের ফোটা ঝরে পড়ছে। রক্তে ভিজছে জোনাক পাড়া মাঠের ঘাস।

‘সিরাজের কাটা মুণ্ডে এত রক্ত? যেন আর্তনাদ করে ওঠে ভবদেব। কিন্তু তার এই অস্ফুট শব্দের প্রশ্নের উত্তর আসার পূর্বেই সে দেখতে পায় নবাব সিরাজের কাটামুণ্ডটি আকাশে ওড়ছে। চুইয়ে রক্ত ঝরছে। সেই রক্তের রঙয়ে মাঠের জোনাক লালবর্ণ ধারণ করে। লাল জোনাকে দীঘল মাঠ ভেসে যায়। অথচ আকাশে গণনা করার মতো একটিও তারা নেই। চাঁদও আকাশের মহাশূন্যতায় অন্ধকারের সঙ্গে গলে গলে একাকার হয়ে গেছে।

‘আমি আবার ফিরে এসেছি, মীরজাফর হয়েই আসব বারবার স্বাধীন হলেও আমার হাত থেকে তোদের মুক্তি নেইরে বাঙাল’, হা-হা অট্টহাসিতে ভেঙে পড়ে মীরজাফরের গলা। তার ঘোড়া প্রচ-বেগে ছুটছে পূর্বদিকে এক সময় সেই অশ্ব আর রাজপুরুষ নিরাকার হয়ে যায়। জোনাককাল হারিয়ে যায়। দীঘল মাঠের দীঘল অন্ধকারের দুর্লঙ্ঘ্য এক বলয়ের ভেতর ভবদেব বন্দি হয়ে পড়ে।

 

॥ কুড়ি ॥

রাত ফুরিয়ে ভোর নামলেই গ্রামাবাসীরা খুলির মাঠ থেকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করে ভবদেবকে। তার সদাই-পাতি সবই অক্ষত। কিন্তু সে নির্বাক। ফ্যালফ্যাল করে কেবল সবাইকে দেখে। বেলা একটু বাড়লে হঠাৎ সারাটা গ্রাম নিঃসাড় হয়ে যায়। রেডিওতে এমন এক সংবাদ প্রচার হতে থাকে ঘন ঘন, তখন ভবদেবকে সবাই যেন ভুলেই যায়। খুলির মাঠের খবর শুনে দীঘল মাঠ পেরিয়ে ইরফান মাস্টার ভবদেবের সন্ধানে এ গাঁয়ে আসে। কেননা মাস্টার তার রাতের সঙ্গী ছিল। নিশ্চুপ ভবদেবকে মাস্টার বলে, ‘ভদা, তুমি যখন খুলির মাঠে রাতের বেলা জ্ঞান হারিয়ে পড়েছিলে, ঠিক তখনই ঢাকা শহরে জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়, আশ্চর্য, কেউ কি তোমাকে এখনও এই সংবাদ দেয়নি?’

এবার ভবদেবের ভয়ের আচ্ছন্নতা হঠাৎ কেটে যায়। খুনির মাঠে প্রেত রাজাকার আর পাঞ্জাবি সেপাইদের শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের মাথার খুলি নিয়ে গেন্ডুয়া খেলার দৃশ্য দেখে সে যেমনি চমকে ওঠেছিল, মাস্টারের মুখে ঢাকার সংবাদ শুনে তেমনি শিউরে ওঠে। তার মুখের বন্ধ দুয়ার খুলে যায় হঠাৎ, ‘একি বলছেন মাস্টার সাহেব, নেতার কি মৃত্যু আছে? নেতাকে কেউ হত্যা করতে পারে না, কোনো বাঙালি না।’

কেননা, অন্য অনেক মানুষের মতো ভবদেবও জাতির পিতার উপর দেবত্ব আরোপ করেছিল। এক কল্পজগতের অতিমানবের দ্যুতির বলয় দিয়ে ঘিরে রেখেছিল। তাকে কেউ কি হত্যা করতে পারে? তিনি কি কখনও ভুল করতে পারেন?

ইরফান মাস্টারের কথায় এক ভূকম্পনে সেই কল্পজগতের দেয়াল ভেঙে খান খান হয়ে যায়। সত্যি তিনি নিহত হয়েছেন। সপরিবারে। তিনি আগুনের তৈরি নন, বরং মাটির। তিনি অজাগতিক শরীরের নয়, বরং জাগতিক রক্তমাংসের।

তারপর ইরফান মাস্টার এবং সমবেতদের সামনে খুলির মাঠে যা যা ঘটেছিল তার সবই বর্ণনা করে ভবদেব। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত রাজাকার আর পাঞ্জাবি সেপাইদের প্রেতাত্মার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে মাঝখানে দু’বার থেমে যায় ভবদেব। সে যখন অশ্বারোহী নবাব সিরাজের সেনাপতি মীর জাফরের প্রেতাত্মার কথা জানায় তখন ইরফান মাস্টার প্রায় চিৎকার করে ওঠে, ‘একি বলছ ভবদা? বত্রিশ নম্বর বাড়িতে জাতির পিতাকে তা হলে কি মীরজাফরের প্রেতাত্মাই হত্যা করেছে? হত্যা শেষে খুলির মাঠে তোমাকে সেই বিশ্বাসঘাতক সতি কি নিজের সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়ে গেছে?’

তখন সমবেতদের মধ্যে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন স্বর একই সঙ্গে ধ্বনিত হয়। একটি বিলাপের, দ্বিতীয়টি আক্ষেপের এবং তৃতীয়টি অস্ফুট হাসির। কে হাসে? এত নিষ্ঠুরতা কার? ইরফান মাস্টার ধরতে পারে না। ভবদেবও হাসির উৎসস্থান সেই কণ্ঠটি চিনতে চায়। কিন্তু বুঝতে পারে না কে হাসার চেষ্টা করেছে। সে ভাবতে থাকে তবে কি মীরজাফরের প্রেতাত্মা অদৃশ্য শরীরে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে? এই বিষণ্ন প্রহরের নীরবতার ভেতর বাইরে গবাদিপশিুর পায়ের খুরের শব্দ শুনতে পায় ভবদেব। ঠিক যেন গতরাতে খুলির মাঠে শোনা মীরজাফরের ঘোড়ার খুরের শব্দের মতো।

খুলির মাঠের ভৌতিক ঘটনাবলির সঙ্গে কি জাতির পিতা হত্যার কোনো পরম্পরা রয়েছে? কেননা ঘটনাগুলো ঘটেছে একই রাতে, একই সময়। মানুষগুলো হতভম্ব! খুলির মাঠ আর জাতির পিতার হত্যার তুফান এলাকাটাকে উলটপালট করে দেয়। গিরিশের কানে পৌছলে দু’গ্রাম পেরিয়ে ভবদেবের বাড়ি পৌঁছে সে। কেন না, স্ত্রী ভগবতীর কাছে সে অপরাধী যে রয়েছে। ভগবতীর বিশ্বাস তার ভীতু স্বার্থপর স্বামী অসুস্থ শিশু কন্যাকে গ্রাম ছাড়ার পথে পরিত্যাগ করেছে। সে আরও বিশ্বাস করে, সত্যি যদি তার কন্যা মৃত হতো তবে এতদিনে সে নিশ্চয়ই মায়ের শূন্য গর্ভে ফিরে আসতো। ভগবতী অপেক্ষা করেছে এবং মৃতকন্যার পুনর্জন্মের জন্য প্রায় প্রতিরাতে গিরিশের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। সেই মিলনে কোনো আনন্দ নেই, কেবল একটা গভীর অন্ধকার অনিশ্চিৎ স্বপ্ন। একটা অভ্যাস। খাদ্যগ্রহণ আর প্রাতঃক্রিয়ার মতোই।

বাড়ি ফিরে স্ত্রীর কাছে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলে সে কেঁদে ওঠে। ইনিয়ে বিনিয়ে বলে, ‘আমার মেয়ে ঠিকই যদি মারা যেতো তবে তার প্রেতাত্মাও আমার কাছে নানা রূপ নিয়ে বারবার ফিরে আসতো। খুনির মাটে ওরা কি আসেনি?’

গিরিশ স্ত্রীকে বুঝাতে চায়, যেমনটা সে গ্রামের বাউলের মুখে শুনেছে, ‘যে  পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যায় সে আর মায়া-মমতা-দু:খ-কষ্টের পৃথিবীতে ফিরে আসে না। মুনি-ঋষির বাক্য কি মিথ্যা?’

ভগবতী এবার উচ্চৈঃস্বরে বিলাপ কাটতে থাকে এবং স্বামীকে এই বলে অভিশাপ দিতে থাকে যে, মানুষটা মিথ্যাবাদী। কেননা একবার বলে তার মেয়ে পুনর্জন্ম নিয়ে ফিরে আসবে, আবার বলে পিরতে পারেনা কখনও।

দুশ্চিন্তায় পড়ে গিরিশ। সত্যি কি শিশুকন্যা পরিত্যাগের সময় জীবিত ছিল? অন্ধকার অচেনা পথে ভয়ার্ত নিরুদ্দেশ যাত্রায় সে কি তাকে পরিত্যাগ করে  মহা অন্যায় করেছে? ঈশ্বর তাকে ক্ষমা করুন। কেননা গর্ভধারিনী ভগবতীর চেয়ে ঈশ্বরকেই তার অধিক ভয়। ভগবতী স্বামীর উপর নির্ভরশীল স্বামী প্রতিপালিত এক দুর্বল নারী মাত্র। ঈশ্বর মহাশক্তিমান। তাই তার কাছেই আনত হয় সে।

সেই মহাশক্তিমান ঈশ্বরের সঙ্গে কার যোগাযোগ রয়েছে? পাগল শিবুর নয় কি? শিবু তান্ত্রিক হয়ে গেছে। অনেকে বলে সে নাকি ভবিষ্যতের কথা বলে দেয়। এমনও গুজব রটে যে, জাতির পিতা যে নিহত হবেন, একথা নাকি সে গ্রামের কাউকে জানিয়েছিল। কিন্তু কে সে?

এর উত্তর পাওয়া গেল না। সেই শিবু পাগলা সত্যি কি বলে দিতে পারবে গিরিশের কন্যার পরিণতির কথা? জেনেও যদি না বলে, গিরিশের কি করার আছে?

শিবুর জীবনটা রহেেস্য ঢাকা। সে সন্তানহীন। তার স্ত্রী পার্বতী সন্তান জন্ম দানে অক্ষম, বাঁজা। বিয়ের দশ বছর কেটে গেলেও তার পেটে সন্তান আসেনি। কিন্তু পাড়ার মেয়েরা কানাকানি করে শিবুর বৌ পার্বতী নাকি বলেছে সে মোটেই বাঁজা নয়, বরং তার স্বামী শিবুই অক্ষম পুরুষ। আবার এটাও পাড়ার লোক লক্ষ্য করেছে যে, দীর্ঘদিন পার্বতী বাপের বাড়ি বেড়িয়ে আসার পর হঠাৎ তার বাড়িতে একজন যুবক অগন্তুকের আবির্ভাব ঘটে। দিন দু’এক কাটিয়েই সে আবার অদৃশ্য হয়ে যায়। পুনরায় তার আগমন ঘটে। শিবু পড়শিদের বলেছে যুবকটি নাকি তার স্ত্রীর দূরসম্পর্কের দাদা। এটাও পড়শি নারীগণ খেয়াল করেছে, যত দিন সে শিবুর বাড়ি কুটুম হয়ে কাটায়, ততদিন খুব হাসিখুশি আর চঞ্চলমতি হয়ে ওঠে পার্বতী। সত্যি যুবকটি গৃহত্যাগ করলেই কেমন যেন উদাস হয়ে পড়ে সে। কাজে থাকে না মন, চোখে নামে না ঘুম।

এক অমাবস্যা তিথিতে শিবু পড়শিদের জানায় তার স্ত্রী দেবী কালীর দর্শন পেয়েছে। কখনও সে শান্তকালী কখনও রণচন্ডি কালী, একই শরীরে দেবীর বহুরূপ। পড়শি নারীগণ তাকে দেখতেও আসে। কিন্তু শিবু পাগলার দাবির সঙ্গে মিল খুঁজে পায় না কেউ। পার্বতী আগে যেমনটা ছিল, এখনও তাই। এক সময় পড়শিরা  ওর বিষয়টি ভুলেই যায়। কিন্তু কথিত সেই যুবক আত্মীদের ঘনঘন আগমন তাদের চোখ এড়ায় না। বিষয়টা সবাই স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেয়। এমন তো কতই হয়।

মাসকয়েক পর হঠাৎ একদিন গ্রামাবসৈিদর শিবু পাগলা জানায় তার স্ত্রী পার্বতীর মৃত্যু ঘটেছে। এর পূর্বে দু’তিন মাস পার্বতীকে বাড়ির বাইরে খুব একটা দেখেনি কেউ। সে অনেকটা বোবা হয়েই ক’মাস গৃহবন্দি হয়েছিল। পাড়ার সবার ধারণা কালীর দর্শন পাওয়া পার্বতী হয়তো দেবীর তুষ্টির জন্য কোনো ব্রত পালন করছে। কিন্তু হঠাৎ মৃত্যু সংবাদ সবাইকে চমকে দেয়। সংবাদ পেয়ে গ্রামবাসী শিবুর বাড়ি এসে দেখতে পায় বিছানায় পার্বতীর মৃত দেহ সটান পড়ে আছে। শাড়িটা অগোছালো। কিন্তু তার পেট কিছুটা স্ফীত-ফোলা। শিবুর দাবি তার স্ত্রী দেবীর পূজায় অনিয়ম করেছে। তাই দেবীর সহচরী ডাকিনী আর যোগিনী পিশাচিরা গলাটিপে ওকে মেরে ফেলেছে।

কারো চোখ এড়ায় না যে, পার্বতীর গলায় নখের দাগ। কিন্তু তার পেট উঁচু কেন? এই প্রশ্ কেউ শিবুকে করেনি বলে উত্তরও অজানা। পুরুষগণ এ বিষয়ে আগ্রহী না হলেও দু’একজন মহিলার মনে প্রশ্ন জাগে, তবে কি পার্বতী গর্ভধারণ করল? যদি তা সত্য হয় তবে কে তার পেটে সন্তান দান করেছে? হয়তো এই সন্দেহ মিথ্যাও হতে পারে। অনেক্ষণ মরে পড়েছিল বলে হয় তো পেটটা ফোলে ওঠেছে।

এই ঘটনার পর থেকেই শিবুর চরিত্রে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। সে হঠাৎ নীরব হয়ে যায়। কাজেও মন নেই। নিজেকে তন্ত্র সাধক বলে দাবি করে। সে সিদ্ধি লাভ করেছে এবং ত্রিকালদর্শী হয়ে গেছে। অতীত বর্তমান, ভবিষৎ সবই তার জ্ঞাত। কেউ তার দাবি সমর্থন করে, কেউ বা হেসে উড়িয়ে দেয়। কিন্তু পার্বতীর মৃত্যুরহস্যও কারো মনে প্রশ্ন জাগায়নি।

সেই শিবু পাগলার কাছেই ছুটে যায় গিরিশ। শিবু তাকে জানায় চারদিন বাদেই অমাবশ্যার রাত। সে রাতে ধ্যানে বসবে সে এবং জেনে নেবে গিরিশের মেয়ের সংবাদ। চারদিন ফুরিয়ে অমাবস্যার রাত আসে। রাত শেষে ভোরবেলা গিরিশ ছুটে যায় শিবুর বাড়ি। শিবু তাকে জানিয়ে দেয় তার মেয়ে জীবিত নেই। ধ্যানের মধ্যে গিরিশের মৃত মেয়ে যে শিবুর সঙ্গে সাক্ষাৎ দিয়েছে তাও জানায় সে। গিরিশ শিবুর কথা ষোল আনাই বিশ্বাস করেছে এবং বাড়ি ফিরে স্ত্রী ভগবতীকে জানালে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। তার বিলাপ যেন শেষ হতেই চায় না। কেন না শিবুর কথা সে বিশ্বাস করে না।

শিবু হাসে। একলাই হাসে। পর মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে যায়। অপলক তাকিয়ে থাকে দূর দিগন্ত রেখায়। ওখানে কোনো একজনকে দেখতে পায় সে। কিন্তু এতদূরে অর্ধেকটা আসমান গাছ-গাছালির উপর কাত হয়ে পড়ে আছে এমনিভাবে যে, সে আর কারও অস্তিত্বের বিন্দুমাত্রও আভাস পায় না। কাকে খোঁজে সে? কাপালিকের তন্দ্র সাধনার মতো আপন আত্মা, মন আর হৃৎপিন্ডের স্পন্দনকে করোটির ঠিক মধ্যবিন্দুতে স্থির করলে কি একটি শূন্যবৃত্ত সৃষ্টি হয়? সেই শূন্যতায়ই কি তার স্ত্রী পার্বতীর মুখ ভেসে ওঠে? মৃত পার্বতীর শরীরে আত্মা প্রবেশ করে? সে তাকে দেখতে পায়, বাক্যালাপ করতে পারে? জিজ্ঞেস করতে পারে কে তাকে হত্যা করেছে? শিবু তার প্রশ্নের উত্তর না পেলেও পার্বতী তাকে গর্ভের জীবিত ভ্রুণটিকে দেখায় কি?

পার্বতীকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করেছে? কে তাকে গর্ভবতী করেছে? তার বীর্যথলির সব শুক্রকীটই মৃত। তবে জীবন্ত শুক্রকীট কে দান করল পার্বতীর গর্ভে? সেই আগুন্তুক আত্মীয় কি? কিন্তু কোনো দিন যুবকটিকে সে পার্বতীর সঙ্গে মিলিত হতে দেখেনি তো? কেবল দু’জনের উচ্চ হাসির বরই দু’একবার শুনেছে। শিবু এটাও বিশ্বাস করে পার্বতীর গর্ভধারণের রহস্য সে আর কোনোদিনই উদঘাটন করতে পারবে না। যেনো এটা এ দুনিয়ার বিষয় নয়, অন্য দুনিয়ার।

কিন্তু পার্বতীকে হত্যা করলো কে? যেমনি সন্তান লাভের উদ্দেশ্যে পার্বতীকে সঙ্গে নিয়ে শহরের ডাক্তারের কাছে গিয়ে জেনেছিল নিজের মৃত শুক্রকীটের কথা, পার্বতীর মৃত্যুর পর কি তেমনি কোনো ডাক্তার ডাকতে পারত না? তখন এ কথা তার মনেই হয়নি এবং কেউ তাকে তা বলেও দেয়নি। এখন আবছা-আবছা তার মনে পড়ে, গভীর রাতে ঝমাঝম বৃষ্টির সময় হ্যারিকেনের আলোয় কে একজন পার্বতীর গলাটিপে ধরেছিল। সে নিজে পাশেই দাঁড়ানো ছিল, হ্যারিকেনটা উঁচিয়ে ধরে।

কে ছিল সে? হ্যারিকেন উঁচিয়ে কি সে তাকে চেনার চেষ্টা করেছিল? কিন্তু বাধা দেয়নি কেন সে? ঘাতককে খুন করার ইচ্ছা কেন জাগাল না তার মনে? শিবুর আবার এমনও মনে হয় পার্বতীকে হত্যার পর ঘাতক তার পাশেই শুয়ে পড়েছিল। তার একটি হাত পার্বতীর ভরাট পেটের উপর মরা সাপে মতো নিশ্চল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু বৃষ্টি থেমে গেলে, হ্যারিকেনের তেল ফুরিয়ে গেলে এবং রাত পোহালে সে দেখতে পায় পার্বতীর পাশে সে নিজেই শুয়ে আছে। তার ডান হাত পার্বতীর উঁচু পেটের উপর মরা সাপ হয়ে পড়ে আছে। তা হলে ঘাতক কে? জানতে চায় শিবু।

 

॥ একুশ ॥

এক ত্রিসন্ধ্যায় আলো আঁধারীর ভেতর গাঁয়ে ফেরে তপন। পিতা-মাতাকে সে এই বলে আশ্বস্ত করে যে, জাতির পিতা হত্যার পর অনেককিছুই বদলে গেছে। তাদের বাহিনী বিলুপ্ত হলেও তারা নিয়োগ পেয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে। অধরচন্দ্র ঈশ্বরের কাছে এই বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে যে, আর যা-ই হোক এখন আর দমনের নামে তার ছেলেকে রক্তের খেলা খেলতে হবে না। একটা যুদ্ধ, কেমন করে যেন সব পালটে দিয়ে গেছে। শিশুকালে যে ছেলে শেয়ালের ডাকে মায়ের বুকে ঝাপিয়ে পড়ে চোখ বুঁজে কাঁপতে থাকতো, কৈশোরে বাড়িতে কুটুম আসলে যে কিনা লাজে-ভয়ে ঘরের কোণে ঘাপটি মেরে থাকতো, সে-ই গেল মুক্তিযুদ্ধে, হলো রক্ষী বাহিনীর সদস্য, বি-ডি-আর-এর সৈনিক? ঘরে ঘরে, গ্রামে গ্রামে এমনি বদলে যাওয়া মানুষ? কী আশ্চর্য! কোন যাদু বলে যুদ্ধটা মানুষকে এমনি বদলে দিল?

