জাপান ও রবীন্দ্রনাথ : পরস্পর সান্নিধ্যে প্রাচ্যের আদর্শবাদী রবীন্দ্রনাথ এবং ওকাকুরা : মূল : ওওরুই জুন

বিশ্বসাহিত্য : প্রবন্ধ
বাংলা ভাষান্তর : প্রবীর বিকাশ সরকার
[ভূমিকা : অধ্যাপক, গবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক ওওরুই জুন (১৮২৩-১৯৮৯) চিনের দিঙদাও শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫০ সালে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব লেটার্স অনুষদের অধীন ভারতীয় দর্শন ও সংস্কৃত সাহিত্য বিষয়ে স্নাতক এবং একই প্রতিষ্ঠানের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। এরপর তোওয়োও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক, সহযোগী অধ্যাপক এবং ১৯৬৭ সালে স্বনামধন্য কোকুশিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও ১৯৭৩ সালে অধ্যাপক ও সাহিত্য বিভাগের পরিচালক ও কাউন্সিল পদ অলঙ্কৃত করেন। ১৯৬১ সালে প্রকাশ করেন শাকা তথা শাক্যমুনি নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। ১৯৭১ সালে তাগোর-রু বা টেগোর নামে একটি পকেট বুক। অনুবাদ করেন যৌথভাবে অধ্যাপক ও সমালোচক সাকামোতো তোকুমাৎসুর সঙ্গে নে-রু- বা নেহরু নামে জওহরলাল নেহরুর বক্তৃতাবলি ১৯৬২ সালে। ১৯৬৬ সালে হো চি মিন রচিত মুক্তির চিন্তা গ্রন্থের জাপানি অনুবাদ করেন অধ্যাপক সাকামোতো তোকুমাৎসুর সঙ্গে।অধ্যাপক ওওরুই জুন একজন একনিষ্ঠ রবীন্দ্রভক্ত, রবীন্দ্রগবেষক ও অনুবাদক হিসেবে জাপানে সুপরিচিত। ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃতি, দর্শন, বৌদ্ধধর্ম ইত্যাদি সম্পর্কে তাঁর অনেক রচনার কথা জানা যায়। ১৯৬১ সালে জাপানে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষ উদযাপনে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। সেই সময় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একাধিক প্রবন্ধ ও রবীন্দ্ররচনা অনুবাদ করেন। বর্তমান প্রবন্ধটি ১৯৬০ সালে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষের প্রাক্কালে লিখিত। প্রবন্ধটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ের জন্য তো বটেই, বর্তমানেও এশিয়া মহাদেশের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় মূল জাপানি থেকে বাংলায় অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি। প্রবন্ধটির মূল সুর, বক্তব্য ও অর্থ অপরিবর্তিত রেখে কিছু অসঙ্গতি ও সন-তারিখের ভুল সংশোধনের প্রয়াস নিয়েছি।]
‘এশিয়া এক। হিমালয়ের বিশাল পর্বতমালা কনফুশিয়াস-এর সাম্যবাদী চিনা সভ্যতা এবং বেদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী ভারতীয় সভ্যতাকে বিভক্ত করার এক প্রাকৃতিক প্রাচীর হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু এতে মূলত দুই সভ্যতার পার্থক্যকেই জোর দিয়ে দেখা হয়েছে মাত্র।’ এই ভাষ্যটি এক সময় ভারতে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল এবং বেঙ্গল থেকে পাঞ্জাব পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে এমন এক জাতিগত চেতনাকে অর্থবহ করে তোলা ও জাগ্রত করার প্রয়াস নিয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল ভারতের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে আধুনিক যুগেও জীবন-নিঃশ্বাসে পরিপূর্ণ এক জীবন্ত বাস্তবরূপে প্রকাশ করা।
