আর্কাইভবইকথাবইকথা

বইকথা : সাদা-কালোয় অতীত : জয়দীপ দে

ফেরদৌস হাসান। নাট্যকার হিসেবে অধিক জনপ্রিয় হলেও কথাসাহিত্যে অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর কথাসাহিত্য চর্চার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো বিচিত্রগামিতা। বিচিত্র সব বিষয় নিয়ে লিখেছেন ৩৫টি উপন্যাস। ১৯৮৬ সালে আধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক বিচিত্রায় তোমার বসন্ত দিনে উপন্যাস প্রকাশের মাধ্যমে তাঁর ঔপন্যাসিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ। পরে এই উপন্যাসটির উপর ভিত্তি করে অভিনেতা তৌকীর আহমেদ বিটিভির জন্য ধারাবাহিক নাটক নির্মাণ করেন। নাটকটি দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল। রোমান্টিক ট্র্যাজিক উপন্যাস পা তাঁর প্রথম বই আকারে প্রকাশিত উপন্যাস। উপন্যাসটি ২০০১ সালে আহমেদ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত হয়। এক কিশোরীর পা ও এক তরুণের প্রেমাকাক্সক্ষাকে ঘিরে আবর্তিত হয় এ উপন্যাসটি।

প্রথম জীবনে তিনি আখতার ফেরদৌস রানা নামে উপন্যাস লিখতেন। বিচিত্রা ও পূর্ণিমার প্রতিটি ঈদ সংখ্যায় তাঁর নতুন নতুন উপন্যাসের দেখা মিলত। অবশ্য তখন তিনি বই প্রকাশে আগ্রহী ছিলেন না। পরবর্তীকালে ফেরদৌস হাসান নামে তিনি পাঠকের সামনে হাজির হন।

এবার বইমেলায় এসেছে তাঁর নতুন একটি উপন্যাস। সাদা-কালো। ইক্ষু কলে ইক্ষু সরবরাহ নিয়ে শুরু হওয়া একটা আন্দোলন দিয়ে এই আখ্যানের পথচলা। সেই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এক শিক্ষক। নাম কাজল মাস্টার। যিনি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। আবার এ-ও বিশ্বাস করতেন গণতন্ত্র ছাড়া সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। কাজল মাস্টারের সঙ্গে উগ্র বামপন্থি, যারা সর্বহারা নামে পরিচিত, তাদের সংযোগ ছিল। সর্বহারাদের নেতা উজ্জ্বল আবার তার শ্যালক রবির বন্ধু। আন্দোলন সহিংস রূপ নিলে কাজল মাস্টার ধৃত হন। পরে পুলিশ হেফাজতে নিহত হন। এদ্দুর পর্যন্ত পড়লে মনে হয়, সবকিছু খুব দ্রুত ঘটে যাচ্ছে। উপন্যাসে একটা তাড়াহুড়োর ভাব আছে। কিন্তু আরেকটু পথ এগুলেই বোঝা যায়, এটা আসলে উপন্যাস শুরুর ঘনঘটা মাত্র। মূল আখ্যান এর পর থেকে।

কাজল মাস্টার মৃত্যুর আগে সর্বহারাদের বস্তাভরা একটি অস্ত্রের চালান তার স্ত্রীকে বুঝিয়ে দিয়ে যান। এই অস্ত্রের বস্তা পরবর্তীকালে কাজল মাস্টারের শ্বশুর বাড়ির লোকজনের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রবি বাইক দুর্ঘটনায় হাসপাতালে ভর্তি হয়। রক্ষীবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারের ভয়ে সেখানেও তার থাকা হয় না। শেষে সে একটি সার্কাসের দলে আত্মগোপন করে। কিন্তু নিয়তি তাকে যেন স্বস্তি দিতে নারাজ। সেই সার্কাস দলের স্বত্বাধিকারী রবিকে চিনে ফেলে। সে তাকে ব্যবসার অংশীদার করতে চায়। সেখানেই সে দেখা পায় প্রিন্সেস রত্নার আড়ালে থাকা ছবি চৌধুরীর। এই ছবি তার পূর্ব পরিচিতা। এই ছবির আবির্ভাবে পুরো আখ্যান যেন নতুন রূপ পেল। সম্পন্ন গৃহস্থ রাসবিহারী বাবুর কন্যার বিপর্যয়ের দৃশ্যগুলো পাঠক হৃদয় নাড়িয়ে দিয়ে যায়। প্রতিরোধযোদ্ধা রাসবিহারীর কন্যা বীরাঙ্গনা ছবি চৌধুরীর সঙ্গে রাষ্ট্র ও সমাজের একের পর এক নিষ্ঠুর আচরণ সংবেদনশীল পাঠকহৃদয়কে বিচলিত করে তোলে।