মা চন্দ্রমুখী তো ছেলের সামনে দাঁড়ালে নিজের অজান্তেই হঠাৎ চমকে ওঠে। লম্বা লম্বা দম টানে। ছেলের শরীরে মানুষের রক্তের গন্ধ নেই তো? তপন বুঝতে পারে কি পারে না, কিছুটা অবাক হয়ে মায়ের কাছে জানতে চায়, ‘তুমি কি আমাকে ভয় পাও মা? বড় হয়েছি বলে কি লজ্জা?’

‘ভয়? ভয় পাব কেন? মায়ের সঙ্গে ছেলের সম্পর্ক কি ভয়ের?’ চন্দ্রমুখী অনুচ্চ স্বরে উত্তর দেয়। কিন্তু ছেলের কথাটা তো একেবারে মিছে নয়।

তপন বুজতে পারে পিতা-মাতার পুরাতন পৃথিবীটা যে ভেঙে খান খান করে দিয়ে গেছে, নয় মাসের ভয়ঙ্কর এক যুদ্ধ আর গণহত্যা, সামনে ঠেলে দিয়েছে এক নতুন দুনিয়া, বিগতকালের মানুষগুলো তা বুঝতে অক্ষম। তাদের চিরচেনা সেই রামায়ণ-মহাভারতের পৃথিবীটা যে আর নেই তা বুঝাবে কেমন করে? পিতা-মাতা আর তার মাঝখানে একটা দেয়াল উঠে দাাঁড়য়নি তো? তপনও স্পষ্ট বুঝতে পারে না।

তপন খুব অবাক হয়। এ গাঁয়ের, এ তল্লাটের কামার, কুমার, জেলে-কৈবর্ত, নমঃসূদ্র, কায়েত, বামুন জাত-পাতের ভিতর যে হাজার বছরের পুরাতন দেয়ালটা ছিল, তা কি নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে? দেশ ভাগ হলো সাতচল্লিশের, দাঙ্গা হলো, দুর্ভিক্ষ হলো, কই, সেই প্রাচীন দেয়াল তো এতদিন অক্ষত-অনড় ছিল! আর এই একাত্তরের যুদ্ধটার এমন কি শক্তিছিল, যার ফলে বর্ণভেদটাকে নাড়িয়ে দিল? যাদের ঘরে জলস্পর্শও ছিল নিষিদ্ধ, সেই নমঃসূত্রের মেয়েই কিনা ঘর করতে যায় কায়েতের ছেলের হাত ধরে? তপন তো এত-শত বুঝে না। লেখা পড়াটাইবা কতটা এগিয়েছিল। কতটুকুই বা এগোতে পেরেছে। যতটাই বা শিক্ষা নিয়েছে ইতিহাসের, তাতেই বুঝতে পারছে শ্রী চৈতন্য, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, এমন কি পিতার মুখে শোনা ইংরেজ যুগের কমিউনিস্ট ভবানী সেন শত চেষ্টা করেও জাত-পাতের যে মীমাংসটা করতে পারেনি, একাত্তরের যুদ্ধটা কি এক ধাক্কায় জাত-বিভোদের শেকড়টা কেটে ফালা ফালা করে দিল? তা না হলে তার কমান্ডার ক্যাপ্টেন আজিজ কেমন করে তার গাঁয়ের কন্যা দায়গ্রস্ত বামুরে মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ের প্রস্তাব দেন?

তপন তার বাবার মুখে কথাটা শুনে তো তাজ্জব! তাদের পুরোহিত ঠাকুরের মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ের প্রস্তাব ঠাকুর নিজেই দিয়ে বসে? আগে ছিল পাত্রের চেয়ে জাত বড়। এখন জাতের চেয়ে পাত্র। কদর ছিল জোতদার পাত্রের, এখন চাকুরিঅলা। কি যে কাল এলো, সেই পায় না অধরচন্দ্র/ছেলের মুখের দিকে তাকায়। বুঝে ওঠতে পারে না। তাই ছেলেকে বরে, ‘চাষা মানুষ আমি তুই চাকরিঅলা, তোকে যে আমি বুঝতে পারিনারে বাপ, তুই যদি অচেনা হয়ে যাস তবে কেমন বাপ আমি?’

তপন হাসে, পিতার দিকে মাথাটা ঝুঁকে নিয়ে উত্তর দেয়, ‘আমি ঠিক আছি বাবা, ভালো করে তাকাও আমার দিকে, চিনতে ভুল হবে না।’

‘বলছিলাম কি বাবা, তোর বিয়ের কথা, কেন মেয়ে যে তোর সঙ্গে মানাবে, বুঝতে পারি না। যুদ্ধে যদি না-যেতি, চাকরি না-করতি, তবে ঠিকই বুঝতাম, এখন কেমন আওড়া-কাওড়া লেগে যায়,’ ছেলের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলে যায় অধরচন্দ্র। মনে প্রশ্ন উঁকি দেয়, কৃষক পিতা কি সৈনিক সন্তানকে সত্যি বুঝতে অক্ষম?

‘ওসব থাক বাবা, সময় হলে আমিই বলব, রাত বাড়ছে ঘুমোতে যাও’,

বলতে বলতে ঘুমের প্রস্তুতি নেয় তপন। অধরচন্দ্র ওঠে দাঁড়ায়। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা চন্দ্রমুখী কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যায়। যাক, পরে বলা যাবে।

ভোর লে তপন বুঝে ওঠতে পারে না কি করবে। বাড়ি ফেরার আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এ যাত্রা আরতি সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে না। কিন্তু এখন মন তো মানছে না। ইচ্ছে হয় এক পলক দেখে আসতে। ছুটে যেতে ইচ্ছে হয় ঢেউখেলানো মাঠটা পেরিয়ে লিচু গাছে ঢাকা মাটির দেয়াল তোলা টিনের চালের ওই বাড়িটার দিকে। কেন যাবে সে? আরতি তো তাকে মৃত বলেই জানে। বিধবার মতো মৃত স্বামীর শোক পালন করছে। ওই দিন কোন পরিস্থিতিতে কেমন করে বাড়িটি ছেড়ে পথে নেমেছিল, তা এখন তার কাছে এলোমেলো, অস্পষ্ট। তবু তপন ছুটে যাক ওই দিকে, দেখে আসুক পলাতক স্বামীর বিধবার বেশে দিন কাটানো একটি মেয়েকে।

আরতিদের বাড়ি পৌঁছলে মা অঞ্জনা বিষণ্ন গলায় জানায় তার মেয়ে ঠাকুর ঘরে। শিব পূজা দিচ্ছে। ঠাকুর ঘরের দুয়ার বন্ধ করে এতেই চলে তার পূজা। দীর্ঘ সময়। মেয়ের হঠাৎ শিবভক্তির বাড়াবাড়ির কথা মায়ের মুখে শুনে তপন বুঝতে পারে ইতিমধ্যে আরতির মনের ভেতর অন্ধকার এক জগৎ তৈরি হয়েছে। সেই ঘন অন্ধকারের জগতের কল্পলোকে শিব নামের আদি দেবতার আরতির স্বামী-পুরুষে রূপান্তর ঘটেছে। এ বড় ভয়ঙ্কর জগৎ। সেই জগতে যে একবার নিজের অজান্তেই পা ফসকে পড়ে যায়, নিচ্ছিদ্র সেই অন্ধকার গুহা থেকে উদ্ধার পেয়ে আলোর জগতে ফেরা তার জন্য দুর্লঙ্ঘ্য। দুঃসাধ্য।

বুকটা কেঁপে ওঠে তপনের। সীমান্ত পাহারার সময় অন্ধকার রাতে হঠাৎ ঝোঁপ-ঝাড়ে পাতার খস্্খস্্ শব্দ হলে নিজের অজান্তেই যেমনি অভ্যাসের কারণে কাঁধের আগ্নোয়াস্ত্রে হাত নেমে আসে। তেমনি দশা তার। ইচ্ছে হয়, ঠাকুর ঘরের দুয়ার ঠেলে অন্ধকার গৃহগর্ভ থেকে হাত ধরে টেনে আরতিকে মুক্ত আলোর উঠোনে বের করে আনতে। কিন্তু এ যে অধর্ম! এই অধিকার আরতির শিব রূপ কল্পিত স্বামী যে দেয়নি তাকে। তাই ধৈর্যের বিকল্প নেই। কিন্তু ধৈর্যটা যে তার বুকটা ইঁদুরের ধানের ছড়া কাটার মতো কাটছে। আবার অন্য মনে ভাবে, আরতির সে কে? কি অধিকার আছে তার? কে দিয়েছে অধিকার?

তারও অনেক পড়ে ঠাকুর ঘরের দুয়ারে শব্দ হয়। দুয়ার খুলে যায়। ঘরের আবদ্ধ অন্ধকারের একটার পর একটা ঢেউ আচমকা আছড়ে পড়ে তপনের চোখে। অন্ধকার পালসে হয়ে এলে তপন দেখতে পায় তার সামনে দাঁড়িয়ে সংসারত্যাগী এক সন্ন্যাসিনী। লাল পেড়ের ধবধবে সাদা শাড়ি পরা, কপাল থেকে চুলের গোড়া অবধি সিঁদুরের বিশাল প্রলেপ। ঘামে ভেজা সিঁদুর গলে যেন নদীরেখা। তপনের মনে হয় মাথা, কপাল নাক আর গাল বেয়ে বুঝি তাজা রক্ত ধারা বইছে। নিজের অজান্তেই সে অস্ফুট স্বরে যেন উচ্চারণ করে, ‘কপালে এত রক্ত! এ কিসের রক্ত আরতি? তোমার, না দেবতার?’

‘তুমি কি দেব-দেবীতে বিশ্বাসী?’ আচমকা আরতির প্রশ্নে ভেঙে খানখান হয়ে যায় তপনের অস্তিত্ব। সে নির্বাক পাথর হয়ে যায়। বুঝতে পারে এভাবে বলা ভুল।

সারা পিঠে ছড়িয়ে দেয়া চুলে বামহাতের আঙুল চালাতে চালাতে নির্বিকারভাবে আরতি পুনরায় বলে, ‘আমি শৈবসন্ন্যাসিনী ভৈরবী নই, এ গাঁয়ের এক সাধারণ মেয়ে।’

তপন আচমকাই বলে ফেলে, ‘খোলা চুল বাঁধো আরতি, দেবী থেকে তুমি আমাদের এই গাঁয়ের পুরাতন আরতি হয়ে যাও। দেবী আমার অচে না, আরতি খুব চেনা।’

নিরুত্তর আরতি এবার ঘরে ঢুকে যায়। বেশখানিক পর বেরিয়ে আসে। হলদে শাড়ির উপর নীল বর্ণ ডোরাকাটা। কপাল সিঁদুর শূন্য। গ্রাম্য এক বালিকা। এবারও ভুল করে তপন। চিনতে পারে না। খোঁপা বাঁধা চুল। ব্লাউজহীন শরীর। শাড়ি ভেদ করে তার স্তনের দুটো বোঁটা ছোরার অগ্রভাগের মতো উদ্যত-স্পর্ধিত। অথচ তপনের কাছে মনে হয়, ওটা আরতির স্তন জোড়ার শীষ নয়, দেবতার থানে পোঁতা এক জোড়া শিবের ত্রিশূল। রক্তমাখা ত্রিশূল। উদ্যত ত্রিশূল।

জীবনে এই প্রথম যৌবন-চোখে তপন আরতির এমনি রূপ দেখে। এই প্রথম কোনো নারীকে সম্পূর্ণ অস্তিত্বের ভেতর আবিষ্কার করে। বিস্ময়করভাবে এমনটাও সে ভাবতে থাকে, এমন নারী-শরীরের সঙ্গে কোনো পুরুষের মিলন ঘটা সম্ভব নয়, কেননা পুরুষদেহ জ্বলে পুড়ে ভস্ম হয়ে যাবে।

আরতির মা অঞ্জনা মেয়ের পাশে বসে কাঁদে। মেয়ের নয়, নিজের ভাগ্যকেই বরং দোষারোপ করে। মায়ের বিশ্বাস যৌবনবতী নারীরা অগ্নিকু-। অথচ বুঝতে পারে না তার অগ্নিকু- মেয়ের শরীর আর দৃষ্টির আগুন কেমন করে হঠাৎ নিভে গেল। অগ্নিকু–আরতি যে নেভেনি বরং তার অন্তরের গহনে, আত্মার অস্তিত্বে আগুন দাউ দাউ জ্বলছে সংগোনে, তা বুঝতে পারে না মা। তপনের ভেতর বুঝা আর না-বুঝার দ্বন্দ্ব। সে শুনেছে, অপতৃপ্ত যৌন ক্ষুধা বা যৌন বঞ্চনা নারীকে এক অতিকল্প জগতের অন্ধকারে টেনে নেয়। সেই যৌনক্ষুধা আশ্রয় নেয় কল্পনার কোনো বৃক্ষ, পশু, পাখি, মৃত মানুষ কিংবা দেবতার উপর স্বামীত্ব আরোপ করে নারী প্রশান্তি পেতে চায়। এটা একটা অসুখ। তবে কি আরতি কোনো মনোযোগে আক্রান্ত? এ রোগের জীবাণু পেলো কোথায়?

খানিক ভেবে নিয়ে আরতির মাকে তপন বলেই ফেলে, ‘কাকি মা, আরতিকে ডাক্তার দেখান, আমি শুনেছি যারা দেবতাকে স্বামী মনে করে তাদের মাথায় গন্ডগোল আছে, তবে সত্য-মিথ্যা আমি জানি না। শহরের ডাক্তারই জানে সব।’

কথাগুলো শোনামাত্র জিভ কামড়ে ধরে হৈ হৈ করে ওঠে অঞ্জনা, ‘এমন কথা বলতে নেই তপন, ঠাকুর পাপ দেবেন, সবই তার ইচ্ছা।’

‘তা হলে আপনার মেয়ের কি আর বিয়ে হবে না?’ তপন জানতে চায়। তপনের এই প্রশ্নে এলোমেলো হয়ে যায় আরতির মা। বুঝতে পারে না কি উত্তর দেবে। এক সময় সে কেঁদেই ফেলে, ‘বাবা তপন, শিব ঠাকুরের অভিশাপের ভয়ে আমরা আরতির ইচ্ছাকেই মেনে নিয়েছি, জানিনা তার কপালে কি লেখা আছে, আমরা কি করতে পারি বাবা? কোন জন্মের পাপ মেয়ের, ভগবান জানে।’

চোখ মুছতে মুছতে আরতির মা উঠোনে নেমে আসে। এবার আরতি তপনের কাছে জানতে চায়, ‘এখন তুমি কত সহজে বাড়ি এসে আমার সামনে দাঁড়াতে পার, অথচ সেই রাতে আমাকে নিয়ে পালিয়ে যাবার সাহস পাওনি। আজ এত সাহস পেলে কোথা থেকে? উত্তরটা আজ আমার জানতে ইচ্ছা করে।’

তপন একটু ভেবে নিয়ে উত্তর দেয়, ‘সেদিন যা পারিনি, আজ তা পারছি। আজকের এই সাহসটা তো আমার অর্জন। যুদ্ধের কাছ থেকে পাওয়া। কেবল স্বাধীনতার জন্যই নয়, একটি মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যাবার সাহস অর্জনের জন্যও আমার যুদ্ধে যাওয়া, বিশ্বাস কর আরতি। জানি, আমার কথা আজ তোমার বিশ্বাস হবে না।’

‘তোমার সেই যুদ্ধের অর্জন তো আর কোনো কাজে লাগে না তপন, এটা যে কত সত্য তা দেখবে, এসো আমার সঙ্গে,’ বলতে বলতে আরতি ঘরে প্রবেশ করে। তপন তার পেছনে। কে জানে আরতির মনের গহনে কি লুকিয়ে আছে।

তপন বিস্ময়ের সঙ্গে দেখতে পায় দেয়ালের যেখানটায় তার মুক্তিযুদ্ধের ফটোটা টাঙানো ছিল, সেখানে তা নেই। ওখানে ঝুলছে দেবতা শিবের একটি ছবি। তপনের ফটোটা টেবিলের ওপর উল্টো করে রাখা। আরতি ছবিটা হাতে তুলে নিয়ে বলে, ‘আমিই নিয়ে এসেছিলাম, একদিন গিয়ে তোমার বাবার হাতে ছবিটা ফিরিয়ে দিয়ে আসব। তুমি কষ্ট পেওনা, তোমার এই যুদ্ধের ছবিটা আজ আর আমার প্রয়োজন নেই।’

তপন স্তব্ধ, যেন প্রাণশূন্য। পৃথিবীর সব কথার অরণ্য তার বুকের ভেতর দীর্ঘখরায় যেন শুকিয়ে গেছে। যেন কঠিন জীবাশ্ম-শিলায় পরিণত হয়েছে। নিজের অজান্তেই চোখ ঝাপসা হয়ে আসে তার। কষ্ট, অপমান নাকি অন্যকিছু, বুঝতে পারে না সে। অপলক চোখে দেখতে থাকে আরতিকে। ওকে চিনতে পারে না। এই না-চেনার গ্লানি তাকে পোড়ায়। সে ছাই হতে থাকে। আরতিও তাকে দেখছে। সেই কিশোরী বেলার প্রথম দেখার মতো। তপন বুঝতে পারে না। সে ঘর ছেড়ে বের হতে হতে অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করে, ‘তোমার কেন মরণ হয় না আরতি?’

 

॥ বাইশ ॥

ভয়ের উপসর্গ নিয়েই নাসিমা বাপের বাড়ি বেড়াতে আসে। শ্বশুর বাড়ির খবর, বিশেষ করে জামাই সুজাত আলির খবর, মায়না কত বাড়ল, দেশে ফিরছে কবে, তাদের বাড়িতে পাকা ঘরের জন্য ইট-সিমেন্ট উঠেছে কিনা, হাজারো খবর জানতে চায় মা। সব খবরই বলে নাসিমা। বাপের বাড়ি আসার সময় পথে ঘাটে যা যা দেখেছে কোনো কিছুই বাদ রাখেনি। বদলে যাওয়া গ্রাম, নাগরিক ইট-পাথর-সিমেন্ট-লোহা বোঝাই ট্রাকের ধূলো উড়িয়ে গ্রামযাত্রার কথাও বাদ যায় না। কিন্তু নাসিমার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা যা ধরতে পারেনি, এই প্রথম মায়ের চোখে তা ধরা পড়ে। মেয়ের উত্তরের ভেতর একই কথা বারবার বলা, ভুলকে শুদ্ধ করার বারবার চেষ্টা এবং চোখের ভেতর মা আতঙ্কের ছায়া দেখতে পায়। বুকটা কাঁপে মায়ের। মেয়েকে পরখ করতে করতে বলে, ‘ত্ইু কি মা ঘুমের মধ্যে পরি দেখতে পাস? মায়ের কাছে শরম কি, সত্য বল।’

‘না মা’, নির্বিকার উত্তর মেয়ের।

‘ঘরে স্বামী নাই, কোনো পরপুরুষের নজর তো পড়েনি?’ মা মেয়েকে মাথায়-গালে হাত বুলিয়ে আদর করে।

নাসিমা নিরুত্তর। মায়ের মনে ত্রিসন্ধ্যায় জিন দেখার ভয়। তাই বারবার একই প্রশ্ন করে মা। মেয়েকে আদর করতে অভয়ের কথা শোনায়।

খানিক উদাস মনে নাসিমা না কথা ভাবে। তারপর অপলক চোখে মাকে দেখতে দেখতে কোথাও যেন একটা আশ্রয় খোঁজে। এক সময় নাসিমা ব্যাংকের কাজে সদরে যাবার কথা এবং অন্ধকার রাতে বাড়ি ফেরার সমস্ত ঘটনা মায়ের সামনে তুলে ধরো মায়ের মুখে আঁলল। চোখের ভেতর অমাবস্যা-কৃষ্ণপক্ষের চন্দ্রকলা অদৃশ্যরাত। স্বর কাঁপে, ‘আল্লাহর কসম, কিছু কুফরি কাজ হয় নাই তো মা?’

