
লিটল ম্যাগাজিনগুলোর যে স্পিরিট থাকা দরকার, যে চেতনায় স্ফুরণে নতুনদের উজ্জীবিত করার প্রয়াস চালানো একান্ত দরকারি কাজ বলে মনে করি―তা সাম্প্রতিক নামক পত্রিকাটি করতে পেরেছে বলেই আমার বিশ্বাস। সমাজ, শিল্প ও সাহিত্যবিষয়ক লিটল ম্যাগাজিন সাম্প্রতিক একটি অনিন্দ্যসুন্দর কাগজ হিসেবে পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। পত্রিকাটি দীর্ঘ পথ পরিক্রমায়―নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে আজ ৩৩ বর্ষে এসে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি বিস্ময় জাগানিয়া অনুভূতিতে চমকিত করে এই ভেবে যে―পত্রিকাটি অন্যান্য অনেক কাগজকে ছাপিয়ে একটি ভিন্ন ধারার দ্যোতনা সৃষ্টি করতে পেরেছে। চলতি সংখ্যাটিও তার ব্যতিক্রম নয়। মে ২০২৫ সংখ্যাটি ‘শ্রমিক সংখ্যা’ হিসেবে ৩০৪ পৃষ্ঠা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। এ সংখ্যায় প্রবন্ধ, নিবন্ধ, কবিতা, ছোটগল্প, অনুবাদ, নাটক দিয়ে সাজানো হয়েছে।
সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে― ‘দেশকাল-সমাজ-মানুষ-রাজনীতি প্রভৃতি আমাদের আন্দোলিত করে। তাই, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সকল ষড়যন্ত্রের নাগপাশ থেকে নিজের দেশ-মাতৃভূমিকে আগলে রেখে নবউদ্যোমে আমাদের পথ চলতে হবে। নতুনের মাঝে থাকে সম্ভাবনা। আমাদের মাঝে যত সংশয় সব দূর হয়ে যাক। যুদ্ধ কোনও সমাধান নয়; সাময়িক উত্তেজনাকে প্রশমিত করে মাত্র। এ পৃথিবীতে মানুষ বাঁচুক। মানুষের বাসযোগ্য ভূমির বন্দোবস্ত করতে হবে। চাই একটা সবুজ পৃথিবী। যুদ্ধকে তাই না বলতে হবে।
‘যারা সরাসরি উৎপাদনব্যবস্থার সাথে জড়িত―কলে-কারখানায়, সুউচ্চ ভবন নির্মাণে, হাটে-মাঠে-ঘাটে যে সকল পা ফাটা মানুষের দুরন্ত মিছিল, যারা রক্তঘামে সভ্যতার চাকা সচল রেখেছেন; বিশ্বজুড়ে সেই সকল নিপীড়িত শ্রমজীবী গণমানুষের প্রতি লাল সালাম।’
এভাবে পত্রিকাটি জানান দিতে পেরেছে―বিশ্বব্যাপী যুদ্ধউন্মাদনা, পরাশক্তিগুলোর আস্ফালন, দেশে দেশে বিভেদের বীজ বপন করে তার সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যবাদকে সমুন্নত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা। এ সবই মানুষকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়ে মানব সভ্যতার বিনাশ করা ছাড়া আর কিছুই নয়। পত্রিকাটিকে সাধুবাদ জানাই শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে যুদ্ধের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা ছড়িয়ে দিতে পেরেছে বলে।