উল্লেখ্য যে, উপর্যুক্ত ভাষ্যটি উচ্চারণ করেছিলেন কোনও ভারতীয় নন, বরং একজন জাপানি, যিনি বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ভারতের জাতীয় পুনর্গঠনের নতুন যুগের চালিকাশক্তি হিসেবে এই ভাবনাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এই ঘটনা বিস্ময়কর এবং গভীর তাৎপর্য বহন না করে পারে না। সেই ব্যক্তি ছিলেন ওকাকুরা তেনশিন (১৮৬৩-১৯১৩)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের দু বছর পর ১৯৬৩ সালে জন্ম ওকাকুরার, রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ১৮৬১ সালে, ধারাবাহিকভাবে তাঁরও জন্মশতবর্ষ আসন্ন। পেশাগতভাবে তিনি ছিলেন একজন চিত্রশিল্পী ও শিল্পসমালোচক; কিন্তু তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল পাশ্চাত্যের চাপের নিচে কাতর এশিয়াকে পুনর্জাগরিত করা।
আজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ওকাকুরা তেনশিনের জন্মশতবর্ষ স্মরণীয় বছরে আমরা উপনীত হতে চলেছি। এই পরিপ্রেক্ষিতে, ভারত ও জাপানের অধুনা আত্মিক-সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ইতিহাসে এই দুই মনীষীর পারস্পরিক সম্পর্ক গভীর তাৎপর্য বহন করছে। সুদীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে নতুন করে এই ঘটনার পর্যালোচনা করা গভীরতর অর্থ বহন করে তাতে কোনও ভুল নেই।
ওকাকুরা তেনশিন ১৯০১ সালের নভেম্বর মাসে ৪০ বছর বয়সে আকস্মিকভাবে ভারত ভ্রমণে যাত্রা করেন। তিনি ভারতে নববর্ষ উদযাপন করেন, এবং পরবর্তী বছরের ৩০ অক্টোবর জাপানে প্রত্যাবর্তনকালে কোবে বন্দরে অবতরণ করেন। ফলে, ভারতে তাঁর অবস্থানকাল ছিল পূর্ণ এক বছরের কিছু কম। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই তেনশিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, এবং তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ লাভ করেন। এই সাক্ষাৎ উভয় মনীষীর জীবনেই এক নির্ণায়ক আত্মিক মিলনের ঘটনা হিসেবে বিবেচ্য।
এই ঘটনার পর, ১৯১২ সালের আগস্ট মাসে তেনশিন তোসামারু জাহাজে চড়ে ইউরোপ অভিমুখে যাত্রা করেন, এবং ২ আগস্ট ইংল্যান্ডে পৌঁছান। নভেম্বর মাসে তিনি আমেরিকায় গমন করে বোস্টনে প্রবেশ করেন। এই যাত্রাপথেও তিনি ভারতে পা রাখেন। তবে এটি ছিল পাশ্চাত্য সমুদ্রপথে ভ্রমণকালীন একটি দেশে সাময়িক যাত্রাবিরতি মাত্র। পরের বছরই ১৯১৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর, তেনশিন তাঁর কর্মজীবনের মধ্যগগনে মৃত্যুবরণ করেন। সুতরাং ভারতীয় চিন্তাজগতের সঙ্গে তেনশিনের প্রত্যক্ষ সংযোগ সংঘটিত হয়েছিল মূলত ১৯০২ সালের প্রথম থেকে, এবং ভারতে তাঁর প্রায় এক বছরের অবস্থানকালেই। যদিও এই সময় ছিল অত্যন্ত স্বল্প, কিন্তু তেনশিনের ৫০ বছরের জীবনে একটি গভীরতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে ভারতে তাঁর এই অবস্থানপর্বে গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রমের নির্ভরযোগ্য কোনও নথি আজ আর অবশিষ্ট না থাকা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। তথাপি, একই সঙ্গে এটা ছিল এমন এক সময়, যখন তিনি দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকেও আধুনিক জাপানি শিল্প আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে নীরবে চিন্তামগ্ন ছিলেন, ভারতের ভূভাগে ভ্রমণ করেছিলেন, এবং আরও বৃহত্তর ও মৌলিক দৃষ্টিতে প্রাচ্য শিল্পের আদর্শের মূল উৎসে প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, এটা ছিল তাঁর জন্য এক পরিপূর্ণ ও অর্থবহ বিচরণকাল।