নাসিমা স্বীকার করে, হতেও পারত। কিন্তু অন্ধকারে খড়ের গাদা থেকে বেরিয়ে আসা সাপের শীতল স্পর্শ তাকে রক্ষা করেছে। মা মেয়েকে বিশ্বাস করে। তাই বিড়বিড় করে বলে,’ ওটা সাপ নয় রে মা। খোদার তরফ থেকে ফেরেশতা সাপের সুরত ধরে তোকে সতর্ক করে দিয়ে রক্ষা করেছে।’

নাসিমার চোখে পানি। বিড়বিড় করে নিজের সঙ্গেই যেন কথা বলে, ‘বৃষ্টিতে আধাভেজা শরীরটার এত ঠান্ডার মাঝেও ক্যান যে হঠাৎ আগুন জ্বলে উঠ, আমি তার কি বুঝি? স্বামীর হাতে তুলে দেওয়া এই শরীরটার হেফাজত করা না জানি কত কঠিন গো মা।’

তারপর দীর্ঘ নীরবতা। মা সবই বুঝতে পারে। নিজেকে দিয়েই বুঝে। স্বামী পরবাসী নারীর শরীর ক্ষুধার্ত সাপের মতোই হিং¯্র। দমন করা বেদের পক্ষেও অসম্ভব। তাই সে নানা কথা ভেবে নিয়ে জানতে চায়, ‘জামাই দেশে ফিরবে কবে? রোজা না কোরবানির ঈদে?’

নাসিমা নিরুত্তর। তাই মা-ই বলে, ‘যে দিনই ফিরুক, সৌদি যাবার কাম নাই। আমার মায়ের বাড়ির দেশের খ্রিস্টান পাড়ার কত মেয়ে-পুরুষ দুবাই, মাস্কাট কাজ করে। প্রতিবছর বড়দিনে দেশে ফিরে। খ্রিস্টান বৌ-ঝিয়েরাও হাসপাতালের নার্স-আয়ার কাজ নিয়ে বিদেশ যায়। ইস্টারের পরবে প্রতি বছর বস্তা ভরা টাকা নিয়ে বাড়ি আসে। আমার জামাই বাপকেও পাঠাব, প্রতি ঈদে দেশে ফিরতে পারবেই।’

সপ্তাহ দুই মায়ের বাড়ি কাটিয়ে শ্বশুর বাড়ি ফেরার সময় আসে নাসিমার। মায়ের বুক কাঁপে। মেয়ের ভয় রোগ কাটাতে রাজাকার ফকিরকে ডাকার পরমর্শ দেয় স্বামীকে। নাসিমার বাবা গাঁয়ের প্রাইমারি শিক্ষক। সব শুনে বাধা দেয় স্ত্রীকে, ‘রাজাকার ফকির একটা জালেম। যুদ্ধে দিনে কি করেছে দেশের, মনে নাই? স্বাধীনের পর পালিয়েছিল, শেখ মুজিব খুন হলে পর গর্ত ছেড়ে বাড়ি ফেরে। তাছাড়া তাবিজ-কবজে আমার বিশ্বাস নাই।’

স্ত্রীকে স্বামী যুক্তি দিয়ে বলে শহরের কলেজে পড়তে যাওয়া বড় ছেলে ছুটিতে বাড়ি ফিরলে নাসিমাকে মনের ডাক্তার দেখাবে। সে সুযোগ আর আসে না। শ্বশুর এসে নাসিমাকে বাড়ি নিয়ে যায়। নাসিমা চলে গেলে তার মা বাপের দেশে বেড়াতে যায়। উদ্দেশ্য, হোটেলে কাজ করা খ্রিস্টান পাড়ার কাউকে ধরে জামাইয়ের একটা কাজের ব্যবস্থা করা। হোটেলের কাজে কষ্ট কম, ছুটিও মেলে। মরুভূমির রোদে জ্বলতে হয় না।

পিটার গমেজের ছেলে স্বপন গমেজ। বছরে দু’বার ফেরে দেশে। দুবাইয়ের আমেরিকান সাহেবদের পাঁচতারা হোটেলের বড় কুক। মোটা মায়না। ঠাটবাটই আলাদা। শহরের ফার্মগেটে অ্যাপার্টমেন্টের মালিক। বৌ বাচ্চারা ওখানেই থাকে। দেশে ফিরলে অর্ধেক সময় গ্রামের বাড়ি বাকি অর্ধেক শহরের অ্যাপার্টমেন্টে থাকে। গ্রামে না এসে পারে না, বৃদ্ধ বাবা রয়েছে, জন্ম দেবার দায় বলে কথা, তাছাড়া ভিটে-মাটি, জোত জমিন। বাপ-মাতো শহরে বেমানান। বৌটার কাছে বেওয়ারিশ বেড়াল-কুকুরের বাড়ি-রান্নাঘর বেদখল নেয়ার মতো উৎপাত। চীনে তৈরি প্রভু যিশুর ক্রুশবিদ্ধ খুদে পুতুল আর লন্ডনে ছাপা ঝকঝকে বাংলা বাইবেল। ছেলের হাতের এই উপহার বাপ-মায়ের কাছে স্বর্গের দুয়ার। ছেলে বৌ’র মন বুঝে বাবা-মা। আক্ষেপ থাকলেও তাই কষ্ট নেই।

স্বপন গমেজ খুদে আদম বেপারিও বটে। বছরে দু’চারটা হোটেল বয় বাংলাদেশ থেকে দুবাইয়ের পাঁচতারা হোটেল কিংবা আরবিয় রেস্টুরেন্টে সাপ্লাই দিতে পারলে বেশ মোটা টাকা মেলে। ঘনঘন দেশে ফেরার বিমান ভাড়ার পরেও পকেটে মন্দ থাকে না। দুবাই মার্কেটের ইন্ডিয়ান জুয়েলারি থেকে বৌর জন্য অলঙ্কারও কেনা যায়। তাই স্বপন গমেজ নাসিমার মায়ের আবদারটা লুফে নেয়। ভাবে, জামাইকে পত্র লিখে দেশে ফিরিয়ে আনবে। স্বামীর সঙ্গ পেলে খরায় আধমরা ফসলক্ষেত হঠাৎ বৃষ্টিতে যেমনি সতেজ হয়ে ওঠে, মেয়েও নিঃসঙ্গতার কষ্ট থেকে উদ্ধার পাবে। মনের ভিতর যে আতঙ্ক তাও কেটে যাবে। মেয়ের সুখেই যে মায়ের শান্তি।

কিন্তু, বেশ ক’বছর পর চেনা খ্রিস্টান গ্রামটা কেমন অচেনা ঠেকে তার। বদলে গেছে সব। প্রায় বাড়িই পাকা-আধাপাকা। পাঁচিল ঘেরা বাড়িও আছে। মালিকের নাম বাংলায় নয়, বরং ইংরেজিতে বাঁকা অক্ষরে লেখা। বন্ধ কাঠের দরজায় সাঁটা রয়েছে প্লাস্টিকে তৈরি ঈশ্বরপুত্র যিশুর মুখ কিংবা সাদা রঙ ক্রুশ। অবাক কা- এই, গ্রামটি যেন পুরুষ শূন্য। পুরুষেরা সব প্রবাসী। আরব, সিঙ্গাপুর, আমেরিকা, লন্ডন। পাড়ার মুদি দোকানও চালায় মেয়ে মানুষ। এ যেন বাংলাদেশের ভিতর নারীদের বিশেষ এক রাজ্য।

নাসিমার মায়ের বুকে খোঁচা লাগে। খ্রিস্টান মেয়েরা কত স্বাধীন। পুরুষশূন্য গাঁয়ে নারীরাই কর্তা। হাট-বাজার সবই তাদের। কিন্তু সে বুঝতে পারে না অদৃশ্যে প্রবাসে রয়েছে যে পুরুষ, সে-ই জিন-ফেরেশতার মতো অদৃশ্য শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করছে পুরুষশূন্য এই গ্রাম। মেয়েরা তো গ্রাম পাহারাদার। সন্তান আর সম্পদের হেফাজতকারী মাত্র।

নাসিমার মা গোলকধাঁধায় পড়ে। বহুদিন পর, অর্থাৎ নাসিমাকে কোলে নিয়েই শেষবার এ গাঁয়ে ঢুকেছিল এক খ্রিস্টান ধর্মখালার বাড়ি। তারপর আজ। চেনা যত বাড়িতেই ঢুকেছে, দেখতে পেয়েছে প্রায় বাড়ির ভেতর দেয়ালে ক্যালেন্ডারের মতো ঝুলছে লন্ডন কিংবা আমেরিকার মানচিত্র। মাত্র একটি বাড়িতেই দেখতে পেয়েছে বাংলাদেশের মানচিত্র, বিবর্ণ। টেবিলে পানি ভরতি কিংবা বিদেশি মদের বোতল।

এ গাঁয়ের অনেক মেয়ে কিংবা পুরুষ শহরের বিদেশি দূতাবাসের কুকুরের আবাসন এলাকায় কাজ করে। চাকর, নফর, গৃহপরিচারিকা, ড্রাইভার, গ্রেহাউন্ড কুকুরের সেবক। পাচক। প্রতিসপ্তাহে না হোক, মাসে একবার দু’এক রাতের জন্য বাড়ি ফেরে ওরা। এদের একজনকে নিয়েই গল্প বলেছে নাসিমার মায়ের ধর্মখালার ছেলের বৌ মিনতি কস্তা। সে এক লোমহর্ষ গল্প।

খ্রিস্টান ধর্মপল্লীর শেষ প্রান্তে দু’তিন ঘর কামার বাড়ির শেষ বাড়িটিই বাদলা কামারের বাড়ি। কলের লাঙল আর হরেক রকম কৃষি উপকরণ সস্তায় চায়না থেকে আমদানির ফলে কামারদের সুদিন প্রায় গত। কালেভদ্রে রাস্তার পাশে বসানো হাপরের ভোঁসভাঁস শব্দ আর চুল্লির গণগনে অঙ্গার লোকের চোখে পড়ে। বাদলা কামারের দিন গেছে। বাদলার ইতিহাস বড় লম্বা। পাশের বাড়ি জগাই কামারের সে জ্ঞতি ভাইয়ের স্ত্রীর সম্পর্কের আত্মীয়। যৌবনকালে অন্যের বৌ চুরি করে নিজের বৌকে ফেলে রেখে এখানে ঘর পাতে। সেই চুরি করা বৌ একটা আট বছরের মেয়ে ফেলে রেখে হঠাৎ একদিন নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। জনশ্রুতি এই, বৌটা এক গ্রাম্য কাপড় ফেরিওয়ালা যুবকের হাত ধরে গ্রাম ছেড়েছে। বাদলা কামার তন্নতন্ন তালাশ করেও ওকে পায়নি। এই ঘটনার দু’বছর পর পড়শিরা দেখতে পায় কোথা থেকে যেন বাদলা কামার দেবীকালীর মত বর্ণের এক বিধবা মহিলাকে এনে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছে। কৌতূহলীদের বাদলা কামার জানায়, ক্ষুধার বিনিময়ে নারী শরীর, এই চুক্তিতেই সে এই বিধবাকে পেয়েছে।

কামারের দিন তো গেছে। তিন তিনটি পেট চলবে কি করে? বাধ্য হয়েই সে খ্রিস্টান পাড়া থেকে চার-পাঁচটি সাদা শোয়রের ছানা কিনে আনে প্রতিপালনের জন্য। কামারপাড়ায় মৃদু আপত্তি। কেননা যুদ্ধের পর দেশটাই যেন উলট পালট হয়ে গেছে। আজ আর খ্রিস্টান আর নীচু বর্ণের হিন্দু মুচি, মেথরেরাই কেবর শুয়র পোষে না, বর্ণহিন্দুরাও। পাকিস্তান যুগেও এই সাহসটা দেখাতে পারতনা বাদলাকামার। যুদ্ধের এই রহস্যটাই অপারাপর কামারগণ বুঝতে পারে না। তা হলে একাত্তরের যুদ্ধের কাছে নত হোক বাদলা কামার। যুদ্ধই তার খাদ্যের দেবতা। পঞ্চপিতা পরমেশ্বর।

তার ক’বছর পর। শুয়র বিক্রির কাঁচা পয়সায় বাদলা কামারের চোলাই মদের নেশাটাও বেড়ে যায়। এই মুখ্য সুযোগে সংসারের দায়িত্ নিজের হাতে তুলে নেয় বৌ। স্বামীকে সে খ্রিস্টান পাড়ার মদের ঠ্যাকে ঢুকতে নিষেধ করলেও জোর চাপ দেয় না। একদিন দুপুরে খালের পারের বেত ঝোপ আর বাঁশঝাড়ের মাঝখানে চিলতে ফাঁকা জায়াগায় অতুল গমেজের ছেলে পিটারের সঙ্গে তরুণী মেয়ে লক্ষ্মীকে দেখতে পায়। বিষয়টি আপত্তিজনক না দেখালেও মনটা তার খচখচ করে।

তাই সে দু’জনের কাছেই জানতে চায় এখানে এই নির্জন জায়গায় আসার কারণ। মেয়ের উত্তর, সে বেতবনে ডাহুকের বাচ্চা খুঁজতে এসেছে। পিটারের উত্তর সহজ। সে এসেছে খালের পারের বাঁশবনে কচ্ছপের ডিমের তালাশে। কিন্তু দু’জনেরই হাত শূন্য। কচ্ছপের ডিমও নেই কিংবা ডাহুকের ছা।

তারও দু’মাস পর এক সন্ধ্যায় কালো বৌকে বিলাপ করে কাঁদতে দেখে বাদলা কামার খুবই অবাক বনে যায়। সতীন ঘরের মেয়ে লক্ষ্মীকে সে এত ভালোবাসতো? লক্ষ্মীতো পালিয়েছে পিটারের হাত ধরে। শহর থেকে গাঁয়ে ফেরা খ্রিস্টানপাড়ার কেউ কেউ লক্ষ্মী আর পিটারকে নাকি রেল স্টেশনে দেখতে পেয়েছে। নিশ্চয় ওরা শহরে পালিয়ে গেছে। বাদলা কামার নেশা করে অতুল গমেজের বাড়ি গিয়ে তার মেয়েকে ভাগিয়ে নেয়ার জন্য অতুলের জাত-ধর্ম নিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করে আসে।

দু’মাস পর পিটার লক্ষ্মীর হাত ধরে গাঁয়ে ফেরে। বাদলা কামার কথাটা শুনেছে। কিন্তু নির্বিকার। যে মেয়ে জাত খুইয়ে খ্রিস্টান হয়ে শহরের গির্জায় গিয়ে বিয়ের কাজ সেরে ফেলেছে তার জন্য মায়া কেন? কিন্তু কালো বৌ মহামায়া ছাড়ার পাত্রী নয়। হাঁটুর উপর শাড়ি টেনে রণরঙ্গিনী কালী মূর্তি ধারণ করে দা হাতে ছুটে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়।

 

॥ তেইশ ॥

কালীদেবী মাহামায়া ছুটছে। হাতে উদ্যত দা। অতুল গমেজের ছেলেকে সে কেটে ফালাফালা করে ছিনিয়ে আনবে লক্ষ্মীকে। ভয়ার্ত বাদলা কামারও বৌকে ফিরিয়ে আনতে পিছু নেয়। কিন্তু সে দিন গেছে তার। বয়স হয়েছে। দৌড়ে জোরও কম। বৌকে সে চেনে। না জানি কি করে বসে। প্রায় পুরুষ শূন্য খ্রিস্টানপাড়াটা রাস্তায় নেমে আসে। নারী আর শিশু। বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। সবার চোখেই আতঙ্ক। কেবলমাত্র মালতি গমেজ যার নার্স মেয়েকে পটিয়ে পাটিয়ে মুসলমান বানিয়ে হাসপাতালেরই কর্মী বিবাহিত দুই সন্তানের পিতা নোয়াখালির লোকমান বিয়ে করেছে, সে-ই উঁচু গলায় হাসে।

মহামায়া ছুটতে ছুটতে অতুল গমেজের বাড়ি ঢুকে পড়ে। উঁচু গলায় চেঁচিয়ে যায়, ‘মাইট্টা ফিরিঙ্গির ছেলে, আমার মেয়েকে ফিরিঙ্গি বানিয়ে জাত-ধর্ম নাশ করে বিয়ে করার সাহস পেলি কই, ফিরিয়ে দে লক্ষ্মীকে।’

অতুল গমেজ আর তার ছেলে স্বপন গমেজ বাড়ি ছিল না। অতুলের স্ত্রী কলাস্টিকা ভয়ে ঠকঠক্ কাঁপছে। তার পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল লক্ষ্মী। তার চোখেও ভয়। না জানি শাশুড়িকে কোপ বসিয়ে দেয় মা। মুখে তার রা নেই। হতচকিত। আরও কয়েক পা এগিয়ে যায় মাহমায়া। ডান হাতে দা। দুচোখে হিংস্র আগুন। ভয় পেয়ে কলাস্টিকা ডান পাশে সরে গিয়ে লক্ষ্মীকে সামনে ঠেলে দেয়, ‘যা, তুই তোর মায়ের সঙ্গে ফিরে যা। তোর জন্য মরব কি আমি?’

সাপের ছোবলের মতো বাম হাত দিয়ে লক্ষ্মীর হাত ধরে টানতে টানতে মহামায়া রাস্তায় নেমে আসে, ‘মেয়ে, তোকে আমি কেটে ফালাফালা করব, বাড়ি চল। তোর বাপ দেখুক মহামায়া কি করতে পারে।’

তামাশাদারগণ নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে মহামায়ার কাণ্ড দেখছে। কেবল একজন বৃদ্ধই প্রতিবাদ করে দূরে থেকে, ‘বাদলার বৌ, বেআইনি কাজ করছ ক্যানো? তোমার মেয়ে কোর্টে গিয়ে বিয়ে করেছে, তারপর গির্জায়। ফাদার-সিস্টার সবাই সাক্ষী।’

কে শোনে কার কথা। লক্ষ্মীকে টানতে টানতে ছুটতে থাকে মহামায়া। শোয়ারের বাথান ছাড়িয়ে উঠোনে পা ফেলেই হাতের দা ছুড়ে ফেলে দেয় মহামায়া। তফাতে দাঁড়িয়ে বাদলা কামার। বাদলাকে বিস্মিত করে আচমকা আর্তচিৎকারে লক্ষ্মীকে জাপটে ধরে মহামায়া। বিলাপ করে বলে, ‘আমি একটা বাঁজ বৌ তোর বাপের, তুই আমার মেয়ে, মাকে ছেড়ে কোন সাহসে পালাইলি?’