‘রক্ত ধোয়া মে, তোমায় লাল সালাম’ শিরোনামে প্রবন্ধে কামাল লোহানী লিখেছেন―‘যে দেশে গণমানুষের কোন মূল্য নেই, সেই বাংলাদেশে প্রতিবছরই পয়লা মে আসে। আসে মেহনতি মানুষের চিরঞ্জীব ঐক্যের উপলব্ধি নিয়ে, সংগ্রামের শপথ নেয়ার তাগিদ নিয়ে। বলে দিয়ে যায় চিরন্তর সেই স্লোগান, দুনিয়ার মজদুর এক হও। ’
‘সাম্যের দুনিয়া গড়ার শপথে মজবুত মেহনতি মানুষের ঐক্যের এই মহতী আহ্বান যখন পৌঁছে রেল কলোনিতে কিংবা শ্রমিকের বস্তিতে, কলে-কারখানায়, তখনই মেশিনের সাথে যাঁদের বুকের দরদ বাঁধা সেই মজদুর মেয়ে মরদের যূথবদ্ধ হাত আকাশে ছুড়ে দেয়, প্রতিধ্বনিত হয় আন্তর্জাতিকতার অমোঘ বাণী আর অনুরণন তোলে বিশ্বময়। লাখো কোটি কণ্ঠে উচ্চারিত হয় সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আর ঘোষণা করে, ‘…আমাদের শান্তি সুখ যারা করতে চায় লুঠতরাজ, সেই সব যুদ্ধোন্মাদ হামলাবাজদের বিরুদ্ধে জোট বাঁধো, তৈরি হও। …কিন্তু এ ছাড়াও প্রিয় স্বদেশ ভূমিতে আজ হিংস্র সরীসৃপ যে উদ্ধত শ্বাস ফেলছে সেই বন্যপশু পিশাচ সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের আজ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’
‘১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে শ্রমিকের রক্তস্নানে যে লাল পতাকা আর মে দিবস সূচনা, সেই মেহনতি মানুষের প্রত্যয়দৃপ্ত অঙ্গীকার―নয়া দুনিয়া গড়বে। অকুতোভয় সাহসে মালিকের শোষণ-নিপীড়ন আর পুঁজিবাদী চক্রান্ত উপেক্ষা করে শোষণহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে আত্মপ্রত্যয়ী সংগ্রামের ইতিহাস রচিত হয়েছিল, তারই পথ ধরে বিশ্বের সর্বত্র আজ এই দিনটি মহাসমারোহে পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু আমাদের মুক্ত স্বদেশ এই বাংলায় উদীয়মান শ্রমিক শ্রেণির প্রবল যে শক্তি গড়ে উঠেছিল আদর্শের ভিত্তিতে তাকে তছনছ করে দিয়েছে জনবিচ্ছিন্ন ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক শক্তি বিদেশি প্রভুচক্রের প্রেসক্রিপশনে। নিজেদের স্বার্থ হাসিলের এক মাধ্যমে পরিণত করেছিল ঐ লড়াকু শ্রমশক্তিকে। যারা সায় দিতে পারেনি, তারা হতমান ও বঞ্চনার শিকার হয়েছে। তাই থমকে গেছে শ্রমিক আন্দোলন। নেতৃত্বও প্রবল সাহসে কেন যেন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে, যদিও গৌরবোজ্জ্বল দূর অতীতের ঐতিহ্যমণ্ডিত সংগ্রামের ইতিহাস তাঁদেরই কব্জায়।’ অত্যন্ত সুখপাঠ্য লেখাটি বারবার পাঠ করবার মতো। লেখক প্রয়াত হয়েছেন, রেখে গেছেন তার চিরঞ্জীব লালিত স্বপ্নে বোনা―শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির আকাক্সক্ষাকে সমুন্নত রাখবার দৃঢ় প্রত্যয়।