আরও একটি বিষয় তেনশিনের জন্য বিরাট প্রাপ্তি হয়ে উঠেছিল। তিনি আধুনিক ভারতীয় ধর্মের একজন সংস্কারক হিসেবে আধ্যাত্মিক গুরু রামকৃষ্ণ-এর প্রধান শিষ্য এবং তাঁর ভাবধারার প্রচারক ধর্মচিন্তাবিদ বিবেকানন্দের সঙ্গেও পরিচিত হন। পাশাপাশি তিনি ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে সংযুক্ত হন, এবং এর ফলে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও মেলামেশার সুযোগ লাভ করেন। তবে এই ঘটনা ভারত যাত্রায় সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার আগেই তাঁর চিন্তায় আসে এবং বাস্তবিক অর্থে তা সম্পূর্ণতা লাভ করে ভারতে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ঞযব ওফবধষ ড়ভ ঃযব ঊধংঃ গ্রন্থে, যা ১৯০৩ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থের ভূমিকাটি লিখেছিলেন বিবেকানন্দের জ্যেষ্ঠ শিষ্যা, ব্রিটিশ নারী সিস্টার নিবেদিতা। এই ঘটনার মধ্যেই নতুনভাবে উদ্দীপ্ত তেনশিনের ভাবনাগুলো ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত হয়ে ক্রমশ বিকশিত হতে থাকে। তিনি এশিয়াবাদের (ঢ়ধহ-অংরধহরংস) লক্ষ্য বা ঐতিহাসিক দায়িত্ব বারবার ব্যাখ্যা করেন; জ্ঞানব্যবস্থার স্তরবিন্যাস, জাতি ও সমাজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে গভীর ও তীব্র আলোচনায় মেতে ওঠেন; নানা উৎস থেকে নিরলসভাবে পাঠ করেন, লেখালেখিতে সচেষ্ট থাকেন এবং বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। এভাবে শেষমেশ ভবিষ্যতে তথা ১৯০৫ সালে সংঘটিত বিদেশি পণ্য বর্জনের স্বদেশী আন্দোলনের উন্মত্ত উত্থান, যার প্রভাব বাংলা অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়―ভারতের এই জাগরণকে এক মৌলিক প্রেরণাশক্তি হিসেবে রোপণ করতে সচেষ্ট ওকাকুরা তেনশিনের সক্রিয় ভূমিকা সহজেই পরিলক্ষিত হয়। এটা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি বিষয়।
এই একটি বছর তেনশিনের আদর্শগত ও আকাক্সিক্ষত বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবতাবোধে আকস্মিক পরিবর্তন একটি অসাধারণ ঘটনা। কেননা, আধুনিক ভারতের মহান জাতীয় নেতা বিপিনচন্দ্র পাল কর্তৃক যথার্থভাবেই আখ্যায়িত ‘নবভারত’, এবং এর নতুন যুগের একজন অগ্রদূত হিসেবে তেনশিন ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকার প্রদত্ত ভাষ্য ১৯০২ সাল তথা এই এক বছরের মধ্যেই ঘটেছিল। ‘এশিয়া এক’ এই বাক্যটি সেই অর্থে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছে একটি স্লোগান হয়ে উঠেছিল।
দুই
ওকাকুরা তেনশিনের কলিকাতায় গমন ছিল বিবেকানন্দকে জাপানে আমন্ত্রণ জানানো এবং জাপানের হিগাশি হোনগানজি মন্দিরে অনুষ্ঠিতব্য ধর্মীয় সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য মূল উপলক্ষ্য। তাঁর এই উপলক্ষ্যটি সাধারণভাবে স্বীকৃত। রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান কেন্দ্র বেলুড় মঠে অবস্থানকালে তেনশিন ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি এর অন্তর্নিহিত চিন্তার গভীরতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। ভেবে দেখলে সিস্টার নিবেদিতার সঙ্গে তাঁর আকস্মিক সাক্ষাৎও ভাগ্যের দ্বারা নির্ধারিত ছিল। এই ঘটনা তেনশিনকে চেতনার গভীর থেকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো এক বৃহৎ দিকপরিবর্তন। তিনি তখন কেবল