লক্ষ্মীও কেঁদে ফেলে। বাদলা কামার দাওয়ায় বসে পড়ে মাথা নুইয়ে। কৌতূহলীর ভিড় জমে বাড়িতে। বাদলা কামার ঘরে ঢুকে যায়। আবছা অন্ধকারের ভেতর চোলাই মদের শূন্য বোতলটা তুলে নেয় হাতে। শূন্য বোতলটা তুলে বুকের উপর চেপে ধরে। তার মনে হয় দশমাস বয়সের শিশুকন্যা লক্ষ্মীকে বুকে আগলে ধরেছে। সমস্ত ভরসা, সমস্ত সুখ যেন উত্থলে ওঠে বুকের ভেতরটায়। পালিয়ে যাওয়া বৌটার কথা বহুদিন পর মনে পড়ে। চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে। বিড়বিড় করে বলে, ‘তুই যদি না-পালাইতি, লক্ষ্মীর জীবনটা এমন হতো না।’

পরদিন ভোর বেলা পুলিশ নিয়ে বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ায় পিটার গমেজের। আরও অনেকে, খ্রিস্টানপাড়ার। লক্ষ্মীকে সে ফিরিয়ে নেবে। বৈধ স্ত্রী তার লক্ষ্মী। আইনের বিয়ে। দারোগার নির্দেশে মহামায়া লক্ষ্মীর হাত ধরে উঠোনে এসে দাঁড়ায়। পেছনে বাদলা কামার। পিটার এগিয়ে আসে লক্ষ্মীর দিকে, ‘বাড়ি চল লক্ষ্মী, আজই শহরে চলে যাব আমরা।’

লক্ষ্মী এক পা পিছিয়ে মাকে আড়াল করে দাঁড়ায়। পিটার তার হাত ধরতে চায়। লক্ষ্মী মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। দারোগার উদ্দেশ্যে ইনিয়ে বিনিয়ে বলে, ‘দারোগাসাব, আমি পনের বছরের নাবালিকা, জাল কাগজ বানিয়ে পিটার আমাকে বিয়ে করেছে, খ্রিস্টান বানিয়েছে। আমি মাকে ছেড়ে যাব না।’

পিটার থমকে যায়। দারোগা এগিয়ে এসে পিটারের কাঁধে চাপ দিয়ে জানতে চায়; এসব কি সত্যি পিটার? শালা বাঞ্চোৎ কোথাকার।’

পিটার আমতা আমতা করে উত্তর দেয়, ‘সত্যি হলেও দারোগাসাব আমি লক্ষ্মীকে ভালোবাসি। প্রভু যীশুর নামে বলছি।’

‘নিকুচি করি তোর ভালোবসার, শালা শুয়র খোর, হারাম খোর, চল হাজতে’, দারোগা গর্জে ওঠে। তার ইঙ্গিতে দুটো পুলিশ তাকে ঘিরে ধরে। হাত টেনে উঠোনটা পেরোতে থাকে। ভয়ার্ত পিটার কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়।

আর ঠিক তখনই একটা চিৎকার দিয়ে লক্ষ্মী মাকে ছেড়ে দিয়ে ঘরের ভেতর ছুটে যায়; ‘ওমা, পিটারকে ক্যানো মারবে পুলিশ?’

পিটারকে পুলিশ মারেওনি, হাজতেও ঠেলে দেয়নি। বরং বাদলা কামারের বাঁজা বৌ মহামায়াকেই ছুটতে হয় সদরের কোর্টে। নাকানি চুবানি খেয়ে বের করতে হয় নাবালিকার বয়সের প্রমাণপত্র। তারপর বিবাহ বিচ্ছেদ। ইচ্ছে করলে পিটারকে নারী অপহরণের মামলায় মহা বিপদে ফেলতে পারত। পারেনি। গির্জার সিনিয়র সিস্টার করুণা বাড়ি এসে পিটারকে ক্ষমার কথা বলে। ঈশ্বরপুত্র যিশুর কথা বলে। ক্রুশে বিদ্ধ হবার সময় যিশু যেমনি বিশ্বাসঘাতক শিষ্য যিশুদাকে রোমান সৈন্যদের হাতে তাঁকে ধরিয়ে দেবার অপরাধের জন্য মৃত্যু যন্ত্রণার ভিতর দিয়েও ক্ষমা করে দিয়েছিলেন, বাইবেলের সেই কাহিনী শোনায়। তাতে মহামায়ার মন গলে যায়।

সদর থেকে ফেরার পথে লক্ষ্মীর হাত ধরে হাঁটছিলেন মহামায়া। লক্ষ্মী এই কাঁদে তো এই নিশ্চুপ। মহামায়া লক্ষ্মীর মাথায় হাত রেখে বলে, ‘তুই যদি আমাকে মা বলে স্বীকার না-ই করিস তবে খুব কষ্ট হবে আমার। যদি চাস তোকে ফেলে রেখে পালিয়ে যাওয়া মায়ের কাছে যেতে, আমি খুঁজে বের করব তাকে, তার হাতেই ফিরিয়ে দেব। তোর সেই মা- কে জানে কোথায় আছে, বেঁচে আছে কি মরে গেছে, ভগবান জানে। যদি কোনোদিন খুঁজে পাই, যাবি তার কাছে?’

‘না, যাব না ওই শয়তান মায়ের কাছে। ঘুমের মধ্যে রেখে যে পালায় সে আমার মা না, ডাইনি, বলতে বলতে কেঁদে ফেলে লক্ষ্মী।

লক্ষ্মীকে আদর করে মহামায়া। চোখ মুছিয়ে দেয়। নির্জন এই মেঠো পথে একটি স্নেহ-করুণার ঢেউ আছড়ে পড়ে লক্ষ্মীর বুকের ভেতর। এই জটিল কুটিল সংসারে অতিক্ষুদ্র কিশোরী তখন ভেঙে বিচূর্ণ হতে থাকে। নির্বোধ এই বালিকার কাছে মনে হয় এ সংসারে তার কেউ নাই। একাকী সে বড় ভয়ার্ত। একটি আশ্রয় আর ভালোবাসার দুনিয়া সে চায়। অথচ পায় না। শূন্য এই তেপান্তরের মাঠের যেখানে শিমুল গাছটা দাঁড়িয়ে আছে, যার ডালের ফাঁক দিয়ে দূরের গির্জার চূড়ায় ক্রশটি স্পষ্ট দেখা যায়, সে দিকে তাকিয়ে লক্ষ্মী বিড়বিড় করে মহামায়াকে বলে, ‘ওমা তুমি কেনো যিশুর মা ম্যারির মতো আমাকে পেটে ধরনি? কেন ধরনি?’

মহামায়া কেঁদে ফেলে, ‘তোকে পেটে ধরিনি, এ আমার অপরাধ। লোকে যে কয় শুনিসনি, আমি বাঁজা মেয়ে, বাঁজা মেয়েরা কি সন্তান পেটে ধরে? ধরে আত্মার ভিতর, আমিও যে তোকে আত্মার ভিতর ধরেছি, এখনও বুঝিস না?’

লক্ষ্মী নিরুত্তর। আরও খানিকটা হাঁটার পর মহামায়া আচমকাই লক্ষ্মীকে প্রশ্ন করে, ‘লক্ষ্মী, পিটারকে বুঝি খুব মনে পড়ে তোর? ওই যে আদালত থেকে বের হবার সময় পিটারের দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলেছিলি, কেন চোখে জল এলো?’

লক্ষ্মী নিরুত্তর। তার নির্বিবোধ জটিলতা শূন্য জলের মতো তরল স্বচ্ছ মনের ভেতর কি চলছে বুঝতে পারে না মহামায়া। দীর্ঘ নিঃশ্বাস পড়ে মহামায়ার। লক্ষ্মীকে কাছে টেনে শরীরের স্পর্শে ওম ছড়িয়ে দিয়ে অনুচ্চ স্বরে বলে, ‘জানিস মা, যে মানুষটি বিয়ের চার বছরের মাথায় ট্রাকের তলায় চাপা পড়ে মারা গেল, তাকে তো আমি ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলাম লক্ষ্মী। এই যে তোর বাপ, তার সঙ্গে ঘর করছি বটে, কিন্তু কোনো দিনই ভালোবাসতে পারব না, কথটা তোর বাপও জানে। সব পুরুষকে কি ভালোবাসা যায় রে লক্ষ্মী, যায় না। পেটের দায়ে, বাপ-মা পড়শিদের চাপে ছোট্ট মেয়েদের জামাই-বিয়ে-বৌ খেলারই মতো পুতুল খেলা আমার এই বিয়ে।’

এবার লক্ষ্মী মহামায়াকে চমকে দিয়ে হঠাৎই বলে বসে, ‘ওমা, পিটারের জন্য মনটা কান্দে কেন গো মা? বল কেন কান্দে?’

‘মনটা কাঁদবে, আমি জানি রে মা, ওই যে আমি নিজের কথা বললাম ঠিক তেমনি। তারপর একদিন আমার মতনই ভুলে যাবি, ভুলতে হয়রে লক্ষ্মী,’ বলতে বলতে চোখ মোছে মহামায়া। প্রাচীন হারানো দিনে ডুবে যায় সে।

আকাশের দিকে তাকায় মহামায়া। পাখিরা উড়ে যায়। তার মনে হয় উড়ন্ত পাখির ঝাঁকের ভেতর এমন একটি পাখি আছে পুনর্জন্মে যে ছিল তার স্বামী। মরে গিয়ে পাখি হয়ে গেছে। পাখি হয়েই ওকে দেখে যায় কেমন করে ঘর করছে অন্য একটা পুরুষের সঙ্গে। চোখ ভরে জলনামে মহামায়ার। লক্ষ্মী তা দেখে। কি বুঝল ওই মেয়েটা, তা বলে দেবার কে আছে বাঁজা মেয়ে মহামায়ার? এখন তার মনে হয়, এই যে সেদিন লক্ষ্মীকে উদ্ধার করার জন্য রণরঙ্গিনীর বেশে উদ্যত দা হাতে খ্রিষ্টানপাড়া ছুটেছিল তা ছিল একটি জটিল গোলকধাঁধা। সে দেখছিল তার প্রথম স্বামীর লাশ বাড়ি এসেছে। রক্তাক্ত। নিথর। সে ছুটছে যম রাজার পেছনে অপহরণ করে নেয়া স্বামীর প্রাণ কেড়ে আনার জন্য। ঠিক বেহুলার মতো।

নদীর পারের শ্মশানে পুড়ছে মহামায়ার দুর্ঘটনায় নিহত প্রথম স্বামীর লাশ। আগুনের জিহ্বা লকপক করছে আসমানে। তারও ঊর্ধ্বে আকাশের শূন্যতায় দ-ায়মান মৃত্যুর দূত যমরাজ। আাকশের সাদা মেঘে আছড়ে পড়ছে তার অট্টহাসি। যমরাজ্যের এককাঁধে মৃতু পরোয়ানার ভয়ঙ্কর গদা। ডান হাতের তালুতে ক্ষুদ্র অগ্নিগোলকের মতো স্বামীর প্রাণপি-। মহামায়া অতি ক্ষুদ্র তুচ্ছ একটি নারী। কি ক্ষমতা আছে তার যমরাজ্যের হাত থেকে স্বামীর প্রাণপি- ছিনিয়ে আনার? সে যে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্র সবচেয়ে নির্বল অসহায় দরিদ্র ঘরের কুৎসিত কালো তুচ্ছ একটি নারী মাত্র।

মহামায়ার কাছে লক্ষ্মী এখন বিগতকালের অগ্নিগোলক প্রাণপি-। একবার মনে হয় আইনের চোখে অপরাধ হলেও খ্রিস্টান যুবক পিটারের হাত থেকে লক্ষ্মীকে ছিনিয়ে আনা ঠিক হয়নি। পুনরায় মনে হয় যা করেছে কিছু অন্যায় করেনি তো! একটি নাবালিকা মাতৃহারা মাতাল পিতার ঔরসজাত লক্ষ্মী তো তার অক্ষম মাতৃত্বের আশ্রয়। সে তো বাঁজা নারী, লক্ষ্মীকে হারালে তার পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে যায়। সূর্য উদয়ের চিরন্তন নিয়ম মিথ্যা হয়ে যায়। একলা ঘরে কার মুখের ভিতর দিয়ে কল্পিত সন্তানের জ্যোৎস্নাকালের ছায়া দেখবে? বাদলা কামারের সঙ্গে কোনো কোনো রাতে অভ্যাস হেতু মিলিত হতে গিয়ে সুখ কই? তার অনুর্বর উষর গর্ভ ভূমিতে স্বামীর সন্তান বীজ বপন তো মিথ্যা একটি গোলকধাঁধা মাত্র। মাতৃত্বের এই কুয়াশার মতো অক্ষমতা এখন আর তাকে কাঁদায় না। এমন বিশ্বাসও তার মনে উঁকি দেয়, কোনো না কোনো পূর্বজন্মে মানুষ কিংবা পক্ষী জীবনে লক্ষ্মী তার গর্ভে জন্মেছিল।

আইনের খাতায় বিয়েটা অবৈধ হলেও লক্ষ্মী মুক্তি পায় না। পড়শি সত্যানন্দকামার বাড়ি এসে শাসিয়ে গেছে। লক্ষ্মীর জাত-ধর্ম গেছে। সে গির্জায় গিয়ে ফাদারের সামনে দাঁড়িয়ে বাইবেলে হাত রেখে খ্রিস্টান হয়ে গেছে। সংগৃহীত জর্ডন নদী আর ভ্যাটিকানের পবিত্র জলের ছিটা শরীরে নিয়ে সে পবিত্র হয়েছে। ফাদারের সঙ্গে সঙ্গে সে উচ্চারণ করেছে বাইবেলের মন্ত্র, ‘আমি পরিবর্তন করেছি আমার অতীত ধর্মকে, যিশুর কৃপায়। আমি ধন্য, যিশু ধন্য, ঈশ্বর ধন্য।’ প্রতিবাদ করেছে বাদলাকামার। সত্যানন্দকে বাড়ি থেকে এই বলে তাড়িয়ে দিয়েছে যে, ‘আমি আমার মেয়েকে প্রায়শ্চিত্ত করার না বামুন ডেকে। এটা কি ইংরেজের যুগ? পাকিস্তানি যুগ? এটা বাংলাদেশের যুগ, পুরাতন নিয়ম মানি না।’

 

॥ চব্বিশ ॥

যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই অহংকার একজন নেশাখোর তুচ্ছ বাদলা কামারকেও প্রতিবাদী করে তোলে। পুরাতন বিশ্বাসকে ভাঙার সাহস পায় সে। এ সাহস তাকে দিয়েছে একাত্তরের যুদ্ধ। বাইবেলের মন্ত্র বলেই যে একজন খ্রিস্টান হয়ে যায় না, বামুন ঠাকুরের মন্ত্রে যে শুদ্ধ হয়ে হিন্দু হয়ে যায় না, এ তার বিশ্বাস। কামারদের সমাজটা যে ইংরেজ মহারানির যুগের সমাজ নয়, পাকিস্তানি যুগেরও নয় বদলে এ যাওয়া সমাজ, এ সমাজ তাকে একঘরে করে দেবে, সে ক্ষমতা হারিয়েছে। গাঁয়ের মুসলমানেরা বাদলা কামারের পক্ষ নিয়ে তেড়ে আসবে নিশ্চয়ই।

মহামায়া সতর্ক থাকে, নজর রাখে মেয়ের দিকে। যে ভয়টা ছিল তা কেটে গেছে। বুঝতে পারে পিটারের ঘরে থাকলেও লক্ষ্মী গর্ভবতী হয়নি। এটাই ওর স্বস্তি। মাস খানিক মনমরা ছিল, এখন সব স্বাভাবিক। ঘরের কাজ আর শুয়রের যতœআত্তি করা সবই করছে লক্ষ্মী। কিন্তু খ্রিস্টানদের বড় পরব ইস্টারের দিন থেকে কেমন হঠাৎ বদলে যায় লক্ষ্মী। খেতে বসে ঠিকঠাক খেতে পারে না, কেমন মনমরা ভাব। জানতে চাইলেও কিছু বলে না।

জোনাকপড়া রাত। ঘরের মাঝখানে মুলিবাঁশের বেড়ার ওপাশে ঘুমিয়ে আছে বাদলাকামার আর তার বৌ মহামায়া। এপাশের খুপড়িতে লক্ষ্মী। জানালা খোলা। বাইরে জোনাক ফকফক করে। জানালার ওপারেই কদম গাছ। লক্ষ্মীর হঠাৎ চোখ পড়ে কদমগাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পিটার। গির্জার ব্রাদারদের মতো পরনে সাদা পোশাক। তবে কি পিটার সংসার ছেড়ে ব্রাদার হয়ে গেছে? তার বুকের ওপর জোনাক পড়ে চকমক করছে রুপোর ক্রুশ। লক্ষ্মীর শরীরে হঠাৎ ভয়ের কাঁপুনি। পরমুহূর্তেই আতঙ্কটা যেন উধাও। বিছানা ছেড়ে ওঠে বসে সে। উঁকি দেয় জানালায়। জোনাক তার মুখের ওপর চোখের মনিতে ছিটকে পড়ে। একটা শিহরন মনের ভেতর। দুয়ার খুলে বাইরে এসে দাঁড়ায় সে। কদমতলার পশ্চিম পাশে গাছের ছায়া মৃদু কাঁপে। পিটারের মুখে হাসি। চোখে যিশুর মূর্তির মতোই ঝলক।

পিটার সামনে। লক্ষ্মী পেছনে। অনুচ্চস্বরে পিটার পবিত্র আত্মা যোহনের কথা বলে, যে তাকে জর্ডন নদীর পবিত্র জলে ¯œান করিয়ে ব্যাপ্তিস্ট বা দীক্ষা দিয়েছিল। আরও বলে কি করে মিশর থেকে অত্যাচারিত ইহুদিদের উদ্ধার করে নবী মুসা নীলনদ পাড়ি দিয়েছিলেন। বিস্ময় এই পিটার একবারও তাদের পুরাতন ভালোবাসা আর বিবাহ বিচ্ছেদের কথা বলে না।

পিটারের পেছনে হাঁটছে লক্ষ্মী। রাত তখন গভীর। আকাশের চাঁদ বর্ষার বৃষ্টির মতো জোনাক ঢেলে দিচ্ছে মাটির ঘাসে। লক্ষ্মী অবাক একথা ভেবে যে, পিটার একবারও ওর হাত ধরা দূরের কথা শরীরও স্পর্শ করে না। সে ভাবছে নিশ্চয়ই পিটার সন্ন্যাসী হয়ে গেছে, প্রিস্ট হয়ে গেছে, সংসারধর্ম থেকে মুক্তি নিয়েছে। যদি তা-ই সত্য হয় তবে কেন এল জোনাক রাতে?