‘বাংলাদেশের প্রথম শহিদ কলমশ্রমিক কবি মেহেরুন্নেসা’ শিরোনামে সলিমুল্লাহ খান প্রথমেই আহমদ ছফার লেখা থেকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন―‘আমাকে যখন কেউ ছাড়া-ছাড়াভাবে একাত্তর সম্পর্কে কিছু লিখতে বলেন কিংবা কোন মন্তব্য করতে বলেন, আমার ভীষণ রাগ ধরে যায়। কারণ একাত্তর সালে যা কিছু ঘটেছে, আমি যা কিছু দেখেছি, যে সকল ঘটনা এবং কর্মকাণ্ডে আমি এবং আমার বন্ধুরা অংশ নিয়েছি, আমার জাতির যে জাগরণ, যে প্রতিরোধ, যে দৃঢ় সংকল্প, মৃত্যুর যে সরল প্রস্তুতি, জয়ের যে নেশা, যে আত্মত্যাগ, যে বোকামি এবং উন্মাদনা আমি দেখেছি সবকিছুকে একটা বিরাট সত্তার অবিভাজ্য অংশ মনে হয়। চোখ বুজে একাত্তরের কথা চিন্তা করলে আমার কানে মহাসিন্ধুর কল্লোল ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।’
এ কথা তিনি কেন বলেছেন ? কারণ, ১৯৭১-এ লেখকদের মধ্যে যিনি প্রথম শহিদ হয়েছিলেন―তিনি কবি মেহেরুন্নেসা। ১৯৭১ সালের ২৬-২৭ মার্চ-এ মাত্র আটাশ-ঊনত্রিশ বছর বয়সের এই কবিকে রাজাকাররা বাসা থেকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। তাঁকে নিয়ে আহমদ ছফা, নূরজাহান বেগম, কাজী রোজী, দিল মনোয়ারা মনু, মকবুলা মনজুর, সুফিয়া কামালসহ অনেকের স্মৃতিচারণ নিয়ে লেখাটি সাজিয়েছেন সলিমুল্লাহ খান। এ লেখা থেকে তরুণ প্রজন্ম জানতে পারবে সে সময় কীভাবে বুদ্ধিজীবীদের ঘর থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। বেদনাবিধুর লেখাটি পাঠকের হৃদয়ে গেঁথে থাকবে।
মোঃ আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব―‘শ্রম ও মে দিবস’ শিরোনামে লিখেছেন―‘বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে টেক অব স্টেজে আছে। দেশ সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিতে যতগুলো ফ্যাক্টর আছে, তার মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো সস্তা শ্রম। এরই সুবাদে বাংলাদেশ শত বাধাবিঘ্নের মধ্যেও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে গার্মেন্টস শিল্প আশেপাশের দেশের সাথে বলতে গেলে প্রতিযোগিতা করে বহাল তবিয়তে টিকে আছে। এখানে বার লক্ষ মহিলা শ্রমিকসহ প্রায় পনের লক্ষ শ্রমিক দিবা-নিশি কাজ করে চলেছে এবং এদের চাহিদা খুব একটা নেই এবং অল্পে তুষ্ট বলে এটিকে প্লাস পয়েন্ট নিয়ে মালিকরা অনেক সময় ছড়ি ঘুরিয়ে থাকে। এখন শ্রমবাজার স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিকভাবে ম্যাক্রো অর্থনীতির আওতায় দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক প্রতিনিয়ত বিশ্ব শ্রমবাজারে ঢুকছে এবং বয়ে নিয়ে আসছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। তবে দক্ষ শ্রমের চাহিদা বেশি বলে, এই পথ ধরে যুগপৎ যে মেধা চলে যাচ্ছে (ইৎধরহ-উৎধরহ) তা অনেক ক্ষেত্রে ফিরে আসে না এবং এটি উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে শুভ নয়। তাছাড়া বর্তমানে শিশুশ্রম (ঈযরষফ খধনড়ঁৎ) আর এক ফোঁড়া হিসেবে দেখা দিয়েছে।’ আমাদের দেশে সস্তা শ্রমবাজার, মহিলা শ্রমিক, শিশুশ্রমিক নিয়ে তথ্যভিত্তিক লেখা পাঠককে শ্রমিকদের জীবন-মান নিয়ে সম্যক একটি ধারণা দিতে পারবে।
‘বিন-মাইনের শ্রমিক’ শিরোনামে সুকান্ত দে লিখেছেন―‘একজন মহিলা যখন নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন ছেলেপুলে লালনপালন করা ‘মা’ বলে তখন জনতা পাত্তা দেয়নি কিন্তু অন্য একদিন মেয়ের পরামর্শে যেই বললেন তিনি একজন ধাত্রী, শিক্ষিকা, নার্স এমনকি ফিনান্স এস্টিমেটার তখন জনতা চমৎকৃত হলো।
‘এসবের মধ্যে একেবারেই অন্যরকম একটি অবস্থানে আছেন একজন গৃহবধূ। তাঁর শ্রম আছে শ্রমের স্বীকৃতি নেই। স্বীকৃতি থাকলেও তাকে টাকায় বদলানো যায় না। এবং আরেকটি মজার কথা বলি। কম বয়সে মার্কস যখন শ্রমের বিচ্ছিন্নতা বা ধষরবহধঃরড়হ নিয়ে ধারণা দিচ্ছিলেন তখন মূলত বিক্রয়যোগ্য শ্রমের কথাই ভেবেছিলেন। পুঁজিবাদের অধীনে মানুষ যখন কাজ করে, খাটে তখন তিনি গৃহে থাকেন না কর্মক্ষেত্রে থাকেন আর যখন বাড়িতে থাকেন তখন তিনি কাজ করছেন না (ড়িৎশ ভৎড়স যড়সব পড়হপবঢ়ঃ ছিল না)। কিন্তু যে নারীর কর্মস্থলই বাড়ি তাহলে মার্কসের শ্রমতত্ত্ব মেনে বলতে হয় গৃহকর্ম করার সময় নারী নিজের বাড়িতে পরবাসিনী কারণ সেটি তাঁর কর্মক্ষেত্র। তাই তাঁর ঘর নেই। কারণ কর্মক্ষেত্র আর ঘর আলাদা, অন্যদিকে মার্কস-এর এই তত্ত্ব অনুযায়ী তিনি যখন ঘরের কাজ করছেন তিনি কর্মক্ষেত্রে নেই। তাই তাঁর কাজ মূলত অকাজ। তাকে বিক্রয়যোগ্য ভাবাই যাবে না। …গৃহকর্মকে পরিমাপ করা যায় না। কথা, কাজ, মানসিক সাহচর্য, কখনও উৎসাহ কখনও বকুনি, সেবা এর কি পরিমাপ হয়, না হতে পারে।’ আমাদের অর্ধেক জনসংখ্যা নারীর প্রতি মমত্ববোধ উৎসারিত হয়েছে লেখার পরতে পরতে। চমৎকার একটি লেখা।
অজন্তা রায় আচার্য ‘শ্রমিকশ্রেণির জীবন ও সংগ্রাম’ শিরোনামে লিখেছেন―‘আধুনিক শ্রমিকশ্রেণির জন্ম হয়েছিল যখন কলকারখনায় উৎপাদন শুরু হয়েছিল। ধনতন্ত্রের বিকাশের সাথে সাথে শ্রমিকশ্রেণির গঠনে অনেক পরিবর্তন হয়েছে, আজও হচ্ছে। উৎপাদন পদ্ধতি বদলে গেছে আগের তুলনায়, অনেক বেশি প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির ব্যবহার হচ্ছে, ফলে শ্রমিকদের কাজের ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। তবু ধনতান্ত্রিক উৎপাদনব্যবস্থা যতই যন্ত্রনির্ভর হোক এই শ্রমিক শ্রেণির ওপরেই তার অস্তিত্ব নির্ভর করে। পৃথিবীর বহু দেশে এবং ভারত