জাপানি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একজন প্রচারক ছিলেন না; আবার পশ্চিমা শিল্পকলার রূপবাদের (ভড়ৎসধষরধংস) মধ্যেও নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। চিত্রকলার অনুসন্ধানে সমস্ত শক্তি নিবেদিত সমসাময়িক এক প্রতিভাবান চিত্রশিল্পী হিসেবেও তাঁকে শুধু ব্যাখ্যা করা যায় না। এমনকি, নিজের শিল্পচর্চার ক্ষেত্র হিসেবে জাপান আর্ট ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা একজন শিল্পশিক্ষক ও তরুণ শিল্পীদের পথপ্রদর্শকÑএই পরিচয়েও তাঁর সমগ্র সত্তাকে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়।
এসবের বাইরে আজ তিনি প্রাচ্য পুনর্জাগরণের একজন নেতা হিসেবে স্বীকৃত। পাশ্চাত্য শক্তির বিরুদ্ধে প্রাচ্যের আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি উত্থাপনকারী এক অগ্রণী কণ্ঠস্বর হিসেবে এবং সমগ্র এশিয়া মহাদেশের সকল দেশকে একটি অভিন্ন সত্তা হিসেবে বিকশিত করার আহ্বান জানানো প্যান-এশিয়ানিস্ট চিন্তাবিদ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। তাঁর কার্যকলাপ সাংস্কৃতিক জাগরণের পরিসর ছাড়িয়ে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। সত্যিকার অর্থেই তিনি বাংলা অঞ্চলের যুবসমাজের আত্মিক চেতনাকে জাগ্রতকারী একজন প্রেরণাদাতা হয়ে উঠেছিলেন। তাদেরকে সচেতনতা সমৃদ্ধি অর্জনের দিকে এগিয়ে চলার পথনির্দেশ করে হয়ে উঠেছিলেন আপনশক্তিতে একজন ঐশী দার্শনিক সত্তা।
কলকাতায় অবস্থানকালে তেনশিনের সমবয়সী সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কনিষ্ঠ ভ্রাতা সতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র), নিবেদিতা তেনশিনকে সমমনা বন্ধু হিসেবে পাওয়ার জন্য কী রকম উৎসাহ দেখিয়েছেন তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় লিপিবদ্ধ করেছেন। আবার, বিবেকানন্দের নরওয়েজীয় শিষ্যা শ্রীমতী ওলে বুল কর্তৃক আমন্ত্রিত নৈশভোজে তেনশিন পুরো সময় জুড়ে নীরব ও শান্তভাবে বসেছিলেন। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি সংযত ও স্থির ভঙ্গিতে অবস্থান করেন, এবং বিরতি না নিয়ে একের পর এক মিশরীয় সিগারেট ফুঁকছিলেন। একসময় অতিথিদের ভিড়ে নিজেকে আড়াল করে তিনি একজনের মুখোমুখি হয়ে হঠাৎ করে প্রশ্ন করেন:
‘তোমরা দেশের সেবা কীভাবে করা উচিত বলে মনে করো আমাকে বলো ?’
অপরিচিতের এমন অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে উপস্থিত তরুণরা বিস্মিত হয়ে পড়ে! এটা নিবেদিতার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাতের পরে ভারতে ঘটিত তেনশিনের একটা স্বাতন্ত্রিক আচরণ। বিংশ শতকের শুরুতে জাপানে আগত প্রথম দিকের ভারতীয় ছাত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন সতীশচন্দ্র দেব। তিনি লিখেছেন, তারা টোকিওতে ওকাকুরার সঙ্গে দেখা হলেই ‘তোমরা স্বদেশে ফিরে গিয়ে স্বদেশমুক্তির জন্য আত্মত্যাগ করো’ বলে বারংবার অনুরুদ্ধ হতেন।
জাপানের রাষ্ট্রনেতৃত্বে পরিচালিত জাতীয়তাবাদী শক্তি যখন চরমভাবে উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল, সেই সময়ের একেবারে শীর্ষভাগে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর এবং তিন বছরেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত করে তেনশিন ১৯০৪ সালে (রুশ-জাপান যুদ্ধ ১৯০৪-০৫) রাশিয়ার বিরুদ্ধে সেই শক্তি প্রকাশের মাধ্যমে জাপানের ক্ষমতাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছিলেন। এই পরিস্থিতিতে এশিয়ার স্বাধীনতা ও মুক্তির প্রবক্তা হিসেবে তেনশিনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ভারতের নিজস্ব তীব্র জাতীয়তাবাদের পথে তিনি দিকনির্দেশনা প্রদর্শনে ব্রতী হন।