হেঁটে হেঁটে ওরা এখন গির্জাটা পেরিয়ে যায়। অনতিদূরে কবরস্থান। ওদিকে যাচ্ছে কেন পিটার? জানতে ইচ্ছে করে? কিন্তু পিটারের মুখে কেবলই বাইবেলের গল্প। হঠাৎ লক্ষ্মী দেখতে পায় সারিসারি বাঁধানো ক্রুশ চিহ্ন দেয়া কবরস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন শহরের ফাদার দানিয়েল বিশ্বাস নামের সেই ফাদার, যিনি তাকে ধর্মান্তর করেছিলেন। ফাদারের চোখ আকাশের দিকে। ওদিকে চাঁদ আর অসংখ্য তারা জ্বলে। ডান হাতটি গলায় ঝুলে থাকা জেরুজালেমের পবিত্র জৈতুন গাছের কাঠে তৈরি ক্রুশ।

তারা যখন ফাদার দানিয়েলের একেবারে পাশে এসে দাঁড়ায় অসংখ্য কবরের পাশ কেটে, তখনই তিনি আকাশে ছড়িয়ে রাখা তার দৃষ্টি তুলে আনেন লক্ষ্মীর সামনে। ক্রুশ ধরা হাত উঁচু হয় তার, ঈশ্বর তোমাদের মঙ্গল করুন, যীশুর নামে তোমরা ধন্য।’

এই নিঝুম রাতের জোছনা ভেজা ঘাসে পা ফেলে ফাদার এগিয়ে যান। পিটার আর লক্ষ্মী তাকে অনুসরণ করে। সেই উঁচু বেদী, যেখানে শ্বেতপাথরের তৈরি মা ম্যারির কোলে পুত্র যিশুর ক্রুশে হত মৃত দেহের মূর্তি তার পাশে এসে সবাই দাঁড়িয়ে পড়ে। আকাশের চাঁদ মাতা-পুত্রের শ্বেতমূর্তির সোজা ওপরের আকাশে স্থলপদ্ম ফুলের মতো ঝুলছে। পবিত্র ‘জটা মাংসী’ সুগন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। ওরা সবাই পবিত্র আত্মার মাতাপুত্রকে প্রণিপাত করে। লক্ষ্মী দেখতে পায় ম্যারি আর যিশুর পাথর শরীর রক্তমাংসের শরীরে রূপান্তর ঘটেছে। মৃতপুত্র কোলে শায়িত ম্যারির দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। বরং ফাদার দানিয়েল, পিটার আর লক্ষ্মী পাথরের ত্রিমূর্তি ধারণ করে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

কত মুহূর্ত? লক্ষ্মী জানে না। হঠাৎ তার কানে গির্জার পবিত্র ঘণ্টাধ্বনির মতো আকাশ থেকে নেমে আসে ক্রম বিলীয়মান শব্দ। আকাশে চোখ তোলে সে। দেখতে পায় পরিদের ডানাওয়ালা অগ্নি বর্ণের একজন উড়ন্ত মানুষ কবরস্থানে নেমে আসছে।

‘ওই দেখো, আকাশ থেকে স্বর্গদূত নেমে আসছেন। স্বর্গদূত গাব্রিয়েল এই গ্রামের পুণ্যাত্মা আব্রাহাম ম-লের মৃত্যুর আজ তৃতীয় দিবসে কবর থেকে পুনরুত্থিত করবেন তাকে। চলো যাই, সাক্ষী থাকি আমরা,’ বলতে বলতে ফাদার দানিয়েল কবর স্থানের পূর্বপ্রান্তে যেখানে তিন দিন পূর্বে এই গাঁয়ের আব্রাহাম ম-লের মৃতদেহ করস্থ করা হয় সেদিকে পা বাড়ান।

কবরের পাশে ডানাওয়ালা গাব্রিয়েল অবতরণ করেন। তার মুখে মৃদুহাসি জোছনায় হীরকের মতো জ্বলে। তবে তিনি নির্বাক। তার হাত দুটো প্রসারিত হয়। গাব্রিয়েলে কবরের ওপর। কি বিস্ময়! কবরটি এভাবেই দু’ভাগ হয়ে যায়, যেন দুয়ার খুলে গেছে। কবরের ভেতর অতি উজ্জ্বল আলো। মৃত আব্রাহাম মণ্ডল শরীরে সাদা কাপড় জড়িয়ে কবর থেকে বেরিয়ে আসে। কোন দিকে, কারও দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই কবর থেকে পুনরুত্থিত মানুষটির।

নির্বাক আব্রাহাম গ্রামের উদ্দেশে হাঁটতে থাকে। তার শ্বেতবসন থেকে ‘জটা মাংসী’ সুগন্ধী বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। আব্রাহামের দিকে তাকিয়ে স্বর্গদূত গাব্রিয়েল বলেন, ‘যীশুর মতোই আব্রাহামও আপন পুনরুত্থানের বিষয়ে গ্রামবাসীর সামনে সাক্ষ্য দিতে হেঁটে যাচ্ছে। বিশ্বাসীরা এর সাক্ষী হোক।’

লক্ষ্মী অপলক আব্রাহামের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ সে দেখতে পায় খনিকটা এগিয়ে যেতেই আব্রাহামের শরীর অদৃশ্য হয়ে যায়। এবার সে বিস্ময়ের সঙ্গে তার ডান আর বাম পাশে তাকায়। কি আশ্চর্য! কেউ কোথাও নেই। পিটার এবং ফাদার দানিয়েল নিরাকার হয়ে গেছে। প্রবল জোছনার ঢেউ আছড়ে পড়ছে প্রতিটি কবরে। চরম আতঙ্ক তাকে গ্রাস করে। এ কোথায় কি করে এল সে? কোথায় বা পিটার? কার সঙ্গী হয়ে কোথায় এসে পড়েছে সে? লক্ষ্মীর গলায় ভয়ার্ত চিৎকার ‘পিটার?’

কবরস্থানে লক্ষ্মীর আর্তনাদ প্রতিধ্বনি তোলে। সে দৌড়াতে চায়। কবরস্থান পেছনে ফেলে ছুটতে চায় গ্রামের দিকে। পারে না। পা দুটো পাথর হয়ে কবরস্থানে মাটির সঙ্গে সেঁটে আছে। দেখতে পায় প্রতিটি কবর থেকে একটি একটি করে কংকাল মূর্তি বেরিয়ে আছে। অট্টহাসিতে ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে কবরস্থানের আকাশ। কংকালেরা হচ্ছে দুনিয়ার দুষ্ট আত্মা। ওরা লক্ষ্মীকে ঘিরে ধরে নৃত্য করতে থাকে। তাদের হাড়ে হাড়ে ঘর্ষণে যে শব্দ হয় তা যেন দেবী কালীর থানে বলির বাজনার মতোই নিষ্ঠুর শব্দ। শরীরের অবশেষ শক্তি দিয়ে লক্ষ্মী দৌড়াবার চেষ্টা করে। খানিকটা দৌড়ায়। কিন্তু কবরস্থান অতিক্রম করতে পারে না সে। তার ভয়ার্ত শরীর ঠান্ডা হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। জ্ঞান হারিয়ে যায় লক্ষ্মীর।

ভোর হলে গির্জার মালি লক্ষ্মীর বেহুঁশ দেহ আবিষ্কার করে। মেয়েটিকে সে চিনতে পারে না। খবর দেয়ার জন্য সে গ্রামে ছুটে যায়। গ্রামাবাসীরা কেউ কেউ তাকে চিনতে পারে। এযে বাদলা কামারের মেয়ে লক্ষ্মী। পিটারের তিন মাসের বৌ। কিন্তু পিটার কোথায়? ওই যে কোর্টে হেরে গ্রাম ছেড়েছে, আর ফেরেনি। শহরে কি যেন কি কাজ করে। খবর পেয়ে ছুটে আসে বাদলাকামার আর মহামায়া। ততক্ষণে জ্ঞান ফিরে পায় লক্ষ্মী। কিন্তু সে নির্বাক। ফ্যালফ্যাল দুটো চোখ। কল্পলোকের এক গোলকধাঁধায় তখনও সে ডুবে আছে।

পথে হাঁটতে হাঁটতে বাদলাকামার কৌতূহলীদের দেখে। লজ্জায় তার মাথা নত হয় না। সে তো তুচ্ছ একটা মানুষ কিংবা অর্ধেক মানুষ, বাকি অর্ধেক অমানুষ। নোশাখোর, মাতাল। নোংরা প্রাণী শুয়রের প্রতিপালক। শুয়রের নোংরা খোঁয়াড়ের সঙ্গেই তার বসবাস। মেয়ের এই কাণ্ডে তার জাত যায় না, মান যায় না। এ দুটোর একটিও যে তার নেই। সে হাসে। হিংস্রর, নির্দয়, নির্দয় হাসি। মহামায়ার ধারালো ধাতব শান খাওয়া তীক্ষ্ণ বটির মতো হাসির ঝিলিক ঢেউ তোলে বাদলার কালো ঠোঁটে।

রাতের সমস্ত ঘটনাই বিস্মৃতির অতল অন্ধকার সুড়ঙ্গে হারিয়ে যায় লক্ষ্মীর। মহামায়া কিংবা বাদলা কামারের নানা প্রশ্নের উত্তরের বদলে বরং সে নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে, ‘কে আমাকে ডেকে নিয়ে গেল খ্রিস্টান কবরখানায়?’

‘কিছুই মনে নাই তোর লক্ষ্মী?’ জানতে চায় মহামায়া।

বাদলাকামার ফোঁস করে ওঠে, ‘মনে থাকব ক্যামনে? এই ভূততো হিন্দুর ব্রহ্মদৈত্য না, মুসলমানের জিন-পরিও না, এযে ফিরিঙ্গির দিয়াবল শয়তান।’

সেই ফিরিঙ্গি ভূতের কবর থেকে মেয়েকে রক্ষা করতে চায় মহামায়া। ভূতের কবরেজের জন্য স্বামীকে তাগাদা দেয় সে। বাদলাকামার রেগে যায়, ‘থোতের কবরেজ, সব ফাঁকিবাজ। মনে নাই তোর খ্রিস্টানপাড়ার জোসেফের বৌরে ভূতে ধরলে পর শহরের পাগলের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল? সেই পাগলের ডাক্তার নাকি মনের ডাক্তার, তার হাতে বৌটা কি ভালো হয় নাই? লক্ষ্মীর অসুখটা ধরতে পারিস না? মনের অসুখ, পিটারকে আজও ভুলতে পারেনি মেয়ে।’

মহামায়া বুঝতে পারে সবই। মতিভ্রমে পড়ে লক্ষ্মী সে রাতে একাকী ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল। কবরখানায় কোনো কিছু দেখে ভয় পেয়ে জ্ঞান হারায়। হুঁশ ফিরলেও সে সব মনে থাকার কথা নয়। কথাটা শুনেছে সে বাজারের টমাস ডাক্তারের মুখে। টামাস শহরের এক বড় ডাক্তারের কম্পাউন্ডার ছিল। ডাক্তারি শিখে গ্রামে ফিরে এসেছে। রেশ হাত যশ আছে তার। সে-ই লক্ষ্মীকে অন্য ঔষুদের সঙ্গে ঘুমের ঔষধ দিয়েছে। মহামায়ার বিশ্বাস এতেই সে সুস্থ হবে। টমাস ডাক্তারের পরামর্শে সে নিজেও লক্ষ্মীর মনের ডাক্তারের অভিনয় করে যাচ্ছে। রোগীর সঙ্গে অভিনয়টা তো সহজ নয়।

এর মাস ছয়েক পর হঠাৎ একদিন দুপুর বেলা লক্ষ্মী বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। টের পেয়ে মহামায়া পিছু নেয়। পেছন থেকে নাম ধরে ডাকালেও ভ্রুক্ষেপ নেই লক্ষ্মীর। মহামায়া ছুটতে ছুটতে লক্ষ্মীর একটা হাত ঝাপটে ধরে, ‘কই যাস তুই? গলাটিপে খুন করে ফেলব মেয়ে।’

লক্ষ্মী মহামায়ার বুকে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে কেঁদে ফেলে, ‘মা, আমি পিটারের কাছে যাচ্ছি।’

মহামায়া তো তাজ্জব! বলে কি মেয়ে। মনের ভিতরটা তার এলোমেলো হয়ে যায়। ধীরে ধীরে লক্ষ্মীকে বুকের ওপর টেনে নেয় মহামায়া। চোখে জল নামে তার। বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পায় না। এভাবে দুটি অসম বয়সের নারীমূর্তি একদেহে নীল হয়ে যায়। কতক্ষণ? কেউ জানে না। এক সময় মহামায়া বিড়বিড় করে বলে, ‘লক্ষ্মী, শোন যা। আমি আর তোর বাবা হেরে গেছি। আর কয়টা বছর অপেক্ষা কর, আইনের বয়সটা আঠার হতে দে, আমি নিজ হাতে তোরে পিটারের ঘরে তুলে দিয়ে আসব, কি হবে জাত-ধর্ম দিয়ে। ত্ইুই আমার জাত, তুই-ই আমার ধর্ম।’

 

॥ পঁচিশ ॥

কাঁটা তারের সীমান্তে সীমান্তরক্ষী তপন পিতা অধরচন্দ্রের পত্রে জানতে পারে কামাখ্যাচরণের মেয়ে আরতির বিয়ে হয়ে গেছে। শহরের ব্যাংকে কর্মরত পাত্র। নগদে আর সোনাদানায় পাঁচ লাখ টাকায় মেয়ের জন্য চাকুরে পাত্র কিনেছে। পাঁচ কেন শ লাখ খরচা হলে কামাখ্যার কি! আরতির সব বৃত্তান্ত জেনেও পাত্র আর পাত্রপক্ষ একপায়ে খাড়া। কামাখ্যাচরণের একমাত্র সন্তান আরতি তার অবর্তমানে বিশাল স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির মালিক। এমন সোনার হাঁস কে হাতছাড়া করে? হোক সে আ¤্রফল অম্লকিংবা দাঁড়কাকে ঠোঁকরানো।

পিতার পত্র পাবার পাঁচদিনের মাথায় ব্যারাকের ভেতর নিজের রাইফেল থেকে গুল ছুড়ে আত্মহত্যার ব্যর্থ চেষ্টা চালায় তপন। বুকের বদলে কাঁধের পাশ দিয়ে গুলি বেরিয়ে যায়। তপনের পাশের সিটে শুয়েছিল প্রবীর বড়–য়া। তপন ভেবেছিল প্রবীর ঘুমিয়ে আছে। প্রবীর চোখ বুঁজে জেগেছিল। চোখ খুলেই তপনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রায় আর্তনাদ করে। তাতেই গুলি লক্ষভ্রষ্ট হয়।

প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মীর আত্মহত্যার চেষ্টা বড় অপরাধ। তারপরও মাসখানিক শারীরিক এবং মানসিক চিকিৎসা শেষে তপনকে চার মাসের ছুটি দিয়ে পিতা অধরচন্দ্রের হাতে তুলে দেয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধা বলে কথা। বাড়ি ফেরার সময় পিতা-পুত্রের সঙ্গী হয় সহকর্মী চট্টগ্রামের প্রবীর বড়ুয়া। ঘটনাটি রটে যাবার ফলে গ্রামে ফিরলে লোকেরা ভিড় করে বাড়িতে। প্রবীর সমবেতদের জানায় তপন মোটেই আত্মঘাতী হতে চায়নি। বরং সীমান্ত পাহারার সময় গরু পাচারকারীদের গুলিতে অন্ধকার রাতে সে আহত হয়। প্রবীর আরও দাবি করে একন মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক কখনও আত্মহত্যার চেষ্টা করতে পারে না বরং দেশের জন্য শহিদ হতে পারে। গ্রামবাসী দ্বিধায় পড়ে।

মাত্র একরাত। প্রবীর বড়–য়াকে বাড়ি যেতে হবে। চট্টগ্রামের পাহাড়তলি। স্ত্রী-সন্তান অপেক্ষায় আছে। প্রবীর সমতলবাসী বড়–য়া হলেও তার স্ত্রী রাঙ্গামাটির পাহাড়ি চাকমা। বড়–য়ারা মিশ্রবর্ণ, চাকমারা গৌরবর্ণ। প্রেমের বিয়ে। বর্ণবাদ হেরে যায়। প্রবীর বহুবার তার ভালোবাসর গল্প বলেছে তপনকে। মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে কিভাবে একটি চাকমা মেয়ের প্রেমে পড়ে সেই কাহিনি। চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হলে প্রবীর তার প্রেমিকা পারমিতা চাকমার নৈকট্য হারিয়ে ফেলে। যুদ্ধশেষে বহু অনুসন্ধানের পর পুড়িয়ে ফেলা সেই চাকমা গ্রাম থেকে বহুদূরের বার্মা সীমান্তে নাফনদীর তীরে এক পল্লীতে হারানো সেই চাকমা পরিবারটিকে ফিরে পায়। এ যেন শাক্যহিংহ গৌতমকে স্বপ্নলোকে সামনে পাওয়া।

প্রথম সাক্ষাতেই প্রবীর যখন দেখতে পায় পারমিতা গর্ভবতী, তখন তার পায়ের তলার পার্বত্য ভূমিটি ভূকম্পনে কেঁপে ওঠে। কিন্তু যখন সে জানতে পারে পারমিতার গর্ভের সন্তানের জন্মদাতা সে, সুখ আনন্দ, মনস্তাপ, অপরাধবোধ আর কিংকর্তব্যবিমূঢ়তার গোলকধাঁধায় পড়ে তখন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। সে ক্ষমা চায় পারমিতা আর তার পিতা-মাতার কাছে। ওরা তাকে ক্ষমা করে এই শর্তে যে, পারমিতাকে সে বিয়ে করবে। সমতলের বড়ুয়া রীতি নয়, পার্বত্য আদিবাসী রীতিতেই বিয়ে হয়ে যায় পারমিতা-প্রবীরের।

কত কথা আজ মনে পড়ে প্রবীরের। একাত্তরের স্মৃতি। কেন জানি হঠাৎ আজ তার মনে হয়, যে মানুষের একাত্তরের স্মৃতি নেই সে মানুষ নয় জড়জীব। পশু-পাখি-বৃক্ষ মাত্র। চেতনাবিহীন পদার্থ। যার আছে যুদ্ধ আর বিজয়ের স্মৃতি তার গৌরব স্বর্গ-মর্ত্য-পাতালস্পর্শী। সেই স্মৃতি প্রবীরের আছে। সেই স্মৃতি তো কেবল হীরক দ্যুতি নয়, অন্ধকার ভয়ংকরও বটে। গণহত্যা, প্রতিরোধ, প্রতিহিংসা, নিষ্ঠুর প্রতিশোধ, রক্ত আর চোখের জলে মিশে তৈরি শিহরন জাগানো এক বিভীষিকা-বীভৎস কালো ¯্রােত। বিজয় আর স্বাধীনতার যে আনন্দের উচ্চ কোলাহল-কলরব তার দৈর্ঘ্য সৃষ্টির আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত প্রসারিত এই স্মৃতি-ধরেরাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মনুষ্য-অবতার।

কি স্মৃতি প্রবীর বড়–য়ার? ওই যে, প্রশিক্ষক কমান্ডার অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন সুপ্রিয় চাকমা কর্তৃক তার আর সহযোদ্ধা চারুচাকমার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা। প্রবীর তো স্মৃতি থেকে পলাতক বিশ্বাসঘাতক নয়। যুদ্ধ এবং নিজের পরিণতি, কোনো স্মৃতিই তাকে প্রতারণা করে না। সন্দেহভাজক পাকিস্তানি গুপ্তচর হিসেবে প্রশিক্ষণ শিবিরেই বন্দি হয়ে যায় প্রবীর বড়–য়া আর চারুচাকমা। প্রাথমিক তদন্তের পরপরই তাদের মৃত্যুদ- ঘোষণা করেন শিবির কমান্ডার। কিন্তু সেক্টর কমান্ডারের নির্দেশে মৃত্যুদ- কার্যকরের পূর্বে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ আসে। চূড়ান্ত পর্যায়ে এটা প্রমাণিত হয় যে, চারু চাকমা পাকিস্তানের পক্ষ নেয়া চাকমা রাজা ত্রিদির রায়ের লোকদের এজেন্ট। কিন্তু গুপ্তচর বৃত্তি নয়, বরং প্রমাণ হয় গেরিলা যুদ্ধরীতির বাইরে গিয়ে প্রবীর এক চাকমা যুবতীর প্রেমে পড়েছে। যুদ্ধকালে এটা ভুল, কিন্তু অপরাধ নয়। তাই প্রবীর প্রাণে রক্ষা পায়।

সেই ভয়ঙ্কর দিন কোনোদিন ভুলতে পারবে না প্রবীর। কেউ যেন বিশ্বাসঘাতকতা করার সাহস না পায় সেই দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্যই প্রকাশ্যে, অপরাপর মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে চারুচাকমার মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। ঠিক দুপুর বারটায় গাছের সঙ্গে বেঁধে চোখবন্ধ অবস্থায় চারুর বুক বরাবর চার রাউন্ডগুলি বর্ষণ করে ক্যাপ্টেন সুপ্রিয় চাকমা। লাশ তুলে নিয়ে পাহাড়ি খালের পারে জ্বালিয়ে দেয়া হয় সন্ধ্যার আগে। কিন্তু বিস্ময় এই, চিতার আগুন নিভে গেলে ক্যাপ্টেন সাহেব স্তব্ধ হয়ে ভস্মস্তূপের দিকে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তার চোখ জোড়া ঝাপসা হয়ে আসে। বুঝা যায় অতিকষ্টে নিজের আবেগকে সংযত রাখছে। এক সময় তার মাথা উঁচু হয়। কণ্ঠস্বর গম্ভীর, কিন্তু শাণিত, ‘বাঙালি যোদ্ধাগণ, চাকমাদের তোমরা অবিশ্বাস কর না। তোমাদের চেয়ে চাকমাদের মাতৃভূমি প্রেম একবিন্দুও কম নয়। স্বাধীনতার জন্য আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা পাহাড়ের মাটিকে ভিজিয়ে দিয়েছিল মুঘল আর ইংরেজের তরবারি-বন্দুকের নিষ্ঠুরতায়।’

কিন্তু ক্যাপ্টেন সুপ্রিয় চাকমার কথাগুলো শোনার জন্য সেই প্রশিক্ষণ শিবিরে তখন কোনো বাংলাভাষী যুবক উপস্থিত ছিল না। পাহাড়ি যারা ছিল তারা তখন সেই চিতাভস্মের দিকে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিয়ে সমস্বরে উচ্চারণ করে- বুদ্ধংশরণং গচ্ছামি। আমরা বুদ্ধের অনুগামী। আমরা সত্যের অনুগামী।