বাংলাদেশেও সংগঠিত ক্ষেত্রে অর্থাৎ বড় বড় কলকারখনার ক্ষেত্রে শ্রমিকশ্রেণির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। তার বদলে অসংগঠিত শ্রমিকশ্রেণির সংখ্যা বাড়ছে। ঠিকা, চুক্তিভিত্তিক, অস্থায়ী, মওসুমি শ্রমিকের সংখ্যা ক্রমশই বাড়ছে। এই বিপুল অংশের শ্রমজীবীর মজুরির হার কম, নির্দিষ্ট কাজের সময় ও সুরক্ষা নিশ্চিত নয়, নিয়োগের স্থায়িত্ব নেই। দীর্ঘদিনের সংগ্রামের ফলে শ্রমজীবী মানুষের অর্জিত অধিকারের অনেক সুফলই এঁরা পান না।’ এই ঘুণে ধরা সমাজে মালিক-শ্রমিকশ্রেণির বিভাজন কখনওই দূর করা সম্ভব নয়। সুখপাঠ্য একটি লেখা।
‘মে দিবস এবং শ্রমিক মর্যাদাহীন গৃহকর্মীরা’ শিরোনামে রুখসানা কাজলের লেখায়―“এ বছর মে দিবসের প্রতিপাদ্য বা থিম, ‘শ্রমিক মালিক গড়বো দেশ, স্মার্ট হবে বাংলাদেশ’। প্রতিনিয়ত মালিকদের শ্রমদানকারী গৃহকর্মীদের শ্রমিক হিসেবে আইনত স্বীকৃতি না দিয়ে কি বাংলাদেশকে ‘স্মার্ট’ করে গড়ে তোলা সম্ভব নাকি নীতিহীন অন্যায্য কদর্যতা ? এইভাবে মে দিবসের মূল উদ্দেশ্যকে ভূলুণ্ঠিত করে কি মহান মে দিবস পালন করা যায় ? মন্ত্রীর বাড়িতে জবাই করা গৃহকর্মীর লাশ, সাংবাদিকের বাড়ির বারান্দা থেকে ঝরে পড়া গৃহকর্মীর লাশ, পুলিশ, মিলিটারি, ব্যাংকার, শিক্ষক, উকিল, সাংস্কৃতিক কর্মী, সাধারণ নাগরিকদের বাড়িতে নির্যাতিত, নিহত, আহত, পোড়ানো, ধর্ষিতা গৃহকর্মীদের জন্য ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণনীতি ২০১৫’ নীতিমালাটির অস্পষ্টতা দূর করে এটি আইনে পরিণত করে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিলে তবেই স্মার্ট হবে বাংলাদেশ। মহান মে দিবসকে সামনে রেখে একটি প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, বর্তমানে সর্বাপেক্ষা লাভজনক শিল্পের শ্রমিকরা কেমন আছে ? কেননা অধিক জনসংখ্যার দেশে শ্রমিক পাওয়া এমন কিছু কঠিন ব্যাপার নয়। শ্রম আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে স্বল্প মজুরিতে চোরাগোপ্তাভাবে নানাভাবে শ্রমিকদের দৈহিক ও মানসিক শ্রম কিনে নেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত করা হচ্ছে নারী শ্রমিকদের।” সুস্পষ্টভাবে কিছু প্রস্তাবনা উঠে এসেছে। ভালো লাগলো। প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়ন হলে খুশি হবো।
ধীরেন হালদার ‘সুকান্তের সাহিত্যে শ্রেণিচেতনা’ শিরোনামে লিখেছেন― “মধ্যবিত্ত শ্রেণির অভাব অনটন সুখ-দুঃখকে সাথী করে নিয়ে বড় হয়েছেন কবি সুকান্ত। শৈশবেই তাই তার কবিতা খেটে খাওয়া মানুষের কথায় বাক্সময় হয়ে উঠেছে। ধনিক শ্রেণির দ্বারা শ্রমিক, মজুর, খেটে খাওয়া মানুষের রক্তশোষণ দেখে শুনে সুকান্ত প্রতিবাদ মুখরিত হয়েছেন। তাই তার কবিতা কালের গণ্ডি অতিক্রম করে সর্বকালের সর্বহারা মানুষের আশার আলোকবর্তিকা হয়ে যুগ যুগ ধরে পিছিয়ে পড়া মানুষকে পথ দেখাবে। দুনিয়ার ধনী শ্রেণির গরিবদের প্রতি অন্যায়-অবিচারে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি লিখেছিলেন―‘বলতে পারো বড় মানুষ মোটর কেন চড়বে ?/ গরীব কেন সেই মোটরের তলায় চাপা পড়বে ?/ বড় মানুষ ভোজের পাতে ফেলে লুচি মিষ্টি/গরীবরা পায় খোলামকুচি এক অনাসৃষ্টি ?’ (পুরানো ধাঁধা)। এভাবেই তিনি সুকান্তের শ্রেণিচেতনা, সাম্যবাদী ভূমিকা, সর্বোপরি একজন কমিউনিস্ট হিসেবে নিজেকে তুলে ধরবার প্রয়াস পেয়েছেন।”
এ সংখ্যায় দুটি অনুবাদ রয়েছে ‘অবিসংবাদিত নাট্যজন সফদার হাশমি : যার নাটকের বিষয়বস্তু শ্রমজীবী মানুষ’ শিরোনামে অনুবাদ করেছেন দেবাশীষ ভট্টাচার্য্য। ‘এক পড়ুয়া শ্রমিকের প্রশ্নাবলী’ শিরোনামে বের্টল্ট ব্রেশট-এর কবিতা অনুবাদ করেছেন মাফীজ দীন সেখ। অনুবাদ দুটি বেশ সুখপাঠ্য।
শ্রমজীবীদের জন্য কবিতা লিখেছেন―গোলাম কিবরিয়া পিনু, হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, শিহাব শাহরিয়ার, আভা সরকার মণ্ডল, পলটু বাসার, শওকত হোসেন, শুভ্র আহমেদ, আহমেদ ফিরোজ, ওবায়েদ আকাশ, মনসুর আজিজ, শাকিলা নাছরিন পাপিয়া, আলমগীর খান, আলী আফজাল খান, বিধানেন্দু পুরকাইত, চন্দনকৃষ্ণ পাল, অরুণ চক্রবর্তী, মহুয়া দাস, মন্দিরা ঘোষ, সোহেল মাহবুব, বঙ্গ রাখাল, মানিক পণ্ডিত, বেবী সাউ, জাফর ওবায়েদ, তাহমিনা শাম্মী, ঝিলম ত্রিবেদী, সাহেদ মন্তাজ, উদয় শংকর দুর্জয়, টিপু সুলতান, রোকসানা পারভীন সাথী, সৌহার্দ সিরাজ, রাসেল আবদুর রহমান, ইমরুল ইউসুফ, শাহনাজ পারভীন, মল্লিকা আফরোজা, ভোলা দেবনাথ, রাজন্য রুহানি, শিশির আজম, আশরাফ চঞ্চল, মুত্তাকিন হাসান, মনিরুজ্জামান মুন্না, মণিদীপা নন্দী বিশ্বাস, লুৎফর রহমান সাজু, নাসিমা আক্তার, শরিফুল বাসার, বেণীমাধব সরকার, নাহিদা আশরাফী, ড. বিশ্বজিৎ বাউনা, আমিরুল বাসার, মাধব চন্দ্র মণ্ডল, জমর সাহানী, খগেশ্বর দাস, মিঠুন চক্রবর্তী, মনোজ অধিকারী, আলমগীর হোসেন টিটু, এম ডি কাইয়ুম, নবী হোসেন নবীন, সালাম তাসির, শর্বরী চৌধুরী, সৌম্যস্বপন চক্রবর্তী, শর্মিষ্ঠা ঘোষ, সুশান্ত হালদার, তুহিন কুমার চন্দ ও মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ।
এছাড়া ‘মঞ্চকর্মী থেকে অক্ষরকর্মী : বিনোদিনী’ শিরোনামে অরবিন্দ সরকারের একটি প্রবন্ধ রয়েছে। নাটিকা : ‘লাল পতাকার গান’ শিরোনামে লিখেছেন গাজী আজিজুর রহমান।
এ সংখ্যায় ছোটগল্প লিখেছেন―অমর মিত্র, মোহাম্মদ শামছুজ্জামান, নভেরা হোসেন, এলিজা খাতুন, শিল্পী গঙ্গোপাধ্যায়, কঙ্কন সরকার, শাশ্বত বোস, জয়িতা ভট্টাচার্য, সমর আচার্য্য ও বিবিকা দেব।