সরকারি সংবর্ধনা সভায় কিংবা ব্যক্তিগত বৈঠকেও তেনশিন বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে বাঙালি জনগণকে আন্দোলনে সক্রিয় হওয়ার জন্য আবেগময় প্রেরণা ও নৈতিক সমর্থন জোগাতেন। ১৯০৩ সালে তেনশিন ঞযব ওফবধষং ড়ভ ঃযব ঊধংঃ (প্রাচ্যের আদর্শ) গ্রন্থের প্রথম খণ্ড প্রকাশ করেন। গ্রন্থটি ভারতীয় ধর্মগ্রন্থ ভাগবৎ গীতা, বন্দে মাতরম্* (মাতৃভূমির বন্দনা) গান, এবং রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ, বিপিন পাল ও অশ্বিনী কুমার দত্ত প্রমুখ জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দের রচনাসহ এবং ভারতের জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার প্রারম্ভিক ভিত্তি হিসেবে দেখা দেয়।
এছাড়াও, ভারতীয় চিত্রকলার ইতিহাসবেত্তা হ্যাভেল, চিত্রশিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশচন্দ্র বসু প্রমুখ এবং বিশেষ করে সিস্টার নিবেদিতার সঙ্গেও তেনশিন ভারতীয় শিল্পকলা বিষয়ে মতবিনিময় করেছিলেন। এইসব মতবিনিময়ের মাধ্যমে ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী শিল্পের মৌলিক ভিত্তি কীভাবে গঠিত হয়েছে এবং ভারতীয় ধ্রুপদি শিল্পধারার ভেতরে তার যথাযথ অবস্থান কোথায় সে বিষয়ে গভীর গবেষণামূলক অনুসন্ধানে ব্রতী হয়েছিলেন
*বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪) ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমসাময়িক এক প্রতিনিধিত্বশীল বাঙালি সাহিত্যিক। তাঁর রচিত গান ‘বন্দে মাতরম্’ এবং রবীন্দ্রনাথের ‘জনগণমন’ এই দুটি গানই সমগ্র ভারতের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃত হয়। পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত কথা ও সুরসংবলিত ‘জনগণমন’ নবভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি সরকারিভাবে গৃহীত হয়।

তিন
বিবেকানন্দের কল্যাণে তেনশিন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। সেই সময় জাপানের শিল্পকলা বিষয়ে গবেষণার উদ্দেশ্যে জাপানে আগমন করেছিলেন ইংল্যান্ডের নাগরিক ম্যাকলাউড (স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্যা মিস জেসেফিন ম্যাকলাউড)। তিনি তেনশিনের বাড়িতে সপ্তাহে একবার করে তেনশিনের শিল্পকলাবিষয়ক বক্তৃতায় অংশ নিতেন। যখন ম্যাকলাউড স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন তেনশিনও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে তড়িঘড়ি তাঁর সঙ্গী হয়ে ১৯০১ সালের নভেম্বর মাসে নাগাসাকি সমুদ্রবন্দর থেকে জাহাজে করে ভারতের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অস্তিত্ব সম্পর্কে তেনশিন আদৌ অবগত ছিলেন না। এই ঘটনার ১১ বছর পরে প্রাচ্যে এমন একজন কবির আবির্ভাব ঘটে, যিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৫২ বছর। এর আগে ভারতের বাইরে তখনও তাঁর নাম পরিচিত হয়ে ওঠেনি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের চেয়ে দু বছরের ছোট তেনশিনের সমবয়সী বিবেকানন্দ ১৮৯৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শিকাগোতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় অংশগ্রহণ করে নতুন এক হিন্দুধর্মকে উপস্থাপন করেন। এই ধর্মের মূল ভিত্তি হিসেবে দানশীলতা, বিশ্বজনীন প্রেম এবং সর্বজনীন সত্যের প্রতি তাঁর আহ্বান বিপুল শ্রোতৃমণ্ডলীকে মুগ্ধ করে এবং অচিরেই তাঁর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বিবেকানন্দ বিশ্বের সকল ধর্মের মূলসত্তা হিসেবে মঙ্গলামঙ্গলের সত্যকে স্বীকার করে সর্বধর্মের মধ্যে সামঞ্জস্য ও সহযোগিতা সাধনের লক্ষ্যে ব্যাপক সহনশীলতার অধিকারী হওয়ার কথা বলেন। ঈশ্বর সম্পর্কে নিরর্থক দার্শনিক কূটতর্ক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক বিতর্ককে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন, এবং বলেন, মানুষের বোধগম্যের অতীত, অতীন্দ্রিয় ও নৈতিকতার ঊর্ধ্বে অবস্থানকারী ঈশ্বর এই জগতের সকল ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই বাস্তবরূপে প্রকাশিত হন। মানবাত্মা স্বভাবতই পবিত্র। কর্মফলতত্ত্বকে মানবপ্রকৃতির প্রতি কোনও নিন্দা হিসেবে ব্যাখ্যা করার ধারণাকেও তিনি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন।
এছাড়া, বিবেকানন্দ হিন্দুধর্মের সংস্কার আন্দোলনকারীদের অতিরিক্ত পাশ্চাত্যকরণকে অর্থাৎ খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে আপসকামী হিসেবে প্রতিনিধিত্বকারী কেশবচন্দ্র সেন-এর সমালোচনা করেন। তিনি ঐতিহ্যের অন্তর্নিহিত মৌলিক অর্থ ও মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে মূর্তিপূজাকে অগ্রহণযোগ্য বলে প্রত্যাখ্যান করেন। এসব উপাদানকে অন্তর্ভুক্ত ও সমন্বিত করে তিনি একটি জাতীয় চেতনা গড়ে তোলার কাজে নিযুক্ত ছিলেন।
বিবেকানন্দের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সাক্ষাতে সক্ষম হওয়া তেনশিন ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। এবং সেই সম্পর্ক দ্বারা তিনি গভীরভাবে প্রভাবিতও হয়েছিলেন। রোঁমা রোঁলার ভাষ্য অনুযায়ী, এই সময়েই ওকাকুরা তেনশিন রবীন্দ্রনাথকে অনন্য কবির মহান প্রতিভা এবং লক্ষ্য (মিশন) সম্পর্কে সচেতন করেছিলেন বলে বলা হয়ে থাকে। এভাবে যদি দেখা হয়, তাহলে নানাভাবে এই দুই চিন্তাবিদকেই প্রাচ্য আদর্শবাদী বলা বাঞ্ছনীয়। এই দুই প্রাচ্য চিন্তাবিদের পথের এই মিলনকে আধুনিক এশীয় চিন্তার ইতিহাসে এক ধরনের অনিবার্য, নিয়তিনির্ধারিত ঐতিহাসিক সংযোগ হিসেবে দেখতে হয়, যার গুরুত্ব উপেক্ষা করা সমীচীন নয়।
ভারতে ভ্রমণকালে বিবেকানন্দের সাহচর্যে তেনশিন ভারতীয় সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থলগুলো পরিভ্রমণ করেন। বুদ্ধগয়ায় বুদ্ধের বোধিলাভের পবিত্র তীর্থস্থান পরিদর্শনকালে সেখানে একটি আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এরপর তিনি বেনারস, শ্রাবস্তী থেকে যাত্রা করে অজন্তা ও ইলোরার গুহাগুলো দর্শন করেন। অজন্তার গুহাচিত্রে গভীরভাবে অভিভূত হয়ে তিনি নিজের অনুভূতি বিবেকানন্দের কাছে প্রকাশ করে একটি পত্র প্রেরণ করেন ১৯০২ সালের মার্চ মাসে।
তবে বিদ্যমান নথিপত্রের আলোকে দেখা যায় যে, রবীন্দ্রনাথের রচনায় ওকাকুরা তেনশিন সম্পর্কে কোনও প্রত্যক্ষ উল্লেখ নেই, তেমনি তেনশিনের ডায়েরিতে প্রতিফলিত উভয়ের মানবিক ও চিন্তাগত বিনিময়ের কোনও বিস্তারিত বিবরণও সংরক্ষিত নেই। এই অনুপস্থিতি কি নিছক কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে কোনও বিশেষ কারণ রয়েছে তা স্পষ্ট নয়। এই প্রসঙ্গে তৎকালীন ভারতের অবস্থা, ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তেনশিনের লেখালেখিকে ঘিরে থাকা নানা প্রেক্ষাপটসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় আনা যেতে পারে। এসব বিষয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন। তবু একটি বিষয় নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, উভয়ের মধ্যকার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও নিবিড়। এই সম্পর্কের ভিত্তি ছিল গভীর পারস্পরিক সহানুভূতি এবং মানবিক স্তরে এক শক্তিশালী আত্মিক প্রতিক্রিয়া। মানুষ হিসেবে তাঁদের মধ্যে যে এক গভীর ও তীব্র আত্মিক সান্নিধ্য গড়ে উঠেছিল, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে যে জাপানির সঙ্গে তিনি সর্বপ্রথম সবচেয়ে গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ আত্মিক সংযোগ স্থাপন করেছিলেন, তিনি হলেন ওকাকুরা তেনশিন।
বিবেকানন্দের একাডেমিক জ্ঞান এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্বে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়ে তেনশিন তৎক্ষণাৎ তাঁর স্বদেশি বৌদ্ধ পণ্ডিত ওদা তোকুনোকে একটি পত্র লেখেন ১৯০২ সালের ১০ জানুয়ারি তারিখে। একই বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি ওদা ভারতে যান এবং তেনশিন ও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মতবিনিময় করেন। সেই সময় তিনজনে মিলে একটি পরিকল্পনা করেন জাপানে প্রাচ্য ধর্মসম্মেলন আয়োজনের, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা বাস্তবায়িত হয়নি। তদুপরি, তেনশিন জাপানে ফিরে এসে বছর খানেক পর ১৯০৩ সালে য়োকোয়ামা তাইকান ও হিশিদা শুসসোও নামক দুই শিষ্যকে ভারতে প্রেরণ করে উভয় দেশের চিত্রকলার পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা এবং চিত্রপ্রযুক্তির পারস্পরিক মতবিনিময়ের মাধ্যমে উভয়পক্ষীয় উপকার সাধনের চেষ্টা করেন। এই উদ্যোগের ব্যাপ্তি ছিল সুদূরপ্রসারী। রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের শেষ দশ বছরে চিত্রকলার জগতে যে অনুশীলনে তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন, সেখানেও তাঁর নিজস্ব শিল্পভাবনার মধ্যেই জাপানি চিত্রকলার এক অত্যন্ত প্রবল প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথমবার জাপান সফর করেন ১৯১৬ সালে। কিন্তু সেই সময়ে ওকাকুরা তেনশিন আর এই পৃথিবীতে জীবিত ছিলেন না। তেনশিনের মৃত্যুর পর ইতিমধ্যেই তিন বছর অতিক্রান্ত হয়ে গিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ প্রথমেই হিতাচি অঞ্চলের (ইবারাকি প্রদেশের কিতা-ইবারাকি শহরের ওৎসু মাচি (ওৎসু নগর)-এর ইজুরায় যান। সেখানে কয়েক দিন অবস্থান করে প্রয়াত বন্ধুকে স্মরণ করেন। এতে বোঝা যায় যে, রবীন্দ্রনাথের অন্তরের গভীরে কী প্রবলভাবে ওকাকুরা তেনশিন বেঁচেছিলেন!
উল্লেখ্য যে, ১৯০৩ সালের শেষ বসন্তকালে তেনশিন ইজুরায় যান এবং সেখানে একটি নির্জন স্থান নির্বাচন করেন। আর্থিক অব্যবস্থাপনার কারণে তিনি নিহোন বিজুৎসুইন (জাপান আর্ট ইনস্টিটিউট)-কে ইজুরায় স্থানান্তরিত করেন। এই স্থানান্তর সম্পন্ন হয় ১৯০৬ সালের আগস্ট মাসে। এরপর এই অঞ্চলের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল ধরে জাপান আর্ট ইনস্টিটিউটের কাজ করতে থাকেন। হিতাচির এই দুর্গম উপকূলভূমিতে, যেখানে (শিমোমুরা) কানজান, তাইকান, শুনসোও এবং (কিমুরা) বুজান সমবেত হয়েছিলেন, তাঁরা তেনশিন নির্দেশিত চিত্রকলার উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করেন, এবং এখান থেকেই জাপান আর্ট ইনস্টিউটের ইজুরা যুগের সূচনা ঘটে।
১৯০৫ সালে, ইজুরার উত্তাল তরঙ্গবেষ্টিত খাড়া পাহাড়ের চূড়ায় তেনশিন ষড়ভুজাকৃতির একটি বিশ্রামকক্ষ রোক্কাকুদোও নির্মাণ করেন। সেখানে তিনি ধ্যানমগ্ন হয়ে সময় কাটাতেন এবং জাপানি ও চিনা শাস্ত্রাদি পাঠে নিমগ্ন থাকতেন। রবীন্দ্রনাথও এখানে এসে নিভৃতে বসে বহুদূর থেকে তাঁর ভাবনাকে ধাবিত করেছিলেন তেনশিনের উদ্দেশে, যিনি ইহলোক ও পরলোকের সীমারেখা অতিক্রম করে চলে গেছেন।
এখন আমি যখন এই ঢেউগুলোর সুরে কান পাতি,
এই সমুদ্রতটে, বহু দূর অতীত দিনের সেই গোধূলি বেলায়,
অন্তরের গভীরে একদিন যে মহান চিন্তাগুলো ধারণ করা ছিল,
তাদেরই স্মৃতি আমি দূর থেকে স্মরণ করি।
হে আমার বন্ধু! তোমার কণ্ঠস্বর
এখন আমার বক্ষের গভীরে এসে পৌঁছায়।
তা আমার কানে এসে লাগে
যেন পাইন গাছের নীল ছায়ায় সেলাই হয়ে থাকা
ঢেউয়ের ধ্বনি,
আর তা আলতো করে এগিয়ে চলে যায়।
এটা এই ষড়ভুজাকৃতি (রোক্কাকুদোও) বিশ্রামকক্ষে রেখে যাওয়া রবীন্দ্রনাথের একটি স্মৃতিমূলক কবিতা।
ইজুরায় অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ একবার তেনশিনের মৎস্য ভিলার একপাশে অবস্থিত পদ্মপুকুরে ফুটে থাকা সুগন্ধী পদ্মফুলের দিকে তাকিয়ে অনুভব করেছিলেন বিদেশের মাটিতে ফোটা পদ্মের মধ্যে স্বদেশ ভারতের প্রতিচ্ছবি। স্মৃতিকাতরতায় আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। তখন এই কবিতাটি লেখেন :
ঞযব ষড়ঃঁং ড়ভ ড়ঁৎ পষরসব
নষড়ড়সং যবৎব রহ ঃযব ধষরবহ ধিঃবৎ,
রিঃয ঃযব ংধসব ংবিবঃহবংং
ঁহফবৎ ধহড়ঃযবৎ হধসব.
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাপানে অবস্থানকালে টোকিওর উয়েনো ইকেনোহাতাস্থ তাইকানের বাসভনে এবং য়োকোহামাস্থ তখনকার জাপানি শিল্পকলার প্রধান পৃষ্ঠপোষক সানকেই হারা তোমিতারো-এর ভিলা সানকেইএন বাগানবাড়িতে অবস্থান করেছিলেন। আগস্ট মাসে তিনি য়োকোহামায় শিমোমুরা কানজানে-এর গৃহে যান এবং সেখানেই জাপানি চিত্রকলার মূল স্রোত ও প্রাণশক্তিকে গভীরভাবে আত্মস্থ করেন। এটা তেনশিনের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের মূলসত্তা এবং সুফল ছাড়া আর কিছুই নয়। শিমোমুরার প্রতিনিধিত্বমূলক শিল্পকর্মগুলোর একটি য়োরোবোশি (অন্ধভিক্ষু)-এর নকলচিত্র আরাই কাম্পোকে অনুরোধ করে আঁকিয়ে তাঁরই মাধ্যমে শান্তিনিকেতনে নিয়ে যাওয়ার কথা সুবিদিত।
পূর্ব ও পশ্চিম থেকে প্রবাহিত
বিভিন্ন আদর্শের বিশাল নদীগুলি
যখন চিন্তার গভীর ঐক্যের মধ্যে
তরঙ্গের আদান-প্রদান করে সেই মুুহূর্তে
আমার আত্মা আনন্দে কেঁপে ওঠে।
―রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আলোকচিত্র
১ জাপানি মনীষী শিল্পাচার্য ওকাকুরা তেনশিন
২ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৩ ইজুরায় প্রয়াত বন্ধু তেনশিনের পরিবারের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ১৯১৬ সালে
৪ ইজুরায় তেনশিন নির্মিত ছ কোণবিশিষ্ট বিশ্রামকক্ষ রোক্কাকুদোও
৫ রোক্কাকুদোওতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৬ ইজুরায় তেনশিন স্মারক স্তম্ভ: আজিয়া ওয়া হিতোৎসুদে আরে অর্থাৎ এশিয়া এক বাক্যটি খোদিত
৭ লেখক ওওরুই জুন
লেখক: শিশুসাহিত্যিক, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক, জাপান প্রবাসী