বহুদিন পর, মনে হয় সহস্র বৎসর পেরিয়ে প্রবীর বড়–য়া আজ রাঙামাটি শহর ছাড়িয়ে দীর্ঘপথ মাড়িয়ে একাত্তরের স্মৃতির দিকে হেঁটে যাচ্ছে। খোঁজাখুঁজির পর স্থানীয় একজুম চাষীর সহায়তার পাহাড়-জঙ্গলের মাঝখানে পরিত্যক্ত সেই প্রশিক্ষণ শিবিরের পাশে এসে দাঁড়ায়। পাহাড়ি ঘাস, ঝোপ-ঝাড়ে ভরে গেছে। কয়েকটি কাঠের খণ্ড, ভাঙা টিন আর যোদ্ধাদের রান্নার স্থানে উনুনের চিহ্ন, ছাই-স্তূপ এখনও স্পষ্ট। ওখানে পড়ে আছে বুনো খরগোশের মল আর একটি সাপের ছলম। যে গাছে বেঁধে চারু চাকমাকে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিলেন ক্যাপ্টেন সাহেব তা আজও সটান দাঁড়িয়ে। যেখানে একজন বিশ্বাসঘাতক আর পাকিস্তানি এজেন্টকে দাহ করা হয়েছিল তা আজ দৃশ্যমান নয়। লতাগুল্মে আচ্ছাদিত। এ যেন চিতাভস্মের অস্বীকৃতি।

প্রবীর বড়–য়ার ইচ্ছে করে ঘাস আর লতাগুল্ম সরিয়ে সরিয়ে খুঁজে দেখতে কোথায় লুকিয়ে রয়েছে একজন রাজভক্ত পাহাড়ি নির্বোধ যুবকের দেহাবশেষ। চিতার ছাই, পোড়া কাঠের অংগার তো অবিনশ্বর। প্রবীর বড়–য়ার আজ মনে হয় নির্বোধ ওই পাহাড়ি আদিবাসী যুবক পাকিস্তানের জন্য প্রাণ দেয়নি, প্রাণ দিয়েছে একজন আদিবাসী রাজাকে ভালোবেসে, প্রজার আনুগত্যের প্রমাণ দিতে। তাই চোখে জল নামে প্রবীরের। গাছে ঝুলে থাকা সাপের মতো লতায় ফুটে থাকা একমুঠো লালফুল চিতাস্থান ঢেকে রাখা লতাগুল্মের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে সে বিড়বিড় করে, ‘আমাকে তুই ক্ষমা করিস চারু, আমার প্রার্থনা, পরজন্মে তুই গৌতম জাতকের মতো একজন তীর্থঙ্কর হয়ে পুনর্জন্ম নিস।’

চোখ ঝাপসা হয়ে আসে প্রবীর বড়–য়ার। চোখ মুছে সে পেছন ফিরেই চমকে ওঠে। আরে একে? এ যে চারু চাকমা। মুক্তিযোদ্ধার পোশাক। কাঁধে রাইফেল। মুখে মৃদু হাসি ঝলসে ওঠে। ফিসফিস করে চারু বলে, ‘প্রবীর, আমার যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি, মুক্তি মেলেনি, যুদ্ধ চলছে। বাঙালির যুদ্ধ যেখানে শেষ, আমার যুদ্ধের শুরু সেখানে।’

‘আর কতদিন চলবে বলে তোর বিশ্বাস?’ প্রবীর নয়, প্রবীরের মুখ দিয়ে বুঝি এমন কেউ একজন জানতে চায়, যে অন্য পৃথিবীর। সে যাকে চেনে না। চারু নিরুত্তর। সে কেবল প্রবীরের পাশে হাঁটে। দূরে পাহাড়ের ওপর সূর্যটা কাত হচ্ছে। প্রবীরের একাবারও মনে হচ্ছে না চারু চাকমা নামের যে যুবক তার সঙ্গী হয়েছে, একাত্তরের যুদ্ধস্মৃতির এক পুরাতন দুনিয়াকে পেছনে ফেলে, জীবিতদের জগতের কেউ নয়। তার জাগতিক অস্তিত্ব এই দুনিয়া থেকে চিরদিনের মতো হারিয়ে গেছে ক্যাপ্টেনের চারটি বুলেটের আঘাতে। সে বুঝতে পারে না প্রাচীন স্মৃতির কুয়াশায় হাঁটছে সে কেবলই।

এবার চারু চাকমা জানতে চায়, গৌতমী চাকমার সঙ্গে যদি তোর কোথাও সাক্ষাৎ ঘটে তবে বলিস যুদ্ধশেষ না হলে ওর সঙ্গে আমার দেখা হবে না।’

‘কে গৌতমী?’ প্রবীর জানতে চায়।

‘আমার প্রেমিকা, যুদ্ধযাত্রায় সে-ই ছিল আমার বিদায়ের শেষ সাক্ষী,’ এবার রাইফেলটা কাঁধ বদল করে চারু। যেন আদি মানবের কাঁধে পাথরের হাতিয়ার।

‘কোথায় পাব তাকে আমি?’

‘রাঙ্গামাটি শহরে।’

‘আমি যে ওকে চিনি না চারু?’

এবার নিরুত্তর। প্রবীর পাশ ফেরে। না, কেউ নেই। সে একাকী হাঁটছে পাহাড়ি পথ ধরে। তাই সে আচমকা চিৎকার দিয়ে ডাকে, ‘চারু… চা…রু…।’

পাহাড়ের গায়ে গড়িয়ে পড়া প্রতিধ্বনি আকাশে বিলীন হয়ে যায়। সামনেই একটা চাকমা পল্লী। ডান পাশে পাহাড়ের গায়ে ফসল কাটা জুম ক্ষেত। প্রাচীন ধানের বীজের চিরকালের মতো হারিয়ে যাবার স্মৃতি যেন শুকনো নাড়ায় কংকাল হয়ে পড়ে আছে। প্রবীর ছুটছে, পাহাড়ি খরগোশের মতো। এবার পিছু ফিরতেই দেখতে পায় দু’হাতের মুঠোয় ধরা তার উদ্যত রাইফেলের পাহাড়ের আকাশ ছুঁয়েছে।

সন্ধ্যার পাহাড়ি অন্ধকার উপত্যকায় ছড়িয়ে পড়ার পূর্বেই তাকে রাঙ্গামাটির মহাবিহারে পৌঁছতে হবে। আনত হতে হবে ভগবান বুদ্ধের পদপক্ষে। জানতে চাইতে গৌতম চাকমার ঠিকানা। যদি জানতে না পারে তবে চারুচাকমার বিষয়ে, কার কাছে সাক্ষ্য দেবে সে। মৃত্যুর দুনিয়া থেকে সাত বছর পর মরিয়ামপুত্র যিশুর মতো যার পুনরুত্থান ঘটেছে তার বিষয়ে কেমন করে সাক্ষ্য দেবে সে? প্রবীরের এই ছুটে চলা তো অজাগতিক এক মহাসত্যকে জাগতিক সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত করার অদম্য বাসনা। কিন্তু সন্ধ্যার আঁধার এত দ্রুত পাহাড় বেয়ে নামছে কেন? কেন নৈঃশব্দিক দুনিয়াটা তাকে চারপাশ ঘিরে ধরছে? এই নৈঃশব্দ্য আর আঁধারের রহস্যে কি সে ডুবে যাবে?

প্রবীর বড়ুয়া পৃথিবীর মহাসময়ের হিসাব জানে না। সে জানে না সময় খরগোশের চেয়েও দ্রুতগামী। পাহাড়ি পতঙ্গের চেয়ে কোটিগুণ দ্রুত উড়তে পারে। সে নিজেও জানে না রাঙ্গামাটির মহাবিহার আর কত দূর। একাত্তরের যুদ্ধের গন্ধ কি তার মতিভ্রম ঘটাচ্ছে? দৃষ্টির ভ্রম আর স্মৃতিরভ্রম কি তাকে ক্রমেই টেনে নিচ্ছে মহাবিশ্বের মহাকালের বিগ হোলের গভীর অনিরুদ্ধ অন্ধকারে? অথচ হিং¯্র জন্তুর অন্ধকারে সে এখন বন্দি হয়ে পড়ে।

 

॥ ছাব্বিশ ॥

প্রবীর বড়–য়া যখন রাঙ্গামাটি মহাবিহারের অতিকায় লৌহ ফটকের সামনে এসে দম ফেলে, তারও অনেক পূর্বে মহাবিহারের দুয়ার বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যুতের আলোয় ঝলমল করে চারপাশ। অনতিদূরে বোধি দ্রুমের পাতায় জোনাকের আলো চিকমিক করে। আকাশে পঞ্চমীর চাঁদ একাকী স্থির হয়ে আছে। জ্ঞান বৃক্ষের নীচে কি শাক্যসিংহ গৌতম বুদ্ধ ধ্যানমগ্ন? না, ওখানে কেউ নেই। আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন প্রজ্ঞাপারমিতা গ্রন্থের পাতা বোধিবৃক্ষের নীচে ছিন্ন পাতার রূপ নিয়ে ছড়িয়ে আছে। তা হলে কার কাছে প্রবীর বড়–য়া জানু পেতে বসে করজোড়ে প্রার্থনা করবে? যার কাছে সে কৃপাপ্রার্থী হবে, তার আড়াই হাজার বৎসর পূর্বের প্রাচীন অস্তিত্বের গন্ধ কোথাও যে নেই।

রাতের দ্বিতীয় প্রহর পেরিয়েই প্রবীর বড়–য়া তার স্ত্রী পারমিতা চাকমার পিতার দুয়ারে এসে হাজির হয়। সঙ্গোপনে কপিলাবস্তু নারী পরিত্যাগের সময় সিদ্ধার্থের স্ত্রী গোপাদেবী ঘুমন্ত শিশু সন্তানকে জড়িয়ে যেমনি নিদ্রাচ্ছন্ন ছিলেন, ঠিক তেমনি কি প্রবীরের স্ত্রী পারমিতাও কন্যাকে জড়িয়ে সুখনিদ্রায় অচেতন হয়ে আছে? না, পরিমিতা জেগেই ছিল স্বামীর প্রতীক্ষায়। দুয়ার খুলে সারা শরীরে কামগন্ধ ছড়িয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় পারমিতা। তার নিদ্রালু চোখ, ঠোঁটে মৃদু হাসির ঝলক, নাইটি পরা শরীরে কিউক্রাডং পাহাড় চূড়ার মতো স্তনজোড়া, কোমর বাঁকা শরীর প্রাচীন অজন্তা চিত্রের নারী শরীরের মতো প্রবীরের অস্তিত্বে কম্পন সৃষ্টি করে। আকারে র্বার ভেঙে পড়া মেঘের ভেতর প্রপাত সৃষ্টি করে। কিন্তু সেখানে একবিন্দুও কাম বর্ষণের জল নেই। নবীন জলের ঘ্রাণ নেই। বরং একাত্তরের রাজভক্ত এক বিশ্বাসঘাতকের গুলিতে বিদীর্ণ হৃৎপিণ্ডের কলকল বয়ে চলা তাজা রক্তের তাজা গন্ধ। পারমিতা তাকে আহ্বান করে, ‘এত রাত?’

‘রাত এত দীর্ঘ, আমি বুঝিনি,’ প্রবীর উত্তর দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে।

তারও দীর্ঘক্ষণ পর রাতের তৃতীয় প্রহরে বহুদিন পেরিয়ে পারমিতার সঙ্গে দেহমিলনের ভেতর পরমানন্দ যখন ফুরিয়ে আসে তখন আলোজ্বলা ঘরে, ঘুমন্ত শিশুকন্যার অস্তিত্বের ভেতর প্রবীরের মনে হয়, এইমাত্র পারমিতার সঙ্গে যা ঘটেছে তা যেন চারু চাকমার চিতাভস্মের আগুনের অবশেষ মৃদু উত্তাপ মাত্র। অথচ পারমিতা তা বুঝতে পারে না। স্বামীর সঙ্গে নাতিদীর্ঘ রমণ শেষে পরম ক্লান্তিতে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ে। তার এই নিদ্রা প্রবীরের কাছে মনে হয় নিরঞ্জনা নদীতীরে গৌতম বুদ্ধের নির্বাণলাভের নিষ্কাম মুহূর্তের মতো। চা হলে সে কি বৈশাখী পূর্ণিমা রাতে সুজাতার হাতের পায়েসান্ন গ্রহণের পর নিঃসঙ্গ গৌতম বুদ্ধের উড়– বেলা গ্রাম ছেড়ে নিরুদ্দেশ যাত্রার মতোই ঘুমের দীর্ঘ পথে নিরুদ্দেশ যাত্রা করবে? নিঃসঙ্গ? নিঃসঙ্গ নয় তো কি! ঘুমে তো সঙ্গী হয় না। ঘুম তো মানুষকে নিঃসঙ্গই করে। এ যেন বুদ্ধের নির্বাণেরই মতো। বহুদিন সীমান্তে স্ত্রী বর্জিত নিদ্রা শেষ আজ রাতে স্ত্রীর সঙ্গে তেমনি নিঃসঙ্গ নিদ্রায় তলিয়ে যায় প্রবীর। এ যেন অপার্থিব মৃত্যু গ্রাস করে তাকে।

দ্বিতীয় প্রভাতে পারমিতাকে সঙ্গে করে নগর ভ্রমণে বেরোয় প্রবীর। রাজধানীগামী বাসগুলো তাকে বিস্মিত করে। পাহাড় উপত্যকা পেছনে ফেলে পাহাড়ি তরুণীরা কোথায় যাচ্ছে দলবেঁধে ওরা কি পার্বত্য খুদে শহরটি চিরদিনের মতো পরিত্যাগ করছে? এত উচ্ছ্বাস, এত ব্যগ্রতা কোন? টার্মিনালে এসি, ননএসি বাসগুলো লাইনে দাঁড়াতেই কেবল তরুণীরাই নয়, তরুণেরাও লম্বা লাইন হয়ে যায়। ব্যগ্রতা থাকলেও বিশৃঙ্খল নয়। মনে হয় বিচিত্র চেহারার একটি পাহাড়ি শঙ্খচূড় সাপ ধারে ধারে গুহার ভেতর হারিয়ে যাচ্ছে। পাহাড় কি তাদের যুগযুগান্তর ধরে কিছুই দেয়নি? দীর্ঘ বঞ্চনার কি অবসান ঘটিয়ে দিয়েছে একাত্তরের যুদ্ধ? তাই পাহাড় ছেড়ে সমতলের রাজধানী শহরের বহুদূরবর্তী আলোকচ্ছটা কি নিশি পতঙ্গের মতো মানুষগুলোর দৃষ্টিভ্রম ঘটিয়েছে? আলোর বিভ্রমে পড়ে ওরা মৃত্যুকূপের দিকে ধাবিত হচ্ছে না তো? এমন সন্দেহ যাদের আছে তারা সংখ্যায় খুবই নগণ্য। সংখ্যাগরিষ্ঠরা বিশ্বাস করে সরকারি বেসরকারি বিশ্বদ্যিালয়গুলো ওদের অপেক্ষায় আলো জ্বালিয়ে বসে আছে। জুমচাষের খর ঘরে হাত নাগরিক বিচিত্র কর্ম¯্রােতে জীবনের ভিন্ন ব্যাখ্যা খোঁজে।

পাহাড়ে পাহাড়ে শান্তি বাহিনীর তরুণের যুদ্ধ করে। প্রাণ দেয়, প্রাণ নেয়। রক্তে ভেজা সিঁড়ি ভেঙে নগরে যারা ছোটে তাদের বুকেও রক্তক্ষণ ঘটে। এই অবিশ্বাস, এই বিদ্বেষ-ঘৃণার সঙ্গে একাকার হয়ে থাকে তারুণ্যের বিশ্বাসের স্বপ্ন। এই বৈপরীত্যের ভেতরও ঐক্যতান একাকার হয়ে বিচিত্র এক রং রাজধানীতে ধারমান বাস ট্রেনের বগিগুলো স্রোতের মতো ঢেলে দেয়। কালো শ্যাম বর্ণের মানুষে ঠাসা এই মহানগরীতে পাহাড়ি তরুণ-তরুণীরা বিত্রি রং গোলাপ-টগর হয়ে আলো ফোটায়। কালোবর্ণ প্রবীর বড়ুয়া শ্বেত বর্ণ পারমিতা চাকমার দিকে তাকিয়ে মনে মনে উচ্চারণ করে বুদ্ধংশরনং গাচ্ছামি। উভয়েরই গন্তব্য শাক্যসিংহ গৌতম বুদ্ধের পথ। একাত্তরের ঐক্যটা এখানেই। সে বুঝতে পারে। যারা উত্তুঙ্গ সমুদ্রে টেউয়ের মতো পর্বতমালা ভেঙে সমতলের উপত্যকায় নেমে আসে, তারপর অজগর সাপের মতো জাতীয় হাইওয়ে কিংবা রেললাইন ধরে বহুদূরবর্তী পলল অথবা এঁটেল মাটির সমতল ভূমির ওপর হাইরাইজ বিল্ডিং দেখতে দেখতে অদৃশ্য হয়ে যায়, তারা কি বন্ধুর পর্বতারোহণের কৌশল স্মৃতির ভেতর আটকে রাখতে পারে? এমন জিজ্ঞাসার এলোমেলো হয়ে যায় প্রবীর। আসলে সে যা সাপের ঝাঁপির মতো মনের গহনে আটকে  রেখেছিল দীর্ঘ সময়, এখন তা ঝাঁপি ভেঙে ফণা তোলে। সেটি কি? চারু চাকমার অজাগতিক শরীরের জাগৃতি আবির্ভাব। পথে হাঁটতে হাঁটতে, সেই কথাটাই বলে ফেলে পারমিতাকে। পারমিতা চমকে ওঠে। বিশ্বাসে-অবিশ্বাসে দোল খায়। একটা শিহরণ তাকে ধাক্কা দেয়, ‘এত পুরানো ঘটনাটা তুমি কী আজও ভুলতে পার না’ নিশ্চয়ই বিষয়টি নিয়ে খুব ভাব, তাই না? যা ঘটেছে সবই তোমার মতিভ্রম’।

‘মতিভ্রম নয় পারমিতা, তুমি বিশ্বাস কর, প্রবীর বিড়বিড় করে।

‘এই জন্য তোমাকে আমি ওই পরিত্যক্ত ট্রেনিং ক্যাম্পে যেতে বারণ করেছিলাম,

নিশ্চয়ই তুমি সেই নির্জন স্থানে গিয়ে স্মৃতির ভেতর আতংকিত হয়ে পড়েছিলে, চারুর ছায়ায় যাকে তুমি দেখেছিলে সে তুমি নিজে, চারুর গলায় যেসব কথা শুনেছিলে সেসব তোমার নিজেরই কণ্ঠস্বর; পারমিতা স্বামীকে বিভ্রম থেকে উদ্ধার করতে চায়। ঠিক মনোবিদের মতো।

‘এভাবে বলছ কেন, তুমি কী মনের ডাক্তার?’ প্রবীর মৃদু প্রতিবাদ করে।

‘মোটেই আমি ভুল বলিনি প্রবীর। একাত্তরে ক্যাপ্টেনের মুখে শোনা ওই মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশের আতংকটা আজও তোমাকে জড়িয়ে বেড়ায়, কি ভয়ংকর নির্দেশ। তোমার চোখের সামনে চারুর মৃত্যুদ- কার্যকর। ওহ্কি ভয়ংকর।’ বলতে বলতে আতংকে যেন নিজেই বিচূর্ণ হয়ে যায় পারমিতা। প্রবীরের একটা হাত জাপটে ধরে। যেন অসাড় আঙুল। রক্তহিম।

প্রবীর নিরুত্তর। বহুদিন পর তার মনের গোপন আতংকটা আজই প্রকাশ করল প্রবীর। এতদিন কি করে চাপা রইল সেই আতংক তার মনের অন্ধকারে, ভাবতে থাকে পারমিতা। তাছাড়া যুদ্ধকালে তার মৃত্যুদ- এবং ক্ষমা পাওয়া সবই তো ওর জানা ঘটনা। কিন্তু সে যা জানতো না তা হচ্ছে প্রবীরের মনে গেঁথে থাকা গোপন প্রাণদণ্ড ভীতি। মৃত্যুদণ্ড।

দীর্ঘ নীরবতার পর বিড়াবিড় করে প্রবীর বলে, ‘পারমিতা, তুমি আমার কথা অবিশ্বাস করো না। আমি মিথ্যা বলছি না। মৃতচারু আমার কাছে ভগবান বুদ্ধের মতোই সত্য। চারুর সঙ্গে আজ আমার সাক্ষাতের ঘটনা যদি মিথ্যা হয় তবে ভগবান বুদ্ধের জন্ম-জন্মান্তরের জাতকের গল্পও অসত্য হয়ে যাবে।’

তাৎক্ষণিক উত্তর না-দিয়ে একটু সময় নেয় পারমিতা। তার মনের দ্বিধ-দ্বন্দ্বের খেলা চলে। সত্যমিথ্যা দোল খায়। এক সময় বলে, আসলে যেখানে চারুর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় সেখান যাওয়া তোমার ঠিক হয়নি। সেটা নিষিদ্ধ ভূমি। সে ভূমি চারুর একার। তার প্রেতাত্মার বাসস্থান। তোমার ভাগ্য ভালো প্রতিহিংসায় জেগে উঠতে পারতো চারুর আত্মা। কেন না মৃত্যুদ- পেয়েও তুমি ক্ষমা পেলে, সে তো পায়নি।’

প্রবীর বড়–য়ার মাথা আনত হয়। বিড়বিড় করে বলে, ‘পারমিতা, চল আমরা মহাবিহারে যাই, চারুর আত্মার জন্য প্রার্থনা করি।’

ওরা যখন মহাবিহারে পোঁছে তখন সেখানে ভিড়। দলে দলে পুণ্যার্থী এসেছে  বুদ্ধ প্রার্থনায়। তারাও প্রার্থনায় অংশ গ্রহণ করে। যেই না বিহার পরিত্যাগের জন্য প্রবীর পারমিতা তৈরি হয়, ঠিক তখনই সেই ভিড়ের ভেতর চারু চাকমাকে এক পলক দেখতে পায় প্রবীর। সে আঁৎকে ওঠে। তার মুখে অস্ফুট ‘পারমিতা ওই যে চারু!’

পারমিতা চারুকে কোনোদিন দেখেনি। চিনবে কি করে? চারু তখন একজন ভিক্ষুর পেছনে হাঁটছে। তার পোশাক সাদা হলেও বৌদ্ধভিক্ষুর গৈরিক রঙের ছায়া পরে ভিক্ষু বিহারে প্রবেশ করেন। পারমিতার হাত ধরে, ভিড়ের ভেতর অপলক তাকিয়ে থাকে প্রবীর। তার দৃষ্টি এবং সমগ্র চৈতন্য ভিড়ের ভেতর একজনকে খুঁজছে। যাকে খুঁজছে সে কি অজাগতিক দেহে এখানেই অবস্থান করছে?

পারমিতার শত অনুরোধেও বিহার পরিত্যাগ করতে রাজি হয় না প্রবীর। তার বিশ্বাস চারু এখানে আছে। হয়ত সে মৃতদের জগৎ থেকে তার হারানো প্রেমিকার খোঁজে এখানে এসেছে। কে কার প্রেমিকা? প্রবীর তো ওকে দেখেনি কোনোদিন। চিনবে কেমন করে? কত যুবতীই তো এখানে এসেছে। হয়ত তার প্রেমিকা এখানে নেই। বান্দরবানের কোনো এক চাকমা পল্লীতে বিয়ে হয়ে গেছে। তবু প্রবীরের ইচ্ছা করছে ‘ গৌতমী গৌতমী’ বলে চিৎকার করে ডাকতে।

কেন জানি হঠাৎ পারমিতার নেই হয়, হয়ত প্রবীর মিথ্যা বলছে না। চারু চাকমার অতৃপ্ত আত্মা রাঙ্গামাটির পাহাড়ে, চাকমা পল্লী কিংবা নগরে ঘুরে বেড়ায়। জগতে কত জটিল রহস্যই তো লুকিয়ে রয়েছে। পারমিতা কি সব কিছুর উত্তর জানে? বোঝা যায় প্রবীরের বিশ্বাস ধীরে ধীরে পারমিতাকেও স্পর্শ করছে তার নিজেরই অজান্তে। তাই তার চোখ প্রবীরের চোখ হয়ে যায়। সে মহাবিহারের প্রতিটি পুণ্যাষ্ঠার মুখে চারুর কল্পিত মুখ খোঁজে।

‘পারমিতা ওই যে, ওই যে চারু’, আচমকা প্রবীরের গলায় অস্ফুট চিৎকার। শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে।

অনতিদূরে বিহারের সিঁড়ির নীচে ভিড়ের ভিতর পারমিতা  একজন যুবককে দেখতে পায়। ঘাড় অবধি মাথার চুল নেমে এসেছে। মুখ বিষণœ, চোখ চঞ্চল। বোঝা যায় কাকে খুঁজছে সে। প্রবীর যেমনটা চারুর চেহারায় বর্ণনা দিয়েছিল হুবহু তাই।

‘পারমিতা, দেখতে পাচ্ছ চারুকে, জলদি চল’, পারমিতাকে হাতে ধরে ভিড় এড়িয়ে এগিয়ে যায় প্রবীর। তার মনে হয় চারু হাত তুলে ইশারা দিয়েছে তাকে। কিন্তু যে লোকগুলোর ভিড়ে দাঁড়িয়েছিল চারু সেখানে সে আর নেই। তার জাগতিক শরীর অজাগতিক হয়ে যায়।

প্রবীর পাগলের মতো ছুটে বেড়ায়, কোথায়, কোথায় চারু? বিহার প্রাঙ্গণের প্রতিটি মুখে হেঁটে বেড়ায় তার অস্থির দুষ্টি। কিন্তু চারু কোথাও  নেই। এক সময় সে থমকে দাঁড়ায়। মাথা নীচু করে ধীর ধীরে এগিয়ে যায় ধ্যানমগ্ন গৌতম বুদ্ধের ধাতব মূর্তির দিকে। হাত জোড় করে দাঁড়ায় সে। পারমিতা ছুটে এসে তার কাঁধে হাত রাখে। চোখে তার জল; চল বাড়ি যাই। এখানে কেউ নেই। চারু, গৌতমী, কেউ নেই। এই গভীর রাতে জোনাকপড়া প্রহরে কে গান গাইছে? জোনাক কি কাউকে ভাবের দুনিয়ায় উসকে দিয়েছে? ঠিক পটুয়া চিত্রকরদের গানের মতো কিন্তু বছর খানিক ধরে মিতালী চিত্রকর তো এ গাঁয়ে ঢোকে না? কোন দূর জেলা থেকে বছরে দু’এবার মিতালী তার স্বামীকে সঙ্গে করে এ তল্লাটে আসে। গাঁয়ের কারও বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে ঘরে ঘরে ঘুরে রামায়নের পালা, রাধাকৃষ্ণের পালা আর গার্হস্থ্য জীবনের সুখের উপায় নিয়ে রচিত গান গেয়ে পটচিত্র দেখিয়ে চাল নগদ পয়সা তুলে নিয়ে হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। ধর্মে মুসলমান, কর্মে হিন্দ, সে এক বিচিত্র জীবন। আঁঠামাখা শক্ত কাপড়ের খণ্ডে নানা রঙে আঁকা পট কাহিনি গানের সুরে বর্ণনা করে ঘুরে বেড়ানোই তাদের যাযাবর জীবন। তবে কি গভীর রাতে পালাগানের রেওয়াজ করছে মিতালী চিত্রকর? গান তো ভেসে আসছে গিরিশদের পাড়া থেকে। ওদিকেই কি আস্তানা ফেলেছে মিতালী চিত্রকর?

পূর্ণচরণ বিছানায় ওঠে বসে। শুয়ে থাকতে পারছিল না। জানালার ওপাশে জোনাক রাত স্থির হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু সে যা শুনছে তা কি চিত্রকারদের গান? করুণ রাগিণী। ঠিক ইনিয়েবিনিয়ে কান্নার মতো। পূর্ণচরণের মনে সন্দেহ। তবে কি কেউ কাঁদছে? মেয়ে মানুষের গলা। এমনও মনে হয় সুর ভেসে আসছে খুব কাছে থেকে। ক্রমশ যেন সেই সুর নিকটবর্তী হচ্ছে।

ঘর ছেড়ে পূর্ণচরণ বাইরের জ্যোৎস্না-বৃষ্টিতে ভিজছে। এমনওতো হতে পারে এটা প্রেতের কান্না। এগিয়ে যাবে কি? কিছুটা ভয়, কিছুটা কৌতূহল। রাত যতই জোনাকপড়া হোক, নির্জনতার ভেতর মিশে থাকে প্রাকৃতিক-অতিপ্রাকৃতিক আতংক। কন্যা মালতির কথা তার মনে পড়ে। হঠাৎ বুকের ভেতরটা অনেকদিন পর উথলে ওঠে। দু’চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। মালতির আত্মা কি প্রেত জীবন থেকে মুক্তি পেয়েছে? কোথাও কি তার পুনর্জন্ম হয়েছে? যদি না হয়ে থাকে তবে কি এ কান্না মালতির প্রেতাত্মার?

ঠিক তখনই গানের সুরের সঙ্গে মিশে থাকা বিলাস কান্নাটা যে দিক থেকে ভেসে আসছিল সে দিকে অন্য কারও গলার শব্দ শুনতে পায় পূর্ণচরণ। নিঝুম রাত বলে শব্দতরঙ্গ দ্রুত আছড়ে পড়ে তার কানে। কিন্তু সবই, এলোমেলো, অর্থহীন। তবে বুঝা যায় নারী আর পুুরুষের দুটি কণ্ঠস্বর। কিন্তু শনাক্ত করা যায় না কাদের স্বর। পূর্ণচরণ ঘরে ফিরে আসে। রাত পোহালে ঘটনাটি জানাজানি হয়ে যায়। দীর্ঘ সাত সাতটি বছর পর সেই একাত্তরের যুদ্ধদিনে শিশুকন্যা হারানো ভগবতীর স্মৃতি আচমকা প্লাবন সৃষ্টি করে। এতদিন মাঝে-মধ্যে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলেই পরক্ষণ ভুলে যেতো। এমনকি ঘটনা ঘটল গিরিশোর বৌ’র যার ফলে এই স্মৃতিবিকার? কারও অজানা নয় এই বছরে ভগবতী দুটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছে। কন্যালোক সে ভুলে গেছে। কিন্তু বাড়ির দক্ষিণ ভিটে কাঁচা ঘরের বদলে আধাপাকা ঘরের ভিত বানাতে গিয়ে মাটি খোঁড়াখুঁড়ি করতে গেলে লাল পোড়া মাটির একটি ছোট মেয়ে পুতুল বেরিয়ে আসে। সেই পুতুলই উস্কে দেয় ভগবতীর চাপা দেয়া শোক। ওই যে গিররিমা বৌকে প্রবোধ দিয়েছিল তার মতো কন্যা পুনর্জন্ম নেবে মায়ের পেটে, তা তো হলো না। জন্ম নিয়েছে পর পর দুটো ছেলে। কিন্তু ভগবতী এখনও বিশ্বাস করে তার হারানো মেয়ে আজও জীবিত। হয়ত কারও ঘরে সে বড় হচ্ছে।
ভগবতী ইনিয়েবিনিয়ে কাঁদে মাটির মেয়ে-পুতুলটি বুকে চেপে ধরে। পাগলের প্রলাপ বকার মতো হিসেব কষে মেয়ের বয়সের। সাত বছর তিন মাস। সাত বছর চার মাস। এখনও তার স্পষ্ট চোখে ভাসে তিন মাস সাতদিন বয়সের মেয়ের ডান পায়ের পাতায় কালো জন্ম দাগটি। ইচ্ছে করে সারা জগৎ ঘুরে ঘুরে এই বয়সের যত মেয়ে শিশু আছে তাদের ডান পায়ের পাখা পরখ করতে। এই কালো জন্ম দাগ তো অক্ষয়। এ যে শিশুর কপালে লেখা ভগবানের ভাগ্যলিপি লিখনের কালির ফোটা। দেবতা কার্তিকের বাহন ময়ূরের পুষ্পকলমে ভগবান মায়ের গর্ভে রেখেই সন্তানের ভাগ্যলিপি লিখেছেন। লিখনের পর অবশিষ্ট কালি জন্ম চিহ্ণ হিসেবে শরীরের যেকোনো স্থানে সাক্ষী হিসেবে রেখে যান। সেদিনই দুপুর বেলা পাশের গায়ের এক ভিখারিনী গিরিশের বাড়ি আসে ভিখ মাগতে। সঙ্গে ছয়-সাত বছরের একটি মেয়ে। চাল ভিক্ষা দিতে দিতে ভগবতী আচমকা মেয়েটির হাত ধরে মাটিতে বসে পড়ে তার ধুলোমাখা পায়ের পাতা পরখ করে। একহাতে তার ডান পায়ের পাতায় লেপটে থাকা ধুলো মুছে জন্ম দাগ খুঁজে বেড়ায়। না ওখানে কিছু নেই।

‘মা লক্ষ্মী, আমার নাতনির পায়ে কি খুঁজছ’, ভিখারিনী জানতে চায়।

ভগবতী নিরুত্তর। ওর চোখে জল। ভিখারিনী কিছুটা অনুমান করতে পারে। কেননা সে শুনেছিল যুদ্ধের সময় এ বাড়ির একটি শিশু হারিয়ে যায়। কোনো উত্তর না-দিয়ে ভগবতী উঠে দাঁড়ায়। তখনই ভিখারিণী বলে, ‘তোমার সন্তান কি হারিয়ে গিয়েছিল? তুমি বরং সুলতানপুরের মাদ্রাসার এতিমখানায় যাও, পেতেও পার ওখানে।

ভগবতী নিরুত্তর। একবার ভিখারিনী আবার ওর নাতনির মুখ দেখে। ভিখারিনী বলে, আমার এই নাতি এতিম। যুদ্ধের সময় রাজাকা-রের তার বাবা-মায়েরে মেরে ফেলে। আমি ছাড়া তার কে আছে কও?

‘সবাই আছে, আমার মেয়ে কই? এবার ভগবতী কেঁদে ফেলে।

‘এতিম খানায় যাও, তালাশ কর, যুদ্ধকালের এতিমও না কি ওইখানে আছে শুনেছি, ‘বলতে বলতে নাতনির হাত ধরে ভিখারিণী অন্য বাড়ির  উদ্দেশে পা ফেলে।

ভগবতী মুখে আঁচল টেনে অপলা তাকিয়ে থাকে মেয়েটির দিকে। চোখজোড়া বড় মায়াবী। সদ্য বিয়ানো গাইয়ের বাছুরের মতো। সে কি তার হারিয়ে যাওয়া মেয়ে হতে পারত না? হয়তা সেই ওই মেয়ে। এতদিনে পায়ের পাতার জন্ম দাগটি মুছে গেছে। কিন্তু এ কি করে সম্ভব? জন্ম দাগ তো মোছার নয়। একে ভগবানের কলমের কালির দাগ।

রাতে ঘুমিয়ে পড়ার আগে ভগবতী গিরিশকে ভিখারিনীর কথাটা বলে। বলে দূরের এই এতিমখানার কথা। গিরিশ নিশ্চুপ। সে তো বিশ্বাস করে তার শিশুকন্যা মৃত। মৃত বলেই ওকে রাতের উদ্বাস্তু যাত্রাপথে পরিত্যাগ করেছিল। কিন্তু ভগবতী বারবার কথাটা বলতে থাকায় কিছুটা ধৈর্য হারায় সে, ‘ঘুমিয়ে পড়, কতদিন কত বছর আর মেয়ে মেয়ে করবি? ভগবান তোর কোলে দুইদুটো ছেলে দেয় নাই? এমন করিস না, ভগবান রাগ করবেন।’

ভগবান রাগ করবেন, কথাটা ভাবতে ভাবতে নিশ্চুপ হয়ে যায় ভগবতী। যদি অসন্তুষ্ট হয়ে তার ছেলে দুটোকে তুলে নিয়ে যান? ভয়ে বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। অন্য মনে ভাবে, ভগবান আর কষ্ট দেবেন ওকে? কন্যাশোক যে কি তা ভগবান কি জানেন? তার যদি এমনি মেয়ে, হারিয়ে যেতো, তখন? আবার এমন আক্ষেপও মনের ভেতর নাড়া দেয়, ভগবান তো ভগবানই। তার আবার ঘর সংসার ছেলে-মেয়ে থাকে না কি!

পরিণামে ভগবতীর ইচ্ছার কাছে হার মানতেই হয় গিরিশকে। সে দূরের ওই এতিমখানায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তা হলে ভগবতী চলুক তার সঙ্গে ওই সুলতানপুরে। পাঁচ মাইল দূরের পথ। এখন পথকষ্ট নেই। কাঁচা রাস্তাটা পাকা হয়ে গেছে। বাস না চললেও, রিকশা চলে, ট্রেকার চলে। যুদ্ধেও আগেও এমনটা ছিল না। কাঁচা জংলি পথ। যুদ্ধটা তার মেয়েকে কেড়ে নিলেও দিয়েছে পাকা সড়ক। মেয়েটা থাকলে ট্রেকারে চেপে মামাবাড়ি যেতে পারত। যেমনটা সঙ্গে যায় ছেলে দুটো। মেয়েটার জন্য কষ্ট যে গিরিশের নেই, তা তো নয়। কিন্তু সে সইতে পারে। পারে না কেবল ভগবতী।

পড়শিদের দেখভালে ছেলে দুটোকে রেখে এক সকালে ভগবতীর হাত ধরে সুলতানপুরের উদ্দেশ্যে পথে নামে গিরিশ। মিনিট কয়েকের পায়ে হাঁটা, তারপর পাকা রাস্তা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলে খালি ট্রেকার পাওয়া যায়। সকালে অবশ্য ট্রেকারে সবজি বোঝাই থাকে। সদরে যায়। ওখান থেকে ট্রাকে করে ঢাকা শহরের আড়ত। পাকা সড়কটা হয়েছে বলেই, ট্রেকার আছে বলেই তো ক্ষেতের শাক-সবজির দাম মেলে। যুদ্ধের আগে তো মাঠের সবজি মাঠেই পচে যেতো।

ট্রেকারে বসে থাকলেও গিরিশের চোখ হাঁটে রাস্তার এপাশ ওপাশে। তার চোখ একটি পুরাতন বেলগাছ খোঁজে। সেই গাছের গোড়াইতো সে তার মৃত শিশুকন্যাকে আবছা অন্ধকারের ভেতর পরিত্যাগ করেছিল। কিন্তু কোন রাস্তা? কোন বেলগাছ? স্মরণ করতে পারে না। তবে এটা সত্য, এমনটা ঘটেছিল নিজেদের গ্রাম পরিত্যাগের অনেক পর। তা ছাড়া এক বছরে বহু প্রাচীন মেঠো পথই পরিত্যক্ত হয়েছে। নতুন রাস্তা হয়েছে। প্রশস্ত হয়েছে দু’পাশের গাছগাছালি কেটে। যদি সেই বেল গাছটা কাটা পড়ে থাকে তবে তো তার মৃত কন্যার ইতিহাস মহাকালের অন্ধকার সুড়ঙ্গ তালিয়ে যাবে।

না। রাস্তার দু’ধারে কোনো বেলগাছই দেখতে পায় না গিরিশ। বরং নতুন গাছ। বিদেশি অচেনা গাছের চারা রাস্তার দু’ধারের মাটি দখল নিয়েছে। চেনা মাটি, চেনা প্রকৃতি কেমন অচেনা হয়ে যাচ্ছে। সে তো দেখতেই পাচ্ছে, গ্রামে গ্রামে বিদেশি গাছের নার্সারি। নিজের সে বাড়ির সামনে পুঁতেছে একটি পাইন গাছের চারা।

ওই তো সুলতানপুর মাদ্রাসা, এতিমখানা। আরবের পয়সায় বিশাল বিশাল বিল্ডিং। এ যেন এক অন্য দুনিয়া। গিরিশ কিংবা ভগবতী কেমন করে বুঝবে? এখানে যারা আসে এতিম হয়ে, আসে শিক্ষা নিতে, তারা আর ফেরে না। ফেরে বদলে যাওয়া মানুষ হয়ে। কি পোশাকে, কি জীবনযাপন, কি বিশ্বাসে। তারা দেশ-দুনিয়ার অন্যসব মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যেন অন্য দুনিয়ার অন্য মানুষ। বেহেস্ত-দোজখ, মৃত্যু, গোনাহ্-নেক্ এর  জটিল দুর্ভেদ্য মহাসত্য দ্যুতি ছড়ায়। এসব গিরিশ আর ভগবতীর জানার কথা নয়। ওরা এসেছে একটি হারানো কন্যা শিশুর খোঁজে।

ভেতরে ঢুকে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে সটান দাঁড়িয়ে পড়ে ওরা। শত শত শিশু-কিশোর। এ যেন এতিম শিশুদের এক দুনিয়া। এ পৃথিবীতে ওদের কেউ নেই? মা, বা কেউ নেই কি? চোখে জল আসে ভগবতীর। তখন এক মুহূর্তেও জন্য হলেও এই শিশু কিশোরগুলো তার গর্ভের সন্তান হয়ে যায়। মাত্র-আট বৎসরের একটি কিশোর সামনে দিয়ে হেঁটে গেলে ছুটে গিয়ে তার একটি হাত জাপটে ধরে ভগবতী ‘তোর কি মা নেই’?

ছেলেটি চমকে গেলেও নিজেকে সামলে নেয়। তার চোখ জলেভরে আসে। সেই চোখে ভগবতী হারানো কন্যার চোখ খোঁজে। ভগবতী ছাড়া দুনিয়ার কেউ জানে না এতিম শিশুটির চোখে তার হারানো কন্যার চোখ খুঁঝে পেয়েছিল কিনা। এর উত্তর গিরিশের কাছেও আজীবন অব্যক্তই থেকে যাবে। অব্যক্ত থাকবে এই দুনিয়ার কাছে। আর ঠিক তখনই এতিমখানার পরিচালকদের একজন এসে সামনে দাঁড়ায়। প্রশ্ন করার আগেই ভগবতী ছেলেটির হাত ছেড়ে দিয়ে করজোড়ো দাঁড়ায়। তার চোখ জলে ভরে আসে; আপনাদের এখানে কি আমার হারানো মেয়েটি আছে? আমার কাছে তাকে ফিরিয়ে দিন।’

লোকটি ভগবতীর কথা বুঝতেই পারছে না। গিরিশ তাকে বুঝিয়ে বললে লোকটি যেন চমকে ওঠে ‘খোদা আমাকে মাফ করবেন। আপনাদের মেয়ে এখানে নেই, যদিও যুদ্ধে বাপ মা হারা চারজন এতিম এখানে আছে। তাছাড়া এটা ছেলে এতিমদের জায়গা, মেয়েদের নয়।’

ভগবতী আচমকা আর্তনাদ করে ওঠে। সে রাস্তার দিকে ছুটতে থাকে। পেছনে গিরিশ। তখনই আজান পড়ে। আজানের শব্দে ভগবতীর কান্নার শব্দ হারিয়ে যায়।

 

॥ সাতাশ ॥

গাঁয়ের মানুষকে থমকে দিয়ে একই সঙ্গে দুটি রটনা রটে যায়। এ অঞ্চলের সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তি, যুদ্ধের পর ক’বছরের ভিতরই আঙুল ফুলে কলাগাছ। গায়ে কানাঘুষা এই যে, রাজধানী শহরের পারিবারিক প্রাচীন পরিত্যক্ত একটি কবরস্থান ছলেবলেকৌশলে দখল করে আলিশান বাদশাহি মহল বানিয়েছে শিহাবউদ্দিন মোল্লা। কি নাই তার? একটি সুপার মার্কেট, একটি টেক্সটাইল মিল, দুটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি, একটি বেসরকরি ব্যাংকের অর্ধেক মালিকানা। রাজধানী শহরে ভাড়া দেয়া নিজস্ব ছয়টি ফø্যাট বাড়ি। অ্যাপার্টম্যান্ট। সত্য-মিথ্যা কেউ জানেন না, তবে রটনা আছে, বোকাধনী হলেই যেমনি চারটি বিয়ে করে, বুদ্ধিমান শিহাবউদ্দিন তা করেনি। সাতটা না পাঁচটা একটিই মাত্র বৌ। কিন্তু নিত্য আসা-যাওয়া তার নাইটক্লাবে, অভিজাত এলাকার মধুচক্রে।

সেই শিহাবউদ্দিনকে কাগজের টাকা দিয়ে তৈরি বাঘ খুবলে খেয়েছে। দ্বিতীয় রটনাটি হচ্ছে টাকা আর গহনার বস্তা বোঝাই বিশাল সিন্দুকের পাল্লা খোলা মাত্রই জিন বেরিয়ে এসে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলে লোকটিকে। পাঁচকান হয়ে কথাটা যখন গিরিশের বৌ ভগবতীর কানে আসে, সে যেন আচমকা ভিরমি খেয়ে পড়ে। কেননা অন্যের চোখে শিহাবউদ্দিন কালো টাকার রহস্যময় মানুষ হলেও, ভগবতীর চোখে সে অসীম ক্ষমতার অধিকারী, আগামীদিনের সংসদ সদস্য, ভাবী মন্ত্রী। এই লোকটাই পারে তার হারানো মেয়েকে খুঁজে বের করে দিতে। আর কিনা সেই মানুষটাকে বাঘ কিংবা ভূত মেরে ফেলেছে?

ভগবতীর মনের এই গোপন কথাটা এই প্রথম জানলো গিরিশ। সে খুবই বিস্মিত হয়। সে জানে রটনা যদি মিথ্যেও হয় তবু আবদার নিয়ে ভগবতীর ওই মানুষটার কাছে পোঁছানো অসাধ্য। অতীতের কথা বাদই গেল, বর্তমানের শিহাবউদ্দিন মোল্লার তুলনায় ভগবতী তো একটা পিঁপড়ের চেয়েও ক্ষুদ্র। ভগবতী স্বামীকে তাগাদা দেয় যেন সে আসল ঘটনাটা জানার চেষ্টা করে। ভগবতী মনে মনে তার ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে সব রটনা যেন মিথ্যে হয়ে যায়। মানুষটা বেঁচে থাকুক। তা না হলে কে তার হারানো মেয়েকে তালাশ করে দেবে?

এখন তা হলে নূর আলির বর্ণনায় শোনা যাক রটনাটি কেমন। তারপর না-হয় জানা যাবে আশরাফ মিস্ত্রীর বয়ান।

প্রথম প্রথম শিহাবউদ্দিন নগদ টাকা সবই ব্যাংক জমাতো। হঠাৎ শখ চাপে অতিকায় স্টিলের আলমিরার অতিকায় সিন্ধুকে রাখতে টাকা। একদিকে টাকার স্তূপ, অন্য পাশে সোনার কয়েন, বাট আর অলংকার। প্রতিরাতে ঘুমের আগে একাকী বসে সিন্ধুকটা খুলে টাকার স্তূপ নামিয়ে, সোনার স্তূপ ছড়িয়ে অপলক তাকিয়ে থাকতো। স্ত্রী বিষয়টা জানতো। কিন্তু এতে তার কোনো হেল-দোল ছিল না। একবার তার মাথায় কি ঢুকলো, মনে হলো তার এই টাকা আর সোনার স্তূপ সুরক্ষিত নয়। যেকোনো সময় স্ত্রী, পুত্র, কন্যারা গায়েব করে দিতে পারে। কথায় বলে টাকা পয়সার বিষয়ে অতি আপনজনকেও বিশ্বাস করতে নেই। তার পিরের এক মুরিদ ছিল জিন সঠিক। তাকেই ডাকল সে। জ্বিন সঠিক এসে শিহাবউদ্দিনের সিন্ধুকটিকে জিন বন্ধন দিয়ে যায়। এর ফলে সিন্ধুকের একটি কানাকড়িও কারও স্পর্শ করার ক্ষমতা রইল না। এমন একটি বিশ্বাস তার মনে বদ্ধমূল হয়ে যায়। একরাতে প্রতিদিনের অভ্যাস হেতু সিন্ধুক খুলে টাকার স্তূপ আর সোনার স্তূপে হাত বুলিয়ে পরম প্রশান্তির ভেতর ঘুমোতে যায় মোল্লা বাতি নিভাতেই ঘরের ভেতর একটা শব্দ শুনতে পায় সে। তৎক্ষণাৎ বাতি জ্বালিয়ে পুনরায় বিছানা ছেড়ে, সিন্ধুকের পাশে এসে বসে। তার মনে হয় শব্দটি তার সম্পদ পাহারাদার জিনের।

হঠাৎ শিহাউদ্দিন শুনতে পায় অদৃশ্য থেকে জিন তাকে বলছে, শিহাব, তোর মনের আশা আজও পূর্ণ হয়নি। আরও, আরও টাকা চাই তোর। আরও এটি সিন্ধুকঅলা আলমারি ঘরে তোল। বাতাসে উড়ছে টাকা, মুঠো মুঠো তুলে এনে সেই সিন্ধুক পূর্ণ কর।’

শিহাবউদ্দিন বুঝতে পারে জিন তার মনের ইচ্ছার কথাই বলছে। নিশ্চয় তার আরও চাই, আরও। উত্তেজনায় তার শরীর কেঁপে কেঁপে ওঠে। সে সিন্ধুকটি পুনরায় খোলার জন্য চাবি হাতে তুলে নেয়। হাত কাঁপছে। সিন্ধুকটা খুলে পরখ করতে চায় কতটা জায়গা ফাঁকা রয়েছে এর ভেতর। যখনই সে সিন্ধুকের পাল্লাটা টান দিয়ে খুলে ফেলে, ঠিক তখনই সিন্ধুকের ভেতর থেকে বিকট চেহারার জিন বেরিয়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিহাবউদ্দিনের উপর। দু’হাতে কণ্ঠনালি চেপে ধরে খুন করে দেয় তাকে। এসব যে ঘটেছে টেরই পায়নি বিছানায় ঘুমন্ত স্ত্রী। জিনের কা- বলে কথা। ভোর হলে ঘুম ভাঙতেই স্ত্রী দেখতে পায় শিহাবউদ্দিনের নিথর দেহ পড়ে আছে। সিন্ধুকটি খোলা। শূন্য সিন্ধুক। টাকা আর সোনাদানা সব গায়েব।

আশরাফ মিস্ত্রির বয়ান আবার অন্য রকম। একবার শিহাবউদ্দিন মোল্লা পরিবার-পরিজন নিয়ে সুন্দরবনে বেড়াতে নিয়েছিল। সেখানেই সে জীবন্ত রয়েল বেঙ্গল টাইগার স্বচক্ষে দেখে প্রথম। ফেরার পথে বাগেরহাট শহর থেকে কাগজে তৈরি বিদেশি একটি বাঘের মডেল কিনে আনে। অপূর্ব সুন্দর সুন্দর সেই বাঘপুতুল। সেটি সে তার সিন্ধুকঅলা আলমারির উপর বসিয়ে রাখে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে সত্যি বুঝি একটি বাঘ বসে আছে। পাহারা দিচ্ছে সিন্ধুকটি। প্রতিরাতের অভ্যাস মতো সে রাতের সিন্ধুকটি খুলে দাঁড়িয়ে ছিল। আচমকা কাগজের বাঘ জীবন্ত রাঘের রূপ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মোল্লার ওপর। তীক্ষè নখরে তার গলার নলি ছেঁড়ে ফেলে। সে এক ভয়ংকর ঘটনা।

এখানেই শেষ নয় আশরাফ মিস্ত্রির বয়ান। সে এমনও দাবি করে জানাজা শেষে মোল্লার মুর্দা কবরে নামাতে গেলে কফিনের ওপর আচমকা উঠে বসে সে। দু’হাতে বাড়িয়ে অস্ফুট আর্তনাদ করে ওঠে, ‘আমার টাকার সিন্ধুকের চাবি কই? আমি কাউকে বিশ্বাস করিনা।’

শিহাব উদ্দিন মোল্লার অপমৃত্যুর রটনা তল্লাটের মানুষগুলোর মনের তলদেশে জমাট বাঁধে ধীরে ধীরে। এক হাটবারে ইরফান মাস্টার খবরের কাগজ আর টিভি নিউজের উদ্ধৃতি দিয়ে হাটুরেদের জানায়, মোল্লা যেই সেই মোল্লা নয়, দেশের একজন উদীয়মান শিল্পপতি। তার মৃত্যুতে শোকবাণী দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী আর শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী। বাঘ-জিন নয়, হৃদযন্ত্রেও ক্রিয়া বন্ধ হয়ে আকস্মিক মৃত্যু হয়েছে তার। যা সত্য তা হচ্ছে পর্বতপ্রমাণ সম্পদ এবং তার অতৃপ্ত অর্থমোহ তাকে গিলে খেয়েছে। মানসিক রোগী হয়ে যায়। পিশাচে পরিণত হয়। হাটুরেরা এতে যতটা বিস্মিত হয়, তার চেয়ে অধিক তাস্কি লেগে যায় এ সংবাদ শুনে যে, পিতার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে আমেরিকা প্রবাসী মোল্লার বড় ছেলে দেশে ফেরে, সঙ্গে জবাফুলের মতো লালচুল আর টগার ফুলের মতো সাদা রং এক যুবতীকে সঙ্গে নিয়ে। যুবতীর পরনে ছিল হাফপ্যান্ট। তার উরু বেয়ে যেন গলিত মাখন ঝরে পড়ছিল। পায়ের আঙুলের নখের রং যেনে ফুটন্ত পদ্ম-ফুলের সাদা পাঁপড়ি।

হাসপাতালের হিমঘর থেকে জানাজার জন্য মোল্লার লাশ বের হয়ে আসে তার বাড়ির ঠিকানায়। জানাজার সময় হাফপ্যান্ট আর পেটখোলা খাটো গেঞ্জিপরা আমেরিকান যুবতীকে দেখে গ্রাম্য মানুষ মোল্লার লাশের কথা বেমালুম ভুলেই যায়। হুজুর গোছের একজনই কেবল প্রশ্ন করেছিল, মেয়েটির জাত ধর্ম কি? জানাজার সময় সে কি বেমানান নয়? শরিয়ত কি বলে?

কথাচ্ছলে ইরফান মাস্টার তার সংসার নিরাসক্ত বাউল ফকির ভাগনে শফিকের বদলে যাওয়া জীবনের কথাও গোপন রাখে না। তালাক নেয়া মেয়ে মারুফার সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেছে শফিকের। মাস্টার জানতে পেরেছে তার ভাগনে চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে বাণিজ্যে নামছে। যার মনের ভিতর এক সময় ফকির লালনের খাঁচার ভিতর অচিন পাখি আসা যাওয়া করত, সে এখন প্রাচীন পণ্ডিত চানক্যের শ্লোক জপ করে। বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্ণী, তদধথং রাজ কার্বেন তবধং কৃষি কার্বেন, ভিক্ষারাং নৈব চ, নৈব চ। বাণিজ্যে ধনের দেবী লক্ষ্মীর বাস, রাজকার্য বা চাকরিতে তার অর্ধেক, কৃষিকাজে তারও অর্ধেক, ভিক্ষায় কিছুই মেলে না।

পুত্র কামনা বা কন্যা কামনা নারীর এক জটিল মনোবাসনা। কন্যা হারানো ভগবতীর যন্ত্রণা অন্যরকম । কিন্তু একাধিক পুত্রের জননী কিংবা বহু কন্যার জননী যখন বুঝতে পারে সন্তান ধারণের সম্ভাবনা তার আর নেই, তখনি তার অতৃপ্ত বাসনায় মিশে যায় এক কল্পজগৎ। বহু কন্যার মাতা এক কন্যাকে পোশাকেআশাকে বানায় পুত্র, বহুপুত্রের মাতার করে তেমনটাই। ভগবতীর হঠাৎ একদিন অদ্ভুদ এক কাণ্ড করে বসে। ছোট ছেলের দু’টো কানই সুঁই দিয়ে ফুটো করে দেয় এই আশায় যে, ফুটো কান দুল পরাতে সে। কি চিৎকার শিশুটির। থামেই না ওর হা-করা মুখ। মাঠ থেকে গিরিশ ফিরে এসে যা দেখে, চেষ্টা করে নিজের রাগ সামলে নেয়। সে সবই বুঝে। এটাও বুঝতে পারে পুত্রকে কন্যা সাজিয়ে এক ছদ্মবেশী কন্যার মায়ের গৌরব অর্জন করতে চায় ভগবতী। হয়ত সেই গৌরবের অতল-বিতল স্পর্শ করার ক্ষমতা নেই গিরিশের। তার কাছে ভগবতীর সব কিছুই হচ্ছে নিছক পাগলামি। কিন্তু তারা কেউ জানে না হারিয়ে যাওয়া কিংবা মৃতশিশু কন্যার জটিল গোলকধাঁধার বাইরে কোন অনির্বচনীয় অপ্রতিরোধ্য সত্য লুকিয়ে রয়েছে।

এমনি একটি রাত নামে. ঘুমোবার আগে হ্যারিকেনের আলোয় গিরিশ তার ঘুমন্ত শিশুপুত্রদের অপলক দেখতে থাকে। পাশেই বড় ছেলেটা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আছে। ভগবতীও সারা দিনের সংসারের খাটুনিতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। জেগে আছে শুধু গিরিশ। গিরিশ র কেমন ধন্ধ লাগে। ছোট ছেলের দু’কানের ফুটোর লাল সুতো বাঁধা। দু’হাতেও লাল চুরির মতো দুটো লাল তাগা। ঠিক যেন সেই হারিয়ে যাওয়া শিশুকন্যা। হঠাৎ তার কানে আসে বাইরে উঠোনে এক বালক শিশুকণ্ঠের খলখল্ হাসি।

দুয়ার খুলে গিরিশ দাওয়ায় এসে দাঁড়ায়। আকাশে চাঁদ নেই। অনেক তারা। আধাঁর নেই। উঠোনে আবছায়া আলোর খেলা। দূর আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে তারার আলো। আচমকাই সে দেখতে পায় উঠোনের কোনে দাঁড়িয়ে আছে উদোস গায়ের এক শিশু। ছেলে না মেয়ে বুঝা যায় না। শিশুটির দু’হাতের তালুতে বসে আছে আকাশের দুটো তারা। নীল আলোর দ্যুতি। হঠাৎ হাতের তালুর তারা দুটি পূর্ণিমার চাঁদ হয়ে যায়। চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত এক শিশুকন্যা। সারা শরীরে হীরকদ্যুতির পোশাক, ঠিক কনভেন্টের খ্রিস্ট সেবিকা সিস্টারদের মতো। একি স্বর্গের হীরক শিশু?

সেই হীরক শিশুকন্যা হেঁটে যায় উঠোন পেরিয়ে। সামনেই কাঁঠালিচাঁপা ফুলের লতানো ঝোপ। ঝোপের পাশ কামিনীফুল গাছের ঘন ছায়া। কামিনী গাছে ছায়ার ভেতর অপার্থিব ছায়া হয়ে অদৃশ্য হয়ে যায় হীরকশিশু। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে গিরিশ। আজই তার প্রথম মনে হয় হারিয়ে যাওয়া শিশুকন্যা বেঁচে আছে। কিন্তু কোথায় রয়েছে সে? কিন্তু কোনোদিন তো সে কারও মুখে শোননি একটি হারানো শিশুর গল্প? কেউ তো বলেনি একটি পরিত্যক্ত শিশুকে অজ্ঞাত কোনো রমণী প্রতিপালন করছে? এমন কি হতে পারে যুদ্ধ শেষে ধর্ষিতার গর্ভজাত শিশুদের সঙ্গে একটি পরিত্যক্ত শিশুকে বিদেশিরা তুলে নিয়ে গেছে সাতসমুদ্ররের ওপারে? দুনিয়ায় কত কিছুই তো ঘটে, মানুষ যার ব্যাখ্যা জানে না। জীবিত মানুষ কি তার অজ্ঞাত জন্মঠিকানায় নিজের অজ্ঞাতসারেই অন্য শরীর নিয়ে আবিভূর্ত হতে পারে না? এক গোলকধাঁধায় পড়ে গিরিশ।

গিরিশ যখন ঘরে ফিরে আসে তখন আকাশের এককোণে তৃতীয়ার চাঁদ উঁকি দেয়। কামিনী আর কাঁঠালিচাঁপার গাছ কালো শরীর দেখায়। ওখানে তৃতীয়ার চাঁদের আলো পোঁছতে পারে না। রাতের রহস্য তার কন্যার মৃত্যু কিংবা হারানোর রহস্যের ভেতর একাকার হয়ে যায়, কামিনী কাঁঠালচাঁপার শীতল অন্ধকারের মতো। গিরিশের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। অন্ধকারপথে জীবিত কিংবা মৃত কন্যাকে পরিত্যাগের জন্য আক্ষেপে ভেঙে পড়ে সে। এই অপরাধী জন্মদাতার কষ্ট যেন এক অতলস্পর্শী আকাশ।