‘জীবনের রেলগাড়ি থেমে গেছে’ শিরোনামে কিংবদন্তি শ্রমিক নেতা কমরেড জসীম উদ্দীন মণ্ডলকে নিয়ে আনোয়ার কামাল একটি নিবন্ধ লিখেছেন। এ দেশের শ্রমিক আন্দোলনের পুরোধা, আজীবন বিপ্লবী, মেহনতি মানুষের মুক্তির সংগ্রামে নিজের জীবনকে যিনি উৎসর্গ করেছেন, তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব কমরেড জসীম উদ্দীন মণ্ডল। শ্রমিকশ্রেণির রাজনীতি করতে এসে যিনি দীর্ঘ ১৯ বছর কারা-নির্যাতন ভোগ করেছেন। তিনি এই নিবন্ধকারের কাছে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন― “তিনি তাঁর জীবনের স্মরণীয় ঘটনাগুলোর মধ্যে হিন্দু-মুসলমানের রায়টকে কখনো ভুলতে পারেননি। হিন্দুরা ‘বন্দে মাতরম’ আর মুসলমানরা ‘নারায়ে তকবির’ বলে একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট বেলা ১০টা হবে নিজের চোখের সামনে তিনি এসব দেখেছেন। সেদিন শিয়ালদহ থেকে সোজা রানাঘাট রেলগাড়ি দিয়ে আসার সময় কত জায়গায় যে রায়ট দেখেছেন তার হদিস নেই। দমদমে ও ব্যারাকপুরে গাড়িতে বোমা মারা হয়েছিল। রেলের নির্দেশ ছিল শিয়ালদহ থেকে রানাঘাটের মধ্যে কোথাও ট্রেন থামানো যাবে না। পথে হিন্দুরা গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো থামানোর জন্য। ওদের উপর দিয়ে ট্রেন চলে আসলো, আবার মুসলমানরা গাড়ি থামানোর জন্য সামনে বুক পেতে দিলো। ওদের উপর দিয়ে ট্রেন চালিয়ে নিয়ে আসলেন। এভাবেই হাজার হাজার লোককে তিনি ট্রেনে করে নিয়ে এসে বাঁচালেন। দেশ বিভক্ত হওয়ার পর অপশন দিলেন, ভারতে থাকার জন্য। কিন্তু তার দরখাস্ত শটিং করার সময় মুসলমান হিসেবে পাকিস্তানের দিকে রেখে দেয়। সেই থেকে তিনি তার প্রিয় দেশ এই বাংলাদেশে।” কুষ্টিয়া জেলায় জন্ম নেওয়া এই অজন্ম বিপ্লবী আমৃত্যু ঈশ্বরদীতেই কাটিয়েছেন। তিনি রেল শ্রমিকদের সংগঠিত করার জন্য আমৃত্যু লড়াই করেছেন। জেল খেটেছেন। রাজশাহী জেলখানার ঐতিহাসিক খাপড়া ওয়ার্ডে তিনি বন্দি ছিলেন।
‘শ্রমিকশ্রেণির যে পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি, যে পার্টি তার আদর্শে ধারণ করে কৃষকরাজ, শ্রমিকরাজ কায়েম করার। সেই পার্টিরই একজন সাচ্চা বিপ্লবী, যিনি একদম খাঁটি শ্রমিক হয়েই পার্টির লাল ঝান্ডাকে তুলে ধরেছেন অনন্য উচ্চতায়। এতে প্রকৃতপক্ষে যারা শ্রমিক হিসেবে নিজেদের জীবন শুরু করে কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য হতে পেরেছিলেন, তাদের মধ্যেও তিনি অন্যতম।’