যাই হোক, ফিকশন একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়। সাদা-কালোও একটা দাঁড়ির পরে শেষ হয়েছে। কিন্তু অনেক প্রশ্ন, দীর্ঘ ঘোর আর ক্ষমাহীন অস্বস্তি রেখে গেছে।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ নিয়ে খুব একটা লেখালেখি হয়নি। বিশেষ করে ফিকশন। মাজহারউল মান্নানের আত্মজৈবনিক উপন্যাস চোখ ভেসে যায় জলে পড়েছিলাম। সেটা পড়ে বিরাট এক ধাক্কা খেয়েছিলাম। এরপর আরেকটা ধাক্কা খেলাম সাদা-কালোয়। ফেরদৌস হাসান কৈশোরে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। তাই তাঁর এই বিবরণ স্বাধীনতার পক্ষের একজন লেখকের দৃষ্টিকোণ থেকে আসা, বলার অপেক্ষা রাখে না। তিনি আকারে ইঙ্গিতে তৎকালীন শাসনব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেছেন। এর প্রতিনিধিত্ব করেছে পুলিশ ও রক্ষীবাহিনীর নিষ্ঠুরতা। প্রথমে এত সোচ্চার না হলেও, শেষ পর্যায়ে জোহরার বয়ানে সর্বহারা নামের উগ্রবামপন্থিদের সমালোচনা করেছেন লেখক।

কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন রেখে উপন্যাসটি শেষ হয়েছে। কাজল মাস্টার কেন নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথে যাননি ? এক জায়গায় লেখা হয়েছে, কাজল মাস্টারের পিতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। আসলে তখন পরিষদ ছিল না, ছিল বোর্ড। পদটির নাম ছিল চেয়ারম্যান। এরা সবাই ছিল আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রী। যারা পরে মুসলিম লীগে যোগ দেয়। আবার সর্বহারারা ছিল চীনপন্থি। এদের বড় একটা অংশ স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। সদ্য স্বাধীন দেশে কীভাবে স্বাধীনতাবিরোধী দুটো শক্তি এত সক্রিয় হয়ে উঠল আমাকে ভাবিয়েছে।

লেখক আখ্যানটি বস্তুনিষ্ঠ করতে কী পরিমাণ পরিশ্রম করেছেন তা রাসবিহারীর দাহের দৃশ্যের বর্ণনা পড়লে বোঝা যায়। যাত্রাদলের বিভিন্ন অনুষঙ্গ এত দারুণভাবে তুলে ধরেছেন যা একজন তন্নিষ্ট গবেষক ছাড়া করা সম্ভব নয়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঘটনাপ্রবাহ বেশ অসঙ্গত মনে হয়েছে। হাতেনাতে ধরা পড়ার পরও মিন্টু চৌধুরী যখন রবিকে ছেড়ে দেয়, কৌতূহলী মনে হিসাব মেলে না একেবারে।

ফেরদৌস হাসান দৃশ্যলোকের মানুষ। নাটক সিনেমা তৈরি করেন। তাই ফ্রেমিংটা ভালো বোঝেন। ছোট ছোট বাক্য দিয়ে তাই একটার পর একটা মনোরম দৃশ্য বানিয়ে দিয়ে গেছেন। নির্ভার বর্ণনা আর প্রাঞ্জল ভাষায় এক হৃদয়গ্রাহী আখ্যান আমাদের উপহার দিলেন। পুকুরে ছবি চৌধুরীর কাঁচুলি ভাসার দৃশ্যটি আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল সমূলে। আমি যেন সব দেখতে পাচ্ছিলাম। যে ছবিকে রাসবিহারী কুমারী পূজা দিতেন, সেই ছবির কাঁচুলি দিঘিতে ভেসে উঠেছে―মায়ের ভাসান কতটা করুণ হাতে পারে ফেরদৌস হাসান দেখিয়ে দিলেন।

তবে শেষমেশ যে সবার শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে তাতেই রক্ষে। জোহরা যেভাবে তাপসীকে ফিরিয়ে আনে প্রতিশোধের পথ থেকে তাতে লেখকের দয়িত্বশীলতার প্রমাণ মেলে। উপন্যাসটি ছবির মুক্তি আর নীরার কান্নায় পাঠকের হৃদয় ভিজিয়ে দিয়ে শেষ হয়। অনেক দিন পাঠক মনে এই কান্নার দাগ লেগে থাকবে।

এটা নিছক উপন্যাস হিসেবে রয়ে যাবে না। বাংলাদেশের ইতিহাসের অনালোকিত কিছু অধ্যায়ের সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।

 লেখক : কথাসাহিত্যিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button