মো. জাহিদুর রহমান ‘কণ্ঠশ্রমিক শেখ লুতফর রহমান’ শিরোনামে নিবন্ধে লিখেছেন―“বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতে একটি সুপরিচিত নাম শেখ লুতফর রহমান। এ দেশের একজন সঙ্গীত শিক্ষক, সঙ্গীত পরিচালক, শিল্পী, নিবেদিতপ্রাণ কণ্ঠশ্রমিক ও সুরসাধক হিসেবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। …বাবার কাছে শেখা তার প্রথম গানের কলি ‘মেঘের কোলে মেঘ জমেছে আঁধার করে আসে’।
এদেশের স্বনামধন্য খ্যাতিমান কণ্ঠশিল্পী মাহমুদুন্নবী, আবুবকর খান, শবনম মুশতারী, মহুয়া হক, আবিদা সুলতানা, রেবেকা সুলতানা, সাদিয়া মল্লিক, সাবিহা মাহবুবসহ অগণিত ছাত্র-ছাত্রী ও শ্রোতাদের হৃদয়ে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে আছেন শেখ লুতফর রহমান। তিনি একুশে পদক (১৯৭৯), নাসির উদ্দীন স্বর্ণপদক, জেবুন্নেসা-মাহবুব উল্লাহ কল্যাণ ট্রাস্ট পদক, বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ, নজরুল একাডেমি পুরস্কার, শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, ঋষিজ পদক, মুকুন্দ দাশ পদকসহ অনেক সম্মাননা অর্জন করেন।” এই গুণীজনকে নিয়ে একটি লেখা সংগীত পিপাসুদের কিঞ্চিৎ হলেও তৃষ্ণা মেটাবে।
এছাড়া আরও নিবন্ধ লিখেছেন ‘চা শ্রমিকদের জীবন ও সংগ্রাম’ নিয়ে মারুফ আহমেদ, শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে শহিদুল ইসলাম, ‘চা শ্রমিক আন্দোলন-১৯২১’ শিরোনামে মুহাম্মদ ফরিদ হাসান, ‘পাহাড়িদের শ্রম : মজুরি দিয়ে যা যায় না মাপা’ লিখেছেন আসিফ আজিজ, মুহাম্মদ আনোয়ার শাহাদাত ‘মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী শ্রমিকদের দিনলিপি’ শিরোনামে লিখেছেন। সুলতানা হুসাইন ‘শিরোনামহীন’ নামে একটা নিবন্ধ লিখেছেন। ‘স্মৃতির ক্যানভাসে’ শিরোনামে কেতকী বসুর একটি লেখা রয়েছে। ‘শ্রম’ নিয়ে আর্য সারথী লিখেছেন। সজীব খান ‘ভালো থাকুক শ্রমিক’ শিরোনামে একটি চমৎকার লেখা উপস্থাপন করেছেন।
পরিশেষে বলতে হয় শ্রমিক ও শ্রমজীবী সম্প্রদায় নিয়ে লেখা সাম্প্রতিক ‘শ্রমিক সংখ্যা’ আমার কাছে অনেক ভালো লেগেছে। কারণ, শ্রমিক এবং শ্রমিজীবী সম্প্রদায় নিয়ে আমাদের ভাববার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আমাদের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর নানান পেশার শ্রমিকরা দেশের অর্থনৈতিক চালিকা হিসেবে বিশ্বের কাছে এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সম্পাদককে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই এ কারণেই যে, লিটল ম্যাগাজিনের মতো একটি জায়গায় ‘শ্রমিক সংখ্যা’ কেউ করেছে বলে আমার নজরে পড়েনি। ব্যতিক্রমী সংখ্যাটির জন্য তাঁকে সাধুবাদ জানাতেই হবে।
লেখক: কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক



